Showing posts with label গ্রন্থ পর্যালোচনা. Show all posts
Showing posts with label গ্রন্থ পর্যালোচনা. Show all posts

Wednesday, 13 April 2022

ডার্ক ম্যাটার রহস্য - গুপ্ত মহাবিশ্বের খোঁজে

 



গুপ্ত মহাবিশ্বের খোঁজে – একটি টানটান উত্তেজনাকর রহস্যোপন্যাসের নাম হতে পারে সহজেই। কিন্তু নামের দ্বিতীয় অংশটা পড়েই বোঝা যায় বইটি বিজ্ঞানের। মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানে ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির রহস্য রহস্যোপন্যাসের চেয়েও রোমাঞ্চকর। তবে পার্থক্য হলো – রহস্যোপন্যাসের শেষে রহস্য উদ্ঘাটিত হয়, কিন্তু ডার্ক ম্যাটারের রহস্য এখনো অনেকটাই রহস্য হয়েই রয়ে গেছে।

ডার্কম্যাটারের রহস্যময়তাকে কোন গাণিতিক সমীকরণ ব্যবহার না করে বাংলার সহজিয়া বিজ্ঞানের বইতে তুলে আনার ব্যাপারটা খুব কঠিন। এই কঠিন কাজটিই অবলীলায় করে ফেলেছেন লেখক আবদুল গাফফার। পদার্থবিজ্ঞানের জটিল বিষয়সমূহের সহজীকরণ করেন যাঁরা – তাঁরা বোঝেন কাজটা কতটা কঠিন। তারজন্য প্রচুর পড়তে হয়, খাটতে হয়। এই বইটি লিখতে গিয়ে লেখক যে প্রচুর খেটেছেন, পড়াশোনা করেছেন, সেই পাঠ থেকে সারবস্তু তুলে এনে তাঁর পাঠককে দিয়েছেন তা এই বইয়ের সাতাশটি পরিচ্ছেদের প্রত্যেকটিতেই স্পষ্ট।

বাংলায় লিখতে গেলে সবচেয়ে বেশি যে সমস্যাটা হয় – সেটা হলো যথাশব্দ খুঁজে বের করা। ইংরেজিতে ডার্ক ম্যাটার বললে পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যে ব্যাপারটা সবার কাছে সমানভাবে বোধগম্য -  ‘কৃষ্ণবস্তু’ কিংবা আরো সহজ বাংলায় ‘কালো পদার্থ’ বললে তা সবার কাছে সমান অর্থবোধক হয় না। তাই শব্দ প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা একটা বড় সমস্যা বাংলায় বিজ্ঞান লেখার ক্ষেত্রে। গুপ্ত মহাবিশ্বের খোঁজে – বইতে ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জিকে বাংলা নামে না ডেকে লেখক সঠিক কাজই করেছেন।

মহাবিশ্ব খুবই রহস্যময় জায়গা। রহস্যময়তার কারণ এখানে যতটা না দুর্বোধ্যতা – তার চেয়েও বেশি অদৃশ্যতা। পুরো মহাবিশ্বের শতকরা ছিয়ানব্বই ভাগই এখনো মানুষের চেনা-জানার বাইরে রয়ে গেছে যার একুশ ভাগ ডার্ক ম্যাটার আর পঁচাত্তর ভাগ ডার্ক এনার্জি।

মহাবিশ্বের উপাদানের শতকরা মাত্র চারভাগ দৃশ্যমান পদার্থ দ্বারা গঠিত। দৃশ্যমান কথাটা পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় ব্যাখ্যা করলে আমরা যেটা বুঝি সেটা হচ্ছে – মহাবিশ্বের যেসব পদার্থের উপর থেকে আলোর প্রতিফলন ঘটে আমাদের চোখে আসে। যেমন খালি চোখে আমরা আকাশের লক্ষ লক্ষ নক্ষত্রের আলো দেখতে পাই। অথবা তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গের মিথষ্ক্রিয়ায় পরোক্ষভাবে যান্ত্রিক উপায়ে দূর মহাকাশ থেকে পদার্থের উপস্থিতি শনাক্ত করি। যেমন এক্স-রে কিংবা গামা-রে’র উপস্থিতি শনাক্ত করে হাজার আলোকবর্ষ দূরের নক্ষত্রের অস্তিস্ত্ব খুঁজে বের করা হচ্ছে। এসব অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করেও এখনো দেখা সম্ভব হয়নি শতকরা ছিয়ানব্বই ভাগ পদার্থ। মহাবিশ্বের এই বিশাল ভর এখনো রয়ে গেছে গুপ্ত। এই গুপ্ত মহাবিশ্বেরই খোঁজখবর দেয়া হয়েছে এই বইতে।

 সাতাশটি অধ্যায়ে ডার্ক ম্যাটারের আদ্যোপান্ত বর্ণনা করা হয়েছে এই বইতে। অধ্যায়গুলি ছোট ছোট – পড়তে পড়তে খেই হারিয়ে যায় না, তথ্যভারাক্রান্তও মনে হয় না। বিজ্ঞানের বই তর তর করে পড়ে ফেলার বই নয়। বিজ্ঞানের বই – সে যে ভাষাতেই লেখা হোক না কেন, সেখানে বিজ্ঞান থাকবে। আর বিজ্ঞান পড়তে হলে মগজে চাপ পড়তেই হবে। এই বইটা পড়তেও পাঠককে সময় নিয়ে পড়তে হবে – সেটাই স্বাভাবিক। আমি বেশ সময় নিয়ে বইটি পড়েছি এবং পড়ে আনন্দ পেয়েছি।

প্রাচীন মহাবিশ্বের ধারণা থেকে শুরু করে আধুনিক মহাবিশ্বের মানচিত্রে ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির স্থান কোথায় হতে পারে – সে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য আমরা পেয়েছি এই বইতে। লেখক এ ব্যাপারে একটা সমন্বিত চিত্র বেশ ভালোভাবেই দিতে পেরেছেন।

প্রথমা প্রকাশন-এর বইগুলির অঙ্গসৌষ্ঠব উন্নত। ব্যবহৃত ছবিগুলি চমৎকারভাবে পরিষ্ফুটিত। কিন্তু সম্পাদনায় কিছুটা ত্রুটি রয়ে গেছে। এটা আমাদের প্রকাশনা জগতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বলে মনে হয় আমার। বেশ কিছু বানান ভুল রয়ে গেছে। আমি বইটির প্রথম সংস্করণ পড়েছি। হয়তো পরবর্তী সংস্করণে এসব ত্রুটি সংশোধিত হয়ে গেছে। আরেকটি দুর্বলতা হলো ছবিগুলিতে কোন নম্বর দেয়া নেই, কিন্তু বর্ণনায় বলা হয়েছে “চিত্র-৩ এর মতো” বা ২ নম্বর ছবির মতো ইত্যাদি (পৃষ্ঠা ৬৫)। আবার অধ্যায়গুলির কোন গাণিতিক পরিচয় নেই – অথচ কোন কোন জায়গায় উল্লেখ আছে “চতুর্দশ অধ্যায়ে বলেছিলাম … (পৃষ্ঠা ১৩৯), ১১তম অধ্যায়ে দেখেছি… (পৃষ্ঠা ১০৬) ইত্যাদি। ছবিগুলির লেবেলিং বাংলায় করা হয়েছে – সেটা খুব ভালো হয়েছে। তবে ৯২ পৃষ্ঠার স্ট্যান্ডার্ড মডেলের ছবিটি জার্মান ভাষায় রয়ে গেছে।

কিছু কিছু ইংরেজি শব্দের সঠিক পরিভাষা আমাদের নেই – যেমন নয়েজকে বাংলায় গোলমাল বললে যা বোঝা যায় – তার সাথে পদার্থবিজ্ঞানের নয়েজের কোন মিল নেই। পদার্থবিজ্ঞানে আমরা নয়েজ বলতে বুঝি – আনওয়ান্টেড ইনফরমেশান; অর্থাৎ অনাকাঙ্খিত সিগনাল। সেখানে গোলমাল বললে অর্থটা গোলমেলে হয়ে যায়। একই ভাবে স্লিট (slit) শব্দের অর্থ ‘ছিদ্র’ বললেও অর্থ বদলে যায় (পৃষ্ঠা ৮৩)

আরো টুকটাক কিছু কিছু বিষয় আরেকটু বিস্তৃতভাবে এলে ভালো হতো – যেমন বলা হয়েছে “ফার্মি টেলিস্কোপে সংযুক্ত আছে বিশাল আকারের এক চুম্বক। এই চুম্বক গামা রশ্মিকে ভেঙে ইলেকট্রন আর পজিট্রন জোড়ায় পরিণত করে ফেলতে পারে।“ (পৃষ্ঠা ১৪৩)  কিন্তু এটুকু বললে একটা সমস্যা থেকে যায়। তা হলো গামা রশ্মির উপর চৌম্বকক্ষেত্রের কোন প্রভাব নেই। সেক্ষেত্রে ঘটনাটা কীভাবে ঘটে তা পুরোটা ব্যাখ্যা করা দরকার।

ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির আদ্যোপান্ত বইটি বাংলায় বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি।


Sunday, 22 August 2021

পাঠ প্রতিক্রিয়া - রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনো আসেননি

 



লেখক – মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
প্রকাশক – অভিযান পাবলিশার্স, কলকাতা
প্রথম প্রকাশ – ফেব্রুয়ারি ২০১৯
প্রচ্ছদ – নিউটন

মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের রহস্যোপন্যাস ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি’ পড়েছি অনেকটা রুদ্ধশ্বাসে। প্রায় একই রকমের আগ্রহ নিয়ে পড়লাম দ্বিতীয় আখ্যান। 

ধারাবাহিক রহস্যোপন্যাসের প্রচলিত নিয়ম হলো এক কাহিনি শেষ হবার মধ্য দিয়ে নতুন কাহিনির বীজ রোপিত হয়। এখানেও সেরকমই হয়েছে। মুশকান জুবেরি গোয়েন্দা অফিসারের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন প্রথম কাহিনিতে। গোয়েন্দা নুরে ছফাকে মেরে ফেলার সমস্ত সুযোগ হাতে থাকা সত্ত্বেও মুশকান জুবেরি ছফাকে এমনভাবে এমন জায়গায় রেখে গিয়েছিল যে মনে হয়েছে ছফার প্রতি কেমন এক দুর্বলতা জমেছে মুশকানের মনে। 

দ্বিতীয় কাহিনি - ধারাবাহিক দ্বিতীয় আখ্যান – ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও আসেননি’ শুরু হচ্ছে রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানের বর্ণনা দিয়ে। 

“সহস্র কপালে লাল সূর্য! কালো মেঘপুঞ্জে চেপে বসেছে শ্বেতশুভ্র ফুলের মেঘ! সেই ফুলের গন্ধে ম-ম করছে চারপাশ।“ – তিনটি বাক্যের ভেতর কত সহজে ধরা হয়েছে উৎসবে হাজারো নারীর অংশগ্রহণ। গোয়েন্দা নুরে ছফা এদের ভেতর খুঁজে বেড়াচ্ছেন তিন বছর আগে পালিয়ে যাওয়া মুশকান জুবেরিকে। রবীন্দ্রনাথের গানের ভেতর ভীড়ের ভেতর শত শত নারীর মুখের ভেতর যেই মুখটা খুঁজে বেড়াচ্ছেন তিনি – নিশ্চিন্ত নন – মুখটি বাস্তব নাকি একটি ভ্রম। 

মুখবন্ধের উপক্রমণিকা শেষ হয় একটি ধাক্কার মধ্য দিয়ে। এখান থেকেই শুরু হয় নতুন আখ্যানের নতুন অধ্যায়। নতুন চরিত্র ডাক্তার লুবনা। অবসরপ্রাপ্ত গোয়েন্দা – নুরে ছফা যাকে গুরু মানেন – সেই কে এস খানের নতুন বান্ধবী ডাক্তার লুবনা। মনে হয়েছিল লুবনার একটা বড় ভূমিকা থাকবে এই কাহিনিতে। লেখক অবশ্য সেটা তুলে রেখেছেন ভবিষ্যতের কোন এক সময়ের জন্য। 

হঠাৎ-ই ঢাকার রাস্তায় ছফা দেখে ফেলেন মুশকানকে একটি দামী গাড়ির ভেতর। তিনি গাড়ির নম্বর দেখতে ভুলে যান। অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয় – কাহিনির বিস্তার ঘটাতে হয় এজন্য। 

এই পর্বের কাহিনিজুড়ে সবচেয়ে যে চরিত্রটি বেশি বিস্তৃত হয় – তিনি আশেক মাহমুদ। প্রাইম মিনিস্টারের অফিসের জাঁদরেল পিএস আশেক মাহমুদ। প্রাইম মিনিস্টারের পিএস ব্যক্তিগত কাজের জন্যই কত প্রভাব বিস্তার করতে পারেন, কত লম্বা তাঁর ক্ষমতা, কত বিচিত্র তাঁর চারিত্রিক স্খলন সব দেখা যায় আশেক মাহমুদের ভেতর। সরকারি গোয়েন্দা নুরে ছফা – আশেক মাহমুদের সরাসরি আদেশেই কাজ করতে থাকেন। যদিও পুরো কাজটিকে মনে হয় ব্যক্তিগত পর্যায়ে হচ্ছে। 

আশেক মাহমুদের বড় বোন ক্যান্সারে মৃত্যুপথযাত্রী। তাঁর ছেলে নিখোঁজ হবার পরই মূলত মুশকান কাহিনি শুরু হয়েছিল। এবার জানা গেলো আশেক মাহমুদের এই বড় বোনের বান্ধবী ছিলেন মুশকান। কাহিনি বাড়তে থাকে – জট পাকাতে থাকে – এবং নতুন মোড় নিতে থাকে। 

ছফার মনে হয় – মুশকান ভারতে আছেন। তিনি সেখানে যান। সেখানকার গোয়েন্দার সাহায্যে খুঁজে বের করেন – কলকাতাতেও মুশকানের কারণে নিখোঁজ হয়ে গেছে দু’জন যুবক – একজন ডাক্তার, অন্যজন শিল্পী। ডাক্তার আবার প্লাস্টিক সার্জন। তবে কি মুশকান চেহারা পাল্টে ফেলেছেন? 

মুশকানকে সাহায্য করেছেন যে ডাক্তার – বাংলাদেশের তিনি আবার নতুন কাহিনির জোগান দেন। জানান – মুশকান আসলে মুশকানের মেয়ে। পাঠকের মনে বিভ্রম তৈরি করার উদ্দেশ্য পুরোপুরি সফল হয়। 

আরেকটি নতুন চরিত্র চলে আসে অনেক শাখা-কাহিনির মূল হয়ে – ডাক্তার আসকারের মেয়ে সুস্মিতা। এই সুস্মিতাই কি মুশকান? 

রহস্য কাহিনির পুরোটা কখনো বলে দিতে নেই। আমিও বলবো না। পড়লেই জানা যাবে সুস্মিতা কে? কিংবা মুশকান কি আসলে মুশকান – নাকি মুশকানের মেয়ে! 

