Wednesday, 26 August 2026

পাঠকের দিনলিপি ২৮-জানুয়ারি-২০০৫

 


২৮০১২০০৫

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র ‘লাল সালু’ ছাড়া হাতে গোনা আর কয়েকটি মাত্র রচনা বাংলায় আছে। সম্প্রতি তাঁর একটি অপ্রকাশিত ইংরেজি উপন্যাসের পান্ডুলিপি পাওয়া গেছে। ‘দি আগলি এশিয়ান’ নামে উপন্যাসটির বাংলা অনুবাদ করেছেন শিবব্রত বর্মন। 

‘‘কদর্য এশীয়’’ নামের এই রচনাটি বাংলা উপন্যাসের ক্ষেত্রে একটি অন্যরকম মাইল ফলক। কারণ এই উপন্যাসটি রাজনৈতিক উপন্যাস। এশিয়ার একটি দেশে - ধরা যাক - বাংলাদেশে আমেরিকার ইংগিতে

কীভাবে সরকার বদল থেকে শুরু করে আন্দোলন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রিত হয়। আমেরিকানদের কমিউনিস্ট ভীতি বা কমিউনিস্ট দমন নীতি বেশ পরিচিত। তারা  কমিউনিস্ট দমনে যে করেই হোক এখন সফল। বিশ্বে এখন ধরতে গেলে কমিউনিস্টদের সেরকম অস্তিত্ব আর নেই। কিন্তু উপন্যাসটির ক্ষেত্র আর ঘটনা আবর্তিত হয়েছে বাঙালিদের মধ্যে আমেরিকানদের প্রতি মিশ্র মনোভাব থেকে শুরু করে অনেককিছু বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে। চমৎকার ঝরঝরে অনুবাদ। শেষের দিকে ঘটনা একটু ঝুলে গেলেও চমৎকার উপন্যাস। মূল ইংরেজিতে পড়তে পারলেও এমন ভালো লাগতো বলে মনে হচ্ছে।

দাউদ হায়দারের একটি রসরচনা ‘‘বিলম্বের এত দেরি হলো কেন?’’ জার্মানি থেকে প্রথম আলোর ঈদসংখ্যার জন্য লিখেছেন তিনি তাঁর আন্তর্জাতিক প্রেমিকাদের কথা। বাংলাদেশের প্রেমিকাদের কথা সেভাবে না এলেও ইন্ডিয়া থাকতে তিনি ক্রমান্বয়ে তিনজন বাঙালি হিন্দু মেয়ের প্রেমে পড়েন। লেখা পড়ে মনে হয়েছে মেয়েরাই উড়ে এসে দাউদ আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সবসময়। আর দাউদ সাহেবও সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে কখনোই দ্বিধান্বিত হননি। বাঙালি মেয়েরাও যে ক’দিন আকাশ ঘাস করার পর দাউদের সাথে হোটেলে গিয়ে ওঠে আর নিরোধ বাবুর সহায়তায় শরীর নিয়ে মেতে ওঠে তা মনে হচ্ছে দাউদ হায়দার একটা নিরাপদ ইউরোপীয় দূরত্বে থেকে সহজে লিখে ফেললেন। কে আর খোঁজ নিতে যাচ্ছে বা করলেও কার কী আসে যায়! এরপর জার্মানির, নরওয়ের, আফ্রিকার, ব্রাজিলের, জাপানের - মনে হচ্ছে সারা পৃথিবীর মেয়েরা সুযোগ খুঁজছে দাউদ হায়দারের প্রেমে পড়বার জন্য। তবুও তো দাউদ হায়দার ইচ্ছা করেই অনেকের কথা লেখেননি -‘‘ইচ্ছে করেই ঢাকার পর্ব বা ঢাকা-পর্ব লিখিনি। আরো লিখিনি ইথিওপিয়া, মিসর, ইরানি, বোম্বের সুন্দরীদের কথা। কতজনের কথা লিখব? লোকে বলবে ‘ছি! ছি!!’’’

দাউদ হায়দারের লেখার শক্তি আছে। মেধা আছে। কিন্তু এই লেখাটি পড়ার পরে আমার মনে সন্দেহ হয়েছে যে উনি অনেকটাই বানিয়েছেন এখানে। কারণ আমিও তো অন্তত সামান্য কিছু হলেও মানুষ দেখেছি পৃথিবীর কয়েকটি মহাদেশের সামান্য কয়েকটি দেশের।

আরও একটা কথা আমার মনে হলো। এই রচনাটি যদি তসলিমা নাসরিন বা অন্য কোন নারী-লেখক লিখতেন - কেমন হতো আমাদের প্রতিক্রিয়া?

কাজী আনোয়ার হোসেনের লেখা উপন্যাস ‘‘মিজান দাদা’’ পড়লাম একটানে। একটানা পড়ে শেষ করার মতই টানটান লেখা কাজী আনোয়ার হোসেনের। বিদেশী কাহিনী থেকেই লেখেন তিনি বরাবর। আমার মনে হয় মূল উৎসটা এমন ভাসা ভাসা উল্লেখ না করে সুনির্দিষ্ট করে বলাটাই রাইটারস এথিক্‌স।

মিজান দাদা সারাজীবন বিদেশে থেকে মৃত্যুর দুমাস আগে নাতি আনোয়ার সাহেবের কাছে আসেন মরতে। মিজান দাদার মৃত্যুর পর একটা ডায়েরি পাওয়া যায়। সেখানে লেখা আছে ইংল্যান্ডে, তাহিতিতে সমারসেট মমের সাথে মিজান দাদার পরিচয় থেকে শুরু করে মজার কিছু ঘটনা।

নাসরীন জাহানের গল্প ‘‘ধূসর যাত্রীগণ’’। মিলির দাদা ছিলেন সূর্যসেনের সৈনিক। মিলি তার দাদাকে দেখতে যাবে বলে বন্ধু অঞ্জনকে নিয়ে রওনা দেয় অনেক দূরের একটা প্রত্যন্ত গ্রামে। কিছুটা ফ্লাশব্যক। 

সূর্যসেন পুষ্পকুন্তলা নামে একটা মেয়েকে বিয়ে করেন পরিবারের চাপে। কিন্তু সংসার করা বলতে  যা বোঝায় তা তিনি কখনো করেননি। আর বিয়ে নামক একটা অনুষ্ঠান হলেও পুষ্পকুন্তলার জীবন আর একজন কুমারীর জীবনে কোন পার্থক্য কোনদিনও ছিলো না। সূর্যসেনের মৃত্যুর পরে তিনি বিধবা। আমার প্রশ্ন হলো এই যে সূর্যসেন - এতবড় ত্যাগী নেতা বিপ্লবী, ইংরেজ তাড়িয়ে দেশ স্বাধীন করার মহামন্ত্রে উজ্জীবিত। তিনি কামান বন্দুকের ভয় করেন না। আর তিনি কিনা বিয়ে করে বসলেন পারিবারিক চাপ সহ্য করতে না পেরে!! নাকি তিনি বিয়ে করাটা আর না করাটাকে সমান মনে করেছেন। নাকি একবারও চিন্তা করেননি যে তিনি একটা মেয়ের সারাজীবন নষ্ট করে দিচ্ছেন বিয়ে করে।

--------

কলম্বাস, ওহাইও

No comments:

Post a Comment

Latest Post

Ken Amos — My Teacher My Mentor

  For many people, another kind of student life begins after the formal years of schooling, college, and university degrees have come to an ...

Popular Posts