Wednesday 30 June 2021

থার্মোমিটার

 


বিজ্ঞানের একেবারে মৌলিক শাখা হলো পদার্থবিজ্ঞান। বিজ্ঞানের এমন কোন শাখা নেই যেখানে পদার্থবিজ্ঞানের ভূমিকাকে গৌণ করা যায়। মানুষের রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় পদার্থবিজ্ঞানের অবদান অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। সবচেয়ে সরল যে যন্ত্রটি রোগ নির্ণয়ে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় তার নাম - থার্মোমিটার। মানুষের শরীরের স্বাভাবিক কাজকর্ম বাধাগ্রস্ত হলে শরীরের তাপমাত্রার পরিবর্তন ঘটে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ধরা হয় ৯৮.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শিশুদের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা এর চেয়ে কিছুটা বেশি থাকে। শরীরের তাপমাত্রা ৯৯ বা ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট হয়ে গেলে আমরা অনেক সময় খুব বিচলিত হয়ে পড়ি। কিন্তু ডাক্তাররা তিন মাসের কম বয়সী শিশুদের শরীরের তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট কিংবা তিন মাসের বেশি বয়সী শিশুদের শরীরের তাপমাত্রা ১০১ ডিগ্রি ফারেনহাইট হলেও তাকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেন। ডাক্তাররা জানেন যে শরীরের তাপমাত্রার পরিবর্তনটা রোগ নয় বটে, কিন্তু অন্য কোন রোগের কারণ। রোগের কারণ শনাক্ত করার জন্য ডাক্তাররা আগে দেখে নেন শরীরের তাপমাত্রার কোন অস্বাভাবিক পরিবর্তন হয়েছে কি না।

মানুষ তাপ ও তাপমাত্রা মাপার চেষ্টা শুরু করেছিল হাজার বছর আগে। আজ থেকে ১৮৫০ বছর আগে ১৭০ খ্রিস্টাব্দে গ্রিক বিজ্ঞানী গ্যালেন সর্বপ্রথম থার্মোমিটার তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাপ কী, কেন তাপমাত্রার পরিবর্তন ঘটে ইত্যাদি মৌলিক বিষয় সম্পর্কে সঠিক ধারণা ছিল না তখন কারো। তার পরের প্রায় দেড় হাজার বছরে তাপমাত্রা মাপার ব্যাপারে তেমন কোন অগ্রগতি হয়নি। স্পর্শের মাধ্যমে তাপমাত্রার তারতম্য নির্ণয় করা গেলেও - তাপমাত্রার সঠিক পরিমাপের কোন কার্যকর পদ্ধতি আবিষ্কার করা যায়নি ১৫৯৩ সাল পর্যন্ত। সেসময় গ্যালিলিও তাপমাত্রা বাড়লে বাতাসের আয়তন বেড়ে যাবার ধর্মকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করলেন এক ধরনের বাতাস-ভর্তি থার্মোস্কোপ। এটা দিয়ে বাতাসের তাপমাত্রার বাড়া-কমা পর্যবেক্ষণ করা যায়, কিন্তু তাপমাত্রার সঠিক পরিমাপ করা গেলো না। আসলে তখনো তাপমাত্রার কোন একক নির্ধারিত হয়নি।

১৬১২ সালে আরেকজন ইতালিয়ান বিজ্ঞানী সান্তোরিও সান্তোরিও থার্মোস্কোপের সাথে একটি আনুপাতিক স্কেল যোগ করে মানুষের শরীরের তাপমাত্রা পরিমাপ করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এর প্রায় চল্লিশ বছর পর ১৬৫৪ সালে ইতালির তাসকানির গ্রান্ড ডিউক - দ্বিতীয় ফার্দিনান্দ প্রথম একটি থার্মোমিটার তৈরি করেন যার মূল গঠন ও কার্যপ্রণালী আধুনিক থার্মোমিটারের মতো। তাপ দিলে এলকোহলের আয়তন বেড়ে যায়। এলকোহলের এই ধর্মকে কাজে লাগিয়ে তিনি একটি কাচের চোঙের মধ্যে এলকোহল রেখে - তাপমাত্রার পরিবর্তনের সাথে এলকোহলের আয়তনের পরিবর্তনের হারকে তাপমাত্রা মাপার কাজে লাগান। তিনি এলকোহলের চোঙায় ৫০টি সমান দাগ দিয়ে তাপমাত্রার এককের নাম দেন 'ডিগ্রি'। কিন্তু কোন নির্দিষ্ট তাপমাত্রার সাথে এই 'ডিগ্রি'র সমন্বয় না থাকার কারণে ফার্দিনান্দের থার্মোমিটারে তাপমাত্রার পরিমাপ ছিল অনুমান নির্ভর।

এর দশ বছর পর ১৬৬৪ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী রবার্ট হুক থার্মোমিটারে শূন্য ডিগ্রি'র প্রচলন শুরু করেন। যে তাপমাত্রায় পানি জমাট বেঁধে বরফে পরিণত হয় সেই তাপমাত্রাকে শূন্য ডিগ্রি ধরে নিয়ে তিনি থার্মোমিটারের এলকোহলের আয়তনকে সমান ৫০০ ভাগে ভাগ করে শূন্য থেকে ৫০০ ডিগ্রি পর্যন্ত তাপমাত্রা মাপার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু তখনো 'ডিগ্রি' বলতে ঠিক কতটুকু তাপমাত্রা - তা নির্দিষ্ট করা যায়নি। ১৭০১ সালে স্যার আইজাক নিউটন একটি থার্মোমিটার তৈরি করেন - যা ছিল সেই সময়ের সবচেয়ে আধুনিক এবং সার্থক থার্মোমিটার। তিনি কাচের সরু নলের মধ্যে কিছু তেল প্রবেশ করিয়ে নলের বাকি অংশ থেকে বাতাস বের করে নলটির দুই মাথা বন্ধ করে দেন। তারপর তিনি থার্মোমিটারের স্কেল তৈরি করেন। পানির জমাটাঙ্ককে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা আর মানুষের শরীরের তাপমাত্রাকে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ধরে নিয়ে এই দুই তাপমাত্রার পার্থক্যকে অনেকগুলি ভাগে ভাগ করেন। বলা যায় প্রথম সার্থক থার্মোমিটার তৈরি হয় স্যার আইজাক নিউটনের হাত দিয়ে।