কাহিনি একই গলিতে বারবার ঘুরপাক খেলেও পড়ার আগ্রহ নষ্ট হয় না। তবে মাঝে মাঝে মনে হয়েছে কাহিনির মেদ কিছুটা ঝরিয়ে ফেললে কাঠামো আরো মজবুত হতো। 

মনে হচ্ছে মুশকান কাহিনির আরো একটি উপাখ্যান প্রকাশিত হবে শীঘ্রই।  


Wednesday, 18 August 2021

পাঠপ্রতিক্রিয়া - রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি

 



সন্ধ্যে সাতটা থেকে এগারোটা পর্যন্ত একটানা পড়ে ফেললাম মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনো খেতে আসেননি’। দু’শ সত্তর পৃষ্ঠার বই – পড়তে চার ঘন্টা সময় লাগলো। অনেকে অনেক দ্রুত পড়তে পারেন, কিন্তু আমার বেশ সময় লাগে। টান টান উত্তেজনাময় থ্রিলার না হলে আরো কতঘন্টা লাগতো জানি না। 

মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন এখন বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের পরিচিত নাম – তাঁর থ্রিলারের কারণে। এবং সম্প্রতি এই বইয়ের ধারাবাহিক চলচিত্ররূপের কারণে। 

ব্যতিক্রমধর্মী নামের কারণেও এই বইটি পাঠকের মন কেড়েছে প্রকাশিত হবার পর পরই। ২০১৫ সালের বইমেলায় প্রথম প্রকাশিত হবার পর নাম শুনেছিলাম এই বইটির। নাম শুনে শুরুতে মনে হয়েছিল কবিতার বই। ইদানীং তো কবিতার বইয়ের কত বিচিত্র নাম হয়। রবীন্দ্রনাথের নাম জড়িয়ে থ্রিলার – নিঃসন্দেহে অনন্য – এর আগে এরকম হয়নি আর। বইটি পড়বার সুযোগ হয়নি এতদিন। ইদানীং অনেকগুলি বাংলা বইয়ের ওয়েবসাইট আছে – যেখানে বাংলা বইয়ের স্ক্যানকপি আপলোড করা হয়। এসব বই ডাউনলোড করে পড়ার ক্ষেত্রে কপিরাইট লঙ্ঘিত হচ্ছে কি না তা মনে থাকে না। বই পড়ার ক্ষেত্রেও মনে হয় প্রেমের মতোই ‘ন্যায় অন্যায় জানি নে জানি নে জানি নে।‘

গল্পের শুরুটা হয় সুস্বাদু খাদ্যের গন্ধের ভেতর দিয়ে। ঢাকা থেকে অনেক দূরে সুন্দরপুর মফস্বল শহরে হাইওয়ের পাশে রেস্টুরেন্টের নাম ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনো খেতে আসেননি’। কাহিনির শুরুতেই রেস্টুরেন্টের পরিবেশ এবং খাদ্যের বর্ণনার মধ্য দিয়ে সূক্ষ্মভাবে তৈরি হতে থাকে রহস্যের জাল। তখনো বোঝা যায় না মূল চরিত্র কে। খাদ্যের মেনু থেকে বার বার উঠে আসে – একটি নাম মুশকান। প্রথম অধ্যায়ের আগে মুখবন্ধের শেষের দিকে আমরা নিশ্চিন্ত হই রেস্টুরেন্টের মালিক মুশকান জুবেরিকে ঘিরেই ঘটতে থাকবে ঘটনা। 

ঢাকা থেকে বিশেষ মিশন নিয়ে যিনি আসেন এবং স্থানীয় থানার ইনফরমার আতর আলীর সাথে যার উদ্দেশ্যমূলক সখ্য গড়ে ওঠে – আমরা জানতে পারি তিনি মহাকাল পত্রিকার সাংবাদিক নুরে ছফা। অনেকগুলি অধ্যায় এবং ঘটনার পরেই শুধু আমরা জানতে পারি নুরে ছফা সাংবাদিক নন – গোয়েন্দা সংস্থার লোক।

প্রচলিত থ্রিলারে যেমন একজন কেন্দ্রীয় চরিত্র থাকেন – যিনি শুরু থেকেই সবকিছুর কেন্দ্রে এসে বসে থাকেন, খুব বাহাদুরি দেখাতে থাকেন আর পাঠকও আশা করতে থাকেন সবশেষে তিনিই জয়ী হবেন, রহস্যভেদ করবেন – আমাদের নুরে ছফাকে সেরকম বাহাদুর মনে হয় না। এতে রহস্য আরো জমতে থাকে। পাঠক পরিচিত হতে থাকে অন্যান্য চরিত্রের সাথে। গুড়ের চা বিক্রেতা রহমান মিয়া, গোরখোদক ফালু, এস আই আনোয়ার, এস পি মনোয়ার, স্থানীয় এমপি আবদুল্লাহ। ঘটনাগুলি এমনভাবে ঘটে, এমন পটভূমিতে ঘটে – আমাদের মনেই থাকে না যে আমরা একটা কাল্পনিক রহস্য গল্প পড়ছি। 

গল্পের ফাঁকে ফাঁকে আমরা সামাজিক রাজনৈতিক বাস্তবতাও নতুন করে জানতে পারি। সাগর-রুনি দম্পতির নাম না নিলেও আমরা বুঝতে পারি কোন্‌ সাংবাদিক দম্পতির হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করতে দেয়া হচ্ছে না – বলা হচ্ছে। স্থানীয় এমপি-রা ক্ষমতার দাপটে কী করেন, থানা-পুলিশ এমন কি পুলিশের সামান্য ইনফরমারও যে বাংলাদেশে কী পরিমাণ দাপট দেখায় – তা বুঝতে পারি তাদের চরিত্রের ভেতর দিয়ে – অথচ মূল রহস্য থেকে একটুও দূরে না সরে। 

জমিদার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে আরেক জমিদার অলোকনাথ বসুর পরিচয় এবং বন্ধুতাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় – আমাদের মনে হতে থাকে অলোকনাথ বসু নামে কেউ একজন সত্যিই ছিলেন কোন এক সময় -যার বাড়িতে এখন মুশকান জুবেরি থাকেন – যিনি সম্পর্কে অলোকনাথ বসুর নাতবৌ। মাস্টার রমাকান্তকামারকেও মনে হয় ইতিহাসের অংশ। 

গোয়েন্দা নুরে ছফা যে ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে মুশকান জুবেরির সন্ধান পান – তা অভিনব। এই রেস্টুরেন্টে খেতে এসে একের পর এক পাঁচ জন তরুণ উধাও হয়ে গেছে। তারা কোথায় গেল! কী রহস্য তাদের অন্তর্ধানের! 

১৯৭২ সালের অক্টোবরে ল্যাটিন আমেরিকার যে বিমান দুর্ঘটনার পরবর্তী ঘটনাকে কেন্দ্র করে মূল রহস্য ঘনীভূত হয় – যদিও বাস্তব ঘটনাটি ছিল উরুগুয়ের এয়ারফোর্সের একটি প্লেন এবং যাত্রীরা ছিল রাগবি টীমের সদস্য – লেখক খুবই বিশ্বাসযোগ্যতার সাথে সেই সময়ের ২৫ বছর বয়সী ডাক্তার মুশকান সোহেলীর সেই প্লেনে ভ্রমণ এবং দুর্ঘটনার এবং পরের ঘটনার একজন করে তোলেন। রহস্য এখানে এসে কেন্দ্রীভূত হয় – মুশকানের বর্তমান বয়স সত্তরের উপর হবার কথা থাকলেও কেন তাকে তিরিশ বছরের তরুণীর মতো লাগে এখনো? 

পাঠকদের মধ্যে যারা থমাস হ্যারিসের সৃষ্ট চরিত্র হ্যানিবল লেকটার সম্পর্কে জানেন – তাঁরা জানেন হ্যানিবল লেকটার নরমাংসভোজনকে কীভাবে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। সিরিয়াল কিলার হ্যানিবল লেকটার – জ্যান্ত অবস্থায় মানুষের ব্রেন স্লাইস করে কেটে নিয়ে রান্না করে যার ব্রেন তাকেই খাইয়েছে এমন বর্ণনাও আছে থমাস হ্যারিসের বইতে। মুশকান জুবেরির ভেতর হ্যানিবল লেকটারের খুব সামান্য একটু ছায়া দেখা দিয়েই মিলিয়ে যায়। এখানেই লেখক মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের নিজস্বতা আলোকিত হয়ে ওঠে। অবশ্য শেষের অধ্যায়ে মুশকান যেভাবে পালিয়ে যান – তার সাথে হ্যানিবল লেকটারের পালানোর মিলটা একটু বেশিই ছিল।

পাঠককে উত্তেজনার টানে টেনে রাখার ক্ষমতা যে লেখকের যত বেশি – থ্রিলারের ক্ষেত্রে তিনি ততই সফল। এই বইতে সেই টান শুরু থেকে শেষ পর্যন্তই আছে। 

খুব আনন্দ পেলাম এই থ্রিলার পড়ে। 

এখন এর দ্বিতীয় পর্ব ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও আসেননি’ পড়তে হবে। 


Sunday, 4 July 2021

বুদ্ধদেব গুহর পঞ্চম প্রবাস

 


বুদ্ধদেব গুহর ভ্রমণ সমগ্রর তৃতীয় বই পঞ্চম প্রবাস। এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮০ সালের অক্টোবরে। সত্তরের দশকের শেষভাগে লেখক আফ্রিকা ভ্রমণে গিয়েছিলেন। এই বইটি সেই ভ্রমণের বর্ণনা।

ভারত মহাসাগরের ছোট্ট একটি দ্বীপরাষ্ট্র সেশেল্‌স (Seychelles). ১১৫টি ছোটবড় দ্বীপ নিয়ে এই স্বাধীন রাষ্ট্রটি। সবচেয়ে বড় দ্বীপ ভিক্টোরিয়া – মাত্র ১৮ মাইল লম্বা ৩ মাইল চওড়া। এখানেই দেশটির রাজধানী। আফ্রিকা থেকে মাত্র ১৫০০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত এই দেশ। মাত্র এক লক্ষ মানুষ নিয়ে আফ্রিকার সবচেয়ে ছোট দেশ সেশেল্‌স।

ভারত থেকে সরাসরি কোন ফ্লাইট নেই। লেখক গিয়েছিলেন মরিশাস থেকে।

সেশেল্‌স-এ প্রচুর ভারতীয় ব্যবসা করেন। সামুদ্রিক মাছ, প্রচুর নারকেল, আর পর্যটন এই দেশের প্রধান আয়ের উৎস।

সেশেল্‌স-এ দু’দিন থেকে পূর্ব আফ্রিকার তানজানিয়ায় মূল ভ্রমণ লেখকের।

আফ্রিকায় এটা লেখকের প্রথম ভ্রমণ। চাঁদের পাহাড়ের দেশ, রবীন্দ্রনাথের আফ্রিকা কবিতার দেশ। কর্পোরেট কাজের সূত্রে গিয়েছিলেন। তাঁরাই সবকিছু ব্যবস্থা করে রেখেছিল। কাজ সেরে আফ্রিকার জঙ্গলে কয়েক সপ্তাহ কাটানোর এলাহি ব্যবস্থা- গাড়ি, গাইড এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিকতা সবকিছু।

লেখক যখন ভ্রমণ করছিলেন – সেই সময় তাঞ্জানিয়া ছিল কমিউনিস্ট দেশ। সবাই তখন কমরেড। অন্যকোন রাজনৈতিক পার্টি সেখানে ছিল না। [১৯৯২ সালে সংবিধান পরিবর্তন করে বহুদলীয় ব্যবস্থার অনুমোদন দেয়া হয়।]

ডার-এস-সালামে দু’দিনের কনফারেন্স সেরে কেনিয়ার রাইবোবিতে একদিনের কনফারেন্স।

ডার-এস-সালাম থেকে গেছেন তানজানিয়ায়। কিলিম্যানজারো এয়ারপোর্টে নেমেই চলেছেন ন্যাশনাল পার্কে পশুপাখির সঙ্গে থাকতে। সারাপৃথিবীর পর্যটকরা এই করতেই আসেন তানজানিয়ায়, আফ্রিকায়।

এয়ারপোর্ট থেকে ২৯ মাইল দূরে আরুশাতে যাবেন লেখক। ট্যাক্সিতে উঠলেন আরো দু’জন পরিচিত ভারতীয় ভদ্রলোক মিস্টার মেহেতা ও মিস্টার প্যাটেলের সঙ্গে। পথে ট্যাক্সির টায়ার ফেটে যায়।

আরুশা দার্জিলিং-এর মতো ছোট্ট সুন্দর শহর। ট্যুরের ব্যবস্থা আগেই করা ছিল। অপারেটর হোটেলে এসে দেখা করে গেল। কর্পোরেট ম্যানেজার দীনুভাই আর হুইট্‌লি সাহেব সব রকমের আরামের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। হোটেল, গাড়ি, ড্রাইভার, গাইড এবং রাতে শীত দূর করার জন্য ‘মিশরের সাপের মতো কালো চকচকে একটি হিলহিলে তরুণী’। লেখক অবশ্য অন্য সব সুবিধা নিলেও তরুণীর সুবিধা নেননি। তিনি দাবি করেছেন, “যে মানুষ প্রকৃতি নামক আদিক, নরম, রূপসী এক চন্ডী নারীর প্রেমে তেমন করে পড়েছে তার কালো অথবা সাদা, কোনো মানবীকেই প্রয়োজন হয় না যখন সে তার পরম প্রেমিকার কাছে থাকে। এমন সুন্দরী, বৈচিত্র্যময়ী এমন স্নিগ্ধ অথচ উষ্ণ নারী পৃথিবীতে আর কে আছে? যার চোখ আছে, কান আছে, যার সমস্তি ইন্দ্রিয় সজাগ; সেই শুধু জানে প্রকৃতিকে প্রেমিকা করার আনন্দ কী এবং কতখানি” [পৃষ্ঠা ১৮৬]

লেখকের জন্য একটা গাড়ি, আর ড্রাইভার কাম গাইড কিলালাকে নিয়ে বের হয়ে পড়লেন সেরিঙ্গিটি ন্যাশনাল পার্কের উদ্দেশ্যে। পথের মধ্যে শত শত বন্য জন্তু – মাইলের পর মাইল বিস্তীর্ণ জমি। সেখানে চরছে বুনো মোষ হাজার হাজার।

জঙ্গলের ভেতর হোটেল। প্রথম রাত কাটলো গোরংগোরোর ক্র্যাটার লজে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মৃত আগ্নেয়গিরি গোরংগোরো। এখানে মাসাইদের বাস। আফ্রিকার মাসাই উপজাতিদের নিয়ে আরো বই লিখেছেন বুদ্ধদেব গুহ। ড্রাইভার ও গাইড কিলালার সাথে কিছুটা অন্তরঙ্গতার সম্পর্কও তৈরি হয় লেখকের।

গোরংগোরা হোটেল থেকে পরদিন নতুন ড্রাইভার ও নতুন ফোর হুইল ড্রাইভ গাড়ি। নতুন ড্রাইভারের নাম ডিক্সন।

