Tuesday 30 April 2019

ইয়ারার তীরে মেলবোর্ন - পঞ্চবিংশ পর্ব


৩১ জুলাই ১৯৯৮ শুক্রবার

প্লাটিনাম ব্লন্ডকথাটা প্রথম শুনেছিলাম ফারুকের কাছে। মাস্টার্সে ইলেকট্রনিক্স ও ডিজিটাল ইনস্ট্রুমেন্টেশান পড়াতেন ভুঁইয়া স্যার। তিনি ফ্রান্সে পি-এইচ-ডি করতে গিয়েছিলেন কোট-টাই পরে, ফিরেছেন মোল্লাদের মত মানসিকতা আর লম্বা আলখেল্লা নিয়ে। তখন তিনি ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান, সুতরাং তাঁর কথার বাইরে আর কোন কথা থাকতে পারে না বলেই তাঁর ধারণা। ডিজিটাল ইলেকট্রনিক্সের আমেরিকান বই পড়াতে গিয়ে ব্লন্ড আর ব্রুনেটের উদাহরণ পাওয়া গেল। ভুঁইয়া স্যার বললেন ব্লন্ড মানে বেঁটে মেয়ে আর ব্রুনেট মানে লম্বা মেয়ে। আর যায় কোথায়! ফারুক উঠে দাঁড়িয়ে স্যারের মুখের উপর বলে দিলো- ব্লন্ড মানে সোনালি রঙের চুল। ছেলে বা মেয়ে যে কেউ ব্লন্ড হতে পারে। ফারুকের এরকম পান্ডিত্যপূর্ণ বোকামীর পরিচয় আমরা আগেও পেয়েছি। কিন্তু এরকম সরাসরি বোমা ফাটানোর নাম আত্মহত্যা। অনেক ভুগতে হয়েছে তাকে এর জন্য। সে অন্য প্রসঙ্গ। আমরা বন্ধুরা ফারুকের কাছ থেকে অনেক ইংরেজি শব্দ শিখেছি, জেনেছি অনেক ধরনের সংস্কৃতির কথা। আজ সকালে প্লাটিনাম ব্লন্ড জিনেটের মুখোমুখি হয়েই মনে পড়লো ফারুকের কথা।
            সোয়া নটার দিকে ডিপার্টমেন্টে গিয়ে দেখি আমার রুমের দরজা হাট করে খোলা। দরজা যেন বন্ধ হয়ে না যায় সে জন্য কাঠের একটা প্রতিবন্ধকও দেয়া হয়েছে। রুমটা কেন যেন একটু অন্যরকম লাগছে। মিষ্টি একটা গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে রুমের ভেতর। ম্যান্ডি বা ইমাজিন কেউই এরকম গন্ধ ব্যবহার করে না। তার মানে নতুন কেউ। ফেলুদা হবার চেষ্টা করলাম। ইমাজিনের পাশের ডেস্কের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারলাম- তিনি এসেছেন। ডেস্ক পরিপাটি করে সাজানো। বুক শেল্‌ফের ধার ঘেঁষে অনেকগুলো খেলনা গাড়ি, ছোট ছোট লাল-নীল-হলুদ। পদার্থবিজ্ঞানীদের এরকম শখও যে থাকে তা জানতাম না।
            মিনিট পাঁচেক পরেই খট্‌ খট্‌ জুতোর শব্দে ফিরে তাকাতেই চোখাচোখি হয়ে গেল। ঘরে ঢুকছে পাঁচ-ফুট আট ইঞ্চি উচ্চতার পারফেক্ট প্লাটিনাম ব্লন্ড। কালো পোশাকের ছিপছিপে মানুষটার সবকিছু এতটাই পরিপাটি যে মনে হচ্ছে সিনেমার পর্দায় কোন হলিউডের নায়িকাকে দেখছি।
            হাই, আই এম জিনেট, জিনেট ফাইফ। ইউ মাস্ট বি প্রাডিব হ্যান্ডশেক করতে করতে বললো জিনেট। ঝাঁঝালো কন্ঠস্বর জিনেটের। তার কন্ঠ মিষ্টি হলে সব কিছু বড় বেশি নিখুঁত হয়ে যেতো। জিনেটের চোখ ঘন নীল। এরকম চোখের দিকে সরাসরি তাকানো যায় না।
            তুমি এসেছো বাংলাদেশ থেকে, তাই না?
            হ্যাঁ, তোমাকে কে বললো?
            ইমাজিন। কেমন লাগছে এখানে?
            জিনেটের ভেতর একটা সহজাত নেতৃত্বের ভাব আছে। কী জানি হয়তো সে স্টুডেন্ট-লিডার টাইপের কিছু। অবশ্য এখানে স্টুডেন্ট পলিটিক্সের ছিঁটেফোঁটাও তো চোখে পড়েনি কোথাও। সে যাই হোক। জিনেট যে স্টুডেন্ট মহলে খুব জনপ্রিয় তা বুঝতে পারলাম একটু পরেই।
            এতদিন আছি এখানে- কাউকে দেখিনি ম্যান্ডি বা ইমাজিনকে খুঁজতে এসেছে। অথচ আজ আধঘন্টার মধ্যে পাঁচ-ছজন এসে দেখা করে গেলো জিনেটের সাথে। জিনেট তাদের সাথে আমাকেও পরিচয় করিয়ে দিলো। অনার্সের রোল্যান্ড ছাড়া বাকিরা সবাই পি-এইচ-ডি স্টুডেন্ট। পার্টিক্যাল থিওরি গ্রুপের নিকোল আর স্টেফি, এক্স-রে ডিফ্রাকশান গ্রুপের ট্রেসি। ভয়াবহ রকমের মোটা এই ট্রেসিকেই দেখেছি নিচের রিসেপশানে কাজ করতে। তখন তাকে খুব গম্ভীর মনে হয়েছিল। আজ দেখছি জিনেটের সাথে খুব হেসে হেসে কথা বলছে। আমাকেও হাসিমুখে হাই বললো। দৈত্যাকৃতি মার্ক যখন ঘরে ঢুকলো- তখন দশটা বাজতে পাঁচ। কোন রকমে হাই- বাই করে চলে গেলাম লেসের ক্লাসে।
            লেস একটা এসাইনমেন্ট ধরিয়ে দিলেন সবাইকে। তিনটা প্রোবলেম সল্‌ভ করে জমা দিতে হবে তিন সপ্তাহের মধ্যে। চোখ বুলিয়ে বুঝতে পারলাম এগুলো সল্‌ভ করতে হলে কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরির অনেক গভীরে ঢুকতে হবে। শখ করে এই কোর্সে এসে তো দেখছি বিপদে পড়ে গেলাম।
