সেপ্টেম্বর ১৮, ২০০৪। শনিবার
ইন্টারনেটে চমৎকার একটা বাংলা সাহিত্য পত্রিকা আছে। ভারতীয় বাঙালিরা এই চমৎকার কাজটি করেছে। এখানে প্রতি সপ্তাহেই চমৎকার লেখা বেরোয়। www.banglalive.com পাতায় গেলেই আলাদা জগৎ। এই পাতার খবর আমাকে দিয়েছে তীর্থ। যার সাথে আমার পরিচয় হয়েছে মেরিল্যান্ডে। প্রথম পরিচয়েই বন্ধুত্ব হয়ে যায় টাইপের মানুষ তীর্থ।
শমীক মুখোপাধ্যায়ের গল্প পড়লাম রঙ। গল্পটা মজার। প্রেমের গল্পও বলা যায়। শোভন তার বৌয়ের সাথে ঝগড়া করার পরে বৌ সুমি বাপের বাড়ি চলে যায়। আর শোভন পরদিন সকালে কিছুতেই আর সুমির মুখ মনে করতে পারে না। কিছুতেই না। ঝগড়ার কারণ সামান্য। সুমি চেয়েছিলো একটা কাঞ্জিভরম শাড়ি কিনতে, শোভন রাজী হয়নি। আর শোভন চেয়েছিলো সুমিকে নিয়ে সিনেমা দেখতে যেতে। সুমি রাজী হয়নি। পরে গর্জন বর্ষণ শেষে মধুরেন টাইপের। যে টাইপের হলে গল্প রোমান্টিক হয় আর কি। শোভন সুমির প্রেমের বিয়ে না হলেও তারা পরস্পরকে তুই করে বলে।
যুগান্তর পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীতে মাঝে মাঝে চমৎকার সব লেখা প্রকাশিত হয়। এই সপ্তাহে ডঃ সফিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন সাহিত্যে চালিয়াতি। মজার এই প্রবন্ধে তিনি দেখিয়েছেন নিজের সাহিত্য কীভাবে পরের নামে চালিয়ে দিয়ে বিখ্যাত হয়েছেন অনেকে। আবার উল্টোটাও।
ফরাসি লেখক আলেকজান্ডার ডুমা নাটক, উপন্যাস আর ছোটগল্প মিলিয়ে প্রায় বারোশত গ্রন্থ রচনা করেছেন। অসম্ভব মনে হচ্ছে না? জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠার পরে দেখা গেলো শুধু তাঁর নাম দেখলেই নাকি বই বিক্রি হয়ে যায়। তখন ডুমা নাকি লোক ভাড়া করে বই লিখিয়ে নিতে শুরু করলেন। সেগুলোও তাঁর নামে প্রকাশিত হয়েছে। একটা গল্প প্রচলিত আছে এই সম্পর্কে। একদিন ডুমা তাঁর ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘তুমি আমার শেষ লেখাটা পড়েছো?’’ ছেলে উত্তরে বলে, ‘‘তুমি নিজে পড়েছোতো বাবা?’’
ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী ষোল বছর বয়সে লিখে রবীন্দ্রনাথ ইচ্ছে করে পারিবারিক পাঠাগারে লুকিয়ে রাখেন। একদিন এই পান্ডুলিপি সেখান থেকে পাওয়া গেলে হৈ চৈ পড়ে যায়। কে এই ভানুসিংহ ঠাকুর! পন্ডিতদের গবেষণা শুরু হয়ে যায়। নিশিকান্ত চট্টোপাধ্যায় ভানুসিংহকে খোঁজার জন্য ইংল্যান্ডে গিয়ে ভানুসিংহের উপর গবেষণা করে এক থিসিস রচনা করেন। সেখানে তিনি দেখান ভানুসিংহ চন্ডীদাসের সমকালীন কবি। তিনি আরো দেখান যে ভাব, ভাষা আর অনুভূতির তীক্ষ্ম ভানুসিংহের পদাবলী চন্ডীদাসের চেয়েও হৃদয়গ্রাহী ও মর্মস্পর্শী। শেষে অবশ্য রবীন্দ্রনাথ পুরা ব্যাপারটা ফাঁস করে দিলে নিশিকান্ত বাবুর পান্ডিত্যপূর্ণ মৌলিক থিসিসটি বাতিল হয়ে যায়। বুদ্ধদেব বসুর অনেক কবিতা নাকি ইংরেজি থেকে অনুবাদ।
হুমায়ূন মালিকের গল্প আকালেশ্বর পড়লাম যুগান্তরের পাতায়। গল্পটায় অনেক ভাষার খেলা আছে। বাক্যবিন্যাসে আর গঠনে। এই কারিকুরি না থাকলে হয়তো সাহিত্য হয় না। তবে মাঝে মাঝে এই বর্ণনার খাদে পড়ে গেলে আর গল্পের ডাল বেয়ে ওঠা যায় না। সালমা শারমিন নামের এক মেয়ে এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র। গরীব বলেই এক ধনী বুড়ার দ্বিতীয় বৌ হতে হয় তাকে।
সাপ্তাহিক ২০০০ এর প্রচ্ছদ কাহিনী বোমার সাথে বসবাস। লিখেছেন গোলাম মোর্তোজা ও অনিরুদ্ধ ইসলাম। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে। আমিনীসহ আগে যারা মৌলবাদী বলে নিজেদের পরিচয় দিতে পছন্দ করতেন তারা এখন বলছেন অন্য কথা। আর শেখ হাসিনার পাশে তাঁর আমলের সন্ত্রাসীরা এখনো রয়ে গেছে। আমরা সবাই একটা গ্যাড়াকলে পড়ে গেছি। কিন্তু এটা তো কথার কথা। গ্যাড়াকল নামে এই কলটা আসলে কী? ইচ্ছা থাকলে এই কলের কলকব্জা খুলে দেখা যায় সারানো যায় কিনা। সেরকম কোন নির্দেশনা নেই কোথাও।
