Monday, 24 August 2026

পাঠকের দিনলিপি ২৬-অক্টোবর-২০০৪

 


অক্টোবর ২৬, ২০০৪

সংবাদপত্রে যে সমস্ত উপসম্পাদকীয় বের হয় তার বেশির ভাগই ফরমায়েশি লেখা। আর কিছু নিয়মিত কলাম বের হয়। আর খুব যত্ন করে সময় নিয়ে গবেষণা করে যারা লেখেন তাদের যদি পরিচিতি না থাকে তেমন তাহলে খুব একটা ছাপানো হয় না। এই হলো কথা। এখন বাংলাদেশে দুই ধরনের সংবাদপত্র আছে। একটা হলো নিরপেক্ষ নাম নিয়ে এদিক ওদিক দুদিক সামলে চলা। অন্যটা হলো দলীয়। এরকমই হয়। সবদেশেই। আমাদের দেশের সংবাদপত্রের পাঠক অন্যান্য দেশের পাঠকের চেয়ে বেশি সিরিয়াস। ইন্ডিয়ার সংবাদপত্রের চেয়েও আমাদের দেশের সংবাদপত্রের মান ভালো। সাপ্তাহিক গুলির মানও খারাপ নয়। তবুও দেখা যায় দেশ বা সানন্দা বা ইন্ডিয়া টুডে যেরকম ব্যবসা করে বাংলাদেশে, বাংলাদেশের কোন ম্যাগাজিন ইন্ডিয়ার বাজারে সেরকম পারে না। কারণ বাংলাদেশের ম্যাগাজিন সেখানে ঢুকতেই দেয়া হয় না। এরকম একটা লেখা পড়েছি গত সপ্তাহের কোন একটা কাগজে। ঠিক মনে করে উঠতে পারছি না কোথায় পড়েছি।

জাফর ইকবালের লেখা পড়েছি প্রথম আলোতে। বাংলাদেশের প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি নিয়ে লিখেছেন। তাঁর কথার সাথে আমিও একমত। আমাদের দেশে কোন নিয়মই চলে না। আনিসুল হক লিখেছেন উত্তরাঞ্চলের মঙ্গা নিয়ে। প্রতিবছরই লিখতে হয় এসময়। কিন্তু কোন কিছুরই পরিবর্তন কখনো হয় না। যে গরীব সে গরীব হতেই থাকে। কথা বলার স্বাধীনতা থাকলে মনে হয় অনেক কিছুর স্বাধীনতাই ত্যাগ করতে হয়। আমি ঠিক জানি না। যেমন সোভিয়েত ইউনিয়নে সবার জন্য খাদ্য আর কাজের ব্যবস্থা করা গিয়েছিলো। কিন্তু ধনতন্ত্রের দেশ একযোগে বলতে শুরু করলো সেখানে মানুষ আর যন্ত্রে কোন পার্থক্য থাকছে না। মানুষের স্বাধীনতা থাকতে হবে। এখন রাশিয়া একটি অধঃপতিত দেশ। দুর্নীতি সেখানের সব জায়গায় ঢুকে গেছে। আমি জানি না। আমেরিকায় আছি একবছরেরও বেশি সময় ধরে। এখানের মানুষ যা খুশি বলতে পারে। কিন্তু চিন্তার স্বাধীনতা আছে কি? এখানে টাকা না থাকলে কিছুই নেই। সবার ভেতর তাই একটাই চিন্তা তা হলো কীভাবে টাকা পাওয়া যাবে। এখানেও বেকার আছে। ধনের বৈষম্য এখানে অপার। কিন্তু এখানে মিডিয়া আছে। ধন এত প্রচুর আছে যে যারা খাচ্ছে তাদের উচ্ছিষ্ট খেয়েও অনেকের সারাজীবন চলা যায়। আমাদের দেশেও খাওয়ার মানুষ আছে। তারা এখনো এতই ক্ষুধার্ত যে তাদের কোন উচ্ছিষ্ট থাকে না যা খেয়ে যারা কখনো খেতে পায় না তারা বাঁচবে।

