Showing posts with label বিদেশ. Show all posts
Showing posts with label বিদেশ. Show all posts

Thursday, 28 March 2019

ইয়ারার তীরে মেলবোর্ন - চতুর্থ পর্ব




১০ জুলাই ১৯৯৮ শুক্রবার

এ মুহূর্তে আমার কেমন লাগছে আমি নিজেও বুঝতে পারছি না। একটু আগে দিদিভাইর বাসায় ফোন করেছিলাম। দিদিও এসেছিল সেখানে সবাইকে নিয়ে। বিশ ডলারের টেলেস্ট্রা ফোন কার্ডে মাত্র পনের মিনিট কথা বলা যায় বাংলাদেশে। কাল অজিতের সাথে কথা বলেছি এক মিনিটেরও কম। অথচ আজ বললো ব্যালেন্স আছে আঠারো ডলার, কথা বলতে পারবো বারো মিনিট। সবার সাথে একটু ‘হ্যালো’ বলতেই শেষ হয়ে গেল আমার ফোন কার্ড। ভালো লাগছে না কিছুই। ইচ্ছে করছে এখনি ফিরে যাই বাংলাদেশে- যেখানে আমার সবকিছু। তুমি হয়তো ভাবছো টেলিফোনে ভাল করে কথা বলতে পারিনি বলেই এরকম ইচ্ছে করছে। পুরো ব্যাপারটা শুনলে কিছুটা বুঝতে পারবে কেন এমন উড়নচন্ডি ইচ্ছে আমার। গোড়া থেকে বলছি- শোন।
            মেলবোর্নে প্রথম পুরো একটা দিন কাটলো আজ- সকাল থেকে রাত। সকালে ঘুম ভেঙেছে টেলিফোনের শব্দে। টেলিফোন নামক যন্ত্রটির সাথে আমার পরিচয় খুব সামান্য। দেশে থাকতে হাতে গোনা কয়েকবার মাত্র ব্যবহার করেছি এই যন্ত্র। কিন্তু এখানে মনে হচ্ছে যন্ত্রটাকে এড়িয়ে চলার কোন উপায় নেই।
            “হ্যালো”
            “হ্যালো স্যার, ইট্‌স মার্গারেট ফ্রম ….”
            মার্গারেট আবার কে? তীব্র ঝাঁঝালো একটা কন্ঠ এই মহিলার। খুব মনযোগ দিয়ে শোনার পরও পুরোপুরি বুঝতে পারলাম না তিনি কী বললেন। আন্দাজ করলাম- কেউ একজন আমার সাথে কথা বলতে চাচ্ছে। একটু পরেই ওপাশে পিটারের গলা। তার সাথে দুপুরে ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে দেখা হবার কথা। কিন্তু সে বলছে- “সরি ম্যান, আই ক্যান নত্‌ দু ইত্‌ তুদে। ইজ ইত্‌ ওকে ইফ আই দু ইত্‌ মান্‌দে?”
            “ইয়েস, ইয়েস”
            “ও-কে। সি ইউ মান্‌দে এত্‌ তুয়াল্‌ভ, ইন ফ্রন্ট অব ইন্তারন্যাশনাল অফিস”
            পিটারের ইংরেজি বুঝতে আমার একটুও অসুবিধে হলো না। বুঝতে পারছি আমার ইংরেজির দৌড় ওই ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত। পিটার সোমবারে আমাকে ক্যাম্পাস দেখাবে। আমি কি তার জন্য বসে থাকবো সোমবার পর্যন্ত? মনে হয় না। আমি আজকেই যাচ্ছি ইউনিভার্সিটিতে।   
            হোটেলের লবি থেকে দেখা যাচ্ছে- রোদে ঝলমল করছে সামনের রাস্তা। কিন্তু রাস্তায় পা দিতেই প্রচন্ড ঠান্ডা বাতাস- মনে হলো হাড় ভেদ করে চলে গেলো। সোয়েটার পরেছি, তার উপর একটা জ্যাকেট পরেছি, গলায় মাফলার জড়িয়েছি- তাতেও এত ঠান্ডা! এদেশের রোদে কি একটুও তাপ থাকতে নেই!
            হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে কোন্‌ দিকে যাবো বুঝতে পারছিলাম না। পেটে কিছু দেয়া দরকার। এই হোটেলের গা ঘেঁষেই একটা রেস্টুরেন্ট আছে। রেস্টুরেন্টের দরজায় মেনু টাঙানো। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম কিছুক্ষণ। খাদ্যতালিকা দেখার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মূল্যতালিকা দেখা। সবচেয়ে কমদামী যা আছে তা হলো ইংলিশ মাফিন- তিন ডলার। অস্ট্রেলিয়ান ডলার মাথার মধ্যে বাংলাদেশী টাকায় কনভার্ট হয়ে যাচ্ছে  মুহূর্তেই। এক টুকরো কেকের দাম নব্বই টাকা! দিদি তার কষ্টার্জিত সঞ্চয় ভেঙে কিছু ডলার কিনে দিয়েছিলো আমাকে। তার বেশির ভাগই চলে গেছে হোটেল ভাড়ায়। এখন হাতে আছে অতি সামান্য।  স্কলারশিপের টাকা কখন পাবো জানি না। এখন হিসেব করে না চললে অসুবিধায় পড়তে হবে। সুতরাং সস্তা কিছু খুঁজে বের করতে হবে। দেখছো- একদিনের মধ্যেই আমি কত হিসেবী হয়ে উঠেছি!
            বাম দিকে একটু হাঁটলেই সোয়ান্সটন স্ট্রিট। ফুটপাতের পাথরের উপর বিশাল এক দাবা বোর্ড। একেকটা ঘুটি প্রায় দু’ফুট উঁচু। সোয়ান্সটন স্ট্রিটে ট্রাম দেখে থমকে দাঁড়ালাম। শহরের রাস্তায় ট্রাম-লাইন। ট্রামের ছাদের সাথে বৈদ্যুতিক তারের সংযোগ আছে। বিদ্যুৎই ট্রামের জ্বালানি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম কিছুক্ষণ। পেটের ক্ষুধা আর সহ্য হচ্ছে না দেখে ফুটপাতে সাজানো একটি খাবারের দোকানের সামনে দাঁড়ালাম। খাবারের সাথে দাম লেখা আছে। আমি দাম দেখছি আর তা বাংলাদেশের টাকায় কত হিসেব করছি। একটা ছোট রুটি কিনলাম- এক ডলার দাম। বাংলাদেশে এর দ্বিগুণ আয়তনের একটি রুটির দাম বড়জোর ছয় টাকা- আর এখানে তা ত্রিশ টাকা। রুটি নিয়ে হোটেলে ফিরে এলাম। রুমে চা চিনি দুধ আছে। ইলেকট্রিক কেটলি আছে। চা বানালাম আর রুটি ডুবিয়ে খেলাম। এর চেয়ে ভালো ব্রেকফাস্ট হয় নাকি?  