লেখক ক্যামেরায় ছবি তুলতে দক্ষ নন। ভালো ক্যামেরাও সাথে ছিল না। তিনি লিখছেন, “আমি নিজে কোনো দিনও ক্যামেরাতে বিশ্বাস করিনি। অবশ্য আমি জানি যে, এমন আহাম্মকের মতো কথা বললে এযুগে সবাই হাসবেন, যে যুগে মানুষের চোখেরই বিকল্প হয়েছে ক্যামেরা।“ [পৃষ্ঠা ১৯৫] [লেখক এই কথাগুলি লিখেছিলেন সেই ১৯৮০ সালে যখন ফিল্ম ক্যামেরাও মানুষের হাতে হাতে ছিল না। এখন কী বলেন আমি জানি না।]

ক্যামেরায় ছবি তুলতে গিয়ে বিপত্তি। ক্যামেরায় রিল ভরতে গিয়ে ক্যামেরা নষ্ট হয়ে যাওয়া। পরে এক জার্মান পর্যটকের সাহায্য নিতে গিয়ে তাদের সঙ্গে অন্তরঙ্গতা এবং তাদের কাহিনিও এই ভ্রমণকাহিনির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হয়ে ওঠে।  

প্রচুর চিতা, সিংহ ঘুরে বেড়াচ্ছে বনের ভেতর। শিকার করছে। এর মধ্যেই গাড়ির ভেতর থেকে পশু দেখা, পাখি দেখা। পথে হাতির পাল পড়ে। বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে হয় এসব পশুদের আক্রমণ থেকে বাঁচতে।

জার্মান এক ইঞ্জিনিয়ার ভদ্রলোক এসেছেন স্ত্রী ও শ্যালিকাকে নিয়ে। তিনি লেখকের ক্যামেরা ঠিক করে দিলেন। এভাবেই পরিচয়। লেখক মুখ দেখে ভবিষ্যত বলতে পারেন জেনে এবং ভারতীয় জেনে ভদ্রলোক এবং তার শ্যালিকা দুজনই আলাদাভাবে তাঁর সাথে কথা বলেন। লেখক হয়তো মনস্তত্ত্ব জানেন। তিনি শ্যালিকাকে বলে দেন – তাঁর ভগ্নিপতিকে নিজের প্রেমের বন্ধন থেকে মুক্ত করে দিতে। ভদ্রলোককেও আলাদা করে বললেন। প্রেম ভালোবাসার অনেক গল্প উপন্যাস লিখেছেন লেখক। তাতে তাঁর অনেক মনস্তত্ত্ব জানা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তিনি জার্মান ভদ্রলোকের ব্যক্তিগত ত্রিভুজ প্রেমের সম্পর্কের টানাপোড়েন ঠিক করে দিলেন এক সন্ধ্যায় কিছুক্ষণের দার্শনিক কথাবার্তা বলেই।

লেখক নারীদের সম্পর্কে এমন কিছু লিখেছেন – যা বিভিন্নভাবে বিতর্কিত। যেমন, “মেয়েদের মতো নরখাদক জানোয়ার ভগবান আর দুটি বানাননি। ধীরে ধীরে, অতি ধীরে তাকে সরিয়ে দাও। দুধ খেলে শরীরে বল হয়, কিন্তু রাবডি খেলে বদহজম হয়। হালকা ভালোলাগা, ভালোবাসা, মানে ভালোলাগাটা হচ্ছে দুধ, কিন্তু মোহ, অবৈধ-প্রেম এসব হচ্ছে রাবড়ি।“ [পৃষ্ঠা ২০৯]

জার্মান ইঞ্জিনিয়ারকে পরামর্শ দেয়ার সময় বলছেন, “ভালোবাসার অনেক রকম আছে। একসঙ্গে দুজন নারীকে যে ভালোবাসা যায় কাউকেই কিছুমাত্র না ঠকিয়ে, এটা আমরা পুরুষরা বিলক্ষণ বুঝি। কিন্তু মেয়েরা বোঝে না। দে ক্যান শেয়ার এনিথিং ইন দ্য ওয়ার্ল্ড, বাট নট দেয়ার হাজব্যান্ডস। নট বাই এনি মিন্‌স। তোমার স্ত্রীর দিকটা তোমার বোঝা উচিত। একটা সম্পর্ক ভেঙে দেওয়া খুব সোজা, কিন্তু যে নতুন সম্পর্কের আশায় পুরোনো সম্পর্ক ভাঙছ, তাও যে একদিন ভাঙবে না তা জানছ কী করে?” [পৃষ্ঠা ২১০]

আবার কিলালার গাড়িতে যাত্রা। বনের ভেতর ঘুরতে ঘুরতে লেখকের উপলব্ধি, “ভারি ভালো লাগছে। কাজ নেই, ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে দিন বাঁধা নেই, সওয়াল নেই, জবাব নেই; সভ্যতার অন্যতম অভিশাপ টেলিফোন নেই…”[পৃ ২১২]। সেই ১৯৮০ সালে যদি টেলিফোন সভ্যতার অন্যতম অভিশাপ হয়ে থাকে, আজকের টেলিফোন সিস্টেমকে কী বলবেন লেখক!!

আফ্রিকার প্রবাসী ভারতীয়দের সম্পর্কে খুব একটা উচ্চ ধারণা পোষণ করেননি লেখক। তিনি বলেছেন, “প্রচুর টাকা রোজগার করে, উঁচু ভল্যুমে হিন্দি ফিল্ম-এর গান শুনে, চুড়মুর, ঢোকলা এবং একগাদা চিনি ও দুধ-দেওয়া চা খেয়ে, বিয়ার পান করে পোলে পোলে জীবন কাটিয়ে দেন এঁরা।“ [পৃ ২১৫]

সেরেঙ্গেটি ন্যাশনাল পার্কে মারাত্মক সেৎসি মাছি আছে। এগুলির কামড়ে মানুষের ইয়েলো ফিভার হয়। আফ্রিকায় যাবার সময় অনেক রকমের প্রতিষেধক ইঞ্জেকশান নিয়ে যাবার দরকার হয়। সেৎসি মাছি এবং তাদের আক্রমণ সম্পর্কেও অনেক ঘটনা ঘটে এই ভ্রমণে।

সেরেঙ্গেটির জন্তু জানোয়ার দেখতে দেখতে যে হোটেলে রাতে ছিলেন সেখানেই উঠেছিলেন পথে পরিচিত জার্মান ভদ্রলোক। তাঁর শালি লাইলাক লেখকের  পরামর্শ পাবার পর থেকে লেখকের ভক্ত হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে যেন প্রেমেই পড়ে যাচ্ছে। হোটেল থেকে রাতে বের হওয়া নিষেধ। কারণ হোটেলের কাছেও ভয়ানক জন্তু জানোয়ার চলে আসে। কিন্তু লেখক লাইলাককে সাথে নিয়ে গভীর রাতে বের হয়ে পড়ে। সেখানে তারা একসাথে জন্তু দেখে, প্রকৃতি দেখে, পাশাপাশি বসে মদ খায়, আর সিংহের পাল্লায় পড়ে। লেখকের শিকারের অভিজ্ঞতা আছে। কেবলমাত্র টর্চের আলো ফেলে সিংহের পালকে সম্মোহিত করে ফেলেন তিনি। লাইলাক তো প্রেমে হাবুডুবু খেতে থাকে। কিন্তু আমাদের লেখক মহামতি ভীষ্মের মতো লাইলাকের সাথে রাত যাপনের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন।

সেরেঙ্গেটি ন্যাশনাল পার্কে রাতের বেলা গাড়ির টায়ার নষ্ট হয়ে যায়। এক্সট্রাটাও নষ্ট। অন্য কোন গাড়ি সেই রাতে যাবার কথা নয়। রাতের অন্ধকারে প্রচন্ড ঠান্ডায় হাতির পাল এসে গাড়ি ঝাঁকিয়ে চলে যায়। লেখক এখানে লিখছেন ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন। [ইওরোপ ভ্রমণের সময় বলেছিলেন তাঁর ঈশ্বর মন্দিরে থাকে না। তিনি মন্দিরে যান না। আমি ভেবেছিলাম তিনি যুক্তিবাদী।] এখানে তিনি ভাগ্যবাদী। কপালে যা থাকবে তাই হবে টাইপ। নিজে এত বছর ধরে গাড়ী চালালেও গাড়ির কাজকর্ম সম্পর্কে কিছুই জানেন না। কোনদিন টায়ার বদলাননি এবং বদলাতে সাহায্য করতেও রাজি নন।

রাতে সেই জার্মান ললনা লাইলাক গার্ড নিয়ে গিয়ে জঙ্গল থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন লেখক এবং তার ড্রাইভারকে।

ভ্রমণকাহিনি শুধু ভ্রমণের কাহিনি হয়ে থাকে না। ইতিহাস থাকে সেখানে, মানুষ থাকে, মানুষের সংস্কৃতি থাকে। তাই এর পাঠে লেখকের সাথে পাঠকেরও ভ্রমণ হয়ে যায়।

এই বইয়ের কিছু ভালো লাগা লাইন:

যা পছন্দের তাকে কখনও বেশিদিন কাছে রাখতে নেই। সে অপছন্দেরই হয়ে পড়ে তাতে। [পৃ ২৪৯]

যখন সময় থাকে, তখন চোখের নীরব ভাষায়, মুখে কিছু না বলেও অনেক কথাই বোঝানো যায়; আর যখন থাকে না, তখন চিৎকার করলেও কেউ কিছুই শুনতে পায় না। [পৃ ২৫০]

এক জীবনে কতটুকুই বা জানা যায়? অনেকই বাকি থাকে। সব সময়েই সেই বাকি থাকার মানে শূন্যতা নয়। [পৃ ২৫৮]

কী মানুষ, কী পশু, সকলেই অথরিটিকে ভয় পায়, এবং মানে। আমাদের সকলের মধ্যেই মাথা নিচু করার, চোখ-রাঙানি মেনে নেবার একটা স্বাভাবিক প্রবণতা আছে। যদিও সেটা লজ্জাকর। এই বাবদে মানুষ পশুর সঙ্গে একাসনে বসেছে চিরকাল। [পৃ ২৬১]

ভ্রমণ সমগ্র ১ – প্রকাশিত হয়েছে কলকাতার দে’জ পাবলিশিং থেকে ২০১৬ সালে।


Saturday, 3 July 2021

আহমদ ছফার 'যদ্যপি আমার গুরু'

 



বাংলাদেশের সাহিত্যের ভুবনে লেখক আহমদ ছফার স্থান অনেক বড়। তাঁর নিজের জায়গা তিনি নিজেই তৈরি করে নিয়েছেন। তিনি অত্যন্ত ভালো লেখেন, সেটা আমরা যেমন জানি – তিনি জানতেন আরো বেশি। তাই তাঁর লেখায় আত্মবিশ্বাসের সাথে অহংকারের মিশেলও আছে, নিজের মতোই – প্রবলভাবে আছে।

বিজ্ঞান গবেষণায় ব্যক্তি বিজ্ঞানীর চেয়েও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এবং উদ্ভাবনই প্রাধান্য পায় বেশি। কিন্তু সাহিত্যে অনেক সময়ই ব্যক্তিগত পরিচয় প্রাধান্য পায়, ব্যক্তিগত সম্পর্ক প্রাধান্য পায় সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার ক্ষেত্রে। সাহিত্য নৈর্ব্যাক্তিক বিষয় নয়। এখানে ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গিই প্রধান। বেশিরভাগ পাঠক নিজের মতামত প্রকাশ করার ব্যাপারে সহজে আত্মনির্ভরশীল হতে পারেন না। একেক জন পাঠকের একেক রকমের লেখা ভালো লাগতে পারে। তাই একেবারে খারাপ লেখা – বা একেবারে ফাটাফাটি রকমের ভালো লেখা আমরা যাকে বলি – সেটাও কিন্তু সব পাঠকের মতামত নয়। কোন একটা বই পড়ে আমার নিজের কেমন লাগলো – তার ভিত্তিতেই আমার মতামত। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় – অন্যান্য পাঠকের মতের চাপে অনেকে ভিন্নমত প্রকাশ করতে চান না। কোন একটা বই পড়ে আমি শুধু আমার কেমন লাগলো তা বলতে পারি। অন্যের কেমন লাগবে বা লাগা উচিত তা বলা আমার পক্ষে অনুচিত, এবং অসম্ভবও বটে।

আহমদ ছফার ‘যদ্যপি আমার গুরু’ একটি বিখ্যাত বই। বইটি প্রকাশিত হয়েছে ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারির বই মেলায়।  প্রকাশক মাওলা ব্রাদার্স, প্রচ্ছদ কাইয়ুম চৌধুরী। বইটি তিনি উৎসর্গ করেছেন ড. আহমদ শরীফকে। ১১০ পৃষ্ঠার ছোট্ট একটা বই, এক বসায় পড়ে ফেলা যায়। আমি দুই বসায় দু’বার পড়েছি বইটি।

দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকার সাহিত্য পাতায় চার মাস ধরে প্রকাশিত হয়েছিল। ভূমিকা লিখতে অনুরোধ করেছিলেন ডক্টর আনিসুজ্জামানকে। পরে নিজেই লিখলেন।

সাতাশ বছর ধরে প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের সংস্পর্শে ছিলেন আহমদ ছফা। দীর্ঘদিনের পরিচয় অনেক সময় বিবর্ণ হয়ে ওঠে, একঘেয়ে হয়ে ওঠে। রাজ্জাক সাহেব একদিনের জন্যও পুরনো হননি। সম্পূর্ণ ব্যক্তিত্বকে ধরতে চেয়েছিলেন তিনি, ধরেছেন। বলা চলে তাঁর মতো করে আর কেউ হয়তো ধরতে পারেননি।

নিজের সাথে প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের সম্পর্কের কথা, বোধের কথা, জ্ঞানের কথা এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা বলার সময় – নিজেকে তো আলাদা করা যায় না। তাই আহমদ ছফা নিজের কথাও অনেক বলেছেন এই বইতে।

আহমদ ছফা সাহসী ছাত্র ছিলেন। ১৯৭০-এ তিনি এম এ পাস করার আগেই বাংলা একাডেমীর পিএইচডি প্রোগ্রামের স্কলারশিপের জন্য দরখাস্ত করেছিলেন। তাঁর দরখাস্ত বিবেচনার জন্য তিনি একাডেমীর সভাপতি কবীর চৌধুরীর সাথে দেখা করেছিলেন। [এগুলি কি তখন থেকেই ছিল? এবং তিনি তাতে পারদর্শী ছিলেন। একাডেমীর সদস্য মুনীর চৌধুরীর সাথেও তিনি দেখা করে অনুরোধ করেছিলেন তাঁকে সুপারিশ করার জন্য। আবার মুনীর চৌধুরি যখন তাঁকে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানোর আশ্বাস দেন- তাকে প্রত্যাখ্যান করেন এই যুক্তিতে যে তিনি যখন বাংলা বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন তখন শিক্ষকদের উৎসাহ পাননি। কী ধরনের উৎসাহ তিনি চেয়েছিলেন? পাস কোর্সে বিএ পাস করেন বাংলা অনার্স ছেড়ে। পরে প্রাইভেটে পলিটিক্যাল সায়েন্সে মাস্টার্স পড়েন। সেই সময় দরখাস্ত করেন পিএইচডির জন্য।]

