Saturday, 22 August 2026

পাঠকের দিনলিপি ০৩-সেপ্টেম্বর-২০০৪

 



সেপ্টেম্বর ৩, ২০০৪

 

গত সপ্তাহে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সভায় গ্রেনেড হামলা হয়েছে। সে নিয়ে বেশ রাজনীতি হচ্ছে এখন বাংলাদেশে। সংবাদপত্র পড়লাম। গতকালের প্রথম আলো পড়লাম। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফ বি আই এখন তদন্তে গেছে বাংলাদেশে।

১৯৯৫ সালের ২৩ আগস্ট দিনাজপুরের কোতোয়ালি থানার গোলাপবাগ রামনগর গ্রামের এমাজউদ্দিনের কিশোরী কন্যা ইয়াসমিন আক্তার ঢাকা থেকে  মায়ের সংগে দেখা করতে যাবার সময় দিনাজপুরের দশমাইল নামক স্থানে বাস থেকে নামার পরে পুলিশের এ এস আই মইনুল হক, কনস্টেবল আবদুস সাত্তার ও ভ্যানচালক অমৃতলাল বর্মন এগিয়ে আসে। বাড়িতে পৌছে দেবে বলে গাড়িতে তোলে ইয়াসমিনকে। তিনজনে মিলে তাকে ধর্ষণ করার পরে খুন করে। ১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট তারিখে এই তিনজনের ফাঁসির আদেশ হয়। গত পরশু এই তিনজনের মধ্যে দুইজনের ফাঁসি হয়ে গেছে। অমৃতলাল এখনো বেঁচে আছে। সে নাকি প্রেসিডেন্টের কাছে ক্ষমার আবেদন করেছে।

আমাদের দেশের খবরগুলি একজন সুস্থ মানুষকে পড়তে দিলে সে অসুস্থ হয়ে যাবে। আমরা হজম করছি কীভাবে? অনেক সময় দেখা যায় খাবার খেতে খেতেও পড়ছি এই সমস্ত খবর। খাদ্যের স্বাদও বদলে যাচ্ছে না। আমরা কি সুস্থ আছি? জীবাণুর আক্রমন রেগুলার হতে হতে আমাদের সহনশীলতা বেড়ে গেছে। এই সহনশীল মানুষ কারা, আমরা যারা ভদ্রলোক নামক কিছু ক্লীব আছি, ভালো ভালো কথা বলতে চেষ্টা করি, কিন্তু সমস্ত অন্যায় সহ্য করি। আমাদের এরকম সহনশীলতার কোন দরকার ছিলো কি? 

প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠার আরেকটি খুব ছোট খবর এরকমঃ জাহাংগীর নগর ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসের জংগলে এক গৃহবধূকে দেলোয়ার হোসেন ও লিটন মিয়া নামে দুইজন পুরুষ ধর্ষণ করার পরে স্পাইনাল কর্ড কেটে দেয়, পায়ের রগ কেটে দেয়, গলা কেটে দেয়। গৃহবধূটি মরে না গিয়ে শরীরে পঁচন নিয়েও অপেক্ষা করেছে সাহায্যের। পুলিশ এসেছে। কারা ধর্ষণ করেছে জানা গেছে। কিন্তু তাদের কিছু হয়নি এখনো। ঐ পুরুষেরা তাদের পুরুষ শরীর নিয়ে পুরুষত্ব জাহির করে চলেছে। আমি নিজেও পুরুষ। আমার কিন্তু খুব একটুও লজ্জা হচ্ছে না এজন্য। আমি কি সুস্থ আছি?

নওগাঁর মান্দা উপজেলার কাঁশোপাড়া গ্রামে বখাটে যুবকদের অত্যাচারে স্কুলশিক্ষিকা সেলিনা আক্তার আত্মহত্যা করেছেন। বখাটেরা আনন্দে আছে। তাদের পুরুষত্বের অস্ত্রে শান দিচ্ছে অন্য কোন সেলিনাকে টার্গেট করার জন্য। হোক না শিক্ষিকা, হোক না মন্ত্রী, মেয়েতো। 

আমাদের দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী দুই পার্টির দুই প্রধান হলেন মহিলা, নারী। অবশ্য মানুষ কি না আমি জানি না। সেলিনা’র আত্মহত্যা বিষয়ে সম্পাদকীয় লিখেছে প্রথম আলো। এরকম ঘটনায় প্রথম আলোতে আমিও একবার চিঠি লিখেছিলাম। এখন আর লিখি না। কারণ? কারণ মনে হচ্ছে আমি নিজেকে জাহির করার জন্যই লিখেছিলাম। কোন সামাজিক পরিবর্তনের আশায় নয়। কারণ আমি নিজে অনেক কিছুই মেনে নিতে বাধ্য। এবং সবসময় মনে হয় আমার কোন ক্ষমতা নেই। আছে কি? 

