Saturday 28 October 2023

মহাবিশ্বের গোপন রহস্য: ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি

 




বিংশ শতাব্দীর শেষে অনেকেই ভেবেছিলেন একবিংশ শতাব্দীতে এসে বিজ্ঞানীদের হাতে আবিষ্কারের জন্য সেরকম জটিল কোন সমস্যা থাকবে না। এরকম ধারণা ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষেও হয়েছিল অনেকের। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের স্থপতি পদার্থবিজ্ঞানী ম্যাক্স প্ল্যাংক যখন ছাত্রজীবনে পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করতে আগ্রহী হচ্ছিলেন, তখন মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ফিলিপ জোলি প্ল্যাংককে বলেছিলেন, “ফিজিক্স পড়ে কী করবে? ফিজিক্সের সবকিছুই তো আবিষ্কৃত হয়ে গেছে।“ অথচ আমরা দেখলাম বিংশ শতাব্দীর পুরোটাই ছিল পদার্থবিজ্ঞানের নতুন নতুন দিক আবিষ্কারের শতক। বিংশ শতাব্দীতেই আবিষ্কৃত হয়েছে কোয়ান্টাম মেকানিক্স; আইনস্টাইনের বিশেষ ও সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব বদলে দিয়েছে আমাদের মহাবিশ্বের সমস্ত হিসেবনিকেশ; মানুষ যে শুধুমাত্র আকাশভ্রমণ শুরু করেছে তা নয় - মানুষের তৈরি স্যাটেলাইট পৌঁছে গেছে আমাদের দৃশ্যমান আকাশ ছাড়িয়ে আকাশান্তরে, চাঁদের বুকে হেঁটে এসেছে মানুষ। মহাকাশে ঘুরে ঘুরে অত্যাধুনিক দুরবিন খুঁজে নিয়ে এসেছে মহাবিশ্বের কোটি আলোকবর্ষ দূরের নক্ষত্রের আলো। আমরা জেনে গেছি মহাবিশ্বের উৎপত্তির গোড়ার কথা। বিজ্ঞানীরা হিসেব করে বের করে ফেলেছেন মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর বা ১৩৮০ কোটি বছর। কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড শনাক্ত করার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা পেয়ে গেছেন মহাজাগতিক প্রথম আলোর সন্ধান – যেখান থেকেই শুরু হয়েছিল মহাবিশ্বের বেড়ে ওঠার পালা। বিংশ শতাব্দীর শেষে তাই অনেকেই ভেবেছিলেন পদার্থবিজ্ঞানের কোন সমস্যা অমীমাংসিত থাকবে না, একবিংশ শতাব্দী হবে মূলত জীববিজ্ঞানের শতাব্দী – যেখানে জানা যাবে মহাবিশ্বে প্রাণের উদ্ভবের মূল কারণ এবং মানুষের জীববৈজ্ঞানিক ভবিষ্যৎ কী। 

কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তির আকাশচুম্বী সাফল্য এবং বিস্তারের পরেও বিজ্ঞানীদের হাতে এমন অনেক সমস্যা রয়ে গেছে যাদের সমাধানের ব্যাপারে কোন কূলকিনারা পাচ্ছেন না তাঁরা। বিজ্ঞানে এরকম ব্যাপারগুলি অনেকটা রহস্যকাহিনির ঘটনার মতো। যখনই মনে হয় যে রহস্যের সমাধান হয়ে গেছে, তখনই দেখা যায় রহস্য নতুন দিকে মোড় নিচ্ছে। আমাদের মহাবিশ্ব আমাদেরকে এরকমই রহস্যের আবরণে জড়িয়ে দিচ্ছে বারবার। 

যে মহাবিশ্বে আমরা বাস করি – কী আশ্চর্য সুন্দর  তার অবয়ব যেটুকু আমরা দেখতে পাই। কিন্তু মহাবিশ্বের ঠিক কতটুকু আমরা দেখতে পাই? প্রাগৈতিহাসিক যুগে যখন চোখ ছাড়া অন্য কোন ব্যবস্থা ছিল না মানুষের দেখার, সেই সময় খালিচোখে আকাশ দেখেই মানুষ ভেবে নিয়েছিল আকাশই মহাবিশ্বের শেষ সীমানা। তখন মনে হতো মহাবিশ্বের পুরোটাই আমরা দেখতে পাই আকাশের দিকে তাকিয়ে। যেন প্রকৃতি আকাশের বুকে সূর্যতারাখচিত চাদরের মতো বিছিয়ে দিয়েছে পুরো মহাবিশ্বকে। তখন মনে হতো আমরা মহাবিশ্বের পুরোটাই দেখতে পাই। 

তার কয়েক হাজার বছর পর মানুষ যখন মহাকাশ জয় করে ফেললো, গ্রহ-নক্ষত্র ছাড়িয়ে মানুষের তৈরি নভোযান পাড়ি দিল আমাদের সৌরজগত থেকে  অন্য নক্ষত্রপুঞ্জে, এক গ্যালাক্সি থেকে অন্য গ্যালাক্সির দিকে – আমরা জানতে পারলাম কী প্রচন্ড গতিশীল আমাদের গ্রহ-নক্ষত্র-গ্যালাক্সিসহ পুরো মহাবিশ্ব। মহাবিশ্বের যত বেশি তথ্য এবং উপাত্ত বিজ্ঞানীদের হাতে আসতে শুরু করলো, মহাবিশ্বের রহস্য ততবেশি উদ্‌ঘাটিত হয়ে যাবার কথা ছিল। কিন্তু দেখা গেলো মহাবিশ্ব নতুন নতুন রহস্যের চাদরে নিজেকে ঢাকতে শুরু করলো। এই একবিংশ শতাব্দীর সিকিভাগ পার করার মুহূর্তে আমরা এই মহাবিশ্বের শতকরা পঁচানব্বই ভাগ বস্তু ও শক্তি সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছুই জানি না।  

বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক হিসেব অনুযায়ী এই মহাবিশ্বের শতকরা পঁচানব্বই ভাগই অদৃশ্য। এতবড় মহাবিশ্বের দৃশ্যমান কোটি কোটি গ্রহ-নক্ষত্র-গ্যালাক্সি সবকিছুকে একসাথে যোগ করলে মহাবিশ্বের মাত্র পাঁচ ভাগ হয়, বাকি পঁচানব্বই ভাগ যে কীভাবে লুকিয়ে আছে তা এক অধরা রহস্য। এই পঁচানব্বই ভাগকে দেখার কোন উপায় নেই। 

কোনো কিছু দেখতে হলে আলো কিংবা তড়িৎচুম্বক তরঙ্গের সাথে সেই বস্তুর মিথষ্ক্রিয়া ঘটতে হয়। মহাবিশ্বের পঁচানব্বই ভাগ বস্তু এবং শক্তির সাথে আলো কিংবা তড়িৎচুম্বক তরঙ্গের কোন মিথষ্ক্রিয়া ঘটে না। ফলে তাদেরকে দেখার কোন উপায় বিজ্ঞানীরা এখনো বের করতে পারেননি। তাই অদৃশ্য অংশের নাম ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জি। মহাবিশ্বের এই অদৃশ্য অংশের তেইশ ভাগ ডার্ক ম্যাটার এবং বাহাত্তর ভাগ ডার্ক এনার্জি। ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জি দুটো সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। এদের কাজ আলাদা, ইতিহাস আলাদা। শুধুমাত্র নামের মিল ছাড়া এদের মধ্যে আর কোন পারস্পরিক সম্পর্ক নেই।  

অবশ্য ডার্ক নামটি যুৎসই হয়নি। আলোর সাথে কোন মিথস্ক্রিয়া করে না বলে এদের নাম হওয়া উচিত ছিল ট্রান্সপারেন্ট বা স্বচ্ছ। অদৃশ্য বস্তু বোঝাতে ডার্ক ম্যাটার নামটি দিয়েছিলেন সুইডিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্রিৎজ জুইকি ১৯৩৩ সালে। তারই অনুকরণে অদৃশ্য শক্তি বোঝানোর জন্য ডার্ক এনার্জি নাম দিয়েছেন আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী মাইকেল টারনার ১৯৯৮ সালে। সে হিসেবে ডার্ক এনার্জি তুলনামূলকভাবে খুবই সাম্প্রতিক বিষয়। 

প্রথমে দেখা যাক ডার্ক ম্যাটারের ব্যাপারস্যাপার কী।  

বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের আকার এবং আকৃতি মাপার চেষ্টা করে যাচ্ছেন কয়েক শতাব্দী থেকে। সপ্তদশ শতকে আইজাক নিউটনের মহাকর্ষের সূত্র আবিষ্কারের পর গ্রহ-উপগ্রহ-নক্ষত্রসহ মহাবিশ্বের সবকিছুর ভর এবং গতিপ্রকৃতি নির্ণয়ের উপায় মানুষের হাতে চলে এলো। মহাবিশ্বের সমস্ত বস্তু একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট হয় মহাকর্ষ বলের কারণে। নিউটনের গতির সূত্র থেকে ত্বরণ ও বল জানা থাকলে আমরা বস্তুর ভর মাপতে পারি। মহাকর্ষ বলের টানে গ্রহ-নক্ষত্রগুলির গতির পরিবর্তন হিসেব করে গ্রহ-নক্ষত্রের ভর হিসেব করতে সক্ষম হলেন বিজ্ঞানীরা। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে নিউটনের সূত্রে হিসেবে বাগড়া দিতে আবিষ্কৃত হলো আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব। নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র অনুসারে মহাবিশ্বের বস্তুগুলি যদি পরস্পরের আকর্ষণে একে অপরকে কাছে টানতে থাকে, তাহলে মহাবিশ্ব ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাবার কথা। কিন্তু তা তো হচ্ছে না। 


আলবার্ট আইনস্টাইন


১৯১৫ সালে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সার্বিক তত্ত্ব প্রকাশিত হলে এই সমস্যার এক রকম সমাধান হয়ে যায়। আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি বা আপেক্ষিকতার সার্বিক তত্ত্ব মহাকর্ষ বলের সংজ্ঞাই বদলে দেয়। নিউটনের মহাকর্ষ বল শুধুমাত্র বস্তুর গতির পরিবর্তন ঘটায়, কিন্তু আইনস্টাইনের মহাকর্ষ বল বস্তুর গতির সাথে স্থান-কাল (স্পেস-টাইম)ও বদলে দেয়। আপেক্ষিকতার সার্বিক তত্ত্বের জটিল গাণিতিক সমীকরণ সমাধান করে দেখা গেলো মহাবিশ্ব ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে। আইনস্টাইন ভাবলেন এটা অস্বাভাবিক। তিনি মহাবিশ্বের আয়তন স্থির রাখার জন্য ১৯১৭ সালে তাঁর আপেক্ষিকতার সার্বিক তত্ত্বের সমীকরণে একটি ধ্রুবক (কসমোলজিক্যাল কন্সট্যান্ট) বসিয়ে দিলেন। ফলে গাণিতিক হিসেবে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ বন্ধ করা গেলো। 

কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। এক যুগ পরেই দেখা গেলো আইনস্টাইনের প্রাথমিক হিসেবই ঠিক ছিল। ১৯২৯ সালে আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডুইন হাবল আবিষ্কার করলেন যে মহাবিশ্ব ক্রমশ সম্প্রসারিত হচ্ছে। হাবল মহাবিশ্বের গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। কোটি কোটি নক্ষত্রপুঞ্জের সমষ্টি একেকটি গ্যালাক্সি থেকে যখন আলো এসে পৌঁছায় টেলিস্কোপে, সেই আলোর বর্ণালী বিশ্লেষণ করে জানা যায় – গ্যালাক্সিটি পৃথিবী থেকে কত দূরে, কত বেগে ঘুরছে। আলো তড়িৎচুম্বক তরঙ্গ। দৃশ্যমান আলোর লাল বর্ণের তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে বেশি, বেগুনি আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে কম। আলোর উৎস যদি টেলিস্কোপ থেকে যত দূরে চলে যেতে থাকে, আলোর তরঙ্গ ততই সম্প্রসারিত হতে থাকে। ফলে তরঙ্গদৈর্ঘ্য বাড়তে থাকে। তরঙ্গদৈর্ঘ্য বাড়তে থাকা মানে তা ক্রমশ লাল বর্ণের দিকে সরে যাওয়া। তাই পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে বলে রেডশিফ্‌ট বা লোহিত সরণ। আবার আলোর উৎস যদি কাছে আসতে থাকে, তাহলে আলোর তরঙ্গ সংকুচিত হয়ে তরঙ্গদৈর্ঘ্য কমে যায়। অর্থাৎ তখন আলো ক্রমশ নীল কিংবা বেগুনির দিকে সরতে থাকে। তাকে বলা হয় ব্লু শিফ্‌ট বা নীল সরণ। রেড শিফ্‌ট দেখে বোঝা যায় আলো দূরে চলে যাচ্ছে, ব্লু শিফ্‌ট দেখে বোঝা যায় আলো কাছে আসছে। 


এডুইন হাবল


এডুইন হাবল দেখলেন যে দূরের গ্যালাক্সিগুলি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে দূরে চলে যাচ্ছে। তার মানে মহাবিশ্ব ক্রমশ সম্প্রসারিত হচ্ছে। আইনস্টাইন এই ফলাফল দেখে বুঝতে পারলেন তিনি শুরুতেই ঠিক ছিলেন। তাঁর কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্ট না বসালেই ঠিক ছিল। 

এডুইন হাবলের আবিষ্কারের পর আরো অনেক জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালাক্সির গতি পর্যবেক্ষণ শুরু করলেন। ১৯৩৩ সালে সুইজারল্যান্ডের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্রিৎজ জুইকি ক্যালিফোর্নিয়া ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির মানমন্দিরের টেলিস্কোপে পর্যবেক্ষণ করছিলেন ৩০ কোটি আলোকবর্ষ দূরের গ্যালাক্সিগুচ্ছ ‘কোমা ক্লাস্টার’-এর গতিপ্রকৃতি। এক হাজারের বেশি গ্যালাক্সির এই গুচ্ছের গ্যালাক্সিগুলি থেকে আসা আলোর বর্ণালী পর্যবেক্ষণ করে ফ্রিৎজ জুইকি অবাক হয়ে গেলেন। বর্ণালীর লোহিত সরণ হিসেব করে দেখলেন যে গ্যালাক্সিগুলি অস্বাভাবিক দ্রুত গতিতে ঘুরছে, কিন্তু গুচ্ছ থেকে ছিটকে বের হয়ে যাচ্ছে না। একটি নির্দিষ্ট মাত্রার গতির বেশি গতিতে ছুটলে বস্তু মাধ্যাকর্ষণ অতিক্রম করে বের হয়ে যায় – যাকে এসকেপ ভেলোসিটি বা মুক্তিবেগ বলে। যেমন পৃথিবী থেকে রকেট উৎক্ষেপণ করার সময় তা পৃথিবীর মুক্তিবেগের (সেকেন্ডে ১১.২ কিলোমিটার বা ঘন্টায় ৪০,৩২০ কিলোমিটার) বেশি বেগে উৎক্ষেপণ করতে হয়। 