            ক্লাস শেষে অফিসে এসে দেখি হলুদ স্টিকারে ঝকঝকে হাতের লেখায় আমার জন্য ম্যাসেজ অপেক্ষা করছে আমার ডেস্কের ওপর- “Ali Called@11:15am 31.08.1998” জিনেটের কাজও বেশ পরিপাটি। অফিসে এখন কেউ নেই। ফোন করলাম আলী সাহেবের অফিসের নম্বরে।
            স্যার, আমি প্রদীপ। আপনি যখন ফোন করেছিলেন আমি তখন ক্লাসে ছিলাম
            হ্যাঁ, যে জন্য ফোন করেছিলাম। আমি বাংলাদেশে যাচ্ছি সোমবার। তুমি যদি চিঠিপত্র কিছু দাও- আমি নিয়ে যেতে পারি। সানডেতে বাসায় ফোন করো। তখন বলে দেবো ডিটেল্‌স
            ও-কে স্যার
            আরেকটি কথা। তুমি কি বিট্টুর সাথে কথা বলেছো?
            জ্বি না স্যার
            তুমি তো আর-এম-আই-টিতে গিয়ে তার সাথে দেখা করতে পারো। তার মোবাইল নাম্বার না থাকলে লিখে নাও
            অফিসের ফোন থেকে মোবাইলে ফোন করা যায় না। নিচে নেমে পাবলিক ফোনে এক ডলার দিয়ে দেড় মিনিটের মত কথা বলতে পারলাম বিট্টুর সাথে। তিনটার দিকে আর-এম-আই-টির কার্ডিগান স্ট্রিটের বিল্ডিং-এ যেতে বললো সে।
            কার্লটন এরিয়া ম্যাপ থেকে কার্ডিগান স্ট্রিট খুঁজে বের করলাম। খুব বেশি দূরে নয় এখান থেকে। আড়াইটার দিকে বেরিয়ে পড়লাম। সোয়ান্সটন স্ট্রিটের ওপর আর-এম-আই-টি ইউনিভার্সিটির বিশাল বিল্ডিং-টার কাছে গিয়ে বামে মোড় নিলাম। সোয়ান্সটন স্ট্রিটের সমান্তরাল রাস্তাটিই কার্ডিগান স্ট্রিট। এখানে বেশির ভাগই টাউন-হাউজ। ইউনিভার্সিটির কোন বড় বিল্ডিং-তো চোখে পড়লো না। কার্ডিগান স্ট্রিটের আগাগোড়া হেঁটে একটা ছোট্ট ঘরের সামনে আর-এম-আই-টির একটা সাইনবোর্ড দেখলাম। কোন অফিস বলে মনে হচ্ছে।
            কাছে গিয়ে দেখি  ঠিক পাশের ঘরের সামনে লাল নিয়ন সাইন জ্বলছে- ইউটোপিয়া। নীল রঙের ওপেন সাইনটা জ্বলছে আর নিভছে। বন্ধ দরজার ওপর একটা মেয়ের ছবি যে ভঙ্গিতে আঁকা তাতে ভীষণ খটকা লাগছে। দ্রুতগামী একটা ট্যাক্সি এসে থামলো  ইউটোপিয়ার সামনে। দুজন মেয়ে দ্রুত নেমে প্রায় ছুটে ঢুকে গেলো ইউটোপিয়ার বন্ধ দরজা ঠেলে। তাদের পোশাক পরিচ্ছদ সাজ-গোজ দেখে বুঝলাম আমার সন্দেহ ঠিক। একটা ইউনিভার্সিটির অফিসের পাশের রুমেই কিনা চলছে নিষিদ্ধ জগতের আয়োজন!
            সভ্যতার নানারকম অসুখও থাকে। কদিন আগে লোকাল ফ্রি পেপারে একটা জমকালো বিজ্ঞাপন দেখেছিলাম। বিজ্ঞাপনের ভাষ্য এরকমঃ একজন স্কুল শিক্ষিকার বেতন ঘন্টায় তেইশ ডলার, একজন নার্সের বেতন ঘন্টায় পঁচিশ ডলার, একজন বিমান-বালার বেতন ঘন্টায় তিরিশ ডলার, একজন ডাক্তারের বেতন ঘন্টায় একশ ডলার। কিন্তু তুমি যদি আঠারো থেকে পঁচিশ বছরের মেয়ে হও- ইচ্ছে করলে ঘন্টায় পাঁচশ থেকে হাজার ডলার উপার্জন করতে পারো। যোগাযোগের ঠিকানা ইত্যাদি। এরকমই কোন কর্মক্ষেত্র ইউটোপিয়া যেখানে কেউ কেউ ঘন্টায় হাজার ডলার উপার্জন করে।
            আর-এম-আই-টির অফিসে উঁকি দিলাম। বিট্টুর চিহ্নও নেই  কোথাও। তবে কি ভুল জায়গায় এসেছি? এখানে অপেক্ষা করার কোন মানে হয় না। ফিরে এলাম নিজের অফিসে। 
            রাত আটটায় লেবি থিয়েটারে ফিজিক্স পাবলিক লেকচার। শুক্রবারের সন্ধ্যায় নানারকম বিনোদনের উপাদান উপেক্ষা করে প্রায় শতিনেক মানুষ বসে বসে বৈজ্ঞানিক বক্তৃতা শুনলেন। আজকের বিষয় ছিলোঃ New Eyes on Mars: Physics of the Pathfinder Mission. মঙ্গলগ্রহ অভিযানের নানারকম খুঁটিনাটি। বক্তা এসোসিয়েট প্রফেসর ডেভিড জেমাইসন। দাড়িওয়ালা প্রফেসর জেমাইসনকে দেখতে অনেকটা নোবেল বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী আবদুস সালামের মত লাগে। চমৎকার উপস্থাপনা তাঁর। বিজ্ঞানের খটমটে জিনিস যে এত আকর্ষণীয় হতে পারে চোখের সামনে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। দুটো বিরাট বিরাট পর্দায় প্রতিফলিত হলো মঙ্গল গ্রহের ঘূর্ণন, পাথফাইন্ডার মিশনের বৈজ্ঞানিক কাজ-কর্ম। দেড়-ঘন্টার প্রতিটি সেকেন্ড উপভোগ করলাম। ইউনিভার্সিটিগুলোর সাথে জনগণের এরকম সরাসরি যোগাযোগ আমাদের দেশে খুব একটা দেখা যায় না। বক্তৃতা শেষে প্রশ্নোত্তর পর্বটা আরো আকর্ষণীয়। দারুণ ভালো লাগা নিয়ে বাসায় ফিরলাম রাত দশটার দিকে। ফিলের লাউঞ্জরুমের উইক-এন্ড পার্টি তখন তুঙ্গে।
___________

