Monday, 10 August 2026

শুভ জন্মদিন আর্নেস্ট লরেন্স

 


৮ আগস্ট আর্নেস্ট লরেন্সের জন্মদিন।

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে পদার্থবিজ্ঞানীরা যখন পরমাণুর কেন্দ্রে প্রবেশের পথ খুঁজছিলেন, নিউক্লিয়াসের বদ্ধ দরজায় ধাক্কা দেয়ার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী কোনো উপায় তাঁদের জানা ছিল না। সেই সমস্যার এক অসাধারণ সমাধান নিয়ে হাজির হয়েছিলেন তরুণ মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী আর্নেস্ট অরল্যান্ডো লরেন্স। তাঁর আবিষ্কৃত সাইক্লোট্রন শুধু নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞানের গতিপথই বদলে দেয়নি, খুলে দিয়েছিল আধুনিক নিউক্লিয়ার মেডিসিন, পার্টিক্যাল এক্সিলারেটর ও বিগ সায়েন্সের এক নতুন যুগের বিপুল সম্ভাবনার দুয়ার। 

আর্নেস্ট লরেন্সের জন্ম ১৯০১ সালের ৮ আগস্ট, যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ডাকোটার ছোট শহর ক্যানটনে। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল প্রবল কৌতূহল এবং যন্ত্রপাতি নিয়ে নাড়াচাড়া করার সহজাত আগ্রহ। প্রথমে পড়াশোনা করেন ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ডাকোটায়, পরে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটা, ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো এবং শেষে ইয়েল ইউনিভার্সিটিতে। ১৯২৫ সালে ইয়েল থেকে পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।

কয়েক বছরের মধ্যেই তাঁর প্রতিভা বিজ্ঞানজগতের নজর কাড়ে। ১৯২৮ সালে, মাত্র সাতাশ বছর বয়সে, তিনি যোগ দেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলি-তে। খুব দ্রুতই ফুল প্রফেসর হন এবং বার্কলিকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলতে শুরু করেন এক নতুন ধরনের পরীক্ষামূলক পদার্থবিজ্ঞানের শক্তিশালী গবেষণা পরিমণ্ডল।

সাইক্লোট্রনের ধারণাটি লরেন্সের মাথায় আসে প্রায় আকস্মিকভাবেই। সে সময় উচ্চশক্তির কণা তৈরির জন্য বিজ্ঞানীরা বেশ দীর্ঘ এক্সিলারেটর নির্মাণের চেষ্টা করছিলেন। চার্জিত কণাকে যত বেশি ত্বরণ দেয়া যাবে, তার গতিশক্তি তত বেশি হবে। লরেন্স ভাবলেন —একটি চার্জযুক্ত কণাকে সোজা পথে না পাঠিয়ে যদি চৌম্বকক্ষেত্রের সাহায্যে বারবার বৃত্তাকার বা সর্পিল পথে ঘোরানো যায়, তবে একই বৈদ্যুতিক বিভব ব্যবহার করেই প্রতিবার তাকে একটু একটু করে আরও বেশি শক্তি দেওয়া সম্ভব হবে। এভাবে কৌণিক ঘূর্ণন বেগকে ত্বরণ জোগানোর কাজে ব্যবহার করা যাবে। এই সরল অথচ অসাধারণ ধারণা থেকেই জন্ম নেয় সাইক্লোট্রন।

সাইক্লোট্রনে চার্জযুক্ত কণাগুলো একটি শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্রের মধ্যে বৃত্তাকার পথে ঘুরতে থাকে। প্রতিবার নির্দিষ্ট একটি ফাঁক অতিক্রম করার সময় পরিবর্তনশীল বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তাদের আরও ত্বরান্বিত করে, ফলে কণার শক্তি যত বাড়ে, তার ঘূর্ণনের ব্যাসও তত বড় হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত সেই উচ্চশক্তির কণাকে আঘাত করানো যায় কোনো পদার্থের নিউক্লিয়াসে।

লরেন্স ও তাঁর সহকর্মীরা প্রথমে তৈরি করেন ছোট আকারের সাইক্লোট্রন। এরপর একের পর এক আরও বড় ও শক্তিশালী সাইক্লোট্রন  নির্মিত হতে থাকে, যার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা সুযোগ পান পরমাণুর নিউক্লিয়াসের গঠন অনুসন্ধান করার, নতুন পারমাণবিক বিক্রিয়া সৃষ্টি করার এবং কৃত্রিম তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ উৎপাদনের।

লরেন্সের আবিষ্কারের সবচেয়ে সুন্দর দিকগুলোর একটি হলো—যে প্রযুক্তির জন্ম হয়েছিল পরমাণুর রহস্য জানার তাগিদে, সেটিই পরবর্তীকালে মানুষের রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সাইক্লোট্রনের সাহায্যে তৈরি করা সম্ভব হয় বিভিন্ন রেডিওআইসোটোপ, যেগুলোকে শরীরের ভেতরে ট্রেসার হিসেবে ব্যবহার করে পর্যবেক্ষণ করা যায় অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যক্রম। এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীকালে গড়ে ওঠে আধুনিক নিউক্লিয়ার মেডিসিন এবং পজিট্রন এমিশান টমোগ্রাফি ( PET)-এর মতো উন্নত ইমেজিং প্রযুক্তি।