ফ্রিৎজ জুইকি


জুইকি গ্যালাক্সিগুলির মোট ভর হিসেব করে দেখলেন – সেই ভরে গ্যালাক্সিগুলির মুক্তিবেগ যত হওয়া দরকার, গ্যালাক্সিগুলি তার চেয়ে অনেক বেশি বেগে ঘুরছে, তবুও ছিটকে বের হয়ে যাচ্ছে না গ্যালাক্সি থেকে। তার কারণ কী? বার বার হিসেব করেও হিসেবে কোন ভুল পেলেন না। তাহলে নিশ্চয় সেখানকার মাধ্যাকর্ষণ শক্তি অনেক বেশি। মাধ্যাকর্ষণ শক্তি বেশি হওয়ার একটিই কারণ হতে পারে – সেটা হলো গ্যালাক্সিগুচ্ছের ভর অনেক বেশি। কিন্তু দৃশ্যমান পদার্থের ভর হিসেব করে যা পাওয়া গেলো তার চেয়ে চল্লিশ গুণ বেশি ভর হলে তবেই গ্যালাক্সিগুলি ঐ বেগে ছুটতে পারে। এত বিশাল পরিমাণ বস্তু কোথায় গেলো? জুইকি জার্মান ভাষায় এই অদৃশ্য বস্তুর নাম দিলেন ‘ডাংকল ম্যাটেরি’ যা ইংরেজিতে হলো ‘ডার্ক ম্যাটার’। 

জুইকির এত বড় আবিষ্কারের দিকে খুব একটা মনযোগ গেলো না তেমন কারো। ইওরোপ আমেরিকা তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গোড়ায় উপস্থিত। নিউক্লিয়ার ফিজিক্স নিয়ে মেতে উঠেছে প্রায় সবাই। জুইকির আবিষ্কারের বছরখানেক আগে নেদারল্যান্ডের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইয়ান ওর্ট-ও একই ধরনের ফলাফল পেয়েছিলেন আমাদের নিজেদের গ্যালাক্সি – মিল্কিওয়ে পর্যবেক্ষণ করার সময়। মিল্কিওয়ের অনেকগুলি লেজের দিকের অনেকগুলি নক্ষত্র এতবেগে ঘুরছে যে ওগুলির ভর যদি যা দেখা যাচ্ছে তা হয়, তাহলে  মিল্কিওয়ে থেকে ছিটকে বের হয়ে যাবার কথা। কিন্তু তা হচ্ছে না, অর্থাৎ সেখানেও যত বস্তু দেখা যাচ্ছে – তার চেয়ে অনেক বেশি বস্তু অদৃশ্য রয়ে গেছে। বছর চারেক পর ১৯৩৭ সালে আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী সিনক্লেয়ার স্মিথ পাঁচ কোটি আলোকবর্ষ দূরের ‘ভার্গো ক্লাস্টার’ গ্যালাক্সিগুচ্ছ পর্যবেক্ষণ করেও একই রকম ফল পেয়েছিলেন। কিন্তু সিনক্লেয়ার স্মিথ তাঁর গবেষণা আরও এগিয়ে নিয়ে যাবার আগেই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং তার পরবর্তী স্নায়ুযুদ্ধের কারণে ডার্ক ম্যাটার নিয়ে আর কেউ তেমন মাথা ঘামাননি পরবর্তী ত্রিশ বছর। 

১৯৭৫ সালে আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী ভেরা রুবিন অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির নক্ষত্রগুলির উপর তাঁর পর্যবেক্ষণের বিস্তারিত ফলাফল প্রকাশ করার পর জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা গুরুত্বদিয়ে বিবেচনা করতে শুরু করলেন ডার্ক ম্যাটার সম্পর্কে। 


ভেরা রুবিন


ভেরা রুবিন খুবই বিস্তারিত গবেষণা করেছিলেন অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির নক্ষত্রগুলিকে নিয়ে। মিল্কিওয়ে, অ্যান্ড্রোমিডা – এরকম চ্যাপ্টা সর্পিলাকার গ্যালাক্সিগুলিতে বেশিরভাগ নক্ষত্রই গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অবস্থান করে, ফলে গ্যালাক্সির ভরের বেশিরভাগই এর কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকে। গ্যালাক্সির কিনারায় এবং লেজের দিকে যে নক্ষত্রগুলি থাকে নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ সূত্র অনুযায়ী তাদের উচিত কেন্দ্রের নক্ষত্রগুলির তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম গতিতে ঘোরা। যেমন আমাদের সূর্যকে কেন্দ্র করে যেসব গ্রহ ঘুরছে – সূর্য থেকে তাদের দূরত্ব বাড়ার সাথে সাথে তাদের ঘূর্ণনের গতি কমে যায়। যেমন বুধ যে গতিতে সূর্যের চারপাশে ঘোরে (সেকেন্ডে ৪৭.৯ কিলোমিটার), বৃহস্পতির গতি তার তুলনায় অনেক কম (সেকেন্ডে ১৩.১ কিলোমিটার)। কিন্তু ভেরা রুবিন হিসেব করে দেখলেন গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে দূরের নক্ষত্রগুলির ঘূর্ণনের গতি কেন্দ্রের কাছের নক্ষত্রগুলির গতির প্রায় সমান। তার মানে নিশ্চয় গ্যালাক্সিতে এমন কোন বস্তু আছে – যার প্রভাবে মাধ্যাকর্ষণ বল তৈরি হচ্ছে, কিন্তু বস্তুগুলি দেখা যাচ্ছে না কিছুতেই। পরবর্তী পাঁচ বছরে ভেরা রুবিন আরো শতাধিক গ্যালাক্সির নক্ষত্রগুলি পর্যবেক্ষণ করে একই ধরনের ফলাফল পেলেন। 

বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হলেন যে গ্যালাক্সিগুলিতে এমন কিছু অদৃশ্য বস্তু ‘ডার্ক ম্যাটার’ আছে যেগুলি গ্যালাক্সির মাঝখানে কেন্দ্রিভূত থাকার বদলে পুরো গ্যালাক্সিজুড়ে ছড়িয়ে আছে – যার ফলে গ্যালাক্সির সব জায়গায় সমান মাধ্যাকর্ষণ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু অদৃশ্য বস্তুগুলি কোন ধরনের আলোর সাথেই কোন মিথষ্ক্রিয়া করে না। সেই থেকে অবিরাম চেষ্টা করেও বিজ্ঞানীরা ডার্ক ম্যাটার শনাক্ত করতে পারেননি, বা গবেষণাগারেও তৈরি করতে পারেননি। কিন্তু গ্রাভিটেশানাল লেন্সিং অর্থাৎ মহাকর্ষ বলের প্রভাবে ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতির প্রমাণ পাচ্ছেন অহরহ। 

গ্রাভিটেশানাল লেন্সিং ব্যাপারটা হলো – যখন অনেকগুলি গ্যালাক্সি একসাথে থাকে – তখন সামনের গ্যালাক্সিগুলি থেকে আলো দেখা গেলেও, পেছনের গ্যালাক্সিগুলির আলো সামনের গ্যালাক্সিগুলির কারণে দেখা যায় না। কিন্তু তাদের ভরের কারণে সৃষ্ট মাধ্যাকর্ষণের কারণে পেছনের গ্যালাক্সিগুলির আলো বেঁকে গিয়ে সামনের গ্যালাক্সিগুলির কিনারা দিয়ে বের হয়ে আসে। ভর যত বেশি হবে, মাধ্যাকর্ষণ তত বেশি হবে, আলোও তত বেশি বেঁকে যাবে। তাই আলো কতটুকু বেঁকে গেলো তা হিসেব করে কতটুকু বস্তু সেখানে আছে তা হিসেব করা যায়। গ্যালাক্সিগুলির দৃশ্যমান বস্তুর সমস্ত ভর একত্রিত করলেও আলোর যতটুকু বেঁকে যাওয়ার কথা, গ্যালাক্সিগুলিতে তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে বেঁকে যাচ্ছে আলো। তাতে এটাই প্রমাণিত হয় যে, গ্যালাক্সিগুলিতে হিসেবের চেয়ে কমপক্ষে ছয়গুণ বেশি বস্তু আছে। এই বস্তুগুলি অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটার। 

ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু ডার্ক ম্যাটার আসলে কী? এই প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিতভাবে বের করতে পারেননি। তবে ডার্ক ম্যাটার সম্পর্কে বেশ কয়েক ধরনের ধারণা দিয়েছেন অনেকে। 

একদল বিজ্ঞানীর ধারণা ছিল ডার্ক ম্যাটার সম্ভবত লুকানো ব্ল্যাকহোল। কিন্তু এই ধারণা সহজেই বাতিল হয়ে গেছে – কারণ অবস্থান জানলে ব্ল্যাকহোল খুঁজে পেতে সমস্যা হয় না। 

আরেকদল বিজ্ঞানী বললেন ডার্ক ম্যাটার হতে পারে মহাবিশ্বের গ্রহ, কিংবা নিউট্রন স্টার, ঠান্ডা হয়ে যাওয়া শ্বেত বামন কিংবা এরকম বস্তু যেগুলির নিজস্ব কোন আলো নেই। এই বস্তুগুলির একটি গালভরা নামও দেয়া হলো – ‘ম্যাসিভ অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল কম্প্যাক্ট হ্যালো অবজেক্টস’ বা ‘ম্যাচো (MACHO)। কিন্তু এই বস্তুগুলি তো আধুনিক টেলিস্কোপে ধরা পড়ার কথা। এদের নিজস্ব আলো না থাকলেও এদের গায়ে অন্য নক্ষত্রের আলো প্রতিফলিত হয়। তাছাড়া এরকম কতগুলি বস্তু মহাবিশ্বে থাকতে পারে – তাদের সম্ভাব্য সবগুলির ভর একসাথে যোগ করেও অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটারের ভরের কাছাকাছিও পৌঁছানো যাচ্ছে না। ফলে এই সম্ভাবনাও বাতিল হয়ে যায়। 

‘ম্যাচো’ পদার্থের সম্ভাবনা বাতিল হয়ে যাবার পর আরেকটি সম্ভাবনা বিজ্ঞানীরা খতিয়ে দেখতে শুরু করেছেন – সেটা হলো নতুন ধরনের কোন কণা কিংবা কণার সমষ্টি দিয়ে গঠিত হতে পারে ডার্ক ম্যাটার। এই কণাগুলি কণা পদার্থবিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত কণাগুলির বাইরে নতুন কোন কণা যেগুলির ভর আছে, কিন্তু অন্য কোন কণার সাথে খুব সামান্যই মিথষ্ক্রিয়া করে। এদের নাম দেয়া হয়েছে উইকলি ইন্টার-অ্যাকটিং ম্যাসিভ পার্টিক্যালস বা উইম্প (WIMP)। ধারণা করা হচ্ছে এই কণাগুলি শুধুমাত্র মহাকর্ষ বল এবং দুর্বল নিউক্লিয়ার বলের সাথে মিথষ্ক্রিয়া করে – অনেকটা নিউট্রিনোর মতো – যাদের শনাক্ত করা দুসাধ্য। ১৯৯৮ সালে জাপানি বিজ্ঞানীরা যখন নিউট্রিনোর ভর নির্ণয় করতে সক্ষম হলেন, তখন সবাই আশা করেছিল মহাবিশ্বে সম্ভাব্য সব নিউট্রিনোর ভর হিসেব করলে অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটারের ভরের সমান হবে। কিন্তু সেরকম কিছু হলো না। সমস্ত নিউট্রিনোর ভর যোগ করলেও অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটারের শতকরা এক ভাগের ভরের সমানও হয় না। বিজ্ঞানীরা আশা করে আছেন – কোনো একদিন হয়তো নিউট্রিনোর মতো কোন নতুন কণার সন্ধান পাওয়া যাবে। 

আবার একদল বিজ্ঞানী মনে করেন – ডার্ক ম্যাটার বলে হয়তো কোন পদার্থ নেই – হয়তো আইনস্টাইনের হিসেবে কোন গন্ডগোল আছে, কিংবা গ্যালাক্সির ক্ষেত্রে আইনস্টাইনের মহাকর্ষ তত্ত্ব সমীকরণে পরিবর্তন আনার দরকার আছে – ডার্ক ম্যাটারের সমস্যা মেটানোর জন্য। আরেকদল বিজ্ঞানী মনে করেন নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র হয়তো মহাবিশ্বের সব জায়গায় সমানভাবে কাজ করে না। গ্রহ-উপগ্রহের ক্ষেত্রে যা কাজ করে, তা হয়তো বৃহত্তর গ্যালাক্সির ক্ষেত্রে কাজ করে না। তারা তাদের ধারণার নাম দিলেন – মডিফাইড নিউটনিয়ান ডায়নামিক্স বা মন্ড (MOND)। 

নানা বিজ্ঞানীর নানা মত থেকে মহাবিশ্বের মোট বস্তুর প্রায় শতকরা সাতাশ ভাগ অদৃশ্য বস্তু ‘ডার্ক ম্যাটার’ সম্পর্কে এখনো সুনির্দিষ্ট কোন সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি, এটা এখনো মহাবিশ্বের অন্যতম প্রধান অমীমাংসিত রহস্য। 

ডার্কম্যাটার রহস্যের মাঝেই নতুন রহস্য হাজির হয়েছে মহাবিশ্বে। সেটা ঘটেছে বিংশ শতাব্দীর একেবারে শেষের দিকে এসে ১৯৯৮ সালে। আর সেই নতুন রহস্যের নাম – ডার্ক এনার্জি। এটা ভাবার কোন কারণ নেই যে ডার্ক ম্যাটার থেকেই ডার্ক এনার্জির উৎপত্তি।

ডার্ক এনার্জি রহস্যের শুরু হয়েছে মহাবিশ্বের প্রসারণের গতি নির্ণয় করতে গিয়ে। আমরা ইতোমধ্যেই আলোচনা করেছি যে ১৯২৯ সালে এডুইন হাবল আবিষ্কার করেছিলেন যে গ্যালাক্সিগুলি ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। কী গতিতে গ্যালাক্সিগুলি ছুটে চলেছে তার একটি সূত্র তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন – যাকে আমরা হাবলের সূত্র বলে জানি। এই সূত্র অনুযায়ী কোন একটি গ্যালাক্সির গতি পৃথিবী থেকে গ্যালাক্সির দূরত্বের সমানুপাতিক। আর এই সমীকরণের সমানুপাতিক ধ্রুবকের নাম – হাবল কনস্ট্যান্ট বা হাবল ধ্রুবক। ১৯৯০ সালে আমেরিকার মহাকাশ সংস্থা নাসা ‘হাবল স্পেস টেলিস্কোপ’ মহাকাশে পাঠায় – যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল হাবল ধ্রুবকের মান প্রতিষ্ঠা করা এবং সেখান থেকে মহাবিশ্বের বয়স নির্ণয় করা। পৃথিবী থেকে গ্যালাক্সির দূরত্ব নির্ণয়ের জন্য হাবল ব্যবহার করেছিলেন সেফিড নক্ষত্রের উজ্জ্বলতা। সেফিড নক্ষত্রগুলির উজ্জ্বলতা একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর বাড়ে এবং কমে। এই উজ্জ্বলতার পরিমাণ হিসেব করে পৃথিবী থেকে তাদের দূরত্ব হিসেব করা যায়। দূরত্ব যত বেশি হয়, উজ্জ্বলতা তত কমতে থাকে। সেফিড নক্ষত্রগুলি আন্তনাক্ষত্রিক দূরত্ব নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ‘আদর্শ বাতি’র কাজ করে। [সেফিড নক্ষত্র সম্পর্কে আরো বিস্তারিত দেয়া আছে আবুল বাসারের ‘মহাজাগতিক প্রথম আলো’ বইতে।] সেফিড নক্ষত্রের আলো ব্যবহার করে হাবল টেলিস্কোপ মহাবিশ্বের বয়স নির্ণয় করেছে ১৩৮০ কোটি বছর। 