এরকম অবস্থার কথা নিয়ে কত কথা যে লেখা হয়। সংবাদ বিক্রি করেও তো চলতে হবে অনেকের। সংবাদপত্রের মালিকেরা ধনী, ক্ষমতাবান। তাদের অন্যান্য ব্যবসার মতো সংবাদপত্রও ব্যবসা। সেখান থেকেও কিছু ভাল  ভালো বিষয় উঠে আসবে এটাই স্বাভাবিক। একদম সিনিক হলে তো চলতে পারবো না।

যেমন ফয়েজ আহমেদ। প্রাচীন ব্যক্তি। প্রগতিশীল। সাম্প্রতিক একটা লেখায় লিখেছেন বাংলাদেশের হিন্দুরা যারা এখনো দেশে রয়ে গেছে তারা মনে মনে ইন্ডিয়াকে নিজেদের দেশ মনে করে। নিজেকে আমি কোন নির্দিষ্ট ধর্মের অধীন মনে না করতে পারি, কিন্তু আমার পরিবার তো হিন্দু। তাদের কেউ তো ইন্ডিয়াকে তাদের নিজের দেশ মনে করে না। এরকম পরিবার কি আরো নেই? আমাদের মারা হচ্ছে, আবার অপবাদও দেয়া হচ্ছে। কিন্তু ফয়েজ আহমেদের মতো লোক যখন তা করেন তখন তা ভালো লাগার কোন কারণ আছে? মুনতাসির মামুন লিখেছেন এই ব্যাপারে।

মৃদুভাষণের ওয়েব এড্রেস চেঞ্জ হয়েছে অনেকদিন।  আমি জানতাম না। পুরানোটার সাথে যে নতুনটার লিংক দেয়া উচিত তা কি তারা জানেন না কেউ? আমাদের সবকিছু কেমন যেন দায়সারা। লেখাগুলো ভালো হয় সেখানে। মাঝে মাঝে।

২৩ অক্টোবর কবি শামসুর রাহমানের জন্মদিন। ছিয়াত্তর বছর হলেন কবি। এখনো সক্রিয়। অনেকেই লিখেছেন তাঁকে নিয়ে। এটাই হওয়া উচিত। আমাদের দেশের একজন মহান কবি তিনি। মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন ভোরের কাগজে স্মৃতিচারণ মূলক একটি লেখা।

প্রথম আলোর আলপিন কিন্তু বেশ ভালো হয়। বিশেষ করে রাজনৈতিক পিন ফুটানোটা। ২৫ অক্টোবরের সংখ্যাটা মূলত বেগুন বিষয়ে। বাজারে এখন বেগুনের দাম প্রায় একশ টাকা কেজি। কৃষক যদি এক কেজি বেগুন ফলিয়ে আশি টাকাও পান, তাহলে একদিক দিয়ে ভালো। কিন্তু কৃষক পাচ্ছে বড়জোর বিশ টাকা। আসল মুনাফা লুটছে একশ্রেণীর মানুষ, যারা কৃষক নন। আওয়ামী লীগ কীভাবে বাজার দর মানুষের ক্রয় ক্ষমতার ভেতরে রেখেছিলো? তাদের সেজন্য একটুও কিন্তু সম্মান দেয়নি কেউ। এখনো কেউ কি মনে করতে পারছেন যে আওয়ামী আমলে জিনিস পত্রের দাম বাড়েনি?

