Tuesday 31 January 2023

সুদূরতমা ভয়েজার

 




আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে ১৯৭২ সালে যখন ‘ম্যারিনার জুপিটার/স্যাটার্ন ১৯৭৭’ প্রকল্পের কাজ শুরু হয় – তখন বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য ছিল মাত্র পাঁচ বছর কাজ করার সামর্থ্যযুক্ত একটি নভোযান মহাকাশে পাঠানো যা বৃহস্পতি ও শনিগ্রহের কাছাকাছি গিয়ে গ্রহদুটো সম্পর্কে তথ্য উপাত্ত এবং ছবি তুলে পাঠাবে, যেখান থেকে ওই দূরের গ্রহ দুটোর অজানা দিকের কিছুটা হলেও জানা যাবে। এর বেশি কিছু আশা সেদিন কেউই করেনি এই মিশন থেকে। সেদিন কেউ স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি যে এই আপাত সাদামাটা মিশনটিই একদিন মহাকাশ গবেষণার ইতিহাস রচনা করবে, পৌছে যাবে সৌরজগতের সীমানা পেরিয়ে অন্তনাক্ষত্রিক স্থানের (interstellar space) শূন্যতায়। ১৯৭৭ সালে মহাকাশে পাঠানো ভয়েজার পয়তাল্লিশ বছর কেটে যাবার পরেও এখনো সক্রিয়। এই ২০২২ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে মহাকাশে  কেটে গেছে ভয়েজারের ৪৫ বছর। এই অক্টোবরের শেষে (২৯/১০/২০২২ বাংলাদেশ সময় সকাল ১১:২২) ভয়েজার-১ পৃথিবী থেকে ১৪,৭৪৪,৮০৪,৩২৮ মাইল এবং সূর্য থেকে ১৪,৬৮৮,১৩৬,০৯১ মাইল দূরে অবস্থান করছিল। ভয়েজার-২ পৃথিবী থেকে ১২,২৫৫,৫৫৫,৪৮৭ মাইল এবং সূর্য থেকে ১২,২৩৭,১১৬,৯৭৯ মাইল দূরে ছিল। চলতে চলতে ক্রমশ আরো দূরে চলে যাচ্ছে এরা। বলা চলে মহাকাশের আরো গভীর থেকে গভীরে চলে যাচ্ছে। [ পাঠক নাসার জেট প্রপালসান ল্যাবরেটরির ওয়েবসাইট https://voyager.jpl.nasa.gov/mission/status/ থেকে ভয়েজারের বর্তমান অবস্থান এবং যন্ত্রপাতির অবস্থা সম্পর্কে জেনে নিতে পারেন।]

আমাদের সৌরজগতের আটটি গ্রহের প্রথম চারটি গ্রহ – বুধ, শুক্র, পৃথিবী ও মঙ্গল – আয়তনে খুব বেশি বড় নয়, কিন্তু ঘনত্ব এমন যে এদেরকে কঠিন গ্রহ বলা হয়। এরা তুলনামূলকভাবে সূর্যের কাছের গ্রহ। বাকি চারটি গ্রহ – বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুন – আয়তনে বিশাল। কিন্তু তাদের শরীরের বেশিরভাগই গ্যাসীয় পদার্থে তৈরি বলে তাদের ঘনত্ব খুব কম। পৃথিবী থেকে এদের দূরত্ব অনেক বেশি।

পৃথিবীর কাছের গ্রহগুলিকে যথাসম্ভব কাছ থেকে দেখার জন্য মহাকাশযান পাঠানো শুরু হয়েছে ১৯৫৭ সাল থেকে তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের স্পুটনিক-১ উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে। বুধ, শুক্র ও মঙ্গল – সৌরজগতের এই তিন কঠিন গ্রহে মহাকাশযান পাঠানো শুরু হয়েছিল ১৯৬২ সালে ম্যারিনার-১ মিশনের মাধ্যমে। পরবর্তী দশ বছরের মধ্যে ম্যারিনার-১ থেকে ম্যারিনার-১০ – দশটি মহাকাশযান পাঠানো হয়েছে বুধ, শুক্র ও মঙ্গলের তথ্যানুসন্ধানে।

