Saturday 31 July 2021

স্বপ্নলোকের চাবি - পর্ব ৩১

 


স্বপ্নলোকের চাবি – ৩১

সারা ওয়ার্ডে গিজগিজ করছে মানুষ। বেশিরভাগ বেডের চারপাশে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে কেউ না কেউ। এই ওয়ার্ডের সব রোগীর শরীরের কোথাও না কোথাও ব্যান্ডেজ বাধা। আমার মাথা একবার চক্কর দিয়ে উঠেছে। দেয়ালে হাত দিয়ে কোন রকমে সামলে নিয়েছি। হাসপাতাল আমার প্রিয় জায়গা নয়। এখানে এলে কেমন যেন অস্থির লাগতে থাকে। অসুস্থতার কাছে মানুষ যে কত অসহায় তা বোঝা যায় হাসপাতালে এলে।

দরজার কাছে দেয়ালে লাগানো বেডে সারা গায়ে-মাথায় ব্যান্ডেজ মোড়ানো ছোট্ট একটা শিশুর মাথার কাছে বসে নিঃশব্দে কাঁদছে একজন মা। দেখেই বোঝা যায় অর্থনৈতিক সামর্থ্য খুব একটা নেই। সরকারি হাসপাতালগুলি আছে বলেই গরীব মানুষরা এখনো কিছুটা হলেও চিকিৎসা পায়। মানুষ নিজের অসুস্থতার সাথে কোন রকমে বোঝাপড়া করে নেয়, কিন্তু সন্তান অসুস্থ হলে মায়ের যে কী কষ্ট হয় তা বোঝানো যায় না।

রুমের চারপাশে যতদূর যায় চোখ বুলালাম। এক কোণার বেডে দুমড়ে মুচড়ে পড়ে আছে একটি শুকনো শরীর। নিঃসঙ্গ। তার বেডের কাছে কেউ নেই। একটা পায়ের উরু থেকে নিচেরদিকের পুরোটাই ব্যান্ডেজে মোড়ানো – লোহার স্ট্যান্ডের সাথে বেল্ট দিয়ে উঁচু করে বেঁধে রাখা হয়েছে। অন্য পা মলিন লুঙ্গিতে ঢাকা থাকলেও বোঝা যাচ্ছে হাঁটুর নিচ থেকে বাকি অংশ নেই সেখানে। আস্তে আস্তে কাছে গিয়ে দেখলাম – অঘোরে ঘুমাচ্ছেন ক্লান্ত তরুণ। হয়তো ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। মুখভর্তি খোঁচাখোঁচা দাড়ি। একপাশ থেকে স্যারের চেহারার সাথে খুব মিল। আমাদের গ্রামের স্কুলের বিএসসি স্যারের ছোটভাই। এখন দেখে কে বলবে মাসখানেক আগেও এই তরুণ এক রাশ স্বপ্ন নিয়ে মাস্টার্স পড়ছিলেন আমাদের ক্যাম্পাসে। আমার সাথে পরিচয় হয়নি তার কোনদিন।

এখানে আসার কোন পরিকল্পনা আমার ছিল না। গতকাল সন্ধ্যায় দিদির বাসার গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকার সময় হঠাৎ দেখা হয়ে গিয়েছিল স্যারের সাথে। আমাদের গ্রামের স্কুলের বিজ্ঞানশিক্ষক সৈয়দ বিএসসি স্যার। বছরখানেক আগেও স্যারের সাথে দেখা হয়েছিল একবার। এবার দেখে মনে হলো এক বছরের মধ্যে বিশ বছর বয়স বেড়ে গেছে স্যারের। গেটের কাছে দাঁড়িয়েই স্যার বললেন তাঁর ভাইয়ের দুর্ঘটনার কথা। বাংলা বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র স্যারের ভাই। আলাওল হলে থাকতেন। একদিন দোতলার ছাদের রেলিং-এ বসেছিলেন। সেই রেলিং ভেঙে নিচে পড়ে যান। তারপর থেকেই হাসপাতালে আছেন গত এক মাস। স্যার এখানে এক আত্মীয়ের বাসায় উঠেছেন। এখান থেকেই দিনরাত হাসপাতালে ছোটাছুটি করছেন।

আলাওল হলের অনেক পুরনো ইটের রেলিং ভেঙে নিচে পড়ে গিয়ে একজন ছাত্রের আহত হবার খবর আমরা পেয়েছিলাম। কিন্তু ব্যাস ঐটুকুই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর কোন শিক্ষার্থী কোন দুর্ঘটনার শিকার হলে তার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব কতটুকু আছে আমি জানি না। শুরুতে হয়তো কয়েকদিন বন্ধুবান্ধবরা এসে খবর নিয়েছে। তারপর প্রত্যেকেরই তো নিজেদের ব্যস্ততা থাকে। স্যার এসব জানেন বলেই হয়তো আমাকে একবারও বলেননি হাসপাতালে আসতে। অবশ্য আমি এসেও বা কী করতে পারছি। সবার অজান্তে একটু দেখে গেলাম। দেখে গেলাম পঙ্গুত্ব মানুষকে কীভাবে ক্রমশ নিঃসঙ্গ করে দেয়।

সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় অ্যাপ্রোন কাঁধে কয়েকজন তরুণকে দেখলাম পরস্পরের সাথে হাসিঠাট্টা করতে করতে উপরে উঠছে। পাশ কাটিয়ে যাবার সময় হঠাৎ মনে হলো – মানব না? ডাক দিলাম – অ্যাই মানব, মানব!

মানব থমকে দাঁড়িয়ে একটু পেছনে তাকালো। তারপর দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেল। হয়তো আমাকে চিনতে পারেনি। সিঁড়িতে আলো কম, অনেক ভীড়, উপর থেকে নিচের দিকে তাকালে হয়তো ঠিকমতো দেখা যায় না। অথবা হাতে সময় নেই, ওয়ার্ডে যেতে হবে – রোগীরা বসে আছে। আমি এখনো অনার্স থার্ড ইয়ারে হলে কী হবে – মেডিকেলে তো ওরা ফিফ্‌থ ইয়ারে উঠে গেছে। অনেক কারণ থাকতে পারে না চেনার। চিটাগং কলেজে আমরা একসাথে পড়েছি। হোস্টেলে সে আমার রুমমেট ছিল। বেশি আলোতে দেখলে অবশ্যই চিনতে পারতো। কিন্তু মন তো এসব যুক্তি মানতে চায় না। ঈর্ষা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে -  ডাক্তারদের প্রতি, ডাক্তারি পড়ুয়াদের প্রতি। মেডিকেল সায়েন্সে কষ্ট কমানোর ওষুধ আছে, ঈর্ষা কমানোর ওষুধ আছে কি?

বড় বড় পা ফেলে বের হয়ে এলাম রাস্তায়। নার্সিং হোস্টেলের সামনের গেট দিয়ে বের হয়ে মেহেদিবাগের ভেতরের রাস্তা দিয়ে চলে এলাম শিল্পকলা একাডেমি। নাট্যকলা বিষয়ক তাত্ত্বিক কর্মশালা – শুরু হতে আর বেশিক্ষণ দেরি নেই।

কত কয়েকদিন ধরে চলছে এই অতি উচ্চমার্গের কর্মশালা। আমেরিকান এক মহিলা প্রফেসর ড্যানি প্যাট্রিজ আর নাট্যনির্দেশক জামিল আহমেদ এই ওয়ার্কশপ পরিচালনা করছেন। নাট্যকর্মী হতে গেলে কতটা নিবেদিতপ্রাণ হতে হয়, সমাজসচেতন আর রাজনীতিসচেতন হতে হয় তা অনেকভাবে বোঝানো হলো। প্রচুর পড়াশোনা করতে হবে, চর্চা করতে হবে, আর অনুশীলনের পাশাপাশি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

একাডেমির বড় একটা রিহার্সাল রুমে সবাই গোল করে বসে মনযোগ দিয়ে ড্যানি প্যাট্রিজ আর জামিল আহমেদের কথাবার্তা শুনছি। গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার কথা বলা হয়েছে – আমি তাও করার চেষ্টা করছি। খুব সিরিয়াস আলোচনা হচ্ছে। ড্যানি প্যাট্রিজ খুব মোটাসোটা মহিলা। তাঁর কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে তিনি সাচ্চা কমিউনিস্ট। আমেরিকান কমিউনিস্ট খুব একটা দেখা যায় না।

জামিল আহমেদ খুব লম্বা পাতলা কাঠখোট্টা ধরনের মানুষ। প্রথম ওয়ার্কশপেই তিনি নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন ফুল টাইম নাটকের ওয়ার্কার হিসেবে। নাটক ছাড়া তিনি নাকি আর কোন চাকরি করেন না। শুনে আশ্চর্য হয়েছি। বাংলাদেশে মঞ্চনাটক করে সংসার চালানো যায়? পরে লিমনভাইয়ের কাছ থেকে শুনেছি – জামিল আহমেদ নাকি শীঘ্রই আমেরিকা চলে যাবেন নাট্যকলা সম্পর্কিত বেশ ভালো একটা স্কলারশিপ নিয়ে।

লিমনভাই আমাদের গ্রুপের বুদ্ধিজীবী। অর্থনীতিতে অনার্স পড়ছেন। ইউনিভার্সিটিতে আমাদের এক ব্যাচ সিনিয়র, কিন্তু কথাবার্তা শুনলে মনে হবে দশ পনেরো বছরের সিনিয়র। আজ দেখলাম তিনি জামিল আহমেদ আর ড্যানি প্যাট্রিজের কাছাকাছি বসেছেন। মনে হচ্ছে খুব মনযোগ দিয়ে শুনছেন নাটকের তত্ত্বকথা।

জামিল আহমেদ খুবই যুক্তিবাদী মানুষ বলে মনে হচ্ছে। তিনি বলছেন – ছোটবেলা থেকে আমরা শিখে এসেছি রিক্সাওয়ালাদের ভাষা অশ্লীল, সমাজ অসভ্য। সুতরাং ওদের সাথে মেশা মানা। কুলিমজুররা অস্পৃশ্য – কারণ তারা ছোট কাজ করে। আমরা মধ্যবিত্তরা চিরদিন উচ্চবিত্তদের করুণা লাভের চেষ্টা করছি। চেষ্টা করছি কী করে উচ্চবিত্ত সমাজে কল্কে পাওয়া যায়। সুতরাং মধ্যবিত্তরা নিম্নবিত্তদের জন্য কিছু করবে – এটা আশা করা যায় না।

রুমের মধ্যে মশার কয়েল জ্বালানো হয়েছে অনেকগুলি। কিন্তু কোন কাজ হচ্ছে না। অনেকগুলি বড় বড় মশা উড়ে বেড়াচ্ছে। মশারাও সম্ভবত উচ্চবিত্ত নিম্নবিত্ত চেনে – তাই আমেরিকান মহিলার ওদিকে বেশি ঘুরঘুর করছে। দেখলাম আমেরিকানরা যুদ্ধ লাগিয়ে মানুষ মারতে যতটা ওস্তাদ – মশা মারতে ততটা নয়। ড্যানি প্যাট্রিজের গায়ে মশা বসলেও তাঁর কোন হেলদোল নেই। এদিকে লিমনভাই হাত দিয়ে মশা ধরতে শুরু করেছেন। মাছ ধরার মতো মশা ধরার মধ্যেও নেশা আছে নিশ্চয়। তিনি মশা মারতে মারতে এতটাই মশগুল হয়ে গেলেন যে জামিল আহমেদ কথা থামিয়ে কয়েক সেকেন্ড যে তাঁর দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করেছেন তা খেয়াল করেননি। ফলে যা হলো তার জন্য আমরা কেউই প্রস্তুত ছিলাম না। জামিল আহমেদ হঠাৎ রেগে উঠে চিৎকার করে লিমনভাইকে রুম থেকে বের করে দিলেন। বুঝলাম – মঞ্চনাটকের ডিরেক্টর আর ডিক্টেটরে খুব বেশি পার্থক্য নেই। এরপর মশা কামড় দিলেও নড়াচড়া করতেও ভয় পাচ্ছিলাম। এত ভয়ের মধ্যে আমি কিছু শিখতে পারি না।

ওয়ার্কশপের পর আমাদের নাটক ‘সমাধান’– হলের মধ্যে। নাটকের টিকেট বিক্রি করা – যাকে বলে ফোর্সড সেল করা নাট্যকর্মীদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আমাকে পাঁচটি টিকেট দেয়া হয়েছিল ‘জোর করে বিক্রি করা’র জন্য। অনিচ্ছুক ব্যক্তিকে জোর করে টিকেট গছিয়ে টাকা নেয়া আর চাঁদাবাজি করা একই কথা। আমি পাঁচটি টিকেট আমার পাঁচ বন্ধুকে এমনিতেই দিয়ে দিয়েছিলাম। প্রদীপনাথ সরাসরি বলেছিল আমার ‘তোহফা’ দেয়া টিকেটে শিল্পকলা একাডেমিতে গিয়ে মঞ্চনাটক দেখার কোন ইচ্ছে তার নেই। তারচেয়ে ভিসিআর-এ জিতেন্দ্র-শ্রীদেবীর ‘তোহফা’ দেখা অনেক আনন্দের। যারা আসবে বলেছিল – তাদের মধ্যে যীশু ছাড়া আর কেউ আসেনি। আমি অবশ্য তাতে খুব খুশি। কারণ মঞ্চে আমার  কোন সংলাপ নেই, কেবল সেট টানাটানি করছি – এটা বন্ধুদের ডেকে এনে দেখানোর মতো কিছু নয়।

ব্যাকস্টেজ থেকে বের হয়ে হলের বারান্দায় এসে দেখলাম ড্যানি প্যাট্রিজ, জামিল আহমেদ আর আহমেদ ইকবাল হায়দার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। জামিল আহমেদ আমাদের নাটকের মূল নির্দেশক। তিনি ঢাকায় থাকেন বলে প্রত্যেক শো-তে আসা সম্ভব হয় না। তাই হায়দারভাই কার্যনির্বাহী নির্দেশকের দায়িত্ব পালন করেন। আমি পাশ কাটিয়ে চলে আসছিলাম। শুনলাম জামিল আহমেদ বললেন, “আপনার কাজ খুব ভালো হয়েছে।“ আমি বুঝতে পারছিলাম না তিনি কাকে বললেন। আমি একটু পেছন ফিরে তাকালাম। তিনি আবার বললেন, “হ্যাঁ, আপনাকে বলছি। মঞ্চে আপনার কাজ খুব ভালো হয়েছে।“

কর্মশালায় দেখেছি জামিল আহমেদ সবাইকে আপনি করে বলেন। তিনি আমার কাজের প্রশংসা করছেন? আমি পুরোপুরি তাদের দিকে ফিরে বললাম, “থ্যাংক ইউ স্যার। আমি তো তেমন কিছু করিনি।“

ড্যানি প্যাট্রিজ বললেন, “ইন থিয়েটার, এভরি সিঙ্গেল মুভমেন্ট ইজ ইম্পর্ট্যান্ট। ইওর পার্ট ওয়াজ ফ্ললেস।“ হুবহু এরকম বলেছিলেন কি না জানি না। আমেরিকান উচ্চারণ ঠিকমতো বুঝিনি। কিন্তু আমার মনে হলো এরকম কিছুই বলেছেন। আমি তো ফুলে বেলুন হয়ে গেলাম। মনে হচ্ছে জামিল আহমেদের মতো আমিও যদি একটা থিয়েটারের স্কলারশিপ পেয়ে যেতাম – পদার্থবিজ্ঞান পড়া বাদ দিয়ে থিয়েটার নিয়েই পড়ে থাকতাম।

দুই লাইন প্রশংসার বাতাসেই প্রায় উড়তে শুরু করলাম। গরিবুল্লাহ শাহ্‌র মাজার থেকে মুরাদপুরে এসে তিন নম্বর বাসে উঠে ফতেয়াবাদে নেমে হাঁটতে হাঁটতে নিজের রুমে আসতে আসতে সারাক্ষণই ভাবছিলাম – সুযোগ পেলে আমার অভিনেতা হতে আটকায় কে। আরো সিরিয়াসলি নাট্যসাহিত্য পড়তে হবে।

অন্ধকারে রুমের তালা খোলার সময় কিছু চোখে পড়েনি। করিডোরে আলো নেই, বাথরুমের লাইটটা সম্ভবত ফিউজ হয়ে গেছে। রুমের লাইট জ্বালানোর পর চোখে পড়লো – আমার দরজায় চক দিয়ে কেউ বড় বড় অক্ষরে লিখে রেখেছে – সালমান রুশদীর ফাঁসি চাই।