PART 26


Monday 29 April 2019

ইয়ারার তীরে মেলবোর্ন - চতুর্বিংশ পর্ব


৩০ জুলাই ১৯৯৮ বৃহস্পতিবার

কোন্‌ কাজ করিলে কী ফল হয় নামে একটা চটি-বই হাতে এসেছিল ক্লাস এইটে পড়ার সময়। সেখানে বিচিত্র সব প্রশ্নোত্তর ছিল। কিছু কিছু প্রশ্নোত্তর যদিও আমার তখনকার বোধের বাইরে ছিল, তবুও বেশ মজা পেয়েছিলাম বইটা পড়ে। সেখানে হাঁচি প্রসঙ্গে তথ্য ছিলঃ যাত্রাকালে একটা হাঁচি দিলে যাত্রানাস্তি হয়। শুভকাজে একটা হাঁচি অমঙ্গলের লক্ষণ। পরপর দুটো হাঁচি দিলে ফল আবার শুভ হয়। পরপর তিনটা বা চারটা হাঁচি দিলে কী হয় তা বইটাতে লেখা ছিল না। দিদিকে জিজ্ঞেস করলে সে বিজ্ঞের মত উত্তর দিয়েছিল- এটা হলো অড আর ইভেন নাম্বারের ব্যাপার। বেজোড় সংখ্যক হাঁচি অশুভ, আর জোড় সংখ্যক হাঁচি শুভশুভ-অশুভ নামক শব্দগুলোর কোন প্রভাব নেই আমার জীবনে। থাকলে গত ছত্রিশ ঘন্টার হাঁচির হিসেব করার জন্য কাগজ-কলম লাগতো।
            ব্যাপারটা শুরু হয়েছে পরশু মধ্যরাত থেকে। চার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে কার্লটন সেমিট্রির শেষ প্রান্ত পর্যন্ত যাওয়া-আসাটা একটু বেশি হয়ে গেছে। ভেবেছিলাম একটা লম্বা ঘুম দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু হয়নি। শরীরের তাপমাত্রা বেড়েছে ইচ্ছেমত। নাক-চোখ দিয়ে পানির সাথে একটু পর-পরই হাঁচি; নাকে-মুখে গামছা চেপেও চাপা যায় না। অনেক দিন পর পুরো একটা দিন দুটো রাত কেটে গেলো বিছানায়।
            আজ সকাল নটার দিকে অফিসে ঢোকার সময় কেনের সাথে গুড মর্নিং বিনিময় হলো। গতকাল যে আসিনি সে ব্যাপারে কিছুই বললেন না। হয়তো খেয়ালও করেননি। পিটারকে দেখলাম ব্যস্তভাবে কেনের রুমে যাওয়া আসা করছেন। গবেষণার কোন টার্নিং পয়েন্টে আছেন হয়তো। 
            লেসের ক্লাসটা করার পর ইউনিয়ন হাউজে গেলাম। কাল থেকে খাওয়া হয়নি কিছুই। ফুডকোর্টে মালয়েশিয়ান কাউন্টার থেকে স্টিম রাইস আর হট চিকেন নিয়ে দেয়ালের পাশে একটা খালি টেবিলের দিকে এগোচ্ছি এমন সময় হাই। ফিরে তাকাতেই চিনতে পারলাম- কারস্টিন। হাসিমুখে এগিয়ে আসছে।
            রিমেম্বার মি?
            ইয়েস। হাউ আর ইউ কারস্টিন?
            গুড। হাউ আর ইউ?
            কারস্টিনের মুখ দেখে বুঝতে পারছি সে আমার নাম মনে করার চেষ্টা করছে। নাম ভুলে যাওয়াটা স্বাভাবিক। আমারও অনেক মানুষের চেহারা মনে থাকে কিন্তু নাম মনে থাকে না। কারস্টিনের নামটা কেন যেন মনে রয়ে গেছে। আজ তার সাথে লুসি নেই। হয়তো স্বামীর কাছে রেখে এসেছে।
            লেট মি গেট সামথিং টু ইট বলে খাবারের দোকানগুলোর দিকে এগিয়ে গেল কারস্টিন। আমি একটা খালি টেবিলে বসে খেতে শুরু করলাম। লাঞ্চ আওয়ারে ভিড় জমে উঠছে। মালয়েশিয়ান চিকেন খুব মজা হবার কথা। কিন্তু আমার খুব একটা ভাল লাগছে না। মনে হচ্ছে মুখের স্বাদ নষ্ট হয়ে গেছে।
            হোয়াট ইউ ইটিং?
            কারস্টিন ফিরে এসেছে। হাতের প্লেট টেবিলে রেখে চেয়ার টেনে বসলো আমার মুখোমুখি। বললাম মালয়েশিয়ান রাইস এন্ড চিকেন। তুমি কি খাচ্ছো?
            ইটালিয়ান পাস্তা
            কারস্টিনের সামনে বসে খেতে আমার অস্বস্তি হচ্ছে। হাঁচি পাচ্ছে। নাকে মুখে দ্রুত রুমাল চাপা দিয়ে হাঁচির শব্দ কমালাম।
            ব্লেস ইউ
            থ্যাংক ইউ
            কেউ হাঁচি দিলে কী কারণে ব্লেস ইউ বলতে হয় জানি না। ব্যুৎপত্তিগত কারণ নিশ্চয় কিছু একটা আছে।
            মেলবোর্নের আবহাওয়া খুব বাজে তাই না?
            ঠিক তাই
            কারস্টিনের উপস্থিতি ভালো লাগছে, আবার অস্বস্তিও হচ্ছে। বুঝতে পারছি আমার সাথে কথা বলার মতো কোন প্রসঙ্গ তার নেই। তাই আবহাওয়া প্রসঙ্গই ভরসা।
            তোমাদের ইন্ডিয়ায় এখন খুব গরম না?
            হ্যাঁ ইন্ডিয়ায় এখন খুব গরম, তবে আমি ইন্ডিয়া থেকে আসিনি। আমি বাংলাদেশী
            হ্যাঁ মনে পড়ছে তুমি বলেছিলে।
            মুখে বলছে বটে, কিন্তু আমি জানি আমার চেহারাটা ছাড়া আমার সম্পর্কে তেমন আর কিছুই মনে নেই কারস্টিনের।
