Saturday 1 January 2022

স্বপ্নলোকের চাবি - পর্ব ৫৩

 



#স্বপ্নলোকের_চাবি_৫৩

“এই রেলস্টেশনের স্থপতি কে ছিলেন?” 

কমলাপুর রেলস্টেশনের বিশাল ছাতার আকৃতির ছাদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো প্রদীপ নাথ। “দেখি তোদের বিসিএস পাস করার সম্ভাবনা কতটুকু আছে।“ মুখ থেকে সিগারেটের ধোঁয়া বের করতে করতে আবার বললো সে। তার কাছাকাছি আমরা যারা আছি সবাই প্রশ্নটা শুনেছি। কিন্তু কেউই উত্তর দিচ্ছি না। বিসিএস পাস করার সম্ভাবনা মনে হচ্ছে আমাদের কারোরই নেই। 

ট্রেন থেকে নেমে আমরা সবাই যে যার ব্যাগ হাতে-কাঁধে নিয়ে এখানে এসে দাঁড়িয়েছি। একপাশে সারি সারি টিকেটঘরের সামনে যাত্রীদের ঠেলাঠেলি চলছে। অন্য পাশে একটা চায়ের দোকান, তার পাশে ফ্লোরের অনেকটুকু জায়গা দখল করে পত্রিকা আর ম্যাগাজিন সাজিয়ে বসেছে হকার। সকাল সাড়ে সাতটার কমলাপুর স্টেশন এমনিতেই ব্যস্ত। তার উপর শতাধিক শিক্ষার্থী একসাথে এসে ভীড় করে দাঁড়িয়েছি স্টেশনের বারান্দাজুড়ে। কোলাহল তীব্র থেকে তীব্রতর হতে শুরু করেছে। 

মেইল ট্রেনে আমাদের সাথের অন্যান্য যাত্রীরা যে যার মতো চলে গেছে। আমরা অপেক্ষা করছি বাসের জন্য। ঢাকায় বাসের দায়িত্ব শাকিল আর আমানের। ওরা একদিন আগে ঢাকা চলে এসেছে বাস ঠিক করে রাখার জন্য। এখনো বাস আসেনি বলে কেউ কেউ বিরক্তি প্রকাশ করতে শুরু করলো। কোন কিছুর দায়িত্ব না নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করাটা খুবই সহজ কাজ, এবং আমরা সেই সহজ কাজে খুবই অভ্যস্ত। 

একটু পরেই ছুটতে ছুটতে এলো আমান। বাস এসে গেছে। দুটো বিশাল আকৃতির বাস নিয়ে আসা হয়েছে আমাদের জন্য। এই বাসগুলি আগামী তিন দিন আমাদের বিভিন্ন জায়গায় আনা-নেয়া করবে। শুরুতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কথা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়ামে ছাত্রদের থাকার ব্যবস্থা করা হবে, আর রোকেয়া হলে ছাত্রীদের। 

কমলাপুর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়ামে যেতে বেশিক্ষণ লাগলো না। কিন্তু সেখানে কেউ নেই। গেটে তালা। দারোয়ানও নেই। শিক্ষার্থীরা অধৈর্য। অনেকে হৈচৈ করে নেমে গেল বাস থেকে। দেখলাম আমাদের ক্লাসের শিবিরের যে ক’জন নেতা-কর্মী আছে তারা খুবই উচ্চকন্ঠে বিরক্তি প্রকাশ করছে। হামিদাবানু ম্যাডাম আমাদের থাকার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব নিয়েছেন এটা তাদের পছন্দ হয়নি। 

অবশ্য একটু পরেই তারা সবাই চুপ করে গেল – যখন খেলার মাঠ থেকে একজন দু’জন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এসে আমাদের উদ্দেশ্যে ব্যাঙাত্মক বাক্য নিক্ষেপ করতে শুরু করলো – “সব তো দেখি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।“ “সাহস তো কম নয়, ব্যানার লাগিয়ে চলে এসেছে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে!” “সবগুলাই তো শিবির!” 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবির আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি সেটা আমরা জানি। সেজন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলি অবশ্যই ধন্যবাদ পেতে পারে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের দখলে। কিন্তু তার অর্থ কি এই যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীই শিবিরের প্রতিনিধিত্ব করছে! 