কিন্তু সেলিনার উপর আমার রাগ হচ্ছে। রাগ আছে সিমির উপরও। রাগ আছে রহিমার উপরও। কারণ, মরেই যাবে সিদ্ধান্ত যখন নিয়েছো, মেরে মরোনি কেন? তাতে অন্তঃত একজন কুকুর তো কমতো। সরি, কুকুর বলা ঠিক হয়নি। কুকুরের সম্মান তাদের প্রাপ্য নয়। কুকুররা টিজ করে না। কুকুরের সাধ্য নেই কোন কুকুরীকে ধর্ষণ করার। পারস্পরিক সম্মতিতেই পশুদের শারীরিক সম্পর্ক হয়।

ফরহাদ মজহারের কলাম সরল পাঠ পড়লাম। ফরহাদ মজহার মহা তাত্ত্বিক। তাঁর তত্ত্ব আমার ভালো লাগে না। তিনি নাকি এখন লুংগি গামছা পরেন। মাজার তত্ত্ব জাহির করেন। আর এনজিও করেন। একই পাতায় লন্ডনের কিংস কলেজের ছাত্র প্রিয়ম দাশগুপ্তের লেখা পড়লাম। বাংলাদেশের ঘটনায় তাঁর লজ্জা হচ্ছে। আরে লজ্জার কী হলো? আমরা তো উলংগ হয়ে পড়েছি সেই কখন থেকে। আর লজ্জা থাকলে তো বেপরোয়া হয়ে উঠা উচিত লজ্জা ঢাকার জন্য। আমরা কি বেপরোয়া কোন ব্যাপারেই? আমরা হলাম সুবিধাবাদী। সুবিধাবাদীদের কি লজ্জা থাকে, নাকি ছিলো কোন কালে? মওদুদ আহমেদের কি লজ্জা আছে? শাহজাহান সিরাজের? কেমন লাগছে তাঁর মইত্যা রাজাকারকে নিয়ে মিটিং করতে?

২৭ আগস্টের প্রথম আলোর অন্য আলো পাতায় সাংবাদিক জিয়া ইসলামের লেখাটা পড়লাম, ডেডলাইন ২১ আগস্ট। পড়তে পড়তে আমার চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে এলো। আমি কাঁদলাম। কার জন্য কাঁদলাম? মানুষের জন্য। যে রকম সম্পর্ককে লোকে আত্মীয়তা বলে, যারা মরে গেছেন তারা আমার সেরকম কেউ ছিলেন না। কিন্তু তারা তো মানুষ ছিলেন। তারা তো একটা সমাবেশে গিয়েছিলেন। একটা নতুন দিন হয়তো চেয়েছিলেন। কিন্তু মরতে কেউই চাননি। যদি তারা আগে জানতেন সেখানে গেলে মরতে হবে, তাহলে কেউই যেতেন না সেখানে। এটা তো কোন যুদ্ধ ছিলো না, যেমন ছিলো একাত্তরে। সেখানে যারা যুদ্ধে গিয়েছিলেন, তারা জানতেন তারা মরে যাবেন। বেঁচে যদি আসেন সেটা হবে বোনাস। কিন্তু এখানে তো সেরকম কোন কমিটমেন্ট ছিলো না। তবে কেন এরকম কাপুরুষতা? কেন এভাবে মেরে ফেলা? প্রশ্ন হলো কেন? উত্তর জানি না বলেই কাঁদলাম। আর উত্তর জানলেও কাঁদতাম কিছু না করতে পারার জ্বালায়। কিন্তু কেঁদে তো কিছু জয় করা যায় না।

