Thursday 30 September 2021

কীভাবে পাই এক্স-রে

 



১৮৯৬ সালের জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে আমেরিকার বিখ্যাত পিয়ারসন্স ম্যাগাজিনে বিজ্ঞানী বিলহেল্‌ম রন্টগেনের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। সাক্ষাৎকারটির কিছু অংশ এরকম: 
“কত তারিখের ঘটনা?”
“নভেম্বরের ৮ তারিখ”
“কী আবিষ্কার করেছেন?”
“আমি একটি ক্রুক্‌স টিউব নিয়ে গবেষণা করছিলাম। টিউবটিকে আমি কালো কার্ডবোর্ড দিয়ে চারদিক থেকে ঢেকে দিয়েছিলাম। একটি বেরিয়াম প্লাটিনো-সায়ানাইড পেপার রাখা ছিল বেঞ্চের উপর। ক্রুক্‌স টিউবের ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহ চালানোর সময় দেখলাম বেরিয়াম প্লাটিনো-সায়ানাইড পেপারে অদ্ভুত একটি কালো দাগ পড়েছে।“
“কিসের দাগ?”
“এরকম দাগ বেরিয়াম প্লাটিনো-সায়ানাইড পেপারে শুধুমাত্র  সরাসরি আলো প্রবেশ করলে পড়তে পারে। কিন্তু টিউব থেকে আলো আসার কোন উপায় ছিল না। কারণ আমি টিউবের চারদিক মোটা কার্ডবোর্ড দিয়ে ঢেকে দিয়েছিলাম। টিউবের ভেতর বিদ্যুৎ প্রবাহে স্ফূলিঙ্গ তৈরি হলেও তার কোন আলো বাইরে আসবে না।“
“তখন আপনি কী ভাবলেন?”
“আমি কিছু ভাবিনি। আমি অনুসন্ধান করেছি। আমি ধারণা করতে পেরেছিলাম যে টিউব থেকেই এটা এসেছে। আমি আরো পরীক্ষানিরীক্ষা করলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার আর কোন সন্দেহ রইলো না। টিউবের ভেতর থেকে কোন রশ্মি বের হয়ে এসে বেরিয়াম প্লেটিনো-সায়ানাইড পেপারে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে কালো দাগ তৈরি করেছে। আমি টিউব থেকে পেপারের দূরত্ব অনেক বাড়ানোর পরেও, এমনকি দুই মিটার দূর থেকেও এই দাগ পাচ্ছিলাম। শুরুতে মনে হয়েছিল এটা একটি নতুন ধরনের অদৃশ্য আলো। এখন পরিষ্কার যে এটা সম্পূর্ণ নতুন একটা কিছু যা আগে কখনো দেখা যায়নি।“
“এটা কি আলো?”
“না”
“এটা কি বিদ্যুৎ?”
“না, আমাদের চেনা বিদ্যুৎ নয়।“
“তবে এটা কী?”
“আমি জানি না।“
প্রফেসর রন্টগেন সেদিন জানতেন না তিনি কী আবিষ্কার করেছেন। জানতেন না বলেই এই অজানা রশ্মির নাম তিনি দিয়েছিলেন – এক্স-রে। কেউ কেউ তাঁর নামে  রন্টগেন-রে রাখতে চেয়েছিলেন এই রশ্মির নাম। কিন্তু তা টেকেনি। এক্স-রে নামই রয়ে গেছে। [জার্মান প্রফেসর বিলহেল্‌ম রন্টগেন ইংরেজি উচ্চারণে হয়ে যান উইলহেল্‌ম রন্টজেন। সেখান থেকে আমাদের বাংলা উচ্চারণে রন্টজেন কীভাবে যেন হয়ে গিয়েছে রঞ্জন। বাংলায় লেখা অনেক বইতে এক্স-রে’কে রঞ্জন রশ্মি বলা হয়ে থাকে। কিন্তু এক্স-রে’র প্রতিশব্দ হিসেবে রঞ্জন-রশ্মি মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।]

এক্স-রে যখন আবিষ্কৃত হয় – ১৮৯৫ সালের নভেম্বরে – তখনো কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের অনেক মৌলিক ব্যাপারই আবিষ্কৃত হয়নি। কিন্তু এক্স-রে আবিষ্কারের পরপরই অনেক কিছু আবিষ্কৃত হয়েছে – যার উপর দাঁড়িয়ে গেছে পুরো বিংশ শতাব্দীর পদার্থবিজ্ঞান। ১৮৯৬ সালে ফরাসী পদার্থবিজ্ঞানী হেনরি বেকোয়ারেল আবিষ্কার করলেন রেডিও-অ্যাকটিভিটি বা তেজস্ক্রিয়তা। ১৮৯৭ সালে স্যার জোসেফ জন থমসন আবিষ্কার করলেন পদার্থের মৌলিক কণা ইলেকট্রন। পরীক্ষাগারে এক্স-রে আবিষ্কার করার কৌশল জানা হয়েছে ইলেকট্রন আবিষ্কারেরও আগে, অথচ পদার্থের পরমাণুর ইলেকট্রনের মিথস্ক্রিয়ার ফলেই যে এক্স-রে উৎপন্ন হয় তা জানা গেছে আরো অনেক বছর পর – যখন কোয়ান্টাম মেকানিক্স এবং পরমাণুর কোয়ান্টাম তত্ত্ব আস্তে আস্তে বিকাশ লাভ করতে শুরু করেছে। এক্স-রে আবিষ্কারের ১৬ বছর পর ১৯১১ সালে আর্নেস্ট রাদারফোর্ড প্রোটন আবিষ্কার করেন। তার দু’বছর পর নীল্‌স বোর পরমাণুর গ্রহণযোগ্য কোয়ান্টাম মডেল উপস্থাপন করেন। পরমাণুর গঠন এবং ইলেকট্রনের কোয়ান্টাম ধর্ম থেকে আমরা এখন এক্স-রে কীভাবে উৎপন্ন হয় তা ব্যাখ্যা করতে পারি। 

এক্স-রে কী ধরনের রশ্মি তা সেদিন অজানা থাকলেও আজ আমরা এক্স-রে সম্পর্কে অনেক কিছুই জানি। এক্স-রে অতিউচ্চ কম্পাঙ্কের তড়িৎ-চুম্বক তরঙ্গ। এর তরঙ্গ-দৈর্ঘ্য অত্যন্ত কম এবং শক্তি অত্যন্ত বেশি। এক্স-রে’র কম্পাঙ্ক ৩০০ কোটি কোটি হার্টজ থেকে ৩ লক্ষ কোটি কোটি হার্টজ পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ এই রশ্মিগুলি ১ সেকেন্ডে ৩ লক্ষ কোটি কোটি তরঙ্গ তৈরি করতে পারে। এই তরঙ্গগুলির দৈর্ঘ্য অত্যন্ত কম – ১০ ন্যানোমিটারেরও কম (১ মিটারকে একশ কোটি ভাগ করলে এক ভাগের দৈর্ঘ্য হবে এক ন্যানোমিটার)। স্বাভাবিকভাবেই এত ছোট তরঙ্গ চোখে দেখা যায় না। এই এক্স-রে খুব সহজেই আমাদের শরীর ভেদ করে চলে যেতে পারে। যে কোন বস্তুর একদিকে ঢুকে অন্যদিকে বের হয়ে যেতে পারে। এক্স-রে কোন চার্জ বহন করে না। ফলে কোন ধরনের তড়িৎ-ক্ষেত্র বা চৌম্বক-ক্ষেত্রে বাধা পড়ে না। দৃশ্যমান আলো ও এক্স-রে একই তড়িৎ-চুম্বক তরঙ্গ পরিবারের সদস্য হলেও এক্স-রে আলোর মতো প্রতিফলিত বা প্রতিসৃত হয় না।এক্স-রে’র কোন ভর নেই, তাই এক্স-রে পদার্থ নয়। এক্স-রে দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না, কিংবা অনুভবও করা যায় না। এক্স-রে তৈরি করে কোথাও জমা করেও রাখা যায় না। এক্স-রে তৈরি করার সাথে সাথেই ব্যবহার করে ফেলতে হয়। 

প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে এক্স-রে’র ব্যবহার অনেক বাড়ছে। এখন এয়ারপোর্টের এক্স-রে চেকিং থেকে শুরু করে মহাশূন্যের এক্স-রে অবজারভেটরি পর্যন্ত এক্স-রে’র বহুবিধ ব্যবহারে আমরা অভ্যস্ত। চিকিৎসা-বিজ্ঞানে এক্স-রের ব্যবহার যে কত প্রয়োজনীয় তা আমরা সবাই জানি। চিকিৎসা-বিজ্ঞানে এক্স-রে’র সাহায্যে যে রেডিওগ্রাফ তৈরি করা হয়, সেটাকেই আমরা এক্স-রে বলতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। পৃথিবীতে প্রতিবছর প্রায় চার-শ কোটি মেডিকেল এক্স-রে তৈরি করা হয় রোগ নির্ণয়ের জন্য। অর্থাৎ পৃথিবীতে গড়ে প্রতি দুইজন মানুষের মধ্যে একজনের শরীরে কমপক্ষে একবার মেডিকেল এক্স-রে প্রয়োগ করা হচ্ছে প্রতিবছর। [এক্স-রে’র ব্যবহার কম্পিউটার বা মোবাইল ফোনের ব্যবহারের চেয়েও অনেক বেশি। এই কম্পিউটার ও মোবাইল ফোনের আবিষ্কারকরা এখন পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষের তালিকায় একদম শুরুর দিকে থাকেন। কিন্তু এক্স-রে আবিষ্কারক বিজ্ঞানী রন্টগেন এক্স-রে আবিষ্কারের মেধাস্বত্ব বিনামূল্যে দিয়ে দিয়েছেন পৃথিবীর মানুষের জন্য। শেষ বয়সে ভীষণ অর্থকষ্টে ভুগে হতদরিদ্র অবস্থায় ক্যান্সারে মৃত্যু হয়েছে এই বিজ্ঞানীর। সে যাই হোক, মহৎ হতে গেলে অনেক কষ্ট স্বীকার করতে হয়।]

একেক কাজের জন্য একেকভাবে এক্স-রে উৎপাদন করা হয়, যদিও এক্স-রে উৎপন্ন হওয়ার মূলনীতি সবক্ষেত্রে এক। দেখা যাক চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগ-নির্ণয় করার জন্য ডায়াগনস্টিক এক্স-রে কীভাবে উৎপাদন করা হয়। এক্স-রে উৎপাদনের জন্য কোন ধরনের কাঁচামাল লাগে না। এক্স-রে মেশিনের যেখানে এক্স-রে উৎপন্ন হয় সেটা একটি বায়ুশূন্য টিউব। সেই ১৮৯৫ সালে রন্টগেন যেরকম বায়ুশূন্য ক্রুক্‌স টিউবে প্রথম এক্স-রে তৈরি করেছিলেন নিজের অজান্তে, এখন এই ১২৫ বছর পরেও একইভাবে এক্স-রে তৈরি করা হয়। কম্পিউটার এবং অন্যান্য উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে রেডিওগ্রাফ তৈরির পদ্ধতিটা বদলে গেছে। কিন্তু এক্স-রে উৎপাদনের পদ্ধতিতে কোন পরিবর্তন হয়নি। 





এক্স-রে টিউবের একদিকে থাকে ক্যাথোড বা ফিলামেন্ট। তার দুই সেন্টিমিটার দূরে থাকে অ্যানোড বা টার্গেট। ক্যাথোড় এবং অ্যানোডের মধ্যে অত্যন্ত উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ-প্রবাহ চালনা করা হয়। এই ভোল্টেজ ৩০ হাজার ভোল্ট থেকে শুরু করে এক লক্ষ চল্লিশ হাজার ভোল্ট পর্যন্ত হতে পারে। এত উচ্চ ভোল্টেজ কোত্থেকে সাপ্লাই করা হয়? এক্স-রে মেশিনের সাথে হাই-ভোল্টেজ জেনারেটর থাকে। সেই জেনারেটর এই ভোল্টেজ সাপ্লাই দেয়। শুধুমাত্র এক্স-রে তৈরি হবার সময় জেনারেটর চালু হয়। এবং পুরো প্রক্রিয়ায় কয়েক সেকেন্ডের বেশি সময় লাগে না। ক্যাথোড ও অ্যানোডের মধ্যে তীব্র আকর্ষণের ফলে ক্যাথোডের ফিলামেন্ট থেকে কোটি কোটি ইলেকট্রন মুক্ত হয়ে অ্যানোডের দিকে ছুটে যায়। ভোল্টেজ যত বেশি হয়, ইলেকট্রনের গতিশক্তি তত বেশি হয়, ফলে তত বেশি জোরে গিয়ে অ্যানোডের গায়ে ধাক্কা দেয়। এই ইলেকট্রন এত জোরে এসে অ্যানোডের ইলেকট্রনের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে। অ্যানোডের পদার্থের পরমাণুর ইলেকট্রন বিন্যাস অনুযায়ী ইলেকট্রনগুলি বিভিন্ন শক্তিস্তরে থাকে। সবচেয়ে ভেতরের শক্তিস্তর – K কক্ষপথের ইলেকট্রনের সাথে যদি ফিলামেন্ট থেকে আগত ইলেকট্রনের সংঘাত হয় – তবে K কক্ষপথের ইলেকট্রন কক্ষচ্যুত হয়। তখন সেখানে একটা খালি জায়গা তৈরি হয়। এই জায়গা পূরণ করার জন্য K কক্ষপথের বাইরের কক্ষপথ L বা M বা N কক্ষপথের ইলেকট্রন হুড়োহুড়ি করে ভেতরের দিকে যায়। বাইরের কক্ষপথের ইলেকট্রনের শক্তি ভেতরের কক্ষপথের ইলেকট্রনের শক্তির চেয়ে বেশি। তাই বাইরে থেকে ভেতরের কক্ষপথে গিয়ে জায়গা দখল করলে সেই ইলেকট্রন তার অতিরিক্ত শক্তি ত্যাগ করে। যে শক্তিটা ত্যাগ করে – সেটাই হলো এক্স-রে। এই শক্তি বহন করে কোয়ান্টাম কণা ফোটন। যাকে বলা হয় এক্স-রে ফোটন। এভাবে কোটি কোটি ইলেকট্রন মিথস্ক্রিয়া ঘটায় সেকেন্ডেরও কম সময়ের মধ্যে। এভাবে তৈরি হওয়া এক্স-রে কে বলা হয় ক্যারেক্টারিস্টিক এক্স-রে। এই ধরনের এক্স-রে’র শক্তি নির্দিষ্টমাত্রার থাকে। আরেক ধরনের এক্স-রেও তৈরি হয় একই সাথে – যার শক্তির পরিমাণ নির্দিষ্ট নয়। সেটা কীভাবে হয়? এই যে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলেকট্রন ফিলামেন্ট থেকে বের হয়ে প্রচন্ড বেগে ঝাঁপিয়ে পড়ে অ্যানোডের গায়ে, সেখানে পরমাণুর শক্তিস্তরের কোন ইলেকট্রনের সাথে যদি সংঘর্ষ না ঘটে তাহলে কী হয়? ইলেকট্রনগুলি তখন সব শক্তিস্তর অতিক্রম করে পরমাণুর নিউক্লিয়াসের দিকে অগ্রসর হয়। নিউক্লিয়াস ধনাত্মক চার্জযুক্ত। ঋণাত্মক ইলেকট্রন স্বাভাবিকভাবেই তার দিকে আকৃষ্ট হবে। কিন্তু নিউক্লিয়াস তো ইলেকট্রনকে কিছুতেই ভেতরে ঢুকতে দেয় না প্রয়োজনীয় শক্তি নেই বলে। তখন ইলেকট্রনের গতি বাধাপ্রাপ্ত হয়ে প্রচুর শক্তি বের হয়ে যায়। এই বের হয়ে যাওয়া শক্তিগুলিও এক্স-রে। এগুলিকে বলা হয় ব্রামস্টারলাং (জার্মান শব্দ – যার অর্থ ভেঙে যাওয়া বিকিরণ) এক্স-রে। এই ধরনের এক্স-রে’র পরিমাণই মূলত বেশি থাকে। তাহলে দেখা যাচ্ছে ইলেকট্রনের সাথে ইলেকট্রনের মিথস্ক্রিয়াতেই এক্স-রে তৈরি হয়। যত বেশি ইলেকট্রন – যত বেশি জোরে গিয়ে ধাক্কা দিতে পারবে তত বেশি এক্স-রে তত বেশি শক্তি নিয়ে তৈরি হবে। 

ক্যাথোড থেকে বেশি ইলেকট্রন তৈরি করার জন্য সেখানে টাংস্টেন ফিলামেন্ট ব্যবহার করা হয়। কারণ এই ফিলামেন্ট প্রায় আড়াই হাজার ডিগ্রি তাপমাত্রাতেও গলে না। আবার তার পারমাণবিক ভরও তুলনামূলক ভাবে বেশি (৭৪)। এক পরমাণু টাংস্টেনে ৭৪টি ইলেকট্রন থাকে। তাহলে এক ইঞ্চি ব্যাসের ফিলামেন্টে কোটি কোটি কোটি ইলেকট্রন থাকে। আবার অন্যদিকে অ্যানোডে টার্গেট হিসেবেও ব্যবহার করা হয় টাংস্টেন। এই অ্যানোড খুবই শক্ত এবং প্রায় ১৫ সেন্টিমিটার ব্যাসের ধাতব চাকতি যা মেশিন চালু অবস্থায় মিনিটে প্রায় কয়েক হাজারবার ঘুরতে পারে। এখানেও প্রচুর ইলেকট্রন। ফলে ফিলামেন্ট থেকে আসা ইলেকট্রনের সাথে অ্যানোডের ইলেকট্রনের ধাক্কা লাগার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। এরকম প্রচন্ড সংঘর্ষের ফলে প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয় এখানে। টাংস্টেন সেই তাপ সহ্য করতে পারে। 

এক্স-রে থেকে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ঘটে। এই বিকিরণ যেন ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য অনেক নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়। এক্স-রে টিউব থেকে উৎপন্ন এক্স-রে রোগীর শরীরে একদিকে প্রবেশ করে অন্যদিকে বের হয়ে যায়। বের হয়ে যাবার সময় এক্স-রে গুলিকে ইলেকট্রনিক ডিটেক্টরে ধারণ করা হয়। সেখান থেকেই মূলত রেডিওগ্রাফ তৈরি করা হয়। এক্স-রে রোগীর শরীরের ভেতর দিয়ে আসার সময় কিছু অংশ শরীরের হাড় ও মাংসে শোষিত হয়। কী পরিমাণ শোষিত হয়েছে তার হিসেব থেকেই মানুষের ভেতরের চিত্র তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়াগুলি এখন কম্পিউটার প্রযুক্তির মাধ্যমে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই হয়ে যায়। 

Monday 27 September 2021

মাসুদ রানা ০৪ - দুঃসাহসিক

 



আশি পৃষ্ঠার একটি ছোট্ট বই – পড়তে অনেকদিন লাগলো। আসলে সেভাবে একটানা পড়া হয়নি এটা। বাইরে ঠান্ডার কারণে ঘরের ভেতর হেঁটে হেঁটে বই পড়ার একটা পদ্ধতি কাজ করে কি না দেখছিলাম। মাসুদ রানা পড়া যায় সেভাবে। মোবাইলে পড়া। যদিও মাসুদ রানা সিরিজের প্রথম দিকের এই বইগুলি যখন লেখা হয় – তখন মোবাইল ফোন তো দূরের কথা – ইলেকট্রনিক্সেরও তেমন কোন উন্নতি হয়নি। 

চতুর্থ বই – দুঃসাহসিক। প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৭ সালে। আমার সমান বয়স এই বইটির। আমি আগে এই সিরিজের অনেকগুলি বই পড়েছিলাম। কিন্তু এখন কিছুই মনে নেই। মনে না থাকার ফলে মনে হচ্ছে সেই সময় পড়া কিংবা না পড়া একই ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো। 

