নভেম্বর ১৭, ২০০৪
প্রথম আলো’র ১০ নভেম্বর নারীপক্ষে আশা নাজনীন লিখেছেন বৃদ্ধাবাসে মায়েদের ঈদ প্রসংগে। বাংলাদেশে প্রবীণ হিতৈষী সংঘের উদ্যোগে একটি বৃদ্ধাবাস গড়ে ওঠেছে ঢাকার আগারগাঁওয়ে। আমাদের দেশে এরকম আরো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে আস্তে আস্তে। এখানে বাস করেন এরকম কয়েকজন মায়ের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লেখাটা তৈরি করা হয়েছে। এখানে যারা থাকেন আর্থিক অভাব নেই তাঁদের, কিন্তু মনে হলো সবাই একা। ছেলে মেয়েদের সংসারে জায়গা হয় না বলেই এখানে
থাকতে হচ্ছে। বা ছেলেমেয়ে দেশের বাইরে বলেই।আমার কাছে ব্যাপারটা মিশ্র অনুভূতিসম্পন্ন। আধুনিকতার সাথে সাথে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ থেকে শুরু করে অনেক কিছুই বদলে যেতে বাধ্য। স্বাধীনতা আমরা এখন নিজের সংসারেতো চাইই, নিজের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই চাই। এটা চাওয়া কোন ভুল কাজ নয়। মা-বাবা বা যে কেউ একটা সময়ে ছেলে মেয়েদের ওপর নির্ভর করবেন এটা স্বাভাবিক। কিন্ত সমস্যা হচ্ছে যখন এই নির্ভরশীলতাটা দাবীর পর্যায়ে চলে যায়। কর্তব্য আর ভালোবাসা আলাদা ব্যাপার। কর্তব্যে ভালোবাসার ছোঁয়া থাকলে ভালো, কিন্তু অনেক সময় নাও থাকতে পারে। পাশ্চাত্যের জীবন পদ্ধতি অনেকদিন থেকেই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে প্রাধান্য দিয়ে আসছে। এখানে একটা নির্দিষ্ট বয়সের পরে ছেলেমেয়েরা বেরিয়ে পড়ে মা বাবার পরিবার থেকে। আমাদের দেশেও প্রচ্ছন্নভাবে অনেকটা সে রকম। আমাদের দেশে আমি মনে করি আরো অনেক বৃদ্ধাবাস গড়ে ওঠা দরকার। আর ব্যাপারটাকেও সহজভাবে মেনে নেয়া দরকার।
১১ নভেম্বরের জনকণ্ঠে মহিউদ্দিন
আহমেদ লিখেছেন ‘জিয়ার আধুনিক বাংলাদেশ’। খুশবন্ত সিং এর আত্মজীবনীর কথা দিয়ে শুরু।
তিনি নাকি একবার চিত্রনায়িকা নার্গিস দত্তকে দিল্লীর কাছে কাসৌলি নামে জায়গায় নিজের
একটা কটেজে কিছুদিনের জন্য থাকতে দিয়েছিলেন। সিং নার্গিসকে শর্ত দিয়েছিলেন, ‘‘আমি কিন্তু
পরে সবাইকে বলবো যে আপনি আমার বিছানায় ঘুমিয়েছেন।’’ পরে নার্গিস সংসদ সদস্য হবার পরে
নার্গিসকে সিং এর সাথে কেউ পরিচয় করিয়ে দিতে চাইলে নার্গিস বলতেন, ‘‘আমি তাঁকে খুব
ভালো করেই চিনি। আমি তাঁর বিছানায় ঘুমিয়েছি।’’ এরপর মহিউদ্দিন আহমেদ লিখেছেন সাম্প্রতিক
কালে মান্নান ভুঁইয়া যে বলেছেন ‘জিয়া আধুনিক বাংলাদেশের শ্রষ্ঠা’। বাংলাদেশ ‘আধুনিক’?
মান্নান সাহেব, আধুনিকতার সংজ্ঞা কী?