দূরবর্তী গ্রহগুলিতে মহাকাশযান পাঠানো অত্যন্ত খরচসাপেক্ষ এবং সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। কিন্তু বিজ্ঞানীরা মহাকাশের মহাজাগতিক ঘটনাগুলি কাজে লাগিয়ে অনেক কঠিন ব্যাপার সহজ করে তোলার পদ্ধতি আবিষ্কার করে চলেছেন। এক গ্রহের কাছাকাছি পৌঁছানোর জন্য অন্য গ্রহের মহাকর্ষ বল কীভাবে কাজে লাগাতে হয় তার হিসেবনিকেশ বিজ্ঞানীদের জানা। এর জন্য খেয়াল রাখতে হয় সৌরজগতের গ্রহগুলির পারস্পরিক অবস্থান কখন কোথায় হবে।

সৌরজগতের গ্রহগুলি নিজেদের কক্ষপথে নির্দিষ্টগতিতে সূর্যের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে অনেক বছর পর পর পরস্পরের খুব কাছাকাছি চলে আসে। ১৯৬৫ সালের মাঝামাঝি জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা হিসেব করে দেখলেন যে বারো-তেরো বছর পর অর্থাৎ ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ সালের মধ্যে বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুন – এই বিশাল চারটি গ্যাসীয় গ্রহের পারস্পরিক অবস্থান এমন হবে যে কোনো নভোযান যদি সেখানে পাঠানো যায়, তাহলে গ্রহগুলির পারস্পরিক মহাকর্ষ বল কাজে লাগিয়ে এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহে সেই মহাকাশযানকে পাঠাতে সময় এবং জ্বালানি দুটোই খুব কম লাগবে। এই গ্রহগুলির আবার এরকম সুবিধাজনক অবস্থানে আসতে সময় লাগবে আরো ১৭৫ বছর। তাহলে এটাই সুবর্ণ সুযোগ বৃহস্পতি ও শনিগ্রহের উদ্দেশে নভোযান পাঠানোর।

তখনো চলমান প্রকল্প ম্যারিনারেরই অংশ হিসেবে ১৯৭৭ সালে বৃহস্পতি ও শনির কাছাকাছি পৌঁছানোর লক্ষ্যে হাতে নেয়া হলো ‘ম্যারিনার জুপিটার/স্যাটার্ন ১৯৭৭’ প্রকল্প। ১৯৭২ সাল থেকে প্রকল্পের কাজ শুরু হলো। ১৯৭৭ সালের মার্চ মাসে এই প্রকল্পের নতুন নামকরণ করা হলো – ভয়েজার। একই ডিজাইনের দুটো নভোযান ভয়েজার-১ ও ভয়েজার-২ তৈরি করা হলো।

২০ আগস্ট ১৯৭৭ আমেরিকার মহাকাশ সংস্থা নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে  বৃহস্পতি ও শনির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলো মহাকাশযান – ভয়েজার-২। এর দু’সপ্তাহ পর ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৭ ভয়েজার-২ কে অনুসরণ করলো তারই যমজ সহোদরা ভয়েজার-১। দুটো মহাকাশযান জমজ এবং একই নামের হলেও তাদের গতি এবং গতিপথের ভিন্নতা ছিল সামান্য। যেটা আগে যাত্রা করেছে তার নাম ভয়েজার-২, আর যেটা পরে গেছে সেটা ভয়েজার-১ হবার কারণ সেখানেই। ভয়েজার-১ পৃথিবীর সাপেক্ষে দক্ষিণ মেরু দিয়ে চলে গেছে, আর ভয়েজার-২ গেছে উত্তর মেরু দিয়ে।  বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ভয়েজার-১ বৃহস্পতি ও শনিগ্রহে পৌঁছে গেছে ভয়েজার-২ এর আগে।


