Wednesday, 26 August 2026

পাঠকের দিনলিপি ২১-ডিসেম্বর-২০০৪

 


২১/১২/২০০৪

নবনীতা দেবসেন দেশে ফিরে আই পত্রিকায় লিখেছেন তাঁর মেলবোর্ন সফর সম্পর্কে। সেখানে তিনি বাঙালিদের সাথে একটি সন্ধ্যা কাটিয়েছেন, শহরে ঘুরেছেন আর মেলবোর্নের কিছু ইংরেজি সাহিত্যসেবীর সাথেও সময় কাটিয়েছেন। এবার তাঁর সাথে ছিলো তাঁর কুড়িয়ে পাওয়া পোষা মেয়ে শ্রাবস্তী। নয় ঘন্টার ভিডিও নাকি করেছেন আর আটশো ছবি তুলেছেন।

একটা গল্প পড়লাম তাও আই পত্রিকায় - দশ। কিছুটা আধিভৌতিক গল্প।

এবার কাজের কথায় আসি। বাংলাদেশের সংবাদপত্রের কলামগুলো একসময় গোগ্রাসে গিলতে শুরু করেছিলাম আর প্রায় প্রত্যেকটারই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু আসলে সবগুলোই হলো থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড়। কলামিস্টরা লেখেন কারণ ওটা করে তারা নাম পান, টাকা পান। প্রাণের তাগিদেও লেখেন অনেকে। গ্যাস দেবার জন্যও অনেকে আর আখের গোছাবার জন্যও অনেকে। সাংবাদিকদের ওপর ভক্তি আর শ্রদ্ধা অচল থাকছে না আমার। 

এখানের পিবিএস টিভিতে এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে একটা অনুষ্ঠান প্রচারিত হলো সেদিন। এবার পাঁচটি মেজর টিভি চ্যানেলের চারটি খোলাখুলিভাবে বুশের নামমাহাত্ম্য প্রচার করেছে। যেগুলো বুশের বিরুদ্ধে গেছে সেসব হয় বিকৃত করেছে, নয়তো ব্ল্যাক আউট করেছে। রেডিও স্টেশানে প্রচারিত হয়েছে অদ্ভুত সব কথাবার্তা। বলা হয়েছে কেরিকে ভোট দেয়া মানে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ভোট দেয়া, যিশুর বিরুদ্ধে ভোট দেয়া, বিন লাদেনের পক্ষে কাজ করা আর নাইন ইলেভেনে যারা মরে গেছে তাদের পরিবারের গায়ে থাপ্পড় মারা।

আমেরিকার সাথে বাংলাদেশের পার্থক্য আছে কিছু? কিছুই নেই। সাদা চোখে কিছু পার্থক্য চোখে পড়ে। যেমন ফেনীর জয়নাল হাজারী সাংবাদিক টিপুকে মেরেছিলো। অন্যায়। সেটা নিয়ে প্রথম আলো আর ডেইলি স্টার যুদ্ধ করলো। কিন্তু সাংবাদিক মানিক সাহাকে যে একেবারে মেরে ফেললো বোমা মেরে? আরো অনেক সাংবাদিক আহত আর নিহত হলেন, কিন্তু যুদ্ধটা থেমে গেলো কেন?

গাছ কাটার বিরুদ্ধে নেমেছিলেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। এখন তিনি বসে আছেন কেন? এখন আর গাছ কাটা হচ্ছে না দেশে? এরকম আরো অনেক কিছু আছে যা আমার চোখে পড়ছে না। কিন্তু সংবাদ পত্রের লেখাগুলো পড়ার বিশেষ কোন উপকারীতা আছে বলে আর মনে হচ্ছে না আমার। 

মৈত্রেয় জাতক পড়লাম। পড়তে অনেক সময় লাগলো। বাণী বসুর এই বইটা বেরিয়েছে ১৯৯৬ সালে। তখন আমি বাংলাদেশে ছিলাম। কিন্তু বইটা পড়ার সময় পাইনি। আমার কাছে যে কপিটা আছে তা রাকার জন্মদিনে উপহার দিয়েছিলেন পূর্ণিমা ম্যাডাম ১৯৯৮ সালে। এবার মানে ২০০৩ সালে বাংলাদেশ থেকে আসার সময় আমার ব্যাগে দিয়ে দিয়েছে দিদিভাই। পড়তে বেশ সময় লেগেছে। কারণ বইটা একটানা পড়ে শেষ করার মত গতিশীল নয়। কিছু কিছু বই আছে যা পড়ে ফেলার পরে আফসোস হয় , কেন এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেলো। আর সত্যি বলতে কি মৈত্রেয় জাতক পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে এই বইটা শেষ হয়না কেন? সেটা অবশ্য আমার নিজেরই দোষ। আমি হয়তো এই বইয়ের যোগ্য পাঠক নই।