নিউইয়র্ক থেকে আবেদীন কাদের লিখেছেন
আমেরিকার সাম্প্রতিক নির্বাচন প্রসংগে ‘ধর্মীয় চেতনার কাছে বেঁচে থাকার সংগ্রাম পরাজিত’।
এ বিষয়টা সত্য। যারা ধর্ম মানে তারা কি পৃথিবীর সব জায়গাতেই ধর্মকে বা ধর্মীয় গোঁড়ামিকে
বেঁচে থাকার সংগ্রামের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয় না? আর আমেরিকানদের তো বুশ নির্বাচিত
হওয়াতে একটুও অখুশি মনে হচ্ছে না।
ওয়াহিদুর রহমান লিখেছেন ‘ক্রসফায়ারে স্বৈরাচারও কি নিধন হবে?’ বরাবর যেরকম লিখে থাকেন। ক্রসফায়ারে মানুষ মেরে ফেলা হচ্ছে বাংলাদেশে। বেশির ভাগই সন্ত্রাসী অবশ্য। সাধারণ মানুষ এদের মৃত্যুতে খুব বেশি দুঃখিত নয়। কিন্তু এভাবে মেরে ফেলাটা কিছুতেই সমর্থন যোগ্য নয়। এতে আইনের প্রতি বুড়ো আঙুল দেখানো হয়।
৯ নভেম্বরের ভোরের কাগজে মনজুরুল হক লিখেছেন ‘টাটার বিনিয়োগ এবং আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলেপনা’’। সিডনির অজয় দাশগুপ্ত কয়েকদিন আগে বাংলাদেশের বামবুদ্ধিজীবী যারা টাটার বিনিয়োগের বিরোধিতা করছেন তাদের বিরুদ্ধে লিখেছেন। বাংলাদেশে টাটার বিনিয়োগ ভালো কি মন্দ তাতে অনেক তর্ক চলতে পারে। কিন্তু টাটার দেয়া শর্তগুলোও কি আমাদের দেশের জন্য খুব লাভজনক? বিশ বছর গ্যাস সাপ্লাই করতে হবে, উৎপাদিত পণ্য কোন ধরণের শর্ত ছাড়া রপ্তানী সহ আরো অনেক। প্রশ্ন হলো টাটা এদেশে আসছে কেন? আর আমার প্রশ্ন হলো টাটার বিরোধীতা কি বিরোধীতার খাতিরে বিরোধীতা? আমাদের দেশে কি যথেষ্ট বিদেশী বিনিয়োগের দরকার নেই? অবশ্য মঞ্জুরুল হকের কাছ থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার জানা যায়, সেটা হলো যারা বাংলাদেশের বাইরে আরাম আয়েসে থেকে মাঝে মাঝে পত্রিকায় নিজেদের জাহির করে তাদের দেশপ্রেমকে আসলে খুব একটা ভালো চোখে দেখা হয় না। দেশকে ভালোবাসতে হলে দেশেই থাকতে হয়, এটাই হলো মঞ্জুরুল হকের কথা।
প্রথম আলোর ঈদসংখ্যা আলপিন পড়লাম।
মধ্যপন্থী পত্রিকা হলেও আলপিন কিন্তু বেশ কাজ করে যাচ্ছে। হুমায়ূন আহমেদের লেখার প্যারোডি
‘মিসির আলীর অমীমাংসিত রহস্য’ লিখেছেন রেদোয়ান রাসেল। ভালো লাগলো। জীবনানন্দ দাশের
আকাশলীনা কবিতার প্যারোডি ‘ফুচকাওয়ালা’ বেশ ভালো লাগলো। কে লিখেছেন নাম নেই এখানে।
‘জুলেখা, ওর ফুচকা খেয়ো নাকে তুমি,
বোলোনাকো কথা ওই ফুচকাওয়ালার সাথে;
ফিরে এসো জুলেখা
মেজাজ আমার হচ্ছে গরম এই চাঁদনীরাতে।’
রবীন্দ্রনাথের হৈমন্তী গল্পের প্যারোডি
‘বাসন্তী’ লিখেছেন নুরুল মোমেন। ভালো লেগেছে।
৯ নভেম্বরের জনকণ্ঠে মনজুরে মওলা
লিখেছেন ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার কি থাকবে?’। বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির সংস্কারের
দাবী উঠছে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে। আরো কিছু বামদলও কথা বলছে এ ব্যাপারে। খালেদা জিয়া
