Showing posts with label বই. Show all posts
Showing posts with label বই. Show all posts

Friday, 11 September 2026

রাজকন্যে সবিতা

 


আমার মা ছিলেন নিরক্ষর, বাবার পড়ালেখা চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত। লেখাপড়া করতে পারেননি বলে লেখাপড়ার প্রতি প্রচন্ড ভালোবাসা ছিল বাবার। তাই নিজের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করানোটাই ছিল তাঁর জীবনের প্রধান লক্ষ্য। আমাকে অক্ষরজ্ঞান দেবার যোগ্যতা ছিল না মায়ের, বাবার ছিল না সময়। আমার হাতেখড়ি আমার দিদি ও দাদার হাতে। তাদের হাত ধরে তাদের খাতাতেই আমার আঁকিবুঁকির

Wednesday, 26 August 2026

পাঠকের দিনলিপি ৩-ফেব্রুয়ারি-২০০৫

 



০৩০২২০০৫

প্রথম আলোর ২০০২ সালের ঈদসংখ্যা শেষ করলাম এতদিনে।

ইস্ট তিমুরের স্বাধীনতার জনক জানানা গুসমাওয়ের আত্মজীবনীমূলক বই ‘টু রেজিস্ট ইজ টু উইন’ এর সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর করেছেন মুনির রানা। সংগ্রামী জীবন গুসমাওয়ের। মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটিতে এসেছিলেন গুসমাও কয়েক বছর আগে। আমি তাঁর সে ভাষণ মিস করেছি। তবে জিনেট গিয়েছিলো সে অনুষ্ঠানে। সে বলেছে আমাকে গুসমাও সম্পর্কে। একজন নেতা হিসেবে যে সকল গুণাবলী থাকা

পাঠকের দিনলিপি ২৮-জানুয়ারি-২০০৫

 


২৮০১২০০৫

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র ‘লাল সালু’ ছাড়া হাতে গোনা আর কয়েকটি মাত্র রচনা বাংলায় আছে। সম্প্রতি তাঁর একটি অপ্রকাশিত ইংরেজি উপন্যাসের পান্ডুলিপি পাওয়া গেছে। ‘দি আগলি এশিয়ান’ নামে উপন্যাসটির বাংলা অনুবাদ করেছেন শিবব্রত বর্মন। 

‘‘কদর্য এশীয়’’ নামের এই রচনাটি বাংলা উপন্যাসের ক্ষেত্রে একটি অন্যরকম মাইল ফলক। কারণ এই উপন্যাসটি রাজনৈতিক উপন্যাস। এশিয়ার একটি দেশে - ধরা যাক - বাংলাদেশে আমেরিকার ইংগিতে

পাঠকের দিনলিপি ১৯-জানুয়ারি-২০০৫

 


১৯০১২০০৫

মৃদুভাষণে সনক রেজা আন্তর্জাতিক বিষয়ে লেখেন। এ সপ্তাহে লিখেছেন প্যালেস্টাইনে সাম্প্রতিক নির্বাচনে মাহমুদ আব্বাসের নির্বাচিত হবার কথা। ইয়াসির আরাফাতের মৃত্যুর পর প্যালেস্টাইনের নেতা নির্বাচনের জন্য একটা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মাহমুদ আব্বাস শতকরা ৬০ ভাগ ভোট পেয়ে জয়ী হন। দেখা যাক প্যালেস্টাইন সমস্যার কোন সমাধান হয় কিনা। সমস্যা সমাধানে সেরকম আগ্রহী

পাঠকের দিনলিপি ১৮-জানুয়ারি-২০০৫

 


১৮০১২০০৫

সা’দ উল্লাহ সাহেবের কলাম ইসলাম ও বর্তমান কলামে ১৪ জানুয়ারি সংখ্যায় লিখেছেন ‘‘বেহেস্ত বা স্বর্গের বর্ণনা সবই কি রূপক?’’ কোরান শরীফে ইহজাগতিক ভালো কাজের পুরষ্কার স্বরূপ মৃত্যুর পরে বেহেশতে জায়গা পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। সেখানে পুরুষদের জন্য নানারকম সুখের কথা বলা হয়েছে। যৌনসুখকে খুব প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। হুরী আর গিলমানের কথা বলা আছে। গিলমান হলো

পাঠকের দিনলিপি ৭-জানুয়ারি-২০০৫

 


০৭০১২০০৫

আবদুললাহ আবু সায়ীদের ‘‘ভালোবাসার সাম্পান’’ শেষ করলাম। কয়েকদিন একনাগাড়ে না হলেও নিয়মিত পড়েছি বইটা। ভালো লাগলো পঞ্চাশ ষাট আর সত্তর দশকের কবি সাহিত্যিকদের কথা। আবদুললাহ আবু সায়ীদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, মোহাম্মদ রফিক, নির্মলেন্দু গুণ, শহীদ কাদরী এঁদের কথা পড়ে বেশ লাগলো। কণ্ঠস্বর পত্রিকার কথাই এই বইয়ের বেশির ভাগ পৃষ্ঠা জুড়ে। বাংলাদেশের সাহিত্যে এঁদের অবদান অনেক। ভালো লেগেছে আবদুললাহ আবু সায়ীদের স্মৃতিচারণ মূলক এ বই।

Sunday, 26 April 2026

সন্দীপ রায়ের বাবা সত্যজিৎ রায়

 


সত্যজিৎ রায়ের জীবনদর্শনের নির্যাস সত্যজিৎ রায় নিজেই দিয়ে গেছেন তাঁর শেষ চলচ্চিত্র আগন্তুক-এ। ব্যক্তি মানুষের জীবদ্দশায় জীবনদর্শন বদলাতে পারে অনেকবার। আমরা অনেক বিখ্যাত মানুষের ভেতরই দেখেছি এরকম ঘটতে। যৌবনে নিখুঁত যুক্তিবাদী বার্ধ্যক্যে এসে অলৌকিক ধর্মের পায়ে আছড়ে পড়েছেন এরকম অহরহ দেখা যায়। মুক্তিযোদ্ধা রাজাকারে রূপান্তরিত হতেও দেখেছি অনেক। তাই একজন মানুষের সামগ্রিক জীবনদর্শন তাঁর জীবন শেষ হয়ে যাবার পরেই ঠিকমতো বিশ্লেষণ করা যায়।

Thursday, 23 April 2026

বিশ্ব গ্রন্থ এবং মেধাস্বত্ত্ব দিবস

 


২৩ এপ্রিল বিশ্বব্যাপী বেশ আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয় গ্রন্থ এবং মেধাস্বত্ত্ব দিবস। বইপড়ায় উদ্বুদ্ধ করা, প্রকাশনা শিল্পের উন্নয়ন, এবং লেখকদের মেধাস্বত্ত্ব সংরক্ষণের লক্ষ্যে ১৯৯৫ সালে ইউনেসকো প্রতিবছর ২৩ এপ্রিল সারাবিশ্বে বই এবং মেধাসত্ত্ব দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়।

২৩ এপ্রিলকে বই দিবস হিসেবে বেছে নেয়ার পেছনে স্পেনের অনেক দিনের পুরনো একটি ঐতিহ্য কাজ করেছে। সেখানে ২৩ এপ্রিল সেইন্ট জর্জ দিবস পালিত হয়ে আসছে অনেক অনেক বছর থেকে –

Sunday, 22 March 2026

তাবাসসুম নাজ - এর 'বিবাহ বিভ্রাট অথবা ভালোবাসা'

 



মলাটের পরিচিতি থেকে জানা গেলো তাবাসসুম নাজ প্রবাসী চিকিৎসক। বিনা চেষ্টায় লেখক হয়ে গেছেন পেন্সিল গ্রুপে লিখতে লিখতে। তাতে কোনো সমস্যা নেই। কে কীভাবে লেখক হলেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে লেখক হিসেবে বিশেষ কেউ হয়ে ওঠার পর।

এই উপন্যাসটির কাহিনি খুব বেশি সিনেমাটিক। অনেকটা সিনেমা দেখে উপন্যাস লেখার মতো। সেই অনেক কাল আগে সাদাকালোর যুগেই এরকম কাহিনির সিনেমা হয়ে গেছে।

আশির আহমেদ - এর 'সোরাকাশ'

 


