মেহেরআপার সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল প্রায় ত্রিশ বছর আগে শাহীন কলেজে যোগ দেয়ার পর। তখন বিমান বাহিনীর একটি বাসে আমরা শহর থেকে কলেজে যেতাম প্রতিদিন সকালে। মেহেরআপা বাসে উঠতেন দেওয়ানহাট থেকে। মুখে স্মিত হাসি লেগেই থাকতো।
This is a personal blog of
Dr Pradip Deb.
Our everyday sciences,
hobbies,
literature,
travel
and
many other human issues
are discussed here.
প্রদীপ দেবের ব্লগ।।
মেহেরআপার সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল প্রায় ত্রিশ বছর আগে শাহীন কলেজে যোগ দেয়ার পর। তখন বিমান বাহিনীর একটি বাসে আমরা শহর থেকে কলেজে যেতাম প্রতিদিন সকালে। মেহেরআপা বাসে উঠতেন দেওয়ানহাট থেকে। মুখে স্মিত হাসি লেগেই থাকতো।
বাঁশখালীর বিশিষ্ট আইনজীবী দীপংকর দে মহাশয়ের জীবনাবসান হয়েছে আজ সকালে। সবার কাছে খ্যাতিমান আইনজীবী হিসেবে পরিচিত হলেও, পারিবারিক সূত্রে তিনি আমার পিসতুতো বড় ভাই হলেও- আমার কাছে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হলো তিনি আমার শিক্ষক। ক্লাস সিক্সে বাংলা দ্বিতীয় পত্র আর ক্লাস সেভেনে বিজ্ঞান পড়িয়েছেন আমাদের।
অনেক বছর আগের কথা। তখন বাংলাদেশে শিক্ষাবোর্ড ছিল মাত্র চারটি। আর এসএসসি পরীক্ষার্থীদের মধ্যে মেয়েদের সংখ্যা ছিল মাত্র ২১ শতাংশ। বিজ্ঞান বিভাগে মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ছয় শতাংশেরও কম ছিল মেয়েদের সংখ্যা। সেই সময় গ্রামের বেশিরভাগ মেয়েরই বিয়ে হয়ে যেতো ক্লাস সেভেন-এইটে বা তার চেয়েও নিচের ক্লাস থেকে। অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে যারা যত পিছিয়ে থাকতো – তাদের মেয়েদের বিয়ে হয়ে যেতো তত আগে। বিয়ে না হলেও পড়াশোনা হতো না অনেক মেয়ের। সেই সময়ের
আমি তখন ক্লাস থ্রি। এসএসসি পাস করার পর দিদি কলেজে পড়ার জন্য শহরে চলে গেল। আমার আনন্দ এবং বিপদ একসাথে হাজির হলো। সে বাড়ি থেকে চলে যাওয়া মানে আমার মুক্তির আনন্দ। সারাক্ষণ তার খবরদারি থেকে মুক্তি। ইচ্ছেমতো পুকুরে দাপাদাপি করার স্বাধীনতা, স্কুল ছুটির পর সোজা বাড়িতে না এসে সন্ধ্যা পর্যন্ত স্কুলের মাঠে ফুটবল খেলে ধুলোকাদায় মাখামাখি হবার স্বাধীনতা। প্রতিবেশীদের নালিশ শুনে যার দোষই হোক, আমার পিঠেই দমাদম কিল মারতো সে। সেইসব
মুনীর চৌধুরী
সে কোন যুগে বলে গিয়েছিলেন – মানুষ মরে গেলে পচে যায়, বেঁচে থাকলে বদলায়। দশ বছর হয়ে গেলো হুমায়ূন আহমেদ মারা গেছেন। এই দশ
বছর ধরে আমরা যাঁরা বেঁচে আছি, প্রত্যেকেই বদলে গেছি কোনো না কোনোভাবে। উগ্র সাম্প্রদায়িকতার
কাছে, নির্লজ্জ দুর্নীতিবাজদের কাছে নতজানু হতে হতে আমরা ভূমির সাথে মিশে গিয়েছি। আমাদের
মধ্যে অনেকেই শারীরিকভাবে বেঁচে থাকলেও মানসিকভাবে মরে পচে গেছি। কিন্তু মৃত্যুর দশ
বছর পরেও হুমায়ূন আহমেদ এখনো সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। মানুষ আর লেখকের মধ্যে পার্থক্য
এখানেই। লেখকরা মরেন না। আসলে লেখকের মূল পরিচয় তো তাঁর লেখায়, লেখাগুলি বেঁচে থাকে।
লেখার সাথে লেখকও।
বিজ্ঞানে কিছুটা
সাহিত্য থাকতেও পারে, কিন্তু সাহিত্য বিজ্ঞান নয় কিছুতেই। সাহিত্য পুরোপুরি সৃষ্টিশীল
কাজ। সেখানে পুনরাবৃত্তির খুব একটা কদর নেই। আর সাহিত্যের বিচারের ব্যাপারটা মোটেও
বস্তুনিষ্ঠ নয়। বিজ্ঞানে যেটা ভুল – সেটা সবার কাছেই ভুল। কিন্তু সাহিত্যে ভুল বলে