এতক্ষণের ফুরফুরে মেজাজটা মুহূর্তেই খারাপ হয়ে গেল। সালমান রুশদী কে আমি ঠিকমতো জানিও না। তার নাম শুনেছি মাত্র কয়েকদিন আগে। স্যাটানিক ভার্সেস নামে যে বইটি লিখেছে সেটি বাংলাদেশে কেউ পড়েছে কি না জানি না – কিন্তু নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই বইটি গতবছর সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হয়েছে ব্রিটেন থেকে। চার-পাঁচ মাস কোন সমস্যা হয়নি। কিন্তু এবছরের শুরু থেকে ঝামেলা শুরু হয়েছে। গত মাসে ইরানে ফতোয়া দেয়া হয়েছে এই বইয়ের বিরুদ্ধে। লেখক সালমান রুশদীকে হত্যা করতে পারলে বেশ মোটা অঙ্কের পুরষ্কার ঘোষণা করা হয়েছে। আগামীকাল ২১ মার্চ সালমান রুশদীর ফাঁসির দাবিতে সারাদেশে অর্ধদিবস হরতাল ডেকেছে জামায়াত-শিবির। সবই বুঝলাম – কিন্তু আমার দরজায় কেন সালমান রুশদীর ফাঁসির দাবি? অন্য কারো দরজায় তো এই দাবির কথা লিখে রাখেনি কেউ! আমাকে ইচ্ছে করে বিরক্ত করা হচ্ছে তা বুঝতে পারছি। কিন্তু তাদের উপর বিরক্ত হয়ে আমি কিছু করতে পারবো না। বড়জোর এখান থেকে চলে যেতে পারবো। কিন্তু যাবো কোথায়? সবখানেই তো এখন এরকম চলছে।

পরদিন খুবই জঙ্গি ধরনের হরতাল হলো। সালমান রুশদীকে যেখানে পাওয়া যাবে সেখানে খুনের ঘোষণা তো দেয়া হলোই – তার সাথে বাংলাদেশের কেউ যদি সালমান রুশদীর পক্ষে কথা বলে – তাকেও খুন করা হবে বলে জানিয়ে দেয়া হলো। এখন খুন করা কত সহজ হয়ে গেলো! কাউকে খুন করে বলে দিলেই হলো যে সে সালমান রুশদীর পক্ষে কথা বলেছিল। আমি খুবই ভয় পেয়ে গেলাম। আমার দরজায় চকের লেখা – ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে ফেলা যায়। কিন্ত ভয়ের চোটে আমি কিছুই করলাম না।

থার্ড ইয়ারের ক্লাস শুরু হলো কয়েকদিন পর। আমাদের অনার্সের সিলেবাস যারা তৈরি করেছিলেন তাঁরা নিশ্চয় অনেক ভেবেচিন্তে করেছিলেন। ফার্স্ট ইয়ারে তিন  পেপার অনার্স আর দুই পেপার সাবসিডিয়ারি, সেকেন্ড ইয়ারে তিন পেপার অনার্স আর চার পেপার সাবসিডিয়ারি, আর থার্ড ইয়ারে আট পেপার অনার্স। আর সব বিষয়ের প্র্যাকটিক্যাল তো আছেই। একটা বছরে যে পরিমাণ সময় পাওয়া যায় – সব বছরে তো একই পরিমাণ সময় পাওয়া যাবার কথা। সেক্ষেত্রে তিন বছরে অনার্সের বিষয়ভিত্তিক বন্টনে এত বৈষম্য কেন? আর যেভাবে সিলেবাস করা হয়েছে – বাস্তবে দেখা যাচ্ছে সেরকম হচ্ছে না। ফার্স্ট ইয়ারে তিন পেপারের অনার্স আর প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার পর সেকেন্ড ইয়ারে উঠে যাচ্ছি। সেকেন্ড ইয়ারে উঠে ফার্স্ট ইয়ারের সাবসিডিয়ারি পরীক্ষা দিতে হচ্ছে, তারপর তিন পেপারের অনার্স ও প্র্যাকটিক্যাল। থার্ড ইয়ারে উঠে সেকেন্ড ইয়ারের চার পেপার সাবসিডিয়ারি, আর থার্ড ইয়ারের আট পেপার অনার্স ও প্র্যাকটিক্যাল। এতকিছু একসাথে কীভাবে করবো?

ক্লাস শুরু হলো খুবই ধীরগতিতে। ফার্স্ট ইয়ার সেকেন্ড ইয়ারে যেসব স্যার আমাদের পড়াননি তাঁদের অনেককেই পেলাম থার্ড ইয়ারে। ফার্স্ট পেপার অপটিক্‌স পড়াচ্ছেন আবদুস সোবহান ভুঁইয়া স্যার। ভুঁইয়া স্যার প্রথমদিন ক্লাস নিতে এলেন প্যান্ট-শার্ট আর মোটা টাই পরে। ফ্রান্স থেকে পিএইচডি করে এসেছেন তিনি, আশা করেছিলাম পদার্থবিজ্ঞানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার অনেক গুরুত্ব দিয়ে পড়াবেন। কিন্তু সেরকম কিছু হলো না। প্রতি ক্লাসেই তিনি কিছু না কিছু ইসলামিক কথাবার্তা বলতে শুরু করলেন। থার্ড ইয়ারের শুরুতেই বেশ একটা ধাক্কা খেলাম।

সেকেন্ড পেপার রিলেটিভিটি পড়াচ্ছেন নুরুল মোস্তফাস্যার। রিলেটিভিটির সিলেবাস দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অব রিলেটিভিটি তবুও কিছুটা আয়ত্বে আসতে পারে, কিন্তু জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটির গাণিতিক ব্যাপারগুলি বুঝতে খবর হয়ে যাবে। কিন্তু নুরুল মোস্তফা স্যার খুব সিস্টেমেটিকভাবে পড়াতে শুরু করলেন। তিনি আইনস্টাইন কীভাবে এসব তত্ত্ব আবিষ্কার করলেন সে সংক্রান্ত কোন বিষয়ে কোন কথা না বলে সরাসরি গাণিতিক সমীকরণগুলি লিখতে শুরু করলেন বোর্ডে। আমরাও লিখতে শুরু করলাম।

থার্ড পেপার ইলেকট্রোডায়নামিক্স পড়াচ্ছেন রশীদুন্নবীস্যার। তিনি এখন বিভাগীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তারপরও আমাদের ক্লাস নিয়মিতই নিচ্ছেন ঠিকমতো।

ফোর্থ পেপার পড়াতে এলেন আহমদ হোসেনস্যার। এই স্যারের ক্লাস আগে কখনো পাইনি। প্রথম দিনের ক্লাসেই বুঝলাম স্যার খুবই সিরিয়াস মানুষ। হাসি কাহাকে বলে তিনি জানেন না। গাম্ভীর্য কী জিনিস সে ব্যাপারে তাঁর জ্ঞান সীমাহীন। প্রথম দিনই বিরাট বিরাট সার্কিট ডায়াগ্রাম এঁকে ব্ল্যাকবোর্ড ভরিয়ে ফেললেন। দাঁত্মুখ খিঁচিয়ে যখন বলেন “বুঝতে পেরেছো?” – তখন আমার বুকের ভেতরের সার্কিট কেঁপে উঠে। তখন কার এমন বুকের পাটা যে বুঝতে না পারলেও সেটা প্রকাশ করবে?

ফিফ্‌থ পেপার হলো থার্ড ইয়ারের সবচেয়ে বড় বিভীষিকা – কোয়ান্টাম মেকানিক্স। ফার্স্ট ইয়ারে প্রামাণিকস্যার ম্যাথমেটিক্যাল ফিজিক্স পড়িয়েছিলেন। তখন থেকেই জানি প্রামাণিকস্যারের ক্লাসে কিছু বোঝার চেষ্টা করা বৃথা। তাই কোয়ান্টাম মেকানিক্সে প্রথম থেকেই আমার লক্ষ্য হচ্ছে অন্তত স্যার বোর্ডে ডান হাতে যা লিখছেন তা বাম হাতে মুছে ফেলার আগেই যেন খাতায় তুলে ফেলতে পারি।

সিক্সথ পেপার অ্যাটমিক অ্যান্ড মলিকিউলার ফিজিক্স পড়াচ্ছেন এস কে সাহাস্যার। স্যারের সবকিছুই খুবই গোছানো। বিশাল ব্ল্যাকবোর্ডের একেবারে বাম দিকের উপরের কোণা থেকে লিখতে শুরু করেন। ক্লাস শেষ হবার আগেই পুরো বোর্ড ভরে যায়। দেখে দেখে লিখতে খুব একটা অসুবিধা হয় না। কিন্তু মনে হচ্ছে শুধু লিখতেই পারছি – বুঝতে পারছি না কিছুই। আমার হলো কী – ক্লাসে কিছু বুঝতে পারছি না কেন? ফারুককে এই প্রশ্ন করার পর সে দার্শনিকভাবে উত্তর দিলো – ‘বৎস, ক্লাসে বসিয়া শুধুই লিখিবে, বুঝিবার চেষ্টা করিবে না। বুঝিবার চেষ্টা করিলে লিখিতে পারিবে না।“

সেভেন্থ পেপার নিউক্লিয়ার ফিজিক্স পড়াচ্ছেন প্রফেসর নুরুল ইসলাম স্যার। এই স্যারের ক্লাস আগে পাইনি। ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী শিক্ষক তিনি। সায়েন্স ফ্যাকাল্টির ডিন ছিলেন। ফ্যাকাল্টিতে কম্পিউটার নিয়ে এসেছেন তিনি। কম্পিউটার সম্পর্কে একটা বইও লিখেছেন। স্যারের হাতের লেখা খুব সুন্দর। তবে যে নোটগুলি থেকে তিনি পড়াচ্ছেন – সেই নোটগুলির বয়স মনে হয় অনেক বেশি। কিন্তু স্যারের ক্লাসে মনে হচ্ছে কিছু কিছু জিনিস বুঝতে পারছি। এটা আশ্চর্য ঘটনা।

এইটথ পেপার সলিড স্টেট ফিজিক্স পড়াচ্ছেন আদম শফিউল্লাহস্যার। ফার্স্ট ইয়ারে দেখেছি – স্যার ক্লাস নেন খুবই কম। কিন্তু ক্লাসে যা পড়ান – তা হুবহু পরীক্ষায় আসে। এখানেও সেরকম হবে তাতেই আমি খুশি। ফার্স্ট ইয়ারে স্যার ক্লাসের বাইরে সিগারেট টেনে আসতেন। এখন থার্ড ইয়ারে সিগারেট ক্লাসের ভেতরও হাতেই থাকছে। স্যারের স্বাস্থ্য মনে হচ্ছে আরো ভালো হয়েছে। মধ্যপ্রদেশ আরো স্ফিত হয়েছে। প্রথম দিন কীভাবে যেন ফার্স্ট বেঞ্চে বসেছিলাম। চোখ বার বার চলে যাচ্ছিলো স্যারের শার্টের বোতামের দিকে। সারাক্ষণই মনে হচ্ছিলো স্যারের শার্টের বোতাম এখনই ছিঁড়ে বন্দুকের গুলির মতো ছুটে এসে আমার চোখে লাগবে।


পরের পর্ব >>>>>>>>>>>>>>>>>

<<<<<<<<<<<< আগের পর্ব 


Wednesday 28 July 2021

মহাবিশ্ব - নোবেল পদার্থবিজ্ঞান পুরষ্কার ২০১৯

 *


মহাবিশ্ব কত বড় সে সম্পর্কে ধারণা করতে গেলে আমাদের কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়। কারণ আমাদের চোখ এই মহাবিশ্বের খুব সামান্য অংশই দেখতে পায়। মহাবিশ্বে কমপক্ষে ১০০ বিলিয়ন বা ১০ হাজার কোটি গ্যালাক্সি আছে। প্রত্যেকটি গ্যালাক্সিতে আছে কমপক্ষে ১০০ বিলিয়ন বা ১০ হাজার কোটি নক্ষত্র।  এই নক্ষত্রগুলোর প্রত্যেকটিকে ঘুরছে তাদের নিজেদের গ্রহ এবং উপগ্রহগুলি। এরকম খুবই সাধারণ একটি নক্ষত্র হলো আমাদের সূর্য। আমাদের সৌরজগতের যে আয়তন -সেটাই আমরা ঠিকমত ধারণা করতে পারি না, সেরকম কোটি কোটি সৌরজগতের আয়তন যোগ করলে হবে মহাবিশ্বের আয়তন। এই বিশাল মহাবিশ্বের অতিক্ষুদ্র একটি অংশ হলো আমাদের পৃথিবী। এই পৃথিবীর মানুষ আজ একবিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞান ও কারিগরী দক্ষতায় পৌঁছে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। আমরা আজ মহাকাশযান পাঠাচ্ছি সৌরজগৎ ছাড়িয়ে অন্য নক্ষত্রলোকে, অসম্ভব শক্তিশালী টেলিস্কোপের সাহায্যে আমরা প্রত্যক্ষ করছি অন্য গ্যালাক্সির কার্যক্রম। আমরা আজ জানি যে সময়ের সাথে সাথে এই মহাবিশ্ব বিশাল থেকে বিশালতর হচ্ছে। কিন্তু একটা মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায় - এই মহাবিশ্বের শুরু কোথায়, আর শেষই বা কোথায়? 

সেই আদিযুগ থেকেই মানুষ মহাবিশ্বের গ্রহ-নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করছে। শুরুতে কোন ধরনের যন্ত্রপাতি ছাড়াই শুধুমাত্র পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মানুষ চন্দ্র-সূর্য এবং অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্রের ধর্মাবলি সম্পর্কে জেনেছে। বলা চলে পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে পুরনো শাখা হলো জ্যোতির্বিদ্যা বা অ্যাস্ট্রোনমি - যা গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি সংক্রান্ত বিজ্ঞান। কিন্তু মানুষ আরো গভীরে গিয়ে যখন থেকে প্রশ্ন করতে শিখেছে - এই যে সৌরজগত এবং আকাশজুড়ে অসংখ্য নক্ষত্রপুঞ্জ তাদের মধ্যে সম্পর্ক কী? কোন্‌ বৃহৎ কাঠামোয় সব এক সুতোয় বাঁধা? সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য গড়ে উঠেছে কসমোলজি - মহাবিশ্বের বিজ্ঞান।

আধুনিক কসমোলজি মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও ক্রমবিবর্তন বুঝতে সাহায্য করার পাশাপাশি পদার্থ ও শক্তির নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দশকে পর্যবেক্ষণ  বা অরজারভেশনাল কসমোলজির বিকাশ শুরু হতে থাকে টেলিস্কোপের সাহায্যে মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দক্ষতা বৃদ্ধির সাথে সাথে টেলিস্কোপের ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে, মানুষ মহাকাশযান পাঠিয়েছে মহাকাশে, এবং প্রচুর উপাত্ত সংগ্রহ করেছে। এই উপাত্তগুলোকে তত্ত্বীয় কাঠামোয় বিশ্লেষণ করার জন্য গড়ে উঠলো ভৌত বা ফিজিক্যাল কসমোলজি। ফিজিক্যাল কসমোলজির অন্যতম স্থপতি অধ্যাপক জেমস পিবলস - এবছরে পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরষ্কার পুরষ্কার পেয়েছেন। পুরষ্কারে অর্থমূল্যের অর্ধেক পাবেন তিনি। তাঁর জন্ম ১৯৩৫ সালে কানাডার উইনিপেগ  শহরে। ১৯৬২ সালে তিনি পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন আমেরিকার প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি থেকে। বর্তমানে তিনি সেখানকার আলবার্ট আইনস্টাইন প্রফেসর অব সায়েন্স।


২০১৯ সালের নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী জেমস পিবল্‌স, ডিডিয়ের কুলে এবং মিশেল মেয়র। (ছবি বিবিসির সৌজন্যে)


আমাদের সৌরজগতের বাইরেও অন্যান্য নক্ষত্রগুলোকে ঘিরে রয়েছে তাদের নিজেদের গ্রহ-উপগ্রহগুলো। আমাদের সৌরজগতের বাইরে অন্যান্য নক্ষত্রগুলোর গ্রহকে বলা হয় এক্সোপ্লেনেট। ১৯৯৫ সালের ৬ অক্টোবর সুইজারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব জেনিভার দু'জন জ্যোতির্বিজ্ঞানী মিশেল মেয়র এবং ডিডিয়ের কুলে (Queloz) আবিষ্কার করলেন প্রথম এক্সোপ্লেনেট। তাঁরা যার নাম দিয়েছিলেন - ৫১ পেগাসি বি। ২০১৫ সালে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন এই গ্রহটির নাম দেয় ডিমিডিয়াম (Dimidium)। ল্যাটিন শব্দ ডিমিডিয়াম-এর অর্থ - অর্ধেক। ৫১ পেগাসি বি গ্রহের ভর বৃহস্পতি গ্রহের ভরের অর্ধেক বলেই এই নাম দেয়া হয়েছে। মিশেল মেয়র ও ডিডিয়ের কুলে'র প্রথম এক্সোপ্লেনেট আবিষ্কারের পর জ্যোতির্বিজ্ঞানে নতুন বিপ্লব ঘটে যায়। একের পর এক এক্সোপ্লেনেট আবিষ্কৃত হতে থাকে। এপর্যন্ত আমাদের গ্যালাক্সি মিল্কিওয়েতে আবিষ্কৃত হয়েছে চার হাজারেরও বেশি এক্সোপ্লেনেট। প্রথম এক্সোপ্লেনেট আবিষ্কারের স্বীকৃতিস্বরূপ এবছরের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন মিশেল মেয়র ও ডিডিয়ের কুলে। পুরষ্কারের মোট অর্থের ৫০% এর সমান অংশীদার তাঁরা। মিশেল মেয়রের জন্ম ১৯৪২ সালে সুইজারল্যান্ডের লুসানে। ১৯৭১ সালে ইউনিভার্সিটি অব জেনিভা থেকে পিএইচডি করেছেন। বর্তমানে সেখানকার অধ্যাপক। ডিডিয়ের কুলের জন্ম ১৯৬৬ সালে। ১৯৯৫ সালে পিএইচডি করেছেন ইউনিভার্সিটি অব জেনিভা থেকে। এখন তিনি সেখানকার প্রফেসর, আবার কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটিরও প্রফেসর।

