Showing posts with label অস্ট্রেলিয়া. Show all posts
Showing posts with label অস্ট্রেলিয়া. Show all posts

Saturday, 19 September 2026

পাবলিক ফোন

 


অস্ট্রেলিয়ায় আমার প্রথম তিন বছর ধরে বাংলাদেশে কথা বলার একমাত্র মাধ্যম ছিল পাবলিক টেলিফোন। টেলেস্ট্রার প্রি-পেইড কলিং-কার্ড কিনতাম সপ্তাহে একবার। দশ ডলারের কার্ডে ছয় মিনিট কথা বলা যেতো। এই ছয় মিনিট কথা বলার পর পুরো এক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হতো পরবর্তী ছয় মিনিটের জন্য। দশ ডলার উপার্জন করার জন্য সেই সময় আমাকে দুই ঘন্টা কায়িক শ্রম দিতে হতো।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকবল

 


প্রায় দুই যুগ আগে যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম তখন মনে হতো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মতো এত সুখ এবং স্বাধীনতা আর কোন পেশায় নেই। সেরকম মনে হবার যথেষ্ট কারণ ছিল। দেখতাম সিনিয়র অধ্যাপকদের কেউ কেউ সারা বছর একটা ক্লাসও না নিয়ে শুধুমাত্র করিডোরে গম্ভীরভাবে হেঁটে হেঁটেই সময় কাটিয়ে দেন। আমাদের এমএসসি ক্লাসে সলিড স্টেট ফিজিক্স পড়ানোর দায়িত্ব যাঁর ছিল তিনি ছিলেন খুবই সিনিয়র অধ্যাপক। পুরো এক বছরে তিনি আমাদের একটা মাত্র ক্লাস

Wednesday, 15 July 2026

অস্ট্রেলিয়া এবং ইন্টারন্যাশনাল ফিজিক্স অলিম্পিয়াড ২০২৬

 


কলম্বিয়ায় অনুষ্ঠিত ৫৬তম  ইন্টারন্যাশনাল ফিজিক্স অলিম্পিয়াড ২০২৬-এ বাংলাদেশ থেকে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীরা দারুণ ফল করেছে। নটরডেম কলেজের ফাহিম ফারবিন সিলভার মেডেল অর্জন করেছে। রংপুর ক্যান্টনমেন্ট কলেজের নাফিস সাদিক ও সেন্ট জোসেফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের আদিত্য রহমান অর্জন করেছে ব্রোঞ্জ মেডেল, আর ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের সামিউল ইসলাম অর্জন করেছে সম্মানজনক স্বীকৃতি। এদের সবাইকে প্রাণঢালা অভিনন্দন।

Friday, 26 August 2022

সাম্প্রদায়িকতার শাস্তি

 


ছবির এই মানুষটির নাম ব্রিজিড হেইউড। দু’সপ্তাহ আগেও তিনি অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইংল্যান্ডের ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন। আগস্টের পাঁচ তারিখ তাঁর চাকরি চলে গেছে। এত বড় পদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করার কিছুটা সম্মানজনক উপায় হলো – পদত্যাগপত্র জমা নেয়া। আগস্টের পাঁচ তারিখ তাঁর পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়েছে। তাঁর অপরাধ কী? না, কিছু কিছু দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের মতো তিনি কোন দুর্নীতি করেননি, স্বজনপোষণ করে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা-জামাতা-ভাইপো-ভাইজিকে নিয়োগ দেননি। তিনি যেটা করেছেন, সেটা আমাদের দেশে হয়তো কোন অপরাধই নয়। তিনি নিজের মুখ থেকে থুতু আঙুলে লাগিয়ে একটি বাদামী মেয়ের কপালে ডলতে ডলতে বলেছিলেন, দ্যাখো তোমার গায়ের চামড়ার রঙ কত ময়লা!

ঘটনাটি ঘটেছিল এবছর ৮ মার্চ – আন্তর্জাতিক নারী দিবসে। আর্মিডেলে – যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়টি অবস্থিত – একটি ক্লাবে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করা হচ্ছিলো। ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ব্রিজিড হেইউড সেই অনুষ্ঠানে আলোচকদের প্যানেলে ছিলেন। স্থানীয় স্কুলগুলি থেকে অনেক মেয়েকেও আনা হয়েছিল সেই অনুষ্ঠানে। ষোল বছর বয়সী স্কুলছাত্রীটি অভিবাসী মা-বাবার সন্তান, জন্মসূত্রে অস্ট্রেলিয়ান। জন্মসূত্রেই গায়ের বাদামী রঙ পেয়েছে। সেটা তার অপরাধ – শ্বেত চামড়ার অধিকারী ব্রিজিড হেইউইয়ের কাছে? অথচ ব্রিজিডের গায়ের বর্ণ সাদা হবার জন্য তাঁর নিজের কি কোন কৃতিত্ব আছে? বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ভিসি হবার পরেও তাঁর সেই সামান্য যুক্তিবোধ কাজ করলো না?

তিনি হয়তো ভেবেছিলেন এটা নিয়ে কেউ কোন আপত্তি করবে না। কিন্তু সেই ব্রিটিশ যুগ কি আছে – যেই যুগে ব্রিটিশরা লাথি মারলে ভারতীয়রা জিভ দিয়ে তাদের জুতো পরিষ্কার করে দিতো বাধ্য হয়ে? অস্ট্রেলিয়া শত বছর অস্ট্রেলিয়ান অশ্বেতাঙ্গ আদিবাসীদের উপর অত্যাচারের চূড়ান্ত করার পর এখন ক্রমশ সভ্য হচ্ছে। সাম্প্রদায়িকতা প্রদর্শনের বিরুদ্ধে এখানে আইনকানুন খুব কড়া। অভিবাসীরা এসব আইনকানুনের খবর রাখেন, বাধ্য হয়েই রাখেন। মেয়েটির স্কুলেও পড়ানো হয় সব মানুষের সমান অধিকারের কথা। সে চুপ করে রইলো না। সে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করেছে ভাইস চ্যান্সেলর ব্রিজিড হেইউডের কাছে।

এদেশে যে যত বড় ক্ষমতাশালী – আইনকানুন তাকে তত বেশি মেনে চলতে হয়। মিডিয়াগুলি স্বাধীন। ফলে একজন সাধারণ মানুষ আইন ভাঙলে মিডিয়া দেখেও না দেখার ভান করতে পারে নিউজভ্যালু কম হবার কারণে। কিন্তু একজন প্রভাবশালী যদি আইন ভাঙে – তাহলে আর রক্ষা নেই। সেজন্যই দেখা যায় কোভিড-১৯ এর লকডাউনের সময় মুখে মাস্ক ছাড়া পেট্রোল পাম্প থেকে তেল নেয়ার কারণে উপপ্রধানমন্ত্রীকে ফাইন করা হয়।

যেহেতু এধরনের সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ আনা হয়েছে ভাইস-চ্যান্সেলরের বিরুদ্ধে, এবং ভিডিও ফুটেজও আছে – শেষ রক্ষা হলো না কোনভাবেই। ভিসি ব্রিজিড হেইউড পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। আদালতের বিচারে তিনি দোষী সাব্যস্ত হতে এখনো অনেক দেরি আছে। কিন্তু ভাইস-চ্যান্সেলরের মতো একটি পদের বিরুদ্ধে এধরনের অভিযোগ উঠলে তা প্রাথমিক তদন্তে যদি দেখা যায় একেবারে ভিত্তিহীন নয়, তখন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চুপ করে থাকতে পারে না। এখানে বলে রাখা ভালো, অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলি চলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পরিচালনা বোর্ডের মাধ্যমে। সরকার সেখানে মাথা গলাতে পারে না। সুতরাং এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের সরকারি লেজুড়বৃত্তি করতে হয় না। আসলে লেজুড়বৃত্তি করে লাভ হলে হয়তো এখানেও করতো।

