নভেম্বর ২৭, ২০০৪
তসলিমা নাসরিনের সমস্যাটা কোথায় তা আমি বুঝতে পারছি না। তিনি ডাক্তার, মেধাবী লেখক আর পুরুষবিদ্বেষী। ঠিক আবার সেরকমও নন। এটা নিয়ে চিন্তা করার মতো কোন কিছু ঘটেনি আমার। কিন্তু তিনি কিছু উলটাপালটা কথা বলেন লেখেন মাঝে মাঝে ধৈর্যচ্যুতি ঘটতে চায়। পশ্চিম বাংলার শারদীয় সংবাদ প্রতিদিনে তিনি একটা প্রবন্ধ লিখেছেন ‘বাঙালি পুরুষ’। লেখাটির বেশির ভাগ কথাই বিতর্কিত। যাকে বলে সাবজেক্টিভ। তসলিমা অব্কেক্টিভিটির কথা বলেন, কিন্তু নিজে বড় বেশি সাবজেক্টিভ কথা
লেখেন। যায় যায় দিন এই লেখাটি পুনঃমুদ্রণ করেছে। কিছুদিন এটা নিয়ে বিতর্ক চালানোর ইচ্ছা হয়েছে তাদের তা বোঝা যাচ্ছে। আমি কোথাও কিছু লিখছি না। এখানে নিজের কাছেই বছর বিশেক পরে কেমন লাগে তা দেখার জন্য লিখে রাখছি এখন কেমন লাগছে তাঁর যুক্তিগুলো।সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্মদিনে অনেকে নাকি গৌরব করে বলেছেন সুনীলের জীবনে অনেক নারীর সমাগম ছিলো। তসলিমার যুক্তি হলো নারী কোন লেখকের যদি অনেক পুরুষ থাকে জীবনে তাহলে তাকে নিয়ে কেউ গৌরব করে না। লিজ টেলর বা এরকম আরো অনেক সেলিব্রেটি নারী আছেন যাঁদের জীবনে অনেক পুরুষ এসেছেন। তসলিমার জীবনেও কি কম? গৌরব করতে চাইলে তো করতে পারেন। সুনীলের জীবনে অনেক নারী আসার ব্যাপারটা তসলিমা কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন ঠিক পরিষ্কার নয় লেখাটাতে। তবে তিনি ভালো কিছু বোঝাননি। আর তসলিমা কেন যেন সবকিছুতে এক ধরনের যৌনতা দেখতে পান। সুনীলের প্রেমিকা স্বাতীর প্রতি সুনীল কি কখনো আনফেইথফুল কিছু করেছেন? আমরাতো জানি না সেরকম কিছু। নাকি আমাদের জানতে দেয়া হয় না, কেবল তসলিমাই জানেন?
রবীন্দ্রনাথ, রবিশংকর, সত্যজিৎ রায়, অমর্ত্য সেন, শামসুর রাহমানসহ অনেক সেলিব্রেটির জীবনে অনেক নারী এসেছেন। ব্যাপারটাকে তসলিমা একবার বলেন ব্যক্তিগত আবার বলেন অনৈতিক। তারপর চলে গেলেন পশ্চিমাদের কথায়। পশ্চিমের পুরুষের তুলনায় বাঙালি পুরুষ যে একেবারে নিকৃষ্ট মানের তা বললেন। পশ্চিমে তিনি অনেক বছর ধরে আছেন বলে নিজের যৌনতার অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে বললেন, ‘‘পৃথিবী ঘুরে অনেক হৃদয়বান প্রেমিক দেখেছি, বাঙালি পুরুষের মতো পাষন্ড প্রেমিক কমই দেখেছি। বাঙালি পুরুষের মতো অপ্রেমিকও কম দেখেছি’’।
