পৃথিবী যতদিন সভ্য থাকবে, হিরোশিমা-নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা মেরে মানবিক পৃথিবীকে ধ্বংস করে দেয়ার কলঙ্ক মুছে ফেলতে পারবে না তথাকথিত শক্তিধর বিষধর দেশগুলি।
জাপানের চারটি শহরকে বেছে নেয়া হয়েছিল বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়ার জন্য। কিয়োতো, হিরোশিমা, ইয়োকোহামা, এবং কোকুরা। সেই সময়ের আমেরিকার যুদ্ধমন্ত্রী হেনরি স্টিমসনের প্রবল আপত্তির মুখে কিয়োতো শহর বেঁচে যায়।
আপনারা যারা ওপেনহেইমার সিনেমা দেখেছেন, সেখানে দেখানো হয়েছে হেনরি স্টিমসন বলছেন কিয়োতো শহরে তিনি হানিমুন করেছিলেন। ব্যাপারটি নাটকীয় ঠিকই, কিন্তু সত্য নয়। স্টিমসন কিয়োতোতে গিয়েছিলেন ১৯২৬ সালে - তাঁর বিয়ের ৩৩ বছর পর। কিয়োতো বেঁচে গিয়েছিল মূলত জাপানের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বলেই। যেভাবে জার্মানদের বোমা থেকে বেঁচে গিয়েছিল ইওরোপের প্যারিস।ইয়োকোহামা শহর পারমাণবিক বোমার হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিল - কারণ ১৯৪৫ সালের ২৯ মে এই শহরে এমনিতেই ব্যাপক বোমা মেরে অনেকটাই ধ্বংস করে ফেলা হয়েছিল। আমেরিকা চেয়েছিল শান্তিপূর্ণ নিখুঁত শহরে বোমা মেরে সেই শহরের সমস্ত নাগরিকসহ সবকিছু ধ্বংস করে শক্তির উন্মত্ততা প্রদর্শন করতে। ইয়োকোহামার ধ্বংসস্তূপের উপর আবার বোমা ফেলতে চায়নি তারা।
শেষে রইল দুটো নিখুঁত টার্গেট - হিরোশিমা ও কোকুরা। ৬ আগস্ট 'লিটল বয়' নামক বোমা ধ্বংস করে ফেললো হিরোশিমা শহর। পরবর্তী টার্গেট কোকুরা শহর।
৯ আগস্ট বি-২৯ বোমারু বিমান ফ্যাটম্যান নামক বোমা নিয়ে উড়ে গেল কোকুরা শহরের উপর। কিন্তু কালোমেঘে ঢাকা কোকুরা শহরের আকাশ। বিমান থেকে দেখা যাচ্ছিল না নিচের কিছুই। কিন্তু বোমা না মেরে চলে যাবে এমন মানবিক মন তো নেই কমান্ডার পাইলট মেজর চার্লস সুইনির।
কোকুরা শহরে বোমা ফেলতে না পারলে কী হবে, ফেলো অন্য কোন শহরে। বিমান চলে গেল দেড়শো কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে। সেখানে নাগাসাকি শহরের আকাশ ঝকঝকে পরিষ্কার। নেমে এলো 'ফ্যাটম্যান' নাগাসাকি শহরের বুকে। মুহূর্তেই ধ্বংস হয়ে গেল সবকিছু। নাগাসাকি শহর - আমেরিকার টার্গেট তালিকায়ই ছিল না যে শহর।
![]() |
| ট্রিনিটি সাইটে ফ্যাট ম্যান বোমার তথ্য |
আমেরিকার ঠিক যেখানে প্রথম পারমাণবিক বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল - সেখানে যাবার সুযোগ আমার হয়েছিল ২০০২ সালের এপ্রিলে। পুরো জায়গাটি এখনো তেজস্ক্রিয়। সেখানে বড় বড় সাইনবোর্ডে প্রমাণ রেখে দেয়া হয়েছে কী করেছিল তারা সেদিন।
![]() |
| হিরোশিমা শান্তি মিউজিয়ামে ফ্যাটম্যান বোমার মডেল |
হিরোশিমা শহরের পারমাণবিক শান্তি পার্কেও গিয়েছিলাম। যে দুটো বোমা 'লিটল বয়' ও 'ফ্যাট ম্যান' তাদের নাগরিকসহ দুটো শহর ধ্বংসস্তুপ করে দিয়েছে - সে দুটো বোমার মডেল তারা রেখে দিয়েছে জাদুঘরে। পৃথিবীর মানুষ দেখুক।
![]() |
| হিরোশিমার শান্তি পার্কে জাপানি শিক্ষার্থীদের সমবেত প্রার্থনা |
শান্তিপার্কে স্কুলের ছেলেমেয়েরা এসে সুশৃঙ্খলভাবে প্রার্থনা করে যায়, পৃথিবীর সকল মানুষের শান্তির জন্য। অন্তর থেকে বিদ্বেষ বিষ নাশো-র প্রার্থনা। দেখে মনটা ভারী হয়ে যায়। উম্মত্ত হিংসাপ্রিয় দানবীয় শক্তিগুলোর কাছে আবারো অসহায় লাগে নিজেকে।




No comments:
Post a Comment