এই বইটি সিরিজের খুব একটা সবল বই নয়। মাসুদ রানা বিশেষ এক মিশন নিয়ে ছদ্মবেশে হংকং যান। সেখান থেকে ম্যাকাও। হংকং-এর হোটেলে, শিপে, রাস্তায় মারামারি চলে। শেষে সে-ই জয়ী হয়। এবার তার চায়নিজ বান্ধবী জোটে। ঘটনায় খুব বেশি থ্রিলিং ছিল না। 

অবশ্য বইটি পড়তে পড়তে আমার নিজের দেখা হংকং-এর কিছুটা মনে পড়ে। হংকং রেসকোর্স, জাহাজঘাটা ইত্যাদি। 


Saturday 25 September 2021

স্বপ্নলোকের চাবি - পর্ব ৩৯

 


স্বপ্নলোকের চাবি – ৩৯

একটা ভ্যাপসা গন্ধ রুমের ভেতর। অনেকদিন বন্ধ থাকার কারণে রুমে তাজা বাতাস ঢুকতে পারেনি। তার উপর প্রচন্ড গরম পড়ছে। রুমের দেয়াল, মেঝে সবই কেমন যেন স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে আছে। জানালার সবগুলি পাল্লা খুলে দিলাম। বাইরে ঝকঝকে রোদ। সূর্য মাঝ-আকাশে উঠে গেছে। এই রোদ সরাসরি এখন রুমে ঢুকবে না। বাইরে খুব একটা বাতাস নেই। জুন মাসের তপ্ত দুপুর স্থির হয়ে আছে। 

মেঝেতে ছোট ছোট লাল পিঁপড়া ঘুরে বেড়াচ্ছে। চৌকির পায়ের ইটের হাইহিলে লেগে থাকা রক্ত আর ছিঁটেফোঁটা চামড়া কবেই খেয়ে ফেলেছে পিঁপড়েগুলি। তবুও এখনো ঘুরে বেড়াচ্ছে কেন কে জানে। 

মেঝে ডেটল দিয়ে ভালো করে মুছে ফেলা দরকার। দুটো টেবিলেই ধুলোর আস্তরণ। টেবিলফ্যানটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। যা গরম পড়ছে – এটাকে এখনই ত্যাগ করার সময় নেই, সামর্থ্যও নেই। তাই এটা দিয়েই কাজ চালাতে হবে। মোটা ইনসুলেটিং ট্যাপ নিয়ে এসেছি। এর পুরো বডি এমনভাবে ট্যাপ দিয়ে ব্যান্ডেজ করে দেবো যে ইলেকট্রিক শক দেয়ার কথা ভুলেই যাবে। 

ফ্লোর মুছে ফেললাম। ফ্যানে ট্যাপ লাগানোর পরও বেশ সাবধানে হ্যান্ডেল করছি ওটাকে। ফ্যানের বাতাসে ফ্লোর শুকিয়ে গেল দ্রুত। রুমে একটা তাজা ভাব চলে এলো। এবার একটু বইখাতা খুলে বসা উচিত। কিন্তু মনে হচ্ছে শরীরে এক ফোঁটাও শক্তি নেই আর। বিছানায় এলিয়ে পড়লাম। 

কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল দরজার শব্দে। চোখ খুলতেই মনে পড়লো – দরজা খোলা রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কে যেন বাইরে থেকে দরজা টেনে দিল। তাড়াতাড়ি উঠে দরজা খুলে দেখি – অজিত। চলে যাচ্ছিলো, শব্দ পেয়েই পেছনে ফিরলো। 

“দরজা খোলা রেখে ঘুমাচ্ছিলি! আরো ঘুমাবি?”

“না। হঠাৎ ঘুম চলে এলো।“

অজিত রুমে এসে বসলো খাটের উপর।

“তোর স্বাস্থ্য অনেক খারাপ হয়ে গেছে। ভালো করে খাওয়া-দাওয়া করতে হবে। পরীক্ষার তো আর মাত্র ছয় দিন আছে।“ 

মনে হচ্ছে আমার পরীক্ষা নিয়ে আমার চেয়েও তার টেনশান বেশি। পরীক্ষা যত কাছে আসতে থাকে, টেনশানের পরিমাণ ততই বাড়তে থাকে। পরীক্ষা ও টেনশানের মধ্যে সম্পর্কটা স্বাভাবিক নিয়মে বিপরীতানুপাতিক হবার কথা। পরীক্ষার দূরত্ব যত কমতে থাকবে, টেনশান তত বাড়তে থাকবে। কিন্তু আমি দেখলাম – আমার কোন টেনশানই হচ্ছে না। অজিতকে এটা বলার পর সে গোঁফের ফাঁকে “হোঁ হোঁ” করে একটু হেসে বললো, “টেনশান না হওয়া তো খুব ভালো। এই ক’দিন জাস্ট একটু দেখে নে। সব ঠিক হয়ে যাবে।“ অজিতের কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে সে আমার নয়, আমার ঠাকুরদার বন্ধু। 

অজিত এই বিল্ডিং-এর দোতলায় এসে উঠেছে দিন পনেরো আগে। তাদের অনার্স পরীক্ষা হয়ে যাবার পর সে হোস্টেল ছেড়ে শহরেই একটা মেসে উঠেছিল। এখন এখানে আসাতে আমার জন্য বিরাট সুবিধা হয়ে গেল। অনেকদিন পর বন্ধুর সাথে দেখা হলে এতদিনের জমা কথাগুলি সব একসাথে বের হয়ে আসতে চায় – আমারও সেরকম হচ্ছিলো। কিন্তু অজিত আমার সাথে এখন কথা বলতে কিংবা আমার কথা শুনতে রাজি নয়। সে তাড়াহুড়ো করে চলে গেল। সে আমাকে পড়ার টেবিলে বসাতে চায়।

২৭ জুন ফার্স্ট পেপার – অপটিক্‌স। জিওমেট্রিক্যাল অপটিক্‌স ছাড়া সিলেবাসে আর কী কী আছে তাও মনে পড়ছে না এখন। ছয়দিনে কতটুকুই আর পড়া যাবে? যাত্রাপালার পরাজিত রাজা যেভাবে বলে – “সমুদ্রে পেতেছি শয্যা, শিশিরে কী ভয়” – আমার অবস্থাও এখন অনেকটা সেরকম। সে কারণেই পরীক্ষার টেনশান একেবারেই উধাও হয়ে গেছে। 

মুকিতভাই এলেন একটু পরে। ছয় সপ্তাহের বিচিত্রা জমা হয়ে আছে। তিনি সেগুলি নিয়ে এসেছেন। মুকিতভাইয়ের সাথে গল্প করলাম কিছুক্ষণ। তিনিও আমার পরীক্ষার ব্যাপারে সচেতন। বেশ দ্রুতই প্রস্থান করলেন। আমি অপটিক্‌স বাদ দিয়ে বিচিত্রার পাতা উল্টাতে শুরু করলাম। 

ডাকসু নির্বাচন হয়ে গেছে জুনের ছয় তারিখ। এবার ছাত্রদল জিতেছে বেশিরভাগ আসনে। আমানুল্লাহ আমান ভিপি ও খায়রুল কবীর খোকন জিএস নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচিত হয়েই তারা এরশাদের বিরুদ্ধে জোরেশোরে আন্দোলন করার ঘোষণা দিয়েছেন। দেখা যাক – কী হয়। চাকসুর নির্বাচিত সর্বদলীয় নেতারা তো জাতীয় রাজনীতিতে ভূমিকা রাখা দূরে থাক – ক্যাম্পাসে শিবিরের বিরুদ্ধেই কিছু করতে পারছে না। 

জুনের ৮ তারিখ থেকে বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হয়ে গেছে ইতালিতে। এই এক মাস দেশে কোন আন্দোলন হবে না গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায়। সবাই এখন খেলা দেখা ও খেলা নিয়ে কথা বলায় ব্যস্ত। ঘরে ঘরে এখন ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার পতাকা। ব্রাজিল গ্রুপ-সি থেকে গ্রুপ-চ্যাম্পিয়ন হয়ে নক-আউট স্টেজে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে ২৪ তারিখ। আর বেচারা আর্জেন্টিনার অবস্থা এবার বেশ খারাপ। গ্রুপ-বি তে কোন রকমে পরের রাউন্ডে গেছে মাত্র তিন পয়েন্ট পেয়ে। শুধুমাত্র সোভিয়েত ইউনিয়নকে হারাতে পেরেছে তারা। ক্যামেরুনের কাছে হেরেছে, রোমানিয়ার সাথে ড্র করেছে। এখন সবার নজর ২৪ তারিখের খেলার দিকে। ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনা – কোন একটা দল বিদায় নেবে। 

আর সোভিয়েত ইউনিয়ন ফার্স্ট রাউন্ড থেকে বিদায় নিয়েছে – সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো সোভিয়েত ইউনিয়নের অস্তিত্বই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। মিখাইল গর্ভাচেভ সোভিয়েত ইউনিয়নের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বুশ গর্ভাচেভকে কী টোপ দিয়েছেন কে জানে – ঘন ঘন মিটিং করছেন দু’জনে। এদিকে দুই জার্মানি এক হয়ে যাচ্ছে আর এক সপ্তাহ পর- জুলাইয়ের এক তারিখ থেকে। পূর্ব-জার্মানি ও পশ্চিম-জার্মানির মধ্যবর্তী বার্লিন-দেয়াল ভেঙে ফেলা হচ্ছে। 

আমার হঠাৎ পৃথিবীর সবকিছু সম্পর্কে কৌতূহল দেখা দিচ্ছে, কিন্তু কিছুতেই পরীক্ষার পড়া পড়তে ইচ্ছে করছে না। এ কোন্‌ ঝামেলায় পড়লাম!

সময় চলে যাচ্ছে সময়ের নিয়মে। পড়ার টেবিলে জোর করে বসে থাকার চেষ্টা করছি। দুপুরে রান্না করি, পরদিন সকাল পর্যন্ত চলে যায়। রাতে ফুটবল খেলা দেখতে ছাদে চলে যাই। শিবিরের কর্মীরা টেলিভিশনের অন্য কোন প্রোগ্রাম দেখে না, কিন্তু খেলা দেখার জন্য আগেভাগে গিয়ে বসে থাকে। এখনো বৃষ্টি হচ্ছে না বলে ছাদে কোন টিভি দেখতে কোন অসুবিধা হচ্ছে না। বৃষ্টি হলে হয়তো মুকিতভাইয়ের রুমে দেখবে। খেলা সম্পর্কে আমার যে খুব একটা আগ্রহ আছে তা নয়। ভাবছি আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের খেলাটা দেখার পর আর দেখবো না। 

২৪ তারিখ রাতের খেলায় প্রচন্ড উত্তেজনা দেখা গেলো। আমাদের বিল্ডিং-এ ব্রাজিলের সমর্থক বেশি। কিন্তু আর্জেন্টিনার কাছে হেরে গেলো ব্রাজিল। বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হলো তাদের। আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে গেল। 

২৭ তারিখ দুপুরে ফার্স্ট পেপার পরীক্ষা হয়ে গেল। অপ্‌টিক্স - সোবহান স্যারের পেপার। টেনশান ছাড়া পরীক্ষা দেয়ার মধ্যে বিশেষ এক ধরনের আনন্দ পাওয়া যায়। আমার খুব ভালো লাগলো পরীক্ষা দিয়ে। 

পরীক্ষার আগে থেকে প্রদীপ নাথ আলাওল হলে উঠেছে। পরীক্ষার পর তার রুমে গিয়ে একটু ঘুরেও এলাম। আমাদের ক্লাসের সুকুমার আর কেমিস্ট্রির ননী তার রুমমেট। আলাওল হল সোহরাওয়ার্দী হলের চেয়ে অনেক সুন্দর। হাফিজও আলাওল হলে থাকে। হলের সামনে দেখা হয়ে গেল তার সাথেও। সে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, “পরীক্ষার সময় মাথা ছিলে ফেলে ভালো করেছিস।“ মাথার পেছনে ব্যান্ড-এইড লাগানো দেখে বললো, “বাহ্‌ ছিদ্রও করেছিস দেখছি। ছিদ্র করে ম্যাটেরিয়েল ঢুকিয়েছিস মগজে?” 

সেকেন্ড পেপার পরীক্ষা জুলাইয়ের ১৬ তারিখ। হাতে আঠারো দিন সময় আছে। এই সময়টা কাজে লাগাতে হবে। ফার্স্ট পেপার পরীক্ষা ঠিকমতো দেয়ার পর কিছুটা আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছি বলে মনে হচ্ছে। 

কিন্তু শরীর আবার ঝামেলা শুরু করেছে। আবার জ্বর এসেছে। আমি সাধারণত ডাক্তারদের এড়িয়ে চলতে পছন্দ করি। পারতপক্ষে তাদের চেম্বারের ধারে কাছেও যাই না। কিন্তু অজিত নিজেই অনেকটা স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ টাইপের মানুষ। বললো, “তোর টিটেনাস দেয়া দরকার। মনে হচ্ছে তোর মাথার ব্যথা থেকেই জ্বর আসছে।“ 

আমার অ্যান্টিবায়োটিক চলছে এখনো। ডাক্তারের কাছে এখন যাওয়ার দরকার নেই। কিন্তু অজিত কোন কথা শুনলো না, জোর করে ধরে নিয়ে গেল ডাক্তারের কাছে। তার কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে ডাক্তারদের প্রতি তার তীব্র একটা আকর্ষণ আছে। তার ইচ্ছে ছিল আমাকে শহরে নিয়ে গিয়ে ডাক্তার দেখায়। কিন্তু আমি পরীক্ষার দোহাই দেয়াতে চৌধুরী হাটের ডাক্তার শাহাদাত হোসেনে রাজি হয়েছে। রিকশা করে চৌধুরিহাট যাওয়ার সময় সে ক্রমাগত বলে চলেছে, “অসুখ না হলেও ডাক্তারের কাছে রেগুলার যাওয়া দরকার। একটা যন্ত্র যেরকম পরীক্ষা করে দেখা দরকার ঠিক আছে কি না, সেরকম আমাদের শরীরও তো একটা যন্ত্র।“ 

কানের কাছে উপদেশের যে যন্ত্রণা চলছে – যন্ত্র না বলার সাহস হলো না। তার কথাগুলি পরপর লিখে ফেললে শরীরের যত্ন বিষয়ক প্রবন্ধ হয়ে যেতো।  

ডাক্তার শাহাদাত হোসেন বললেন আমার আর কোন নতুন চিকিৎসার দরকার আপাতত নেই। ফিরে আসার সময় অজিতকে বললাম, “কোন দরকার ছিল না। শুধু শুধু নিয়ে এলি।“

“অবশ্যই দরকার ছিল। শরীরের ব্যাপারে সবসময় ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া উচিত।“ 

কোরবানের ছুটি শুরু হয়েছে। অজিত বাড়িতে গেছে। মুকিতভাইও বাড়িতে চলে গেছেন। আমি নিজের মতো করে পরবর্তী সাতটি পেপারের অত্যন্ত সিলেকটিভ কিছু অংশ রেডি করছি আস্তে আস্তে পরীক্ষার জন্য। যীশু আর প্রদীপ নাথ আসে প্রত্যেক পেপারের আগে কী কী পড়ছি তা ঠিক করে নিতে। 

জুলাইর শুরুতেই পশ্চিম জার্মানি আর পূর্ব জার্মানি এক হয়ে গেছে। জুলাইয়ের দুই তারিখ মক্কায় হজ্ব করার সময় একটি টানেলের মধ্যে ভীড়ে হুড়োহুড়িতে পদদলিত হয়ে মর্মান্তিকভাবে মারা গেছেন প্রায় চৌদ্দ শ হাজী। কেমিস্ট্রির হারুনভাইর খুব মন খারাপ করে আছেন। তাঁর কোন আত্মীয় এবার হজ্বে গেছেন। এখনো তাঁর খবর পাওয়া যায়নি। 

আট তারিখ রাতে বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল খেলা দেখলাম রাত আড়াইটা পর্যন্ত। বিশ্বকাপ ১৯৯০ গেলো পশ্চিম জার্মানির ঘরে। একটু টেকনিক্যাল সমস্যাও হয়ে গেল। বিশ্বকাপ শুরুর সময় দেশটি ছিল পশ্চিম জার্মানি। অথচ এই  জুলাইয়ের এক তারিখ থেকে পূর্ব-পশ্চিম এক হয়ে দেশটি এখন শুধু জার্মানি। সে যাই হোক, আর্জেন্টিনার সাথে পেনাল্টি শটে গোল করেছে তারা। বিশ্বকাপ ফাইনাল হিসেবে খুব একটা ভালো খেলা হয়নি। আর্জেন্টিনার সেকেন্ড রাউন্ডে উঠা অনিশ্চিত ছিলো। সেখানে তারা রানার্স আপ হয়ে গেল। কিন্তু রেফারির আচরণ নিরপেক্ষ ছিল বলে মনে হলো না। পৃথিবীব্যাপী যেকোনো ব্যাপারেই রেফারীদের এই সমালোচনা সইতে হয়। 

 বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন কী যে হচ্ছে বোঝা যাচ্ছে না। এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে এখন আট, সাত, আর পাঁচ দলীয় জোট একসাথে আন্দোলন করছে। কিন্তু সরকারের তেমন কোন হেলদোল হচ্ছে না। ১৫ জুলাই জনতা মুক্তি পার্টি নামে আরেকটি নতুন রাজনৈতিক দল জন্ম নিয়েছে। মীর্জা সুলতান রাজা এই দলের আহ্‌বায়ক, আর মাহমুদুর রহমান মান্না যুগ্ম আহ্‌বায়ক। মান্না সাহেব ডাকসুর ভিপি ছিলেন এক সময় – সে হিসেবে কিছুটা পরিচিত। কিন্তু মীর্জা সুলতান রাজার নাম আগে কখনো শুনিনি। 

এই সময় আমার এসব রাজনীতির খবরাখবর না পড়ে পরীক্ষার পড়া পড়া উচিত জানি। কিন্তু কী করবো – চোখের সামনে রিলেটিভিটির বই আর বিচিত্রা এক সাথে থাকলে কোন এক বিচিত্র কারণে বিচিত্রার দিকে চোখ যায়। 

১৬ জুলাই সেকেন্ড পেপার রিলেটিভিটি পরীক্ষা হয়ে গেল। এবার আর বেশি গ্যাপ নেই। ২২ তারিখ থার্ড পেপার – ইলেকট্রোডায়নামিক্স, আর ২৮ তারিখ ইলেকট্রনিক্স পরীক্ষা হয়ে গেল। পরীক্ষা কেমন হচ্ছে চিন্তাও করছি না। যেরকম সিরিয়াস হয়ে পরীক্ষা দেয়া দরকার সেরকম কিছু হচ্ছে না। অজিত বাড়ি থেকে আসার পর থেকে আমার পেছনে লেগে আছে। রুমের বাইরে ঘুরঘুর করছি দেখলেই কথা আছে বলে রুমে ডেকে নিয়ে আসে। সে অনার্সের সিলেবাসের কোন কিছুই বাদ দেয়নি। সবকিছুই সে পড়েছে এবং ভালো করেই মনে আছে সব। কলেজে অনার্স না পড়ে সে যদি ইউনিভার্সিটিতে অনার্স পড়তো – তার রেজাল্ট আরো অনেক ভালো হতো। সে আমার সাথে পড়ার বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। আমি বুঝতে পারি সে আমার মগজে ফিজিক্স ঢুকিয়ে দিচ্ছে – কিন্তু ভালোই লাগে। সে খুব ভালো বোঝাতে পারে। ইলেকট্রনিক্স পরীক্ষার আগের সন্ধ্যায় তার রুমে বসে বসেই পড়াশোনা করলাম। 

