Sunday, 23 August 2026

পাঠকের দিনলিপি ১৭-সেপ্টেম্বর-২০০৪

 


সেপ্টেম্বর ১৭, ২০০৪। শনিবার

ওয়াহিদুল হকের লেখার ধার খুব বেশি। মাঝে মাঝে ভাষাটাও কিছুটা জটিল হয়ে যায়। ১৬ সেপ্টেম্বরের ভোরের কাগজে লিখেছেন ১১ সেপ্টেম্বরের ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীদের উপর ছাত্রদল যে হামলা চালিয়েছে তার প্রতিবাদ করে। তিনি উপাচার্য ফয়েজের পদত্যাগ দাবী করছেন। কিন্তু আমাদের দেশের ইউনিভার্সিটির উপাচার্যদের কোন আত্মসম্মান বোধ এখন আর নেই। ইউনিভার্সিটিকে তাঁরা নীচে নামাতে নামাতে

রাজনীতিব্যবসায়ীদের দোকান করে ছেড়েছেন। একজন পিন্টু বা একজন লুসির ক্ষমতা এখন একজন উপাচার্যের চেয়ে বেশি।

সাপ্তাহিক ২০০০ এর ১৭ সেপ্টেম্বর সংখ্যা এখন ইন্টারনেটে। এই সংখ্যায় বেশ কিছু ভালো প্রতিবেদন আছে। প্রবাস জীবন নামে প্রবাসীদের পাতায় নিউইয়র্ক থেকে মঞ্জুর আহমদ লিখেছেন বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ প্রসংগে। কে বা কারা এখন নতুন করে একটা বিতর্কের সূচনা করেছেন। তা হলো বংগবন্ধু নাকি ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের শেষে জিয়ে পাকিস্তান বলেছিলেন। শামসুর রাহমানও নাকি কোথায় লিখেছেন এই কথা। আর হুমায়ূন আহমেদ তাঁর জোছনা ও জননীর গল্প উপন্যাসেও নাকি এই কথা লিখেছেন। কিন্তু ব্যাপারটা সত্য নয়। মঞ্জুর আহমদ দৈনিক পাকিস্তানের রিপোর্টার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সেদিন রেসকোর্সে। নোট নিয়েছেন। টেপ করেছেন ভাষণ। কিন্তু প্রশ্নই উঠেনি জিয়ে পাকিস্তানের। বংগবন্ধু জয় বাংলা বলে ভাষণ শেষ করেছিলেন। অনেকে নাকি রেডিওতেও শুনেছেন বলে দাবী করছেন। কিন্তু এই ভাষণ রেডিওতে প্রচার করা হয়েছিলো  ৮ মার্চ সকালে। জিয়ে পাকিস্তান বলাটা অবান্তর। বংগবন্ধু জিয়ে পাকিস্তান বলেছিলেন ৩রা জানুয়ারীর ভাষণে। সেদিন তিনি জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ গ্রহন অনুষ্ঠানে ভাষণ দিয়েছিলেন। আর শেষে বলেছিলেন জিয়ে পাকিস্তান আর জয় বাংলা। তখন আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জিতেছে। পশ্চিম পাকিস্তানীরা যদি ক্ষমতা তাঁর হাতে দিতে ছলচাতুরি না করতো তাহলে তো ৭ই মার্চের জনসভারও দরকার হতো না। আমাদের হূমায়ূন আহমেদ কেন এরকম একটা কাজ করলেন?