কিছু নেই। ভালোমন্দ লাগার ব্যাপারটাও পাঠকের নিজস্ব ব্যাপার। সাহিত্যের যে বই একেবারে
অ্যাকাদেমি পুরষ্কার পেয়ে আকাশে উঠে গেছে, সেই বইও অনেক পাঠকের কাছে তীব্র বিবমিষাময়
মনে হতে পারে। অনেক পাঠকের যে বই ভালো লাগে, সেই বই পাঠকপ্রিয় হয়, সেই লেখক প্রিয় লেখক
হয়ে উঠেন। সেখানে যখন দেখা যায় একজন লেখক, আরেকজন লেখককে বলছেন – খারাপ লেখক – প্রশ্ন
জাগে – ভালো-খারাপ মাপার মাপকাঠিটি কী ভাই? হুমায়ূন আজাদ হুমায়ূন আহমেদকে “অপন্যাসিক”
বলতেন। ব্যক্তিগত মতামতের ভিত্তিতে তা তিনি বলতেই পারেন। তার অর্থ এই নয় যে হুমায়ূন
আজাদ হুমায়ূন আহমেদের চেয়ে ভালো লেখক। কার কোন্ লেখককে ভালো লাগবে তার তো কোন নিয়ম
নেই। ভালো লাগার স্বাধীনতা সবার আছে। যে লেখা পড়ে আনন্দ পাওয়া যায় – সেই লেখা যদি মানুষ
পড়ে – লেখককে যদি মাথায় তুলে রাখতে চায়, তাহলে দোষের কী আছে? হুমায়ূন আহমেদকে বাংলাদেশের
বেশিরভাগ পাঠক মাথায় তুলে রেখেছেন। মৃত্যুর দশ বছর পরেও তাঁর অবস্থান সেখানেই।
তাঁর প্রথম
প্রকাশিত উপন্যাস নন্দিত নরক প্রকাশিত হয়েছিল ডক্টর আহমদ শরীফের লেখা ভূমিকাসহ। সেই
১৯৭২ সালে আর কোন উপন্যাসে এরকম অন্য বিখ্যাত মানুষের ভূমিকা প্রকাশিত হয়েছিল আমার
জানা নেই। ডক্টর আহমদ শরীফ সেই ভূমিকায় লিখেছিলেন, “মাসিক মুখপত্রের প্রথম বর্ষের তৃতীয়
সংখ্যায় গল্পের নাম ‘নন্দিত নরকে’ দেখেই আকৃষ্ট হয়েছিলাম। কেননা ঐ নামের মধ্যেই যেন
একটি নতুন জীবনদৃষ্টি, একটি অভিনব রুচি, চেতনার একটি নতুন আকাশ উঁকি দিচ্ছিল। লেখক
তো বটেই, তাঁর নামটিও ছিল আমার সম্পূর্ণ অপরিচিত। তবু পড়তে শুরু করলাম ঐ নামের মোহেই।
পড়ে আমি অভিভূত হলাম। গল্পে সবিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করেছি একজন সূক্ষ্মদর্শী শিল্পীর, একজন
কুশলী স্রষ্টার পাকা হাত। বাঙলা সাহিত্যক্ষেত্রে এক সুনিপুণ শিল্পীর, এক দক্ষ রূপকারের,
এক প্রজ্ঞাবান দ্রষ্টার জন্মলগ্ন যে অনুভব করলাম।“ বাংলা সাহিত্যে যে বিপুল সম্ভাবনা
নিয়ে শুরু করেছিলেন শিল্পী হুমায়ূন আহমেদ, পরবর্তী চল্লিশ বছর ধরে তিনি বাংলাদেশের
গল্প-উপন্যাস-নাটকে ফসলের বান বইয়ে দিয়েছিলেন।
নন্দিত নরকে
পড়ে সাহিত্যিক আবুল ফজল লিখেছিলেন, “লেখকের যেন কোন বক্তব্য নেই, কোন দৃষ্টিকোণ নেই,
আশ্চর্য এক নির্লিপ্তির সাথে তুমি তোমার গল্প বলে গেছ। গল্প বলা তো নয়, এ যেন ছবি আঁকা।
যাতে একটি রেখাও অযথা টানা হয়নি। আমাকে সবচে বিস্মিত করেছে তোমার পরিমিতিবোধ আর সংযম।
এত অল্প বয়সে রচনায় এমন সংযম খুব কম দেখা যায়। তোমার লেখনী জয়যুক্ত হোক।“ হুমায়ূন আহমেদের
লেখনী যেভাবে জয়যুক্ত হয়েছে, বাংলাদেশের সাহিত্যে অন্য কোন লেখকের ক্ষেত্রে ততটা ঘটেনি।
হুমায়ূন আহমেদ
এর লেখার সমালোচনা করতে গিয়ে প্রায়ই দেখা যায় – ব্যক্তি হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে সমালোচনা
শুরু হয়। ব্যক্তি হুমায়ূন আহমেদের জীবনযাপন, বিশ্বাস, প্রেম-ভালোবাসা-বিবাহ এসব নিয়ে
কথা বলা যাবে না তা নয়। অবশ্যই যাবে। জনপ্রিয় মানুষের ব্যক্তিগত জীবন ব্যক্তিগত গন্ডির
বাইরে চলে আসবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তার ভিত্তিতে তাঁর লেখার বিচার করা অবিচারেরই
নামান্তর। আর একজন লেখকের সব লেখাই সবার ভালো লাগবে – সেটা আশা করাও কোন কাজের কথা
নয়।
নন্দিত নরকে
শেষ হয়েছে এভাবে - “ভোর হয়ে আসছে। দেখলাম চাঁদ ডুবে গেছে। বিস্তীর্ণ মাঠের উপরে চাদরের