ইন্টারভিউ বোর্ডের ডক্টর এনামুল হক ছাড়া বাকি সবাইকে চিনতেন তিনি। সবার কাছেই তিনি গিয়েছিলেন ইন্টারভিউর আগে। [এই ব্যাপারটা কি ন্যায়সঙ্গত? অন্য প্রার্থীদের হয়তো এই সুযোগ ছিল না।]

তিনি বৃত্তি পেয়েছিলেন। কিন্তু পিএইচডি শেষ করতে পারেননি। এর জন্য দায়ী করছেন প্রফেসর আবদুর রাজ্জাককে। কাহিনির শুরু সেখান থেকেই।

আহমদ ছফা প্রাইভেটে এম এ পরীক্ষা পাস করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশি শিক্ষককে  চেনেন না বলেছেন। বন্ধুরা পরামর্শ দিলেন রাজ্জাক সাহেবের কাছে পিএইচডি করতে।

বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টারে স্যারের বাসায় গেলেন। দেখলেন খুবই সাদামাটা জীবনযাপন তাঁর। একটি চৌকির পায়া নেই। সেখানে বই দিয়ে পায়ার কাজ করানো হয়েছে। অনেক বই স্যারের বাসায়। কিন্তু খাবারদাবারের আয়োজন এলাহি, খেতে এবং খাওয়াতে ভালোবাসেন প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক।

রাজ্জাক সাহেবের সাথে প্রথম সাক্ষাৎ খুব মজার। আহমদ ছফাকে তিনি সরাসরি উপেক্ষা করেছেন। [যে মানুষ ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকরা যথেষ্ট উৎসাহ দেননি অভিযোগ করেন, সেখানে এরকম ব্যবহারে তিনি খুশি হয়ে গেলেন।]

রাজ্জাক সাহেব ছিলেন লেকচারার। নিয়ম অনুযায়ী মিনিমাম রীডার হতে হয়। তাই থিসিস সুপারভাইজার হতে পারলেন না।

প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক আহমদ ছফাকে ডাকতেন মৌলবি আহমদ ছফা বলে। কোন কারণ ছাড়াই। এবং এর কী কারণ থাকতে পারে সে ব্যাপারে কোন কৌতূহলও প্রকাশ করা হয়নি কোথাও।

১৯৭২ সালে তিনি জাতীয় অধ্যাপক হয়ে গেছেন। পলিটিক্যাল সায়েন্সের চেয়ারম্যান হয়েছেন। কারণ তাঁর স্নেহাস্পদ ডক্টর মোজাফফর আহমদ চৌধুরি উপাচার্য হয়েছেন। [একজন লেকচারার জাতীয় অধ্যাপক। বঙ্গবন্ধু করেছিলেন। কিন্তু রাজ্জাক সাহেব ছিলেন মুসলিম লীগার]

প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক অনেক বিষয় নিয়েই নিজের মত ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু সবই মৌখিকভাবে। তিনি বলেছেন – কোন্‌ জাতি কী খায় কী পড়ে না জানলে সেই জাতি কোন্‌দিকে যাচ্ছে জানা যায় না। এই কথাটি কি এখন খাটে? এখন বিশ্বায়নের যুগ। খাদ্য এখন বৈশ্বিক হয়ে উঠছে।

আবদুর রাজ্জাক অনেক বিখ্যাত মানুষ সম্পর্কে নেতিবাচক কথা বলতে পছন্দ করতেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে অত্যন্ত আপত্তিজনক কথাবার্তা বলতেন। বলতেন ‘মোহিতলালের জিভের মইধ্যে বিষ আছিলো’। নিয়াজ মোর্শেদকে দাবাড়ু তৈরি করতে অনেক সাহায্য করেছেন আবদুর রাজ্জাক। রাজা রামমোহন রায়কে বলেছেন – ভুয়া রাজা, ঘুষ খেতেন ইত্যাদি।

প্রফেসর রাজ্জাকের কাছে সবাই যেতেন সুবিধা আদায় করার জন্য। আবদুল মতিন চৌধুরিও গিয়েছিলেন। তিনি পিএইচডির থিসিস রেখে গিয়েছিলেন প্রফেসর রাজ্জাকের বাসায়। প্রফেসর হবার কমিটিতে যারা আছেন তাদেরকে বলে দেয়ার জন্য। [তবুও ভালো যে সেই সময় এরকম কমিটি ইত্যাদি ছিল। এখন তো আরো অনেক সহজ হয়ে গেছে।]

লেখাপড়ার ব্যাপারে প্রফেসর রাজ্জাকের উপদেশ - পড়ার সময় প্রয়োজনীয় নোট নেয়ার ব্যাপারটা – নতুন কিছু নয়। গবেষক মাত্রেই ব্যাপারটা জানেন। ‘ক্ষেত চষবার সময় জমির আইল বাইন্ধা রাখতে অয়’। কিন্তু রাজ্জাক স্যার নিজে কোনদিন কোনকিছু নোট করেছেন বলে শোনা যায় না। অন্তত বিলেত থেকে ফিরে আসার পর – তিনি যা করেছেন – তার সবকিছুই একাডেমিক স্বেচ্ছাচারিতা। শুনতে খারাপ লাগলেও – ব্যাপারটা সেরকমই।

প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক কিছুই পাবলিশ করেননি। অনেক উন্নতমানের কাজ ট্রটস্কির থিওরি অব পার্মানেন্ট রেভ্যলিউশেন এর বাংলা অনুবাদ, কিংবা অবন ঠাকুরের ইংরেজি অনুবাদ – এতো অনুবাদ করেছিলেন বলে বলেছেন তিনি। কিন্তু প্রমাণ কোথায়? কেউ তো সেই পান্ডুলিপি দেখেননি। তাঁর মৌলিক লেখা কোথায়?? বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে এসে একজন মনীষি কিছু না লিখে – শুধুমাত্র একতরফা কথা বলে বিখ্যাত জ্ঞানী হয়ে গেলেন কীভাবে?

প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন মুসলিম লীগের সমর্থক। তিনি মনেপ্রাণে পাকিস্তান চেয়েছিলেন। নেহেরুর চেয়ে তিনি জিন্নাহকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিতেন, অনেক বেশি জ্ঞানী মনে করতেন, অনেক বেশি বড় মাপের নেতা মনে করতেন। নেহেরুকে যেভাবে পারেন ছোট করতে পছন্দ করতেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রফেসর রাজ্জাকের ভূমিকা স্পষ্ট নয়। কিন্তু আহমদ ছফা বলেছেন অন্য কথা। তিনি প্রফেসর রাজ্জাকের মুসলিম লীগ করাকে ডিফেন্ড করার চেষ্টা করেছেন।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রফেসর রাজ্জাকের ভূমিকা যেমন জানা যায় না, তেমনি ভাষা আন্দোলনের সময়েও তাঁর কোন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা দেখা যায় না। বঙ্গবন্ধুকে তিনি সমর্থন করেননি। বইতে আছে তিনি বলেছেন তিনি বঙ্গবন্ধুকে নেহেরুরু উদাহরণ দেখিয়ে বলেছিলেন বিরোধী দলকে একশটি সিট ছেড়ে দিতে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সিট ছেড়ে দেয়া হয় কীভাবে? বিরোধী দল তৈরি করাও কি সরকারের দায়িত্ব? আর যে নেহেরুকে তিনি পছন্দ করেন না, সেই নেহেরুর উদাহরণকে আদর্শ মানেন কীভাবে? ১৯৭৫ এর পর প্রফেসর রাজ্জাকের ভূমিকা কী ছিল তার কোন উল্লেখ এখানে নেই। 

প্রফেসর রাজ্জাককে মাঝে মাঝে অতিনায়ক তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে। সলিমুল্লাহ খান বৃত্তির জন্য কামাল হোসেন ও আবদুর রাজ্জাকের সুপারিশপত্রের জন্য গেছেন। সলিমুল্লাহ খান – রাজ্জাক সাহেবের উপর বই লিখেছিলেন। তাতে সবাই অখুশি হয়েছিলেন। রাজ্জাক সাহেব নিজে তাকে অনেক সাহায্য করেছেন। আমেরিকা যাবার প্লেনভাড়াও দিয়েছেন।

সেই সময়ের হিন্দু সাহিত্যিকদের উপন্যাসে মুসলমান চরিত্রের সংখ্যা কম বলেই নাকি তিনি পাকিস্তান চেয়েছিলেন? আলাদা রাষ্ট্র চেয়েছিলেন মুসলমানদের জন্য। কিন্তু মুসলমান সাহিত্যিকদের উপন্যাসে কয়টা হিন্দু চরিত্র আছে এই প্রশ্ন কি তিনি কখনো করেছিলেন?

শিল্পী সুলতানকে সাহায্য করেছেন আহমদ ছফা ও আবদুর রাজ্জাক। শিল্পী সুলতানের শৈল্পিক প্রতিষ্ঠার পেছনে প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক অনেক ভূমিকা রেখেছেন।

আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কথা আছে। ভালো স্কুল তৈরি না করে কলেজ তৈরির কুফল সম্পর্কে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু তিনি তো এত ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। যাকে খুশি বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি দিতে পারতেন। তিনি নিজে কেন উদ্যোগী হননি?

সত্যেন বসুর পান্ডিত্যের কথা স্বীকার করেছেন রাজ্জাক স্যার।

বঙ্গবন্ধু বাধ্য হয়েছিলেন হেনরি কিসিঞ্জারকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ করতে। হেনরি কিসিঞ্জার এসেছিলেন, ৪৫ মিনিট হোটেল কন্টিনেন্টালে ছিলেন। তার মধ্যে ২৫ মিনিট রাজ্জাক সাহেবের সাথে ছিলেন।

লেখক আহমদ ছফা সৈয়দ আলি আহসানের সাথে দেখা করেছেন ফাউস্ট অনুবাদ প্রকাশ করার ব্যাপারে সাহায্য পাবার জন্য। তিনি নাকি সৈয়দ আলি আহসানকে পছন্দ করতেন না। আবার স্বার্থের জন্য গেলেনও।

লেখকদের মধ্যে অনেক স্ববিরোধিতা থাকে। কারণ প্রফেসর রাজ্জাকই একে স্বীকৃতি দিয়ে বলেছেন, “লেখক কবিরা যা বলে সেরকম আচরণ না করলেও চলে”। এই ব্যাপারটা আমি পাঠক হিসেবে মানতে পারি না। লেখক হলে কী করতাম জানি না।

প্রফেসর রাজ্জাককে নিয়ে অনেক বই লেখা হয়েছে। তাদের মধ্যে  যদ্যপি আমার গুরু – অনেক গুরুত্বপূর্ণ বই সন্দেহ নেই, কিন্তু প্রফেসর রাজ্জাক সম্পর্কে নির্মোহ নিরপেক্ষ বই একে বলতে পারছি না।

এই বইতে অনেক চমৎকার কথা এবং পর্যবেক্ষণ আছে।

“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা বিষয়ে যে গবেষণা হয়েছে তার বেশিরভাগই চাকুরির প্রমোশনের উদ্দেশ্যে লেখা।“

“কিছু কিছু জিনিস কাউরে অন্য মাইনষের সামনে দিলে মনে কষ্ট পাইতে পারে।“

“পুষ্টিকর খাদ্যের দুষ্প্রাপ্যতার কারণে মানুষ ক্ষুদ্রাকৃতির হয়ে যাচ্ছে।“

“বড়লোক আর বড় মানুষ এক নয়। বড়লোকদের মধ্যে বড় মানুষের ছায়া থাকে। বড় মানুষরা আসলেই বড় মানুষ।“

“বাংলা ভাষাটা বাঁচাইয়া রাখছে চাষাভুষা, মুটেমজুর – এরা কথা কয় দেইখ্যাইত কবি কবিতা লিখতে পারে। সংস্কৃত কিংবা ল্যাটিন ভাষায় কেউ কথা কয় না, হের লাইগ্যা এখন সংস্কৃত কিংবা ল্যাটিন ভাষায় সাহিত্য লেখা হয় না।“

“মওলানা ভাসানীর দু’রকম অসুখ ছিল। পলিটিক্যাল অসুখ ও আসল অসুখ।“

“যার মনে দয়া নেই তাকে উপরে আনা ঠিক নয়।“

“সৈয়দ আলি আহসান সত্য কথা বেশি বলতেন না।“

“তরুণ বয়সে মানুষের শরীরের কোনো অংশে চোট লাগলে যৌবনে সেটা অনুভব করা যায় না অনেক সময়। বুড়ো হলেই ব্যথাটা ফিরে আসে। মানুষের বিশ্বাস এবং সংস্কার এগুলো বেশি বয়সে নতুন করে জেগে ওঠে।“

“There are periods in history when crawling is the best means of communication.”

“এখানে প্রতিষ্ঠাসম্পন্ন কাউকে সালাম দিলে সালামটা তাঁর প্রাপ্য ধরে নেন এবং যিনি সালাম দেন তাঁকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিতান্তই ছোটোলোক বলে ধরে নেয়া হয়।“


Tuesday, 29 June 2021

এ জে জ্যাকব্‌স এর থ্যাংকস এ থাউজ্যান্ড

 


কথায় কথায় ‘থ্যাংক ইউ’ বা ধন্যবাদ বলার সংস্কৃতি আমাদের নয়। অর্থাৎ বাঙালিদের নয়। ছোটবেলা থেকেই আমরা ভদ্রতার শিক্ষা পেয়েছি। বয়সে যারা বড় তাদের কখনো আমরা নাম ধরে ডাকি না। আত্মীয় হলে তো নয়ই, অনাত্মীয় হলেও নয়। নামের সাথে ভাই, আপা, চাচা, চাচী, খালা, খালু, আংকেল ইত্যাদি জুড়ে দিয়ে আমরা ভদ্রতা দেখাই। অবশ্য খুব বেশি বিখ্যাত হলে অন্য কথা। যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আমরা রবীন্দ্রনাথই বলি – রবীন্দ্রদা কিংবা রবীন্দ্রজেঠু বলি না।

যতই ভদ্রতা দেখাই, আমরা কিন্তু কথায় কথায় ধন্যবাদ বলি না। ইংরেজিতে থ্যাংক ইউ বললে যতটা মানিয়ে যায়, বাংলায় ধন্যবাদ শব্দটি এখনো কেন যেন আমাদের সহজাত হয়ে ওঠেনি। সেই কারণেই হয়তো আমরা খুব একটা ধন্যবাদ দিই না।

কিন্তু ইংরেজিভাষী সংস্কৃতিতে ‘থ্যাংক ইউ’ শব্দযুগল সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দ। কথায় কথায় সেখানে থ্যাংক ইউ বলার চল আছে। কিন্তু এই থ্যাংকস দেয়াটা কতটা আন্তরিক, আর কতটাই বা অভ্যাসের বশে?

