আমালি এমি নোইটার ছিলেন বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে মৌলিক গণিতবিদদের একজন। বিশুদ্ধ গণিত এবং তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞান উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর গবেষণা ব্যাপক প্রভাব রেখেছে। বিমূর্ত গাণিতিক গবেষণায় তিনি বাস্তব কাঠামো প্রয়োগের ধারণা প্রবর্তন করেন। তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানে তাঁর তত্ত্ব কন্টিনিউয়াস সিমেট্রি বা অবিচ্ছিন্ন প্রতিসাম্য ও সংরক্ষণ সূত্রের মধ্যে এক গভীর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছে। ফলে শক্তির সংরক্ষণ, ভরবেগের সংরক্ষণ এবং কৌণিক ভরবেগের সংরক্ষণকে আর বিচ্ছিন্ন
নিয়ম হিসেবে নয়, বরং সময়, স্থান ও গতিপথের রূপান্তরের ভিত্তিতে প্রকৃতির সংরক্ষণশীলতার ফল হিসেবে বোঝা সম্ভব হয়েছে [১-৮]। আলবার্ট আইনস্টাইন আপেক্ষিকতার তত্ত্বের গাণিতিক ভিত্তি সংহত করেছিলেন এমি নোইটারের গণিতের সাহায্য নিয়ে। সেজন্য এমি নোইটারকে আইনস্টাইনের টিউটর হিসেবে অভিহিত করেন অনেকে [২]। প্রতিষ্ঠান, সমাজ, রাষ্ট্র সবখানেই প্রচন্ড প্রতিকুলতার সম্মুখীন হয়েছিলেন এমি নোইটার। নারী হওয়ার কারণে তাঁকে স্বাভাবিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে দেওয়া হয়নি। বছরের পর বছর বেতন ছাড়াই তাঁকে কাজ করতে হয়েছে। ইহুদি হওয়ার কারণে নাৎসিরা ক্ষমতা দখলের পর তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। বাধ্য হয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নিয়েছিলেন [১-৪]। গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান এমি নোইটারের এতটাই ঋণী, অথচ তাঁর প্রাপ্য স্বীকৃতির কণামাত্রও তিনি পাননি সেভাবে। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে অনেক বিজ্ঞানী এমি নোইটারের প্রতিভার স্বীকৃতি দিয়েছেন। আইনস্টাইন তাঁর অসাধারণ প্রতিভাকে স্বীকার করেছিলেন, আর গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্ট ও ফেলিক্স ক্লাইন প্রত্যক্ষভাবে ইনভ্যারিয়ান্ট তত্ত্বে তাঁর দক্ষতার সহায়তা নিয়েছিলেন [২, ৫-৭]। এমি নোইটারের পথচলা সহজ ছিল না, কিন্তু তাঁর অধ্যবসায়ের কাহিনি আমাদের জন্য হতে পারে অনুপ্রেরণার অনন্য উদাহরণ।শৈশব
কৈশোর
১৮৮২ সালের ২৩ মার্চ জার্মানির বাভারিয়া
রাজ্যের এরলাঙ্গেনে জন্ম এমি নোইটারের। ম্যাক্স নোইটার ও ইডা আমালিয়া কাউফম্যান নোইটারের
প্রথম সন্তান এমি। তাঁর বাবা ছিলেন এরলাঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সম্মানিত গণিতবিদ ও অধ্যাপক। তাঁর মা কোলোনের একটি সচ্ছল ব্যবসায়ী পরিবার থেকে এসেছিলেন। মা-বাবা উভয়েই ছিলেন ইহুদি বংশোদ্ভূত।
অন্যান্য সাধারণ শিশুদের মতোই বেড়ে ওঠা
এমির। এরলাঙ্গেন পৌরসভার বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে তাঁর পড়াশোনা। সেই সময় ছেলেদের স্কুলের
সিলেবাস আর মেয়েদের স্কুলের সিলেবাস আলাদা ছিল। মেয়েরা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কয়েকটি
বিষয়ে পড়াশোনা করতে পারতো। জার্মান, ফরাসি এবং ইংরেজি ভাষা, সঙ্গীত, এবং হিসেব নিকেশ
করতে পারার মতো সাধারণ গণিত – এসবের বাইরে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি কিংবা গবেষণামূলক কোন
বিষয়ে পড়াশোনা করার অনুমতি মেয়েদের ছিল না। স্কুলে এসব বিষয়ে পড়াশোনা করার পর ১৯০০
সালে বাভারিয়া রাজ্যে স্কুল-শিক্ষক হবার পরীক্ষা পাস করলেন এমি নোইটার।
স্কুলে ইংরেজি ও ফরাসি ভাষা শিক্ষার শিক্ষক
হয়ে সামাজিকভাবে অনুমোদিত পেশায় জীবন কাটিয়ে দিতে পারতেন এমি নোইটার। কিন্তু ভাষার
চেয়েও গণিতের প্রতিই সত্যিকারের ভালোবাসা এমির। ছোটবেলা থেকেই বাবার কাছে গণিতের কলাকৌশল
শিখেছেন। কিন্তু গণিতে উচ্চতর ডিগ্রি নেয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার সুযোগ নেই
– শুধুমাত্র নারী বলে। তবুও দমে থাকলেন না তিনি।
প্রতিকুল পরিবেশে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা
বিংশ শতাব্দীর শুরুতেও জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাধারণত নারীদের নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে ভর্তি করত না।
