Showing posts with label পদার্থবিজ্ঞান. Show all posts
Showing posts with label পদার্থবিজ্ঞান. Show all posts

Wednesday, 2 September 2026

কোয়ান্টাম কম্পিউটার: বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী নাকি বিদ্যুৎখেকো

 


আজ থেকে মাত্র চল্লিশ বছর আগেও পৃথিবীতে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল হাতেগোণা। ধরা যাক ১৯৮০র দশকের কথা। মোবাইল ফোন তখনও মানুষের দৈনন্দিন কাজকর্মের অংশ হওয়াতো দূরের কথা, সাধারণ মানুষের আশেপাশেও ছিল না। সেই সময় পৃথিবীতে বিদ্যুৎ শক্তির মোট ব্যবহারের পরিমাণ ছিল বছরে প্রায় ৭,৩০০ টেরা-ওয়াট-আওয়ার (TWh)। [১ টেরা-ওয়াট = ১ মিলিয়ন মেগা-ওয়াট = ১ লক্ষ কোটি ওয়াট]। ২০২৪ সালের মধ্যে মোবাইল ফোন, স্মার্টফোন, পারসোনাল কম্পিউটিং, ক্লাউড

Saturday, 16 May 2026

পাইজোবিদ্যুৎ, তেজস্ক্রিয়তা এবং পিয়ের কুরি

 



নোবেল পুরষ্কারের ইতিহাসে বিশেষ সম্মানের স্থানে অধিষ্ঠিত আছে ফ্রান্সের কুরি পরিবার। কারণ এই পরিবারের পাঁচজন সদস্য ছয়টি নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন। মেরি কুরিকে সারাপৃথিবী চেনে নোবেলজয়ী প্রথম নারী হিসেবে। মেরি কুরি এখনো পর্যন্ত একমাত্র নারী যিনি দুবার নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন – ১৯০৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে এবং ১৯১১ সালে রসায়নে। রেডিওঅ্যাকটিভিটি বা তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার এবং গবেষণার জন্য ১৯০৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন হেনরি

Thursday, 16 April 2026

ম্যাডাম উ – ফিজিক্সের ফার্স্ট লেডি


১৯৪২। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রুদ্ধ্বশ্বাস সময়। ম্যানহাটান প্রজেক্টের পারমাণবিক বোমার মূল উপাদান ইউরেনিয়াম ও প্লুটোনিয়াম তৈরি হচ্ছে  বেশ কয়েকটি গোপন রিঅ্যাকটরে। কলম্বিয়া নদীর দক্ষিণ-পূর্ব দিকে হ্যানফোর্ড রিঅ্যাক্টর তৈরি হয়েছে প্লুটোনিয়াম উৎপাদনের উদ্দেশ্যে। কিন্তু দেখা গেল রিঅ্যাক্টর চালু করার পর চেইন রিঅ্যাকশান শুরু হবার একটু পরেই রিঅ্যাকটর নিজে নিজে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বার বার ঘটছে এই ঘটনা। চিন্তায় পড়ে গেলেন প্রকল্প পরিচালক এনরিকো ফার্মি। তিনি নিজে নিউট্রনের

Thursday, 19 March 2026

নিউটনের প্রিন্সিপিয়া: মহাবিশ্বের মহাগ্রন্থ

 


কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত গবেষণাগ্রন্থগুলির মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বই “থ্রি হানড্রেড ইয়ারস অব গ্র্যাভিটেশান” প্রকাশিত হয়েছে ১৯৮৭ সালে। বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং এবং ওয়ারনার ইসরায়েল এই বইটির সম্পাদনা করেছেন। এই বইটি বিজ্ঞানের ইতিহাসের অনন্য এক আবিষ্কারের স্বীকৃতি – যে আবিষ্কারের নাম “মহাকর্ষ”। ১৬৮৭ সালে স্যার আইজাক নিউটনের ‘প্রিন্সিপিয়া’ প্রকাশের ঠিক তিন শ বছর পর প্রকাশিত এই ‘মহাকর্ষের তিন শ বছর’ বইটি নিউটনের

Monday, 26 January 2026

ফিউশন শক্তির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ

 


আমাদের এই বিশাল মহাবিশ্বের যে বিপুল কর্মযজ্ঞ চলছে – এই যে প্রচন্ড গতিতে ধাবমান কয়েক শত কোটি গ্যালাক্সি, গ্যালাক্সির ভেতর কোটি কোটি নক্ষত্র, ব্ল্যাকহোল, নক্ষত্রগুলির চারপাশে ঘূর্ণায়মান গ্রহ-উপগ্রহ – সবকিছুকে অদৃশ্য মহাকর্ষ বলের মাধ্যমে টেনে রাখাসহ সমস্ত মহাজাগতিক কাজকর্ম নিয়ে প্রচন্ড বেগে চলমান এই মহাবিশ্বের শক্তির উৎস কী? কোত্থেকে আসছে এই বিপুল পরিমাণ শক্তি?কোন্‌ প্রক্রিয়ায় তৈরি হচ্ছে এই শক্তি? এক শব্দে যদি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়, এর উত্তর হবে – ফিউশন।

Monday, 5 January 2026

শ্বেতবিবর: তাত্ত্বিক ভিত্তি ও ক্রমবিকাশ

 


ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণবিবর সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই ধারণা আছে। আমরা জানি যে আমাদের সূর্যের ভরের তিনগুণেরও বেশি ভরবিশিষ্ট নক্ষত্রের মৃত্যু হলে তা অভিকর্ষণ বলের টানে সংকুচিত হতে হতে ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণবিবরে পরিণত হয়। প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলাম তাঁর বিখ্যাত ‘কৃষ্ণবিবর’ বইতে ব্ল্যাকহোলের সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে, “একটি নক্ষত্রের ভর সূর্যের ভরের তিন গুণের বেশি হলে নিউট্রনের ফার্মি চাপ এবং অন্যান্য বহির্মুখী চাপ অন্তর্মুখী মাধ্যাকর্ষণ বল সামলাতে পারে না। তাই

Saturday, 6 December 2025

কোয়ান্টাম-সুড়ঙ্গে অতিপরিবাহিতা

 


পদার্থবিজ্ঞানীরা ভূতে বিশ্বাস না করলেও কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অদ্ভুত ভূতুড়ে কাজকর্মকে অস্বীকার করার কোনো উপায় তাঁদের নেই। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের, বিশেষ করে তার কার্যকরী সমীকরণের একশ বছর পূর্তি উপলক্ষে এবছর (২০২৫) বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে কোয়ান্টাম বর্ষ – ইয়ার অব কোয়ান্টাম সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি। আধুনিক জগতের সমস্ত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির তত্ত্বগুলির গভীরতর স্তর দখল করে আছে কোয়ান্টাম বিজ্ঞান। মৌলিকতম কণা কোয়ার্ক থেকে শুরু করে বিশাল

Monday, 17 November 2025

প্রহেলিকাময় কোয়ান্টাম তত্ত্ব

 


“কোয়ান্টাম জগত বলে আসলে কিছুই নেই। কোয়ান্টাম দশার অস্তিত্ব আছে শুধু আমার মাথার ভেতর যা দিয়ে আমি অঙ্ক করি। কোয়ান্টাম অবস্থা বড়জোর কিছু তথ্যের বর্ণনা দেয় – বাস্তব জগতের সাথে তাদের খুব একটা মিল নেই।“ – কথাগুলি শুনে মনে হতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া কোন শিক্ষার্থী কোয়ান্টাম মেকানিক্সের দুর্বোধ্যতায় বিরক্ত হয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছে। কিন্তু আমাদের অবাক করে দিয়ে অতি সম্প্রতি কোয়ান্টাম মেকানিক্স সম্পর্কে এই কথাগুলি বলেছেন ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ান্টাম

Thursday, 30 October 2025

হেনরি ক্যাভেন্ডিস: অদ্ভুত মানুষ, অসাধারণ বিজ্ঞানী


বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির যে সিঁড়ি ধরে পৃথিবীর মানুষ এত উপরে উঠে এসেছে সেই সিঁড়ির ভিত্তি তৈরি হয়েছে যেসব গবেষণাগারে, সেসব গবেষণাগারের নাম লিখতে হলে প্রথমেই লিখতে হবে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাভেন্ডিস ল্যাবের নাম। এই একটি মাত্র গবেষণাগার থেকে উদ্ভূত গবেষণা এপর্যন্ত অর্জন করেছে একত্রিশটি নোবেল পুরষ্কার। এই গবেষণাগার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৮৭৪ সালে। সেই সময় কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ছিলেন ডেভনশায়ারের সপ্তম ডিউক স্যার উইলিয়াম ক্যাভেন্ডিস।

Tuesday, 10 June 2025

চার প্রজন্মের বেকেরেল: প্রতিপ্রভা ও তেজস্ক্রিয়তা

 


 ১৮৯৫ সালের নভেম্বর থেকে শুরু করে পরবর্তী কয়েক বছরে পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে অনেকগুলি যুগান্তকারী মাইলফলক স্থাপিত হয়েছে। জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী উইলহেল্‌ম রন্টজেন যখন এক্স-রে আবিষ্কার করলেন – তার সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে চারদিকে হৈচৈ পড়ে গেলেও তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানীরা বিপদে পড়ে গেলেন। কারণ তাঁরা তখনো জানেন না পদার্থবিজ্ঞানের কোন্‌ তত্ত্বের সাহায্যে এক্স-রে উৎপন্ন হবার কারণ ব্যাখ্যা করা যাবে।

Monday, 12 May 2025

কোয়ান্টাম মেকানিক্সের একশ বছর

 



কোয়ান্টাম মেকানিক্স যে পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে দুর্বোধ্য বিষয় সে ব্যাপারে কারোরই কোন সন্দেহ নেই। এই বিষয়টি যে শুধুমাত্র পদার্থবিজ্ঞান শিক্ষার্থীদেরই আতঙ্ক তা নয়, কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান যাঁরা আবিষ্কার করেছেন সেসব নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানীদের কাছেও কোয়ান্টাম মেকানিক্স – এই একশ বছর পরেও – দুর্বোধ্য রয়ে গেছে। কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্সের অন্যতম স্থপতি সবচেয়ে স্মার্ট পদার্থবিজ্ঞানীদের একজন রিচার্ড ফাইনম্যান সরাসরি মন্তব্য করেছেন, “আমার মনে হয় আমি

Sunday, 6 April 2025

নিউক্লিয়ার ঘড়ি

 




মানব সভ্যতা বিকাশের শুরু থেকেই সময় সম্পর্কে মানুষ সচেতন হতে শুরু করেছে। সময়ের সাথে সাথে মানুষ যতই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগতভাবে আধুনিক হচ্ছে ততই সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতরভাবে সময় মাপার কলাকৌশল উদ্ভাবিত হচ্ছে। প্রাচীনকালে প্রাকৃতিক ঘটনাগুলি পর্যবেক্ষণ করেই চলতো সময় মাপার কাজ – যেমন সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এক দিন, সূর্যাস্ত থেকে পরবর্তী সূর্যোদয় পর্যন্ত এক রাত। চাঁদ পর্যবেক্ষণ করে মাসের হিসেব, ঋতু পরিবর্তন দেখে বছরের হিসেব। তারপর দিনের সময়কে

Friday, 14 March 2025

জামাল নজরুল ইসলাম: মহাবিশ্বের নিয়তির সন্ধানে

 




বিজ্ঞানজগতে বাংলাদেশের গর্ব বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম। তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞান ও কসমোলজিতে তাঁর যুগান্তকারী অবদান রয়েছে। তাঁর মৌলিক গবেষণাগুলিকে প্রধানত পাঁচটি ধাপে ভাগ করা যায়: কণা পদার্থবিজ্ঞানের ম্যান্ডেলস্ট্যাম রিপ্রেজেন্টেশানের গাণিতিক বিশ্লেষণ, জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটির আইনস্টাইন-ম্যাক্সওয়েল সমীকরণের সঠিক সমাধান, মহাজাগতিক ধুলোকণার ক্ষেত্র সমীকরণের সমাধান, মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি, এবং গাণিতিক অর্থনীতি।

Wednesday, 1 January 2025

ক্লাসিক্যাল ফিজিক্সের নায়ক - লর্ড র‍্যালে

 


লর্ড র‍্যালে নামটি আমাদের কাছে যতটা পরিচিত, জন উইলিয়াম স্ট্রুট ততটা নয়। অথচ নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী লর্ড র‍্যালের আসল নাম হলো জন উইলিয়াম স্ট্রুট। ইংল্যান্ডের এসেক্স কাউন্টির একটি শহরের নাম র‍্যালে। সেখানকার লর্ড ছিলেন বলেই জন উইলিয়াম স্ট্রুটকে সবাই লর্ড র‍্যালে বলে ডাকতো। তিনি ছিলেন তৃতীয় লর্ড র‍্যালে। ক্লাসিক্যাল পদার্থবিজ্ঞানের অনেক কিছুর সাথেই লর্ড র‍্যালের নাম যুক্ত হয়ে আছে তাঁর আবিষ্কার এবং অবদানের জন্য। শব্দ, তাপ, আলোক, তড়িৎচুম্বক, এবং নিষ্ক্রিয় গ্যাস – সবকিছুরই অনেক তত্ত্ব আবিষ্কৃত হয়েছে লর্ড র‍্যালের হাতে। নিষ্ক্রিয় গ্যাস আর্গন আবিষ্কারের জন্য তিনি পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার অর্জন করেছেন ১৯০৪ সালে। লর্ড র‍্যালেকে আমরা এই উপমহাদেশের মানুষ হিসেবে আরো একটি কারণে বিশেষভাবে স্মরণ করি – সেটা হলো তাঁর কাছে পদার্থবিজ্ঞানের পাঠ নিয়েছিলেন আমাদের স্যার জগদীশচন্দ্র বসু। 

জন  উইলিয়াম স্ট্রুটের জন্ম ১৮৪২ সালের ১২ নভেম্বর ইংল্যান্ডের এসেক্সে। তাঁর বাবা জন জেমস স্ট্রুট ছিলেন দ্বিতীয় লর্ড র‍্যালে। র‍্যালে শহরের ব্যারন বা লর্ডশিপ পদটি সৃষ্টি করা হয়েছিল ইংল্যান্ডের রাজা চতুর্থ জর্জের ইচ্ছায়। তাঁর রাজত্বের সময় কর্নেল জোসেফ হোল্ডেন স্ট্রুট ছিলেন সাসেক্স কাউন্টির পার্লামেন্ট মেম্বার। নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের যুদ্ধে খুব বীরত্ব দেখিয়েছিলেন কর্নেল জোসেফ হোল্ডেন স্ট্রুট। রাজা চতুর্থ জর্জ কর্নেলকে পুরষ্কার স্বরূপ র‍্যালে শহরের ব্যারন করতে চাইলেন। ব্যারন পদটি ছোটখাট আঞ্চলিক রাজার মতো - খুব সম্মানজনক, এবং পুরুষানুক্রমিকভাবে অধিকারযোগ্য। অর্থাৎ একবার কেউ ব্যারন হলে তার পরবর্তী প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই পদের সমস্ত সুযোগ-সুবিধা ও উপাধি ভোগ করবে। কিন্তু কর্নেল জোসেফ হোল্ডেন স্ট্রুট নিজে ব্যারন হতে চাইলেন না। কারণ ব্যারন হয়ে গেলে পার্লামেন্ট থেকে পদত্যাগ করতে হবে। তিনি ভোটের রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন। আবার রাজার দেয়া সম্মান ঠেলে ফেলতেও চাইলেন না। তিনি অনুরোধ করলেন তাঁর বদলে পদটি যেন তাঁর স্ত্রীকে দেয়া হয়। রাজা চতুর্থ জর্জ তাঁর ইচ্ছা পূরণ করলেন। প্রথম ব্যারনেস র‍্যালে হলেন শার্লট মেরি গারট্রুড। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর প্রথম সন্তান জন জেমস স্ট্রুট হলেন দ্বিতীয় লর্ড র‍্যালে। ১৮৭৩ সালে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর প্রথম সন্তান জন উইলিয়াম স্ট্রুট হলেন তৃতীয় লর্ড র‍্যালে – যিনি আমাদের আজকের আলোচ্য পদার্থবিজ্ঞানী। [তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে রবার্ট জন ছিলেন চতুর্থ লর্ড র‍্যালে, রবার্ট জনের ছেলে জন আর্থার ছিলেন পঞ্চম লর্ড র‍্যালে, আর বর্তমানে ষষ্ট লর্ড র‍্যালে হয়েছেন জন আর্থারের ছেলে জন জেরাল্ড স্ট্রুট।]