            হ্যাল্লো, হিয়ার ইউ আর বলতে বলতে তিনজন ছেলে এসে ঘিরে ধরলো কারস্টিনকে। দুপুরের এ সময়ে এখানে টেবিল খালি পাওয়া মুশকিল। আমাদের টেবিলে দুটো চেয়ার খালি ছিল। তিনজনের দুজন বসে গেল চেয়ার দুটোতে। তিনজনই হৈ হৈ করে কারস্টিনের সাথে কথা বলছে। আমার উপস্থিতির কোন প্রভাব নেই এদের কাছে। কারস্টিন হয়তো এদের জন্যই অপেক্ষা করছিল। নিজেকে কেমন যেন আনফিট মনে হলো। এখান থেকে সরে পড়াটাই উত্তম। বললাম, আই নিড টু গো, সি ইউ লেইটার। কারস্টিন হাসিমুখে বললো- বাই
            কেন্‌ তাঁদের থার্সডে লাঞ্চ থেকে ফিরে আসার আগেই আমি বেরিয়ে পড়লাম। সেফওয়েতে গিয়ে দুটো নন্‌স্টিক পট-প্যান কিনে ফেললাম। দুটো পাত্রের জন্য তিরিশ ডলার খরচ করতে গায়ে লাগলেও করার কিছু নেই। ফিলের জিনিস আর ব্যবহার করবো না।
            বাসার সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় দেখলাম সিঁড়ির নিচের একটুকুন জায়গায় গায়ের সাথে গা লেপ্টে মুখে মুখ লাগিয়ে বসে আছে স্কুল ড্রেস পরা একটা মেয়ে আর একটা ছেলে। মেয়েটার মুখের এক পাশ দেখে চেনা চেনা লাগলো। এই শ্যামলা মেয়েটিকে আগে কোথাও দেখেছি। দাঁড়িয়ে ভালো করে দেখার ইচ্ছে থাকলেও দেখা অসম্ভব। কারণ এই সভ্য দেশে তারা যা করছে তা সভ্যতা, কিন্তু তাদের দিকে ভালো করে তাকানোটা নাকি অসভ্যতা।
            রুমে ঢুকে জানালার কাছে এসে বাইরের দিকে তাকালাম। পার্কিং এরিয়ার পাশ দিয়ে পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছে একটু আগের দেখা ছেলে-মেয়ে দুটো। মেয়েটার হাঁটার ভঙ্গি দেখেই মনে পড়লো। বাসা দেখতে আসার দিন বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে এই মেয়েটি আমাকে পথ দেখিয়েছিলো। যাকে আমার পথের পাঁচালীর দুর্গা মনে হয়েছিল। বারো-তেরো বছরের একটা কিশোরী। স্থান-কালের সাথে কীভাবে বদলে যায় মানুষের স্বভাব, সংস্কৃতি।
            সাতটার পরে রান্নাঘরে ঢুকেছি। বসার ঘর আর রান্নাঘরের দরজা আলাদা করে দিয়ে ফিল একটা ভালো কাজ করেছেন। বসার ঘরে কী হচ্ছে তা আর আমাকে দেখতে হবে না। রান্নাঘরের কাজ এখন আধঘন্টার মধ্যেই হয়ে যায়। সপ্তাহে তিন দিনের বেশি ঢুকতেও হয় না রান্নাঘরে। নতুন ডেক্‌চিতে ভাতের সাথে ডিম সিদ্ধ করতে দিয়ে সব্‌জি কাটছি- এমন সময় নাকে সিগারেটের গন্ধ লাগতেই বুঝলাম ফিল বা ডেভিড কেউ আছে আশেপাশে। ডেভিড সেই বিশ ডলার নেবার পর থেকে এড়িয়ে চলছে আমাকে। একটু পরেই রান্নাঘরের দরজা খুলে গেল।
            হাই প্রাডিব, হাউআইয়া মাইট?
            ফিলের মুড খুব ভালো আজ। হাসিমুখ দেখে মনে হচ্ছে দুদিন আগের উত্তপ্ত বাক্য-বিনিময় ভুলে গেছেন তিনি। মুখে যান্ত্রিক হাসি ফুটিয়ে বললাম, গুড। হাউ আর ইউ?
            মিনিট দশেক খেজুরে আলাপ করলেন ফিল। জানতে চাইলেন আমার গার্লফ্রেন্ড আছে কি না। থাকলে বাসায় নিয়ে আসবো কি না। বললাম, আপনি তো লিখে রেখেছেন- নো বডি ইজ এলাউড
            এক্সেপ্ট গার্লফ্রেন্ডস। হাঃ হাঃ হাঃ
            এই হাসিখুশি ফিলের সাথে পরশুদিন সন্ধ্যার কাঠখোট্টা রাগী ফিলের কোন মিল নেই।
            ডেক্‌চি দুটো কেনার সুফল প্রায় সাথে সাথেই পেতে শুরু করেছি। রান্নাঘরের সময় প্রায় অর্ধেক কমে গেছে। ভাত আর তরকারি আধা-সিদ্ধ অবস্থায় রুমে এনে ঢাকনা দিয়ে রেখে দিয়েছি। ঘন্টাখানেক পরে ঢাকনা খুলে দেখি চমৎকার সিদ্ধ হয়ে গেছে। প্রাথমিক সিদ্ধ হবার সময়েই বেশি তাপ লাগে- কারণ তখন পদার্থের অবস্থার পরিবর্তনের জন্য ল্যাটেন্ট হিট বা সুপ্ত-তাপ প্রয়োগ করতে হয়। এরপর একবার সিদ্ধ হতে শুরু করলে আর বেশি তাপের দরকার হয় না। তখন ঢাকনা দিয়ে তাপ সংরক্ষণ করতে পারলে ওই সংরক্ষিত তাপ শোষণ করে ডেকচির ভেতরের বস্তু সিদ্ধ হয়ে যায়। এতে সময় বাঁচলো, শক্তি বাঁচলো। এবার একটা ছুরি আর কাটিং বোর্ড কিনে নিতে হবে। তাতে করে কাটাকুটির কাজটাও রুমে বসে সেরে নেয়া যাবে।
            সাড়ে নটার দিকে খেয়ে-দেয়ে বাথরুম থেকে ফিরে এসে দেখি আমার রুমের দরজা খোলা। অথচ স্পষ্ট মনে আছে আমি দরজা টেনে গিয়েছিলাম। রুমে ঢুকে দেখি জোয়ানা- টেবিলের কাছে ঝুঁকে ছবি দেখছে।