বাংলাদেশ দুর্নীতির নাম্বারে আবারো ফার্স্ট হয়েছে। এবার মন্ত্রীরা লেগেছেন সংবাদপত্রের পেছনে। কারণ তারাই নাকি সব প্রকাশ করে বাংলাদেশকে ফার্স্ট করে দিয়েছে। তবুও ভালো যে এখনো আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্র বলছেন না। কিছুদিন পরে বলবেন। নাজমুল হুদা বলেছেন সাংবাদিকদের র‌্যাবের আওতায় নিয়ে আসতে। মানে ধরে মার দিতে। তিনি বলতেই পারেন। কারণ সিএনজি থেকে তিনি যা পেয়েছেন তাতে তার কয়েক পুরুষ আরামে চলতে পারবে। তিনি মানবাধিকারের নামে রেলওয়ের জায়গা দিয়েছেন তার (একটা চন্দ্রবিন্দু এখানে দেয়া উচিত, কিন্তু ইচ্ছা করছে না। সম্মান দেখানো কেন উচিত তাই বুঝতে পারছি না। এমনিতে তো আমার কোন ক্ষমতা নেই, কিন্তু আমার লেখা তো আমার। এখানেই আমার যা করার করতে পারি। এখানেও দৌড়টা এই পর্যন্তই) স্ত্রীকে।  সুমন্ত আসলাম লিখেছেন এই নিয়ে আলপিনে।

আই পত্রিকার শারদিয়া সংখ্যা পড়লাম। কয়েকটা গল্প। দিব্যেন্দু পালিতের গল্প ‘যে যেখানে’। শ্রীলেখা আর গায়ত্রী বন্ধু অনেকদিনের। এপার্টমেন্ট হাউজে এসে প্রতিবেশী হিসেবে অন্তরংগতা হয় গায়ত্রীর সাথে। গায়ত্রীর স্বামী মারা গেছে কয়েক বছর আগে। এত কম বয়সে স্বামীকে হারিয়ে কেমন হয়ে যায় গায়ত্রী। শ্রীলেখার স্বামী উচ্চপদে কাজ করে। একদিন এই তিনজনে বাইরে যাবার সময় খবর আসে শ্রীলেখার স্বামী হঠাৎ স্ট্রোক করে হাসপাতালে। তাকে দেখতে যাবার পথে গায়ত্রী নিজের স্বামীর স্ট্রোকের কথা বলতে শুরু করে। শুনতে ভালো লাগে না শ্রীলেখার। তার মনে হয় গায়ত্রী ভাবছে বা চাইছে যেন তার স্বামীর মতো শ্রীলেখার স্বামীও মারা যায়। গায়ত্রীকে তাই সাথে নেয় না হাসপাতালে গিয়ে ইনটেনসিভ কেয়ারে যাবার আগে।

কৃষ্ণকলি রায়ের গল্প ‘পাগলি তোমার সংগে’। কেন এটাকে গল্প বলা যাবে আমি জানি না। বাসে অফিস যাবার পথে একজন পাগলি প্রতিদিন লেডিস সিটের কাছে এসে দাঁড়ায়। খাবার চেয়ে নেয় একজনের কাছে। একেকদিন একেক নামে ডাকে। মাঝে মাঝে ফিলসপিও আওড়ায়। মাঝখানে কিছুদিন আসে না। সবাই মনে করে সে মরে গেছে। আবার একদিন দেখা যায় তাকে। সেদিন খাবার চায় না। অলংকার চায়। এই হলো গল্প।

ঋত্বিক বসুর গল্প ‘কবিতার উৎস সন্ধানে’। একজন আধুনিক কবি একা থাকে। একজন মা বাপ মরা মেয়েকে খুঁজে পায় সমুদ্রের ধারে। দত্তক নেয় তাকে। মেয়েটির সাথে অনাবিল স্নেহের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে সে। তারপর কিছুটা কবিগুরুর পোস্টমাস্টার। কিন্তু একদিন মেয়েটি হেঁটে হেঁটে সমুদ্রে চলে যায় যেখানে তার মা বাবা গেছে। তারপর কবির কবিতা নাকি প্রাণ পায়। আঘাত না পেলে নাকি ভালো লেখা আসে না। শোক না পেলে নাকি শক্তি আসে না। কী জানি বাপু, আমি তো কবি নই।

দেবনাথ ঘোষালের গল্প ‘দূরের পথ’। আমি দুঃখিত দুই পৃষ্ঠার এই গল্পে কী আছে আমি জানি না। ঘুড়ি উড়াচ্ছে বুঝতে পারলাম। কিন্তু মাজেজাটা কী? জানি না।