বাবা অধ্যাপক হবার সুবাদে এমি এরলাঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে বসে লেকচার শোনার অনুমতি
পেয়েছিলেন। কিন্তু স্বাভাবিক শিক্ষার্থীদের মতো পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ ছিল না। তাই ১৯০০
থেকে ১৯০২ পর্যন্ত তাঁর ভালোলাগার ক্লাসগুলি করে যেতে লাগলেন।
তবে ইওরোপে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে ততদিনে।
সুইজারল্যান্ডের জুরিখ ইউনিভার্সিটিতে মেয়েদের ভর্তির সুযোগ তৈরি হয়েছে ১৮৬৭ সাল থেকে।
জার্মানিতেও দাবি উঠছে বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের ভর্তির সুযোগ দেয়ার। ১৯০০ সালে হাইডেলবার্গ
বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমিতভাবে হলেও নারী শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু করেছে। তবে জটিল ভর্তি পরীক্ষায়
পাস করার পরেই শুধু ভর্তির সুযোগ দেয়া হচ্ছিল। ছেলেদের চেয়েও বেশি যোগ্যতা দেখাতে হতো
মেয়েদের ভর্তি পরীক্ষায়। এমি ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন।
১৯০৩ সালে ন্যুরেমবার্গ ইউনিভার্সিটির
ভর্তি পরীক্ষায় পাস করলেন এমি নোইটার। কিন্তু নিয়মিত ভর্তি প্রক্রিয়ার বাধা না কাটলেও
গোটিনগেন ইউনিভার্সিটিতে এক সেমিস্টার পড়াশোনার সুযোগ পান এমি। গোটিনগেন ইউনিভার্সিটির
এই এক সেমিস্টার এমি নোইটারের গণিতপ্রীতি বহুগুণ বাড়িয়ে দিলো। এখানেই তিনি ইওরোপের
সবচেয়ে প্রভাবশালী গণিতবিদদের বিজ্ঞান-বক্তৃতা শোনার সুযোগ পান। ডেভিড হিলবার্ট, ফেলিক্স
ক্লাইন, হারমান মিনকৌস্কি, কার্ল শোয়ার্জশিল্ডসহ ইওরোপের আরো অনেক গণিতজ্ঞের গবেষণার
সাথে সরাসরি পরিচিত হন এমি। গোটিনগেন ইউনিভার্সিটি তাঁকে এমন এক বৌদ্ধিক জগতের সাথে
পরিচয় করিয়ে দেয় যেখানে গণিত, জ্যামিতি, বলবিদ্যা ও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান সর্বোচ্চ
পর্যায়ে পরস্পরের সাথে যুক্ত [১-৪]।
১৯০৪ সালে এরলাঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয় মেয়েদের
ভর্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। এমি নোইটার আনুষ্ঠানিকভাবে এরলাঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ে
ভর্তি হলেন। বিশিষ্ট গণিতজ্ঞ প্রফেসর পল গর্ডানের তত্ত্বাবধানে পিএইচডি গবেষণা শুরু
করেন এমি। গণিতে ইনভ্যারিয়েন্ট থিওরি বা অপরিবর্তনশীল রাশির তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করেন
এমি নোইটার। নির্দিষ্ট কাঠামোর ভেতর বিভিন্ন অপেক্ষকের পরিবর্তন হলেও এরকম রাশিগুলি
অপরিবর্তিত থাকে। প্রথমদিকে এরকম রাশির গণিত ছিল প্রায় পুরোটাই বিমূর্ত সাংকেতিক। এমি
নোইটার এই বিমূর্ত সাংকেতিক গণিতকে নিয়ে আসেন প্রায়োগিক গণিত ও তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের
কেন্দ্রে [১-৩]।
১৯০৭ সালে এরলাঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ের
সর্বোচ্চ সম্মানসহ গণিতে ডক্টরেট ডিগ্রি সম্পন্ন করেন এমি নোইটার। তাঁর থিসিসের বিষয়
ছিল টার্নারি বাইকোয়াড্র্যাটিক ফর্মের ইনভ্যারিয়েন্ট ব্যবস্থা। ধ্রুপদি ইনভ্যারিয়েন্ট
তত্ত্বের তৎকালীন গাণিতিক ধারায় এই গবেষণা করা হলেও, ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির প্রয়োগক্ষেত্র
বিবেচনা করলে খুবই জটিল গবেষণা ছিল এমি নোইটারের পিএইচডি গবেষণা। পরে এমি নোইটার তাঁর
প্রাথমিক গবেষণা পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা শুরু করেন। তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের
স্বতসিদ্ধ ও গাঠনিক সম্পর্কের সাথে মানানসই উপপাদ্য আবিষ্কার করেন এমি নোইটার – যা
হয়ে ওঠে বিংশ শতাব্দীর গণিতের অন্যতম নির্ণায়ক পদ্ধতি [১-৩, ৯]।
বিনাবেতনের গবেষক
ডক্টরেট ডিগ্রি সাধারণত যেকোনো
গবেষকের একাডেমিক কর্মজীবনের সূচনা নির্দেশ করে। কিন্তু
এমি নোইটারের ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটি সাধারণ কিংবা স্বাভাবিক কোনোটাই ছিল না। পেশাগত
গবেষণার সূচনার বদলে এমি নোইটারের ক্ষেত্রে তা হয়ে গেল পেশাগত বঞ্চনার
সূচনা। জার্মানিসহ পুরো ইওরোপের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সুযোগ পাওয়া মোটেও
সহজ ছিল না। পিএইচডি করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন অধ্যাপকের অধীনে থেকে প্রশিক্ষণ নিতে