আশির আহমেদ-এর লেখা এই বইটি পড়ার আগে পড়িনি। তবে আশির আহমেদ নামটি বেশি পরিচিত। লেখক হিসেবে না হলেও – অন্য একটি কারণে তিনি বাংলাদেশের অনেকের কাছেই পরিচিত। জাপানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তিনি অনেকগুলি বই লিখে ফেলেছেন বলেও শুনেছি। তবে এখনো সেই বইগুলি পড়া হয়ে ওঠেনি।

Thursday, 19 March 2026

নিউটনের প্রিন্সিপিয়া: মহাবিশ্বের মহাগ্রন্থ

 


কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত গবেষণাগ্রন্থগুলির মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বই “থ্রি হানড্রেড ইয়ারস অব গ্র্যাভিটেশান” প্রকাশিত হয়েছে ১৯৮৭ সালে। বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং এবং ওয়ারনার ইসরায়েল এই বইটির সম্পাদনা করেছেন। এই বইটি বিজ্ঞানের ইতিহাসের অনন্য এক আবিষ্কারের স্বীকৃতি – যে আবিষ্কারের নাম “মহাকর্ষ”। ১৬৮৭ সালে স্যার আইজাক নিউটনের ‘প্রিন্সিপিয়া’ প্রকাশের ঠিক তিন শ বছর পর প্রকাশিত এই ‘মহাকর্ষের তিন শ বছর’ বইটি নিউটনের

Wednesday, 4 March 2026

ইমদাদুল হক মিলনের "প্রিয় হুমায়ূন আহমেদ"

 



বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করেছেন আরেকজন জনপ্রিয় লেখক ইমদাদুল হক মিলন। লেখাগুলি তিনি ধারাবাহিকভাবে লিখেছিলেন তাঁর সম্পাদিত পত্রিকায় – হুমায়ূন আহমেদ যখন শেষবার অসুস্থ হয়ে নিউইয়র্কের হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। বইতে বর্ণিত ঘটনাগুলি বাংলাদেশের পাঠকের জানা। এর অনেক ঘটনা হুমায়ূন আহমেদ নিজেই লিখেছেন তাঁর বিভিন্ন লেখায়।

Friday, 7 November 2025

টেরি ওয়াগ্যান এর ‘দ্য লিটল বুক অব কমন সেন্স’

 



ইংরেজিতে যেটাকে আমরা কমন সেন্স বলি সেটা আসলে খুব একটা কমন নয়। বই পড়ে যদি কমন সেন্স শেখা যেতো – তাহলে অনেক অনেক বই পড়ে বড় বড় পাস দেয়া মানুষের ভেতরও ওই বস্তুটার এত অভাব দেখা যেতো না। অনেক বছর আগে একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতাম। সেখানে আমার এক সহকর্মী শিক্ষকদের কমন রুমে সবার সামনে বসে নাকের লোম ছিঁড়তেন এবং ছিন্নলোম ফুঁ দিয়ে উড়াতেন। কমন রুমের কমন সেন্স!! তিনি কি বই কম পড়েছেন?

Wednesday, 20 August 2025

মুহম্মদ নিজাম-এর 'বেগানা পুষ্প'

 




বেগানা পুষ্প পড়তে শুরু করার আগেই চোখে পড়ে “সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ” – যেখানে লেখা আছে “অতীব ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল, মারাত্মকভাবে ১৮+, অনুগ্রহপূর্বক প্রাপ্ত বয়স্ক না-পাঠক এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক সুপাঠকের স্পর্শ থেকে এই গ্রন্থটি দূরে সরিয়ে রাখুন। অজাগর মন ও মগজের কুপ্রভাব থেকে বেগানা উপাখ্যানের স্বাস্থ্য রক্ষায় যত্নবান হোন। আদেশক্রমে, কর্তৃপক্ষ।“

ব্যাপারটি যে ভীষণ নতুন - তা নয়। শতাব্দী আগে আঠারো পেরিয়েছি। আমার নিজস্ব আঠারোর আগেই

Sunday, 22 June 2025

মুহম্মদ নিজাম-এর “ঝড় ও জনৈক চিন্তাবিদ”

 



মুহম্মদ নিজাম-এর চিন্তা-চেতনার সাথে আমার প্রথম পরিচয়, বলা যায় ঝটিকা পরিচয়, ঘটে ফেসবুকে তাঁর হ্রস্ব অথচ টাইফুনের শক্তিসম্পন্ন পোস্ট দেখে। ইতোমধ্যে অনেকগুলি গল্প, উপন্যাস লিখে সাড়া ফেলে দিয়েছেন এই তরুণ লেখক। তাঁর বইগুলি পড়ার জন্য এক ধরনের অস্থির তাগিদ অনুভব করছিলাম অনেকদিন থেকে।

 প্রবাসের পাঠকদের এখন আর আগের মতো খরায় কাটাতে হয় না। অনলাইনে এখন হাজার হাজার বই

Thursday, 20 March 2025

মহিউদ্দিন মোহাম্মদের 'আধুনিক গরু-রচনা সমগ্র'

 




বেশ কয়েকদিন ধরে একটানা পড়ে শেষ করলাম মহিউদ্দিন মোহাম্মদের পাঁচটি বই। কোনো একজন লেখকের প্রকাশিত ছয়টি বইয়ের মধ্যে পাঁচটি পড়ে ফেলা – কম কথা নয় আমার জন্য। বিশেষ করে যেখানে দীর্ঘদিন বাংলা পরিমন্ডলের বাইরে থাকলে – বাৎসরিক বইমেলা থেকে দূরে থাকতে হলে – বই তো দূরের কথা, বইয়ের খবরও যথাসময়ে এসে পৌঁছায় না। 

হিশেব করে দেখা যাচ্ছে এই লেখকের প্রথম বই প্রকাশিত হয়েছে ২০২২ সালে। কম সময়ের মধ্যেই

Friday, 10 January 2025

বিশ্বজিত সাহার "হুমায়ূন আহমেদের শেষ দিনগুলো"

 



বাংলাদেশের লেখকদের মধ্যে জনপ্রিয়তার শীর্ষে যে হুমায়ূন আহমেদের অবস্থান সে নিয়ে কারোরই কোন দ্বিমত নেই। ২০১২ সালে হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর আরো এক যুগ কেটে গেছে। এখনো হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি। তাঁর বই এখনো পাওয়া যাচ্ছে, এখনো মানুষ তাঁর বই পড়ছে। অবশ্য তাঁর নতুন প্রজন্মের কোন পাঠক তৈরি হয়েছে কি না আমি জানি না। কারণ আমাদের দেশের পাঠকদের মন এবং পাঠাভ্যাস নিয়ে নির্ভরযোগ্য তেমন কোনো গবেষণা হয় না।

২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হুমায়ূন আহমেদের ক্যান্সার শনাক্ত হবার পর যখন তিনি চিকিৎসার্থে আমেরিকায় গেলেন তখন থেকে প্রায় প্রতিদিনই তাঁর চিকিৎসার অগ্রগতি সম্পর্কে নানারকম সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশের প্রায় সবগুলি সংবাদপত্রে। হুমায়ূন আহমেদ নিজেও লিখেছেন তাঁর নিজের চিকিৎসা এবং অন্যান্য আনুসঙ্গিক প্রসঙ্গ নিয়ে নিয়মিত কলাম “নিউইয়র্কের আকাশে ঝকঝকে রোদ”সহ আরো অনেক লেখা। তাঁর লেখা এবং তাঁর সম্পর্কে খবরগুলি নিয়মিত পড়েছি অনলাইনে পাওয়া বাংলাদেশের সংবাদপত্রে।

২০১২ সালের ১৯ জুলাই যখন তাঁর মৃত্যু হলো – দুঃখে বুক ভেঙে গেছে তাঁর লক্ষ লক্ষ পাঠকের। হুমায়ূন আহমেদের কট্টর সমালোচকরাও কেউ তাঁর এরকম মৃত্যুতে অবিচল থাকতে পারেননি। এটাই স্বাভাবিক।

তাঁর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে বেশ কিছু অপ্রিয় বাদানুবাদ, আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে যা কিছুতেই অভিপ্রেত ছিল না। তাঁকে কোথায় কবর দেয়া হবে – তা নিয়েও হূমায়ূন আহমেদের পরিবারের ভেতরই মতভিন্নতা দেখা দিয়েছিল – এবং প্রচারমাধ্যম তা খুবই বিস্তারিতভাবে, অনেকক্ষেত্রে ফুলিয়ে ফাঁপিয়েও প্রচার করেছে। সর্বযূগে সর্বদেশে প্রচারমাধ্যমের ভূমিকা এরকমই।