প্রথম আলোর সাময়িকী’র নজরুল সংখ্যায় মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের লেখা রবীন্দ্র-নজরুল সমাচার পড়লাম। এই একজন মানুষ দেখলাম হাবিবুর রহমান। এই মানুষটার সবকিছুই অনুকরণ যোগ্য। একজন বিচারক হিসেবে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে, লেখক হিসেবে, গবেষক হিসেবে, মানুষ হিসেবে। এই মানুষটার সামান্যতম যোগ্যতাও যদি আমার থাকতো।

প্রথম আলোর আলপিন পড়লাম। 

সত্যজিৎ রায়ের ছোটগল্প অনুকুল পড়লাম। এই গল্পটি সত্যজিতের বারো সিরিজের কোন একটা বইতে পড়েছিলাম আগে। আবার পড়লাম। 

দন্তস রওশনের অণুকাব্য ভালো লাগে আমার।

রুখে দাঁড়াবার

মানুষ কোথা পাই

হায়, আমরা ছিলাম

তিতুমিরের ভাই।

-- কখনো ছিলাম কি?

 

দেশ থেকে

ভাগতে পারলে বাঁচি

আমি এখন

ভিসার আশায় আছি!

- আমি তো কত আগেই ভেগেছি।

 

২ সেপ্টেম্বরের জনকণ্ঠে অধ্যাপক আবু সাইয়িদের লেখা পড়লাম ‘সর্ষের মধ্যেই ভূত! প্রসংগ তদন্ত’। আওয়ামী লেখা। তিনি নিজের লেখাতেও নামের আগে কেন ‘অধ্যাপক’ কথাটা লাগিয়ে রাখেন বুঝতে পারলাম না। মনে হয় তিনি এটা অর্জন করেননি। যেমন নুরুল ইসলাম বি-এস-সি। শেষের অংশটা যেন নিজের নাম হয়ে গেছে। আমাদের স্কুলে একজন স্যারের নাম ছিলো ছৈয়দ বি-কম। অবশ্য গ্রামের স্কুলে এখনো চালু আছে ছৈয়দ বি-এস-সি। তারো আগে ছিলো বড় বি-এস-সি, ছোট বি-এস-সি। এই ছোট বি-এস-সি এখন আমার দাদার মেশোশ্বশুর। 

মাসুদা ভাট্টি লিখেছেন ১৯৭৫ থেকে ২০০৪। ঘাতকের উদ্দেশ্য অভিন্ন। তিনি দেখাতে  চেয়েছেন বংগবন্ধুকে হত্যা করা থেকে শুরু করে সবকিছুতেই আমেরিকার হাত আছে। এই ২০০৪ এও।

ইন্‌কিলাব পত্রিকা মানি বা না মানি একটা শক্তি এখন বাংলাদেশে। তাদের সোর্স অনেক। ক্ষমতাও অনেক। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে ইন্‌কিলাব তাদের নির্বাচনের ফলাফলের যে পূর্বাভাস দিয়েছিলো তার ৯৮ শতাংশই মিলে গেছে। মনে হতে পারে প্রশ্ন আউট হয়ে গিয়েছিলো। অথবা তারাই প্রশ্ন তৈরি করেছিলো। সে যাই হোক। এই পেপারের কোন নীতি নেই। মুখে ইসলাম ইত্যাদি বলে যা বলতে হয়। ধর্ম আর দেশপ্রেমের নাম দিয়ে মানুষকে যেভাবে শোষণ করা যায়, আর কোন কিছুতেই যায় না। এই ইনকিলাবে প্রতিদিন একটা বিনোদন পাতা থাকে। সেখানে সিনেমার নায়িকাদের যে ছবি গুলো বেছে বেছে ছাপানো হয়, তা হলো উগ্রতায় ভরা। এমনি সিনেমা পত্রিকা হলে কিছু বলতাম না। কিন্তু ইনকিলাব যে ইসলামী লাইনের কথা বলে, এই ছবি গুলো সেই লাইনের সাথে মিলে না।