এরকম শাস্তির নজির থাকলেই কি মানুষের মন থেকে সাম্প্রদায়িক মনোভাব মুছে যাবে? সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষ পুরোপুরি সাম্প্রদায়িকতামুক্ত হতে পারে না। কোনো না কোনোভাবে যত সামান্য পরিমাণেই হোক না কেন তা প্রকাশিত হয়ে পড়ে। সাম্প্রদায়িকতা বলতে যদিও আমরা শুধুমাত্র ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা বুঝি, কারণ ওটা নিয়েই সবচেয়ে বেশি গন্ডগোল দেখতে আমরা অভ্যস্ত, কিন্তু বর্ণসাম্প্রদায়িকতা আরো মারাত্মক। বাংলাদেশের কথা যদি ধরি – আমাদের গায়ের বর্ণ মোটামুটিভাবে সবারই একই রকম। সেখানে গাত্রবর্ণ দেখে ধর্মনির্ণয় অসম্ভব। ধর্মীয় পরিচয় আমি ইচ্ছে করলে প্রকাশ নাও করতে পারি। কিন্তু আমার গাত্রবর্ণ লুকানোর তো কোন ব্যবস্থা নেই। আমেরিকায় বর্ণসাম্প্রদায়িকতার ফলে সংঘর্ষ প্রায়ই ঘটে, এই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও। আফ্রিকান-আমেরিকান জাতিগোষ্ঠী কয়েক প্রজন্ম ধরে আমেরিকায় জন্ম নেয়ার পরেও, একজন কৃষ্ণাঙ্গ আটবছর ধরে সেই দেশের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করলেও – বর্ণবিদ্বেষ মুছে যায়নি। বিশ্বায়নের ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের বাদামী বর্ণের মানুষগুলি যখন পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়েছে – তখন তাদেরকেও এখন প্রায়ই বর্ণসাম্প্রদায়িকতার কদর্য অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে। আমেরিকা কানাডা ইওরোপ অস্ট্রেলিয়ার মতো শ্বেতাঙ্গশাসিত দেশে তো বটেই, আফ্রিকার মতো কৃষ্ণাঙ্গ শাসিত দেশেও বাদামীরা বর্ণবাদের শিকার হচ্ছে যথেষ্ট কালো নয় বলে।

আবার বাদামীরা যে নিজেদের ভেতর কী পরিমাণ বর্ণসাম্প্রদায়িক তা আর নতুন করে বলার দরকার আছে বলে মনে হয় না। চট্টগ্রাম কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পড়ার সময় একজন প্রভাবশালী স্যার আমাকে প্রত্যেক ক্লাসেই সম্বোধন করতেন “এই কালাইয়া” বলে। অনেক বছর আগের সেই পরিস্থিতির কি এখন কোন উন্নতি হয়েছে?


Saturday, 21 May 2022

অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচন ২০২২

 



অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল ইলেকশান হয়ে গেল একটু আগে। এখন ভোট গণনা শুরু হয়েছে। এ নিয়ে বেশ কয়েকটি নির্বাচনে ভোট দেয়া হয়ে গেলো এই দেশে। অস্ট্রেলিয়ার বেশির ভাগ নাগরিকের  মতোই আমারও রাজনীতির ব্যাপারে তেমন কোন আগ্রহ নেই। কিন্তু ভোট দেয়া এখানে বাধ্যতামূলক। তাই দিতে হয়। কিন্তু এদেশে নির্বাচনের ব্যাপারটা আমার কাছে খুবই খুশির ব্যাপার বলে মনে হয়। নাগরিক অধিকার বলে উচ্চকন্ঠ হতে দেখা যায় প্রায় সব দেশেই। কিন্তু নাগরিক দায়িত্বের ব্যাপারটা সেভাবে গুরুত্ব পায় না। এখানে নাগরিক দায়িত্বের ব্যাপারটাতে গুরুত্ব দেয়া হয়। এই দায়িত্ব পালন করা বাধ্যতামূলক।

এখানে ভোট দিতে গেলে যেসব ব্যাপার দেখে আমার আনন্দ লাগে সেগুলির মধ্যে আছে – ভোট কেন্দ্রের কোথাও কোন পুলিশ নেই, নির্বাচন কমিশননিযুক্ত নিরস্ত্র কর্মীরাই ভোট পরিচালনা করে, নির্বাচনী সহিংসতা নামক কোন ব্যাপার এখানে ঘটে না, ভোট দিয়েছি কি না প্রমাণ করার জন্য আঙুলে কোন কালি লাগানো হয় না –– একবার ভোট দিয়ে আরেকবার যে দিতে যাবে না সেই বিশ্বাসে নাগরিকের সততা ও দায়িত্বকে সম্মান করা হয় সবখানে, বেশিরভাগ কেন্দ্রেই কোন পরিচয়পত্রও দেখাতে হয় না; কেবল নাম-ঠিকানা বললেই হয়, এমপি পদে যে আসনে যতজন প্রার্থী হন – তাদের সবাইকেই ভোট দিতে হয় পছন্দ অনুসারে ১, ২, ৩ ইত্যাদি লিখে। অর্থাৎ প্রত্যেক প্রার্থীই ভোট পান – শুধু যিনি সবচেয়ে বেশি মানুষের প্রথম পছন্দ তিনিই জিতেন।

আর কয়েক ঘন্টা পরেই চূড়ান্ত হয়ে যাবে – বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আবার দায়িত্বে আসবেন, নাকি লেবার পার্টি সরকার গঠন করবে। যেই করুক, অন্যদল তাকে অভিনন্দন জানিয়ে হাসিমুখে সরে যাবে।

ইন্টারন্যাশনাল বেস্ট প্র্যাকটিস বলে একটা ব্যাপার আছে। পৃথিবীর উন্নত ব্যবস্থাগুলিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের ব্যবস্থাকে আরো উন্নত করার অবিরাম চেষ্টার নামই সত্যিকারের উন্নতি। অস্ট্রেলিয়ায় সরকারের মেয়াদ তিন বছর নির্ধারণ করা হয়েছে এজন্য যে দীর্ঘদিন দায়িত্বে থাকলে দায়িত্বে অবহেলার ভাব চলে আসে, দায়িত্বকে ক্ষমতা বলে ভাবতে শুরু করে। দুর্নীতিও হতে পারে। কম মেয়াদী হলে নির্বাচিতদের ভয় থাকে – কিছুদিন পরেই দায়িত্ব হারানোর। এদেশের রাজনীতিকরা জনগণকে সমীহ করেন, কারণ জনগণের ভোটেই আছে তাঁদের রাজনৈতিক ভবিষ্যত। এদেশে ক্ষমতার অপব্যবহার করলে, দুর্নীতি করলে – রাজনৈতিক দলগুলি তাদেরকে বহিস্কার করতে বাধ্য হয়। না হলে তাদের আবার নির্বাচিত হবার সম্ভাবনা শূন্য হয়ে যায়। দুর্নীতিবাজকে ভোটের মাধ্যমে উপড়ে ফেলার দায়িত্বটা তখন নাগরিকরাই নেয়।

আমার প্রশ্ন হলো এরকম একটা কল্যাণকর সমাজব্যবস্থা যদি অস্ট্রেলিয়া তৈরি করতে পারে, কানাডা পারে, ইওরোপের অনেক দেশ পারে – পৃথিবীর অনেকগুলি দেশ পারে না কেন?


Wednesday, 11 May 2022

মন্ত্রীত্ব এবং সারমেয় সমাচার

 


আচ্ছা, আপনি কাসুন্দি চিনেন? খেয়েছেন কখনো? আমি খাইনি, চিনিও না। বাংলা একাডেমির ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে দেখলাম কাসুন্দি হলো সরিষার তৈরি আচার বিশেষ। কাসুন্দি পুরনো হলে কী হয়? ঝাঁজ কমে যায়? নাকি স্বাদ চলে যায়? নিশ্চয় কিছু একটা হয়, নইলে পুরনো কাসুন্দির কথা আসতো কোত্থেকে। পুরনো কাসুন্দি বলতে কী বোঝায় তা আমরা জানি।

তাহলে একটু পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটা যাক। পাঁচ-ছয় বছরের পুরনো কথা। অস্ট্রেলিয়া দেশের ভিক্টোরিয়া রাজ্যের প্রভাবশালী মন্ত্রী ছিলেন স্টিভ হারবার্ট। ট্রেনিং অ্যান্ড স্কিলস মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল তাঁর। বড়ই সুখে-শান্তিতে-মন্ত্রীত্বে দিন কাটছিলো তাঁর। কিন্তু একদিন তাঁর মন্ত্রীত্ব চলে গেল। কী অপরাধ? তিনি তাঁর সরকারি গাড়িতে তাঁর দুটো পোষা কুকুরকে চড়িয়েছেন। জি, এটাই অপরাধ। আপনি হাসছেন? সে আপনি হাসতে পারেন, কিন্তু অস্ট্রেলিয়ানদের কাছে এই ব্যাপারটি হাস্যকর ছিল না মোটেও। তারা বিশ্বাস করে মন্ত্রীদের সরকারি গাড়ি দেয়া হয় সরকারি কাজে ব্যবহারের জন্য। নিজের পরিবারের লোকজন কিংবা পোষা সারমেয়কে চড়াবার জন্য নয়।