ইলেকট্রনিক্স, কোয়ান্টাম মেকানিক্স, নিউক্লিয়ার ফিজিক্স আর সলিড স্টেট ফিজিক্স মাস্টার্সেও আছে। এই পরীক্ষাগুলির প্রস্তুতি নেয়ার সময় অজিত যে আমাকে কীভাবে সাহায্য করেছে তা বলে বোঝানো যাবে না। সে টপিকগুলি আমার কাছে এমনভাবে ব্যাখ্যা করছিলো যেন সে নিজের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অথচ সেগুলি আমারই পরীক্ষার টপিক। 

অবশেষে আগস্টের ২১ তারিখ আমার তত্ত্বীয় পরীক্ষা শেষ হলো। দুই মাস লাগলো থিওরি পরীক্ষা শেষ হতে। প্র্যাকটিক্যাল আর ভাইভা হতে আরো দুই মাস। 

প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার জন্য প্র্যাকটিস শুরু হলো সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি। প্রদীপ নাথ আলাওলের ১০৪ নম্বর রুমে থাকে। আমি আর যীশুও গিয়ে উঠলাম সেখানে। ছোট্ট দু’জনের রুমে তারা আগে থেকেই তিনজন থাকতো। আমরা দু’জনসহ হলাম পাঁচজন। সুজন হলে নাকি তেঁতুল পাতাতেও নয়জনের জায়গা হয়ে যায়। আমাদেরও জায়গা হয়ে গেল। পুরো এক সপ্তাহ ধরে প্র্যাকটিক্যাল প্র্যাকটিস করলাম। আর হলে ইচ্ছামতো গল্পগুজব করলাম সবাই মিলে। হাফিজ তো আলাওলেই থাকে। ফারুক থাকে এফ রহমানে। সেও চলে আসে আড্ডা মারার জন্য। আড্ডায় যে কী সুখ তা যারা আড্ডা মারে না – তারা বুঝবে না। 

অবশেষে অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা ও ভাইভার ডেট দেয়া হয়েছে। আমার ভাইভা ১১ তারিখ, আর প্র্যাকটিক্যাল তেরো-চৌদ্দ। কিন্তু এগারো তারিখ সারাদেশে হরতাল ডেকেছে আট, সাত ও পাঁচ দল। এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরদার হচ্ছে। ডাক্তাররা সবাই আন্দোলন করছেন প্রস্তাবিত স্বাস্থ্যনীতি বাতিলের দাবিতে। এরশাদ আইন করে সরকারি ডাক্তারদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করতে চাচ্ছেন। 

এগারো তারিখ হরতালের কারণে বাস-ট্রেন সব বন্ধ। পরীক্ষা হবে কি হবে না কিছু জানি না। সকালে রেললাইন ধরে হেঁটে ক্যাম্পাসে গেলাম। যাদের প্র্যাকটিক্যাল ছিল – তাদের প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা হয়ে গেল। কিন্তু হরতালের কারণে এক্সটার্নাল এক্সামিনার আসতে পারেননি বলে ভাইভা হলো না। পরে কখন হবে এখনো জানি না।

থার্ড ইয়ারের প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা বিশাল লম্বা। মোট ১০০ নম্বরের প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা হয় দুই দিনে। প্রতিদিন ছয় ঘন্টা করে বারো ঘন্টা সময়। এক দিনে একটা করে এক্সপেরিমেন্ট করতে হয়। প্রথমদিন ইলেকট্রনিক্সে আমার লটারিতে উঠলো ‘স্টাডি অব অ্যা পাওয়ার সাপ্লাই’। মূলত ট্রান্সফর্মার। এই বস্তু কীভাবে কাজ করে তা জানি। কিন্তু পরীক্ষার সময় যে যন্ত্রপাতি দেয়া হয়েছে তা আমার সাথে এমন ব্যবহার শুরু করলো যেন আমি তার চিরশত্রু। একটা পাঠও ঠিকমতো নিতে পারলাম না। এর মধ্যে প্রামাণিকস্যার ভাইভা নিতে এসে এমন উল্টোপাল্টা প্রশ্ন করতে শুরু করলেন, যেটুকু থিওরি জানা ছিল সেটুকুও এলোমেলো হয়ে গেলো। প্রামাণিকস্যারের সাথে সাথে আমি নিজেও বুঝতে পারলাম যে ইলেকট্রনিক্সের অ-আ-ক-খ কিছুই আমার জানা নেই। 

পরের দিন ১৪ অক্টোবর প্র্যাকটিক্যালের সেকেন্ড পার্ট – অপটিক্‌স। পোলারিমিটারের সাহায্যে সুগার সলিউশানের স্পেসিফিক রোটেশান বের করতে হবে। পানির মধ্যে চিনি মেশাতে হবে একটা পর্যায়ে। পরে কতটুকু চিনি মেশানো হলো তার ভর বের করতে হবে। পোলারিমিটারের খুবই প্রাগৈতিহাসিক পরীক্ষণ। এই পদ্ধতিতে কাজ করা হতো সম্ভবত উনবিংশ শতাব্দীতে। মনে হলো সবকিছু ঠিকমতোই করলাম যা যা করতে হয়। ভাইভা নিতে এলেন সোবহানস্যার। তিনি আমার খাতার রিডিং দেখে ডানে-বাঁয়ে মাথা নাড়েন পেন্ডুলামের মতো। “সুগারের কোয়ান্টিটি কি ওরা বলে দিয়েছে তোমাকে?”

কারা বলে দেবে? ল্যাব-সহকারী যারা যন্ত্রপাতি সাপ্লাই করেছেন, তাঁরা? আমি তাঁদের সাহায্য কেন নেবো? স্যার কি আমার সততার ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করছেন? 

“না স্যার, কেউ কিছু বলেনি। আমি পরীক্ষার ডাটা থেকে হিসেব করে বের করেছি।“

“তোমার উত্তর তো সঠিক হয়নি। কীভাবে নম্বর দিই তোমাকে?”

“আপনি ডাটা দেখুন স্যার। এই পোলারিমিটারের রিডিং দেখেন।“

পোলারিমিটারের রিডিং-এর প্রতি স্যারের কোন আগ্রহ দেখা গেল না। তিনি কাগজে কিছু একটা লিখে নিয়ে এসেছেন। সম্ভবত কতটুকু চিনি দেয়া হয়েছে তা লেখা আছে সেখানে। স্যার আমাকে আর কোন প্রশ্ন না করে চলে গেলেন। আমি বুঝতে পারলাম না পাস করলাম, না ফেল করলাম। অনার্সের সবগুলি পরীক্ষা পরীক্ষা দিয়ে ফেললাম কোন ধরনের টেনশান ছাড়া। আর আজ প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার শেষে আমার সেই টেনশানটা ফিরে এলো। প্র্যাকটিক্যালে ফেল করিয়ে দিলেই কিন্তু আমি একেবারে ফেল। আমাকে আবার সবগুলি পরীক্ষা আগামীবছর দিতে হবে। স্যাররা কী কারণে শিক্ষার্থীদের টেনশান দিতে পছন্দ করেন আমি জানি না। 

যাই হোক, জেনারেল ভাইভাটা হয়ে গেলেই অনার্স পরীক্ষা শেষ। আমার জেনারেল ভাইভা প্রথমদিন হওয়ার কথা ছিল। হরতালের কারণে হয়নি। এক্সটার্নাল কিন্তু এর পরেও আসতে পারেননি। জেনারেল ভাইভা আমাদের স্যাররাই নিয়ে নিচ্ছেন। 

পরদিন ডিপার্টমেন্টে গেলাম ভাইভা কখন হবে জানতে। আমাদের পরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান নুরুল মোস্তফাস্যার। তিন তলায় স্যারের রুমের সামনে দাঁড়াতেই স্যার রুম থেকে বের হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “অ্যাই ছেলে, ভাইভা দিয়েছো?”

“না স্যার”

“আসো, ভাইভা দিয়ে যাও।“

স্যারের রুমে ঢুকলাম। আহমদ হোসেনস্যার বসে আছেন সেখানে। মনে মনে ভয় পাচ্ছিলাম ইলেকট্রনিক্স থেকে কিছু জিজ্ঞেস করলেই তো আমি শেষ। আহমদ হোসেনস্যারের প্রিয় বিষয় ইলেকট্রনিক্স। কিন্তু তিনি সব প্রশ্ন করলেন অ্যাটমিক ফিজিক্স থেকে। আর নুরুল মোস্তফাস্যার প্রশ্ন করলেন নিউক্লিয়ার ফিজিক্স থেকে। উৎরে গেলাম। 

জুনের ২৭ তারিখ থেকে শুরু হয়ে অক্টোবরের ১৫ তারিখ শেষ হলো। প্রায় চার মাস লাগলো অনার্সের থার্ড ইয়ারের পরীক্ষা সম্পন্ন করতে। শুনেছি বিদেশে নাকি এই সময়ের মধ্যে একটা সেমিস্টারের পড়াশোনা, পরীক্ষা, রেজাল্ট সব হয়ে যায়। 

Thursday 23 September 2021

মেলবোর্নের লজ্জা

 

করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে চমৎকার পারদর্শিতা দেখিয়ে বিশ্বে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল অস্ট্রেলিয়া। বিশ্বের প্রধান বিশেষজ্ঞদের অনেকেই করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে অস্ট্রেলিয়াকে অনুসরণ করার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন এই সেদিনও। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহের চিত্র দেখলে যে কারোরই মনে প্রশ্ন জাগবে এত দীর্ঘদিন ধরে, এত কঠোর লকডাউন, আর কারফিউর মধ্যেও সংক্রমণ দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে কেন?

আজকের (২৩/৯/২০২১) অস্ট্রেলিয়ান কোভিড পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যায় – পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে ভেবে আত্মতৃপ্তি পাবার মতো অবস্থা নেই এখন। গত ২৪ ঘন্টায় অস্ট্রেলিয়ায় প্রায় ১৭০০ নতুন সংক্রমণ ঘটেছে। যার মধ্যে ৫১০ জনের সংক্রমণ কীভাবে ঘটেছে তা অনিশ্চিত। এখনো প্রায় বিশ হাজার জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে করোনা ভাইরাস আছে। দেড় হাজারেরও বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি। অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় সংক্রমণের শতকরা হার হয়তো অনেক কম। কিন্তু বিশাল মহাদেশের সমান এই দেশে যেখানে মাত্র দুই কোটি চল্লিশ লাখ মানুষের বাস, সেখানে তো নিয়মকানুন মেনে চললে একটা সংক্রমণও হবার কথা ছিল না।


অস্ট্রেলিয়ার করোনা-চিত্র (২৩/৯/২০২১)

করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে অস্ট্রেলিয়ার ছয়টি স্টেট আর দুইটি টেরিটরির মধ্যে সবচেয়ে কঠোর নিয়মকানুন বলবত আছে ভিক্টোরিয়া রাজ্যে। মেলবোর্ন যার রাজধানী। পরপর সাত বছর এই মেলবোর্ন শহর পৃথিবীর সবচেয়ে বাসযোগ্য শহর ছিল। কিন্তু মেলবোর্ন তার সেই অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি। এখনো বিশ্বের প্রথম দশটি বাসযোগ্য শহরের একটি – মেলবোর্ন। কিন্তু সেই অবস্থানও কতদিন থাকবে জানি না। 

এক বছরেরও বেশি হয়ে গেল আমরা মেলবোর্নে লকডাউনে আছি। কয়েক সপ্তাহ আগে আমাদের সংক্রমণ শূন্যে নেমে এসেছিল। কিন্তু তারপর থেকে সংক্রমণ হঠাৎ বাড়তে শুরু করে। জানা গেলো কিছু মানুষ গোপনে গোপনে একে অন্যের বাসায় গিয়েছে, বাজারে গিয়েছে, কোভিডের লক্ষণ থাকা সত্ত্বেও তা গোপন করে নিজেদের পরিবারে, বন্ধুদের পরিবারে এবং কমিউনিটিতে ছড়িয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি যারা সংক্রমণের শিকার হয়েছে তারা সবাই শিশু। মোট সংক্রমিত মানুষের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি শিশু। যাদের বয়স ১৫ বছরের কম। যদিও তাদেরকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়নি, কিন্তু স্কুল বন্ধ রাখতে হয়েছে। কিছুদিনের জন্য পার্ক, শিশুদের খেলার জায়গা সব বন্ধ করে দিতে হয়েছে।

বিধিনিষেধ না মানলে পাঁচ হাজার ডলারেরও বেশি জরিমানা করেও সংক্রমণ কমানো যাচ্ছে না। আজকের  (২৩/৯/২০২১)  ভিক্টোরিয়া রাজ্যের সংক্রমণের পরিসংখ্যান দেখা যাক।


ভিক্টোরিয়া রাজ্যের কোভিডচিত্র (২৩/৯/২০২১)

গত চব্বিশ ঘন্টায় ৭৬৬ জন মানুষ সংক্রমিত হয়েছে। অথচ কঠোর লকডাউন এবং কারফিউ চলছে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে। বাড়ি থেকে পাঁচ কিলোমিটারের বাইরে যাবার অনুমতি নেই, বাড়ির দরজার বাইরে যেতেও মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক।

শুধু বিধিনিষেধ আছে, তা তো নয়। আর্থিক সাহায্যও আছে – ঘরে বসে থাকার জন্য। কোভিড টেস্ট করালে ৪৫০ ডলার দেয়া হচ্ছে – রেজাল্ট পাবার আগপর্যন্ত বাসায় থাকার জন্য। তারপরও সংক্রমণ বাড়ছে কেন?

দেখা গেলো নির্মাণশ্রমিকরা তাদের সুযোগের অপব্যবহার করছে। যত সংক্রমণ হচ্ছে তার অর্ধেকেরও বেশি হচ্ছে নির্মাণ শ্রমিকদের মধ্যে। সংক্রমণ একেবারে শূন্যে নামিয়ে আনা আর কিছুতেই সম্ভব নয়। আগের মতো স্বাভাবিক জীবনে আর কখনোই ফিরে যাওয়া যাবে না। এখন যেটা হবে – সেটা হবে নতুন স্বাভাবিক। নতুন স্বাভাবিকে যাবার জন্য দরকার কমপক্ষে শতকরা আশি ভাগ মানুষের টিকা নিয়ে ফেলা। সেজন্য কাজে যাবার শর্ত হিসেবে টিকা নেয়া বাধ্যতামূলক করা খুবই গ্রহণযোগ্য একটা সিদ্ধান্ত।

কিন্তু কিছু কিছু মানুষ অতিস্বাধীনতায় বিশ্বাসী। তারা দাবি করতে শুরু করেছে, “আমার শরীর আমার সিদ্ধান্ত”। খুবই ভালো কথা। কিন্তু তোমার পারমিশান নিয়ে তো ভাইরাস তোমার শরীরে ঢুকছে না। তুমি যখন আরেকজনের শরীরে ভাইরাস ঢুকতে সাহায্য করছো – তা কী তোমার সিদ্ধান্ত? তুমি যখন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হবে – তখন তোমার চিকিৎসার কী হবে?

নির্মাণশ্রমিকদের জন্য টিকা বাধ্যতামূলক করার সাথে সাথেই তারা ধুন্ধুমার লাগিয়ে দিয়েছে। তাদের কেউ কেউ প্রকাশ্যে ঘোষণা দিলো – তারা টিকা নেবে না, মাস্কও পরবে না। যা খুশি তাই করবে, কে কী করতে পারবে?

দু’দিন আগে তারা মেলবোর্ন শহরের প্রাণকেন্দ্রে শ্রমিকদের সংগঠনের প্রধান কার্যালয় ভাঙচুর করেছে। রাস্তা দখল করে ইচ্ছেমতো গাড়ি ভেঙেছে। পুলিশের উপর আক্রমণ করেছে।


স্রাইন অব রিমেম্বারেন্সে প্রতিবাদের নামে তান্ডব চালাচ্ছে

 
গতকাল তারা শ্রাইন অব রিমেম্বারেন্স – যুদ্ধে শহীদদের সম্মানে যেটাকে আমাদের দেশের শহীদ মিনারের মতো সম্মান দেয়া হয় – তাতে উঠে প্রতিবাদের নামে ইচ্ছেমতো ময়লা ঢেলেছে। এই শহীদ বেদীর দেয়ালে প্রশ্রাব করেছে। মেলবোর্নের জন্য এর চেয়ে লজ্জাকর আর কী হতে পারে?

আজ এরা চড়াও হয়েছে স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর। কমপক্ষে দুইটি টিকাকেন্দ্রে এরা আক্রমণ করেছে। কর্তব্যরত নার্সদের অপমান করেছে, থুতু ছিটিয়েছে। টিকাকেন্দ্রদুটো সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে হয়েছে। 

আমি ভাবতাম রাষ্ট্র যখন একজন নাগরিককে তার মৌলিক চাহিদাগুলি মিটিয়ে অন্যান্য যৌগিক চাহিদাগুলিও মেটাতে সক্ষম হয়, তখন নাগরিকও তার দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করে। কিন্তু মানুষের চাহিদা এমন একটা ব্যাপার – যেটা কেবল বাড়তেই থাকে। এখানেও তা দেখলাম।

স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনার নিন্দা করছে সবাই। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো – এরকম মানসিকতা তৈরি হলো কীভাবে এদের? এটা কি এদেশে গুরু পাপে লঘু দন্ড দেয়া হয় সেজন্য?

দেখা যাক – এই পরিস্থিতির শেষ কীভাবে হয়। 


Tuesday 21 September 2021

মাকড়শার জাল - ইস্পাতের চেয়েও শক্ত

 


সান্‌-বাঁধা মোর আঙিনাতে

           জাল বুনেছি কালকে রাতে,

            ঝুল ঝেড়ে সব সাফ করেছি বাসা।

            আয় না মাছি আমার ঘরে,

            আরাম পাবি বসলে পরে,

            ফরাশ পাতা দেখবি কেমন খাসা!