সাত হাজার একরের একটি বিশাল স্টেটের মালিক এবং ব্যারনের  ছেলে হওয়াতে খুবই আরাম আয়েশে কেটেছে জন উইলিয়ামের ছোটবেলা। কিন্তু এত বিত্তবৈভব আরাম-আয়েশের মধ্যে থেকেও খুব একটা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন না জন উইলিয়াম। বাড়িতে গৃহশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে পড়ালেখার শুরু। দশ বছর বয়সে বিখ্যাত ইটেন কলেজে ভর্তি করানো হয়েছিল তাকে। কিন্তু হুপিং কাশিতে আক্রান্ত হওয়ার কারণে তাকে স্কুল ছাড়তে হয় এক টার্মের পরেই। তারপর একটু সুস্থ হয়ে উইম্বলডনের ছোট্ট একটা বোর্ডিং স্কুলে পড়াশোনা ১৮৫৪ থেকে ১৮৫৬ পর্যন্ত। এখান থেকে তাঁকে ভর্তি করানো হলো ইংল্যান্ডের বিখ্যাত হ্যারো স্কুলে। কিন্তু দুই টার্ম পরে সেখান থেকেও চলে আসতে হলো শারীরিক অসুস্থতার কারণে। এরপর তার লেখাপড়ার ব্যবস্থা করা হয় ইংল্যান্ডের দক্ষিণে সমুদ্রতীরবর্তী ডেভন কাউন্টির একটি প্রাইভেট স্কুলে যার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন রেভারেন্ড জর্জ টাউনসেন্ড ওয়ার্নার। ১৮৬০ সালে স্কুল ফাইনাল পাস করলেন জন উইলিয়াম। 

১৮৬১ সালে ভর্তি হলেন কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির ট্রিনিটি কলেজে। স্কুলে থাকতে তেমন কোন বিশেষ মেধার স্বাক্ষর রাখতে পারেননি জন উইলিয়াম। খুবই সাধারণ মানের ছাত্র ছিলেন তিনি। কিন্তু কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তিনি গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ বোধ করতে শুরু করলেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের গাণিতিক দক্ষতা প্রমাণের জন্য প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা আছে যা ম্যাথমেথিক্যাল ট্রাইপোস নামে পরিচিত। অনেকগুলি অত্যন্ত জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে হয় এই প্রতিযোগিতায়। এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার জন্য পাঁচ বছর কঠোর পরিশ্রম করলেন জন উইলিয়াম। এসময় তাঁর গণিতের প্রশিক্ষক ছিলেন কেমব্রিজের বিখ্যাত গণিতজ্ঞ এডোয়ার্ড জন রাউথ। ১৮৬৫ সালে ম্যাথমেথিক্যাল ট্রাইপোস পরীক্ষায় সর্বোচ্চ র‍্যাংক “সিনিয়র র‍্যাংলার” অর্জন করলেন। সেই সময়ের বিশাল অর্জন এটা জন উইলিয়ামের জন্য। কারণ তাঁর সিনিয়র জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল কিংবা লর্ড কেলভিনও ম্যাথমেটিক্যাল ট্রাইপোসে “সিনিয়র র‍্যাংলার” পাননি, পেয়েছিলেন “সেকেন্ড র‍্যাংলার” র‍্যাংক। একই বছর গণিত ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে বিশেষ দক্ষতার পুরষ্কার “স্মিথ প্রাইজ” লাভ করলেন জন উইলিয়াম। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রাক্তন অধ্যাপক রবার্ট স্মিথের টাকায় এই পুরষ্কার প্রবর্তিত হয়েছিল। 

১৮৬৬ সালে জন উইলিয়াম ট্রিনিটি কলেজের ফেলো নির্বাচিত হন। তখনো পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে শুধুমাত্র তাত্ত্বিক গবেষণাই হতো। পরীক্ষণ গবেষণা যা হতো সবই ব্যক্তিউদ্যোগে নিজেদের বাড়িতে বা অন্য কোন ব্যক্তিগত গবেষণাগারে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়েও কোন পরীক্ষাগার ছিল না। ১৮৬৮ সালে জন উইলিয়াম আমেরিকা ভ্রমণে গিয়েছিলেন। তিনি সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষণ গবেষণাগারের কাজকর্ম দেখে এসেছেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষাগার তৈরি করার ক্ষমতা তাঁর ছিল না। কিন্তু তিনি নিজের টাকায় বৈজ্ঞানিক গবেষণার যন্ত্রপাতি কিনে নিজের বাড়ি টার্লিং প্যালেসে ব্যক্তিগত গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করে গবেষণা শুরু করলেন। 

১৮৬৯ সালে প্রকাশিত হলো তড়িতচুম্বকের ধারণার উপর তাঁর প্রথম গবেষণাপত্র। পরবর্তী দুবছরের মধ্যে শব্দের রেজোন্যান্স, আলোর বর্ণ, বিচ্ছুরণ ও প্রতিফলন সংক্রান্ত আরো এগারোটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়।

কেমব্রিজে জন উইলিয়ামের সহপাঠী ছিলেন আর্থার ব্যালফোর, যিনি পরবর্তীতে ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। আর্থার ব্যালফোরের বোন ইভলিনের সাথে প্রেম হয় জন উইলিয়ামের। ১৮৭১ সালে ইভলিন ও জন উইলিয়াম বিয়ে করেন। বিয়ে করার সাথে সাথে জন উইলিয়ামের ট্রিনিটি কলেজের ফেলোশিপ বাতিল হয়ে গেল। কারণ বিবাহিতদের জন্য ঐ ফেলোশিপ নিষিদ্ধ ছিল। 

এদিকে তাঁর শরীরও হঠাৎ প্রচন্ড খারাপ হয়ে গেল। রিউম্যাটিক ফিভারে আক্রান্ত হয়ে প্রচন্ড কাহিল হয়ে গেলেন জন উইলিয়াম। ডাক্তারের পরামর্শে ইওরোপের শীত থেকে বাঁচতে ১৮৭২ সালের ডিসেম্বরে তিনি স্ত্রীকে সাথে নিয়ে চলে গেলেন মিশরে। সেখানে নীল নদের উপর একটি নৌকা ভাড়া করে থাকতে শুরু করলেন। নৌকায় বসেই তিনি লিখতে শুরু করলেন শব্দবিজ্ঞানের উপর প্রথম পূর্ণাঙ্গ বই “দ্য থিওরি অব সাউন্ড”। ১৮৭৭ সালে দ্য থিওরি অব সাউন্ডের প্রথম খন্ড এবং ১৮৭৮ সালে দ্বিতীয় খন্ড প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে অনেক বছর ধরে অনেকগুলি সংস্করণ প্রকাশিত হয় এই বইয়ের। 

১৮৭৩ সালে মিশর থেকে ইংল্যান্ডে ফিরে এলেন জন উইলিয়াম। তার কিছুদিন পরে তাঁর বাবা দ্বিতীয় লর্ড র‍্যালে মৃত্যুবরণ করলে উত্তরাধিকারসূত্রে তৃতীয় লর্ড র‍্যালে হলেন জন উইলিয়াম স্ট্রুট। এরপর থেকে ইংল্যান্ডের প্রথা অনুযায়ী আসল নামের পরিবর্তে উপাধিতেই তিনি পরিচিতি লাভ করতে শুরু করলেন – লর্ড র‍্যালে হিসেবে। 

১৮৭৩ সালে রয়েল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হলেন লর্ড র‍্যালে। আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক গবেষণাও চালিয়ে গেছেন তিনি সমান দক্ষতায়। তখনো পর্যন্ত তিনি তাঁর স্টেটের উপার্জন ছাড়া অন্য কোন প্রতিষ্ঠান থেকে কোন সম্মানী নেননি। বৈজ্ঞানিক গবেষণার সবকিছুই করছিলেন নিজের বাড়ির গবেষণাগারে নিজের টাকায়। সবকিছু ঠিকই চলছিল। ১৮৭৮ সাল পর্যন্ত শব্দ, আলো, তাপ, তড়িৎচুম্বক ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর ষাটটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়ে গেছে। 

কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পরপর তিন বছর পর্যাপ্ত ফসল না হওয়াতে র‍্যালে স্টেটের উপার্জন কমে গেলো। লর্ড র‍্যালে বাধ্য হলেন প্রাতিষ্ঠানিক কাজের বিনিময়ে সম্মানী গ্রহণ করতে। 

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানের প্রথম গবেষণাগার ‘ক্যাভেন্ডিস ল্যাব’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৮৭৩ সালে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন চ্যান্সেলর উইলিয়াম ক্যাভেন্ডিসের নিজস্ব অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত এই গবেষণাগারের প্রথম ‘ক্যাভেন্ডিস প্রফেসর’ হিসেবে যোগ দিয়েছেন বিজ্ঞানী জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল। কিন্তু ১৮৭৯ সালে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে ম্যাক্সওয়েলের মৃত্যু হলে ক্যাভেন্ডিস প্রফেসরের পদ খালি হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুরোধে এবং কিছুটা আর্থিক প্রয়োজনে ক্যাভেন্ডিস প্রফেসর পদে যোগ দিতে রাজি হন লর্ড র‍্যালে। নিতান্ত প্রয়োজন না হলে কাজের বিনিময়ে অর্থ গ্রহণের পক্ষপাতি ছিলেন না তিনি। তাই তাঁর এস্টেটের উপার্জন প্রয়োজনীয় স্তরে পৌঁছানোর সাথে সাথে ১৮৮৪ সালে তিনি ক্যাভেন্ডিস প্রফেসর পদে ইস্তফা দিয়ে নিজের এস্টেটে ফিরে যান স্বাধীন গবেষণায়। 

মাত্র পাঁচ বছরের জন্য ক্যাভেন্ডিস প্রফেসর এবং ল্যাবের পরিচালক হিসেবে কাজ করলেও – এই পাঁচ বছরের মধ্যেই লর্ড র‍্যালে কেমব্রিজের ক্যাভেন্ডিস ল্যাবের যুগান্তকারি পরিবর্তন ঘটান। এতদিন বিজ্ঞানের ক্লাস ও গবেষণাগারে মেয়েদেরকে ঢুকতে দেয়া হতো না। লর্ড র‍্যালে মেয়েদের জন্য সমস্ত বিজ্ঞান ক্লাস ও গবেষণাগার উন্মুক্ত করে দিলেন। গবেষকদের ভেতর সামাজিক যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য চালু করেন বৈকালিক চায়ের ব্যবস্থা – যেখানে চা খেতে খেতে গবেষকরা একে অন্যের সাথে বৈজ্ঞানিক ধারণা বিনিময় করেন। লর্ড র‍্যালের তত্ত্বাবধানে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম চালু হয় তাপ, বিদ্যুৎ, চুম্বক, আলো, শব্দ, এবং পদার্থের ধর্ম সংক্রান্ত পরীক্ষণ পদার্থবিজ্ঞানের পাঠদান। ক্যাভেন্ডিস ল্যাবের পাঁচ বছরে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে ৫৪টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। 

লর্ড র‍্যালের সময়ে ১৮৮০ সালে কেমব্রিজে পড়তে এসেছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু। লর্ড র‍্যালের কাছ থেকেই তিনি উৎসাহ পেয়েছিলেন পরীক্ষণ পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায়। 

১৮৮৪ সালে ক্যাভেন্ডিস প্রফেসরের পদ ত্যাগ করে নিজের স্টেটে ফিরে গিয়ে নিজস্ব গবেষণাগারে আজীবন স্বাধীনভাবে গবেষণা চালিয়ে গেছেন লর্ড র‍্যালে। ক্লাসিক্যাল ফিজিক্সের এমন কোন শাখা নেই যেখানে লর্ড র‍্যালের উল্লেখযোগ্য অবদান নেই। প্রায় সাড়ে চার শ গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন তিনি। আবিষ্কার করেছেন পদার্থবিজ্ঞানের অনেক সূত্র এবং তত্ত্ব। 

গ্যাসের উপাদান ও ঘনত্ব সম্পর্কে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন লর্ড র‍্যালে। স্কটিশ রসায়নবিদ উইলিয়াম রামজির সাথে যৌথভাবে তিনি আবিষ্কার করেছেন নিষ্ক্রিয় গ্যাস আর্গন। এজন্য ১৯০৪ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন লর্ড র‍্যালে, এবং রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন উইলিয়াম রামজি। সেই ১৯০৪ সালের নোবেল পুরষ্কারের সাত হাজার পাউন্ড (বর্তমানের দশ লক্ষ পাউন্ড) পুরোটাই তিনি দান করে দিয়েছিলেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়কে। পাঁচ হাজার পাউন্ড দিয়েছিলেন ক্যাভেন্ডিস ল্যাবের উন্নয়নের জন্য, বাকি দুই হাজার পাউন্ড দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির জন্য। 

পৃথিবীর আকাশ নীল কেন – এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর প্রথম দিয়েছিলেন লর্ড র‍্যালে। আজ আমরা সবাই জানি বাতাসের ধূলিকণার সাথে আলোর স্ক্যাটারিং বা বিক্ষেপনের কারণে আকাশে নীল রঙ বেশি ছড়িয়ে পড়ে বলে দিনের বেলা আকাশ নীল থাকে। এই স্ক্যাটারিং – র‍্যালে স্ক্যাটারিং নামে পরিচিত। 

ব্ল্যাক-বডি রেডিয়েশন বা কালো পদার্থের বিকিরণ সংক্রান্ত র‍্যাইলে-জিনস সূত্র আবিষ্কৃত হয়েছে ১৮৮৯ সালে। মূলত এই সূত্র থেকেই ১৯০১ সালে ম্যাক্স প্ল্যাংক আলোর কোয়ান্টাম তত্ত্বের ধারণা পেয়েছেন। সে হিসেবে বলা চলে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সূচনা হয়েছে র‍্যালের আবিষ্কার থেকে। 

অণুবীক্ষণ, দূরবীক্ষণ, প্রিজম ইত্যাদি আলোকসংবেদী যন্ত্রপাতির রিজলভিং পাওয়ার সংক্রান্ত র‍্যালের আবিষ্কারের ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছে আলোকবিজ্ঞানের কারিগরি দিক। মাইক্রোস্কোপের সাহায্য এত ছোট বস্তু কীভাবে এত বড় আকারে দেখা যায়, কিংবা টেলিস্কোপের সাহায্যে এত দূরের গ্রহ-নক্ষত্র কীভাবে এত কাছে দেখা যায় – অর্থাৎ এসব সূক্ষ্ম আলোকসংবেদী যন্ত্রপাতিতে কীভাবে ছবি তৈরি হয় – সে সংক্রান্ত প্রথম তত্ত্ব দেন লর্ড র‍্যালে। 

বৈজ্ঞানিক সংগঠক হিসেবেও পদার্থবিজ্ঞানের অনেক উন্নয়ন ঘটিয়েছেন লর্ড র‍্যালে। ১৮৮৫ থেকে ১৮৯৬ পর্যন্ত তিনি রয়েল সোসাইটির সেক্রেটারি এবং ১৯০৫ থেকে ১৯০৮ পর্যন্ত রয়েল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন লর্ড র‍্যালে। ১৮৮২ থেকে ১৯০৫ পর্যন্ত রয়েল ইন্সটিটিউশানের ন্যাচারাল ফিলোসফির চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। ১৯০৮ সাল থেকে ১৯১৯ সালে তাঁর মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। 

এত আবিষ্কার, সম্মান, পুরষ্কার সবকিছুর চেয়েও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল পদার্থবিজ্ঞানের গবেষক হিসেবে নিজের কাছে ভালোলাগা। তিনি সারাজীবন গবেষণা করে গেছেন নতুন কিছু জানার প্রতি ভালোবাসা থেকে। ১৯১৯ সালের ৩০ জুন তাঁর মৃত্যু হয়।


তথ্যসূত্র

১। রবার্ট ব্রুস লিন্ডসে, লর্ড র‍্যালে দ্য ম্যান অ্যান্ড হিজ ওয়ার্ক, পারগ্যামন প্রেস, অক্সফোর্ড, ১৯৭০।

২। ব্যারি আর মাস্টার্স, লর্ড র‍্যালে অ্যা সায়েন্টিফিক লাইফ, ওপিএন জুন ২০০৯।

৩। পিটার ওয়েল্‌স, লর্ড র‍্যালে জন উইলিয়াম স্ট্রুট থার্ড ব্যারন র‍্যালে, আইইই ট্রানজেকশান, সংখ্যা ৫৪(৩), মার্চ ২০০৭। 

_______________
বিজ্ঞানচিন্তা নভেম্বর ২০২৪ সংখ্যায় প্রকাশিত







Monday, 9 December 2024

কৃত্রিম স্নায়ুতন্ত্র ও যন্ত্রের লেখাপড়া

 



মানুষ যখন থেকে বুঝতে পেরেছে যে তাদের মগজে বুদ্ধি আছে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মাধ্যমে বুদ্ধির পরিমাণ এবং তীক্ষ্ণতা বাড়ানো যায় – তখন থেকেই জানার চেষ্টা করছে বুদ্ধিমত্তা ব্যাপারটি আসলে কী। মানুষ গভীরভাবে বুঝতে চেষ্টা করছে – আমাদের মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে এবং যান্ত্রিক মস্তিষ্ক বানিয়ে তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালানো যায় কীভাবে।             

গত আড়াই হাজার বছর ধরে ক্রমাগত বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসা এবং গবেষণা কাজে লাগিয়ে মানুষ তার জীবনযাপন আরামদায়ক ও নিরাপদ করার জন্য যা যা লাগে তার প্রায় সবকিছুই উদ্ভাবন করে ফেলার পরও সন্তুষ্ট নয়। যন্ত্র চালানোর কাজটিও এখন যন্ত্রের হাতে তুলে দিচ্ছে তারা।