বলেছেন ‘তাহলে বি-এন-পির অধীনে নির্বাচনে অংশ নিতে হবে। ২০০১ সালের নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক
সরকার ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে।
আবদুল মান্নান লিখেছেন ‘আফতাবনামার
সঙ্গে যৎকিঞ্চিৎ সংযোজন’। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য আফতাব আহমাদ বেশ
আলোচিত ব্যক্তি এখন। দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে হঠাৎ ঘোষণা করেছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের
নাম হবে জিয়াউর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়।
ডঃ এ কে আবদুল মোমেন লিখেছেন ‘২১
০ ১৫ আগষ্টের নীলনক্সা কি একই?’ ডঃ মোমেন জিয়াউর রহমানের সাথে শ্রীলংকা ও তেহরান ভ্রমণ
করেছিলেন। সেখানে সাংবাদিকরা জিয়াউর রহমানকে প্রশ্ন করেন তিনি শেখ মুজিবকে হত্যার সাথে
জড়িত কিনা। জিয়া সেই সাংবাদিককে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে বলেন দেশের মানুষ কী
বলে তা জেনে নিতে। সামরিক সরকারের আমলে দেশের মানুষ কি কখনো কিছু বলে? দেশের মানুষের
কাজ হলো হাততালি দেয়া। বানরের নাচ দেখলেও হাততালি দেয়, সামরিক সরকার প্রধানের বত্তৃতা
শুনলেও দেয়।
প্রিয় হাসান লিখেছেন ‘নির্লজ্জ ও বেহায়া সংস্কৃতি’ যা আমাদের দেশের এখন চলছে।
৮ নভেম্বর প্রথম আলোতে আবদুল কাইয়ুম লিখেছেন ‘খারাপ কিন্তু কত খারাপ?’। আবদুল কাইয়ুম সহজ কথায় সত্য কথা লিখেছেন ‘টেবুলেশন শিটে জালিয়াতি করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়না, ক্ষুণ্ন হয় সেই জালিয়াতির তথ্য প্রকাশ করলে! দুর্বৃত্তের কাজ দ্বারা দুর্বৃত্তায়ন হয় না, দুর্বৃত্তায়ন হয় সেটা ফাঁস করলে!’ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নাকি রেগে গেছেন জালিয়াতির কথা জেনে নয়, সেটা প্রকাশিত হয়ে পড়েছে জেনে। কাইয়ুম লিখছেন বাংলাদেশের সরকারী ও বিরোধীদল আসলেই চাইলে বাংলাদেশ থেকে সন্ত্রাস নির্মূল করতে পারে। তারা যদি তাদের দলীয় সন্ত্রাসীদের দল থেকে বের করে দেয়। তারা জানে বলেই একাজ কখনো করবে না। কাইয়ুম সাহেবও জানেন এ কথা। আমরা আমেরিকার বুশকে গালাগালি করি। এদেশে মাফিয়ারা আছে। কিন্তু রাজনীতিবিদরা কখনোই প্রকাশ্যে কাউকে সাপোর্ট করতে পারে না। করেছে প্রমাণ পাওয়া গেলে আর যাই হোক, রাজনীতি আর করতে হবে না। সিনেমাতে যেরকম দেখা যায়, বাস্তবে কিন্তু সেরকম ঘটে না।
১০ নভেম্বরের প্রথম আলোর সম্পাদকীয়তে
সরকারকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে খালেদা জিয়া আর জিয়াউর রহমানের প্রশস্তিমূলক বই কিনে স্কুল
কলেজের লাইব্রেরী ভর্তি না করে ফেলতে। তাহলে কাদের বই কিনবে এই সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত
লোকেরা? ভালো লেখকরা যদি জিয়াভক্ত না হয়, সেটা তো তাদের দোষ নয়। সরকার কি আসলেই বিশ্বাস