সুকুমার রায়ের ‘মূর্খ মাছি’ কবিতায় আমরা দেখেছি মাকড়শা মাছিকে এরকম লোভ দেখিয়ে তার জালে টেনে আনছে। ‘হাওয়ায় দোলে জালের দোলা, চারদিকে তার জান্‌লা খোলা’ মাকড়শার জাল আমরা সবাই দেখেছি। বাড়ির আনাচে-কানাচে, ঘরের কোণে, অনেকদিন হাত না দেয়া বইয়ের তাকে – সব জায়গায়। ভালো করে খেয়াল করলে আমরা দেখতে পাবো – বিভিন্ন রকমের মাকড়শা বিভিন্ন নকশার জাল বুনে। এই মাকড়শার জাল আমরা  চাইলেই খুব সহজে পরিষ্কার করে ফেলতে পারি। কিন্তু যদি বলা হয় যে মাকড়শার জাল সঠিকভাবে তুলনা করলে ইস্পাতের চেয়েও শক্ত এবং মজবুত – বিশ্বাস হবে? অবিশ্বাস্য মনে হলেও – ব্যাপারটা সত্যি।

মাকড়শা নিজের শরীর থেকে রেশমের মত সুতা বের করে জাল তৈরি করে বিভিন্ন নকশার। এই জালগুলির নির্দিষ্ট জ্যামিতিক আকার আছে, উদ্দেশ্য আছে। সাধারণ ধারণা থেকে আমরা সবাই জানি মাকড়শা এই জাল দিয়ে খাবার জোগাড় করে। তাদের জালে পোকামাকড় আটকে পড়ে, আর মাকড়শা তাদের খায়। বিজ্ঞানীরা অনেক বছর ধরে গবেষণা করে মাকড়শার জাল সম্পর্কে এমন সব বৈজ্ঞানিক তথ্য আবিষ্কার করেছেন যা অত্যন্ত চমকপ্রদ। মাকড়শার জালে রয়েছে একটুখানি জীববিজ্ঞান, একটুখানি রসায়ন এবং অনেকখানি পদার্থবিজ্ঞান।

মাকড়শার শরীরের নির্দিষ্ট গ্রন্থি থেকে জাল তৈরির তরল উপাদান বের হয়। বাতাসের সংস্পর্শে এসেই তা বিশেষ ধরণের সূক্ষ্ম সুতায় পরিণত হয় যা দিয়ে মাকড়শা জাল তৈরি করে। মাকড়শার গ্রন্থিগুলি শরীর থেকে প্রোটিন সংগ্রহ করে এই সুতার উপাদান বানায়। এই উপাদানের প্রক্রিয়াটা রসায়নের অন্তর্ভুক্ত। প্রোটিন মূলত অ্যামিনো এসিড যা কার্বন, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন ও অক্সিজেনের রাসায়নিক শিকল। মাকড়শার জালের এই রাসায়নিক শিকল খুবই লম্বা। এই শিকল তৈরি হয় দুটো সবচেয়ে ছোট আকারের অ্যামিনো এসিড – অ্যালানিন (C3H7NO2) ও গ্লাইসিন (C2H5NO2)। অ্যালানিন কৃস্টাল আকারে একটার সাথে একটা খুব শক্তভাবে লেগে থাকে এবং জালের গঠনকে মজবুত করে। আর মাকড়শার জালের অত্যাশ্চর্য স্থিতিস্থাপকতা আসে গ্লাইসিন অণু থেকে। পরপর পাঁচটি গ্লাইসিন অণু আর তার সাথে অ্যালানিন যোগ হয়ে অনেকটা স্প্রিং-এর মতো কুন্ডলী পাকিয়ে লম্বা মজবুত জৈব-সুতা তৈরি হয়। এগুলিই মাকড়শার জালের উপাদান।

মাকড়শা তাদের জাল দিয়ে অনেক ধরনের কাজ করে। জালে আটকা পরা শিকারকে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে নির্জীব করে ফেলার জন্য এক ধরনের সুতা। শিকার জালে পড়লে লাফিয়ে যেন চলে যেতে না পারে সেজন্য আরেক ধরনের সুতা, নিজের জাল থেকে নিজে যেন পড়ে না যায় সেজন্য নিরাপত্তা সুতা, জাল থেকে সুতা বেয়ে ঝুলতে ঝুলতে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাবার জন্য এক ধরনের সুতা, বাসা বানানোর জন্য এক ধরনের সুতা, ডিম পাড়ার জন্য এক ধরনের সুতা, আবার বংশ-বৃদ্ধির জন্য সঙ্গীর সাথে মিলিত হবার জন্য বিশেষ ধরনের সুতা। মাকড়শা বিভিন্ন রাসায়নিক শিকলে প্রয়োজনমত অ্যামিনো এসিডের অনুপাত পরিবর্তন করে এসমস্ত বিভিন্ন ধরনের সুতা তৈরি করতে পারে। বিভিন্ন ধরনের সুতা তৈরির জন্য বিভিন্ন ধরনের গ্রন্থি থাকে মাকড়শার শরীরে। শিকার ধরার জন্য যে সুতা তৈরি করে সেই সুতার স্থিতিস্থাপকতা এত বেশি যে স্বাভাবিক দৈর্ঘ্যের চেয়ে টেনে চারগুণ লম্বা করলেও এই সুতা ছিঁড়ে না। মাকড়শা জালের চারপাশে এবং মাঝখানে যে নিরাপত্তা সুতা ব্যবহার করে তাকে ড্র্যাগলাইন সিল্ক বলা হয়। মাকড়শাকে কেউ আক্রমণ করলে মাকড়শা এই মোটা সুতা বেয়ে পালায়। এই সুতাগুলিতে গ্লাইসিন অণু শিকলে পরপর আট থেকে নয় বার করে থাকে। ফলে এই সুতাগুলি টেনে শতকরা ৩০ ভাগ পর্যন্ত লম্বা করলেও ছিঁড়ে না। ইস্পাতের তারকেও টেনে এতদূর পর্যন্ত লম্বা করা যায় না। তার আগেই ইস্পাতের তার ছিঁড়ে যায়।

মাকড়শার জালের সুতা ইস্পাতের তারের চেয়েও শক্ত ও মজবুত তা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। কোন্‌ সুতা কত শক্ত তা হিসেব করার পদ্ধতি হলো সেটা কী পরিমাণ চাপ সহ্য করতে পারে তার উপর। এই চাপ হলো প্রতি একক ক্ষেত্রফলের উপর কী পরিমাণ বল প্রয়োগ করা হয় তার পরিমাণ। যে সুতা যত বেশি চাপ সহ্য করতে পারে সেই সুতা তত শক্ত। সবচেয়ে শক্ত ইস্পাতের তার দুই হাজার মেগা প্যাসকেল চাপ সহ্য করতে পারে। এর বেশি হলে ইস্পাতের তার ছিঁড়ে যায়। মাকড়শার জালের সুতাও এরকম বা এর চেয়ে বেশি চাপ সহ্য করতে পারে। ইস্পাত ও মাকড়শার জালের তুলনা করতে হলে আমাদের আরো কিছু ধর্মের তুলনা করতে হবে। ইস্পাতের ঘনত্ব মাকড়শার জালের ঘনত্বের চেয়ে অনেক বেশি। এক বর্গ মিলিমিটার প্রস্থচ্ছেদ বিশিষ্ট এক মিটার লম্বা স্টিলের তারের ভর প্রায় ৮ গ্রাম। অথচ একই প্রস্থচ্ছেদ ও এক মিটার লম্বা মাকড়শার জালের সুতার ভর মাত্র ১.৩ গ্রাম। ৮ গ্রাম ভরের এক মিটার লম্বা একটি স্টিলের তার ২০০০ নিউটন  পর্যন্ত বল সহ্য করতে পারে। তার বেশি হলে ছিঁড়ে যায়। সেই একই পরিমাণ বল সহ্য করতে পারে মাত্র ১.৩ গ্রাম ভরের মাকড়শার জালের সুতা। এখন যদি ৮ গ্রাম ভরের মাকড়শার জাল নেয়া হয় – সেই সুতা ১২০০০ নিউটন অর্থাৎ ইস্পাতের তারের ছয়গুণ বল সহ্য করতে পারে।

মাকড়শার জালের চেয়েও বেশি শক্ত সুতা আছে। যেমন কার্বন ফাইবার প্রায় চার হাজার মেগা প্যাসকেল চাপ সহ্য করতে পারে। কিন্তু কার্বন ফাইবার শক্ত হলেও তেমন ঘাতসহ নয় বা মজবুত নয়। মজবুত বা টাফনেস মাপা হয় কীভাবে? টাফনেস হলো প্রতি একক ভরে কী পরিমাণ শক্তি শোষণ করেও টিকে থাকতে পারে। ইস্পাতের তার প্রতি কিলোগ্রামে চার হাজার জুল শক্তি শোষণ করেও টিকে থাকে থাকতে পারে। কার্বন ফাইবার প্রতি কিলোগ্রামে চল্লিশ হাজার জুল শক্তি শোষণ করে টিকে থাকতে পারে। কিন্তু মাকড়শার জাল প্রতি কিলোগ্রামে প্রায় এক লক্ষ চল্লিশ হাজার জুল শক্তি শোষণ করেও টিকে থাকতে পারে।

পরীক্ষা করে দেখা গেছে মাকড়শার জাল অনেক উচ্চ-তাপমাত্রা (১৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) এবং অনেক নিম্ন তাপমাত্রা (-৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) সহ্য করতে পারে। বিজ্ঞানীরা আরো পরীক্ষা করে দেখেছেন যে বিভিন্ন আকৃতির জালে বিভিন্ন ধরনের শব্দ-তরঙ্গ সৃষ্টি হয়। অতিসম্প্রতি তাইওয়ানের বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন যে মাকড়শার জালের উপাদান ব্যবহার করে জৈবকোষীয় লেন্স তৈরি করা সম্ভব। জার্নাল অব অ্যাপ্লাইড ফিজিক্সে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে ট্যামক্যাং ইউনিভার্সিটি ও ইয়াং-মিং ইউনিভার্সিটির গবেষকরা মাকড়শার জালের উপাদান থেকে লেন্স তৈরি করে সেখানে বিশেষ ধরনের লেসার প্রয়োগ করে দেখেছেন যে এই লেন্স অত্যন্ত উচ্চ রেজ্যুলেশনের ইমেজ বা ছবি তৈরি করতে সক্ষম। অদূর ভবিষ্যতে বিজ্ঞানের অনেক শাখায় মেকানিক্যাল ইমেজিং এর পরিবর্তে বায়োলজিক্যাল ইমেজিং ব্যবহার করা হবে। মাকড়শার জাল থেকে তৈরি লেন্স সেখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে বলে আশা করা যায়। বুঝাই যাচ্ছে মাকড়শার জাল দেখতে নরম মনে হলেও আসলে ইস্পাতের চেয়ে মজবুত, বৈজ্ঞানিকভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিস।

তথ্যসূত্র: 

1.     Stephen D. Hudson, Vladimir Zhurov, Vojislava Grbic´, Miodrag Grbic´, and Jeffrey L.   Hutter, 'Measurement of the elastic modulus of spider mite silk fibers using atomic force       microscopy', J. Appl. Phys. 113, 154307 (2013); https://doi.org/10.1063/1.4800865

2.    Marco Miniaci, Anastasiia Krushynska, Alexander B. Movchan, Federico Bosia, and       Nicola M. Pugno, Spider web-inspired acoustic metamaterials, Appl. Phys. Lett. 109, 071905 (2016);  https://doi.org/10.1063/1.4961307

3.    A. Gliˇsovi´c, T. Salditt, Temperature dependent structure of spider silk by X-ray               diffraction, Appl. Phys. A 87, 63–69 (2007), DOI: 10.1007/s00339-006-3849-9

4.    Russ Swan, The Physics Behind, Cassell, UK, 2018. page 152-153. 


_____________________

বিজ্ঞানচিন্তা আগস্ট ২০২০ সংখ্যায় প্রকাশিত

Sunday 19 September 2021

পাল্‌স অক্সিমিটারের পদার্থবিজ্ঞান

 



আমরা সবাই জানি – বেঁচে থাকার জন্য আমাদের অক্সিজেনের দরকার হয়। আমাদের সুস্থ শরীর বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে, এবং সেই অক্সিজেন রক্তের মাধ্যমে শরীরের প্রত্যেকটি কোষে পাঠায়। আমাদের শরীরে অক্সিজেন কেন দরকার হয়? অক্সিজেনের সরবরাহ না থাকলে, বা প্রয়োজনের চেয়ে কমে গেলে আমাদের কী অসুবিধা হয়? 

আমাদের শরীরের জীববিজ্ঞানিক মৌলিক উপাদান হলো – কোষ। আমাদের শরীরের সবকিছু এই কোষ দ্বারা গঠিত। আমাদের শরীরে গড়ে প্রায় ৭৫ ট্রিলিয়ন বা ৭৫ লক্ষ কোটি কোষ আছে। এক ফোঁটা রক্তেই আছে প্রায় ৫০ লক্ষ লাল রক্তকোষ। সামগ্রিকভাবে বলা চলে আমাদের শরীরের সমস্ত কাজ নিয়ন্ত্রিত হয় এই কোষগুলির সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে। 

শরীরের প্রত্যেকটি কোষ সক্রিয় থাকার জন্য যে শক্তি লাগে তা নিজেরাই তৈরি করে। কোষ সক্রিয় থাকার অর্থ হলো শরীরে তার যে ভূমিকা তা সঠিকভাবে পালন করা এবং নির্দিষ্ট সময় পর পর কোষ-বিভাজনের মাধ্যমে নতুন কোষ তৈরি করা। নতুন কোষ তৈরি হতে না পারলে আমরা দ্রুত মরে যাবো – কারণ স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতিদিন প্রায় ৭০ হাজার কোটি কোষের মৃত্যু হয় আমাদের শরীরে। নতুন কোষ এই মৃতকোষগুলির দায়িত্ব পালন করে। 

কোষের কাজ চলার জন্য যে শক্তি লাগে সেই শক্তি উৎপন্ন হবার জন্য দরকার হয় অক্সিজেনের। বেশ কয়েকটি ধাপে এই শক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়া সংঘটিত হয়। আমরা যে খাবার খাই সেগুলোর রাসায়নিক উপাদানের সাথে অক্সিজেনের বিক্রিয়ায় শক্তি উৎপন্ন হয়। যেমন গ্লুকোজ অণুর সাথে অক্সিজেন অণুর বিক্রিয়ার ফলে যে তাপ উৎপন্ন হয় সেটাই কোষের কাজকর্ম করার শক্তি যোগায়। তার সাথে তৈরি হয় পানি এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইড। এই পানিও শরীরের অনেক কাজে লাগে। আর কার্বন-ডাই-অক্সাইড আমরা শরীর থেকে বের করে দিই।

কোষ তার দরকারি অক্সিজেন পায় রক্ত থেকে। আমাদের শরীরের রক্তসংবহনতন্ত্রে দুই ধরনের রক্তনালিকা আছে। এক ধরনের রক্তনালিকা অক্সিজেনযুক্ত রক্ত সরবরাহ করে – তাদেরকে আমরা বলি ধমনী বা আর্টারি। আরেক ধরনের রক্তনালিকা কার্বন-ডাই-অক্সাইডযুক্ত রক্ত বহন করে – তাদেরকে আমরা বলি শিরা বা ভেইন। ধমনী কোষের মধ্যে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়। আর কোষে যে কার্বন-ডাই-অক্সাইড তৈরি হয় শিরা সেগুলো নিয়ে আসে ফুসফুসে। ফুসফুস রক্ত থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড আলাদা করে ফেলে। আমরা নিশ্বাসের মাধ্যমে সেই কার্বন-ডাই-অক্সাইড শরীর থেকে বের করে দিই।

সুস্থ থাকার জন্য আমাদের রক্তে প্রয়োজনীয় পরিমাণে অক্সিজেন থাকতে হয়। রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ মাপা হয় ধমনীর রক্ত পরীক্ষা করে। আর্টারিয়াল ব্লাড গ্যাস বা এবিজি পরীক্ষার মাধ্যমে সঠিকভাবে মাপা যায় রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ। কিন্তু সেই পদ্ধতিটি খুব সহজ নয়। ধমনী থেকে রক্ত নিয়ে তা পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করতে হয়। 

এর চেয়ে অনেক সহজ পদ্ধতি হলো খুবই ছোট্ট একটা যন্ত্র - পাল্‌স অক্সিমিটার - এর সাহায্যে রক্তের অক্সিজেনের পরিমাণ মেপে দেখা। এই যন্ত্রটি আঙুলে লাগিয়ে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ এবং হার্টবিট মাপা যায়। এর জন্য শরীর থেকে রক্ত নেয়ারও দরকার হয় না, কোন পরীক্ষাগারেরও দরকার হয় না। তড়িৎচুম্বক তরঙ্গের সাধারণ ধর্মকে কাজে লাগিয়ে রক্তে অক্সিজেন সম্পৃক্তি বা ব্লাড অক্সিজেন স্যাচুরেশান পরিমাপ করা হয়।

রক্তের হিমোগ্লোবিন-ই মূলত অক্সিজেন বহন করে। তবে সব হিমোগ্লোবিন যৌগেই অক্সিজেন থাকবে এমন কোন কথা নেই। হিমোগ্লোবিনে যদি অক্সিজেন থাকে – তাদেরকে বলা হয় অক্সিজেনেটেড  বা অক্সিজেনযুক্ত হিমোগ্লোবিন। আর যেসব হিমোগ্লোবিনে অক্সিজেন থাকে না, তাদের বলা হয় ডি-অক্সিজেনেটেড বা অক্সিজেনমুক্ত হিমোগ্লোবিন। অক্সিজেন স্যাচুরেশান বা সম্পৃক্তি মূলত নির্দেশ করে রক্তের মোট হিমোগ্লোবিনে্র কতভাগ অক্সিজেন বহন করে।  একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ রক্তে যত হিমোগ্লোবিন আছে তার সবগুলোতে যদি অক্সিজেন থাকে – তাহলে বলা যায় অক্সিজেন সম্পৃক্ততার পরিমাণ শতকরা ১০০ ভাগ, আর যদি মাত্র ৭০ ভাগ অক্সিজেনেটেড হিমোগ্লোবিন, আর ৩০ ভাগ ডি-অক্সিজেনেটেড হিমোগ্লোবিন থাকে, তাহলে অক্সিজেন সম্পৃক্ততা হবে ৭০%।

পাল্‌স অক্সিমিটার খুব সহজেই এই সম্পৃক্ততার পরিমাণ হিসেব করতে পারে। কীভাবে? পাল্‌স অক্সিমিটার একটি ছোট্ট ক্লিপের মতো আঙ্গুলের উপর আটকে দেয়া যায়। এর একদিকে থাকে পাশাপাশি  দুটো লাইট এমিটিং ডায়োড বা এল-ই-ডি লাইট সোর্স। এদের একটি লাল আলো দেয়- যার তরঙ্গ দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৬০ ন্যানোমিটার। এই আলো আমরা খালি চোখেও দেখতে পাই। অন্য এল-ই-ডি থেকে ইনফ্রা-রেড বা অবলোহিত আলো নির্গত হয় – যার তরঙ্গ দৈর্ঘ্য প্রায় ৯৪০ ন্যানোমিটার। অবলোহিত আলো আমরা খালি চোখে দেখতে পাই না। এই আলো ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ বা তড়িৎচুম্বক তরঙ্গের অংশ। ক্লিপের অন্যপ্রান্তে থাকে  আলোক-সংবেদী ডিটেক্টর যা তড়িৎচুম্বক তরঙ্গের সাথে মিথস্ক্রিয়ায় (ইন্টারঅ্যাকশান) তড়িৎচুম্বক তরঙ্গের সমানুপাতিক হারে ইলেকট্রনিক সিগনাল উৎপন্ন করে।

আমাদের শরীরে তড়িৎচুম্বক তরঙ্গ প্রয়োগ করলে তার কিছুটা আমাদের শরীরে শোষিত হয়, আবার কিছুটা শরীর ভেদ করে অন্যদিকে বের হয়ে আসে। কতটুকু শোষিত হবে, কতটুকু নির্গত হবে তা নির্ভর করে তড়িৎচুম্বক তরঙ্গের কম্পাঙ্ক এবং শক্তির উপর। দৃশ্যমান আলোর শক্তির চেয়ে এক্স-রে’র শক্তি বেশি। তাই এক্স-রে’র বেশিরভাগ শরীর ভেদ করে বের হয়ে আসে। কিন্তু দৃশ্যমান আলোর বেশিরভাগ শোষিত হয়। আবার একই শক্তি ও কম্পাঙ্কের তরঙ্গও শরীরের কোন্‌ কোষ কতটুকু শোষণ করবে তা নির্ভর করে কী পরিমাণ পদার্থ এবং কোন্‌ ধরনের পদার্থের ভেতর দিয়ে তা আসছে তার উপর। অক্সিজেনযুক্ত হিমোগ্লোবিনে  পদার্থের পরিমাণ অক্সিজেনমুক্ত হিমোগ্লোবিনের চেয়ে বেশি। তাই অক্সিজেনযুক্ত হিমোগ্লোবিন অক্সিজেনমুক্ত হিমোগ্লোবিনের চেয়ে অনেক বেশি আলো শোষণ করে। অক্সিজেনযুক্ত হিমোগ্লোবিন লাল আলো যতটুকু শোষণ করে তার চেয়ে  অনেক বেশি শোষণ করে অবলোহিত আলো। অক্সিজেনমুক্ত হিমোগ্লোবিনের শোষণ হয় উভয়ক্ষেত্রেই আনুপাতিকহারে কম।