এই কুকুরদুটোকে গাড়িতে চড়াবার কারণেই স্টিভ হারবার্টের মন্ত্রীত্ব চলে যায়



সাংবাদিকরা এই খবর হৈ হৈ করে প্রচার করলো। বিরোধীদল সংসদে ঝড় তুললো এই ইস্যুতে। মন্ত্রীর বাড়ি হলো পার্কডেলে। সেখান থেকে ট্রেনথাম-এ তার ছুটি কাটানোর বাড়ির দূরত্ব প্রায় এক শ কিলোমিটার। এই এক শ কিলোমিটার ভ্রমণের জন্য সারমেয়দের পেছনে জনগণের ট্যাক্সের পয়সা খরচ হয়েছে ১৯২ ডলার ৮০ সেন্ট। মন্ত্রী সেই পরিমাণ ডলার নিজের পকেট থেকে সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে অসংখ্যবার ক্ষমা চাওয়ার পরেও ক্ষমা পাননি। তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। কারণ তিনি সরকারি সম্পদের অপব্যবহার করেছেন।

মন্ত্রী বললেই আমরা যেরকম এলাহী ব্যাপার, অফুরন্ত ক্ষমতা বলে মনে করি – অস্ট্রেলিয়ার মন্ত্রীদের কিংবা তাঁদের আত্মীয়স্বজনের সেই সুখ নেই। ক্ষমতার আসল মজা তো তার অবৈধ ব্যবহারে। ক্ষমতার অপব্যবহারই যদি করা না যায়, তাহলে ক্ষমতার আর মূল্য কী??

এই পুরনো কাসুন্দির সাথে অন্য কোন দেশের মন্ত্রীর কিংবা তাদের স্ত্রীর কিংবা তাদের আত্মীয়স্বজনের কিংবা তাদের সারমেয়দের পুরনো কিংবা নতুন কোন কাসুন্দিরই কোন সম্পর্ক নেই।

অস্ট্রেলিয়ান সংবাদপত্রে প্রকাশিত লিংক:

দ্য এজ



Thursday, 23 September 2021

মেলবোর্নের লজ্জা

 

করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে চমৎকার পারদর্শিতা দেখিয়ে বিশ্বে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল অস্ট্রেলিয়া। বিশ্বের প্রধান বিশেষজ্ঞদের অনেকেই করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে অস্ট্রেলিয়াকে অনুসরণ করার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন এই সেদিনও। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহের চিত্র দেখলে যে কারোরই মনে প্রশ্ন জাগবে এত দীর্ঘদিন ধরে, এত কঠোর লকডাউন, আর কারফিউর মধ্যেও সংক্রমণ দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে কেন?

আজকের (২৩/৯/২০২১) অস্ট্রেলিয়ান কোভিড পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যায় – পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে ভেবে আত্মতৃপ্তি পাবার মতো অবস্থা নেই এখন। গত ২৪ ঘন্টায় অস্ট্রেলিয়ায় প্রায় ১৭০০ নতুন সংক্রমণ ঘটেছে। যার মধ্যে ৫১০ জনের সংক্রমণ কীভাবে ঘটেছে তা অনিশ্চিত। এখনো প্রায় বিশ হাজার জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে করোনা ভাইরাস আছে। দেড় হাজারেরও বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি। অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় সংক্রমণের শতকরা হার হয়তো অনেক কম। কিন্তু বিশাল মহাদেশের সমান এই দেশে যেখানে মাত্র দুই কোটি চল্লিশ লাখ মানুষের বাস, সেখানে তো নিয়মকানুন মেনে চললে একটা সংক্রমণও হবার কথা ছিল না।


অস্ট্রেলিয়ার করোনা-চিত্র (২৩/৯/২০২১)

করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে অস্ট্রেলিয়ার ছয়টি স্টেট আর দুইটি টেরিটরির মধ্যে সবচেয়ে কঠোর নিয়মকানুন বলবত আছে ভিক্টোরিয়া রাজ্যে। মেলবোর্ন যার রাজধানী। পরপর সাত বছর এই মেলবোর্ন শহর পৃথিবীর সবচেয়ে বাসযোগ্য শহর ছিল। কিন্তু মেলবোর্ন তার সেই অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি। এখনো বিশ্বের প্রথম দশটি বাসযোগ্য শহরের একটি – মেলবোর্ন। কিন্তু সেই অবস্থানও কতদিন থাকবে জানি না। 

এক বছরেরও বেশি হয়ে গেল আমরা মেলবোর্নে লকডাউনে আছি। কয়েক সপ্তাহ আগে আমাদের সংক্রমণ শূন্যে নেমে এসেছিল। কিন্তু তারপর থেকে সংক্রমণ হঠাৎ বাড়তে শুরু করে। জানা গেলো কিছু মানুষ গোপনে গোপনে একে অন্যের বাসায় গিয়েছে, বাজারে গিয়েছে, কোভিডের লক্ষণ থাকা সত্ত্বেও তা গোপন করে নিজেদের পরিবারে, বন্ধুদের পরিবারে এবং কমিউনিটিতে ছড়িয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি যারা সংক্রমণের শিকার হয়েছে তারা সবাই শিশু। মোট সংক্রমিত মানুষের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি শিশু। যাদের বয়স ১৫ বছরের কম। যদিও তাদেরকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়নি, কিন্তু স্কুল বন্ধ রাখতে হয়েছে। কিছুদিনের জন্য পার্ক, শিশুদের খেলার জায়গা সব বন্ধ করে দিতে হয়েছে।

বিধিনিষেধ না মানলে পাঁচ হাজার ডলারেরও বেশি জরিমানা করেও সংক্রমণ কমানো যাচ্ছে না। আজকের  (২৩/৯/২০২১)  ভিক্টোরিয়া রাজ্যের সংক্রমণের পরিসংখ্যান দেখা যাক।


ভিক্টোরিয়া রাজ্যের কোভিডচিত্র (২৩/৯/২০২১)

গত চব্বিশ ঘন্টায় ৭৬৬ জন মানুষ সংক্রমিত হয়েছে। অথচ কঠোর লকডাউন এবং কারফিউ চলছে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে। বাড়ি থেকে পাঁচ কিলোমিটারের বাইরে যাবার অনুমতি নেই, বাড়ির দরজার বাইরে যেতেও মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক।

শুধু বিধিনিষেধ আছে, তা তো নয়। আর্থিক সাহায্যও আছে – ঘরে বসে থাকার জন্য। কোভিড টেস্ট করালে ৪৫০ ডলার দেয়া হচ্ছে – রেজাল্ট পাবার আগপর্যন্ত বাসায় থাকার জন্য। তারপরও সংক্রমণ বাড়ছে কেন?

দেখা গেলো নির্মাণশ্রমিকরা তাদের সুযোগের অপব্যবহার করছে। যত সংক্রমণ হচ্ছে তার অর্ধেকেরও বেশি হচ্ছে নির্মাণ শ্রমিকদের মধ্যে। সংক্রমণ একেবারে শূন্যে নামিয়ে আনা আর কিছুতেই সম্ভব নয়। আগের মতো স্বাভাবিক জীবনে আর কখনোই ফিরে যাওয়া যাবে না। এখন যেটা হবে – সেটা হবে নতুন স্বাভাবিক। নতুন স্বাভাবিকে যাবার জন্য দরকার কমপক্ষে শতকরা আশি ভাগ মানুষের টিকা নিয়ে ফেলা। সেজন্য কাজে যাবার শর্ত হিসেবে টিকা নেয়া বাধ্যতামূলক করা খুবই গ্রহণযোগ্য একটা সিদ্ধান্ত।

কিন্তু কিছু কিছু মানুষ অতিস্বাধীনতায় বিশ্বাসী। তারা দাবি করতে শুরু করেছে, “আমার শরীর আমার সিদ্ধান্ত”। খুবই ভালো কথা। কিন্তু তোমার পারমিশান নিয়ে তো ভাইরাস তোমার শরীরে ঢুকছে না। তুমি যখন আরেকজনের শরীরে ভাইরাস ঢুকতে সাহায্য করছো – তা কী তোমার সিদ্ধান্ত? তুমি যখন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হবে – তখন তোমার চিকিৎসার কী হবে?