আমাদের থাকার ব্যবস্থা কোথায় হয়েছে আমরা কেউ জানি না। বাসের সামনের সিটে শংকরলালস্যার আর রশীদুন্নবীস্যার চুপচাপ বসে আছেন। তাঁদের কাছাকাছি সিটগুলিতে বসেছে মেয়েরা। রোকেয়া হলে তাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে কি না সে ব্যাপারে তারাও এখনো নিশ্চিত নয়। 

বাস দুটো এখানে রেখে আমান আর শাকিল চলে গেছে একটা ট্যাক্সি নিয়ে। প্রায় আধঘন্টা পরে শাকিল এলো শেষ খবর নিয়ে। আমাদের যেতে হবে বুয়েটের প্যাভেলিয়নে। যাবার পথে মেয়েদের নামিয়ে দেয়া হলো রোকেয়া হলে – সেখানেই তাদের থাকার ব্যবস্থা। 

বুয়েটের বিশাল খেলার মাঠের এক পাশে দোতলা প্যাভেলিয়নের দোতলায় বেশ বড় বড় তিনটা পাশাপাশি রুম। কোন আসবাবপত্র নেই। ফ্লোরে যে যার মতো শোবে। অনেকেই বেডশিট নিয়ে এসেছে। আগের দিনের ইন্ডিয়ান বাংলা সিনেমাতে দেখা যায় - কোথাও যাবার সময় বিছানাপত্র সাথে নিয়ে যায়। এখানে এভাবে থাকতে হবে আগে জানলে বিছানাপত্র নিয়ে আসা যেতো, একটা বেডশিট অন্তত নিয়ে আসতে পারতাম। কিন্তু দেখলাম অনেকেই বেডশিট নিয়ে এসেছে। ফ্লোরে বেডশিট পেতে জায়গা দখল করা হলো। ‘যদি হও সুজন, তেঁতুল পাতায় ন’জন’ – দেখা গেলো এখানে প্রায়-সবাই সুজন। 

কিন্তু এখানে এভাবে থাকাটা শিবিরের নেতাদের জন্য কিছুটা অস্বস্তিকর ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো। তারা তাদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত। তাদের কয়েকজন কর্মী বেশ উচ্চস্বরে হৈচৈ করে বলে উঠলো যে তারা এখানে থাকবে না। 

হামিদাবানুম্যাডাম প্যাভেলিয়নের অফিসে বসেছিলেন বুয়েটের একজন কর্মকর্তার সাথে। শিবিরের হৈচৈ তাঁর কানে গেল। ম্যাডাম অফিস থেকে বের হয়ে বেশ স্পষ্টভাষায় বললেন, “এখানে যারা থাকতে চাও না, তোমরা ইচ্ছে করলে নিজ দায়িত্বে যেখানে খুশি থাকতে পারো। হোটেল কিংবা বাসা – যেখানে খুশি। যেদিন যেখানে যাবার কথা আছে সেখানে তোমরা সময়মতো পৌঁছে গেলেই হবে।“

আমাদের ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে ম্যাডামের উপর শিবিরের ক্যাডাররা আক্রমণ করার সাহস দেখিয়েছিল। কিন্তু এখানে ম্যাডামের কথার উপরে কথা বলার সাহস তাদের নেই। যারা এখানে থাকবে না বলে এতক্ষণ লম্ফঝম্প করছিলো তারা সবাই রয়ে গেল। তবে শিবিরের কিছ উঁচুপর্যায়ের নেতা চুপচাপ কোথায় যেন চলে গেল। তাদেরকে আর কোন কার্যক্রমে দেখা যায়নি। 

শিক্ষাসফরের শিক্ষাকার্যক্রম শুরু হলো একটু পরেই। রাতে একটুও ঘুমানোর সুযোগ হয়নি। ইচ্ছে করছে এখনই ফ্লোরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। কিন্তু সেই সুযোগ নেই। একের পর এক প্রোগ্রাম সেট করা আছে। বুয়েটের ক্যান্টিনে নাস্তা করে একটু ফ্রেশ হয়েই বাসে উঠলাম আবার। 