১৭০২ সালে ডেনমার্কের গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী ওলে রোমার তাপমাত্রার প্রথম 'স্কেল' চালু করেন - যা পরে তাপমাত্রার রোমার স্কেল নামে পরিচিতি লাভ করে। রোমার গলন্ত বরফের তাপমাত্রাকে ৭.৫ ডিগ্রি, আর ফুটন্ত পানির তাপমাত্রাকে ৬০ ডিগ্রি ধরে তাঁর থার্মোমিটার তৈরি করেন। ১৭১৪ সালে জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল গাব্রিয়েল ফারেনহাইট রোমারের স্কেলকে পরিবর্তন করে নতুন স্কেলের প্রবর্তন করেন - যা গত তিন শ বছর ধরে আমরা ব্যবহার করছি - ফারেনহাইট স্কেল। ফারেনহাইট বরফ লবণ ও পানির মিশ্রণের তাপমাত্রাকে ধরেন শূন্য ডিগ্রি ফারেনহাইট, পানির জমাটাঙ্কের তাপমাত্রাকে ধরেন ৩২ ডিগ্রি ফারেনহাইট, আর পানির ফুটনাঙ্কের তাপমাত্রাকে ধরেন ২১২ ডিগ্রি। রোমারের এক ডিগ্রিকে প্রায় চার ভাগ করে ফারেনহাইটের এক ডিগ্রি হিসেব করা হয়েছে। এই ফারেনহাইট স্কেল এখন আর তাপমাত্রার আন্তর্জাতিক স্কেল না হলেও আমেরিকায় এখনো ফারেনহাইট স্কেল ব্যবহৃত হয়। আমরাও জ্বর মাপার জন্য এখনো ফারেনহাইট স্কেল ব্যবহার করি। বিজ্ঞানী ফারেনহাইট সর্বপ্রথম থার্মোমিটারে পারদ ব্যবহার করেন। পারদ স্বাভাবিক কক্ষ-তাপমাত্রায় তরল অবস্থায় থাকে। তাপমাত্রার সামান্য পরিবর্তনেও পারদের আয়তনের পরিবর্তন ঘটে। তার স্বাভাবিক উজ্জ্বলতার কারণে কাচের নলের ভেতর দিয়ে পারদের উঠানামা পরিষ্কারভাবে দেখা যায় বলে থার্মোমিটারের জন্য পারদ খুবই উপযোগী। 

কিন্তু ফারেনহাইট স্কেল ব্যবহারকারীদের জন্য খুব একটা সহজবোধ্য নয়, খুব একটা যুক্তিগ্রাহ্যও নয়। পানি জমে বরফ হয়ে যাওয়ার তাপমাত্রা কেন ৩২ ডিগ্রি হবে, আর গরম হয়ে ফুটতে শুরু করবে কেন ২১২ ডিগ্রিতে? এর কোন সদুত্তর নেই। ১৭৪২ সালে সুইডেনের বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী অ্যান্ডার্স সেলসিয়াস ফারেনহাইটের স্কেলকে সহজ করার ব্যবস্থা করলেন। তিনি পানির জমাটাঙ্ককে ১০০ ডিগ্রি এবং ফুটনাঙ্ককে শূন্য ডিগ্রি ধরে একটি স্কেল চালু করলেন। এই সেলসিয়াস স্কেল সহজ হলেও কেমন যেন উল্টো মনে হলো সবার কাছে। তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে ডিগ্রির পরিমাণ বাড়া উচিত। সেলসিয়াস তাঁর স্কেল ঠিক করার আগেই ১৭৪৪ সালে মারা যান মাত্র ৪৩ বছর বয়সে। সেলসিয়াসের মৃত্যুর পর উদ্ভিদবিজ্ঞানী কার্ল লিনিয়াস সেলসিয়াস স্কেলকে উল্টে দিয়ে ঠিক করে দেন। নতুন স্কেলে শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পানি জমে বরফ হয়ে যায়, আর ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পানি ফুটতে শুরু করে। তখন কিন্তু ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বলা হতো। কিন্তু কোণের পরিমাণও ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড হিসেবে মাপা হয় বলে ১৯৪৭ সালে তাপমাত্রা মাপার একককে 'ডিগ্রি সেলসিয়াস' হিসেবে প্রচলন করা হয়।

উনবিংশ শতাব্দীতে পদার্থবিজ্ঞানের অনেক উন্নতি ঘটে। বিজ্ঞানীরা গ্যাসের আয়তনের উপর তাপ ও চাপের প্রভাব এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক খুঁজে বের করতে সক্ষম হন। ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জেমস জুল তাপগতিবিদ্যার আলোকে তাপমাত্রার আধুনিক সংজ্ঞা দেন। তাপমাত্রা হলো পদার্থের মধ্যস্থিত কণাগুলোর গড় গতিশক্তির পরিমাপ। কণাগুলোর গতিশক্তি যত বেশি, তার তাপমাত্রাও তত বেশি। অর্থাৎ বস্তু তাপ শোষণ করে গরম হবার অর্থ হলো বস্তুর কণাগুলোর গতি বেড়ে যাওয়া। আবার ঠান্ডা হবার অর্থ হলো কণাগুলোর গতি কমে যাওয়া। যেমন পানি স্বাভাবিক তাপমাত্রায় তরল। পানিকে ঠান্ডা করতে থাকলে পানির অভ্যন্তরীণ কণাগুলোর গতি ক্রমশ কমে যায়, এবং পানি জমে বরফ হয়ে যায়। আবার যখন অনেক বেশি গরম করা হয় - তখন কণাগুলোর গতি বেড়ে যেতে যেতে তারা বাষ্প হয়ে গ্যাসে পরিণত হয়।

১৮৬২ সালে স্কটল্যান্ডের পদার্থবিজ্ঞানী উইলিয়াম থমসন লর্ড কেলভিন 'পরম শূন্য' তাপমাত্রার ধারণা দেন। তিনি দেখান যে -২৭৩.১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পদার্থের কণাগুলোর গতি একেবারে থেমে যায়। গতিশক্তি শূন্য হয়ে যাবার কারণে তখন পদার্থের চাপও শূন্য হয়ে যায়। এই তাপমাত্রাকে পরম শূন্য তাপমাত্রা ধরে তাপমাত্রার নতুন একটি স্কেল চালু হয় - যা কেলভিন স্কেল নামে পরিচিত। পরম শূন্য তাপমাত্রাকে শূন্য ডিগ্রি কেলভিন ধরা হয়। এই তাপমাত্রার নিচে আর কিছুতেই যাওয়া সম্ভব নয়, কারণ এই তাপমাত্রায় পদার্থের তাপ চাপ পারমাণবিক গতি সব শূন্য হয়ে যায়।