নির্মাণশ্রমিকদের জন্য টিকা বাধ্যতামূলক করার সাথে সাথেই তারা ধুন্ধুমার লাগিয়ে দিয়েছে। তাদের কেউ কেউ প্রকাশ্যে ঘোষণা দিলো – তারা টিকা নেবে না, মাস্কও পরবে না। যা খুশি তাই করবে, কে কী করতে পারবে?

দু’দিন আগে তারা মেলবোর্ন শহরের প্রাণকেন্দ্রে শ্রমিকদের সংগঠনের প্রধান কার্যালয় ভাঙচুর করেছে। রাস্তা দখল করে ইচ্ছেমতো গাড়ি ভেঙেছে। পুলিশের উপর আক্রমণ করেছে।


স্রাইন অব রিমেম্বারেন্সে প্রতিবাদের নামে তান্ডব চালাচ্ছে

 
গতকাল তারা শ্রাইন অব রিমেম্বারেন্স – যুদ্ধে শহীদদের সম্মানে যেটাকে আমাদের দেশের শহীদ মিনারের মতো সম্মান দেয়া হয় – তাতে উঠে প্রতিবাদের নামে ইচ্ছেমতো ময়লা ঢেলেছে। এই শহীদ বেদীর দেয়ালে প্রশ্রাব করেছে। মেলবোর্নের জন্য এর চেয়ে লজ্জাকর আর কী হতে পারে?

আজ এরা চড়াও হয়েছে স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর। কমপক্ষে দুইটি টিকাকেন্দ্রে এরা আক্রমণ করেছে। কর্তব্যরত নার্সদের অপমান করেছে, থুতু ছিটিয়েছে। টিকাকেন্দ্রদুটো সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে হয়েছে। 

আমি ভাবতাম রাষ্ট্র যখন একজন নাগরিককে তার মৌলিক চাহিদাগুলি মিটিয়ে অন্যান্য যৌগিক চাহিদাগুলিও মেটাতে সক্ষম হয়, তখন নাগরিকও তার দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করে। কিন্তু মানুষের চাহিদা এমন একটা ব্যাপার – যেটা কেবল বাড়তেই থাকে। এখানেও তা দেখলাম।

স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনার নিন্দা করছে সবাই। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো – এরকম মানসিকতা তৈরি হলো কীভাবে এদের? এটা কি এদেশে গুরু পাপে লঘু দন্ড দেয়া হয় সেজন্য?

দেখা যাক – এই পরিস্থিতির শেষ কীভাবে হয়। 


Sunday, 13 June 2021

গেট অফ দি গ্রাস

 This is Australia. This is the freedom of speech. 

অস্ট্রেলিয়ান প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন গতকাল তাঁর সরকারের ৬৮৮ মিলিয়ন ডলারের হোম বিল্ডার স্কিম সম্পর্কে সাংবাদিকদের বলছিলেন একটি নির্মাণাধীন বাড়ির সামনের ফুটপাতে ঘাসের উপর দাঁড়িয়ে। তাঁর কয়েকজন কর্মকর্তা তাঁর কাছে দাঁড়িয়েছিলেন ঘাসের লনের উপর। এমন সময় বাড়ির মালিক ঘর থেকে বের হয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে বললেন, "হ্যাই গাইস্‌, আপনারা দয়া করে আমার ঘাসের উপর থেকে নেমে যান।" প্রধানমন্ত্রী হাসিমুখে কয়েক পা সরে দাঁড়ালেন। তাঁর কর্মকর্তাদেরও সরে দাঁড়াতে বললেন। বাড়ির মালিক আবার চিৎকার করে বললেন, "আমি মাত্রই ঘাসের বীজ লাগিয়েছি আবার।" "সরি মাইট"। প্রধানমন্ত্রী আরো সরে গিয়ে হাসিমুখে বাড়ির মালিকের উদ্দেশ্যে বললেন, "অল গুড। থ্যাংকস।" 

অস্ট্রেলিয়ায় এরকম ব্যাপার খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।

৫ জুন ২০২০




Sunday, 5 May 2019

ইয়ারার তীরে মেলবোর্ন -চতুর্ত্রিংশ পর্ব (শেষ পর্ব)