 আর পূর্ণিমাতে সব সময়েই একটা না একটা ফিচার বা প্রচ্ছদ থাকে যৌনতা বিষয়ে। এবার পূর্ণিমার প্রচ্ছদ প্রতিবেদন হলো উচ্চবিত্তের কলগার্ল। মাহমুদ কাসেম নামে এই লোক লিখেছে কিছু মেয়ের গল্প। সেখানে তথ্যের চেয়ে মশলা বেশি। পূর্ণিমা জানে কিভাবে ব্যবসা করতে হয়। আর মৌলভি বেশি মৌ-লোভীরা যে এগুলি পড়তে পড়তে চেয়ারে পা তুলে বসবে তাও জানে বলেই এসব এরা করে। 

এ প্রসংগে আমার মনে পড়ছে কলেজে কাজ করার সময় আমার এক সিনিয়র সহকর্মীর কথা। তিনি আধুনিক জামাতী। ইসলামের ইতিহাসের এই অধ্যাপক মনে করেন তিনি পৃথিবীর সব ইতিহাস জানেন। আর তিনি কট্টর সমালোচক। 

একবার টিচার্স রুমে কথা হচ্ছিলো। তিনি বলছেন, ‘‘আজকালকার মেয়েদের কথা কী বলবো। পোশাক পরে যেন গায়ের সাথে লেগে থাকে।’’ 

কী একটা কারণে তিনি ঢাকায় গিয়েছিলেন কয়েকদিন আগে। সেখানে ইউনিভার্সিটিতেও গিয়েছিলেন বা ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে কোথাও যেতে দেখেছেন। 

তিনি বলছেন, ‘‘একটা মেয়ে দেখলাম প্যান্ট শার্ট পরে এসেছে। প্যান্টটা এতো টাইট যে --- সবকিছু দেখা যায়।’’ 

কয়েকটা শব্দ তিনি অবলীলায় উচ্চারণ করতে পারলেও আমি এখানে লিখতে পারছি না। তখন টিফিনের সময়। টিচার্স রুমে আমরা সবাই আছি। সবাই স্কুলে কলেজে শিক্ষা দিচ্ছি। সবাই পুরুষ। মনে হলো সবাই খুব আনন্দ পেলো ইতিহাসস্যারের কথায়। হাসলো অনেকেই। আমার খুব খারাপ লাগছিলো। কষ্ট হচ্ছিলো। আমি নিজে খুব ভালো মানুষ তা বলছি না। কিন্তু মানুষের পোশাকে ইতিহাস স্যার যা দেখতে পান, আমি তা দেখতে পাইনা। 

বললাম, ‘‘দেখতে চাইলে তো অনেক কিছুই দেখা যায় -ভাই! আর কল্পনা করতে চাইলে আরো অনেক বেশি। আমরা নিজেরা যা পরে আছি আপনার চোখ শক্তিশালী হলে তাও ভেদ করতে পারেন আপনি।’’ 

আমার কথাগুলি তাঁর যে ভালো লাগেনি তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু এই লোকের বা এরকম লোকদের গুণ হলো খুন করার আগেও লম্বা করে সালাম দেয়। চিটাগং ইউনিভার্সিটিতে শিবিরের ক্যাডাররা ছাত্রসমাজ নেতা হামিদের হাত কেটে নেয়ার আগে মুখের সামনে মাইক নিয়ে বলেছে, ‘আস্‌সালামু আলায়কুম হামিদ ভাই’। আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক। তারপরই এক কোপে ডান হাত বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। 

তো সাপ্তাহিক পূর্ণিমা হলো এরকম। এখন কথা হলো আমি নিজে কেন এই প্রতিবেদনটা পড়লাম পূর্ণিমা থেকে? আমি পড়েছি, কারণ আমার কেন যেন মনে হয় আবর্জনা ঘাটলেও আবর্জনার সাধ্য নেই আমাকে আবর্জনায় পরিণত করে। আত্মবিশ্বাসটা একটু বেশি হয়ে গেলো না? এই পূর্ণিমাতেই আরেকটি প্রতিবেদন বোমা হামলা নিয়ে। তাদের লেখা পড়ে মনে হচ্ছে আওয়ামী লীগেরই দোষ সব।