লেখক এ জে জ্যাকবস – একজন ব্যতিক্রমী লেখক। তিনি এক দু’বছরে একটা বই লেখেন। কিন্তু তাঁর বইগুলি পড়ে যেমন হাহা করে হাসতে হয়, তেমনি অত্যন্ত গভীরভাবে চিন্তাও করতে হয়। তাঁর একেকটা বই একেকটা প্রজেক্ট। একসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার সবগুলি খন্ড পড়ে তিনি একটি বই লিখেছেন সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে, বাইবেল সম্পর্কে বই লেখার জন্য তিনি এক বছর পাদ্রী হয়ে গিয়েছিলেন, এভাবে তার সবগুলি বই তিনি লিখেছেন বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ নিজে করার পর। তাঁর সাম্প্রতিক বই ‘থ্যাংকস অ্যা থাউজ্যান্ড’ তাঁর ধন্যবাদ দেয়ার প্রজেক্ট।

সুখ থেকে কৃতজ্ঞতা আসে না, বরং কৃতজ্ঞতা থেকেই সুখলাভ করা যায়। জ্যাকবস ধর্মবিশ্বাসী নন, রবং সন্দেহবাদী মানুষ। ধার্মিক মানুষ সবকিছুর জন্য সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ দেয় প্রার্থনার মাধ্যমে। লেখকের সেই সুযোগ নেই। ধার্মিক মানুষ প্রায় সময়েই মূল কাজ যে করে – তাকে উপেক্ষা করে, বিশেষ করে কাজ যদি আশানুরূপ হয় – ধন্যবাদ দেয় অদৃশ্য সৃষ্টিকর্তাকে। কিন্তু কাজে যদি আশানুরূপ ফল না পাওয়া যায় – তখন তার জন্য দায়ি করে মানুষকে।

আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য জ্যাকব্‌স ঠিক করলেন – প্রতিদিন সকালে যে দোকান থেকে তিনি কফি নেন, সেই কফি যে সার্ভ করে থাকে ধন্যবাদ দেবেন। এবং শুধু তাকে নয়, এই এক কাপ কফি তার হাতে এসে পৌঁছাবার পেছনে যারা যারা কাজ করে যাচ্ছেন তাদের প্রত্যেককেই ধন্যবাদ দেবেন।

ধন্যবাদ পর্ব শুরু হয় কফিশপ থেকে। কফি বানায় যে মেয়েটি তাকে ধন্যবাদ দেয়ার পর কফি সাপ্লাইয়ার। কফি যারা কেনেন তারা কফির স্বাদ নেন। কফির স্বাদ নেয়ার জন্য বিশেষ মানুষ থাকে। জ্যাকবস তাঁদের সাথে কথা বলেন। সেই কফি রাখার গুদাম, পদ্ধতি – সব জায়গায় নির্দিষ্ট মানুষ প্রশিক্ষিত মানুষ আছে। তাদের সাথেও কথা বলেন জ্যাকবস। ধন্যবাদ দেন।



কফির কাপ আমরা একবার ব্যবহার করেই ফেলে দিই। চিন্তাও করি না এর পেছনে কী পরিমাণ প্রকৌশল দক্ষতা লাগে। কত বড় ব্যবসা এই কফির কাপ সাপ্লাইয়ের ব্যবসা। কফির কাপ – বিশেষ ধরনের কাপ, যা তাপ সংরক্ষণ করে। বাইরে বেশি গরম হয় না, কিন্তু ভেতরের কফি গরম রাখে। আবার তার ঢাকনা এমনভাবে তৈরি করতে হয় যেন খাওয়ার সময় কফি ছলকে না পড়ে। এদের টিমের সাথে দেখা করে তাদের ধন্যবাদ দেন জ্যাকবস।

কফির বীজ আসে কলম্বিয়া থেকে। কফি চাষীদের সাথে দেখা করার জন্য্য কলম্বিয়ায় যান জ্যাকবস। তাদেরকেও সরাসরি ধন্যবাদ দিয়ে আসেন।

থ্যাংকস এ থাউজ্যান্ড সত্যি সত্যি হাজারেরও বেশি মানুষকে ধন্যবাদ দেয়ার বই। বইয়ের শেষে হাজারেরও বেশি মানুষের নামও দেয়া আছে যাদেরকে লেখক সরাসরি ধন্যবাদ দিয়েছেন। তাঁরা সবাই তাঁর সকালের এক কাপ কফির জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।

বইটি প্রকাশিত হয়েছে টেড-এর পক্ষ থেকে সাইমন অ্যান্ড সুস্টার। টেড-এর বইগুলি অত্যন্ত চমৎকার হয়ে থাকে সবদিক থেকেই। এটিও ব্যতিক্রম নয়।

লেখক এই বইটি নিয়ে একটি টেড টক-ও দিয়েছিলেন। সেটা ইউটিউব থেকে এখানে দেখা যেতে পারে। 



মাসুদ রানা ০২ - ভারত নাট্যম



ভরতনাট্যম বলে ভুল করেছিলাম, আসলে বইয়ের নাম হলো ভারত নাট্যম। মাসুদ রানা সিরিজের এই দ্বিতীয় বইটিও কাজী আনোয়ার হোসেন প্রকাশ করেছিলেন বিদ্যুৎ মিত্র ছদ্মনামে ১৯৬৬ সালের নভেম্বরে।

সেই সময় পাকিস্তানী হিসেবে ভারতবিদ্বেষ সম্ভবত খুব কাজ করছিল। প্রথম বইতে ভারতীয়দের সাহায্যে কাপ্তাই বাঁধ ভেঙে দেয়ার পরিকল্পনা করেছিলো পাকিস্তানী এক নৃশংস পাগল বিজ্ঞানী। সিরিজের দ্বিতীয় বইতেও দেখা যায় – পাকিস্তানকে ধ্বংস করে দেয়ার ষড়যন্ত্র করছে ভারতীয়রা। শান্তি মিশনের নামে সাংস্কৃতিক দলের ছদ্মবেশে পূর্ব পাকিস্তানে ঢুকে পড়ে ভারতীয় গুপ্তচররা। পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে। নৃত্যশিল্পী মিত্রা সেন – সুন্দরী। ভারতীয় গুপ্তচর। অথবা টোপ। তাকে ব্যবহার করা হচ্ছে ষড়যন্ত্রের কাজে। জানা যায় – মিত্রা সেনের মামা আবার ভারতীয় মন্ত্রী।


পাকিস্তান গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান রাহাত খান মাসুদ রানাকে দায়িত্ব দেন এই মিশনের কাজে নজর রাখতে। রানা সাংবাদিকের ছদ্মবেশে তার কাজ করে। যথারীতি – মিত্রা সেনের কাছে চলে আসে রানা। মিত্রা রানার প্রেমে পড়ে।

ঘটনাক্রমে পাকিস্তানের নব্য ধনীদের বখাটে ছেলেদের কথা আসে – যারা ইয়ং টাইগার্স ক্লাব গড়ে তোলে – মদ ড্রাগ আর নারীচর্চা করে। যা অনেকটা এখনকার সময়েরও প্রতিনিধিত্ব করে।

রানা পূর্ব-পাকিস্তানের কাজ কিছুটা গুছিয়ে চলে যায় ব্যাংকক। সেখানে পরিচয় হয় ক্যাথি ডেভনের সাথে। ক্যাথিকে সাহায্য করার জন্য জুয়া খেলায় কয়েক মিনিটের মধ্যেই তুলে দেয় ১২ হাজার ডলার। কিন্তু ক্যাথি তা জানতো না। টাকার জন্য সে বিশ্বাসঘাতকতা করে রানার পরিচয় জানিয়ে দেয়। রানা ইন্ডীয়াতে এসে ধরা পড়ে। সেখানে তাকে সাহায্য করে ক্যাথির বোন।

ইন্ডিয়ানরা পূর্ব-পাকিস্তানে লক্ষ লক্ষ পতঙ্গ পাঠিয়ে সব খাদ্যশস্য ধ্বংস করে দেয়ার পরিকল্পনা করে। রানা অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তা বাঞ্চাল করে দেয়।

মাসুদ রানার সংলাপে মাঝে মাঝেই নারীর প্রতি অবমাননাকর মন্তব্য উঠে আসে। এগুলি সম্ভবত সেই সময় খুব স্বাভাবিক ছিল – যেমন ক্যাথি গাড়ি চালানোর সময় রানা মন্তব্য করে – বেশিরভাগ মেয়ে ড্রাইভার একদিকে সিগনাল দিয়ে অন্যদিকে টার্ন নেয়। অর্থাৎ মেয়েরা খারাপ ড্রাইভার!!


Tuesday, 15 June 2021

শংকরের একা একা একাশি

 


'কত অজানারে' যখন প্রকাশিত হয় তখন তার লেখকের বয়স মাত্র একুশ। সীমাহীন দারিদ্র্য আর জীবন-সংগ্রাম করতে করতে সাহিত্যের অঙ্গনে জায়গা করে নিয়েছেন লেখক শংকর। সেই ১৯৫৪-৫৫ সালে বাংলা সাহিত্যের শেয়ার মার্কেট যাঁরা নির্ধারণ করতেন তাঁরা নিদান হেঁকেছিলেন তাঁর জীবনে কিছু হবে না। লেখক হওয়া অবশ্যই নয়। ভাড়া বাড়িতে ইলেকট্রিক বিল দিতে পারেননি বলে লাইন কাটা গিয়েছিল। রাতের পর রাত অন্ধকারে কুপির টিমটিমে আলোতে বসে সাহিত্যের সাধনা করেছেন শংকর। একনিষ্ঠ সাধনার ফলও পেয়েছেন তিনি। তাঁর সবগুলো লেখাই ঈর্ষণীয় পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। তাঁর প্রত্যেকটি উপন্যাস পুনর্মুদ্রিত হয়েছে কমপক্ষে পঞ্চাশ ষাটবার। সত্যজিৎ রায় তাঁর 'জন অরণ্য' ও 'সীমাবদ্ধ' উপন্যাসকে চলচিত্ররূপ দিয়েছেন। ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর লেখক হয়ে ওঠার আত্মজৈবনিক গ্রন্থ "একা একা একাশি"। এই বইতে শংকর ফিরে দেখেছেন তাঁর একাশি বছরের জীবনের নানা দিক। লেখক হয়ে ওঠার জন্য যে ধারাবাহিক সংগ্রাম করতে হয় - তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ এই বই। 




শংকর হলেন এমন একজন লেখক - যিনি শক্ত পাথরকেও নরম সুস্বাদু সন্দেশের মত করে পরিবেশন করতে জানেন। আর আশ্চর্য তাঁর পরিমিতিবোধ - যেটা একজন লেখকের অবশ্যই থাকা চাই। 'একা একা একাশি' বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশিত অনেক লেখার একটি সমন্বিত রূপ বলে অনেক জায়গায় পুনরাবৃত্তি ঘটেছে একই ঘটনার।




এত দীর্ঘদিনের লেখালেখি শংকরের। জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা সত্ত্বেও কোন ধরনের সাহিত্য পুরষ্কার পাননি এতদিন। ২০২১ সালে তাঁকে ২০২০ সালের একাডেমি পুরষ্কার দেয়া হয়েছে তাঁর 'একা একা একাশি' বইটির জন্য। অথচ এর চেয়েও আরো কত ভালো ভালো বই তিনি লিখেছেন। 


Thursday, 10 June 2021

সুমন্ত আসলামের বই - ভূতবন্ধু

 


সুমন্ত আসলামের ছোটদের জন্য গল্পের বই ‘ভূতবন্ধু’।

ভূতবন্ধু, ফাঁকিবাজ, মধ্যরাতের আতঙ্ক, সুমর্মির শাস্তি, ভয়ঙ্কর জন্মরাত, কাঁঠাল চোর, জাদুর ইঁদুর, দুষ্টু ছেলেগুলোর আজ মন খারাপ – এই সাতটি ছোট ছোট গল্প নিয়ে ৬৪ পৃষ্ঠার ছোট্ট বই।

ভূতবন্ধু গল্পটি অলৌকিক ভূতের গল্প। জর্জের একটি পা নেই। ট্রাকের ধাক্কায়। তারপর থেকে ক্রাচে ভর দিয়ে চলতে হয়। হঠাৎ দেখা গেলো একটা ভূত এসে তার সব কাজ করে দিচ্ছে। তাকে মাঠে নিয়ে যাচ্ছে ফুটবল খেলা দেখতে। বাসায় তার সব কাজ করে দিচ্ছে। ভূতের নাম জীম। একদিন জীম চলে যায় – কারণ সে জানে জর্জের বাবা কবিরাজ নিয়ে আসবে ভূত তাড়ানোর জন্য। শিশুতোষ গল্প কি এরকম হতে হয়? শৈশবে এই গল্প পড়তে কেমন লাগতো আমি জানি না।

ফাঁকিবাজ গল্পটি একজন গৃহশিক্ষকের গল্প। নিয়াজ সাইফুল সাহেবের ছেলে-মেয়েকে পড়ানোর জন্য যায়। তারা দুষ্টু খুব। নিয়াজ তাদেরকে খেলার ছলে লেখাপড়া করাতে পারবে ভেবে বাইরে বেড়াতে নিয়ে যায়। সেখানে বেলুনওয়ালার কাছে কতটা বেলুন আছে গুনতে বলে। বাচ্চারা ধরে ফেলে যে সে অংক শেখানোর চেষ্টা করছে। বহুল প্রচলিত কৌতুক আছে এরকম।

মধ্যরাতের আতঙ্ক গল্পটি ভূতের গল্প। রুদ্র স্বপ্ন দেখে। ঘরের ভেতর সাপ ঢুকে যাচ্ছে, তারপর তেলাপোকায় ঘর ভরে যাচ্ছে। তারপর দেখে কাটা হাত, বিভৎস সব দৃশ্য। এসব হরর মুভিতে হরদম দেখা যায়। শিশুদের জন্য কতটুকু উপযোগী সেটাই ভাবার বিষয়।

সুমর্মির শাস্তি গল্পটি একদম সরল। সুমর্মি খুব ভালো মেয়ে। তার বাবার বাধ্য মেয়ে। একদিন তার বাবা তাকে বসিয়ে রাখেন। এটাই তার শাস্তি। কেউই বুঝতে পারে না কেন সুমর্মিকে শাস্তি দেয়া হয়েছে। শেষে জানা গেলো সুমর্মি যে পড়ার বইয়ের পাশাপাশি গল্পের বইও পড়ে সেটা তার বাবাকে জানায়নি – সে কারণে বাবার খুব অভিমান হয়েছে। বাবা তার জন্য আরো অনেক গল্পের বই কিনে নিয়ে আসেন।

ভয়ঙ্কর জন্মরাত গল্পটি জর্জ ও তার বন্ধুদের গল্প। জর্জের বন্ধুরা জর্জকে না জানিয়ে মধ্যরাতে বার্থ ডে উইশ করার পরিকল্পনা করে। জর্জ এতে খুব ভয় পায়।

কাঁঠাল চোর গল্পটি সম্ভবত গোয়েন্দা গল্প। স্কুলের গাছ থেকে কেউ কাঁঠাল চুরি করেছে। সেই কাঁঠাল চোর ধরার জন্য উঠতি গোয়েন্দা জর্জের ডাক পড়ে। জর্জ একটু বুদ্ধি করেই কাঁঠাল চোর ধরে ফেলে। গোয়েন্দার বুদ্ধি দেখলে ফেলুদা কিংবা শার্লক হোম্‌স অবাক হয়ে যাবে। আর গোয়েন্দা গল্পের লেখকরা গল্প লেখা ছেড়ে দিতে চাইবেন।