সাপ্তাহিক ২০০০ এর বিশেষ প্রতিবেদন ধর্ম ও হারবাল চিকিৎসার নামে প্রতারণা। লিখেছেন আহসান কবির ও খোন্দকার তানভীর জামিল। বাংলাদেশের মানুষকে ধর্মের নামে বিভ্রান্ত করাটা মনে হয় সবচেয়ে সহজ কাজ। যারা করে তারা ঠিকই জানে যে ধর্মের আপ্তবাক্যগুলির আসলে কোন শক্তি নেই। আর সর্বশক্তিমান বলেও আসলে কেউ নেই। আছে এই বিশ্বাস থাকলে তো তাদের কোন ধরনের প্রতারনা করার কথা নয়। ব্যবসার খাতিরে হালাল আর হারাম যত প্রচার পাচ্ছে তাতে করে ব্যাপারটা যে আর ধর্মীয় নেই, পুরাটাই ব্যবসায়িক হয়ে পড়েছে তা বুঝার ক্ষমতা তো মানুষের থাকা উচিত। বাংলাদেশের একটা এম এল এম কোম্পানী হলো ডোরওয়ে মার্কেটিং লিমিটেড। এম এল এম হলো মালটি লেভেল মার্কেটিং। অর্থাৎ এখানে ক্রেতারা ক্রেতা সৃষ্টি করে, মানে কমিশন পাবার জন্য ক্রেতারা বিক্রেতা হয়ে যায়। এই ডোরওয়ের ব্রুশিয়ারে বলা হয়েছে, ‘হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন, আয়ের শতকরা ৯০ ভাগ আসবে ব্যবসা থেকে। তিনিও এম এল এম রীতিতে অর্থাৎ দলগতভাবে দাওয়াতের মাধ্যমে সমাজ, দেশ, ধর্ম তথা জগতের কল্যাণমুখী বহু কাজ করে গেছেন। তাইতো আপনিও করবেন।’ এরা ক্ষমতাবান বা টাকাবান। তাই এরা মুহাম্মদের নামেও যা খুশি বলে পার পেয়ে যেতে পারে। আর ভালো মানুষ যদি কোন সত্য কথাও বলে, তাহলে সে মুহুর্তেই হয়ে পড়ে মুরতাদ। বা তার জন্য হতে পারে ব্লাসফেমী আইন।

সাপ্তাহিক ২০০০ এর আরেকটি প্রতিবেদন আহমইদ্যা খুন। সাতকানিয়ার আহমইদ্যা নাকি বি-এন-পিতে যোগ দিয়েছিলো। শাহজাহান চৌধুরি এম পির এই জামায়াতি ক্যাডার নাকি জামায়াতের রগকাটা রাজনীতির অনেক গোপন কাহিনী ফাঁস করে দিচ্ছিলো। তাই সে র‌্যাবের হাতে ধরা পড়ার পরে ক্রস ফায়ারে মারা গেলো। এরকম খুব হচ্ছে আজকাল। বড় সন্ত্রাসী ধরা পড়লেই মারা যাচ্ছে। আমার বন্ধু ফারুক মনে করে এটা ভালো। কিন্তু আমি মনে করি ভালো নয়। মানুষ মেরে ফেলার লাইসেন্স কারো পাওয়া উচিত নয়।

যোগাযোগ মন্ত্রনালয়ের দুর্নীতি বিষয়ে আর একটা প্রতিবেদন পড়লাম ২০০০ এ। নাজমুল হুদার একটা ছবিও আছে সেখানে। আমাদের দেশে যারা চুরি করে তারা খুব লজ্জিত থাকে। কিন্তু যারা বড় বড় দুর্নীতি করে, তাদের কোন লজ্জা নেই। তারা বড় বড় কথাও বলে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, কোন ছেলেমেয়েই কিন্তু বড়মুখ করে বলতে চায় না যে ‘‘আমার বাবা যা ঘুষ খায়!’’। কিন্তু বেশ আনন্দ আর গর্ব নিয়ে বলে যদি সৎ হয়, ‘‘আমার বাবা কোনদিনই ঘুষ খায়নি।’’ তবে কি ধরে নিতে হবে সততার একটা দাম কোথায় যেন রয়ে গেছে এখনো?

২০০০ এর আরেকটি আৎকে উঠা প্রতিবেদন হলো রোকেয়া হলে সিডি ক্যামেরা রহস্য। লিখেছেন কাওসার খান। ব্যাপারটা আৎকে উঠার মতোই। রোকেয়া হলের বাথরুমে নাকি কে বা কারা ক্যামেরা বসিয়ে মেয়েদের স্নান করার দৃশ্য ধারণ করে তা সিডি আকারে বাজারে ছেড়েছে। আমাদের দেশের পুরুষদের হলো কী? তারা কি তাদের মানসিক বৈকল্যের শিকার হয়ে গেলো পুরোপুরি? মেয়েদের সম্মান করা তো দূরের কথা, সুযোগ পেলেই তারা মেয়েদের উপর চড়াও হচ্ছে। প্রেমের অভিনয় করে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তা ক্যামেরা বন্দী করে বাজারে ছাড়ছে। এখন আবার স্নানঘরে ক্যামেরা বসানো। বিকৃতিরও তো একটা সীমা থাকা উচিত। এদেরকে কী বলবো আমি জানিনা। রুচি হচ্ছেনা। কেবল লজ্জা হচ্ছে যে আমিও একজন বাংলাদেশী পুরুষ । হয়তো আমাকেও কোন মেয়ের বিশ্বাস করা উচিত নয়। 