কসমোলজির তত্ত্বীয় ভিত্তি গড়ে উঠেছে জেমস পিবলের হাত দিয়ে। ১৯৬০এর দশকে তিনি গবেষণা শুরু করেছিলেন। তারপর গত ৫৯ বছর ধরে তিনি নিরলস গবেষণা চালিয়ে গেছেন এই বিষয়ে। ১৯৭১ সালে তাঁর ফিজিক্যাল কসমোলজি বই প্রকাশিত হবার পর অনেকেই এই বিষয়ে তত্ত্বীয় এবং পরীক্ষণ গবেষণায় উদ্বুদ্ধ হন। ১৯২০ সালের আগে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতেন যে মহাবিশ্ব স্থির। অর্থাৎ যে মহাবিশ্ব আমরা গতকাল দেখেছি, আজকেও তা দেখছি, আগামীকালও তাই দেখবো। কিন্তু ১৯২০ সালের পর বিজ্ঞানীরা যখন আবিষ্কার করলেন যে গ্যালাক্সিগুলো পরস্পর দূরে সরে যাচ্ছে - স্থির মহাবিশ্বের ধারণা বদলে গেলো। এখন আমরা জানি - যে মহাবিশ্বকে আজ দেখছি, আগামীকাল তা বদলে যাবে। জেমস পিবল কসমোলজিতে একটি সমন্বিত গাণিতিক মডেল দাঁড় করিয়েছেন যেটা দিয়ে মহাবিশ্বের শুরু থেকে বর্তমান এবং বর্তমান থেকে ভবিষ্যৎ পর্যন্ত সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।

১৯১৬ সালে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সার্বিক তত্ত্ব বা জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটিই এখন মহাবিশ্বের বৃহৎ কাঠামোর হিসাব-নিকাশের মূল ভিত্তি। আধুনিক কসমোলজিতে মহাবিশ্বের শুরু বিগ ব্যাং থেকে। বিগ ব্যাং-এর শুরুতে মহাবিশ্ব ছিল প্রচন্ড উত্তপ্ত এবং ঘনত্ব ছিল অত্যন্ত বেশি। প্রচন্ড তাপমাত্রায় পুরো মহাবিশ্বের গঠন ছিল তরল ঘন স্যুপের মত - যেখানে সমস্ত কণা বিচ্ছিন্নভাবে লাফালাফি করছিল। চার লক্ষ বছর ধরে ঠান্ডা হতে হতে তাপমাত্রা তিন হাজার ডিগ্রি কেলভিনে নেমে এলো। তখন ইলেকট্রন নিউক্লিয়াসের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে তৈরি হলো পরমাণু। শুরুতে হলো হাইড্রোজেন হিলিয়াম ইত্যাদি, পরে আরো ভারী পরমাণু। কোন চার্জিত কণা অবশিষ্ট রইলো না। অচার্জিত কণা ফোটন রয়ে গেলো আলাদা হয়ে। আলোর কণা ফোটন কোন বাধা ছাড়াই মহাবিশ্বের সবখানে ছুটে বেড়াতে লাগলো। এই আলো মহাবিশ্বের সবখানে ছড়িয়ে পড়লো। মহাবিশ্ব যখন প্রসারিত হলো আলোর তরঙ্গও প্রসারিত হয়ে তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেড়ে গেলো, শক্তি গেলো কমে। ফলে দৃশ্যমান আলো হয়ে গেলো অদৃশ্য মাইক্রোওয়েভ। কসমোলজিতে এই আলোক-বিকিরণ কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে পরিচিত।

এই কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড সর্বপ্রথম শনাক্ত করেন দুজন আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর্নো পেনজিয়াস ও রবার্ট উইলসন ১৯৬৪ সালে। এই আবিষ্কারের জন্য তাঁরা দু'জন পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন ১৯৭৮ সালে। পেনজিয়াস ও উইলসন তাঁদের আবিষ্কারের তত্ত্বীয় ভিত্তির জন্য নির্ভর করেছিলেন এবছরের নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী জেমস পিবলের পেপারের উপর। জেমস পিবল সেই সময় এই ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশানের তত্ত্বীয় হিসাব করেছিলেন। পিবল অনুধাবন করলেন যে ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশানের তাপমাত্রা থেকে বিগ-ব্যাং-এ কী পরিমাণ পদার্থ সৃষ্টি হয়েছিল তা বের করা যায়। শুধু তাই নয়, এটাও বুঝতে পারলেন যে এই কসমিক লাইট গ্যালাক্সিগুলো সৃষ্টির সময় ভূমিকা রেখেছে। মহাবিশ্বে মাইক্রোওয়েভ রেডিয়েশান আবিষ্কার আধুনিক কসমোলজির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করলো। এর সাহায্যে হিসেব করা গেলো মহাবিশ্বের বয়স, মহাবিশ্বের ভবিষ্যত, মহাবিশ্বে কী পরিমাণ পদার্থ ও শক্তি আছে ইত্যাদি।

মহাবিশ্বের কসমিক ব্যাকগ্রাউন্ড খুঁজে বের করার লক্ষ্যে  ১৯৮৯ সালের ১৮ নভেম্বর পৃথিবীর কক্ষপথে পাঠানো হয় কসমিক ব্যাকগ্রাউন্ড এক্সপ্লোরার (COBE) স্যাটেলাইট। ১৯৯২ পর্যন্ত ডাটা সংগ্রহ করে এই স্যাটেলাইট। ১৯৯২ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত হয় COBE স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত কসমিক ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশান থেকে তৈরি আদি মহাবিশ্বের ছবি। এই আবিষ্কারের জন্য COBE প্রকল্পের বিজ্ঞানী জন মাথির ও জর্জ স্মুট পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন ২০০৬ সালে। কসমিক ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশানের তাপমাত্রা মাপার লক্ষ্যে ২০০১ সালের ৩০ জুন মহাকাশে পাঠানো হয় আরেকটি স্যাটেলাইট উইলকিনসন মাইক্রোওয়েভ অ্যানাইসোট্রপি প্রোব (WMAP)। ২০০১ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত মহাকাশে মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশানের তাপমাত্রার পার্থক্য মাপে এই স্যাটেলাইট। এই তাপমাত্রার পার্থক্য এক ডিগ্রি কেলভিনের এক লক্ষ ভাগের একভাগ। এখান থেকে মহাবিশ্বের মোট শক্তি ও পদার্থের পরিমাণ হিসেব করে দেখা যাচ্ছে যে মহাবিশ্বের শতকরা ৯৫ ভাগ শক্তি ও পদার্থ আমরা দেখতে পাই না। এই শক্তি ও পদার্থ হলো ডার্ক এনার্জি ও ডার্ক ম্যাটার।

ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি কসমোলজির জন্য এখনো সবচেয়ে বড় রহস্য। বিজ্ঞানীরা অনেকদিন থেকে বিশ্বাস করে আসছিলেন যে নিউট্রিনোগুলো হয়তো ডার্ক ম্যাটার বহন করছে। কিন্তু কম-ভরের নিউট্রিনোগুলোর গতি প্রায় আলোর গতির সমান - এবং এই গতিতে ডার্ক ম্যাটার ধরে রাখা সম্ভব নয়। ১৯৮২ সালে জেমস পিবল প্রস্তাব করলেন ভারী এবং ধীর গতিসম্পন্ন ঠান্ডা ডার্ক ম্যাটারের কণা এই রহস্যের সমাধান করতে পারে। তিনি হিসেব করে দেখিয়েছেন মহাবিশ্বের প্রায় ২৬% এই ঠান্ডা ডার্ক ম্যাটারের কণার দখলে। কিন্তু এখনো এই কণার সন্ধান মেলেনি। এখন সারাপৃথিবীতে অনেকগুলো বৈজ্ঞানিক প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে ডার্ক ম্যাটার খুঁজে বের করার লক্ষ্যে।

যদিও মাত্র শতকরা ৫% পদার্থ ও শক্তির সন্ধান আমরা পেয়েছি বিগ বিং-এর হিসেব অনুসারে, তবুও বিজ্ঞানীরা একমত যে মহাবিশ্বের শুরু হয়েছে বিগ ব্যাং-এর মধ্য দিয়ে। সৌরজগতে সূর্যের চারপাশে যেরকম গ্রহগুলো ঘুরছে - সেরকম গ্যালাক্সির আরো দশ হাজার কোটি নক্ষত্রের প্রত্যেককে কেন্দ্র করে ঘুরছে তাদের গ্রহগুলো - যারা আমাদের এক্সোপ্লেনেট। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এখন একের পর এক নতুন নতুন  এক্সোপ্লেনেট আবিষ্কার করছেন। এপর্যন্ত চার হাজারেরও বেশি এক্সোপ্লেনেট আবিষ্কৃত হয়েছে। কিন্তু ১৯৯৫ সালের মিশেল মেয়র এবং ডিডিয়ের কুলে যখন প্রথম এক্সোপ্লেনেট  ৫১ পেগাসি বি আবিষ্কার করলেন - কেউ বিশ্বাসই করতে চাইলেন না। কারণ গ্রহটি অনেক বেশি বড় এবং খুব নক্ষত্রের খুব বেশি কাছে।

১৯৯৫ সালের ৬ অক্টোবর ইতালির ফ্লোরেন্সে এক কনফারেন্সে মিশেল মেয়র ও ডিডিয়ের কুলে ঘোষণা করলেন যে তাঁরা একটি এক্সোপ্লেনেট আবিষ্কার করেছেন। সৌরজগতের বাইরে ওটাই প্রথম গ্রহ। নাম দেয়া হয়েছে - ৫১ পেগাসি বি। নক্ষত্র ৫১ পেগাসির চারপাশে ঘুরছে বলেই এই নাম দেয়া হয়েছে। পৃথিবী থেকে এই গ্রহের দূরত্ব ৫০ আলোকবর্ষ। তার মানে ওখান থেকে আলো পৃথিবীতে আসতে সময় লাগে ৫০ বছর। মাত্র চারদিনে এই গ্রহটি তার নক্ষত্রের চারপাশে একবার ঘুরে আসে। তার মানে সেই গ্রহের এক বছর হলো পৃথিবীর চার দিনের সমান। গ্রহটি তার নক্ষত্র থেকে মাত্র ৮০ লক্ষ কিলোমিটার দূরে। নক্ষত্রের এত কাছে বলে গ্রহটির তাপমাত্রা প্রায় ১০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই গ্রহটির আয়তন বিশাল। আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে বড় গ্রহ বৃহস্পতি। ৫১ পেগাসি বি আয়তনে বৃহস্পতি গ্রহের দ্বিগুণ। এত বড় একটা গ্রহ নক্ষত্রের এত কাছে! এতদিন ধারণা ছিল বড় গ্রহগুলো সূর্য থেকে দূরে উৎপন্ন হয় এবং দূরেই থাকে। কিন্তু ৫১ পেগাসি বি সে ধারণা অনেকটা বদলে দেয়। এখন বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে বড় গ্রহগুলো দূরে উৎপন্ন হওয়ার পরেও কোটি বছর পর কালের পরিক্রমায় কাছে চলে আসতে পারে।

 

৫১ পেগাসি-বি'র অবস্থান (ছবি - spokesman.com)

অবিশ্বাস্য মনে হলেও আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী পল বাটলার ও জেফ্রি মারসি তাঁদের টেলিস্কোপ তাক করলেন ৫১ পেগাসি বি-এর দিকে এবং তারাও দেখতে পেলেন। এতদিন বিজ্ঞানীরা চিন্তাও করেননি যে নক্ষত্রের এত কাছে গ্রহ থাকবে। অচিরেই একের পর এক এক্সোপ্লেনেট আবিষ্কার হতে লাগলো। এখন শুধুমাত্র পৃথিবীর টেলিস্কোপ থেকে নতুন গ্রহ আবিষ্কৃত হচ্ছে তা নয়, স্যাটেলাইট থেকেও আবিষ্কৃত হচ্ছে নতুন গ্রহ। ২০০৯ সালের ৭ মার্চ মহাকাশে এক্সোপ্লেনেট খুঁজে বের করার জন্য পাঠানো হয়েছিল কেপলার স্পেস টেলিস্কোপ। ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে ২,৩০০ এক্সোপ্লেনেট আবিষ্কার করেছে এই টেলিস্কোপ। ২০১৮ সালের ১৮ এপ্রিল মহাকাশে পাঠানো হয়েছে ট্রানজিটিং এক্সোপ্লেনেট সার্ভে স্যাটেলাইট (TESS)। আমাদের গ্যালাক্সির দুই লক্ষাধিক নক্ষত্রের দিকে চোখ রাখছে এই স্যাটেলাইট নতুন গ্রহের সন্ধানে। সৌরজগতের বাইরের গ্রহগুলোর আকার, আকৃতি, কক্ষপথ বিভিন্ন রকমের। এখন বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে এই এক্সোপ্লেনেটগুলোতে প্রাণের সন্ধান করার জন্য।

এবছরের নোবেলবিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানীরা মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণা বদলে দিতে সাহায্য করেছেন। জেমস পিবলস তাঁর তত্ত্বীয় গবেষণার সাহায্যে প্রতিষ্ঠা করেছেন বিগ ব্যাং-এর পর মহাবিশ্ব কীভাবে বর্তমান রূপ লাভ করেছে তা বুঝতে। মিশেল মেয়র ও ডিডিয়ের কুলে আমাদের গ্যালাক্সির অন্যান্য নক্ষত্রজগত জরিপ করে নতুন গ্রহ আবিষ্কারের পথ দেখিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছেন। 

___________________

* এই ছবিটি নেয়া হয়েছে ক্রিয়েটিভ কমন্‌স লাইসেন্স এর আওতাভুক্ত pixabay.com ওয়েবসাইট থেকে।
 ____________________

বিজ্ঞানচিন্তা অক্টোবর ২০১৯ সংখ্যায় প্রকাশিত






Monday 26 July 2021

কাশেমভাই - দাদাভাই

 কাশেমভাই -দাদাভাই


কাশেমভাইয়ের সাথে আমার প্রথম দেখা কোন্‌দিন হয়েছিল তার দাঁড়ি-কমা-সেমিকোলন সবই মনে আছে। আশ্চর্যের ব্যাপার তাঁর সাথে শেষ যেদিন দেখা হয়েছিল – সেদিনের কথাও মনে আছে। মাঝখানের অনেকগুলি বছরের অনেকগুলি দিন আলাদা আলাদাভাবে মনে করার উপায় নেই। কাশেমভাইয়ের সাথে শাহীন কলেজে একসাথে কাজ করেছি সাড়ে চার বছরেরও বেশি। পুরনো লাল বিল্ডিং-এ তাঁর সাথে ডেস্ক শেয়ার করেছি প্রায় তিন বছর। তারপর নতুন বিল্ডিং-এ আরো দেড় বছর মানুষটিকে দেখেছি কাছ থেকে, কাজ থেকে।

আমরা সবাই জানি – কাজের জায়গায় কত বিচিত্র রকমের মানুষ থাকে। তাঁদের প্রত্যেকের কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে – যেগুলি দিয়ে তাদেরকে আলাদা করা যায়। অনেক সময় আমরা তাদের বৈশিষ্ট্যগুলির কারণে তাদেরকে ঈর্ষা করি, আবার বৈশিষ্ট্যভেদে অনেক সময় বিরক্ত হই। গতকাল কাশেমভাইয়ের মৃত্যুসংবাদ পাবার পর থেকে অনেকক্ষণ ধরে মনে মনে খুঁজে বের করার চেষ্টা করলাম – কাশেমভাইয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য কোন্‌টি।

কাশেমভাইয়ের যেদিকটি আমাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছে তা হলো শাহীন কলেজ কর্তৃপক্ষের বহুবিধ চাপাচাপির মধ্যেও একেবারে প্রতিক্রিয়াহীন থাকা। কত ন্যায্য-অন্যায্য কারণে আমাদের অনেকের মাথা গরম হয়ে গেছে, আমরা কমনরুমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছি, অনেক সময় ছাত্রছাত্রীদের কাছেও আমাদের মানসিক অস্থিরতা চাপা থাকেনি। মানসিক চাপে আমাদের শারীরিক ভাষাও বদলে গেছে অনেকসময়। আমাদের হাঁটার গতি বেড়েছে, কিংবা ডাস্টারের উপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে – অথবা নিদেনপক্ষে অ্যাডজাস্টমেন্ট খাতা আছড়ে ফেলেছি। কিন্তু কাশেমভাইকে কোনদিন মেজাজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে দেখিনি। শুরুতে ভেবেছিলাম তিনি সংসারে বাস করা সন্ন্যাসী টাইপের মানুষ। কিন্তু ক্রমে জেনেছি তিনি ঘোরতর সংসারী মানুষ। মানুষের যেসব স্বাভাবিক স্বার্থচিন্তা থাকে – তার কোনটা থেকেই তিনি মুক্ত ছিলেন না। তাহলে কোন্‌ জাদুবলে কলেজের সব চাপ তিনি উপেক্ষা করে সদাস্থির থাকতে পেরেছিলেন?