প্রথম গন্তব্য আণবিক শক্তি কমিশন। শাহবাগের মোড়ে বেশ বড় জায়গা নিয়ে বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের মূল অফিস। অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের বাংলা পারমাণবিক শক্তি কমিশন হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু দেখলাম আণবিক শক্তি কমিশন লেখা আছে। 

দোতলার প্রশস্ত সিঁড়ি দিয়ে উঠে বেশ ছিমছাম চুপচাপ অনেকগুলি ঘরের প্যাসেজ মাড়িয়ে বেশ বড় একটি হলঘরে এসে বসলাম। কিছুক্ষণ পর সম্ভ্রান্ত, সৌম্যদর্শন এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক এলেন। তিনি কমিশনের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিলেন। হামিদাবানু ম্যাডামের কাছে জানলাম ভদ্রলোকের নাম ডক্টর ওয়াজেদ আলী মিয়া। শেখ হাসিনার স্বামী। 

ব্রিফিং শেষে আমরা কমিশনের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট – হেল্‌থ ফিজিক্স, থিওরেটিক্যাল ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, নন-ডেসট্রাকটিভ টেস্টিং ডিভিশান, ভ্যান-ডি-গ্রাফ এগুলি ঘুরে ঘুরে দেখলাম। ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে অনেকটা ছুটোছুটি করে ভিড়ের মধ্যে ক্লান্ত হয়ে কোনরকমে প্রথম পর্ব শেষ করলাম। 

এরপরই বাসে উঠে রওনা দিলাম সাভারের উদ্দেশ্যে। আণবিক শক্তি কমিশনের রি-অ্যাক্টর দেখার জন্য। 

ক্ষিধেয় পেট জ্বলে যাচ্ছিলো। চোখভর্তি ঘুম। এর মধ্যেই প্রোগ্রামের পর প্রোগ্রাম। আড়াইটার দিকে সাভার বাজারে বাস থামানো হলো দুপরের খাবারের জন্য। খাবার ব্যবস্থা যারটা তার। এখানে অনেকগুলি রেস্টুরেন্ট আছে। খাবার পেতে সমস্যা হলো না। 

সাভারের নিউক্লিয়ার এনার্জি রিসার্চ সেন্টারে আমাদের শিডিউল করা ছিল সকাল সাড়ে এগারটায়। আমরা পৌঁছলাম বিকেল চারটায়। গেটে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন মিলিটারিরা। আনুষঙ্গিক কাগজপত্র চেক করতে এবং আমাদের পেছনের গাড়ির জন্য অপেক্ষা করতে করতে আরো কিছুক্ষণ দেরি হলো। 

ভেতরে অনেক জায়গা নিয়ে রি-অ্যাক্টর বিল্ডিং – অনেক বেশি চুপচাপ। চারদিকে প্রচুর খালি জায়গা। রি-অ্যাক্টর বিল্ডিং-এর বড় প্যাসেজ ধরে আমরা উঠে এলাম মূল রিঅ্যাক্টর এর একেবারে উপরে। নিচ থেকে তিন-তলার সমান উঁচু। মূলত রেডিও-আইসোটোপ তৈরি করা হয় এখানে। হলুদ আলোর বন্যায় ভেসে যাচ্ছে রি-অ্যাক্টর এর চারপাশ। 

এখানকার বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা ব্রিফিং দিচ্ছিলেন কী কী গবেষণা হচ্ছে ইত্যাদি সম্পর্কে। কিন্তু ভালোভাবে কিছু শুনতে পেলাম না। আমরা সংখ্যায় এত বেশি যে সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করে বোঝানো সহজ নয়। তাছাড়া এসব ব্যাপারে আমাদের আগে থেকে কোন তাত্ত্বিক প্রস্তুতি নেয়ার সুযোগ দেয়া হয়নি। এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলি সম্পর্কে আমাদেরকে যদি ডিপার্টমেন্টেই কিছু তথ্য দেয়া হতো – আমাদের শিক্ষাসফর আরো কার্যকরী হতো। 

