Showing posts with label বিজ্ঞানী. Show all posts
Showing posts with label বিজ্ঞানী. Show all posts

Saturday, 16 May 2026

পাইজোবিদ্যুৎ, তেজস্ক্রিয়তা এবং পিয়ের কুরি

 



নোবেল পুরষ্কারের ইতিহাসে বিশেষ সম্মানের স্থানে অধিষ্ঠিত আছে ফ্রান্সের কুরি পরিবার। কারণ এই পরিবারের পাঁচজন সদস্য ছয়টি নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন। মেরি কুরিকে সারাপৃথিবী চেনে নোবেলজয়ী প্রথম নারী হিসেবে। মেরি কুরি এখনো পর্যন্ত একমাত্র নারী যিনি দুবার নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন – ১৯০৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে এবং ১৯১১ সালে রসায়নে। রেডিওঅ্যাকটিভিটি বা তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার এবং গবেষণার জন্য ১৯০৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন হেনরি

Tuesday, 12 May 2026

প্রিয় ফাইনম্যান ২০২৬


 

এই বালকটির জন্ম ১৯১৮ সালের ১১ মে নিউইয়র্ক শহরে। ছবিটি তার আট-নয় বছর বয়সে তোলা। সেদিন কেউ কি ভাবতে পেরেছিল এই অশ্বারোহী বালক একদিন পদার্থবিজ্ঞান শৃঙ্গের শীর্ষে আরোহন করবেন!! 

পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়ে বিশ্ববিখ্যাত হয়েছেন যাঁরা, তাঁরা সবাই যে তাঁদের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার বা উদ্ভাবনের তত্ত্ব এবং তথ্য সহজভাবে সবার জন্য ব্যাখ্যা করতে পারেন তা কিন্তু নয়। তাঁরা

Thursday, 16 April 2026

ম্যাডাম উ – ফিজিক্সের ফার্স্ট লেডি


১৯৪২। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রুদ্ধ্বশ্বাস সময়। ম্যানহাটান প্রজেক্টের পারমাণবিক বোমার মূল উপাদান ইউরেনিয়াম ও প্লুটোনিয়াম তৈরি হচ্ছে  বেশ কয়েকটি গোপন রিঅ্যাকটরে। কলম্বিয়া নদীর দক্ষিণ-পূর্ব দিকে হ্যানফোর্ড রিঅ্যাক্টর তৈরি হয়েছে প্লুটোনিয়াম উৎপাদনের উদ্দেশ্যে। কিন্তু দেখা গেল রিঅ্যাক্টর চালু করার পর চেইন রিঅ্যাকশান শুরু হবার একটু পরেই রিঅ্যাকটর নিজে নিজে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বার বার ঘটছে এই ঘটনা। চিন্তায় পড়ে গেলেন প্রকল্প পরিচালক এনরিকো ফার্মি। তিনি নিজে নিউট্রনের

Friday, 27 March 2026

রন্টজেনের জন্মদিনে

 

আমাদের সময়ের স্কুলের বিজ্ঞান বইতে এক্সরেকে বলা হতো  রঞ্জন রশ্মি। এক্স রশ্মি যিনি আবিষ্কার করেছিলেন – তাঁর নাম ‘রঞ্জন’ বলেই জানতাম আমরা। জার্মান উচ্চারণে যা ‘রন্টগেন’ – আক্ষরিক ইংরেজি অনুবাদে তা হয়ে উঠেছে রন্টজেন। পৃথিবীতে প্রতি বছর শুধুমাত্র রোগনির্ণয়ের জন্যই এক্স-রে করা হয় চারশ কোটির বেশি। চিকিৎসায় ব্যবহৃত সিটি-স্ক্যান, ফ্লুরোস্কোপি, ইন্টারভেনশনাল রেডিওলজি, রেডিওথেরাপি ইত্যাদি হিসেবে ধরলে বছরে এক্স-রের সংখ্যা দাঁড়াবে ছয় শ কোটিরও বেশি।

Tuesday, 24 February 2026

স্টিভ জবস-এর জন্মদিনে

 



১৯৫৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি সান ফ্রানসিসকোর এক হাসপাতালে যখন ছেলেটির জন্ম হয় – তখন তার নাম রাখা হয়েছিল আবদুল লতিফ জানদালি। ছেলেটির জন্মদাতা পিতা আবদুল ফাত্তাহ জানদালি ছিলেন সিরিয়ার এক ধনী মুসলিম পরিবারের সন্তান। তিনি আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিনে এসেছিলেন পলিটিক্যাল সায়েন্সে পিএইচডি করার জন্য। সেখানেই তিনি প্রেমে পড়েছিলেন জোয়ান শিয়েবল-এর। জোয়ানের পরিবার ছিল কট্টর ক্যাথলিক। জোয়ানের বাবা-মা

Thursday, 8 January 2026

হকিং তাপমাত্রা

 



আজ স্টিফেন হকিং-এর জন্মদিন। তিনি আজ ৭৬ + ৮ হলেন। ১৯৪২ সালের ৮ জানুয়ারি তাঁর জন্ম। জীবদ্দশায় ৭৬ তম জন্মদিন পার করেছেন ২০১৮ সালে। আইনস্টাইনের পর হকিং-এর মতো এতটা জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেননি অন্য কোনো বিজ্ঞানী।  

বিজ্ঞানে স্টিফেন হকিং-এর অন্যতম মৌলিক অবদান হলো ‘হকিং রেডিয়েশান’ বা হকিং বিকিরণ।

Tuesday, 11 November 2025

মহাকাশের মহানায়ক কার্ল স্যাগান

 



সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষায় উপস্থাপন করে বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করে তোলার পেছনে যেসব বিজ্ঞানী অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন কার্ল স্যাগান ছিলেন তাঁদের মধ্যে উজ্জ্বলতম। টাইম ম্যাগাজিন কার্ল স্যাগানকে অভিহিত করেছেন আমেরিকার সবচেয়ে সফল বিজ্ঞান-উপস্থাপক হিসেবে। পৃথিবীবিখ্যাত বিজ্ঞানীদের মধ্যে হাতেগোণা কয়েকজন মাত্র বিজ্ঞানী কঠিন জটিল বিজ্ঞান গবেষণার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্যও সহজ ভাষায় বিজ্ঞানের কথা লিখেছেন। কার্ল স্যাগান ছিলেন এই

Saturday, 8 November 2025

জেমস ওয়াটসন – অসাধারণ বিজ্ঞানী, কিন্তু অসহ্য বর্ণবাদী নারীবিদ্বেষী পুরুষ

 



শত শত আবিষ্কার উদ্ভাবন কৃতিত্বের সাক্ষী হতে হতে ক্যাম্পাসের “ঈগল” পাবটিও কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির মতোই বিখ্যাত হয়ে গেছে। পাবের দেয়ালে লাগানো ফলকটি এমনই একটি ঘটনার সাক্ষ্য দিচ্ছে। ৭২ বছর আগে ১৯৫৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি লাঞ্চটাইমে ভরাপাবে ঢুকে ফ্রানসিস ক্রিক ও জেমস ওয়াটসন ঘোষণা করেছিলেন যে তাঁরা জীবনের রহস্য “ডি এন এ”-র গঠন আবিষ্কার করেছেন। ঈগল পাবের দেয়ালে লাগানো এই ফলকটির ছবি তুলতে গিয়ে আমার বেশ ভালো লেগেছে এটুকু দেখে

Thursday, 30 October 2025

হেনরি ক্যাভেন্ডিস: অদ্ভুত মানুষ, অসাধারণ বিজ্ঞানী


বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির যে সিঁড়ি ধরে পৃথিবীর মানুষ এত উপরে উঠে এসেছে সেই সিঁড়ির ভিত্তি তৈরি হয়েছে যেসব গবেষণাগারে, সেসব গবেষণাগারের নাম লিখতে হলে প্রথমেই লিখতে হবে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাভেন্ডিস ল্যাবের নাম। এই একটি মাত্র গবেষণাগার থেকে উদ্ভূত গবেষণা এপর্যন্ত অর্জন করেছে একত্রিশটি নোবেল পুরষ্কার। এই গবেষণাগার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৮৭৪ সালে। সেই সময় কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ছিলেন ডেভনশায়ারের সপ্তম ডিউক স্যার উইলিয়াম ক্যাভেন্ডিস।

Wednesday, 13 August 2025

ফ্রেডেরিক স্যাঙ্গার – রসায়নের মহানায়ক

 



পৃথিবীতে বর্তমানে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা প্রায় ৫৯ কোটি। তাঁদের মধ্যে পনেরো কোটির বেশি মানুষকে রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রতিদিন ইনসুলিন নিতে হয়। এই ইনসুলিন নেয়া মানুষগুলির মধ্যে কতজন এই ছবির মানুষটিকে চিনেন আমি জানি না। এই মানুষটির নাম ফ্রেডেরিক স্যাঙ্গার। ইনসুলিনে অ্যামিনো অ্যাসিডের নিখুঁত সিকোয়েন্সিং আবিষ্কার করেছিলেন তিনি। তারই ফলশ্রুতিতে গবেষণাগারে ইনসুলিন তৈরি করা সম্ভব হয়েছে যা বর্তমানে রোগীরা ব্যবহার করছে। তার

Tuesday, 10 June 2025

চার প্রজন্মের বেকেরেল: প্রতিপ্রভা ও তেজস্ক্রিয়তা

 


 ১৮৯৫ সালের নভেম্বর থেকে শুরু করে পরবর্তী কয়েক বছরে পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে অনেকগুলি যুগান্তকারী মাইলফলক স্থাপিত হয়েছে। জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী উইলহেল্‌ম রন্টজেন যখন এক্স-রে আবিষ্কার করলেন – তার সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে চারদিকে হৈচৈ পড়ে গেলেও তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানীরা বিপদে পড়ে গেলেন। কারণ তাঁরা তখনো জানেন না পদার্থবিজ্ঞানের কোন্‌ তত্ত্বের সাহায্যে এক্স-রে উৎপন্ন হবার কারণ ব্যাখ্যা করা যাবে।

Friday, 14 March 2025

জামাল নজরুল ইসলাম: মহাবিশ্বের নিয়তির সন্ধানে

 




বিজ্ঞানজগতে বাংলাদেশের গর্ব বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম। তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞান ও কসমোলজিতে তাঁর যুগান্তকারী অবদান রয়েছে। তাঁর মৌলিক গবেষণাগুলিকে প্রধানত পাঁচটি ধাপে ভাগ করা যায়: কণা পদার্থবিজ্ঞানের ম্যান্ডেলস্ট্যাম রিপ্রেজেন্টেশানের গাণিতিক বিশ্লেষণ, জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটির আইনস্টাইন-ম্যাক্সওয়েল সমীকরণের সঠিক সমাধান, মহাজাগতিক ধুলোকণার ক্ষেত্র সমীকরণের সমাধান, মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি, এবং গাণিতিক অর্থনীতি।

Wednesday, 1 January 2025

ক্লাসিক্যাল ফিজিক্সের নায়ক - লর্ড র‍্যালে

 


লর্ড র‍্যালে নামটি আমাদের কাছে যতটা পরিচিত, জন উইলিয়াম স্ট্রুট ততটা নয়। অথচ নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী লর্ড র‍্যালের আসল নাম হলো জন উইলিয়াম স্ট্রুট। ইংল্যান্ডের এসেক্স কাউন্টির একটি শহরের নাম র‍্যালে। সেখানকার লর্ড ছিলেন বলেই জন উইলিয়াম স্ট্রুটকে সবাই লর্ড র‍্যালে বলে ডাকতো। তিনি ছিলেন তৃতীয় লর্ড র‍্যালে। ক্লাসিক্যাল পদার্থবিজ্ঞানের অনেক কিছুর সাথেই লর্ড র‍্যালের নাম যুক্ত হয়ে আছে তাঁর আবিষ্কার এবং অবদানের জন্য। শব্দ, তাপ, আলোক, তড়িৎচুম্বক, এবং নিষ্ক্রিয় গ্যাস – সবকিছুরই অনেক তত্ত্ব আবিষ্কৃত হয়েছে লর্ড র‍্যালের হাতে। নিষ্ক্রিয় গ্যাস আর্গন আবিষ্কারের জন্য তিনি পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার অর্জন করেছেন ১৯০৪ সালে। লর্ড র‍্যালেকে আমরা এই উপমহাদেশের মানুষ হিসেবে আরো একটি কারণে বিশেষভাবে স্মরণ করি – সেটা হলো তাঁর কাছে পদার্থবিজ্ঞানের পাঠ নিয়েছিলেন আমাদের স্যার জগদীশচন্দ্র বসু। 