            হাই জোয়ানা
            হাই প্রাডিব। নাইস ফ্যামিলি ফটোস
            টেবিলে রাখা আমাদের পরিবারের বিভিন্ন জনের ছবির প্রতি নিবিড় আগ্রহ জোয়ানার। মিনিট দশেক ধরে বর্ণনা দিতে হলো তাকে। খেয়াল করে দেখলাম আমার নিজেরও বেশ ভাল লাগছে কাছের মানুষদের কথা জোয়ানাকে বলতে।
            কিন্তু একটু পরেই আশঙ্কাটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। জোয়ানা নিশ্চয় কোন উদ্দেশ্য নিয়ে আমার রুমে ঢুকেছে। আগের বার গেছে বিশ ডলার, আজ কত যাবে কে জানে। একটু পরেই হয়তো ডেভিড এসে কোন একটা বাহানা তৈরি করবে। সরাসরি জিজ্ঞেস করলাম, ডেভিড কোথায়?
            আমি জানি না। আছে কোথাও। আমি যদি কিছুক্ষণ বসি এখানে তুমি কি মাইন্ড করবে?
            না না, বসো
            বিছানায় বসে পড়লো জোয়ানা। কোন ফাঁদে পা দিচ্ছি না তো?  যদি সেদিনের মত শুয়ে পড়ে আমাকে পালাতে হবে রুম ছেড়ে। জোয়ানা পা নাচাচ্ছে। পা নাচানোর অভ্যাস থাকে অনেকের, জোয়ানারও আছে। আমি বিছানা থেকে যথাসম্ভব দূরে চেয়ার টেনে নিয়ে বসলাম।
            তুমি ইন্ডিয়া থেকে এসেছো না?
            না। বাংলাদেশ থেকে
            স্কুলে আমাদের সাথে একজন ইন্ডিয়ান মেয়ে ছিল।
            তুমি লেখাপড়া করো না জোয়ানা?
            ইয়ার নাইনের পর ছেড়ে দিয়েছি। ভাল লাগে না লেখাপড়া।
            তবে কী ভাল লাগে?
            বাচ্চা ভালো লাগে।
            হোয়াট?
            কিছুদিনের মধ্যেই আমি মা হবো।
চমকে উঠলাম। কত বয়স হবে জোয়ানার? আঠারো উনিশ। স্বাস্থ্য ভালো বলে হয়তো কিছুটা বেশি মনে হচ্ছে। চোখ গেলো তার শরীরের দিকে। এই শীতেও বড় বেশি খোলামেলা। মা হবার স্বাভাবিক চিহ্নগুলো এখনো স্পষ্ট নয় কোথাও। এক ধরণের অস্বস্তি হচ্ছে আমার। আমাকে কেন বলছে এসব? আমাদের দেশের কোন তরুণী কোন অপরিচিত মানুষকে তার মা হবার খবর দেয়ার অর্থ হলো- মাথায় গন্ডগোল। জোয়ানাও কি সেরকম? কী বলবো কথা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। বাচ্চার বাবা সম্পর্কে প্রশ্ন করা কি উচিত হবে? কিছু না বলে চুপচাপ তো বসে থাকা যায় না।
            ডেভিডের সাথে সম্পর্ক কত দিনের?
            প্রায় দুমাস
            সম্পর্কের ব্যাপারে এরা যে বড় দ্রুত-গতি সম্পন্ন তা তো দেখতেই পাচ্ছি। সম্পর্ক গড়া বা ভাঙা কোনটাতেই খুব একটা সময় লাগে না।
            বাইরের দরজা খোলার শব্দ হলো। আমার ঘরের দরজা খোলাই আছে। প্যাসেজের আলোতে ডেভিডকে দেখতে পেলাম।
            হাই ডেভিড। জোয়ানা ইজ হিয়ার।
            হাই প্রাডিব। হাই বেবি বলতে বলতে রুমে এসে জাপটে ধরলো জোয়ানাকে। এলকোহলের তীব্র গন্ধ ডেভিডকে ঘিরে। জোয়ানা উঠে দাঁড়িয়ে ডেভিডকে জড়িয়ে ধরে প্রায় কোলে উঠে গেলো তার। মিনিট খানেক চললো এরকম। ডেভিড বললো- হানি, তুমি প্রদীপকে বেশি ডিস্টার্ব করো নি তো?
            ডেভিড ভদ্রতা দেখাচ্ছে। এ ভদ্রতার দাম কত পড়বে জানি না। মনে মনে ভেবে রেখেছি আজ ডলার চাইলে আগের বিশ ডলারের কথা মনে করিয়ে দেবো। বলবো আমার নিজের কোন চাকরি নেই। যাও একটা পাবার সম্ভাবনা ছিল তা তোমার বাবা আমাকে ইন্টারভিউর খবর না জানিয়ে মাটি করে দিয়েছে।
            কিন্তু সেরকম কিছু বলতে হলো না। জোয়ানাকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে যাবার সময় হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়ার ভঙ্গিতে ফিরে দাঁড়ালো ডেভিড। আমি যা ভেবেছি তা ভুল প্রমাণ করে ডেভিড বললো, আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম। এই নাও তোমার বিশ ডলার। থ্যাংক ইউ সো মাচ
            বিশ ডলারের নোটটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম। ডেভিডকে অহেতুক দুনম্বরী মনে করেছিলাম। মানুষকে না জেনে অবিশ্বাস করাটা যে কত বড় অন্যায় তা আমি জানি। আর জেনে শুনে সে অন্যায়টাই আমি করেছি। খুব খারাপ লাগছে। হাঁচি পাচ্ছে খুব। প্রচন্ড শব্দে হাঁচলাম। ওদিক থেকে ভেসে এলো ডেভিডের জড়ানো কন্ঠস্বর- ব্লেস ইউ
____________
PART 25