যুগান্তরের পাতায় আর্নেস্ট হেমিং ওয়ের আপ ইন মিশিগান গল্পের অনুবাদ করেছেন প্রমিত হোসেন। মূল গল্পটা আমার পড়া নেই। কিন্তু অনুবাদ পড়ে এটাকে খুব একটা ভালো গল্প বলে মনে হলো না। গল্পের জায়গাগুলির খুব কাছে এখন আছি আমি। মিশিগান ওহাইওর পাশের স্টেট। তবে গল্পের মিশিগান কিন্তু মিশিগান স্টেট নয়। লেক মিশিগান যেটা হলো শিকাগো সিটিতে। মানে ইলিনয় রাজ্যে।
আনন্দবাজার পত্রিকায় দিল্লির জওহরলাল নেহেরু ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর হিস্টরিকাল স্টাডিজের প্রফেসর তনিকা সরকারের একটা সাক্ষাৎকার পড়লাম। নারীর ইতিহাস বিষয়ে তিনি বলেছেন আজ যেখানে মেয়েরা এসে দাঁড়িয়েছে তার পেছনে পুরুষদের অবদান আছে তা আমরা মানতে চাচ্ছি না, কেবলি নস্যাৎ করছি। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রাধাকান্ত দেব অনেক কাজ করেছেন। অবশ্য রাধাকান্ত দেব কী কাজ করেছেন সে সম্পর্কে আমি এখনো কিছুই জানি না। আর একটা ভাইটাল প্রশ্নে কথা বলেছেন তনিকা, তা হলো বাম রাজনীতিতে মেয়ে রাজনীতিকের সংখ্যা এতো কম কেন? পশ্চিমবংগে এতো এতো বাম বুদ্ধিজীবী। কয়জন মেয়ে আছেন সেখানে যারা পার্টিতে শুধু ওয়ার্ক ফোর্স না হয়ে ইন্টেলেকচুয়াল পর্যায়ে কাজ করছে? কমিউনিস্ট পার্টিতে এটা একটা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড। আর মেয়েদের যতটা ভিকটিমাইজড হিসেবে দেখানো হয়, প্রচার করা হয়, সে অনুপাতে মেয়েদের সাফল্য আর চেষ্টা আর উদ্যোগকে ততটা মহিমা দিয়ে প্রচার করা হয় না। মেয়েদের বৌদ্ধিক আর সামাজিক অবস্থান নিয়েও খুব একটা মাথা ঘামায় না কেউ।
আনন্দবাজার পত্রিকায় অভিষেক রায়ের গল্পটা বেশ মজার। ট্রায়াল-হানিমুন। সুলগ্ন কোম্পানীর এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার। আড়াই মাসের পরিচয়ের মাথায় বিয়ে করছে আলেখ্যকে। হানিমুনে দূরে কোথাও যাবার প্লান করতে চেয়েছিলো। কিন্তু ছুটির অভাবে তাদের দূরে কোথাও যাওয়া হয় না। কাছে দীঘায় যায়। সেখানে যে হোটেলে রুম পায় দেখা যায় সেখানে আগে অন্যজনকে নিয়ে এসেছিলো সুলগ্ন। সেটা গোপন করতে গিয়ে দেখে আলেখ্যের কাছেও হোটেলটা খুব পরিচিত।
প্রথম আলোর আনন্দ পাতায় চোখ বুলাই মাঝে মাঝে। এবারের সংখ্যাটা বেশ খুটিয়ে পড়লাম। হুমায়ূন আহমেদের শ্যামল ছায়া শেষ হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা নিয়ে এই সিনেমা। সবাই সাধু সাধু করছে সিনেমাটি নিয়ে। দেখার পরে বুঝা যাবে। আরেকটা জোছনার গল্প হবে কিনা কে জানে।
১০ সেপ্টেম্বরের প্রথম আলোতে তানজিনা হোসেনের গল্প ‘সংসার’ পড়লাম। গল্পটাও খুব মজার। শাহানা ডিভি পেয়েছে। এটা পাওয়ার পরে তার স্বামী হিসেবে তার সাথে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে সিরাজ। এক লাখ টাকা দিয়েছে সে শাহানাকে। আর একটা ছেলেও জুটে যায় সাথে যাবার জন্য। বারো বছরের এই ছেলের নাম হাসান। শাহানার ছেলে হিসেবে যাবে সে আমেরিকা। সেখানে হাসানের খালারা আছে। এয়ারপোর্ট থেকেই তারা নিয়ে যাবে। গল্পটা মজার।
৮ সেপ্টেম্বরের প্রথম আলোর অন্যপক্ষে 'একজন সরস্বতীর জীবন যুদ্ধ' নামে ফারহানা ইয়াসমিন লাকীর লেখাটা অবাক হয়ে পড়েছি। এই সরস্বতী রানী সিকদার ফরিদপুরের মধুখালি থানার কাপাসাটিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। প্রচন্ড অভাব, ভিক্ষাকরে, চুরি করে জীবন বাঁচাতে হয়েছে ছোটবেলায়। পড়াশুনাও করতে হয়েছে অন্যের কাছ থেকে শুনে শুনে বা ধার দেনা করে। প্রচন্ড পরিশ্রম প্রচন্ড কষ্ট করেছেন তিনি জীবনে। এখন একটু সাফল্য পেয়েছেন।
-------
কলম্বাস, ওহাইও

No comments:
Post a Comment