বাণী বসু একটা সময়কে এখানে ধরতে চেয়েছেন। বইয়ের শুরুতে তাঁর নিবেদনেই একথা প্রকাশ পায়। আমার প্রশ্ন হলো বইটার ঘটনা পুরোটাই মানে শতকরা ১০০ ভাগ ঐতিহাসিক নয়। উপন্যাসের উপাদান ঢুকিয়ে এটাকে উপন্যাস করা হয়েছে। সেসময়ের চরিত্রগুলো বাংলাভাষায় কথা বলতেন না। গৌতম বুদ্ধ বা চনক বা তিষ্য বা বিশাখা কেউই বাংলাভাষী ছিলেন না। কিন্তু উপন্যাসটা বাংলা বলে সবাই বাংলায় কথা বলেছেন। তাহলে বাংলায় অপ্রচলিত শব্দগুলো ব্যবহার না করে সহজ বাংলা ব্যবহার করা যেতো না? অর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি বইটাকে আরো সহজ করে লেখা যেতো কিনা। তাতে বাণী বসুর পান্ডিত্য সম্পর্কে আমাদের মোটেও কোন সন্দেহ জাগতো না।

গৌতম বুদ্ধ এই বইয়ের একজন নায়ক, কিন্তু একমাত্র নায়ক নন। চনককে দেখানো হয়েছে যুক্তিবাদী হিসেবে, যিনি দেখেন, বিশ্নেষণ করেন আর সেখান থেকে শিক্ষা আর সিদ্ধান্ত নেবার কথা ভাবেন। গৌতম বুদ্ধের প্রতি সবাই আকৃষ্ট হচ্ছে, কিন্তু আকৃষ্ট হবার মতো তেমন সম্মোহণী চরিত্র হিসেবে গৌতম এই বইয়ে ফুটে ওঠেননি। তবে এই বইয়ের সবচেয়ে যৌক্তিক বিশ্লেষণ হলো বুদ্ধের মতের যে স্ববিরোধীতা আর একটা অকর্মণ্য পরাশ্রয়ী ভিক্ষুকের শ্রেণী তৈরি করা ছাড়া বুদ্ধের অনুশাসনের আর কোন মহৎ ব্যাপার ঘটেনি তা পরিষ্কার হয়ে গেছে। 

কিছু কিছু ব্যাপারে অবশ্য কোন ধরনের প্রশ্ন না তুলেই মেনে নেয়া হয়েছে বা বইয়ে তুলে আনা হয়েছে। যেমন শিস দিয়ে হাতি বশ করা। বেশ কয়েকবার এই ব্যাপারটা দেখা গেছে। একবার বালিকা বিশাখা করেছে, একবার চনক এবং অন্যবার গৌতম। গৌতমকে তো হাতি স্নান করিয়ে দিচ্ছে। দেখা গেলো গৌতমকে চাকভাঙা মধু খাওয়াচ্ছে বনের বানর। একটা মৌচাক নিয়ে এসে তা দুহাতে টিপে মধু খাওয়াচ্ছে। একটা মৌচাকে হাজার হাজার মৌমাছির প্রাণ থাকে। তাদের মেরে মধু খেতে গৌতমের কিছু মনে হয় না। রাজাদের সাথে হাত মিলিয়ে বিশাখার মতো রাণি বা রাজকন্যাদের মোহিত করে চমৎকার সব উপহারের ব্যবস্থা, প্রতিদিন খাদ্য বস্ত্রের ব্যবস্থা দেখে মনে হয় না যে বৈরাগ্যই বুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিলো। সে হিসেবে দেবদত্ত যখন বুদ্ধের ‘কিং মেকার’ হবার স্বপ্নের কথা বলেন, তা আর অস্বীকার করা যায় না। বুদ্ধ মনে করেন সবকিছুই কর্মফল। ভালো কথা। কিন্তু পূর্বজন্মের ফল মনে করাটা তো ভালো কথা নয়। তিনি আত্মায় বিশ্বাস করেন না। খুবই ভালো কথা। কিন্তু মানুষ মরে গেলে আবার জন্মে কীভাবে? বুদ্ধের  উত্তর নেই। তিনি বলেছেন মজঝিম প্রথা বা মধ্য পন্থার কথা। মানে সুবিধাবাদীতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

বইটার বিরুদ্ধে বৌদ্ধধর্মের অনুসারীদের কাছ থেকে কোনরূপ প্রতিবাদ করা হয়েছে কিনা জানি না। প্রতিবাদ করতে তো যুক্তি লাগে না। এমনিতে গলাবাজী করলেই হয়। যেমন সুনীল হিন্দুদের দেবী কালীকে সাঁওতালদের নেংটা মেয়ে বলাতে হিন্দুরা ক্ষেপে গিয়েছিলো।

-------

কলম্বাস, ওহাইও


No comments:

Post a Comment

Latest Post

Ken Amos — My Teacher My Mentor

  For many people, another kind of student life begins after the formal years of schooling, college, and university degrees have come to an ...

Popular Posts