ইয়ারার তীরে মেলবোর্ন - ত্রয়োবিংশ পর্ব


২৮ জুলাই ১৯৯৮ মঙ্গলবার

কান ঝাঁ ঝাঁ করছে। অপমান লাগছে খুব। মুখের উপর সহজ সত্যি কথা কেউ বললে তা হজম করতে এত কষ্ট কেন লাগে বলতে পারো? আসলে অপ্রিয় সত্য কথা বলা যত সহজ সহ্য করা তত সহজ নয়। যাক একটা শিক্ষা হলো- সোজাসাপ্টা কথা বলার পাশাপাশি সোজাসাপ্টা কথা সহ্য করার অনুশীলনও করতে হবে। ব্যাপারটা ঘটেছে ফিলের সাথে। তেমন মারাত্মক কিছু নয়- তবুও কেন যে এত খারাপ লাগছে।
        বিকেলে আলী সাহেব ফোন করেছিলেন অফিসে। জিজ্ঞেস করলেন আমি বিট্টুর সাথে কথা বলেছি কিনা। বিট্টুর সাথে এর মধ্যে কোন কথা হয়নি আমার। তাকে ফোন করেছিলাম কিন্তু পাইনি।
        কাল রাতে তুমি বাসায় ছিলে না?
        ছিলাম তো
        তবে ফিল যে বললো তুমি নেই! বিট্টু তোমাকে অনেকদিন বাসায় ফোন করেছে। তুমি কোন ম্যাসেজ পাওনি?
        না, ফিল তো আমাকে কিছু বলেন নি
        কালকে আমিও ফোন করেছি। ফিলকে বললাম তোমাকে ডেকে দিতে। সে বললো তুমি বাসায় নেই
        আমি তো কাল সন্ধ্যা থেকে বাসায়। ফিল তো আমাকে কিছু বলেনি
        বুঝতে পারছি। তুমি বিট্টুকে ফোন করো। সে তোমার জন্য কী একটা কাজ জোগাড় করেছে
        ফিলের ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না। তিনি কেন আমাকে ডেকে দিলেন না? বিট্টু এতদিন ফোন করেছে, একটা বারও তো ফিল আমাকে কিছু বলেন নি। হঠাৎ মনে পড়লো সেফওয়েতে যে চাকরির দরখাস্ত জমা দিয়ে এসেছিলাম সেখানেও ফিলের নম্বর দিয়েছিলাম। খোঁজ নেয়া দরকার।
        সেফওয়েতে গিয়ে স্টোর ম্যানেজারের সাথে কথা বললাম। তিনি ফাইল খুলে বললেন, তোমাকে তো ডেকেছিলাম ইন্টারভিউর জন্য। তুমি তো আসো নি, কোন খবরও দাওনি
        আপনারা কি ফোন করেছিলেন?
        হ্যাঁ, তাই তো করি। তোমার দেয়া নম্বরেই তো ফোন করেছিলাম। গতকাল আসতে বলেছিলাম। আমি খুব দুঃখিত, আমরা তো লোক নিয়ে ফেলেছি যতজন দরকার। তুমি চাইলে তোমার দরখাস্ত আবার বিবেচনার জন্য রেখে দিতে পারি
        কোন রকমে তাকে ধন্যবাদ দিয়ে বাসায় ফেরার পথে রাগে মাথায় রক্ত উঠে গেল। ফিল কেন এরকম করবে? আমার টেলিফোন এসেছে আমাকে বলবে না? কিন্তু ফিলের ওপর রাগ করে আমি যে কত অনধিকারচর্চা করেছি তা বুঝতে পেরেছি ফিলের সাথে কয়েকটা বাক্য বিনিময়ের পরেই।
        রেগে গেলে কথাবার্তা ঠিকমত গুছিয়ে বলতে পারি না আমি। যুক্তিবোধগুলোও কেমন যেন ভোঁতা হয়ে যায়। বাসায় ঢুকেই সরাসরি চলে গেলাম লাউঞ্জরুমে। ফিল মদের পাত্র হাতে টিভির সামনে বসে আছেন। তাঁর সঙ্গিনী এখনো আসেন নি।
        হাই ফিল
        প্রাডিব। হাউ আর ইউ মাইট?
        গুড। আপনার সাথে কি একটু কথা বলতে পারি?
        অবশ্যই। কী ব্যাপার?
        আমার কি কোন ফোন এসেছিল?
        তোমার ফোন? তোমার ফোন এখানে আসবে কেন?