হয় কীভাবে স্বতন্ত্রভাবে গবেষণা প্রকল্প চালাতে হয়, কীভাবে ক্লাসে লেকচার দিতে হয়,
পড়াতে হয়, শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে হয়। প্রশিক্ষণকালীন অবস্থাকে
‘হ্যাবিলিটেশান’ বলা হয়। এমির আশা ছিল পিএইচডি করার পর হ্যাবিলিটেশান পাওয়া তাঁর ক্ষেত্রে
কঠিন হবে না। তাঁর বাবার সহকর্মী অধ্যাপকদের মধ্যে কেউ না কেউ তাঁকে প্রশিক্ষণ দিতে
রাজি হবেন। কিন্তু দেখা গেল, নারীদের পিএইচডি করার ক্ষেত্রে নিয়মের বাধা দূর হলেও,
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হবার প্রশিক্ষণ পাবার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা রয়েই গেছে। জার্মানির
সব বিশ্ববিদ্যালয়েই একই ব্যবস্থা। নারী হবার কারণে এমি নোইটারের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের
শিক্ষক হবার পথ রুদ্ধ।
কিন্তু তাঁর শেখার আগ্রহ কোনো বাধা মানলো
না। এরলাঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯০৭ থেকে ১৯১৪ পর্যন্ত এই আট বছর তিনি বিনাবেতনে এবং
বিনাস্বীকৃতিতে অনানুষ্ঠানিকভাবে একাডেমিক কাজকর্ম করে গেছেন। তাঁর বাবার স্বাস্থ্যের
অবনতি হলে তিনি বাবার হয়ে ক্লাস নিয়েছেন, গবেষণা প্রকল্প তত্ত্বাবধান করেছেন, সাথে
চালিয়ে গেছেন নিজের গবেষণাও। একজন পুরুষ একই কাজ করলে যে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেতেন, বিশ্ববিদ্যালয় তা না দিয়েও তাঁর শ্রম থেকে সুবিধা নিয়েছিল। এই
সময়ে বেশ কয়েকজন পিএইচডি ছাত্রের গবেষণা তত্ত্বাবধান করেছেন তিনি। কিন্তু নিয়ম রক্ষার্থে
তাঁর নাম সেখানে দেয়া যায়নি। তাঁর বদলে অন্য কোনো পুরুষ শিক্ষকের নাম ব্যবহার করতে
হয়েছে [১-৩]।
কোনো পদ না থাকলেও এমি
নোইটারের বৈজ্ঞানিক বিকাশ থেমে থাকেনি। ১৯০৮
সালে তিনি সারকোলো ম্যাথম্যাটিকো ডি পালেরমো এবং ১৯০৯ সালে জার্মান ম্যাথমেটিক্যাল
সোসাইটির সদস্যপদ লাভ করেন। তিনি গাণিতিক সভায় গবেষণা উপস্থাপন করেন এবং ইনভ্যারিয়ান্ট তত্ত্ব, ফিল্ড ও তাত্ত্বিক
গাণিতিক সমস্যা নিয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। সেই
সময়ের শীর্ষ গণিতবিদ আর্নস্ট ফিশার এবং ডেভিড
হিলবার্টের ক্রমবর্ধমান বিমূর্ত পদ্ধতির প্রভাব
পড়ে তাঁর গবেষণায়। প্রতিটি গাণিতিক সমস্যাকে পৃথক গণনা হিসেবে দেখার বদলে তিনি সমগ্র সমস্যাগুচ্ছের অন্তর্নিহিত সার্বিক কাঠামো অনুসন্ধান করতে শেখেন [১-৪,
৯]। তাঁর
নিরলস গবেষণা তাঁকে একটি স্বাধীন গাণিতিক গবেষকের পরিচয় দেয়। ১৯১৫ সালের মধ্যে তিনি
এতটাই খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন যে হিলবার্ট ও ক্লাইন তাঁকে গোটিনগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা
সহযোগী হবার আমন্ত্রণ পাঠান। গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানের একটি বিশেষ সমস্যার সমাধান তাঁরা
করতে পারছিলেন না। তবে তাঁদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল এমি নোইটারের বিশেষ গাণিতিক দক্ষতার
সহায়তা নিলে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
আপেক্ষিকতার সার্বিক তত্ত্ব এবং নোইটারের
উপপাদ্য
প্রফেসর ফেলিক্স ক্লেইন এবং ডেভিড হিলবার্ট
এর পরিচালনায় গণিত এবং তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায় বিশ্বব্যাপী খ্যাতিলাভ করেছে
গোটিনগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগ। ১৯১৫ সালে এমি নোইটার যখন গোটিনগেনে যান, তখন বিশ্ববিদ্যালয়টি বিশ্বের প্রধান গণিতকেন্দ্রগুলোর একটি। সেইসময় ডেভিড হিলবার্ট ও ফেলিক্স ক্লাইন আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব থেকে উদ্ভূত সমস্যা, বিশেষত একটি সাধারণ কোভেরিয়ান্ট তত্ত্বে শক্তি সংরক্ষণের অবস্থান
সংক্রান্ত গবেষণা করছিলেন। তাঁরা উপলব্ধি করেন যে ইনভ্যারিয়ান্ট তত্ত্ব ও ভ্যারিয়েশন ক্যালকুলাসে নোইটারের দক্ষতা কাজে
লাগতে পারে [১-৭]।
হিলবার্ট ও ক্লাইনের গবেষণায় সহযোগী হিসেবে
কাজ শুরু করলেন নোইটার। তাঁর আশা ছিল এরলাঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষক হবার পথে
যেসব বাধা ছিল সেসব গোটিনগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকবে না। বিশেষ করে হিলবার্ট ও ক্লাইনের