যখন থেকে আমাদের আধুনিক কম্পিউটার প্রযুক্তি সহজলভ্য হয়ে গেছে তখন থেকেই আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন দ্রুত বদলে যেতে শুরু করেছে। এখন আমরা শুধুমাত্র যে শারীরিক কাজের জন্য যন্ত্রনির্ভর হয়ে উঠছি তা নয়, মানসিক কাজ – যেমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াতেও যন্ত্রের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। মানুষ এখন যন্ত্রকে বুদ্ধিমান প্রাণির মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা তৈরি করে দিতে শুরু করেছে। আর যন্ত্র যখন বুদ্ধিমান প্রাণির মতো সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হচ্ছে তখন সেই বুদ্ধিমত্তার ব্যাপারটি হয়ে দাঁড়াচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা – বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স।

আমাদের মগজে স্নায়ুকোষগুলি যেমন প্রাকৃতিকভাবেই কাজ করতে শুরু করে এবং অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত স্মৃতি জমা রেখে পরবর্তীতে সেখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে – যন্ত্রের মধ্যেও সেরকম ক্ষমতা তৈরি করার লক্ষ্যে আজ থেকে ৭৫ বছর আগে শুরু হয়েছে যন্ত্রকে শেখানোর প্রক্রিয়া – মেশিন লার্নিং। যদিও সেই ১৯৫০-এর দশকের বিজ্ঞানীদের ধারণাও ছিল না যে কম্পিউটার এরকম সহজ হয়ে মানুষের হাতে হাতে ঘুরবে – তবুও সেসময় তাত্ত্বিক গবেষণা শুরু করে দিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা – কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে যন্ত্রের “মগজ” তৈরি করা যায়।

এখন এই একবিংশ শতাব্দীর সিকিভাগ অতিক্রান্ত হবার আগেই আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম পরিচালিত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং-এর দ্বারা। এখন পৃথিবীতে আটশ কোটি মানুষের জন্য দুই হাজার কোটিরও বেশি স্মার্ট ডিভাইস চালু আছে। আগামী বছরের মধ্যে এই সংখ্যা তিন হাজার কোটি ছাড়িয়ে যাবে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪৬৫ হেক্সাবাইট (৪৬৫ মিলিয়ন টেরাবাইট) ডেটা তৈরি হচ্ছে এই যন্ত্রগুলি থেকে। এই বিপুল পরিমাণ ডেটা সংরক্ষণ করে সেগুলি বিশ্লেষণ করার পর সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া মানুষের পক্ষে ক্রমেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু মানুষের পক্ষে অসম্ভব কাজগুলি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সামলাতে কাজে লেগে গেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন অসংখ্য যন্ত্র – যা এখন আমাদের যাতায়াতব্যবস্থা, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, এমন কি রাজনীতিও সামলাচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে কম্পিউটার কীভাবে এসব করছে? কীভাবে এক কম্পিউটার আরেক কম্পিউটারের সাথে নেটওয়ার্ক তৈরি করছে, কীভাবে এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় রূপান্তরিত হচ্ছে, কীভাবে ডেটা থেকে ছবি তৈরি করছে? কী সেই মৌলিক প্রযুক্তি – যার ফলে আর্টফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং মেশিন লার্নিং সম্ভব হচ্ছে? এবছরের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরষ্কার সেই প্রযুক্তিকে সম্মান দিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং-এর মতো দুনিয়া বদলে দেওয়া প্রযুক্তির উদ্ভাবনে মৌলিক অবদান রেখেছেন এরকম দুজন বিজ্ঞানী – প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন হপফিল্ড এবং টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেফরি হিনটনকে ২০২৪ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয়েছে।


জন হপফিল্ড


জন জোসেফ হপফিল্ডের জন্ম ১৯৩৩ সালের ১৫ জুলাই আমেরিকার শিকাগো শহরে। তাঁর বাবার নামও ছিল জন হপফিল্ড। সিনিয়র জন হপফিল্ডও ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক। পোলান্ড থেকে তিনি ছোটবেলাতেই চলে এসেছিলেন আমেরিকায়। পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপকের সন্তান হবার সুবাদে পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ জন্মেছিল জন হপফিল্ডের। ১৯৫৪ সালে ফিজিক্স মেজর নিয়ে তিনি পেনসিলভেনিয়ার সোয়ার্থমোর কলেজ থেকে বিএ পাস করে কর্নেল ইউনিভার্সিটির ফিজিক্স ডিপার্টমেন্ট থেকে তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি করেন ১৯৫৮ সালে। তাঁর পিএইচডির গবেষণাক্ষেত্র ছিল সলিড স্টেট ফিজিক্স। তাঁর পিএইচডি থিসিসে তিনি একটি নতুন কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন – যা পরবর্তীতে তাঁর নামে ‘হপফিল্ড ডাইইলেকট্রিক’ মডেল হিসেবে পরিচিতি পায়।

পিএইচডি অর্জনের পর ১৯৫৮ সালেই তিনি যোগ দেন বেল ল্যাবরেটরিতে। সেখানে হিমোগ্লোবিনের গঠন আবিষ্কারের জন্য গবেষণা করছিল যে গ্রুপ, সেই গ্রুপে তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। ১৯৬১ পর্যন্ত সেখানে কাজ করার সময় তিনি জীববিজ্ঞানে – বিশেষ করে ফিজিওলজিতে পদার্থবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক প্রয়োগের সম্ভাবনা খুঁজে পান। ১৯৬১ সালে তিনি ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া বার্কলের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে যোগ দেন কন্ডেন্সড ম্যাটার ফিজিক্স পড়ানো ও গবেষণায়। ১৯৬৪ সালে তিনি চলে যান প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে। ১৯৮০ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে ছিলেন।

প্রিন্সটনে তিনি কন্ডেন্সড ম্যাটার ফিজিক্সের গবেষণার পাশাপাশি শারীরবিজ্ঞানেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। কন্ডেন্সড ম্যাটার ফিজিক্সের গবেষণায় অবদানের জন্য ১৯৬৯ সালে তিনি ‘অলিভার বার্কলে পুরষ্কার’ পান।

জীববিজ্ঞান ও শারীরবিজ্ঞানের গবেষণার দিকে তাঁর আগ্রহ জন্মাতে থাকে – শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের কার্যাবলি পদার্থবিজ্ঞানের তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় দেখে। শরীরের কোষগুলি ক্রমাগত বিভাজিত হচ্ছে। কোষ বিভাজনের সময় কোষের ডিএনএ প্রথমে ঠিক দ্বিগুণ হয়ে যায় – পরে দুই ভাগ হয়ে আলাদা দুটো কোষে পরিণত হয়। এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় যদি কোন ত্রুটি থাকে তাহলে কোষ বিভাজনের ফলে ত্রুটিযুক্ত কোষের পরিমাণ বাড়তে থাকে – ফলে শরীরে জিনগত ত্রুটি দেখা দেয়। জন হপফিল্ড এই ত্রুটি শনাক্তকরণের একটি প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেন – যার নাম দেন ‘কাইনেটিক প্রুফরিডিং’।

পদার্থবিজ্ঞান থেকে তাঁর গবেষণার আগ্রহ ক্রমেই সরে যাচ্ছিল জীববিজ্ঞান ও রসায়নের দিকে, বিশেষ করে শারীরবিজ্ঞান ও প্রাণরসায়নের দিকে। ১৯৮০ সালে তিনি প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি থেকে চলে গেলেন ক্যালিফোর্নিয়া ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির (ক্যালটেক) কেমিস্ট্রি ও বায়োলজি ডিপার্টমেন্টে। এখানেই ১৯৮২ সালে তিনি প্রকাশ করেন তাঁর প্রথম নিউরোসায়েন্স গবেষণাপত্র ‘নিউরাল নেটওয়ার্ক্স অ্যান্ড ফিজিক্যাল সিস্টেমস উইথ ইমারজেন্ট কালেক্টিভ কম্পিউটেশানাল অ্যাবিলিটিজ’। খুলে যায় কৃত্রিম স্নায়ুতন্ত্র তৈরির পথ। প্রিন্সটনে থাকতে তিনি জৈব অণুর মধ্যে ইলেকট্রন আদান-প্রদানের তত্ত্ব নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেছেন। ক্যালটেকে এসে মস্তিষ্কের নিউরনের ভেতরও ইলেকট্রনিক তথ্য আদান-প্রদানের অনুরূপ একটি কার্যকর তত্ত্ব তিনি দাঁড় করান – যা পরবর্তীতে তাঁর নামে বিখ্যাত হয় – ‘হপফিল্ড নেটওয়ার্ক’ হিসেবে। ক্যালটেকে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন স্নায়ুতন্ত্রের সাথে কম্পিউটারের যান্ত্রিক সমন্বয়ের পিএইচডি গবেষণার নতুন ক্ষেত্র।

১৯৯৭ সালে ক্যালটেক থেকে আবার ফিরে এলেন প্রিন্সটনে। এবার মলিকিউলার বায়োলজি ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর হিসেবে। মূল পিএইচডি গবেষণা পদার্থবিজ্ঞানের হলেও তিনি জীববিজ্ঞানে পদার্থবিজ্ঞানের তত্ত্বের ব্যাপক প্রায়োগিক ক্ষেত্র আবিষ্কার করেছেন। প্রিন্সটন থেকে অবসর নেয়ার পরেও এখনো তিনি এমেরিটাস প্রফেসর হিসেবে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যুক্ত আছেন। ২০০১ সাল থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তিনি অনেকগুলি গবেষণা পুরষ্কার পেয়েছেন। ২০০১ সালে পেয়েছেন ডিরাক মেডেল, ২০০২ সালে হ্যারোল্ড পেন্ডার অ্যাওয়ার্ড, ২০০৫ সালে আলবার্ট আইনস্টাইন ওয়ার্ল্ড অ্যাওয়ার্ড অব সায়েন্স, ২০১৯ সালে বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন মেডেল, ২০২২ সালে বোলটজম্যান মেডেল এবং এবছর ২০২৪ সালে পেলেন পদার্থবিজ্ঞানের সর্বোচ্চ পুরষ্কার – নোবেল পুরষ্কার।

জন হপফিল্ডের উদ্ভাবিত ‘হপফিল্ড নেটওয়ার্ক’ খুব দক্ষতার সাথে কাজে লাগিয়ে মেশিন লার্নিং-এর পথ সুগম করে এবছর অন্য যে বিজ্ঞানী পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন তিনি টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর জেফরি হিনটন। জেফরি হিনটন ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের গডফাদার’ হিসেবে খ্যাতিমান হয়ে পদার্থবিজ্ঞানের সর্বোচ্চ পুরষ্কার নোবেল পুরষ্কার পেলেও মজার ব্যাপার হলো – তাঁর পদার্থবিজ্ঞানের কোন ডিগ্রি নেই।


জেফরি হিনটন

জেফরি এভারেস্ট হিনটনের জন্ম ইংল্যান্ডের উইম্বলডনে ১৯৪৭ সালের ৬ ডিসেম্বর। তাঁর মধ্যনাম এভারেস্ট এসেছে তাঁর পূর্বপুরুষ জর্জ এভারেস্টের নাম থেকে যাঁর নামে এভারেস্ট পর্বতের নাম দেয়া হয়েছে। ব্রিস্টলের ক্লিফটন কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশোনা শেষ করে জেফরি কেমব্রিজের কিংস কলেজে ভর্তি হলেন স্নাতক পর্যায়ের পড়াশোনা করার জন্য। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোন বিষয়ের প্রতিই আগ্রহ অনুভব করছিলেন না। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের কয়েকটি গুচ্ছ বিষয় – ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজি নিয়ে পড়লেন কিছুদিন। ভালো লাগলো না। ছেড়ে দিয়ে ভর্তি হলেন শিলকলার ইতিহাসে। সেটাও ভালো লাগলো না। কিছুদিন দর্শন শাস্ত্রের ক্লাস করলেন। তাও ভালো লাগলো না। শেষ পর্যন্ত কোনো রকমে পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি শেষ করলেন ১৯৭০ সালে। এর আট বছর পর ১৯৭৭ সালে ইউনিভার্সিটি অব এডিনবরা থেকে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স-এ পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করলেন। তাঁর থিসিসের বিষয় ছিল ‘রিলাক্সেশান অ্যান্ড ইটস রোল ইন ভিশান’।

পিএইচডি করার পর জেফরি হিনটন কিছুদিন সাসেক্স ইউনিভার্সিটিতে পোস্টডক্টরাল গবেষণা করলেন, ইংল্যান্ডের মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিলের অ্যাপ্লাইড সাইকোলজি বিভাগেও কাজ করলেন কিছুদিন। কিন্তু ইংল্যান্ডে গবেষণার ফান্ড না থাকাতে চাকরির উদ্দেশ্যে তাঁকে আমেরিকায় পাড়ি দিতে হলো ১৯৮২ সালে। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৭ পর্যন্ত তিনি কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা ও গবেষণা করলেন। ১৯৮২ সালে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে হপফিল্ড নেটওয়ার্ক আবিষ্কার করেছেন প্রফেসর জন হপফিল্ড। জেফরি হিনটন এই আর্টিফিসিয়াল নিউরাল নেটওয়ার্ক কাজে লাগালেন তাঁর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স-এর গবেষণায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপুল সম্ভাবনার দরজা খুলে গেল। এই সম্ভাবনার সবটুকুকে সামরিক শক্তি অর্জনের কাজে লাগাতে এর গবেষণায় অর্থায়ন করা শুরু করলো আমেরিকান সামরিক বাহিনি।

বিজ্ঞানকে যুদ্ধের কাজে ব্যবহার করার ব্যাপারকে ভীষণ নীতিবিরুদ্ধ বলে বিশ্বাস করেন প্রফেসর হিনটন। তিনি দেখলেন আমেরিকায় থাকলে তাঁকে গবেষণার জন্য সামরিক বাহিনীর অর্থপুষ্ট প্রজেক্টে কাজ করতে হবে। তাই তিনি আমেরিকা থেকে কানাডা চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। ১৯৮৭ সালে তিনি টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগে প্রফেসর হিসেবে যোগ দিলেন। সেই থেকে এখনো তিনি টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সংযুক্ত। পাশাপাশি ২০১৩ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি গুগলের বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন গুগলের ডিপ-লার্নিং প্রকল্পে – বিশেষ করে ইমেজ রিকগনিশান এবং ন্যাচারাল ল্যাংগুয়েজ প্রসেসিং ডেপেলপ করার কাজে। কিন্তু তিনি যখন দেখলেন মানুষের চেয়েও ক্রমশ শক্তিমান হয়ে উঠছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, এবং এখনো কঠোর আইন তৈরি হয়নি মেশিনের হাত থেকে মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা রক্ষার - ২০২৩ সালের মে মাসে তিনি গুগল থেকে পদত্যাগ করলেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান যদিও তাঁর হাত ধরে হয়েছে, যদিও তিনি ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের গডফাদার’, মেশিনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতে মানুষের বুদ্ধিমত্তাকেও টেক্কা দিতে পারে বলে সন্দেহ করছেন তিনি। তাঁর গবেষণার সর্বোচ্চ স্বীকৃতি নোবেল পুরষ্কার পাবার পরেও তাঁর নীতিগত অবস্থানের বদল হয়নি।

নোবেল পুরষ্কারের আগে আরো অনেক পুরষ্কার পেয়েছেন প্রফেসর হিন্টন। ২০০১ সালে পেয়েছেন রুমেলহার্ট প্রাইজ, ২০১৪ সালে পেয়েছেন ফ্র্যাংক রোজেনব্লাট পুরষ্কার, ২০১৬ সালে পেয়েছেন জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল মেডেল, ২০১৮ সালে পেয়েছেন টুরিং পুরষ্কার, ২০২১ সালে পেয়েছেন ডিকসন পুরষ্কার, ২০২২ সালে স্পেন সরকারের প্রিন্সেস অব অ্যাস্ট্রিয়াস পুরষ্কার। রয়েল সোসাইটির ফেলো হয়েছিলেন ১৯৯৮ সালে। ২০১৮ সালে পেয়েছেন কানাডা সরকারের অর্ডার অব কানাডা পুরষ্কার।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মেশিন লার্নিং-এর পুরো ব্যাপারটাকেই আমরা অনেকে কম্পিউটার প্রযুক্তিবিদদের ব্যাপার বলে ধরে নিয়ে থাকি। তাই বিশুদ্ধ পদার্থবিজ্ঞানের অনেকেই মনে করছেন এবারের পদার্থবিজ্ঞানের পুরষ্কারটিতে সরাসরি পদার্থবিজ্ঞানের অবদান কম। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল কমিটি  কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মেশিন লার্নিং-এর বর্তমান পর্যায়ে আসার পেছনে যে মূল আবিষ্কার কাজ করেছে তা যে মৌলিক পদার্থবিজ্ঞান থেকে উদ্ভূত হয়েছে তাকেই সম্মান করেছে।

একথা সত্য যে কম্পিউটার প্রযুক্তির এত অভাবনীয় উন্নতি না হলে যন্ত্রের ভেতর চিন্তাশক্তি ঢুকিয়ে দেয়া সম্ভব হতো না। কিন্তু এই প্রক্রিয়াটি দীর্ঘদিনের গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের ফসল।