মতো পড়ে থাকা ম্লান জ্যোৎস্নাটা আর নেই।“ ওখান থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল হুমায়ূন আহমেদের
সাহিত্যের ভুবন।
"আকাশভরা
সূর্যতারা বিশ্বভরা প্রাণ,
তাহারি মাঝখানে
আমি পেয়েছি মোর স্থান,
বিস্ময়ে তাই
জাগে আমার গান।"
রবীন্দ্রনাথের
এই গান যতবারই শুনি - বিস্ময়ে ব্যাকুল হই - আকাশভরা সূর্যতারার এই মহাবিশ্বের এই অপার
বিস্ময়ের কিছুই তো জানা হলো না।
রবিবিশ্বের
মুগ্ধতা কাটবার নয়। সেরকমই মুগ্ধতায় বাক্যহারা হয়ে যাই - সৈয়দ মুজতবা আলীর পান্ডিত্যে,
লেখার মণিমুক্তায়।
১১৭ বছর বয়স
হলো তাঁর। ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯০৪ - সিলেটের করিমগঞ্জে তাঁর জন্ম। অগাধ পান্ডিত্যের ছিঁটেফোঁটাই
মাত্র লিখেছেন। সেই লেখাও থেমে গেছে ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ - প্রায় ৪৭ বছর আগে। কিন্তু
তাঁর যেকোনো লেখা পড়লেই মনে হয় - নিত্যনতুন।
তাঁর যেসব লেখাকে
আমরা 'রম্যরচনা' নাম দিয়ে হালকা ভাবার চেষ্টা করি - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সেগুলি সম্পর্কে
যথার্থই বলেছেন - ওগুলি সব প্রবন্ধ।[1] আমাদের প্রচলিত ধারণা হলো -
যেসব লেখা পন্ডিতী ফলানোর জন্য লেখা হয়, কয়েক লাইন পড়লেই ঘুম চলে আসে - সেগুলিই প্রবন্ধ।
সৈয়দ মুজতবা আলীর প্রবন্ধগুলি পড়তে শুরু করলে শেষ না করে রাখা যায় না -সে কারণেই কি
সেগুলিকে প্রবন্ধ বলতে চাই না?
'দেশেবিদেশে'
তাঁর প্রথম প্রকাশিত বই। কিন্তু প্রথম লেখা নয়। দেশেবিদেশে কি শুধুই ভ্রমণকাহিনি? ইতিহাস
নয়? সমাজদর্পণ নয়?
প্রাণখোলা হাসি
প্রচলিত পান্ডিত্যের পরিপন্থী। যেসব পন্ডিত আমাদের সমাজে সদর্পে স্বপ্রচারে সরব, তাঁদের
কেউই প্রাণখুলে হাসেন না। পাছে লোকে তাঁদের পান্ডিত্য নিয়ে সন্দেহ করে। কিন্তু সৈয়দ
মুজতবা আলী পাঠককে যেভাবে হো হো করে হাসিয়ে ছাড়েন, তেমনি নিজেও হাসতে পারতেন প্রাণখুলে,
মন খুলে। কিছু কিছু পন্ডিতের সাথে আমরা পরিচিত - যাদের সাক্ষাৎ এত বেশি গম্ভীর যে
দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়। অথচ সৈয়দ মুজতবা আলীর পান্ডিত্য ছিল ভোরের আলোর মতো স্নিগ্ধ,
শরতের বাতাসের মতো নির্মল।
সৈয়দ মুজতবা
আলীর প্রত্যেকটি লেখায় কতো কিছু অজানা বিষয় থাকে।
অথচ একটুও মনে হয় না তিনি মাস্টারি করছেন। পাঠক মাস্টারদের তবু কোন রকমে সহ্য
করতে পারেন, কিন্তু সাহিত্যে মাস্টারি অসহ্য। সৈয়দ মুজতবা আলী ব্যাপারটা খুব ভালোভাবেই
জানতেন।
এত কম কথায়
এত বেশি তিনি বলতে পারতেন - যা মাঝে মাঝে তাঁর গুরুদেব রবিঠাকুরের ঠিক উল্টো। রবিঠাকুরের
গল্প কিংবা উপন্যাসে কম-কথার চলন খুব একটা নেই। কিন্তু সৈয়দ মুজতবা আলী কম-কথায় এক
কথায় অনবদ্য। 'মুখের রঙটি যেন শিশিরে ভেজা' - পাঁচ শব্দেই তাঁর গল্পের নায়িকার রূপ মূর্ত হয়ে ওঠে।
প্রেমে পড়ার
বয়সে তাঁর 'প্রেম' পড়ে আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। প্রেমিকার গর্ভে সন্তান রেখে প্রেমিক
পালিয়ে গেছে প্রতারণা করে। আদালতে বিচারক যখন প্রতারিতাকে প্রশ্ন করেন, "আচ্ছা,
তুমি সেই ছেলেটার সন্ধান নিলে না কেন? তাকে বিয়ে করাতে বাধ্য করালে না কেন?"[2]
কুন্ডুলি পাকানো
গোখরো সাপ যে রকম হঠাৎ ফণা তুলে দাঁড়ায়, মেয়েটা ঠিক সেই রকম বলে উঠলো, 'কী! সেই কাপুরুষ
- যে আমাকে অসহায় করে ছুটে পালালো! তাকে বিয়ে করে আমার বাচ্চাকে দেব সেই কাপুরুষের,
সেই পশুর নাম!'