পশ্চিমাদের প্রতি এমন ঢালাও সার্টিফিকেট তিনি কেন বা কীভাবে দেন আমি জানি না। পশ্চিমাদের ভালোবাসা একেবারে নিখাদ আর এই ভালোবাসাই নাকি টিকিয়ে রাখে তাদের সম্পর্ক। তসলিমা কি শুধু সিনেমা দেখে বা তাঁর সাথে যে সাদা চামড়ার সাদা কলারের লোকের পরিচয় আছে তাদের কথাই বিবেচনায় নিয়েছেন? পশ্চিমাদের বিয়ে বিচ্ছেদের হার এত বেশি কেন? প্রধান যে কারণে এখানে বিয়ে বিচ্ছেদ ঘটে তা হলো স্বামী বা স্ত্রীর অনৈতিক সম্পর্কের কারণে। একজনের বর্তমানে পুরুষ বা নারী যদি তাদের জীবনে আর কাউকে আসতে না দিতো তাহলে তো দ্বিতীয় বিয়ের ঘটনা ঘটতো একমাত্র কোন একজনের মৃত্যুর পরে। আমি নিজে পশ্চিমে আসার আগে কিছু কিছু মূল্যবোধকে মনে করতাম বিশ্বজনীন। কিন্তু পশ্চিমারা আমার সেই বিশ্বাসে চিড় ধরিয়েছে। ব্যাপারটা তসলিমাও জানেন। তারপরও নিজের দেশের মানুষকে বিশেষ করে পুরুষ মানুষকে সুযোগ পেলেই গালাগালি করেন তিনি।
বাঙালি পুরুষ মাত্রেই যদি পাষন্ড হয়, তাহলে আমি নিজেও একজন পাষন্ড। কিন্তু আমি তা মেনে নিতে পারছি না। যে কোন ব্যাপারে ভুল ধরা খুবই সহজ। কিন্তু ভুলটা শোধরানোর পথ বাৎলে দেয়ার কাজটা কঠিন, কিন্তু জরুরী। তসলিমা এই কঠিন কাজটা কোনদিনই করেননি এপর্যন্ত।
বাঙালি পুরুষের নাকি একটা বড় দোষ তারা নারীকে শীর্ষসুখ দিতে জানেনা। তসলিমা যৌনতাকে খুব বেশি প্রাধান্য দেন। তাতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু সমস্যা হলো তিনি যখন লেখেন ‘‘অধিকাংশ বাঙালি পুরুষ অবাধ যৌন সম্পর্কে পারদর্শী বলে নিজেদের যৌন বিশারদ মনে করে, তারা কিন্তু জানেই না নারীর যৌনাঙ্গের যাবতীয় অঞ্চল সম্পর্কে খুটিনাটি----’’ তারপর আরো অনেক কথা তিনি লিখেছেন এ সম্পর্কে। অধিকাংশ বাঙালি পুরুষ বললে বোঝানো হয় মোট বাঙালি পুরুষের অর্ধেকের চেয়েও বেশি। এত বিরাট সংখ্যক পুরুষ তসলিমার মতে অবাধ যৌন সম্পর্কে পারদর্শী। তসলিমা আপনি কি সংখ্যাতত্ত্ব একেবারেই বোঝেন না? আর আমাদের দেশে স্কুল কলেজের কোথাও যৌনতা বিষয়ে পড়ানো হয় না। পুরুষরা কীভাবে জানবে বা শিখবে নারীদেহ সম্পর্কে। আর এরকম শিক্ষাটা কি খুবই জরুরী পুরুষের জন্য? নিজদের শরীর সম্পর্কে জানা দরকার সুস্থতার প্রয়োজনে। কিন্তু তসলিমা যে প্রয়োজনের কথা বললেন আমার তো মনে হয় তা স্বামী-স্ত্রী’র নিজেদের একান্ত ব্যাপার। এজন্য নানারকম ফোরাম হতে পারে, ওয়ার্ক শপ হতে পারে। তসলিমা নিজেও উদ্যোগ নিতে পারেন এরকম স্কুল খোলার। কিন্তু তাতে কি পুরুষের প্রতি বিদ্বেষ কমে যাবে? যে পুরুষ এখন নারীকে সম্মান করে না, তারা তখন সম্মান করতে শিখে যাবে? ঠিক কোন ধরনের সমাজ ব্যবস্থা চান, কেমন হবে সেই স্বপ্নের সমাজের পুরুষেরা তা যদি তসলিমা তাঁর লেখায় তৈরি করে দেখাতেন তাহলে আমাদের কেউ কেউ হয়তো চেষ্টা করে দেখতে পারতো সেরকম হবার জন্য। কিন্তু তসলিমা তা করেন না। তসলিমা আপনার ওপর খুব রাগ হচ্ছে আমার। কারণ আপনি আমার সময় নষ্ট করছেন।
www.bangladeshinfo.com সাইটে একান্নবর্তী নিয়ে লিখেছেন
আনিসুল হক। এটা সম্ভবত তাঁর ধারাবাহিক নাটক একান্নবর্তীর সারসংক্ষেপ। ধানমন্ডির ৫১