অমিতাভ রায়ের গল্প ‘পি এম এর মিটিং’ দারুন উপভোগ করেছি।  প্রধানমন্ত্রী কিছু কিছু দপ্তর নিজের কাছে রাখতে পছন্দ করেন। আর অসময়ে মাঝে মাঝে সচিবালয়ে এসে বসেন এই দপ্তরের কাজ দেখার জন্য। তখন সেখানের অবস্থা কী হয় তার চমৎকার একটা বর্ণনা দিয়েছেন লেখক। যেদিকেই যাও নিরাপত্তা কর্মী। রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম। নিরাপত্তা কর্মীদের হাতে অফিসের বড়বাবুদের হেনস্তা দেখে ছোটদের এক ধরনের আরাম পাওয়া। উঁচুপদের লোকের ব্লাড প্রেসার বেড়ে যাওয়া। আর প্রধানমন্ত্রীর প্রস্থান  শেষে অশ্বডিম্ব প্রসব।

উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণী পর্যন্ত বাংলা সাহিত্য পড়তে হয়েছে পরীক্ষা পাসের জন্য। তখনো আমি উপভোগ করেছি এই বিষয়টা। উচ্চমাধ্যমিকে আমি খুব একটা ভালো ছাত্র ছিলাম না। কোন পরীক্ষায় প্রমাণ করতে পারিনি যে আমি ভালো ছাত্র। কিন্তু বাংলায় আমি সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়ে গিয়েছিলাম কলেজে। এখানে সে প্রসংগ কেন আসছে সে প্রসংগে আসছি এখন। বাংলায় আমাদের একটা প্রশ্ন সবসময়েই থাকতো তা হলো নামকরণের সার্থকতা। সে কবিতার হোক, বা গল্পের হোক। কবি বা লেখক কেন এই নাম রেখেছেন কবিতার বা গল্পের তা লিখতে হবে। এখানে আমরা কখনোই  স্বাধীন ভাবে আমাদের মত জানাতে পারিনি। কারণ সবসময়েই লিখতে হয়েছে লেখক যে নাম দিয়েছেন তা সার্থক নাম। এই নামের কোন বিকল্প নেই। এখন কোন নাম যদি আমার পছন্দ না হয়, বা আমি যদি মনে করি এই নামটি আসলে সার্থক নয়, আমার যুক্তি দিয়ে বুঝাই, তাহলেও কিন্তু আমার পরীক্ষক আমাকে নাম্বার দেবেন না। কারণ তিনি ধরেই রেখেছেন এই নাম সার্থক। হতেই হবে, কারণ লেখক রেখেছেন এই নাম। 

বাণী বসুর গল্প ‘অক্রুর সংবাদ’ পড়ার পরেও আমাকে যদি বলা হয় এর নামকরনের সার্থকতা নিরূপন করতে, আমার বড় বিপদ হবে। কারণ গল্পটার এই নাম কেন তা আমি বুঝতে পারিনি। গল্পটা এরকমঃ রণিতা আর সৃঞ্জয়ের ছেলে টেডি। রণিতার মা সুমিতার সাথেই টেডির ওঠাবসা। সুমিতা টেডিকে ছাড়া থাকতে পারেন না। স্কুলে পড়ান সুমিতা। সৃঞ্জয়ের পুনায় ট্রানসফারের পরে সুমিতার খুব মন খারাপ হয়ে যায় টেডিকে ছেড়ে থাকতে। টেডির টেডি পুতুলকে নিজের কাছে রেখে আদর দেন সুমিতা। ইচ্ছা থাকা সত্বেও সময় করে উঠতে পারেন না তিনি পুনায় গিয়ে থাকতে। টেডি সেখানে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। সময়ের নিয়মেই সে আর দিদাকে মিস করে না আগের মতো। টেলিফোনেও আগের মতো উত্তাপ পান না সুমিতা। বুক ভেঙে যেতে যায় তার। মেয়ে আসে মায়ের কাছে। জামাই বা নাতি সময় করে উঠতে পারে না। এই নাতি দিদাকে ছেড়ে এক সেকেন্ডও থাকতে পারতো না চিন্তা করে বুকটা কেমন করে ওঠে দিদার। সুমিতা ঠিক করে রিটায়ার করেন রিটায়ার করে পুনায় গিয়ে থাকবেন নাতি আর মেয়ের কাছে। প্রস্তুতি চলে। এদিকে মেয়ে আর জামাই প্রস্তুতি নিতে থাকে বোস্টনে চলে যাবার। মা কষ্ট পাবে বলে একদম শেষ সময়ে জানানো হয়। এই হলো গল্প। এখানে অক্রুর সংবাদের কী হলো? মহাভারতে অক্রুরের গল্প আছে। নাকি রামায়নে? এই দু’টোর কোন একটাতে পড়ছিলাম অক্রুরের কথা। এখন মনে পড়ছে না কাহিনীটা। কিন্তু বাণী বসু কি ভেবে বসে আছেন আমরা সবাই তাঁর মতো অক্রুরের কথা জানি? বাংলা সাহিত্যে অনেক বাগধারা আছে পৌরানিক উপাখ্যান থেকে নেয়া, যেমন দক্ষযজ্ঞ, দাবানল, রাবণের চিতা। এগুলোর পেছনের কাহিনীগুলো জানা আছে বলে ভালোও লাগে। কিন্তু অক্রুর সংবাদ কি কোন বাগ্‌ধারা? জানি না।