হামিদাবানুম্যাডাম বললেন এখলাসস্যারসহ তিনি এখানে আট বছর চাকরি করেছিলেন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়ার আগে। তাঁর বড়ছেলেও এখানে দেড় বছর চাকরি করার পর এখন আমেরিকায় পিএইচডি করছেন। 

নিউক্লিয়ার সেন্টার থেকে বের হয়ে পড়ন্ত বিকেলে পৌঁছে গেলাম জাতীয় স্মৃতিসৌধে। বিশাল এলাকাজুড়ে এই স্মৃতিসৌধ। সামনে বিস্তীর্ণ চত্বর – লাল ইটে বাঁধানো। এই স্মৃতিসৌধ আমাদের মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত স্মারক। একটা ভাবগম্ভীর পরিবেশ থাকার কথা এখানে। কিন্তু আয়োজন করে শোক প্রকাশ করতে গেলেও তা উৎসবে পরিণত হয়। আমাদের স্মৃতিসৌধও হয়ে গেছে একটা বেড়ানোর জায়গা। ছবি তোলার জায়গা। ভয়ে ভয়ে ছিলাম প্রদীপ নাথ আবার এই স্মৃতিসৌধের স্থপতির নাম জিজ্ঞেস করে কি না। কিন্তু সে স্যার-ম্যাডামদের চোখ এড়িয়ে সিগারেট খাওয়ার ব্যবস্থা করতে করতে স্থপতির নাম জিজ্ঞেস করতে ভুলে গিয়েছিল। 

প্যাভেলিয়নে ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। সারাদিনের ক্লান্তির পর ফ্লোরে পিঠ ঠেকাতেই ঘুম। সবাই এত ক্লান্ত ছিলাম যে কে কার পাশে ঘুমাচ্ছে তারও কোন হিসেব ছিল না। 

পরদিন আরো টাইট শিডিউল। দুই গ্রুপে ভাগ করা হলো। একটা গ্রুপ যাবে বাংলাদেশ টেলিভিশনে, অন্যগ্রুপ গাজীপুর মেশিন টুল্‌স ফ্যাক্টরি দেখার জন্য। শংকরস্যার আর রশীদুন্নবীস্যারের তত্ত্বাবধানে একটি বাস চলে গেল রামপুরা টেলিভিশনে। আমরা হামিদাবানুম্যাডামের তত্ত্বাবধানে চললাম গাজীপুরের মেশিন টুল্‌স ফ্যাক্টরিতে। 

বিশাল জায়গা নিয়ে এই কারখানা। এদিকে এখনো অনেক খালি জায়গা। ঢাকা থেকে আসার পথের দুই পাশে অনেক গাছপালা – বেশ সুন্দর। ভিজিটরদের তালিকায় আমাদের ইউনিভার্সিটির নাম লেখা আছে। প্রবেশে কোন সমস্যা হলো না। ফ্যাক্টরি অফিস থেকে আমাদের জন্য গাইড দেয়া হলো। তিনি আমাদের সবকিছু দেখালেন। আজ সংখ্যায় অর্ধেক হওয়াতে সুবিধা হয়েছে। অন্য গ্রুপ আগামীকাল আসবে এখানে। 

এই ফ্যাক্টরি উৎপাদন শুরু করেছে ১৯৮১ থেকে। বছরে প্রায় ১৫০০ মেট্রিক টন উৎপাদন। মোট জনশক্তি অফিসারসহ ১১২ জন। দুটো সেকশানের একটিতে বিভিন্ন প্যাটার্নের যন্ত্রপাতি – বিশেষ করে রেলওয়ে, শিপিং, টেক্সটাইল ইত্যাদির যন্ত্রপাতি তৈরি করে। অন্য সেকশানে তৈরি হয় রড় আর স্ক্রু। এখানে কাজের ক্ষেত্রে বিরাট ঝুঁকি আছে দেখলাম। টকটকে লাল গরম লোহা চিমটার সাহায্যে হাতে ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে শ্রমিকরা। ঢালাই মেশিনে গলন্ত লোহা ছিঁটকে পড়ছে। শ্রমিকদের গায়ের শার্টে অসংখ্য ছিদ্র। শরীরেও হয়তো প্রতিদিন ফোসকা পড়ছে। 