এতটা আত্মসম্মান,
আত্মশক্তি আবিষ্কার করতে পারেন যিনি - তিনিই তো সৈয়দ মুজতবা আলী।
শুভ জন্মদিন
প্রিয় লেখক।
[1] সৈয়দ মুজতবা আলী রচনাবলীর তৃতীয় খন্ডের
ভূমিকা। মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রা: লি:, কলকাতা, শ্রাবণ ১৪০৮ বাংলা।
[2] সৈয়দ মুজতবা আলী, রাজা উজীর গ্রন্থের
‘প্রেম’।
![]() |
| নিউইয়র্ক শহরে টুইন টাওয়ারের ঘটনাস্থলে নিহতদের স্মরণে আলোকস্তম্ভ। [ছবি: pxfuel.com] |
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর – আমেরিকানদের তারিখ লেখার পদ্ধতি অনুসারে নাইন-ইলেভেন। এইদিনের পর থেকে গত বিশ বছরে পৃথিবীর রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক আর সর্বোপরি ধর্মীয় বিভাজন প্রবলভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু আমেরিকা নয়, পুরো বিশ্বকে বদলে দিয়েছে এই একটি তারিখ।
আমেরিকায় নাইন-ইলেভেনের সকালে এই ঘটনা যখন ঘটছে তখন মেলবোর্নে ১২ তারিখের ভোররাত। আমি তখন থাকতাম ফিলের অ্যাপার্টমেন্টের একটা রুম ভাড়া নিয়ে। আমার টেলিভিশন ছিল না। ফিল একটা বারো ইঞ্চি সাদা-কালো অ্যানালগ টেলিভিশন আমার রুমে এনে দিয়েছিল। তখন ডিটিজাল টেলিভিশন আসতে শুরু করেছে। লোকে পুরনো অ্যানালগ টেলিভিশনগুলি ফেলে দিচ্ছিলো। ফিল সেরকই কোন পরিত্যক্ত টেলিভিশন ফুটপাত থেকে তুলে এনে আমার রুমে ঢুকিয়ে দিয়েছে। শুয়ে শুয়ে ওটা দেখতে দেখতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ ভোররাতে ঘুম ভাঙার পর দেখি টিভিতে টুইন টাওয়ারের ঘটনা দেখানো হচ্ছে। প্রথমে বুঝতে পারিনি। ভেবেছিলাম কোন মুভি চলছে। কিন্তু একটু পরেই বুঝতে পারলাম – কোন সিনেমার দৃশ্য নয়, সরাসরি দেখানো হচ্ছে আমেরিকায় তখন কী হচ্ছে।
এরপর পরের দিনই সবাই জেনে গিয়েছে কী কী হয়েছিল সেখানে। আল্ কায়েদার ১৯জন জঙ্গী চার গ্রুপে বিভক্ত হয়ে চারটি যাত্রীবাহী প্লেন হাইজ্যাক করেছে প্রায় একই সময়ে। দুটি প্লেন উড়ে গিয়ে আঘাত করেছে টুইন টাওয়ারের দুই টাওয়ারে। তৃতীয় প্লেনটি আছড়ে ফেলেছে পেন্টাগনের উপর। আর চতুর্থ প্লেনটি বিধ্বস্ত হয়েছে পেনসিলভেনিয়ার শ্যাংকসভিলের মাঠে। তিন হাজারেরও বেশি সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যেই। সন্ত্রাসী জঙ্গিরা ইসলাম ধর্মের দোহাই দিয়ে ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পনা করে বিভৎসভাবে খুন করেছে এতগুলি মানুষ – নারী, পুরুষ, শিশু।
![]() |
| টুইন টাওয়ার জ্বলছে। [ছবি: skeptic.com] |
১১ সেপ্টেম্বর ২০০১, নিউইয়র্ক সময় সকাল ৮টা ৪৫। মঙ্গলবার সকালের ঝকঝকে রোদে জেগে উঠেছে ম্যানহাটানের অফিসপাড়া। আমেরিকান এয়ারলাইনসের বোয়িং ৭৬৭ প্লেনটি উড়ে গিয়ে টুইন টাওয়ারের উত্তরের দিকের টাওয়ারের ৮০ তলায় ঢুকে গেল। বিশ হাজার গ্যালন জ্বালানি তেলের আগুন ছড়িয়ে পড়লো মুহূর্তেই। দমকলবাহিনি সর্বোচ্চ চেষ্টায় যখন মানুষের প্রাণ বাঁচাতে ব্যস্ত, টেলিভিশন ক্যামেরাগুলি যখন সরাসরি এই ঘটনা দেখাতে শুরু করেছে নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে – তখনি – প্রথম আঘাতের আঠারো মিনিট পর আরেকটি বোয়িং ৭৬৭ – ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ১৭৫ উড়ে এসে আছড়ে পড়লো দক্ষিণের টাওয়ারের ৬০ তলায়। তখনি বোঝা গেল – এগুলি দুর্ঘটনা নয়, সরাসরি আক্রমণ।