নিউইয়র্কের মুক্তধারার মালিক বিশ্বজিত সাহার সাথে লেখক হুমায়ূন আহমেদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক অনেক বছরের। হুমায়ূন আহমেদের বই, নাটক, চলচিত্রের উত্তর আমেরিকার পরিবেশক মুক্তধারা। বিশ্বজিত সাহা হুমায়ূন আহমেদের চিকিৎসার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবসময়েই কাছে ছিলেন এবং আমেরিকায় হুমায়ূন আহমেদের চিকিৎসার ব্যাপারে ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ নিয়ে অনেক কিছু করেছেন। তাই ‘হুমায়ূন আহমেদের শেষ দিনগুলো’ সম্পর্কে স্বয়ং বিশ্বজিত সাহাই যখন একটি বই লিখলেন – তখন সেই বই সম্পর্কে পাঠকের আগ্রহ জন্মাবে সেটাই খুব স্বাভাবিক।

২০১৩ সালের বইমেলায় এই বই প্রকাশিত হবার পর সেটা নিয়ে হৈচৈ যেমন হয়েছে – তেমনি মেহের আফরোজ শাওনের সাথে বিশ্বজিত সাহার মনোমালিন্যও প্রকাশ্যে এসেছে। শাওন তথা মিসেস হুমায়ূন আহমেদ ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে বইটির প্রকাশককে উকিল নোটিশ পাঠান যেন বইটি বইমেলা থেকে প্রত্যাহার করে নেন এবং প্রচার ও বিক্রয় করা থেকে বিরত থাকেন। কিন্তু তাতেও কাজ না হলে পুলিশ পাঠিয়ে বইমেলা থেকে সেই বইয়ের অনেকগুলি কপি বাজেয়াপ্ত করান। তাতে বইয়ের কাটতি অনেক বেড়ে যায়। সেই সময় বিশ্বজিত সাহা ইত্তেফাক পত্রিকায় এবং আরো কয়েকটি পত্রিকায় হুমায়ূন আহমেদের শেষের দিনগুলি সম্পর্কে বেশ কয়েকটি লেখা লিখেছিলেন। সেইসময় সেগুলিও পড়েছিলাম।

এতবছর পর ‘হূমায়ূন আহমেদের শেষ দিনগুলো’ পড়ে আবারো মনে হলো হুমায়ূন আহমেদের মতো মানুষের শেষ দিনগুলি বিশেষ করে শেষের এক মাস ভীষণ যন্ত্রণাময় ছিল। এই যন্ত্রণা তাঁর পাবার কথা ছিল না।

হুমায়ূন আহমেদের মা আয়েশা ফয়েজের জন্য পুত্রশোক সহ্য করা ভীষণ কঠিন ছিল। অসহনীয় শোকের মধ্যেও তিনি কয়েক লাইনের একটি মন্তব্য করেছেন এই বইটি সম্পর্কে যে তিনি এই বইটি পড়ার জন্য আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন, কারণ বিশ্বজিত সাহা হুমায়ূন আহমেদের চিকিৎসার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হুমায়ূন আহমেদের কাছে ছিলেন।

লেখক আয়েশা ফয়েজের এই কথাগুলি খুবই গুরুত্বের সাথে বইয়ে সংযুক্ত করেছেন ভূমিকারও আগে প্রাক-ভূমিকা হিসেবে। আমার মনে হয়েছে লেখক এর মাধ্যমে প্রমাণ করতে চেয়েছেন এই বইয়ের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত। লেখক নিজের ভুমিকাতেও উল্লেখ করেছেন আরো অনেক লেখকের এই বিষয়ে অনেক লেখা এবং বই প্রকাশের কথা। সেসব লেখার চেয়েও তাঁর নিজের লেখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং বিশ্বাসযোগ্য এটা প্রমাণের জন্য লেখক পুরো বইতে ডিটেলস এর প্রতি এত বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন – যেমন ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন, ওষুধের নাম, সময়, হাসপাতালের ডিটেলস – যা বইটিকে করে তুলেছে অনেকটাই ফ্যাক্ট ফাইল এর সংকলন।

হুমায়ূন আহমেদের ব্যক্তিগত অভ্যাস থেকে শুরু করে তাঁর পরিচিত, ভক্ত, বন্ধুবান্ধব, হিতৈষীদের অনেকের – বিশেষ করে যারা প্রবাসে সেই সময়ে হুমায়ূন আহমেদের চিকিৎসা ব্যবস্থায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছেন সবার কথা উঠে এসেছে।

লেখকের নিজের ভূমিকা এবং তাঁর স্ত্রী রুমা সাহার কথা স্বাভাবিকভাবেই এসেছে প্রতিটি অধ্যায়ে কারণ হুমায়ূন আহমেদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে বিশ্বজিত সাহা যতটুকু ভূমিকা রেখেছেন, প্রতিদিন হাসপাতালে যাওয়া, হুমায়ূন আহমেদের শিশুপুত্রদের দেখাশোনা করা, মেহের আফরোজ শাওনকে সঙ্গ এবং সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া সবই করেছেন রুমা সাহা।

প্রবাসী লেখক এবং বিজ্ঞানী পূরবী বসুও অনেক কিছু করেছেন হুমায়ূন আহমেদের চিকিৎসার বন্দোবস্ত করার ব্যাপারে।

আমেরিকায় ক্যান্সার চিকিৎসার খরচ অনেক। মুক্তধারার মাধ্যমে চিকিৎসার বেশিরভাগ খরচ স্পন্সর করেছেন বিশ্বজিত সাহা। তিনি কম খরচে চিকিৎসা যেন হয় সেজন্য হুমায়ূন আহমেদকে একটি মেডিক-এইড কার্ডেরও ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এই কার্ড সাধারণত আমেরিকার স্বল্প-আয়ের মানুষদের জন্য ফেডারেল সরকারের স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্পের অধীনে আমেরিকানদের দেয়া হয়। যদিও কার্ডটি দেয়া হয়েছে চিকিৎসার মাঝামাঝি সময়ে – তারপরও অনেক হাজার ডলার খরচ হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারও বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকের জন্য যা যা করা সম্ভব সব করেছে। হুমায়ূন আহমেদকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে অবৈতনিক একটি পদ দেয়া হয়েছিল – যেন যতদিন দরকার হয় তিনি আমেরিকায় থাকতে পারেন, আমেরিকার বাংলাদেশ দূতাবাসের সুযোগ-সুবিধা দরকার হলে নিতে পারেন। অনেক সময় বেশ কিছু সুযোগ সুবিধা নিয়েছেনও তিনি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হুমায়ূন আহমেদকে দেখতে গিয়েছিলেন তাঁর নিউইয়র্কের বাসায়। অর্থ সহায়তাও দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ অর্থ সাহায্য নেননি।

২০১১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১২ সালের জুন পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ের সাথে বাস্তববাদী হুমায়ূন আহমেদ ভালোভাবেই মানিয়ে নিয়েছিলেন। তিনি সেইসব দিনগুলি নিয়ে বই লিখেছেন। নিয়মিত রসিকতা করেছেন। ছবি এঁকেছেন। তাঁর আঁকা ছবির ফ্রেম করেছেন লেখকের স্ত্রী রুমা সাহা। নিউইয়র্কে হুমায়ূন আহমেদের আঁকা ছবির প্রথম প্রদর্শনীও হয়েছে। শুরুতে পরিকল্পনা ছিল ছবি বিক্রি করে চিকিৎসার খরচ ওঠানো হবে। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত বদলান। তিনি ছবির প্রদর্শনী করতে রাজি হলেও বিক্রি করতে রাজি হননি।

২০১২ সালের জুন মাসের ১৯ তারিখ সকাল আটটায় সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে হুমায়ূন আহমেদ হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরেন। পরবর্তী ফলো আপের তারিখ দেয়া হয়েছিল ১৫ আগস্ট। কিন্তু দুদিনের মধ্যেই ঘটে যায় ভয়ংকর ঘটনা এবং ঘটনা কিছুটা রহস্যময়ও হয়ে ওঠে।