জন  উইলিয়াম স্ট্রুটের জন্ম ১৮৪২ সালের ১২ নভেম্বর ইংল্যান্ডের এসেক্সে। তাঁর বাবা জন জেমস স্ট্রুট ছিলেন দ্বিতীয় লর্ড র‍্যালে। র‍্যালে শহরের ব্যারন বা লর্ডশিপ পদটি সৃষ্টি করা হয়েছিল ইংল্যান্ডের রাজা চতুর্থ জর্জের ইচ্ছায়। তাঁর রাজত্বের সময় কর্নেল জোসেফ হোল্ডেন স্ট্রুট ছিলেন সাসেক্স কাউন্টির পার্লামেন্ট মেম্বার। নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের যুদ্ধে খুব বীরত্ব দেখিয়েছিলেন কর্নেল জোসেফ হোল্ডেন স্ট্রুট। রাজা চতুর্থ জর্জ কর্নেলকে পুরষ্কার স্বরূপ র‍্যালে শহরের ব্যারন করতে চাইলেন। ব্যারন পদটি ছোটখাট আঞ্চলিক রাজার মতো - খুব সম্মানজনক, এবং পুরুষানুক্রমিকভাবে অধিকারযোগ্য। অর্থাৎ একবার কেউ ব্যারন হলে তার পরবর্তী প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই পদের সমস্ত সুযোগ-সুবিধা ও উপাধি ভোগ করবে। কিন্তু কর্নেল জোসেফ হোল্ডেন স্ট্রুট নিজে ব্যারন হতে চাইলেন না। কারণ ব্যারন হয়ে গেলে পার্লামেন্ট থেকে পদত্যাগ করতে হবে। তিনি ভোটের রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন। আবার রাজার দেয়া সম্মান ঠেলে ফেলতেও চাইলেন না। তিনি অনুরোধ করলেন তাঁর বদলে পদটি যেন তাঁর স্ত্রীকে দেয়া হয়। রাজা চতুর্থ জর্জ তাঁর ইচ্ছা পূরণ করলেন। প্রথম ব্যারনেস র‍্যালে হলেন শার্লট মেরি গারট্রুড। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর প্রথম সন্তান জন জেমস স্ট্রুট হলেন দ্বিতীয় লর্ড র‍্যালে। ১৮৭৩ সালে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর প্রথম সন্তান জন উইলিয়াম স্ট্রুট হলেন তৃতীয় লর্ড র‍্যালে – যিনি আমাদের আজকের আলোচ্য পদার্থবিজ্ঞানী। [তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে রবার্ট জন ছিলেন চতুর্থ লর্ড র‍্যালে, রবার্ট জনের ছেলে জন আর্থার ছিলেন পঞ্চম লর্ড র‍্যালে, আর বর্তমানে ষষ্ট লর্ড র‍্যালে হয়েছেন জন আর্থারের ছেলে জন জেরাল্ড স্ট্রুট।]

সাত হাজার একরের একটি বিশাল স্টেটের মালিক এবং ব্যারনের  ছেলে হওয়াতে খুবই আরাম আয়েশে কেটেছে জন উইলিয়ামের ছোটবেলা। কিন্তু এত বিত্তবৈভব আরাম-আয়েশের মধ্যে থেকেও খুব একটা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন না জন উইলিয়াম। বাড়িতে গৃহশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে পড়ালেখার শুরু। দশ বছর বয়সে বিখ্যাত ইটেন কলেজে ভর্তি করানো হয়েছিল তাকে। কিন্তু হুপিং কাশিতে আক্রান্ত হওয়ার কারণে তাকে স্কুল ছাড়তে হয় এক টার্মের পরেই। তারপর একটু সুস্থ হয়ে উইম্বলডনের ছোট্ট একটা বোর্ডিং স্কুলে পড়াশোনা ১৮৫৪ থেকে ১৮৫৬ পর্যন্ত। এখান থেকে তাঁকে ভর্তি করানো হলো ইংল্যান্ডের বিখ্যাত হ্যারো স্কুলে। কিন্তু দুই টার্ম পরে সেখান থেকেও চলে আসতে হলো শারীরিক অসুস্থতার কারণে। এরপর তার লেখাপড়ার ব্যবস্থা করা হয় ইংল্যান্ডের দক্ষিণে সমুদ্রতীরবর্তী ডেভন কাউন্টির একটি প্রাইভেট স্কুলে যার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন রেভারেন্ড জর্জ টাউনসেন্ড ওয়ার্নার। ১৮৬০ সালে স্কুল ফাইনাল পাস করলেন জন উইলিয়াম। 

১৮৬১ সালে ভর্তি হলেন কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির ট্রিনিটি কলেজে। স্কুলে থাকতে তেমন কোন বিশেষ মেধার স্বাক্ষর রাখতে পারেননি জন উইলিয়াম। খুবই সাধারণ মানের ছাত্র ছিলেন তিনি। কিন্তু কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তিনি গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ বোধ করতে শুরু করলেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের গাণিতিক দক্ষতা প্রমাণের জন্য প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা আছে যা ম্যাথমেথিক্যাল ট্রাইপোস নামে পরিচিত। অনেকগুলি অত্যন্ত জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে হয় এই প্রতিযোগিতায়। এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার জন্য পাঁচ বছর কঠোর পরিশ্রম করলেন জন উইলিয়াম। এসময় তাঁর গণিতের প্রশিক্ষক ছিলেন কেমব্রিজের বিখ্যাত গণিতজ্ঞ এডোয়ার্ড জন রাউথ। ১৮৬৫ সালে ম্যাথমেথিক্যাল ট্রাইপোস পরীক্ষায় সর্বোচ্চ র‍্যাংক “সিনিয়র র‍্যাংলার” অর্জন করলেন। সেই সময়ের বিশাল অর্জন এটা জন উইলিয়ামের জন্য। কারণ তাঁর সিনিয়র জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল কিংবা লর্ড কেলভিনও ম্যাথমেটিক্যাল ট্রাইপোসে “সিনিয়র র‍্যাংলার” পাননি, পেয়েছিলেন “সেকেন্ড র‍্যাংলার” র‍্যাংক। একই বছর গণিত ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে বিশেষ দক্ষতার পুরষ্কার “স্মিথ প্রাইজ” লাভ করলেন জন উইলিয়াম। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রাক্তন অধ্যাপক রবার্ট স্মিথের টাকায় এই পুরষ্কার প্রবর্তিত হয়েছিল। 

১৮৬৬ সালে জন উইলিয়াম ট্রিনিটি কলেজের ফেলো নির্বাচিত হন। তখনো পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে শুধুমাত্র তাত্ত্বিক গবেষণাই হতো। পরীক্ষণ গবেষণা যা হতো সবই ব্যক্তিউদ্যোগে নিজেদের বাড়িতে বা অন্য কোন ব্যক্তিগত গবেষণাগারে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়েও কোন পরীক্ষাগার ছিল না। ১৮৬৮ সালে জন উইলিয়াম আমেরিকা ভ্রমণে গিয়েছিলেন। তিনি সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষণ গবেষণাগারের কাজকর্ম দেখে এসেছেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষাগার তৈরি করার ক্ষমতা তাঁর ছিল না। কিন্তু তিনি নিজের টাকায় বৈজ্ঞানিক গবেষণার যন্ত্রপাতি কিনে নিজের বাড়ি টার্লিং প্যালেসে ব্যক্তিগত গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করে গবেষণা শুরু করলেন। 

১৮৬৯ সালে প্রকাশিত হলো তড়িতচুম্বকের ধারণার উপর তাঁর প্রথম গবেষণাপত্র। পরবর্তী দুবছরের মধ্যে শব্দের রেজোন্যান্স, আলোর বর্ণ, বিচ্ছুরণ ও প্রতিফলন সংক্রান্ত আরো এগারোটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়।

কেমব্রিজে জন উইলিয়ামের সহপাঠী ছিলেন আর্থার ব্যালফোর, যিনি পরবর্তীতে ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। আর্থার ব্যালফোরের বোন ইভলিনের সাথে প্রেম হয় জন উইলিয়ামের। ১৮৭১ সালে ইভলিন ও জন উইলিয়াম বিয়ে করেন। বিয়ে করার সাথে সাথে জন উইলিয়ামের ট্রিনিটি কলেজের ফেলোশিপ বাতিল হয়ে গেল। কারণ বিবাহিতদের জন্য ঐ ফেলোশিপ নিষিদ্ধ ছিল। 

এদিকে তাঁর শরীরও হঠাৎ প্রচন্ড খারাপ হয়ে গেল। রিউম্যাটিক ফিভারে আক্রান্ত হয়ে প্রচন্ড কাহিল হয়ে গেলেন জন উইলিয়াম। ডাক্তারের পরামর্শে ইওরোপের শীত থেকে বাঁচতে ১৮৭২ সালের ডিসেম্বরে তিনি স্ত্রীকে সাথে নিয়ে চলে গেলেন মিশরে। সেখানে নীল নদের উপর একটি নৌকা ভাড়া করে থাকতে শুরু করলেন। নৌকায় বসেই তিনি লিখতে শুরু করলেন শব্দবিজ্ঞানের উপর প্রথম পূর্ণাঙ্গ বই “দ্য থিওরি অব সাউন্ড”। ১৮৭৭ সালে দ্য থিওরি অব সাউন্ডের প্রথম খন্ড এবং ১৮৭৮ সালে দ্বিতীয় খন্ড প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে অনেক বছর ধরে অনেকগুলি সংস্করণ প্রকাশিত হয় এই বইয়ের। 

১৮৭৩ সালে মিশর থেকে ইংল্যান্ডে ফিরে এলেন জন উইলিয়াম। তার কিছুদিন পরে তাঁর বাবা দ্বিতীয় লর্ড র‍্যালে মৃত্যুবরণ করলে উত্তরাধিকারসূত্রে তৃতীয় লর্ড র‍্যালে হলেন জন উইলিয়াম স্ট্রুট। এরপর থেকে ইংল্যান্ডের প্রথা অনুযায়ী আসল নামের পরিবর্তে উপাধিতেই তিনি পরিচিতি লাভ করতে শুরু করলেন – লর্ড র‍্যালে হিসেবে। 

১৮৭৩ সালে রয়েল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হলেন লর্ড র‍্যালে। আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক গবেষণাও চালিয়ে গেছেন তিনি সমান দক্ষতায়। তখনো পর্যন্ত তিনি তাঁর স্টেটের উপার্জন ছাড়া অন্য কোন প্রতিষ্ঠান থেকে কোন সম্মানী নেননি। বৈজ্ঞানিক গবেষণার সবকিছুই করছিলেন নিজের বাড়ির গবেষণাগারে নিজের টাকায়। সবকিছু ঠিকই চলছিল। ১৮৭৮ সাল পর্যন্ত শব্দ, আলো, তাপ, তড়িৎচুম্বক ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর ষাটটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়ে গেছে। 

কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পরপর তিন বছর পর্যাপ্ত ফসল না হওয়াতে র‍্যালে স্টেটের উপার্জন কমে গেলো। লর্ড র‍্যালে বাধ্য হলেন প্রাতিষ্ঠানিক কাজের বিনিময়ে সম্মানী গ্রহণ করতে। 

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানের প্রথম গবেষণাগার ‘ক্যাভেন্ডিস ল্যাব’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৮৭৩ সালে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন চ্যান্সেলর উইলিয়াম ক্যাভেন্ডিসের নিজস্ব অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত এই গবেষণাগারের প্রথম ‘ক্যাভেন্ডিস প্রফেসর’ হিসেবে যোগ দিয়েছেন বিজ্ঞানী জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল। কিন্তু ১৮৭৯ সালে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে ম্যাক্সওয়েলের মৃত্যু হলে ক্যাভেন্ডিস প্রফেসরের পদ খালি হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুরোধে এবং কিছুটা আর্থিক প্রয়োজনে ক্যাভেন্ডিস প্রফেসর পদে যোগ দিতে রাজি হন লর্ড র‍্যালে। নিতান্ত প্রয়োজন না হলে কাজের বিনিময়ে অর্থ গ্রহণের পক্ষপাতি ছিলেন না তিনি। তাই তাঁর এস্টেটের উপার্জন প্রয়োজনীয় স্তরে পৌঁছানোর সাথে সাথে ১৮৮৪ সালে তিনি ক্যাভেন্ডিস প্রফেসর পদে ইস্তফা দিয়ে নিজের এস্টেটে ফিরে যান স্বাধীন গবেষণায়। 