পনেরো মিনিটের মধ্যেই দক্ষিণ টাওয়ারের পুরোটাই ধ্বসে পড়লো। সাড়ে দশটার মধ্যে উত্তরের টাওয়ারও মিশে গেল মাটির সাথে। ধ্বংসস্তুপে চাপা পড়লো আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষ।
![]() |
| পেন্টাগনে আক্রমণ [ছবি Flickr] |
![]() |
| রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯৪১) |
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শারীরিকভাবে বেঁচেছিলেন আশি বছর (১৮৬১ – ১৯৪১)। তাঁর মৃত্যুর বয়সও আশি হয়ে গেল। অথচ তিনি আমাদের জীবনের মননশীল সব কাজে চিন্তায় আনন্দে বিষাদে প্রেমে বিরহে হেলাফেলায় সারাবেলায় কী অপরূপভাবে জীবন্ত।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ ‘শেষ লেখা’ প্রকাশিত হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর পর। ১৩৪৮ বাংলার ভাদ্র মাসে। রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণ ঘটে তার কিছুদিন আগে – ১৩৪৮ বাংলার ২২শে শ্রাবণ।
‘শেষ লেখা’ গ্রন্থের নামকরণ রবিঠাকুর নিজে করে যেতে পারেননি। বইয়ের ভূমিকায় কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন এ কথা। এই বইতে ১৫টি কবিতা আছে – যার মধ্যে কয়েকটি কবিতা কবি নিজের হাতে লিখতে পেরেছিলেন। বাকিগুলি কবি রোগশয্যায় শুয়ে শুয়ে মুখে মুখে বলেছিলেন – অন্যরা লিখে নিয়েছিলেন। কবি পরে সেগুলি দেখে সংশোধন করেছিলেন। একেবারে শেষের কবিতা “তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি’ সংশোধন করার সময় পাননি।
এই কবিতাগুলির কোনটারই শিরোনাম নেই। কবিতার প্রথম লাইনকেই কবিতার শিরোনাম ধরা হয়েছে। এই ১৫টি কবিতার মধ্যে কয়েকটি কবিতা নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয়েছে। বহুল আলোচিত কবিতার একটি হলো –
“প্রথম দিনের সূর্য
প্রশ্ন করেছিল
সত্তার নূতন আবির্ভাবে,
কে তুমি—
মেলে নি উত্তর।
বৎসর বৎসর চলে গেল,
দিবসের শেষ সূর্য
শেষ প্রশ্ন উচ্চারিল পশ্চিম-সাগরতীরে,
নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়,
কে তুমি—
পেল না উত্তর।“
এই কবিতাটি কবি লিখেছিলেন ২৭ জুলাই ১৯৪১ সালে – তাঁর মৃত্যুর মাত্র ১২দিন আগে। এই কবিতার অনেক রকমের দার্শনিক ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে – এখনো হচ্ছে। কবিতাতে যে ব্যাপারটা স্পষ্ট – সেটা হলো জীবনের অস্পষ্টতা। যে আমিত্বের বড়াই মানুষ করে – তার স্বরূপ কী? কে আমি? – এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না।
রবিঠাকুরের জীবনের সর্বশেষ রচনা –
“তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি
বিচিত্র ছলনা-জালে,
হে ছলনাময়ী।
মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছ নিপুণ হাতে
সরল জীবনে।
এই প্রবঞ্চনা দিয়ে মহত্ত্বেরে করেছ চিহ্নিত;
তার তরে রাখ নি গোপন রাত্রি।
তোমার জ্যোতিষ্ক তারে
যে পথ দেখায়
সে যে তার অন্তরের পথ,
সে যে চিরস্বচ্ছ,
সহজ বিশ্বাসে সে যে
করে তারে চিরসমুজ্জল।
বাহিরে কুটিল হোক অন্তরে সে ঋজু,
এই নিয়ে তাহার গৌরব।
লোকে তারে বলে বিড়ম্বিত।
সত্যেরে সে পায়
আপন আলোকে ধৌত অন্তরে অন্তরে।
কিছুতে পারে না তারে প্রবঞ্চিতে,
শেষ পুরস্কার নিয়ে যায় সে যে
আপন ভাণ্ডারে।
অনায়াসে যে পেরেছে ছলনা সহিতে
সে পায় তোমার হাতে
শান্তির অক্ষয় অধিকার।“
মৃত্যুর আট দিন আগে রচিত (৩০ জুলাই ১৯৪১) এই কবিতায় কি কোনোভাবে কবির বিরক্তি প্রকাশিত হয়েছে ছলনা এবং মিথ্যার কারণে?