১৯ তারিখ রাতেই নাকি হুমায়ূন আহমেদের নিউইয়র্কের বাসায় পার্টি হয়, সেখানে ঠিক কী কী হয় জানা যায় না। হুমায়ূন আহমেদ নাকি চেয়ার থেকে পড়ে যান, যদিও সেটা গোপন রাখার চেষ্টা করা হয়েছে বলে লেখক দাবি করেছেন। গোপন করেছেন মিসেস হুমায়ূন আহমেদ এবং প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম।

বিশ্বজিত সাহাকে খবর দেয়া হয় দুদিন পর – যখন হুমায়ূন আহমেদকে জ্যামাইকা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পরপর অনেকগুলি অপারেশন করাতে হয়। ডাক্তাররা শনাক্ত করেছেন হয়তো পড়ে গিয়ে আগের অপারেশনের সেলাই ছিড়ে যায়। কিন্তু সাথে সাথে হাসপাতালে না নিয়ে গিয়ে পুরো একদিন বাসায় রেখে দেয়াতে তাতে ইন্টারন্যাল হেমারেজ হয় এবং ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করে।

জুনের ২০ তারিখ থেকে জুলাইর ১২তারিখ পর্যন্ত অনেকগুলি অপারেশন, লাইফ সাপোর্ট এবং আমেরিকার হাসপাতালের সর্বোচ্চ চেষ্টাতেও বাঁচানো যায়নি হুমায়ূন আহমেদকে।

লেখকের কাছে সেই সময়ে শাওন ও মাজহারুল ইসলামের ব্যবহার এবং ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। অনেকগুলি প্রশ্নের উদয় হয়েছে সেখানে। সেই প্রশ্নগুলির কোন নৈব্যক্তিক উত্তর আজও পাওয়া যায়নি।

হুমায়ূন আহমেদের মরদেহও একদিন বেশি আমেরিকায় রেখে দিতে হয় – শুধুমাত্র শাওন প্রথম শ্রেনির বিমান টিকেট ছাড়া দেশে ফিরবেন না বলে জেদের কারণে। শাওনের মা সরকার দলীয় এমপি হওয়াতে বেশ প্রভাব খাটিয়েছেন সেটাও স্পষ্ট।

হুমায়ূন আহমেদকে কোথায় দাফন করা হবে সেটা নিয়েও হুমায়ূন আহমেদের প্রথম পক্ষের সন্তানসন্ততি এবং ভাইবোন বনাম শাওনের মধ্যে প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত নুহাশ পল্লীতেই দাফন করা হয়।

এই বইটি শাওন কেন নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর এই বইয়ের পাঠক হিসেবে আমি যতটুকু বুঝেছি তা হলো – শাওন চাননি তাঁর ব্যবহারের অসংলগ্নতা কেউ জানুক, কিংবা কেউ তাঁকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করান।

হুমায়ূন আহমেদের ছবিগুলি লেখক বইতে দাবি করেছেন হুমায়ূন আহমেদের মা আয়েশা ফয়েজের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। ছবিগুলি নিয়ে পরে কোনো ঝামেলা হতে পারে এটা কি তিনি টের পেয়েছিলেন?

বই প্রকাশের অনেক বছর পর সম্ভবত ২০২১ সালে মেহের আফরোজ শাওন হুমায়ূন আহমেদের ছবি চুরির অভিযোগে মামলা করেছিলেন রুমা চৌধুরি ও মঞ্জুরুল আজিম পলাশের বিরুদ্ধে। এগুলি বইয়ের বাইরের ঘটনা। আমি বেশ হতবাক হয়েছি বিশ্বজিত সাহা ও  রুমা সাহার বিবাহবিচ্ছেদ এবং রুমা সাহার মঞ্জুরুল আজিম পলাশকে বিয়ে করে আমেরিকা ছেড়ে বাংলাদেশে এসে বাস করার সংবাদে। ২০১২ সালে নাকি চব্বিশটি ছবির মধ্যে বিশটি ফেরত দেয়া হলেও চারটি ছবি ফেরত দেয়া হয়নি। রুমা সাহা নাকি বলেছিলেন সেগুলি হারিয়ে গেছে। ২০২১ সালে কুমিল্লায় এক প্রদর্শনীতে হুমায়ুন আহমেদের সেই হারিয়ে যাওয়া ছবিগুলি দেখা যায় – যে প্রদর্শনী করছিলেন রুমা চৌধুরি ও পলাশ। শাওন মামলা করেছিলেন এদের বিরুদ্ধে। দুবছর পর ছবিগুলি উদ্ধার করে শাওনের হাতে তুলে দেয়া হয়।

বিশ্বজিত সাহার বইটি হুমায়ূন আহমেদের শেষ দিনগুলোর ক্রমানুগতিক ঘটনাপঞ্জি তাতে সন্দেহ নেই। তবে মাঝে মাঝে মনে হয়েছে লেখক যেন পাঠকের কাছে কৈফিয়ত দিচ্ছেন তিনি হুমায়ূন আহমেদের জন্য কী কী করেছেন এবং কতখানি করেছেন। ভবিষ্যতের হুমায়ূন গবেষকদের তো বটেই, হুমায়ূনের শিশুপুত্রদ্বয় নিষাদ ও নিনিতও যদি কোনোদিন কৌতূহলী হয়ে জানতে চায় – এই বই থেকে জানতে পারবে অন্য একটা ভার্সন যেটা হয়তো তাদের মা তাদেরকে অন্যভাবে বলেছেন।

বইটি দুঃখদিনের ঘটনা, তাই সুখপাঠ্য হবার দাবি রাখে না। কিন্তু তবুও বেশ কিছু ঘটনা এবং বর্ণনার পুনরুক্তি আছে। হুমায়ূন আহমেদ আমাদের ইতিহাসের অংশ। সে হিসেবে এই বইও ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছে।

------------

হুমায়ূন আহমেদের ছবি আঁকার হাতও যে এত চমৎকার তা আমরা জানতে পেরেছি তাঁর জীবনের একেবারে শেষের দিকে। এখানে তাঁর আঁকা কিছু ছবি রেখে দিলাম। 





Sunday, 5 January 2025

হায় সজনি - প্রেম বিরহের উপাখ্যান

 


সমরেশ মজুমদারের জীবনের শেষের দিকের উপন্যাস ‘হায় সজনি’ প্রকাশিত হয়েছে ২০২০ এর ডিসেম্বরে। ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে একটানা পড়ে ফেলার মতো ছোট্ট উপন্যাস। উত্তরাধিকার, কালবেলা, কালপুরুষ, গর্ভধারিনী কিংবা সাতকাহনের সমরেশ মজুমদার – তাই প্রত্যাশা একটু বেশিই ছিল। 

উপন্যাসের ঘটনার সময়কাল দীর্ঘ। শুরু হয়েছে সেই সময় থেকে যখন কলকাতার কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়েও ছেলে-মেয়েতে মেলামেশা তো দূরের কথা – কথা বলাটাকেও দোষের বলে ধরা হতো। গল্পের নায়িকা মৃণালিনী বড়লোকের মেয়ে, গাড়িতে করে কলেজে যায়। সারাক্ষণ মা-মাসীর নজরদারিতে থাকে। এরমধ্যে হঠাৎ একদিন মৃণালিনীর ইচ্ছে হলো স্বাধীনভাবে বাসে চড়তে। বাসস্টপে ‘টু বি’ নম্বর বাসের জন্য দাঁড়ালে অমিত তাকে বাস স্টেশনে দেখেই নাটকীয় কায়দায় “টু বি অর নট টু বি” বলে একটা মনলোগ আউড়ে দেয়। 

সেই তিল থেকেই তাল। না, সরাসরি মৃণালিনী কিংবা অমিতের কথাও হয় না, মেলামেশার তো প্রশ্নই ওঠে না। মৃণালিনীর মাসী খোঁজখবর নিয়ে অমিতের হোস্টেলে হাজির হন গোয়েন্দার মতো। অমিতকেই ভার দেন মৃণালিনীর ওপর নজরদারি করার জন্য। 

সময় গড়ায়। মৃণালিনীর বিয়ে হয়ে যায়, আবার অকালে বিধবাও হয়ে যায় সে। অমিত গল্প লেখে। তার গল্প থেকে সিনেমা হয়। মৃণালিনী সিনেমায় অভিনয় করতে চায়, আবার একটি সিনেমায় অভিনয় করেই হারিয়ে যায়। 