মতো সিনিয়র প্রফেসর যেখানে তাঁকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু দেখা গেল গবেষণার
অগ্রগতি হলেও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির পথে বাধা রয়েই গেছে। হিলবার্ট ও ক্লাইন তাঁর হ্যাবিলিটেশান
অর্জনের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের
অন্যান্য পুরুষ শিক্ষকরা একজন নারীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে দেয়ার বিরোধিতা করেন।
নারীর যোগ্যতার ব্যাপারে কোন আপত্তি নেই, কিন্তু একাডেমিক দায়িত্বে নারীর নেতৃত্ব মেনে
নেয়ার মানসিকতা তাদের ছিল না। গণিত বিভাগে এমি নোইটার অনেকগুলি কোর্স পড়ালেও – সবগুলি
কোর্সেই ডেভিড হিলবার্টের নাম ব্যবহার করতে হয়েছিল। নিজের নাম লিখতে হয়েছিল ডেভিড হিলবার্টের
সহকারি হিসেবে [১-৪]।
গোটিনগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে এরকম পদমর্যাদাবিহীন
অবস্থাতেই তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানে তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত অবদানটি উপস্থাপন করেন এমি
নোইটার। ১৯১৮ সালে প্রকাশিত ইনভ্যারিয়েন্স ভ্যারিয়েশান্স প্রোবলেম প্রবন্ধে তিনি ভ্যারিয়েশনাল সমস্যার প্রতিসাম্য সম্পর্কিত দুটি উপপাদ্য প্রণয়ন করেন [৫-৭]।
এমি নোইটারের প্রথম উপপাদ্য অনুসারে যেকোনো
ভৌত ব্যবস্থার যেকোনো ক্রিয়ার একটি অবিচ্ছিন্ন প্রতিসাম্য সংরক্ষণ সূত্রের সাথে যুক্ত।
যেমন, সময়ের পরিবর্তনের অধীনে অপরিবর্তনীয়তা - শক্তির সংরক্ষণ সূত্রের সাথে যুক্ত।
স্থানের পরিবর্তনের অধীনে অপরিবর্তনীয়তা রৈখিক ভরবেগের সংরক্ষণের সাথে যুক্ত। ঘূর্ণনের
অধীনে অপরিবর্তনীয়তা কৌণিক ভরবেগের সংরক্ষণের সঙ্গে যুক্ত। এই ফলাফলের গুরুত্ব যেমন ধারণাগত, তেমনি প্রযুক্তিগত। নোইটারের আগে সংরক্ষণ নীতিগুলোকে প্রায়ই পৃথক পরীক্ষালব্ধ বা বলবিদ্যাগত সত্য হিসেবে দেখা হতো। তাঁর উপপাদ্য অনুসারে
এগুলো ভৌত সূত্রের প্রতিসাম্য-কাঠামো থেকে উদ্ভূত
হয়। ফলে আপাতদৃষ্টিতে ভিন্ন ভিন্ন ভৌত রাশির মধ্যে
অন্তর্নিহিত গভীর ঐক্য প্রকাশ পায়। আধুনিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান নিয়মিতভাবে কোনো ব্যবস্থার প্রতিসাম্য শনাক্ত করে এবং তা থেকে সংরক্ষিত কারেন্ট, চার্জ ও অনুমোদিত মিথষ্ক্রিয়া নির্ধারণ করে।
নোইটারের দ্বিতীয় উপপাদ্যটি এমন সিমেট্রি
বা প্রতিসাম্য নিয়ে কাজ করে, যা আর্বিট্র্যারি ফাংশনের ওপর নির্ভরশীল।
বর্তমানে যেগুলোকে স্থানীয় বা গেজ প্রতিসাম্য বলা হয়। এটি গতির সমীকরণগুলোর মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে এবং আপেক্ষিকতার
সার্বিক তত্ত্ব ও গেজ তত্ত্বের গাণিতিক ভিত্তি হয়ে ওঠে। এমি
নোইটারের এই উপপাদ্যের প্রয়োগে আইনস্টাইনের সার্বিক তত্ত্বের গাণিতিক ভিত্তি আরো বেশি
সংহত হয়। আইনস্টাইন নিজেই স্বীকার করেছেন তাঁর তত্ত্বে এমি নোইটারের পরোক্ষ অবদানের
কথা।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর রাজনৈতিক ও আইনগত পরিবর্তনে নারীদের একাডেমিক যোগ্যতা অর্জনের আনুষ্ঠানিক বাধার
অনেকটাই দূর হয়। ১৯১৯ সালে এমি নোইটার বিশ্ববিদ্যালয়ে
শিক্ষকতা করার জন্য যে প্রশিক্ষণের দরকার হয় তা সম্পন্ন করে নবীন শিক্ষক হিসেবে স্বনামে
শিক্ষকতা করার অধিকার লাভ করেন।
বিমূর্ত বীজগণিত
নবীন শিক্ষক হিসেবে গোটিনগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে
আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করার পর ক্রমশ অ্যাবস্ট্রাক্ট এলজেব্রা বা
বিমূর্ত বীজগণিতে মনোনিবেশ করেন। ১৯২০-এর দশকে তিনি
গাণিতিক ব্যবস্থাকে সংগঠিতকারী কাঠামো ও ম্যাপিংয়ের দিকে নিয়ে গিয়ে বিমূর্ত
বীজগণিতের ক্ষেত্রকে রূপান্তরিত করেন। তিনি রিং, আইডিয়াল ও মডিউলকে এমনভাবে
উপস্থাপন করেন যাতে পৃথক প্রেক্ষাপটে পূর্বে প্রমাণিত ফলাফলগুলোকে একটি সার্বিক নীতির মাধ্যমে
বোঝা যায় {১-৩, ৯, ১০]। রিং হলো একটি বীজগাণিতিক ব্যবস্থা, যেখানে যোগ ও গুণ নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে। আইডিয়াল হলো রিংয়ের একটি বিশেষ উপসেট, যার মাধ্যমে বিভাজ্যতা, উৎপাদক বিশ্লেষণ কাঠামো পরীক্ষা করা যায়। নোইটারের পূর্বসুরি গণিতবিদেরা নির্দিষ্ট সংখ্যা-ব্যবস্থার