সাধারণ পারদ-থার্মোমিটার দিয়ে আমরা শরীরের তাপমাত্রা মাপি। কিন্তু পারদ-থার্মোমিটার ব্যবহারে অনেক বিপদও আছে। মুখের ভেতর থার্মোমিটার ঢুকিয়ে তাপমাত্রা পরিমাপ করার সময় যদি থার্মোমিটার ভেঙে যায় তবে খুব ক্ষতি হতে পারে। তাই আস্তে আস্তে থার্মোমিটারের অনেক বিবর্তন ঘটেছে। এখন ডিজিটাল থার্মোমিটার ব্যবহার করা হচ্ছে প্রায় সবখানে। ডিজিটাল থার্মোমিটারে কোন পারদ থাকে না। তাপমাত্রার পরিবর্তনের সাথে পদার্থের রেজিস্ট্যান্সের পরিবর্তন ঘটে। ডিজিটাল থার্মোমিটারে রেজিস্ট্যান্সের পরিবর্তনে বিদ্যুৎ-প্রবাহের যে পরিবর্তন ঘটে তার হিসেব করে তাপমাত্রার পরিমাণ করা হয়।

আধুনিক চিকিৎসা-ব্যবস্থায় ডিজিটাল থার্মোমিটার ছাড়াও ব্যবহৃত হয় ইনফ্রারেড বা অবলোহিত থার্মোমিটার। ছোট শিশুদের তাপমাত্রা সহজে নির্ণয় করার জন্য এই থার্মোমিটার খুব উপযোগী। কানের ছিদ্রে এই থার্মোমিটার প্রবেশ করিয়ে শরীরের তাপমাত্রা মাপা যায়। আবার কপালে স্পর্শ করিয়েও তাপমাত্রা মাপা যায় এধরনের থার্মোমিটার দিয়ে। উত্তপ্ত বস্তু তাপ বিকিরণ করে। আমাদের শরীরে তাপ আছে এবং তা বিকীর্ণ হচ্ছে। ইনফ্রারেড থার্মোমিটার শরীরের বিকিরণ শনাক্ত করে। এই বিকিরণের মাত্রা অনুযায়ী ডিজিটাল সিগনালে পরিণত হয়। এবং সিগনাল উপযুক্ত ইলেকট্রনিক্সের মাধ্যমে তাপমাত্রায় রূপান্তরিত হয়। পারদ-থার্মোমিটারে যেখানে তাপমাত্রা মাপতে মিনিট খানেক সময় লাগে, সেখানে মাত্র কয়েক সেকেন্ডেই তাপমাত্রা মাপা যায় ইনফ্রারেড থার্মোমিটার দিয়ে। মানুষের শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রার সামান্যতম পরিবর্তনও শনাক্ত করা যায় এধরনের থার্মোমিটারের সাহায্যে। অদূর ভবিষ্যতে আমাদের কোষের সামান্যতম অস্বাভাবিক পরিবর্তনও পর্যবেক্ষণ করা যাবে তাপমাত্রার পরিবর্তন লক্ষ্য করে। সুস্থ থাকা আরো অনেক বেশি সহজ হয়ে যাবে বিজ্ঞানের কল্যাণে। 

___________________

**ডিজিটাল থার্মোমিটারের ছবিটি নেয়া হয়েছে techinn.com ওয়েবসাইট থেকে। 

___________________

বিজ্ঞানচিন্তা মে ২০১৯ সংখ্যায় প্রকাশিত


Tuesday 29 June 2021

এ জে জ্যাকব্‌স এর থ্যাংকস এ থাউজ্যান্ড

 


কথায় কথায় ‘থ্যাংক ইউ’ বা ধন্যবাদ বলার সংস্কৃতি আমাদের নয়। অর্থাৎ বাঙালিদের নয়। ছোটবেলা থেকেই আমরা ভদ্রতার শিক্ষা পেয়েছি। বয়সে যারা বড় তাদের কখনো আমরা নাম ধরে ডাকি না। আত্মীয় হলে তো নয়ই, অনাত্মীয় হলেও নয়। নামের সাথে ভাই, আপা, চাচা, চাচী, খালা, খালু, আংকেল ইত্যাদি জুড়ে দিয়ে আমরা ভদ্রতা দেখাই। অবশ্য খুব বেশি বিখ্যাত হলে অন্য কথা। যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আমরা রবীন্দ্রনাথই বলি – রবীন্দ্রদা কিংবা রবীন্দ্রজেঠু বলি না।

যতই ভদ্রতা দেখাই, আমরা কিন্তু কথায় কথায় ধন্যবাদ বলি না। ইংরেজিতে থ্যাংক ইউ বললে যতটা মানিয়ে যায়, বাংলায় ধন্যবাদ শব্দটি এখনো কেন যেন আমাদের সহজাত হয়ে ওঠেনি। সেই কারণেই হয়তো আমরা খুব একটা ধন্যবাদ দিই না।

কিন্তু ইংরেজিভাষী সংস্কৃতিতে ‘থ্যাংক ইউ’ শব্দযুগল সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দ। কথায় কথায় সেখানে থ্যাংক ইউ বলার চল আছে। কিন্তু এই থ্যাংকস দেয়াটা কতটা আন্তরিক, আর কতটাই বা অভ্যাসের বশে?

লেখক এ জে জ্যাকবস – একজন ব্যতিক্রমী লেখক। তিনি এক দু’বছরে একটা বই লেখেন। কিন্তু তাঁর বইগুলি পড়ে যেমন হাহা করে হাসতে হয়, তেমনি অত্যন্ত গভীরভাবে চিন্তাও করতে হয়। তাঁর একেকটা বই একেকটা প্রজেক্ট। একসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার সবগুলি খন্ড পড়ে তিনি একটি বই লিখেছেন সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে, বাইবেল সম্পর্কে বই লেখার জন্য তিনি এক বছর পাদ্রী হয়ে গিয়েছিলেন, এভাবে তার সবগুলি বই তিনি লিখেছেন বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ নিজে করার পর। তাঁর সাম্প্রতিক বই ‘থ্যাংকস অ্যা থাউজ্যান্ড’ তাঁর ধন্যবাদ দেয়ার প্রজেক্ট।