০৯ আগস্ট ১৯৯৮ রবিবার
ইয়ারা নদীর তীরে

আজ ঠিক এক মাস হলো মেলবোর্নে এসেছি। দুপুর থেকেই ঘুরছি ইয়ারার তীরে। এখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে। প্রিন্সেস ব্রিজের নিচে পায়ে হাঁটা আর সাইকেলে চড়ার যে রাস্তাটি চলে গেছে পূর্বে এম-সি-জি আর পশ্চিমে ক্রাউন ক্যাসিনোর দিকে, তার পাশে স্টিল ও পাথরের বাঁধানো যে সিঁড়িটি ঘুরে ঘুরে উঠে গেছে উপরে ব্রিজের সমতলে- সেই সিঁড়ির নিচে সুন্দর বসার জায়গা আছে। ভিক্টোরিয়ান ধাচের সোনালী-রূপালী কারুকার্যখচিত লাইটপোস্ট থেকে আলো এসে পড়েছে এখানে। কয়েক হাত দূরেই তিরতির করে বয়ে যাচ্ছে ইয়ারার ঘোলা-সবুজ জল। বিকেলে যখন ব্রিজের নিচের ওপেন মার্কেটে ঘুরছিলাম তখন একজন শিল্পীকে দেখেছি এখানে বসে ছবি আঁকতে। শিল্পী চলে গেছেন অনেকক্ষণ। এখন আমি এখানে বসে লিখছি তোমাকে।
            ঘুম থেকে উঠেছি আজ অনেক দেরিতে। কাল রাতে ঘুমাতে দেরি হয়েছে অনেক। কতবার যে চিঠিগুলো পড়েছি। পড়তে পড়তে মনে হয়েছে এই তো কত কাছে সবাই। সবারই চিন্তা আমি কী খাচ্ছি, কীভাবে থাকছি, ঠিকমত ঘুমাচ্ছি কি না, নিজের যত্ন করছি কি না। হায়রে মানুষের মন। প্রিয়জন চোখের আড়াল হলেই দুঃশ্চিন্তা শুরু হয়ে যায়। স্নেহ-ভালবাসার সাথে দুঃশ্চিন্তা সমানুপাতিক।
            বাথরুমে যাবার জন্য রুম থেকে বেরিয়ে দেখলাম লিও বেরোচ্ছেন টয়লেট থেকে। লিও ফিলের নতুন ভাড়াটে। ডেভিড চলে যাবার সাথে সাথে তার রুমটা ভাড়া দিয়ে ফেলেছে ফিল। কাল রাতে হঠাৎ লিওকে দেখে চমকে উঠেছিলাম। রান্নাঘরের দরজা খুলে দেখি এই অচেনা চায়নিজ টেবিলে জিনিসপত্র ছড়িয়ে রান্নার আয়োজন করছেন। আমাকে দেখে খুব একটা ভাবান্তর হলো না চায়নিজের। বড় বড় ফ্রেমের মোটা চশমাপরা চোখ তুলে তাকালেন আমার দিকে, কিন্তু কিছু বললেন না।
            আমি বললাম, “হ্যালো। মুভ্‌ড ইন টুডে?” (বলা উচিত ছিল টু-ডাই)। তিনি গগগোগো করে গলার ভেতর থেকে এক ধরণের শব্দ করলেন যাকে ‘ইংরেজি’ বলা যাবে না কিছুতেই। বুঝলাম এই লোকের সাথে কথা বলতে গেলে খবর আছে। তবে এরকম একজন দুর্বল-ইংরেজির লোক কাছে পেয়ে নিজেকে বেশ বাহাদুর মনে হলো। ডিম সিদ্ধ করতে করতে কিছুক্ষণ ইংরেজি জাহির করলাম। জানলাম তাঁর নাম লিও- সহজ কমন চাইনিজ নাম। কিন্তু আমার নাম তিনি কিছুতেই উচ্চারণ করতে পারেন না। অনেক কসরৎ করার পর তাঁর মুখে আমার নাম দাঁড়ালো ‘ফাডি’। নাম নিয়ে খুঁতখুঁতানি নেই আমার। এই যে সবাই প্রাডিব বলে ডাকে তাতে আমার কিছুই যায় আসে না। এশিয়ানরা নামের উচ্চারণ নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামায় না। চায়নিজ বা ভিয়েতনামিজ   নাম শুদ্ধভাবে উচ্চারণ করতে হলে আমার নিজেরই বারোটা বেজে যাবে।
            লিও’র সাথে চোখাচোখি হতেই বললাম, “গুড মর্নিং লিও”। লিও বললেন, “মনিং ফাডি”। চায়নিজরা স্বল্প-স্বরের ‘র’ উচ্চারণ করতে পারে না কিছুতেই। তাই ‘মর্নিং’ হয়ে গেছে ‘মনিং’।
            টয়লেটে ঢুকে খেয়াল করলাম দেয়ালে আরো দুটো নতুন পোস্টার যোগ হয়েছে। এগুলো তাহলে ফিলের কাজ! আমি ভেবেছিলাম ডেভিডের তারুণ্যের বিকৃতি। আমার ভাবনায় ভুল ছিল। এদেশের তরুণদের মধ্যে এসব বিকৃতি খুব একটা দেখা যায় না। এসব বিকৃতি বেশি দেখা যায় ফিলের মত বুড়োদের মধ্যে। তবে আশ্চর্য এদের সংস্কৃতি। নিজের ছেলে আর ছেলের-প্রেমিকা যে টয়লেট ব্যবহার করে বুড়োটা সেখানেই এরকম আদিম ছবি লাগিয়ে রাখে! জানি না তার বেডরুমের অবস্থা কী।
            পৌনে বারোটা বেজে গেলো ঘর থেকে বেরোতে। বিল্ডিং-এর সামনের লন পেরিয়ে বাচ্চাদের খেলার জায়গার মধ্য দিয়ে সোজা উঠে এলাম ইউনাইটেড চার্চের সামনে। রবিবারের প্রার্থনা সেরে সামাজিক আলাপ করছেন অনেকে লনে দাঁড়িয়ে।
            “প্রাডিব”- ডাক শুনে ফিরে তাকালাম। কোট-টাই পরা ফিলকে দেখে একটু অবাক হলাম। একজন আধ-বয়সী মহিলার সাথে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে। “হাই ফিল” বলে জিজ্ঞেস করলাম “এনিথিং স্পেশাল টু-ডে?”
            “ইট্‌স সান-ডে মাইট। ওয়েন্ট টু চার্চ”
            “ও-কে”
            “শি ইজ মার্গারিটা”- সাথের মহিলার কাঁধে হাত রেখে বললেন ফিল। ক্যাথির জায়গায় এখন মার্গারিটা। সেজেগুজে চার্চে আসার আসল উদ্দেশ্য তাহলে এই।
            “হ্যালো মার্গারিটা”
            “হ্যালো”
মার্গারিটার মুখে উগ্র প্রসাধন। ঠোঁটদুটো টকটকে লাল। চর্বি-জমা মুখ লাবণ্যময় করার যত কৌশল জানা আছে সব প্রয়োগ করেছে মার্গারিটা। উচ্চারণে কিছুটা ইতালিয়ান টান। ফিল মার্গারিটার কাঁধ ধরে আরেকটু ঘনিষ্ঠ হয়ে হাসিমুখে বললেন, “ইজন’ট শি বিউটিফুল?”
            ফিল যে বহুল ব্যবহৃত সস্তা চাটুকারিতা করছে তা না বোঝার মত বোকা মার্গারিটা নিশ্চয় নন। কিন্তু মানুষের স্বভাব বড় অদ্ভুত। অতি সত্যবাদীও এসব ক্ষেত্রে সোজাসাপ্‌টা কথা বলেন না। মার্গারিটারও উৎসাহ আছে ফিলের ব্যাপারে। তিনি ফিলের গায়ের ওপর হেলে পড়ে বলবেন, “ভেরি নটি, ফিল”। একেবারে সস্তা মানের বাণিজ্যিক ছবির ডায়ালগ। সেজেগুঁজে চার্চে আসার উদ্দেশ্য তাহলে এই! হাসি চেপে রাখতে না পেরে হো হো করে হাসতে হাসতে ‘বাই’ বলে চলে এলাম।
            মেলবোর্ন আর্ট সেন্টারের সামনের বারান্দাজুড়ে হস্তশিল্পের মেলা বসেছে আজ। কত রকম হাতের কাজ যে বিক্রি হচ্ছে। একজন হস্তশিল্পী খেঁজুর পাতা কেটে কেটে চোখের সামনে তৈরি করছেন নানারকম ফুল, নৌকা, পাখি। চিত্রশিল্পী ক্যানভাসে দ্রুত তুলি বুলিয়ে আঁকছেন পোট্রেট। অনেক নবীন শিল্পী সাজিয়ে বসেছেন নিজেদের আঁকা ছবি বিক্রির আশায়। সবচেয়ে বেশি ভিড় গয়না আর অলংকারের দোকানে। ভাঙা কাচের টুকরো থেকে কত অবিশ্বাস্য সুন্দর গয়না তৈরি হতে পারে তুমি না দেখলে বুঝতে পারবে না।