নাম্বার বাড়ির ঘটনা। ধারাবাহিকটা ডিভিডিতে পাওয়া যাচ্ছে বলে শুনেছি। সংগ্রহ করে দেখতে
হবে।
ইমদাদুল হক মিলনের কিছু খুবই উন্নতমানের
সাহিত্য হয়তো আছে, তবে আমি পড়িনি এখনো। আই-পত্রিকার বেশ পুরনো একটা গল্প পড়লাম তাঁর
‘পিতা এবং স্বামীর মৃত্যুর পর’। সুমির বাবা মরার পরে সে প্রতিদিন সন্ধ্যার দিকে কাঁদে।
তাঁর প্রেমিক সেলিম তাকে সান্ত্বনা দেয়। আর কিছু নেই। এই হলো গল্প। এটাকে কেন গল্প
বলতে হবে আমি জানিনা।
সমরেশ মজুমদারের গল্প ‘খরার পরে
বৃষ্টি’। সুন্দর প্রেমের গল্প। তিনটি চরিত্র; স্কুল মাস্টার কল্যাণী। তাঁর ছেলে কম্পুটার
ইঞ্জিনিয়ার বলে তিনি খুব দাপটে কথা বলেন। প্রায় পঁয়ত্রিশের সংযুক্তা অধ্যাপিকা। বিয়ে
করেননি আর বিয়ে সিস্টেমটার প্রতি খুব একটা শ্রদ্ধাও নেই তাঁর। একজন সোহন তার প্রেমিকাকে প্রকাশ্যে আদর করে বহুতল ভবনের
পরিবেশ নষ্ট করেছেন বলে মনে করছেন কল্যাণী আর সংযুক্তা। তারা সোহনকে ওয়ার্নিং দেয়ার
জন্য যায়। সোহনের সাথে কথা বলার পর সংযুক্তার চিন্তাভাবনাই বদলে যায়।
রবিবাসরীয় আনন্দবাজারের গল্প অলকানন্দা
রায়ের ‘অকৃত্রিম’। চলচিত্রের অভিনেত্রী অর্পিতা বসুর গল্প। অর্পিতা যখন স্কুলে পড়াতো
তখন সিনেমার নামও সহ্য করতে পারতো না। তার তখনকার প্রেমিক সিনেমা অভিনেতা সারণকে শিক্ষা
দেবার জন্য অর্পিতা সিনেমায় আসে। দেখা যায় অর্পিতা অনেক উন্নতি করে আর সারণের ক্যারিয়ার
শেষ হয়ে যায়। বিখ্যাত ক্লাসিক ‘‘এ স্টার ইজ
বর্ন’’ সিনেমার গল্প এরকমই।
তৃষ্ণা বসাকের গল্প ‘মুক্তি’। সুমিতা জীবনের প্রয়োজনে সুজনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে। সুজন বিবাহিত। ছেলেমেয়ে বৌ থাকে গ্রামে। আর শহরে চাকরি করে সুমিতা, সুজন থাকে সেখানে। তারা বিয়ে করেনি। সুজনের বৌ এই সুযোগে সুমিতার কাছ থেকে তাদের সংসারে যখন যা লাগে চিঠি লিখে চেয়ে নেয়। গল্পটা একটু অন্যরকম। গল্পের নাম মুক্তি হলেও এখানে কোথাও কারো মুক্তি ঘটেনা।
ঈদসংখ্যা প্রথম আলো বললে যে ঢাউস
ভলিউমের কথা মনে হয়, আমার ঈদসংখ্যা সেটা নয়। সাধারণ পত্রিকার সাথে বিশেষ সংখ্যা যেটা
বেরিয়েছে ঈদ উপলক্ষে তা পড়লাম কয়েকদিনে। খুব একটা ছোট নয়। ইন্টারনেটের ৮৭ পৃষ্ঠা। জিল্লুর
রহমান সিদ্দিকীর ‘দেশপ্রেম’। ‘‘দেশপ্রেম হচ্ছে বদমাশের শেষ অবলম্বন’।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরির ‘উদারনীতি
কতটা উদার’। আমেরিকার নির্বাচন প্রসঙ্গেও কথা বলেছেন। বিজ্ঞান স্বাধীনতা পেয়েছে কিনা
প্রশ্ন করেছেন এবং আরো অনেক গুরুগম্ভীর কথা আছে। এরকম পন্ডিতী কথা হয়তো কারো কারো বেশ
ভালো লাগে।
বেলাল চৌধুরীর ‘স্বপ্নকাতর অনুপ্রবেশ’
কি গল্প, নাকি প্রবন্ধ, নাকি স্বপ্নদর্শন আমি জানিনা। আমার বুদ্ধি এত কম কেন?