            এবার ইউনিভার্সিটিতে যাওয়া দরকার। কীভাবে যাবো জানার জন্য ইনফরমেশান সেন্টারে ঢুকলাম। সোয়ান্সটন ও লিটল কলিন স্ট্রিটের কোণায় বেশ বড় ইনফরমেশান সেন্টার। যারা কাজ করছেন বেশির ভাগই প্রবীণা। সুন্দর করে হেসে জানতে চাইলেন আমি কোথায় যেতে চাচ্ছি। মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটিতে যাবো শুনে মেলবোর্ন সিটির ম্যাপের উপর পেন্সিল দিয়ে এঁকে দিলেন ইউনিভার্সিটির রাস্তা। তিনি যা বললেন তার কয়েকটি শব্দ ছাড়া বেশির ভাগই আমি না বুঝে মাথা নাড়ালাম। ইংরেজি পড়ে তবু কিছুটা বুঝতে পারি, কিন্তু অস্ট্রেলিয় উচ্চারণে কথ্য ইংরেজি বুঝতেই পারছি না।
            ইউনিভার্সিটিতে যেতে হলে ট্রামে চড়ে যেতে হবে- এটুকু বুঝতে পেরেছি। সামনেই ট্রাম স্টপ। ট্রাম আসার সাথে সাথে উঠে পড়লাম। খুব বেশি ভিড় নেই। ঝকঝকে পরিষ্কার সিট। টিকেট কীভাবে করতে হয় জানি না। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি পেছনের দিকে দেখিয়ে দিলেন। কোন কন্ডাক্টর বা টিকেট চেকার চোখে পড়লো না। পরের স্টেশনে কয়েকজন নেমে যাবার পর নতুন যারা উঠলেন তাদের অনুসরণ  করলাম। একজন পকেট থেকে টিকেট বের করে একটা মেশিনে ঢুকালেন। এরকম মেশিন বেশ কয়েকটি আছে। লেখা আছে- ‘প্লিজ ভ্যালিডেট ইওর টিকেট হিয়ার’। আরেকটি বড় মেশিন চোখে পড়ল। টিকেট কাটার মেশিন। একজন লম্বা চুলের তরুণ মেশিনে কয়েন ঢুকিয়ে টিকেট বের করে আনলো। ব্যাপারটি খুব সোজা হবার কথা। ট্রামে যারা ভ্রমণ করেন তারা সবাই নিশ্চয় সায়েন্টিস্ট নন। টিকেট ভেন্ডিং মেশিন থেকে টিকেট কেনা শিখে নিলাম কয়েক মিনিটে।
            এখানে টিকেট বিক্রি হয় সময়ের হিসেবে- দূরত্বের হিসেবে নয়। শর্ট ট্রিপের ভাড়া সবচেয়ে কম। মাত্র কয়েকটা স্টপ পরে নেমে গেলে ওই টিকেট। তারপর দু’ঘন্টার টিকেট ও সারাদিনের টিকেট। এক ডলার আশি সেন্ট দিয়ে একটা শর্ট ট্রিপের টিকেট কিনলাম। দুই ডলারের একটি সোনালী কয়েন মেশিনে ঢোকালাম, একদিকে টিকেট বেরিয়ে এলো- অন্যদিকে বিশ সেন্টের একটা কয়েন বেরিয়ে এলো। কত স্মার্ট মেশিন! এই মেশিনের অপারেশান শিখতে পেরে নিজেকেও স্মার্ট মনে হচ্ছে।                 ইনফরমেশান ডেস্কের মহিলা বলেছিলেন ইউনিভার্সিটি বেশি দূরে নয়। কিন্তু মনে হচ্ছে ট্রাম অনেক দূর চলে এসেছে। ঠিক পথে যাচ্ছি তো? ড্রাইভারকে কোনরকমে জিজ্ঞেস করলাম- এই ট্রাম মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটি যাবে কি না। গায়ের রঙ আর ইংরেজি উচ্চারণ- দুটোই বলে দিচ্ছে ড্রাইভারটি ইন্ডিয়ান অথবা শ্রীলংকান। খুব আন্তরিক ভাবে বললেন-  ট্রাম যাচ্ছে উল্টো দিকে। কথা ঠিকমত না বুঝলে যা হয়। ট্রাম শুনেই উঠে পড়েছি, কোন দিকের ট্রাম তা বুঝিনি। ড্রাইভারের কথা মত পরের স্টপে নেমে গিয়ে রাস্তা পেরিয়ে অন্যদিকের ট্রামে উঠলাম।
                মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের ম্যাপ দেখে একটা ধারণা করে নিয়েছিলাম যে ক্যাম্পাসটি অনেক বড় হবে। কিন্তু সেটা যে এত বড় হবে ভাবিনি। রাস্তা থেকেই দেখা যাচ্ছে বিশাল বিশাল বিল্ডিং, বিল্ডিং এর গায়ে ইউনিভার্সিটির মনোগ্রাম। ট্রাম ইউনিভার্সিটির সামনে এসে থেমে গেলো। এখানেই টার্মিনাল।
                কী কী করতে হবে তা মনে মনে ঠিক করে এসেছিলাম। প্রথমে যেতে হবে ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে। সোয়ান্সটন স্ট্রিটের উপর ইউনিভার্সিটির ছয় নম্বর গেটের কাছে একটা লাল বিল্ডিং ঘেঁষে কাচের দেয়াল ঘেরা অফিস। সামনে যেতেই নিজে নিজে খুলে গেল কাচের দরজা। রিসেপশান ডেস্কে দাঁড়িয়ে আছেন বেশ মোটা একজন মহিলা। হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ?’
                ইংরেজি বাক্য তৈরি করতে অনেক সময় লাগছে আমার। ইংরেজি কথা শোনার পরে তা আমার মাথায় বাংলায় অনুবাদ হচ্ছে। তারপর তার উত্তরে আমার বাংলা বাক্য তৈরি হচ্ছে। পরে সেই বাংলাকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে মুখ দিয়ে বের করে আনতে অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে। ততক্ষণে অন্যপক্ষ অনেক কিছু বলে ফেলছে। এই কারণেই স্কুলে পড়ার সময় আমার ইংরেজি শিক্ষক রমণীবাবু বলতেন, “ইংরেজিতে চিন্তা করবি”। কিন্তু বাংলা থাকতে বাঙালি ইংরেজিতে চিন্তা করবে কী কারণে?             মহিলাটিকে বললাম, “আমি ভর্তি হয়েছি প্রফেসর ক্যানেথ আমোসের আন্ডারে পিএইচডি করার জন্য। প্রফেসরের সাথে দেখা করা যায় কীভাবে”। মহিলা কম্পিউটারে কিছু একটা দেখে নিয়ে টেলিফোন করলেন কোথাও। টেলিফোনে এত দ্রুত কথা বললেন যে আমি একটা বাক্যও ঠিকমত বুঝতে পারলাম না। কিন্তু তিনি আমার সাথে যখন কথা বলেছেন তখন তার কথা আমি মোটামুটি বুঝতে পেরেছি। হয়তো ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে কাজের সুবাদে তারা আমাদের বোঝার মত করেই আস্তে আস্তে ইংরেজি বলেন। মহিলা বললেন, “প্রফেসর আমোস এখন লাঞ্চে গেছেন। লাঞ্চের পর দেখা হতে পারে। ফিজিক্স বিল্ডিং এর ছয় তলায় ৬০৯ নম্বর রুমে তিনি বসেন”।
            ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার থেকে বেরিয়ে আর্টস বিল্ডিং। তার পাশেই 1888 বিল্ডিং- মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির গ্রাজুয়েট বিল্ডিং। গেরুয়া রঙের বিল্ডিংটি কারুকার্যময়। পিলার আর ছাদের নকশা দেখে ছবিতে দেখা ভারতের মন্দিরের মত লাগছে। একশ’ দশ বছরের পুরানা এই বিল্ডিং-এ ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েট পর্যায়ের রিসার্চ স্টুডেন্টদের সেন্টার। সাথে আছে গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টস ইউনিয়ন। মাস্টার্স ও পিএইচডি পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা সংগঠন। এখানেও কি স্টুডেন্ট পলিটিক্স আছে? জানি না এখনো। ইউনিভার্সিটির কোথাও কোন রাজনৈতিক কার্যকলাপ দেখলাম না। বিল্ডিংগুলোর দেয়াল ঝকঝকে পরিষ্কার। এত বড় ক্যাম্পাসে এতগুলো বিল্ডিং- অথচ কোন ধরণের রাজনৈতিক মতবাদ দেয়ালে দেয়ালে শোভা পাচ্ছে না এটাই আশ্চর্যের।
            এত বড় ইউনিভার্সিটিতে পড়তে এসেছি- একটু ভয় তো লাগছেই। ম্যাপ দেখে দেখে ফিজিক্স বিল্ডিং এ এলাম। বিশাল সাত তলা বিল্ডিং এর দেয়ালে তামার অক্ষরে লেখা ‘স্কুল অফ ফিজিক্স’।  নিচের তলায় রিসেপশানে জিজ্ঞেস করলাম প্রফেসর আমোস অফিসে আছেন কি না। মেয়েটি টেলিফোন করল প্রফেসরের অফিসে। কেউ ধরছে না। তার মানে তিনি লাঞ্চ থেকে ফিরে আসেন নি এখনো। রিসেপশানে বসা এই মেয়েটিও খুব মোটা। মনে হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ায় মোটা মানুষের সংখ্যা বেশি। মোটা মানুষ হাসিখুশি হয় বলে শুনেছি। কিন্তু এই মেয়েটি গম্ভীর। আমার দিকে খুব একটা তাকানোর দরকার আছে বলেও মনে করছেন না। অনেকটা আপন মনেই বললেন, “কেন্‌ বসেন ছয় তলায়। ৬০৯ নম্বর রুমে”। অস্ট্রেলিয়ানরা সবাই সবাইকে নাম ধরে ডাকে। তাই প্রফেসর ক্যানেথ আমোস এদের কাছে শুধুই ‘কেন্‌’।
            পাশাপাশি দুটো লিফ্‌ট। তার পাশেই সিঁড়ি। লিফ্‌টের বোতাম টেপার আগেই লিফ্‌ট খুলে গেলো। হুড়মুড় করে বেরিয়ে এলেন চার-পাঁচজন মানুষ। হা হা করে হাসছে তারা। লিফ্‌টে উঠে ছয়তলার বোতাম টিপে দিলাম। এখানেও কোন লিফ্‌ট-ম্যান নেই। এদেশে মনে হয় কোন লিফ্‌টেই চালক থাকে না।
            ছয়তলায় লিফ্‌ট থেকে বেরিয়ে সামনেই ফিজিক্স রিসার্চ লাইব্রেরি। লেখা আছে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট পর্যায়ের লাইব্রেরি এটা। আন্ডার-গ্র্যাজুয়েট ফিজিক্সের বইয়ের দরকার হলে যেতে হবে বিলিউ লাইব্রেরিতে, স্কুল পর্যায়ের ফিজিক্সের বই আছে ই-আর-সি লাইব্রেরিতে। কয়টা লাইব্রেরি আছে এখানে?