প্রেক্ষাপটে আইডিয়াল তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। নোইটারের
জিজ্ঞাস্য ছিল - প্রধান উপপাদ্যগুলো সত্য হওয়ার জন্য আসলে কোন বিমূর্ত শর্তগুলো অপরিহার্য [৮,৯]। ১৯২১
সালে প্রকাশিত হলো এমি নোইটারের যুগান্তকারী গবেষণাপত্র ‘আইডিয়েল থিওরি ইন রিং ডোমাইনস’।
এই গবেষণা কমিউটেটিভ রিং তত্ত্বের একটি ভিত্তিমূলক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে [৮]। এলজেব্রিক
জিওমেট্রি বা বীজগাণিতিক জ্যামিতির মাধ্যমে জটিল গাণিতিক সমস্যাকে অপেক্ষাকৃত সরল গাঠনিক
উপাদানের সাহায্যে বোধগম্য করে তোলার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন এমি নোইটার।
তাঁর কৃতিত্ব শুধুমাত্র বীজগণিতে আরেকটি উপপাদ্য যোগ করা ছিল না। তিনি বিষয়টির কাজ করার ধরনই বদলে দেন। তাঁর পদ্ধতি ছিল সঠিক গাঠনিক অনুমানগুলো চিহ্নিত করা, সেগুলোকে বিমূর্তভাবে প্রণয়ন করা এবং যে প্রাথমিক সমস্যা থেকে ধারণাটি এসেছে তার বহুদূর পর্যন্ত প্রযোজ্য ফলাফল উদ্ভাবন করা। এই পদ্ধতি গণিতবিদদের সংখ্যা তত্ত্ব, বহুপদী বীজগণিত, জ্যামিতি ও উপস্থাপন তত্ত্বের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন
করতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে পড়ানোর পদ্ধতিতে
ব্যাপক পরিবর্তন করেন তিনি। শুষ্ক নিরস গণিতকে তিনি আকর্ষণীয় করে তোলেন। ১৯২২ সালে
তিনি গোটিনগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘এক্সট্রাঅরডিনারি প্রফেসর’ বা অসাধারণ প্রফেসর-এর স্বীকৃতি
পেলেও অন্যান্য পুরুষ সহকর্মীর চেয়ে অনেক কম ছিল তাঁর পদমর্যাদা। অসাধারণ পান্ডিত্যের
স্বীকৃতি পেলেও শুধুমাত্র নারী হবার কারণে তাঁর বেতন ছিল তাঁর বিভাগের কম পান্ডিত্যসম্পন্ন
পুরুষ সহকর্মীর বেতনের তুলনায় অনেক কম [১-৪]।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
১৯২০-এর দশকের শেষভাগে নোইটার তাঁর গাঠনিক বীজগাণিতিক পদ্ধতিকে নন-কমিউটেটিভ বীজগণিত, উপস্থাপন তত্ত্ব ও বীজগাণিতিক সংখ্যাতত্ত্বে সম্প্রসারিত করেন। নন-কমিউটেটিভ ব্যবস্থায় গুণের ক্রম গুরুত্বপূর্ণ, এবং এসব কাঠামো গ্রুপ, অপারেটর বীজগণিত ও কোয়ান্টাম বলবিদ্যার গবেষণায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। সমসাময়িক
গণিতবিদ ও তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানীদের সাথে তাঁর সক্রিয় গবেষণা-সহযোগিতা ক্রমেই বাড়তে
থাকে। গোটিনগেন ইউনিভার্সিটির তরুণ গণিতবিদদের সাথে প্রায়ই তাঁর সেমিনার, আলোচনা চলতে
থাকে। তাঁর চারপাশে শিক্ষার্থী ও সহযোগীদের একটি দল গড়ে ওঠে, যাকে কখনো কখনো ‘নোইটার
স্কুল’ বলে ডাকা হয়। তাঁর ধারণায় প্রভাবিত ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন বার্টেল ভ্যান ডার ভেয়ার্ডেন, ম্যাক্স ডয়রিং, হান্স ফিটিং, গ্রেটে হারমান, আর্নস্ট ভিট, ওলগা টাউস্কি এবং আরও অনেকে, যাঁরা পরে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গাঠনিক বীজগণিতের ধারা ছড়িয়ে দেন [১-৩,
৯-১১]।
নোইটারের পাঠদানের প্রক্রিয়া ছিল সেই
সময়ের প্রেক্ষিতে খুব আধুনিক। আগে থেকে পরিপাটি করে লেকচার প্রস্তুত করে তা ক্লাসে
উপস্থাপনে কোন মৌলিকত্ব নেই। তিনি তাঁর লেকচারে গণিতের বাস্তব সমস্যার উদাহরণ দিতেন
এবং তা সমাধানে শিক্ষার্থীদেরও সম্পৃক্ত করতেন। এই পদ্ধতি কঠিন হলেও এর ফলে শিক্ষার্থীরা
ক্লাসের মধ্যেই গবেষণা-পরিবেশ পেয়ে যেতো এবং নিজেদেরকে সেই গবেষণার অংশ হিসেবে দেখতে
পেতো। আলোচনা থেকে উদ্ভূত ধারণার অংশীদারিত্বে তিনি বিশ্বাস করতেন এবং শিক্ষার্থীদের
যেকোনো নতুন ধারণাকে উপযুক্ত সম্মান ও স্বীকৃতি দিতেন। ভ্যান ডার ভেয়ার্ডেনের বিখ্যাত পাঠ্যপুস্তক
‘মর্ডান এলজেব্রা’ নোইটারের পদ্ধতিগুলো আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয়। ওই বই এবং তাঁর শিক্ষার্থীদের স্থানান্তরের মাধ্যমে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বিংশ শতাব্দীর বীজগণিতের একটি নির্ধারক ভাষায় পরিণত হয়। তাই শুধু তাঁর নিজের নামে প্রকাশিত গবেষণাপত্রের
সংখ্যা দিয়ে তাঁর বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার পরিমাপ করা সম্ভব নয় [২,
৩, ৯]।
১৯৩০-এর দশকের শুরুতে নোইটারের কাজের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অস্বীকার করার আর কোনো উপায় ছিল না। ১৯২৮