জাদুর ইঁদুর গল্পটিকে লেখক বলছেন বিদেশি গল্পের ছায়া অবলম্বনে লেখা হয়েছে। ইঁদুর বিড়াল পশুপাখি ইত্যাদিরা কথা বলে এখানে। একটি বিড়াল একটি বাড়িতে ঢুকে পড়ে সবাই মানা করা সত্ত্বেও। সেখানে সে কাচের বয়াম থেকে সুস্বাদু ইঁদুর খায়। তাতে তার কান বড় হয়ে যায়। একজন জাদুকর থাকে। সেই জাদুকর আবার মন্ত্র দিয়ে তার কান ছোট করে দেয়।

দুষ্টু ছেলেগুলোর আজ মন খারাপ – এটা স্কুলের অঙ্কস্যারের গল্প। ক্লাস সিক্সের নতুন অঙ্কস্যার কীভাবে যেন সবাইকে অংক শিখিয়ে ফেলেছেন। সবাই অঙ্কে ভালো করতে শুরু করে। তিনি আবার সবার মনও ভালো করে দেন। তিনি একদিন দেখেন ছেলেদের মন খারাপ। কারণ তাদের খেলার জায়গায় বড় দালান হয়ে যাচ্ছে।

এই গল্পগুলি পড়ে মনে হচ্ছে – শিশুদের জন্য লেখা যেসব গল্প পড়ে যে কোন বয়সের পাঠকই মজা পায় – এসব গল্পের একটিও সেরকম নয়।

ভূত বন্ধু (১০/৬/২০২১) ।। প্রকাশক – অনুপম প্রকাশনী ।। প্রথম প্রকাশ – ফেব্রুয়ারি ২০১১।।


Sunday, 6 June 2021

বুদ্ধদেব গুহর প্রথম প্রবাস

 




বুদ্ধদেব গুহ প্রথমবার ইওরোপ ভ্রমণে গিয়েছিলেন উনিশ শ সত্তরের দশকে। লন্ডনে তাঁর আত্মীয়-ভাই টবীর বাসায় কিছুদিন আতিথ্য গ্রহণ করে একটা কনডাক্টেড ট্যুরে চলে গিয়েছিলেন জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া এবং আরো অনেক দেশে। ট্যুর কোম্পানির বাসে বারোদিন ধরে ঘুরেছেন তিনি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছে চলার পথে। এরই সরস বর্ণনা তাঁর প্রথম প্রবাস বইতে। ভূমিকায় তিনি উল্লেখ করেছেন ভারতের জরুরি অবস্থার সময় তাঁর লেখা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল সাপ্তাহিক অমৃত পত্রিকায়। সেই সময় তিনি দেশের সমালোচনা করেছেন এই অজুহাতে তাঁর লেখার অনেক অংশ সেন্সরড হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। পুলিসের নজরদারিতেও থাকতে হয়েছিল। তাঁর বাড়িতে তল্লাশিও চালানো হয়েছিল। সেই যাই হোক। 

আমাদের দেশের মানুষ – বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশের মানুষ উন্নত দেশে ভ্রমণ করার সময় নিজের অজান্তেই তুলনা  করতে শুরু করে নিজের দেশের সাথে। কোন ব্যবস্থায় যখন আমরা অভ্যস্ত হয়ে যাই – অনেক সময় আমাদের সুযোগও থাকে না এর চেয়ে ভালো ব্যবস্থা কী হতে পারে তা জানার। কিন্তু সেই সুযোগটা আসে উন্নত দেশে ভ্রমণ করতে গেলে। তবুও আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে একটা ব্যাপার আছে – দেশপ্রেমের নামে দেশের দোষগুলি লুকিয়ে রাখার চেষ্টা। কোন কারণ ছাড়াই আমরা যদি আমাদের দেশকে পৃথিবীর সেরা দেশ বলে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে থাকি – সেটাকেই দেশপ্রেমের প্রমাণ বলে মনে করা হয়। আকন্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত যারা – তারা তো গলা ফুলিয়ে বলবেনই যে আমাদের দেশের মতো এমন ভালো দেশ আর কোথাও নেই – যেখানে এরকম খোলামেলাভাবে দুর্নীতি করা যায়। কিন্তু যারা এর শিকার, ভুক্তভোগী – তারা কী কারণে নিজের দেশকে পৃথিবীর সেরা দেশ বলে মনে করবে – যদি নিজের দেশে হাজারো অনিয়ম থাকে? লেখক এই প্রশ্নগুলি বিভিন্ন জায়গায় তুলেছেন।

অনেক পুরনো দিনের ভ্রমণকাহিনি পড়লে সেই ভ্রমণকাহিনি অনেকটা ইতিহাসের কাজও করে। যেই সময়ে তিনি ভ্রমণ করেছিলেন ১৯৭৪-৭৫ সালে – মাত্র ৮ ডলার সাথে নিয়ে যেতে দেয়া হতো। তার স্থানীয় মুদ্রায় দাম ছিল ৫৬ টাকা। অর্থাৎ তখন এক ডলারের দাম ছিল ৭ টাকা। ২০২১ সালে তা বেড়েছে প্রায় দশ গুণ।

ডিসি টেন প্লেন ছিল তখন আধুনিকতম প্লেন। তখন প্লেনে পাইপ টানা যেতো। ধুমপান পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে আরো অনেক বছর পর। তখনো প্লেনে সিনেমা দেখানো হতো। তবে তা দেখানো হতো ছোট্ট প্রজেক্টরে।

বিদেশী প্লেনের ঝলমলে চঞ্চলা এয়ার-হোস্টেসদের দেখে বুদ্ধদেব আক্ষেপ করেছেন এয়ার-ইন্ডিয়ার এয়ার-হোস্টেসদের ব্যাপারে। “এত টাকা মাইনে দিয়ে, এমন সুন্দর সাজপোশাক পরিয়ে এমন রাম-গরুডের ছানাদের কেন ইন্ডিয়ান এয়ার-লাইনসে রাখা হয় তা সাধারণ বুদ্ধির বাইরে।“

লন্ডনে পৌঁছে লেখক তার ভাইয়ের বাড়িতে উঠেছেন। তারা ব্যস্ত দম্পতি। তবুও যথাসম্ভব সাথে করে নিয়ে গিয়ে পথঘাট দেখিয়ে দিয়েছেন। পরে লেখক নিজে নিজেই ঘুরেছেন লন্ডনে। তাঁর ভাই শুরুতে জার্মানিতে গিয়েছিলেন। সেখানে অনেক বছর অনেক ধরনের কষ্ট করে এখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রবাসীদের কষ্ট বুঝতে চেষ্টা করেছেন লেখক। আবার প্রবাসী বাঙালীদের সমালোচনাও আছে – “পাঁচজন বাঙালি এই দূরদেশে এসেও মিলে মিশে থাকতে পারে না। পরনিন্দা, পরচর্চা, দলাদলি, ঈর্ষা, এইই সব।“ – পৃথিবীর সব দেশেই প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে এই ব্যাপারটা আছে। কিন্তু শুধুমাত্র কি বাঙালিদের মধ্যে? আমার নিজের অভিজ্ঞতা বলে – অন্যান্য জাতির মধ্যেও এই ব্যাপারগুলি কমবেশি আছে।

ইংরেজরা আমাদের উপমহাদেশ শাসন করেছিল। তাদেরকে ভারত থেকে তাড়ানোর পরেও কিন্তু আমাদের ইংরেজ-প্রীতি যায়নি। লেখক সেই প্রসঙ্গে বলছেন – “প্রভুত্ব করাতে তাদের যতটুকু বাহাদুরি ছিল, দাসত্ব সীকারে আমাদের বাহাদুরি তার দেয়ে প্রবলতর ছিল।

আমাদের দেশের হ্যাভ আর হ্যাভ-নটদের শ্রেণিবিভাজনের ব্যাপারে লেখক বলছেন – “আমাদের দেশে রাজার ছেলে প্রায়শই রাজা হয়, মন্ত্রীর ছেলে মন্ত্রী হয়,  মসৃণভাবে না হলে এই ঘটনা অমসৃণভাবে ঘটানো হয়। এবং চাষার ছেলে হয় চাষা।“ – লেখকের ক্ষোভটা এখানে বোঝা যায়। কিন্তু তিনি যেখানে গিয়ে এই উপলব্ধিটা প্রবলভাবে বুঝতে পারছেন – সেখানেই কিন্তু রাজা-বাদশাদের সমারোহ। ইওরোপে এখনো যত রাজা আছে আর কোন মহাদেশে এত রাজা নেই। সেখানে কিন্তু রাজার ছেলেরাই রাজা হয়।

কসমস কোম্পানির বাসে করে ইউরোপ ট্যুরে বের হয়ে লেখক মিশেছেন বিভিন্ন দেশের মানুষের সাথে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট হয়েছেন ইজরায়েলি তরুণী সারা, আর অস্ট্রেলিয়ান তরুণী ক্যারল ও জেনির প্রতি। এই বইটি তিনি উৎসর্গ করেছেন ক্যারল ও জেনিকে। তবে সারার সাথে তিনি একটি রাত একই ঘরে কাটিয়েছেন, শরীর বিনিময়ও করেছেন। তিনি হয়তো ঠিকই উপলব্ধি করেছেন – “ওদের দেশে কোনো মেয়েকে চুমু খেলেই সঙ্গে সঙ্গে তার সতীত্ব নষ্ট হয়ে যায় না এবং চুমু খেলেই ভালোবাসাও হয়ে যায় না।“

আবার এটাও উপলব্ধি করেছেন – পৃথিবীর সব মানুষই কিছু কিছু ব্যাপারে একই রকমের প্রতিক্রিয়া দেখায় – যেমন, “তার পা মাড়িয়ে দিলে, তার স্বার্থে, আরামে বা মানিব্যাগে হাত পড়লে পৃথিবীর সব মানুষই সমান।“

শিল্পের শহর প্যারিসে গিয়ে লেখক আর্ট সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ যে কথা বলেছেন তা সঠিকভাবে নিয়ে এসেছেন – প্রয়োজনের অতিরিক্তটাই আর্ট। অর্থাৎ পেটের ক্ষুধা মিটানো প্রয়োজন। কিন্তু মনের ক্ষুধা মেটানোর জন্য যা করি – সেটা আর্ট।

প্যারিসে স্টেজ শো দেখতে গিয়ে দেখেছেন স্টেজে একেবারে নিরাবসনাদের প্রাচুর্য। তার প্রেক্ষিতে তিনি মন্তব্য করেছেন – “পৃথিবীতে মেয়েদের সমুদয় সাজপোশাকের আড়ম্বর শুধু খুলে ফেলার জন্যই।“ আমি জানি না লেখক পরিণত বয়সেও তা মনে করেন কি না। কিন্তু আমার মনে হয়েছে এখানে লেখক যথেষ্ট উদার হতে পারেননি।

ভ্রমণকাহিনি পড়তে ভালো লাগে আমার। তাতে অন্য আরেকজন ভ্রমণকারির মনের ভেতরটাও দেখার সুযোগ পাওয়া যায়। আর সেই ভ্রমণকারি যদি বুদ্ধদেব গুহর মতো লেখক হন – তাহলে তো কথাই নেই। লেখকরা ভ্রমণ কাহিনিতেও অনেক কাহিনি তৈরি করেন সেটা করেন আর্টের কারণে। সেই আর্টটুকু তো সহ্য করতেই হয়।


Thursday, 3 June 2021

মাসুদ রানা ০১ - ধ্বংসপাহাড়

 



মাসুদ রানা সিরিজের প্রথম বই – ধ্বংসপাহাড় প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৬ সালের মে মাসে। কাজী আনোয়ার হোসেন সম্ভবত খুব একটা নিশ্চিত ছিলেন না এই সিরিজের সাফল্যের ব্যাপারে। তাই সিরিজের প্রথম কয়েকটি বইতে লেখকের ছদ্মনাম ‘বিদ্যুৎ মিত্র’ ব্যবহার করা হয়েছিল।



পাকিস্তান আমলের বই। সেই সময় বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানকে নিজের দেশ হিসেবে অনেক পছন্দ করতো। পাশের দেশ ভারতের সাথে পাকিস্তানের শত্রুভাবাপন্নতার অনেক কারণ ছিল তখন। তাই মাসুদরানা সিরিজের প্রথম বইতে ভারতকে বাংলাদেশের সাফল্যের শত্রু হিসেবে দেখানো হয়েছে।

কাহিনি আবর্তিত হয়েছে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য সদ্যনির্মিত বাঁধকে নিয়ে। পাকিস্তানের কিছু মানুষ ভারতীয়দের সাহায্য নিয়ে  উদ্বোধনের দিনেই কাপ্তাই বাঁধ ধ্বংস করে দেয়ার প্ল্যান করে। সেই প্ল্যানের কথা ফাঁস হয়ে যায় পাকিস্তান কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স এর ঢাকা অফিসে। তারা মাসুদ রানাকে পাঠায় এই পরিকল্পনা বাঞ্চাল করতে। সুন্দরী ভারতীয় এজেন্ট সুলতা রায়ের সাথে কাজ করতে গিয়ে যা হয় – প্রেম-ভালোবাসা ইত্যাদিও হয়ে যায়।

এই বইয়ের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ বিজ্ঞানী কবীর চৌধুরি। কাপ্তাই-এর জঙ্গলের মধ্যে তিনি গড়ে তুলেছিলেন বিরাট গবেষণাগার। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান। সেই ১৯৬৬ সালেই অ্যান্টি-ম্যাটার, অ্যান্টি-গ্র্যাভিটি, আর সুপারসাউন্ড নিয়ে কাজ করছিলেন তিনি। কিন্তু এত মেধাবী মানুষ – শুধুমাত্র বাঁধের কারণে ল্যাব ডুবে যাচ্ছে বলেই এতটা নৃশংস হয়ে উঠতে পারেন – ভাবা যায় না। কাপ্তাই বাঁধ তৈরি করার সময় অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন, কিন্তু সরকার সবাইকেই যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিয়েছিল। 

সে যাই হোক – এই সিরিজটি এত বেশি জনপ্রিয় হয়েছে যে ৫৫ বছর পরেও এখনো এর পাঠকসংখ্যা কমেনি।

যে সময় আমার অনেক বন্ধু সেবা প্রকাশনীর বই পড়ছিল বুঁদ হয়ে, আমি তখন পড়েছি দস্যু বনহুর। এত বছর পরে মাসুদ রানা পড়ছি। হাহাহা।


Sunday, 9 May 2021

বুদ্ধদেব গুহর হাজারিবাগের কথা

 


বুদ্ধদেব গুহ শক্তিমান লেখক। লেখায় তিনি শক্তিমান তো বটেই – আমার ধারণা তিনি আক্ষরিক অর্থেও ভীষণ শক্তিমান। যে হাতে তিনি কলম চালান, সেই হাতে তিনি বন্দুকও চালান। আবার সেই হাতে বাদ্যযন্ত্রও বাজান। তাঁর লেখা বেশ কিছু বই আগে পড়েছি। এখন পড়ছি তাঁর ভ্রমণ সমগ্র। প্রথম গল্প – হাজারিবাগের কথা। ভ্রমণ এবং শিকারের মিশ্রকাহিনি।