নাসরীন জাহানের গল্প ‘কালো বিড়াল
আর আগন্তুক’। নিউইয়র্কের কুইনসের একটা জরাজীর্ণ বাসায় থাকেন বাংলাদেশ থেকে আসা জেরীনা।
জেরীনার স্বপ্ন লেখক হবার। কিন্তু পারেন না। একদিন এবাসায় আসেন একজন আগন্তুক। জেরীনাকে
উৎসাহ দেন লেখার। জেরীনার জীবন বদলে যায়। জেরীনা বিখ্যাত লেখক হয়ে যান। পুরষ্কারও পান।
আগন্তুককে ভালোবেসে ফেলে জেরীনা। কিন্তু দেখা যায় আগন্তুক একজন খুনী পলাতক।
আসিফ নজরুলের গল্প ‘অপরাধ’। লুনা এন জি ওতে কাজ করে। কলম্বোতে সেমিনারে যায়। সাথে আরেকজন সিনিয়র কর্মী রোকন। তাদের দুজনেরই পেপার আছে প্রেজেন্ট করার। লুনা ভালোবেসে বিয়ে করেছিলো নাজমুলকে। নাজমুল কর্মক্ষেত্রে লুনার উন্নতি পছন্দ করেনি। বিচ্ছেদ হয়ে যায় তাদের। কলম্বোতে গিয়ে দেখা যায় রোকনেরও একই সমস্যা হচ্ছে। রোকনের বৌ নীলা ডিভোর্স চাচ্ছে। কারণ রোকনেরও একই অপরাধ। অপরাধটা ঠিক কী তা বোঝা যায় না। নীলাও হয়তো রোকনকে বিশ্বাস করে না।
নির্মলেন্দু গুণ নিউইয়র্কে এসে কবি
অ্যালেন গিনসবার্গের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করেন তিনবার। তাদের কথোপকথনের বিবরণ দিয়েছেন
নাসির আলী মামুন। ভালো লাগলো।
চে গুয়েভারার মেয়ে আলেইদা গুয়েভারার সাক্ষাৎকারের বাংলা অনুবাদ করেছেন জাহীদ রেজা নূর। চে গুয়েভারা কিউবার স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক। সুনীলের একটা চমৎকার কবিতা আছে চে গুয়েভারা কে নিয়ে। ভালো লাগলো আলেইদার কথা। চে গুয়েভারা মেয়েকে লিখেছিলেন মাকে ঘরের কাজে সাহায্য করতে আর ছেলেকে লিখেছিলেন যুদ্ধে যেতে। ছেলে আর মেয়ের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য বিশ্বজনীন।
উম্মে মুসলিমার কবিতা ‘পাগলামির
ডান্ডাবেড়ি’ খুব জনপ্রিয় হবে বলে আমার বিশ্বাস। বেশ ভালো লেগেছে আমার।
‘‘আমার যত পাগলামি তার চারাগাছে
যে নিত্য
জল ঢালতো
সে আর এখন এই গরীব মাটিতে নেই
ধনী দেশে পালিয়ে গেছে অনেক আগেই।
ইচ্ছে হলে আসতো চলে অসময়ের বৃষ্টি
যেন
বলতো ‘কেন
তা দিচ্ছিস সরকারি কাজ ঢিম তেতালা?
জানলা দিয়ে দেখ তাকিয়ে আকাশখানা
কী উতলা
ভিজবি নাকি?’