মাত্র পাঁচ বছরের জন্য ক্যাভেন্ডিস প্রফেসর এবং ল্যাবের পরিচালক হিসেবে কাজ করলেও – এই পাঁচ বছরের মধ্যেই লর্ড র‍্যালে কেমব্রিজের ক্যাভেন্ডিস ল্যাবের যুগান্তকারি পরিবর্তন ঘটান। এতদিন বিজ্ঞানের ক্লাস ও গবেষণাগারে মেয়েদেরকে ঢুকতে দেয়া হতো না। লর্ড র‍্যালে মেয়েদের জন্য সমস্ত বিজ্ঞান ক্লাস ও গবেষণাগার উন্মুক্ত করে দিলেন। গবেষকদের ভেতর সামাজিক যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য চালু করেন বৈকালিক চায়ের ব্যবস্থা – যেখানে চা খেতে খেতে গবেষকরা একে অন্যের সাথে বৈজ্ঞানিক ধারণা বিনিময় করেন। লর্ড র‍্যালের তত্ত্বাবধানে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম চালু হয় তাপ, বিদ্যুৎ, চুম্বক, আলো, শব্দ, এবং পদার্থের ধর্ম সংক্রান্ত পরীক্ষণ পদার্থবিজ্ঞানের পাঠদান। ক্যাভেন্ডিস ল্যাবের পাঁচ বছরে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে ৫৪টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। 

লর্ড র‍্যালের সময়ে ১৮৮০ সালে কেমব্রিজে পড়তে এসেছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু। লর্ড র‍্যালের কাছ থেকেই তিনি উৎসাহ পেয়েছিলেন পরীক্ষণ পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায়। 

১৮৮৪ সালে ক্যাভেন্ডিস প্রফেসরের পদ ত্যাগ করে নিজের স্টেটে ফিরে গিয়ে নিজস্ব গবেষণাগারে আজীবন স্বাধীনভাবে গবেষণা চালিয়ে গেছেন লর্ড র‍্যালে। ক্লাসিক্যাল ফিজিক্সের এমন কোন শাখা নেই যেখানে লর্ড র‍্যালের উল্লেখযোগ্য অবদান নেই। প্রায় সাড়ে চার শ গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন তিনি। আবিষ্কার করেছেন পদার্থবিজ্ঞানের অনেক সূত্র এবং তত্ত্ব। 

গ্যাসের উপাদান ও ঘনত্ব সম্পর্কে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন লর্ড র‍্যালে। স্কটিশ রসায়নবিদ উইলিয়াম রামজির সাথে যৌথভাবে তিনি আবিষ্কার করেছেন নিষ্ক্রিয় গ্যাস আর্গন। এজন্য ১৯০৪ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন লর্ড র‍্যালে, এবং রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন উইলিয়াম রামজি। সেই ১৯০৪ সালের নোবেল পুরষ্কারের সাত হাজার পাউন্ড (বর্তমানের দশ লক্ষ পাউন্ড) পুরোটাই তিনি দান করে দিয়েছিলেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়কে। পাঁচ হাজার পাউন্ড দিয়েছিলেন ক্যাভেন্ডিস ল্যাবের উন্নয়নের জন্য, বাকি দুই হাজার পাউন্ড দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির জন্য। 

পৃথিবীর আকাশ নীল কেন – এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর প্রথম দিয়েছিলেন লর্ড র‍্যালে। আজ আমরা সবাই জানি বাতাসের ধূলিকণার সাথে আলোর স্ক্যাটারিং বা বিক্ষেপনের কারণে আকাশে নীল রঙ বেশি ছড়িয়ে পড়ে বলে দিনের বেলা আকাশ নীল থাকে। এই স্ক্যাটারিং – র‍্যালে স্ক্যাটারিং নামে পরিচিত। 

ব্ল্যাক-বডি রেডিয়েশন বা কালো পদার্থের বিকিরণ সংক্রান্ত র‍্যাইলে-জিনস সূত্র আবিষ্কৃত হয়েছে ১৮৮৯ সালে। মূলত এই সূত্র থেকেই ১৯০১ সালে ম্যাক্স প্ল্যাংক আলোর কোয়ান্টাম তত্ত্বের ধারণা পেয়েছেন। সে হিসেবে বলা চলে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সূচনা হয়েছে র‍্যালের আবিষ্কার থেকে। 

অণুবীক্ষণ, দূরবীক্ষণ, প্রিজম ইত্যাদি আলোকসংবেদী যন্ত্রপাতির রিজলভিং পাওয়ার সংক্রান্ত র‍্যালের আবিষ্কারের ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছে আলোকবিজ্ঞানের কারিগরি দিক। মাইক্রোস্কোপের সাহায্য এত ছোট বস্তু কীভাবে এত বড় আকারে দেখা যায়, কিংবা টেলিস্কোপের সাহায্যে এত দূরের গ্রহ-নক্ষত্র কীভাবে এত কাছে দেখা যায় – অর্থাৎ এসব সূক্ষ্ম আলোকসংবেদী যন্ত্রপাতিতে কীভাবে ছবি তৈরি হয় – সে সংক্রান্ত প্রথম তত্ত্ব দেন লর্ড র‍্যালে। 

বৈজ্ঞানিক সংগঠক হিসেবেও পদার্থবিজ্ঞানের অনেক উন্নয়ন ঘটিয়েছেন লর্ড র‍্যালে। ১৮৮৫ থেকে ১৮৯৬ পর্যন্ত তিনি রয়েল সোসাইটির সেক্রেটারি এবং ১৯০৫ থেকে ১৯০৮ পর্যন্ত রয়েল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন লর্ড র‍্যালে। ১৮৮২ থেকে ১৯০৫ পর্যন্ত রয়েল ইন্সটিটিউশানের ন্যাচারাল ফিলোসফির চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। ১৯০৮ সাল থেকে ১৯১৯ সালে তাঁর মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। 

এত আবিষ্কার, সম্মান, পুরষ্কার সবকিছুর চেয়েও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল পদার্থবিজ্ঞানের গবেষক হিসেবে নিজের কাছে ভালোলাগা। তিনি সারাজীবন গবেষণা করে গেছেন নতুন কিছু জানার প্রতি ভালোবাসা থেকে। ১৯১৯ সালের ৩০ জুন তাঁর মৃত্যু হয়।


তথ্যসূত্র

১। রবার্ট ব্রুস লিন্ডসে, লর্ড র‍্যালে দ্য ম্যান অ্যান্ড হিজ ওয়ার্ক, পারগ্যামন প্রেস, অক্সফোর্ড, ১৯৭০।

২। ব্যারি আর মাস্টার্স, লর্ড র‍্যালে অ্যা সায়েন্টিফিক লাইফ, ওপিএন জুন ২০০৯।

৩। পিটার ওয়েল্‌স, লর্ড র‍্যালে জন উইলিয়াম স্ট্রুট থার্ড ব্যারন র‍্যালে, আইইই ট্রানজেকশান, সংখ্যা ৫৪(৩), মার্চ ২০০৭। 

_______________
বিজ্ঞানচিন্তা নভেম্বর ২০২৪ সংখ্যায় প্রকাশিত







Tuesday, 24 September 2024

মাইকেল ফ্যারাডের জন্মদিনে

 


জনাব মাইকেল ফ্যারাডে,

আপনার জন্মদিনে আপনার প্রতি শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

১৭৯১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর লন্ডনের নিউইংটন বাটস নামের এক অখ্যাত জায়গায় আপনি জন্মেছিলেন। কিন্তু আপনার বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এবং উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে আপনি নিজে যখন বিখ্যাত হলেন, আপনার জন্মস্থানও বিখ্যাত হয়ে গেল।

“জন্ম হোক যথা তথা, কর্ম হোক ভালো” – এরকম আপ্তবাক্য আপনার ভাষাতেও ছিল। আপনি আপনার দরিদ্র কামার মা-বাবার ঘরে জন্ম নেয়াটাকে ভাগ্য বলে মেনে নিয়ে, স্কুল-কলেজে লেখাপড়া করতে না পারার ব্যাপারটাকে বিধাতার ইচ্ছা বলে মনে করে চুপ করে বসে থাকেননি। নিজের চেষ্টায় আপনি বই পড়তে শিখেছিলেন। বই বাঁধাইয়ের দোকানের সামান্য কর্মচারী হিসেবে বই বাঁধাই করতে করতে যেসব বই হাতের কাছে পেয়েছিলেন, সব বই পড়ে ফেলেছিলেন। শুধু পড়া নয়, পড়তে পড়তে আপনি চিন্তা করতে শিখেছিলেন। গাণিতিক বিজ্ঞানে আপনার প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাব আপনাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। আপনি পরীক্ষণ পদার্থবিজ্ঞানে আপনার দক্ষতা প্রদর্শন করেছেন।

সেই সময় আপনার দেশ ইংল্যান্ডে প্রকৃত মেধার মর্যাদা দেয়ার লোকের অভাব ছিল না (এবং এখনো নেই)। আপনার সাথে পরিচয় হয়েছিল সেই সময়ের বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্যার হামফ্রে ডেভির সাথে। তিনি আপনার মেধা এবং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসাকে যথাযথ সম্মান দিয়ে আপনাকে সুযোগ করে দিয়েছিলেন রয়েল ইন্সটিটিউশানে গবেষণা করার। আপনার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব কোন বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি সেদিন।

আপনার হাত দিয়েই ধরতে গেলে পৃথিবীর বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির বিপ্লব ঘটে গেছে। ১৮৩১ সালে আপনি আবিষ্কার করেছেন তড়িতচুম্বক আবেশ। চুম্বক ক্ষেত্র থেকে বিদ্যুৎ এবং বিদ্যুৎক্ষেত্র থেকে চুম্বকত্ব – এসব আপনারই আবিষ্কার। ১৮৩৩-৩৪ সালে আপনি আবিষ্কার করেছেন বিদ্যুৎ প্রবাহ এবং রাসায়নিক বিক্রিয়ার মধ্যে সম্পর্ক – ইলেকট্রোলাইসিস বা তড়িৎবিশ্লেষণের নীতি। বর্তমানে আমরা যে গাণিতিক ক্ষেত্রতত্ত্বের ধারণা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছি – সেই ক্ষেত্রতত্ত্বের – বিশেষ করে চৌম্বকক্ষেত্রের ধারণা আবিষ্কার করেছিলেন আপনি।

বৈদ্যুতিক মটর উদ্ভাবন করে পুরো পৃথিবীর কর্মপদ্ধতি আপনি বদলে দিয়েছেন। বিদ্যুৎ প্রবাহ চালনা করে যান্ত্রিক গতি তৈরির পদ্ধতি যদি উদ্ভাবন আপনি না করতেন তাহলে সম্ভবত আমরা এখনো শারীরিক শক্তির উপরই নির্ভর করতাম। আপনার আবিষ্কার এবং উদ্ভাবনের তালিকা আরো অনেক দীর্ঘ।

আমরা বিজ্ঞানের অবদানকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করি, কিন্তু কৃতজ্ঞতা জানাই না। কিংবা জানালেও অন্য কাউকে জানাই। কিন্তু আপনি বিজ্ঞানী বলেই তাতে আপনার কিছু যায় আসে না।

হে মহান ফ্যারাডে, আপনার জন্মদিনে একজন সাধারণ পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমি আপনাকে অভিবাদন জানাচ্ছি।

শুভ জন্মদিন হে মহাত্মন।


Friday, 7 June 2024

হেনড্রিক লরেন্টজ: আইনস্টাইনের গুরু




প্রফেসর হেনড্রিক লরেন্টজ সম্পর্কে বলতে গিয়ে আইনস্টাইন দ্বিধাহীনভাবে বলেছেন, “He meant more to me personally than anybody else I have met in my lifetime” – “ব্যক্তিগতভাবে আমি জীবনে যত মানুষের সংস্পর্শে এসেছি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন তিনি।“ আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব আবিষ্কৃত হয়েছে লরেন্টজ-এর গবেষণার ফসল থেকে। পদার্থের পারমাণবিক তত্ত্বের জন্য বিখ্যাত ছিলেন হেনড্রিক অ্যান্টুন লরেন্টজ। ১৯০২ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন তিনি এবং তাঁর ছাত্র পিটার জিম্যান। 

১৮৫৩ সালের ১৮ জুলাই নেদারল্যান্ডের আর্নহেমে জন্ম হয় হেনড্রিক লরেন্টজের। তাঁর বাবা ছিলেন গেরিট ফ্রেদেরিক, মা গিরট্রুইডা। চার বছর বয়সে লরেন্টজ মাতৃহারা হন। তাঁর বাবা আবার বিয়ে করেন লুবার্টা হুপকিসকে। মাতৃস্নেহ বঞ্চিত লরেন্টজ একেবারে শৈশব থেকেই লেখাপড়ার মধ্যে বড় হন।