কমনরুমে আমরা কত কিছু নিয়ে, কত কাউকে নিয়ে কতরকমের মন্তব্য করেছি। কাশেমভাই সেসব মন্তব্য চলাকালীন আরাম করে পান চিবিয়েছেন।

শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর গভীর মমতা ছিল তার প্রমাণ পেয়েছি অনেক সময়। ক্লাসের ভালো, কিংবা ধনী, কিংবা প্রভাবশালী, কিংবা গন্ডগোলে শিক্ষার্থীদের প্রতি অনেক শিক্ষকেরই ধনাত্মক-ঋণাত্মক কোন না কোন রকমের পক্ষপাতিত্ব থাকে। কিন্তু দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রতি মমতা দেখানোর মতো ধৈর্য অনেক শিক্ষকের থাকে না। কাশেমভাইয়ের মধ্যে আমি সেই মমতা দেখেছিলাম। তাঁর শিক্ষার্থীরাই ভালো বলতে পারবে তারা তাদের কাশেমস্যারকে মনে রাখলে কেন মনে রাখবে। আমি আমার জ্যেষ্ঠ সহকর্মী কাশেমভাইকে মনে রাখবো তাঁর কিছুতেই-কিছু-যায়-আসে-না স্বভাবের জন্য। কলেজে তিনি অনেক সিনিয়র ছিলেন – কিন্তু কখনোই সেটা জাহির করেননি। ক্ষমতাকেন্দ্রিক প্রভাবশালী শিক্ষকদের বলয়ে তিনি কোনদিনই ঢুকতে চেষ্টা করেননি।

কাশেমভাইয়ের সাথে আমার সর্বশেষ দেখা হয়েছিল ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে – ঢাকা ডোমেস্টিক এয়ারপোর্টে। আমাদের আরেকজন সহকর্মী আলী হায়দারভাই কানাডা থেকে ঢাকায় এসে কানেক্টিং ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। আমিও বাড়িতে যাচ্ছিলাম। কাশেমভাই আলী হায়দারভাইয়ের সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। আমার সাথে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল। কাশেমভাই তখন অবসর নিয়েছেন। আমার সাথে প্রায় এক যুগ পরে দেখা হলেও চিনতে পারলেন, বুকে টেনে নিলেন। মানুষকে আপন করে নেয়ার এই গুণের কারণে আপনাকে মিস করবো কাশেমভাই – আমাদের দাদাভাই।

Saturday 24 July 2021

মাসুদ রানা ০৩ - স্বর্ণমৃগ

 



মাসুদ রানা সিরিজের ৩য় বই  স্বর্ণমৃগ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। এই বইটাও প্রথমে প্রকাশিত হয়েছিল বিদ্যুৎ মিত্র ছদ্মনামে।




স্বর্ণ চোরাচালানীর মূল হোতাকে ধরার জন্য দায়িত্ব দিয়ে মাসুদ রানাকে পাঠানো হয় করাচিতে। সেখানে গিয়ে যে হোটেলে ওঠে – সেখানেই পরিচয় হয় জিনাত সুলতানার সাথে। যথারীতি সুন্দরী এবং কিছুটা ডিস্টার্বড জিনাতের সাথে নানা ঘটনার মাধ্যমে ঘনিষ্ঠতা হয়। জিনাতের বাবা খান মোহাম্মদ জান একটা উপদলের সর্দার হিসেবে অনেক ক্ষমতার অধিকারী। জিনাতকে মানসিক সমস্যা থেকে প্রেম-ভালোবাসার ওষুধে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে আসার বিনিময়ে রানাকে সাহায্য করতে রাজি হন জিনাতের বাবা। তবে খুব বেশি কিছু তিনি করতে পারেননি।

মূল ভিলেন ওয়ালী আহমেদের অনেক ক্ষমতা। তার পোষা শক্তিশালী মানুষ গুঙ্গা’র সাথে অনেক মারপিট করতে হয় রানাকে। শেষ পর্যন্ত রানা ধরে ফেলে ওয়ালী আহমেদের নেটওয়ার্ক। একোয়ারিয়ামের মাধ্যমে সোনা চালান হয়। শত্রুকে শেষ করার জন্য ওয়ালী পিরানহা মাছ চাষ করেছিল। শেষ পর্যন্ত অনেক মারপিট শেষে পিরানহা মাছের কবলেই পড়তে হয় ওয়ালী আহমেদকে। রানাকে সাহায্য করেছে ওয়ালীর এক সময়ের কর্মচারী অনীতা গিলবার্ট। থ্রিলারের নিয়ম অনুযায়ী অনীতাও অনেক সুন্দরী।

সেই সময় সোনার দাম ছিল প্রতি ভরি ১৩০ টাকা। 

থ্রিলার হিসেবে মাসুদ রানা পড়ার সময় প্রায়ই মনে হয় জেমস বন্ডের কোন সিনেমা দেখছি। হবেই তো। কারণ এই থ্রিলার জেমস বন্ডের ছায়া অনুসারে লেখা।


মাইক্রোওয়েভ: র‍্যাডার থেকে রান্না

 

***

রান্না করার মাধ্যম হিসেবে মাইক্রোওয়েভ ওভেনের জনপ্রিয়তা দিনে দিনে বাড়ছে। বিমান, জাহাজ, কিংবা ট্রেনের কিচেন, বড় বড় রেস্টুরেন্ট তো বটেই - এখনকার যে কোন আধুনিক রান্নাঘরেও জায়গা করে নিয়েছে মাইক্রোওয়েভ ওভেন। প্রতিবছর প্রায় তিন কোটি নতুন মাইক্রোওয়েভ ওভেন বিক্রি হয় পৃথিবীজুড়ে মানুষের খাবার রান্না করার জন্য। অথচ যে মানুষটি এই মাইক্রোওয়েভ ওভেন উদ্ভাবন করেছিলেন - সেই পারসি স্পেনসারের ছোটবেলায় খাবার জুটতো না। মা-বাবা আত্মীয়স্বজন কেউ ছিল না তাঁর। এতিমখানায় কেটেছে শৈশব। তাঁর কথায় আসার আগে মাইক্রোওভেন সম্পর্কে আরো কিছু কথা বলে নেয়া যাক। 

মাত্র কয়েক মিনিটেই রান্না হয়ে যায় মাইক্রোওভেনে। রান্না করা খাবার গরম করতে সময় লাগে মাত্র কয়েক সেকেন্ড। এই ওভেনে আগুন জ্বালাতে হয় না, গ্যাস লাগে না, এমনকি খাবার বা পানীয় গরম হলেও মাইক্রোওয়েভ ওভেনটি গরম হয় না। স্বাভাবিক ভোল্টেজের বিদ্যুৎ সরবরাহ ছাড়া আর কিছুই লাগে না এই ওভেনের। তাহলে রান্না করার মূল যে তাপশক্তি - সেটা আসছে কোত্থেকে? সেটা আসছে মাইক্রোওয়েভ থেকে। মাইক্রোওয়েভ হলো  ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ বা তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গের অংশ। টেলিভিশন সম্প্রচার, র‍্যাডার (RaDaR - Radio Detection and Ranging) যোগাযোগ,  মোবাইল ফোন ইত্যাদি সব আধুনিক প্রযুক্তির যোগাযোগে মাধ্যম হিসেবে যে তরঙ্গ ব্যবহার করা হয় সেটা হলো মাইক্রোওয়েভ। একটু অবাক হবার মতো লাগছে না ব্যাপারটা? কোথায় মোবাইল ফোন, র‍্যাডার, কিংবা টেলিভিশন, আর কোথায় রান্না করার মেশিন। 

আসলে তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গের ব্যাপারটাই অবাক হওয়ার মতো। মহাবিশ্বের নক্ষত্রগুলো থেকে যে শক্তি বেরিয়ে আসে তা তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ আকারে আসে। তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ প্রবাহের জন্য কোন মাধ্যমের দরকার হয় না। এই তরঙ্গের বর্ণালীর খুব ছোট একটা অংশ আমরা দেখতে পাই - সেটা হলো আলো। দৃশ্যমান আলোর বাইরে তড়িৎচুম্বক তরঙ্গের বিশাল বিস্তৃতির কোন অংশই আমরা খালি চোখে দেখতে পাই না। 

অনেক লম্বা তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বেতার তরঙ্গ থেকে শুরু করে অনেক ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের এক্স-রে কিংবা গামা-রে পর্যন্ত তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গের বিস্তৃতি। তরঙ্গের শক্তি ও তরঙ্গ-দৈর্ঘ্যের সম্পর্ক পরস্পর বিপরীতানুপাতিক। অর্থাৎ একটির মান বাড়লে অন্যটির মান কমে যায়। তরঙ্গদৈর্ঘ্য আর কম্পাঙ্কও একে অপরের বিপ্রতীপ। অর্থাৎ তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেশি হলে কম্পাঙ্ক কম হয় এবং তরঙ্গদৈর্ঘ্য কম হলে কম্পাঙ্ক বেশি হয়। যে তরঙ্গের কম্পাঙ্ক যত বেশি তাদের শক্তিও তত বেশি। দৃশ্যমান আলোর কম্পাঙ্কের চেয়ে বেশি কম্পাঙ্কের তরঙ্গ এত বেশি শক্তিশালী যে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এদের ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়। এক্স-রে, গামা-রে ইত্যাদি খুবই উচ্চ কম্পাঙ্কের তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ। বেতার তরঙ্গ দৃশ্যমান আলোর চেয়ে অনেক কম শক্তিশালী এবং এদের কম্পাঙ্কও অনেক কম। তাই এদের তরঙ্গদৈর্ঘ্য অনেক বড়। বেতার তরঙ্গ জ্যোতির্বিদ্যায় খুব কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়। কারণ দৃশ্যমান আলো যেখানে মেঘ বা ধূলিকণা ভেদ করে যেতে পারে না সেখানে বেতার তরঙ্গ সহজেই সবকিছু ভেদ করে চলে যেতে পারে। রেডিও, টেলিভিশন, র‍্যাডার, মোবাইল ফোন ইত্যাদি প্রযুক্তিতে সিগনাল পাঠানোর মাধ্যম হলো বেতার তরঙ্গ। ৩০০ মেগাহার্টজ থেকে ৩০০ গিগাহার্টজ পর্যন্ত কম্পাঙ্গের বেতার তরঙ্গকে মাইক্রোওয়েভ বলা হয়। এদের তরঙ্গ-দৈর্ঘ্য ১ মিটার থেকে ১ মিলিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। 

বেতার তরঙ্গ কাজে লাগিয়ে র‍্যাডার প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী রবার্ট ওয়াটসন-ওয়াট ১৯৩৫ সালে - দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। ১৯৩৪ সালে ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের কাছে খবর আসে যে জার্মানির নাৎসি বিজ্ঞানীরা বেতার তরঙ্গ থেকে এমন মারণ-রশ্মি বা ডেথ-রে তৈরি করেছে যেগুলো দিয়ে যে কোন বিমান ভূ-পাতিত করে ফেলা যায়। ব্রিটিশ মিলিটারিরা খুব ভয় পেয়ে গেলো। তাদের এয়ার ডিফেন্স সায়েন্টিফিক কমিটির চেয়ারম্যান দেখা করলেন ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাবরেটরির প্রধান বিজ্ঞানী রবার্ট ওয়াটসন-ওয়াটের সাথে। জিজ্ঞেস করলেন ব্রিটিশ বিজ্ঞানীদের পক্ষে ডেথ-রে তৈরি করা সম্ভব কি না। পুরো ব্যাপারটা শুনে বিজ্ঞানী ওয়াটসন-ওয়াট বুঝতে পারলেন যে যুদ্ধকালীন সময়ে বিপক্ষের মনোবল কমিয়ে দেয়ার জন্য অনেক রকমের গুজব তৈরি করা হয়। ডেথ-রে'র ব্যাপারটাও সায়েন্স ফিকশান থেকে ধার করা একটা অসম্ভব ধারণা। কারণ বেতার তরঙ্গ থেকে বিমান বিধ্বস্ত করার মত শক্তি তৈরি করা সম্ভব নয়। তার মানে জার্মানরা ডেথ-রে তৈরি করেনি। বিজ্ঞানী ওয়াটসন-ওয়াট গবেষণা করে দেখলেন যে বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করে শত্রুপক্ষের বিমানের গতিপথ শনাক্ত করা সম্ভব। 


 

বেতার তরঙ্গ তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গের অংশ। শূন্য মাধ্যমে এর গতিবেগ সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার। বায়ুমন্ডলে এই গতিবেগ কিছুটা কমে গেলেও তা সবচেয়ে গতিশীল বিমানের চেয়েও অনেক বেশি গতিশীল। বেতার তরঙ্গ ধাতব পদার্থের ভেতর দিয়ে যেতে পারে না। ধাতব পদার্থের গায়ে লেগে তা ফিরে আসে বা প্রতিফলিত হয়। কিন্তু অধাতব পদার্থ যেমন কাচ বা প্লাস্টিকের ভেতর দিয়ে সহজে চলে যেতে পারে। কিন্তু যাবার সময় তার শক্তির কিছুটা শোষিত হয়ে যায়। কী পরিমাণ শক্তি শোষিত হবে তা কোন্‌ পদার্থের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে তার উপর নির্ভর করে। কোন উৎস থেকে বেতার তরঙ্গ  পাঠালে তা যদি কোন বিমানের গায়ে লেগে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে, তবে যেতে আসতে যে সময় নেবে সেই সময়ের হিসেব এবং বেতার তরঙ্গের গতির হিসেব থেকে বিমানটির দূরত্ব এবং কী বেগে অগ্রসর হচ্ছে তা জানা সম্ভব। ব্রিটিশরা এই প্রযুক্তির নাম দিয়েছিল Radio Direction Finding বা RDF। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকা ব্রিটিশদের মিত্রপক্ষ হিসেবে আমেরিকান মিলিটারিরাও এই প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতে শুরু করে। আমেরিকানরা এর নাম দেয় Radio Detection and Ranging বা RADAR। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অনেকগুলো র‍্যাডার স্টেশন স্থাপন করা হয়েছিল। র‍্যাডারের জন্য যে মাইক্রোওয়েভ লাগে তা তৈরি করা হচ্ছিল মাল্টি ক্যাভিটি-ম্যাগনেট্রন থেকে। এই মাল্টি ক্যাভিটি-ম্যাগনেট্রন উদ্ভাবন করেছিলেন সোভিয়েত পদার্থবিজ্ঞানী আলেক্সেরেভ এবং মালিয়ারফ র‍্যাডার উদ্ভাবনের পরের বছর ১৯৩৬ সালে। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান সাবমেরিনের পেরিস্কোপ কোথায় আছে খুঁজে বের করার জন্য আমেরিকান নৌবাহিনীর র‍্যাডার টেকনিশিয়ান টিমে কাজ করছিলেন পারসি স্পেনসার। একদিন র‍্যাডারের ম্যাগনেট্রন নিয়ে কাজ করার সময় হঠাৎ খেয়াল করে দেখলেন যে তাঁর পকেটে রাখা চকলেট গলতে শুরু করেছে। অথচ রুমের তাপমাত্রা খুব কম। তাহলে কি মাইক্রোওয়েভ থেকে তাপ তৈরি হচ্ছে! ম্যাগনেট্রনের সামনে ভুট্টার প্যাকেট রাখার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভুট্টার খই ফুটতে শুরু করলো। একটা ডিম রাখার পর দেখা গেলো ডিমটা বোমার মত বিস্ফোরিত হয়ে গেলো। তার মানে মাইক্রোওয়েভ দিয়ে রান্না করা সম্ভব। মাইক্রোওয়েভ ওভেনের পরিকল্পনা মাথায় এলো পারসি স্পেনসারের। 

স্পেনসারের শৈশব কেটেছে অনাহারে অর্ধাহারে আমেরিকার মেইন রাজ্যের একটি এতিমখানায়। লেখাপড়া তেমন কিছুই করতে পারেননি। ১২ বছর বয়সে কাজ নিতে হয়েছে একটি কারখানায়। কয়েক  বছর পর যোগ দিলেন আমেরিকান নৌবাহিনীতে। সেখানে তিনি ওয়ার্কশপে টেকনিক্যাল কিছু কাজ শেখার সুযোগ পান। সেখান থেকে তিনি টেকনিশিয়ান হিসেবে যোগ দেন আমেরিকান ডিফেন্সের জন্য অস্ত্রশস্ত্র ও ইলেকট্রনিক্স তৈরির প্রধান কোম্পানি রেথিয়নে। রেথিয়ন কোম্পানি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রবাহিনীর জন্য র‍্যাডার স্থাপন করেছে। মাইক্রোওয়েভ ওভেনের ধারণা ও পরিকল্পনা পারসি স্পেনসারের। কিন্তু তিনি যেহেতু রেথিয়ন কোম্পানির সামান্য কর্মচারি, ১৯৪৫ সালে মাইক্রোওয়েভ ওভেন উদ্ভাবনের প্যাটেন্ট পেলো রেথিয়ন কোম্পানি। ১৯৪৭ সালে পৃথিবীর প্রথম মাইক্রোওয়েভ ওভেন বাজারে এলো - যার উচ্চতা ছিল সাড়ে পাঁচ ফুট, আর ওজন ৩৪০ কেজি; নাম ছিল র‍্যাডারেঞ্জ। ৩০০০ ওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ লাগতো এর জন্য।