মেশিন টুল্‌স ফ্যাক্টরি থেকে বের হয়ে আবার বাস। এবার গেলাম স্পারসো – বাংলাদেশ স্পেস রিসার্চ অ্যান্ড রিমোট সেন্সিং অর্গানাইজেশান। বাংলাদেশের মহাকাশ বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রে। ১৯৮০ সালে এই প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করেছে। মহাকাশ নিয়ে আমাদের দেশে কী কী গবেষণা হচ্ছে সে সম্পর্কে কোন ধারণাই ছিল না আমার। এখানকার একজন অফিসার ওবায়দুল কাদের – আমাদের ডিপার্টমেন্ট থেকে পাস করেছিলেন অনেক বছর আগে। তিনি আমাদের বিভিন্ন সেকশান ঘুরিয়ে দেখালেন। স্পারসো বিল্ডিং-এর সামনে বেশ বড় একটা গোলাকার অ্যান্টেনা আছে। ওটার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলাতেই বেশি আগ্রহ দেখা গেল সবার। 

স্পারসোর পাশেই আবহাওয়া অফিস। আমাদের অন্যদল যারা সকালে টেলিভিশন ভবনে গিয়েছিল – তারা ফিরে এসে আমাদের সাথে যোগ দিলো। সবাই মিলে ঢুকলাম আবহাওয়া অফিসে। রাডার সম্পর্কে আমরা ক্লাসে পড়েছি। এখানে তার কাজকর্ম দেখার সুযোগ। রাডার দশতলার উপরে। কিন্তু লিফ্‌ট বন্ধ। রশীদুন্নবীস্যার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করলেন। তিনি এই বয়সে সিঁড়ি বেয়ে উঠে যাবেন দশ তলা পর্যন্ত? সম্ভবত উঠেই যেতেন। কিন্তু তিন তলায় ওঠার পর ওখান থেকে লিফ্‌ট চালু আছে। দশ তলায় উঠে রাডার রুমে ঢুকলাম। এই রাডারটার রেঞ্জ চারশ কিলোমিটার। এখান থেকে নেমে আরেকটি বিল্ডিং-এ গেলাম। এখান থেকে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়া হয়। আড়াইটায় এই অফিস ছুটি হয়ে যায়। কিন্তু আমরা পৌঁছেছি আড়াইটার পর। তারপরও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা আমাদের অনেককিছু দেখালেন। কিন্তু স্যাররা তাগাদা দিয়ে আমাদেরকে বের করে নিয়ে এলেন। 

সন্ধ্যায় আরো প্রোগ্রাম আছে। আগারগাঁও-এ বেতারভবনে গেলাম। গেটে সবার ব্যাগ চেক করা হলো। সব ক্যামেরা রেখে দেয়া হলো। নতুন একটি মিলনায়তন তৈরি করা হয়েছে। আমাদেরকে সেখানে বসানো হলো। রেডিও বাংলাদেশ ঢাকার আঞ্চলিক পরিচালক ফখরুল ইসলাম আমাদের সাথে বাংলাদেশ রেডিও’র বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বললেন। বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরও দিলেন। সুযোগ পেয়ে তাঁকে প্রশ্ন করলাম – বাংলাদেশের রেডিও-টেলিভিশনের স্বায়ত্বশাসনের কতদূর কী হলো? তিনি সরাসরি বললেন, “আমি সরকারি চাকরি করি। আমার পক্ষে এই ব্যাপারে কথা বলা সম্ভব নয়।“ এখান থেকেই বোঝা গেল স্বায়ত্বশাসনের অবস্থা কী। রেডিওর বিভিন্ন সেকশান ঘুরে দেখলাম। রেকর্ডিং স্টুডিওতে দেখা হলো ফরিদুর রেজা সাগরের সাথে। সন্ধা ছ’টার খবর প্রচার দেখলাম। রেহানা পারভীন খবর পড়লেন। ঘোষক সাইফুল ইসলাম রেজার সাথে পরিচয় হলো। 