        আপনার নম্বরটা আমি দিয়েছিলাম কাজের জন্য। ওখান থেকে ফোন করে আমাকে ডেকেছিল ইন্টারভিউর জন্য। আপনি আমাকে জানাননি
        তাতে কী হয়েছে?
        ফোনটা জরুরি ছিল
        হু কেয়ার্‌স?
        আই কেয়ার। আমাকে জব ইন্টারভিউর জন্য ডেকেছিল, কিন্তু আপনি আমাকে জানাননি।
        থামো থামো। এই ফোনটা তোমার না আমার?
        আপনার।
        আমার নম্বর অন্যকে দেবার সময় আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলে?
        জ্বি না।
        এই টেলিফোনের জন্য তুমি আমাকে কোন পয়সা দাও?
        না।
        তোমাকে ঘরভাড়া দেবার সময় কি আমি বলেছিলাম যে তুমি টেলিফোন ব্যবহার করতে পারবে?
        ব্যবহার যে করতে পারবো না তাও তো বলেননি।
        এখন তো বললাম।
        নির্বিকার ভাবে মদের পাত্রে চুমুক দিচ্ছেন ফিল। আর কথা বাড়ানোর মানে হয় না। রুমে চলে এলাম। রাগে অপমানে অস্থিরতায় কী করবো বুঝতে পারছিলাম না। বিছানায় মুখ গুঁজে শুয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। গাল বাড়িয়ে চড়টা নিজে নিজেই খেয়ে এসেছি, যন্ত্রণা তো লাগবেই। কষ্টের ভাগ দেয়ার জন্য তোমাকে লিখতে বসেছিলাম। লিখতে লিখতেই রাগটা কমে গিয়ে যুক্তিবোধ ফিরে এসেছে।
        অচেনা অন্ধকার পথে চলার সময় নিজেকে যথাসম্ভব নমনীয় করে ফেলবি। তখন শক্ত কিছুতে ধাক্কা লাগলেও ব্যথা কম পাবি।- আমার ক্লাস-ফোর পাস বাবার দার্শনিক কথাবার্তা। খুব মনে পড়ছে কথাগুলো,  সাথে মানুষটাকেও। এখানকার কিছুই চিনি না, পায়ের তলায় মাটির নাগাল পাইনি এখনো। রাগ করার কোন যোগ্যতাই নেই আমার। ফিল তো ঠিক কথাই বলেছেন। কী দায় পড়েছে তাঁর যে আমার প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেবেন?
        থাক এসব কথা। আজ লেস অ্যালেনের ক্লাস করলাম। ফোর্থ ইয়ার বা অনার্স ইয়ারের সাত জন শিক্ষার্থী স্ক্যাটারিং থিওরির কোর্সটা নিয়েছে। আমি সহ আটজন হলাম। পরিচয় হলো সবার সাথে। ম্যাট আর ফিওনা যেভাবে আঁঠার মত লেগে আছে একে অপরের সাথে- বোঝাই যাচ্ছে নতুন জুটি।        
        আমি যে তিনটা ক্লাস মিস করেছি সেগুলোর লেকচার নোট দিয়ে দিলেন লেস। কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরির জটিল ব্যাপারগুলো যেভাবে বোঝালেন তাতে মনে হলো কোয়ান্টাম মেকানিক্সের কিছু কিছু অংশ বুঝতে পারছি। কোয়ান্টাম মেকানিক্স বুঝলেও আবার বিপদ আছে।  রিচার্ড ফাইনম্যান বলেছেন ইফ ইউ থিংক ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড কোয়ান্টাম মেকানিক্স, ইউ ডোন্ট আন্ডারস্ট্যান্ড কোয়ান্টাম মেকানিক্স- তুমি যদি মনে  করো যে তুমি কোয়ান্টাম মেকানিক্স বোঝ, তুমি আসলে কোয়ান্টাম মেকানিক্স বোঝ না। তাই ঠিক বুঝতে পারছি না বুঝতে পারছি কি না।         