‘মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছ নিপুণ হাতে সরল জীবনে’ – এ যেন আমাদের প্রত্যেকের মনের কথা – যখন আমাদের বিশ্বাস ভেঙে যায় প্রতারণার ফাঁদে।
কবির জীবনের শেষ পংক্তি – ‘অনায়াসে যে পেরেছে ছলনা সহিতে, সে পায় তোমার হাতে – শান্তির অক্ষয় অধিকার।“ এ যেন নিজেকে সান্তনা দেয়া – ছলনা সয়ে যাবার পরেও মনে মনে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা। কষ্ট লাগে – যখন জীবনের সায়াহ্নে বসে বিশ্বকবিকেও ভাবতে হয় কী ছলনাময় এই জগতের চারপাশ।
কাশেমভাইয়ের
সাথে আমার প্রথম দেখা কোন্দিন হয়েছিল তার দাঁড়ি-কমা-সেমিকোলন সবই মনে আছে। আশ্চর্যের
ব্যাপার তাঁর সাথে শেষ যেদিন দেখা হয়েছিল – সেদিনের কথাও মনে আছে। মাঝখানের অনেকগুলি
বছরের অনেকগুলি দিন আলাদা আলাদাভাবে মনে করার উপায় নেই। কাশেমভাইয়ের সাথে শাহীন কলেজে
একসাথে কাজ করেছি সাড়ে চার বছরেরও বেশি। পুরনো লাল বিল্ডিং-এ তাঁর সাথে ডেস্ক শেয়ার
করেছি প্রায় তিন বছর। তারপর নতুন বিল্ডিং-এ আরো দেড় বছর মানুষটিকে দেখেছি কাছ থেকে,
কাজ থেকে।
আমরা সবাই জানি
– কাজের জায়গায় কত বিচিত্র রকমের মানুষ থাকে। তাঁদের প্রত্যেকের কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে
– যেগুলি দিয়ে তাদেরকে আলাদা করা যায়। অনেক সময় আমরা তাদের বৈশিষ্ট্যগুলির কারণে তাদেরকে
ঈর্ষা করি, আবার বৈশিষ্ট্যভেদে অনেক সময় বিরক্ত হই। গতকাল কাশেমভাইয়ের মৃত্যুসংবাদ
পাবার পর থেকে অনেকক্ষণ ধরে মনে মনে খুঁজে বের করার চেষ্টা করলাম – কাশেমভাইয়ের সবচেয়ে
উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য কোন্টি।
কাশেমভাইয়ের
যেদিকটি আমাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছে তা হলো শাহীন কলেজ কর্তৃপক্ষের বহুবিধ চাপাচাপির
মধ্যেও একেবারে প্রতিক্রিয়াহীন থাকা। কত ন্যায্য-অন্যায্য কারণে আমাদের অনেকের মাথা
গরম হয়ে গেছে, আমরা কমনরুমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছি, অনেক সময় ছাত্রছাত্রীদের কাছেও আমাদের
মানসিক অস্থিরতা চাপা থাকেনি। মানসিক চাপে আমাদের শারীরিক ভাষাও বদলে গেছে অনেকসময়।
আমাদের হাঁটার গতি বেড়েছে, কিংবা ডাস্টারের উপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে – অথবা নিদেনপক্ষে
অ্যাডজাস্টমেন্ট খাতা আছড়ে ফেলেছি। কিন্তু কাশেমভাইকে কোনদিন মেজাজের উপর নিয়ন্ত্রণ
হারাতে দেখিনি। শুরুতে ভেবেছিলাম তিনি সংসারে বাস করা সন্ন্যাসী টাইপের মানুষ। কিন্তু
ক্রমে জেনেছি তিনি ঘোরতর সংসারী মানুষ। মানুষের যেসব স্বাভাবিক স্বার্থচিন্তা থাকে
– তার কোনটা থেকেই তিনি মুক্ত ছিলেন না। তাহলে কোন্ জাদুবলে কলেজের সব চাপ তিনি উপেক্ষা
করে সদাস্থির থাকতে পেরেছিলেন?