            বামে করিডোর দিয়ে হেঁটে গিয়ে দাঁড়ালাম ৬০৯ নম্বর রুমের সামনে। নেমপ্লেটে লেখা আছে- ডঃ কে. এ. আমোস। দরজা বন্ধ। সামনের রুম ৬১২। তার দরজা খোলা। আমি প্রফেসর আমোসের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি দেখে ৬১২ নম্বর রুম থেকে একটা ছেলে বেরিয়ে এলো। ছেলেটার চোখে চশমা, লম্বা চুল পিঠ ছুঁয়েছে। ছেলেদের লম্বা চুল রাখা মনে হচ্ছে খুবই কমন এখানে। বললো, “কেন্‌ এখন লাঞ্চে গেছে। মিনিট দশেক পরে আসবে। কোন ম্যাসেজ আছে?” আমি হ্যাঁ হুঁ করে কী বললাম নিজেই জানি না। ছেলেটি আমার কথা শুনে কিছু বুঝলো বলে মনে হচ্ছে না। বার দুয়েক - “পারডন মি” “পারডন মি” বললো। আমার ইংরেজি এতই দুর্বোধ্য যে এই ব্যাটা অস্ট্রেলিয়ান মাফ চাচ্ছে আমার কাছে!  আমি আবার আসবো বলে দ্রুত চলে এলাম।
            ফিজিক্স বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে সামনে আরেকটি বিশাল বিল্ডিং- পনের ষোল তলা হবে। তার পাশে একটি পুরানা বিল্ডিং- স্টুডেন্টস্‌ সাপোর্ট সেন্টার। সেখানে ঢুকে দেখি- দেয়ালে সুন্দর করে টাঙানো আছে নানারকম বিজ্ঞপ্তি, বিজ্ঞাপন। পার্ট-টাইম চাকরির বিজ্ঞাপন, ঘরভাড়ার বিজ্ঞাপন। আমার খুব দরকারে লাগবে এসব। থাকার একটা ঘর- আর খন্ডকালীন একটা চাকরি তো এখুনি দরকার। কিন্তু চাকরির বিজ্ঞাপন গুলোতে যে সব যোগ্যতার কথা উল্লেখ আছে তার কোনটাই আমার নেই। কয়েকটাতে বলা হচ্ছে নিজের গাড়ি থাকতে হবে। কয়েকটাতে বলা হচ্ছে শিশুদের তদারক করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। আমি করতে পারবো এরকম চাকরি একটাও চোখে পড়লো না। মনে হচ্ছে আমি কোন কাজের যোগ্য নই।
            ঘরভাড়ার বিজ্ঞাপনগুলো দেখলাম। বেশির ভাগই শেয়ার একোমোডেশান। অনেকগুলো টার্ম আমি বুঝতে পারছি না। ভাড়ার অঙ্কটা চোখে পড়ে আগে। সবগুলো ভাড়াই সাপ্তাহিক। এখানে মনে হচ্ছে ঘরভাড়া হিসেব করা হয় সপ্তাহ অনুসারে। সপ্তাহে আশি ডলারের নিচে কোন রুম নেই। তাও ইউনিভার্সিটি থেকে অনেক দূরে। বুঝতে পারছি না কী করবো।
            ফিরে আসার পথে আবার ফিজিক্স বিল্ডিংএর ছয় তলায় উঠলাম। প্রফেসর আমোসের অফিস খোলা। সামনে যেতেই ভদ্রলোকের চোখে চোখ পড়লো। চোখে মোটা লেন্সের চশমা। খুবই হাসিখুশি প্রায় সাড়ে ছ’ফুট দীর্ঘ স্বাস্থ্যবান অস্ট্রেলিয়ান। বয়স পঞ্চাশের ওদিকে। মাথার চুল বেশির ভাগই সাদা হয়ে গেছে। মুখভর্তি হাসি। আমাকে দেখেই ডেস্ক ছেড়ে উঠে এলেন। হ্যান্ড শেক করতে করতে বললেন, ইউ আর প্রাডিব - রাইট?
            “প্রদীপ দেব, স্যার”।
            “নো ‘স্যার’। প্লিজ কল মি কেন্‌”।
            দু’মিনিটেই ভালো লেগে গেল মানুষটিকে। মনে হচ্ছে এই মানুষের সবকিছুই শিক্ষণীয়। বললেন আজ শুক্রবার বলে ডিপার্টমেন্টে তেমন কাউকে পাওয়া যাবে না। সোমবার সকাল দশটায় এসে যেন দেখা করি। সেদিন তিনি আমার সব অফিসিয়াল ফর্মালিটি শেষ করবেন। উইক-এন্ড ভালোভাবে কাটাতে বললেন। মনে একটা ভালো লাগার অনুভূতি নিয়ে চলে এলাম।
            ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে হাঁটলাম অনেকক্ষণ। বিল্ডিংয়ের পর বিল্ডিং। কত রকমের ডিপার্টমেন্ট। মনে হচ্ছে ইউনিভার্সিটি নিজেই একটা গোটা শহর। এত বড় ইউনিভার্সিটিতে আমি পড়তে এসেছি, গবেষণা করতে এসেছি- মনে মনে একধরণের আনন্দ, উদ্দীপনা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ফিরে এলাম হোটেলে। না হাঁটলে পথ চেনা যায় না। পথ চলতে চলতে পথ চেনা হলো কিছুদুর।
            আরেকটা রুটি আর চা। কিন্তু এটাই তো প্রধান খাবার হতে পারে না। এখানে ভাত কোথায় পাওয়া যায় জানি না। সন্ধ্যায় হোটেলের রিসেপশান থেকে দুধ নিতে গিয়ে দেখি গতকালকের মেয়েটির বদলে একজন ফর্সামতোন স্যুট-টাই পরা যুবক কাজ করছেন। আমি ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে কোন রকমে বললাম, “ক্যান আই হ্যাভ এ প্যাক অব মিল্ক প্লিজ!”
            কাউন্টারের ড্রয়ার থেকে দুধের একটা প্যাকেট এগিয়ে দিতে দিতে যুবকটি হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন- “আপনি বাংলাদেশী না?”
            তাঁর মুখে বাংলা শুনে আমি কী যে খুশি হয়েছি! মনে হলো জেল থেকে মুক্তি পেলাম আমি।
            “আমার নাম মাসুদ। আমি এখানে সপ্তাহে তিনদিন কাজ করি। রাতের শিফ্‌টে”।
            মাসুদ সাহেবের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলার পরই জানতে চাইলাম এখানে ভাত কোথায় পাওয়া যায়। তিনি বললেন “সোয়ান্সটন স্ট্রিটে গোপাল্‌স নামে একটা ইন্ডিয়ান নিরামিষ দোকান আছে। বেশ সস্তায় ভাত পাওয়া যায়”। ভাত পাওয়া যায় শুনেই পেটের মধ্যে যেন আগুন জ্বলে উঠল। মনে হলো- কতদিন ভাত খাইনি! ছুটলাম গোপাল্‌’স এর সন্ধানে।
            লিটল কলিন্স স্ট্রিট যেখানে সোয়ান্সটন স্ট্রিটকে ক্রস করেছে- সেখান থেকে সামান্য উত্তরদিকে গিয়েই পেয়ে গেলাম ‘গোপাল্‌স’। ছোট একটা সিঁড়ির মুখে ইংরেজিতে লেখা “হরি কৃষ্ণ, হরি কৃষ্ণ”। দোতলায় মাঝারি সাইজের একটা রেস্টুরেন্ট। দেয়াল জুড়ে ছোটবড় অনেকগুলো কৃষ্ণের ছবি। একটি কাচের কাউন্টারে ভাত তরকারি সাজিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তিনজন ভক্ত। তিনজনেরই মুন্ডিত মস্তকে লম্বা টিকি, কপালে মস্তবড় সাদা ফোঁটা- সম্ভবত চন্দনের, গলায় পুঁতির মালা টাইপের কিছু। তিনজনই শ্বেতাঙ্গ। হলুদ ফতুয়া আর সাদা ধুতিতে বেশ মানিয়েছে তাদের। পেছনের দেয়াল জুড়ে  ডঃ মহানামব্রত ব্রহ্মচারীর একটা বড় ছবি। এই ভদ্রলোকতো দেখি তাঁর আধ্যাত্মিক সাম্রাজ্য মেলবোর্ন পর্যন্ত বিস্তৃত করে ফেলেছেন।
            কাচের শোকেসের ভেতর ভাত- ভাতের মধ্যে মটরশুটি মেশানো। দাম লেখা আছে প্রতি প্লেট চার ডলার। শুধু ভাত নাকি সাথে আর কিছু দেবে জানি না। জিজ্ঞেস করার জন্য ইংরেজি বাক্য তৈরি করছি মনে মনে। এসময় তিনজনের একজন জানতে চাইলো-
            “হোয়াট ডু ইউ লাইক?”