সালে বোলোনিয়ায় আন্তর্জাতিক গণিত কংগ্রেসে বক্তৃতা
দেয়ার আমন্ত্রণ পান তিনি। ১৯৩২ সালে জুরিখের কংগ্রেসে একটি প্লেনারি বক্তৃতা দেন—যা একজন গণিতবিদের জন্য অন্যতম সর্বোচ্চ সম্মান। একই বছরে তিনি গাণিতিক জ্ঞানের অগ্রগতির জন্য আলফ্রেড অ্যাকারমান-টয়বনার স্মৃতি পুরস্কার লাভ করেন [১-৪]। এই সাফল্যগুলো তাঁর ইউরোপীয় কর্মজীবনের শীর্ষবিন্দু নির্দেশ করলেও গোটিনগেন
বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে তাঁর মর্যাদার উপযুক্ত পূর্ণ অধ্যাপক-পদ দেয়নি শুধুমাত্র
নারী বলে।
হিটলারের উত্থান, বর্ণবাদের শিকার ও নির্বাসন
১৯৩৩ সালের জানুয়ারিতে অ্যাডলফ হিটলার জার্মানির চ্যান্সেলর হন এবং উৎকট
নাৎসি শাসন চালু
হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে ইহুদি অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিরোধীদের অপসারণ শুরু হয়। ইহুদি হওয়ার কারণে
১৯৩৩ সালের এপ্রিল মাসে এমি
নোইটারকে গোটিনগেন ইউনিভার্সিটি থেকে বরখাস্ত করা হয়। তাঁর আন্তর্জাতিক খ্যাতি কিংবা জার্মান গণিতে তাঁর অবদান—কোনোটিই তাঁকে বর্ণবাদী নিপীড়ন থেকে রক্ষা করতে পারেনি [১-৪]।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর অধিকার হারানোর পরও নোইটার নিজের বাসায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ
এবং একাডেমিক আলোচনা অব্যাহত রাখেন। এই বিপজ্জনক সময়েও তাঁর শান্তভাব ও দৃঢ়তা একটুও
কমেনি। গণিত শুধু তাঁর পেশা ছিল না; অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনেরও কেন্দ্রীয় মাধ্যম ছিল গণিত।
সেইসময় ইওরোপ থেকে নির্বাসিত বিজ্ঞানীদের
আমেরিকায় আশ্রয় দেয়ার জন্য বিভিন্ন সংগঠন কাজ করে যাচ্ছিলো। প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি
আইনস্টাইনকে গ্রহণ করলেও নোইটারকে গ্রহণ করলো না, কারণ প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি তখনো
ছিল পুরোদস্তুর পুরুষের বিশ্ববিদ্যালয়। নারী-শিক্ষার্থী বা নারী-শিক্ষকের স্থান সেখানে
ছিল না। এমি নোইটারকে যেতে হলো মেয়েদের কলেজে – যেখানে শুধুমাত্র মেয়েদের পড়াশোনার
সুযোগ রয়েছে।
নির্বাসিত বিজ্ঞানীদের সহায়তাকারী সংগঠনগুলোর সহায়তায়
এমি নোইটার পেনসিলভানিয়ার ব্রায়ান মাওর কলেজে ভিজিটিং প্রফেসরের পদ গ্রহণ করেন। ১৯৩৩
সালের অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছান এমি
নোইটার। ব্রায়ান মাওর কলেজ ছিল উচ্চশিক্ষার দীর্ঘ ঐতিহ্যসম্পন্ন একটি নারীশিক্ষা
প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানে এসে নোইটার যেন নতুন প্রাণ পেলেন। স্নাতকোত্তর নারীশিক্ষার্থীদের আধুনিক বীজগণিত শেখানোর
কাজে তিনি উঠেপড়ে লাগলেন। কলেজটি নারীদের বিশ্বের অন্যতম প্রধান গণিতবিদের কাছে শেখার সুযোগ করে দেয়। এমি
নোইটার সেখানে খুঁজে পান এমন একটি সমাজ, যেখানে সবাই প্রকাশ্যে তাঁর উপস্থিতির মূল্য দিচ্ছে। নারীদের
জন্য জার্মানির দমবদ্ধ পরিবেশ থেকে এই পরিবেশ অনেকটাই মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেয়ার মতো,
যদিও তাঁর আমেরিকায় অন্য কোন ইউনিভার্সিটিতে যাবার সুযোগ ছিল না যেখানে ছেলেরা পড়াশোনা
করে।
আইনস্টাইন প্রিন্সটনের ইন্সটিটিউট ফর
অ্যাডভান্সড স্টাডিতে বিশেষ অধ্যাপকের পদমর্যাদায় স্বাধীনভাবে গবেষণা করছেন। আইনস্টাইন
এমি নোইটারের গাণিতিক প্রতিভাকে বিশেষ সম্মান করতেন। তিনি এমি নোইটারকে ইন্সটিটিউটে
বক্তৃতা দেয়ার সুযোগ করে দিলেন। ১৯৩৪ সালের শুরু থেকে নোইটার প্রিন্সটনের ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিতেও নিয়মিত বক্তৃতা দিতে থাকেন। সেখানে তিনি হারমান ভাইল, অসওয়াল্ড ভেবলেন, রিচার্ড ব্রাউয়ার এবং অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় গণিতবিদের সঙ্গে আলোচনার
সুযোগ পান। আমেরিকান গাণিতিক সংস্কৃতি তখনও নোইটারের অত্যন্ত গাঠনিক বীজগাণিতিক পদ্ধতিতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি।
তাঁর বক্তৃতাগুলো আমেরিকার গাণিতিক জগতে নতুন জ্ঞানের সরবরাহ
ঘটায়।
যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর সময় ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তা ব্যক্তিগত ও বৌদ্ধিকভাবে ছিল