বছরের পর বছর কেটে যায়। অমিত বিখ্যাত সাহিত্যিক হয়। কিন্তু তার মনের ভেতরে মৃণালিনীর জন্য একটা জায়গা রয়েই যায়। শেষ অধ্যায় শেষ হয় নাটকীয় বিরহের মধ্য দিয়ে। একটু বেশি নাটকীয়ই বলা যায়। 

উপন্যাসে সব উপাদানই আছে। সমরেশ মজুমদার অভিজ্ঞ বিখ্যাত লেখক। কোনো উপাদানের ঘাটতি রাখেননি। কিন্তু উপাদানগুলি কেমন যেন একটু ছাড়া ছাড়া খাপছাড়া রয়ে গেছে। হতে পারে প্রত্যাশার পরিমাণ বেশি ছিল বলেই কেমন যেন অতৃপ্তি রয়ে গেছে। 


Sunday, 17 March 2024

বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী - ইতিহাস ও রাজনৈতিক দর্শনের অমূল্য দলিল

 



বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী প্রথমবার যখন পড়েছিলাম তখন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুর সাবলীল ভাষার দক্ষতায়। কী অনায়াসে তিনি নির্মেদ বাক্যে তুলে এনেছেন তাঁর সমসাময়িক ইতিহাস। পড়ার পর প্রথম যে কথাটি মনে হয়েছিল সেটা হলো – এই বই সর্বজনপাঠ্য হওয়া উচিত। আশা করেছিলাম – বঙ্গবন্ধুকে যাঁরা সহ্যও করতে পারেন না কোনো না কোনো কারণে – তাঁরাও যদি এই বইটি পড়েন – জানতে পারবেন রাজনীতির কত চড়াই-উৎরাই পার হয়ে, কত দীর্ঘ সংগ্রাম আর আত্মত্যাগের মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের নেতা হয়ে উঠেছিলেন। 

তার এক দশক পর সম্প্রতি বইটি আবার পড়লাম। এবার ঘটনার চেয়ে বঙ্গবন্ধুর নৈতিক আদর্শের ব্যাপারটা টানলো আরো বেশি। প্রশ্ন জাগে – একটানা পনেরো বছর বঙ্গবন্ধুর নাম জপ করার পরেও আমাদের নেতাদের ভেতর তাঁর আদর্শের কোন ছাপ দেখি না কেন?

 বইয়ে উল্লেখিত সেই সময়ের ইতিহাস নিয়ে অনেক বই লেখা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর এই বই থেকে তথ্য নিয়েই রচিত হয়েছে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে অসংখ্য বই। সেই বইগুলির কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া বেশিরভাগই বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে রচিত। 

২০১২ সালে প্রকাশিত হবার পর থেকে বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’  সম্ভবত সবচেয়ে বেশি আলোচিত বই বাংলাদেশে। পাঠকরা নিজেদের মধ্যে কতটুকু উপলব্ধিমূলক আলোচনা করেছেন জানি না, তবে রাষ্ট্রীয় আনুকুল্যে এবং আনুকুল্য লাভের আশায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই বইয়ের সুখ্যাতি করেছেন অনেকেই । শুনেছি বিসিএস পরীক্ষার্থীদের অবশ্যপাঠ্য এই বই – কারণ এই বই থেকে এক বা একাধিক প্রশ্ন প্রতি বৎসরই আসে, কিংবা মৌখিক পরীক্ষায় জিজ্ঞাসা করা হয়। অনলাইনে খুঁজলেই বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র অসংখ্য প্রশ্নোত্তর পাওয়া যায়। নিসন্দেহে এতে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তথ্য কে কতটুকু জানে তা প্রমাণিত হয়। কিন্তু তথ্য জানা আর আদর্শ ধারণ করা কি এক? 

গত এক দশকে বঙ্গবন্ধুর পোশাক পরে যতজন নিজেদের বঙ্গবন্ধুর সৈনিক কিংবা সন্তানের চেয়েও বেশি সন্তান বলে গলা ফাটিয়ে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করেছেন – আমার কেন যেন মনে হয় তাঁদের কেউই বঙ্গবন্ধুর এই বইটি সম্পূর্ণ পড়েননি। যদি পড়তেন, কিছুটা হলেও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতিফলন দেখা যেতো তাঁদের মধ্যে। 

অবশ্য এটাও ঠিক, ধর্মীয় গ্রন্থ তো অনেকেই দিনরাত পড়তে পড়তে মুখস্থ করে ফেলেন। তাতে কি ধর্মের আদর্শগুলি তাঁরা ধারণ করেন? যাই হোক, এই বইয়ে বর্ণিত ইতিহাস নয়, আমার কাছে যেটা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে সেটা হলো সেই সময় থেকেই বঙ্গবন্ধুর ভেতর আদর্শ নেতৃত্ব আর সত্যিকারের দেশপ্রেমের দর্শন গড়ে ওঠাটা। তাঁর আদর্শের ছিটেফোঁটাও যদি বর্তমান নেতাদের সবার ভেতর থাকতো!

রাজনীতির  পিচ্ছিল এবং ক্ষেত্রবিশেষে পংকিল পথ ধরে, অনেক ক্ষেত্রে জঞ্জাল পরিষ্কার করতে করতে তিনি উঠে এসেছেন একেবারে কর্মীর কাতার থেকে নেতার সারিতে। 

নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি ঘটনা লিখতে লিখতে প্রাসঙ্গিকভাবে কিছু কিছু দার্শনিক লাইন লিখেছেন, যেগুলি আমার দৃষ্টিতে অত্যন্ত মূল্যবান তাঁকে চেনার জন্য। 

টাকার কাছে বিক্রি হয়ে যাওয়া জনপ্রতিনিধি সেই সময়েও ছিল (এখনো আছে বলাই বাহুল্য)। তিনি একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন: “এর পূর্বে আমার ধারণা ছিল না যে, এমএলএরা এইভাবে টাকা নিতে পারে। এরাই দেশের ও জনগণের প্রতিনিধি। আমার মনে আছে, আমাদের উপর ভার পড়ল কয়েকজন এমএলএকে পাহারা দেবার, যাতে তারা দল র‍্যাগ করে অন্য দলে না যেতে পারে। আমি তাদের নাম বলতে চাই না, কারণ অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছেন। একজন এমএলএকে মুসলিম লীগ অফিসে আটকানো হল। তিনি বার বার চেষ্টা করেন বাইরে যেতে, কিন্তু আমাদের জন্য পারছেন না। কিছু সময় পরে বললেন, “আমাকে বাইরে যেতে দিন, কোনো ভয় নাই। বিরোধী দল টাকা দিতেছে, যদি কিছু টাকা নিয়ে আসতে পারি আপনাদের ক্ষতি কি? ভোট আমি মুসলিম লীগের পক্ষেই দিব।“ আশ্চর্য হয়ে চেয়ে রইলাম তাঁর দিকে। বৃদ্ধ লোক, সুন্দর চেহারা, লেখাপড়া কিছু জানেন, কেমন করে এই কথা বলতে পারলেন আমাদের কাছে? টাকা নেবেন একদল থেকে অন্যদলের সভ্য হয়ে, আবার টাকা এনে ভোটও দেবেন না। কতটা অধঃপতন হতে পারে আমাদের সমাজের!” (পৃ ৩৪)। 

বই থেকে কিছু লাইন যেখান থেকে বোঝা যায় তাঁর নীতিবোধ কতটা প্রখর ছিল:

“উদারতা দরকার, কিন্তু নীচ অন্তঃকরণের ব্যক্তিদের সাথে উদারতা দেখালে ভবিষ্যতে ভালর থেকে মন্দই বেশি হয়, দেশের ও জনগণের ক্ষতি হয়।“ (পৃ ৪৭)