ক্যানসার চিকিৎসাতেও উচ্চশক্তির বিকিরণ ও কণার ব্যবহার ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই বলা যায়, আজ হাসপাতালের নিউক্লিয়ার মেডিসিন বিভাগে কিংবা আধুনিক পার্টিকল থেরাপি কেন্দ্রে ব্যবহৃত প্রযুক্তির ইতিহাস অনুসরণ করলে তার একটি সূত্র গিয়ে মিশে যায় লরেন্সের সাইক্লোট্রনে।

সাইক্লোট্রনের উদ্ভাবন এবং এর মাধ্যমে নিউক্লীয় পদার্থবিজ্ঞানে নতুন গবেষণার দ্বার খুলে দেওয়ার স্বীকৃতিস্বরূপ লরেন্স ১৯৩৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন, তখন তাঁর বয়স মাত্র ৩৮ বছর।

কিন্তু লরেন্সের গুরুত্ব শুধু একটি অসাধারণ যন্ত্র আবিষ্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না—তিনি বদলে দিয়েছিলেন বিজ্ঞান গবেষণার ধরনও। তাঁর আগে পদার্থবিজ্ঞানের বড় বড় আবিষ্কার সাধারণত হতো ছোট গবেষণাগারে, কখনো একজন বা দুজন বিজ্ঞানীর হাতে। লরেন্স দেখিয়ে দিলেন, আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের জটিল প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রয়োজন হতে পারে বিশাল যন্ত্র, বিপুল অর্থ, এবং প্রকৌশলী-প্রযুক্তিবিদসহ বিভিন্ন শাখার বহু বিজ্ঞানীর সম্মিলিত প্রচেষ্টা। এই নতুন ধারাই পরবর্তীকালে পরিচিতি পায় "Big Science" বা বৃহৎ বিজ্ঞান নামে। বার্কলিতে লরেন্সের গবেষণাগার ধীরে ধীরে রূপ নেয় এক বিশাল প্রতিষ্ঠানে, যা পরবর্তীকালে পরিচিত হয় Lawrence Berkeley National Laboratory নামে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে পরমাণুবিজ্ঞান আর কেবল গবেষণাগারের বিষয় থাকল না—তা হয়ে উঠল সামরিক শক্তিরও কেন্দ্রবিন্দু। লরেন্স যুক্তরাষ্ট্রের গোপন ম্যানহাটন প্রজেক্টে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর নেতৃত্বে তৈরি প্রযুক্তি ব্যবহার করে তড়িৎচৌম্বকীয় পদ্ধতিতে ইউরেনিয়ামের বিভিন্ন আইসোটোপ পৃথক করার চেষ্টা চালানো হয়।

ফলে লরেন্সের বৈজ্ঞানিক জীবনে দেখা যায় এক ধরনের দ্বৈতসত্ত্বা। একদিকে তাঁর প্রযুক্তি রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে একই নিউক্লীয় বিজ্ঞানের সামরিক প্রয়োগ মানবসভ্যতাকে নিয়ে গেছে পারমাণবিক অস্ত্রের যুগে।

যুদ্ধের পর লরেন্স আরও শক্তিশালী পার্টিকল অ্যাক্সিলারেটর তৈরির পক্ষে কাজ চালিয়ে যান। তাঁর বিশ্বাস ছিল, প্রকৃতির ক্ষুদ্রতম রহস্য উন্মোচন করতে হলে বিজ্ঞানীদের পৌঁছাতে হবে ক্রমশ উচ্চতর শক্তিতে। তাঁর এই দর্শনই পরবর্তী দশকগুলোতে সূচনা করে বিশাল কণা ত্বরক বা পার্টিক্যাল এক্সিলারেটর নির্মাণের প্রতিযোগিতার। আজকের CERN-এর Large Hadron Collider-এর মতো বিশাল গবেষণা অবকাঠামোর দিকে তাকালেও সহজেই দেখা যায় লরেন্সের শুরু করা সেই বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতির প্রতিফলন।

আর্নেস্ট লরেন্স মৃত্যুবরণ করেন ১৯৫৮ সালের ২৭ আগস্ট, মাত্র ৫৭ বছর বয়সে। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে থেমে যায়নি তাঁর প্রভাব।

পর্যায় সারণির ১০৩ নম্বর মৌলটির নাম রাখা হয়েছে তাঁর স্মরণে—'লরেন্সিয়াম' (Lawrencium)। তাঁর নাম বহন করছে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বিখ্যাত গবেষণাগার—Lawrence Berkeley National Laboratory এবং Lawrence Livermore National Laboratory।

No comments:

Post a Comment

Latest Post

Cinderella’s Feet

  A Fairy-Tale Mystery Nobody Thought to Investigate “Bhaiya, did Cinderella have some serious problem with her feet ?” I looked at Otho...

Popular Posts