ভয়েজার এর গতিপথ



ভয়েজার-এর গঠন ও যন্ত্রপাতি




ভয়েজারের কমান্ড কম্পিউটার সাবসিস্টেম (সিসিএস) দ্বারা নভোযানের কন্ট্রোল ফাংশান নিয়ন্ত্রিত হয়। নভোযান কোন্‌ কাজের পর কোন্‌ কাজ করবে, অ্যান্টেনার দিক কীভাবে পরিবর্তিত হবে তাও নিয়ন্ত্রিত হয় সিসিএস এর মাধ্যমে। নভোযানের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় করার জন্য আছে অ্যাটিচিউড অ্যান্ড আর্টিকুলেশান কন্ট্রোল সাবসিস্টেম। পৃথিবীর কন্ট্রোল স্টেশন থেকে তথ্য গ্রহণ এবং নভোযান থেকে পৃথিবীতে তথ্য প্রেরণের জন্য আপলিংক ও ডাউনলিংক ট্রান্সমিটার সিস্টেম কাজ করে তিন দশমিক সাত মিটার লম্বা হাই-গেইন অ্যান্টেনার মাধ্যমে। বৈদ্যুতিক শক্তি সরবরাহের জন্য সংযুক্ত করা হয়েছে তিনটি রেডিও-আইসোটোপ থার্মোইলেকট্রিক জেনারেটর।

পরিকল্পনা করা হয়েছিল ভয়েজার বৃহস্পতি ও শনিগ্রহকে খুব কাছ থেকে দেখবে। শনির বলয়গুলি দেখবে আর দেখবে দুইটি গ্রহের যে ক’টি উপগ্রহ দেখা যায় তাদের। দুইটি ভয়েজার গ্রহগুলির দুই দিক থেকে ছবি তুলবে – তাই একটা সামগ্রিক চিত্র পাওয়া যাবে। এই লক্ষ্যে মাত্র পাঁচ বছর কাজ করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল নভোযানদুটো।

১৯৭৭ সালের ২০ আগস্ট কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণ করা হয় ভয়েজার-২, ৫ সেপ্টেম্বর উৎক্ষেপণ করা হয় ভয়েজার-১। উৎক্ষেপণের পরদিনই ৬ সেপ্টেম্বর ভয়েজার-১ পৃথিবী ও চাঁদের ছবি পাঠায়।

১৯৭৯ সালের ৫ মার্চ – ভয়েজার-১ বৃহস্পতির কাছাকাছি পৌঁছে যায়। ১৬১০ সালে গ্যালিলিও তাঁর নিজের তৈরি দূরবীক্ষণের সাহায্যে আবিষ্কার করেছিলেন বৃহস্পতির চারটি চাঁদ – আইও, ইওরোপা, গ্যানিমিড, ও ক্যালিস্টো। এই উপগ্রহগুলির অবস্থান এবং আকার ছাড়া আর কোনো বিশেষ তথ্য জানা ছিল না এতদিন। বৃহস্পতির কাছে গিয়েই ভয়েজার-১ মার্চের নয় তারিখে অপটিক্যাল ন্যাভিগেশান ইমেজের মাধ্যমে বৃহস্পতির চাঁদ আইও-র বুকে জীবন্ত আগ্নেয়গিরি শনাক্ত করে।  গ্যানিমিড উপগ্রহে দেখা গেলো ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট লম্বা গভীর খাদ। বৃহস্পতির আরো দুটো চাঁদ থিবি (Thebe) ও মেটিস (Metis) আবিষ্কৃত হয়। আমরা এখন অবশ্য বৃহস্পতির মোট আশিটি চাঁদের সন্ধান পেয়েছি। ভয়েজার-১ বৃহস্পতিগ্রহে বিদ্যুৎচমকের ছবি তোলে। পৃথিবীর বাইরে এই প্রথম অন্য কোন গ্রহে বিজলি চমকানো শনাক্ত করা হলো।

ভয়েজার-১ এর পাঠানো উপাত্ত বিশ্লেষণ করে জানা গেলো বৃহস্পতির গ্রহ আইও-র উপরিতল থেকে বৈদ্যুতিক আয়ন আলাদা হয়ে বৃহস্পতির চৌম্বকক্ষেত্রকে অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে এটা বৃহস্পতির চুম্বকক্ষেত্রে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ অ্যাম্পিয়ার বিদ্যুৎপ্রবাহ সরবরাহ করছে।