মাইক্রোওয়েভ ওভেন তাপ উৎপন্ন করে কীভাবে? মূলত ধাতব বাক্সের ভেতর থাকে ম্যাগনেট্রন। সেখান থেকে মাইক্রোওয়েভ উৎপন্ন হয়। সেই মাইক্রোওয়েভ কাচ, কাগজ, প্লাস্টিক, চিনামাটি ইত্যাদি সহজে ভেদ করে যায়। খাবারের মধ্যে যে পানি থাকে সেই পানির অণুগুলো মাইক্রোওয়েভ শোষণ করে মাইক্রোওয়েভের কম্পাঙ্ক সমান কম্পাঙ্কে কাঁপতে শুরু করে। ওভেনে ব্যবহৃত মাইক্রোওয়েভের কম্পাঙ্ক ২.৪৫ গিগাহার্টজ পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ পানির অণুগুলো সেকেন্ডে ২৪৫ কোটি বার কাঁপে। একটা অণু যখন কাঁপে তখন তার ঘর্ষণে চারপাশের অণুগুলোও কাঁপতে থাকে এবং শক্তি একটি থেকে অন্যটিতে ছড়িয়ে যায়। এভাবেই একটি অণুর সাথে অন্য অণুর প্রচন্ড ঘর্ষণের ফলে প্রচন্ড তাপের উৎপত্তি হয়। যদি খাবারের মধ্যে কোন পানির অণু না থাকে - তাহলে মাইক্রোওভেন তা সহজে গরম করতে পারে না। 

গত ৭২ বছরে অনেক উন্নত হয়েছে মাইক্রোওয়েভ ওভেন। একদিকে এর শক্তি বেড়েছে, ব্যবহার বেড়েছে, অন্যদিকে এর আয়তন কমেছে, ওজন কমেছে, দামও কমেছে। ২০১১ সালে অতিক্ষুদ্র আকারের মাইক্রোওভেন মঙ্গল গ্রহে পাঠানো হয়েছে কিউরিসিটি মিশনে - যেখানে মঙ্গল গ্রহের মাটির নমুনা প্রায় ১০০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত উত্তপ্ত করে তার বর্ণালী বিশ্লেষণ করে দেখা হচ্ছে সেখানে আসলে কী কী আছে। 


***ছবিটি কপিরাইটমুক্ত। নেয়া হয়েছে maxpixel.net থেকে। 

____________
বিজ্ঞানচিন্তা সেপ্টেম্বর ২০১৯ সংখ্যায় প্রকাশিত




স্বপ্নলোকের চাবি - পর্ব ৩০

 



স্বপ্নলোকের চাবি – ৩০

ফার্স্ট ইয়ারের সাউন্ড ক্লাসে ডপ্‌লার ইফেক্ট পড়িয়েছিলেন নুরুল মোস্তফা স্যার। তখন সেই থিওরি কতটুকু বুঝেছিলাম জানি না, কিন্তু আজ প্রদীপ নাথের সাইকেলের ক্যারিয়ারে বসে তার প্র্যাকটিক্যাল দিকটা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছি। বাসট্রাক পেছন থেকে যখন হর্ন বাজাতে বাজাতে এগোচ্ছে বুঝতে পারছি শব্দের কম্পাঙ্ক কত দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। একইভাবে সামনে থেকেও আসছে। রাঙ্গামাটির বাসগুলি এত জোরে হর্ন বাজাতে বাজাতে গা ঘেঁষে চলে যাচ্ছে যে মনে হচ্ছে একটু এদিক-ওদিক হলেই সাইকেলসহ বাসের চাকায় থেঁতলে যাবো। 

আমি সাইকেলের পেছনে বসেই এত ভয় পাচ্ছি, অথচ প্রদীপ নাথ ঠান্ডা মাথায় সবকিছু উপেক্ষা করে নির্বিকারভাবে সাইকেল চালাচ্ছে। অবশ্য সম্পূর্ণ নির্বিকারভাবে চালাচ্ছে বলা যাবে না। আমি ভয়ে কেঁপে উঠলেই সে আমাকে ধমক দিচ্ছে – “বাইন মাছর নান্‌ কইছালি কিল্লা গরদ্দে?” 
বাইন মাছ কানে শুনে কি না জানি না। পানিতে শব্দের বেগ বাতাসের চেয়ে অনেক বেশি। বাইন মাছের কানের কাছে রাঙামাটির বাসের হর্ন বাজালে বাইন মাছ কেমন ‘কইছালি’ করতো তা চিন্তা করে আবারো কেঁপে উঠে বললাম, “চাইস্‌, চাক্কার নিচে ঢুকাই দিবি।“
“গেলে যাবি দে এরি, ছ-আইন্না জীবন!”

প্রদীপ নাথের হাসির শব্দে আমি শিউরে উঠি। ছয় আনার জীবন হলেও জীবনের প্রতি একটা মায়া তো আছে! 

ন্যায্য হিসেব অনুযায়ীই আমার জীবনের মূল্য ছয় আনা ধার্য করা হয়েছে। সুকুমার রায়ের ‘ষোল আনাই মিছে’ কবিতা অনুসারে সাঁতার না জানলে জীবনের ষোল আনাই মিছে। সাঁতার একবার শিখতে পারলে সেই শিক্ষা সারাজীবন থেকে যায়। সেরকম সাইকেল চালানোও – একবার শিখতে পারলেই হলো। সাঁতার এবং সাইকেল চালানোর মতোই চিরকালীন আরো এক ‘স’-যুক্ত ক্রিয়া আছে যেটা সম্পর্কে প্রকাশ্যে আলোচনা করাটা অশালীন, অথচ জীবন সৃষ্টির জন্য ওটাকে অস্বীকার করার উপায় নেই।  
এই তিন ‘স’ সংক্রান্ত দীর্ঘ আলোচনার পর আমার বন্ধুরা আমার জীবনের মূল্য ধার্য করেছে ছয় আনা। সাঁতারটা কোন রকমে শিখেছিলাম বলেই এই ছয় আনা দাম পেয়েছি। নইলে জীবন ‘ষোল আনাই মিছে’ হয়ে যেতো। 

সাইকেল চালানোটা শিখে নিতে পারলে আরো পাঁচ আনা দাবি করতে পারতাম। কিন্তু একবার চেষ্টা করেও আমার শরীরে সাইকেল চালানোর ভারসাম্য আসেনি বলে আমি আর চেষ্টা করিনি। ‘একবার না পারিলে দেখো শতবার’ আমার জন্য নয়। আমি অনেকটা ‘একবার না পারিলে দেখিও না আর’ টাইপের। তবুও অন্যের ইচ্ছেকে মূল্য দিতে গিয়ে নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধেও অনেক কিছু একবারের বেশি চেষ্টা করেছি। 

প্রদীপ নাথও একবার রাতের বেলা মেইন রোডে আমাকে সাইকেল চালানো শেখানোর চেষ্টা করেছে। ধবল জোছনায় সে সাইকেলের পেছনে ধরে দৌড়াতে দৌড়াতে কখন ছেড়ে দিয়েছে আমি খেয়াল করিনি। অনেকদূর যাওয়ার পর মনে হলো সাইকেলের সাথে দুজনের বদলে শুধু একজনের ছায়া দেখতে পাচ্ছি। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কিছু একটা হলো। আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম। বুঝতে পারলাম প্রশস্ত উঁচু রাস্তার প্রতি সীমাহীন বিরক্তিজনিত বিকর্ষণে সাইকেল আমাকে নিয়ে প্রায় পনেরো ফুট নিচে জমিতে পড়ে যাচ্ছে। কাদা-পানির পুরু আস্তরণ সাইকেলসহ আমাকে সাদরে বরণ করে নিলো। কতক্ষণ ওভাবে ছিলাম জানি না। রাস্তার উপর থেকে খিলখিল করে হাসির শব্দ শুনে সম্বিত ফিরে পেলাম। প্রদীপ নাথের লাফিং অ্যাটাক হয়েছে – হাসি থামছে না কিছুতেই। অনেকক্ষণ লাগলো সাইকেল নিয়ে রাস্তার উপরে উঠে আসতে। মসজিদের পুকুরের ঘাটে এসে সাইকেল আর নিজেকে ধোয়ার সময় প্রদীপ নাথ রায় দিলো – “তোর দ্বারা আর সাইকেল চালানো হবে না।“ 

সাইকেল চালানোর পাঁচ আনা গেলো। অন্য ‘স’ এর পাঁচ আনা পেতে হলে কার ক’বছর লাগবে কেউ জানে না। আপাতত আমার ছয় আনা, আর প্রদীপ নাথের এগারো আনা জীবন চলছে। 

চট্টগ্রাম থেকে নাজিরহাটের রাস্তাটা মোটেও সরলরৈখিক নয়। ছরার কুল থেকে নন্দীর হাট পর্যন্ত গিয়ে রাস্তা অনেকটা বেঁকে গিয়ে মদনহাট পর্যন্ত পৌঁছেছে। সেখানে আরো একটা বড় বাঁক নিয়ে এক নম্বর গেট। রেললাইনের পাশে সাইকেল চালানোর মতো রাস্তা থাকলে এতক্ষণে ক্যাম্পাসে পৌঁছে যেতাম। 
মার্চ মাসের গরমে সাইকেল চালাতে গিয়ে ঘেমে যাচ্ছে প্রদীপ নাথ। আমাকে সে নিয়ে যাচ্ছে ক্যাম্পাসে পৌঁছে দিতে। 

আজ আমার প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা। ক্যাম্পাসে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেও শান্তি পাচ্ছে না ছাত্রশিবির। কোথাও কিছু হলেই তারা ক্যাম্পাসে তালা লাগিয়ে দেয়। ফেব্রুয়ারির ২০ তারিখ আমাদের থিওরি পরীক্ষা শেষ হয়েছে। তারপর থেকে কয়েকদিন প্র্যাকটিক্যাল প্র্যাকটিস করার কথা ছিল। কিন্তু শিবিরের যখন তখন অবরোধ ডাকার ফলে ঠিকমতো প্র্যাকটিস করাও হয়নি আমাদের।

মার্চের চার তারিখ থেকে প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা হবার কথা। আমাদের পরীক্ষার রোল নম্বর দেয়া হয়েছে হলভিত্তিক। আলাওল হলের রোলনম্বর সবার আগে। চার তারিখ প্রদীপ নাথের প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা ছিল। কিন্তু সেদিন চট্টগ্রামে অর্ধদিবস হরতাল পালন করেছে জামায়াতে ইসলাম। ছাত্রশিবির সেদিন ক্যাম্পাসে ক্লাস তো দূরের কথা, কোন পরীক্ষাও হতে দেয়নি। একটা রিকশা পর্যন্ত কোথাও চলতে দেয়নি জামাত-শিবিরের কর্মীরা। প্রদীপ নাথ সাইকেল চালিয়ে ক্যাম্পাসে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু তাকে এক নম্বর গেট থেকে ফিরে আসতে হয়েছে। শিবিরের কর্মীরা হাতে সুঁচালো পেরেক নিয়ে সাইকেল-রিক্সার চাকা ফুটো করে দিচ্ছিল। 

অর্পণেরও পরীক্ষা ছিল সেদিন। দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে সে আমার রুমে এসে হাজির হয়েছিল। আন্দরকিল্লা থেকে একটানা হাঁটতে হাঁটতে সে ছরার কুল চলে এসেছে। একটার পর থেকে বাস চলতে শুরু করেছিল। প্রদীপ নাথ ও অর্পণের সাথে ক্যাম্পাসে গেলাম। চার তারিখের পরীক্ষা কয় তারিখে হবে, আমার পরীক্ষা ছয় তারিখে হবে কি না জেনে আসার জন্য। অর্ধদিবস হরতাল হলেও ক্যাম্পাসে গিয়ে মনে হলো চিরকালীন হরতাল। ডিপার্টমেন্টে কেউ নেই। সবকিছু বন্ধ। কোথাও কোন নোটিশ নেই।

 আমরা পরীক্ষার্থীরা অসহায়ের মতো ডিপার্টমেন্টের বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করলাম। ল্যাবোরেটরির সামনে গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম। কোথাও কিছু নেই। ছাত্রলীগ অবরোধ ডাকলে ডিপার্টমেন্টে ক্লাস হয়, আর জামায়াত-শিবিরের হরতালে সবকিছু এভাবে বন্ধ হয়ে গেল? আমাদের ডিপার্টমেন্ট কি পুরোটাই জামায়াত-শিবির হয়ে গেল? অবশ্য আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ ডিপার্টমেন্টেই কাজকর্ম দুপুর একটার পর বন্ধ হয়ে যায়। শ্রমঘন্টার এত অপচয় আর কোন সেক্টরে হয় কি না আমার জানা নেই। 

তিন তলায় উঠলাম। যা ভেবেছিলাম তাই, প্রামাণিকস্যারের অফিস খোলা। কিন্তু স্যার তো আমাদের কোন ক্লাস নেননি এবার। আমাদের পরীক্ষা সম্পর্কে তিনি কি কিছু জানবেন? স্যারের অফিসের দরজা খোলা। বিছানার চাদরের মতো ডোরা কাটা পর্দা ঝুলছে দরজায়। অর্পণকে বললাম, “তুই স্যারকে জিজ্ঞেস কর।“

আমরা এই ডিপার্টমেন্টের ছাত্র, অথচ ডিপার্টমেন্টের স্যারদের সাথে কথা বলার সাহস অর্জন করতে পারিনি এখনো। এটা কি আমাদের দোষ, নাকি স্যারদের – জানি না। স্যাররা কি পারতেন না আমাদের সাথে আরেকটু সহজ হতে? একে অপরকে ঠেলাঠেলি করলেও – কেউই সাহস করে স্যারের দরজার পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢোকার সাহস পাচ্ছি না। স্যার সম্ভবত ভেতর থেকে আমাদের কথাবার্তা শুনতে পেয়েছেন। অফিস থেকে নিজেই বের হয়ে এলেন। 

“তোমরা কি আমার কাছে এসেছো?” – স্যার গম্ভীর, অথচ আন্তরিক। 
আমরা হড়বড় করে বললাম আমাদের প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার কথা। স্যার বললেন, “নিয়ম অনুযায়ী তো আজকের পরীক্ষাটা হতে না পারলে আজকেরটা পরে হবে। আগামী কাল থেকে রুটিন অনুযায়ীই পরীক্ষা হবে। তবুও তোমরা চেয়ারম্যানের কাছ থেকে জেনে নাও। আমি টেলিফোন করে দেখি – তিনি ডিপার্টমেন্টে আসছেন কি না।“

প্রামাণিকস্যার রুমে ঢুকে গেলেন। আমরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে শুনতে পেলাম স্যার টেলিফোনে কথা বলছেন। মিনিটখানেক পরে তিনি ডাকলেন আমাদের। আমরা গুটিশুটি মেরে স্যারের দরজার পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। স্যারের টেবিলভর্তি খোলা বইপত্র। স্যার পড়াশোনা করছিলেন। 

“তোমরা চেয়ারম্যান সাহেবের অফিসের সামনে অপেক্ষা করো। তিনি আসছেন।“

এরপর আমরা চেয়ারম্যান স্যারের অফিসের সামনে অপেক্ষা করলাম অনেকক্ষণ। রশীদুন্নবী স্যার আসার আগেই সেকশান অফিসার ফরিদভাই আর তাঁর সহকারী এসে চেয়ারম্যান স্যারের অফিস খুলে দিলেন। একটু পর রশীদুন্নবী স্যার এলেন। প্রামাণিক স্যারের কথাই ঠিক।

কিন্তু ৫ তারিখ থেকে নতুন ঝামেলা শুরু হয়েছে। হরতাল না থাকলেও শিবির ক্যাম্পাসে অবরোধ ডেকেছে। তারা কী চায় – আমরা ঠিক জানি না। কিন্তু ভেতরের খবর যতটুকু কানে আসে – তাতে বোঝা যাচ্ছে ভিসি আলমগীর মোহাম্মদ সিরাজুদ্দিনের উদারপন্থী নীতি জামায়াত শিবিরের পছন্দ হচ্ছে না। ক্যাম্পাসে প্রগতিশীল ছাত্ররাজনীতির উত্থান হোক – এটা কিছুতেই চায় না তারা। 

পাঁচ তারিখ – অর্থাৎ গতকাল যীশুর পরীক্ষা ছিল। আমাদের ক্লাসেও শিবিরের নেতাকর্মী অনেকেই আছে। হয়তো তাদের কারণেই – অবরোধের মধ্যেও প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা হতে দিয়েছে তারা। কিন্তু শহর থেকে শাটল ট্রেন ছাড়তে দেয়নি। যীশু বাসে এসে এক নম্বর গেট থেকে হেঁটে হেঁটে ক্যাম্পাসে গিয়ে পরীক্ষা দিয়েছে। পরীক্ষা শেষে আমার রুমে এসেছিল সে কাল বিকেলে। এক নম্বর গেট থেকে হেঁটে গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে আসা তেমন কোন কঠিন ব্যাপার নয়। কিন্তু প্রদীপ নাথ আমার দায়িত্ব নিয়েছে সাইকেলে করে ক্যাম্পাসে পৌঁছে দেবার। কিন্তু শর্ত একটাই – শিবিরের লোকরা যদি টায়ার ফুটো করে দিতে চায় -সে সাইকেল নিয়ে পালাবে। আমাকে ওখান থেকে নিজের ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হবে। 
এক নম্বর গেটে আজও অবরোধকারীদের জটলা; সাইকেলকে বাধা দিলো না। প্রদীপ নাথ আমাকে সায়েন্স ফ্যাকাল্টির সিঁড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিলো। তার পরীক্ষার নতুন ডেট জেনে সে চলে যাবে। আমার ছয় ঘন্টার পরীক্ষা শেষ হবে বিকেল চারটায়। রিকশা চলতে না দিলে আমি হেঁটেই চলে যেতে পারবো এক নম্বর গেট পর্যন্ত। 

