Saturday, 19 September 2026

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকবল

 


প্রায় দুই যুগ আগে যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম তখন মনে হতো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মতো এত সুখ এবং স্বাধীনতা আর কোন পেশায় নেই। সেরকম মনে হবার যথেষ্ট কারণ ছিল। দেখতাম সিনিয়র অধ্যাপকদের কেউ কেউ সারা বছর একটা ক্লাসও না নিয়ে শুধুমাত্র করিডোরে গম্ভীরভাবে হেঁটে হেঁটেই সময় কাটিয়ে দেন। আমাদের এমএসসি ক্লাসে সলিড স্টেট ফিজিক্স পড়ানোর দায়িত্ব যাঁর ছিল তিনি ছিলেন খুবই সিনিয়র অধ্যাপক। পুরো এক বছরে তিনি আমাদের একটা মাত্র ক্লাস

নিয়েছিলেন - মাত্র চল্লিশ মিনিটের একটা ক্লাস। সেই সময় প্রায়ই শোনা যেতো যে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক নেই। 

তারপরের বছরগুলোতে অনেক নতুন শিক্ষক যোগ দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। অনেকগুলো নতুন নতুন বিভাগ খোলা হয়েছে, নতুন ভবন তৈরি হয়েছে। কিন্তু এখনো শোনা যায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যথেষ্ট জনবল নেই। সেজন্যই না কি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর লেখাপড়ার মান আগের চেয়েও কমে গেছে। এই মান মাপার মাপকাঠি কী তা আমি জানি না। কিন্তু শিক্ষক ও সহায়ক জনশক্তির পরিমাণ মেপে দেখা খুব একটা কঠিন নয়। কত জন শিক্ষার্থীর জন্য কত জন শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োজিত আছেন তা সহজেই দেখা যায়।

ইন্টারনেটের কল্যাণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওয়েবসাইট এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের সংখ্যা পাওয়া যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমান শিক্ষার্থী ৩৭,০১৮ জন। শিক্ষক আছেন ১৯৯২ জন, অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে মোট স্টাফ আছেন ৬৪৩৬ জন। তার মানে প্রতি ১৮.৫৮ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন করে শিক্ষক আছেন। আর মোট সহায়ক শক্তি হিসেব করলে প্রতি ৫.৭৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন করে মানুষ নিয়োজিত আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমান শিক্ষার্থী ২২,৮৩৬ জন। শিক্ষক আছেন ৮৯৯ জন। অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে মোট স্টাফ ২৮১৪ জন। অর্থাৎ প্রতি ২৫.৪০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক আছেন। মোট সহায়ক শক্তি হিসেব করলে প্রতি ৮.১১ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন করে মানুষ নিয়োজিত আছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে।

প্রতি ছয় জন বা আট জন শিক্ষার্থীর লেখাপড়ার জন্য একজন করে মানুষ নিয়োজিত আছেন বাংলাদেশের সবগুলো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারপরেও আমরা জনবল নেই বলে অভিযোগ করি কীভাবে? তবে কি বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো - যেগুলো ওয়ার্ল্ড র‍্যাংকে জায়গা করে নেয় - সেখানে কি শিক্ষার্থীর তুলনায় জনবল আরো বেশি?

আমার হাতের কাছের দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকাই। ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্ন এবং আর-এম-আই-টি ইউনিভার্সিটি। এই দুটো ইউনিভার্সিটিতে আমি পড়াশোনা করেছি এবং পড়াচ্ছি বলে কিছুটা কাছ থেকে দেখেছি কীভাবে পড়াশোনা ও গবেষণা হয় এখানে। ওয়ার্ল্ড র‍্যাংকিং-এ মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটি প্রথম ৫০ এর মধ্যে থাকে, RMIT থাকে প্রথম ২০০-এর মধ্যে।

২০১৬ সালে মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির মোট পূর্ণ-কালীন শিক্ষার্থী ৪৮,০৮৮ জন, শিক্ষক ৪,০২৯ জন, কর্মকর্তা ৩,৮৪১ জন। অর্থাৎ প্রতি ১১.৯৩ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক আছেন। মোট জনবল হিসেব করলে প্রতি ৫.৮৭ জন শিক্ষার্থীর লেখাপড়ার জন্য একজন মানুষ নিয়োজিত আছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিন্তু প্রতি ৫.৭৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন করে মানুষ নিয়োজিত আছেন। তার মানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর অনুপাতে জনবল মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীর অনুপাতে জনবলের চেয়ে বেশি।

অস্ট্রেলিয়ার যে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি এখন কাজ করি সেখানে বর্তমান শিক্ষার্থীর সংখ্যা আশি হাজারেরও বেশি। ২০১৬ সালের হিসেবটা দেখি। মোট শিক্ষার্থী ৭৮,৭৫৫। শিক্ষকের সংখ্যা ১৯২৬। কর্মকর্তা ২৫০১। প্রতি ৪০.৮৯ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক আছেন। মোট জনবল হিসেব করলে প্রতি ১৫.২৪ জন শিক্ষার্থীর শিক্ষার জন্য একজন মানুষ নিয়োজিত আছেন। (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি ৮.১১ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন মানুষ নিয়োজিত আছেন)। সেই হিসেবে আমাদের বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর অনুপাতে জনবল অনেক বেশি।

তাহলে পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে আমরা পিছিয়ে পড়ছি কথাটা মনে হয় সত্য নয়।

====

5/11/2017


No comments:

Post a Comment

Latest Post

সরকারি চাকরিতে উচ্চতার শর্ত

  সম্প্রতি প্রকাশিত ৩৮তম বিসিএস পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তিটা পড়ে আবারো কিছুটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লাম। বিসিএস পরীক্ষার সাথে আমার একটি অদ্ভুত অন্যরকম অন...

Popular Posts