যায় যায় দিনের শফিক রেহমান যে একটা সুবিধাবাদী তা জানতে আমার অনেক বছর লেগেছে। এই লোকটা এরশাদের সময় যে লেখা লিখতেন তাতে মনে হতো এই তো যোদ্ধা। কত ভাল ছিলেন তিনি। ১৯৯৬ এর আগ পর্যন্ত তিনি নিজেকে আড়াল করে রেখেছিলেন। কিন্তু মনে হলো আওয়ামী লীগকে তিনি সহ্য করতে পারলেন না।বাংলাদেশে মূলত দুইটি দল, একটা আওয়ামী লীগ, অন্যটা আওয়ামী লীগ বিরোধী দল। শফিক রেহমান শেষের দলে। এক সময় কত ভালো ভালো লোক লিখতেন যায় যায় দিনে। মাহবুব কামাল, আনিসুল হক সহ অনেকেই। এখন কেউ নেই। আনিসুল হক এখন প্রথম আলোতে। প্রথম আলোতেও একসময় অনেকে লিখতেন, এখন আর লেখেন না।

যায় যায় দিন আমি এখনো পড়ি। কারণ শফিক রেহমান এখনো কিছু কিছু সময়ে যুক্তির কথা বলেন। আমেরিকানদের একটা নীতি হলো একজন লোক প্রচুর মদ খেয়ে মাতাল হয়ে থাকলেও সে যদি ভালো একাউন্টেন্ট হয়, তাহলে একাউন্টের কাজ ঐ মাতালকেই দেবে। শফিক রেহমান আধুনিক। এটাই তাঁর সবকিছু যাওয়ার পরেও এখনো অবশিষ্ট আছে। 

সমকাল বিভাগে এই সংখ্যায় ভালো কিছু নেই। প্রেস নোটস এ যথারীতি মহিউদ্দিন আহমেদ, আবদুল গাফফার চৌধুরি, মুনতাসির মামুন, আবেদ খানের সমালোচনা। এবার জাফর ইকবালের সমালোচনাও করেছেন প্রতিবেদক সায়ন্থ সাখাওয়াৎ। জাফরস্যারের দোষ হলো তিনি প্রথম আলোতে তাঁর লেখায় বলেছেন ২১ আগস্টের ঘটনা ১৯৭৫ এর পরে সবচেয়ে নৃশংসতা। আর তিনি পরের দিন আওয়ামী লীগের মিছিলে পুলিশের টর্চারকে একাত্তরের রাজাকারের কার্যকলাপের সাথে তুলনা করেছেন। জাফরস্যারদের বড় কষ্ট বাংলাদেশে। সত্য কথা যার গায়েই লাগে সে ফোঁস করে উঠে। আওয়ামী তো আওয়ামী, বি-এন-পি তো বি-এন-পি, এমন কি মনে হয় ছাত্ররাও ফোঁস করে, যখন স্টুডেন্টদের পরীক্ষা পিছানোর আন্দোলনকে নীতিগত ভাবে সাপোর্ট করতে পারেন না।

মুশাররাত জাহান শ্বেতা ‘আমেরিকা আমেরিকা’ নামে একটা কলাম লেখেন যায় যায় দিনে। তিনি থাকেন এখানে টলিডোতে। মন্ত্রী মোশাররফ হোসেনের মেয়ে না হলে কি শফিক রেহমান এই মানের লেখা ছাপাতেন? অবশ্য এখন যায় যায় দিনের স্ট্যান্ডার্ড বলে কিছু আর নেই তেমন। শুনেছি শ্বেতার বইও নাকি বেরিয়েছে এবং তা নাকি সরকারী লিস্টে আছে। স্বাভাবিক। বাবা মন্ত্রী, অথচ মেয়ের বই প্রচার পাবে না? আমি মন্ত্রী হলে আমার মেয়ের বই এর চেয়েও বেশি প্রচার পেতো। 

শফিক রেহমানের নিজের কলাম ‘‘দিনের পর দিন’’ এখন আর খুব একটা ভালো হয়না। মনে হয় শফিক রেহমানেরও খুব কষ্ট হয়। কারণ একদম বি-এন-পি’র বিপক্ষে যাচ্ছে এরকম ঘটনা থেকেও বি-এন-পি’র গুণ আর আওয়ামী লীগের দোষ বের করতে হয়। কত আর পারা যায়?  