আমাদের প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার সিস্টেমটা অদ্ভুত। সারাবছর এতগুলি প্র্যাকটিক্যাল করলাম, প্র্যাকটিক্যাল খাতা লিখলাম প্রত্যেকটি এক্সপেরিমেন্টের, স্যারদের সাইন নিলাম – এগুলির কোন দামই নেই। পরীক্ষার সময় লটারি করে একটা এক্সপেরিমেন্ট করতে দেয়া হবে। সেটার উপরই পরীক্ষার নম্বর দেয়া হবে। কোন কারণে সেই এক্সপেরিমেন্টের ডাটা ঠিক না হলে, রেজাল্ট ঠিক না হলে আমি প্র্যাকটিকেলে ফেলও করতে পারি। এটা কোন কথা হলো? অবশ্য শুধু প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা কেন – ভাইভাতেও যদি ১০ নম্বরে সাড়ে তিন এর কম পাই – আমি ফেল। আমাকে পুরো ইয়ারের সবগুলি পরীক্ষা আবার পরের বছর দিতে হবে। স্যাররা কি এসব বোঝেন না? অবশ্যই বোঝেন। স্যাররাও নিশ্চয় এই পদ্ধতিতে পরীক্ষা দিয়ে স্যার হয়েছেন। স্যার হয়েই ছাত্রজীবনের সবকিছু হয়তো ভুলেই গেছেন। 
লটারিতে পড়লো ডিটারমিনেশান অব প্লাটিনাম রেজিস্ট্যান্স থার্মোমিটার কো-ইফিসিয়েন্ট। সোজা এক্সপেরিমেন্ট। কিন্তু পুরোটাই নির্ভর করে যন্ত্রপাতির মেজাজমর্জির উপর। কোন কারণে যদি থার্মোমিটার খারাপ হয় – সারাদিন চেষ্টা করলেও কিছু হবে না। আর স্যাররা তো কোন কথাই শুনতে চাইবেন না। সারা বছর প্র্যাকটিক্যালের সময় যে স্যারদের কোনদিনই প্র্যাকটিক্যাল রুমে দেখিনি – তাঁরা এসে পরীক্ষা নেন। 

মোবাশ্বের স্যারকে দেখেই কেমন যেন লাগছে। স্যার আমার টেবিলের কাছে আসার সাথে সাথেই আমি আমার জ্যামিতি বাক্স খুলে ফেললাম। ক্যালকুলেটরের কভার খুলে ফেললাম। কিন্তু তারপরেও স্যার খুশি হলেন না। স্যারের যে কথা শোনার ভয়ে এসব করলাম স্যার কপাল কুঁচকে সেই কথাই বললেন – “এই ছেলে, নকল নিয়ে এসেছো না কি? পকেটে কী?” – বলেই আমার প্যান্টের পকেটে হাত ঢোকাতে চাইলেন। আমি প্যান্টের দুই পকেটই ভেতর থেকে টেনে বের করে দিলাম। 

স্যার কেন মনে করেন সবাই পরীক্ষায় নকল নিয়ে আসে – আমি জানি না। আত্মসম্মানবোধ যে ছাত্রদেরও থাকতে পারে – তা কি শিক্ষকদের বোঝা উচিত নয়? কিন্তু স্যারদের তো একথা বলার কোন সুযোগ নেই। প্র্যাকটিক্যালে পঞ্চাশে ১৬ দিলেই ফেল, ভাইভাতে দশের মধ্যে তিন দিলেই ফেল। 

ছয় ঘন্টার পরীক্ষা আমার পাঁচ ঘন্টাতেই শেষ হয়ে গেল। খাতা জমা নেয়ার সময় আহমদ হোসেনস্যার বললেন, “জেনারেল ভাইভা দিয়ে যেয়ো।“

প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার পাশাপাশি জেনারেল ভাইভাও হয়ে যাচ্ছে। ফরায়জি কামালস্যারের রুমে হচ্ছে জেনারেল ভাইভা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর অরুন বসাক এসেছেন এক্সটার্নাল হিসেবে। এ অবরোধের সময় স্যাররা কীভাবে চলাচল করছেন জানি না। হয়তো ক্যাম্পাসের ভেতরই এক্সটার্নাল স্যারের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। শুনেছি বসাকস্যার প্রামাণিকস্যারেরও শিক্ষক ছিলেন। 

শিবিরের অবরোধের ফলে লাভ হয়ে গেল বলা চলে। জেনারেল ভাইভার জন্য আলাদা করে আরেকদিন আসতে হলো না। ফরায়জি কামালস্যারের রুমের সামনে কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। মনে হচ্ছে ডেকে ডেকে ভাইভা নেয়া হচ্ছে। দরজার পর্দা সরানো। ফরায়জি কামালস্যার ডাক দিলেন – “অ্যাই ছেলে, তুমি কি সেকেন্ড ইয়ারের পরীক্ষার্থী?” গত তিন বছর ধরে স্যারের ক্লাস করছি – অথচ স্যার আমাকে চিনেনও না। স্যাররা না চিনলেই ভালো। তাতে ভাইভাতে প্রশ্নের উত্তর ঠিকমতো দিতে না পারলে মনের উপর আলাদা কোন চাপ থাকে না। বললাম, “জ্বি স্যার।“
“ভাইভা দিয়েছো?”
“না স্যার।“
“চলে আসো।“

রুমে ঢুকলাম। প্রামাণিকস্যারের পাশে ছিপছিপে গড়নের একজন অপরিচিত স্যার হাসিমুখে বসে আছেন। ইনিই নিশ্চয় এক্সটার্নাল বসাকস্যার। ভাইভা বোর্ড হচ্ছে আমার কাছে গিলোটিনে মাথা দেয়ার মতো। স্যাররা প্রশ্ন করার আগেই হৃৎপিন্ডের গতি বেড়ে যায়, গলা শুকিয়ে যায়, আর কেমন যেন গরম লাগতে শুরু করে। জানা প্রশ্নের উওরও ঠিকমতো দিতে পারি না। 

প্রথমেই জিজ্ঞেস করা হলো কী প্র্যাকটিক্যাল করলাম আজকে। প্লাটিনাম রেজিস্ট্যান্স থার্মোমিটারের কো-এফিসিয়েন্ট বের করে এসেছি একটু আগে – অথচ আমি প্লাটিনাম শব্দটিই ভুলে গেলাম। কয়েকবার রেজিস্ট্যান্স রেজিস্ট্যান্স বলে তোতলালাম। 

এবার বসাকস্যার জিজ্ঞেস করলেন তাপ দিলে রেজিস্ট্যান্স বাড়ে না কমে? 

তাপমাত্রা বাড়লে রেজিস্ট্যান্স বাড়ে সেটা জানি। বললাম। কিন্তু স্যাররা তো প্রশ্ন করেন আটকানোর জন্য। যতক্ষণ আটকাতে না পারবেন – ততক্ষণ তাঁরা শান্তি পান না। 

“তাপমাত্রা বাড়লে তো পদার্থের আয়তন বেড়ে যায়। আয়তন বেড়ে গেলে তো রেজিস্ট্যান্স কমে যাবার কথা। কিন্তু রেজিস্ট্যান্স বেড়ে যায় কেন?”

আটকে গেলাম। প্রামাণিক স্যার খুশি হলেন কি রেগে গেলেন বুঝতে পারলাম না। তিনি হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, “রেয়াজুদ্দিন বাজারে গিয়েছ কখনো?”
“জ্বি স্যার, গিয়েছি।“
“সেখানে কী দেখেছো?”

আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না – স্যার রেয়াজুদ্দিন বাজারে আমার আনাগোনার হিসেব কেন নিতে চাচ্ছেন? আমি তো প্রায় সময়ই রেয়াজুদ্দিন বাজারের আমতলা দিয়ে ঢুকে নুপুর সিনেমার টিকেট ঘরের সামনে গিয়ে বের হই। এই চোরাগলি তো স্যারের চেনার কথা নয়। স্যার কি তবে আমাকে নুপুর সিনেমার টিকেটের লাইনে দেখেছেন? কিন্তু স্যার তো আমাকে চেনেন না। স্যাররা না চিনলে কত ধরনের সুবিধা। কিন্তু প্রশ্নের উত্তর তো দিতে হবে। বললাম, “স্যার, জিনিসপত্র, দোকানপাট।“
“মানুষের কথা বল। সেখানে যে মানুষের ভীড় – সেই ভীড় ঠেলে কি তুমি দ্রুত যেতে পারবে?” 

ভীড়ের মধ্যে কীভাবে দৌড়াতে হয় – তা তো জানি। কিন্তু এখানে স্যার নিশ্চয় আমার দৌড়ানোর কৌশল জানতে চাচ্ছেন না। আমি কী বলবো বুঝতে না পেরে চুপ করে আছি দেখে স্যার আবার বললেন, “ভীড়ের ভেতর ব্যস্ততার ভেতর দিয়ে যেমন তুমি দ্রুত যেতে পারবে না, সেরকম ইলেকট্রনগুলিও তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে ছুটাছুটি করতে থাকে – ফলে সেগুলির ভেতর দিয়ে …” 

এবার বুঝতে অসুবিধা হলো না। তাপমাত্রা বাড়লে পদার্থের ইলেকট্রনের র‍্যানডম মুভমেন্ট বেড়ে যাবার ফলে রেজিস্ট্যান্স বেড়ে যায়। 

বসাকস্যারের প্রশ্ন করার মধ্যে কেমন যেন একটা কৌতুকবোধ আছে। স্যার হাসিমুখে কথা বলেন দেখে প্রশ্নের উত্তর না পারলেও খুব একটা খারাপ লাগে না। 

এক ধরনের ভালো লাগা নিয়েই বের হয়ে এলাম ভাইভা দিয়ে। সেকেন্ড ইয়ার শেষ বলা চলে। কিন্তু সাবসিডিয়ারি কখন শেষ হবে জানি না। 

প্রায় দৌড়ে চলে এলাম এক নম্বর গেটে। যীশু যেভাবে দৌড়ে গিয়ে বাসে উঠে – আমিও সেভাবেই দৌড়ে বাসে উঠে গেলাম। অবশ্য না দৌড়ালেও চলতো। অবরোধের কারণে আজ ছাত্রদের ভীড় নেই। 

এতদিন পরীক্ষার মধ্যেও আমি নাটকের রিহার্সালে গিয়েছি অনেকবার। কিন্তু পরীক্ষার কারণে মাঝে মাঝে বিরতি দিতে হয়েছে। এবার পরীক্ষা শেষ হবার পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই বিকেল বেলা হাজির হচ্ছি শিল্পকলা একাডেমিতে। মনে হচ্ছে পদার্থবিজ্ঞানের চেয়েও নাটক আমার কাছে বেশি প্রিয় হয়ে উঠছে। এখন পুরনো নাটকের সেট টানছি – মনে মনে আশা করছি নতুন নাটকের কাজ শুরু হলে হয়তো অভিনয় করার সুযোগ পেতেও পারি। 

দিন চলে যাচ্ছে দ্রুত। এর মধ্যে মুকিতভাইয়ের উৎসাহে চৌধুরিহাটের পি-জে টাইপরাইটার্সে ভর্তি হয়ে গেলাম ইংরেজি টাইপ করা শেখার জন্য। প্রতিদিন সকালে গিয়ে মুকিতভাইসহ টাইপ রাইটারের সামনে বসে টাইপ করতে থাকি – the quick brown fox jumps over the lazy dog.  আমি এক লাইন টাইপ করতে করতে মুকিতভাইয়ের দশ লাইন টাইপ করা হয়ে যায়। 

প্রশিক্ষক ভদ্রলোক আমার হাতের আঙুলের দিকে তাকিয়ে খুবই বিরক্ত হয়ে বলেন, “কুইক ব্রাউন ফক্স হতে হবে, লেজি ডগ হলে চলবে না। দশ আঙুলে টাইপ করতে হবে। এভাবে এক আঙুলে টাইপ করতে থাকলে এক পৃষ্ঠা টাইপ করতে সারাদিন লাগবে। টাইপিস্টের চাকরি এত সোজা নয়।“ 

রুমের ভেতর আরো সাত-আটজন তরুণ-তরুণী ছিল। দেখলাম তারা টাইপ করা বন্ধ করে হা করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি অক্ষর খুঁজে খুঁজে এক আঙুলে টাইপ করছি – এরকম দৃশ্য তারা আগে কখনো দেখেনি। 

Saturday 17 July 2021

ট্রাইবোলজি ও কলার খোসা

 

বিজ্ঞান আর কলার মধ্যে একটা চিরকালিন কলহের ব্যাপার আছে। আর্টিস্ট বা কলাবিদরা বিজ্ঞানীদের খুব একটা পাত্তা দেন না। আবার বিজ্ঞানীরাও কলাবিদ-বিদ্বজনদের যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলেন। এই দুই শ্রেণির মানুষের চিন্তাভাবনা আলাদা, কাজের ধরন আলাদা, এমনকি কাজের লক্ষ্যও আলাদা। বিজ্ঞানীদের মূল কাজ হলো অজানাকে জানা, প্রকৃতির জটিল বৈজ্ঞানিক রহস্য ভেদ করে তাকে সরল করে ফেলা। বিশাল আকাশের দিকে তাকিয়ে কলাবিদরা যেখানে কল্পনার ফানুস ওড়ান, জটিল প্রকৃতির মহাকাব্য রচনা করেন - সেখানে বিজ্ঞানীরা দিনরাত গবেষণা করে মহাকাশের রহস্য উদ্ঘাটন করতে করতে প্রকৃতির জটিলতা নিরসন করেনসংক্ষেপে বলা চলে - বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য হলো জটিল ব্যাপারকে সহজ করা। আর অন্যদিকে কলাবিদদের প্রধান লক্ষ্য হলো সহজ ব্যাপারকে জটিল করা। বৃষ্টি পড়লে বিজ্ঞানীরা যেখানে বলেন, "বৃষ্টি পড়ছে", সেখানে কলাবিদরা গান ধরেন, 'বাদল বাউল বাজায় বাজায় বাজায় রে, বাজায় রে একতারা'। বিজ্ঞানীদের ব্যাপারে কলাবিদদের প্রধান অভিযোগ হলো - বিজ্ঞানীরা জীবনের সবকিছুতেই বৈজ্ঞানিক যুক্তি খোঁজেন। অভিযোগটা খুব একটা মিথ্যে নয়। কলা বললেই কলাবিদদের চোখে যেখানে শিল্পকলার নানা রূপ ফুটে উঠে, সেখানে বিজ্ঞানীরা কলা বলতে কলা-ই বোঝেন।

কলার পুষ্টিগুণ সম্পর্কে আমাদের কারো কোন সন্দেহ নেই। পুষ্টিবিজ্ঞানে কলার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কিন্তু বিকিরণ পদার্থবিজ্ঞানীদের কাছে কলার গুরুত্ব অন্যরকম - কারণ কলায় সামান্য পরিমাণে তেজস্ক্রিয়তা আছে। কলায় তেজস্ক্রিয়তা আছে শুনেই আঁৎকে উঠার দরকার নেই। কারণ প্রাকৃতিকভাবেই কলায় কিছুটা তেজস্ক্রিয়তা আছে। এই তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ খুবই কম। 

কলার তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ বোঝানোর জন্য বিকিরণের আলাদা একটি একক তৈরি করা হয়েছে - বেনানা ইকুইভ্যালেন্ট ডোজ (BED)অর্থাৎ একটি কলায় যতটুকু তেজস্ক্রিয় বিকিরণ থাকে ততটুকু। ঠিক কতটুকু তেজস্ক্রিয় বিকিরণ থাকে একটি কলায়? গড়পড়তা একটি কলায় এক মাইক্রোসিভার্টের দশ ভাগের এক ভাগ বিকিরণ থাকে। 

শরীরের কোন অঙ্গের এক্স-রে করালে শরীরে বিকিরণ ঢোকে। একটি বুকের এক্স-রে থেকে বিশ মাইক্রোসিভার্ট বিকিরণ ঢোকে আমাদের শরীরে। তার মানে বুকের একটি এক্স-রের বিকিরণ ২০০টি কলার বিকিরণের সমান। বুকের সিটি-স্ক্যান করালে শরীরে বিকিরণ ঢোকে প্রায় সাত হাজার মাইক্রোসিভার্ট বা সাত মিলিসিভার্ট, অর্থাৎ প্রায় সত্তর হাজার কলার মোট বিকিরণের সমান। 

আমেরিকা তাদের সীমান্ত দিয়ে তেজস্ক্রিয় পদার্থের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার জন্য চেক পয়েন্টে রেডিয়েশন মনিটর বসিয়েছে। মেক্সিকো থেকে যখন ট্রাকভর্তি কলা ঢোকে - তখন রেডিয়েশন মনিটরে কলার মোট তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা দেখলে সত্যিই আঁৎকে উঠতে হবে।