লেখাপড়ার ব্যাপারে খুবই সিরিয়াস ছিলেন লরেন্টজের বাবা। ছোটবেলাতেই একটি কঠোর নিয়মকানুনসমৃদ্ধ স্কুলে ভর্তি করে দেন তাকে। ওখান থেকে ১৮৬৬ সালে হাইস্কুলের বেশ এডভান্সড কোর্সে ভর্তি হয়ে যান অনায়াসে। ১৮৭০ সালে লিডেন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন এবং দুবছরের মধ্যে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৮৭২ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করার পর আর্নহেমের একটি নৈশবিদ্যালয়ে বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি আলোর প্রতিফলন ও প্রতিসরণ সম্পর্কিত পিএইচডি গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। 

১৮৭৫ সালে মাত্র বাইশ বছর বয়সে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন হেনড্রিক লরেন্টজ। এরপর যোগ দেন লিডেন ইউনিভার্সিটির ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে। কয়েক বছরের মধ্যেই তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞান-এর প্রধান অধ্যাপকে উন্নীত হন। নেদারল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে এর আগে কোন তত্ত্বীয় অধ্যাপকের পদ ছিলো না। পদার্থবিজ্ঞানের আলাদা শাখা হিসেবে তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞান তখন সবেমাত্র যাত্রা শুরু করেছে। সে হিসেবে বলা যায় হেনড্রিক লরেন্টজ ছিলেন নেদারল্যান্ডের তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের প্রথম অধ্যাপক। পরবর্তীতে ইওরোপের অনেকগুলি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধ্যাপনার লোভনীয় প্রস্তাব পাওয়া সত্ত্বেও তিনি অন্য কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেননি। সারাজীবন লিডেন ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা করেই কাটিয়ে দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করার পরেও তিনি তাঁর সোমবার সকালের লেকচার চালিয়ে গিয়েছেন। এই লেকচার ক্লাসে অংশ নিয়েছিলেন আলবার্ট আইনস্টাইন। 

লিডেন ইউনিভার্সিটিতে আইনস্টাইন তাঁর বন্ধু পল ইরেনফেস্টের কাছে যেতেন। তখন প্রতি সোমবার প্রফেসর লরেন্টজ যে পদার্থবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক আবিষ্কার ও গবেষণার অগ্রগতি সম্পর্কে যে লেকচার দিতেন – আইনস্টাইন সেখানে যোগ দিতেন। সেখান থেকে আইনস্টাইন তাঁর নিজের গবেষণার অনেক খোরাক পেয়েছেন। 

শুরুতে ম্যাক্সওয়েলের তড়িৎচুম্বক তরঙ্গের উপর কাজ করছিলেন লরেন্টজ। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও আলোর সম্পর্কের নীতিগুলি নিয়ে। ম্যাক্সওয়েলের তত্ত্বের মাধ্যমে তিনি তাঁর পিএইচডি থিসিসে আলোর প্রতিসরণ ও প্রতিফলনের নীতিগুলির নতুন ব্যাখ্যা দেন। আলোর বেগ এবং যে মাধ্যমে আলো চলাচল করে সেই মাধ্যমের ঘনত্ব ও উপাদানের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করেন লরেন্টজ। 

প্রায় একই সময়ে ডেনমার্কের পদার্থবিজ্ঞানী লুডভিগ লরেঞ্জও আলোর বেগের সাথে আলোর মাধ্যমের প্রতিসরণাঙ্কের একই ধরনের গাণিতিক সম্পর্ক আবিষ্কার করেন। হেনড্রিক লরেন্টজ আর লুডভিগ লরেঞ্জের নাম অনুসারে এই সমীকরণের নাম হয় লরেন্টজ-লরেঞ্জ সমীকরণ। এই সমীকরণ অনুসারে আলোক মাধ্যম বৈদ্যুতিক চার্জযুক্ত অসংখ্য কণার সমষ্টি – যে কণাগুলি সবসময় ঢেউয়ের মতো দুলছে। মাধ্যমের ভেতর দিয়ে আলোর চলাচলের সময় এই কণাগুলির সাথে আলোর তরঙ্গের মিথষ্ক্রিয়া ঘটে। এখন আমরা সবাই আলোর কণাতত্ত্ব সম্পর্কে জানি। কিন্তু সেই ১৮৭৯-৮০ সালে পরমাণু এবং তার উপাদান – ইলেকট্রন, প্রোটন-নিউট্রন সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোন ধারণাই ছিল না বিজ্ঞানীদের। 

১৮৮১ সালে লরেন্টজ একাডেমি অব ফাইন আর্টস এর প্রফেসর ইওহান কাইজারের মেয়ে আলেত্তাকে বিয়ে করেন। হেনড্রিক ও আলেত্তা লরেন্টজ-এর দুই মেয়ে এবং দুই ছেলে হয়। তাঁদের বড় মেয়ে গিরট্রুইডা পরবর্তীতে বাবার মতোই পদার্থবিজ্ঞানী হন। 

ম্যাক্সওয়েলের সূত্র থেকে লরেন্টজের যে সমীকরণের সূত্রপাত হয়েছে, সেখান থেকেই দানা বেঁধেছে ইলেকট্রনের তত্ত্ব। ১৮৯২ সালে লরেন্টজ তাঁর তাত্ত্বিক গবেষণা থেকে উদ্ভূত প্রস্তাব করেন যেকোনো পদার্থের মধ্যেই ধনাত্মক কিংবা ঋণাত্মক চার্জযুক্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা আছে। লরেন্টজ তাত্ত্বিকভাবে প্রমাণ করেন যে এসব চার্জিত কণার কম্পনের ফলে তড়িৎচুম্বক তরঙ্গের উৎপত্তি হয়। ম্যাক্সওয়েল তড়িৎচুম্বক তরঙ্গের সূত্র দিয়েছিলেন ১৮৫০ থেকে ১৮৭০ সালের মধ্যে। লরেন্টজ যেসময় তাঁর ইলেকট্রনের তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করছিলেন, সেই সময়েই ১৮৮৮ সালে হেনরিখ হার্টজ পরীক্ষাগারে তড়িতচুম্বক তরঙ্গ উৎপন্ন করতে সক্ষম হন। 

লরেন্টজ-এর সমসাময়িক বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতেন যে বাতাসে ইথার নামে এক ধরনের স্বচ্ছ পাতলা অদৃশ্য বস্তু আছে। অনেক বিজ্ঞানী বাতাসে ইথারের বেগ নির্ণয় করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে অনেকে বিশ্বাস করতেন যে ইথার স্থির – বাতাসে তাদের বেগ শূন্য। লরেন্টজও শুরুতে বিশ্বাস করতেন যে বাতাসে ইথার আছে এবং তার ভেতর দিয়ে আলো, শব্দ ইত্যাদি চলাচল করে। কিন্তু ১৮৮৭ সালে মাইকেলসন ও মর্লির পরীক্ষা থেকে প্রমাণিত হয়ে যায় যে ইথারের কোন অস্তিত্ব নেই। 

কিন্তু ইথারের অস্তিত্ব মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় ব্যাপারটি পুরোপুরি মেনে নেননি লরেন্টজ। তিনি ইথার খুঁজে না পাবার ব্যাপারটিকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করলেন তাঁর ইলেকট্রন তত্ত্বের গবেষণায়।  গতির ফলে বস্তুর আকারের কী পরিবর্তন ঘটে তার তত্ত্ব আবিষ্কার করেন তিনি – যা পরবর্তীতে বিখ্যাত হয়েছে লরেন্টজ ট্রান্সফরমেশান নামে। লরেন্টজ ট্রান্সফরমেশান কাজে লাগিয়েই আইনস্টাইন আবিষ্কার করেছেন তাঁর আপেক্ষিকতার তত্ত্ব।

লরেন্টজের পরমাণু তত্ত্ব অনুসারে বস্তু যখন যেদিকে চলতে থাকে সেদিকে তার দৈর্ঘ্য কিছুটা কমে যায়। যদিও এই পরিবর্তন খুবই নগণ্য, বস্তুর গতিবেগ অত্যন্ত বেশি হলে এই পরিবর্তন মাপা সম্ভব। লরেন্টজ ধারণা দেন যে বস্তুর গতি বস্তুর ভেতরের চার্জিত বস্তুর মধ্যবর্তী বলের পরিবর্তন ঘটায়। 

লরেন্টজ ট্রান্সফরমেশান প্রকাশিত হবার আগেই পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়ে গেছেন হেনড্রিক লরেন্টজ তাঁর আলোর উপর চুম্বকত্বের প্রভাবের তত্ত্বের জন্য। ম্যাক্সওয়েলের তত্ত্ব অনুযায়ী পরীক্ষাগারে তড়িৎচুম্বক তরঙ্গ উৎপাদনের প্রমাণ পান জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী হেনরিক হার্টজ। পরীক্ষামূলক প্রমাণ পাওয়া সত্ত্বেও ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণে কিছুটা অসম্পূর্ণতা রয়ে গিয়েছিল – সেখানে পরমাণু তত্ত্বের কোন স্থান না থাকাতে। 

লরেন্টজ তাঁর পরমাণুর তত্ত্বে চার্জিত ইলেকট্রনের ধারণা দেন – যার প্রবাহের প্রকৃতির উপর নির্ভর করে পরিবাহী ও অপরিবাহী বস্তুর ধর্ম নির্ধারণ করা যায়। লরেন্টজ-এর তত্ত্বের পরীক্ষামূলক প্রমাণ দেন তাঁর ছাত্র পিটার জিম্যান। এই আবিষ্কারের জন্য তাঁরা দুজন ১৯০২ সালের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরষ্কার পান। 

লরেন্টজের নোবেল পুরষ্কার-পরবর্তী গবেষণা আরো অনেক বেশি যুগান্তকারী। ১৯০৪ সালে প্রকাশিত লরেন্টজ ট্রান্সফরমেশান তত্ত্ব অনুসারে গতির ফলে গতিশীল বস্তুর ভেতরের কণার চার্জের মধ্যবর্তী তড়িৎচুম্বক বলের তারতম্য ঘটে। ফলে গতিশীল বস্তু আকারে কিছুটা সংকুচিত হয়ে যায়। এখান থেকেই পরের বছর ১৯০৫ সালে আলবার্ট আইনস্টাইন আবিষ্কার করেন স্পেশাল থিওরি অব রিলেটিভিটি। 

লরেন্টজের গবেষণা থেকে পদার্থবিজ্ঞানের এত বেশি নতুন গবেষণার পথ খুলে গিয়েছিল যে তাঁকে সেই সময়ের শ্রেষ্ঠ তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। ১৯০৫ সালে তিনি রয়েল সোসাইটির ফেলোশিপ পান। ১৯০৮ সালে পান রয়েল সোসাইটির রামফোর্ড মেডেল এবং ১৯১৮ সালে পান কোপলে মেডেল। ১৯১১ সালে তাঁর সভাপতিত্বে ব্রাসেলস-এ অনুষ্ঠিত হয় প্রথম সলভে কংগ্রেস। 

১৯১৯ সালে নেদারল্যান্ড সরকার সমুদ্র নিয়ন্ত্রণের উচ্চ-পর্যায়ের কমিটির চেয়ারম্যান নিযুক্ত করে প্রফেসর লরেন্টজকে। তাঁর নেতৃত্বে হাইড্রলিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ব্যাপক উন্নতি ঘটে নেদারল্যান্ডে। 


আইনস্টাইন ও লরেন্টজ (১৯২১)


প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর লরেন্টজ ইওরোপের বিভিন্ন দেশের মধ্যে বৈজ্ঞানিক গবেষণা-সহযোগিতা পুনপ্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হন। বিশ্বের বিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রথম সারির সাত জন বিজ্ঞানীর সমন্বয়ে ‘কমিটি অন ইন্টেলেকচুয়াল কো-অপারেশন অদ দ্য লিগ অব নেশনস’-এর অন্যতম সদস্য ছিলেন লরেন্টজ। ১৯২৫ সালে তিনি সেই কমিটির চেয়ারম্যান মনোনীত হয়েছিলেন। 

১৯২৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি লরেন্টজ মৃত্যুবরণ করেন। নেদারল্যান্ডে তিনি এতটাই সম্মানিত ছিলেন যে তাঁর মৃত্যুতে দেশের সবগুলি টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন সার্ভিস তিন মিনিটের জন্য বন্ধ রেখে তাঁর জন্য শোক প্রকাশ করা হয়। 

১৯৫৩ সালে লরেন্টজ-এর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আলবার্ট আইনস্টাইন লিডেন ইউনিভার্সিটির অনুষ্ঠানে যে লেখাটি পাঠান সেখানে তিনি লিখেছেন, “সবাই অনুভব করতো তাঁর শ্রেষ্ঠতা, তাঁর প্রাধান্য। কিন্তু তাঁর শ্রেষ্ঠতা কারো উপরই কোন চাপ সৃষ্টি করতো না।“ 