            হাজারিবাগে তিনি ভ্রমণ করেছেন অসংখ্যবার – পঞ্চাশের দশক থেকে নব্বই এর দশক অবধি। প্রথমবার ১৯৫৭-তে। চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সি পেশার কারণে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে তাঁর অসংখ্য বন্ধু, পরিচিত, পেশাগত আত্মীয়স্বজন। বাঘ শিকার করেছেন তিনি গভীর রাতে জঙ্গলে গিয়ে। জঙ্গলের বর্ণনা, রুক্ষ ধুলিওঠা পথের বর্ণনা জীবন্ত হয়ে ওঠে তাঁর লেখায়। আর আছে খাবারের বর্ণনা। তিনি নিজেই বলেছেন পেটুক এবং খাদ্যরসিক বলেই তাঁর বিভিন্ন জায়গার খাদ্যের স্বাদও পুরোপুরি মনে আছে।

            তাঁর সেন্স অব হিউমার – বাংলায় যাকে রসবোধ বলা যায় – অত্যন্ত উঁচুমানের। নেকড়ে শিকারের জন্য তিনি হাজারিবাগে গিয়েছিলেন। তাঁর শিকারের বন্ধু নাজিম সাহেব তখন একটি গাড়ি কিনেছেন। ৪২ মডেলের গাড়ি। “৩২ মডেলের ড্রাইভারের পরনে একটি ৩২ মডেলের পায়জামা ছিল। সেইটি এই দীর্ঘদিনের ব্যবহারে আন্ডারওয়ারে পরিণত হয়েছিল।“ সেই গাড়ির বর্ণনা দিচ্ছেন তিনি এভাবে – “আমরা দেখলাম, শীতে রাতের অন্ধকারে একটি অদ্ভুত দর্শন, প্রাগৈতিহাসিক জন্তু দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনে দিয়ে ধক্‌-ধক্‌-ধক্‌-ধক্‌ করে আওয়াজ আসছে আর পেছনের সাইলেন্সার পাইপের মধ্যে দিয়ে দুর্বাসা মুনির চোখের আগুনের মতো আগুনের হলকা বেরোচ্ছে।“

            “গাড়ি গিয়ারে দিতেই মনে হল গাড়িতে ভূমিকম্প উপস্থিত হল, আর গাড়ি পথে উঠতেই বিনা পয়সায় বেঠোফেনিক অর্কেস্ট্রা শুনতে পেলাম। গাড়ি সামান্য গতি পেতেই দেখলাম সামনের হেড লাইট দুটি ডিক ডিক শব্দ করে একবার ডাইনে একবার বাঁয়ে যেতে লাগল।“

            “পিছনের সিটে বসার সঙ্গে সঙ্গে আমার পেছনে কে যেন কামড়ে ধরল এবং ওঠবার সঙ্গে সঙ্গেই আমার সাধের ব্যারেথিয়ার ট্রাউজারের এক  গিরে কাপড় পেছনের সিটেই আটকে রইল এবং পেছন দিয়ে হু হু করে হাজারিবাগি ডিসেম্বরের হাওয়া ঢুকতে লাগল।“

            সেই গাড়িতে নেংটি ইঁদুর ছোটাছুটি করছিল। এক পর্যায়ে গাড়িটি রাস্তা থেকে ছিটকে পড়ে যায় নদীর বালিময় বুকের উপর। গাড়ি ছত্রখান হয়ে সবাই ছিটকে পড়ে। পরে দুর্ঘটনার কারণ জানা গেল – “একটা নেংটি ইঁদুর ড্রাইভারের আধছেঁড়া আন্ডারওয়ারের ভেতর ঢুকে গিয়েছিল।“

            বুদ্ধদেব গুহ মুক্তচিন্তার মানুষ। পথে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে তিনি বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রকমের মন্দির দেখেছেন। কিন্তু তাঁর দেবতা মন্দিরে থাকেন না। তিনি লিখছেন, “আমার ঈশ্বর কোনদিনই কোনো মন্দিরের মধ্যে অবস্থান করেননি। আমার ঈশ্বর ছিলেন পথে। সে জন্য তীর্থস্থানের পথই আমাকে চিরদিন আকৃষ্ট করেছে।“

            হাজারিবাগ পালামৌ – এসব জায়গার প্রকৃতি দেখতে যেতে হবে যদি কোনদিন সুযোগ হয়। এই পালামৌ-তে সত্যজিৎ রায় ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ আর ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’র শুটিং করেছিলেন। এর পরোক্ষভাবে ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন বুদ্ধদেব গুহ।

            ভালো লাগলো তাঁর ভ্রমণ-শিকার কাহিনি। 

Monday, 12 April 2021

পার্থিব: অপার্থিব বিশ্বাসের নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ

 




পাঠ প্রতিক্রিয়া
পার্থিব
অনন্ত বিজয় দাশ ও সৈকত চৌধুরী
প্রথম প্রকাশঃ ২০১১
প্রকাশকঃ শুদ্ধস্বর
শাহবাগ, ঢাকা
প্রচ্ছদঃ শিবু কুমার শীল
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ১৩৫
মূল্যঃ ২২৫ টাকা

 

ঘনকালো পটভূমির উপর রক্তের মত টকটকে লাল অক্ষরে লেখা ‘পার্থিব’, উপর থেকে নিচে কোনাকুনি নেমে এসেছে অসমান্তরাল রক্তধারার মত পথের রেখা – যেন এত বছরের অন্ধ-সংস্কারের কালোপর্দা ভেদ করে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে নতুন সত্যের তাজা রক্ত। অনন্ত বিজয় দাশ ও সৈকত চৌধুরীর ‘পার্থিব’ হাতে নিয়ে এরকমই একটা অনুভূতি হলো। শিবু কুমার শীলের আঁকা প্রচ্ছদ এমনই গা শিরশির করা চোখকাড়া। ১৩৫ পৃষ্ঠার নাতিদীর্ঘ বইটা পড়তে পড়তে মনে হলো আমাদের অন্ধবিশ্বাসের কালো পিঠে নির্মোহ যুক্তির তীব্র চাবুক কষেছেন অনন্ত ও সৈকত। পার্থিব জগতে অপার্থিব ধারণার উৎপাদন, বিতরণ ও ধারণ করেন যাঁরা তাঁদের জন্য বড্ড দরকার এ কষাঘাতের।

জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে মানুষ ক্রমশ বুঝতে পারছে অনেক অনেক বছর আগে ঈশ্বর নামক যে অপার্থিব ধারণাকে মানুষ সৃষ্টি করেছিল নিজেদের অজ্ঞানতাকে ঢেকে রাখার জন্য, বর্তমানে তার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। কিন্তু ঈশ্বরের ধারণাকে একেবারে ঝেড়ে ফেলতে গিয়ে সমস্যা হচ্ছে প্রধানত তাঁদেরই – যাঁরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ঈশ্বরকে পুঁজি করে চলছেন – প্রত্যক্ষ জীবিকার প্রয়োজনে বা পরোক্ষভাবে দুর্বল মননে। সৃষ্টিকর্তার ধারণা টিকিয়ে রাখার জন্য বিভিন্নরূপে বিভিন্ন দেশে প্রচলিত লোকগাথাও ধর্মের মোড়কে পরিবেশিত হয়ে মানুষের বিশ্বাসের জগতে ঠাঁই করে নিয়েছে। এমনই একটা মিথ হলো মহাপ্লাবন ও নুহের নৌকা। পার্থিব’র প্রথম অধ্যায়ে হযরত নুহ্‌ ও মহাপ্লাবন সম্পর্কে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ ও পৌরাণিক লোকগাথায় বর্ণিত তথ্যগুলোকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে এই কাহিনির বয়স পাঁচ হাজার বছরেরও বেশি। রোমান, সুমেরিয়ান, আসামের লুসাই, চীনের দক্ষিণাঞ্চলের ললোবাসীদের মধ্যে এবং পূর্ব আফ্রিকার মাসাইদের আঞ্চলিক লোকগাথায় মহাপ্লাবন ও তার হাত থেকে মানুষ সহ আরো কিছু প্রজাতির রক্ষা পাবার কথা বর্ণিত আছে। ওল্ড টেস্টামেন্ট, বাইবেল ও কোরানে এ লোকগল্পের অন্তর্ভুক্তি তাই হঠাৎ করে হয়ে ওঠেনি। এবং এসাথে এটাও প্রমাণিত হয় যে ধর্মীয় গ্রন্থগুলোর কোনটাই অলৌকিক নয় – বরং লোক-কাহিনি নির্ভর।

ধর্মগ্রন্থে যেভাবে মহাপ্লাবন ঘটেছিল বলে বর্ণনা করা হয়েছে – (চল্লিশ দিন চল্লিশ রাত ধরে বৃষ্টি পড়েছিল, পৃথিবীর সমস্ত পাহাড়-পর্বত ডুবিয়ে দিয়ে আরো পনের হাত উপরে উঠে গেল বন্যার পানি, দুনিয়া একশ’ পঞ্চাশ দিন ডুবে রইলো বন্যার পানিতে – ইত্যাদি) এবং নুহের নৌকার মাধ্যমে কীভাবে নুহের পরিবার ও অন্যান্য প্রজাতির প্রাণিদের একজোড়া করে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছিল – তা আদৌ বৈজ্ঞানিক যুক্তিতে সম্ভব কিনা তা সাধারণ পাটিগণিতের হিসেবে সহজভাবে দেখানো হয়েছে এ অধ্যায়ে। সমস্ত পৃথিবীপৃষ্ঠ পানিতে ডুবিয়ে রাখতে হলে ১০৮০ মিলিয়ন কিউবিক কিলোমিটার জায়গা পানি দিয়ে ভর্তি করে ফেলতে হবে। অত বেশি পরিমাণ বৃষ্টি হওয়া কি সম্ভব? মেঘ তৈরি না হলে তো বৃষ্টি সম্ভব নয়। বাতাসে সর্বোচ্চ যে পরিমাণ জলীয় বাষ্প থাকতে পারে তা দিয়ে সারা পৃথিবীর উপরিতলের মাত্র আড়াই সেন্টিমিটার (এক ইঞ্চিরও কম) পানি ঢালা সম্ভব – যা সহজেই শোষিত হয়ে যায় মাটিতে। পৃথিবীর সবগুলো পাহাড়কে ডুবিয়ে দেয়ার মত বৃষ্টি হতে হলে প্রায় পৌনে নয় কিলোমিটার গভীর পানির দরকার। যা কিছুতেই সম্ভব নয়।

যে নুহের নৌকায় (৩০০ হাত লম্বা, ৫০ হাত চওড়া আর ৩০ হাত উঁচু) সব ধরণের প্রাণির আশ্রয় জুটেছিল বলা হচ্ছে তার মোট ক্ষেত্রফল মাত্র নয় হাজার বর্গমিটার। সেখানে পৃথিবীর প্রায় দশ কোটি প্রজাতির প্রাণি – (যাদের মধ্যে তিমি, হাতি, জিরাফ, জলহস্তির মত বিশাল প্রাণিও আছে) কীভাবে ঠাঁই পেলো? তাছাড়া পৃথিবী ১৫০ দিন পানির নিচে ডুবে ছিল। ১৫০ দিনের খাবার-দাবারও নৌকায় রাখতে হয়েছিল নিশ্চয়। যৌক্তিক অসম্ভাব্যতার প্রশ্ন উঠলেই গোঁজামিল দিতে হবে এখানে। মানুষ যখন নুহের নৌকায় অন্ধভাবে বিশ্বাস স্থাপন করে ফেলে – তখন অহংবোধের কারণেই গোঁজামিল দিয়ে হলেও নিজেদের অন্ধবিশ্বাস টিকিয়ে রাখতে চায়। বিশ্বাসীরা নিজেরাও জানেন যে অংকের হিসেবে গন্ডগোল হচ্ছে, কিন্তু স্বীকার করতে লজ্জা পান। তাই লজ্জার হাত থেকে বাঁচার জন্য মারমুখী হয়ে ওঠেন। ১৯৯১ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় নিজের চোখে দেখেছি মহাপ্লাবন ও নুহের নৌকার ঘটনার অসম্ভাব্যতা প্রমাণ করে দেয়ায় যুক্তিবাদী অধ্যাপককে জামার আস্তিন গুঁটিয়ে মারতে আসেন অন্ধবিশ্বাসী অধ্যাপক। সেই যুক্তিবাদী অধ্যাপককে পদত্যাগ করে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়তে হয়েছে – আর অন্ধবিশ্বাসী অধ্যাপকটি ক্রমশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পর্যন্ত হয়েছেন। কিন্তু তাই বলে কি যুক্তিবাদীরা থেমে গেছেন? থেমে যান নি বলেই তো এখন ‘পার্থিব’র মত সাহসী বই প্রকাশিত হচ্ছে বাংলাদেশ থেকেই।

‘মিরাকল-১৯ এর উনিশ-বিশ’ – পার্থিব’র দ্বিতীয় অধ্যায়। ধর্মগ্রন্থগুলো মিরাকলের খবরে ভর্তি। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন সময়ে বিশ্বাসের হেরফের অনুযায়ী মানুষ বিভিন্ন রকমের মিরাকলের খবরের জন্ম দেয়। প্রতিটি মিরাকলই হলো গুজব বা গুজবের সমষ্টি। খ্রিষ্টান প্রধান দেশে মাতা মেরি বা যীশুর মিরাকল দেখা যায়, হিন্দু-এলাকায় দেবতা গনেশ হঠাৎ দুধ খেতে শুরু করে, বাংলাদেশের আকাশে সাদ্দাম হোসেন দেখা দেন ইরাকের যুদ্ধের সময়। ইউ-এফ-ও’র ধারণা বাংলাদেশে এখনো ততটা জনপ্রিয় নয় এবং ইউ-এফ-ও ধাপ্পা দেয়ার জন্য যে কারিগরী দক্ষতা দরকার তা বাংলাদেশে সহজলভ্য নয় বলেই বাংলাদেশের আকাশে ইউ-এফ-ও দেখা দেয় না যতটা দেখা দেয় আমেরিকার আকাশে। কেউ কেউ জেনেশুনে ধাপ্পা দিলেও অনেকে আবার দুর্বল মনের দৃঢ় বিশ্বাসের কারণে দুর্বল মুহূর্তে মাঝে মাঝে এক ধরণের প্রহেলিকায় আচ্ছন্ন হতে পারেন। আমাদের দেখার প্রক্রিয়া অনেক জটিল। কোন বস্তুর উপর আলো পড়ে তা প্রতিফলিত হয়ে চোখের লেন্স ভেদ করে রেটিনাতে পড়ার পর অপটিক নার্ভ তাদের নিয়ে যায় মস্তিষ্কে। সেখানে পরিস্ফুটন ঘটে ছবির। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় অসম্পূর্ণ তথ্যও প্রয়োজন অনুযায়ী জোড়া লাগিয়ে নিয়ে সম্পূর্ণতা দেয়ার কাজটা করে নেয় মস্তিষ্ক। এসময় মস্তিষ্ক যেরকম কল্পনা করে সেরকম ছবি তৈরি হতে পারে। দেয়াল চুঁইয়ে পানি পড়ার দাগ দেখে মাতা মেরির মুখ ভেবে নেয়া, বা পেঁপে কাঁটার পর সেখান থেকে প্রয়োজনমত বিঁচি সরিয়ে আরবিতে আল্লাহু-আকবর দেখা এরকমই অসম্পূর্ণ তথ্যের মস্তিষ্কজাত ফসল। তাই দেখা যায় অনেক মিরাকল উদ্দেশ্যমূলকভাবে মানুষেরই তৈরি। ৯/১১ এর সন্ত্রাসী হামলায় ১১ সংখ্যার ‘মিরাকল’ এরকমই একটা উদাহরণ (পৃঃ ৩৭)।