মানুষের মস্তিষ্কের মতো কাজ করতে পারবে এরকম কৃত্রিম যান্ত্রিক মস্তিষ্ক তৈরির ইচ্ছে আরো অনেক আগে থেকেই বিজ্ঞানীদের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। মস্তিষ্কের নিউরাল নেটওয়ার্কের মতো করে আর্টিফিশিয়াল নিউরাল নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছে কম্পিউটারের জন্য। এটা করতে গিয়ে অনেকগুলি ধাপ অতিক্রম করতে হয়েছে বিজ্ঞানীদের। ১৯৪০-এর দশকে কানাডার স্নায়ুবিজ্ঞানী ডোনাল্ড হেব তত্ত্ব দিয়েছিলেন আমাদের মস্তিষ্কের নিউরন নেটওয়ার্ক বাড়িয়ে কমিয়ে আমাদের শিখন ক্ষমতা বাড়ানো-কমানো যায়। এই তত্ত্বকে কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা কাজে লাগিয়েছেন আর্টিফিশিয়াল নিউরাল নেটওয়ার্ক বা কৃত্রিম স্নায়ুতন্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে।

আমাদের স্নায়ুতন্ত্র যেমন নিউরন দ্বারা তৈরি, কৃত্রিম স্নায়ুতন্ত্র তৈরি হয় ইলেকট্রনিক নোডের মাধ্যমে। এই নোডগুলি একে অন্যের সাথে ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে সংযুক্ত থাকে। শেখার ক্ষেত্রে যেভাবে আমাদের স্নায়ুর সংযোগগুলির উদ্দীপনার হ্রাসবৃদ্ধি ঘটে – কৃত্রিম নোডগুলির সংযোগকেও প্রয়োজনীয় ট্রেনিং – বা কোডের মাধ্যমে বাড়ানো কিংবা কমানো যায়। ফলে আমাদের মস্তিষ্ক যেভাবে নতুন কিছু শেখে এবং মনে রাখে, কৃত্রিম স্নায়ুতন্ত্রও সেভাবে নতুন কিছু শিখতে পারে এবং স্মৃতিতে ধরে রাখতে পারে।

তাত্ত্বিকভাবে এরকম সম্ভাবনা দেখলেও বিজ্ঞানীরা ১৯৮০র দশকের আগপর্যন্ত বিশ্বাস করতে পারেননি যে বাস্তবে এরকম কিছু ঘটবে। ১৯৮২ সালে জন হপফিল্ড যখন তাঁর ‘হপফিল্ড নেটওয়ার্ক’ উদ্ভাবন করলেন – দেখা গেল কৃত্রিম স্নায়ুতন্ত্র মস্তিষ্কের নিউরনের মতোই কাজ করতে পারে। তিনি তাঁর নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিলেন তাঁর সলিড স্টেট ফিজিক্সের জ্ঞান কাজে লাগিয়ে। চৌম্বকীয় পদার্থের পারমাণবিক ঘূর্ণন বা অ্যাটমিক  স্পিন পদার্থের পরমাণুকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চুম্বকে পরিণত করতে পারে। একটি চুম্বকের ঘূর্ণন তার পার্শবর্তী চুম্বকের ঘূর্ণনকে প্রভাবিত করে। এভাবে সঠিক সংযোগ (ট্রেনিং) এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট সংখ্যক নোডের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করা যায়।


হপফিল্ড নেটওয়ার্ক


হপফিল্ড নেটওয়ার্কে নির্দিষ্ট সংখ্যক নোড থাকে যারা একে অপরের সাথে যুক্ত। নোডগুলির মধ্যে ইনপুট তথ্য হিসেবে একটি ছবি দেয়া হয় – যেখানে প্রতিটি নোড একটি নির্দিষ্ট মান 0 অথবা 1 ধরে রাখতে পারে। এখানে তথ্য ধরে নেয়া যায় 0 যদি কালো হয়,1 হবে সাদা – যেভাবে বাইনারি পদ্ধতি কাজ করে। নেটওয়ার্কের সংযোগ তখন ঠিক করে নেয়া হয় স্পিন-এনার্জির হিসেবের ভিত্তিতে। এখন আরেকটি প্যাটার্নের ছবি যদি এই নেটওয়ার্কে যোগ করা হয় – তখন আগের ছবির তথ্যের সাথে এই নতুন প্যাটার্ন মিলিয়ে দেখে। যদি কোন একটা নোডের মানে তারতম্য দেখা দেয় – তখন নোডের রং বদলে যায়। এভাবে নতুন প্যাটার্নটি পুরনো প্যাটার্নের সাথে মিলিয়ে নেয়া যায়। এভাবে নেটওয়ার্কে অনেকগুলি ছবি একের পর এক ঢুকিয়ে সবগুলিকে একসাথে রেখে দেয়া যায়। নেটওয়ার্কের সংযুক্ত স্মৃতি বা এসোসিয়েটেড মেমোরি হিসেবে কাজ করতে পারে এই তথ্যগুলি। অসম্পূর্ণ তথ্য বা আংশিক তথ্য দিলেও এই নেটওয়ার্ক সংরক্ষিত স্মৃতি থেকে পুরো তথ্য বের করে দিতে পারে।

একই রকম ছবির সাথে ছবির মিল খুঁজে বের করতে পারা আর ছবি চিনতে পারার মধ্যে পার্থক্য আছে। শিশুরা যেভাবে নতুন জিনিস দেখতে দেখতে মনে রাখে এবং পরবর্তীতে আবার দেখলে মনে করে বলতে পারে কোন্‌টা কী, সেই পদ্ধতিতে কৃত্রিম স্নায়ুতন্ত্রকে কি শেখানোর ব্যবস্থা করা যায়? এই ভাবনা থেকে স্ট্যাটিস্টিক্যাল ফিজিক্সের তত্ত্ব কাজে লাগিয়ে জেফরি হন্টন উদ্ভাবন করেছিলেন বোল্টজম্যান মেশিন।

জন হপফিল্ড যখন তাঁর নিউরাল নেটওয়ার্কের অ্যাসোসিয়েটেড মেমোরি সংক্রান্ত গবেষণাপত্র প্রকাশ করলেন, জেফরি হনটন সেই সময় ছিলেন কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটিতে। তিনি হপফিল্ড নেটওয়ার্কে স্ট্যাটিস্টিক্যাল ফিজিক্স প্রয়োগ করার কথা ভাবলেন। গ্যাসের অণুগুলির প্রত্যেকটির ধর্ম যেমন আলাদা আলাদাভাবে পরীক্ষা না করেও কিছু সামগ্রিক ধর্ম পরীক্ষা করে গ্যাসের সামগ্রিক পরিবর্তন শনাক্ত করা যায় – যেমন গ্যাসের চাপ কিংবা তাপ; সেরকম কোন সূত্র প্রয়োগ কি করা যায় নিউরাল নেটওয়ার্কের মেমোরির ক্ষেত্রে? স্ট্যাটিস্টিক্যাল ফিজিক্সে বোল্‌টজম্যান সমীকরণ প্রয়োগ করে হিনটন একটি নিউরাল নেটওয়ার্ক তৈরি করে নাম দিলেন ‘বোল্টজম্যান মেশিন’। ১৯৮৫ সালে এসংক্রান্ত গবেষণাপত্র প্রকাশিত হলো।


বোল্টজম্যান মেশিন

বোল্‌টজম্যান মেশিন হলো মেশিন লার্নিং-এর একেবারে প্রাথমিক মডেল। এতে শুরুতে দুই ধরনের নোড থাকে। এক ধরনের নোডে তথ্য দেয়া হয় – যাদেরকে বলা হয় দৃশ্যমান নোড। অন্য ধরনের নোড একটি অদৃশ্য স্তর তৈরি করে। অদৃশ্য নোডগুলিও পুরো নেটওয়ার্কের অংশ। দৃশ্যমান নোডগুলির মধ্যে যতভাবে সংযোগ ঘটানো সম্ভব সবগুলি একের পর এক স্মৃতিতে জমা করে দেয়া হয়। কী কী সংযোগ সম্ভব নয়, তার একটা শিখিয়ে দিলে (স্মৃতিতে রেখে দিলে) বাকি অসম্ভব সংযোগ গুলি এই মেশিন শিখে নিতে পারে। বোল্টজম্যান মেশিন হলো সম্ভাব্য সব প্যাটার্ন খুঁজে বের করার নেটওয়ার্ক। আমরা যেমন পরিচিত কারো চেহারার সাথে অপরিচিত কোন মানুষের চেহারার কিছুটা সাদৃশ্য দেখলেও চিনতে পারি – সেভাবে হিনটনের নেটওয়ার্ক অনেকগুলি প্যাটার্নের ভেতর থেকে সাদৃশ্য-অসাদৃশ্য খুঁজে বের করতে পারে।

সেই ১৯৮২ থেকে ১৯৮৫ তে যে কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্ক ও মেশিন লার্নিং পদ্ধতির সূচনা করেছিলেন প্রফেসর জন হপফিল্ড ও জেফরি হিনটন – তা বিপুল বিপ্লব ঘটিয়ে দেয় ২০১০ সালের পর থেকে। এখন প্রতিদিন যে পরিমাণ ডেটা তৈরি হচ্ছে তার মধ্যে থেকে অনেক ডেটা ব্যবহার করা হচ্ছে মেশিন লার্নিং-এ। কম্পিউটারগুলি প্রতিদিনই অনেকগুণ শিক্ষিত হচ্ছে আগেরদিনের চেয়ে। ১৯৮২ সালে হপফিল্ড তাঁর নেটওয়ার্কে মাত্র তিরিশটি নোড ব্যবহার করেছিলেন। সবগুলি নোড একে অপরের সাথে সংযুক্ত হলে মোট ৪৩৫টি সংযোগ হয়। এই নোডগুলির বিভিন্ন মান মিলিয়ে প্রায় পাঁচ শ’র মতো প্যারামিটারের হিসেব রাখতে গিয়েই তাঁর সেই সময়ের কম্পিউটার হাঁপিয়ে উঠেছিল। তিনি মাত্র একশটি নোডের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করতে গিয়েও পারেননি কম্পিউটারের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে। আজকের নিউরাল নেটওয়ার্কগুলি ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন প্যারামিটার সামাল দিচ্ছে।

২০০৬ সালে প্রফেসর হিনটন উদ্ভাবন করেছেন ডিপ লার্নিং ও ডিপ বিলিফ নেটওয়ার্ক। বহুমাত্রিক নিউরাল নেটওয়ার্ক-কে প্রশিক্ষণ দিয়ে মেশিন-লার্নিং বহুগুণ শক্তিশালী করার ব্যাপারে অবদান রেখেছেন বলেই প্রফেসর হিনটনকে ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স-এর গডফাদার’ বলেন সবাই।

জন হপফিল্ড এবং জেফরি হিনটনের দেখানো পথ অনুসরণ করে এখন আমাদের হাতে এসে গেছে চ্যাটজিপিটির মতো ট্রান্সফর্মার মডেল। এখন আমাদের প্রযুক্তির অনেকটাই স্বয়ংক্রিয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের জীবনকে অনেকটাই সহজ করে দিচ্ছে।

কিন্তু একই সাথে পরোক্ষভাবে আমাদের চিন্তাভাবনাকে নিয়ন্ত্রণ করতেও শুরু করেছে। এখন একটা ম্যাসেজ টাইপ করতে গেলেও শব্দের জোগান দিচ্ছে মেশিন – আমরা বেশিরভাগ সময় সেই শব্দগুলিই ব্যবহার করছি। কিন্তু অন্যদিকে যেসব গবেষণা আমাদের পক্ষে মেশিনের সাহায্য ছাড়া কিছুতেই সম্ভব নয়, যেমন মহাবিশ্বের আন্তনাক্ষত্রিক বিপুল আয়তনের ডেটা বিশ্লেষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে করে ফেলার দিকে এগোচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। এবছরের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরষ্কার অদূর ভবিষ্যতে জীবপদার্থবিজ্ঞানের গবেষণাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবে। কোয়ান্টাম কম্পিউটার পুরোমাত্রায় কাজ শুরু করলে মেশিন লার্নিং অন্যমাত্রা পাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। তখন হয়তো আমরা ক্যান্সারের মতো রোগের সঠিক কারণ খুঁজে বের করে তাকে প্রতিরোধ করতেও সক্ষম হবো।

 

তথ্যসূত্র

১। www.nobelprize.org

২। মাইকেল নেগনেভিতস্কি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এ গাইড টু ইন্টেলিজেন্ট সিস্টেমস, এডিসন-ওয়েসলি, ইংল্যান্ড ২০০৫।

৩। সায়েন্টিফিক অ্যামেরিকান, ২৫ জুন ২০২৪।

৪। ইথেম আলপ্যায়দিন, মেশিন লার্নিং, এম আই টি প্রেস, কেমব্রিজ, ২০২১।

৫। মার্গারেট বোডেন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যা ভেরি শর্ট ইন্ট্রোডাকশান, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০১৮।


============

বিজ্ঞানচিন্তা অক্টোবর ২০২৪ সংখ্যায় প্রকাশিত



Tuesday, 24 September 2024

মাইকেল ফ্যারাডের জন্মদিনে

 


জনাব মাইকেল ফ্যারাডে,

আপনার জন্মদিনে আপনার প্রতি শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

১৭৯১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর লন্ডনের নিউইংটন বাটস নামের এক অখ্যাত জায়গায় আপনি জন্মেছিলেন। কিন্তু আপনার বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এবং উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে আপনি নিজে যখন বিখ্যাত হলেন, আপনার জন্মস্থানও বিখ্যাত হয়ে গেল।

“জন্ম হোক যথা তথা, কর্ম হোক ভালো” – এরকম আপ্তবাক্য আপনার ভাষাতেও ছিল। আপনি আপনার দরিদ্র কামার মা-বাবার ঘরে জন্ম নেয়াটাকে ভাগ্য বলে মেনে নিয়ে, স্কুল-কলেজে লেখাপড়া করতে না পারার ব্যাপারটাকে বিধাতার ইচ্ছা বলে মনে করে চুপ করে বসে থাকেননি। নিজের চেষ্টায় আপনি বই পড়তে শিখেছিলেন। বই বাঁধাইয়ের দোকানের সামান্য কর্মচারী হিসেবে বই বাঁধাই করতে করতে যেসব বই হাতের কাছে পেয়েছিলেন, সব বই পড়ে ফেলেছিলেন। শুধু পড়া নয়, পড়তে পড়তে আপনি চিন্তা করতে শিখেছিলেন। গাণিতিক বিজ্ঞানে আপনার প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাব আপনাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। আপনি পরীক্ষণ পদার্থবিজ্ঞানে আপনার দক্ষতা প্রদর্শন করেছেন।

সেই সময় আপনার দেশ ইংল্যান্ডে প্রকৃত মেধার মর্যাদা দেয়ার লোকের অভাব ছিল না (এবং এখনো নেই)। আপনার সাথে পরিচয় হয়েছিল সেই সময়ের বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্যার হামফ্রে ডেভির সাথে। তিনি আপনার মেধা এবং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসাকে যথাযথ সম্মান দিয়ে আপনাকে সুযোগ করে দিয়েছিলেন রয়েল ইন্সটিটিউশানে গবেষণা করার। আপনার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব কোন বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি সেদিন।

আপনার হাত দিয়েই ধরতে গেলে পৃথিবীর বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির বিপ্লব ঘটে গেছে। ১৮৩১ সালে আপনি আবিষ্কার করেছেন তড়িতচুম্বক আবেশ। চুম্বক ক্ষেত্র থেকে বিদ্যুৎ এবং বিদ্যুৎক্ষেত্র থেকে চুম্বকত্ব – এসব আপনারই আবিষ্কার। ১৮৩৩-৩৪ সালে আপনি আবিষ্কার করেছেন বিদ্যুৎ প্রবাহ এবং রাসায়নিক বিক্রিয়ার মধ্যে সম্পর্ক – ইলেকট্রোলাইসিস বা তড়িৎবিশ্লেষণের নীতি। বর্তমানে আমরা যে গাণিতিক ক্ষেত্রতত্ত্বের ধারণা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছি – সেই ক্ষেত্রতত্ত্বের – বিশেষ করে চৌম্বকক্ষেত্রের ধারণা আবিষ্কার করেছিলেন আপনি।

বৈদ্যুতিক মটর উদ্ভাবন করে পুরো পৃথিবীর কর্মপদ্ধতি আপনি বদলে দিয়েছেন। বিদ্যুৎ প্রবাহ চালনা করে যান্ত্রিক গতি তৈরির পদ্ধতি যদি উদ্ভাবন আপনি না করতেন তাহলে সম্ভবত আমরা এখনো শারীরিক শক্তির উপরই নির্ভর করতাম। আপনার আবিষ্কার এবং উদ্ভাবনের তালিকা আরো অনেক দীর্ঘ।

আমরা বিজ্ঞানের অবদানকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করি, কিন্তু কৃতজ্ঞতা জানাই না। কিংবা জানালেও অন্য কাউকে জানাই। কিন্তু আপনি বিজ্ঞানী বলেই তাতে আপনার কিছু যায় আসে না।

হে মহান ফ্যারাডে, আপনার জন্মদিনে একজন সাধারণ পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমি আপনাকে অভিবাদন জানাচ্ছি।