অনেক দূরের গ্যালাক্সির দূরত্ব নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সেফিড খুব বেশি কার্যকরী নয়। কারণ অত দূর থেকে আসতে আসতে আলো অনেক বেশি ম্লান হয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা তাই সেফিডের চেয়েও উজ্জ্বল কোনকিছুর খোঁজ করছিলেন যাকে ‘আদর্শ বাতি’ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। ১৯৯০এর দশকে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের দুটো দল আলাদা আলাদাভাবে গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ শুরু করলেন সুপারনোভা-টাইপ-1aকে ‘আদর্শ বাতি’ ধরে। টাইপ-1a সুপারনোভায় একটি শ্বেত বামন (মৃত নক্ষত্র – যার সব হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম শেষ হয়ে গেছে, শুধুমাত্র কার্বন আর অক্সিজেন অবশিষ্ট আছে) অন্য একটি নক্ষত্রের সাথে যুথবদ্ধভাবে একে অপরের চারপাশে ঘুরতে থাকে। শ্বেতবামনের ঘনত্ব অন্য নক্ষত্রের চেয়ে বেশি এবং তার মাধ্যাকর্ষণও বেশি। ফলে ঘুরতে ঘুরতে অন্য নক্ষত্রের জ্বালানি এবং গ্যাসীয় পদার্থ শ্বেত বামনের দিকে চলে আসতে থাকে। ফলে শ্বেত বামনের ভর বাড়তে থাকে। চন্দ্রশেখর সুব্রাহ্মনিয়ানের ‘চন্দ্রশেখর সীমা’ নীতি অনুযায়ী শ্বেতবামনের ভর বাড়তে বাড়তে যদি আমাদের সূর্যের চেয়ে ১.৪ গুণের বেশি হয়ে যায়, তখন সুপারনোভা বিস্ফোরণ ঘটে। কোনো গ্যালাক্সির সবগুলি নক্ষত্রের উজ্জ্বলতা একসাথে যোগ করলে যে পরিমাণ উজ্জ্বলতা পাওয়া যায়, একটি সুপারনোভা বিস্ফোরণে সেই পরিমাণ উজ্জ্বলতা তৈরি হয়। এই উজ্জ্বলতা কয়েকশ কোটি আলোকবর্ষ পার হয়ে এলেও পৃথিবীর টেলিস্কোপে ধরা পড়ে। 


চন্দ্রশেখর সুব্রাহ্মনিয়ান


ক্যালিফোর্নিয়া কেন্দ্রিক ‘সুপারনোভা কসমোলজি প্রজেক্ট’ এবং আন্তর্জাতিক ‘হাই-জেড সুপারনোভা সার্চ টিম’ দুটো দলই কাজ শুরু করার কয়েক বছরের মধ্যে ফলাফল পেতে শুরু করলো। পাঁচশ থেকে সাতশ কোটি আলোকবর্ষ দূরের ৪২টি সুপারনোভা এবং অপেক্ষাকৃত কম দূরত্বের আরো ১৮টি সুপারনোভার আলোর বর্ণালীর রেডশিফ্‌ট বা লোহিত সরণ হিসেব করে বিজ্ঞানীরা খুবই আশ্চর্যজনক ফলাফল পেলেন। বিগ ব্যাং-এর পর মহাবিশ্বের দ্রুত প্রসারণ ঘটতে থাকে। কিন্তু মহাকর্ষ বল তৈরি হবার পর একটা সময়ের পর থেকে মহাবিশ্বের প্রসারণের গতি কমে আসার কথা। বিজ্ঞানীরা দেখতে পেলেন উল্টো ঘটনা ঘটছে আমাদের মহাবিশ্বে। মহাবিশ্বের বয়স পাঁচশ কোটি বছর পার হবার পরবর্তী দুইশ কোটি বছর ধরে প্রসারণের গতি কিছুটা কমতে শুরু করেছিল। কিন্তু বয়স সাতশ কোটি বছর পার হবার পর থেকে মহাবিশ্বের প্রসারণের গতি ক্রমশ বাড়তে শুরু করেছে। মহাকর্ষ বল বস্তুকে নিজের দিকে টানার বদলে কেন বাইরের দিকে ঠেলতে শুরু করেছে তার কোন সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না বিজ্ঞানীরা। ১৯৯৮ সালে তাদের গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হবার পর বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের এই নতুন রহস্যে হতবাক হয়ে গেলেন। আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী মাইকেল টার্নার এর জন্য দায়ী করলেন অদৃশ্য শক্তি – ডার্ক এনার্জিকে। ডার্ক এনার্জি – যার সম্পর্কে কোন সুনির্দিষ্ট ধারণাই নেই কোন বিজ্ঞানীর। তবুও এই নতুন আবিষ্কারের জন্য সুপারনোভা প্রকল্পের দুটো গ্রুপের প্রধান বিজ্ঞানীদের তিন জন – সল পারমুটার, ব্রায়ান স্মিড এবং আদম রেইস পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন ২০১১ সালে। 

২০১৩ সালে ইওরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির প্ল্যাংক স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন পরিমাপ করে বিজ্ঞানীরা একমত হয়েছেন যে মহাবিশ্বের মোট ভর এবং শক্তির শতকরা ৬৮.৩ ভাগ ডার্ক এনার্জি, ২৬.৮ ভাগ ডার্ক ম্যাটার এবং মাত্র পাঁচ ভাগ আমাদের দৃশ্যমান বস্তু। অর্থাৎ এই মহাবিশ্বের শতকরা ৯৫ ভাগ সম্পর্কে আমরা এখনো নির্দিষ্টভাবে কিছুই জানি না – কেবল জানি যে তারা আছে। 


তথ্যসূত্র: 

১। লেফটেরিস পাপানটোনোপোলোস, দি ইনভিজিবল ইউনিভার্স: ডার্ক ম্যাটার অ্যান্ড ডার্ক এনার্জি, স্প্রিঙ্গার, বার্লিন ২০০৭।

২। আবুল বাসার, মহাজাগতিক প্রথম আলো, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা, ২০২২। 

৩। জন ম্যাডক্স, হোয়াট রিমেইনস টু বি ডিসকভারড, দ্য ফ্রি প্রেস, নিউইয়র্ক, ১৯৯৮। 

৪। পল স্টেইনহার্ডট ও নিল টুরক, এন্ডলেস ইউনিভার্স, ব্রডওয়ে বুক্‌স, নিউ ইয়র্ক, ২০০৭।

৫। গাইলস স্পারো, ফিফটি আইডিয়াস ইউ রিয়েলি নিড টু নো অ্যাস্ট্রোনমি, কোয়েরকাস, লন্ডন, ২০১৬। 

___________
বিজ্ঞানচিন্তা আগস্ট ২০২৩ সংখ্যায় প্রকাশিত










Tuesday 24 October 2023

মিশন আর্টেমিস: আবার চাঁদে

 




“গগনের থালে, রবি চন্দ্র দীপক জ্বলে” – রবীন্দ্রনাথের কথাগুলি খুবই সত্যি, সুন্দর। পৃথিবীর আকাশে উজ্জ্বলতম সূর্যের পরেই উজ্জ্বলতর বস্তু আমাদের চাঁদ। যদিও তার নিজের আলো নেই, সূর্যের আলোর প্রতিফলনেই সে এতটা জোছনাময়ী – সেই আমাদের পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ। মহাকাশে আমাদের নিকটতম প্রাকৃতিক প্রতিবেশী সে, পৃথিবী থেকে মাত্র তিন লক্ষ চুরাশি হাজার কিলোমিটার দূরত্বে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে। এই দূরত্ব খুব একটা বেশি নয়। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাঁরা গাড়ি নিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করেন – দুবছর যাতায়াত করলেই তাঁরা এই দূরত্ব পেরিয়ে যান। কিন্তু পৃথিবীর পরিবেশে দূরত্ব পাড়ি দেয়া যতটা সহজ, পৃথিবী থেকে মহাকাশ পাড়ি দিয়ে চাঁদে পৌঁছানো ততটা সহজ নয়। কিন্তু মানুষ এই কঠিন কাজটি করে ফেলেছে আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে – যখন মহাকাশ প্রযুক্তি আজকের তুলনায় অনেকটাই সীমিত ছিল। 


১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই চাঁদের বুকে প্রথম পা রেখেছিল পৃথিবীর মানুষ। সেদিন চাঁদে নামার আগের মুহূর্তে লুনার মডিউলের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে নীল আর্মস্ট্রং বলেছিলেন, “I am going to step off the LM now. That’s one small step for a man, one giant leap for mankind.” সেদিন একজন মানুষের একটি ছোট্ট পদক্ষেপ ছিল সমগ্র মানবজাতির একটি বিশাল উল্লম্ফন। চাঁদের বুকে এই ‘ছোট্ট পদক্ষেপ’ দেয়ার জন্য দীর্ঘ পরিশ্রম করতে হয়েছে মহাকাশবিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদসহ অসংখ্য মানুষকে বছরের পর বছর। ধরতে গেলে সেই সময় মানুষের চাঁদে যাওয়ার ব্যাপারটি ছিল মূলত আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে প্রতিযোগিতার ফসল। সেই প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর পর। ১৯৪৬ সালে আমেরিকা চাঁদের উদ্দেশ্যে প্রথম বেতারতরঙ্গ পাঠায়। চাঁদের উদ্দেশ্যে প্রথম স্যাটেলাইট ‘স্পুটনিক’ পাঠায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৫৭ সালে। এরপর তারা ১৯৫৯ থেকে ১৯৭৬ পর্যন্ত মোট চব্বিশটি ‘লুনা মিশন’ পরিচালনা করে চাঁদের উদ্দেশ্যে। তাদের বেশ কয়েকটি মিশন ব্যর্থ হলেও অনেকগুলি মিশন সফল হয়। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন চাঁদে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা করেনি। এদিকে আমেরিকা ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৫ পর্যন্ত পাইওনিয়ার ও র‍্যাঞ্জার প্রকল্পের আওতায় চাঁদের উদ্দেশ্যে আঠারোটি মিশন চালিয়ে মাত্র তিনটিতে আংশিক সফল হয়। এরপর ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৮’র মধ্যে চাঁদের বুকে রোবট পাঠিয়ে ছবি ও ভূতাত্ত্বিক তথ্য সংগ্রহের জন্য সাতটি সার্ভেয়ার মিশন পরিচালনা করে। সাতটির মধ্যে পাঁচটি মিশন সফল হয়। ১৯৬৬-৬৭ সালে লুনার অরবিটার প্রোগ্রামের পাঁচটি মিশন চালানো হয় সফলভাবে। এরপর আসে মানুষের চাঁদে যাওয়ার অ্যাপোলো প্রোগ্রাম। কিন্তু প্রথম মিশন অ্যাপোলো-১ উৎক্ষেপণের সময়েই আগুন লেগে পুড়ে মারা যান তিনজন নভোচারী গাস গ্রিসম, এড হোয়াইট এবং রজার শ্যাফি। চাঁদে যাওয়ার জন্য মানুষের অভিযাত্রা তাতেও দমে যায়নি। এরপর অ্যাপোলো প্রকল্পের আওতায় আরো অ্যাপোলো-২ থেকে অ্যাপোলো-১৭ পর্যন্ত মিশন পরিচালনা করা হয়েছে। অ্যাপোলো-১১ সর্বপ্রথম চাঁদে নামে ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই। নীল আর্মস্ট্রং এবং এডউইন অলড্রিন চাঁদে নামেন। মানুষের চন্দ্রবিজয় সেখানেই থেমে থাকেনি। সেবছরই নভেম্বর মাসে চাঁদে পৌঁছায় অ্যাপোলো-১২। চাঁদে নামেন চার্লস কনরাড ও অ্যালেন বিন। ১৯৭০ সালে অ্যাপোলো-১৩ চাঁদের উদ্দেশ্যে রওনা হলেও যান্ত্রিক গোলযোগের জন্য চাঁদে পৌঁছাতে পারেনি। ১৯৭১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি চাঁদে পৌঁছায় অ্যাপোলো-১৪। চাঁদে নামেন অ্যালেন শেপার্ড ও এডগার মিশেল। এর পাঁচ মাস পর জুলাই মাসে চাঁদে পৌঁছায় অ্যাপোলো-১৫। চাঁদে নামেন ডেভিড স্কট ও জেমস ইরউইন। ১৯৭২ সালের এপ্রিলে চাঁদে পৌঁছায় অ্যাপোলো-১৬।  চাঁদে নামেন জন ইয়ং এবং চার্লস ডিউক। অ্যাপোলো-১৭ ছিল মানুষের চাঁদে যাবার সর্বশেষ মিশন। ১৯৭২ সালের ১১ নভেম্বর চাঁদে নামেন ইউজিন কারনান ও হ্যারিসন স্মিট। তিন দিন দুই ঘন্টা ৫৯ মিনিট তাঁরা চাঁদের বুকে ছিলেন সেবার। এরপর দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর কেটে গেছে – মানুষ আর চাঁদে যায়নি। 


অ্যাপোলো-১৭ মিশনের কমান্ডার নভোচারী ইউজিন কারনান হলেন সর্বশেষ মানুষ যিনি চাঁদের মাটিতে হেঁটেছেন। তিনি একটি বই লিখেছেন ‘দ্য লাস্ট ম্যান অন দ্য মুন’ নামে (The Last Man on the Moon, St. Matin’s Griffin, New York, 2009) । অ্যাপোলো মিশনের কমান্ডার হিসেবে তিনিই ছিলেন চাঁদের বুকে সর্বশেষ মানুষ। কিন্তু তাঁর এই তকমা বদলে যাবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই। চাঁদে যাওয়ার নতুন মিশন শুরু হয়ে গেছে। এখন চলছে চাঁদে মানুষের দ্বিতীয় অভিযান – মিশন আর্টেমিস। 