তাড়াতাড়ি গুটিয়ে শাড়ি হাটু অব্দি
বলতে থাকি
‘তা কি
আর বলতে?
গুলি মারো সর্দি কাশি, ফ্লুতে ভোগার
ভয় ভীতিতে
পথ চলতে’।
মধুমিতায় গ্রেগরি পেক? আর তাহলে
আটকায় কে?
খুব জরুরি মিটিং ফেলে
মতিঝিলে
আমি ও সে।
বলতো এসে ‘চল পালিয়ে যাই চলে সেই
মতিহারে
কাজলা মোড়ে পান খেয়ে পিক্ খানিক
গিলে
শুকনো বিলে
সারা দুপুর
শেখ আতাউর
স্যারকে ভেবে কাটাই বেলা চুপিসারে’।
এখন এলে ফেব্রুয়ারি যাবো যাবো করতে
গিয়ে
বেরিয়ে যায় বইয়ের গন্ধ একাডেমির
পাঁচিল দিয়ে।
আষাঢ় মাসের প্রথম দিনে
তোকে বিনে
কালিদাসের যক্ষ হয়েও রান্না করি
ইলিশভাজা দোপেঁয়াজা গাওয়া ঘিয়ে মুগ্খিচুড়ি।
বাস্তবতার ডান্ডাবেড়ি আমাকে বেশ
ফেলছে চিনে
আমার যত পাগলামি সব অংকুরেতেই নিচ্ছে
কিনে। ’’^^^^^
প্রণব ভট্টের গল্প ‘‘ইফতার’’। দয়াময়ীদের বাড়ি সীমান্তের কাছাকাছি। তাদের স্কুলের
হেডমিস্ট্রেস জাহানারা বেগম বেশ গোঁড়া মুসলমান। বোরকা ছাড়া চলেন না। কেউ তাঁর মুখও
দেখতে পাননা স্কুলের বাইরে। দয়াময়ীর ধারণা তিনি খুব সাম্প্রদায়িক। দয়াময়ীর প্রতি কিছু
আচরণে তার সেরকমই মনে হয়েছে এবং দয়াময়ী বড় হবার পরেও সে ধারণা বদলায়নি। দয়াময়ীর সে
ভুল ভাঙে গল্পের শেষে যেদিন জাহানারা বেগম দয়াময়ীদের বাড়িতে আসেন ইফতার করার জন্য।
দারুণ ভালো লেগেছে গল্পের শেষাংশটা।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের গল্প ‘‘জিন্দা লাশ’ ভালো লেগেছে।
জনকণ্ঠের ঈদসংখ্যাটাও বেশ বড়। শামসুর
রাহমানের কবিতা দিয়ে শুরু। আমি কবিতা খুব একটা পড়ি না। আর পড়লেও সব কবিতা বুঝতে পারি না।
আর বুঝতে না পারলে ভালো লাগবে কীভাবে। না বুঝে ভালোবাসা যায়?
জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী লিখেছেন
‘কেমন আছি আমরা’। আমরা মানে শুধু বাংলাদেশের মানুষ নয়, কেমন আছে পৃথিবীর মানুষ? খুব
আশান্বিত হবার মতো কিছু নেই অবশ্য। হতাশার কথা শোনাতে খুব একটা কষ্ট করতে হয় না মনে
হয়। একটা ভাইটাল প্রশ্ন করেছেন তিনি ‘‘বহুতল ভবন, বিদেশী পণ্যে টইটম্বুর প্লাজা, অল্প
সংখ্যক সড়কে বহু সংখ্যক নতুন ঝকমকে গাড়ি, উৎসবের দিনে পরিধেয় বিচিত্র দামের বিন্যাসের
শাড়ির সঙ্গে পাল্লা দেয়া বহুবর্ণিল পুরুষ-পরিধেয় পাঞ্জাবী, পুরো রমজান মাসে ইফতারের
বৈভব ও বৈচিত্র, - এর পাশাপাশি শহরময় ছড়িয়ে পড়া লক্ষ ভিক্ষুকের কাতরতা, একি পবিত্র
মাহে রমজানে ইসলামী সাম্যনীতির এক ব্যঙ্গচিত্র নয়?’’