            আঙুল দিয়ে ভাত দেখাতেই ঝটপট এক প্লেট ভাত বেড়ে দিল।
            “এনিথিং এল্‌স?”
            শুধু ভাত খাবো কীভাবে? তরকারির দিকে চোখ দিলাম। নানারকম শাক-পাতা, ডাল, সব্‌জি আছে শোকেসের ভেতর। আমার চোখ তরকারির চেয়েও তরকারির দামের দিকে। সবচেয়ে কমদামী যেটা চোখে পড়লো সেটা ডাল। এক বাটি তিন ডলার। সাত ডলার মানে দু’শ টাকার ডাল-ভাত। খুব যে তৃপ্তি করে খেলাম তা নয়। ডালে মনে হয় লবণের বদলে চিনি দিয়েছে। গোপাল্‌সে আর কোনদিন ঢুকছি না।
            হোটেলে এসে আলী সাহেবের কথা মনে হলো। হুমায়রা আপা ঠিকানা দিয়েছিলেন। কিন্তু ফোন নম্বরটা দিতে পারেন নি। টেলিফোন ডাইরেক্টরি দেখে নম্বর বের করতে খুব একটা অসুবিধা হলো না। পারিবারিক নাম অনুসারে সাজানো ঢাউস টেলিফোন ডাইরেক্টরিতে অনেকগুলো আলী। আলী ডি আছেন বেশ কয়েকজন। ঠিকানা মিলিয়ে মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে ফোন করলাম।
                “গুড ইভনিং”
                ইংরেজি শুনে একটু নার্ভাস হয়ে গেলাম। এমনিতেই আমি অপরিচিত মানুষের সাথে সহজে কথা বলতে পারি না। সেখানে ইংরেজি বলছেন। আমারও কি ইংরেজি বলা উচিত? কাঁপা কাঁপা গলায় কোন রকমে জানতে চাইলগ- “ক্যান আই স্পিক টু মিস্টার আলী প্লিজ!”
                “স্পিকিং। হু ইজ দিস?”
                “স্লামাইকুম, আমার নাম প্রদীপ। বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আপনার ঠিকানা পেয়েছি আমার একজন কলিগের কাছ থেকে”
                “আপনি কোথায় আছেন এখন?”
                হোটেলের নাম ঠিকানা বললাম। আলী সাহেব বললেন টেলিফোন নম্বরটা দিতে। হোটেলের রসিদ থেকে টেলিফোন নম্বরটা দিতেই লাইন কেটে গেল। কী করবো বুঝতে পারছি না। আমার কি উচিত আবার টেলিফোন করা? কথার মাঝখানে লাইন কেটে গেলে কী করতে হয়? দেশে থাকতে তো টেলিফোন ব্যবহার করিনি তেমন একটা। টেলিফোন-কার্টিসি নামে কিছু যদি থাকে তা আমার জানা নেই। আলী সাহেবের মনে আমার ভদ্রতা সম্পর্কে সন্দেহ জাগার আগেই আমার উচিত আবার ফোন করা। ভাবতে ভাবতে রিসিভারের দিকে হাত বাড়াতেই টেলিফোন বেজে উঠলো। ওপাশে আলী সাহেব।
                “আপনি হোটেলের টেলিফোন নম্বর না দিয়ে ফ্যাক্স নম্বর দিয়েছেন”
            এবার বোঝ আমার অবস্থা। আমি যে একটা খ্যাৎ - তা কিছুতেই গোপন রাখা গেল না। আলী সাহেব বর্ণনা দিচ্ছেন কীভাবে তাঁকে ইয়েলো পেইজ থেকে হোটেলের ফোন নম্বর নিয়ে ফোন করতে হয়েছে। শুনতে শুনতে আমি সংকুচিত হয়ে যাচ্ছি। ইয়েলো পেইজ বস্তুটা কী তা জানি না। আলী সাহেব দ্রুত বলে যাচ্ছেন অনেককিছু-
            “আপনি কি একা এসেছেন, নাকি পরিবার নিয়ে এসেছেন?”
            “আমি একা”।
            “কোন্‌ ইউনিতে?”
            “ইউনিট মানে?”
            “আই মিন হুইচ ইউনিভার্সিটি?”
            ইউনিভার্সিটিকে যে এখানে ইউনি বলে তাও তো জানতাম না। বললাম “মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটি”।
            “মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটি মানে- দি ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্ন?”
            “জ্বি স্যার”।
            “গুড, ভেরি গুড। খুব ভাল, খুব ভাল। কিন্তু খরচ তো অনেক ওখানে। এনিওয়ে- ভেরি গুড, ভেরি গুড। খুব ভাল লাগলো। হোটেলে কোন অসুবিধা হচ্ছে না তো?”
            “জ্বি না স্যার”।
            “আপনি আমার মোবাইল নম্বরটা লিখে রাখেন। দিনের বেলা যদি দরকার হয় ওটাতে ফোন করবেন”।
            “ঠিক আছে স্যার”। আমি নম্বরটা লিখে নিলাম।
            “ওকে। আই উইল মিট ইউ অন মানডে। আই উইল কল ইউ বিফোর দ্যাট। ওকে? গুড নাইট”।
            “গুড নাইট স্যার”।
            মিশ্র একটা অনুভূতি হচ্ছে। আলী সাহেবকে বিরক্ত করা কি ঠিক হয়েছে? বুঝতে পারছি না। মনে হচ্ছে বেশ রাশভারী মানুষ। সোমবার তাঁর সাথে দেখা হলে কী বলবো ভেবে এখনি টেনশান হচ্ছে। উট্‌কো ঝামেলা মনে করবেন না তো আবার! জানি না। সোমবারেরটা সোমবারে দেখা যাবে। জ্যাকেটটা আবার গায়ে জড়িয়ে বেরিয়ে পড়লাম।  
            শুক্রবারের সন্ধ্যা বলেই রাস্তায় খুব ভীড়। গুঁটি গুঁটি বৃষ্টি হচ্ছে। কনকনে ঠান্ডা বাতাস। বাংলাদেশে একটা সোয়েটার পরেই পুরো শীতকাল কাটিয়ে দিয়েছি। অথচ এখানে উদয়দার দেয়া কাশ্মিরী সোয়েটারের উপর হকার্স মার্কেট থেকে কেনা জ্যাকেট পরেছি। গলায় মাফলার জড়িয়েছি- তারপরও ঠান্ডায় কাবু হয়ে যাচ্ছি।
                লিটল কলিন্স স্ট্রিট ধরে হাঁটতে হাঁটতে রাসেল স্ট্রিটে এলাম। এদিকে মানুষের ভীড় আরো বেশি। রাস্তার দু’পাশে সারি সারি রেস্টুরেন্ট আর মদের দোকান। এই কনকনে ঠান্ডার মধ্যেও অনেক মেয়েকে দেখা যাচ্ছে নাম-মাত্র পোশাকে ঘুরে বেড়াচ্ছে, টিপটিপ বৃষ্টি উপেক্ষা করে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছে। একটু সামনে গেলেই গ্রেটার ইউনিয়ন সিনেমা হলের বারান্দার সিঁড়িতে বসে আড্ডা দিচ্ছে অনেকগুলো ছেলেমেয়ে। বেশ কয়েকজোড়া ছেলেমেয়েকে দেখলাম খুব ঘনিষ্ঠভাবে চুমুখাচ্ছে। ছেলে-মেয়েদের এত বেশি ঘনিষ্ঠতা অস্ট্রেলিয়ানদের জন্য স্বাভাবিক। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে দেখলাম অনেক চায়নিজ ছেলেমেয়েও অস্ট্রেলিয়ান কায়দা রপ্ত করে ফেলেছে। বৃষ্টির ফোঁটা বড় হচ্ছে ক্রমশ। একটা বড় ‘নিউজ এজেন্ট’ দেখে ঢুকে পড়লাম।
                হাজার রকমের সংবাদপত্র আর ম্যাগাজিনে ভর্তি এই নিউজ-এজেন্ট। অফিস স্টেশনারি, নানারকম বইপত্র, ফোনকার্ড, শুকনো খাবার- সব আছে এখানে। এক পাশে ফ্রিজভর্তি নানারকম পানীয়ও দেখা যাচ্ছে। জিনিসপত্রের যা দাম- তাতে মনে হচ্ছে এ কোন দেশে এলাম! একটি ছোট পাউরুটির দাম এক ডলার- মানে ত্রিশ টাকা!