শুভ জন্মদিন হে মহাত্মন।


Friday, 7 June 2024

হেনড্রিক লরেন্টজ: আইনস্টাইনের গুরু




প্রফেসর হেনড্রিক লরেন্টজ সম্পর্কে বলতে গিয়ে আইনস্টাইন দ্বিধাহীনভাবে বলেছেন, “He meant more to me personally than anybody else I have met in my lifetime” – “ব্যক্তিগতভাবে আমি জীবনে যত মানুষের সংস্পর্শে এসেছি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন তিনি।“ আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব আবিষ্কৃত হয়েছে লরেন্টজ-এর গবেষণার ফসল থেকে। পদার্থের পারমাণবিক তত্ত্বের জন্য বিখ্যাত ছিলেন হেনড্রিক অ্যান্টুন লরেন্টজ। ১৯০২ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন তিনি এবং তাঁর ছাত্র পিটার জিম্যান। 

১৮৫৩ সালের ১৮ জুলাই নেদারল্যান্ডের আর্নহেমে জন্ম হয় হেনড্রিক লরেন্টজের। তাঁর বাবা ছিলেন গেরিট ফ্রেদেরিক, মা গিরট্রুইডা। চার বছর বয়সে লরেন্টজ মাতৃহারা হন। তাঁর বাবা আবার বিয়ে করেন লুবার্টা হুপকিসকে। মাতৃস্নেহ বঞ্চিত লরেন্টজ একেবারে শৈশব থেকেই লেখাপড়ার মধ্যে বড় হন।

লেখাপড়ার ব্যাপারে খুবই সিরিয়াস ছিলেন লরেন্টজের বাবা। ছোটবেলাতেই একটি কঠোর নিয়মকানুনসমৃদ্ধ স্কুলে ভর্তি করে দেন তাকে। ওখান থেকে ১৮৬৬ সালে হাইস্কুলের বেশ এডভান্সড কোর্সে ভর্তি হয়ে যান অনায়াসে। ১৮৭০ সালে লিডেন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন এবং দুবছরের মধ্যে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৮৭২ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করার পর আর্নহেমের একটি নৈশবিদ্যালয়ে বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি আলোর প্রতিফলন ও প্রতিসরণ সম্পর্কিত পিএইচডি গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। 

১৮৭৫ সালে মাত্র বাইশ বছর বয়সে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন হেনড্রিক লরেন্টজ। এরপর যোগ দেন লিডেন ইউনিভার্সিটির ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে। কয়েক বছরের মধ্যেই তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞান-এর প্রধান অধ্যাপকে উন্নীত হন। নেদারল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে এর আগে কোন তত্ত্বীয় অধ্যাপকের পদ ছিলো না। পদার্থবিজ্ঞানের আলাদা শাখা হিসেবে তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞান তখন সবেমাত্র যাত্রা শুরু করেছে। সে হিসেবে বলা যায় হেনড্রিক লরেন্টজ ছিলেন নেদারল্যান্ডের তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের প্রথম অধ্যাপক। পরবর্তীতে ইওরোপের অনেকগুলি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধ্যাপনার লোভনীয় প্রস্তাব পাওয়া সত্ত্বেও তিনি অন্য কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেননি। সারাজীবন লিডেন ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা করেই কাটিয়ে দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করার পরেও তিনি তাঁর সোমবার সকালের লেকচার চালিয়ে গিয়েছেন। এই লেকচার ক্লাসে অংশ নিয়েছিলেন আলবার্ট আইনস্টাইন। 

লিডেন ইউনিভার্সিটিতে আইনস্টাইন তাঁর বন্ধু পল ইরেনফেস্টের কাছে যেতেন। তখন প্রতি সোমবার প্রফেসর লরেন্টজ যে পদার্থবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক আবিষ্কার ও গবেষণার অগ্রগতি সম্পর্কে যে লেকচার দিতেন – আইনস্টাইন সেখানে যোগ দিতেন। সেখান থেকে আইনস্টাইন তাঁর নিজের গবেষণার অনেক খোরাক পেয়েছেন। 

শুরুতে ম্যাক্সওয়েলের তড়িৎচুম্বক তরঙ্গের উপর কাজ করছিলেন লরেন্টজ। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও আলোর সম্পর্কের নীতিগুলি নিয়ে। ম্যাক্সওয়েলের তত্ত্বের মাধ্যমে তিনি তাঁর পিএইচডি থিসিসে আলোর প্রতিসরণ ও প্রতিফলনের নীতিগুলির নতুন ব্যাখ্যা দেন। আলোর বেগ এবং যে মাধ্যমে আলো চলাচল করে সেই মাধ্যমের ঘনত্ব ও উপাদানের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করেন লরেন্টজ। 

প্রায় একই সময়ে ডেনমার্কের পদার্থবিজ্ঞানী লুডভিগ লরেঞ্জও আলোর বেগের সাথে আলোর মাধ্যমের প্রতিসরণাঙ্কের একই ধরনের গাণিতিক সম্পর্ক আবিষ্কার করেন। হেনড্রিক লরেন্টজ আর লুডভিগ লরেঞ্জের নাম অনুসারে এই সমীকরণের নাম হয় লরেন্টজ-লরেঞ্জ সমীকরণ। এই সমীকরণ অনুসারে আলোক মাধ্যম বৈদ্যুতিক চার্জযুক্ত অসংখ্য কণার সমষ্টি – যে কণাগুলি সবসময় ঢেউয়ের মতো দুলছে। মাধ্যমের ভেতর দিয়ে আলোর চলাচলের সময় এই কণাগুলির সাথে আলোর তরঙ্গের মিথষ্ক্রিয়া ঘটে। এখন আমরা সবাই আলোর কণাতত্ত্ব সম্পর্কে জানি। কিন্তু সেই ১৮৭৯-৮০ সালে পরমাণু এবং তার উপাদান – ইলেকট্রন, প্রোটন-নিউট্রন সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোন ধারণাই ছিল না বিজ্ঞানীদের। 

১৮৮১ সালে লরেন্টজ একাডেমি অব ফাইন আর্টস এর প্রফেসর ইওহান কাইজারের মেয়ে আলেত্তাকে বিয়ে করেন। হেনড্রিক ও আলেত্তা লরেন্টজ-এর দুই মেয়ে এবং দুই ছেলে হয়। তাঁদের বড় মেয়ে গিরট্রুইডা পরবর্তীতে বাবার মতোই পদার্থবিজ্ঞানী হন। 

ম্যাক্সওয়েলের সূত্র থেকে লরেন্টজের যে সমীকরণের সূত্রপাত হয়েছে, সেখান থেকেই দানা বেঁধেছে ইলেকট্রনের তত্ত্ব। ১৮৯২ সালে লরেন্টজ তাঁর তাত্ত্বিক গবেষণা থেকে উদ্ভূত প্রস্তাব করেন যেকোনো পদার্থের মধ্যেই ধনাত্মক কিংবা ঋণাত্মক চার্জযুক্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা আছে। লরেন্টজ তাত্ত্বিকভাবে প্রমাণ করেন যে এসব চার্জিত কণার কম্পনের ফলে তড়িৎচুম্বক তরঙ্গের উৎপত্তি হয়। ম্যাক্সওয়েল তড়িৎচুম্বক তরঙ্গের সূত্র দিয়েছিলেন ১৮৫০ থেকে ১৮৭০ সালের মধ্যে। লরেন্টজ যেসময় তাঁর ইলেকট্রনের তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করছিলেন, সেই সময়েই ১৮৮৮ সালে হেনরিখ হার্টজ পরীক্ষাগারে তড়িতচুম্বক তরঙ্গ উৎপন্ন করতে সক্ষম হন। 

লরেন্টজ-এর সমসাময়িক বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতেন যে বাতাসে ইথার নামে এক ধরনের স্বচ্ছ পাতলা অদৃশ্য বস্তু আছে। অনেক বিজ্ঞানী বাতাসে ইথারের বেগ নির্ণয় করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে অনেকে বিশ্বাস করতেন যে ইথার স্থির – বাতাসে তাদের বেগ শূন্য। লরেন্টজও শুরুতে বিশ্বাস করতেন যে বাতাসে ইথার আছে এবং তার ভেতর দিয়ে আলো, শব্দ ইত্যাদি চলাচল করে। কিন্তু ১৮৮৭ সালে মাইকেলসন ও মর্লির পরীক্ষা থেকে প্রমাণিত হয়ে যায় যে ইথারের কোন অস্তিত্ব নেই। 

কিন্তু ইথারের অস্তিত্ব মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় ব্যাপারটি পুরোপুরি মেনে নেননি লরেন্টজ। তিনি ইথার খুঁজে না পাবার ব্যাপারটিকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করলেন তাঁর ইলেকট্রন তত্ত্বের গবেষণায়।  গতির ফলে বস্তুর আকারের কী পরিবর্তন ঘটে তার তত্ত্ব আবিষ্কার করেন তিনি – যা পরবর্তীতে বিখ্যাত হয়েছে লরেন্টজ ট্রান্সফরমেশান নামে। লরেন্টজ ট্রান্সফরমেশান কাজে লাগিয়েই আইনস্টাইন আবিষ্কার করেছেন তাঁর আপেক্ষিকতার তত্ত্ব।

লরেন্টজের পরমাণু তত্ত্ব অনুসারে বস্তু যখন যেদিকে চলতে থাকে সেদিকে তার দৈর্ঘ্য কিছুটা কমে যায়। যদিও এই পরিবর্তন খুবই নগণ্য, বস্তুর গতিবেগ অত্যন্ত বেশি হলে এই পরিবর্তন মাপা সম্ভব। লরেন্টজ ধারণা দেন যে বস্তুর গতি বস্তুর ভেতরের চার্জিত বস্তুর মধ্যবর্তী বলের পরিবর্তন ঘটায়। 

লরেন্টজ ট্রান্সফরমেশান প্রকাশিত হবার আগেই পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়ে গেছেন হেনড্রিক লরেন্টজ তাঁর আলোর উপর চুম্বকত্বের প্রভাবের তত্ত্বের জন্য। ম্যাক্সওয়েলের তত্ত্ব অনুযায়ী পরীক্ষাগারে তড়িৎচুম্বক তরঙ্গ উৎপাদনের প্রমাণ পান জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী হেনরিক হার্টজ। পরীক্ষামূলক প্রমাণ পাওয়া সত্ত্বেও ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণে কিছুটা অসম্পূর্ণতা রয়ে গিয়েছিল – সেখানে পরমাণু তত্ত্বের কোন স্থান না থাকাতে। 

লরেন্টজ তাঁর পরমাণুর তত্ত্বে চার্জিত ইলেকট্রনের ধারণা দেন – যার প্রবাহের প্রকৃতির উপর নির্ভর করে পরিবাহী ও অপরিবাহী বস্তুর ধর্ম নির্ধারণ করা যায়। লরেন্টজ-এর তত্ত্বের পরীক্ষামূলক প্রমাণ দেন তাঁর ছাত্র পিটার জিম্যান। এই আবিষ্কারের জন্য তাঁরা দুজন ১৯০২ সালের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরষ্কার পান। 

লরেন্টজের নোবেল পুরষ্কার-পরবর্তী গবেষণা আরো অনেক বেশি যুগান্তকারী। ১৯০৪ সালে প্রকাশিত লরেন্টজ ট্রান্সফরমেশান তত্ত্ব অনুসারে গতির ফলে গতিশীল বস্তুর ভেতরের কণার চার্জের মধ্যবর্তী তড়িৎচুম্বক বলের তারতম্য ঘটে। ফলে গতিশীল বস্তু আকারে কিছুটা সংকুচিত হয়ে যায়। এখান থেকেই পরের বছর ১৯০৫ সালে আলবার্ট আইনস্টাইন আবিষ্কার করেন স্পেশাল থিওরি অব রিলেটিভিটি। 

লরেন্টজের গবেষণা থেকে পদার্থবিজ্ঞানের এত বেশি নতুন গবেষণার পথ খুলে গিয়েছিল যে তাঁকে সেই সময়ের শ্রেষ্ঠ তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। ১৯০৫ সালে তিনি রয়েল সোসাইটির ফেলোশিপ পান। ১৯০৮ সালে পান রয়েল সোসাইটির রামফোর্ড মেডেল এবং ১৯১৮ সালে পান কোপলে মেডেল। ১৯১১ সালে তাঁর সভাপতিত্বে ব্রাসেলস-এ অনুষ্ঠিত হয় প্রথম সলভে কংগ্রেস। 

১৯১৯ সালে নেদারল্যান্ড সরকার সমুদ্র নিয়ন্ত্রণের উচ্চ-পর্যায়ের কমিটির চেয়ারম্যান নিযুক্ত করে প্রফেসর লরেন্টজকে। তাঁর নেতৃত্বে হাইড্রলিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ব্যাপক উন্নতি ঘটে নেদারল্যান্ডে। 


আইনস্টাইন ও লরেন্টজ (১৯২১)


প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর লরেন্টজ ইওরোপের বিভিন্ন দেশের মধ্যে বৈজ্ঞানিক গবেষণা-সহযোগিতা পুনপ্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হন। বিশ্বের বিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রথম সারির সাত জন বিজ্ঞানীর সমন্বয়ে ‘কমিটি অন ইন্টেলেকচুয়াল কো-অপারেশন অদ দ্য লিগ অব নেশনস’-এর অন্যতম সদস্য ছিলেন লরেন্টজ। ১৯২৫ সালে তিনি সেই কমিটির চেয়ারম্যান মনোনীত হয়েছিলেন। 

১৯২৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি লরেন্টজ মৃত্যুবরণ করেন। নেদারল্যান্ডে তিনি এতটাই সম্মানিত ছিলেন যে তাঁর মৃত্যুতে দেশের সবগুলি টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন সার্ভিস তিন মিনিটের জন্য বন্ধ রেখে তাঁর জন্য শোক প্রকাশ করা হয়। 

১৯৫৩ সালে লরেন্টজ-এর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আলবার্ট আইনস্টাইন লিডেন ইউনিভার্সিটির অনুষ্ঠানে যে লেখাটি পাঠান সেখানে তিনি লিখেছেন, “সবাই অনুভব করতো তাঁর শ্রেষ্ঠতা, তাঁর প্রাধান্য। কিন্তু তাঁর শ্রেষ্ঠতা কারো উপরই কোন চাপ সৃষ্টি করতো না।“ 

লরেন্টজ ছিলেন অত্যন্ত মানবিক, যুদ্ধবিরোধী একজন মানুষ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর এক জার্মান প্রফেসর বন্ধু তাঁকে বোঝাতে চেষ্টা করেছিলেন যে – পৃথিবীতে মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হবে শুধুমাত্র শক্তি প্রয়োগে। লরেন্টজ তার উত্তরে বলেছিলেন, “সেরকম পৃথিবীতে আর যেই থাকুক, আমি থাকতে চাই না।“ 

তথ্যসূত্র

১।  https://www.nobelprize.org/prizes/physics/1902/ceremony-speech/

২। https://www.britannica.com/biography/Hendrik-Antoon-Lorentz

৩। আলবার্ট আইনস্টাইন, আইডিয়াজ অ্যান্ড ওপিনিয়ন্স, রূপা অ্যান্ড কোং, দিল্লী, ২০০৯।

৪। বায়োগ্রাফিক্যাল এনসাইক্লোপিডিয়া অব সায়েন্টিস্টস, ওয়ার্ল্ড বুক, শিকাগো, ২০০৩।

৫। https://en.wikipedia.org/wiki/Hendrik_Lorentz

 ______________

বিজ্ঞানচিন্তা মার্চ ২০২৪ সংখ্যায় প্রকাশিত






Sunday, 5 May 2024

দ্য থিওরি অব এভরিথিং: সবকিছুর এক সুর - বাস্তবতা কত দূর

 


প্রাণিজগতে প্রজাতিগতভাবে সবচেয়ে অসন্তুষ্ট প্রজাতি হলো মানুষ। তারা কোনভাবেই তাদের বর্তমান অবস্থা নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। তাই সবসময় তারা তাদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে চায়। আত্মসন্তুষ্টি যেকোনো সৃষ্টিশীলতার, আবিষ্কারের, উদ্ভাবনের মৃত্যু ডেকে আনে। মানুষ যদি সমষ্টিগতভাবে তাদের অবস্থা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতো – তাহলে তারা হয়তো এখনো প্রস্তরযুগেই রয়ে যেতো – পাথরের সাথে পাথর ঠুকে আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করতো। যেমন সেই যুগের বন্য প্রাণিরা এখনো একইভাবে জীবনযাপন করছে। জীবনযাপনের গুণগত মানে, পদ্ধতিতে এবং ব্যবহারিকতায় মানুষের উত্তরপ্রজন্ম সবসময় তাদের পূর্বপ্রজন্মের চেয়ে এগিয়ে থাকছে – তাদের সামগ্রিক অসন্তুষ্টির কারণে। আর এই এগিয়ে থাকায় সারাক্ষণ সহযোগিতা করছে নতুন আবিষ্কার এবং উদ্ভাবন। 