সুখ থেকে কৃতজ্ঞতা আসে না, বরং কৃতজ্ঞতা থেকেই সুখলাভ করা যায়। জ্যাকবস ধর্মবিশ্বাসী নন, রবং সন্দেহবাদী মানুষ। ধার্মিক মানুষ সবকিছুর জন্য সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ দেয় প্রার্থনার মাধ্যমে। লেখকের সেই সুযোগ নেই। ধার্মিক মানুষ প্রায় সময়েই মূল কাজ যে করে – তাকে উপেক্ষা করে, বিশেষ করে কাজ যদি আশানুরূপ হয় – ধন্যবাদ দেয় অদৃশ্য সৃষ্টিকর্তাকে। কিন্তু কাজে যদি আশানুরূপ ফল না পাওয়া যায় – তখন তার জন্য দায়ি করে মানুষকে।

আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য জ্যাকব্‌স ঠিক করলেন – প্রতিদিন সকালে যে দোকান থেকে তিনি কফি নেন, সেই কফি যে সার্ভ করে থাকে ধন্যবাদ দেবেন। এবং শুধু তাকে নয়, এই এক কাপ কফি তার হাতে এসে পৌঁছাবার পেছনে যারা যারা কাজ করে যাচ্ছেন তাদের প্রত্যেককেই ধন্যবাদ দেবেন।

ধন্যবাদ পর্ব শুরু হয় কফিশপ থেকে। কফি বানায় যে মেয়েটি তাকে ধন্যবাদ দেয়ার পর কফি সাপ্লাইয়ার। কফি যারা কেনেন তারা কফির স্বাদ নেন। কফির স্বাদ নেয়ার জন্য বিশেষ মানুষ থাকে। জ্যাকবস তাঁদের সাথে কথা বলেন। সেই কফি রাখার গুদাম, পদ্ধতি – সব জায়গায় নির্দিষ্ট মানুষ প্রশিক্ষিত মানুষ আছে। তাদের সাথেও কথা বলেন জ্যাকবস। ধন্যবাদ দেন।



কফির কাপ আমরা একবার ব্যবহার করেই ফেলে দিই। চিন্তাও করি না এর পেছনে কী পরিমাণ প্রকৌশল দক্ষতা লাগে। কত বড় ব্যবসা এই কফির কাপ সাপ্লাইয়ের ব্যবসা। কফির কাপ – বিশেষ ধরনের কাপ, যা তাপ সংরক্ষণ করে। বাইরে বেশি গরম হয় না, কিন্তু ভেতরের কফি গরম রাখে। আবার তার ঢাকনা এমনভাবে তৈরি করতে হয় যেন খাওয়ার সময় কফি ছলকে না পড়ে। এদের টিমের সাথে দেখা করে তাদের ধন্যবাদ দেন জ্যাকবস।

কফির বীজ আসে কলম্বিয়া থেকে। কফি চাষীদের সাথে দেখা করার জন্য্য কলম্বিয়ায় যান জ্যাকবস। তাদেরকেও সরাসরি ধন্যবাদ দিয়ে আসেন।

থ্যাংকস এ থাউজ্যান্ড সত্যি সত্যি হাজারেরও বেশি মানুষকে ধন্যবাদ দেয়ার বই। বইয়ের শেষে হাজারেরও বেশি মানুষের নামও দেয়া আছে যাদেরকে লেখক সরাসরি ধন্যবাদ দিয়েছেন। তাঁরা সবাই তাঁর সকালের এক কাপ কফির জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।

বইটি প্রকাশিত হয়েছে টেড-এর পক্ষ থেকে সাইমন অ্যান্ড সুস্টার। টেড-এর বইগুলি অত্যন্ত চমৎকার হয়ে থাকে সবদিক থেকেই। এটিও ব্যতিক্রম নয়।

লেখক এই বইটি নিয়ে একটি টেড টক-ও দিয়েছিলেন। সেটা ইউটিউব থেকে এখানে দেখা যেতে পারে। 



মাসুদ রানা ০২ - ভারত নাট্যম



ভরতনাট্যম বলে ভুল করেছিলাম, আসলে বইয়ের নাম হলো ভারত নাট্যম। মাসুদ রানা সিরিজের এই দ্বিতীয় বইটিও কাজী আনোয়ার হোসেন প্রকাশ করেছিলেন বিদ্যুৎ মিত্র ছদ্মনামে ১৯৬৬ সালের নভেম্বরে।

সেই সময় পাকিস্তানী হিসেবে ভারতবিদ্বেষ সম্ভবত খুব কাজ করছিল। প্রথম বইতে ভারতীয়দের সাহায্যে কাপ্তাই বাঁধ ভেঙে দেয়ার পরিকল্পনা করেছিলো পাকিস্তানী এক নৃশংস পাগল বিজ্ঞানী। সিরিজের দ্বিতীয় বইতেও দেখা যায় – পাকিস্তানকে ধ্বংস করে দেয়ার ষড়যন্ত্র করছে ভারতীয়রা। শান্তি মিশনের নামে সাংস্কৃতিক দলের ছদ্মবেশে পূর্ব পাকিস্তানে ঢুকে পড়ে ভারতীয় গুপ্তচররা। পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে। নৃত্যশিল্পী মিত্রা সেন – সুন্দরী। ভারতীয় গুপ্তচর। অথবা টোপ। তাকে ব্যবহার করা হচ্ছে ষড়যন্ত্রের কাজে। জানা যায় – মিত্রা সেনের মামা আবার ভারতীয় মন্ত্রী।


পাকিস্তান গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান রাহাত খান মাসুদ রানাকে দায়িত্ব দেন এই মিশনের কাজে নজর রাখতে। রানা সাংবাদিকের ছদ্মবেশে তার কাজ করে। যথারীতি – মিত্রা সেনের কাছে চলে আসে রানা। মিত্রা রানার প্রেমে পড়ে।

ঘটনাক্রমে পাকিস্তানের নব্য ধনীদের বখাটে ছেলেদের কথা আসে – যারা ইয়ং টাইগার্স ক্লাব গড়ে তোলে – মদ ড্রাগ আর নারীচর্চা করে। যা অনেকটা এখনকার সময়েরও প্রতিনিধিত্ব করে।