লরেন্টজ ছিলেন অত্যন্ত মানবিক, যুদ্ধবিরোধী একজন মানুষ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর এক জার্মান প্রফেসর বন্ধু তাঁকে বোঝাতে চেষ্টা করেছিলেন যে – পৃথিবীতে মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হবে শুধুমাত্র শক্তি প্রয়োগে। লরেন্টজ তার উত্তরে বলেছিলেন, “সেরকম পৃথিবীতে আর যেই থাকুক, আমি থাকতে চাই না।“ 

তথ্যসূত্র

১।  https://www.nobelprize.org/prizes/physics/1902/ceremony-speech/

২। https://www.britannica.com/biography/Hendrik-Antoon-Lorentz

৩। আলবার্ট আইনস্টাইন, আইডিয়াজ অ্যান্ড ওপিনিয়ন্স, রূপা অ্যান্ড কোং, দিল্লী, ২০০৯।

৪। বায়োগ্রাফিক্যাল এনসাইক্লোপিডিয়া অব সায়েন্টিস্টস, ওয়ার্ল্ড বুক, শিকাগো, ২০০৩।

৫। https://en.wikipedia.org/wiki/Hendrik_Lorentz

 ______________

বিজ্ঞানচিন্তা মার্চ ২০২৪ সংখ্যায় প্রকাশিত






Sunday, 12 May 2024

রিচার্ড ফাইনম্যানের জন্মদিনে - ২০২৪

 


১৯৭৯ সালে আমেরিকার Omni ম্যাগাজিন রিচার্ড ফাইনম্যানের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছিল। লেখাটির শিরোনাম দিয়েছিল ‘The Smartest Man in the World’. ফাইনম্যানের মা তখনো জীবিত। তিনি যখন শুনলেন যে তাঁর ছেলেকে পৃথিবীর সবচেয়ে স্মার্ট ছেলে বলা হচ্ছে – তিনি অবাক হয়ে বলেছিলেন, “Our Richie? The World’s smartest man? God help us!”

মায়ের কাছে সন্তান চিরদিনই শিশু থেকে যায়। সন্তান যদি বিখ্যাত হয়ে যান, তাহলে তো কথাই নেই। মায়ের কথা বাদ দিলেও, রিচার্ড ফাইনম্যানকে পৃথিবীর সবচেয়ে স্মার্ট পুরুষ বলাতে অনেকের আপত্তি থাকতে পারে। আপত্তি তখনো ছিল, এখনো আছে। কিন্তু আমি তাঁকে সবচেয়ে স্মার্ট পদার্থবিজ্ঞানী বলে মনে করি। তিনি যে আইনস্টাইনের মতো মহাবিশ্বের পদার্থবিজ্ঞানের খোলনলচে পালটে দিয়েছেন তা নয়। তাঁর গবেষণা যে পদার্থবিজ্ঞানের সকল শাখায় কোনো না কোনো ভাবে প্রভাব ফেলেছে – তাও নয়। তিনি কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্সের অগ্রদূত, ফাইনম্যান-ডায়াগ্রাম তাঁর আবিষ্কৃত অত্যন্ত কার্যকরী গাণিতিক কৌশল, The Feynman Lectures of Physics পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে মৌলিক এবং স্মার্ট ক্লাসরুম লেকচার। কিন্তু ফাইনম্যানের লেকচারের চেয়েও আকর্ষণীয় লেকচার দিয়েছেন আরো অনেক পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। তাঁর চেয়েও বিখ্যাত এবং জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিল এবং এখনো আছে পৃথিবীতে। 

তারপরেও কেন শুধুমাত্র একজন পদার্থবিজ্ঞানী বেছে নেয়ার সুযোগ থাকলে আমি রিচার্ড ফাইনম্যানকে বেছে নেবো? কারণ তাঁর অনন্য স্টাইল। তিনি পদার্থবিজ্ঞানকে একেবারে নিজের মতো করে বুঝেছেন। তিনি যা বোঝেননি তা অকপটে বলে দিয়েছেন। তাঁর ভেতরে কোন ব্যাপারেই কোন দ্বিচারিতা ছিল না। তিনি নিজে তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানী হয়েও স্পষ্টভাবে বলেছেন, যে কোনো তত্ত্ব সে যত আকর্ষণীয়ই হোক, তা যদি বাস্তবে প্রমাণ করা না যায় – তা কোন তত্ত্বই নয়। 

এই মানুষটি সারাজীবন কাজ করে গেছেন নতুন জিনিস শেখার আনন্দে। প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনে তাঁর কৌতূহল ছিল একেবারে শিশুদের মতো। জনপ্রিয় হবার কোন চেষ্টাই ছিল না তাঁর মধ্যে। জীবদ্দশায় তিনি অতটা জনপ্রিয় ছিলেনও না, যতটা হয়েছেন তাঁর মৃত্যুর পর। নোবেল পুরষ্কার পাবার পরেও তাঁকে যে আমেরিকার মানুষ খুব একটা চিনতো তা নয়। অবশ্য আমেরিকাতে এত বেশি নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী যে – কে কার খবর রাখে। বিজ্ঞান জনপ্রিয়তা মাপার মাপকাঠি এখনো নয়, তখনো ছিল না। 

তবে ফাইনম্যান তাঁর মৃত্যুর দু’বছর আগে আমেরিকান সর্বস্তরের জনগণের কাছে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিলেন চ্যালেঞ্জার শাটল দুর্ঘটনার মূল কারণ উদ্ঘাটন করে। ১৯৮৬ সালের ২৮ জানুয়ারি নাসার মহাকাশ যান চ্যালেঞ্জার উৎক্ষেপণের সাথে সাথেই বিস্ফোরিত হয়ে সাতজন নভোচারীর সবাই মারা যায়। এই ঘটনার তদন্তের জন্য আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান যে কমিটি গঠন করেন সেখানে বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানী হিসেবে রিচার্ড ফাইনম্যানকে সদস্য করা হয়। ফাইনম্যান সরকারি কাজে উৎসাহী ছিলেন না কোনোদিনই। আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা আর অহেতুক ফরমালিটি তাঁর অসহ্য ছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত অনুরোধে অসুস্থ শরীরেও তিনি রাজি হয়েছিলেন। সেই সময় তিনি ক্যান্সারে ভুগছিলেন। ফাইনম্যান শর্ত দিয়েছিলেন – তিনি কমিটিতে থাকলেও কমিটির সকল সদস্যের মতের সাথে তাঁর মত মিলতে হবে কোন কথা নেই। কমিটির রিপোর্টের সাথে তাঁর ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করার স্বাধীনতাও তাঁকে দিতে হবে। এরকম তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ করতে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়, অনেক সময় কোন রিপোর্ট প্রকাশিতও হয় না। এসব তাঁর জানা ছিল বলেই তিনি এরকম শর্ত দিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট রিগ্যান তাঁর শর্ত মেনে নিয়েই তাঁকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিয়েছিলেন। রিচার্ড ফাইনম্যান চ্যালেঞ্জার মহাকাশযানের দুর্ঘটনার সঠিক কারণ বের করেছিলেন। রিপোর্টের সাথে তাঁর নিজের রিপোর্টও প্রকাশ করেছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি সংবাদ সম্মেলন করে ন্যাশনাল টেলিভিশনের ক্যামেরার সামনে ছোট্ট পরীক্ষার মাধ্যমে দেখিয়েছিলেন কী ঘটেছিল আসলে। রকেটের মোটর সেফটিতে যে রাবারের ও-রিং ছিল – প্রচন্ড ঠান্ডায় সেই রাবারের ইলাস্টিসিটি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ফাইনম্যান সাংবাদিকদের সামনে একটুকরো রাবার বরফ-পানিতে ডুবিয়ে দেখিয়েছিলেন কীভাবে রাবারের কার্যকারিতা কমে যায় তাপমাত্রা ভীষণ কমে গেলে। ফাইনম্যান সেই ঘটনার পর আমেরিকার সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছিলেন। অবশ্য তার দেড় বছর পরেই ফাইনম্যান মারা যান। কিন্তু তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়তেই থাকে। 

কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে রিচার্ড ফাইনম্যান সম্পর্কে কোন তথ্যই আমরা পাইনি সেইসময়। আমি দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম। অনার্স ও মাস্টার্স পাস করেছি। এমফিলেও ভর্তি হয়েছিলাম। আমাদের শিক্ষকরা আমাদের কোনো ক্লাসেই রিচার্ড ফাইনম্যানের নাম উচ্চারণও করেননি। এমফিল করার সময় প্রামাণিকস্যার “ফাইনম্যান’স পাথ ইন্টিগ্র্যাল” নামে একটি বই পড়তে দিয়েছিলেন। কিন্তু তখনো ফাইনম্যান সম্পর্কে কিছুই জানি না। ধরতে গেলে ফাইনম্যানের সাথে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে। ফাইনম্যানস লেকচার অব ফিজিক্সের মতো এত ভালো বই থাকতে কেন আমাদের অনার্সে এই বই পড়তে বলা হয়নি – এই অভিমান আমার কখনো যাবে বলে মনে হয় না। 

আজ ১১ মে রিচার্ড ফাইনম্যানের জন্মদিন। 

Happy birthday Feynman – the finest man! 


Tuesday, 9 January 2024

স্টিফেন হকিং-এর জন্মদিন ২০২৪

 


স্টিফেন হকিং এর জন্মদিন ৮ জানুয়ারি। 

বেঁচে থাকলে তিনি আজ ৮২ হতেন। বিজ্ঞানীদের মধ্যে তাঁর মতো জনপ্রিয়তা ছিল আর মাত্র তিনজনের – গ্যালিলিও, নিউটন আর আইনস্টাইনের। 

গ্যালিলিও, নিউটন এবং আইনস্টাইন তাঁদের নিজ নিজ আবিষ্কারের মাধ্যমে মহাবিশ্বের বিজ্ঞানের চেহারা বদলে দিয়েছেন – সেটা তাঁদের মৃত্যুর এত বছর পরেও বার বার প্রমাণিত হয়েই চলেছে। কিন্তু হকিং আসলে কী করেছেন যার জন্য তিনি এত খ্যাতি লাভ করেছেন – সেই প্রশ্নের সহজ কোন উত্তর নেই – এমন কোনো প্রমাণও হাতে নেই যে বলা চলে হকিং না থাকলে এরকম হতো কিংবা ওরকম হতো। 

হকিং-এর মৌলিক কাজ যতটা – তার চেয়েও অনেক বেশি হলো তাঁর জনপ্রিয় বিজ্ঞান বা পপুলার সায়েন্সের বইগুলি। সেগুলিরও পাঠকপ্রিয়তা বেড়েছে – হকিং-এর সার্বক্ষণিক মিডিয়া উপস্থিতির কারণে। হকিং-এর মতো মিডিয়া-পণ্য আর কোন বিজ্ঞানী কোন যুগেই হয়ে ওঠেননি। 

ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড পত্রিকা ‘ডেইলি সান’ প্রায় প্রতিদিনই স্টিফেন হকিং-কে নিয়ে নানারকম সংবাদ ছাপাতো। তাদের বিজ্ঞানপাতা জুড়ে হকিং-এর নামে যা থাকতো – তাতে আর যাই থাকুক – বিজ্ঞান থাকতো না। যেমন হকিং এর বয়ানে বলা হতো – এলিয়েনরা পৃথিবীতেই মানুষের মাঝে মিশে আছে- এরকম আরো অনেক কিছু। ২০১৮ সালের ১৩ জানুয়ারি – হকিং-এর ৭৬তম জন্মবার্ষিকীর কয়েক দিন পরেই বিশাল এক প্রবন্ধ ছাপানো হয় ডেইলি সানে – যেখানে অনুমান করা হয়েছে প্রকৃত স্টিফেন হকিং মারা গেছেন অনেক বছর আগে, যে হকিং হুইল চেয়ারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন – তিনি আসলে হকিং-এর মতো দেখতে একটি পুতুল। এরকম সন্দেহ হবার পেছনে তারা কিছু কারণ দেখিয়েছে – যেমন হকিং-এর যে অসুখ হয়েছে – তাতে এত বছর বেঁচে থাকার কথা নয় কিছুতেই, হকিং-কে ২০১৭ সালে দেখতে ১৯৮২ সালের চেয়েও তরুণ মনে হয়, কথা যেহেতু তিনি বলতে পারেন না, সেহেতু কম্পিউটারের ভয়েজ আগে যেমন ছিল এখনো তেমন আছে, কিন্তু আগে তিনি কথা বলতে অনেক সময় নিতেন, কিন্তু এখন অনেক তাড়াতাড়ি কথা বলতে পারেন, তিনি আগে এত রাজনীতি বিষয়ক (ট্রাম্প বিরোধী, ব্রেক্সিট বিরোধী) কথাবার্তা বলতেন না – ইত্যাদি ইত্যাদি। এর দুমাস পর হকিং সত্যিই মারা যাবার পর এ বিতর্ক আর বেশিদূর এগোয়নি। তবে অনেকেই বিশ্বাস করেছেন যে হকিং আসলে ১৯৮৫ সালেই মারা গেছেন নিউমোনিয়ায়। অবশ্য তাদেরকে বেশি গুরুত্ব দেয়ার  কোন দরকার নেই – কারণ হকিং-এর এত্তো জনপ্রিয় সব বই লেখা হয়েছে ১৯৮৫ সালের পরে। 