কমনরুমে আমরা
কত কিছু নিয়ে, কত কাউকে নিয়ে কতরকমের মন্তব্য করেছি। কাশেমভাই সেসব মন্তব্য চলাকালীন
আরাম করে পান চিবিয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের
প্রতি তাঁর গভীর মমতা ছিল তার প্রমাণ পেয়েছি অনেক সময়। ক্লাসের ভালো, কিংবা ধনী, কিংবা
প্রভাবশালী, কিংবা গন্ডগোলে শিক্ষার্থীদের প্রতি অনেক শিক্ষকেরই ধনাত্মক-ঋণাত্মক কোন
না কোন রকমের পক্ষপাতিত্ব থাকে। কিন্তু দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রতি মমতা দেখানোর মতো
ধৈর্য অনেক শিক্ষকের থাকে না। কাশেমভাইয়ের মধ্যে আমি সেই মমতা দেখেছিলাম। তাঁর শিক্ষার্থীরাই
ভালো বলতে পারবে তারা তাদের কাশেমস্যারকে মনে রাখলে কেন মনে রাখবে। আমি আমার জ্যেষ্ঠ
সহকর্মী কাশেমভাইকে মনে রাখবো তাঁর কিছুতেই-কিছু-যায়-আসে-না স্বভাবের জন্য। কলেজে তিনি
অনেক সিনিয়র ছিলেন – কিন্তু কখনোই সেটা জাহির করেননি। ক্ষমতাকেন্দ্রিক প্রভাবশালী শিক্ষকদের
বলয়ে তিনি কোনদিনই ঢুকতে চেষ্টা করেননি।
কাশেমভাইয়ের
সাথে আমার সর্বশেষ দেখা হয়েছিল ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে – ঢাকা ডোমেস্টিক এয়ারপোর্টে।
আমাদের আরেকজন সহকর্মী আলী হায়দারভাই কানাডা থেকে ঢাকায় এসে কানেক্টিং ফ্লাইটের জন্য
অপেক্ষা করছিলেন। আমিও বাড়িতে যাচ্ছিলাম। কাশেমভাই আলী হায়দারভাইয়ের সাথে দেখা করতে
এসেছিলেন। আমার সাথে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল। কাশেমভাই তখন অবসর নিয়েছেন। আমার সাথে প্রায়
এক যুগ পরে দেখা হলেও চিনতে পারলেন, বুকে টেনে নিলেন। মানুষকে আপন করে নেয়ার এই গুণের
কারণে আপনাকে মিস করবো কাশেমভাই – আমাদের দাদাভাই।
হেরমান মিনকৌস্কি ছিলেন আলবার্ট আইনস্টাইনের সরাসরি শিক্ষক। সুইস পলিটেকনিকের গণিতের অধ্যাপক ছিলেন মিনকৌস্কি। ১৯০৫ সালে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব প্রকাশিত হবার পর মিনকৌস্কি অবাক হয়ে গিয়েছিলেন যে তাঁর ক্লাসের 'অলস' ছাত্রটির হাত দিয়ে এত উন্নত মানের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব আবিষ্কৃত হয়েছে। মনকৌস্কির মতে আইনস্টাইন ছিলেন খুবই অলস প্রকৃতির ছাত্র - গণিতের প্রতি যার কোন আকর্ষণই ছিল না। আইনস্টাইন ক্লাস খুব একটা করতেন না, সে হিসেবে তাঁকে 'অলস ছাত্র' বলতেই পারেন তাঁর শিক্ষক। শিক্ষকরা তো মনে করেন তাঁদের ক্লাসে যারা নিয়মিত উপস্থিত থাকেন, তাঁদের সাথে যারা সুসম্পর্ক বজায় রাখেন - তারাই ভালো ছাত্র। তবে মিনকৌস্কি তাঁর ছাত্র আইনস্টাইনের তত্ত্বের মূল সুর বুঝতে দেরি করেননি। তিনি বুঝেছিলেন যে আপেক্ষিকতার তত্ত্ব ঠিকমতো বুঝতে হলে শুধুমাত্র ত্রিমাত্রিক জ্যামিতি দিয়ে কাজ হবে না, আরো একটি মাত্রা লাগবে - সেটা হলো সময়। মিনকৌস্কির হাত দিয়েই আমরা পেলাম চতুর্মাত্রিক জগত - x, y, z এবং সময়। যার গাণিতিক নাম মিনকৌস্কি স্পেস-টাইম।
মাত্র ৪৪ বছর বেঁচেছিলেন হেরমান মিনকৌস্কি। ১৮৬৪ সালের ২২ জুন তখনকার রুশ সাম্রাজ্যের অধীনস্থ পোলান্ডে জন্মেছিলেন তিনি। ১৯০৯ সালের ১২ জানুয়ারি অ্যাপেন্ডিসাইটিসের জটিলতায় হঠাৎ মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
আজ হেরমান মিনকৌস্কির জন্মদিন।
শুভ জন্মদিন চতুর্থ-মাত্রার জনক।
ছবির কপিরাইট: মিনকৌস্কির ছবিটি নিয়েছি Vesselin Petkov সম্পাদিত Minkowski Spacetime: A Hundred Years Later (Springer 2010) বই থেকে।
২০ জুন ২০১৯
২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০