                দোকানের শেষের সারির দেয়ালে ছোট আরেকটি দরজা। প্রবেশ পথে লেখা আছে 18+ মানে প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য। কৌতূহল হল। ঢুকে দেখি সামনের অংশের চেয়ে অন্তঃত দশগুণ বড় জায়গা নিয়ে বিশাল সমারোহ। সারি সারি তাকভর্তি হাজার রকমের পর্ণোগ্রাফিক ম্যাগাজিন। আমার ভীষণ লজ্জা লাগছে। মনে হচ্ছে সবাই দেখছে আমাকে। প্রচুর ভীড়, অসংখ্য নারী-পুরুষ নির্বিকার ভাবে ম্যাগাজিন উল্টাচ্ছে। ম্যাগাজিন ছাড়াও নানারকম অ্যাডাল্ট জিনিসপত্রে ঠাসা কাউন্টার। ক্রেতাদের ভীড় সামলাচ্ছে দু’জন তরুণী। নানা বয়সের নারী-পুরুষ তাদের নানারকম গোপন আগ্রহের রসদ কিনে নিয়ে যাচ্ছে। এদের এই ব্যবস্থাটিকে ঠিক কী বলবো বুঝতে পারছি না- বিকৃতি, নাকি জাস্ট ভিন্নতা? যাই হোক- আমার নিজস্ব রুচিবোধ কিংবা সংস্কার আমাকে ঠেলে নিয়ে এলো বাইরে।
                বৃষ্টি কমে গেছে, ফুটপাতে ভীড় বেড়েছে আরো। সিনেমা হলের সামনে বীয়ারের বোতল হাতে নানারকম উল্কি আঁকা তরুণদের দেখে কেমন যেন একটু ভয় ভয় লাগছে। কোন রকমে তাদের পাশ দিয়ে চলে আসছি- হঠাৎ প্রচন্ড ধাক্কা। ছিটকে পড়ে গেলাম ফুটপাত থেকে রাস্তায়। অগভীর নালার পানিতে ডুবে গেছে আমার বাম হাঁটু। চশমা ছিটকে পড়েছে একটু দূরে। না, ভাঙেনি। চোখ তুলে তাকালাম। দু’তিনজন অস্ট্রেলিয়ান তরুণ বিয়ারের বোতল হাতে মারমুখী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের কানে দুল, বাহুতে উল্কি, মাথার চুল সজারুর কাঁটার মত খাড়া খাড়া। একজন বাম হাতের মধ্যমা উঁচু করে হো হো করে হাসছে। বড় অশ্লীল সে হাসি।
            “আর ইউ ওকে?” বলতে বলতে আমার হাত ধরে টেনে তুললো একজন প্রায়-বস্ত্রহীন তরুণী। তাকে কোনরকমে ধন্যবাদ জানিয়ে দ্রুত হাঁটতে শুরু করলাম হোটেলের দিকে। কেমন যেন লাগছে। মেলবোর্নে আসার দু’দিনের মধ্যেই এরকম একটা ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। যারা আমাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছে তাদের চোখেমুখে ঘৃণা স্পষ্ট। এটা কি আমার গায়ের রঙের কারণে? আবার যে মেয়েটি আমাকে টেনে তুললো- সেও শ্বেতাঙ্গিনী। তার চোখে তো ঘৃণা ছিল না এক ফোঁটাও, ছিল এক ধরণের মমতা। বুঝতে পারছি না- মেলবোর্ন শহর কি আমার আপন হবে কখনো? বাম হাঁটু আর দুই কনুই থেকে রক্ত বের হচ্ছে। চোখ জ্বালা করছে। তুমি কি বুঝতে পারছো আমার কেমন লাগছে?

____________


Wednesday, 27 March 2019

ইয়ারার তীরে মেলবোর্ন - তৃতীয় পর্ব


০৯ জুলাই ১৯৯৮ বৃহস্পতিবার
ভিক্টোরিয়া ভিস্‌তা হোটেল

ঢং ঢং ঢং। খুব কাছেই কোন গীর্জার ঘন্টাধ্বনি। রাত বারোটা বাজলো মেলবোর্নে। তোমার সাথে এখন আমার সময়ের দূরত্ব চার ঘন্টা, আর ভৌগোলিক দূরত্ব এক মহাদেশ। আজ একদিনেই যেন সবকিছু অন্যরকম হয়ে গেছে। সকালে সিডনি এয়ারপোর্টে যখন নামলাম তখন আমার ঘড়িতে রাত ৩টা ২০ আর সিডনিতে সকাল ৭টা ২০। সময় হঠাৎ করেই এগিয়ে গেলো চার ঘন্টা। প্লেন থেকে নামার সময় শুধুমাত্র পাসপোর্ট আর টিকেট হাতে নিয়েই নেমে পড়েছি। কেবিন ব্যাগ কেবিনেই রয়ে গেছে। নামার সময় মেলবোর্নের ট্রানজিট কার্ড দিয়েছে একটি। সুন্দর প্লাস্টিকের কার্ড।
            সিডনি এয়ারপোর্টটা বেশ বড়। এয়ারপোর্টের  বিভিন্ন জায়গায় সুন্দর বুক-স্ট্যান্ডে সিডনির সিটিগাইড সাজিয়ে রাখা আছে। স্ট্যান্ডের মাথায় বড় করে লেখা- প্লিজ টেক ওয়ান। নিলাম একটা। সিডনি শহরের ম্যাপ সহ যাবতীয় তথ্য আছে এই গাইডে। ট্যুরিস্টদের জন্য কত সুন্দর ব্যবস্থা। ৫৩ নম্বর গেট দিয়ে প্লেনে উঠতে হবে আমাকে। শুরুতেই গেটটা খুঁজে বের করলাম। ট্রানজিট কার্ড হাতে গেটের কাছে ঘোরাঘুরি করছি দেখে থাই এয়ারলাইন্‌সের একজন বললেন- বোর্ডিং শুরু হবে ন’টায়। তার মানে দেড় ঘন্টার মত সময় হাতে আছে। একটু ঘুরে দেখা যাক।
            এত সকালেও প্রচন্ড ব্যস্ত এই এয়ারপোর্ট। এয়ারপোর্টের ভেতর ঝলমলে সব দোকানপাট। বিশাল বইয়ের দোকান দেখে অবাক হয়ে গেলাম। প্লেনে পড়ার জন্য অনেকেই বই কিনছেন। দোকানে যত খুশি যতক্ষণ খুশি বই নাড়াচাড়া করা যায়। আমার দৃষ্টি ঘুরছে এখান থেকে ওখানে। প্রচুর চায়নিজ দেখা যাচ্ছে এখানে। হবে নাই বা কেন। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ছয় ভাগের এক ভাগ চায়নিজ। সে হিসেবে অবশ্য সমান সংখ্যক ইন্ডিয়ান থাকারও দরকার ছিল। কিন্তু ভারতীয়রা মনে হয় এখনো সেভাবে আসতে শুরু করে নি।
            অনেক ডিউটি ফ্রি শপ এখানে। এদিক সেদিক ঘুরে দোকান পাটে ঢু মেরে বই ম্যাগাজিন উল্টিয়ে সময় কাটালাম। বই এর দোকানে বেস্টসেলার বইগুলো সাজানো আছে একটা শেল্‌ফে। সেখানে আমার পাশে দাঁড়িয়ে বই দেখছে একজোড়া তরুণ-তরুণী। হঠাৎ তারা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে শুরু করলো।  আমার প্রথম সাংস্কৃতিক ধাক্কা।
            ন’টা বেজে গেছে। আস্তে আস্তে ৫৩ নম্বর গেটের দিকে এগিয়ে গেলাম। গেটে দাঁড়িয়ে একজন পেটমোটা অফিসার যাত্রীদের নামের তালিকা মিলিয়ে নিচ্ছেন। কম্পিউটার প্রিন্ট-আউটে নিজের নাম দেখে ভালো লাগলো। এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ প্লেন ছাড়ার আগেই যাত্রীদের নামের তালিকা পাঠিয়ে দেয় সংশ্লিষ্ট এয়ারপোর্টে। একটা রুটিন কাজ। তবুও আনন্দ হলো। শিশুতোষ ভালো লাগা।
            আবার একই প্লেন, একই সিট। তেমন কিছুই বদলায়নি। আমার ব্যাগদুটো যেখানে রেখে গিয়েছিলাম সেখানেই আছে। শুধু পাশের খালি সিটে একজন নতুন যাত্রী উঠেছেন। আর এয়ার হোস্টেজরা সব বদলে গেছে। আরেক ঝাঁক নতুন মুখ। আবার আকাশে ওড়া। একটু পরেই আবার খাদ্য সরবরাহ। প্রাতঃরাশ। এখানে দশটা বেজে গেলেও আমার বায়োলজিক্যাল ক্লকে এখনো সকাল ছ’টা। খেতে পারলাম না কিছুই। হয়তো একটু টেনশানও হচ্ছে। মনে হচ্ছে- মেলবোর্ন তো এসে গেলাম। এবার যে কাজে এসেছি পারবো তো তা শেষ করতে? আমি পারবো তো?
