Wednesday, 26 August 2026

পাঠকের দিনলিপি ৩-ফেব্রুয়ারি-২০০৫

 



০৩০২২০০৫

প্রথম আলোর ২০০২ সালের ঈদসংখ্যা শেষ করলাম এতদিনে।

ইস্ট তিমুরের স্বাধীনতার জনক জানানা গুসমাওয়ের আত্মজীবনীমূলক বই ‘টু রেজিস্ট ইজ টু উইন’ এর সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর করেছেন মুনির রানা। সংগ্রামী জীবন গুসমাওয়ের। মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটিতে এসেছিলেন গুসমাও কয়েক বছর আগে। আমি তাঁর সে ভাষণ মিস করেছি। তবে জিনেট গিয়েছিলো সে অনুষ্ঠানে। সে বলেছে আমাকে গুসমাও সম্পর্কে। একজন নেতা হিসেবে যে সকল গুণাবলী থাকা

দরকার জানানা গুজমাওয়ের তা আছে। পর্তুগিজ উপনিবেশের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের আগে থেকেই ইস্ট তিমুর তাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছে। কাজও করেছে তার জন্য। কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার সরকার তা মানতে চায়নি একেবারে বাধ্য হবার আগ পর্যন্ত। লেখাটা ভালো লেগেছে। 

সৈয়দ শামসুল হকের উপন্যাস কাব্য ‘‘নুন ও জোছনার গল্প’’। উপন্যাস-কাব্য জিনিসটা নতুন আমার কাছে। কবিতার মতো করে লেখা উপন্যাস? ম্যাগাজিন সাইজের বারো পৃষ্ঠা সাকুল্যে। ঘটনায় খুব একটা বৈচিত্র কিছু নেই। কবি-সাংবাদিক শহীদ চৌধুরির স্ত্রী মায়মুনা চলে যায় একমাত্র ছেলে মোহিতকে রেখে। বিরহ। সীমান্তের কাছে ব্যবসা জমে ওঠে। চোরাচালানের সাথে দেহব্যবসা। পুষ্প নামে একজন সে ব্যবসা চালায়। একদিন শহীদ চৌধুরি সেখানে যান ছেলেকে নিয়ে। আর বোঝা যায় না। উপন্যাস কাব্য তো। বোঝার সাধ্য আমার নেই। সৈয়দ হক শক্তিমান প্রতিভাবান সব্যসাচী লেখক। তাঁর লেখা যে কোন কিছুই মনে হয় বিরাট কিছু। ‘মনে হয়’ - মানে সাবজেক্টিভ। যেমন ভ্যান গগ বা লিওনার্দো দা ভিঞ্চির হাত মোছা কাগজও হয়তো উন্নত মানের শিল্পকর্মের মর্যাদা পায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পান্ডুলিপির কাটাকুটি নিয়েও অনেকে গবেষণা করেছেন।

ইমদাদুল হক মিলনের উপন্যাস ‘কাঁচা বাঁশের পালকি’। খুব একটা ভালো লাগেনি। ইমদাদুল হক মিলনের খুব ভালো রচনা কিছু নিশ্চয় আছে। টেলিভিশনে তাঁর রোমান্টিক নাটকগুলো অনেকেই তো খুব আগ্রহ ভরে দেখে।

মশিউল আলমের ‘তনুশ্রীর সঙ্গে দ্বিতীয় রাত’ উপন্যাসের একটা লম্বা সমালোচনা লিখেছেন হাসান ফেরদৌস। বইয়ের সমালোচনা হলেও লেখাটা একটা উন্নত মানের প্রবন্ধ ‘স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নের সোভিয়েত ইউনিয়ন’। সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্তির পেছনে মিখাইল গর্বাচেভকে দায়ী করেন বেশির ভাগ সাবেক ও বর্তমান মস্কোপন্থী। হাসান ফেরদৌস গর্বাচেভের  ‘অন মাই কান্ট্রি এন্ড দি ওয়ার্লড’ বইয়েরও সমালোচনা করেছেন পাশাপাশি। মশিউলের উপন্যাসের নায়ক হাবিব বাংলাদেশ থেকে কমিউনিস্ট পার্টির বৃত্তি নিয়ে রাশিয়ায় পড়তে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার কয়েক বছর আগে। তনুশ্রীও সেখানে যায় ইন্ডিয়া থেকে। তনুশ্রী যাকে বলে রূপে গুণে অতুলনীয়া। হাবিব খুব সাদামাটা। তাছাড়া ধর্মীয় বিভাজন তো আছেই। তারপরও একরাতে তাদের মধ্যে ঝড়ের মত শারীরিক মিলন হয়ে যায়। হাবিবের মনে তনুশ্রীর জন্য আবেগ ভালোবাসা থাকলেও তনুশ্রীর মনে হাবিবের জন্য কিছুই নেই। বরং এ ঘটনার পরে প্রচন্ড ঘৃণার জন্ম হয়। কিন্তু তনুশ্রী কনসিভ করে। হাবিব খুশিতে নেচে ওঠে। কিন্তু তনুশ্রী চায় গর্ভপাত। এ ঘটনার পাশাপাশি তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়নের ঘটনাগুলো ঘটতে থাকে। মশিউলের বইটা পড়তে হবে।