করে যে এসমস্ত প্রশস্তি পড়ে স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েরা সব জিয়ার সৈনিক হয়ে যাবে? সবাই
কি ঘাসে মুখ দিয়ে চরে? ক্রীতদাসের হাসি চিরকালীন নয়।
পাঠকের কলামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
ছাত্র মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম লিখেছেন তাঁর বড়ভাইয়ের কথা যিনি অনেক ভালো রেজালট আর জাপান
থেকে পি-এইচ-ডি করেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারেননি। এখন তিনি আমেরিকায় আছেন,
ভালো করছেন। সাইফুল চিঠিটা লিখেছেন ১২ অক্টোবর তারিখে প্রকাশিত সামিনা লুৎফা নিত্রা’র
‘মেধার স্থান বনাম রঙের খেলা’ লেখাটার সূত্র ধরে। নিত্রার লেখাটা আগে পড়িনি। প্রথম
আলোর আর্কাইভ থেকে বের করে পড়লাম। নিত্রা বর্তমানে আমেরিকায় ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে
পড়াশোনা করছেন। তাঁর লেখা থেকে জানা যায় তিনি জীবনের সব পরীক্ষায় প্রথম হয়েছেন। তাঁর
মা বাবা দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তিনি কোন দল করেন না বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
শিক্ষক হতে পারেননি। তবে তিনি বাংলাদেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পেয়েছেন। তাঁর
মূল বক্তব্য পরিষ্কার নয়। তিনি দেশে ফিরে যাবেন বলছেন, আবার না ফিরলে তাঁকে দোষ দেয়া
যাবে কিনা তাও জিজ্ঞেস করছেন। নিত্রার মতো আরো অনেকেই আছেন এরকম। তাতে আমার কোন সন্দেহ
নেই। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কিছুদিন পরেই লজ্জা পাবেন তাঁদের পরিচয়
দিতে। কারণ শিক্ষক বললেই সবাই বুঝে নেবে কীভাবে
চাকরি হয়েছে তাদের, কীরকম ব্যবহার করেন তাঁরা
ছাত্রছাত্রীদের প্রতি, শিবির তাদের কেমন শক্তি বা রগ কাটায় কেমন দক্ষতা আছে;
কিংবা কেমন প্রশস্তি তিনি রচনা করতে পারেন সরকারের।
মৌলি আজাদ তাঁর আব্বা হুমায়ূন আজাদকে
একটা খোলা চিঠি লিখেছেন। চিঠি পড়ে মনে হচ্ছে হুমায়ূন আজাদের বস্তুবাদীতার দীক্ষা ঠিকমতো
পাননি তাঁর মেয়ে। ছেলেমেয়েরা তাঁর শেষ ইচ্ছা মেডিকেল কলেজে দেহদানের ব্যাপারটাকেই যেখানে
গুরুত্ব দিতে পারেনি আবেগ আর ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণে সেখানে হুমায়ূন আজাদ ব্যর্থ। তাঁর
উত্তরাধিকারী তাঁর পরিবারে নেই।
ডঃ শাহদীন মালিক লিখেছেন ‘দোহাই,
কমিশন আর দরকার নেই’। আমাদের দেশের হবে হচ্ছে করা স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন সহ আরো
নানা রকম ক্ষমতাবিহীন পোস্টার সর্বস্ব কমিশন সম্পর্কে বলেছেন তিনি। প্রশ্ন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে
যারা প্রশাসনিক পদে নিয়োগ পান, তারা যোগ্য কিনা? আমাদের দেশের যোগ্যতা মাপার মাপকাঠিটা
আসলে অন্যরকম।
কলম্বাস, ওহাইও

No comments:
Post a Comment