প্রথম আলোর উপসম্পাদকীয়তে হাসান ফেরদৌসের লেখা পড়লাম। জন কেরিকে নিয়ে লিখেছেন। আমারো মনে হচ্ছে জন কেরি জিততে পারবেন না। কারণ আমেরিকার সাধারণ মানুষ আঁতেল টাইপের মানুষ পছন্দ করে না। তারা ভোলাভালা সাধারণ মানুষ পছন্দ করে। একজন নোবেল বিজয়ীর চেয়ে একজন ভলিবল প্লেয়ারের গ্রহনযোগ্যতা এখানে অনেক বেশি। তারা নোবেলজয়ীকে সম্মান দেখাতে হয়তো রাজী। কিন্তু ভালোবাসতে রাজী নয়। কাছের মানুষ করতে রাজী নয়। আটপৌরে সাধারণ মানুষকেই এরা মনে করে স্বাভাবিক মানুষ। জর্জ বুশের গ্রহনযোগ্যতা সে হিসেবে জন কেরির চেয়ে অনেক বেশি। 

আর একটা ব্যাপার ক্লিয়ার হলো এতদিনে। অনেকে মনে করে জর্জ বুশ ২০০১ এর নির্বাচনে কারচুপি করে জিতেছেন। ব্যাপারটা ততোটা মোটা নয়। এদেশের নির্বাচনের নিয়ম অনুযায়ী ইলেক্টোরাল কলেজের ভোট পেয়ে আসলেই জিতেছেন জর্জ বুশ। সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি ভোট পেলেই কিন্তু জিতে যাবেন না। রাজ্যের ভোটার সংখ্যা অনুযায়ী ইলেক্টোরাল ভোট আছে। এখন যে কোন রাজ্যে যে জিতবেন সেই রাজ্যের সবগুলি ইলেক্টোরাল ভোট পাবেন তিনি। ৫০টি রাজ্য আছে এখানে। আল গোরের চেয়ে অনেক বেশি রাজ্যে  জিতেছিলেন জর্জ বুশ। আমেরিকানরা মনে করে তারা কোন মানুষ দ্বারা শাসিত নয়। তারা তাদের দেশের আইন দ্বারা শাসিত। এই আইন সকলের জন্য সমান। 

আর আমার কাছে হাসান ফেরদৌসের বিশ্লেষণ বেশ ভালো লাগলো। যেমন জন কেরি কিন্তু বলছেন আমেরিকার যুদ্ধ করা দরকার। তিনিও যুদ্ধ বন্ধ করবেন না। কারণ যুদ্ধ আমেরিকানদের একটা প্রিয় খেলা। আর ধর্মের ব্যাপারেও যেন জন কেরি বুশের চেয়ে কম যান না। জন কেরি বলছেন আমরা বলছি না যে ঈশ্বর আমাদের পক্ষে আছে, কিন্তু আমরা জানি আমরা ঈশ্বরের পক্ষে। ব্যাপারটা কী দাঁড়ালো? খালেদা যখন নির্বাচনের আগে বললো ধানের শীষে ভোট না দিলে বাংলাদেশ ইন্ডিয়ার অংশ হয়ে যাবে, মসজিদে উলুধবনি শোনা যাবে, তখন হাসিনা কী করলেন? মাদ্রাসায় অনুদান বাড়ালেন, ভারতের বিরুদ্ধে বলা শুরু করলেন আর বেশি বেশি মক্কা মদিনা করতে লাগলেন। শেষ রক্ষা কি হলো?

------------

কলম্বাস, ওহাইও

No comments:

Post a Comment

Latest Post

পাঠকের দিনলিপি ১৬-অক্টোবর-২০০৪

  ১৬/১০/২০০৪ গোলাম শফিকের গল্প ‘তেজখালির ব্রিজ’ পড়লাম ভোরের কাগজের সাহিত্য পাতায়। স্বাধীনতা যুদ্ধের কিছু আগে তেজখালিতে একটা ব্রিজ তৈরির কা...

Popular Posts