পরদিন অর্থাৎ তৃতীয় দিন রাতের ট্রেনে আমাদের ফিরে আসার কথা। কিন্তু সারাদিনে অনেক প্রোগ্রাম আছে। সকালে গেলাম রামপুরা টেলিভিশনে। গেটেই আমাদের সব জিনিসপত্র দেখে দেয়া হলো। টিভি ভবনের কোথাও ছবি তোলা যাবে না। দোতলায় একটা মিটিং রুমে নিয়ে যাওয়া হলো আমাদের। প্রোগ্রাম ম্যানেজার এ কে কোরেশী সাহেব এলেন। টেলিভিশনে তাঁকে অনেকবার দেখেছি। তিনি খুব সুন্দর করে কথা বলেন। বিটিভির ইতিহাস তিনি খুব সংক্ষেপে অথচ চমৎকারভাবে বললেন। 

এরপর টেলিভিশনের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরিয়ে দেখানোর ব্যবস্থা করা হলো। লাইব্রেরি, শ্যুটিং, এডিটিং, নিউজ সেকশান – সব ঘুরে ঘুরে অনেক ক্লান্ত হয়ে গেলাম। মনে করেছিলাম টেলিভিশনের নায়ক-নায়িকাদের দেখা পাবো। তাদের কাউকেই দেখলাম না কোথাও। 

আমাদের এর পরের প্রোগ্রাম টঙ্গিতে টেলিফোন শিল্প সংস্থা দেখা। যখন পৌঁছলাম তখন প্রচন্ড রোদ। টঙ্গীর বাজারে বাস থামিয়ে রেস্টুরেন্টে ঢুকে দ্রুত দুপুরের খাওয়া সেরেই টেলিফোন শিল্প সংস্থায়। টেলিফোনের স্ক্রু থেকে শুরু করে তার পর্যন্ত সবকিছুই এখানে তৈরি করা হয়। টি এন্ড টি থেকে একটা টেলিফোন সংযোগ পেতে হলে কত কাঠখড় যে পোড়াতে হয়। এখানে এত এত টেলিফোন সেট তৈরি করা হচ্ছে – এগুলির বাজার কোথায় কে জানে। 

মূলভবনে ঢুকার জন্য আমাদের সাথে একজন গাইড দেয়া হলো। গাইড ভদ্রলোক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। দেখলাম তিনি দ্রুতপদস্থও বটেন। এত দ্রুত হাঁটেন, এত দ্রুত কথা বলেন – আমরা তাঁর পেছনে হাঁটতে হাঁটতেই ক্লান্ত হয়ে গিয়েছি, তাঁর কথা কিছুই বুঝতে পারিনি। 

ফ্যাক্টরি দেখানোর পর আমাদেরকে অডিটরিয়ামে বসিয়ে চা-বিস্কুট খাওয়ানো হলো। তার সাথে আরো কিছু তথ্যও দেয়া হলো। বাংলাদেশে এই ১৯৯২ সালেও কোন ডিজিটাল টেলিফোন এক্সচেঞ্জ নেই। যতগুলি টেলিফোন আছে সবগুলিই অ্যানালগ এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে চলে। ডিজিটাল সিস্টেম চালু হলে এই শিল্প সংস্থার ভবিষ্যৎ কী হবে জানি না। 

এর পরেও প্রোগ্রাম ছিল শাহবাগের জাদুঘর দেখার। জাদুঘরের সামনে গিয়ে দেখি জাদুঘর বন্ধ। বৃহস্পতিবার, সাপ্তাহিক ছুটি। কিন্তু আহসান হাবীব দীপকের দায়িত্ব ছিল ছুটির দিনেও জাদুঘর দেখানোর ব্যবস্থা করার। সে ব্যবস্থা করার জন্য ভেতরে গিয়েওছিল। কিন্তু সবাই অধৈর্য হয়ে বাস থেকে নেমে যে যার মতো গ্রুপ করে এদিক সেদিক ছড়িয়ে পড়লো। শিক্ষাসফরের নাম দিয়ে আমরা পিকনিক করতে পছন্দ করি। সেখানে একটার পর একটা শিক্ষামূলক প্রোগ্রাম ভালো লাগে? 

No comments:

Post a Comment

Latest Post

Memories of My Father - Part 2

  In our childhood and even in our adulthood, there was no tradition of celebrating birthdays. We didn't even remember when anyone's...

Popular Posts