                ১১টা ১৫ মিনিটে প্লেন এসে নামলো মেলবোর্ন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে। ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে আস্তে আস্তে নেমে এলাম প্লেন থেকে। ইমিগ্রেশানের দিকে এগোবার পথে জমজমাট ডিউটি ফ্রি শপ। আর একটু পর পরই ‘ওয়েলকাম টু মেলবোর্ন’ লেখা নিয়ন সাইনের পাশে সাজিয়ে রাখা মেলবোর্ন ভিজিটর্‌স গাইড।
                হাতে পাসপোর্ট আর কাস্টম্‌স ডিক্লারেশান ফরম, কাঁধে দুটো ব্যাগ আর হৃৎপিন্ডের কিছুটা দ্রুত স্পন্দন নিয়ে ইমিগ্রেশানের লাইনে এসে দাঁড়ালাম। অনেকগুলো কাউন্টার। আমি যে লাইনে দাঁড়িয়েছি সে অফিসারটি দাড়িওয়ালা অস্ট্রেলিয়ান। সবাইকে বেশ জেরা করছেন। এত জেরা করছে কেন? আমাকেও কি এতগুলো প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে? অন্য লাইনে চলে যাবো কিনা ভাবছি- এসময় ডাক পড়লো আমার। পাসপোর্ট আর কাস্টম্‌স ফরম এগিয়ে দিলাম।
                “এনিথিং টু ডিক্লেয়ার?”
                “নো”
                “এনি ফুড আইটেম?”
                “নো”
                আমার পাসপোর্ট খুলে ভিসাটা একটা মেশিনের সামনে ধরলেন, তারপর কম্পিউটারের কয়েকটা বোতাম টিপলেন। ধাম করে একটা সিল লাগালেন পাসপোর্টে।
                “ওয়েলকাম টু অস্ট্রেলিয়া”
                “থ্যাংক ইউ”
                এবার ব্যাগেজ। কনভেয়ার বেল্টের কাছে এসে দাঁড়ালাম। কয়েক শ’ সুটকেস বেল্টের উপর ঘুরছে। মনে হচ্ছে মাটির নিচ থেকে উঠে আসছে একের পর এক নানারকম সুটকেস। যেদিকে চোখ যাচ্ছে কাস্টমস্‌-এর বিরাট বিরাট নোটিশ চোখে পড়ছে “ডিক্লেয়ার ইট, অর ডেস্ট্রয় ইট”। ইংরেজি লেখার পাশাপাশি ছবির মাধ্যমেও দেখানো হচ্ছে যে এখানে খাদ্যদ্রব্য নিয়ে আসা যাবে না। একজন কাস্টম্‌স অফিসার একটা কুকুর নিয়ে ঘুরছেন। কুকুরটি সবার ব্যাগ শুঁকে দেখছে। আমার ব্যাগগুলো শুঁকে নাক ফিরিয়ে নিতেই স্বস্তি পেলাম। ততক্ষণে আমার সুটকেস এসে গেছে বেল্টে। সুটকেসটা টেনে নেয়ার সময় দেখলাম বেল্টের অন্যপাশে দাঁড়িয়ে আছেন ‘বিরক্তি বেগম’। চোখে চোখ পড়তেই তার শ্যামলা মুখটা একেবারে কালো হয়ে গেল। কেন যে তিনি এত বিরক্ত হচ্ছেন কিছুতেই বুঝতে পারছি না।
            একটা ট্রলিতে সবগুলো ব্যাগ চাপিয়ে এগিয়ে গেলাম কাস্টমস এর দিকে। কোন কিছু ডিক্লেয়ার করার নেই। চটপটে মহিলা অফিসার হাতের ফরমটি নিয়ে ব্যাগগুলো স্ক্যানারে চালান করে দিলেন। ছোট ব্যাগগুলো বেরিয়ে এল। বড়টা মেশিনে রেখেই মনিটরে চোখ রাখা দশাসই পুরুষ অফিসার জিজ্ঞেস করলেন ব্যাগে কোন সাবান আছে কিনা। আছে, ছয়টি লাক্স সাবান নিয়ে এসেছি উদয়দা’র পরামর্শে। দাদা সহ কত কসরত করে সুটকেসটি গুছিয়েছি সোমবার রাতে। একজোড়া জুতা ঢুকানো হয়েছে- আর জুতার ভেতর সাবানগুলো। স্ক্যানারে আমার জুতাজোড়াও দেখা যাচ্ছে নিশ্চয়।  অফিসারটির পুরু লাল গোঁফের ফাঁক দিয়ে হাসি দেখা গেলো একটু।  
            সুটকেস বেরিয়ে এলো। ট্রলি নিয়ে একটু এগোতেই হঠাৎ যেন দেয়াল ফাঁক হয়ে দরজা হয়ে গেলো। চমকে উঠলাম আমি। এরকম কিছুর জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। আলিবাবা’র সিসেম ফাঁক এর মতো  মেলবোর্ন এয়ারপোর্টের অটোম্যাটিক দরজা খুলে গেলো আমার জন্য। আমি মেলবোর্নে পা রাখলাম।   
            ট্রলি নিয়ে একটু এগিয়ে যেতেই দেখতে পেলাম অনেক মানুষের ভীড়। কারো কারো হাতে নাম লেখা বোর্ড। আমাকেও রিসিভ করতে আসার কথা ইউনিভার্সিটি থেকে। একটু দূরেই হলুদ একটা বোর্ডে TOGOTO লেখা দেখে বুঝতে পারলাম আমার জন্যই এসেছেন তাঁরা। দু’জন বয়স্ক মহিলা। পরিপাটি দাঁত বের করে অভ্যর্থনার হাসি হাসছেন দু’জনই। কাছে যেতেই দু’জন একসাথে হাত বাড়িয়ে দিলেন আমার দিকে।
                দু’জনের বয়সই ষাটের কাছাকাছি হবে। চুলের লাল রঙ দেখে বোঝার উপায় নেই চুল পেকেছে কিনা। মুখের চামড়া কুঁচকে গেছে, ঠোঁটে গাঢ় লিপিস্টিক, কানে আর গলায় জমকালো গয়না। পুরু ওভারকোট দেখে বোঝা যাচ্ছে এখন শীতকাল। তবে ঠান্ডা লাগছে না একটুও।
                “হ্যাড এ নাইস ফ্লাইট?” হ্যান্ডশেক করতে করতে প্রশ্ন করলেন একজন।
                “ইয়েস, ইয়েস”। আমার সংক্ষিপ্ত উত্তর।
                “ইউ আর মিস্টার ডেব, রাইট?”
                “ইয়েস, ইয়েস”। মনে হচ্ছে ‘ইয়েস’ শব্দটি ছাড়া আর কোন শব্দ আমার জানা নেই।
                “আই এম সুজান, এন্ড সি ইজ লিয়ানা”।
                সুজান হাতে ধরা লিস্টে আমার নামের পাশে একটা টিক চিহ্ন দিয়ে জানালেন আরো দু’জনের আসার কথা ইন্দোনেশিয়া থেকে। তাদের জন্য একটু অপেক্ষা করতে হবে। তাদের প্লেন এসে গেছে, মিনিট দশেকের মধ্যেই তারা এসে পড়বে।
                দশ মিনিট সময় হাতে পাওয়া গেলো। একটা টেলিফোন করা দরকার বাংলাদেশে। এসে পৌঁছানোর খবর না পাওয়া পর্যন্ত দিদিরা উৎকন্ঠায় থাকবে। টেলিফোন কার্ড কেনার কথা মনে হওয়াতে মনে পড়লো অস্ট্রেলিয়ান ডলার নেই আমার কাছে। আসার সময় দিদি একটা আমেরিকান একশ’ ডলারের নোট পকেটে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। জাপানে পাওয়া তার স্কলারশিপ থেকে অনেক কষ্টে বাচানো এই ডলার। মানি এক্সচেঞ্জ থেকে নোটটা ভাঙিয়ে নিলাম। ১৫৪ অস্ট্রেলিয়ান ডলার পাওয়া গেলো। বিশ ডলার দিয়ে একটা ফোন কার্ড কিনলাম। টেলেস্ট্রা ফোন এওয়ে কার্ড।
                ইন্দোনেশিয়ান দু’জন চলে এসেছে। একজন ছেলে ও একজন মেয়ে। কারো বয়সই আঠারো উনিশের বেশি হবে বলে মনে হচ্ছে না। সুজান আর লিয়ানার পিছু পিছু বেরোলাম এয়ারপোর্ট থেকে।  কাচের দরজার বাইরে পা রাখতেই কনকনে ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা এসে কুঁচকে দিলো আমাকে। এমন ঝকঝকে রোদ অথচ এমন বিদ্ঘুটে ঠান্ডা!
                ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে এগিয়ে চলেছি গাড়ি পার্কে। বিশাল এক সাদা গাড়ি নিয়ে এসেছেন সুজান আর লিয়ানা। লিয়ানা ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসলেন। সুজান গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে পেছনে সুটকেস উঠাতে লাগলেন। ইন্দোনেশিয়ান ছেলে-মেয়ে দুটো গাড়িতে উঠে বসলো। তাদের সুটকেস দুটোর সাইজ আমার সুটকেসের দ্বিগুণ হবে। এত বড় সুটকেস গাড়িতে উঠানো সুজানের পক্ষে সম্ভব নয়। হাত লাগালাম। আমার হ্যান্ডব্যাগটা দেখে সুজান জানতে চাইলেন ওটার ভেতর কম্পিঊটার আছে কি না। অবাক হয়ে গেলাম আমি। কম্পিঊটার কি এখন ব্যাগে নিয়ে ঘোরা যায়?
            গাড়িতে বসে সহযাত্রীদের সাথে আলাপ জমাতে চেষ্টা করলাম। তাদের কথ্য-ইংরেজি আমার ইংরেজির চেয়েও খারাপ। ওরা একই দেশ থেকে এলেও কেউ কাউকে চেনে না। দু’জন একই ভাষায় কথা বলে- অথচ এখানে কেউ কারো সাথে কথা বলছে না। আমি আলাদা আলাদা ভাবে কথা বললাম তাদের সাথে। ছেলেটা এসেছে ইংলিশ কোর্স করতে। সুমাত্রা থেকে। থাকবে একটি অস্ট্রেলিয়ান পরিবারের সাথে। পেয়িং গেস্ট। এটাকে নাকি ‘হোম স্টে’ বলা হয় এখানে। মেয়েটি এসেছে জাকার্তা থেকে। ট্রিনিটি কলেজে ফাউন্ডেশান কোর্স করতে। ট্রিনিটি কলেজ কোথায় আমি জানি না। সে থাকবে হোস্টেলে। দু’জনের চেহারাতেই একটু চায়নিজ চায়নিজ ভাব আছে। নাক বোঁচা, রঙ হলুদ।
            গাড়ি চলছে প্রচন্ড গতিতে। বিশাল মসৃণ রাস্তা। সারি সারি গাড়ি দ্রুত বেগে ছুটে চলেছে। দেখতে দেখতে পার হয়ে যাচ্ছে কত দোকান-পাট। একটু পরেই ট্রাম চোখে পড়লো। ইন্দোনেশিয়ান ছেলে-মেয়ে দুটো জানে তারা কোথায় থাকবে। আমি কিন্তু জানিও না আমাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। শুধু জানি ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ আমার দু’সপ্তাহ থাকার ব্যবস্থা করেছে।
            একটু পরে মূল রাস্তা ছেড়ে একটা ছোট রাস্তায় ঢুকে পড়লো গাড়ি। সুন্দর ছিমছাম একতলা সব বাড়ি রাস্তার দু’পাশে। বেশির ভাগ বাড়ির ছাদই টালির। সামনে সুন্দর বাগান, রাস্তার দু’পাশে সারি সারি গাছ। সবকিছু পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি। একটা বাড়ির সামনে গাড়ি থামলো। বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন লাল সোয়েটার পরা একজন সাদা বুড়ি। ‘সাদা বুড়ি’ বলেছি বলে রেগে যাচ্ছো তুমি। ঠিক আছে- শ্বেত বৃদ্ধা। মাথার চুল ধবধবে সাদা। সুজান গাড়ি থেকে নেমে দরজা খুলে দিলেন। ইন্দোনেশিয়ান ছেলেটিকে বললেন এখানেই তার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ছেলেটি চুপচাপ নেমে গেলো। সুটকেস নামানোর দিকে কোন খেয়াল নেই তার। মনে হচ্ছে বড়লোক মা-বাবার সন্তান। নিজের কাজ নিজে করতে অভ্যস্ত হয়নি এখনো। সুজানকে সাহায্য করলাম- সুটকেসটি নামিয়ে দিলাম। গাড়িতে উঠে জানালা দিয়ে দেখলাম শ্বেত বৃদ্ধা প্রাণপনে টেনে নিয়ে যাচ্ছে বিশাল সুটকেস আর তার পেছন পেছন চলেছে সুমাত্রা থেকে আসা ইন্দোনেশিয়ান তরুণ।
            গাড়ি আবার চলতে শুরু করেছে। একটু আগেও আকাশ নীল ছিলো, ঝলমলে রোদ ছিলো। এখন হঠাৎ আকাশের মুখ গোমড়া হতে হতে কুচকুচে কালো হয়ে গেলো। মিনিট খানেকের মধ্যেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো। প্রথমে টিপটিপ- একটু পরেই ঝুম ঝুম।  
            মেলবোর্ন শহরে এসে গেছি। বিশাল বিশাল বিল্ডিং রাস্তার দু’পাশে। শহরের রাস্তা যে এত বড় হতে পারে ধারণা ছিল না। একটু পরে একটা বাড়ির সামনে থামলো গাড়ি। রাস্তার নাম চোখে পড়ল- ব্যুভেরি স্ট্রিট। বৃষ্টি কিছুটা কমেছে, কিন্তু থামেনি এখনো। গাড়ির দরজা আবার খুলে গেলো। এখানেই কি থাকার ব্যবস্থা আমার? না, সুজান তার হাসিমুখ বাড়িয়ে বললেন, “ইট্‌স ইওর হোস্টেল জুন”। মেয়েটির নাম তাহলে জুন। জুন নেমে গেলো। গাড়ি আবার চলতে শুরু করলো। চোখে পড়লো সোয়ান্সটন স্ট্রিট, কিছুদূর গিয়ে রাস্তার বামপাশে রয়েল মেলবোর্ন ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি’র বিশাল বিল্ডিং। বিল্ডিং এর গায়ে জ্বলজ্বল করছে ‘আর-এম-আই-টি’।
            খুব আস্তে আস্তে চলছে গাড়ি। ট্রাম চলছে পাশাপাশি। ট্রাম থামলে গাড়িও থেমে যাচ্ছে। কিছুদূর গিয়ে গাড়ি কলিন স্ট্রিটে ঢুকে গেলো। আমি রাস্তার নাম পড়ছি। একটু পরেই রাসেল স্ট্রিটে ডানে মোড় নিলো। আবার ডানে ঢুকে গেলো। লিটল কলিন স্ট্রিট। ছোট্ট একটা গলি। ওয়ান ওয়ে বলে রক্ষা। গাড়ি থেমে গেলো একটা দালানের বারান্দায়- ‘ভিক্টোরিয়া ভিস্‌তা হোটেল’।
            সুটকেস আর ব্যাগ নিয়ে নেমে গেলাম। হোটেলের কাচের দরজা খুলে গেল আপনা-আপনি। আবার বিস্ময়ের পালা আমার। স্বয়ংক্রিয় দরজার সুবিধা অনেক। দু’হাতে ব্যাগ নিয়ে ঢুকতে কোন সমস্যা হয় না। সুজান কাউন্টারে গিয়ে রিসেপশানিস্টকে বললেন, “ইট্‌স প্রাডিব ফ্রম ব্যাংলাডেশ। উই হ্যাভ আ রিজার্ভেশান ফর হিম”। চটপটে মেয়েটি কম্পিউটারের পর্দায় খুঁজতে লাগলো আমাকে। সুজান আমার দিকে তাকিয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে বললেন, “দে উইল টেক কেয়ার অব ইউ। হ্যাভ আ নাইস টাইম”। দ্রুত চলে গেলেন সুজান।
            “ক্যান আই সি ইওর পাসপোর্ট প্লিজ”
            হোটেলে পাসপোর্ট কী কারণে দেখাতে হবে বুঝতে পারলাম না। কিন্তু জিজ্ঞেস করে দেখার মত ইংরেজি আমার ঘটে নেই। পাসপোর্ট এগিয়ে দিলাম। মেয়েটি পাসপোর্ট খুলে দেখলো আমি আসলেই আমি কিনা। সন্তুষ্ট হয়ে পাসপোর্ট ফেরত দিয়ে বললো, “তোমার নামে একটি রুম বুক করা হয়েছে দু’সপ্তাহের জন্য। দু’সপ্তাহের ভাড়া ৪২২ ডলার। তুমি কি ক্যাশ দেবে নাকি ক্রেডিট কার্ড?”