কলার তেজস্ক্রিয়তার উৎস কী? কলায় পটাশিয়াম আছে। প্রতি ১০০ গ্রাম কলায় ৩৫৮ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম আছে। পটাশিয়ামের তিনটি আইসোটোপ আছে। পটাশিয়াম-৩৯, পটাশিয়াম-৪০ আর পটাশিয়াম-৪১। পটাশিয়াম-৩৯ ও পটাশিয়াম-৪১ নিউক্লিয়াস মোটামুটি স্থায়ী, অর্থাৎ তারা তেজস্ক্রিয় নয়। কিন্তু পটাশিয়াম-৪০ নিউক্লিয়াস অস্থায়ী, অর্থাৎ তেজস্ক্রিয়। কলায় পটাশিয়াম-৪০ আছে, এবং সেটাই তার তেজস্ক্রিয়তার উৎস। পটাশিয়াম-৪০ নিউক্লিয়াসের তেজস্ক্রিয়তা খুবই দীর্ঘস্থায়ী। এর হাফ-লাইফ বা অর্ধায়ু ১২৫ কোটি বছর। অর্থাৎ একটি কলার ভেতর যতটুকু পটাশিয়াম-৪০ নিউক্লিয়াস আছে, ১২৫ কোটি বছর লাগবে তার অর্ধেক পরিমাণ ক্ষয় হতে। 

আমাদের মধ্যে অনেকেরই রেডিয়েশান ফোবিয়া বা  বিকিরণ-ভীতি আছে। তেজস্ক্রিয় বিকিরণের কথা শুনলেই তারা আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন। তারা হয়তো বলবেন, 'কলা থেকে দূরে থাকুন'। কিন্তু কলায় যতটুকু পটাশিয়াম আছে তার চেয়ে অনেক বেশি পটাশিয়াম আছে আলুতে। প্রতি ১০০ গ্রাম আলুতে ৬৫০ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম আছে। মিষ্টিকুমড়ার বিচিতে পটাশিয়াম আছে আরো বেশি - প্রতি ১০০ গ্রামে ৯১৯ মিলিগ্রাম। 

তাহলে শুধুমাত্র কলাকে আমরা তেজস্ক্রিয় বলছি কেন? আসলেই তাই, শুধু কলা নয়, আলুও প্রাকৃতিকভাবে তেজস্ক্রিয়। শুধু তাই নয়, আমাদের সবার শরীরই কমবেশি তেজস্ক্রিয়। প্রাণিকোষের শক্তির জোগান আসে সোডিয়াম-পটাশিয়াম মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে। ৭০ কিলোগ্রাম ভরের কোন মানুষের শরীরে প্রায় ১৫০ গ্রাম পরিমাণ পটাশিয়াম থাকে। আমাদের শরীর থেকে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৪৪০০ পরমাণু তেজস্ক্রিয় পটাশিয়াম-৪০ নির্গত হচ্ছে। তেজস্ক্রিয়তার ভয়ে নিজের শরীর ছেড়ে পালানোর কোন উপায় নেই আমাদের।

কলার বিজ্ঞানে ফিরে আসি। আমরা সবাই জানি কলার খোসায় পা পড়লে 'পা পিছলে আলুর দম' হবার সম্ভাবনা প্রবল। তাই কলার খোসা থেকে আমরা সাবধানে থাকি। জেনেশুনে আমরা কেউ কলার খোসায় পা দিই না। কলার খোসা প্রচন্ড পিচ্ছিল - এমন পিচ্ছিল যে গাড়ির চাকাও পিছলে যায় এর উপর। 

কলার খোসা এত পিচ্ছিল কেন? বিজ্ঞানের যে শাখায় এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে সেই শাখার নাম ট্রাইবোলজি। ট্রাইবোলজি হলো বিজ্ঞানের একটি বিশেষ শাখা যেখানে পদার্থের ঘর্ষণ, মসৃণতা ও পিচ্ছিলতা সম্পর্কে বিস্তারিত গবেষণা করা হয়। 

মানুষের কারিগরী দক্ষতা অর্জনের শুরু থেকেই মানুষ ট্রাইবোলজির ধর্মগুলো পর্ববেক্ষণ এবং ব্যবহার করে আসছে। বরফের মসৃণ তলের উপর দিয়ে কোন ভারী মসৃণ তলের বস্তু ঠেলে দিলে খুব সহজেই তা গড়িয়ে যায়। আবার খসখসে কঠিন তলের উপর দিয়ে আরেকটি খসখসে তলের বস্তু ঠেলে নিয়ে যেতে হলে অনেক বেশি শক্তি প্রয়োগ করতে হয়। 

প্রাচীন মিশরীয়রা পিরামিড তৈরি করার জন্য বিশালাকৃতির পাথর ঠেলে নিয়ে গেছে পাথরের উপর পিচ্ছিল তরল ঢেলে দিয়ে। যে কোন মেশিনে পিচ্ছিল গ্রিজ বা তেল ব্যবহার করা হয় ঘর্ষণজনিত শক্তির অপচয় রোধ করার জন্য। আবার গাড়ি চলার রাস্তায় যদি যথেষ্ট ঘর্ষণ না থাকে তাহলে গাড়ি চালানোই দুরুহ হয়ে পড়ে। 

পদার্থের মসৃণতা সংক্রান্ত ব্যাপারগুলোর বৈজ্ঞানিক হিসেবনিকাশ করার জন্য আলাদা বিজ্ঞান "ট্রাইবোলজি" প্রথম শুরু করেছিলেন ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী ডেভিড ট্যাবর ১৯৬৫ সালে। ট্রাইবোলজি শব্দটি নেয়া হয়েছে গ্রিক শব্দ "ট্রাইব" থেকে। ট্রাইব শব্দের আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে - 'আমি ঘষি'।

 কলার খোসা কেন এত পিচ্ছিল এই প্রশ্নের উত্তর প্রথম জানা যায় জাপানের বিজ্ঞানী কিয়োশি মাবুচি'র গবেষণা থেকে। ২০১২ সালে কিতাসাতো বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিজ্ঞানী ও তাঁর দল ট্রাইবোলজির সাহায্যে কলার খোসার পিচ্ছিলতার পরিমাণ নির্ণয় করেন। 

কোন পদার্থ কত পিচ্ছিল তা নির্ভর করে তার 'কোএফিশিয়েন্ট অব ফ্রিকশান' বা 'ঘর্ষণাঙ্ক'র উপর। ধরা যাক বসার ঘরের সোফাটা কার্পেটের উপর দিয়ে ঠেলে সোজা করে বসাতে হবে। সোফার ভর যদি ত্রিশ কিলোগ্রাম হয়, এবং কার্পেটের উপর দিয়ে তাকে ঠেলে নিয়ে যেতে যদি ১০ কিলোগ্রামের সমতুল্য বল প্রয়োগ করতে হয় - তাহলে কার্পেটের উপর সোফার ঘর্ষণাঙ্ক হবে ১০/৩০ বা ০.৩৩। 

কার্পেটের বদলে সোফাটি যদি মসৃণ টাইলসের উপরে থাকে, তাহলে অনেক কম বল প্রয়োগ করেই সোফাটি সরানো যাবে। ধরা যাক ৩ কিলোগ্রামের সমতুল্য বল প্রয়োগ করেই সোফাটি সরানো যাবে। সেক্ষেত্রে টাইলসের উপর সোফার ঘর্ষণাঙ্ক হবে ৩/৩০ বা ০.১। দেখা যাচ্ছে দুটো তলের মধ্যে ঘর্ষণাঙ্কের মান যত কম হবে তল দুটো তত মসৃণ হবে। জমাট বরফের তলের উপর আরেকটি জমাট বরফের মধ্যে ঘর্ষণাঙ্কের মান মাত্র ০.০২। বিজ্ঞানী কিয়োশি মাবুচি পরীক্ষা করে দেখেছেন - রাবারের উপর কলার খোসার ঘর্ষণাঙ্ক মাত্র ০.০৭। এই ঘর্ষণাঙ্কের মান পিচ্ছিল গ্রিজ মাখানো ধাতব তলের উপর যে কোন ধাতুর ঘর্ষণাঙ্কের চেয়েও কম। অর্থাৎ কলার খোসা গ্রিজ মাখানো ধাতব তলের চেয়েও পিচ্ছিল। 

অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে দেখা গেছে কলার খোসার ভেতরের দিকে অসংখ্য ছোট ছোট গুটির মত আছে - যেখানে জমা থাকে প্রচুর কার্বোহাইড্রেট ও প্রোটিন। (তার মানে কলার খোসাতেও উপকারি খাদ্যোপাদান আছে)। রাস্তায় কলার খোসায় যখন আমাদের পা পড়ে তখন খোসার এই গুটিগুলো থেকে কার্বোহাইড্রেট ও প্রোটিন বের হয়ে রাস্তা ও খোসার উপরের ত্বকের ভেতর খুবই পিচ্ছিল জেল জমা হয়ে যায় - যা রাস্তার সাথে আমাদের পায়ের ঘর্ষণাঙ্কের মান খুবই কমিয়ে দেয়। তখন পতন অনিবার্য হয়ে পড়ে। 

__________

বিজ্ঞানচিন্তা আগস্ট ২০১৯ সংখ্যায় প্রকাশিত




স্বপ্নলোকের চাবি - পর্ব ২৯

 



স্বপ্নলোকের চাবি – ২৯

“আবেগটা একটু বেশি হয়ে গেল না? ছন্দেও তো গন্ডগোল আছে।“ 

আমার টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে প্রায় চার ফুট দূর থেকে আমার খাতায় লেখা কবিতার লাইনদুটো বিড়বিড় করে পড়ে এই গম্ভীর মন্তব্যটুকু করলেন মুকিতভাই। আশ্চর্য দৃষ্টি তাঁর। যে দূরত্বে আমার চশমা লাগে, তিনি খালি চোখেই এত ছোট ছোট অক্ষরের লেখাগুলি পড়ে ফেললেন। আমি তাঁর মুখের দিকে তাকালাম। মুখে লম্বা দাড়ি থাকলে তাঁকে এই মুহূর্তে সৈয়দ আলি আহসানের মতো লাগতো। এখলাসের কাছে শুনেছি মুকিতভাই আগে তাবলিগ করতেন। প্রায় এক ফুট লম্বা দাড়ি ছিল তাঁর। সালোয়ার-কামিজ আর পাগড়ি পরে ফিজিক্সের ক্লাস করতেন তিনি। তারপর কী যে হলো – মতবাদ, পোশাক, সাবজেক্ট সব বদলে বাংলায় গিয়ে ভর্তি হলেন। এখন তিনি সাহিত্যের এমন গভীর গম্ভীর পাঠক হয়েছেন যে ভাষা-ছন্দ এসবের গন্ডগোলটাই চোখে পড়ে আগে। 

আমিও যথাসম্ভব গম্ভীর এবং কিছুতেই কিছু যায় আসে না ধরনের উদাস ভাব নিয়ে বললাম, “ছন্দে গন্ডগোল হলে সেটা পূর্ণেন্দু পত্রীর হয়েছে।“ 

ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি মানুষ অন্যের লেখা চুরি করে নিজের নামে চালায়। আর আমি সমালোচনার ভয়ে নিজের লেখা অন্যের নামে চালাতে চেষ্টা করছি। মুকিতভাই এবার শব্দ করে পড়লেন - যদি ছন্দের ভেতর পূর্ণেন্দু পত্রীর ভাবটা ধরতে পারেন - 

এ কেমন ভালোবাসা 
সর্বনাশা 
কেউ জানে না।
যে আমার 
সব সাধনার
আমি তার কেউ না।। 

কয়েকবার পড়ার পরেও তিনি সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। বললেন, “আমার মনে হচ্ছে না এটা পূর্ণেন্দু পত্রীর লেখা। তিনি এত সোজাসুজি শব্দ ব্যবহার করেন না, আর এমন তরলও নয় তাঁর কবিতার আবেগ। কোন্‌ বইতে পড়েছেন দেখান আমাকে।“ 

প্রাক্তন-তাবলিগ কবিতার ব্যাপারে এত কট্টর কেন হলেন বুঝতে পারছি না। আর আমিও কেন যে ইলেকট্রিসিটি অ্যান্ড ম্যাগনেটিজম খাতায় কার্শপের সূত্র না লিখে ভালোবাসার পংক্তি রচনা করেছি জানি না। 

মুকিতভাইকে ফাঁকি দেয়ার সুযোগ নেই। এই মানুষটা বলেন কম, জানেন বেশি, পড়েন আরো বেশি। তসলিমা নাসরিন নামে কোন একজন লেখকের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে তা আমি প্রথম জেনেছি মুকিতভাইয়ের কাছে। তসলিমা নাসরিনের কোনো লেখা কোথাও প্রকাশিত হলেই তা জোগাড় করে পড়ে ফেলতে শুরু করেছেন মুকিতভাই। আর তাঁর পড়া হয়ে গেলেই আমাকে বাধ্য করেন পড়তে। একইভাবে হুমায়ূন আহমেদেরও কোন নতুন বই বের হলেই মুকিতভাই তা কিনে এনে দ্রুত পড়ে ফেলেন। তারপর আমাকে পড়তে দেন। পড়ার পরে বই ফেরত দিতে গেলে জানতে চান কেমন লাগলো। আমি উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করি, কিংবা নিন্দা। কিন্তু মুকিতভাই এব্যাপারে অনেকটা নির্লিপ্ত ধরনের; কারো লেখা নিয়েই খুব একটা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন না। নিন্দা তো প্রায় করেনই না, প্রশংসাও করেন মেপে মেপে। যে বই পড়ে আমি উচ্ছ্বাসের বন্যা বইয়ে দিচ্ছি যেখানে – তিনি সেখানে ‘ভালো’ কিংবা ‘খুব ভালো’র চেয়ে বেশি কিছু বলেন না। আবার আমি যখন বইয়ের নিন্দা করতে গিয়ে লেখককে তুলোধুনো করতে শুরু করি -তখন তিনি আমাকে থামিয়ে দেন। আমাকে বোঝান – যে কোনো লেখাই লেখকের কাছে সন্তানের মতো। সৃষ্টিশীল লেখার ভালো-মন্দ পাঠকের ব্যক্তিগত রুচিনির্ভর। আমার যা ভালো লাগেনি, তা অন্য পাঠকের ভালো লাগতে পারে। আবার উল্টোটাও হতে পারে। সৃষ্টিশীলতার ব্যাপারটাকে ঠিকভাবে মাপার কোন উপায় নেই, ইত্যাদি। 

এতকিছু বোঝেন যে মুকিতভাই – তিনি আমার নিজের লেখার ব্যাপারে খুব কট্টর। আমি যে খুব কিছু লিখেছি তা নয়। চট্টগ্রাম কলেজের অর্থনীতি বিভাগের ম্যাগাজিনে আমার একটা গল্প ছাপানো হয়েছিল। বন্ধু যদি সম্পাদক হয়, তাহলে অখাদ্যও ছাপানো হয়। এবং মজার বিষয় হলো – পরিচিত মানুষ অখাদ্য লেখারও প্রশংসা করে। আমার গল্পটারও অনেকে প্রশংসা করেছিল। কিন্তু অন্যায্য প্রশংসা যে সৃষ্টিশীল লেখকের মৃত্যুফাঁদ তা আমি বুঝতে চাইনি। আমি ব্যাপক প্রশংসার বাতাসে ফুলে গিয়ে সেই ম্যাগাজিনটি আমার টেবিলে এমনভাবে রেখেছিলাম যেন মুকিতভাইয়ের চোখে পড়ে। তিনি দেখেও দেখছেন না দেখে প্রচন্ড শীতকালেও আমি ওটা নিয়ে ‘কী গরম’ বলে বাতাস করেছি। তারপর মুকিতভাই ম্যাগাজিনটা নিয়ে গিয়ে পরের দিন বলেছিলেন, “আপনার লেখায় ব্যর্থ প্রেমের কাহিনি আছে – কিন্তু গল্প খুঁজে পাইনি।“ 

শুনে আমার ফুলানো বেলুন চুপসে গিয়েছিল। কাহিনি আর গল্পের মধ্যে একটা শৈল্পিক পার্থক্য আছে। সেই পার্থক্যটাই গল্পের মূল সুর। অনেকসময় চমৎকার গীতিকবিতাও যেমন খারাপ সুরের কারণে ব্যর্থ হয়, সেরকম অনেক ভালো কাহিনিও ভালো গল্প হয়ে উঠতে পারে না। এখানেই ফুটে উঠে লেখকের স্বাতন্ত্র্য। কিন্তু মুকিতভাইয়ের তত্ত্বকথা আমার ভালো লাগলো না। 

নিখাঁদ বন্ধুত্বে কোদালকে কোদাল বলা যায়, বলাই উচিত। কিন্তু ভদ্রতার পরিচয়টাই যেখানে একমাত্র সম্পর্ক – সেখানে অনেকসময় অন্যায্য প্রশংসার উপরেই সম্পর্ক বেঁচে থাকে। তাই হয়তো মুখের উপর কেউ বলে না – গল্প নামে যে বস্তুটা লেখা হয়েছে – সেটা আসলে কিছুই হয়নি। অন্যের মুখের উপর অপ্রিয় সত্য কথা অনেকেই বলতে পারে। কিন্তু নিজের মুখের উপর অন্য কেউ অপ্রিয় সত্য কথা বললে তা অপ্রিয়-সত্যবাদীর পক্ষেও সহ্য করা কঠিন হয়ে ওঠে। মুকিতভাইয়ের কথায় আমারো শুরুতে বেশ কষ্টই লেগেছিল। কিন্তু পরে বুঝতে পেরেছি – তিনি আমার বন্ধু বলেই সরাসরি বলে ফেলেছেন। কিন্তু তারপরেও কেমন যেন একটা লজ্জা চলে এসেছে। পারতপক্ষে আমার রচনা আমি আর মুকিতভাইয়ের সামনে রাখি না। 

কিন্তু আজ তিনি আমার খাতার লাইনগুলি দেখে ফেলেছেন। পরীক্ষার আগে আমার  পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটবে ভেবে তিনি গত এক সপ্তাহ আমার রুমে আসেননি। কিন্তু আমি যে একেবারে দরজা বন্ধ করে সারাসপ্তাহ পড়াশোনা করেছি তা মোটেও নয়। শিল্পকলা একাডেমিতে গিয়ে গ্রুপ থিয়েটারের প্রাথমিক কাজ হিসেবে স্টেজ ঝাড় দিয়ে এসেছি। পরীক্ষার তিন দিন আগে হলে গিয়ে প্রবেশপত্র নিয়ে এসেছি। ফাইনাল রিভিশান দেয়ার জন্য প্রদীপ নাথ সেই রাতে আমার রুমেই ছিল। আমরা সারারাত জেগে ক্লাসিক্যাল মেকানিক্সের বদলে এমন কোন বিষয় নেই যা নিয়ে গল্প করিনি। আর কাব্যচর্চা তো ছিলই। মুকিতভাইকে এসব বললে এখলাসের মতো নিচু গলায় বলবেন, আরেকটু সিরিয়াস হওয়া মনে হয় দরকার।  

হকারকে সাপ্তাহিক বিচিত্রা দিতে বলেছিলাম। মুকিতভাই আজ গত দুই সপ্তাহের দুটি বিচিত্রা নিয়ে এসেছেন। এতদিন তাঁর কাছেই রেখে দিয়েছিলেন। আমি বিচিত্রার পাতা উল্টাচ্ছি। আর মুকিতভাই আমার কবিতার ছন্দের ব্যবচ্ছেদ করছেন। 

“কী ব্যাপার? ভালোবাসা তরল হয়ে যাচ্ছে! কেউ এসেছে নাকি – স্বপ্নে কিংবা জীবনে?” – মুকিতভাই কাব্যের সাথে বাস্তবের যোগসূত্র আছে কি না দেখতে চাচ্ছেন। 

কৈশোরে-তারুণ্যে কত স্বপ্ন উঁকি দেয় যখন তখন। কিন্তু জীবনটা তো আরতি মুখার্জির গানের মতো নয় যে আমার একুশ বছর হলেই লজ্জা জড়ানো ছন্দে কাঁপতে শুরু করবে সেই অষ্টাদশীর হৃদয়! 

