Wednesday, 6 May 2026

প্রিয় সত্যজিৎ রায়

 


সত্যজিৎ রায়কে আজীবন সম্মাননা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে অস্কার পুরষ্কার কমিটি ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরেই টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিল। কথা ছিল ১৯৯২ সালের ৩০ মার্চে লস আঞ্জেলেসে গিয়ে অস্কার পুরষ্কারের অনুষ্ঠানে গিয়ে পুরষ্কার গ্রহণ করবেন সত্যজিৎ রায়। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যে তাঁর শরীর এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে তাঁর পক্ষে সশরীরে গিয়ে পুরষ্কার গ্রহণ করা সম্ভব হবে না জানিয়ে দেয়া হলো।


অস্কার পুরষ্কার কমিটির টেলিগ্রাম


অস্কার কমিটির লোকজন কলকাতায় নিয়ে এলেন সেই পুরষ্কার। সত্যজিৎ রায় তখন হাসপাতালের আইসিইউতে। সেখানেই তিনি পুরষ্কার গ্রহণ করে সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করলেন। সবকিছু ভিডিও করে নিয়ে গেলেন অস্কার কমিটির লোকজন। 

অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে সত্যজিৎ রায়কে পুরষ্কার দেয়ার দায়িত্ব পেয়েছিলেন অড্রি হেপবার্ন। অড্রি হেপবার্নের মতো শীর্ষস্থানীয় তুখোড় অভিনেত্রী – সত্যজিৎ রায়ের হাতে আজীবন সম্মাননা পুরষ্কার তুলে দেয়ার সুযোগ পেয়ে আপ্লুত হয়ে টেলিগ্রাম পাঠালেন সত্যজিৎ রায়কে।


অড্রি হেপবার্নের টেলিগ্রাম


শুধু তাই নয়, সত্যজিৎ রায়ের নাম নির্ভুলভাবে উচ্চারণ করার জন্য অড্রি হপবার্ন হলিউডে একজন বাঙালি উচ্চারণ বিশেষজ্ঞের কাছে শিখে নিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়ের নামের উচ্চারণ। সেই অস্কার অনুষ্ঠানে অড্রি হপবার্ন ‘সত্যজিৎ রায়’-ই উচ্চারণ করেছিলেন, ‘শাটিয়াজিট রে’ নয়।

১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল থেকে ২ মে – মাত্র কয়েকদিন বাকি ছিল সত্যজিৎ রায়ের ৭১ পূর্ণ হবার। চলে গেলেন তিনি। আরো ক’বছর বাঁচলে আরো কত কিছু দিয়ে যেতে পারতেন আমাদের।

আমাদের – কথাটি আসলেই আমাদের, যারা তাঁর সৃষ্টিকে ভালোবাসি। তাঁর সিনেমা, গল্প, কথা, গান, ছবি – সবই ভালোবাসি। সৃষ্টির ভেতর দিয়ে শ্রষ্ঠার বেঁচে থাকা এখানেই সার্থক হয়ে ওঠে। একসাথে সবাইকে দিয়ে যাওয়া – শুধুমাত্র শিল্পকর্মের মাধ্যমেই সম্ভব। অন্যকোনো সম্পদ কিংবা দায় কিংবা দায়িত্ব এভাবে দিয়ে দেয়া যায় না।

 মানুষ সত্যজিৎ, পরিচালক সত্যজিৎ, সুরকার সত্যজিৎ, লেখক সত্যজিৎ - প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই মানুষটি এতটাই ঋজু আর সুশৃঙ্খল যে – মাঝে মাঝে তাঁকে মানুষ বলেই মনে হয় না। মনে হয় যেন এক সাড়ে ছয় ফুটি কর্মদৈত্য সবকিছু করে গেছেন একের পর এক।


মা, স্ত্রী, ও পুত্রের সাথে সত্যজিৎ রায়

আমার কাছে সত্যজিৎ রায়ের কর্মপদ্ধতি এখনো ভীষণ রহস্যময়। এতকিছু করার সময় তিনি পেতেন কীভাবে? দিনের চব্বিশ ঘন্টা তো আমারও আছে। কেন দিনের শেষে সময় হাতড়ে বেড়াতে হয়?

এত স্বচ্ছ চিন্তা করার মগজ তিনি কীভাবে তৈরি করেছিলেন? আর কোথায় পেয়েছিলেন এত মানবিকতাবোধ, নীতিবোধ! তাঁর সৃষ্টি প্রতিটি কাজে বৃহত্তর মানবিকতার খোঁজ আমরা সবসময়ই পাই। কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি যেরকম সোচ্চার চরিত্র তৈরি করেছেন তাঁর বিভিন্ন সিনেমায় – বর্তমানের চলচ্চিত্রের সাথে তুলনা করলে মনে হয় আমাদের পুরো ইন্ড্রাস্ট্রি হাত-মাথা বেঁধে ফেলেছে কুসংস্কারের রঙিন সুতোয়।

সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে চর্চা নিয়মিত চলছে। ফেলুদা’র প্রতিটি কাহিনি নিয়ে একাধিকবার চলচিত্র তৈরি হয়েছে। ফেলুদা-তোপশে-জটায়ুর আদলেই ঘুরপাক খাচ্ছে বর্তমানের গোয়েন্দারা। সত্যজিৎ রায়-এর সৃষ্টির আদলে সৃষ্ট হচ্ছে অনেক কিছুই। কিন্তু আমরা কি আর একটাও ‘সত্যজিৎ রায়’ পাবো কোনোদিন? 


Latest Post

প্রিয় সত্যজিৎ রায়

  সত্যজিৎ রায়কে আজীবন সম্মাননা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে অস্কার পুরষ্কার কমিটি ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরেই টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিল। কথা ছিল ১৯৯২ সালের ৩০ ম...

Popular Posts