            আর্টসেন্টার থেকে অপেরা হলের সামনের লন পেরিয়ে চলে এলাম ইয়ারার দক্ষিণ তীরে। প্যাঁচানো সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলাম। এখানে ভীড় আরো বেশি। এই নিয়ে পরপর চার রবিবার এসেছি এখানে। খেয়াল করে দেখলাম দোকানীরা প্রতি সপ্তাহে একই জায়গায় বসছেন। তাদের দোকানের জন্য নির্দিষ্ট স্থান ঠিক করা আছে নিশ্চয়। এরকম ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের জন্যও ট্রেড-লাইসেন্স নিতে হয়।  
            অনেকক্ষণ ঘুরে ফিরে চারটার দিকে এই সিঁড়ির কাছে এসে বসলাম। খুব কাছেই একজন বৃদ্ধ দোকানী জামা-কাপড় বিক্রি করছেন। একজন তরুণও আছে বৃদ্ধের সাথে। তিন দিকে তিনটি টেবিলে সাজানো শীতের কাপড়, টি-শার্ট, আর বিভিন্ন ফুটবল টিমের লোগো যুক্ত নানা রঙের টুপি, জার্সি, মাফলার। ভীড় কমতে শুরু করেছে, কমে আসছে কোলাহল। বৃদ্ধ আর তাঁর তরুণ সাহায্যকারীর কথোপকথন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি, কিন্তু বুঝতে পারছি না কিছুই। কিছু পরিচিত শব্দ শুনে মনে হচ্ছে ভাষাটা আরবি।
            মানুষের মুখের ভাষা না বুঝলেও অঙ্গভঙ্গি ও অভিব্যক্তি থেকেও অনেক কিছু বোঝা যায়। খেয়াল করে দেখলাম স্বাস্থ্যবান ক্লিন শেভ্‌ড কেতাদুরস্ত তরুণটি খুব রেগে গেছে। হাত পা নেড়ে চোখ-মুখ খিঁচে বৃদ্ধকে শাসাচ্ছে। বৃদ্ধের ছেলে বা কোন নিকটাত্মীয় হবে নিশ্চয়। কর্মচারী হলে মালিককে এরকম শাসানোর প্রশ্ন উঠতো না। আবার উল্টোটাও তো হতে পারে। হতে পারে তরুণটি দোকানের মালিক- বকা দিচ্ছে তার বৃদ্ধ কর্মচারীকে। খুব খারাপ লাগছে বুড়ো মানুষটার জন্য। রোগা-পাতলা শরীর, মুখে তিন-চারদিনের না-কামানো পাকা-দাড়ি। পিঠটা সামান্য বেঁকে গেছে। বৃদ্ধ বয়সে বেঁচে থাকার জন্য কাজ করতে হচ্ছে। হয়তো রিফিউজি হিসেবে এদেশে এসেছেন মধ্যপ্রাচ্যের কোন দেশ থেকে। সরকারি সাহায্য যা পান তাতে হয়তো চলে না। ক্ষীণ কন্ঠে বৃদ্ধ ক্রুদ্ধ তরুণকে কিছু বোঝাতে চাইলেন। তরুণ আরো রেগে এক টানে টেবিলের জামাকাপড় ছুড়ে ফেলে হন হন করে হেঁটে চলে গেলো পশ্চিম দিকে। বৃদ্ধ হতভম্বের মত কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন সেদিকে। তারপর মাথা নিচু করে এলোমেলো জামা-কাপড় গোছাতে শুরু করলেন। আশেপাশের দোকানীদের অনেকে দেখেছে এই দৃশ্য। একজনের মন্তব্য কানে এলো- ‘চিল্ড্রেন্স! দিস ডেজ্‌!’- আজকের সন্তানেরা! তবে কি তরুণটি এই বৃদ্ধের ছেলে! হয়তো।
            বৃদ্ধের মাথা নিচু হয়ে যাওয়া দেখে খুব খারাপ লাগছে আমার। বাবার কথা মনে পড়ছে। জীবনে কত কষ্ট তাঁকে করতে হয়েছে। এরকম হাটে-বাজারে জামা-কাপড় বই-পত্র চাল-ডাল বিক্রি করে তিনি আমাদের বড় করেছেন, লেখাপড়া শিখিয়েছেন। আরবি-ভাষী এই বৃদ্ধ বাবার জন্য মনটা কেমন করে উঠলো। ভ্যানের দরজা খুলে জামা-কাপড় গুছিয়ে আস্তে আস্তে ভ্যানে তুলছেন। আশেপাশের অনেক দোকানী ইতোমধ্যেই চলে গেছেন নিজেদের পসরা গুছিয়ে।
            “হ্যালো ইয়ংম্যান, ক্যান ইউ গিভ মি এ হ্যান্ড প্লিজ?” কাছে এসে মিষ্টি করে হেসে জিজ্ঞেস করলেন বৃদ্ধ দোকানী। আমি নিজে থেকেই তাঁকে সাহায্য করার কথা ভাবছিলাম। কিন্তু তিনি কী মনে করবেন ভেবে এতক্ষণ কিছু বলিনি। খুশি হয়ে বললাম, “অবশ্যই”। একটা টেবিলের জামা-কাপড় তিনি ইতোমধ্যেই ভ্যানে তুলে ফেলেছেন। খালি টেবিলটা গুটিয়ে ভ্যানে তোলার জন্য আমার সাহায্য চেয়েছেন। টেবিলটা ভ্যানে তোলার পর জিজ্ঞেস করলাম অন্য টেবিল দুটোর জামা-কাপড় গুছিয়ে দেবো কি-না। বৃদ্ধ খুশি হয়ে বললেন, “সো কাইন্ড অব ইউ”। দেখিয়ে দিলেন কীভাবে গোছাতে হবে। বেশ ভালো লাগছিল মানুষটার জন্য কিছু একটা করতে পেরে। রাগী তরুণটি তাঁর ছেলে কিনা খুব জানতে ইচ্ছে করছিল। জিজ্ঞেস করলাম, “যে ছেলেটা আপনার সাথে রাগ করলো সে কি আপনার ছেলে?”
            কিছুটা লজ্জিত হয়ে বৃদ্ধ বললেন, “খুব ভালো ছেলে সে। কিছুটা রাগী, তবে খুব ভালো ছেলে”। হায়রে অপত্যস্নেহ, সন্তান বাবাকে লাথি মারলেও বাবা সন্তানের বিরুদ্ধে কিছু বলেন না।
            “তুমি কি ইন্ডিয়ান?” দ্রুত প্রসঙ্গ পরিবর্তন করলেন বৃদ্ধ।
            “না, আমি বাংলাদেশী”
            “আমি লেবানিজ”
            “কতদিন থেকে আছেন মেলবোর্নে?”
            “সাত বছর। তুমি?”
            “আজ ঠিক এক মাস হলো”
            “স্টুডেন্ট?”
            “হ্যাঁ”
            “কাজ করো কোথাও?”
            “এখনো পাইনি”
            টুকটাক কথা বলতে বলতে সব জিনিস-পত্র ভ্যানে ঢুকে গেলো। কাজ শেষ। ব্যাকপ্যাক কাঁধে তুলে নিতেই বৃদ্ধ আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “প্লিজ টেক দিস”। তাঁর হাতে একটা দশ ডলার ও একটা পাঁচ ডলারের নোট। আমি বললাম, “নো, নো, থ্যাংক ইউ। ইউ ডোন্ট নিড টু পে মি”।
            “আমি তোমাকে পারিশ্রমিক দিচ্ছি না। কাজের প্রস্তাব দিচ্ছি। পড়তে এসেছো- ডলার লাগবে না? প্রতি রবিবার এখানে আমাকে সাহায্য করবে। সকাল ন’টা থেকে বিকেল পাঁচটা। ঘন্টায় সাড়ে সাত ডলার করে  আটঘন্টায় ষাট ডলার পাবে”
            একটা কাজের জন্য কতদিন থেকে কত জায়গায় ঘুরছি। সেই অধরা কাজ নিজে এসে ধরা দিলো আজ। কী যে খুশি লাগছে!
            “ও-কে?” এখনো হাত বাড়িয়ে আছেন বৃদ্ধ।
            “ও-কে”
            “দেন টেক দিস। বাই দি ওয়ে, আমার নাম আজাহার”
            ভ্যান চালিয়ে চলে গেলেন বৃদ্ধ আজাহার। আমার হাতের মুঠোয় পনেরো ডলার। মেলবোর্নে আমার প্রথম পারিশ্রমিক।
            তারপর আনন্দ আর উৎসাহের মিশ্র অনুভূতি নিয়ে এখানে বসে তোমাকে লিখছি। এখন থেকে প্রতি রবিবার সারাদিন এখানেই কাটবে।  তুমি তো জানো এই একমাসে যখনই সময় পেয়েছি কী এক অদ্ভুত টানে চলে এসেছি এই নদীর তীরে। কোন মিল নেই, তবুও মেলবোর্নে ইয়ারাই আমার কর্ণফুলী, আমার দুঃখ-সুখের ইছামতি। 
______________