“আমাদের বাঙালির মধ্যে দুইটা দিক আছে। একটা হল আমরা মুসলমান, আর একটা হল, আমরা বাঙালি। পরশ্রীকাতরতা এবং বিশ্বাসঘাতকতা আমাদের রক্তের মধ্যে রয়েছে। বোধহয় দুনিয়ার কোন ভাষায়ই এই কথাটা পাওয়া যাবে না, পরশ্রীকাতরতা। পরের শ্রী দেখে যে কাতর হয়, তাকে পরশ্রীকাতর বলে। ঈর্ষা, দ্বেষ সকল ভাষায়ই পাবেন, সকল জাতির মধ্যেই কিছু কিছু আছে, কিন্তু বাঙালিদের মধ্যে আছে পরশ্রীকাতরতা। ভাই, ভাইয়ের উন্নতি দেখলে খুশি হয় না। এই জন্যই বাঙালি জাতর সকল রকম গুণ থাকা সত্ত্বেও জীবনভর অন্যের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে। সুজলা, সুফলা বাংলাদেশ সম্পদে ভর্তি। এমন উর্বর জনি দুনিয়ায় খুব অল্প দেশেই আছে। তবুও এরা গরিব। কারণ, যুগ যুগ ধরে এরা শোষিত হয়েছে নিজের দোষে। নিজকে এরা চেনে না, আর যতদিন চিনবে না এবং বুঝবে না ততদিন এদের মুক্তি আসবে না।“ (পৃ – ৪৭-৪৮)

“কুসংস্কার ও অলৌকিক বিশ্বাসও যে বাঙালির দুঃখকষ্টের কারণ তা তিনি বুঝেছিলেন খুব ভালো করে। তাই তিনি পরিষ্কার ভাষায় উদাহরণসহ লিখেছেন এভাবে: “অনেক সময় দেখা গেছে, একজন অশিক্ষিত লোক লম্বা কাপড়, সুন্দর চেহারা, ভাল দাড়ি, সামান্য আরবি ফার্সি বলতে পারে, বাংলাদেশে এসে পীর হয়ে গেছে। বাঙালি হাজার হাজার টাকা তাকে দিয়েছে একটু দোয়া পাওয়ার লোভে। ভাল করে খবর নিয়ে দেখলে দেখা যাবে এ লোকটা কলকাতার কোন ফলের দোকানের কর্মচারী অথবা ডাকাতি বা খুনের মামলার আসামি। অন্ধ কুসংস্কার ও অলৌকিক বিশ্বাসও বাঙালির দুঃখের আর একটা কারণ।“ (পৃ ৪৮)

ষড়যন্ত্রের রাজনীতি যে তখনো ছিল, এবং যতই দিন গেছে তা বেড়ে চলেছে তা তিনি জানতেন। “পাকিস্তানের রাজনীতি শুরু হল ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে। জিন্নাহ যতদিন বেঁচেছিলেন প্রকাশ্যে কেউ সাহস পায় নাই। যেদিন মারা গেলেন ষড়যন্ত্রের রাজনীতি পুরাপুরি প্রকাশ্যে শুরু হয়েছিল।“ পৃ ৭৮। 

তিনি কর্মবীর ছিলেন। তাঁর কর্মদর্শনও ছিল পরিষ্কার। “আমি অনেকের মধ্যে একটা জিনিস দেখেছি, কোন কাজ করতে গেলে শুধু চিন্তাই করে। চিন্তা করতে করতে সময় নষ্ট করে এবং জীবনে কোন কাজই করতে পারে না। আমি চিন্তাভাবনা করে যে কাজটা করব ঠিক করি, তা করেই ফেলি। যদি ভুল হয়, সংশোধন করে নেই। কারণ, যারা কাজ করে তাদেরই ভুল হতে পারে, যারা কাজ করে না তাদের ভুলও হয় না।“ (পৃ ৮০)

“কোন নেতা যদি অন্যায় কাজ করতে বলেন, তার প্রতিবাদ করা এবং তাকে বুঝিতে বলার অধিকার জনগণের আছে।“ (পৃ ১০০)

ছাত্রলীগের বার্ষিক সম্মেলনে সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, “আজ থেকে আমি আর আপনাদের প্রতিষ্ঠানের সভ্য থাকব না। ছাত্র প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত থাকার আর আমার কোনো অধিকার নেই। আমি আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি। কারণ আমি আর ছাত্র নই।“ (পৃ ১২৬) এখনকার বৃদ্ধ ছাত্রনেতারা এই বই পড়লে নিশ্চয় লজ্জা পেতেন। 

“জনমতের বিরুদ্ধে যেতে শোষকরাও ভয় পায়। শাসকরা যখন শোষক হয় অথবা শোষকদের সাহায্য করতে আরম্ভ করে তখন দেশের ও জনগণের মঙ্গল হওয়ার চেয়ে অমঙ্গলই বেশি হয়।“ পৃ ২১০

চীনের শান্তি সম্মেলনে গিয়ে তিনি নিজের চোখে যে শিল্প বিপ্লবের সূচনা এবং চীনা নাগরিকদের মানসিকতার পরিবর্তন দেখেছিলেন তা অত্যন্ত শিক্ষণীয়। “চীন দেশে যে জিনিস তৈরি হয় না, তা লোকে ব্যবহার করবে না।“ “এরা শিল্প কারখানা বানানোর জন্যই শুধু বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে। আমাদের দেশে সেই সময়ে কোরিয়ার যুদ্ধের ফলস্বরূপ যে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়েছিল তার অধিকাংশ ব্যয় হল জাপানি পুতুল, আর শৌখিন দ্রব্য কিনতে। দৃষ্টিভঙ্গির কত তফাৎ আমাদের সরকার আর চীন সরকারের মধ্যে!” “এদেশে একটা বিদেশী সিগারেট পাওয়া যায় না। সিগারেট তারা তৈরি করছে নিকৃষ্ট ধরনের, তাই বড় ছোট সকলে খায়।“ পৃ ২৩১। 

দেশ স্বাধীন হলেই যে আপনাআপনি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যায় না তা তিনি ভালো করেই বুঝেছিলেন। চীনের সাথে পাকিস্তানের তুলনা করেছিলেন তিনি – “আমরা স্বাধীন হয়েছি ১৯৪৭ সালে আর চীন স্বাধীন হয়েছে ১৯৪৯ সালে। যে মনোভাব পাকিস্তানের জনগণের ছিল, স্বাধীনতা পাওয়ার সাথে সাথে আজ যেন তা ঝিমিয়ে গেছে। সরকার তা ব্যবহার না করে তাকে চেপে মারার চেষ্টা করেছে। আর চীনের সরকার জনগণকে ব্যবহার করছে তাদের দেশের উন্নয়নমূলক কাজে। তাদের সাথে আমাদের পার্থক্য হল, তাদের জনগণ জানতে পারল ও অনুভব করতে পারল এই দেশ এবং এদেশের সম্পদ তাদের। আর আমাদের জনগণ বুঝতে আরম্ভ করল, জাতীয় সম্পদ বিশেষ গোষ্ঠীর আর তারা যেন কেউই নন।“ পৃ ২৩৪।

পুঁজিবাদের কুফল সম্পর্কে তাঁর মনোভাব ছিল স্পষ্ট। “আমি নিজে কমিউনিস্ট নই। তবে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি না। একে আমি শোষণের যন্ত্র হিসাবে মনে করি। এই পুঁজিপতি সৃষ্টির অর্থনীতি যতদিন দুনিয়ায় থাকবে ততদিন দুনিয়ার মানুষের উপর থেকে শোষণ বন্ধ হতে পারে না।“ পৃ ২৩৪।

যুক্তফ্রন্ট করে ক্ষমতায় যাবার প্রস্তাবের উত্তরে ১৯৫৩ সালে তিনি বলেছিলেন, “ক্ষমতায় যাওয়া যেতে পারে, তবে জনসাধারণের জন্য কিছু করা সম্ভব হবে না, আর এ ক্ষমতা বেশি দিন থাকবেও না। যেখানে আদর্শের মিল নাই সেখানে ঐক্যও বেশি দিন থাকে না।“ পৃ ২৫০।

“নীতিবিহীন নেতা নিয়ে অগ্রসর হলে সাময়িকভাবে কিছু ফল পাওয়া যায়, কিন্তু সংগ্রামের সময় তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না।“ “অযোগ্য নেতৃত্ব, নীতিহীন নেতা ও কাপুরুষ রাজনীতিবিদদের সাথে কোনোদিন একসাথে হয়ে দেশের কোনো কাজে নামতে নেই। তাতে দেশসেবার চেয়ে দেশের ও জনগণের সর্বনাশই বেশি হয়।“ পৃ ২৭৩।

আমাদের নেতারা কি দয়া করে এই বইটি মনযোগ দিয়ে পড়বেন এবং আত্মসমালোচনা করে দেখবেন – বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কতটুকু তাঁরা ধারণ করেন? 