খুবই উৎসাহজনক। কয়েক দশকের অস্বীকৃতির পর তিনি এমন এক পরিবেশ পান, যেখানে নারীরাই প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু। স্বভাবসুলভ প্রাণশক্তি নিয়ে তিনি গবেষণা, শিক্ষা এবং তরুণ শিক্ষার্থীদের সহায়তা অব্যাহত রাখেন।
কিন্তু সুসময় দীর্ঘস্থায়ী হলো না। ১৯৩৫
সালের এপ্রিল মাসে টিউমার ধরা পড়লো
এমি নোইটারের। অস্ত্রোপচার করা হলো। প্রথমদিকে নোইটার সুস্থ হয়ে উঠছেন বলে মনে হলেও পরে গুরুতর অস্ত্রোপচার-পরবর্তী জটিলতা দেখা দেয়। ১৯৩৫
সালের ১৪ এপ্রিল মাত্র ৫৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন এমি নোইটার।
ব্যক্তিত্ব ও স্বীকৃতি
নোইটার ছিলেন প্রাণবন্ত, উষ্ণ এবং খুবই
ইনফরমাল। প্রায় সময় তিনি গাণিতিক চিন্তায় আচ্ছন্ন থাকতেন। হাঁটা, খাবার বা ট্রেনযাত্রার সময়ও তিনি গাণিতিক আলোচনা চালিয়ে যেতে পারতেন। আনুষ্ঠানিকতা, পদমর্যাদা বা সামাজিকতা প্রদর্শনের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল খুবই কম [১-৩,
৯-১১]। গণিতই
ছিল তাঁর ধ্যান-জ্ঞান সংসার। তাঁর শিক্ষাদান পদ্ধতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য ছিল। শিক্ষার্থীদের সামনে পুরোপুরি সাজানো জ্ঞানের ভাণ্ডার উপস্থাপন না করে তিনি তাঁদের অমীমাংসিত সমস্যা ও বিকাশমান তত্ত্বের মধ্যে নিয়ে যেতেন। ফলে কোনো
কোনো শিক্ষার্থীর কাছে তাঁর সেমিনার কঠিন মনে হলেও, যারা অনুসরণ করতে পারতেন তাঁদের ওপর তা গভীর প্রভাব ফেলত। তিনি সমালোচনাকে ব্যক্তিগত কর্তৃত্বের চ্যালেঞ্জ নয়, বরং গাণিতিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে দেখতেন।
বৈজ্ঞানিক যোগ্যতার সঙ্গে সম্পর্কহীন কারণে বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা তাঁকে আয়, পদমর্যাদা, নিরাপত্তা ও জনসমক্ষে একাডেমিক কর্তৃত্ব থেকে বঞ্চিত করেছিল। এত
বঞ্চনা, অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হবার পরও তিনি প্রকাশ্যে কখনোই তিক্ততা প্রদর্শন করেননি।
আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান ও গণিতে এমি নোইটারের
উপপাদ্য এখনো প্রাসঙ্গিক। কোয়ান্টাম তত্ত্ব ও কণাপদার্থবিজ্ঞানে প্রতিসাম্যের নীতিগুলো খুব কেন্দ্রীভূত। অবিচ্ছিন্ন অভ্যন্তরীণ প্রতিসাম্য সংরক্ষিত চার্জ ও কারেন্টের জন্ম দেয়, আর স্থানীয় গেজ প্রতিসাম্য মৌলিক আন্তঃক্রিয়ার গাণিতিক বর্ণনাকে সংগঠিত করে। কণাপদার্থবিজ্ঞানের স্ট্যান্ডার্ড মডেল গেজ প্রতিসাম্যের ওপর নির্মিত – এমি নোইটার যার ভিত্তি দিয়েছিলেন কণাপদার্থবিজ্ঞানের
জন্মেরও কয়েক দশক আগে। নোইটারের উপপাদ্যের প্রভাব মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানের বাইরেও বিস্তৃত। তাঁর তত্ত্বের বিভিন্ন রূপ কন্টিনিউয়াম মেকানিক্স, তরলগতিবিদ্যা, আলোকবিজ্ঞান ও আধুনিক গাণিতিক মডেলিংয়ে দেখা যায়।
গণিতবিদদের কাছে আধুনিক বীজগণিতের অধিকাংশ কাঠামো নির্মাণের জন্য নোইটার খুবই
শ্রদ্ধার আসনে আসীন। কমিউটেটিভ বীজগণিত ও বীজগাণিতিক জ্যামিতির সর্বত্র ‘নোইটারিয়ান’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়; এটি এমন সসীমতা শর্তকে বোঝায়, যা অসীম বীজগাণিতিক প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে বাধা দেয়। নোইটারিয়ান রিং, মডিউল ও টপোলজিক্যাল স্পেস উচ্চতর গণিতের মৌলিক বিষয়।
নোইটারের মৃত্যুর পর তাঁর মহত্ত্বের স্বীকৃতি আরও তীব্র হয়। হারমান ভাইলের স্মৃতিচারণে তাঁর বৌদ্ধিক শক্তি এবং গাণিতিক জীবনে আনা উষ্ণতা—উভয়েরই বর্ণনা পাওয়া যায় [১০]। আলবার্ট আইনস্টাইন প্রকাশ্যে লিখেছিলেন, নারীরা উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের পর থেকে জন্ম নেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সৃজনশীল গাণিতিক প্রতিভাদের মধ্যে তিনি অন্যতম [১২]। বিমূর্ত বীজগণিত ও প্রতিসাম্যভিত্তিক পদার্থবিজ্ঞান বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞানের কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর পরের খ্যাতি আরও বিস্তৃত হয়। যে ধারণাগুলো একসময় অত্যন্ত বিমূর্ত বলে মনে হয়েছিল, সেগুলো অপরিহার্য উপকরণে পরিণত হয়। আন্তর্জাতিক গণিত ইউনিয়নের ICM Emmy Noether Lecture গাণিতিক বিজ্ঞানে মৌলিক ও দীর্ঘস্থায়ী অবদান রাখা নারীদের সম্মানিত করে [১৩]। এই স্মরণ প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যে নারী একসময় সাধারণ একাডেমিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন, তাঁকেই পেশাটির সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক সমাবেশের কেন্দ্রে স্থান দেওয়া হয়েছে।