ইয়ারার তীরে মেলবোর্ন - ত্রয়োত্রিংশ পর্ব



০৮ আগস্ট ১৯৯৮ শনিবার

বৎসরের এগারোতম মাসের এগারোতম দিনের এগারোতম ঘন্টার এগারোতম মিনিটে এখানে সবকিছু থেমে যায়। সবাই স্থির নীরব হয়ে যান এক মিনিটের জন্য। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধায় নুয়ে আসে সবার মাথা। ঠিক তখনই ছাদের ছোট্ট একটা ছিদ্র দিয়ে এক টুকরো সূর্যালোক এসে পড়ে এই স্মৃতিসৌধের ঠিক মাঝখানে আয়তাকার একটা গর্তে। সূর্যের আলোতে ঝলমল করে ওঠে একটা ছোট্ট অথচ প্রচন্ড শক্তিশালী শব্দ “LOVE”।  মাথা নিচু করে “LOVE” এর দিকে তাকালে দেখতে পাবে পাঁচ শব্দের একটি বাক্য “GREATER LOVE HATH NO MAN”। বাইবেলের বাণী “Greater love hath no man than this, that a man lay down his life for his friends” এর অংশবিশেষ। পরের জন্য যে নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে পারে তার চেয়ে মহৎ আর কে হতে পারে! দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য যাঁরা শহীদ হয়েছেন তাঁদের ভালবাসা সত্যিই অতুলনীয়। মেলবোর্নের স্রাইন অব রিমেম্বারেন্সে এসে মনে পড়ছে আমাদের শহীদ মিনারের কথা।
                       আমাদের যেমন স্মৃতিসৌধ বা শহীদ-মিনার, মেলবোর্নের তেমনি স্রাইন অব রিমেম্বারেন্স। তবে আমরা যে রকম যে কোন জাতীয় দিবসে, বিপ্লবে-বিদ্রোহে, শোকে-সংগ্রামে, প্রতিবাদ-প্রতিরোধে, শপথে-অনশনে, কবিতার উৎসব সহ আরো শত উপলক্ষে ছুটে যাই শহীদ মিনারে, মেলবোর্ন-বাসীরা সেরকম ভীড় জমায় না স্রাইন অব রিমেম্বারেন্সে। পর্যটকেরা আসে সারাবছর, স্থানীয়রা আসেন বছরের বিশেষ বিশেষ দিনে বা বিশেষ কোন উপলক্ষে।
            ফ্লিন্ডারস্ট্রিট পার হয়ে ইয়ারার প্রিন্সেস ব্রিজ থেকে সোজা দক্ষিণে চলে গেছে সেন্ট-কিলদা রোড। ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে সেদিকে তাকালে দেখতে পাবে রাস্তা যেখানে বাঁক নিয়েছে সেখানে ছোট্ট পাহাড়ের ওপর পিরামিড আকৃতির স্রাইন অব রিমেম্বারেন্স- মেলবোর্নের শহীদ-মিনার।
            আজ সকালে আকাশে মেঘের আনাগোনা কম। তাই রোদের কৃপণতা নেই। তবে কতক্ষণ এরকম থাকবে জানি না। মেলবোর্নের আবহাওয়া ধনীলোকের আদুরে মেয়ের মুডের মত- বিনা নোটিশেই বদলে যেতে পারে।
            দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে সোজা ইয়ারার তীরে। প্রতিদিন নতুন নতুন পথে হাঁটার একটা সুবিধা আছে। চেনা হয়ে যাচ্ছে মেলবোর্নের অলি-গলি। অনেক শর্টকাট জানা হয়ে গেছে এর মধ্যে। প্রিন্সেস ব্রিজে এসে বামদিকের ফুটপাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে ডোমেইন ট্রাম টার্মিনাল ডানে রেখে একটু এগোতেই স্রাইন অব রিমেম্বারেন্স।
            ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে স্মৃতিসৌধ তৈরির পরিকল্পনা নেয়া হয় ১৯২০ সালে। অবসরপ্রাপ্ত আর্মি-কমান্ডার জেনারেল স্যার জন মনাশের নেতৃত্বে কাজ শুরু হয়। ১৯২২ সালে ডিজাইন আহবান করা হয়। ১৯২৩ সালের ডিসেম্বরে মোট ৮৩টি নক্‌শার মধ্য থেকে মেলবোর্নের দু’জন স্থপতি ফিলিপ হাডসন ও জেম্‌স ওয়ারড্রপের নক্‌শা গৃহীত হয়। কিন্তু অনেকের বিরোধিতার মুখে কাজ শুরু করা যায়নি পরবর্তী পাঁচ বছর। সবচেয়ে বড় বাধা এসেছিল খ্রিস্টান পাদ্রিদের কাছ থেকে। তাঁরা ভবনের নক্‌শা নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন। স্মৃতিভবনের কোথাও ক্রুশ বা হলি-ক্রস জাতীয় কোন ধর্মীয় চিহ্ন রাখা হয়নি- এটাই তাদের মাথাব্যথার সবচেয়ে বড় কারণ। কিন্তু তাদের আপত্তি বেশিদিন টিকেনি।
            ১৯২৭ সালের ১১ নভেম্বর স্মৃতি-সৌধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন ভিক্টোরিয়া রাজ্যের গভর্নর লর্ড সোমার্‌স। পরপরই কাজ শুরু হয়ে যায়। মোট আড়াই লক্ষ পাউন্ড খরচের এক লক্ষ ষাট হাজার পাউন্ড উঠে আসে জনগণের চাঁদা থেকে। ১৯৩৪ সালের সেপ্টেম্বরে কাজ সম্পূর্ণ হয়। সে-বছরই ১১ নভেম্বর বেলা এগারোটায় প্রায় তিন লাখ মানুষের সমাবেশের মধ্য দিয়ে এই স্মৃতিসৌধ সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। সেই থেকে প্রতি বছর নভেম্বরের এগারো তারিখ বেলা এগারোটায় রিমেম্বারেন্স-ডে উপলক্ষে শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আসেন এখানে সবাই।
            দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্মৃতিসৌধের নকশায় বেশ কিছু পরিবর্তন করা হয়। সৌধের উত্তরদিকে গ্যাস সরবরাহ দিয়ে ‘শিখা-অনির্বাণ’ স্থাপন করা হয়। পাশেই স্থাপিত হয় সাড়ে বারো মিটার উচ্চতার স্মৃতিস্তম্ভ। রয়েল বোটানিক্যাল গার্ডেন, স্রাইন অব রিমেম্বারেন্স।
            মানুষ বড় আশ্চর্য প্রাণী। মানুষ মানুষের সাথে যুদ্ধ করে। যুদ্ধ বাধানোর কতরকমের অজুহাত তাদের। যুদ্ধের সব পক্ষই দাবী করে তারা শান্তির স্থাপনের জন্য যুদ্ধ করছে। আবার যুদ্ধে শহীদদের জন্য শোক করে। শহীদ মিনারে এসে ‘যুদ্ধ নয় শান্তি’ বলে স্লোগান দেয়। অথচ অস্ত্র-কারখানাগুলো বন্ধ করে দেয় না। অস্ট্রেলিয়া শান্তিপ্রিয় জাতি। এদেশের রাস্তা-ঘাটে অস্ত্র নিয়ে ঘুরতে দেখা যায় না কাউকেই। তবুও এরা এদের বড়ভাই আমেরিকা ও ব্রিটেনকে অনুসরণ করে যুদ্ধে সৈন্য পাঠায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অস্ট্রেলিয়ানরা সৈন্য পাঠিয়েছে কোরিয়ার যুদ্ধে, মালয়েশিয়ার স্বাধীনতার সময়ের জরুরি অবস্থায়, ভিয়েতনাম যুদ্ধে, মধ্যপ্রাচ্যে। সবই শান্তির জন্য! ভালবাসার জন্য! তাই কি ‘ভালোবাসা’ শব্দটিকে আলোকিত করা হয়েছে এখানে?
            স্মৃতিসৌধের ভেতরের ঘরের মাঝখানের বেদীতে ‘LOVE’ শব্দের ওপর প্রতিবছর এগারোই নভেম্বর বেলা এগারোটায় সূর্যালোক প্রবেশ করানোর কারিগরী দক্ষতা অপূর্ব। বছরের আর কোন দিন ওই ছিদ্র দিয়ে আলো প্রবেশ করে না। আজ এই আগস্টেও একটা আলোক-রশ্মি দেখতে পেলাম। তবে ওটা সূর্যালোক নয়, বৈদ্যুতিক আলো। স্মৃতিসৌধের চারপাশে ঘুরে দেখলাম। সবকিছু ঝকঝকে পরিষ্কার। এখান থেকে উত্তর দিকে তাকালে পুরো মেলবোর্ন শহর দেখা যায় একটা ভিউকার্ডের মত। 
            স্মৃতিসৌধ থেকে বেরিয়ে সিটির দিকে হাঁটতে শুরু করে ডান দিকের রাস্তায় ঢুকে গেলাম- রয়েল বোটানিক গার্ডেন। এই দুপুরেও অনেকে দৌড়াচ্ছেন পার্কের মাঝখানের বাধানো রাস্তায়। বোটানিক গার্ডেনের এক জায়গায় বোর্ডের তথ্য থেকে দেখতে পাচ্ছি ১৮৪৬ সাল থেকেই আছে তিন লাখ ষাট হাজার বর্গমিটার ক্ষেত্রফলের এই বাগানটি। প্রায় দশ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ আছে এখানে। ক্যাকটাস এরিয়ায় কত বিচিত্র রকমের ক্যাকটাস যে আছে। ক্যালিফোর্নিয়া গার্ডেন, নিউজিল্যান্ড কালেকশান, চায়না কালেকশান ছাড়াও আরো অনেক দেশের ফুল আর লতা-পাতা।