Tuesday, 9 January 2024

মহাজাগতিক মানসভ্রমণ

 


মহাজাগতিক প্রথম আলো’র পাঠ প্রতিক্রিয়া

____________________

মাত্র পঁচিশ বছর আগেও জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের বয়স হিসেব করেছিলেন আনুমানিক সাত থেকে বিশ বিলিয়ন অর্থাৎ সাত শ থেকে দুই হাজার কোটি বছর পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু স্যাটেলাইট আর টেলিস্কোপের আধুনিকায়ন এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য যান্ত্রিক পদার্থবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিজ্ঞানের উন্নতির ফসল কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা এখন প্রায় সুনির্দিষ্টভাবেই হিসেব করে দেখেছেন যে মহাবিশ্বের বর্তমান বয়স ১৩৭০ কোটি বছর, খুব বেশি হলে ২০ কোটি বছর এদিক ওদিক হতে পারে। মহাবিশ্বের তুলনায় আমাদের সৌরজগৎ তথা পৃথিবীর বয়স অনেক কম, মাত্র সাড়ে চারশ কোটি বছর। অর্থাৎ মহাবিশ্বের উৎপত্তি হবার প্রায় নয় শ কোটি বছর পর আমাদের সৌরজগতের উৎপত্তি হয়েছে। এই সাড়ে চারশ কোটি বছর বয়সী পৃথিবীতে মানুষের উদ্ভব হয়েছে মাত্র দুই লক্ষ বছর আগে। আর এতসব আমরা জানতে শুরু করেছি মাত্র কয়েক শ বছর আগে থেকে। 

এত অতীতের ঘটিনা – যখন মানুষ তো দূরের কথা, আমাদের সৌরজগতই ছিল না – সেই সুদূর অতীতের কথা আমরা কীভাবে জানলাম? এই জানার মূলে আছে আলো। মহাবিস্ফোরণ বা বিগ ব্যাং-এর পর প্রথম শক্তির বিকিরণ হয়েছিল যে আলোর আকারে – সেই মহাজাগতিক প্রথম আলোই আজ সাক্ষ্য দিচ্ছে মহাবিশ্বের আদি অবস্থার, একেবারে গোড়ায় কী হয়েছিল সেসব ঘটনার। মহাবিশ্বের পটভূমিতে ছড়িয়ে থাকা সে আদি আলোর অবশিষ্টাংশ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা খুঁড়ে আনছেন আমাদের মহাবিশ্বের অতীত ইতিহাস। আমাদের মাথার ওপর যে আকাশে জ্বলতে দেখছি লক্ষ কোটি তারার মেলা – তাদের অনেকেই হয়তো ধ্বংস হয়ে গেছে অনেক বছর আগে – কিন্তু যে আলো রওনা দিয়েছিল মিলিয়ন বছর আগে – সেই আলো এসে পৌঁছাচ্ছে এতদিন পরে – মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরত্ব পার হয়ে। 

থ্রিলারের চেয়েও রোমহর্ষক এসব মহাজাগতিক ইতিহাস আমাদের চোখের সামনে একটার পর একটা ধারবাহিকভাবে চলে আসেনি। মহাবিশ্বের রহস্যের জটখোলা এত সহজ নয়। একেক সময় একেক ঘটনার ভেতর দিয়ে একেক রকমের আবিষ্কার ঘটে। সেসব আবিষ্কারের তথ্য থেকে মহাবিশ্বের রহস্যের ধারাবাহিকতা খুঁজে বের করতে বিজ্ঞানীদের বছরের পর বছর ধরে গবেষণা করতে হয়। সেই গবেষণালব্ধ ফলাফল থেকে গবেষণাপত্র তৈরি হয়। নানাসময়ের গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল বিশ্লেষণ করে তথ্য-প্রমাণসহ উপস্থাপন করতে হয় বিজ্ঞানের বইপত্রে। সেখান থেকে আমরা সাধারণ মানুষ জানতে পারি – মহাবিশ্বে কী ঘটলো কখন ঘটলো। সেরকম জুৎসই বই হলে বই পড়তে পড়তেই পাঠকের মানসভ্রমণ হয়ে যেতে পারে – মহাবিশ্বের একেবারে গোড়ার সময় থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত। আবুল বাসারের “মহাজাগতিক প্রথম আলো বিগ ব্যাং ও পটভূমি বিকিরণের খোঁজে” তেমনই এক সুখপাঠ্য বিজ্ঞানবই যা পড়ার সময় মহাজাগতিক মানসভ্রমণের অনুভূতি হলো। 

বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানের বই লেখা সহজ নয়। কারণ অনেক। প্রথমত বৈজ্ঞানিক শব্দগুলির যথাযথ বাংলা পরিভাষা আমাদের নেই। দ্বিতীয়ত আমরা বিজ্ঞানের বই হয়তো অনেক পড়ি, কিন্তু সেভাবে বিষয়ভিত্তিক বিজ্ঞানচর্চা আমাদের নেই। আমাদের বিজ্ঞানপাঠের প্রয়োজনীয়তা পরীক্ষা পাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে বেশিরভাগ সময়। ফলে বিজ্ঞান লেখকের জন্য পাঠকের কাছ থেকে যে চ্যালেঞ্জটা আসার কথা সেটা অনেকসময় আসে না। আরো একটা বড় কারণ হলো – বিজ্ঞানের জনপ্রিয় বই লিখতে গিয়ে আমরা ইংরেজিতে লেখা জনপ্রিয় বিজ্ঞান বইগুলির ভাষাশৈলিও অনুকরণ করি, অনেকসময় হয়ে ওঠে আক্ষরিক অনুবাদ। এটা দোষের কিছু নয়। একসময় জার্মান ভাষা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করতে হতো আমেরিকান বা ইংল্যান্ডের লেখকদের। 

বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে অবদান রাখছেন এখন অনেকেই। তাঁদের মধ্যে অন্যতম লেখক আবুল বাসার। তিনি একাধারে জনপ্রিয় অনুবাদক, মাসিক বিজ্ঞানচর্চার নির্বাহী সম্পাদক। জনপ্রিয় বিজ্ঞানের বই অনুবাদের পাশাপাশি তিনি ইতোমধ্যে নিজস্ব বই লিখেছেন বেশ কয়েকটি। প্রথমা থেকে প্রকাশিত মহাজাগতিক প্রথম আলো তাঁর অত্যন্ত দরকারি একটি বই। 

বিশটি অধ্যায় আছে এই বইতে। প্রত্যেকটি অধ্যায়ের শিরোনাম আকর্ষণীয় – যেমন ‘একঘেয়ে ভুতুড়ে হিসহিস’, ‘দুটি প্যারাডক্স ও আইনস্টাইনের মহা ভুল’, গ্যামো অ্যান্ড গং, একটি হরর মুভি ও থ্রি মাস্কেটিয়ার্স, কফিনের শেষ পেরেক, নোবেল ও শোক সমাচার – ইত্যাদি। শিরোনাম পড়ে মনে হচ্ছিলো থ্রিলার কাহিনিতে ঢুকতে যাচ্ছি। বিজ্ঞানের ইতিহাসের কাহিনিগুলিও তিনি সাজিয়েছেন সেভাবে সমান আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে। 

শুরুতেই তিনি চমকে দিয়েছেন ১৯৬৫ সালে নিউ জার্সিতে বিজ্ঞানী আর্নো পেনজিয়াস ও রবার্ট উইলসনের হর্ন অ্যান্টেনায় ধরা পড়া ভুতুড়ে হিসহিস নয়েজের ঘটনার মাধ্যমে। সেখান থেকে তিনি অতীতে গিয়েছেন, গিয়েছেন বিজ্ঞানীদের পরবর্তী কর্মকান্ডে। 