[ডেইলি সান এর রিপোর্টটির লিংক নিচে দেয়া হলো। আগ্রহীরা পড়ে দেখতে পারেন।]

হকিং-এর শারীরিক অক্ষমতা যতটা না তাঁর জীবনধারণ কঠিন করে তুলেছে – তার সেই অক্ষমতাকে ফোকাস করেই মিডিয়াগুলি দিনের পর দিন হকিং-কে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বানিয়ে দিয়েছে সুপারস্টার। গত শতাব্দীর শেষ দশক থেকে শুরু করে আমৃত্যু হকিং তা উপভোগ করে গেছেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট, ভ্যাটিকানের পোপ, ইংল্যান্ডের রানি – সবার সাথেই তাঁর মিডিয়া-প্রেজেন্সের আয়োজন করেছিলেন তাঁর আয়োজক-কোম্পানি, বিভিন্ন ইভেন্টে জনপ্রিয় বক্তৃতা, নাসার জিরো-গ্রাভিটি শাটলে ভ্রমণ, বিগ-ব্যাং থিওরির মতো সিরিয়ালে উপস্থিতি –ইত্যাদির মাধ্যমে তারা শুধুমাত্র মিডিয়াস্বত্ব থেকেই উপার্জন করেছে লক্ষ লক্ষ ডলার/পাউন্ড/ইউরো। 

স্টিফেন হকিং এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে হলিউডের বিখ্যাত (যৌন নির্যাতক হিসেবে পরবর্তীতে কুখ্যাত) জেফরি এপস্টেইন তাঁর সাথে বন্ধুত্ব করেছিলেন এবং বিভিন্ন পার্টিতে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে যেতেন। অতিসম্প্রতি শিশুদের উপর যৌননির্যাতনের এক মামলার নথিতে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, পপ তারকা মাইকেল জ্যাকসন, ব্রিটিশ রাজপুত্র অ্যান্ড্রুর পাশাপাশি স্টিফেন হকিং-এর নামও এসেছে – যারা জেফরি এপস্টেইনের পার্টিতে উপস্থিত ছিলেন যেখানে যৌন নির্যাতন ঘটেছিল। হকিং-এর বিরুদ্ধে অবশ্য কোন অভিযোগ করা হয়নি।

তাহলে যতটা মিডিয়া কভারেজ পেয়েছেন, সেই তুলনায় হকিং-এর যুগান্তকারী আবিষ্কার বলে কি কিছুই নেই? অবশ্যই আছে। ব্ল্যাক হোল থেকে যে বিকিরণ ঘটে যা ‘হকিং রেডিয়েশান’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে তা নিঃসন্দেহে তাঁর বড় তাত্ত্বিক আবিষ্কার। বেঁচে থাকলে ২০২০ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কারের তিনিও অংশীদার হতে পারতেন – সেক্ষেত্রে হয়তো রেইনহার্ড গেনজেল অথবা অ্যান্ড্রিয়া গেজ – কেউ একজনকে বাদ দিতে হতো। কিন্তু সিংগুলারিটি বিষয়ে রজার পেনরোজের তাত্ত্বিক কাজ হকিং-এর কাজের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং বিস্তৃত। 

হকিং-এর বৈজ্ঞানিক অবদানের চেয়েও অনেক বেশি মৌলিক এবং গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন আরো অসংখ্য বিজ্ঞানী। তাঁদের কাজের জন্য তাঁরা নোবেল পুরষ্কার পেলেও – পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ তাঁদের চেনেনও না। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা আর জনপ্রিয় হওয়া এক কথা নয়। স্টিফেন হকিং জনপ্রিয় ছিলেন – থাকবেন আরো অনেক বছর সন্দেহ নেই।

শুভ জন্মদিন স্টিফেন হকিং। 

___________

ডেইলি সানের লিংক



Thursday, 15 June 2023

হ্যাপি বার্থডে পিটার হিগ্‌স

 



“গুড আফটারনুন প্রফেসর”

“গুড আফটারনুন” 

এডিনবরার ফুটপাত দিয়ে হাঁটার সময় পরিচিত অপরিচিত অনেকেই হাই হ্যালো করে তাঁকে। 

অন্যান্য দিনের মতো সেদিনও রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ সেরে হেঁটে হেঁটে বাসায় ফিরছিলেন তিনি। ঘ্যাঁচ করে একটি গাড়ি থামলো ফুটপাত ঘেঁষে। গাড়ি থেকে দ্রুত নেমে এলেন এক মধ্যবয়সী মহিলা। 

প্রফেসরের পথ আগলে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, “কনগ্র্যাচুলেশান্‌স প্রফেসর হিগ্‌স”। 

চুরাশি বছর বয়সেও প্রফেসর হিগ্‌সের স্মৃতিশক্তি অটুট। তিনি চিনতে পারলেন মহিলাকে। একসময় এই মহিলা তাঁর প্রতিবেশী ছিলেন। প্রফেসর হিগ্‌স অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “হোয়াট্‌স দ্য নিউজ?”

“আপনি জানেন না? আপনি নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন। আমার মেয়ে নিউজ শুনে  আজ সকালেই আমাকে বলেছে। আশ্চর্য! আপনি জানেন না! নোবেল একাডেমি আপনাকে ফোন করেনি?”


প্রফেসর হিগ্‌স কিছুটা বিব্রতভাবে বললেন, “আমার তো সেলফোন নেই। বাসার ফোন হয়তো খেয়াল করিনি। থ্যাংক ইউ, এনিওয়ে।“

মহিলাকে বিদায় দিয়ে শান্তভাবেই হেঁটে বাসায় এলেন প্রফেসর পিটার হিগ্‌স। টিভির সংবাদ থেকে নিশ্চিন্ত হলেন যে তিনি নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন। 

৪৯ বছর আগে ১৯৬৪ সালে তিনি পেপার লিখেছিলেন নতুন ধরনের মৌলিক ভারী বোসন কণা থাকার সম্ভাবনার ব্যাপারে। প্রায় একই সময়ে ফ্রান্সের ফ্রাঁসোয়া ইংলার্ট এবং রবার্ট ব্রাউটও একই সম্ভাবনা ব্যক্ত করেছিলেন আলাদা পেপারে। তারপর বছরের পর বছর কেটে গেছে সেই বোসন কণার সন্ধানে। তত্ত্বীয়ভাবে পদার্থবিজ্ঞানীরা সবাই একমত হয়ে এই বোসন কণার নাম দিয়েছেন হিগ্‌স বোসন। এতে কিছুটা বিব্রত হলেও মেনে নিয়েছেন প্রফেসর পিটার হিগ্‌স। মনে মনে হয়তো খুশিও হয়েছেন। কিন্তু ১৯৯৩ সালে নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী লিওন লেডারম্যান যখন ‘দ্য গড পার্টিক্যাল’ নামে বই লিখলেন – হিগ্‌স বোসনের আরেকটি নাম হয়ে গেল গড পার্টিক্যাল। এই নামে প্রচন্ড আপত্তি ছিল ঈশ্বরে অবিশ্বাসী প্রফেসর হিগ্‌স-এর। প্রফেসর লেডারম্যানও এই কণার নাম গড পার্টিক্যাল রাখতে চাননি – বলেছিলেন গডড্যাম পার্টিক্যাল। কিন্তু ঈশ্বরের নামে বাণিজ্য সবচেয়ে লাভজনক বাণিজ্য। এই বাণিজ্যের লোভেই লেডারম্যানের বইয়ের নাম প্রকাশক ‘গড পার্টিক্যাল’ রেখেছিলেন – যেখানে ব্যবসাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। বইটি ঈশ্বরের নামে প্রচুর বিক্রি হয়েছে। গড পার্টিক্যাল সম্পর্কে অনেকেই তেমন কিছু না জেনেই এই কণাকে ঈশ্বরের প্রদত্ত কণা বলে প্রচার করতে শুরু করলো। এই ব্যাপারটিতে ভীষণ বিরক্ত হয়েছেন প্রফেসর হিগ্‌স। বিরক্তির মাত্রা চরমে উঠেছে যখন কণাটি পরীক্ষাগারে শনাক্ত হবার পর সব ধর্মের লোকজনই তাদের ধর্মগ্রন্থে এই কণার উল্লেখ আছে বলে দাবি করে তাঁর কাছে শত শত চিঠি পাঠাতে শুরু করলো।

হিগ্‌স বোসন খুঁজে পেতে তিন যুগ সময় লেগেছে বিজ্ঞানীদের। ২০১২ সালের ৪ জুলাই লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারের কণাবিজ্ঞানীরা ঘোষণা দিলেন যে হিগ্‌স বোসন পাওয়া গেছে। প্রফেসর হিগ্‌স সেই ঘোষণা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁর চোখ ভিজে উঠেছিল সেদিন। 

তারপর আরো এক বছর কেটে গেছে। হিগ্‌স বোসন আবিষ্কারের তত্ত্বের জন্য প্রফেসর পিটার হিগ্‌স যে নোবেল পুরষ্কার পাবেন তা অনেকেই অনুমান করেছিলেন। কেবল পিটার হিগ্‌স নিজেই খেয়াল রাখেননি কখন ২০১৩ সালের নোবেল পুরষ্কারের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। 

১৯২৯ সালের ২৯মে নিউক্যাসেলে জন্ম হয়েছিল প্রফেসর পিটার হিগ্‌স এর। আজ তাঁর ৯৪তম জন্মদিন।

শুভ জন্মদিন প্রফেসর হিগ্‌স। 


রিচার্ড ডকিন্সের সাথে একটি সন্ধ্যা


 [শুক্রবার ১৭/২/২০২৩ সন্ধ্যে ৭টা ৩০]


আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় – বিজ্ঞানের মতো সস্তা জিনিস আর নেই। এতটাই সস্তা যে পরীক্ষায় পাসের জন্য কোচিং সেন্টার ছাড়া বিজ্ঞানের জন্য আর কোথাও এক পয়সাও খরচ করতে রাজি নয় বেশিরভাগ মানুষ। নোরাহ ফাতেহির পনের মিনিট নাচ দেখার জন্য পনের হাজার টাকার টিকেট কেনার লোকের অভাব নেই, কিন্তু  বিনামূল্যেও বিজ্ঞান-বক্তৃতা শোনার জন্য লোক পাওয়া যায় না আমাদের দেশে।

তবে কিছু কিছু দেশে কিছু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই কথা প্রযোজ্য নয়। যেমন ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী ও জনপ্রিয় লেখক ব্রায়ান কক্স-এর এক ঘন্টার একটি বিজ্ঞান বক্তৃতার টিকেটের দাম দু’শ থেকে পাঁচশ ডলার।  জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় এরকম জনপ্রিয় বাগ্মী আছেন, যেমন রিচার্ড ডকিন্স, বিল ব্রাইসন, নীল টাইসন – যাদের কথা শোনার জন্য অনেক টাকার টিকেট কিনে জ্ঞানপিপাসু লোক ভীড় জমায়, বিশাল বিশাল কনভেনশান সেন্টার কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। এরকম দৃশ্য দেখে আনন্দ হয়, পাশাপাশি কষ্টও হয়। কষ্ট হয় এই কারণে যে জামাল নজরুল ইসলাম স্যার যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনার বক্তৃতা দিতেন – তখন সায়েন্স ফ্যাকাল্টির গ্যালারির তিন ভাগের একভাগও পূর্ণ হতো না। অথচ সায়েন্স ফ্যাকাল্টির যেকোনো একটা সাবজেক্টে ভর্তি হবার জন্য কী পরিমাণ যুদ্ধ সবাই করে। 

সে যাই হোক, মূল কথায় আসি। রিচার্ড ডকিন্সের বক্তৃতা শুনতে গিয়েছিলাম। টিকেট কেনার সময় বেশ মজাই লাগছিল এই কারণে যে মেলবোর্নে অমিতাভ বচ্চনের বক্তৃতা শোনার জন্য যত ডলারের টিকেট লেগেছিল – রিচার্ড ডকিন্সের জন্য লাগলো তার দ্বিগুণেরও বেশি। 