মানুষের উদ্ভবের আগে থেকেই চাঁদ-সূর্য-গ্রহ-নক্ষত্রগুলি মহাবিশ্বে আলো ছড়াচ্ছে। তাই মানুষের কাল্পনিক লোককাহিনিতে চন্দ্র-সূর্যের নানারকমের অলৌকিক অবস্থান ও পরিচিতি। লোকসংস্কৃতির সম্মানে মানুষের চাঁদে যাবার প্রথম অভিযানের নাম দেয়া হয়েছিল গ্রিক দেবতা অ্যাপোলোর নামে। এবার দ্বিতীয় পর্যায়ের চন্দ্রাভিযানের নাম রাখা হয়েছে গ্রিক দেবী আর্টেমিসের নামে। লোককাহিনির অ্যাপোলো আর আর্টেমিস জমজ ভাইবোন হলেও - মিশন অ্যাপোলোর কার্বনকপি নয় মিশন আর্টেমিস। অ্যাপোলোর চেয়ে অনেক বেশি উন্নত এবং ব্যাপ্ত মিশন আর্টেমিস। 


১৯৬৯ সালে মানুষ যখন প্রথমবার চাঁদে যায় তখন কম্পিউটার প্রযুক্তি ছিল অত্যন্ত সীমিত। এখনকার মতো মানুষের হাতে হাতে আধুনিক কম্পিউটার থাকা তো দূরের কথা – কম্পিউটারের নামও তখন সাধারণ মানুষ শোনেনি। যে লুনার মডিউল ‘ঈগল’ প্রথম চাঁদে নামে তার কম্পিউটারের মেমোরি ছিল মাত্র ৭৪ কিলোবাইট। এখনকার শিশুদের খেলনা ইলেকট্রনিক্সেও এর চেয়ে বেশি মেমোরি থাকে। তাই ১৯৬৯-৭২ সালের চন্দ্রাভিযানের চেয়ে ২০২২-২৫ সালের চন্দ্রাভিযান অনেক বেশি উন্নত হবে সেটাই স্বাভাবিক। তাই  এবারের চন্দ্রমিশনের ব্যাপ্তিও বেড়েছে অনেক। মিশন আর্টেমিস – শুধু চাঁদে যাওয়া নয় – চাঁদে বসবাস করারও একটি সুদূরপ্রসারী মিশন। চাঁদের কক্ষপথে এবং চাঁদের মাটিতে স্থায়ী মহাকাশ স্টেশন স্থাপন করার উদ্দেশ্যও আছে এই আর্টেমিস মিশনের সাথে। 


আর্টেমিস মিশনের উদ্দেশ্যগুলিকে - সমতা, প্রযুক্তি, অংশীদারিত্ব, স্থায়ীত্ব, জ্ঞান এবং সম্পদ – এই ছয়টি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। 

(১) সমতা: ১৯৬৯ থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত যে ছয়টি মিশনে বারো জন নভোচারী চাঁদের বুকে পা রেখেছেন – তাঁদের প্রত্যেকেই শ্বেতাঙ্গ পুরুষ। এবারের চন্দ্রাভিযানে নাসা উদ্যোগ নিয়েছে নভোচারীদের মধ্যে লিঙ্গ এবং বর্ণবৈষম্য দূর করার। তাই এই আর্টেমিস মিশনে প্রথমবার একজন নারী এবং একজন অশ্বেতাঙ্গ পুরুষ নভোচারী চাঁদে যাবেন বলে ঠিক করা হয়েছে। ইতোমধ্যে নাসা চাঁদে যাবার প্রথম নভোচারীদল নির্বাচন করে ফেলেছে। আর্টেমিস-২ ও আর্টেমিস-৩ মিশনে যে চারজন নভোচারী চাঁদে যাবেন তাঁরা হলেন – কমান্ডার রেইড ওয়াইজম্যান, পাইলট ভিক্টর গ্লোভার, মিশন স্পেশালিস্ট-১ ক্রিস্টিনা হ্যামক কোচ, এবং মিশন স্পেশালিস্ট-২ জেরেমি হ্যানসেন। ভিক্টর গ্লোভার হবেন প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নভোচারী যিনি চাঁদে যাবেন। আর ক্রিস্টিনা কোচ হবেন প্রথম নারী নভোচারী যিনি চন্দ্রবিজয় করবেন। 


 

কমান্ডার রেইড ওয়াইজম্যান, পাইলট ভিক্টর গ্লোভার, মিশন স্পেশালিস্ট-১ ক্রিস্টিনা হ্যামক কোচ, এবং মিশন স্পেশালিস্ট-২ জেরেমি হ্যানসেন।


(২) প্রযুক্তি: আর্টেমিস মিশনের জন্য সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে রকেট থেকে স্পেসস্যুট পর্যন্ত সবকিছু তৈরি করা হয়েছে – যা ভবিষ্যতে আরো দূরের মহাকাশযাত্রায় কাজে লাগবে। আর্টেমিস মিশনে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আধুনিকতম সংস্করণ ব্যবহার করা হচ্ছে এবং আরো নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন হচ্ছে। 

(৩) অংশীদারিত্ব: আমেরিকান মহাকাশ সংস্থা নাসা এবার অন্যান্য দেশের মহাকাশ সংস্থার পাশাপাশি অন্যান্য বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান – যেমন স্পেস-এক্স, বোয়িং ইত্যাদির সাথে যৌথ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে এই মিশন পরিচালনা করছে। প্রথম চারজন নভোচারীর মধ্যে একজন (জেরেমি হ্যানসেন) কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির নভোচারী। 

(৪) স্থায়ীত্ব: অ্যাপোলো মিশনের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হবে আর্টেমিস মিশনের সময়কাল। অ্যাপোলো-১৭’র নভোচারীরা সর্বাধিক তিন দিন অবস্থান করেছিলেন চাঁদের পিঠে। আর্টেমিসের নভোচারীদের চাঁদের পিঠে সপ্তাহেরও বেশি সময় থাকার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ভবিষ্যতের মিশনে লুনার গেটওয়ে স্টেশনের মাধ্যমে তিন মাস পর্যন্ত নভোচারীদের চাঁদে থাকার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

(৫) নতুন জ্ঞান: অ্যাপোলো মিশনের পরবর্তী পঞ্চাশ বছরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতি হয়েছে অনেক। এই উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে আর্টেমিস মিশনের নভোচারীরা চাঁদের অনেক অজানা তথ্য আবিষ্কার করতে পারবেন যা এতদিন জানা সম্ভব হয়নি। এই মিশন শুধুমাত্র চাঁদে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভবিষ্যতের আর্টেমিস মিশন চাঁদ থেকে মঙ্গল পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। 

(৬) চাঁদের সম্পদ: চাঁদে পানি এবং অন্যান্য দুষ্প্রাপ্য খনিজ সম্পদ পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এই মিশন সেই সম্ভাবনার সাথে বাস্তবের সমন্বয় করতে সক্ষম হবে। এই সম্পদকে কাজে লাগিয়ে চাঁদে স্থায়ী মহাকাশ স্টেশন তৈরি করে সেখান থেকে ভবিষ্যতের মহাকাশ মিশন চালানোর সম্ভাবনা বাড়বে। 


নাসার এযাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী মিশন আর্টেমিস। এই মিশনে চারজন নভোচারী চাঁদে যাবেন এবং চাঁদ পেরিয়ে মহাকাশের আরো চৌছট্টি হাজার কিলোমিটার গভীরে পৌঁছে যাবেন যেখানে এপর্যন্ত আর কোনো নভোচারী যাননি। যে নভোযানে চড়ে নভোচারীরা যাবেন তার নাম অরিয়ন। সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি এই নভোযান এপর্যন্ত পৃথিবীতে একমাত্র নভোযান যা নভোচারীদের মহাকাশের গভীরে নিয়ে গিয়ে আবার নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পারবে। এই আধুনিকতম নভোযান মহাকাশে পাঠানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে সবচেয়ে শক্তিশালী রকেটসমৃদ্ধ স্পেস লঞ্চিং সিস্টেম। এই প্রজেক্টে প্রাথমিকভাবে খরচ হচ্ছে প্রায় একশ বিলিয়ন ডলার বা দশ লক্ষ কোটি টাকা। 


প্রাথমিকভাবে আর্টেমিস-১, আর্টেমিস-২, এবং আর্টেমিস-৩ এর বিস্তারিত কর্মসূচি এবং কর্মপরিকল্পনা ঘোষিত হয়েছে। তিনটি মিশন-ই চাঁদে যাওয়ার মিশন। আর্টেমিস-১ মিশন হলো চাঁদে যাবার প্রাথমিক মিশন যেখানে নভোযান উৎক্ষেপণ থেকে শুরু করে চাঁদের চারপাশে ঘুরে আসা পর্যন্ত চন্দ্রাভিযানের সবগুলি ধাপ পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে নভোচারীদের ছাড়াই। ইতোমধ্যে ১৬ নভেম্বর ২০২২ থেকে ১১ ডিসেম্বর ২০২২ পর্যন্ত  আর্টেমিস-১ মিশন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এখন সেই মিশনের ফলাফল বিশ্লেষণ এবং পর্যালোচনা চলছে। এই মিশনের বিস্তারিত আমরা একটু পরে আলোচনা করছি। আর্টেমিস-২ মিশনে নভোচারীরা মহাকাশে গিয়ে চাঁদের চারপাশে ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন, এবং আর্টেমিস-৩ মিশনে নভোচারীরা চাঁদে অবতরণ করবেন এবং সপ্তাহখানেক সেখানে থেকে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন। আশা করা হচ্ছে ২০২৪ সালে আর্টেমিস-২ এবং ২০২৫ সালে আর্টেমিস-৩ মিশন কার্যকর হবে। 


আর্টেমিস মিশনের যান্ত্রিক গঠনের চারটি প্রধান অংশ: (১) নভোযান – অরিয়ন, (২) লুনার গেটওয়ে, (৩) হিউম্যান ল্যান্ডিং সিস্টেম (এইচ এল এস), এবং (৪) স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (এস এল এস) ।


আর্টেমিস মিশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এর নভোযান – অরিয়ন। পৃথিবীবিখ্যাত নভোযান প্রস্তুতকারি সংস্থা লকহিড মার্টিন তৈরি করেছে এই অত্যাধুনিক নভোযান অরিয়ন। এখনো পর্যন্ত অরিয়ন হলো পৃথিবীর সবচেয়ে আধুনিক নভোযান। এই নভোযান চন্দ্রাভিযানের নভোচারীদের প্রচন্ড বেগে নিয়ে যাবে গভীর মহাকাশে, আবার নিরাপদে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে পৃথিবীতে। মহাকাশের তেজস্ক্রিয় থেকে রক্ষা করবে নভোচারীদের। আবার পৃথিবীতে ফেরার সময় পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের সাথে প্রচন্ড সংঘর্ষে যে অসহ্য তাপ উৎপন্ন হবে – রক্ষা করবে সেই তাপ থেকেও। অরিয়ন নভোযান অনেকবার ব্যবহার করা যাবে। আর্টেমিস-১ মিশনে অরিয়ন ইতোমধ্যে চাঁদের পাশ থেকে ঘুরে এসেছে। আবার অরিয়ন-২ ও ৩ মিশনে নভোচারীদের নিয়ে যাবে চাঁদে।  

অরিয়নের তিনটি প্রধান অংশ – লঞ্চ অ্যাবর্ট সিস্টেম, ক্রু মডিউল, এবং সার্ভিস মডিউল। তিনটি অংশের দৈর্ঘ্য ৬৭ ফুট। স্পেস লঞ্চ সিস্টেম রকেটের উপর লাগানো অবস্থায় এর উচ্চতা ৩২২ ফুট। চারজন নভোচারী নিয়ে এই নভোযান মহাকাশে একুশ দিন পর্যন্ত থাকতে পারবে। ৭৭,১৫০ ধরনের ৩,৫৫,০৫৬টি যন্ত্রাংশের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে অরিয়ন। 


 



মহাকাশে নভোচারীদের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিখুঁত হওয়াটা সবচেয়ে জরুরি। প্রথমবার চন্দ্রাভিযানের সময় অ্যাপোলো-১ এর তিনজন নভোচারীর মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছিল। সেরকম দুর্ঘটনা যেন আর না ঘটে সেজন্য নিশ্চিদ্র ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে অরিয়নে। এই ব্যবস্থার নাম লঞ্চ অ্যাবর্ট সিস্টেম। স্পেস লঞ্চ সিস্টেমের রকেটের সাহায্যে উৎক্ষেপণের সময় অরিয়নের ক্রু মডিউলের সামনে পঞ্চাশ ফুট দৈর্ঘ্যের এই লঞ্চ অ্যাবর্ট সিস্টেম লাগানো থাকে। এই সিস্টেমের দুইটি অংশ – ফেয়ারিং অ্যাসেম্বলি এবং লঞ্চ অ্যাবর্ট টাওয়ার। ফেয়ারিং অ্যাসেম্বলি হালকা যৌগিক ধাতুর তৈরি প্রকোষ্ঠ যেটা উৎক্ষেপণের সময় উৎপন্ন তাপ, বাতাস এবং শব্দ থেকে অরিয়নকে রক্ষা করে। লঞ্চ অ্যাবর্ট টাওয়ারে লাগানো থাকে তিনটি অত্যন্ত শক্তিশালী যান্ত্রিক মোটর যেগুলি প্রায় চার লক্ষ পাউন্ড ধাক্কা তৈরি করতে পারে। উৎক্ষেপণের সময় যদি কোন যান্ত্রিক ত্রুটি বা অন্য কোন কারণে যদি নভোচারীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবার সম্ভাবনা দেখা দেয় – লঞ্চ অ্যাবর্ট সিস্টেমের মোটরগুলি চালু হয়ে অরিয়নের ক্রু মডিউলে অবস্থানরত নভোচারীদের নিয়ে ক্রু মডিউলটিকে অরিয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন করে সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে নিরাপদ জায়গায় উড়ে যায়। লঞ্চ অ্যাবর্ট সিস্টেমের বেগ শূন্য থেকে ঘন্টায় ৮০০ কিলোমিটার উঠে যেতে পারে দুই সেকেন্ডের মধ্যে। অথচ একটি বোয়িং-৭৪৭ প্লেনের গতিবেগ ঘন্টায় শূন্য থেকে ৩৬০ কিলোমিটারে উঠতে কমপক্ষে দশ সেকেন্ড সময় লাগে। যদি কোন দুর্ঘটনা না ঘটে এবং সবকিছু ঠিকঠাকমতো উৎক্ষেপণ হয়, তখন অরিয়নের লঞ্চ অ্যাবর্ট সিস্টেমের আর কোন কাজ থাকে না। সেক্ষেত্রে শুধু শুধু এই পঞ্চাশ মিটার লম্বা যন্ত্রাংশ নিয়ে মহাকাশে ঢোকার কোন মানে থাকে না। যখন আর কোন বিপদের সম্ভাবনা থাকে না তখন অরিয়ন থেকে এই লঞ্চ অ্যাবর্ট সিস্টেম আলাদা হয়ে যায়। তখন অরিয়নের ক্রু মডিউল আর সার্ভিস মডিউল নিয়ে চাঁদের পানে চলতে থাকে স্পেস লঞ্চিং সিস্টেমের রকেট। 