বইয়ের প্রতিটি অধ্যায়ই স্বয়ং-সম্পূর্ণ আবার উপন্যাসের মতো ঘটনার প্রবাহে সচল। ঘটনাপ্রবাহে বিভিন্ন বিজ্ঞানীর কাজকর্ম বর্ণিত হয়েছে, বিজ্ঞানীদের অতিসংক্ষিপ্ত জীবনীও আছে সাথে যেখানে যেটুকু দরকার। রাশিয়ান বিজ্ঞানী আলেকসান্দার ফ্রিডম্যান, বেলজিয়ামের জর্জ লেমিত্রি, আমেরিকার হেনরিয়েটা লিভেট, হার্লো শ্যাপলি, হেবার কার্টিস, এডুইন হাবল, জর্জ গ্যামো, র‍্যালফ আলফার, রবার্ট হারম্যান, ফ্রেড হয়েল, রবার্ট ডিকি – প্রায় প্রত্যেক মহারথির কথাই এসেছে যথাপ্রসঙ্গে। 

জ্যোতির্বিজ্ঞানী অধ্যাপক দীপেন ভট্টাচার্য এই বইয়ের ভূমিকায় সঠিকভাবেই লিখেছেন – যে এই বই ধরতে গেলে জ্যোতির্বিদ্যার আধুনিকতার সূত্রপাতের কাহিনি। আমি তাঁর সাথে সম্পূর্ণ একমত। সাবলীল ভাষা এই বইয়ের প্রধান আকর্ষণ। ভাষার কারণে হোঁচট খেতে হয়নি তেমন কোথাও। 

তবে কয়েকটি জায়গায় আমার সামান্য একটু মন্তব্য আছে। ষষ্ঠ অধ্যায়ে ৬৯ পৃষ্ঠায় বুনসেন ও কার্শভের যন্ত্রের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে “যেখানে একটি সরু স্লিট বা নল বসানো ছিল” – স্লিট আর নল কিন্তু এক জিনিস নয়। একই অধ্যায়ে ৭২ পৃষ্ঠায় হাইড্রোজেন পরমাণুর শক্তিস্তর বোঝানোর ক্ষেত্রে ইলেকট্রনের ফোটন শুষে নেয়ার ঘটনাটি খুব একটা পরিষ্কার হয়নি। আগত ফোটনের শক্তি আর ইলেকট্রনের বাইন্ডিং এনার্জির উপর নির্ভর করে ফোটনটি শোষিত হবার পর ইলেকট্রন শক্তিস্তর অতিক্রম করতে পারবে কি না, নাকি উত্তেজিত হবার পর আবার ফোটন বের করে দিয়ে নিজের জায়গায় বসে পড়বে। 

সপ্তম অধ্যায়ে ৮২ পৃষ্ঠায় কিছুটা রূপক অর্থে বলা হয়েছে রসায়নবিদ ও পদার্থবিজ্ঞানীদের ভাগ্য কীভাবে জ্যোতির্বিদদের ভাগ্যের চেয়ে ভালো। এই ব্যাপারটিতে আমার মতো আরো অনেক পাঠকই হয়তো দ্বিমত পোষণ করবেন। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে পদার্থবিজ্ঞানী কিংবা রসায়নবিদ কাউকেই বাদ দেয়ার সুযোগ নেই। 

৮৭ পৃষ্ঠার গ্রাফে উলম্বিক অক্ষে মন্দন বেগ কেন হিসেব করা হয়েছে তা ব্যাখ্যা করলে ব্যাপারটি আরো বোধগম্য হতো।

নবম অধ্যায়ে ১০২ পৃষ্ঠায় কথার ছলে লেখা হয়েছে বর “শুভদিন দেখে” নিজের দেশ ডেনমার্ক ছেড়ে আশ্রয় নিলেন ব্রিটেনে। এখানে কথার কথা হলেও “শুভদিন” ব্যাপারটি নীলস বোরের ক্ষেত্রে খাটে না। একই অধ্যায়ের ১১৪ পৃষ্ঠায় বিটা ক্ষয় বা বিটা ডিকের ব্যাখ্যাটিতে নিউট্রন প্রোটনে রূপান্তরিত হয়ে একটি ইলেকট্রন বিটা পার্টিক্যাল আকারে বের হয়ে আসার ব্যাপারটা উল্লেখ করা হয়নি। 

একই অধ্যায়ে ১১৭ পৃষ্ঠায় যেখানে সূর্যের কেন্দ্রে শক্তির উৎপত্তি দেখানো হয়েছে – সেখানে আমাদের বাঙালি পদার্থবিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার আয়নাইজেশান সূত্রকে খুব বেশি মিস করেছি। এই বইতে মেঘনাদ সাহার কাজ খুবই প্রাসঙ্গিক ছিল, অথচ মেঘনাদ সাহা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। 

১৫তম অধ্যায়ে ১৭৭ পৃষ্ঠায় ১৯৫৬ সালে ট্রানজিস্টার উদ্ভাবনের জন্য নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন বেল ল্যাবের দুজন বিজ্ঞানীর জায়গায় তিনজন বিজ্ঞানী হবে। 

এই বইয়ের শেষে তথ্যনির্দেশে কয়েকটি বৈজ্ঞানিক বিষয়ের টীকা দেয়া আছে – যা কোন পাঠককে কিছু অতিরিক্ত সুবিধা দেবে। 

শুধু এই বইয়ের ক্ষেত্রেই নয়, যে কোনো বিজ্ঞানের বইতেই আমি বইয়ের শেষে শব্দের নির্ঘন্টটা খুব মিস করি। প্রকাশকরা হয়তো বইয়ের পৃষ্ঠাসংখ্যা না বাড়ানোর জন্য, বইয়ের দাম কম রাখার জন্য নির্ঘন্ট দেন না, কিন্তু ইনডেক্স বা নির্ঘন্ট ছাড়া যে কোনো মননশীল বই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কারণ এসব বই তো শুধুমাত্র একবার পাঠের জন্য নয়। পরে যখন এই বই আমি রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করতে চাইবো – তখন পুরো বই আমাকে তন্ন তন্ন করতে হবে কোন নির্দিষ্ট তথ্যের জন্য। 

আরো একটি ব্যাপার আমি খুব মিস করি বাংলা বইয়ে – সেটা হচ্ছে ক্রস রেফারেন্স বা টীকা। যেমন এই বই থেকেই উদাহরণ দিই – পৃষ্ঠা ৪৭ – “তাঁর এই গবেষণার ফল অচিরেই জার্নালে প্রকাশিত হলো।“ পাঠক এখানে জানতে চাইতে পারেন সেই জার্নালের ফুল রেফারেন্স। সেটা টীকা আকারে দেয়া যেতো। পৃষ্ঠা ৫৭ – হাবল তাঁর বাবার মৃত্যুর পর কীভাবে মনের অবস্থা বর্ণনা করেছেন তার উদ্ধৃতি আছে। কিন্তু রেফারেন্স নেই। পাঠকের কৌতূহল এখানে মিটছে না। সেজন্য লেখক ও প্রকাশকদের কাছে আমার আবেদন – বইয়ের পৃষ্ঠা কমিয়ে দাম যতই কম রাখার চেষ্টা করুন – যিনি বই কিনবেন না তিনি কিছুতেই কিনবেন না। আর ভালো বই ভালোভাবে বের করেন, পাঠক কিনবে। কারণ বাংলাদেশের বইয়ের দাম এখনো ফাস্টফুডের দামের চেয়ে অনেক কম। 

মহাজাগতিক প্রথম আলোর পাঠক আমাদের মহাবিশ্বের উৎপত্তি থেকে বর্তমান অবস্থায় আসার বিভিন্ন ধাপগুলির প্রমাণ তো পাবেনই – সাথে পাবেন মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চিন্তা করার খোরাক। এধরনের বিজ্ঞানের বই চিন্তার খোরাক জন্মায় – এখানেই লেখকের সাফল্য। 


বই - মহাজাগতিক প্রথম আলো

লেখক – আবুল বাসার

প্রকাশক – প্রথমা প্রকাশন

প্রকাশকাল – ২০২২

পৃষ্ঠাসংখ্যা – ২৪০

মুদ্রিত মূল্য – ৫০০ টাকা

ISBN 978 984 96885 0 1


Latest Post

রাজকন্যে সবিতা

  আমার মা ছিলেন নিরক্ষর, বাবার পড়ালেখা চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত। লেখাপড়া করতে পারেননি বলে লেখাপড়ার প্রতি প্রচন্ড ভালোবাসা ছিল বাবার। তাই নিজের ...

Popular Posts