Sunday, 30 August 2026

বিদায় দীপঙ্করস্যার

 


বাঁশখালীর বিশিষ্ট আইনজীবী দীপংকর দে মহাশয়ের জীবনাবসান হয়েছে আজ সকালে। সবার কাছে খ্যাতিমান আইনজীবী হিসেবে পরিচিত হলেও, পারিবারিক সূত্রে তিনি আমার পিসতুতো বড় ভাই হলেও- আমার কাছে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হলো তিনি আমার শিক্ষক। ক্লাস সিক্সে বাংলা দ্বিতীয় পত্র আর ক্লাস সেভেনে বিজ্ঞান পড়িয়েছেন আমাদের।

হাইস্কুলে ভর্তি হবার আগে থেকেই অবশ্য তাঁর অভিনয়ে মুগ্ধ ছিলাম। শিল্পসংস্কৃতি – বিশেষ করে মঞ্চনাটকের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল আমাদের গ্রাম। স্কুলে প্রতি বছর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং নাটক মঞ্চস্থ হতো। নাটকের রিহার্সাল থেকে শুরু করে প্রতিটি কর্মকান্ড চোখ বড় বড় করে গিলতাম সেই প্রাইমারি স্কুলে থাকতেই। সেখানে দেখতাম দীপঙ্করস্যারের কর্মতৎপরতা।

একটি নাটকের কথা বিশেষভাবে মনে পড়ছে। আমি তখন ক্লাস ফাইভে উঠেছি। হাইস্কুলে সেবছরের নাটকের নাম ছিল সম্ভবত ‘গণিমাস্টারের দিনরাত্রি’। দরিদ্র স্কুলশিক্ষক গণিমাস্টারের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন স্বয়ং রমণীমোহন দে – যিনি রমণীমাস্টার নামে পরিচিত ছিলেন সবার কাছে।  নাপোড়ার বিখ্যাত মাস্টারবাড়ি আমাদের কাছে ছিল জ্ঞানতীর্থের ঠিকানা। সেই মাস্টারবাড়ির প্রধান ব্যক্তি মাস্টার রমণীমোহন দে। জ্ঞান এবং ব্যক্তিত্বের কারণে তিনি ছিলেন সবার শ্রদ্ধেয়। তাঁর পাঁচ ছেলের মধ্যে প্রথম তিন জনই ততদিনে শিক্ষকতা শুরু করেছেন। চতুর্থ এবং পঞ্চমজন তখনো ছাত্র। স্কুলের নাটক এতটাই সমৃদ্ধ হতো যে সেখানে বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সাথে শিক্ষকরাও অভিনয় করতেন।

নাটকের ঘটনা এবং অভিনেতাদের কথা যতটুকু মনে পড়ছে – গণিমাস্টারের বড় ছেলে যে উচ্চশিক্ষিত হয়েও দিনের পর দিন চেষ্টা করেও একটি চাকরি জোটাতে না পেরে কীরকম হতাশায় ভুগছিলেন – সেই চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন দীপঙ্করস্যার – যিনি রমণীমাস্টারের তৃতীয় পুত্র, আর ছোট ছেলের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন রমণীমাস্টারের  দিনমণিদা – যিনি রমণীমাস্টারের পঞ্চম পুত্র। গণিমাস্টারের স্ত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন আমাদের মুকুন্দ আচার্য স্যার। দীপংকরস্যারের অভিনয়ের বেশ কিছু দৃশ্য আমার এখনো মনে পড়ে।

হাইস্কুলে ওঠার পর আমার একবার সুযোগ হয়েছিল দীপংকরস্যারের সাথে একটি নাটকে অভিনয় করার। সেই নাটক ছিল আমার প্রথম মঞ্চনাটক। নাটকের নাম ছিল রাজবন্দী। দীপংকরস্যার ছিলেন সেই নাটকের নায়ক। আমি ছিলাম সামান্য একজন সৈনিক। সর্বমোট তিনটি সংলাপ ছিল আমার।

নাটকের কথা বাদ দিই। লেখাপড়ার কথায় আসি। ক্লাস সিক্সে দীপংকর‍স্যার পড়াতেন বাংলা দ্বিতীয় পত্র। খুবই কাব্যিক মানুষ ছিলেন। যেকোনো বিষয়ের বর্ণনা এমন কাব্যিকভাবে দিতেন যে দৃশ্যগুলি চোখের সামনে ভেসে উঠতো।

পোশাক-পরিচ্ছদে বেশ সৌখিন ছিলেন তিনি। সাফারি স্যুট নামে এক ধরনের পোশাক ছিল সেই সময়। ঢোলা প্যান্ট, শার্টে সোনালী ধাতব বোতাম। উঁচু হিলের জুতো পরতেন। দেখলে বেশ সম্ভ্রম এবং ভয়ও জাগতো।

ক্লাস সেভেনে ওঠার পর আমার বাবা তাঁকে অনুরোধ করলেন আমাদের দুই ভাইকে বাড়িতে এসে পড়াতে। আমার বাবা তাঁর মামা। মামার অনুরোধ রক্ষার্থে আমাদের পড়াতে আসা। আমার চেয়েও আমার সদ্য নাইনে ওঠা বড়ভাইকে ইংরেজি শেখানোর তাগিদই বেশি ছিল। দীপঙ্করস্যার ছিলেন সব বিষয়েই দক্ষ। ইংরেজি বাংলা গণিত বিজ্ঞান সবকিছুতেই ছিল তাঁর গভীর পান্ডিত্য। তাঁর লেখার হাত ছিল চমৎকার, হাতের লেখাও।

কিন্তু তাঁর কাছে বসে পড়ার সুযোগ বেশিদিন থাকলো না। একদিন হঠাৎ তিনি স্কুলের চাকরি ছেড়ে দিয়ে উধাও হয়ে গেলেন। বেশ কয়েকবছর পর ফিরলেন আইন পাশ করে অ্যাডভোকেট হয়ে। ততদিনে আমি স্কুল থেকে কলেজে চলে এসেছি।

এরপর যতবারই দেখা হয়েছে, কাছে ডেকে কথা বলেছেন। আমি তাঁকে যতই আমার শিক্ষক হিসেবে পরিচয় দিই, তিনি ততই আমাকে ছোটভাই হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন।

আজ যখন তাঁর মৃত্যুসংবাদ শুনলাম, আপনজন চলে যাবার বেদনা অনুভব করলাম। মৃত্যুকে এড়িয়ে যাবার কোনো সুযোগ কারো নেই। তবুও বেদনাকে অস্বীকার করি কীভাবে! তাঁর এত শত আপনজনের স্মৃতিতে তিনি বেঁচে থাকবেন – বর্তমান প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মে।


No comments:

Post a Comment

Latest Post

বিদায় দীপঙ্করস্যার

  বাঁশখালীর বিশিষ্ট আইনজীবী দীপংকর দে মহাশয়ের জীবনাবসান হয়েছে আজ সকালে। সবার কাছে খ্যাতিমান আইনজীবী হিসেবে পরিচিত হলেও, পারিবারিক সূত্রে তিন...

Popular Posts