রানা পূর্ব-পাকিস্তানের কাজ কিছুটা গুছিয়ে চলে যায় ব্যাংকক। সেখানে পরিচয় হয় ক্যাথি ডেভনের সাথে। ক্যাথিকে সাহায্য করার জন্য জুয়া খেলায় কয়েক মিনিটের মধ্যেই তুলে দেয় ১২ হাজার ডলার। কিন্তু ক্যাথি তা জানতো না। টাকার জন্য সে বিশ্বাসঘাতকতা করে রানার পরিচয় জানিয়ে দেয়। রানা ইন্ডীয়াতে এসে ধরা পড়ে। সেখানে তাকে সাহায্য করে ক্যাথির বোন।

ইন্ডিয়ানরা পূর্ব-পাকিস্তানে লক্ষ লক্ষ পতঙ্গ পাঠিয়ে সব খাদ্যশস্য ধ্বংস করে দেয়ার পরিকল্পনা করে। রানা অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তা বাঞ্চাল করে দেয়।

মাসুদ রানার সংলাপে মাঝে মাঝেই নারীর প্রতি অবমাননাকর মন্তব্য উঠে আসে। এগুলি সম্ভবত সেই সময় খুব স্বাভাবিক ছিল – যেমন ক্যাথি গাড়ি চালানোর সময় রানা মন্তব্য করে – বেশিরভাগ মেয়ে ড্রাইভার একদিকে সিগনাল দিয়ে অন্যদিকে টার্ন নেয়। অর্থাৎ মেয়েরা খারাপ ড্রাইভার!!


Monday 28 June 2021

নোবেলবিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী মারিয়া গোয়েপার্ট-মেয়ার

 



১৯০১ থেকে ২০২১ - এই ১২০ বছরে ২১৬ জন বিজ্ঞানী পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন। এই ২১৬ জনের মধ্যে মাত্র চারজন হলেন নারী। বিংশ শতাব্দীতে এই সংখ্যা ছিল মাত্র দুই। এই চারজন নোবেলবিজয়ী নারী পদার্থবিজ্ঞানীর একজন হলেন মেরি কুরি। ১৯০৩ সালে তিনি পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন। বিশ্বের অনেকেই মেরি কুরিকে চেনেন। কিন্তু নোবেল বিজয়ী দ্বিতীয় নারী পদার্থবিজ্ঞানী ততটা পরিচিত নন আমাদের অনেকের কাছে। তাঁর নাম মারিয়া গোয়েপার্ট-মেয়ার। মেরি কুরির নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার ৬০ বছর পর ১৯৬৩ সালে নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের Shell Model আবিষ্কারের জন্য পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন মারিয়া গোয়েপার্ট-মেয়ার।

২৮ জুন মারিয়া গোয়েপার্ট-মেয়ারের জন্মদিন। ১৯০৬ সালের ২৮ জুন জার্মানির কাটোভিজে জন্মগ্রহণ করেছিলেন মারিয়া গোয়েপার্ট। তাঁর বাবা ছিলেন গটিংগেন (Gottingen) ইউনিভার্সিটির মেডিকেল ফ্যাকাল্টির প্রফেসর, মা ছিলেন স্কুল শিক্ষক। মেরি কুরির মত অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা সহ্য করতে হয়নি মারিয়াকে। অভিজাত মা-বাবার একমাত্র সন্তান ছিলেন তিনি। তাঁর বাবা তাঁকে সবসময় বলতেন, "মেয়েমানুষের মত হয়ো না, মানুষ হতে চেষ্টা করো।'' মা-বাবার প্রভাবে বিজ্ঞানী হবার স্বপ্ন মাথার ভেতর ঢুকে গিয়েছিল মারিয়ার। গণিতের প্রতি প্রচন্ড আকর্ষণ ছিল তাঁর।

কিন্তু সেই ১৯২০-এর দশকে যখন ইওরোপে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের বেড়ে ওঠার কাজ চলছে - তখন সেখানে মেয়েদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ খুবই সীমিত। তবুও গণিতের প্রফেসর হতে চেয়েছিলেন মারিয়া। কিন্তু ম্যাক্স বর্নের প্রভাবে গণিত থেকে পদার্থবিজ্ঞানে চলে এলেন তিনি। ম্যাক্স বর্নের তত্ত্বাবধানে শুরু করলেন পদার্থবিজ্ঞানের পাঠ।

১৯২৭ সালে তাঁর বাবার মৃত্যু হয়। আর্থিক অবস্থা কিছুটা খারাপ হয়ে যায়। মারিয়ার মা তাঁদের বাড়ির কয়েকটা রুম ইউনিভার্সিটির ছাত্রদের ভাড়া দিতে শুরু করেন। একদিন মারিয়াদের বাড়ির একটা রুম ভাড়া নিয়ে এলেন আমেরিকান কেমিস্ট জোসেফ মায়ার। ধরতে গেলে প্রথম দর্শনেই প্রেম। ১৯৩০ সালে বিয়ে। 

মারিয়া ও জোসেফ মেয়ার

মারিয়া জোসেফের প্রেমে এতই মশগুল হয়ে যান যে - ফিজিক্সে পিএইচডি'র কাজ পর্যন্ত ছেড়ে দেন। কিন্তু জোসেফ জানতেন মারিয়ার স্বপ্নের কথা। তিনি অনেক বুঝিয়ে মারিয়াকে পিএইচডি সম্পন্ন করতে রাজি করান।

মারিয়ার পিএইচডি অর্জিত হওয়ার পর জোসেফ মারিয়াকে নিয়ে আমেরিকায় ফিরে আসেন। জন হফকিন্‌স ইউনিভার্সিটিতে যোগ দেন জোসেফ মেয়ার। কিন্তু মারিয়া তাঁর সন্তানদের লালনপালন আর ঘরসংসারের কাজ করতে করতে নিজের ক্যারিয়ারের কথা ভুলেই যান।

জার্মানিতে মারিয়া বড় হয়েছেন অনেকটা প্রাচুর্যের মধ্যে। বাড়িতে কাজ করার লোক ছিল। নিজেকে কিছুই করতে হয়নি তেমন। কিন্তু আমেরিকাতে ঘরের কাজ করতে করতেই সময় চলে যায়। কিন্তু তাঁর স্বামী জোসেফ মারিয়ার ক্যারিয়ার গড়ার ব্যাপারে মারিয়ার চেয়েও সচেষ্ট। তিনি মারিয়াকে বলেন, "আমেরিকাতে কাজের লোক রাখার খরচ যত বেশিই হোক, আমি তোমার ঘরের কাজের জন্য কাজের লোক রাখবো, কিন্তু তোমাকে কথা দিতে হবে যে - তুমি বিজ্ঞান ছাড়বে না।"