অক্সিমিটারের ক্লিপ আঙুল চেপে ধরে। আঙ্গুলের মধ্যে শিরা এবং ধমনী দুটোই আছে। ধমনীর রক্তে অক্সিজেন থাকে। কিন্তু শিরার রক্তে যে কার্বন-ডাই-অক্সাইড থাকে, সেই কার্বন-ডাই-অক্সাইডেও তো অক্সিজেন থাকে। তাহলে সেই অক্সিজেনও তো হিসেবে চলে আসার কথা। তাহলে শিরার রক্ত এবং ধমনীর রক্ত কীভাবে বুঝতে পারে অক্সিমিটার? শুধুমাত্র ধমনীর রক্তের অক্সিজেনই তো আমরা মাপতে চাই। এখানে ভূমিকা রাখে আমাদের হৃদপিন্ডের সংকোচন এবং প্রসারণ বা সিস্টোল এবং ডায়াস্টোল। হৃদপিন্ডের সংকোচনের সময় ধমনীর রক্তের পরিমাণ বেড়ে যায়, আবার প্রসারণের সময় ধমনীর রক্তের পরিমাণ কমে যায়। ফলে ধমনীতে রক্তের পরিমাণের উঠানামার তরঙ্গ তৈরি হয়। এই তরঙ্গের কম্পাঙ্ক ধমনীর পাল্‌স বা স্পন্দনের কম্পাঙ্কের সমান। এক মিনিটে কয়টা স্পন্দন হয় সেটাও হিসেব করা যায় ধমনীর রক্তের তরঙ্গের হিসাব থেকে। শিরার মধ্য দিয়ে রক্তপ্রবাহের পরিমাণের কোন তারতম্য ঘটে না। ফলে কোন তরঙ্গ সৃষ্টি হয় না। ধমনী ও শিরার রক্তপ্রবাহের মধ্যে যে তরঙ্গগত পরিবর্তন ঘটে তাকে প্লেথিস্মোগ্রাফিক ট্রেস বা সংক্ষেপে প্লেথ বলা হয়। পাল্‌স অক্সিমিটারের ফলাফল সঠিকভাবে নির্ণয়ের জন্য এই প্লেথ খুব ভালো হতে হয়।

ধমনীর রক্তে অক্সিজেন সম্পৃক্ততার পরিমাপ করা হয় অক্সিজেনযুক্ত ও অক্সিজেনমুক্ত হিমোগ্লোবিনের অনুপাতের হিসেব করে। রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ বেশি হলে লাল আলোর শোষণ বেশি হবে, নির্গমন কম হবে। ফলে ডিটেক্টর কম আলো শনাক্ত করবে। অবলোহিত আলোর শোষণ ঘটবে আরো বেশি। ডিটেক্টর অবলোহিত আলো শনাক্ত করবে আরো কম। তখন লাল আলো ও অবলোহিত আলোর অনুপাত হবে বেশ কম। একইভাবে রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ কম হলে শোষণ  কম হবে, নির্গমন বেশি হবে। ফলে ডিটেক্টরে শনাক্তকৃত লাল আলো ও অবলোহিত আলোর অনুপাত হবে বেশ বড়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে ডিটেক্টরে শনাক্তকৃত লাল ও অবলোহিত আলোর অনুপাত অক্সিজেন সম্পৃক্ততার বিপরীত অনুপাতিক।

অক্সিমিটারের ক্লিপে লাল ও অবলোহিত আলোর এল-ই-ডি ব্যাবহার করা হয়। কিন্তু ব্যবহারের সময় রুমে অন্য যেসব আলো থাকে – সেই আলোও আঙ্গুলে প্রবেশ করে। এখন সেই আলো কি অক্সিমিটারের রিডিং-এ সমস্যা করে? আসলে করে না। কীভাবে? অক্সিমিটারের ক্লিপে আঙুল রাখার পর প্রথম ধাপে লাল আলো জ্বলে। তখন রুমের আলো ও লাল আলো ডিটেক্ট করে ডিটেক্টর। তারপর দ্বিতীয় ধাপে অবলোহিত আলো জ্বলে। তখন ডিটেক্টর অবলোহিত আলো ও রুমের আলো ডিটেক্ট করে। তৃতীয় ধাপে লাল ও অবলোহিত আলো দুটোই বন্ধ থাকে। তখন শুধু রুমের আলো ডিটেক্ট করে ডিটেক্টর। অক্সিমিটারের ইলেকট্রনিক সার্কিট এই রুমের আলোর সিগনাল আনুপাতিক হিসাব থেকে বাদ দেয়। তাই রুমে কী আলো জ্বললো তাতে অক্সিমিটারের রিডিং-এ কোন সমস্যা হয় না। তবে আঙুলের নখে যদি গাঢ় রঙের নখপালিশ থাকে – অক্সিমিটারের রিডিং-এ সামান্য তারতম্য ঘটতে পারে। এই করোনাকালে অনেকেই শরীরে অক্সিজেন সম্পৃক্তির পরিমাণের দিকে নজর রাখছেন পাল্‌স অক্সিমিটারের সাহায্যে। সাধারণত সুস্থ শরীরে রক্তের অক্সিজেন সম্পৃক্ততা ৯৫%-এর বেশি থাকে।

ছবির উৎস: https://commons.wikimedia.org/wiki/File:OxyWatch_C20_Pulse_Oximeter.png

________________________

বিজ্ঞানচিন্তা অনলাইনে প্রকাশিত

স্বপ্নলোকের চাবি - পর্ব ৩৮

 



স্বপ্নলোকের চাবি – ৩৮

ঘুম ভেঙেছে অনেকক্ষণ। চুপচাপ শুয়ে আছি চোখ বন্ধ করে। দিদি অফিসে চলে গেল এইমাত্র। বের হবার আগে আমার মাথার কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল। চোখ না খুলেই দেখতে পাচ্ছিলাম তার উদ্বিগ্ন মুখ। কপালে হাত দিয়ে জ্বরটা দেখে ইস্‌ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চাপাস্বরে বললো, “জ্বরটা এখনো কেন কমছে না!” তারপর দ্রুত বের হয়ে যাবার সময় ছেলের উদ্দেশ্যে বলতে শুনলাম, “ছোটমামাকে একটুও বিরক্ত করবে না বাবা। লক্ষ্মী হয়ে থাকবে।“

মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী মানুষের বাসায় দিন শুরু হয় অনেক সকালে। একই পরিবারে স্বামী-স্ত্রী দুজনই চাকরিজীবী হলেও সংসারের কাজকর্ম সামলানোর ঝড়ঝাপটার পুরোটাই যায় স্ত্রীর উপর দিয়ে। সবকিছু রেডি করে অফিসে যাওয়ার সময় হলে স্বামীকে ডেকে তোলার দায়িত্বটাও স্ত্রীর উপর বর্তায়। ব্যতিক্রম হয়তো আছে, কিন্তু এখনো চোখে পড়েনি।

একটু পরেই বুঝতে পারলাম খাটে উঠে আমার মাথার কাছে এসে বসলো একজন। ছোট্ট ছোট্ট হাত দিয়ে আমার চোখের পাতা খোলার চেষ্টা করছে। আমি চোখ খুলতেই মুখের কাছে ঝুঁকেপড়া ছোট্টমুখে একগাল হাসি।

“ছোতমামা, তুমি কি আমাকে চিন?”

গতকাল থেকে সে যখনই সুযোগ পাচ্ছে এই প্রশ্নটা করেই যাচ্ছে। তার কাকুরা নাকি বলেছে আমি সবকিছু ভুলে গেছি, আমি এখন কিছুই জানি না, কাউকেই চিনি না। এই ব্যাপারটা সত্য কি না বোঝার চেষ্টা করছে সে। গতকাল থেকে অনেকবার তার প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে। আজ সকালে আবারো শুরু হলো।

আমি গম্ভীরভাবে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কে?”

“আমি পত্তয়”

তিন বছর চার মাস হলো তার – এখনো ‘প্রত্যয়’ বলতে পারে না। মদন টাইপের কিছু একটা সোজা নাম রাখলে ভালো হতো। আমি তার একটা ডাকনামও দিয়েছিলাম - বৃত্ত। কিন্তু সবার মুখে সেটা হয়ে গেল ভিত্য। তবু ভালো যে ভৃত্য বলে ডাকা শুরু করেনি। এখন সবাই তাকে বাবু বলে ডাকে। কিন্তু নাম জিজ্ঞেস করলে সে কখনো নিজের নাম বাবু বলে না।

“পত্তয় কে? আমি তো পত্তয়কে চিনি না।“

“আমি আমি – আমি পত্তয়। তুমি আমার ছোতমামা। তুমি আমাকে মিমি এনে দাও।“

তার হাত নিশপিশ করছে আমার মাথায় হাত দেয়ার জন্য। কাঁধে উঠে দুই হাতে আমার মাথার চুল টানা তার অভ্যাস। চুল ছোট করে রাখলে তার আরো মজা। ছোট ছোট আঙুলে মাটি থেকে ঘাস তোলার মতো করে চুল টানে তখন। কিন্তু এখন মাথায় পুরো ব্যান্ডেজের কারণে তার প্রিয় কাজ সে করতে পারছে না।

“তোমাকে কে মেরেছে ছোতমামা?”

এই প্রশ্নটাও তার মনে ঢুকিয়ে দিয়েছে তার কাকুরা। তারা নাকি বলেছে কারা যেন আমাকে পিটিয়ে আধমরা করে ফেলেছে।

“আমাকে কেউ মারেনি। পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছি।“

আমার উত্তরে সে খুশি হলো না। মনে হচ্ছে আমাকে কেউ ধোলাই দিয়েছে বললে সে খুব খুশি হতো। আনন্দের ব্যাপারটা চিরকালই আপেক্ষিক।  

“বাবু, আসো - খেতে হবে” – বলতে বলতে রুমে ঢুকলো স্মৃতিবৌদি। আমি জেগে উঠেছি দেখে দুখিদুখি মুখে জিজ্ঞেস করলো, “আঁরে চিনর্‌ নে?”

স্মৃতিবৌদি আমার মাসতুতো দাদার বউ। বৌদি হবার আগে দূরসম্পর্কের দিদি ছিল। সে জিজ্ঞেস করছে আমি তাকে চিনতে পারছি কি না। স্মৃতিবৌদিরও ধারণা আমার স্মৃতি নষ্ট হয়ে গেছে! কাল রাতে সে বাড়ি থেকে এসেছে আমাকে দেখতে। এসেই যা করেছে সেটা মনে করে আমার হাসি পেয়ে গেল। কিন্তু হাসলাম না। স্মৃতিভ্রংশ হয়ে যাবার ধারণাটা আমার কাছে বেশ মজাই লাগছে। তাছাড়া মাথায় প্রচন্ড ব্যথার কারণে ভালো করে হা করতে পারছি না, কথাই বলতে পারছি না, হাসবো কি।

আমাকে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে স্মৃতিবৌদি হয়তো ধরেই নিয়েছে যে আমি তাকে চিনতে পারছি না। সে প্রত্যয়কে টেনে নিয়ে গেল খাওয়ানোর জন্য। এই খাওয়ানোর পালা চলবে কমপক্ষে তিন ঘন্টা।

আজ কত তারিখ? মনে করতে পারছি না। সত্যি সত্যি কি স্মৃতি নষ্ট হয়ে গেল নাকি? ছোটবেলায় দেখা আসামী সিনেমার কথা মনে পড়ছে। সিনেমার শুরুতে মাথায় লাঠির বাড়ি খেয়ে রাজ্জাক সব ভুলে যায়। সিনেমার শেষের দিকে আবার মাথায় বাড়ি। সব স্মৃতি ব্যাক টু দ্য ব্রেইন। আমারও সেরকম হলে তো ঝামেলা হয়ে যাবে। একবার যা হয়েছে তা আবার হলে বাঁচার সম্ভাবনা থাকবে না।

মনে মনে হিসেব করে দেখলাম – ২২মে এখানে এসেছি। আজ জুন মাসের ৬ তারিখ। ১৬ দিন চলে গেছে একটা লাইনও পড়িনি। আর ২০ দিন পরেই আমার অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা। অথচ এখনো ঠিকমতো মাথা তুলে বসতেও পারছি না। জোর করে উঠে বসলাম। অ্যান্টিবায়োটিক খাবার সময় হয়েছে। আমাকে দ্রুত সুস্থ হয়ে যেতে হবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমার মেসের রুমে ফিরে গিয়ে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হবে।

পরীক্ষার জন্য জোরেশোরে প্রস্তুতি শুরু করেছিলাম মে মাসের ২০ তারিখ থেকে। ২০ তারিখ রিলেটিভিটির লাস্ট টিউটোরিয়াল ছিল। ওটা শেষ করে সেদিন থেকেই পড়তে বসেছিলাম। আমাদের অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার ফার্স্ট ডেট দিয়েছিল মার্চে। ওটা এমনিতেই পিছিয়ে গেছে। ফেব্রুয়ারিতে চাকসু নির্বাচন হলো। ছাত্রশিবিরের ভরাডুবি হবার পর আশা করেছিলাম সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য শুধুমাত্র নির্বাচনী ঐক্য নয়, সত্যিকারের ঐক্যবদ্ধভাবে ক্যাম্পাসে প্রগতির পরিবেশ তৈরি করবে, স্বাধীনতার পক্ষশক্তির উত্থান ঘটবে। কিন্তু আশাভঙ্গ হতে বেশিদিন লাগেনি।

রমজান শুরু হবার আগে মার্চের শেষের দিকে চাকসুর অভিষেক অনুষ্ঠান হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে। বিশাল আয়োজন। কিন্তু প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি। তবুও ছাত্রছাত্রীদের উচ্ছ্বাসের অন্ত ছিল না। কাদেরী কিবরিয়া, ফাতেমা-তুজ-জোহরা, ফকির আলমগীর আর ডাকসুর সাংস্কৃতিক দল এসেছিল। অনেক রাত পর্যন্ত অনুষ্ঠান চলেছিল। কিন্তু এত আয়োজনের মধ্যেও ছাত্রলীগ আর ছাত্রদলের মধ্যে মারামারি লেগে যাবার উপক্রম হয়েছে। নির্বাচনে যেতার পরই ছাত্রঐক্যের বারোটা বেজে গেছে তা বুঝে গেছে সবাই। তবুও গত চার বছর ধরে ক্যাম্পাসে যে সাংস্কৃতিক খরা চলছে – তা থেকে মুক্তির জন্যই সব শিক্ষার্থী জোটকে ভোট দিয়েছে। কিন্তু নেতারা এখনই নিজেদের স্বার্থ নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু করে দিয়েছে। এতে শিবিরেরই লাভ হচ্ছে। নির্বাচনে পরাজিত হয়েও তারাই এখনো সবগুলি হল দখল করে রেখেছে।

আমাদের পরীক্ষার আরেকটা তারিখ দেয়া হয়েছিল মে মাসের আট তারিখ। সেটা পেছানোর জন্য আন্দোলন করতে হয়েছে। প্রফেসর আলমগীর মোহাম্মদ সিরাজুদ্দিন সাধারণত পরীক্ষা পেছানোর পক্ষপাতী নন। কিন্তু হয়তো পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ অফিস কোন কারণে মে মাসে পরীক্ষা নেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল না। তাই পরীক্ষা পিছিয়ে ২৭ জুন নতুন তারিখ দেয়া হলো। এই তারিখ আর পেছানোর সম্ভাবনা নেই। পরীক্ষার রুটিনও দিয়ে দিয়েছে। ২৭ জুন ফার্স্ট পেপার পরীক্ষা হবার পর কোরবানের বন্ধ আছে। সেকেন্ড পেপার পরীক্ষা ১৭ জুলাই।

এপ্রিল মাস পুরোটা রমজানের ছুটিতে গেছে। পড়ালেখা হচ্ছে না বলে টেনশান করেছি সত্য, কিন্তু পড়াশোনা করিনি। বইপত্র ক্লাসনোট সব গুছিয়ে নিয়ে পড়তে পড়তে নিজের নোট তৈরি করছিলাম। দু’দিন বেশ ভালোই চললো। সারাদিনের মধ্যে সন্ধ্যাবেলা ঘন্টাখানেক মুকিতভাইয়ের সাথে গল্প করি। তিনিই আমার রুমে আসেন। দুজনে বের হয়ে একটু রাস্তায় হেঁটে আসি। আসার সময় ইসলাম সওদাগরের রেস্টুরেন্ট থেকে টিফিন কিনে নিয়ে আসি, রুমে এসে গল্প করতে করতে খাই। রাতে টিভি দেখাও কমিয়ে দিয়েছি। অনেক সিরিয়াস হয়েছি ভেবে মনে মনে কিছুটা আত্মতৃপ্তিও পেতে শুরু করেছিলাম।

কিন্তু বাইশ তারিখ সন্ধ্যায় একটু ঝামেলা হয়ে গেল। বাইরে থেকে দরজা খুলে রুমে ঢুকলাম। আমার পেছনে মুকিতভাই। হেঁটে আসার ফলে বেশ গরম লাগছিলো। আমার টেবিলফ্যানটা  টেবিল থেকে সরিয়ে খাটের দিকে করে দেয়ার জন্য হাতে নিতেই কী হলো বুঝার আগেই দেখা গেলো আমি শূন্যে উঠে আছড়ে পড়েছি ফ্লোরে। আর মুকিতভাই হতভম্ব হয়ে আমাকে ওঠাচ্ছেন।

উঠে দাঁড়াতেই দেখা গেলো আমার মাথার পেছন থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। হাত দিয়ে চেপে ধরে বোঝার চেষ্টা করলাম কী হলো। টেবিলফ্যানটার পুরো বডি স্টিলের। ওটা কোন কারণে শর্টসার্কিট হয়ে গিয়েছিল। পায়ে স্যান্ডেল না থাকলে কী হতো জানি না। আছড়ে না পড়লে মৃত্যু হতো। আর আছড়ে পড়েছি খাটের পায়ের নিচে যে ইট ছিল সেই ইটের উপর। একটা ইটের কোণা ঢুকে গেছে মাথার পেছনদিকে। ওখান থেকে রক্ত বের হচ্ছে গলগল করে। হাত ভিজে গেছে রক্তে। দড়ি থেকে গামছা টেনে নিয়ে জোরে মাথা টিপে ধরলাম।

মুকিতভাই ঘেমে ভিজে গেছেন একেবারে। মনে হচ্ছে তাঁর ফর্সামুখ রক্তশূন্য হয়ে গেছে। ফ্যানের প্লাগ লাগিয়ে তিনিই সুইচ অন করেছিলেন বলে নিজেকে অপরাধী মনে করছেন। তিনি হায় হায় করছেন। কিন্তু এটা হায় হায় করার সময় নয়। ড্রয়ার খুলে টাকা যা ছিল সব নিয়ে বের হলাম।

রিকশা করে চৌধুরিহাটে এসে ডাক্তার শাহাদাত হোসেনের চেম্বারে গেলাম। ফতেয়াবাদ কলেজের গেটের সামনে তাঁর চেম্বার। তিনি আমাদের ইউনিভার্সিটি মেডিক্যাল সেন্টারের ডাক্তার। সন্ধ্যায় চৌধুরিহাটে চেম্বার করেন। আমরা যখন গেলাম তখন তিনি চেম্বারে নেই। আরো কয়েকজন রোগী অপেক্ষা করছেন। পাশাপাশি চেয়ারে বসে মুকিতভাই আমার মাথায় গামছা চেপে ধরে আছেন আমার হাতের উপর দিয়ে। গামছা ভিজে গেছে। রক্ত বন্ধ হচ্ছে না এখনো। তার মানে ইটের কোণা অনেকদূর ঢুকেছে।