            অনেক বড় বড় ইউক্যালিপ্টাস আছে বাগানের ভেতর। অস্ট্রেলিয়ায় সবখানেই ইউক্যালিপ্টাস দেখা যায়। একটা বড় ইউক্যালিপ্টাসকে বিশেষ যত্নে ঘিরে রাখা হয়েছে। এই গাছটির বয়স প্রায় তিনশ’ বছর। তার মানে বোটানিক গার্ডেন হবার আগে থেকেই গাছটা আছে এখানে। বোর্ডে লেখা আছে ‘সেপারেশান ট্রি’। নিউ-সাউথ ওয়েল্‌স থেকে পৃথক হবার সময়ে এর নিচে দাঁড়িয়ে স্বতন্ত্র ভিক্টোরিয়া রাজ্যের ঘোষণা দেয়া হয়েছিল।
            একপাশে বিরাট লেক। ছোট ছোট কিছু হাঁস ভেসে বেড়াচ্ছে এদিক-ওদিক। গাছপালা আর ঘাসের মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই খেয়াল করলাম রোদের গায়ে মেঘ এসে ভিড়তে শুরু করেছে। একটু পরেই আকাশের মেজাজ খারাপ হয়ে যাবে। শুরুতে গোমড়া হবে, তারপর গলতে শুরু করবে।
            এবার ফেরা যাক। ইয়ারা নদীর দক্ষিণ তীর ধরে হাঁটতে হাঁটতে ফুট-ব্রিজ পার হয়ে ফ্লিন্ডার স্ট্রিট স্টেশনের ভেতর দিয়ে ফ্লিন্ডার স্ট্রিটে আসতে না আসতেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো। এরকম হাল্‌কা বর্ষণকে কেউ পাত্তা দেয় না এখানে। আমিও দিলাম না। রাস্তা পেরোতে গিয়ে দেখলাম সিটি সার্কেল ট্রাম দাঁড়িয়ে আছে ট্রাম-স্টপে। উঠে পড়লাম। বিনে-পয়সায়  শহর-ঘুরে দেখার এমন আরাম ছাড়বো কেন।
                         ট্রাম চলছে ঘন্টায় খুব বেশি হলে বিশ কিলোমিটার বেগে। এক ব্লক পর পরই স্টপ। বৃষ্টির তেজ বাড়ার সাথে সাথে ট্রামের ভিড়ও বাড়তে শুরু করেছে। বন্ধ জানালায় বৃষ্টির ঝাপটা আমাকে নষ্টালজিক করে তোলে। আজ থেকে ঠিক একমাস আগে বাংলাদেশের এই সময়ে আমি জিয়া বিমানবন্দরে। স্মৃতিজাগানিয়া বৃষ্টি দেখতে দেখতে আমি চলে যাই ভেসে যাওয়া অতীতে, কেটে যায় সিটি-সার্কেলের তিন-চার চক্কর। হঠাৎ ঘোর কাটলে নেমে পড়ি লা-ট্রোব আর এলিজাবেথ স্ট্রিটের কোণায়। এলিজাবেথ ধরে উত্তর-পূর্ব দিকে হেঁটে হেঁটে ইউনিভার্সিটি। পার্কভিল ক্যাম্পাসের অলি-গলি এখন চেনা হয়ে গেছে।
            অফিসে এসে কিছুক্ষণ পড়ালেখা করার চেষ্টা করলাম। লেসের এসাইনমেন্টের সমস্যাগুলোর মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না। তিন সপ্তাহ সময়ের এক সপ্তাহ চলে গেছে এখনো একটা সমস্যারও সমাধান করতে পারিনি। বই-পত্র ঘেঁটেও কোন কূল-কিনারা পাচ্ছি না। ওপেন বুক এক্সামিনেশান হলেও যে তেমন কোন সুবিধা করতে পারবো না তা তো বুঝতেই পারছি।
            মনে পড়লো হারিশ দেশাই বলেছিলেন শনিবার-রবিবারের দিকে ফোন করে দেখতে। হয়তো হবে না কিছুই। কিন্তু চেষ্টা না করে ছেড়ে দিলে পরে আফসোস করতে হয় অনেক সময়। সাড়ে পাঁচটার দিকে ফোন করলাম।
            “গুড ইভ্‌নিং ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। হাউ কেন আই হেল্প ইউ?”
হারিশ দেশাই’র সহকারী ভদ্রমহিলার গলা। হারিশ দেশাই’র সাথে কথা বলতে চাই শুনে চুপ করে গেলেন। হয়তো দেশাই সাহেবকে ডাকতে গেছেন। রান্নাঘরের জিনিস-পত্র নাড়ার স্বাভাবিক শব্দ ভেসে আসছে। একটু পরে দেশাই সাহেবের গলা শোনা গেল- “ইয়েস?”
            “স্যার, আমি গত বুধবার আপনার সাথে দেখা করেছিলাম। আপনি বলেছিলেন আজ ফোন করতে”
            “কাজের ব্যাপারে?”
            “হ্যাঁ স্যার”
            “এক-দেড়ঘন্টা পরে ফোন করো”
            “এখন বলতে পারবেন না স্যার?”
            “বললাম তো দেড়-ঘন্টা পরে ফোন করতে”-ফোন রেখে দেয়ার শব্দ হলো।
            এখন বাজে ছ’টা। আরো দেড়-ঘন্টা পর মানে সাড়ে সাতটার দিকে ফোন করতে হবে। তখন আবার কাস্টমারের ভীড় বেড়ে গেছে বলে রাত এগারোটায় ফোন করতে বলবেন না তো?        
            দেড়-ঘন্টা কাজে লাগানো যাক। পড়াশোনায় মন দিলাম। দেড়-ঘন্টা বেশ ফলপ্রসু হলো। লেসের সমস্যাগুলোর দুটোর সমাধান পেয়ে গেলাম। মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে গেল। এবার দেখা যাক কী বলেন দেশাই সাহেব।
            ঠিক সাড়ে সাতটায় ফোন করলাম। আবারো একই টোনে একই শব্দাবলী “গুড ইভ্‌নিং ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। হাউ কেন আই হেল্প ইউ?” মনে হয় ‘রেপিডেক্স ইংলিশ’ থেকে মুখস্থ করেছেন। আমার বৃত্তান্ত শুনে আবারো নিস্তব্ধতা, তারপর হারিশ দেশাই’র “ইয়েস?”
            “আপনি আমাকে সাড়ে সাতটায় ফোন করতে বলেছিলেন”
            “কাজের ব্যাপারে?”
            “ইয়েস স্যার”
            “আমার এখানে একজন কাজ করছে এখন। সে না পারলে তোমাকে খবর দেবো। তুমি দু’সপ্তাহ পরে ফোন করো, আমি-”
            কথাগুলো দেড়-ঘন্টা আগে বলা যেতো না? কী যেন হয়ে গেলো আমার। দেশাই সাহেবের কথা শেষ হবার আগেই লাইন কেটে দিলাম। ডায়েরির যে পাতায় হারিশ দেশাইর ঠিকানা আর ফোন নম্বর লেখা ছিল- সেই পাতাটা এক টানে ছিঁড়ে কুচিকুচি করলাম। আরো অনেক কিছু ছিঁড়তে পারলে আরো ভালো লাগতো। মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মানুষ মানুষকে কতরকম অপমান যে করে। ছোটবেলা থেকে আশেপাশে এরকম এত মানুষ দেখেছি যে কী বলবো তোমাকে। মেলবোর্নে এসেও এরকম মানুষের পাল্লায় পড়বো ভাবিনি। হারিশ দেশাই’র রেস্টুরেন্টে কাজ না পেলে আমি নিশ্চয়ই মরে যাবো না।
            বাসায় যাবার জন্য নিচে নেমে অভ্যাসবশত মেইল-বক্সে উঁকি দিলাম একবার। কোয়ান্টাম থিওরি গ্রুপের বাক্সে একটা বড় হলুদ খাম দেখা যাচ্ছে। কাল বিকেলেও দেখেছিলাম ওটা ওখানে। পিটারের হলে রুমে নিয়ে গিয়ে রাখতে হবে। তিনি এলে পাবেন। তালা খুলে খামটা বের করতে গিয়েই সোনার খনি পেয়ে গেলাম। বড় খামের নিচে চাপা পড়েছিল আরো তিনটা খাম। খামের উপর হাতের লেখা দেখেই ভালো লাগছে- একটা খামে মামামের, একটাতে দিদির ও অন্যটাতে দাদার হাতে আমার ঠিকানা লেখা। পরের মুহূর্তে যেন উড়ে চলে এলাম বাসায়। 
_____________________
PART 34 (LAST)

Latest Post

চিকিৎসাবিজ্ঞানে যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তা

  ধীরে ধীরে চোখের আলো নিভে আসছিলো রিস হিবার্টের। পৃথিবীর আলো দেখার আশা ছেড়েই দিতে হয়েছিল তাঁকে। দু’বছর আগেও বেশ সুস্থ স্বাভাবিক ছিলেন তিনি। ...

Popular Posts