বিজ্ঞান ছাড়তে না চাইলেও - বৈজ্ঞানিক গবেষণার কোন সুযোগই পাচ্ছিলেন না মারিয়া। কোন বিশ্ববিদ্যালয়েই তাঁকে নিয়োগ দেয়নি। অনেক চেষ্টা করার পর জন হফকিন্স ইউনিভার্সিটিতে তিনি বিনাবেতনে কাজ করার সুযোগ পান। ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত বিনাবেতনে কাজ করেন তিনি সেখানে।

তারপর তাঁর স্বামী জোসেফ মায়ার যখন শিকাগো ইউনিভার্সিটিতে চলে যান, মারিয়াও যান তাঁর সাথে এবং সেখানেও তিনি বিনাবেতনে কাজ শুরু করেন। কিছু সময়ের মধ্যে সেখানে আর্গন ন্যাশনাল ল্যাবোরেটরি প্রতিষ্ঠিত হয়। আর্গন ল্যাবের ডিরেক্টর হলেন রবার্ট স্যাচ।

মজার ব্যাপার হলো রবার্ট স্যাচ পিএইচডি করেছিলেন জন হফকিন্‌স ইউনিভার্সিটিতে মারিয়া গোয়েপার্ট-মেয়ারের তত্ত্বাবধানে। ছাত্র রবার্ট একটা ন্যাশনাল ল্যাবের পরিচালক হয়ে গেছেন, অথচ শিক্ষক মারিয়ার কোন সবেতন চাকরি নেই।

রবার্ট মারিয়াকে আর্গন ন্যাশনাল ল্যাবে খন্ডকালিন চাকরি দিলেন। প্রায় ১৫ বছর বিনাবেতনে কাজ করার পর এই প্রথম তিনি বেতন পেলেন। এখানেই তিনি কাজ করেছেন এনরিকো ফার্মিসহ আরো অনেক বিখ্যাত নিউক্লিয়ার ফিজিসিস্টের সাথে।

এখানে কাজ করতে করতে মারিয়া গোয়েপার্ট-মেয়ার নিউক্লিয়ার শেল মডেল আবিষ্কার করেন। ১৯৫৩ সালে তিনি যখন তাঁর মডেল প্রকাশ করেন, তখন প্রায় একই সময়ে জার্মানিতে এই মডেল আবিষ্কার করেন হ্যান্স জেনসেন। ক্রমে মারিয়া ও হ্যান্স জেনসেনের মধ্যে পেশাগত বন্ধুত্ব তৈরি হয়। নিউক্লিয়ার শেল মডেলের উপর একটি ক্লাসিক বই লেখেন তাঁরা।




বিজ্ঞানী হিসেবে এত নামডাকের পরেও একটা পূর্ণকালীন চাকরি জোটেনি মারিয়া গোয়েপার্ট-মেয়ারের ১৯৬০ সাল পর্যন্ত। ১৯৬০ সালে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া সান দিয়েগোতে অধ্যাপক পদে প্রথম পূর্ণকালীন চাকরি পান মারিয়া। তাঁর স্বামী জোসেফ মেয়ারও একই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক পদে যোগ দেন। দেখা গেলো জোসেফকে যত বেতন দেয়া হয়, মারিয়াকে দেয়া হয় তার অর্ধেক।

১৯৬৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পান মারিয়া মেয়ার, হ্যান্স জেনসেন এবং ইউজিন বিগনার। নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার পর মারিয়া মেয়ারের বেতন হয় পুরুষ অধ্যাপকদের সমান।

১৯৭২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন মারিয়া গোয়েপার্ট-মেয়ার।  


Saturday 26 June 2021

জুমানজি দ্য নেক্সট লেভেল

 


বাচ্চাদেরকে নিয়ে সিনেমা দেখতে যাবো এরকম প্রস্তাব রাখার সাথে সাথেই তা নাকচ করে দিল বাচ্চাদের পিতা। বাচ্চাদের মাতা বুদ্ধের মতো নিরপেক্ষতা অবলম্বন করলো - অর্থাৎ কর্তার ইচ্ছেয় কর্ম হবে এরকমই সিদ্ধান্ত তার। এরকম কিছু একটা যে হবে সে ব্যাপারে বাচ্চারা আমাকে আগেই সাবধান করে দিয়েছিল। আমি বাচ্চাদের আশ্বাস দিয়ে বলেছিলাম যে তাদের পিতার সম্মতি আদায় করা তেমন কোন কঠিন কাজ নয়। তারা হাসতে হাসতে বলেছিল – দেখা যাবে।

বাচ্চারা তাদের পিতাকে আমার চেয়ে বেশি চেনে। বাড়ির কর্ত্রীও জানে কর্তাব্যক্তির মতিগতি। এই কর্তাটিকে সিনেমা দেখার ব্যাপারে উদবুদ্ধ করা সম্ভবত স্বয়ং স্পিলবার্গের পক্ষেও সম্ভব নয়। কারণ সে জীবনে কোন সিনেমা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এক বসায় দেখেনি। আমরা মোটামুটি একই সময়ে পৃথিবীতে এসেছি। একই রকম দারিদ্র্যের ভেতর দিয়ে পার করেছি আমাদের শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য। একই সাবজেক্টে পড়াশোনাও করেছি। কিন্তু সবকিছু একই রকম হলেও মানুষের শখ, সাধ, ভালো লাগা কিংবা না লাগা এসবে ভিন্নতা থাকেই। যেমন নাটক, সিনেমা – এসব আমার কাছে মৌলিক চাহিদারই কাছাকাছি কিছু। কিন্তু তার কাছে এসব হলো অহেতুক সময় নষ্ট, পয়সা নষ্ট করার অপকর্ম। সে এতটাই শিক্ষানুরাগী যে – যেসব কাজকর্ম সরাসরি শিক্ষার সাথে সংযুক্ত নয় – সেসব কাজ তার কাছে বাধ্যতামূলকভাবে পরিত্যাজ্য।