আইভি চ্যাটার্জি লিখেছেন ‘হিন্দুধর্ম ও সংস্কার’ প্রসংগে। তিনি ঠারে ঠুরে বলতে চেয়েছেন অনেক প্রচলিত সংস্কার বিজ্ঞানসম্মত, আর কুসংস্কার নয়। ব্যাখ্যা করেননি। শ্রাদ্ধ, উপনয়ন, পুংসবন, অন্নপ্রাশন এগুলো বলেছেন বিজ্ঞানসম্মত। কিন্তু ব্যাখ্যাটা কী? বিজ্ঞানকে ধর্মওয়ালারা ভয় পেতে শুরু করেছে বলেই তারা ধর্ম আর বিজ্ঞানে বিরোধ নেই এটা বলেন সুযোগ পেলেই। তবে এরকম এক উগ্রলোকের দেখা পেয়েছিলাম চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় যাবার পথে। ট্রেনে। তিনি আমাকে বুঝালেন ধর্মের বিজ্ঞান সম্মত হওয়ার দরকার নেই,বরং বিজ্ঞানের উচিত ধর্মসম্মত হওয়া। অর্থাৎ কিনা বিজ্ঞানীর উচিত ধর্মের বই দেখে বিজ্ঞান চর্চা করা। তাঁর মতে কোরানের চেয়ে বেশি আর কোন বিজ্ঞান আছে কি? থাকলেও তা থাকে কীভাবে? আমি তাঁর কাছে পরিচয় দিয়েছিলাম গ্রামের স্কুলের কৃষিবিজ্ঞান শিক্ষক হিসেবে। কেন দিয়েছিলাম জানি না।

শমীক মুখোপাধ্যায় ভ্রমণ কাহিনী লিখেছেন ’ফিলিপ দ্বীপের গপ্পো’। এটা যে মেলবোর্নের ফিলিপ আইল্যান্ড তা বুঝতে একটু সময় লেগেছে। তবে পড়ে মনে হলো এর চেয়ে ভালো লেখা লেখা সম্ভব। খারাপ লাগলো যখন এই ভারতীয় বাঙালি লেখেন ‘বিদেশ বিভুঁয়ে প্রথম আলাপে সব বাঙালিই প্রথমে  জানান বাড়ি কলকাতা’। আমাদের বাংলাদেশের কথা কেন মনে আসে না তোমাদের? নাকি কোন বাংলাদেশী বাঙালির দেখা পাওনা তোমরা? নাকি পেলেও তাদের বাঙালি মনে করো না।