কিছু কিছু ব্যাপার থাকে – যা বোঝানো যায় না, এড়ানো যায়। আমিও তাই করলাম। জিজ্ঞেস করলাম, “প্রেসিডেন্ট এরশাদ যে মরণোত্তর চক্ষুদানের ঘোষণা দিয়েছেন দেখেছেন?”
“ফার্স্ট লেডিও দিয়েছেন তো। এরশাদের দু’দিন পর রওশন এরশাদও ঘোষণা করেছেন মরণোত্তর চক্ষুদান করবেন।“
“আচ্ছা বাংলায় চক্ষুদান-এর আরেকটা অর্থ আছে না?”
“চুরি করা?” 
“হাহাহা। সারাদেশকে চক্ষুদান করে চক্ষুদানের অঙ্গীকারটা ভালোই করেছেন।“
“তাঁদের মৃত্যুর পরেই জানা যাবে – তাদের চোখ আসলেই দান করা হয়েছে কি না।“ 

প্রেসিডেন্ট এরশাদ এবং ফার্স্ট লেডি মরণোত্তর চক্ষুদানের ঘোষণা করে খুব ভালো একটি কাজ করেছেন। আমাদের দেশের মানুষের ভেতর শরীর নিয়ে অনেক ধরনের কুসংস্কার আছে। মৃত্যুর পর আমাদের শরীর যার যার ধর্মমতে কবর দেয়া হয়, কিংবা দাহ করা হয়। কিন্তু মৃত শরীরের কিছু অঙ্গ দিয়েই অনেক অসহায় মানুষের সেবা করা যায়। চোখ দান করা অর্থাৎ কর্নিয়া দান করলে মৃত ব্যক্তির কর্নিয়া অন্ধ চোখের দৃষ্টি ফিরিয়ে দিতে পারে। অথচ অনেকে ধর্মের দোহাই দিয়ে এরকম ভালো কাজে বাধা দেন। 

একটু পর দরজায় খান সাহেবের গলা শোনা গেল – “প্রদীপবাবু, প্রদীপবাবু”

“আজকে ভাড়া নিতে দেরি করে এসেছেন মনে হয়। আমি যাই।“ দরজা খুলে মুকিতভাই প্রস্থান করলেন আর খান সাহেব প্রবেশ করলেন। 

আজ ফেব্রুয়ারি মাসের এক তারিখ। মাসের প্রথম দিনে খান সাহেব খুব ভোরে উঠে চলে আসেন ঘরভাড়া আদায় করতে। কিন্তু আজ অনেকটাই দেরি করে এসেছেন। ১৮০ টাকা ঘরভাড়া আমি আলাদা করে রেখে দিয়েছিলাম। তিনি টাকা নিয়ে খাতায় স্বাক্ষর করতে করতে বললেন, “আপনি কি হিটার জ্বালান?” 

এই বিল্ডিং-এ যারা রান্না করে খায়, তাদের অনেকেই কেরোসিনের স্টোভ আর ইলেকট্রিক হিটার দুটোই ব্যবহার করে। আমিও করি মাঝে মাঝে – যখন তাড়া থাকে স্টোভ আর হিটার একসাথে ব্যবহার করি। কিন্তু গতকাল আমার হিটারের কয়েল ছিঁড়ে গেছে। 

গতকাল সন্ধ্যায় আমার দাদা এসেছিল টাকা দিতে। প্রতি মাসের শেষে আমার বাবা টাকা পাঠিয়ে দেন। দাদাই টাকা নিয়ে আসে। তার কাছে আমার রুমের একটা চাবি আছে। আমি রুমে না থাকলে ড্রয়ারে টাকা রেখে চিঠি লিখে যায়। সে জানতো ৩০ তারিখ আমার পরীক্ষা। ৩১ তারিখ সন্ধ্যায় এসেছিল। রান্না করে খেতে আমার যে কোন অসুবিধাই হচ্ছে না, এবং কত তাড়াতাড়ি আমার রান্না হয়ে যায় – তা তাকে দেখাতে গিয়ে বিপদে পড়েছি। দুইটা মাত্র ডিম ছিল – সেগুলি ধোয়ার জন্য পানিতে দিতেই পিংপং বলের মতো ভেসে উঠলো। শীতকালে ডিম এত তাড়াতাড়ি নষ্ট হবার কথা ছিল না। সিদ্ধ না করে মামলেট করা যায়। বাটিতে ডিম ভাঙার পর সামান্য একটু হাইড্রোজেন সালফাইডের গন্ধ পাওয়া গেল। এরকম ডিম পেঁয়াজ আর কাঁচামরিচের সাথে মিশিয়ে গরম তেলে দিলে খুব চমৎকার খাদ্য হয়। হাইড্রোজেন সালফাইডের গন্ধ তখন আর থাকে না। এ ব্যাপারে আমার পূর্ব-অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু দাদা খুব জোর দিয়ে বললো – ডিমগুলি পচে গেছে, পচা জিনিস খেতে হয় না। আলুভর্তা আর ডাল চলতে পারে। স্টোভে ডাল বসিয়ে হিটারে ভাত বসিয়ে দিলে পনেরো মিনিটের মধ্যে হয়ে যাবার কথা। কিন্তু হিটার কিছুতেই জ্বললো না। দেখলাম কয়েল ছিঁড়ে গেছে তিন চার জায়গায়। অনেক সময় কয়েল জোড়া লাগিয়ে চালিয়েছি। কিন্তু এটা আর জোড়া লাগানোর মতো অবস্থায় নেই। দোকানে গিয়ে কিনে আনতে বেশিক্ষণ লাগার কথা নয়। কিন্তু দাদা আমার পারদর্শিতা পুরোটা না দেখেই চলে গেলো। হিটারটা কাল রাত থেকে ছেঁড়া কয়েল নিয়ে পড়ে আছে ঘরের কোণে। 

খান সাহেবের প্রশ্নের উত্তরে বললাম, “জ্বি। মাঝে মাঝে জ্বালাই। এখন কয়েল নষ্ট হয়ে গেছে।“ 
“আর জ্বালাবেন না।“
“জ্বি আচ্ছা।“  
“হিটারটা আমাকে দিয়ে দেন।“
“ঠিক আছে, নিয়ে যান।“ 

খান সাহেব আমার ভাঙা হিটারটা নিয়ে চলে গেলেন। ওটা নিয়ে কী করবেন জানি না। তবে  আমি যে আর জ্বালাবো না বলেছি, তা যে তিনি বিশ্বাস করেননি সেটা বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন। তিনি মনে করেছেন আমি চুরি করে হিটার জ্বালাবো। শুরুতেই হিটার জ্বালানো যাবে না বলে দিলে আমি হিটার কিনতামও না। এসব হয়তো খুবই ছোটখাট ব্যাপার, কিন্তু এই ব্যাপারগুলি আমার খুবই গায়ে লাগে। কেমন যেন  একটু অপমান লাগছে। কিছুটা অভিমানও। আমি তো শুধু তাঁর বাসায় ভাড়া থাকি না, তাঁর কন্যাদের শিক্ষকও। আমার সাথে তাঁর এরকম না করলেও চলতো। মনে মনে ঠিক করলাম আমি আর পড়াতে যাবো না। 

বিচিত্রার পাতা উল্টাতে শুরু করলাম। দুর্ঘটনা যেন আমাদের পিছু ছাড়ছে না। টঙ্গির ট্রেন দুর্ঘটনার এক সপ্তাহ না যেতেই বরিশালে ফেরিঘাটে একটি যাত্রীবাহী বাস নদীতে পড়ে গেছে। একুশজন মানুষ মারা গেছেন কয়েক মিনিটের মধ্যেই। তার দুদিন পরেই নগরবাড়ি ফেরিঘাটে চিত্রপরিচালক আলমগীর কবীবের গাড়িকে ধাক্কা দিয়ে নদীর পানিতে ফেলে দিয়েছে একটি ট্রাক। আলমগীর কবীর ও অভিনেত্রী টিনা খান মারা গেছেন। আলমগীর কবীরের মতো একজন চিত্রনির্মাতা আমাদের দেশের জন্য কত বড় সম্পদ। অথচ কী মর্মান্তিকভাবে মৃত্যু হলো তাঁর। এ কেমন ফেরি? আমি ফেরিতে নদী পার হইনি কখনো। কিন্তু যতটুকু জানি – ফেরির চারপাশে তো রেলিং থাকার কথা। দুর্ঘটনা না ঘটার জন্য যেসব ব্যবস্থা নিতে হয়, তা না নিয়ে কিংবা দায়িত্বে অবহেলা করে দুর্ঘটনা না হবার জন্য প্রার্থনা করলেই কি দুর্ঘটনা বন্ধ হয়ে যাবে? 

আলমগীর কবীরের মৃত্যুসংবাদ পড়ে মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেল। মাত্র কিছুদিন আগেই তাঁর ‘সীমানা পেরিয়ে’ দেখেছি দিনার সিনেমায়। এরকম ব্যতিক্রমী সিনেমা আমি আর দেখিনি। কত পরিশ্রম, অধ্যবসায় আর চর্চার ফসল এরকম একজন মেধাবী সৃষ্টিশীল মানুষ। অথচ এক মুহূর্তেই সব শেষ। এরকম অনিশ্চয়তা আছে বলেই কি জীবন এত প্রিয় আমাদের? আলমগীর কবীর যদি জানতেন তিনি ওভাবে মারা যাবেন – তাহলে কি তিনি সেখানে যেতেন? ফেরির উপর গাড়ির ভেতর বসে থাকতেন? নাকি মৃত্যু এড়ানোর চেষ্টা করতেন? ট্রাক ড্রাইভার কি ইচ্ছে করে ধাক্কাটা দিয়েছে? নাকি ট্রাকের ব্রেক-ফেল করেছিল? কেউ কি তদন্ত করে দেখবে এসব? এধরনের দুর্ঘটনা বন্ধের কি কোন জোরালো পদক্ষেপ নেয়া হবে? জানি না। 

রান্না করা দরকার, কিন্তু ইচ্ছে করছে না। কাল রাতের কিছু ভাত আর ডাল ছিল। সকালে সেগুলি খেয়েছি। দুপুরে রান্না করতে হলে দোকানেও যেতে হবে। কিন্তু কিছুই ইচ্ছে করছে না এখন। শেখ ইসতিয়াকের একটা ক্যাসেট দিয়েছিল প্রদীপ নাথ। সেটা বাজছিল এতক্ষণ – ‘লেখাপড়া শেষ করে বেকারত্বে ধুকে মরা এ কেমন অভিশাপ বলো’র মাঝখানে হঠাৎ থেমে গেছে। কারেন্ট চলে গেছে। 
লেখাপড়া শেষ করার ব্যাপারটা যে কখন ঘটবে জানি না। পরীক্ষা ব্যাপারটা অসহ্য লাগছে। ফার্স্ট পেপার পরীক্ষা দিয়েছি মোটামুটি। পরীক্ষার পর থেকে এখনো বই ধরিনি। গতকাল সারাদিন বাইরে কাটিয়ে সন্ধ্যায় ফিরেছিলাম দাদা আসার একটু আগে। আজ বিকেলেও বের হবো। সেকেন্ড পেপার পরীক্ষা ১১ তারিখ। আজকের দিন বাদ দিলে আর মাত্র নয় দিন আছে মাঝখানে। এই নয় দিনে কয়দিন পড়াশোনা করতে পারি জানি না। প্রদীপনাথ আর যীশু আসবে বলেছিল। দুপুরের আগেই আসার কথা। সেকেন্ড পেপারের জন্য কী কী পড়বো ইত্যাদি নিয়ে ফাইনাল মিটিং হবে। যীশু ইলেকট্রিসিটি খুব ভালো বোঝে, আমার তেমন একটা ভালো লাগে না। আমার অবশ্য এখন গ্রুপ থিয়েটারের পোকা মাথায় ঢুকে গেছে।  

পরীক্ষার আগে ভেবেছিলাম পরীক্ষা চলাকালীন আর গ্রুপ থিয়েটারের কাজে যাবো না। কিন্তু কয়েকবার গিয়েই কেমন যেন একটা ভালো লাগা তৈরি হয়ে গেছে। আগে আমার ধারণা ছিল থিয়েটারে অভিনয়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখন কয়েকটা রিহার্সাল দেখে বুঝতে পারছি – থিয়েটারের প্রাণশক্তি হচ্ছে টিম-ওয়ার্ক। টিমের একজনের কাজ খারাপ হলে বাকিদের কাজও খারাপ হয়ে যায়। কিছুদিনের মধ্যে গ্রুপের নাটক ‘সমাধান’ এর শো হবে। পুরনো নাটক – নতুন করে মঞ্চে আসছে। আমাকে নাটকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ দেয়া হয়েছে – বিভিন্ন দৃশ্যে সেট পরিবর্তনে সাহায্য করা। ফার্স্ট পেপার পরীক্ষার দুদিন আগে একটা ফুল রিহার্সাল দিয়ে এসেছি। চেয়ার-টেবিল বাক্স-প্যাটরা টানতে টানতে এক রিহার্সালেই কাহিল হয়ে গিয়েছি। নাটকের রাম একটা দড়ি ধরতে বলেছিল বলে শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত খুশিতে আটখানা হয়ে গিয়েছিল। সে হিসেবে আমার তো হাজারখানা হয়ে যাওয়া উচিত। 

পরীক্ষার মাঝখানের দিনগুলি দ্রুত চলে যায়। মনে হচ্ছে এক তারিখ থেকে আট তারিখ চলে এলো এক লাফেই। ফেব্রুয়ারির আট তারিখের জন্য খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। ১৯৮২ সালে এরশাদ মার্শাল ল দিয়ে ক্ষমতা দখল করার পর থেকে গত সাত বছর ধরে দেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। এত বছর পর ডাকসু নির্বাচন খুবই সুষ্ঠভাবে হয়ে গেল ফেব্রুয়ারির আট তারিখে। নয় তারিখ ফলাফল ঘোষণা করা হলো। ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ ডাকসু ও ১৩টি হলের প্রত্যেকটিতে পূর্ণ প্যানেলে জয়লাভ করেছে।  সুলতান মনসুর ভিপি, মুস্তাক হোসেন জিএস নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ছাত্রীদের বিজয়মিছিলে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে পরাজিত ছাত্রদলের গুন্ডারা। তাদের গুলিতে একজন ছাত্র মারা যায়, মারাত্মকভাবে আহত হয় অসংখ্য ছাত্রী। শিক্ষার্থীদের নির্বাচনের ফলাফলই যদি মেনে নিতে না পারে – কেমন গণতন্ত্রের চর্চা করে এরা? শোনা যাচ্ছে চাকসু নির্বাচনও হবে কিছুদিনের মধ্যে। এখানে কী হয় কে জানে। 

Latest Post

Memories of My Father - Part 6

  The habit of reading books was instilled in us from a young age, almost unknowingly. There was no specific encouragement or pressure for t...

Popular Posts