রিচার্ড ডকিন্সকে পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় বিবর্তন-জীববিজ্ঞানী বলা যায়। এই বিরাশি বছর বয়সেও পৃথিবীর এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে – লন্ডন – কানাডা – আমেরিকা – অস্ট্রেলিয়া - নিউজিল্যান্ড – দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই বিশ্বের কোনো না কোনো শহরে তাঁর বিজ্ঞানবক্তৃতা থাকে। প্রতিটি বক্তৃতার জন্য তিনি পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লাখ ডলার পর্যন্ত সম্মানী নেন। টিকেটের মূল্য থেকে এত আয় হয় যে আয়োজকদের গায়েই লাগে না। সাম্প্রদায়িকতামুক্ত যুক্তিবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রিচার্ড  ডকিন্স একটি ফাউন্ডেশান প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর প্রকাশিত বইগুলির রয়্যালটি এবং বিজ্ঞান-বক্তৃতা থেকে তিনি প্রতি বছর যে কয়েক মিলিয়ন ডলারের উপরে উপার্জন করেন তার পুরোটাই এই ফাউন্ডেশানে দিয়ে দেন। 




ভেবেছিলাম তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ঝাঁঝালো ধর্মবিরোধী বক্তৃতা দেবেন তিনি। কিন্তু প্রোগ্রামের ফরম্যাট ছিল কথোপকথন। অস্ট্রেলিয়ান বংশোদ্ভূত আরেকজন পৃথিবীবিখ্যাত দার্শনিক প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োএথিক্সের অধ্যাপক পিটার সিঙ্গার এবং রিচার্ড ডকিন্সের কথোপকথন। পিটার সিঙ্গারের দর্শনের সবকিছুর সাথে আমি পুরোপুরি একমত না হলেও কিছু কিছু ব্যাপারে ভীষণ একমত। তিনি কম কাজে বেশি ইমপ্যাক্টে বিশ্বাসী। যেমন একজন অন্ধ মানুষকে একটি গাইড ডগ দিতে  – গাইড ডগের ট্রেনিংসহ সবকিছু মিলিয়ে কমপক্ষে চল্লিশ হাজার ডলার খরচ হয়। সেক্ষেত্রে চল্লিশ হাজার ডলার দিয়ে শুধুমাত্র একজন অন্ধ মানুষকে সহায়তা করা যায়। অথচ যদি অন্ধদের চোখ পরীক্ষা করে বোঝা যায় যে অপারেশান করলে চোখ ভালো হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে তাহলে চল্লিশ হাজার ডলার দিয়ে এরকম বিশ জন মানুষের চোখ ভালো করে দেয়া যায়। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও মানুষের জন্য করতে চাইলে অনেক কিছু করা যায়। অথচ আমরা এরকমও দেখি – আর্তজনকে দশ হাজার টাকা দেয়ার জন্য লাখ টাকা খরচ করে অনুষ্ঠান করা হয়, অতিথিদের বহুমূল্য ক্রেস্ট দেয়া হয়, লম্বা লম্বা বক্তৃতা দেয়া হয়। 

পিটার সিঙ্গার আর রিচার্ড ডকিন্স ঘন্টাখানেক কথা বললেন মানুষের বিভিন্ন মানবিক গুণাবলির উৎকর্ষ সাধনে কী কী করা যায় সেসব নিয়ে। দর্শকদের মধ্যে তরুণদের সংখ্যা বেশি। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ তৈরি করতে পারা যে সভ্যতার লক্ষণ, এবং সেক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যে একটা বিরাট দায়িত্ব থাকে – তা অনস্বীকার্য। 

আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি কি সেই দায়িত্ব পালন করতে পারছে? মোসায়েবি করা কি জ্ঞানের পর্যায়ে পড়ে? 


Wednesday, 24 May 2023

ট্রানজিস্টরের মহাগুরু - উইলিয়াম শকলি

 



একবিংশ শতাব্দীতে আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে রয়েছে প্রযুক্তি। যে আধুনিক প্রযুক্তি আমরা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছি – তা হলো তথ্যপ্রযুক্তি। আমাদের প্রায় সব কাজই এখন কোনো না কোনোভাবে কম্পিউটারনির্ভর। ১৯৪৫ সালে যখন প্রথম কম্পিউটার এনিয়াক (ENIAC – Electronic Numerical Integrator and Computer) তৈরি হয় – তখন তাতে ব্যবহার করা হয়েছিল হাজার হাজার ভ্যাকুয়াম টিউব। তখন একটি কম্পিউটারের জন্য জায়গা লাগতো কমপক্ষে ৫০ ফুট বাই ৩০ ফুট। সেই সময় কেউ ভাবতেও পারেনি যে একদিন কম্পিউটার চলে আসবে আক্ষরিক অর্থেই মানুষের হাতের মুঠোয়। আজ এই ২০২৩ সালে পৃথিবীর আট শ কোটি মানুষের হাতে রয়েছে চৌদ্দ শ কোটি স্মার্ট ফোন। ইলেকট্রনিকসের যে উদ্ভাবনের ফলে বিশাল শিল্প-বিপ্লব ঘটে গেছে পৃথিবীজুড়ে – তার মূলে আছে ট্রানজিস্টরের উদ্ভাবন। প্রযুক্তির ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিন হিসেবে চিহ্নিত করা হয় ১৯৪৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর – যেদিন আমেরিকার বেল টেলিফোন ল্যাবরেটরিতে তৈরি হয়েছিল প্রথম ট্রানজিস্টর। 

এই ট্রানজিস্টর আবিষ্কারের জন্য ১৯৫৬ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পান বেল ল্যাবরেটরির তিনজন বিজ্ঞানী – জন বার্ডিন, ওয়াল্টার ব্র্যাটেইন এবং উইলিয়াম শকলি। ট্রানজিস্টরের উদ্ভাবনকে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন হিসেবে চিহ্নিত করা হয় – কারণ তথ্যপ্রযুক্তির যে বিপুল উন্নতি আজ ঘটেছে পৃথিবীতে তার মূলে রয়েছে ট্রানজিস্টর। ট্রানজিস্টরকে ইলেকট্রনিক যুগের “নার্ভ সেল” বা স্নায়ুকোষের সাথে তুলনা করা হয় । উইলিয়াম শকলি বেল ল্যাবরেটরির রিসার্চ গ্রুপের প্রধান হওয়া সত্ত্বেও বার্ডিন ও ব্র্যাটেইনের কাজের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। ফলে বেল ল্যাবরেটরির প্রথম ট্রানজিস্টরের প্যাটেন্ট নেয়া হয়েছিল জন বার্ডিন ও ওয়াল্টার ব্র্যাটেইনের নামে। কিন্তু তাতে ভীষণ রেগে যান উইলিয়াম শকলি। তিনি নিজেই আরো উন্নত একটি ট্রানজিস্টরের প্যাটেন্ট নিয়ে প্রমাণ করেন যে বার্ডিন ও র‍্যাটেইন যদি ট্রানজিস্টরের গুরু হন, তাহলে শকলি হলেন ট্রানজিস্টরের মহাগুরু। এই উইলিয়াম শকলির হাতেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ট্রানজিস্টর তৈরির প্রথম কারখানা – যা পরবর্তীতে পথ দেখায় সিলিকন ভ্যালির। বিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তির ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবকদের একজন হিসেবে উইলিয়াম শকলি একদিকে ছিলেন ভীষণ নন্দিত, আবার অন্যদিকে তাঁর ব্যক্তিগত উন্নাসিক স্বভাব আর সাম্প্রদায়িক বর্ণবাদী মনোভাবের কারণে হয়ে পড়েছিলেন ভীষণ নিন্দিত। আজকের কাহিনি উইলিয়াম শকলির কাহিনি। 

উইলিয়াম ব্র্যাডফোর্ড শকলির জন্ম ১৯১০ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্যের লন্ডনে। তাঁর আমেরিকান বাবা-মা তখন কাজের সূত্রে লন্ডনে বাস করছিলেন। বাবা উইলিয়াম হিলম্যান শকলি ছিলেন মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার, আর মা মে শকলি ছিলেন খনিজসম্পদ জরিপের প্রধান। মা-বাবা দু’জনই উচ্চশিক্ষিত এবং উচ্চপদে কর্মরত থাকার সুবাদে এবং একমাত্র সন্তান হওয়াতে ছোটবেলা থেকেই বিশেষ জ্ঞান এবং আভিজাত্যের ভেতর দিয়ে মানুষ হয়েছেন উইলিয়াম শকলি। তাঁর তিন বছর বয়সে ১৯১৩ সালে তিনি মা-বাবার সাথে ফিরে আসেন আমেরিকায় - ক্যালিফোর্নিয়ার পালো আল্টোয়। তাঁদের প্রতিবেশী ছিলেন স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ফিজিক্সের প্রফেসর পার্লি রস। প্রফেসর রস শকলিকে খুবই স্নেহ করতেন। তাঁর প্রভাবেই শকলি ছোটবেলা থেকেই পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন। 

শকলির মা-বাবা নিজেরাই বাড়িতে প্রাথমিক শিক্ষা দেন শকলিকে। তারপর তাকে ভর্তি করানো হয় পালো আল্টো মিলিটারি একাডেমিতে। এরপর হলিউড হাইস্কুলে। ১৯২৭ সালে স্কুল শেষ করে ভর্তি হলেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া লস এঞ্জেলেসে। এক বছর এখানে পড়ার পর চলে গেলেন ক্যালিফোর্নিয়া ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি – ক্যালটেকে। সেখান থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন ১৯৩২ সালে। স্নাতকের রেজাল্টের ভিত্তিতে এমআইটির টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ লাভ করেন শকলি। সোডিয়াম ক্লোরাইডের কৃস্টালে ইলেকট্রনের ওয়েভ ফাংশান সংক্রান্ত গবেষণা করে এমআইটি থেকে পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি অর্জন করেন ১৯৩৬ সালে।

সলিড স্টেট ফিজিক্সে ভীষণ দক্ষতা ছিল শকলির। পিএইচডি লাভের সঙ্গে সঙ্গেই চাকরি পেয়ে গেলেন বেল টেলিফোন ল্যাবরেটরিতে। সেই সময় টেলিফোন প্রযুক্তি খুব একটা শক্তিশালী ছিল না। ট্রান্সমিটার ও রিসিভারে ব্যবহার করা হতো বড় বড় ভ্যাকুয়াম টিউব। টেলিফোনের তার দিয়ে হাজার দেড় হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে শব্দ পাঠাতে গেলে শব্দের মান খুব কমে যেতো, নয়েজ বেড়ে গিয়ে আসল শব্দের কিছুই শোনা যেতো না। বেল টেলিফোন ল্যাবরেটরিতে উইলিয়াম শকলির প্রথম গবেষণা প্রকল্প হলো – আরো উন্নত মানের ভ্যাকুয়াম টিউব উদ্ভাবন করা যাদের সাহায্যে শব্দের প্রাবল্য বাড়ানো সম্ভব হবে।

সলিড স্টেট সেমিকন্ডাক্টরের তত্ত্বকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করলেন শকলি। কিন্তু তখনো জার্মেনিয়াম কিংবা সিলিকনের মতো সেমিকন্ডাক্টর সহজে ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠেনি। ১৯৩৯ সালে শকলি ফিল্ড ইফেক্ট ট্রানজিস্টরের তত্ত্ব দেন এবং ল্যাবরেটরিতে তৈরি করার চেষ্টা করেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল ভ্যাকুয়াম টিউবের বদলে ট্রানজিস্টর ব্যবহার করে টেলিফোন সিস্টেমের ব্যাপক উন্নতি ঘটানো। কিন্তু সে পরিকল্পনা কার্যকর হবার আগেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বেল ল্যাবরেটরি আমেরিকান মিলিটারির হয়ে অনেকগুলি প্রজেক্টে গবেষণা করে। রাডারের যন্ত্রপাতির ইলেকট্রনিক ডিজাইনের দায়িত্ব পড়ে উইলিয়াম শকলির উপর। ১৯৪২ সালে তিনি আমেরিকান নৌবাহিনীর অ্যান্টিসাবমেরিন অপারেশান রিসার্চ গ্রুপের ডিরেক্টর নিযুক্ত হন। তাঁর তত্ত্বাবধানে আমেরিকান নৌবাহিনী সাবমেরিন ধ্বংস করার অনেক কার্যকর পদ্ধতি উদ্ভাবন করে। ১৯৪৪ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি আমেরিকান সরকারের যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। উইলিয়াম শকলি নতুন নতুন যুদ্ধকৌশল উদ্ভাবন করে খুব আনন্দ পেতেন। 