জুবাইদা গুলশান আরা লিখেছেন ‘চিনি
কি চিনি না তারে’। গল্প কিংবা ভ্রমণকাহিনী, কিংবা মাঝামাঝি বাংলাদেশের মেয়ে ঝুমুরের
গল্প যে কিনা ম্যানিলাতে গেছে নাট্যজন সম্মেলনে।
হুমায়ূন আজাদের মেয়ে স্মিতা আজাদ
লিখেছেন ‘‘আব্বুকে মনে পড়ে’’। স্মিতার দিদি মৌলি এধরণের একটা চিঠি লিখেছেন প্রথম আলোতে
কয়েকদিন আগে। মৌলি বা স্মিতার বয়স কত আমি জানিনা। স্মিতার চিঠি পড়ে মনে হচ্ছে তিনি
এখনো কিশোরী। আবেগ দিয়ে চিঠি লিখছেন মৃত বাবাকে উদ্দেশ্য করে। বাবার স্মৃতিচারণ করে।
চিঠিতে আসলে হুমায়ূন আজাদের আদর্শ বা শিক্ষার কোনকিছুই প্রতিফলিত হয়না। বাবার কণ্ঠস্বর
কত সুন্দর, মৌলির চেয়ে স্মিতাকে বেশি ভালোবাসতেন বাবা, বাবাকে আসতে বলছেন স্মিতা। এচিঠি
হুমায়ূন আজাদ পড়লে কী বলতেন আমি জানিনা। মনে হচ্ছে হুমায়ূন আজাদ সময়ের অনেক আগেই মারা
গেছেন বলে নিজের মেয়েদের কাছেও এখনো ঠিক পরিচিত নন আদর্শিক হিসেবে।
মোহাম্মদ আবুল হোসেন একটা বৈজ্ঞানিক
কল্পকাহিনী লিখেছেন ‘ব্রিতনের শেষ গল্প’। গল্পের ডঃ রিফাত কবির মানুষের ক্লোন নিয়ে
কাজ করছেন। এই ক্লোনরা কথা বলা পূর্ণাঙ্গ মানুষ। ডঃ রিফাত তাদের কেটে কুটে পরীক্ষা
করে। মানুষকে এভাবে কখনো ব্যবহার করা হবে না। কিন্তু গল্পটা যেভাবে লেখা হয়েছে তাতে
মনে হচ্ছে লেখক ক্লোন প্রক্রিয়ার বিরোধী। তা হতেই পারেন, কিন্তু বিজ্ঞানের প্রতি অহেতুক অবিচার করা হয়েছে এ গল্পে।
জাফর তালুকদারের গল্প ‘শোধ’। মুক্তিযুদ্ধের
গল্প লিখতে চেয়েছেন। আরেফার স্বামী মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার। শত বিপদ মাথায় নিয়ে দেখা
করতে আসে আরেফার সাথে একরাতে। আরেফা স্বামীকে যেন হারিয়ে ফেলতে না হয় সেজন্য সে রাতে আত্মহত্যা করে। লেখক এরকম কেন করলেন? আরেফা
আত্মহত্যা করে মুক্তিযোদ্ধা স্বামীকে সাহায্য করলেন? মনে হয়না।
মাহমুদুল হাসান নীরুর গল্প ‘তবু
সামনে চলা’। রংপুর অঞ্চলের মঙ্গার গল্প। আতিয়ার গ্রাম থেকে শহরে চলে আসে রিক্সা চালিয়ে
হলেও কোন কিছু রোজগার করতে পারে কিনা দেখতে।
ফয়েজ আহমদ লিখেছেন ‘হে মাতৃভূমি
আমার, আশ্রয় দাও’’। সাম্প্রদায়িকতার কারণে বাংলাদেশ থেকে হিন্দুরা যে ইন্ডিয়াতে চলে
যাচ্ছে সে প্রসঙ্গে লিখেছেন তিনি। লিখেছেন ‘‘বাংলাদেশে হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে
দাঁড়াবার চিত্র পাই না।’’ হিন্দুরাও প্রতি আক্রমণ শুরু করলে দেশের পরিস্থিতি কি ভালো
হয়ে যাবে? প্রতিহিংসা দিয়ে হিংসা কমানো যায়না।
আফরোজা পারভীনের গল্প ‘সেদিন সন্ধ্যায়
ঝুম বৃষ্টিতে’। প্রেমের গল্প লিখতে গেলে কি এরকম কাঁচা গল্প লিখতে হয়? অতি দরিদ্র অথচ
অতি রূপসী মেয়ে লাজের সাথে এক ঝুম বৃষ্টিতে দেখা হয়ে যায় অতি ধনী রূপবান ব্যাচেলর রূপমের
সাথে। লাজ নাকি অতি লাজুক। অথচ দেখা যাচ্ছে আলাপের এক ঘন্টার মধ্যেই লাজ রূপমের অফিসে
বসে রূপমকে গান শোনাচ্ছে। মনে হচ্ছে আফরোজা পারভীন এখনো কৈশোর অতিক্রম করেননি। নাকি
বাংলাদেশের প্যাকেজ নাটক দেখেন অতিমাত্রায়?