আবিষ্কার এবং উদ্ভাবনে মগ্ন বিজ্ঞানীদের সবাই বিজ্ঞানের মূল উদ্দেশ্য সাধনেরই সাধনা করেন। সেই মূল উদ্দেশ্য হলো - জটিল রহস্যের সরলীকরণ। বিজ্ঞানের জটিল রহস্যের সরল সমাধান খুঁজে বের করতে গিয়ে ভিন্ন ভিন্ন শাখার বিজ্ঞানীরা ভিন্ন ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেন। যেমন মনোবিজ্ঞানীরা শরীর ও মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ জটিল কাজকর্মের সাথে আনুষঙ্গিক অন্যান্য উপাদানের সম্পর্ক নির্ণয় করতে পারলেই মনে করেন জটিল সমস্যা সরল হয়ে গেল। জীববিজ্ঞানীরা ওইসব কাজকর্ম কীভাবে ঘটে তা আরো সরলভাবে বোঝার চেষ্টা করেন জীবকোষের গঠন এবং কার্যপদ্ধতি বোঝার মাধ্যমে। রসায়নবিজ্ঞানীরা আরো একটু গভীরে গিয়ে বুঝতে চেষ্টা করেন কোষের রাসায়নিক গঠন ও মিথষ্ক্রিয়ার প্রক্রিয়া। রাসায়নিক বিক্রিয়ার স্বরূপ উদ্ঘাটন করতে পারলে তাঁদের কাজ সহজ হয়ে যায়। অণু ও পরমাণুর কাজকর্ম বুঝতে পারলেই তাঁদের হয়ে যায়। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানীরা কোথাও থামতে চান না। তাঁরা ঢুকে যান পরমাণুর অভ্যন্তরে, নিউক্লিয়াসেরও ভেতরে। 

বিজ্ঞানের জগতে পদার্থবিজ্ঞান হলো ভীষণ রকমের সাম্রাজ্যবাদী। তাঁরা মনে করেন মহাবিশ্বের সমস্ত পদার্থ এবং শক্তি  এবং তাদের  মধ্যকার সমস্ত কাজকর্ম পদার্থবিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। মহাবিশ্বের জন্ম থেকে এ পর্যন্ত যা কিছু ঘটেছে এবং ভবিষ্যতেও যা ঘটবে তার সবকিছুই পদার্থবিজ্ঞানের আওতাভুক্ত। তাই পদার্থবিজ্ঞানের ব্যাপ্তি পরমাণুর অভ্যন্তরীণ গঠন থেকে শুরু করে গ্যালাক্সি পর্যন্ত বিস্তৃত। যতই দিন যাচ্ছে তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের বিস্তৃতি আরো বাড়ছে। একটি মাত্র দৃশ্যমান মহাবিশ্ব নিয়ে সন্তুষ্টি নেই সেখানে আর। আরো অসংখ্য অদৃশ্য কাল্পনিক মহাবিশ্বের তত্ত্বও আবিষ্কৃত হচ্ছে। এত তত্ত্বের মাঝেও পদার্থবিজ্ঞানীদের সার্বিক লক্ষ্য হলো এমন একটি তত্ত্বের যার মাধ্যমে মহাবিশ্বের সবকিছু সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে – যার নাম সবকিছুর তত্ত্ব বা থিওরি অব এভরিথিং।

তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানীরা মনে করেন থিওরি অব এভরিথিং (TOE) হবে পদার্থবিজ্ঞানের এমন একটি সর্বময় তত্ত্ব যে তত্ত্ব থেকে মহাবিশ্বের জন্ম কীভাবে হলো, কেন হলো, কীভাবে মহাবিশ্বের সবকিছু – কোয়ার্ক থেকে কসমস পর্যন্ত – কীভাবে কাজ করছে -  সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাওয়া যাবে। এখানে ‘সব’ বলতে একেবারে ঢালাওভাবে সবকিছু বোঝানো হবে, নাকি শুধুমাত্র মূল বিষয়গুলি বোঝানো হবে সে ব্যাপারে মতভেদ আছে। 

মতভেদ থাকাটাই স্বাভাবিক। কারণ পদার্থবিজ্ঞানীদের অনেক দাবি আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় ভুল কিংবা সঠিক প্রমাণ করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ। যেমন আকাশে মেঘ কীভাবে তৈরি হয় তা পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র দিয়ে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু যদি বলা হয় পদার্থবিজ্ঞানের সমীকরণ দিয়ে ছোট্ট একখন্ড মেঘের গাণিতিক মডেল তৈরি করতে যা একটা নির্দিষ্ট সময় পর আকাশে ঠিক ঠিক তৈরি হবে এবং আকার-আয়তন সবদিক দিয়ে মডেলের সাথে মিলে যাবে – পদার্থবিজ্ঞানের পক্ষে তা সঠিকভাবে করা সম্ভব হবে না। কারণ সেখানে এত বেশি পরিবর্তনশীল সূচক ব্যবহার করতে হবে যা অনেকগুলি সুপারকম্পিউটারের মাধ্যমেও সঠিকভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। 

এরকম অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যায়। যেমন একটি কাচের গ্লাস যদি হাত থেকে ফেলে দেয়া হয় – তা মাধ্যাকর্ষণ বলের প্রভাবে মেঝেতে পড়ে যাবে সেটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। কিন্তু মেঝেতে পড়ে গিয়ে ভেঙে যাবে কি না তা আগে থেকে বলে দিতে হলে জানতে হবে আরো অনেক কিছু – যেমন মেঝে কী দিয়ে তৈরি, গ্লাসটি কত ভারী, কত দূর থেকে কত বেগে ফেলা হয়েছে, আছাড় দেয়া হয়েছে নাকি এমনিতেই ফেলে দেয়া হয়েছে, গ্লাসের কাচের গাঠনিক উপাদান থেকে শুরু করে অসংখ্য প্যারামিটার। সবগুলি প্যারামিটার হিসেব করে বলা সম্ভব – গ্লাসটি ভাঙবে। গ্লাস ভাঙার পর কাচের ঠিক কতগুলি টুকরো হবে – তা কি সঠিকভাবে বলা সম্ভব? টুকরো গুলির আকার, আয়তন কীরকম হবে তা কি বলা সম্ভব? 

তাই সবকিছুর তত্ত্ব থেকে সমস্ত ডিটেলস বলা যাবে এরকম আশা কেউ করছেন না। কিন্তু আশা করা হচ্ছে এই তত্ত্ব থেকে ব্যাখ্যা করা যাবে মহাবিশ্বের সবগুলি প্রাকৃতিক বলের উৎস, শক্তির হিসেব, মহাবিশ্বের সূচনা কীভাবে হয়েছে, সমাপ্তি কীভাবে হবে। 

সবকিছুর তত্ত্ব বলতে আসলে কী তত্ত্ব বোঝানো হচ্ছে? কী হবে এই তত্ত্ব আবিষ্কৃত হলে? আর আবিষ্কৃত না হলেই বা কী অসুবিধা? এসব প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে আমাদের দেখা দরকার এরকম তত্ত্বের ধারণা পদার্থবিজ্ঞানীদের মনে এলো কীভাবে। 

পঞ্চম শতাব্দীতে গ্রিক দার্শনিক লুসিপাস ও ডেমোক্রিটাসের অ্যাটমিজম বা পরমাণুতা তত্ত্ব ছিল প্রথম সবকিছুর তত্ত্ব। এই তত্ত্ব দিয়ে তাঁরা বোঝাতে চেয়েছিলেন পরমাণু দিয়েই মহাবিশ্বের সবকিছু তৈরি। পরবর্তী হাজার বছর ধরে এই ধারণা টিকে ছিল যে পরমাণু অবিভাজ্য। 

পরমাণুতা তত্ত্বকে সবকিছুর তত্ত্ব বলার কারণ কী ছিল? কারণ ছিল এই যে – সেই সময়ে যেকোনো বস্তুই কী দিয়ে তৈরি হয়েছে জিজ্ঞেস করা হলে উত্তর হতো – পরমাণু দিয়ে। আর বস্তুর অভ্যন্তরীণ কাজকর্মকেও ব্যাখ্যা করা হতো পরমাণুর সাথে পরমাণুর মিথষ্ক্রিয়ার মাধ্যমে। ভিন্ন ভিন্ন পদার্থের ভিন্ন ভিন্ন পরমাণু থাকলেও সব পদার্থের মৌলিক উপাদান মনে করা হতো পরমাণুকে। সেহিসেবে সেই সময়ের সবকিছুর তত্ত্বের মূলে ছিল পদার্থের মৌলিক উপাদান। 

পরের কয়েক শতকের মধ্যেই পদার্থবিজ্ঞানের ব্যাপক উন্নতি ঘটে। আবিষ্কৃত হতে থাকে ন্যাচারাল ফোর্স বা প্রাকৃতিক বলগুলি। 

১৬৮৭ সালে প্রকাশিত হয় নিউটনের ল অব গ্রাভিটি বা মহাকর্ষ বলের সূত্র। প্রাকৃতিক বলগুলির মধ্যে এই বলের কথাই প্রথম জানা যায় আইজাক নিউটনের আবিষ্কারের মাধ্যমে। মহাকর্ষ বল অত্যন্ত দুর্বল বল। কিন্তু এই দুর্বল বলই মহাবিশ্বের সব বস্তুকে একে অপরের সাথে অদৃশ্যভাবে টেনে ধরে রেখেছে। মহাকর্ষ বল আকর্ষণ বল। মহাবিশ্বের সবখানেই এর প্রভাব আছে। মহাকর্ষের তত্ত্ব অনুসারে – দুটো বস্তুর মধ্যে আকর্ষণ বল বস্তুদুটোর ভরের গুণফলের সমানুপাতিক এবং বস্তু দুটোর পারস্পরিক দূরত্বের বর্গের বিপরীত অনুপাতিক। বস্তু যত বড় হবে, এবং ভর যত বেশি হবে তাদের মধ্যকার আকর্ষণ বলের পরিমাণ তত বেড়ে যাবে। আবার তারা যত বেশি কাছাকাছি থাকবে, বলের পরিমাণও তত বেড়ে যাবে। দূরত্ব যদি দ্বিগুণ বেড়ে যায়, বলের পরিমাণ চার গুণ কমে যাবে। মহাকর্ষ বলের তত্ত্ব অনুযায়ী কোন বস্তুই অন্য কোন বস্তুকে বিকর্ষণ করে না। নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্ব বস্তুর মধ্যে কীভাবে আকর্ষণ বল কাজ করে তার হিসেব দেয়, কিন্তু কেন আকর্ষণ করে তার কোন ব্যাখ্যা দেয় না। তবে মহাকর্ষ বলের আকর্ষণেই যে মহাবিশ্বের উপগ্রহ-গ্রহ-নক্ষত্র-গ্যালাক্সি সব একে অপরকে কেন্দ্র করে ঘুরছে তার মোটামুটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। 

১৭৫০ থেকে ১৮৫০ সালের মধ্যে ইওরোপের অনেক দেশের বিজ্ঞানীরা আলাদা আলাদা ভাবে  বিদ্যুৎ ও চুম্বকত্ব সম্পর্কে অনেক পরীক্ষানিরীক্ষা করে বিদ্যুৎ ও চুম্বকের অনেক ধর্ম আবিষ্কার করেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে দরকারি আবিষ্কার ছিল – গতিশীল বৈদ্যুতিক চার্জের ফলে চুম্বকত্বের সৃষ্টি হয়, আর গতিশীল চুম্বক বৈদ্যুতিক চার্জ তৈরি করতে পারে। ডেনমার্কের পদার্থবিজ্ঞানী হ্যান্স ক্রিস্টিয়ান ওরস্টেড ১৮২০ সালে নিশ্চিত হন যে বিদ্যুৎ ও চুম্বকের মধ্যে একটি পারস্পরিক সম্পর্ক আছে। তিনি সেই সম্পর্কের নাম দেন ইলেকট্রোম্যাগনেটিজম বা তড়িৎচুম্বকত্ব। 

১৮৩১ সালে ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডে পরীক্ষাগারে প্রমাণ করেন যে বৈদ্যুতিক প্রবাহ থেকে চুম্বকত্ব উৎপন্ন হয়, আবার চুম্বকক্ষেত্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা যায়। এর চৌদ্দ বছর পর ফ্যারাডে আরো আবিষ্কার করেন যে বিদ্যুৎ ও চুম্বকত্বের সাথে আলোরও নিবিড় সম্পর্ক আছে। 

এরপর ১৮৬১ সালে স্কটিশ পদার্থবিজ্ঞানী জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল সঠিকভাবে ধারণা দিলেন- যদি বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের পরিবর্তন ঘটে তাহলে চৌম্বক ক্ষেত্রের সৃষ্টি হয়। আবার যদি চৌম্বকক্ষেত্রের পরিবর্তন ঘটে, তাহলে বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের সৃষ্টি হয়। আরো সোজাভাবে বললে বলা যায় - বিদ্যুৎ থেকে চুম্বকত্ব পাওয়া যায়, চুম্বকত্ব থেকে পাওয়া যায় বিদ্যুৎ। বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র এবং চৌম্বকক্ষেত্র পরস্পর লম্বভাবে থাকে সবসময়। ম্যাক্সওয়েল গাণিতিকভাবে হিসেব করে দেখান যে শূন্যস্থানে আলোর বেগ সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার। পরবর্তীতে আমরা দেখেছি যে আলো তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গের দৃশ্যমান অংশ। কিন্তু বিশাল অদৃশ্য অংশে রয়েছে কম শক্তিসম্পন্ন বেতারতরঙ্গ, অবলোহিত রশ্মি বা ইনফ্রারেড রে, মাইক্রোওয়েভ, এবং বেশি শক্তিসম্পন্ন আলট্রাভায়োলেট রে বা অতিবেগুনি রশ্মি, এক্স-রে, গামা-রে ইত্যাদি। বিংশ শতাব্দী এবং একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তিতে তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গের ব্যাপক ব্যবহার আমরা দেখছি ভূমি থেকে মহাকাশ, মোবাইল ফোন থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞান - সবখানে। 

ম্যাক্সওয়েলের তত্ত্ব থেকে পাওয়া গেল দ্বিতীয় প্রাকৃতিক বল – তড়িৎচুম্বক বল। তড়িৎচুম্বক বল মহাকর্ষ বলের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী। গাণিতিকভাবে মহাকর্ষ বলের সাথে খুব সাদৃশ্য আছে তড়িৎচুম্বক বলের। দুটো চার্জের মধ্যে তড়িৎচুম্বক বলের পরিমাণ চার্জ দুটোর পরিমাণের গুণফলের সমানুপাতিক এবং তাদের মধ্যবর্তী দূরত্বের বর্গের বিপরীত অনুপাতিক। মহাকর্ষ বলের মতোই এই বলের তীব্রতা বাড়ে যদি চার্জের পরিমাণ বাড়ে। চার্জের মধ্যবর্তী দূরত্ব দ্বিগুণ বেড়ে গেলে বলের পরিমাণ চার গুণ কমে যায়। তবে মহাকর্ষ বলের সাথে তড়িৎচুম্বক বলের গুণগত যে পার্থক্য আছে সেটা হলো – এই বল আকর্ষণ কিংবা বিকর্ষণ দুটোই হতে পারে। যদি চার্জদুটো একই ধর্মের হয় (দুটোই ধ্বনাত্মক বা দুটোই ঋণাত্মক) তড়িৎচুম্বক বল হবে বিকর্ষণ বল। কিন্তু যদি চার্জদুটো বিপরীত ধর্মের হয় (একটি ধ্বনাত্মক, অন্যটি ঋণাত্মক), তখন বল হবে আকর্ষণ বল। এর ফলে বড় বড় বস্তুর ক্ষেত্রে আকর্ষণ বল ও বিকর্ষণ বল পরস্পরকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। তাই বড় বস্তুর মধ্যে তড়িৎচুম্বক বল ততটা কার্যকর থাকে না। কিন্তু অণু ও পরমাণুর মধ্যে এই বল খুবই সক্রিয়। সব ধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়া ও জৈবরাসায়নিক ক্রিয়াকলাপ ঘটে তড়িৎচুম্বক বলের প্রভাবে।

১৮৯৫ সালে এক্স-রে, ১৮৯৬ সালে রেডিও অ্যাকটিভিটি এবং ১৮৯৭ সালে ইলেকট্রন আবিষ্কৃত হবার পর পদার্থবিজ্ঞানীদের মধ্যে অনেকেরই ধারণা জন্মে যে পদার্থবিজ্ঞানের সবকিছুর তত্ত্ব পাওয়া হয়ে গেছে, মহাকর্ষ ও তড়িৎচুম্বক তত্ত্ব দিয়েই সবকিছু ব্যাখ্যা করে ফেলা যাবে। ১৯০০ সালে ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশান ফর দি অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্স-এর এক বক্তৃতায় লর্ড কেলভিন তো বলেই ফেলেছিলেন, “পদার্থবিজ্ঞানে আবিষ্কার করার মতো এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। এখন বাকি আছে শুধু পুঙ্খানুপূঙ্খ পরিমাপ।“ 

কিন্তু লর্ড কেলভিনের কথা ভুল প্রমাণিত হতে দেরি হলো না। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই পদার্থবিজ্ঞানের নতুন নতুন তত্ত্ব আবিষ্কারের পালে হাওয়া লাগে। একদিকে ম্যাক্স প্ল্যাংকের হাত ধরে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের যাত্রা শুরু হয়েছে। অন্যদিকে আলবার্ট আইনস্টাইন ১৯০৫ সালে একের পর এক চারটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে বদলে দিয়েছেন পুরো মহাবিশ্বের ধারণা। আবিষ্কৃত হয়েছে স্পেশাল থিওরি অব রিলেটিভিটি, প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শক্তির সাথে ভর ও আলোর গতির সম্পর্ক। 

আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব আবিষ্কারের ফলে মহাকর্ষ তত্ত্বে ভর এবং দূরত্ব দুটোতেই সমস্যা হয়ে গেল। নিউটনের তত্ত্ব অনুসারে বস্তুর গতির সাথে ভরের কোন পরিবর্তন ঘটে না, কিন্তু আইনস্টাইনের তত্ত্ব অনুসারে গতির পরিবর্তনের সাথে ভরের পরিবর্তন ঘটে। আবার নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্বে বস্তুর মধ্যবর্তী যে দূরত্বের ব্যাপার আছে – সেই দূরত্ব মাপার কোন ফ্রেম অব রেফারেন্স নির্দিষ্ট করা নেই। কিন্তু আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব অনুসারে এই দূরত্ব রেফারেন্স ফ্রেমের উপর নির্ভরশীল। ধীরগতির বস্তুর ক্ষেত্রে দূরত্বের এই পার্থক্য খুব একটা বেশি নয়, কিন্তু প্রচন্ড গতিশীল গ্রহ-নক্ষত্রের মধ্যে মহাকর্ষ বল হিসেব করতে হলে দূরত্ব মাপার ক্ষেত্রে অবশ্যই আপেক্ষিকতার তত্ত্ব প্রয়োগ করতে হবে। 

আইনস্টাইন দেখলেন নিউটনের মহাকর্ষ বলের তত্ত্ব সংস্করণ করার দরকার। পরবর্তী দশ বছর ধরে গবেষণা করে ১৯১৫ সালে আইনস্টাইন প্রকাশ করলেন আপেক্ষিকতার সার্বিক তত্ত্ব যা মূলত আইনস্টাইনের মহাকর্ষ তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুসারে মহাকর্ষ বল স্থান-কালের উপর ভরের প্রভাবে যে বক্রতা তৈরি হয় তার উপর নির্ভর করে। ধরতে গেলে জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি পদার্থবিজ্ঞানকে জ্যামিতিতে পরিণত করে ফেলেছে। জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটির সার্থক প্রমাণ জ্যোতির্বিজ্ঞানে নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছেই। তার ব্যবহারিক প্রমাণ – বর্তমানের সবগুলি স্যাটেলাইট, জিপিএস ন্যাভিগেশান ইত্যাদি। 

স্পেশাল ও জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি আবিষ্কারের পর আইনস্টাইন প্রাকৃতিক বলের তত্ত্বগুলিকে একীভূত করে একটি সমন্বিত তত্ত্ব আবিষ্কারের চেষ্টা করে গেছেন তাঁর বাকি জীবন। কিন্তু সাফল্যের মুখ দেখেননি। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন আইনস্টাইন সফল হতে পারেননি – কারণ তিনি কোয়ান্টাম মেকানিক্স ব্যবহারের ব্যাপারে উৎসাহী ছিলেন না। তাছাড়া মহাকর্ষ তত্ত্বে অর্থপূর্ণভাবে কোয়ান্টাম মেকানিক্স প্রয়োগ করা এখনো সহজ নয়। 

পরমাণুর নিউক্লিয়াস, প্রোটন ও নিউট্রন আবিষ্কারের পর রেডিওঅ্যাকটিভিটির তত্ত্ব থেকে আরো দুটো প্রাকৃতিক বল আবিষ্কৃত হলো – দুর্বল নিউক্লিয়ার বল এবং সবল নিউক্লিয়ার বল। দুর্বল নিউক্লিয়ার বল রেডিওঅ্যাকটিভিটির জন্য দায়ী। এই বলের ফলেই মহাবিশ্বের শুরুতে নক্ষত্রগুলিতে বিভিন্ন মৌল তৈরি হয়েছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা সাধারণত এই বল অনুভব করি না। 

প্রকৃতির চতুর্থ বল সবল নিউক্লিয়ার বল। নিউক্লিয়াসের ভেতর প্রোটন ও নিউট্রনগুলিকে শক্তভাবে ধরে রাখে এই বল। চারটি প্রাকৃতিক বলের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী বল হলো সবল নিউক্লিয়ার বল। নিউক্লিয়াসের বাইরে এই বল অনুভূত হয় না। সবল নিউক্লিয়ার বল প্রচন্ড আকর্ষণ বল।

আইনস্টাইনসহ তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানীদের আরো অনেকে এই চারটি প্রাকৃতিক বলকে একীভূত করে একটি গ্রান্ড ইউনিফাইড থিওরি বা সমন্বিত তত্ত্ব আবিষ্কারের চেষ্টা করছিলেন। মহাকর্ষ বল ছাড়া বাকি তিনটি বল অত্যন্ত ক্ষুদ্র পারমাণবিক স্কেলের বস্তুর (পরমাণু, ইলেকট্রন, প্রোটন, কোয়ার্ক) উপর প্রযোজ্য। অণু পরমাণুর কাজকর্ম সঠিকভাবে বুঝতে হলে কোয়ান্টাম মেকানিক্স প্রয়োগ করেই বুঝতে হবে। তাই তড়িতচুম্বক বল, দুর্বল নিউক্লিয়ার বল, সবল নিউক্লিয়ার বল সবগুলিরই কোয়ান্টাম মেকানিক্সে রূপান্তরিত করা দরকার। 

আবার মহাকর্ষ বল গ্রহ-নক্ষত্র-গ্যালাক্সির মতো বড় বড় বস্তুর উপর প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে তার কোয়ান্টাম মেকানিক্সে রূপান্তরিত করার দরকার নেই। কিন্তু আমরা যদি আদি মহাবিশ্ব সম্পর্কে জানতে চাই – তাহলে সিঙ্গুলারিটি থেকে শুরু করতে হবে। সেই সময় সবকিছুই ছিল মাইক্রোস্কোপিক। তাই মহাকর্ষ তত্ত্বকেও কোয়ান্টাম তত্ত্বে রূপান্তর না করলে হবে না। 

নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্ব হোক, কিংবা আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটির মহাকর্ষ তত্ত্ব হোক – দুটোই ক্লাসিক্যাল থিওরি। এদের কোনটিকেই কোয়ান্টাম তত্ত্বে রূপান্তর করা সম্ভব নয়। কারণ কোয়ান্টাম তত্ত্বে হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তার নীতি কাজ করে। জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটিতে অনিশ্চয়তার নীতি প্রয়োগ করলে তার ফলাফল বাস্তবসম্মত হবে না। যেমন তখন ব্ল্যাকহোল পুরোপুরি ব্ল্যাক হবে না, শূন্যস্থানও পুরোপুরি শূন্য হবে না। 

সবকিছুর তত্ত্ব পেতে হলে প্রকৃতির সবগুলি বলকে সমন্বিত করতে হবে। সেটা করতে হলে চারটি বলেরই কোয়ান্টাম রূপান্তর ঘটাতে হবে। এই তত্ত্বগুলির কোয়ান্টাম রূপকে বলা হয় – কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি। বাংলায় কোয়ান্টাম ক্ষেত্রতত্ত্বও বলে থাকেন অনেকে। কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরিতে বস্তুকণা বা ভর বিনিময় কণা হলো ফার্মিয়ন (ইলেকট্রন ও কোয়ার্ক), এবং ফার্মিয়নগুলির মধ্যে বল বিনিময় কণা হলো বোসন (ফোটন)। 

তড়িৎচুম্বক বলের কোয়ান্টাম রূপান্তর সম্ভব হয়েছে রিচার্ড ফাইনম্যানের কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্স আবিষ্কারের মাধ্যমে। 

কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি প্রয়োগ করে তড়িৎচুম্বক বল ও দুর্বল নিউক্লিয়ার বলের সমন্বয় ঘটিয়েছেন প্রফেসর আবদুস সালাম, স্টিভেন ওয়াইনবার্গ এবং শেলডন গ্ল্যাসো। 

দুর্বল নিউক্লিয়ার বল ও তড়িৎচৌম্বক বল মূলত একই রকম। কিন্তু তাদেরকে ভিন্ন মনে হয় কারণ দুর্বল নিউক্লিয়ার বলের বিনিময় কণার ভর আছে, কিন্তু তড়িৎচৌম্বক বলের বিনিময় কণার ভর নেই। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই বল বিনিময় কণা হলো বোসন। তড়িৎচৌম্বক বলের ক্ষেত্রে বিনিময় কণা ফোটন যার স্থির ভর শূন্য। ফোটন আলোর বেগে চলে। দুর্বল নিউক্লিয়ার বলের ক্ষেত্রে বিনিময় কণার ভর আছে। ফলে এই বোসনগুলোর বেগ দূরত্বের সাথে বদলে যায়। 

দুর্বল নিউক্লিয়ার মিথষ্ক্রিয়ায় চার্জের পরিবর্তন ঘটে। অর্থাৎ চার্জহীন নিউট্রন ধনাত্মক চার্জযুক্ত প্রোটন বা ঋণাত্মক চার্জযুক্ত ইলেকট্রনে পরিণত হয়। ফলে যে কারেন্ট পাওয়া যায় তাকে চার্জড কারেন্ট বলা যায়। অন্যদিকে তড়িৎচৌম্বক বলের ক্ষেত্রে চার্জের কোন পরিবর্তন ঘটে না। ফলে এক্ষেত্রে যে কারেন্ট পাওয়া যায় তাকে নিউট্রাল কারেন্ট বলা যায়। 

ওয়াইনবার্গ ও সালামের তত্ত্ব প্রমাণ করে যে দুর্বল নিউক্লিয়ার বল ও তড়িৎচৌম্বক বলের মধ্যে একমাত্র পার্থক্য হলো বিনিময় কণা বোসনের ভরে। তড়িৎচৌম্বক বলের ক্ষেত্রে বিনিময় কণা ফোটন ভরহীন, কিন্তু দুর্বল নিউক্লিয়ার বলের ক্ষেত্রে বিনিময় কণা বোসনের (W) ভর প্রোটনের ভরের প্রায় একশ' গুণ। দুর্বল নিউক্লিয়ার বলের বোসনকে এ কারণে ভারী ফোটনও বলা হয়। 

আবদুস সালাম ও স্টিভেন ওয়াইনবার্গ ধারণা দেন যে দুর্বল নিউক্লিয়ার বলের ক্ষেত্রে নিউট্রাল কারেন্ট ও চার্জড-কারেন্ট দুটোই পাওয়া যেতে পারে। দুটো মিথষ্ক্রিয়ার বল বিনিময় কণাগুলোকে একই পরিবারভুক্ত করে নাম দেয়া হয় W+, W- এবং Z0 বোসন। +, - এবং ০ যথাক্রমে ধনাত্মক, ঋণাত্মক এবং নিউট্রাল চার্জড বোসন বোঝায়। তিনটাকে এক সাথে ইন্টারমিডিয়েট ভেক্টর বোসন বলা হয়। এই ভেক্টর বোসনগুলো নিউক্লিয়াসের ভেতরে খুবই ভারী। আর সেখানেই দুর্বল মিথষ্ক্রিয়া ঘটে। নিউক্লিয়াসের বাইরে ঘটে তড়িৎচুম্বক মিথষ্ক্রিয়া। 

১৯৭৩ সালে সার্নের পরীক্ষাগারে নিউক্লিয়াস ও নিউট্রিনোর মিথষ্ক্রিয়া ঘটিয়ে কোন ধরনের চার্জ বিনিময় ছাড়াই দুর্বল নিউক্লিয়ার মিথষ্ক্রিয়া ঘটানো সম্ভব হলো। নিউট্রাল কারেন্টের অস্তিত্ব প্রমাণিত হলো। ফার্মি ল্যাবেও একই ধরনের রেজাল্ট পাওয়া গেলো। ১৯৭৮ সালে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইলেকট্রন এক্সিলারেটরে (SLAC) ইলেট্রন ও ডিউটেরনের মিথষ্ক্রিয়া ঘটিয়েও দুর্বল নিউক্লিয়ার বল এবং তড়িৎচালক বলের সমন্বয়ের প্রমাণ পাওয়া গেলো। এই আবিষ্কারের জন্য ১৯৭৯ সালের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয় বিজ্ঞানী আবদুস সালাম, স্টিভেন ওয়াইনবার্গ ও শেলডন গ্ল্যাশোকে।

তড়িৎচুম্বক বল ও দুর্বল নিউক্লিয়ার বল একীভূত করা সম্ভব দেখে সমন্বিত তত্ত্বের বিজ্ঞানীরা আরো উৎসাহিত হয়ে উঠলেন বাকি বলগুলিকেও একত্রিত করে ফেলার ব্যাপারে। সবল নিউক্লিয়ার বলের কোয়ান্টাম প্রক্রিয়া সামলানোর জন্য আবিষ্কৃত হলো কোয়ান্টাম ক্রোমোডায়নামিক্স। নিউক্লিয়াসের ভেতরের প্রোটন ও নিউট্রনকেও ততদিনে ভেঙে ফেলেছেন বিজ্ঞানীরা। আবিষ্কৃত হয়েছে আরো ক্ষুদ্র মৌলিক কণা কোয়ার্ক। কোয়ার্কের প্রকৃতি অনুযায়ী তাদেরকে ছয়টি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে – আপ কোয়ার্ক, ডাউন কোয়ার্ক, টপ কোয়ার্ক, বটম কোয়ার্ক, চার্ম কোয়ার্ক ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক। দুটো আপ কোয়ার্ক আর একটি ডাউন কোয়ার্ক মিলে হয় একটি প্রোটন, আবার দুটো ডাউন কোয়ার্ক আর একটি আপ কোয়ার্ক মিলে হয় একটি নিউট্রন। নিউক্লিয়াসের ভেতর কোয়ার্কগুলি পরস্পরের কাছ থেকে যত দূরে যায় তাদের মধ্যকার আকর্ষণ বল বাড়ে। সে কারণেই প্রকৃতিতে বিচ্ছিন্ন কোন কোয়ার্ক পাওয়া যায় না। 

মৌলিক কণার স্ট্যান্ডার্ড মডেলে হিগস বোসনের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে স্ট্যান্ডার্ড মডেল সম্পূর্ণতা পেয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড মডেল অনুসারে মহাবিশ্বের সবকিছুর ভর তৈরি হয়েছে ছয়টি কোয়ার্ক ও ছয়টি লেপটন কণার (ইলেকট্রন, ইলেকট্রন নিউট্রিনো, মিউয়ন, মিউয়ন নিউট্রিনো, টাউ এবং টাউ নিউট্রিনো) সমন্বয়ে। এদের মধ্যে মাত্র চারটি কণা (আপ কোয়ার্ক, ডাউন কোয়ার্ক, ইলেকট্রন ও ইলেকট্রন নিউট্রিনো) হলো সব পদার্থের মূল উপাদান। পারমাণবিক স্কেলে বল নিয়ন্ত্রিত হয় বল বিনিময়কারী বোসন কণার (Z, W, ফোটন, গ্লুয়ন এবং হিগস) মাধ্যমে। 

স্ট্যান্ডার্ড মডেলের মৌলিক কণাগুলির তত্ত্ব পরমাণু ও নিউক্লিয়ার স্কেলের কাজকর্মকে সমন্বিতভাবে ব্যাখ্যা করতে পারলেও বড় স্কেলের মহাকর্ষকে কিছুতেই একত্রিত করতে পারছে না। কারণ মহাকর্ষ বলের সার্থক কোয়ান্টাম রূপান্তর করা যাচ্ছে না। 

১৯৭৬ সালে বিজ্ঞানীরা একটি সম্ভাবনা দেখলেন। গ্রাভিটি থিওরি সামলানোর জন্য এই সম্ভাবনার নাম দেয়া হলো সুপারগ্রাভিটি। এটি মূলত আইনস্টাইনের জেনারেল রিলেটিভিটির সাথে কিছু তাত্ত্বিক কোয়ান্টাম কণার সমন্বিত রূপ। গ্রাভিটির সাথে সুপার কথাটি যোগ করা হয়েছে মূলত সুপারসিমেট্রির ধারণা থেকে। পদার্থবিজ্ঞানে সিমেট্রি বা সাম্যতার ব্যাপারটা খুবই ব্যবহার করা হয় কোয়ান্টাম মেকানিক্সের গাণিতিক প্রয়োজনে। স্থান-কাল ও কোয়ান্টাম স্টেট  উল্টে দিলেও যদি কোন সিস্টেম একই থাকে – তাকে সিমেট্রিক্যাল সিস্টেম বলা হয়। যেমন একটি সুষম বৃত্ত। সুপারসিমেট্রির ধারণাটি আরেকটু জটিল। সুপারসিমেট্রি তত্ত্ব অনুসারে যে কোন কণারই একটি ভরবাহী অংশ থাকবে, এবং একই সাথে আরেকটি বলবাহী অংশ থাকবে। অর্থাৎ একটি কোয়ার্ক যদি স্বাভাবিকভাবে ভর বহন করে তার একই রকমের একটি সহযোগী কণা থাকবে যেটা বল বহন করবে। অন্যদিকে একটি ফোটন স্বাভাবিকভাবে বল বহন করে। সুপারসিমেট্রিতে ফোটনের আরেকটি সহযোগী ফোটন থাকবে যেগুলি ভর বহন করবে। পুরো সিস্টেমের গাণিতিক প্রক্রিয়া শেষ হবার পর অবশ্য এই কাল্পনিক কণাগুলির ভর ও বলবাহী অংশগুলি সমন্বিতভাবে একটি ধনাত্মক হলে অন্যটি ঋণাত্মক হয়ে বাতিল হয়ে যাচ্ছে। 