হাসান ফেরদৌস সাবলিল ভাষায় ব্যাখ্যা করেছেন কেন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হলো। সমাজতান্ত্রিক নেতাদের মানে একনায়কদের হাতে কত মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। সোভিয়েত শাসনামলে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ফলে নিহত হয়েছে ২০ মিলিয়ন মানুষ। দুই কোটি মানুষ! আর সারা বিশ্বে কমিউনিস্ট সন্ত্রাসের ফলে নিহত হয়েছে একশ মিলিয়ন মানুষ (দশ কোটি মানুষ!) এ সংখ্যা যদি সত্য হয়, কমিউনিজমের বিশেষত্ব কী?

আমার নিজের কাছে ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য। আমেরিকায় থাকতে থাকতে হাসান ফেরদৌস কি আমেরিকানদের বুলি আওড়াচ্ছেন? হাসান ফেরদৌস নিজেও রাশিয়ায় পড়াশোনা করেছেন ছয় বছর। জানি না, আমি কনফিউজড এখানে।

সরদার ফজলুল করিমের প্রবন্ধ ‘একজন প্রাক্তন রাজবন্দীর ডায়রি’। ১৯৫০ সালে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে বন্দী ছিলেন সরদার স্যার। এতদিন পরে এই ডায়েরিটি অনেক হাত ঘুরে তাঁর হাতে এসে পৌছেছে।

অদিতি ফাল্গুনীর গল্প ‘সৌভাগ্যের রজনী’। শাবানের রুটির চাঁদে শাবানা নামে একজন মেয়ের কথা - যে ঘটনাচক্রে দেহব্যবসা করে জীবন চালায়। গল্পের কাঠামো পরীক্ষামূলক। অদিতি চেষ্টা করছেন ভালো গল্প লেখার। গল্প নিয়ে নানারকম কাজ করার। একটু হাসান আজিজুল হকের ছায়া পড়েছে বলে মনে হয়।

গোলাম মুরশিদের প্রবন্ধ ‘মহিলারা ইদানীং’। বাংলাদেশের মহিলাদের সামাজিক বিবর্তনের  একটা গঠনমূলক ব্যালেন্সড লেখা। ভালো লেগেছে।

শাহাদুজ্জামান তরুণ প্রজন্মের লেখকদের মধ্যে ভালো একটা স্থান করে নিয়েছেন। লন্ডন থেকে প্রকাশিত লিটারেচার ম্যাগাজিন ‘গ্রান্টা’য় প্রকাশিত একটা রচনার অনুবাদ বা রচনাশ্রিত লেখা ‘ভিনদেশী লেখকদের চোখে কিঞ্চিৎ আমেরিকা’ লিখেছেন। যাদের রচনা তিনি ব্যবহার করেছেন তাঁরা কেউই পরিচিত কোন লেখক নন। আমেরিকাকে তাঁরা দেখেছেন নিজেদের মত করে। তবে কোন লেখকই আমেরিকায় বাস করেন না। পুরো না জেনেই এঁরা আমেরিকাকে ঘৃণা করেন। এখানেই আমার সমস্যা। না জেনে ভালোবাসা গ্রহণযোগ্য হলেও ভালো করে না জেনে ঘৃণা করাটা উচিত নয় বলে মনে হয় আমার। অন্তত বেনিফিট অব ডাউটের কথা তো বিবেচনা করা যায়।

---------

কলম্বাস, ওহাইও

No comments:

Post a Comment

Latest Post

সিনেমাখোরের দিনলিপি ৩-ফেব্রুয়ারি-২০০৫

  সোফিয়া লরেন অস্কার পেয়েছিলেন ১৯৬২ সালের   দিকে। টু ওম্যান ছবিতে অভিনয়ের জন্য। ‘টু ওম্যান’ ছবিটা দেখলাম সম্প্রতি। বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ...

Popular Posts