            বিরাট একটা ধাক্কা খেলাম আবার। ভেবেছিলাম ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ আমার দু’সপ্তাহের থাকার ব্যবস্থা করবে- মানে আমাকে কোন টাকা-পয়সা দিতে হবে না। এখনতো হোটেল ভাড়া দিতেই ফতুর হয়ে যাব আমি। প্রতিরাতের ভাড়া ৩০ ডলার করে হলে  ৪২০ ডলার হয়। আরো দু’ডলার কী কারণে দিতে হচ্ছে জানি না। ট্রাভেলার্স চেক ভাঙাতে হলো। কিছু অস্ট্রেলিয়ান নোট আর কয়েন ফেরৎ পাওয়া গেল। এবার একটা ফরমে সাইন করতে হলো। রুমের চাবি এগিয়ে দিয়ে মেয়েটি হাসিমুখে বললো, “রুম নাম্বার টু হান্ড্রেড এন্ড সিক্সটি ফাইভ- টেক দি এলিভেটর অন ইওর রাইট। ডায়াল নাইন ইফ ইউ নিড এনিথিং”।
            ব্যাগ টানতে টানতে কাহিল হয়ে গেছি। ঢাকা চট্টগ্রামের হোটেলে দেখেছি ব্যাগ নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু করে হোটেলের কর্মচারীরা, কার আগে কে নিয়ে যাবে। আর এখানে- রিসেপশানের মেয়েটি ছাড়া দ্বিতীয় কোন কর্মচারী চোখে পড়ল না। লিফ্‌টেও কোন লিফ্‌টস-ম্যান নেই। একটু নার্ভাস লাগলেও কোন সমস্যা হলো না। সেকেন্ড ফ্লোরের বোতাম টিপতেই লিফ্‌টের দরজা বন্ধ হয়ে গেল- একটু পরেই দোতলায়। রুম খুঁজে পেতে দেরি হলো না।
            ছোট্ট একটা রুম। একটা সিংগেল বিছানা। একপাশে টেবিল-চেয়ার। জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকালাম। বৃষ্টি হচ্ছে এখনো। জানালার পাশে একটা বেসিনও আছে। ঘরের একটা কোণ জুড়ে ওয়াড্রোব। নিচু টেবিলের উপর ইলেকট্রিক কেতলি, চা-কফি ও চিনির অনেকগুলো ছোট ছোট প্যাকেট। এক প্যাকেট দুধও আছে। সবকিছু আছে কিন্তু বাথরুম নেই। বাংলাদেশে ফকিরাপুলের একশ’ টাকা ভাড়ার একেবারে নিম্নমানের হোটেলেও এটাস্টড বাথরুম থাকে। অথচ এখানে রাত প্রতি প্রায় নয়শ’ টাকা ভাড়া দিয়েও রুমের ভেতর বাথরুম নেই! হতাশ হয়ে গেলাম। রুমের চাবির সাথে দেয়া অন্য চাবির গায়ে লেখা আছে ‘বাথরুম’।
            রুমের বাইরে লম্বা করিডোর পেরিয়ে ডানদিকে গেলে তালাবদ্ধ বাথরুম। ভেতরে দুটো টয়লেট আর দুটো শাওয়ার। কতজন মানুষের জন্য এ ব্যবস্থা জানি না। টয়লেটে পানির ব্যবস্থা নেই। শুধু টয়লেট পেপার। যস্মিন দেশে যদাচার।
            রুমে এসে বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করার সাথে সাথে মনে হলো সারাঘর দুলছে। ভূমিকম্প নাকি? দ্রুত উঠে বসলাম। ভূমিকম্প নয়। শোয়ার সাথে সাথে আবার দুলুনি। প্লেনের গতিজড়তা মাথার ভেতর রয়ে গেছে। রয়ে গেছে আরো সব স্মৃতি- যা এক এক করে আসতে শুরু করেছে। বুকের ভেতরটা কেমন যেন খালি খালি লাগছে। এই বিশাল শহরে আমি এখনো কাউকে চিনিনা।
            কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না, হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো টেলিফোনের শব্দে। বিছানার পাশেই টেলিফোন। আমাকে কে টেলিফোন করবে এখানে? আমার হোটেলের নম্বারতো কারো জানার কথা নয়। ধরবো কি ধরবো না করতে করতে রিসিভার তুলে ‘হ্যালো’ বলতেই শোনা গেল- “ক্যান আই স্পিক টু মিস্টার প্র্যাডিব কিউমার ড্যাব?”
            আমি অবাক হয়ে গেলাম। আমার নামের যে এরকম উচ্চারণও হতে পারে কখনো ভাবিনি। আমাকে কে চাইতে পারে? উচ্চারণ শুনে মনে হচ্ছে অবাঙালি কেউ। ভাঙা ভাঙা উচ্চারণ। সুতরাং ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ ইংরেজি নয়। বললাম, “ইয়েস। প্রদীপ স্পিকিং”
            তার নাম পিটার। মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটি তাকে দায়িত্ব দিয়েছে আমাকে ক্যাম্পাস ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য। জানতে চাচ্ছে আমি তাকে আগামীকাল সময় দিতে পারবো কি না। না পারার কোন কারণ নেই। কথা হলো কাল দুপুর দুটোয় দেখা হবে তার সাথে- ইউনিভার্সিটিতে।
            ক্যাম্পাসটি কোথায় আমি এখনো জানি না। কীভাবে যাবো- কতদূরে- পিটারকে আমি কীভাবে চিনবো এসব কিছুই বলেনি পিটার। ফোন রেখে দিলো। আমার উঠে বসার শক্তি নেই। চব্বিশ ঘন্টার জার্নিতে কাহিল হয়ে গেছি। আবার ঘুমিয়ে পড়লাম।
            যখন জেগে উঠলাম- ঘুটঘুটে অন্ধকার। লাইট জ্বেলে ঘড়ি দেখে চমকে উঠলাম। এগারোটা বেজে গেছে। এতক্ষণ ঘুমিয়েছি! বাংলাদেশে এখন সন্ধ্যা সাতটা। দু’দিন আগেও এই সময়টাতে আমি মামামের কাছে থাকতাম। মনে হচ্ছে কতদিন কথা হয় না কারো সাথে। অথচ মাত্র ছত্রিশ ঘন্টা কেটেছে।
            ফোন করা দরকার। ফোন কার্ড কীভাবে ব্যবহার করতে হয় জানি না। তবে শিখে নিতে দেরি হলো না। কার্ডে একটা ফোন নাম্বার দেয়া আছে। রুমের ফোন থেকে ওই নম্বরে ফোন করলাম। ওপাশে ইলেকট্রনিক নারী কন্ঠঃ
            “ফর ইংলিশ প্রেস ওয়ান”। বলেই অন্য কয়েকটি ভাষায় ইনস্ট্রাকশান শুরু হলো। বাংলা আছে কিনা দেখার জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। না, বাংলা নেই। একটু পরে আবার ইংরেজি শোনা গেল। তাড়াতাড়ি ‘1’ টেপার পর বলা হলো বারো ডিজিটের পিন নাম্বার প্রেস করতে। করার পর বললো কার্ডে বিশ ডলার ব্যালেন্স আছে।
            দিদিভাইরা এখনো ঢাকা থেকে ফিরেনি। তার বাসায় ফোন করে কাউকে পাবো না। অজিতের নাম্বারে ডায়াল করলাম। যান্ত্রিক নারীকন্ঠ জানালো- যে ব্যালেন্স আমার আছে তাতে পনের মিনিট কথা বলতে পারবো। একটু পরেই ওপ্রান্তে অজিত। সে হোটেলের নম্বরটা জেনে নিয়েই লাইন কেটে দিলো।
            একটু পরে সে-ই ফোন করলো। অনেকক্ষণ কথা হলো। আমি কেমন আছি কোথায় আছি জেনে নিয়ে দিদিদের জানাবে। অজিতের কাছে আমার ঋণ বাড়ছে তো বাড়ছেই।
            সকালে প্লেন থেকে নামার পর আর কিছুই খাওয়া হয়নি। কিন্তু এতরাতে খাবার কোথায় পাবো? পেটে প্রচন্ড ক্ষুধা। পরশু রাতে এসময় কস্তুরী রেস্তোঁরায় ডিনারের আয়োজন করেছিল অজিত। মাছ মাংস পোলাওয়ের সমারোহ আর তার আতিথেয়তায় অস্থির হয়ে উঠেছিলাম। অথচ এখন খাদ্যের মধ্যে আছে মাত্র একশ মিলিলিটার দুধ। তুমি জানো দুধ খেতে আমার ভালো লাগে না। কিন্তু আর কিছুই যে নেই।
_____________



Latest Post

চিকিৎসাবিজ্ঞানে যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তা

  ধীরে ধীরে চোখের আলো নিভে আসছিলো রিস হিবার্টের। পৃথিবীর আলো দেখার আশা ছেড়েই দিতে হয়েছিল তাঁকে। দু’বছর আগেও বেশ সুস্থ স্বাভাবিক ছিলেন তিনি। ...

Popular Posts