জাহিদুল হকের গল্প ‘মাতাল বাতাসের
নাচের মতো’। রোকেয়া আর শফিকের সুখের সংসার। তাদের কারোরই কোন অসুবিধা নেই, অথচ তারা
নিঃসন্তান। রোকেয়ার স্বামী শফিক জানেনা যে রোকেয়ার প্রথম ভালোবাসার ফসল এসেছিলো তার
রোকেয়ার শরীরে। আফরোজা আলির ক্লিনিকে তাকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করতে বাধ্য হয়েছিলো সে প্রেমিক
হাশেমের প্রতারণার বিরুদ্ধে করার কিছু ছিলো না বলে।
শান্তা মারিয়া নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে
তথ্যভিত্তিক লেখা লিখেছেন ‘যে নাহং নাহমৃতা’’।
বেশ পরিশ্রম করেছেন লেখাটার জন্য। বিজ্ঞানে মেয়েদের অবদানের কথা অবশ্য সেভাবে আসেনি।
আর সাহিত্য আর শিল্পকলায় রিজিয়া রহমান, রুবী রহমানের মতো লেখকের নামও তিনি উল্লেখ করেছেন,
কিন্তু তসলিমা নাসরিনের নাম উল্লেখ করেননি কোথাও। তসলিমা কিন্তু একজন শক্তিশালী নারী।
তাঁকে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই, আর উচিতও নয়।
সালেহা চৌধুরির গল্প ‘মাহির মা’।
সালেহা চৌধুরী ভালো লেখেন। দু বছরের মাহিকে রেখে মাহির বাবা মারা যান। মাহিকে মানুষ
করেন সামিরা বেগম। মাহিময় জগৎ তাঁর। আবার বিয়ে করেননি মাহির কথা ভেবে। পঁচিশ বছর পরে
সাতাশ বছরের মাহি যখন মেঘ নামে একজন মেয়ের প্রেমে পড়ে মাহির মায়ের তা সহ্য হয়না। মাহি
পরিকল্পনা করেছে ক্যালিফোর্নিয়া চলে যাবে, মেঘকে বিয়ে করবে ইত্যাদি। মাহির মা এসব সহ্য
করতে পারে না। মাহি তাকে ছেড়ে যাবে ভাবতেই তিনি কেমন যেন হয়ে যান। ছেলের সাথে গাড়িতে
যাবার সময় নিজেই ট্রাকের মুখে ঠেলে দেন ছেলেসহ নিজেকে। এরকম নৃশংস হয়ে ওঠতে পারেন
কোন মা? গল্পের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের সম্মুখীন হয় এখানে।
এখানে আরো কিছু অনুল্লেখযোগ্য গল্প
আছে। তেমন একটা লাগেনি কোনটাই। জনকণ্ঠের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রচনা হলো মতিন রায়হানের
নেয়া সরদার ফজলুল করিমের সাক্ষাৎকার। কমিউনিষ্ট পার্টির নির্দেশে তিনি জেল খেটেছেন,
ঢাকা ইউনিভার্সিটির চাকরি ছেড়েছেন, বিদেশে পি-এইচ-ডি করতে যাবার নিশ্চিত স্কলারশিপের
চিঠি ছিঁড়ে ফেলেছেন। ভালো লাগলো তাঁদের সেসময়ের কথা পড়ে। সত্যেন সেনদের মতো সমাজকর্মী
এখন আর দেখা যায় না কেন?
কলম্বাস, ওহাইও
No comments:
Post a Comment