আর কে নারায়ণের আত্মজীবনী My Days পড়লাম। বইটি প্রকাশিত হয়েছে ১৯৭৩ সালে। চমৎকার লেখা। অত্যন্ত পরিমিত। আর নির্মোহ। তসলিমা নাসরিন এই বই পড়েছেন বলে আমার মনে হয় না। সে যাই হোক। নারায়ণের শৈশব কৈশোর কেটেছে তাঁর মামার বাড়িতে। সেখানের স্কুলের বর্ণনা আছে। ছুটিতে মা বাবার কাছে আসতেন। আছে সেখানের কথা। পরে তাঁর বাবা যখন হেডমাস্টার হয়ে ট্রানস্ফার হন, সেখানে পাকাপাকি ভাবে স্কুল শেষ করেন। সায়ন্সের সাব্জেক্ট গুলো একদম ভালো না লাগলেও কোন রকমে পাস করেছিলেন। কিন্তু ফেল করেছিলেন ইংরেজিতে। ফলে এক বছর বসে থাকতে হয়েছে কলেজে ঢোকার আগে। সে সময় ইচ্ছা মতো পড়াশুনা করেছেন সাহিত্য আর সাহিত্য। লেখার শুরুও তখন। 

বি এ পাস করে এম এ পড়তে ভর্তি হবার জন্য গিয়ে এক বন্ধু যখন বললো সাহিত্য নিয়ে পড়লে সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা কমে যাবে, তখন এম এ পড়ার ইচ্ছা ত্যাগ করে চলে আসেন। একটা স্কুলে চাকরি হয়। এক সপ্তাহের মধ্যে সেখান থেকে চলে আসেন তিনি। পরে আবার গিয়েছিলেন, কিন্তু দুদিন পরেই চলে আসেন চিরতরে। কোন চাকরি করা হয়নি এর পরে। সাংবাদিকতা করেছেন। বিয়ে করেছেন নিজের পছন্দেই। একটা কন্যা হেম কে রেখে স্ত্রী মারা যান টায়ফয়েডে বিয়ের পাঁচ বছরের মধ্যেই। আর বিয়ে করেননি। 

উপন্যাস লেখার শুরু করেছিলেন আরো অনেক আগে। এক একটা বই একেক প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে। কোনটাই তেমন ব্যবসা করেনি শুরুতে। রকেফেলার ফাউন্ডেশানের বৃত্তি নিয়ে আমেরিকা এসেছিলেন ষাটের দশকে। সেসময় তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস গাইড লিখেছেন। দেবানন্দ সিনেমা বানিয়েছেন এই উপন্যাসের। খুব কম কথায় বর্ণনা আছে সব কিছুর। ভালো লেগেছে সবই, কেবল তাঁর পরকাল আর প্রেত চর্চার বিষয়টি ছাড়া। মৃত স্ত্রীর সাথে তিনি প্লানচেট করে কথা বলেছেন এগুলি আমার বিশ্বাসের বাইরে আর যুক্তির বাইরে বলে আমি মানতে পারছি না। কিন্তু তিনি কারো উপর কোন কিছু চাপিয়ে দেবার পক্ষপাতি নন। আর তিনি কাউকে আক্রমণ করেননি কোথাও। ভালো লাগলো। 

তিনি শেষ করেছেন নিজের নাতি নাতনির কথা দিয়ে। একাডেমিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি তাঁর কোন শ্রদ্ধা ছিলো না। কন্যা হেম যখন বললো, আমাকে কেন অংক করতে হবে? তখন তিনি সানন্দে সায় দিয়েছিলেন মেয়ের লেখাপড়ার প্রতি অনিচ্ছার প্রতি।

এবার পড়তে শুরু করেছি নোবেল বিজয়ী লেখিকা ইলিয়েনিকের দি পিয়ানো টিচার। 


No comments:

Post a Comment

Latest Post

পাঠকের দিনলিপি ১৭-নভেম্বর-২০০৪

  নভেম্বর ১৭, ২০০৪ প্রথম আলো’র ১০ নভেম্বর নারীপক্ষে আশা নাজনীন লিখেছেন বৃদ্ধাবাসে মায়েদের ঈদ প্রসংগে। বাংলাদেশে প্রবীণ হিতৈষী সংঘের উদ্যোগ...

Popular Posts