১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই – ভয়েজার-২ বৃহস্পতির কাছাকাছি পৌঁছায়। বৃহস্পতিরও যে বলয় আছে তা সর্বপ্রথম ধরা পড়ে ভয়েজার-২ এর ক্যামেরায়। বৃহস্পতির তৃতীয় চাঁদ আড্রাস্টিয়া আবিষ্কৃত হয় – যেখানে শুকিয়ে যাওয়া সাগরের চিহ্ন স্পষ্ট। আইও-র বুকে তখনো ছয়টি আগ্নেয়গিরি জীবন্ত। ভয়েজার-১ এর চার মাস পর ভয়েজার-২ পৌঁছেছে বৃহস্পতির কাছে। ভয়েজার-১ চার মাস আগে যে আগ্নেয়গিরি দেখেছিল আইও-তে তা তখনো সক্রিয়। তার মানে বৃহস্পতির আগ্নেয়গিরি বেশ কয়েক মাস পর্যন্ত সক্রিয় থাকে।

১৯৮০ সালের ৯ নভেম্বর ভয়েজার-১ শনির উপগ্রহ টাইটান এবং শনির কাছাকাছি পৌঁছে যায়। শনির কয়েকটি বড় বড় চাঁদ সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল আগেই। ভয়েজার-১ এর মাধ্যমে শনির আরো তিনটি চাঁদ অ্যাটলাস, প্রমিথিউস, প্যানডোরা আবিষ্কৃত হয়। টাইটানের ডাটা থেকে প্রমাণিত হয় যে সেখানে নাইট্রোজেন-সমৃদ্ধ বায়ুমন্ডল আছে। পৃথিবীর বাইরে অন্য কোন গ্রহে এই প্রথম এরকম বায়ুমন্ডলের সন্ধান পাওয়া গেল। টাইটানের ভূমিতে মিথেন ও ইথেন পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলো।

এরপর ভয়েজার-১ শনিগ্রহের সীমানা ছাড়িয়ে ক্রমশ সৌরজগতের বাইরের দিকে চলে যেতে শুরু করলো। ভয়েজার-১ এর যে লক্ষ্য ছিল তা পূরণ হয়ে গেছে।

১৯৮১ সালের ২৫ আগস্ট ভয়েজার-২ শনির কাছাকাছি পৌঁছালো। শনির আরো অনেকগুলি বরফাচ্ছাদিত উপগ্রহের সন্ধান পাওয়া গেলো।

বৃহস্পতি ও শনি গ্রহ সম্পর্কে জানার জন্য পাঁচ বছরের যে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল – চার বছরের মধ্যেই সে লক্ষ্যপূরণ হয়ে গেছে। কিন্তু ভয়েজার-এর দুটো নভোযানই তখনো পুরোমাত্রায় সক্রিয়। ভয়েজার-১ তখন ইউরেনাস ও নেপচুন থেকে দূরে সরে সৌরজগতের বাইরের সীমানার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা ভয়েজার-২ এর গতিপথ বদলে পাঠিয়ে দিলেন ইউরেনাস ও নেপচুনের দিকে।

১৯৮৬ সালের ২৪ জানুয়ারি ভয়েজার-২ ইউরেনাসের কাছাকাছি পৌঁছে গেল। এই প্রথম সৌরজগতের সপ্তম গ্রহকে এত কাছ থেকে দেখা গেলো। ইউরেনাসের এগারটি নতুন উপগ্রহের সন্ধান দিলো ভয়েজার-২। ইউরেনাসের চৌম্বকমেরুদ্বয় গ্রহটির বিষুবরেখার কাছাকাছি। ভয়েজার-২ সর্বপ্রথম ইউরেনাসের তাপমাত্রা মাপলো।  এই গ্রহের তাপমাত্রা মাইনাস ২১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস  (৫৯ ডিগ্রি কেলভিন)। প্রমাণিত হলো সৌরজগতের গ্রহগুলির মধ্যে সবচেয়ে ঠান্ডা গ্রহ ইউরেনাস।