বিয়ের এগারো বছরের মাথায় দুর্ঘটনায় স্বামীকে হারিয়ে ছোট ছোট দুটো মেয়েকে নিয়ে নিজের যোগ্য সম্মান ও অধিকার অর্জনের জন্য ধরতে গেলে সারাজীবনই সংগ্রাম করতে হয়েছে মেরি কুরিকে। ফ্রান্সের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ মেরির নামে কলংক রটিয়েছে - আর মেরি তখন তাঁর একক গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ অর্জন করেছেন দ্বিতীয় নোবেল পুরষ্কার। গবেষণা আর দুটো মেয়েকে বুকে ধরে এগিয়ে গেছেন নীরবে। গড়ে তুলেছেন বিশ্ববিখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান - রেডিয়াম ইনস্টিটিউট। মৌলিক বিজ্ঞানের গবেষণায় মেয়েদের অংশগ্রহণের অগ্রদূত মেরি কুরি। তিনি ছিলেন বিশ্বের সর্বপ্রথম নারী যিনি বিজ্ঞানে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। তিনিই প্রথম নারী যিনি নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন এবং একমাত্র নারী বিজ্ঞানী যিনি দু’বার নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন। শুধু তাই নয় - নিজের মেয়ে আইরিনকে গড়ে তুলেছেন বিজ্ঞানী হিসেবে। আইরিন কুরি ও তাঁর স্বামী ফ্রেদেরিক জুলিও রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন নিউক্লিয়ার কেমিস্ট্রিতে তাঁদের মৌলিক অবদানের জন্য। ক্যান্সার চিকিৎসায় তেজষ্ক্রিয়তার ব্যবহারের পথিকৃৎ মেরি কুরি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় কিশোরী মেয়েকে সাথে নিয়ে মেরি ছুটে গিয়েছিলেন যুদ্ধাহত সৈনিকদের চিকিৎসায়। এক্স-রে ও রেডিয়াম ব্যবহার করে তাঁরা প্রাণ বাঁচিয়েছেন শত শত মানুষের। তাঁর সম্মানে তাঁর জন্মদিনে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় মেডিকেল ফিজিক্স দিবস।
আজ মেরি কুরির জন্মদিন। শুভ জন্মদিন প্রিয় বিজ্ঞানী।
৭/১১/২০২০
ফিওদর দস্তয়ভস্কি (১১/১১/১৮২১ - ৯/২/১৮৮১)
"মাননীয় স্যার", রাজকীয় কায়দায় শুরু করলো লোকটা- "দারিদ্র্য কোন রোগ নয়। এ কথা কিন্তু সত্যি। মদ খেয়ে মাতাল হওয়াও যে কোন গৌরবের কাজ নয়, তাও আমি জানি। এটা আরো বেশি সত্যি। কিন্তু ভিক্ষাবৃত্তি, মাননীয় স্যার, ভিক্ষাবৃত্তি একটি ভয়াবহ রোগ স্যার। দারিদ্র্যের মাঝে থেকেও আপনি আপনার ভেতরের আদর্শ অটুট রাখতে পারেন। কিন্তু ভিক্ষাবৃত্তিতে - কক্ষনো না - কেউই পারে না। ভিক্ষা করলে সমাজ হয়তো আপনাকে লাঠি নিয়ে তেড়ে মারতে আসবে না, কিন্তু সম্মানের জায়গা থেকে আপনাকে একদম ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দেবে। তাই এই কাজটাকে যতটুকু লজ্জাকর করে তোলা যায় - হ্যাঁ স্যার, ঠিক তাই, ভিক্ষা করার আগে আমি নিজেকে নিজে অপমান করে নিচ্ছি সবার আগে।"
- দস্তয়ভস্কির 'ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট' অনুবাদ করার চেষ্টা করেছিলাম অনেক বছর আগে। পর পর শব্দের প্রতিশব্দ বসিয়ে দিয়ে ভাষান্তর করা যায়, কিন্তু মূল ভাব ধরে রাখার কাজটা শক্তিমান শব্দশিল্পীর পক্ষেই সম্ভব। দস্তয়ভস্কির ভাবের গভীরতার ধারে কাছে যাওয়াও আমার অসাধ্য। মানুষের অন্তর্জগতের এত গভীরে দস্তয়ভস্কির মতো আর কেউ ঢু মেরেছেন বলে আমার জানা নেই। প্রায় দু'শ বছর আগে আজকের দিনে জন্মেছিলেন ফিওদর দস্তয়ভস্কি। শুভ জন্মদিন বস্।
১১/১১/২০২০
৭/১২/২০২০
২১/২/২০২১
আমার মা ছিলেন নিরক্ষর, বাবার পড়ালেখা চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত। লেখাপড়া করতে পারেননি বলে লেখাপড়ার প্রতি প্রচন্ড ভালোবাসা ছিল বাবার। তাই নিজের ...