অরিয়নের ক্রু মডিউল হলো মিশন চলাকালীন নভোচারীদের আবাসস্থল। এগারো ফুট উচ্চতা এবং সাড়ে ষোল ফুট ব্যাসের এই চোঙাকৃতি জায়গায় চারজন নভোচারীর থাকার ব্যবস্থা। উৎক্ষেপণের সময় থেকে শুরু করে পৃথিবী থেকে চাঁদে পৌঁছে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসা পর্যন্ত সর্বোচ্চ একুশদিন পর্যন্ত এখানে স্বচ্ছন্দে থাকতে এবং প্রয়োজনীয় কাজ করতে পারবেন চারজন নভোচারী। পৃথিবী থেকে চাঁদে যাবার সময় ক্রু মডিউল এবং সার্ভিস মডিউল একসাথে গেলেও পৃথিবীতে ফিরে আসার সময় শুধুমাত্র এই ক্রু মডিউলটাই ফিরে আসবে নভোচারীদের নিয়ে। ক্রু মডিউলের ভেতর নভোচারীদের বাসোপযোগী পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। তাপমাত্রা, বায়ুচাপ, আর্দ্রতা, অক্সিজেনের মাত্রা, কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা প্রভৃতি স্বাস্থ্যকর পর্যায়ে রাখা হয়। স্বচ্ছ শক্ত কাচের জানালাযুক্ত ককপিট থেকে নভোচারীরা অরিয়নের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। ক্রু মডিউলের দেয়াল এমনভাবে তৈরি যেন মহাকাশের তেজস্ক্রিয় বিকিরণ মডিউলের ভেতর প্রবেশ না করতে পারে। মিশন চলাকালীন এই মডিউলই হবে নভোচারীদের ঘরবাড়ি। এখানেই তাদের খাওয়া-পরার ব্যবস্থা, এখানেই ওজনহীন পরিবেশে তাদের টয়লেট করার ব্যবস্থা। নভোচারীদের সুস্থ থাকার জন্য নিয়মিত ব্যায়াম করতে হয়। এই মডিউলে তার ব্যবস্থাও আছে। 


ক্রু মডিউলের নিচে লাগানো থাকে সার্ভিস মডিউল। ইওরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি এই মডিউলের সব ব্যবস্থা করেছে বলে অরিয়নের এই মডিউলের নাম ইওরোপিয়ান সার্ভিস মডিউল। সার্ভিস মডিউল হলো নভোযানের পাওয়ার হাউজ। এখানেই সৌরপ্যানেল থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়, এখানেই ইঞ্জিন এবং থ্রাস্টার। অরিয়নের সার্ভিস মডিউলের দৈর্ঘ্য ১৫.৭ ফুট এবং ব্যাস ১৬.৫ ফুট। আর্টেমিস-১ মিশনে এর ভর ৩৩,৭০০ পাউন্ড, আর্টেমিস-২ মিশনে এর ভর হবে ৩৪,৪০০ পাউন্ড। ছয় হাজার পাউন্ড ধাক্কা তৈরি করার ক্ষমতাসম্পন্ন একটি ইঞ্জিন আছে যেটা দিয়ে অরিয়নকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এই প্রধান ইঞ্জিনকে সাহায্য করার জন্য রয়েছে আটটি সাহায্যকারী ইঞ্জিন – যেগুলির প্রত্যেকে ১১০ পাউন্ড ধাক্কা তৈরি করতে পারে। গতি-প্রতিক্রিয়া সামলানোর জন্য রয়েছে আরো চব্বিশটি ছোট ইঞ্জিন – যেগুলি প্রত্যেকে ৫০ পাউন্ড ধাক্কা তৈরি করতে পারে। সৌরবিদ্যুৎ তৈরি করার জন্য রয়েছে পনের হাজার সৌরকোষ সমন্বিত চারটি সৌরপ্যানেল যেগুলি খুললে ৬২ ফুট লম্বা হয়। এগারো কিলোওয়াট বিদ্যুৎশক্তি তৈরি করতে পারে এই প্যানেলগুলি। 


আর্টেমিস মিশনে যতগুলি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হবে তাদের সবগুলিই একাধিকবার আলাদা আলাদাভাবে পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে আর্টেমিস-১ মিশন শুরু হবার আগে। আর্টেমিস-১ মিশনে পুরো সিস্টেমকে একসাথে পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। স্পেস লঞ্চিং সিস্টেম থেকে শুরু করে অরিয়ন নভোযান। নভোচারীদের বদলে ডামি নভোচারী (মুনকিন) পাঠানো হয়েছিল এই মিশনে। 

পরপর চারবার উড্ডয়ন বাতিল হবার পর অবশেষে ১৬ নভেম্বর ২০২২ কেনেডি স্পেস সেন্টারের লঞ্চপ্যাড ৩৯বি থেকে আকাশে পাড়ি দেয় আর্টেমিস-১ মিশনের নভোযান অরিয়ন। উৎক্ষেপণের ৯০ সেকেন্ডের মধ্যেই অরিয়নকে নিয়ে রকেট পৌঁছে যায় সর্বোচ্চ বায়ুমন্ডলীয় শক্তির পর্যায়ে। দুই মিনিট পরে রকেট বুস্টার আলাদা হয়ে যায়। এর আট মিনিট পরে চারটি রকেট ইঞ্জিন অরিয়নকে আরো সামনের দিকে এগিয়ে দিয়ে রকেট এবং লঞ্চ অ্যাবর্ট সিস্টেম আলাদা হয়ে যায়। ক্রু মডিউল এবং সার্ভিস মডিউলসহ অরিয়ন তখন ইনট্রিম ক্রায়োজনিক প্রপালসান স্টেজের (আইসিপিএস) সাথে যুক্ত হয়ে চাঁদের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। পৃথিবীর চারপাশে একবার প্রদক্ষিণ করার পর সার্ভিস মডিউলের সোলার প্যানেল খুলে যায় এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপন্ন হতে শুরু করে। আইসিপিএস তখন অরিয়নকে একটি বড় ধাক্কা দিয়ে পৃথিবীর কক্ষপথে থেকে সরিয়ে চাঁদের দিকে ঠেলে দেয় এবং আইসিপিএস আলাদা হয়ে যায়। পঞ্চম দিনে (২০ নভেম্বর) নভোযান অরিয়ন চাঁদের প্রভাববলয়ে প্রবেশ করে। পৃথিবীর মহাকর্ষ বলের চেয়ে চাঁদের মহাকর্ষ বল এখানে বেশি। ষষ্ঠ দিবসে (২১ নভেম্বর) অরিয়ন চাঁদের পিঠের ১৩০ কিলোমিটারের মধ্যে পৌঁছে যায়। চাঁদের পাশ দিয়ে উড়ে যায় অরিয়ন। অষ্টম দিবসে চাঁদের প্রভাববলয় থেকে বের হয়ে আসে অরিয়ন। আস্তে আস্তে চাঁদ থেকে দূরে সরে আসতে থাকে অরিয়ন। দশম দিবসে অরিয়ন নভোযান জ্বালানি পুড়িয়ে ‘ডিসট্যান্ট রেট্রোগ্রেড লুনার অরবিট’এ প্রবেশ করে। চাঁদের পিঠ থেকে অনেক দূরে উড়ছিল বলে এটা ডিসট্যান্ট। আর রেট্রোগ্রেড – কারণ এটা চাঁদ যেদিকে ঘুরছিল – তার বিপরীত দিকে ঘুরছিলো। একাদশ দিবসে (২৬ নভেম্বর) অরিয়ন মহাকাশে ইতিহাস তৈরি করে। নভোচারীদের বহন করার জন্য তৈরি নভোযান এর আগে মহাকাশের এত গভীরে আর প্রবেশ করেনি। এর আগে অ্যাপোলো-১৩ পৃথিবী থেকে ৪,০০,১৭১ কিলোমিটার দূরে উড়েছিল। অরিয়ন তেরোতম দিবসে ৪,৩২,২১০ কিলোমিটার দূরত্বে উড়েছিল। ১৬তম দিবসে (১ ডিসেম্বর) আরেকবার জ্বালানি পুড়িয়ে অরিয়ন ডিসট্যান্ট রেট্রোগ্রেড লুনার অরবিট থেকে বের হয়ে পৃথিবীর দিকে রওনা দেয়। ২০তম দিবসে (ডিসেম্বর ৫) অরিয়ন চাঁদের পিঠের আরো কাছাকাছি ১২৮ কিলোমিটারের মধ্যে উড়ে যায়। চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ ব্যবহার করে অরিয়ন পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের ভেতর চলে আসে। ডিসেম্বরের ১১ তারিখে সান দিয়েগোর তীরে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করে অরিয়ন। আর্টেমিস-১ মিশনে পঁচিশ দিন ১০ ঘন্টা ৫৩ মিনিটে প্রায় তেইশ লক্ষ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে অরিয়ন। 

 

আর্টেমিস-১ মিশন পৃথিবী থেকে চাঁদ প্রদক্ষিণ করে সফলভাবে পৃথিবীতে ফিরে এসেছে। অরিয়নের ক্রু মডিউলে নভোচারীদের সিটে তিনটি ডামি নভোচারী বসানো হয়েছিল। কমান্ডার মুনিকিনের (প্রধান ডামি) সিটের পেছনে এবং মাথার পেছনে দুটো সেন্সর বসানো হয়েছিল – মিশন চলাকালীন ত্বরণ ও কম্পনের মাত্রা রেকর্ড করার জন্য। ডামি নভোচারীর পোশাকের সাথে আরো পাঁচটি ত্বরণমাপক যন্ত্র বসানো হয়েছিল ত্বরণ রেকর্ড করার জন্য। হেলগা এবং জোহর নামে আরো দুটো ডামি নভোচারী পাঠানো হয়েছিল। তাদের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ৫৬০০ পরোক্ষ বিকিরণমাপক যন্ত্র এবং ৩৪টি প্রত্যক্ষ বিকিরণমাপক যন্ত্র বসানো হয়েছিল মহাকাশের তেজস্ক্রিয় বিকিরণ মেপে দেখার জন্য। এই ডাটা থেকে দেখা যাবে আর্টেমিস-২ ও আর্টেমিস-৩ এর সময় নভোচারীরা বিকিরণ থেকে নিরাপদ থাকবেন কি না। 


আর্টেমিস-১ এর সাফল্যের পর এখন প্রস্তুতি চলছে আর্টেমিস-২ মিশনের। আর্টেমিস-২ মিশনে চারজন নভোচারীকে চাঁদে পাঠানো হবে দশ দিনের জন্য। চাঁদের উল্টোপিঠে অরিয়ন থেকে পরিক্রমা করবেন তাঁরা। এই মিশনে অরিয়নের উৎক্ষেপণ হবে আর্টেমিস-১ এর অনুরূপ। অরিয়ন এবং আইসিপিএস পৃথিবীকে দুবার প্রদক্ষিণ করে নিশ্চিত করবে যে সবগুলি সিস্টেম ঠিকমতো কাজ করছে। প্রথমবার পৃথিবীর কাছাকাছি উপবৃত্তাকার কক্ষপথে – (১৮৫ থেকে ২৯০০ কিলোমিটার উচ্চতায়), এবং দ্বিতীয়বার পৃথিবী থেকে দূরে উপবৃত্তাকার পথে – (৩৮০ কিলোমিটার থেকে ১ লক্ষ ১০ হাজার কিলোমিটার উচ্চতায়) ঘুরবে অরিয়ন। এরপর চলে যাবে চাঁদের মাধ্যাকর্ষণের দিকে। চাঁদের কাছাকাছি পৌঁছে চাঁদের যে পিঠ পৃথিবী থেকে দেখা যায় না, সেই পিঠে চৌষট্টি হাজার কিলোমিটার উড়ে উড়ে দেখবে। ফিরে আসার সময় পৃথিবীর মহাকর্ষ কাজে লাগিয়ে মুক্তভাবে পৃথিবীতে ফিরে আসবে যেভাবে এসেছে আর্টেমিস-১ মিশনে। 


আর্টেমিস-৩ মিশন হবে মানুষের দ্বিতীয় পর্যায়ে চাঁদে নামার মিশন। এই মিশনে চারজন নভোচারী চাঁদে যাবেন। তাঁদের মধ্যে দু’জন নভোচারী হিউম্যান ল্যান্ডিং সিস্টেমের মাধ্যমে চাঁদের বুকে নামবেন। তাই এই মিশনের আগে একটি সার্ভিস মিশনের মাধ্যমে হিউম্যান ল্যান্ডিং সিস্টেম এবং অরিয়ন ডকিং সিস্টেম চাঁদে স্থাপন করা হবে। চাঁদের কক্ষপথে একটি মহাকাশ স্টেশন - লুনার গেটওয়ে স্থাপনের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে যার সম্পর্কে একটু পরে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। চাঁদের ঠিক কোন্‌ জায়গায় হিউম্যান ল্যান্ডিং সিস্টেম স্থাপন করা হবে এবং ঠিক কোথায় নভোচারীরা চাঁদে নামবেন তা এখনো নির্দিষ্টভাবে ঠিক করা হয়নি। চাঁদের চারপাশ থেকে প্রতিনিয়ত ছবি তুলে পাঠাচ্ছে লুনার রিকনিসেন্স অরবিটার স্যাটেলাইট। বছরের প্রতিদিন চাঁদের কোথায় কী পরিবর্তন হচ্ছে তা বোঝা যায় সেই ছবিগুলি থেকে। বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন চাঁদের পিঠে এমন একটি জায়গা খুঁজে বের করতে যেখানে প্রচুর সূর্যালোক থাকবে যেন তাপমাত্রার পার্থক্য খুব কম হয়, যেখানে ল্যান্ডিং সহজ হবে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় কোন বিচ্যুতি ঘটবে না। আর্টেমিস-৩ এর নভোচারীরা চাঁদের পিঠ থেকে প্রায় চল্লিশ কিলোগ্রাম নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে নিয়ে আসবেন। 


আর্টেমিস মিশনের আরেকটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা হলো লুনার গেটওয়ে – স্পেস স্টেশন স্থাপন করা। চাঁদের চারপাশে ঘুরবে এই বিশেষ মহাকাশ স্টেশন – লুনার গেটওয়ে। এই স্টেশনে নভোচারীরা এক থেকে তিন মাস পর্যন্ত অবস্থান করে চাঁদের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে অনেকগুলি পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে পারবেন। পৃথিবী থেকে তিন লক্ষ ৮৫ হাজার কিলোমিটার দূরে থেকে মহাকাশের ভবিষ্যৎ মিশনগুলির কারিগরি সহায়তা দেয়া হবে এই স্টেশন থেকে। আর্টেমিস-৩ এ নভোচারীরা যখন চাঁদে অবতরণ করবেন, তখন এই স্টেশন অনেক কাজে আসবে। 