বাসায় যতটা পারে নিজের ক্ষমতা দেখায় সে। নিজের নিয়ম কঠোরভাবে বলবৎ রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু পুরোটা যে পারে না সে নিজেও জানে। অনেকটা ক্ষোভের সাথে সে আমাকে বলে, “আর বলিস না। যতক্ষণ আমি বাসায় থাকি+ ততক্ষণ বাসার টিভি বন্ধ থাকে, বাচ্চারা পড়াশোনার টেবিলে এমনভাবে ঝুঁকে থাকে যেন পারলে টেবিলের ভেতর ঢুকে যাবে। আর বাচ্চাদের মাও এমন আচরণ করে যেন সিরিয়াল বলতে সে শিশুদের খাবারই বুঝে, টিভি সিরিয়ালের নাম সে জীবনেও শোনেনি। আর যেই আমি বাসা থেকে অফিসের দিকে রওনা দেবো, সাথে সাথে বাসার পরিবেশ দ্রুত বদলে যায়। জি বাংলা, হ্যাঁ বাংলা, স্টার প্লাস, স্টার মাইনাস এরকম যত চ্যানেলে যত সিরিয়াল আছে সেগুলি চালু হয়ে যায়।“

“তোর বাসার তো ডিডিএলজে’র মতো অবস্থা” – আমি বললাম।

“ডিডিএলজে? ওটা কোন্‌ কোম্পানি?” – সে অবাক হয়ে প্রশ্ন করে। কর্পোরেট অফিসে কাজ করার অনেক সমস্যার একটি হলো – তাদের চিন্তাভাবনাজুড়ে কোম্পানির নাম, কোম্পানির টার্মগুলি ঘুরতে থাকে। আমার বোঝা উচিত ছিল।

“কোম্পানি নয়। ডিডিএলজে – দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েংগে”

“জাইঙ্গা নিয়ে কী করবি?”

তার প্রশ্নে আমি হাসবো না কাঁদবো বুঝতে পারি না। লে জায়েঙ্গে কে যে জাঙিয়া ভাবতে পারে তাকে ডিডিএলজে সম্পর্কে কথা বলা বৃথা।

এহেন মানুষ বাচ্চাদের নিয়ে সিনেমা দেখতে যাবার প্রস্তাব নাকচ করে দেবে সেটাই তো স্বাভাবিক। প্রত্যেক মানুষের কিছু দুর্বল জায়গা থাকে। তাদের কাবু করতে হলে দুর্বল জায়গায় হাত দিতে হয়। এই মানুষটির দুর্বল জায়গা হলো বন্ধুত্ব। আমার নিজের জন্য কিছু করতে বললে সে যেকোনোভাবেই সেটা করে দেবে। দুরন্ত ছাগলকে ধরতে হলে যেমন হিসি করার সময় ধরতে হয়, তেমনি এই লোককে রাজি করানোর জন্য বললাম, “দ্যাখ, আমি জীবনে কোনদিন ঢাকার সিনেমাহলে সিনেমা দেখিনি। ছোটবেলা থেকে যতবার ঢাকায় এসেছি, সিনেমা দেখতে চেয়েছি। কিন্তু এখনো সেই সাধ মেটেনি। এখন তো সিনেমাহলগুলি সব বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যে ক’টা আছে সেগুলিও বন্ধ হয়ে যাবার আগে একটা সিনেমা দেখা অবশ্যকর্তব্য। আজ বিকেলটা যখন ফ্রি আছি, একটা সিনেমা দেখার ব্যবস্থা কর।“

তারপর প্রায় আধঘন্টা ধরে শিশুদের মতো আবদার করতে করতে তাকে রাজি করালাম। একা যেতে অস্বস্তি লাগবে, আমি তোদের অতিথি, আমাকে একা পাঠাবি? শুধুমাত্র তুই সাথে যাবি, বাচ্চারা যাবে না তা কি হয়? বউকে একলা ফেলে যাবি? স্টারপ্লেক্সেই যখন দেখাবি – থ্রিডি সিনেমাই দেখি। তুই সিনেমা না দেখিস, কিন্তু থ্রি ডাইমেনশানাল ব্যাপারটা তো দেখা উচিত – এরকম আরো কতকিছু বললাম।

থ্রিডি বলে অবশ্য একটু বেকায়দায়ও পড়ে গিয়েছিলাম। কারণ সে বললো, “যা কিছু সবসময় দেখি, সবই তো থ্রিডি। ওটা আবার সিনেমাহলে গিয়ে দেখতে হবে কেন?”

বাচ্চাদের পিতা রাজি হলো। কিন্তু তাতেই সমস্যার সমাধান হয়ে গেল না। বাংলাদেশের স্কুল-কলেজে পড়ুয়া বাচ্চাদের মতো ব্যস্ততা সম্ভবত পৃথিবীর আর কোন দেশের বাচ্চাদের নেই। এই বাসার দুই বাচ্চার একজন স্কুলে, অন্যজন কলেজে। দুইজনের স্কুল-কলেজের পর অনেকটা করে কোচিং-ক্লাস। সব সামলে এক সাথে তিন-চার ঘন্টা সময় বের করাও কঠিন তাদের পক্ষে। অনেক কষ্টে একটা কোচিং-ক্লাস বাদ দিতে হলো। এই স্যাক্রিফাইসটা করার সময় বাচ্চা খুবই খুশি, কিন্তু বাচ্চার বাবার অবস্থা হলো শেয়ার মার্কেটে ধ্বস লাগার মতো।

ঠিক হলো আমরা আগে গিয়ে টিকেট করে রাখবো, বাচ্চারা কোচিং শেষে সেখানে যাবে। রওনা হলাম। বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্সে আসার সময় রিকশায় বসে তাত্ত্বিক কথাবার্তা হচ্ছিল তার সাথে। ছেলে-মেয়েদের সন্তুষ্ট রাখা যে কী কঠিন কাজ তা বর্তমান টিন-এজ মা-বাবার চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। আমার সাথে অবশ্য তার ছেলে-মেয়ে দুটোর সম্পর্ক বেশ চমৎকার। ট্যুরিস্টদের কাছে যেমন সব দেশই ভালো, তেমনি আমার কাছেও পৃথিবীর সব ছেলে-মেয়েই অসাধারণ। 

মধ্যবিত্ত শ্রেণির ভেতর একটা দ্বন্দ্ব কাজ করে সবসময়। তারা নিজেদের অর্থনৈতিক টানাপোড়েন ঠিকমতো মেনে নিতে পারে না। মনে মনে চায় ধনী হতে। কিন্তু যখন পারে না, তখন আদর্শের দোহাই দেয়। কিন্তু মাঝে মাঝে তারা ধনীদের মতো ধনী এলাকায় যেতে পছন্দ করে। পরিবারের সবাইকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে খাওয়া, একটু বেড়াতে যাওয়া, দু-একটা শো-পিস কেনা - এসবেই সীমাবদ্ধ আমাদের মধ্যবিত্তের বিলাসিতা। 