আমাদের অনার্স আর মাস্টার্সে কোয়ান্টাম মেকানিক্স পড়াতেন প্রামাণিক স্যার। স্যারকে কষ্ট করে সবগুলো সমীকরণ ব্ল্যাকবোর্ডে লিখতে হতো। পুরো সময়টাই চলে যেতো সমীকরণের পর সমীকরণ লিখতে। আর আমরাও বোর্ড থেকে খাতায় তুলতাম প্রায় কিছু না বুঝেই। পরীক্ষার সময় ঝাড়া মুখস্থ। এখানে মুখস্থ করার ঝামেলা নেই। কারণ এই কোর্সে নাকি ওপেন বুক এক্সামিনেশান। বই খাতা নোট দেখে দেখে পরীক্ষার খাতায় লেখা। এ রকম পরীক্ষার কথা আগে কখনো শুনিনি। কোর্স শেষ হলেই বোঝা যাবে কেমন পরীক্ষা হয়।
        আজ রাখছি এখানে। ঘরে থাকতে ইচ্ছে করছে না আর। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে- টাপুর টুপুর বৃষ্টি। যাই একটু ভিজে আসি।
__________________
PART 24

Latest Post

Memories of My Father - Part 2

  In our childhood and even in our adulthood, there was no tradition of celebrating birthdays. We didn't even remember when anyone's...

Popular Posts