ডাক্তার কতক্ষণে আসবেন জানি না। চেম্বারে সহকারী যিনি আছেন – তিনি বললেন ডাক্তার নিজের বাড়িতে গেছেন একটু কাজে। চলে আসবেন। ডাক্তারের বাড়ি কতদূর তা তো জানি না। এমন সময় কারেন্ট চলে গেলো।

এই কারেন্টের জন্যই প্রাণটা যেতে বসেছিল একটু আগে। পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে জানি যে সামান্য বৈদ্যুতিক শকেই মানুষের মৃত্যু হতে পারে। আমাদের হৃৎপিন্ডের যে অবিরাম সংকোচন-প্রসারণ চলছে তার জন্য খুব সামান্যই কারেন্ট লাগে – মাত্র কয়েক মিলি অ্যাম্পিয়ার। কিন্তু এসি কারেন্ট যদি হৃৎপিন্ডের ভেতর দিয়ে যায় – তাহলে সংকোচন-প্রসারণ চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এর আগেও আমি দু’বার বড় ধরনের বৈদ্যুতিক শক খেয়েছি। দু’বারই মরতে মরতে বেঁচে গিয়েছি। একবার চিটাগং কলেজের রেডবিল্ডিং-এ তিনদিন ধরে কারেন্ট ছিল না। বাইরে সবখানে কারেন্ট আছে, সেই বিল্ডিং-এর দোতলাতেও আছে, অথচ তিন তলায় নেই। কৌতূহলী হয়ে সব তার চেক করতে করতে ইউরেকা – একটা চিকন তার পেয়ে গেলাম। ওটা লাগাতে গিয়েই প্রচন্ড ধাক্কা। আরেকবারও আমার হোস্টেলের রুমে। হোস্টেলে বৈদ্যুতিক সংযোগের যে কী খোলামেলা এলোমেলো অবস্থা তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করবে না কেউ।

অন্ধকারে বসে থাকতে থাকতে মুকিতভাই নিচুস্বরে বললেন, “না দেখে সুইচ দেয়া উচিত হয়নি আমার।“

“ওটা আমি দিলেও হতো। দুর্ঘটনা তো ঘটতেই পারে।“

ঘন্টাখানেক পর ডাক্তার এলেন, কিন্তু কারেন্ট এলো না। মোমবাতির আলোতে ডাক্তার কীভাবে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করলেন, সেলাই করলেন আমি জানি না। অনেকক্ষণ লাগলো। ওষুধপত্র নিয়ে রিকশা করে ফিরে আসার সময় ঠিক করলাম দিদির বাসায় চলে যাবো। এখানে থাকলে মুকিতভাই অহেতুক ব্যস্ত হবেন। নিজেকে অপরাধী ভাববেন আর আমাকে আমার মতো থাকতে দেবেন না।

রুমে ঢুকে দ্রুত কিছু বইপত্র আর জামাকাপড় নিয়ে বের হয়ে পড়লাম। মুকিতভাই কিছুতেই আমাকে একা আসতে দিলেন না। একেবারে দিদির বাসায় আমাকে ঢুকিয়ে দিয়ে তবে চলে গেলেন। বাসায় একটু বসলেনও না। বসার সময়ও ছিল না। তাঁকে আবার ছরারকুলে ফিরতে হবে। 

রাত তখন প্রায় এগারোটা। দিদিরা খেতে বসেছিল। আমাকে এ অবস্থায় দেখে কেমন যেন হতভম্ব হয়ে গেল। কী হয়েছে জিজ্ঞেস করার আগেই আমি সবার সামনে সংক্ষেপে বলে দিলাম কী হয়েছে।

আমার ঘুম পাচ্ছিলো। তারপর আর কিছু মনে নেই। পরদিন ঘুম ভাঙলো অনেক দেরিতে। দেখলাম দিদি বসে আছে আমার বিছানার পাশে। অফিসে যায়নি। আমার সারাশরীর ব্যথা। হাঁটুতে আর কনুইতে প্রচন্ড ব্যথা। ফ্লোরে যে আছাড় খেয়ে পড়েছিলাম তখন লেগেছে। মাথার দিকে নজর দিতে গিয়ে অন্য দিকের ব্যথা বুঝতে পারিনি। ব্যথায় জ্বর-টর এলো। তিন-চারদিন পর সবকিছু গা-সহা হয়ে গেলো। পরীক্ষার কথা মনে পড়লো। খাতাপত্র খুলে বসলাম। কিন্তু পড়তে গেলেই মাথায়, কপালে, চোখে প্রচন্ড ব্যথা লাগে, সবকিছু ঝাপসা হয়ে যায়। আমি কি অন্ধ হয়ে যাচ্ছি নাকি? আমার কেন যেন নার্ভাস লাগতে থাকে।

মুকিতভাই আর এখলাস এলো আমাকে দেখতে। এখলাস মজার মজার কথা বলে আমাকে হাসাতে চেষ্টা করলো। অন্যসময় হলে তার এসব কথায় আমি ঘরফাটানো হাসি দিতাম। কিন্তু এখন হাসতে গেলেই মাথায় টান পড়ে। দিদিদের বাসার উপরের তলায় রীতারা থাকে। রীতা আমার চিটাগং কলেজের বন্ধু। একদিন সে এলো। তারপরের দিন টিপু আর মিনি এলো। অজিত এলো কয়েকদিন পর। প্রদীপ নাথ আর বিপ্লব এসে দেখে গেলো। আমার বন্ধুদের আনাগোনা ভালো লাগছে। কিন্তু প্রত্যেকেরই তো পরীক্ষা। আমার নিজের পরীক্ষার কী হবে চিন্তা করলেই চোখে অন্ধকার দেখছি।

চোখে ব্যথা লাগলেও করার কিছু নেই। জোর করে একটু আধটু পড়ালেখার চেষ্টা করছি। এখন সব সাবজেক্ট পড়ার আর সময় নেই। ফার্স্ট পেপারের প্রস্তুতি নিই এখন। পরে কোরবানের ছুটিতে অন্য সাবজেক্ট পড়তে হবে। মেসে আমার রুমে ফিরে যাওয়া দরকার। কিন্তু দিদি কিছুতেই ফিরতে দিচ্ছে না। ডাক্তার শাহাদাতের কাছে গেলাম একদিন ফলো-আপ করার জন্য। সাথে গেলো আমার এক ভাগনে বিশু। ডাক্তার ব্যান্ডেজ খুলে কিছুটা চিন্তিত মুখে বললেন এখনো ক্ষতস্থান শুকায়নি। আবার ব্যান্ডেজ করে দিলেন। বিশুসহ রুমে এসে অপটিক্সের বইপত্র নিয়ে চলে এলাম।

সেদিন রাতে এলো প্রচন্ড জ্বর। সমানে ওষুধপত্র খাওয়ার পরেও জ্বর কমছে না। ডাক্তার শাহাদাতের উপর আমার আস্থা থাকলেও আমার দিদির আস্থা রইলো না। গতকাল বিকেলে সে আমাকে নিয়ে গেলো চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সার্জারির প্রফেসর ফারুকের কাছে। মেডিকেল কলেজের আবাসিক এলাকায় নিজের বাসায় তিনি রোগী দেখেন।

ডাক্তার ফারুক আমার ব্যান্ডেজ খুলে ফেলে দিলেন। আবার নতুন করে ছুরিকাঁচি সুঁইসুতা নিয়ে অনেককিছু করলেন। আমি প্যাসেন্ট-বেডে উপুড় হয়ে শুয়ে শুয়ে কেবলি ভাবছিলাম – আমার পরীক্ষার আর মাত্র ২১ দিন আছে।

মাথায় আবার ব্যান্ডেজ করে দিলেন। প্রেসক্রিপশান লেখার সময় আমার দিদি আর ডাক্তারের মধ্যে কথোপকথনের কিছু অংশ এরকম –

“তার ফাইনাল পরীক্ষা জুনের ২৭ তারিখ থেকে। সে কি পরীক্ষা দিতে পারবে?”

“জীবনের চেয়ে পরীক্ষা বড়? জীবন বাঁচলে কত পরীক্ষা দিতে পারবে।“ – দেখলাম ডাক্তারের কথা শুনে আমার দিদির মুখ হঠাৎ রক্তশূন্য-ফ্যাকাসে হয়ে গেল। কোনরকমে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “সিরিয়াস কিছু হয়েছে?”

“এখনো বলা যাচ্ছে না। মাথার পেছন দিকে তো, অনেক ব্যাপারস্যাপার আছে সেদিকে। হেড ইনজুরি দেখে অনেকসময় বলা যায় না ব্রেইন ইনজুরি কি না। ব্রেইন স্ক্যান করলে জানা যাবে। আপাতত দেখেন কয়েকদিন।“

“ব্রেইন ইনজুরি …” – দিদি কী প্রশ্ন করবে বুঝতে পারছে না।

“আশা করি ব্রেইন ইনজুরি হয়নি। মাঝে মাঝে টেস্ট করে দেখবেন – মেমোরি লস হচ্ছে কি না।“

ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হবার পর থেকেই শুরু হয়ে গেছে আমার মেমোরি টেস্ট। রিকশা অলিয়ঁজ ফ্রসেস পার হয়ে আরেকটু সামনে আসতেই দিদি প্রশ্ন করলো, “সামনের মোড়টার নাম কী বলতো?” তার বাসার গেট দিয়ে ঢোকার সময় জিজ্ঞেস করলো, “আমাদের বাসা কোন্‌ তলায়?” “সাত আর আট যোগ করলে কত হয়?”– তার কান্ড দেখে আমার হাসি পাচ্ছে।

বাসায় এসে আমি বিছানায় শুয়ে পড়লাম। দিদি কাকে কী বলেছে জানি না। বাসার তিন বছরের শিশুটা এসে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “ছোতমামা, তুমি আমাকে চিন?” মেমোরি টেস্ট এমনভাবে শুরু হলো যে ইচ্ছে করছিলো এমন ভাব করি যেন সবকিছু ভুলে গেছি। কিন্তু দিদি যেভাবে টেনশান করছে – তাকে আর কষ্ট দিতে ইচ্ছে করলো না।

বিশু ভাগনে আমার সাথে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল। সে পুরো ঘটনা জানেও না কীভাবে কী হয়েছে। কিন্তু সে তার মামার বাড়ি – অর্থাৎ আমার মাসির বাড়িতে গিয়ে সবাইকে অনেক ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বলেছে আমার মাথার খারাপ অবস্থা। আর তারা বুঝেছে আমার মাথা-খারাপ অবস্থা। সোজা বাংলায় বাংলা সিনেমার মতো – মাথায় বাড়ির পরে মাথা খারাপ।

স্মৃতিবৌদি কাল সন্ধ্যায় এসেই হয়তো দিদিকে এই প্রশ্ন করেছে। দিদি কী বলেছে আমি শুনতে পাইনি। স্মৃতিবৌদির কথা কানে গেলো, “অ বুক! এব্বেরে বেগিন পঅরাই ফেলাইয়ে নে? বেগিন? ছাবগরি?”

সবকিছু ভুলে গেলে কী হতো জানি না। ডাক্তার ফারুকের চিকিৎসায় কাজ দিলো। পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে আমার জ্বর নেমে গেল। পাঁচ দিনের মাথায় আবার গেলাম। ব্যান্ডেজের সাইজ ছোট হয়ে গেল। আরো পাঁচদিন পর সেলুনে গিয়ে মাথা কামিয়ে ফেললাম। দিদির সাথে অনেক বোঝাপড়া করে, খারাপ লাগলেই আবার তার বাসায় চলে যাবো এসব বলে মেসে এলাম পরীক্ষার মাত্র এক সপ্তাহ আগে।

পরীক্ষার জন্য এতদিন টেনশান করছিলাম – রেজাল্ট ভালো হবে কি হবে না এই ভেবে। সেই টেনশান এখন বিলাসিতার পর্যায়ে চলে গেছে। আমার জন্য এখন সুস্থ শরীরে পরীক্ষাটা দিতে পারাটাই বড় কথা।

 পরের পর্ব >>>>>>>>>>>>

<<<<<<<< আগের পর্ব

Monday 13 September 2021

সৈয়দ মুজতবা আলীর জন্মদিনে

 


"আকাশভরা সূর্যতারা বিশ্বভরা প্রাণ,

তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান,

বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান।"

রবীন্দ্রনাথের এই গান যতবারই শুনি - বিস্ময়ে ব্যাকুল হই - আকাশভরা সূর্যতারার এই মহাবিশ্বের এই অপার বিস্ময়ের কিছুই তো জানা হলো না।

রবিবিশ্বের মুগ্ধতা কাটবার নয়। সেরকমই মুগ্ধতায় বাক্যহারা হয়ে যাই - সৈয়দ মুজতবা আলীর পান্ডিত্যে, লেখার মণিমুক্তায়।

১১৭ বছর বয়স হলো তাঁর। ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯০৪ - সিলেটের করিমগঞ্জে তাঁর জন্ম। অগাধ পান্ডিত্যের ছিঁটেফোঁটাই মাত্র লিখেছেন। সেই লেখাও থেমে গেছে ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ - প্রায় ৪৭ বছর আগে। কিন্তু তাঁর যেকোনো লেখা পড়লেই মনে হয় - নিত্যনতুন।

তাঁর যেসব লেখাকে আমরা 'রম্যরচনা' নাম দিয়ে হালকা ভাবার চেষ্টা করি - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সেগুলি সম্পর্কে যথার্থই বলেছেন - ওগুলি সব প্রবন্ধ।[1] আমাদের প্রচলিত ধারণা হলো - যেসব লেখা পন্ডিতী ফলানোর জন্য লেখা হয়, কয়েক লাইন পড়লেই ঘুম চলে আসে - সেগুলিই প্রবন্ধ। সৈয়দ মুজতবা আলীর প্রবন্ধগুলি পড়তে শুরু করলে শেষ না করে রাখা যায় না -সে কারণেই কি সেগুলিকে প্রবন্ধ বলতে চাই না?

'দেশেবিদেশে' তাঁর প্রথম প্রকাশিত বই। কিন্তু প্রথম লেখা নয়। দেশেবিদেশে কি শুধুই ভ্রমণকাহিনি? ইতিহাস নয়? সমাজদর্পণ নয়?

প্রাণখোলা হাসি প্রচলিত পান্ডিত্যের পরিপন্থী। যেসব পন্ডিত আমাদের সমাজে সদর্পে স্বপ্রচারে সরব, তাঁদের কেউই প্রাণখুলে হাসেন না। পাছে লোকে তাঁদের পান্ডিত্য নিয়ে সন্দেহ করে। কিন্তু সৈয়দ মুজতবা আলী পাঠককে যেভাবে হো হো করে হাসিয়ে ছাড়েন, তেমনি নিজেও হাসতে পারতেন প্রাণখুলে, মন খুলে। কিছু কিছু পন্ডিতের সাথে আমরা পরিচিত - যাদের সাক্ষাৎ এত বেশি গম্ভীর যে দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়। অথচ সৈয়দ মুজতবা আলীর পান্ডিত্য ছিল ভোরের আলোর মতো স্নিগ্ধ, শরতের বাতাসের মতো নির্মল।

সৈয়দ মুজতবা আলীর প্রত্যেকটি লেখায় কতো কিছু অজানা বিষয় থাকে।  অথচ একটুও মনে হয় না তিনি মাস্টারি করছেন। পাঠক মাস্টারদের তবু কোন রকমে সহ্য করতে পারেন, কিন্তু সাহিত্যে মাস্টারি অসহ্য। সৈয়দ মুজতবা আলী ব্যাপারটা খুব ভালোভাবেই জানতেন।

এত কম কথায় এত বেশি তিনি বলতে পারতেন - যা মাঝে মাঝে তাঁর গুরুদেব রবিঠাকুরের ঠিক উল্টো। রবিঠাকুরের গল্প কিংবা উপন্যাসে কম-কথার চলন খুব একটা নেই। কিন্তু সৈয়দ মুজতবা আলী কম-কথায় এক কথায় অনবদ্য। 'মুখের রঙটি যেন শিশিরে ভেজা' - পাঁচ শব্দেই  তাঁর গল্পের নায়িকার রূপ মূর্ত হয়ে  ওঠে।

প্রেমে পড়ার বয়সে তাঁর 'প্রেম' পড়ে আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। প্রেমিকার গর্ভে সন্তান রেখে প্রেমিক পালিয়ে গেছে প্রতারণা করে। আদালতে বিচারক যখন প্রতারিতাকে প্রশ্ন করেন, "আচ্ছা, তুমি সেই ছেলেটার সন্ধান নিলে না কেন? তাকে বিয়ে করাতে বাধ্য করালে না কেন?"[2]

কুন্ডুলি পাকানো গোখরো সাপ যে রকম হঠাৎ ফণা তুলে দাঁড়ায়, মেয়েটা ঠিক সেই রকম বলে উঠলো, 'কী! সেই কাপুরুষ - যে আমাকে অসহায় করে ছুটে পালালো! তাকে বিয়ে করে আমার বাচ্চাকে দেব সেই কাপুরুষের, সেই পশুর নাম!'