যুদ্ধশেষে আবার বেল ল্যাবে ফিরে এলেন উইলিয়াম শকলি। ল্যাবের প্রেসিডেন্ট মারভিন কেলি সেমিকন্ডাক্টর ফিজিক্স ভালোভাবে বোঝার জন্য একটি রিসার্চ গ্রুপ তৈরি করলেন। ইলেকট্রনিক্সে সেমিকন্ডাক্টরের ব্যবহারের সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছিল তখন। সিলিকন ক্রিস্টালের অদ্ভুত কিছু ধর্ম সেই সময় আবিষ্কৃত হয়েছে। সেগুলির তত্ত্ব তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। উইলিয়াম শকলি রিসার্চ গ্রুপের সুপারভাইজার নিযুক্ত হলেন। তিনি বেছে বেছে উদীয়মান পদার্থবিজ্ঞানীদের নিয়ে এলেন নিজের গ্রুপে। জন বার্ডিন, ওয়াল্টার ব্র্যাটেইন , জেরাল্ড পিয়ারসন, মরগান স্পার্কস – প্রমুখ তরুণ বিজ্ঞানীদের নিয়ে এসেছিলেন তিনি তাঁর রিসার্চ গ্রুপে। 

সলিড স্টেট ফিজিক্সে কোয়ান্টাম তত্ত্বের প্রয়োগ তখন শুরু হচ্ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় উইলিয়াম শকলি রাডারের ডিটেক্টর হিসেবে জার্মেনিয়াম ও সিলিকন পয়েন্ট কন্টাক্ট ডিটেক্টর ব্যবহার করেছিলেন। এবার তিনি একইভাবে ফিল্ড ইফেক্ট ট্রানজিস্টর উদ্ভাবন করার চেষ্টা করলেন। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের হিসেব অনুসারে জার্মেনিয়াম ফিলামেন্টে বিদ্যুৎপ্রবাহ চালনা করলে ভ্যাকুয়াম টিউবের গ্রিডের মতো বিদ্যুৎ প্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হবার কথা। কিন্তু উইলিয়াম শকলি পরীক্ষাগারে আশানুরূপ ফল পেলেন না। শুধু তাই নয়, কেন আশানুরূপ ফল পাচ্ছেন না তার কোন বিশ্বাসযোগ্য কারণও খুঁজে পেলেন না। 
 
শকলির পরীক্ষণের ব্যর্থতা থেকে  নতুন ধারণা পেলেন জন বার্ডিন। বার্ডিনের ব্যাখ্যা ছিল এরকম – জার্মেনিয়াম সেমিকন্ডাক্টরে বিদ্যুৎপ্রবাহ চালনা করলে এর উপরিতলে কিছু ইলেকট্রন আটকে থাকে। এই আটকে থাকা ইলেকট্রনের কারণে বিদ্যুৎক্ষেত্রের মধ্যে রাখলেও ইলেকট্রন আর সেমিকন্ডাক্টর ক্রিস্টালে প্রবেশ করতে পারে না। এই ধারণার সত্যতা পরীক্ষা করে দেখার জন্য অনেকগুলি পরীক্ষণ ডিজাইন করা হলো বেল ল্যাবে। জন বার্ডিন আর ওয়াল্টার ব্র্যাটেইন এই পরীক্ষণগুলি করলেও উইলিয়াম শকলি সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। বার্ডিন ও ব্র্যাটেইন উদ্ভাবন করলেন প্রথম পয়েন্ট কন্টাক্ট ট্রানজিস্টর। 

উইলিয়াম শকলি যেমন প্রতিভাবান ছিলেন, তেমনি ভীষণ রকমের প্রশংসাপ্রিয় ছিলেন। যে কোনো কিছুতেই তিনি নিজের কৃতিত্ব দাবি করতেন। তাঁর রিসার্চ গ্রুপ থেকে প্রথম ট্রানজিস্টর উদ্ভাবিত হয়েছে – অথচ তার কৃতিত্বের ভাগ তিনি পাবেন না তা তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না। ট্রানজিস্টরের প্যাটেন্ট বার্ডিন ও ব্র্যাটেইনের নামে হবার পর সেটার পরীক্ষামূলক ব্যবহার যখন শুরু হলো তখন উইলিয়াম শকলি উদ্ভাবন করলেন জাংশান ট্রানজিস্টর। সেই ট্রানজিস্টরের প্যাটেন্ট পেলেন তিনি। 

১৯৫০ সালে উইলিয়াম শকলি লিখলেন তাঁর প্রথম বই ‘ইলেকট্রনস অ্যান্ড হোল্‌স ইন সেমিকন্ডাক্টরস’। এই বইটি সেই সময়ের সলিড স্টেট গবেষকরা বাইবেলের মতো ব্যবহার করতেন। ১৯৫১ সাল থেকে শুরু হলো ট্রানজিস্টরের উৎপাদন। ইলেকট্রনিক্সের জগতে বিপ্লব শুরু হয়ে গেল। 

এই বিপ্লবের অন্যতম নায়ক উইলিয়াম শকলি তাতে সন্দেহ ছিল না কারোরই। নিত্যনতুন বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানী ধারণায় ভরপুর ছিলেন শকলি। প্রতি সপ্তাহে তিনি মিটিং ডেকে নতুন নতুন গবেষণার ফলাফল ঘোষণা করতেন। তিনি উৎসাহে টইটুম্বুর থাকতেন সবসময়।  উদ্ভাবক হিসেবে তিনি ছিলেন অসাধারণ। নব্বইটির বেশি প্যাটেন্ট লাভ করেছিলেন তিনি। ১৯৫১ সালে মাত্র ৪১ বছর বয়সে তিনি আমেরিকার ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সের ফেলো মনোনীত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন সেই সময়ের সর্বকনিষ্ঠ ফেলো। 

গবেষণার বাইরে আরো অনেক বিষয়ে উৎসাহ ছিল তাঁর। জাদু দেখাতে পছন্দ করতেন, খাড়া দেয়াল বেয়ে উঠার নেশা ছিল তাঁর। প্রচন্ড বেগে গাড়ি চালাতেন। গাড়িতে পিস্তল রাখতেন। সিনেমা দেখতেন এবং নিজেকে সিনেমার নায়ক ভাবতেন। নিজের ব্যাপারে এতটাই উচ্চধারণা পোষণ করতেন যে, বেশিরভাগ সময়েই তিনি তাঁর অধীনস্তদের কোন মতামতের দাম দিতেন না। এ নিয়ে বেল ল্যাবের বিজ্ঞানীদের সাথে মনোমালিন্য শুরু হয়ে গেলে তাঁর পক্ষে আর বেল ল্যাবে থাকা সহজ হলো না। 

১৯৫৫ সালে উইলিয়াম শকলি স্ট্যানফোর্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে স্থাপন করলেন নিজের কোম্পানি ‘শকলি সেমিকন্ডাক্টর ল্যাবরেটরিজ’। বেকম্যান ইন্সট্রমেন্ট কোম্পানি তাঁকে কারখানা স্থাপনের অর্থ জুগিয়েছিল। শকলির কোম্পানি ছিল পৃথিবীর প্রথম সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানি। সেদিন কেউই ভাবতে পারেনি যে একদিন এই পথেই ঘটে যাবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শিল্প-বিপ্লব, এখানেই গড়ে উঠবে সিলিকন ভ্যালি। শকলির পরিকল্পনা ছিল উন্নতমানের গবেষণার পাশাপাশি প্রচুর সিলিকন ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী উৎপাদন করা। ১৯৫৬ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পাবার পর একেবারে প্রথম সারির বিজ্ঞানীদের দলে উঠে এলেন শকলি। তবুও শেষরক্ষা হলো না। 

শকলি যতটা দক্ষ বিজ্ঞানী ছিলেন, ততটাই অদক্ষ ব্যবসায়ী ছিলেন। তাঁর ব্যক্তিগত দুর্ব্যবহার ও অদক্ষতার কারণে কয়েক বছরের মধ্যেই তাঁর কোম্পানি থেকে তাঁর বেশিরভাগ বিজ্ঞানী বের হয়ে গেলেন। শকলির কোম্পানি থেকে বের হয়ে তাঁরা নিজেরা প্রতিষ্ঠা করলেন ফেয়ারচাইল্ড সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানি। পরবর্তী বিশ বছরের মধ্যে এখান থেকেই তৈরি হয় ইন্টেল কর্পোরেশন, এডভান্সড মাইক্রো ডিভাইসেস (এ এম ডি) ইত্যাদি বিশাল শিল্পগোষ্ঠী। 

দক্ষ ইঞ্জিনিয়ারদের হারিয়ে উইলিয়াম শকলির পক্ষে আর কারখানা চালানো সম্ভব হলো না। কয়েক বছরের মধ্যেই কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেল। ১৯৬৩ সালে উইলিয়াম শকলি স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে যোগ দিলেন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর প্রফেসর হিসেবে। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে অধ্যাপনা করেছেন। 
কিন্তু তাঁর পেশাগত জীবনের শেষের দিকে তিনি বৈজ্ঞানিক গবেষণার বদলে তাঁর নিজস্ব কিছু উগ্র সাম্প্রদায়িক মতবাদ প্রতিষ্ঠার দিকে ঝুঁকে পড়লেন। তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষের মেধা এবং সক্ষমতার জন্য পরিবেশ ও সুযোগের চেয়েও বেশি দায়ী জন্মগত উত্তরাধিকার। তিনি প্রকাশ্যে বলতে শুরু করেন – কৃষ্ণাঙ্গদের আই-কিউ অনেক কম, তারা আরো কম আই-কিউ সম্পন্ন শিশুর জন্ম দিচ্ছে। তাদেরকে সুযোগ সুবিধা দিলে সমাজের কোন উন্নতি হবে না, বরং সমাজ দ্রুত মেধাহীন হয়ে যাবে। 

তাঁর এরকম স্বভাবের কারণে দ্রুতই তিনি বন্ধুহীন হয়ে যেতে শুরু করলেন। তাঁর বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতিগুলি ম্লান হয়ে যেতে লাগলো। ১৯৩৩ সালে তিনি বিয়ে করেছিলেন জিন বেইলিকে। দুই ছেলে ও এক মেয়ে তাঁদের। ১৯৫৫ সালে জিনকে ডিভোর্স দিয়ে তিনি আবার বিয়ে করেছিলেন এমি ল্যানিং-কে। জীবনের শেষের দিকে তাঁর ছেলেমেয়েরাও তাঁর সাথে ছিল না। কিন্তু যতই তিনি সমালোচিত হচ্ছিলেন ততই বেপরোয়া হয়ে উঠছিলেন। তাঁর সাম্প্রদায়িক মতবাদকে নাৎসিদের মতবাদের সাথে তুলনা করে ১৯৮০ সালে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল ‘আটলান্টা কনস্টিটিউশন’। শকলি এই পত্রিকার বিরুদ্ধে আদালতে সোয়া মিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ দাবি করে মানহানির মামলা করেছিলেন। আদালত শকলির পক্ষে রায় দিয়ে মাত্র এক ডলার ক্ষতিপূরণ দেয়ার আদেশ দিয়েছিল। ১৯৮২ সালে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার সিনেটর হবার জন্য নির্বাচনে দাঁড়িয়ে আটজনের মধ্যে অষ্টম হয়েছিলেন। ১৯৮৯ সালের ১২ আগস্ট তাঁর মৃত্যু হয় ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের বাড়িতে একা। 


তথ্যসূত্র
১। জোয়েল এন শুরকিন, ব্রোকেন জিনিয়াস, পলগ্রেভ ম্যাকমিলান, লন্ডন ২০০৮।
২। বো লোজেক, হিস্ট্রি অব সেমিকন্ডাক্টর ইঞ্জিনিয়ারিং, স্প্রিঙ্গার, জার্মানি ২০০৭।
৩। রজার পিয়ারসন, শকলি অন ইউজেনিক্স অ্যান্ড রেইস, স্কট-টাউনসেন্ড পাবলিশার্স, ওয়াশিংটন ডিসি, ১৯৯২। 
৪। ওয়ার্ল্ড বুক্‌স বায়োগ্রাফিক্যাল এনসাইক্লোপিডিয়া অব সায়েন্টিস্টস, সপ্তম খন্ড, ওয়ার্ল্ড বুক, শিকাগো, ২০০৩। 
৫। www.nobelprize.org

--------------------

বিজ্ঞানচিন্তা মার্চ ২০২৩ সংখ্যায় প্রকাশিত





Latest Post

রাজকন্যে সবিতা

  আমার মা ছিলেন নিরক্ষর, বাবার পড়ালেখা চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত। লেখাপড়া করতে পারেননি বলে লেখাপড়ার প্রতি প্রচন্ড ভালোবাসা ছিল বাবার। তাই নিজের ...

Popular Posts