সুপারগ্রাভিটি তত্ত্বে ধারণা করা হচ্ছে মহাকর্ষ বল বহনকারী কণা হবে ‘গ্রাভিটন’ যার স্পিন সংখ্যা ২। এটি একটি সুপারসিমেট্রিক কণা। স্পিন-২ কণার স্পিন কোয়ান্টাম সংখ্যা হতে পারে ৫টি (2s + 1 = 2 x 2 +1 = 5)। অর্থাৎ গ্রাভিটনের সাথে আরো চারটি কাল্পনিক কণা যোগ করা যাবে যাদের স্পিন সংখ্যা ৩/২, ১, ১/২, এবং ০। স্পিন সংখ্যা ০, ১, এবং ২ সম্পন্ন কণাগুলির শক্তি হবে ধনাত্মক। স্পিন সংখ্যা ৩/২ এবং ১/২ সম্পন্ন কণাগুলির শক্তি হবে ঋণাত্মক। এভাবে অসীম সম্ভাবনার শেষ পর্যন্ত যোগফল হবে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক শক্তির কাটাকাটি। কিন্তু এই কাল্পনিক কণার অসীম সম্ভাবনা সিরিজের হিসেব করতে শক্তিশালী কম্পিউটারেরও সময় লেগে যেতে পারে বছরের পর বছর। আর হিসেবে ভুল হলে তো কথাই নেই – সবকিছু আবার প্রথম থেকে শুরু করতে হবে। তাই সুপারগ্রাভিটি বা সুপারসিমেট্রি (SUSY) গাণিতিকভাবে সফল হলেও খুব একটা বাস্তবসম্মত নয়। লার্জ হার্ড্রন কোলাইডারে এখনো সুপারসিমেট্রির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। 

জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি ক্লাসিক্যাল থিওরি। এটাকে কোয়ান্টামে রূপান্তর ঘটানোর জন্য বিজ্ঞানীরা আরেকটি ভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে অগ্রসর হলেন। আমরা জানি মহাকর্ষ বল মহাবিশ্বের সবখানে আছে, এবং তা নিরবিচ্ছিন্ন। কিন্তু কোয়ান্টাম সিস্টেম হলো বিচ্ছিন্ন সিস্টেম। বিজ্ঞানীরা চিন্তা করলেন লুপ কোয়ান্টাম গ্রাভিটির – যেখানে স্পেস-টাইম হবে কোয়ান্টাইজড – অর্থাৎ ছোট ছোট লুপ বা স্পিন নেটওয়ার্কে বিভক্ত। কোয়ান্টাম মেকানিক্সে যেভাবে গুচ্ছ গুচ্ছ শক্তিস্তরের হিসেব করা হয় – সেভাবে গ্রাভিটিকেও গুচ্ছ গুচ্ছ লুপ গ্রাভিটি ধরে হিসেব করা হবে। যার ফলে দ্বিমাত্রিক এরিয়া কোয়ান্টাইজেশান বা ত্রিমাত্রিক ভল্যুম কোয়ান্টাইজেশানও করা যাবে। কিন্তু লুপ কোয়ান্টাম গ্রাভিটি কোন সিঙ্গুলারিটি সমর্থন করে না। অর্থাৎ লুপ কোয়ান্টাম গ্রাভিটির মাধ্যমে মহাবিশ্বের সূচনা কীভাবে হয়েছিল সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে না। এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া না গেলে এটি সবকিছুর তত্ত্বের পুরোপুরি দাবিদার হতে পারবে না। 

এসময় ভিন্ন ধারণার একটি তত্ত্বের প্রবর্তন করেন বিজ্ঞানীরা – যার নাম স্ট্রিং থিওরি। সুপারগ্রাভিটি তত্ত্বের চেয়েও বেশি সম্ভাবনাময় তত্ত্ব হলো স্ট্রিং থিওরি। কারণ স্ট্রিং থিওরি অনুসারে মহাবিশ্বের সবকিছুই তৈরি হয়েছে অত্যন্ত ক্ষুদ্রাকারের সূতা বা স্ট্রিং থেকে। পার্টিক্যাল ফিজিক্সের স্ট্যান্ডার্ড মডেল অনুযায়ী যেখানে মৌলিক কণা – ইলেকট্রন, কোয়ার্ক ইত্যাদি কণা আকারে রয়েছে, সেখানে স্ট্রিং থিওরি বলছে ইলেকট্রন কিংবা কোয়ার্ক পদার্থের শেষ কথা নয়। বরং এগুলিও তৈরি হয়েছে আরো ক্ষুদ্র তরঙ্গ আকারের স্ট্রিং থেকে। স্ট্রিং তত্ত্ব প্রচলিত যে কোনো তত্ত্বের চেয়ে জটিল – কারণ এটি প্রচলিত স্পেস-টাইমের চার মাত্রিক ভুবনের বদলে দশ মাত্রিক ভুবনে কাজ করে। 

ত্রিমাত্রিক ভুবনে বাস করে দশ মাত্রিক ভুবন কল্পনা করা আমাদের জন্য সহজ নয়। কিন্তু ইলেকট্রন কোয়ার্কের চেয়েও ছোট স্কেলে স্পেস-টাইম এমনভাবে একট মাত্রার সাথে অন্যমাত্রা ভাঁজ হয়ে থাকে যে সেখানে দশ মাত্রা থাকতেই পারে। গাণিতিক প্রয়োজনেই স্ট্রিং তত্ত্বে দশ মাত্রিক ভুবনের ধারণা নেয়া হয়েছে। প্রচলিত তিন মাত্রিক ভুবনের প্রত্যেকটি মাত্রাকে তিন মাত্রিক ধরে তাদের সাথে সময়ের মাত্রা যোগ করে দশ মাত্রিক ভুবন। 

স্ট্রিং তত্ত্বের বিজ্ঞানীরা গাণিতিকভাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে এই তত্ত্ব সবকিছুর সমন্বিত তত্ত্ব হিসেবে অত্যন্ত সফল এবং কার্যকর। কিন্তু বিভিন্ন গবেষকদল বিভিন্ন গণিত ব্যবহার করে স্ট্রিং তত্ত্বের আরো অনেকগুলি রূপ আবিষ্কার করে ফেললেন। দেখা গেলো বহুমাত্রিক ভুবন অসংখ্য রূপে একের ভেতর অন্যটি ভাঁজ হয়ে থাকতে পারে। সকল কাজের একটি মাত্র তত্ত্ব আবিষ্কার করতে গিয়ে দেখা গেলো স্ট্রিং থিওরি একীভূত হবার বদলে বিভক্তি ডেকে আনলো। 

১৯৯৪ সালের দিকে বিজ্ঞানীরা কিছুটা একমত হলেন যে স্ট্রিং থিওরির যে পাঁচটি প্রধান রূপ তারা প্রত্যেকেই আসলে প্রচলিত চতুর্মাত্রিক ভুবনকেই ভিন্ন ভিন্নভাবে উপস্থাপন করছে। সবগুলি স্ট্রিং থিওরির সমন্বয়ে তৈরি হলো স্ট্রিং তত্ত্বের বর্ধিত সংস্করণ এম-থিওরি। স্টিফেন হকিং তাঁর গ্রান্ড ডিজাইন বইতে লিখেছেন, “সম্ভবত কেউ জানে না এম-থিওরির এম মানে কী। হতে পারে ‘মাস্টার’, ‘মিরাকল’, ‘মিস্ট্রি’ – কিংবা সবগুলিই।“ তবে জন গ্রিবিন ব্যাখ্যা করেছেন এই এম-থিওরির এম এসেছেন ‘মেমব্রেন’ থেকে। স্ট্রিং বা সুতার বদলে মেমব্রেন বা ঝিল্লি। ধারণা করা হচ্ছে এম-থিওরি মহাবিশ্বের সবকিছু ব্যাখ্যা করতে সক্ষম। এম-থিওরির কাজ করার জন্য দরকার হয় এগারো মাত্রিক ভুবনের। বলা হচ্ছে দশ মাত্রিক স্ট্রিং থিওরিতে একটি মাত্রা বাদ পড়ে গিয়েছিল। 

সকল কাজের তত্ত্বের একটি শক্তিশালী দাবিদার এম-থিওরি। যদিও এর কোন বাস্তব প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি, কিন্তু গাণিতিকভাবে এম-থিওরি এক মাত্রিক কণা, দ্বিমাত্রিক ঝিল্লি, ত্রিমাত্রিক বস্তু সবকিছুরই কাজকর্ম ব্যাখ্যা করতে পারে। এম-থিওরি গাণিতিকভাবে এতটাই শক্তিশালী যে এটি কোটি কোটি কোটি নতুন মহাবিশ্বের সম্ভাবনার ধারণাকে সমর্থন করে। একটি মহাবিশ্বের সবকিছুকে একটিমাত্র তত্ত্বে প্রকাশ করার জন্য যে থিওরি অব এভরিথিং খুঁজে বেড়াচ্ছেন বিজ্ঞানীরা, এম-থিওরি যদি সেই তত্ত্ব হয়, তাহলে এম-থিওরি তো নতুন সমস্যার জন্ম দিচ্ছে – যা হলো আরো অসীম সংখ্যক মহাবিশ্ব। তাহলে এটি সবকিছুর তত্ত্ব হিসেবে কতটুকু সফল হবে সে ব্যাপারে সন্দেহ থেকেই যায়। 

এখন প্রশ্ন হলো সবকিছুর তত্ত্ব কেন লাগবে আমাদের? পদার্থবিজ্ঞান ছাড়া বিজ্ঞানের অন্য কোন শাখার এ নিয়ে তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানে কেন দরকার এই তত্ত্বের? 

আইনস্টাইন তাঁর জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময় ধরে যে তত্ত্বের সন্ধান করেছেন সেটা ছিল – গ্রান্ড ইউনিফিকেশান থিওরি। তিনি আশা করেছিলেন মহাবিশ্বের সবকিছুর ভেতর একটা গাণিতিক যোগসূত্র খুঁজে বের করার। তিনি সফল হননি। তাতে পদার্থবিজ্ঞানের কোন ক্ষতি হয়নি।

এরপর তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানীরা গ্রান্ড ইউনিফিকেশানের চেয়েও উচ্চাকাঙ্খী একটি তত্ত্বের পেছনে ছুটলেন যেটা থেকে মহাবিশ্বের সব মৌলিক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে। এই তত্ত্বকে জনপ্রিয় করে তোলার পেছনে যেসব বিজ্ঞানীদের অবদান সবচেয়ে বেশি তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন স্টিফেন হকিং।  ১৯৮১ সালে লুকাসিয়ান প্রফেসরের দায়িত্ব নিয়ে প্রথম লেকচারে স্টিফেন হকিং আশা প্রকাশ করেছিলেন পরবর্তী বিশ বছরের মধ্যে সবকিছুর তত্ত্ব (TOE) আবিষ্কৃত হয়ে যাবে। এরপর তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানীদের হাতে আসলে আর কোন কাজ থাকবে না করার। স্টিফেন হকিং তাঁর ব্রিফ হিস্টি অব টাইম বই শেষ করেছিলেন এভাবে: একটি সম্পূর্ণ তত্ত্ব যদি  আমরা আবিষ্কার করতে পারি, সেই তত্ত্ব শুধুমাত্র গুটিকতক বিজ্ঞানীদের কাছে নয়, সবারই বোধগম্য হবে। তখন আমরা সবাই, দার্শনিক, বিজ্ঞানী, সাধারণ মানুষ সবাই আলোচনা করতে পারবো কেন এবং কীভাবে আমরা এবং আমাদের মহাবিশ্বের উৎপত্তি হয়েছে। 

স্টিফেন হকিংয়ের জীবনসঙ্গিনী জেন হকিং এর অসাধারণ স্মৃতিকথা “মিউজিক টু মুভ দ্য স্টারস: এ লাইফ উইথ স্টিফেন” অবলম্বনে জেমস মার্শ যখন সিনেমা তৈরি করেন, অনেক ভেবেচিন্তে তার নাম দেন স্টিফেন হকিং-এরই একটি জনপ্রিয় বইয়ের নামানুসারে ‘দ্য থিওরি অব এভরিথিং’। ২০১৪ সালে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমাটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় – কারণ এই সিনেমা স্বয়ং স্টিফেন হকিং এর জীবনের প্রতিফলন। ‘থিওরি অব এভরিথিং’ বইটি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়া স্টিফেন হকিং-এর সাতটি জনপ্রিয় বিজ্ঞান বক্তৃতার সংকলন। এই বক্তৃতামালা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৬ সালে ‘দ্য কেমব্রিজ লেকচার’ নামে। পরে ২০০৫ সালে ‘থিওরি অব এভরিথিং’ নামে বইটি প্রকাশিত হয়। বইয়ের সপ্তম ও শেষ অধ্যায়ের শিরোনাম ‘দ্য থিওরি অব এভরিথিং’। এর পাঁচ বছর পর ২০১০ সালে স্টিফেন হকিং লিওনার্ড ম্লোডিনাউয়ের সাথে যৌথভাবে প্রকাশ করেন আরেকটি জনপ্রিয় বই ‘দ্য গ্রান্ড ডিজাইন’। এই বইতেও ‘দ্য থিওরি অব এভরিথিং’ শিরোনামে একটি অধ্যায় আছে। সবকিছুর তত্ত্বকেই স্টিফেন হকিং মনে করেছিলেন মহাবিশ্বের গ্রান্ড ডিজাইন। 

কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের একটিমাত্র তত্ত্ব দিয়েই মহাবিশ্বের সমস্ত রহস্যের সমাধান করে ফেলা যাবে – এ ব্যাপারে স্টিফেন হকিং-এর যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। ২০০২ সালে স্টিফেন হকিং তাঁর “গোডেল অ্যান্ড দ্য এন্ড অব ফিজিক্স” লেকচারে বলেছিলেন, অনেকেই হতাশ হবেন যদি একটি পরম তত্ত্ব খুঁজে না পাওয়া যায় যার মাধ্যমে সবকিছুই ব্যাখ্যা করা যায়। “আমিও তাদের দলে ছিলাম, কিন্তু আমি আমার মত পাল্টে ফেলেছি। আমি এখন এই ভেবে খুশি যে আমাদের খোঁজার পালা কখনোই সাঙ্গ হবে না। ফলে সবসময়েই আমাদের মধ্যে নতুন কিছু আবিষ্কারের চেষ্টাটা রয়ে যাবে।“


তথ্যসূত্র ও সহায়ক গ্রন্থ

১। মোয়াতাজ এইচ ইমাম সম্পাদিত ‘আর উই দেয়ার ইয়েট? দ্য সার্চ ফর এ থিওরি অব এভরিথিং’, বেন্থাম সায়েন্স পাবলিশার্স, ২০১১। 

২। জেমস আর জনসন, ‘ডাজ এ থিওরি অব এভরিথিং এক্সিস্ট?’, ফিলোসফি অ্যান্ড কসমোলজি, সংখ্যা ২৬, ২০২১।

৩। স্টিফেন হকিং ও লিওনার্ড ম্লোডিনাউ, দ্য গ্রান্ড ডিজাইন, ব্যান্টাম বুক্‌স, লন্ডন, ২০১০।

৪। স্টিফেন হকিং, দ্য থিওরি অব এভরিথিং, ফিনিক্স বুক্‌স, ক্যালিফোর্নিয়া, ২০০৫।

৫। জন গ্রিবিন, ইন সার্চ অব সুপারস্ট্রিংস, দ্বিতীয় সংস্করণ, আইকন বুক্‌স, লন্ডন, ২০০৭।

৬। পি সি ডাব্লিউ ড্যাভিস ও জে ব্রাউন সম্পাদিত, সুপারস্ট্রিংস এ থিওরি অব এভরিথিং? ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস, ক্যান্টো সংস্করণ, ভিক্টোরিয়া, ১৯৯২।

৭। এ থিওরি অব এভরিথিং? ন্যাচার, সংখ্যা ৪৩৩, জানুয়ারি ২০০৫।

৮। ডন লিংকন, আইনস্টাইনস আনফিনিশড ড্রিম: প্র্যাকটিক্যাল প্রোগ্রেস টুওয়ার্ডস এ থিওরি অব এভরিথিং, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০২৩।

৯। ব্রায়ান গ্রিন, দি এলিগ্যান্ট ইউনিভার্স, ভিন্টেজ বুক্‌স, নিউ ইয়র্ক, ২০০৩। 

১০। মিশিও কাকু, দ্য গড ইকুয়েশান: দ্য কোয়েস্ট ফর এ থিওরি অব এভরিথিং, ডাবলডে, নিউইয়র্ক, ২০২১। 

______________
বিজ্ঞানচিন্তা ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সংখ্যায় প্রকাশিত











Latest Post

বাংলাদেশি ডাক্তার সমাচার ১: তোফা ও তহুরা

  আমাদের ডাক্তারদের নিয়ে গর্ব করার মতো অসংখ্য ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে বাংলাদেশে। কিন্তু ডাক্তারদের সমালোচনা করার ব্যাপারে আমরা যতটা উৎসাহী, প্রশ...

Popular Posts