এতটা আত্মসম্মান, আত্মশক্তি আবিষ্কার করতে পারেন যিনি - তিনিই তো সৈয়দ মুজতবা আলী।

শুভ জন্মদিন প্রিয় লেখক।



[1] সৈয়দ মুজতবা আলী রচনাবলীর তৃতীয় খন্ডের ভূমিকা। মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রা: লি:, কলকাতা, শ্রাবণ ১৪০৮ বাংলা।

[2] সৈয়দ মুজতবা আলী, রাজা উজীর গ্রন্থের ‘প্রেম’।


Sunday 12 September 2021

আইরিন কুরি - নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী

 



পদার্থবিজ্ঞানের জগতে বেশ কয়েকটি যুগান্তকারী আবিষ্কারের সমসাময়িক সময়ে আইরিনের জন্ম। উইলহেল্‌ম রন্টগেনের এক্স-রে আবিষ্কারের দু’বছর পর, হেনরি বেকোয়ারেলের তেজষ্ক্রিয়তা আবিষ্কারের পরের বছর ১৮৯৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পিয়ের ও মেরি কুরির প্রথম সন্তান আইরিন কুরির জন্ম। নির্ধারিত সময়ের প্রায় চার সপ্তাহ আগে জন্ম হয় আইরিনের। মেরি কুরি তখন প্যারিসের মেয়েদের স্কুলে ফিজিক্সের শিক্ষক এবং পিয়ের কুরি ইকোল মিউনিসিপেল দ্য ফিজিক অ্যাট কিমিয়ে ইন্ডাস্ট্রিয়েল্‌স (ইপিসিআই) এর ফিজিক্স ল্যাবের প্রধান। আইরিনের জন্মের দু’সপ্তাহ পর তার দিদিমা (পিয়েরের মা) মারা যান। কিছুদিন পর পিয়ের তাঁর বাবাকে নিজেদের কাছে নিয়ে আসেন। ডাক্তার ইউজিন কুরি বুকে তুলে নেন নাতনি আইরিনকে। দাদুর সাথে গভীর আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে আইরিনের।

গবেষণা ও পড়ানোর কাজে খুব ব্যস্ত আইরিনের মা-বাবা। পিয়ের কুরি গবেষণা করছেন কৃস্টালের চৌম্বক-ধর্ম নিয়ে। মেরি কুরি তাঁর ডক্টরেট ডিগ্রির গবেষণার জন্য কাজ শুরু করেছেন সদ্য আবিষ্কৃত তেজষ্ক্রিয়তার ধর্মের ওপর। দিনরাত পরিশ্রম করে নতুন ধরনের তেজষ্ক্রিয় পদার্থের সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছেন মেরি। আইরিনের জন্মের পর সামান্য কয়েক সপ্তাহ বিশ্রামের পর দ্রুত কাজে ফিরে গেছেন তিনি। ১৮৯৮ সালের জুন মাসে পাওয়া গেলো নতুন তেজষ্ক্রিয় মৌল - নিজের জন্মভূমির নামানুসারে মেরি যার নাম রেখেছেন পোলোনিয়াম। পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে পাওয়া গেলো আরো শক্তিশালী নতুন মৌল রেডিয়াম। আইরিনের মতো রেডিয়াম-পোলোনিয়ামও যেন মেরির সন্তান। আইরিনের মা-বাবা আইরিনের চেয়েও বেশি সময় দিতে লাগলেন রেডিয়ামকে।

দাদুর কোলে-পিঠেই বেড়ে উঠছে আইরিন। শুধুমাত্র ছুটির দিনে কিছুটা সময় মা-বাবাকে কাছে পায়। তার বয়স যখন পাঁচ-ছয় বছর মা-বাবা আরো ব্যস্ত হয়ে যান। দেখা যায় সন্ধ্যাবেলা বাসায় ফিরে ডিনারের পর আবার গবেষণায় ফিরে যাবার জন্য প্রস্তুত হতে থাকেন। আইরিন তখন কান্নাকাটি শুরু করে। মা তাকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করেন। অভিমান হয় ছোট্ট আইরিনের। মা-বাবা কেন তার কাছ থেকে দূরে থাকে সব সময়? অনেক সময় ঘুমের ভান করে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে থাকে। মা তখন তাকে দাদুর কোলে দিয়ে বাবার সাথে বেরিয়ে যান কাজে। আইরিন চোখ খুলে দেখে দাদুর মুখ। 

মা-বাবা ও দাদুর সাথে আইরিন


দাদু আইরিনকে বোঝান - মা-বাবার গবেষণার কাজ কত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা এমন কিছু আবিষ্কার করেছেন যা দিয়ে পৃথিবীর কোটি মানুষের উপকার হবে। নিজের স্বার্থের কথা চিন্তা না করে মানুষের উপকারের চেষ্টা করার নামই যে মানব-ধর্ম তা আইরিনের মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে দেন তার দাদু। মা-বাবার কথা শুনতে শুনতে ‘ল্যাবরেটরি’, ‘রেডিওএক্টিভিটি’, ‘রেডিয়াম’, ‘পোলোনিয়াম’ ইত্যাদি শব্দের সাথে খুবই পরিচিত হয়ে যায় ছোট্ট আইরিন।

১৯০৪ সালের ডিসেম্বরে আইরিনের ছোটবোন ইভের জন্ম হয়। আইরিনের একজন খেলার সাথি হলো। পাশের বাসার প্রফেসর জাঁ পেরির ছেলে-মেয়ে আলিন ও ফ্রান্সিস আইরিনের ভালো বন্ধু। আইরিন তাদের সাথেও খেলে। কিন্তু অপরিচিত কারো সাথে আইরিন কথাই বলতে চায় না। যতই বড় হচ্ছে তার এই সমস্যা বাড়ছে। মেরি কুরি মেয়ের এই সমস্যা কাটানোর জন্য বাড়িতে অনেক বন্ধুবান্ধব ডেকে পার্টি দিয়েছেন - যেন তাদের ছেলে-মেয়েদের সাথে আইরিনের বন্ধুত্ব হয়। কিন্তু আইরিন তাদের কারো সাথেই কোন কথা বলে না। বাইরের কারো সামনে সে হাসেও না, গম্ভীর হয়ে থাকে।

১৯০৬ সালের এপ্রিলে আইরিনের বয়স যখন সাত – আইরিনের বাবা পিয়ের কুরি রাস্তা পার হতে গিয়ে ঘোড়ার গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা যান। সাড়ে আট বছর বয়সেই বাবাকে হারিয়ে আরো গম্ভীর হয়ে গেলো আইরিন। দাদু যথাসম্ভব শোক সামলে নাতনিদের দেখাশোনা করতে লাগলেন আগের মতোই। মা প্যারিসের বাসা বদলে সবাইকে নিয়ে চলে গেলেন স্‌সোতে। সেখানে তাদের নতুন বাসায় বেশ বড় একটা বাগান আছে। মা আইরিনকে বাগানের একটা অংশ দিয়ে দিলেন ইচ্ছেমত বাগান করার জন্য। সাত বছরের আইরিন নিজের হাতে বাগান করা শুরু করে - তাকে সাহায্য করেন দাদু। 

কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই দাদুর শরীর ক্রমশ খারাপ হয়ে যেতে শুরু করলো। বিছানা থেকে উঠতে পারেন না। বারো বছরের কিশোরী আইরিন যখনই সময় পাচ্ছে দাদুর সেবা করার চেষ্টা করছে। 
১৯১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দাদু মারা যান। আইরিনের পৃথিবীটা শোকে স্তব্ধ হয়ে যায়। বাবার মৃত্যুর পর দাদু ছিল তার বন্ধু, শিক্ষক আর পথপ্রদর্শক। দাদুর কাছ থেকে যে ভালোবাসা, দেশপ্রেম, মানবতার শিক্ষা আইরিন পেয়েছে তার তুলনা নেই। দাদুকে হারিয়ে আইরিনের হঠাৎ ভয় করতে শুরু করলো - মাকেও যদি কোনদিন এমনি ভাবে হারাতে হয়! না, সে তার মা ও ছোট বোনকে দেখে রাখবে। 
দাদুর মৃত্যুর পর বাসাটা পুরুষ-শূন্য হয়ে গেল। মেরি দুটো কন্যাকে মানুষ করার জন্য যা যা লাগে সব ব্যবস্থা করলেন। মেয়েদের নিজের মাতৃভাষা পোলিশ শেখানোর উদ্দেশ্যে বাসায় পোলিশ গভর্নেস রাখলেন। ইভ ও আইরিন ফরাসির পাশাপাশি পোলিশ ভাষাতেও দক্ষ হয়ে উঠছে।

মেয়েদের শারীরিক স্বাস্থ্যের প্রতি কড়া নজর মেরির। তিনি বিশ্বাস করেন ছেলেমেয়েদের শরীর সুগঠিত হলে কোন রোগজীবাণু তাদের আক্রমণ করতে পারবে না, মানসিক বিকাশও অনেক ভালোভাবে হবে। মেয়েদেরকে সাইকেল কিনে দিয়েছেন - তারা ইচ্ছেমতো সাইকেলে চেপে ঘুরে বেড়ায় উন্মুক্ত প্রান্তরে। সাঁতার কাটা, ঘোড়ায় চড়া, নৌকা চালানো, স্কেটিং, স্কিইং, জিমনেস্টিক্‌স সবকিছু শিখিয়েছেন মেয়েদের। আইরিন দেখেছে - যে সাইকেলে চড়া তার মায়ের এত প্রিয় ছিল, স্বামীর মৃত্যুর পর একটা দিনের জন্যেও আর সাইকেলে চড়েননি তার মা।

ফ্রান্সের স্কুলের গতানুগতিক শিক্ষাপদ্ধতির ওপর কোন আস্থা ছিল না মেরি কুরির। তিনি দেখছেন ফ্রান্সের স্কুলের শিক্ষার্থীরা দিন-রাত গাধার মত পরিশ্রম করছে, মুখস্থ করছে, পরীক্ষা দিচ্ছে - কিন্তু শিখছে না কিছুই। তিনি এই সিস্টেমের অবসান করতে না পারলেও নিজের মেয়েদের এই শিক্ষার নামে ‘কলুর বলদ’ বানাবার বিপক্ষে। তাঁর কাছের বন্ধু ও সহকর্মীদের নিয়ে তিনি একটা অপ্রাতিষ্ঠানিক কো-অপারেটিভ স্কুল-ব্যবস্থার চালু করলেন। 

ছয় জন প্রফেসরের দশজন ছেলেমেয়েকে নিয়ে শুরু হলো তাঁদের প্রচেষ্টা। প্রতি সপ্তাহে একেক জন প্রফেসর একেক বিষয়ে ক্লাস নেন। পদার্থবিজ্ঞানী জাঁ পেরি এবং পল লাঁজেভি পড়াতেন ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রি ও গণিত। মেরি কুরি পড়াতেন এক্সপেরিমেন্টাল ফিজিক্স।  সাহিত্য, শিল্পকলা, সাধারণ বিজ্ঞান, ইংরেজি, জার্মান ইত্যাদি পড়ানোর জন্য সেসব বিষয়ের বিশেষজ্ঞকে নিয়ে আসা হতো। একেক সপ্তাহে একেক প্রফেসরের বাড়িতে ক্লাস বসতো। দশজন ছেলেমেয়ের প্রত্যেকে প্রত্যেকের বন্ধু হয়ে যায়। আইরিনও খুব সহজ ছিল তার এসব বন্ধুদের সাথে। এই দশজনের বাইরে আইরিনের সারাজীবনে আর কোন ফ্রেন্ডসার্কেল গড়ে ওঠেনি।

আড়াই বছর চলার পর কো-অপারেটিভ স্কুলটি আর চললো না। প্রফেসররা নানা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। স্কুল উঠে গেলেও মেরি কুরি তাঁর ফিজিক্স স্কুলের একটা রুমে প্রতি বৃহস্পতিবার ছেলে-মেয়েদের সারাদিন পড়াতেন। মেরি বিশ্বাস করেন মৌলিক বিজ্ঞানে ভালো করতে হলে পদার্থবিজ্ঞান ও গণিত বোঝার কোন বিকল্প নেই।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা-পদ্ধতিকে অপছন্দ করলেও প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিকে অস্বীকার করার উপায় নেই। উচ্চ মাধ্যমিকের সমতুল্য পরীক্ষা দেয়ার জন্য আইরিনকে একটি প্রাইভেট স্কুলে ভর্তি করে দেয়া হলো। দু’বছর সেই স্কুলে পড়ার পর উচ্চমাধ্যমিক পাস করে আইরিন।

মা যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ব্যস্ত থাকেন তা কিছুটা আন্দাজ করতে পারে আইরিন। কিন্তু মা যে বিশ্বসেরা বিজ্ঞানী তা বুঝতে পারে মায়ের সাথে স্টকহোমে গিয়ে। ১৯১১ সালে দ্বিতীয় বার নোবেল পুরষ্কার পেলেন মাদাম কুরি। প্রথমবার ১৯০৩ সালে যখন বাবার সাথে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন মা - তখন অসুস্থতার কারণে বাবা-মা কেউই স্টকহোমে আসতে পারেননি। এবার রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পাবার পর প্যারিসের প্রেসের শত কুৎসা অপবাদ আক্রমণের পরেও মা একটুও দমে যাননি। মাথা উঁচু করে সুইডেনে এসেছেন নিজের যোগ্যতার স্বীকৃতি - নোবেল পুরষ্কার নিতে। 
অডিটোরিয়ামের চোখ ঝলসানো আলোয় সঙ্গীত মূর্ছনায় এবং প্রচন্ড করতালির সাথে রাজা পঞ্চম গুস্তাভের কাছ থেকে মা যখন নোবেল মেডেল নিচ্ছিলেন - গর্বে বুক ভরে গেছে আইরিনের। কিন্তু সেদিন একবারের জন্যও সে ভাবেনি যে চব্বিশ বছর পর তার নিজের জীবনেই সেরকম কোন ঘটনা ঘটবে।

মা নিজের কাজে এতই ব্যস্ত থাকেন যে আইরিন ও ইভ পুরোপুরি স্বনির্ভর হয়ে গেলো। বাসার কাজকর্ম দেখাশোনার জন্য একজন গভর্নেস আছেন - তিনি রান্নাবান্না ও অন্যান্য কাজ করেন। আইরিন ও ইভ দুজনই যে যার নিজের কাজ করে নেয়। দুবোন দুরকম, দুজনের ইন্টারেস্টও দুরকম।
আইরিন তার বাবার মতোই খুব সল্পভাষী, ধীরস্থির এবং গভীর চিন্তাশীল। বৈজ্ঞানিক যুক্তিতে সবকিছু বিবেচনা করে দেখে আইরিন। কোন ব্যাপারেই সময় নষ্ট করার পক্ষপাতী নয় আইরিন। ফ্যাশনেবল প্যারিসে যেখানে মেয়েরা নিত্যনতুন ড্রেস আর রূপচর্চার পেছনে টাকা আর সময় খরচ করতে দু’বার চিন্তা করে না - সেখানে আইরিন কোন ধরনের প্রসাধন তো দূরের কথা ভালো কোন ড্রেসও কিনেনি কখনো। ঢিলেঢালা আরামদায়ক ও কাজ করতে সুবিধাজনক পোশাকই আইরিনের পছন্দ। তার জামার হাতায় পকেট থাকতো রুমাল রাখার জন্য। সময় বাঁচাবার জন্য তার সুন্দর কোঁকড়া চুল সে নিজেই কেটে ছোট করে রাখতো।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধের প্রথম দশ দিনের মধ্যেই প্রায় তিন লাখ ফরাসি সৈন্য নিহত হয়, আহত হয় আরো বেশি। যুদ্ধাহত সৈনিকদের শরীর থেকে বুলেট বের করে আনতে আর্মি-সার্জনদের অনেক সমস্যা হয়। শরীরের নানা জায়গায় অস্ত্রোপচার করতে হয় - ফলে অনেক সময় সৈন্যদের প্রাণ বাঁচানো যায় না। মাদাম কুরি একটা উপায় বের করলেন। শরীরে বুলেটের অবস্থান নির্ণয় করার জন্য এক্স-রে ব্যবহার করা যায় কিনা দেখলেন তিনি। 
এক্স-রে’র বয়স তখন মাত্র পনেরো বছর। এক্স-রে তৈরি ও রেডিওগ্রাফ প্রযুক্তির সূচনা হয়েছে মাত্র। মাদাম কুরি মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ারিং ও হেল্‌থ ইউনিটকে কাজে লাগিয়ে বিশটি এক্স-রে ইউনিট তৈরি করালেন। দুর্গম যুদ্ধক্ষেত্রের অস্থায়ী হাসপাতালে বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকে না। মেরি কুরি বিশটি ছোট ট্রাকের মধ্যে জেনারেটর সহ এক্স-রে ইউনিট বসিয়ে এরকম হাসপাতালে সরবরাহ করার ব্যবস্থা করলেন। 
যুদ্ধাহতদের চিকিৎসা সেবা দেয়ার জন্য ফরাসি মেয়েরা নার্সিং ট্রেনিং নিচ্ছিলো। আইরিনও নার্সিং ট্রেনিং নিলো। ইতোমধ্যে মাদাম গাড়ি চালানো শিখে নিয়েছেন। আইরিনকে সাথে নিয়ে নিজে ভ্রাম্যমান এক্স-রে ইউনিট চালিয়ে দুর্গম হাসপাতালে পৌঁছে যান তিনি। এক্স-রে মেশিন সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক জ্ঞান তিনি আইরিনকে দেন গাড়ি চালাতে চালাতেই। আইরিন দ্রুত শিখে নেয় সব।

১৯১৫ সালের ১২ সেপ্টেম্বর আইরিনের বয়স আঠারো হবার পর মাদাম তাকে কয়েকটা এক্স-রে ইউনিটের দায়িত্ব দিয়ে দিলেন। এক্স-রে ইউনিট বসানো, সার্জনকে রোগীর এক্স-রে নিতে সাহায্য করা, সৈনিকদের এক্স-রে মেশিন চালানোর ট্রেনিং দেয়া সব করতে লাগলো আইরিন একা। যুদ্ধাহত সৈনিকেরা পরমা সুন্দরী আইরিনকে সত্যি সত্যিই গ্রিক শান্তির দেবী ‘আইরিন’ হিসেবেই দেখতে শুরু করলেন। 

এক্স-রে ইউনিট নিয়ে কাজ করছেন মেরি ও আইরিন কুরি



আমেরিকান সৈন্যরা ফ্রান্সে এসেছে যুদ্ধে সহায়তা করার জন্য। তারাও যোগ দেয় আইরিনের ট্রেনিং ক্লাসে। তরুণ সৈন্যরা আইরিনকে দেখে চোখ ফেরাতে পারে না। তাদের মধ্যে হুড়োহুড়ি লেগে যায় আইরিনের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য। কিন্তু স্বভাব-গম্ভীর আইরিন ট্রেনিং দেবার সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটা শব্দও উচ্চারণ করে না।  
যুদ্ধ চলাকালীন সময়েই ফরাসি সৈনিকেরা বুঝতে পেরেছেন মাদাম কুরি ও রেডিয়াম ইনস্টিটিউটের গুরুত্ব কতখানি। তারা রেডিয়াম ইনস্টিটিউটকে সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য চারপাশে বালির বস্তা দিয়ে বাংকার তৈরি করে ট্যাংক নিয়ে পাহারা বসালো। সুন্দর নতুন বিল্ডিং-এর চারপাশে এরকম বিশ্রী বালির বস্তা দেখে আইরিনের মন খারাপ হয়ে গেল। সে বালির বস্তার ওপর সুন্দর করে ফুলের টব বসিয়ে দিলো। 
১৯১৮ সালে যুদ্ধ শেষ হবার পর আইরিনকে মিলিটারি মেডেল প্রদান করা হয় যুদ্ধে তার অবদানের জন্য। কিন্তু মাদাম কুরিকে কোন রাষ্ট্রীয় সম্মান দেয়া হলো না। 
কিছুদিন পর সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে আইরিন। আরো দু’বছর পর পদার্থবিজ্ঞান ও গণিতে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন আইরিন।

আইরিন তেজষ্ক্রিয়তার ধর্ম সংক্রান্ত বিজ্ঞানকে ভালোবেসে ফেলেছেন। মা মাদাম কুরি আইরিনকে তাঁর সহকারী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন রেডিয়াম ইনস্টিটিউটে। গবেষণা বেশ ভালো লাগতে শুরু করেছে তাঁর। তেজষ্ক্রিয় বস্তুর আভা দেখে বাচ্চা মেয়ের মত খুশি হয়ে উঠেন আইরিন। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের গুরুত্বের চেয়েও আবিষ্কারের আনন্দটা অনেক বেশি দরকারি তাঁর কাছে। প্রতিযোগিতা ও সাফল্যে কিছু যায় আসে না তাঁর। বাবার পর্যায়ের কাজ তিনি করতে পারবেন কিনা সে ব্যাপারে কোন মাথাব্যথা তাঁর কখনোই ছিল না। তবে বাবার মত আইরিন বিজ্ঞান পড়েন প্রকৃতিকে জানার আনন্দে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ভালোভাবে উপভোগ করার জন্য।

মায়ের সাথে ল্যাবরেটরিতে আইরিন



সহকর্মীদের সাথে ল্যাবে কাজ করার সময় আইরিন ভীষণ কড়া। জ্ঞানে এবং শারীরিক দক্ষতায়ও তিনি সবার চেয়ে এগিয়ে। ২৫ বছর বয়সেই তিনি অনেক বেশি জানেন। কিন্তু সামাজিক মেলামেশায় অভ্যস্ত না হবার কারণে তাঁর কথাবার্তা ভীষণ চাঁছাছোলা। তিনি কোদালকে শুধু কোদালই বলেন না - কোদালের খুঁত থাকলে তাও বলেন। বাড়ির লোকের সাথে মাঝে মাঝে হাসলেও - বাইরের কারো সামনে কখনোই হাসেননি আইরিন। অনেকে আইরিনকে অহংকারী ভেবে ভুল বোঝেন। ঈর্ষাতুর অনেকে মনে করেন ডিরেক্টরের মেয়ে হবার কারণে আইরিন ডাঁট দেখান। আড়ালে অনেকে তাঁকে ‘প্রিন্সেস বলেও ডাকেন। কিন্তু আইরিনের কিছুতেই কিছু যায় আসে না। আইরিন জানেন তাঁর বৈজ্ঞানিক ক্ষমতা কতটুকু। কিন্তু সে নিয়ে কোন অহংকার তাঁর নেই।