ভোরের কাগজ মনে হচ্ছে এখনো ভালো আছে। ভালো শব্দটা আপেক্ষিক আমি জানি। এখানে ভালো মানে আমার মতে ভালো। ওয়াহিদুল হকের লেখা পড়লাম  এখনো গেল না আঁধার। বাংলাদেশের কথা তিনি লেখেন জোরালো বাংলা ভাষায়। এটাও ব্যতিক্রম নয়। তবে মাঝে মাঝে মনে হয়, এতো ঘোর প্যাচ না করে সোজা সরল বাক্যে বলা উচিত। স্বীকার করতেই হবে ওয়াহিদুল হকের লেখার ধার খুব বেশি। তাই ভয় হয় যে কাটবে, সেও আহত হয় কিনা। 

সিডনি প্রবাসী অজয় দাশগুপ্ত ভোরের কাগজেও লেখেন জনকণ্ঠের পাশাপাশি। তাঁর লেখা আমার খুব খারাপ লাগে না, আবার খুব ভালোও লাগে না। মাঝে মাঝে মনে হয় তিনি যেন বিষয় খুঁজে পান না কী লিখবেন। আর খুব খারাপ লাগে যখন অস্ট্রেলিয়ান বুঝাতে  ‘অজি’ শব্দটাকে তিনি ‘অসি’ লেখেন।

সরদার ফজলুল করিমের লেখা আমার খুব ভালো লাগে। এখন বয়স হয়ে গেছে বলেই হয়তো শুধু দিনলিপি লিখছেন। কিন্তু এই দিনলিপি তো শুধু দিনলিপি নয়, মনে হয় অতি উন্নতমানের সাহিত্য কিংবা ইতিহাস। ১ সেপ্টেম্বর তিনি লিখেছেন তিনি যে বাংলাদেশে বাস করছেন সেই দেশের আসলে নাম কী? এটা তো বাংলাদেশ নয়, অন্তঃত যে বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলো যারা করার। 

হিলাল ফয়েজী তাঁর রঙ্গমশালি কলামে লিখেছেন বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে প্রফেসর সৈয়দ আনোয়ার হোসেন যে ফরমূলা দিয়েছেন তার বিরুদ্ধে। আনোয়ার হোসেন বলতে চাচ্ছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মস্তিষ্ক হলেন বংগবন্ধু, আত্মাঃ শেরে বাংলা ও ভাসানী; সংগঠকঃ তাজ উদ্দিন। আর তরবারি হলেনঃ জিয়া ও ওসমানী। হিলাল ফয়েজী স্বাভাবিক ভাবেই সমালোচনা করেছেন এর। করার কথা তো বটেই। আমি হিলাল ফয়েজীর যুক্তির সাথে একমত। 

ভোরের কাগজের কলাম গুলির মধ্যে আমি সাদ’উল্লাহর ‘ইসলাম ও বর্তমান’ কলামটা খুব পছন্দ করি। ২০ আগস্টের সংখ্যায় তিনি লিখেছেন মাওলানা প্রসংগে। মাওলা আর আনা মিলে হয় মাওলানা। মাওলা শব্দের অর্থ অভিভাবক আর আনা মানে আমি। মাওলানা বলতে আমিই অভিভাবক মানে আল্লাহকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু কোরান শরীফ মেনে চললে মাওলানা শব্দ ব্যবহার করাটা উচিত নয়। কারণ তাতে আল্লাহর শরীক করা হয়।

২৭ আগস্টের সংখ্যায় সা’দ উল্লাহ লিখেছেন দাড়ি ও টুপি সমাচার। মূর্তি পূজারীরা যা করে তার বিপরীত করতে বলা হয়েছে ইসলামে অনেক কিছুই। কিন্তু দাড়ি লম্বা রাখা না রাখা প্রসংগে সুনির্দিষ্ট ভাবে কিছুই বলা নেই। টুপি পরা সম্পর্কেও। এটা ধর্মের চেয়ে সংস্কৃতির ব্যাপার। বাড়াবাড়ি ব্যাপারটা কেন যেন এসে যায়। 


No comments:

Post a Comment

Latest Post

পাঠকের দিনলিপি ০৩-সেপ্টেম্বর-২০০৪

  সেপ্টেম্বর ৩, ২০০৪   গত সপ্তাহে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সভায় গ্রেনেড হামলা হয়েছে। সে নিয়ে বেশ রাজনীতি হচ্ছে এখন বাংলাদেশে। সংবাদপত্র পড়ল...

Popular Posts