ইউরেনাস ও নেপচুন পৃথিবী থেকে এত বেশি দূরে যে ওখান থেকে পাঠানো সিগনাল এতই ক্ষীণ যে তা পৃথিবীতে স্থাপিত সবচেয়ে বড় ডিশ অ্যান্টেনাগুলির পক্ষেও শনাক্ত করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালো। এর আগে পৃথিবী থেকে এত দূরের কোন মহাকাশযানের সাথে যোগাযোগ করতে হয়নি। ভয়েজার-২ নেপচুনে গিয়ে পৌঁছানোর আগেই নাসা পৃথিবীর ডিশ অ্যান্টেনা উন্নত করার ব্যবস্থা করলো। ১৯৮৭ সালের আগস্ট মাসে নাসার ডিপ স্পেস নেটওয়ার্কের আওতায় তার তিনটি কমিউনিকেশান ডিশ অ্যান্টেনার (ক্যালিফোর্নিয়ার গোল্ডস্টোন, স্পেনের মাদ্রিদ, এবং অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরা) ব্যাস ৬৪ মিটার থেকে ৭০ মিটারে উন্নীত করলো। ফলে নেপচুন থেকে পাঠানো ক্ষীণমাত্রার রেডিওওয়েভ সিগনালও শনাক্ত করতে পারার সক্ষমতা অর্জিত হলো।

১৯৮৯ সালের ২৫ আগস্ট ভয়েজার-২ নেপচুনের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। এই প্রথম কোন মহাকাশযান নেপচুনের কাছাকাছি পৌঁছালো। নেপচুনের ছয়টি নতুন চাঁদ আবিষ্কৃত হলো। নেপচুনের বলয়ের ছবি প্রথমবারের মতো দেখা গেলো।  এরপর ভয়েজার-২ সৌরজগতের সীমানার বাইরে রওনা দিলো।

ভয়েজার মিশন লক্ষ্যপূরণ করার পরেও আশাতীত সাফল্য দেখিয়ে ফেলেছে ইতোমধ্যে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের খোলনলচে পাল্টে দেয়ার মতো তথ্যের জোগান দিয়েছে এই ভয়েজার। গ্রহগুলির উৎপত্তি এবং বিবর্তন সংক্রান্ত এত তথ্য আমরা পেয়েছি যে সৌরজগতের সবগুলি গ্রহ সম্পর্কে আমাদের এতদিনের ধারণা পাল্টে গেছে। 

মাত্র পাঁচ বছর কাজ করার জন্য যে নভোযান পাঠানো হয়েছিল তা বারো বছর পরেও যখন সক্রিয়ভাবে কাজ করছে – বিজ্ঞানীরা ভয়েজারদ্বয়কে দিয়ে আরো কিছু কাজ করিয়ে নেয়া যায় কি না দেখলেন। জ্বালানি এবং কম্পিউটারের মেমোরি সংরক্ষণ করার লক্ষ্যে ভয়েজার-২ এর দুটো ক্যামেরা – ওয়াইড আঙ্গেল ও ন্যারো আঙ্গেল ক্যামেরা বন্ধ করে দেয়া হলো।

১৯৯০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সূর্য থেকে ছয় বিলিয়ন কিলোমিটার দূরে গিয়ে ভয়েজার-১ সৌরজগতের সবগুলি গ্রহ ও উপগ্রহের একসাথে ছবি নিলো। সেই ছবি পৃথিবীতে এসে পৌঁছানোর পর বিজ্ঞানীরা ভয়েজার-১ এর ক্যামেরা অফ করে দিলেন। জ্বালানি শক্তি এবং কম্পিউটারের মেমোরি সংরক্ষণ করা হলো সৌরজগতের সর্বশেষ সীমানার তথ্য সংগ্রহ করার জন্য।

১৯৯৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ভয়েজার-১ পৌঁছে গেল পৃথিবী থেকে দূরতম দূরত্বে যেখানে এপর্যন্ত আর কোন মানুষের তৈরি বস্তু কোনদিন পৌঁছায়নি।

কোনো নক্ষত্রের সীমানা নির্ধারিত হয় সেই নক্ষত্র থেকে নির্গত শক্তিতরঙ্গ এবং চৌম্বকক্ষেত্র সর্বোচ্চ যতদূর পর্যন্ত বলবৎ থাকে ততদূর পর্যন্ত। সে হিসেবে আমাদের সৌরজগতের সীমানা নির্ধারিত হয়েছে ততদূর পর্যন্ত যতদূর পর্যন্ত সূর্যের শক্তি থেকে উৎপন্ন তরঙ্গ পৌঁছায়। সূর্যের চারপাশে এই তরঙ্গের সীমানা ধরে একটা বিশালাকার কাল্পনিক বুদবুদ (bubble) ধরে নেয়া হয়। এই বুদবুদের বাইরে ইন্টারস্টেলার স্পেস বা অন্তনাক্ষত্রিক শূন্যতা – যেখানে অন্য কোন নক্ষত্রের সীমানা তখনো শুরু হয়নি।