আইরিনকে কখনো কোন বিষয় নিয়ে রাগতে দেখেনি কেউ। আইরিন জীবনে কোনদিন মিথ্যা কথা বলেননি, কোনদিন কাউকে ইম্প্রেস করতে চান নি। তিনি যা তিনি তাই।

রেডিয়াম ইনস্টিটিউটে মায়ের তত্ত্বাবধানে ডক্টরেট ডিগ্রির জন্য গবেষণা শুরু করলেন আইরিন। মায়ের আবিষ্কৃত পোলোনিয়াম থেকে যে আলফা পার্টিক্যাল বের হয় তার ধর্ম বিশ্লেষণ শুরু করলেন তিনি। তাঁর গবেষণার মূল প্রতিপাদ্য হলো পদার্থের ভেতর দিয়ে যাবার সময় আলফা পার্টিক্যল কেন গতি হারায় এবং কীভাবে গতি হারায় তা খুঁজে বের করা। ১৯২১ সালে আইরিন কুরির প্রথম গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। ইনস্টিটিউটের চিফ অব স্টাফ ফারনান্দ হলউইকের সাথে একের পর এক পরীক্ষণ চলতে থাকে আইরিনের।

১৯২৪ সালের নভেম্বরে ডক্টরেট ডিগ্রির জন্য থিসিস লিখছেন আইরিন। থিসিসে তিনি যেসব পরীক্ষালব্ধ ফলাফল বিশ্লেষণ করেছেন তার সবকিছুই নতুন। সেই সময় পোলোনিয়াম সম্পর্কে যত পরীক্ষা আইরিন করেছেন পৃথিবীর আর কোথাও কেউ ততটা করেননি।

 ১৯২৫ সালে আইরিন সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরাল থিসিস জমা দিয়েছেন - ‘আলফা রে অব পোলোনিয়াম শিরোনামে। থিসিস উৎসর্গ করেছেন তাঁর মাকে - ‘টু মাদাম কুরি বাই হার ডটার এন্ড পিউপিল। আইরিন থিসিস ডিফেন্ড করতে গেলেন একটা ঢিলেঢালা ব্যাগি ড্রেসের ওপর কালো একাডেমিক গাউন পরে। 


ডক্টর আইরিন কুরি


অডিটোরিয়ামে প্রায় হাজার দর্শক উপস্থিত রেডিয়াম-কন্যার বক্তৃতা শোনার জন্য। আইরিন যদিও সমাবেশ পছন্দ করেন না, কোন ধরনের টেনশান ছাড়াই তিনি বক্তৃতা করলেন। তিনি যা জানেন তা এত ভালো জানেন যে সেটা নিয়ে কোনদিনই কোন উৎকন্ঠায় ভোগেন না। আইরিনের পরীক্ষকদের ওপর মানসিক চাপ পড়বে ভেবে মাদাম কুরি যাননি সেই অনুষ্ঠানে। পরীক্ষকদের সবার ভূয়সী প্রশংসার ভেতর দিয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি পেলেন আইরিন কুরি।

১৯২৬ সালের ৯ই অক্টোবর বিয়ে হলো আইরিন কুরি ও ফ্রেডেরিক জুলিওর। ফ্রেডেরিক জুলিও মেরি কুরির ইন্সটিটিউটে গবেষণা করছিলেন। সেখানে গবেষণা করতে করতেই আইরিন ও ফ্রেডেরিকের মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হয়। বিয়ের পর ফ্রেডেরিক নিজের পদবির সাথে কুরি পদবিও জুড়ে নেন। তখন থেকে তাদের পদবি হয় জুলিও-কুরি। বিয়ের পর আইরিন ও ফ্রেডেরিকের যৌথ গবেষণা আরো বেগবান হয়।

গবেষণারত আইরিন ও ফ্রেডেরিক

১৯২৭ সালে ফ্রেড সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। একই বছর তাঁদের প্রথম সন্তান হেলেনের জন্ম হয়। ১৯৩০ সালে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করলেন ফ্রেডেরিক জুলিও-কুরি। তাঁর থিসিসের শিরোনাম ছিল, “ইলেকট্রোকেমিক্যাল প্রপার্টিজ অব রেডিওঅ্যাক্টিভ কম্পাউন্ডস অব পোলোনিয়াম” । 

১৯৩২ সালে আইরিন ও ফ্রেডের দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হলো। আইরিন তাঁর বাবার নাম অনুসারে ছেলের নাম রাখলেন পিয়ের। হেলেন আর পিয়ের মাদাম কুরির চোখের মণি হয়ে উঠলো। সময় পেলেই মাদাম নাতি-নাতনিদের সাথে খেলতে চেষ্টা করেন। তাঁর কাজের অনেকটুকুই এখন আইরিন সামলাচ্ছেন। তবুও তিনি রেডিয়াম ইনস্টিটিউটে যাওয়া থামাচ্ছেন না। ১৯৩৩ সালের সলভে কনফারেন্সে যোগ দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। 

এদিকে পিয়েরের জন্মের পর আইরিন আরো দুর্বল হয়ে পড়েছেন। পঁয়ত্রিশ বছর বয়সেই তাঁকে অনেক বয়স্কা মনে হচ্ছে। যক্ষা থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না কিছুতেই। কিন্তু কোনকিছুই তাঁকে ঘরে আটকে রাখতে পারলো না। তিনি কাজে ফিরে গেলেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। ল্যাবে গিয়েই নতুন পরীক্ষায় হাত দিলেন।

নিউট্রন আবিষ্কৃত হবার পর ইতালিয়ান পদার্থবিজ্ঞানী এনরিকো ফার্মি পারমাণবিক নিউক্লিয়াসের গবেষণায় বিপুল সম্ভাবনা দেখতে পেলেন। আইরিন ও ফ্রেড উইলসন ক্লাউড-চেম্বার ব্যবহার করে নিউট্রন নিয়ে পরীক্ষা করার পরিকল্পনা করলেন। তাঁরা দেখলেন ক্লাউড-চেম্বারে ইলেকট্রন-ট্র্যাকের পাশাপাশি নতুন ধরনের ট্র্যাক দেখা যাচ্ছে - যা শুধুমাত্র সম্ভব যদি ইলেকট্রনের চার্জ পজিটিভ হয়। আইরিন ও ফ্রেডের আগে এ পরীক্ষা আর কেউ করেননি এবং এই পজিটিভ ইলেকট্রনের অস্তিত্ব সম্পর্কেও কেউ জানতেন না। তবে তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানী পল ডিরাক পজিটিভ ইলেকট্রনের সম্ভাবনার কথা প্রকাশ করেছিলেন। ডিরাকের পেপার আইরিন ও ফ্রেডের চোখে পড়েনি। 

পজিটিভ চার্জের ট্র্যাক দেখে তাঁদের ফলাফল সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হলেন আইরিন ও ফ্রেড। কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (ক্যালটেক) কার্ল এন্ডারসন আইরিন ও ফ্রেডের পরীক্ষাটা করে একই রেজাল্ট পেলেন এবং সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করলেন যে এগুলো পজিট্রনের ট্র্যাক। আরো একটা যুগান্তকারী আবিষ্কারের কৃতিত্ব থেকে বঞ্চিত হলেন আইরিন ও ফ্রেড। [পজিট্রন আবিষ্কারের জন্য ১৯৩৬ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেলেন কার্ল এন্ডারসন।] 

পরপর দু’বার সঠিক পরীক্ষণের মাধ্যমে আইরিন ও ফ্রেড নিউট্রন ও পজিট্রন আবিষ্কারে প্রধান ভূমিকা রেখেছেন। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীদের কাছে আইরিন ও ফ্রেডের গ্রহণযোগ্যতা অনেকগুণ বেড়ে গেলো। ১৯৩৩ সালের সল্‌ভে কনফারেন্সে আমন্ত্রিত হলেন তাঁরা। সল্‌ভে কনফারেন্সে আমন্ত্রিত হওয়া মানে বিশ্বস্বীকৃতি পাওয়া। মাদাম কুরি তো সল্‌ভে কনফারেন্সের জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে সবগুলো কনফারেন্সেই আমন্ত্রিত হয়েছেন। আইরিন ও ফ্রেডের এটাই প্রথম।

কনফারেন্সে যাবার আগে অনেকগুলো পরীক্ষা করলেন তাঁরা। পোলোনিয়ামের সামনে অ্যালুমিনিয়ামের পাতলা পাত রেখে দেখেছেন পোলোনিয়াম থেকে আলফা পার্টিক্যল এসে অ্যালুমিনিয়াম পাতে ধাক্কা দিয়ে সেখান থেকে নিউট্রন ও পজিট্রন বের করে দিচ্ছে। বার বার পরীক্ষা করে একই রেজাল্ট পেয়েছেন আইরিন ও ফ্রেড।

১৯৩৩ সালের অক্টোবরে ব্রাসেল্‌সে সল্‌ভে কনফারেন্সে আইরিন ও ফ্রেডের পরীক্ষার ফলাফল উপস্থাপন করলেন ফ্রেড। আইরিন কথা বলতে পছন্দ করেন না, তাই তিনি চুপচাপ বসে আছেন অন্যান্য বিজ্ঞানীদের সাথে। কনফারেন্সে চল্লিশ জন আমন্ত্রিত বিজ্ঞানীর মধ্যে বিশ জন নোবেল বিজয়ী। চল্লিশ জনের মধ্যে মাত্র তিনজন নারী বিজ্ঞানী - মাদাম কুরি, আইরিন আর লিজা মাইটনার।


১৯৩৩ সালের সল্‌ভে কনফারেন্সে আইরিন ও মাদাম কুরি

১৯৩৪ সালের শুরুতে আইরিন ও ফ্রেড পুরোদমে কাজ শুরু করেছেন পোলোনিয়াম আর অ্যালুমিনিয়ামের পাত নিয়ে। তাঁরা দেখতে পেলেন পোলোনিয়ামের আলফা পার্টিক্যল অ্যালুমিনিয়ামের সাথে বিক্রিয়া করে নতুন ধরনের তেজষ্ক্রিয়তা তৈরি করছে। কীভাবে হচ্ছে? 

অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তাঁরা নিশ্চিত হলেন যে পোলোনিয়াম থেকে আলফা পার্টিক্যল বের হয়ে অ্যালুমিনিয়ামের নিউক্লিয়াসের সাথে সংঘর্ষ ঘটায়। তাতে অ্যালুমিনিয়ামের নিউক্লিয়াস থেকে একটি নিউট্রন বেরিয়ে আসে - ফলে অ্যালুমিনিয়াম নিউক্লিয়াস রূপান্তরিত হয় একটি তেজষ্ক্রিয় ফসফরাস নিউক্লিয়াসে। কয়েক মিনিট পর এই তেজষ্ক্রিয় ফসফরাস থেকে একটি পজিট্রন বের হয় - ফসফরাস নিউক্লিয়াস তার তেজষ্ক্রিয়তা হারিয়ে পরিণত হয় একটি সিলিকন নিউক্লিয়াসে। তার মানে তাঁরা কৃত্রিম তেজষ্ক্রিয়তার সন্ধান পেয়েছে!

১৯৩৪ সালের ৪ঠা জুলাই সকালে মাদাম কুরি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

১৯৩৫ সালে রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পেলেন আইরিন ও ফ্রেডেরিক জুলিও-কুরি।

নোবেলজয়ী আইরিন ও ফ্রেডেরিক জুলিও-কুরি


নোবেল বক্তৃতা দেবার সময় পদার্থবিজ্ঞানের অংশ বললেন আইরিন, আর রসায়নের অংশ বললেন ফ্রেড। সাংবাদিকদের সব প্রশ্নের উত্তর মহাউৎসাহে ফ্রেডই দিলেন। ফ্রেড প্রশংসা পেতে পছন্দ করেন, মিডিয়া কভারেজ তাঁর খুবই ভালো লাগে। আইরিন কিছুক্ষণ পরেই উৎসাহ হারিয়ে ফেললেন। সংবাদ সম্মেলন শেষে আইরিনকে নোবেল অনুষ্ঠানের কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। শেষে ফ্রেড নোবেল ফাউন্ডেশানের লাইব্রেরিতে গিয়ে দেখলেন আইরিন এক কোণায় বসে নিবিষ্টমনে বই পড়ছেন।

এদিকে ফ্রান্সে তখন প্রগতিশীল পপুলার ফ্রন্ট ক্ষমতায় এসেছে। সমাজতন্ত্রী প্রেসিডেন্ট লিওন ব্লাম মেয়েদের ক্ষমতায়নে বিশ্বাস করেন। কিন্তু ফ্রান্সে তখনো মেয়েদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। [ফ্রান্সে মহিলারা ভোট দেয়ার অধিকার পায় ১৯৪৬ সালে।] প্রেসিডেন্ট ব্লাম শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করলেন, শ্রমজীবীদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ালেন। 

ফ্রান্সের বিজ্ঞান-গবেষণা বাড়ানোর জন্য প্রফেসর জাঁ পেরির উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘ন্যাশনাল ব্যুরো অব সায়েন্টিফিক রিসার্চ’। জাঁ পেরি আইরিনের বাবা-মার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। জাঁ পেরির পরামর্শে প্রেসিডেন্ট ব্লাম ফ্রেডেরিককে ‘ন্যাশনাল ব্যুরো অব সায়েন্টিফিক রিসার্চ’র ডিরেক্টর নিযুক্ত করলেন। আর আইরিন কুরিকে করলেন বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। আইরিন কুরি হলেন ফ্রান্সের প্রথম মহিলা মন্ত্রী। 

পরদিন প্রেসিডেন্টের অফিসে মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন আইরিন জুলিও-কুরি। তিনি সহ মোট তিন জন মহিলা মন্ত্রী নিযুক্ত হয়েছেন। আইরিনকে রেডিয়াম ইনস্টিটিউটের গবেষণা থেকে ছুটি নিতে হলো। সম্পূর্ণ নতুন এই প্রশাসনিক কাজে এসে সবকিছু একেবারে গোড়া থেকেই শুরু করতে হলো আইরিনকে। দায়িত্ব নিয়ে তা ঠিকমত পালন না করার মানুষ আইরিন নন।

মন্ত্রীসভায় আইরিনের সততা আর স্পষ্টবাদিতা অনেকেরই অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ালো। ছয় মাস ধরে কাজ করার পরও ডিপ্লোম্যাটিক ভাষা ও আচরণ আয়ত্ত্ব করতে পারলেন না আইরিন। তিনি বুঝতে পারছেন তাঁর একার পক্ষে পুরো সিস্টেম বদলানো সম্ভব নয়। তাঁর মনে হচ্ছে তিনি ভুল জায়গায় এসে পড়েছেন, তাঁর বদলে ফ্রেড মন্ত্রী হলেই ভালো করতেন। কারণ ফ্রেড ক্ষমতার স্বাদ বোঝেন।

আইরিনের ইচ্ছে করছে বাবা-মার মতো সরবোনের প্রফেসর হতে। প্রফেসর হবার সব যোগ্যতা তাঁর আছে। নোবেল পুরষ্কার পাবার পর পৃথিবীর যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হতে পারেন তিনি। কিন্তু সরবোনের প্রফেসরশিপ পেতে হলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন লাগে। আইরিন ভাবলেন তিনি যদি এখন দরখাস্ত করেন তাহলে তাঁর সহকর্মী শিক্ষামন্ত্রী কোন কিছু না দেখেই তাঁকে অনুমোদন দিয়ে দেবেন। এটা অনুচিত হবে ভেবে তিনি মন্ত্রীত্বে ইস্তফা দিলেন। মন্ত্রীপরিষদের সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।

আইরিন রেডিয়াম ইনস্টিটিউটের পুরনো পদে ফিরে গেলেন। সেখান থেকে সরবোনে প্রফেসর পদের জন্য দরখাস্ত করলেন এবং সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে সরবোনের প্রফেসর পদে যোগ দিলেন। রেডিয়াম ইনস্টিটিউটের পদটিও তাঁর থাকলো। অধ্যাপনা ও গবেষণার জগতে ফিরে এলেন আইরিন। কিন্তু ফ্রেডের সাথে যৌথ গবেষণা আর সম্ভব হলো না। ফ্রেড ‘কলেজ দ্য ফ্রেঞ্চ’ ও ‘ব্যুরো অব সায়েন্টিফিক রিসার্চ’ নিয়ে ব্যস্ত। ফ্রেড ‘ল্যাবরেটরি অব অ্যাটমিক সিন্থেসিস’ নামে নতুন একটা গবেষণাকেন্দ্র তৈরি করেছেন। অ্যাটমিক নিউক্লিয়াস সংক্রান্ত নতুন নতুন গবেষণা চলছে সেখানে। ফ্রান্সের নিউক্লিয়ার গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে আইরিন ও ফ্রেডেরিকের হাত দিয়ে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্রেডেরিক যুদ্ধে যোগ দেন। ছেলে-মেয়ে ও আইরিনকে পাঠিয়ে দেন সুইজারল্যান্ডে। ফ্রেডের নেতৃত্বে ফ্রান্সে গঠিত হয় পারমাণবিক গবেষণাগার। যুদ্ধের পর ফ্রেড ফ্রান্সের হিরো হয়ে গেলেন। ‘কমান্ডার অব দি লিজিয়ন অব অনার’ নিযুক্ত হলেন তিনি। ১৯৪৬ সালে পারমাণবিক শক্তির নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন’ গঠিত হলো। ফ্রেড কমিশনের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হলেন, আইরিন কমিশনের সদস্য মনোনীত হলেন। ফ্রেড কমিশনের প্রশাসনিক কাজে তাঁর দক্ষতার ছাপ রাখতে শুরু করেছেন, আইরিন বৈজ্ঞানিক দিক দেখাশোনা করেন।

১৯৫০ এর দিকে ফরাসি সরকারের ওপর আমেরিকান সরকারের প্রভাব ও চাপ বাড়তে শুরু করেছে। আমেরিকান সরকার কমিউনিস্ট ফোবিয়ায় ভুগছে। তার ধারাবাহিকতায় ১৯৫০ সালের ২৮শে এপ্রিল ফ্রেঞ্চ অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন থেকে ফ্রেডকে বরখাস্ত করা হলো। ফ্রেডের অপরাধ - তিনি ফ্রান্সের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। মানসিকভাবে খুব হতাশ হয়ে পড়লেন ফ্রেড। তাঁর শরীরেও তেজষ্ক্রিয়তার প্রভাব দেখা দিতে শুরু করেছে। খুবই অসুস্থ হয়ে পড়লেন ফ্রেড। 

অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন থেকে আইরিনকে বরখাস্ত করা না হলেও ১৯৫১ সালের ১০ই জানুয়ারি তাঁর মেয়াদ শেষ হবার পর তাঁকে কমিশন থেকে বাদ দেয়া হয়। সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় এবং রেডিয়াম ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টরের পদ এখনো আছে তাঁর। কিন্তু শরীর তাঁরও খুব খারাপ। এক সময়ের এত ভালো অ্যাথলিট আইরিন নানারকম রোগে ভুগছেন।

১৯৫৫ সালে লিউকেমিয়া ধরা পড়ে আইরিনের। সারাজীবন এক্স-রে আর রেডিয়াম পোলোনিয়ামের তেজষ্ক্রিয়তার সাথে থাকতে থাকতে ব্লাড-ক্যান্সার হয়ে গেছে তাঁর। হাসপাতালে ভর্তি হতে হলো তাঁকে। 
১৯৫৬ সালের ১৭ই মার্চ মারা যান আইরিন জুলিও-কুরি। 

তথ্যসূত্র:
প্রদীপ দেব, রেডিয়াম ভালোবাসা, মীরা প্রকাশন, ঢাকা, ২০১৪। 




Latest Post

ডাইনোসরের কাহিনি

  বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাণি কী? এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা বলবো নীল তিমি – যারা দৈর্ঘ্যে প্রায় তিরিশ মিটার, আর ওজনে প্রায় ১৯০ টন পর্যন্ত...

Popular Posts