আমরা যারা নিম্ন-মধ্যবিত্তের ঘরে জন্মছি - বাহুল্য বলতে তেমন কিছুই আমাদের ছিল না শৈশবে। তখন আমরা অল্পেই সন্তুষ্ট থাকতাম। উচ্চবিত্তদের জীবনযাপন ছিল আমাদের অপরিচিত। তাই মনে অহেতুক কোন হীনমন্যতা জন্মাবার সুযোগ ছিল না। 

কিন্তু এখনকার ছেলেমেয়েরা - বিশেষ করে মধ্যবিত্তের ছেলে-মেয়েদের কাছেও বাইরের পৃথিবী খুবই পরিচিত। ইলেকট্রনিক্স এখন একেবারে নিম্নবিত্তেরও নাগালের মধ্যে। বিশ্বায়নের কল্যাণে টেলিভিশনের পর্দার ভেতর দিয়ে সারা পৃথিবীর চাকচিক্য ঢুকে পড়ছে আমাদের ছেলেমেয়েদের ভেতর। তারা এখন অল্পতে সন্তুষ্ট হয় না, কিন্তু অল্পতেই মন খারাপ করে ফেলে। তাদেরকে মূল্যবোধের কথা বললে তারা ভাবে তাদের চাহিদার মূল্য দেবার সামর্থ্য নেই বলেই আমরা মূল্যবোধ নামক কিছু বায়বীয় শব্দাবলি প্রয়োগ করে তাদের মনযোগ বিক্ষিপ্ত করার চেষ্টা করছি। 

বাসা থেকে দূরত্ব বেশি নয়। তাই তাত্ত্বিক আলোচনাও দীর্ঘস্থায়ী হলো না। অবাক হয়ে দেখলাম কী বিপুল সমারোহ এই বসুন্ধরায়।

বাংলাদেশের সিনেমাহলগুলি একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমি যেসব সিনেমাহলে সিনেমা দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম, চট্টগ্রামের সেইসব সিনেমাহলগুলির মধ্যে মাত্র চারটি অবশিষ্ট আছে। বাকি দশ-এগারোটি সিনেমাহল এখন সুপারমার্কেট হয়ে গেছে। আধুনিক সুপারমার্কেট - যেগুলিকে শপিং মল বলা হয় - সেখানে আধুনিক থিয়েটারে সিনেমা দেখানোর ব্যবস্থা থাকে। বাংলাদেশেও সেরকম কিছু অত্যাধুনিক শপিং মল গড়ে উঠেছে। বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্স সেরকমই একটা। সেখানে সবকিছুর দাম অত্যন্ত বেশি। নিম্নবিত্তদের দূরে রাখার জন্যই হয়তো এরকম। বাংলাদেশে কিছু মানুষের হাতে এখন অনেক টাকা। সেই টাকাই এখন মানুষের সাথে মানুষের বৈষম্যের প্রধান নিয়ামক। 




বাংলাদেশের সিনেমাশিল্প ধ্বংস হয়ে গেছে। একসময় এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য – কোন ধরনের প্রতিযোগিতা যেন করতে না হয় অন্যদেশের সিনেমার সাথে, বিদেশী সব সিনেমা – বিশেষ করে ভারতীয় সিনেমা এদেশের সিনেমাহলে প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু তাতে কি রক্ষা পেয়েছে এদেশের সিনেমা? একের পর এক ভারতীয় সিনেমা নির্লজ্জভাবে নকল করে সিনেমা বানানো হয়েছে এদেশে। ভিসি-আর ডিভিডি এসব সহজলভ্য হওয়ার পর থেকে আর কোন জারিজুরি খাটলো না। এখন তো সরাসরি আকাশ সংস্কৃতি। প্রত্যেক বাসায় শত শত বিদেশী চ্যানেলে শত শত সিনেমা চলে। ইউটিউব, নেটফ্লিক্সসহ হাজারো প্লাটফরমে সিনেমা দেখার সুযোগ। মানুষের হাতে হাতে স্মার্টফোন। প্রতিভা না থাকলে কী প্রদর্শন করবে? আর প্রতিযোগিতা না থাকলে প্রতিভার কি বিকাশ ঘটে? যাই হোক – সেসব তত্ত্ব কথা আপাতত থাক।

জুমানজি’র এটা পার্ট-২। বাচ্চারাই বললো। তারা এর আগের পার্টও অলরেডি দেখে ফেলেছে। মাত্র কয়েক সপ্তাহ  আগে এই মুভি মুক্তি পেয়েছে হলিউডে। আর এর মধ্যেই চলে এসেছে বাংলাদেশে।

স্টারপ্লেক্স থিয়েটারগুলির যান্ত্রিক স্মার্টনেস সম্পর্কে আলাদা করে বলার দরকার নেই। এখন সবকিছুই গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড। বোঝা যাচ্ছে – আমরা গ্লোবাল সিটিজেন হয়ে গিয়েছি, অন্তত সিনেমা হলের ভেতর।

এই সিনেমার কোন ঘটনাই আমার মনে দাগ কাটেনি। বুঝলাম এধরনের সিনেমা আমার ভালো লাগার সিনেমা নয়। আমার পাশে বসে বাচ্চাদের পিতা দেড়ঘন্টার একটা গভীর ঘুম দিলো। বুঝলাম এটা নেট প্রফিট। কারণ বাসায় ঘুমের ওষুধ ছাড়া সে ঘুমাতে পারে না। তবে আমাকে মাঝে মাঝেই মাথা নেড়ে হাত-পা নেড়ে আশেপাশের দর্শকদের বোঝাতে হচ্ছিলো যে গম্ভীর নাসিকাগর্জনের শব্দ আমার নাক থেকে বের হচ্ছে না।

সিনেমার মাঝখানে বাচ্চাদের মাতা হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো, “এই দ্যাখো দ্যাখো, প্রিয়াংকা চোপড়ার হাজব্যান্ড।“

তার চিৎকারে তার স্বামীর ঘুম ভেঙে গেল। সে জেগে উঠে বিরক্ত হয়ে বললো, “নিজের হাজব্যান্ডের দিকে ফিরেও তাকায় না, অন্যের হাজব্যান্ডকে দেখে কী করছে দ্যাখ।“ 



Latest Post

Hendrik Lorentz: Einstein's Mentor

  Speaking about Professor Hendrik Lorentz, Einstein unhesitatingly said, "He meant more to me personally than anybody else I have met ...

Popular Posts