২০০৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর – ভয়েজার-১ আমাদের সৌরজগতের সীমানা পেরিয়ে গেল। ২০০৭ সালের ৩০ আগস্ট ভয়েজার-২ সৌরজগতের সীমানা অতিক্রম করে গেলো। কিন্তু ডাটা পাঠানো বন্ধ হয়নি কারোরই।

২০১২ সালের ২৫ আগস্ট ভয়েজার-১ ইন্টারস্টেলার স্পেসে প্রবেশ করলো। হেলিওপজের বাইরে এই প্রথম মানুষের তৈরি কোন বস্তু এত দূরে গিয়ে পৌঁছালো। ভয়েজার-১ তখনো ডাটা পাঠাচ্ছে। এই ডাটা থেকে ইন্টারস্টেলার ম্যাগনেটিক ফিল্ডের পরিমাপ করা সম্ভব হলো প্রথম বারের মতো। ২০১৮ সালের ৫ নভেম্বর ভয়েজার-২ ইন্টারস্টেলার স্পেসে প্রবেশ করলো।

বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন ২০২৫ সাল পর্যন্ত কোনো না কোনোভাবে ডাটা পাঠাতে সক্ষম থাকবে ভয়েজার। এরপর পৃথিবীর সাথে ভয়েজারের যোগাযোগ হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু নভোযানদুটো অন্তনাক্ষত্রিক স্থানে ভাসতে ভাসতে চলে যাবে আমাদের প্রতিবেশি নক্ষত্রের সীমানায়। অবশ্য সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র আলফা সেন্টোরির কাছাকাছি পৌঁছাতে ভয়েজারের সময় লাগবে আরো চল্লিশ হাজার বছর।

ভয়েজার মিশন আরো একটি কারণে স্মরণীয় হয়ে থাকবে – সেটা হলো মহাবিশ্বের আর কোথাও মানুষের মতো বুদ্ধিমান প্রাণি আছে কি না দেখার জন্য  এই মিশনে পাঠানো হয়েছিল একটি গোল্ডেন রেকর্ড। শুধুমাত্র বুদ্ধিমান প্রাণির সংস্পর্শে এলেই সেই রেকর্ড চালু হবে। বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সাগান ছিলেন এই গোল্ডেন রেকর্ড কমিটির চেয়ারম্যান। পৃথিবী থেকে বাছাই করা ১১৫টি ছবি, প্রাকৃতিক কাজকর্মের বাছাই করা শব্দ – যেমন বাতাস ও বজ্রপাতের শব্দ, পশুপাখির ডাক, বিভিন্ন ভাষা এবং সময়ের বিখ্যাত কিছু সঙ্গীত, এবং পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় রেকর্ড করা শুভেচ্ছা-বাণী যার মধ্যে বাংলা ভাষায়ও একটি শুভেচ্ছা বাণী আছে – “বিশ্বের শান্তি হোক”। এই ভয়েজার গোল্ডেন রেকর্ড মহাকাশে এখনো একবারও বাজেনি। বাজার সম্ভাবনা কি আছে?


তথ্যসূত্র: (১) লিন্ডা এলকিন্স-ট্যানটন, জুপিটার অ্যান্ড স্যাটার্ন, চেলসি হাউজ পাবলিশার্স, নিউইয়র্ক, ২০০৬; (২) প্রদীপ দেব, সবার জন্য স্যাটেলাইট, তাম্রলিপি, ঢাকা, ২০১৯; (৩) বেন ইভান্স, নাসা’জ ভয়েজার মিশানস, দ্বিতীয় সংস্করণ, স্প্রিঙ্গার, ইউ কে, ২০২২; (৪) voyager.jpl.nasa.gov

____________

বিজ্ঞানচিন্তা নভেম্বর ২০২২ সংখ্যায় প্রকাশিত









Latest Post

Memories of My Father - Part 6

  The habit of reading books was instilled in us from a young age, almost unknowingly. There was no specific encouragement or pressure for t...

Popular Posts