নাসা অনেক বছর থেকেই চেষ্টা করছে চাঁদের পাশে স্টেশন তৈরি করার। ২০১২ সালে নাসা চাঁদের উল্টোপিঠে [যে পিঠ পৃথিবী থেকে দেখা যায় না] লুনার স্টেশন তৈরি করার পরিকল্পনা পর্যালোচনা করে। ২০১৭ সালে নাসা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল চাঁদের পাশে ‘ডিপ স্পেস গেটওয়ে’ মহাকাশ স্টেশন তৈরি করবে। ২০১৮ সালে স্পেস স্টেশনের নাম ঠিক করা হয় – লুনার অরবিটাল প্লাটফরম-গেটওয়ে। এখন স্পেস স্টেশনটি গেটওয়ে নামেই পরিচিত। 


আমেরিকার সবচেয়ে বড় বহুজাতিক মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারি প্রতিষ্ঠান নরথ্রপ গ্রুম্যান করপোরেশন লুনার গেটওয়ের হ্যাবিটেশন ও লিজিস্টিক আউটপোস্ট – হ্যালো (HALO) নির্মাণ করেছে। এর আগে নরথ্রপ গ্রুম্যান কোম্পানি জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের বিভিন্ন অংশ তৈরি করেছে। হ্যালো মডিউলটি তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে যন্ত্রপাতি এবং নভোচারীদের জন্য রসদ পাঠানোর জন্য ব্যবহৃত কার্গো মহাকাশযান সিগনাসের অনুকরণে। গেটওয়ের আয়তন সীমিত রাখা হয়েছে যেন তাকে মহাকাশে পাঠাতে কোন বেগ পেতে না হয়। বর্তমানে যেসব রকেটের মাধ্যমে সিগনাস পাঠানো হয় – সেই রকেটেই গেটওয়ে পাঠানো যায় মহাকাশে। গেটওয়ের হ্যালো মডিউল তৈরিতে খরচ হচ্ছে প্রায় ১১২২ মিলিয়ন ডলার (১১,২২০ কোটি টাকা)। গেটওয়ের হ্যালোতে চারজন নভোচারী তিরিশ দিন পর্যন্ত চাঁদের কাছাকাছি গিয়ে থাকতে পারবে এবং আবার ফিরেও আসতে পারবে। ২০২৪ সালে স্পেস-এক্স ফ্যালকন হ্যাভি রকেটের সাহায্যে গেটওয়ে পাঠানো হবে মহাকাশে। 


মহাকাশ স্টেশনের পাওয়ার অ্যান্ড প্রপালশান মডিউল তৈরি করছে আমেরিকার বিখ্যাত স্যাটেলাইট প্রস্তুতকারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্সার টেকনোলজিস। সৌরবিদ্যুৎ তৈরি করে সেই বিদ্যুতের মাধ্যমে চলবে এই মডিউল। চাঁদের চারপাশে এটা ঘুরবে, এবং ভবিষ্যতে এই স্টেশনকে যখন মঙ্গলে অভিযাত্রার কাজে লাগানো হবে, তখন প্রয়োজনীয় কারিগরি পরিবর্তন করা সম্ভব হবে। ২০২৪ সালে স্পেস-এক্স ফ্যালকন হ্যাভি রকেটের সাহায্যে এই মডিউল মহাকাশে পাঠানো হবে। 


লুনার স্পেস স্টেশন গেটওয়েতে নভোচারীরা সবসময় থাকবেন না। সর্বোচ্চ তিরিশ দিন থাকার পর তাঁরা যখন পৃথিবীতে ফিরে আসবেন, পরবর্তী মিশনে আরেকদল নভোচারী যাওয়ার আগপর্যন্ত সেই স্টেশন খালি থাকবে। তখন তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় মেরামতি কাজ করার জন্য অত্যাধুনিক রোবটিক হাতের ব্যবস্থা করছে কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সি। এই রোবটিক হাতের নাম কানাডার্ম-৩। স্পেস শাটল এবং ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনেও তাদের কানাডার্ম- ১ ও ২ কাজ করছে। কানাডার্ম -৩ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন বলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনেক দরকারি কাজ নিজে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে করে ফেলতে পারে। আগামী চব্বিশ বছরে কানাডা এ বাবদ দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি (বাংলাদেশ টাকায় প্রায় বিশ হাজার কোটি টাকা) খরচ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।  


স্পেস-এক্স কোম্পানি গেটওয়ের কার্গো সার্ভিসের দায়িত্ব নিয়েছে। তাদের কার্গোযানের নাম দেয়া হয়েছে ড্রাগন। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে ড্রাগন নিয়মিত পণ্য সরবরাহ করে। গেটওয়ের কার্গোর নাম ড্রাগন এক্স-এল। এই ড্রাগন আগের ড্রাগনের চেয়ে সাড়ে পাঁচ টন বেশি মালামাল বহন করতে পারবে। কার্গোর জন্য নাসার খরচ হচ্ছে প্রায় সাত শ কোটি ডলার (প্রায় সত্তর হাজার কোটি টাকা)। নভোচারীরা গেটওয়েতে যাবেন অরিয়ন নভোযানে চড়ে। 


গেটওয়ের জন্য একটি নতুন কক্ষপথ নির্ধারণ করা হয়েছে। এই কক্ষপথে আগে কোন নভোযান চাঁদের চারপাশে ঘোরেনি। এই কক্ষপথের নাম ‘নিয়ার রেকটিলিনিয়ার হ্যালো অরবিট (NRHO)’। এই কক্ষপথ থেকে চাঁদের দক্ষিণ মেরু একদম কাছে, কিন্তু অন্যান্য দিকে কিছুটা দূরে। এই কক্ষপথটি চাঁদের ভূমি থেকে তিন হাজার থেকে সত্তর হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। এই কক্ষপথে চাঁদের চারপাশে একবার ঘুরে আসতে সাত দিন সময় লাগবে। 


আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন পৃথিবী থেকে মাত্র ৪০৮ কিলোমিটার দূরে লোয়ার আর্থ অরবিটে ঘুরছে। সে তুলনায় গেটওয়ে পৃথিবী থেকে প্রায় তিন লক্ষ কিলোমিটার দূরে চাঁদের চারপাশে ঘুরবে। পৃথিবী থেকে এই স্টেশনে নভোচারী এবং অন্যান্য সামগ্রী পাঠানো অনেক বেশি ব্যয়বহুল এবং জটিল। তাই গেটওয়েতে সবসময় নভোচারীরা থাকবেন এমন নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই স্টেশন চলবে। এমনকি অন্যান্য মহাকাশ মিশনের নভোচারীরাও এই স্টেশন ব্যবহার করতে পারবে ভবিষ্যতে। গেটওয়ে স্টেশন স্থাপনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো চাঁদে অবতরণ এবং চাঁদ থেকে পৃথিবীতে ফিরে আসার সময় নভোচারী এবং নভোযানগুলি এই স্টেশন ব্যবহার করবে। নাসা ভবিষ্যতে চাঁদের বুকে একটি স্থায়ী স্টেশন ‘আর্টেমিস বেইজ ক্যাম্প’ স্থাপন করার পরিকল্পনাও গ্রহণ করেছে। 


গেটওয়ে থেকে লুনার টেলিরোবটিক্স পরীক্ষা করে দেখা হবে – পৃথিবী থেকে কমান্ড পাঠালে আর গেটওয়ে থেকে কমান্ড পাঠালে তাদের কর্মদক্ষতায় কোন পার্থক্য দেখা যায় কি না তা পরীক্ষা করে দেখা হবে। পৃথিবী থেকে কমান্ড পাঠালে তা চাঁদে পৌঁছাতে দুই সেকেন্ড সময় লাগে। গেটওয়ে থেকে কমান্ড পাঠাতে কোন সময়ই লাগবে না। সময়ের পার্থক্য কি কোন পরিবর্তন আনে তা পরীক্ষা করে দেখা যাবে। সুদূর ভবিষ্যতে চাঁদ থেকে মঙ্গলে পাড়ি দেয়ার সময় গেটওয়ে স্টেশন ভীষণ দরকারি হয়ে উঠবে। 

আর্টেমিস মিশনের মাধ্যমে মানুষের দ্বিতীয় পর্যায়ে চাঁদে যাওয়ার প্রক্রিয়া চালু হয়ে গেছে। অচিরেই আমাদের চাঁদ হয়ে উঠবে মহাকাশের স্থায়ী স্টেশন। 


তথ্যসূত্র:

১। www.nasa.gov

২। www.space.com

৩। প্রদীপ দেব, চাঁদের নাম লুনা, মীরা প্রকাশন, ঢাকা, ২০১৭। 

৪। ডগলাস ব্রিংকলি, আমেরিকান মুনশট, হারপার পেরেনিয়াল, নিউইয়র্ক,২০১৯। 

____________
বিজ্ঞানচিন্তা জুলাই ২০২৩ সংখ্যায় প্রকাশিত










Saturday 14 October 2023

সাগরতলে অভিযান




ছোটবেলায় আমরা যখন রুপকথার পাতালপুরীর রহস্যময় জগতের কথা পড়েছি তখন হয়তো ভেবে দেখিনি যে পাতাল বলতে আসলে আমরা কী বুঝি। আকাশ যেরকম আমাদের  উর্ধ্বদিকের দৃষ্টিসীমা নির্দেশ করে, সেরকমই পাতাল কি আমাদের পৃথিবীর নিম্নদিকের সীমানা? বড় হতে হতে আমরা জানলাম অন্যান্য সব গ্রহ-নক্ষত্রের মতোই পৃথিবী মহাশূন্যে ভাসমান সামান্য একটি গোলাকার গ্রহ। এই ভাসমান পৃথিবী মানুষ এবং অন্য সব প্রাণি, উদ্ভিদ সবকিছু নিজের পিঠের উপর নিয়েই প্রচন্ড বেগে ঘুরছে এবং ঘুরতে ঘুরতেই ঘুরে আসছে সূর্যের চারপাশে নির্দিষ্ট নিয়মে অবিরাম। আমরা বুঝলাম - পাতাল খুঁজে বের করতে হলে আমাদের পৃথিবী খুঁড়ে ঢুকতে হবে তার ভেতরে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতি কাজে লাগিয়ে মানুষ ইতোমধ্যেই আকাশ জয় করে ফেলেছে। আকাশপথে ভ্রমণ এখন কোন সমস্যাই নয়। পৃথিবী ছাড়িয়ে আকাশযান চলে গেছে সৌরজগতের সীমানা ছাড়িয়ে মহাশূন্যের অন্যান্য সব নক্ষত্রলোকের দিকে মহাবিশ্বের অজানা জ্ঞান অনুসন্ধানে। চাঁদের পিঠে হেঁটে এসেছে পৃথিবীর বারোজন মানুষ। চাঁদে বসতি গড়ার কথা হচ্ছে, চেষ্টা চলছে মঙ্গল গ্রহে যাবার। পৃথিবীতে আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম চালানোর জন্য পৃথিবীর বাইরে স্থাপন করা হয়েছে শতাধিক স্যাটেলাইট – যেগুলি সারাক্ষণ পৃথিবীর উপর নজরদারি করছে। পৃথিবীর স্থলভাগের এমন কোনো জায়গা আর অবশিষ্ট নেই – যেখানকার কোন ছবি তোলা হয়নি। শুধু মাটির উপরিভাগ নয়, মাটির গভীরেও চলছে মানুষের অনুসন্ধান। মানুষ মাটি খুঁড়ে বের করে ফেলেছে তেল, গ্যাস, সোনা, রূপা, হীরা, তামা, কয়লাসহ প্রয়োজনীয় অনেককিছু। ভূস্তরের শত শত মিটার নিচ থেকে তুলে আনছে  বিশুদ্ধ পানি – পান করার জন্য, শুকনো মৌসুমে চাষ করার জন্য। কিন্তু পৃথিবীর স্থল এবং অন্তরীক্ষ  সম্পর্কে মানুষ যে পরিমাণ জ্ঞান আহরণ করেছে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এত উন্নতির পরেও সেই তুলনায় স্থলভাগের দ্বিগুণেরও বেশি যে জলভাগ, সেই গভীর জলভাগ সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান এখনো অনেকক্ষেত্রেই ততটা গভীর নয়। 


এর প্রধান কারণ হলো প্রতিবন্ধকতা। মানুষ খালি চোখে আকাশের গ্রহ-নক্ষত্রগুলি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবনের আগেই অনেক হিসেবনিকেশ করে ফেলতে পেরেছিল মহাবিশ্ব সম্পর্কে। কিন্তু সাগরতলের গভীর পানির নিচে কী হচ্ছে তা পর্যবেক্ষণ করা সহজ ছিল না। মানুষ পানিতে নেমে সাঁতার শিখেছে, ডুব দিতে শিখেছে। ডুব দিয়ে কতক্ষণ পানির নিচে নিশ্বাস বন্ধ করে থাকা যায় দেখেছে, চেষ্টা করেছে যতদূর সম্ভব গভীরে যাওয়ার। কিন্তু অক্সিজেন ছাড়া পানির নিচে বেশিক্ষণ থাকা যায় না। প্রয়োজনীয় কারিগরি ব্যবস্থা ছাড়া পানির গভীরে প্রচন্ড চাপ সহ্য করা মানুষের শরীরের পক্ষে অসম্ভব। তাছাড়া পানির অনেক নিচে সূর্যালোক প্রবেশ করতে পারে না বলে সেখানে ভীষণ অন্ধকার। সহনীয় গভীরতার নিচে সেই অন্ধকার, প্রচন্ড চাপ এবং অক্সিজেনবিহীন পরিবেশে কোন প্রাণী বাস করতে পারবে না বলেই ধারণা ছিল মানুষের। তাই যোগাযোগের প্রয়োজনে মানুষ যখন বিভিন্ন ধরনের জলযান তৈরি করে ফেলেছে – মহাসাগরগুলির দ্বীপগুলি আবিষ্কৃত হয়ে গেছে, আস্তে আস্তে মনোনিবেশ করেছে পানির গভীরে। সেই ইতিহাস খুব বেশি পুরনো নয়। 


বৈজ্ঞানিকভাবে ডিপ সি বা গভীর সমুদ্র বলতে বোঝানো হয় পানির সেই গভীরতা যেখানে পানির তাপমাত্রা আর সূর্যের আলোর উপর নির্ভর করে না। পানির উপর সূর্যের আলো পড়লে পানির তাপমাত্রা কিছুটা বাড়ে, তার প্রভাব থাকে যতদূর পর্যন্ত সূর্যালোক প্রবেশ করে ততদূর পর্যন্ত। চার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় বিশুদ্ধ পানির ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি। তাপমাত্রা চার ডিগ্রি সেলসিয়াসের চেয়ে বাড়তে থাকলে কিংবা কমতে থাকলে পানির ঘনত্ব কমতে থাকে। পানির উপরিস্তর থেকে একটা গভীরতার পর পানির উপর সূর্যালোকের আর কোন প্রভাব থাকে না – যার নাম থার্মোক্লাইন লেয়ার (thermocline)। সাধারণত ২০০ মিটার থেকে এক হাজার মিটার পর্যন্ত গভীরে এই লেয়ার থাকে। গভীর সমুদ্রে অনেকক্ষেত্রে ১৮০০ মিটার গভীরতায় এই থার্মোক্লাইন স্তর থাকতে পারে। এই গভীরতায় পানির তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রি থেকে তিন ডিগ্রি পর্যন্ত হতে পারে। 