উপসংহার
এমি নোইটারের জীবন সংগ্রাম ও অর্জনের কাহিনি
খুবই অনুপ্রেরণাদায়ক। তাঁর যাত্রা শুরু হয় ভাষা-শিক্ষক হওয়ার জন্য প্রস্তুত করা এক কিশোরী হিসেবে। বিশেষ অনুমতি নিয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেন, অসাধারণ ফলাফলসহ ডক্টরেট অর্জন করেন এবং তারপর বহু বছর বেতন বা পদমর্যাদা ছাড়াই কাজ করেন। শীর্ষস্থানীয় গণিতবিদেরা তাঁর দক্ষতার প্রয়োজন অনুভব করে তাঁকে গোটিনজেন
ইউনিভার্সিটিতে আমন্ত্রণ জানালেও তাঁকে নিজের নামে প্রকাশ্যে পড়াতে বাধা দেয়া
হয়। সেই বঞ্চনার সময়েই তিনি এমন একটি উপপাদ্য আবিষ্কার করেন, যা পদার্থবিজ্ঞানকে স্থায়ীভাবে বদলে দেয়।
শিক্ষাদানের অধিকার পাওয়ার পর তিনি রিং, আইডিয়াল, মডিউল ও গাঠনিক নীতিকে কেন্দ্র করে বিমূর্ত বীজগণিতকে পুনর্গঠন করেন। তাঁর শিক্ষার্থী ও সহযোগীরা সেই পদ্ধতি গণিতের জগৎজুড়ে ছড়িয়ে দেন। আন্তর্জাতিক সম্মান শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রতিভাকে স্বীকৃতি দিলেও একটি পূর্ণ অধ্যাপক-পদ তাঁর নাগালের বাইরে থেকে যায়। এরপর নাৎসি নিপীড়ন তাঁকে জার্মানি থেকে বিতাড়িত করে। যুক্তরাষ্ট্রের
ব্রায়ান মাওর কলেজে তাঁর সম্ভাবনাময় নতুন জীবন মাত্র ৫৩ বছর বয়সে অকালমৃত্যুর মাধ্যমে শেষ হয়। তাঁর
জীবন যেমন আমাদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক, আবার একইভাবে তাঁকে জীবদ্দশায় যথাযথ সম্মান
দিতে না পারার জন্য অস্বস্তিকরও বটে।
তথ্যসূত্র
১। Dick, A. (1981). Emmy Noether
1882-1935 (H. I. Blocher, Trans.). Birkhauser.
https://doi.org/10.1007/978-1-4684-0535-4
২। Phillips, L. (2024). Einstein's
tutor: The story of Emmy Noether and the invention of modern physics.
PublicAffairs.
৩। Rowe, D. E. (2021). Emmy
Noether - mathematician extraordinaire. Springer.
https://doi.org/10.1007/978-3-030-63810-8
৪। O'Connor, J. J., & Robertson, E. F. (n.d.). Emmy Noether. MacTutor History of
Mathematics Archive, University of St Andrews.
https://mathshistory.st-andrews.ac.uk/Biographies/Noether_Emmy/
৫। Noether, E. (1971). Invariant variation problems (M. A. Tavel,
Trans.). Transport Theory and Statistical
Physics, 1(3), 186-207. https://doi.org/10.1080/00411457108231446
৬। Kosmann-Schwarzbach, Y. (2011). The
Noether theorems: Invariance and conservation laws in the twentieth century.
Springer. https://doi.org/10.1007/978-0-387-87868-3
৭। Quigg, C. (2019). Colloquium: A century of Noether's theorem. arXiv.
https://doi.org/10.48550/arXiv.1902.01989
৮। Noether, E. (1921). Idealtheorie in Ringbereichen. Mathematische Annalen, 83(1), 24-66.
https://doi.org/10.1007/BF01464225
৯। Brewer, J. W., & Smith, M. K. (Eds.). (1981). Emmy Noether: A tribute to her life and work.
Marcel Dekker.
১০। Weyl, H. (1935). Emmy Noether. Scripta
Mathematica, 3(3), 201-220.
১১। Srinivasan, B., & Sally, J. D. (Eds.). (1983). Emmy Noether in Bryn Mawr: Proceedings of a
symposium sponsored by the Association for Women in Mathematics in honor of
Emmy Noether's 100th birthday. Springer.
https://doi.org/10.1007/978-1-4612-5547-5
১২। Einstein, A. (1935, May 4). The late Emmy Noether: Professor
Einstein writes in appreciation of a fellow-mathematician. The New York Times, 12.
১৩। International Mathematical Union. (n.d.). ICM Emmy Noether Lecture.
https://www.mathunion.org/imu-awards/icm-emmy-noether-lecture
বিজ্ঞানচিন্তা আগস্ট ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত







No comments:
Post a Comment