পানির গভীরতা বাড়ার সাথে সাথে চাপ বাড়তে থাকে। তিন হাজার মিটার গভীরে পানির চাপ প্রায় ১৫,৭৫০ পিএসআই, অর্থাৎ প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে চাপের পরিমাণ ১৫,৭৫০ পাউন্ড – যা পৃথিবীর বায়ুর চাপের এক হাজার গুণেরও বেশি। তাই এই চাপ সহ্য করার মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা উদ্ভাবনের আগপর্যন্ত গভীর পানিতে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান সম্ভব হয়নি। 


সাগরতলে অভিযানের ইতিহাস থেকে দেখা যায় – প্রাচীনকালে দড়িতে পাথর বেঁধে পানির গভীরতা মাপার চেষ্টা করা হতো। পর্তুগিজ নাবিক ফার্দিনান্দ ম্যাগেলান ১৫২১ সালে প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরতা মাপার চেষ্টা করেছিলেন। স্পেনের সাথে ইস্ট ইন্ডিজের সামুদ্রিক বাণিজ্য স্থাপনের লক্ষ্যে প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্র যাত্রা করেছিলেন ফার্দিনান্দ ম্যাগেলান ১৫১৯ সালে। সমুদ্রপথে বিশ্বভ্রমণের সূচনা করেছিলেন তিনি। প্রশান্ত মহাসাগর এবং আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্যে সংযোগের নৌপথ তিনি আবিষ্কার করেছিলেন বলে সেই সংযোগ পথের নাম দেয়া হয়েছে স্ট্রেইট অব ম্যাগেলান। প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরতা মাপার জন্য তিনি ২,৪০০ ফুট লম্বা দড়ির মাথায় ভারী লোহা বেঁধে জাহাজ থেকে পানিতে ফেলেছিলেন। ২,৪০০ ফুট দড়ি দিয়েও তিনি সাগরের তল স্পর্শ করতে পারেননি। সেই বছরই তিনি প্রতিপক্ষের হাতে নিহত হবার পর আর চেষ্টা করার সুযোগ পাননি। 


পরবর্তী তিনশ বছরধরে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করা হয়েছে সমুদ্রের গভীরতা মাপার। সমুদ্রের গভীরতা ভৌগোলিক কারণেই বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন। বিজ্ঞানীরা তখনো বিশ্বাস করতেন যে থার্মোক্লাইন লেয়ারের নিচের গভীরতায় কোন প্রাণি থাকতে পারে না। তাই শুধুমাত্র নিষ্প্রাণ গভীর অন্ধকারের প্রতি তেমন কৌতূহল কারো ছিল না।     


কিন্তু ১৮১৮ সালে স্কটিশ রয়্যাল নেভি অফিসার স্যার জন রস যখন আটলান্টিক মহাসাগরের উত্তরপশ্চিম অংশে সমুদ্র-জরিপ করছিলেন সমুদ্রের বিভিন্ন জায়গা থেকে সামুদ্রিক প্রাণির নমুনা সংগ্রহ করছিলেন। লম্বা তারের মাধ্যমে ধাতব খাঁচা পানিতে ফেলে বিভিন্ন গভীরতায় নমুনা সংগ্রহ চলছিল। তিনি আটলান্টিক মহাসাগরের প্রায় দুই হাজার মিটার গভীরতায় কিছু সামুদ্রিক পোকামাকড় এবং জেলিফিস পান। পূর্বধারণা অনুযায়ী এই গভীরতায় কোন প্রাণীর থাকার কথা নয়। তাহলে কি সেই ধারণা ভুল ছিল? এত চাপের মধ্যেও সমুদ্রে প্রাণ থাকা সম্ভব? বিজ্ঞানীদের কৌতূহল বেড়ে গেল। ছোট পরিসরে বিভিন্ন রকমের সামুদ্রিক অভিযান চলতে থাকলো। 


কিন্তু বৃহৎ পরিসরে সামুদ্রিক বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান শুরু হয় ১৮৭০ সালে। ব্রিটিশ সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী চার্লস থমসন এবং উইলিয়াম কার্পেন্টার প্রস্তাব করলেন পৃথিবীর সবগুলি মহাসাগরে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান শুরু করার। এর প্রায় দশ বছর আগে থেকে তাঁরা স্কটল্যান্ডের সমুদ্রে এবং ফ্যারো দ্বীপে গভীর পানিতে অনুসন্ধান চালিয়ে প্রমাণ পেয়েছেন যে এক কিলোমিটারেরও অধিক গভীরে সামুদ্রিক প্রাণী আছে। এখন তাঁরা দেখতে চান সমুদ্রের সর্বোচ্চ কত গভীরতায় সামুদ্রিক প্রাণী খুঁজে পাওয়া যায়। গেলে সেগুলির বৈশিষ্ট্য কী? একটি সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক জরিপ তাঁরা করতে চান। তাঁরা বিস্তারিত পরিকল্পনা তৈরি করে রয়্যাল সোসাইটি এবং ব্রিটিশ সরকারের কাছে আবেদন পাঠালেন। 


সেই সময় পৃথিবীর টেলিগ্রাফ যোগাযোগব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। আমেরিকা ও ইউরোপের মধ্যে টেলিগ্রাফ যোগাযোগের জন্য সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে টেলিগ্রাফের তার নিয়ে যাবার পরিকল্পনা করা হচ্ছিল। সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে টেলিগ্রাফের তার নিয়ে যেতে হলে সমুদ্রের গভীরতা কোথায় কত, এবং পরিবেশ কীরকম তা জানা খুবই জরুরি ছিল। তাই থমসন ও কার্পেণ্টারের বৈজ্ঞানিক প্রস্তাবটি ছিল খুবই সময়োপযোগী। ব্রিটিশ সরকার তাঁদের বৈজ্ঞানিক প্রস্তাব অনুমোদন করে দুই লক্ষ পাউন্ড বরাদ্দ করল। সেই সময়ের দুই লক্ষ পাউন্ড বর্তমানে প্রায় এক কোটি পাউন্ডের সমতুল্য। এই প্রকল্পের নাম দেয়া হলো রয়্যাল নেভির জাহাজ এইচ-এম-এস চ্যালেঞ্জারের নামানুসারে এক্সপেডিশান ‘চ্যালেঞ্জার’। 


জুল ভার্নের 'টুয়েন্টি থাউজ্যান্ড লিগ্‌স আন্ডার দ্য সিজ' বইয়ের প্রথম প্রচ্ছদ


এদিকে কল্পকাহিনির জগতেও এর প্রভাব পড়লো। ফরাসি কল্পবিজ্ঞানলেখক জুল ভার্নের সাগরতলের রহস্যজনক দৈত্যাকৃতি প্রাণির অনুসন্ধানকেন্দ্রিক সামুদ্রিক অভিযানের বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি ‘টুয়েন্টি থাউজ্যান্ড লিগস আন্ডার দ্য সিজ’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৭০ সালে। এর চার বছর পর ১৮৭৪ সালে সাগরতলের অভিযান নিয়ে জুল ভার্নের আরো একটি কল্পকাহিনি ‘দ্য মিস্টেরিয়াস আইল্যান্ড’ প্রকাশিত হয়। দুটো কাহিনিতেই দুর্ধর্ষ চরিত্র ক্যাপ্টেন নিমো ‘নটিলাস’ নামে যে সাবমেরিন ব্যবহার করেছিলেন – সেই সাবমেরিন পুরোপুরি কাল্পনিক ছিল না। প্রথম বাস্তব সাবমেরিনের নাম ছিল ‘নটিলাস’। আমেরিকান ইঞ্জিনিয়ার রবার্ট ফুলটন ‘নটিলাস’ সাবমেরিন তৈরি করেছিলেন এবং ১৮০০ সালে তা প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে পানির নিচে চালানো হয়েছিল। 


অবশ্য পানির নিচে চালানোর মতো নৌযানের ধারণা এবং প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল আরো প্রায় দু’শ বছর আগে। ১৬২০ সালে ওলন্দাজ (ডাচ) ইঞ্জিনিয়ার করনেলিস ড্রেবেল বিশ্বের প্রথম সাবমেরিন তৈরি করেছিলেন। পরবর্তী দেড়শ বছর ধরে প্রয়োজনের সাথে পাল্লা দিয়ে অনেক উন্নতি হয়েছে সাবমেরিন প্রযুক্তির। আমেরিকার স্বাধীনতাযুদ্ধে প্রথমবার ব্যবহৃত হয়েছিল সাবমেরিন “টার্টল”। কচ্ছপের মতো পানির নিচে বিচরণ করতে পারতো বলেই এই নাম। আমেরিকার কানেকটিকাট রাজ্যের ডেভিড বুশনেল ছিলেন অসম্ভব দক্ষ একজন উদ্ভাবক। তিনি একাধারে ছিলেন ডাক্তার, শিক্ষক, উদ্ভাবক এবং প্রকৌশলী। তিনি ছিলেন আমেরিকার স্বাধীনতাযোদ্ধা। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আমেরিকার স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় ১৭৭৫ সালে তিনি তৈরি করেছিলেন পানির নিচে থেকে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জাহাজে আক্রমণ করার উপযোগী সাবমেরিন ‘টার্টল’। ১৭৭৬ সালে নিউইয়র্ক হারবারে ব্রিটিশ জাহাজে আক্রমণ করার কাজে প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা হয়েছিল “টার্টল’। যদিও সেই আক্রমণ ব্যর্থ হয়েছিল – ‘টার্টল’ ইতিহাসে নাম লিখিয়ে ফেলেছিল। ১৮০০ সালে রবার্ট ফুলটন যখন ‘নটিলাস’-এর নকশা তৈরি করেছিলেন তাতে ড্রেবেলের সাবমেরিন এবং বুশনেলের ‘টার্টল’-সাবমেরিনের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা ছিল। জুল ভার্নের কাল্পনিক সাবমেরিন ‘নটিলাস’ ছিল অনেকটাই বাস্তব নটিলাসের আধুনিক প্রতিফলন। কল্পকাহিনিতে অন্যান্য যেসব যন্ত্রপাতি এবং আনুষঙ্গিকতার বর্ণনা আছে – তাদের সাথে বাস্তবের অনেক মিল আছে। পানির নিচে শ্বাসপ্রশ্বাস নেয়ার জন্য যন্ত্রপাতির প্রথম প্যাটেন্ট দেয়া হয়েছিল ১৮৬৫ সালে ফরাসি ইঞ্জিনিয়ার বেনট রকোয়ারল এবং অগাস্তি ডেনায়রসকে। 


চ্যালেঞ্জার অভিযানের জন্য ব্রিটিশ রয়েল নেভি – তাদের পুরনো যুদ্ধজাহাজ এইচ-এম-এস চ্যালেঞ্জারকে কিছুটা পরিবর্তন করে ব্যবহারের জন্য দেয়। কাঠের তৈরি দুইশ ফুট লম্বা এই জাহাজ থেকে কামান এবং অন্যান্য যুদ্ধসরঞ্জাম সরিয়ে সেখানে ল্যাবরেটরি আর নমুনা রাখার ঘর তৈরি করে অভিযাত্রা শুরু হয় ১৮৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে। পোর্টসমাউথ বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে পরবর্তী চার বছর ধরে গভীর সমুদ্রপথে উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, প্রশান্ত এবং আটলান্টিক মহাসাগরের সবগুলি দ্বীপ পরিভ্রমণ করে ১৮৭৬ সালে ইংল্যান্ডে ফিরে আসে চ্যালেঞ্জার। প্রায় ৭০ হাজার নটিক্যাল মাইল পরিভ্রমণকালে ৩৬২টি জায়গায় থেমে নমুনা সংগ্রহ করেছেন চ্যালেঞ্জারের বিজ্ঞানীরা। ধাতব জাল এবং পাত্রের সাহায্যে তাঁরা সংগ্রহ করেছেন সামুদ্রিক প্রাণী, মাটি, পানি, কীটপতঙ্গ, মাছ ইত্যাদি নমুনা। ৫৬৩টি বাক্সভর্তি ২,২৭০টি বড় কাচের পাত্র, ১৭৪৯টি ছোট কাচের বোতল, ১৮৬০টি কাচের টিউব, ১৭৬টি টিনভর্তি নমুনা নিয়ে ফিরেছিল চ্যালেঞ্জার। পরবর্তীতে বিশ বছর সময় লেগেছে সবগুলি নমুনা পরীক্ষা করতে। পরীক্ষালব্ধ ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে পঞ্চাশটি খন্ডে মোট তিরিশ হাজারের বেশি পৃষ্ঠায়। 


চ্যালেঞ্জার অভিযানে বিজ্ঞানী চার্লস থমসন ও উইলিয়াম কার্পেন্টারের তত্ত্বাবধানে যে অনুসন্ধান চালানো হয়েছিল তাতে পৃথিবীর পাঁচটি মহাসাগরের বিভিন্ন স্থানের গভীরতা মাপা হয়েছে। গভীরতা মাপার জন্য সাথে নেয়া হয়েছিল প্রায় ১৫০ মাইল লম্বা তামার তার। এই তারে ধাতব ওজন ঝুলিয়ে পানিতে ডুবিয়ে দেয়া হতো। সেই সময় গভীরতা মাপা হতো ফ্যাদমে। ছয় ফুটে এক ফ্যাদম। তারের প্রতি ফ্যাদমে একটি করে মার্কিং ফ্ল্যাগ লাগানো ছিল। কত গভীরতায় গিয়ে তারের মাথায় লাগানো ওজন সমুদ্রের তলে গিয়ে ঠেকেছে তা দেখে সহজেই সেই জায়গায় পানির গভীরতা মাপা যেতো। চ্যালেঞ্জার দক্ষিণ পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপ গুয়াম ও পালাউর মাঝামাঝি জায়গায় খুঁজে পেয়েছে পৃথিবীর গভীরতম খাদ – ম্যারিয়ানা ট্রেঞ্চ। এউ ট্রেঞ্চের গভীরতা মাপা হয়েছিল প্রায় আট কিলোমিটার। 


ভূপদার্থবিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন এর উৎপত্তির ইতিহাস। প্যাসিফিক ও ফিলিপাইন টেকটোনিক প্লেটের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিল প্রায় ষাট লক্ষ বছর আগে। সংঘর্ষের ফলে প্যাসিফিক প্লেট ঢুকে যায় সমুদ্রতলের প্রায় আট থেকে দশ কিলোমিটার গভীরে। ফলে এমন গভীর খাদের সৃষ্টি হয় যাতে পৃথিবীপৃষ্ঠের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্ঘ এভারেস্টও ডুবে যাবে পুরোপুরি। 


সমুদ্রের গভীরতা মাপার পদ্ধতির অনেক উন্নতি হয়েছে পরবর্তীতে। ১৯১২ সালে টাইটানিক জাহাজ ডুবে যায় আটলান্টিক মহাসাগরে। পানিতে শব্দের প্রতিফলন কাজে লাগিয়ে বস্তুর অবস্থান এবং দূরত্ব হিসেব করার ইকো রেঞ্জিং পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে ১৯১৪ সালে। কানাডিয়ান উদ্ভাবক এবং বেতার পদার্থবিজ্ঞানী রেজিনাল্ড ফেসেনডেন তাঁর তৈরি ফেসেনডেন অস্‌সিলেটর ব্যবহার করে পানির ভেতরের দূরত্ব এবং গভীরতা নির্ণয় করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। তাঁর অস্‌সিলেটর পানির নিচে প্রচন্ড শব্দ তৈরি করে পাঠায়। পরে সেই শব্দ তরঙ্গ কোথাও প্রতিফলিত হয়ে ফিরে এলে তা নির্ণয় করতে পারে। প্রেরণের সময় এবং গ্রহণের মধ্যবর্তী সময় হলো শব্দ যাওয়া এবং আসার মোট সময়। পানিতে শব্দের বেগ দিয়ে এই সময়কে গুণ করে শব্দের উৎস থেকে প্রতিফলক বস্তুর দূরত্ব নির্ণয় করা যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ফেসেনডেনের ইকো রেঞ্জিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল ব্যাপকভাবে। 


ইকো রেঞ্জিং পদ্ধতি থেকে উদ্ভাবিত হয়েছে আধুনিক সাউন্ড ন্যাভিগেশন অ্যান্ড র‍্যাঞ্জিং বা সোনার (SONAR) পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে আলট্রাসাউন্ড পাঠিয়ে এবং তার প্রতিফলন শনাক্ত করে দুটো সময়ের পার্থক্যকে শব্দের বেগ দিয়ে গুণ করে দূরত্ব নির্ণয় করা হয়। সোনার পদ্ধতিতেই ডুবে যাওয়া টাইটানিক জাহাজের সঠিক অবস্থান খুঁজে বের করা সম্ভব হয়েছে আটলান্টিক মহাসাগরের ১২,৬০০ ফুট গভীরে।


১৯৫১ সালে ব্রিটিশ জরিপ জাহাজ চ্যালেঞ্জার-২ আরো আধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ে চ্যালেঞ্জার অভিযাত্রার পুনরাবৃত্তি করে। সেই সময় আবিষ্কৃত হয়েছে পৃথিবীর গভীরতম স্থান – ম্যারিয়ানা ট্রেঞ্চ যার গভীরতা ৩৬,২০১ ফুট বা ১১,০৩৪ কিলোমিটার যা মাউন্ট এভারেস্টের চেয়ে ২,১৮৫ মিটার বেশি। চ্যালেঞ্জার অভিযাত্রার নাম অনুসারে  এই গভীরতম স্থানের নাম দেয়া হয়েছে চ্যালেঞ্জার ডীপ। 


পৃথিবীর উচ্চতম শৃঙ্গে হেঁটে উঠে গেছে এমন মানুষের সংখ্যা তিন হাজারেরও বেশি। পৃথিবী থেকে তিন লক্ষ চৌত্রিশ হাজার কিলোমিটার দূরের চাঁদের পিঠে গিয়ে হেঁটে এসেছে বারোজন মানুষ। অথচ ম্যারিয়ানা ট্রেঞ্চের তলদেশে গিয়েছেন এমন মানুষের সংখ্যা মাত্র তিন। 


পানির গভীরে অক্সিজেন নেই এবং চাপ অত্যন্ত বেশি। পানিতে স্কুবা ডাইভিং-এর জন্য স্বয়ংক্রিয় শ্বাস-প্রশ্বাসের যন্ত্র একুয়ালাং আবিষ্কৃত হয়েছে ১৯৪৩ সালে। ফরাসি বিজ্ঞানী জ্যাকস-ইয়েভিস কসটেউ এবং এমিল গ্যাংনান একুয়ালাং উদ্ভাবন করেন। একুয়ালাং-এর সাহায্যে পানির গভীরে ভেসে বেড়ানো অনেকটাই সহজ হয়েছে সাহসী মানুষের জন্য। কিন্তু আরো গভীরে অনুসন্ধান চালানোর জন্য ডুবুরীর সরঞ্জামের সাথে দরকার আধুনিক সাবমেরিন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সাবমেরিন প্রযুক্তির অনেক উন্নতি ঘটে।


১৯৬০ সালে আমেরিকান নেভির তত্ত্বাবধানে সমুদ্রের গভীরে অভিযান এবং গবেষণা চলছিল। প্রজেক্ট নেকটন ছিল সমুদ্রের গভীরে সাবমেরিনের মাধ্যমে মানুষ গিয়ে – প্রচন্ড গভীরে গিয়ে মেরিন লাইফ, তাপমাত্রা চাপ এবং শব্দের মিথষ্ক্রিয়া কী রকম – এসমস্ত বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানী প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য। সাবমেরিন ট্রিয়েস্টি ছিল এই প্রজেক্টের অংশ। ১৯৬০ সালের ২৩ জানুয়ারি ম্যারিয়ানা ট্রেঞ্চের তলদেশে প্রথম দুজন মানুষ – আমেরিকান নেভি ল্যাফটেনেন্ট ডন ওয়ালশ  এবং এক্সপ্লোরার জ্যাকস পিকার্ড সাবমেরিন নিয়ে পৌঁছে যান। আমেরিকান নেভি এই সাবমেরিন কিনেছিল এই অভিযানের জন্য। সাবমেরিনের দেয়াল ছিল পাঁচ ইঞ্চি পুরো স্টীলের তৈরি যেন ওটা ওই গভীরতায় পানির প্রচন্ড চাপ  (প্রতি বর্গইঞ্চিতে আট টন) সহ্য করতে পারে। 


সমুদ্রের তলদেশে পৌঁছানোর আগে সাবমেরিনের হেডলাইটের আলোতে  তাঁরা একটি শোল মাছের মতো মাছ দেখতে পান। তার মানে সমুদ্রের অত গভীরেও মাছের শ্বাস প্রশ্বাস নেয়ার মতো অক্সিজেন আছে, খাদ্য আছে। সেখানে একটি মাছ আছে মানে আরো মাছ আছে যারা সমুদ্রের তলদেশে থাকে। তলদেশে পৌঁছে তাঁরা কোন ছবি তুলতে পারেননি। কারণ সাবমেরিনটি সমুদ্রের তলদেশ স্পর্শ করার সাথে সাথে বালি এবং কাদা ছিটকে চারপাশের পানি প্রচন্ড ঘোলা হয়ে যায়।  সমুদ্রের তলদেশে তারা সাবমেরিনের ভেতর আধঘন্টা ছিল। এরপর উপরে চলে আসেন। যাওয়া-আসা মিলিয়ে প্রায় বাইশ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে তাঁদের সময় লেগেছিল প্রায় পাঁচ ঘন্টা।  


জেমস ক্যামেরুন


পরবর্তী পঞ্চাশ বছরে আর কেউই যাননি ম্যারিয়ানা ট্রেঞ্চের তলদেশে। ১৯৬০ সালে যে দুজন মানুষ পৃথিবীর গভীরতম স্থানে গিয়েছিলেন তাঁদের মৃত্যু হয়েছে অনেক বছর আগে। তাঁদের অভিযাত্রার বায়ান্ন বছর পর যে সাহসী মানুষটি পা রাখলেন পৃথিবীর গভীরতম স্থানে – তিনি আমাদের সবার পরিচিত জেমস ক্যামেরন । টার্মিনেটর, অ্যালিয়েন, টাইটানিক, অবতার প্রভৃতি বিপুল জনপ্রিয় সিনেমার পরিচালক জেমস ক্যামেরন যে একজন অভিযাত্রিক তা আমরা অনেকেই জানি না। অনেক বছর ধরে তিনি প্রশিক্ষণ নিয়েছেন গভীর সমুদ্রে অভিযান চালানোর জন্য। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, রোল্যাক্স এবং নিজের টাকায় তিনি তৈরি করিয়েছেন অত্যাধুনিক সাবমেরিন ডিপ সী চ্যালেঞ্জার। ২০১২ সালের ২৬ মার্চ তিনি পৌঁছান ম্যারিয়ানা ট্রেঞ্চের গভীরতম স্থান চ্যালেঞ্জার ডীপে। তলদেশে পৌঁছার পর তিনি সাবমেরিন থেকে বের হয়ে পাঁচ ঘন্টা ধরে পানির নিচে ছবি এবং ভিডিও ধারণ করেন। পরবর্তীতে ‘ডিপ সি চ্যালেঞ্জ’ নামে  ত্রিমাত্রিক তথ্যচিত্র তৈরি করেন তিনি যাতে ম্যারিয়ানা ট্রেঞ্চের পুঙ্খানুপূঙ্খ বাস্তব চিত্র দেখা সম্ভব হয় আমাদের। বর্তমানে জেমস ক্যামেরনই পৃথিবীর একমাত্র জীবিত ব্যক্তি যিনি  ৫৮ বছর বয়সে পৃথিবীর গভীরতম স্থানে পা রেখেছিলেন। 


বর্তমানে সামুদ্রিক অভিযান ক্রমাগত চলছে আধুনিক রোবটের মাধ্যমে। রিমোর্টলি অপারেটেড ভ্যাহিকল বা রোভ-এর সাহায্যে সমুদ্রের তলদেশে ক্যামেরা, সোনার এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতির মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা ল্যাবরেটরিতে বসেই তথ্য সংগ্রহ করছেন। অটোনোমাস আন্ডারওয়াটার ভেহিকলস অর্থাৎ স্বয়ংক্রিয় মনুষ্যবিহীন সাবমেরিনের মাধ্যমেও বর্তমানে সামুদ্রিক গবেষণা চলছে। সমুদ্রের তলদেশে নোঙর করা স্বয়ংক্রিয় ল্যাবরেটরি পানির গভীরে থেকে সমুদ্রের গভীরের অনেক প্রাকৃতিক ঘটনার দিকে নজর রাখছে এবং নিয়মিত ডাটা পাঠাচ্ছে। প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশ থেকে ৯৮০ মিটার উচ্চতায় পানির ভেতর ভেসে আছে মনটেরে এক্সিলারেটেড রিসার্চ সিস্টেম বা মার্স যা প্রশান্ত মহাসাগরের ভূমিকম্প রেখার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করছে। তবুও এখনো মহাসাগরের অনেককিছুই অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে আগামী দিনের বিজ্ঞানীদের জন্য।


তথ্যসূত্র

১। Wolf H. Berger, Ocean Reflection of a century of exploration, University of California Press, Berkeley, 2009.

2. Deepseachallenge.com

3. Helmenstine, Anne Marie, Ph.D. "Deep Sea Exploration History and Technology." Thought Co, Aug. 27, 2020, thoughtco.com/deep-sea-exploration-4161315.

4. Alok Jha, The Water Book, Headline publishing, London, 2016. 

5. The Lonely Planet guide to the middle of nowhere, Australia 2006. 

_________
বিজ্ঞানচিন্তা জুন ২০২৩ সংখ্যায় প্রকাশিত










Saturday 7 October 2023

নোবেল পুরষ্কার ২০২৩ – শান্তি

 



ইরানের নার্গিস মোহাম্মদী ২০২৩ সালের নোবেল শান্তি পুরষ্কার পেয়েছেন। ইরানে নারীদের উপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ ও সংগ্রামের স্বীকৃতি এই নোবেল শান্তি পুরষ্কার। 


নার্গিস মোহাম্মদী


নার্গিস মোহাম্মদী



তাঁর জন্ম ১৯৭২ সালের ২১ এপ্রিল ইরানের জানজানে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করার কারণে ইরানের শাসকরা তাঁকে ১৩বার বন্দী করেছে, পাঁচ বার তাঁকে  আদালত বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড এবং চাবুক মারার শাস্তি দিয়েছে। সব মিলিয়ে তিনি এখন একত্রিশ বছরের কারাদন্ড ভোগ করছেন ইরানের জেলখানায়। তাঁকে একশ চুয়ান্নবার বেত্রাঘাত করা হবে শাসকরা যেদিন চাইবে।


নোবেল পুরষ্কার ২০২৩ – সাহিত্য

 


২০২৩ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন নরওয়ের লেখক ইয়ন ফসি (Jon Fosse)। ১৯৫৯  সালের ২৯ সেপ্টেম্বর জন্ম তাঁর। গদ্য, পদ্য, নাটক, প্রবন্ধ অনেককিছু লিখেছেন তিনি। অনেকগুলি সাহিত্য পুরষ্কার পেয়েছেন। মূলত নরওয়েজিয়ান ভাষায় লেখেন তিনি। তবে অনেক পদ্য, গদ্য এবং নাটক ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। 


ইয়ন ফসি


[অন্যান্য বছরের মতো এবছরও দেখা যাচ্ছে, নোবেল পুরষ্কারপ্রাপ্ত সাহিত্যিকের নাম আমি এই প্রথম শুনলাম। বিশ্বসাহিত্যে আমার জ্ঞান যে শূন্য তা আবারো প্রমাণিত হলো।]


নোবেল পুরষ্কার ২০২৩ – রসায়ন

 



২০২৩ সালের রসায়ন নোবেল পুরষ্কার ন্যানোপার্টিক্যালের। তিনজন আমেরিকান রসায়নবিজ্ঞানী আলেক্সেই একিমভ, মঞ্জি বাবেন্ডি, এবং লুই ব্রুস এ বছরের রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন কোয়ান্টাম ডট আবিষ্কারের জন্য। 


মঞ্জি বাবেন্ডি

এম আই টির প্রফেসর মঞ্জি বাবেন্ডি (Moungi Bawendi)র জন্ম ১৯৬১ সালে প্যারিসে। ১৯৮৮ সালে তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করেন। 


লুই ব্রুস


কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর লুই ব্রুসের (Louis Brus) জন্ম ১৯৪৩ সালে ওহাইওর ক্লিভল্যান্ডে। ১৯৬৯ সালে তিনি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করেন।


আলেক্সেই একিমভ


নিউইয়র্কের ন্যানোকৃস্টাল টেকনোলজি কোম্পানির প্রাক্তন প্রধান বিজ্ঞানী আলেক্সেই একিমভের (Alexei Ekimov) জন্ম তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নে ১৯৪৫ সালে। ১৯৭৪ সালে তিনি পিএইচডি অর্জন করেন রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ ফিজিক্যাল-টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট থেকে। 

বর্তমানে QLED টেকনোলোজিতে কোয়ান্টাম ডট ব্যবহার করা হচ্ছে। এই প্রযুক্তিতে কম্পিউটার মনিটর এবং স্মার্ট টেলিভিশন স্ক্রিন আলোকিত করা হচ্ছে। ভবিষ্যতের মাইক্রোইলেকট্রনিক্স হবে ন্যানোটেকনোলজি নির্ভর - যেখানে কোয়ান্টাম ডট ব্যবহৃত হবে নিয়মিতভাবে।


Latest Post

Hendrik Lorentz: Einstein's Mentor

  Speaking about Professor Hendrik Lorentz, Einstein unhesitatingly said, "He meant more to me personally than anybody else I have met ...

Popular Posts