মিশরীয় আমেরিকান জৈব-রসায়নবিদ রাশেদ খলিফা অনেক ভেবেচিন্তে হিসেব-নিকেশ করে কিছু রেখে কিছু ঢেকে কোরান থেকে ১৯ সংখ্যার মিরাকল আবিষ্কার করেছেন। এই ১৯ দিয়েই তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন কোরান অলৌকিক। বে-আক্কেলের মত প্রশ্ন জাগে আমার – কোরানকে অলৌকিক প্রমাণ করার জন্য এত গলদঘর্ম হচ্ছেন কেন বিশ্বাসীরা? কেউ যদি কোরানকে অবিশ্বাস করেন – তিনি তো নিজ দায়িত্বেই তা করছেন। অবিশ্বাস করলে জাহান্নামের আগুনে কীভাবে তাঁকে পোড়ানো হবে তা তো কোরানেই বলে দেয়া আছে। তাহলে বিশ্বাসীদের এত মাথাব্যথা কেন? আসলে বিশ্বাসীদের বিশ্বাসও এই পোড়া-বিজ্ঞানের যুগে পদে পদে টলে যাচ্ছে। ফলে নিজেদের খাতিরেই তারা খুঁজে পেতে মিরাকল বের করার চেষ্টা করছেন। রাশেদ খলিফার ১৯-তত্ত্ব নিয়ে বাংলাদেশেও অনেক হৈ চৈ হয়েছে। বিজ্ঞানের আলোকে কোরানের ব্যাখ্যা করার হিড়িকও পড়েছে। এই উনিশের দফা-রফা করে ছেড়েছেন অনন্ত ও সৈকত তাঁদের পার্থিব বইতে। ১৯ এর মিরাকল দেখানোর জন্য কোরানের আয়াত সংখ্যার ভুল উল্লেখ, বর্ণ ও শব্দের সংখ্যায় যে গোঁজামিল ইত্যাদি দিয়েছেন রাশেদ খলিফা তা খুঁজে বের করেছেন অনন্ত ও সৈকত। শুধু তাই নয়, আরো অনেক সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম যৌক্তিক বিচারে প্রমাণ করে দিয়েছেন যে উনিশ নিয়ে কোরানের অলৌকিকত্ব প্রমাণের রাশেদ খলিফার দাবি অন্তঃসারশূন্য।

এ প্রসঙ্গে মার্কিন লেখক আর্নেস্ট ভিনসেন্ট রাইট এর ‘গ্যাড্‌সবি – চ্যাম্পিয়ন অব ইয়থ’ উপন্যাসের কথা উল্লেখ করেছেন অনন্ত ও সৈকত। ৫০১১০ শব্দের এই উপন্যাসে ঔপন্যাসিকের নাম ছাড়া আর কোথাও একটা বারের জন্যও ‘ই’ অক্ষরটি ব্যবহার করা হয়নি। ‘ই’ বাদ দিয়ে ইংরেজি বর্ণমালার বাকি ২৫টি অক্ষর দিয়ে চমৎকার একটা উপন্যাস লেখা হয়েছে মানুষের হাতে। আর্নেস্ট রাইট ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিলেন বলেই মনে হয়, কিন্তু তিনিও তাঁর উপন্যাসকে অলৌকিক কিছু বলে মনে করেন নি। বাংলায় কমলকুমার মজুমদারের লেখা ‘সুহাসিনীর পমেটম’ উপন্যাস যাঁরা পড়েছেন তাঁরা খেয়াল করলে দেখবেন যে শতাধিক পৃষ্ঠার এই বইটিতে দাঁড়ি ব্যবহার করা হয়নি কোথাও। তার মানে কি ‘সুহাসিনীর পমেটম’ একটা অলৌকিক কিছু?

বাইবেল বা কোরানে বিজ্ঞান খোঁজার উৎসবে পিছিয়ে পড়তে রাজি নন ভগবদ্‌গীতার ভক্তরা। সেজন্য তাঁরা গল্প বানাতে শুরু করেছেন। মাসিক হরেকৃষ্ণ সমাচারে (এপ্রিল ২০০৬) ইস্‌কনের ভক্তরা টেনে এনেছেন স্বয়ং আইনস্টাইনকে। তাঁদের মতে আইনস্টাইন নাকি নিজের মুখে বলেছেন – “আমি ইংরেজিতে অনুবাদ করা গীতা পড়তে পড়তে অবাক হয়ে যাই, আত্মস্থ হয়ে পড়ি এবং এই আত্মস্থ অবস্থায় পদার্থবিজ্ঞানের অতি দুর্বোধ্য আপেক্ষিক তত্ত্ব আমার কাছে সূর্যের আলোর মত সহজ সরল হয়ে যায়” (পৃঃ৭১)। তার অর্থ দাঁড়াচ্ছে আইনস্টাইন থিওরি অব রিলেটিভিটি আবিষ্কার করেছেন গীতা পড়ে। ভারতীয় হিন্দুরা গীতা পড়ছেন কত শত বছর ধরে – আর থিওরি অব রিলেটিভিটি কিনা ধরা পড়লো ইহুদি আইনস্টাইনের হাতে? এটা যে কত বড় নির্লজ্জ ভন্ডামি তা গীতায় বিশ্বাসীরাও জানেন। গীতায় বিজ্ঞান খোঁজার প্রতারক প্রচেষ্টার মুখোশ খোলা হয়েছে পার্থিব’র ‘ভগবদ্গীতায় বিজ্ঞান অন্বেষণ এবং অন্যান্য’ প্রবন্ধে।

গীতার উৎপত্তি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে। সমস্ত যুদ্ধায়োজন শেষ হবার পর যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে অর্জুনের হঠাৎ যুদ্ধ বাদ দিয়ে শান্তিবাদী হবার ইচ্ছে জাগে। তখন যুদ্ধ থামিয়ে অর্জুনকে উপদেশ দিতে শুরু করেন কৃষ্ণ। আঠারো অধ্যায়ে শেষ হয় এই উপদেশবাণী- যার নাম হয় ভগবদ্‌গীতা। মহাভারতে এই গীতাকে যে ঠেলেঠুলে জোর করে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে তা বিভিন্ন উদাহরণ সহকারে প্রমাণ করে দিয়েছেন পার্থিব’র লেখকদ্বয়। রবীন্দ্রনাথের কথা এখানে খুবই উল্লেখযোগ্যঃ “কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ থামিয়ে রেখে সমস্ত গীতাকে আবৃত্তি করা সাহিত্যের আদর্শ অনুসারে নিঃসন্দেহে অপরাধ। … যখন কুরুক্ষেত্রের তুমুল যুদ্ধ আসন্ন তখন সমস্ত ভগবদ্‌গীতা অবহিত হইয়া শ্রবণ করিতে পারে, ভারতবর্ষ ছাড়া এমন দেশ জগতে আর নাই” (পৃঃ ৮০)। গীতার অর্থহীন উৎপত্তি সহ গীতায় বিজ্ঞান খোঁজার সামাজিক কারণও ব্যাখ্যা করা হয়েছে এ অধ্যায়ে। গীতা বা অন্যান্য ধর্মগ্রন্থে ভগবানের নাম দিয়ে যেসব বক্তব্য প্রচারিত হয়েছে তা তৎকালীন সমাজের বৈষম্যের প্রতিফলন। “শূদ্র যদি কখনো ব্রাহ্মণের সঙ্গে একাসনে বসে তবে শূদ্রের কটিদেশে গরম লোহার ছ্যাঁকা দিয়ে নির্বাসন দেয়া হবে”। “শূদ্র ব্রাহ্মণপত্নীগমন করলে শাস্তি ছিল মৃত্যু, কিন্তু ব্রাহ্মণ শূদ্রাণীকে বলাৎকার করলেও শাস্তি ছিল অর্থদন্ড মাত্র” (পৃঃ৯১)। এসব শুনলে ধিক্কার দিয়ে উঠবেন যে কোন আধুনিক মানুষ। কিন্তু এগুলো যে মনুসংহিতার বাণী! অনন্ত ও সৈকত প্রমাণ করে দিয়েছেন যে ভগবদ্‌গীতা ব্রাহ্মণ্য-ক্ষত্রিয়দের নিজস্ব কাঠামো, শাসন-শোষণ টিকিয়ে রাখার জন্য সুদীর্ঘ সময় ধরে মানুষেরই সুকৌশলী রচনা।

এ অধ্যায়ে ৭৪ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আকাশের রঙ কেন নীল দেখায় তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় সামান্য ভুল আছে। বলা হয়েছে নীল রঙের তরঙ্গদৈর্ঘ্য লাল রঙের তরঙ্গদৈর্ঘ্য থেকে বেশি। আসলে লাল রঙের আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য নীল রঙের আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের চেয়ে বেশি। নীল রঙের আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যে কম হওয়ার কারণে তা বায়ুমন্ডলের ধূলিকণায় ধাক্কা খেয়ে চারিদিকে বিচ্ছুরিত হয়। ফলে বায়ুমন্ডলে নীল রঙ ছড়িয়ে পড়ে। তাই আকাশ নীল। একই পৃষ্ঠার আরেক জায়গায় বলা হয়েছে “আগুন হলো শক্তি, বস্তু নয়”। এটাও অতিসরলীকরণ। আগুনের সৃষ্টি হয় রাসায়নিক বিক্রিয়ায়। রাসায়নিক উপাদানগুলো বস্তু। আগুন থেকে যে তাপ ও আলো বের হয় সেগুলো শক্তি।

সংশয়বাদী দৃষ্টিকোণ থেকে ঈশ্বর ও ধর্ম প্রসঙ্গে যুক্তিনিষ্ঠ আলোচনা সন্নিবেশিত হয়েছে পার্থিব’র শেষ অধ্যায়ে। বিশ্বাস ও যুক্তির বিরোধ, স্রষ্টায় বিশ্বাসের উৎপত্তি ও ধর্মে সে বিশ্বাস রোপন করতে গিয়ে যে কত রকমের স্ববিরোধিতার সৃষ্টি হয়েছে -তার প্রাঞ্জল বর্ণনা আছে এ অধ্যায়ে। বাইবেল যে স্ববিরোধিতায় পূর্ণ তার কয়েকটি মোক্ষম উদাহরণ দেয়া হয়েছে ১০১ পৃষ্ঠায়। যেমন জেনেসিসের এক জায়গায় বলা হয়েছে মানুষ সৃষ্টির আগে গাছ সৃষ্টি করা হয়েছে। আবার একই জেনেসিসের অন্য জায়গায় বলা হয়েছে গাছের সৃষ্টি হয়েছে মানুষ সৃষ্টির পরে। মানুষ ঈশ্বরের দেখা পাবে না বলা হয়েছে। অথচ আরেক জায়গায় বলা হয়েছে অনেক মানুষ ঈশ্বরের দেখা পেয়েছে। যে ঈশ্বরকে সব ধর্মই খুব দয়ালু বলে প্রচার করে – ধর্মগ্রন্থগুলিতে বর্ণিত নারকীয় শাস্তির বর্ণনা শুনলে ঈশ্বরকে কিছুতেই দয়ালু বলে মনে হয় না। ঈশ্বর মানুষের ভক্তি আর পূজা লাভ করার জন্য এত লালায়িত যে মানুষেরই লজ্জা হয় ঈশ্বরের লোভ দেখে। ধর্মগ্রন্থগুলোতে বিজ্ঞান খুঁজে পাবার জন্য শত চেষ্টার পাশাপাশি গ্রন্থগুলোকে অলৌকিকত্ব দান করার চেষ্টাগুলোকেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কেউ কোন কিছু দাবি করলে তা প্রমাণের দায়িত্বও সাধারণত তার ঊপরেই পড়ে। কিন্তু ধর্মের অলৌকিকত্বের ব্যাপারে দেখা যায় উলটো। অলৌকিক বলে দাবি করেন ধর্মবাদীরা – কিন্তু প্রমাণ করতে বললে দায়িত্ব ঠেলে দেন যুক্তিবাদীদের দিকে। বলেন – বিশ্বাসে মিলায় বস্তু। কোরানের অলৌকিকত্বের পক্ষে যেসব যুক্তি ধর্মবাদীরা দেখান তার সবগুলোকেই খন্ডন করেছেন অনন্ত ও সৈকত। এই যুক্তিখন্ডন ও পার্থিব প্রমাণে কোন ধরনের আবেগ বা পূর্ব-বিশ্বাস স্থান পায়নি। মুক্তমন নিয়ে কেউ যদি ‘পার্থিব’ পড়েন – ভাবতে বাধ্য হবেন যে অলৌকিকতার দাবিগুলোতে কত বড় বড় ফাঁকি।

পার্থিব’র লেখকদের সাথে যুক্তিবাদী মাত্রেই একমত হবেন যে – ”

ধর্মগ্রন্থগুলো পড়তে হবে যার যার নিজের ভাষায়। যুক্তি প্রয়োগ করে বুঝতে হবে ধর্মগ্রন্থের বাণীর মর্মার্থ। শুধু পুণ্যলাভের আশায় না বুঝে পবিত্র ভাষায় পাঠ করা থেকে বিরত থাকা ভালো। না বুঝে পাঠ করলে শুধু অজ্ঞতাই বৃদ্ধি পায়, জ্ঞান বৃদ্ধি পায় না। আর এই অজ্ঞতা নামক দুর্বলতার সুযোগ নেয় আমাদের চারপাশের কিছু মোল্লা-মৌলভি, পীর-ফকির, ঠাকুর প্রমুখেরা। তাই সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিবাদী, প্রগতিশীল করে তুলতে হলে যুক্তিবোধের বিকাশ ঘটানোর কোন বিকল্প নেই”

(পৃঃ ১৩৪)।

বইয়ের বিষয়বস্তু ছাড়াও ঝকঝকে ছাপা ও চমৎকার বাঁধাইয়ের কারণে শুদ্ধস্বর ইতোমধ্যেই প্রকাশনার জগতে মর্যাদার আসন তৈরি করে নিয়েছে। পার্থিব’র ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। প্রচ্ছদের কথা আগেই উল্লেখ করেছি। সামান্য কিছু বানান ভুল চোখে পড়েছে। যেমন – ‘লোকগাথা’ অনেক জায়গায় ‘লোকগাঁথা’ হয়েছে। তাছাড়া পৃঃ ৯ – তুলে (তোলে), পৃঃ ২৫- আবহবিদ্যার (আবহাওয়াবিদ্যার), পৃঃ ৩৩- খুঁজার (খোঁজার), পৃঃ ৩৬- ঝাকে ঝাকে (ঝাঁকে ঝাঁকে), পৃঃ ৬৪- খোঁজলে (খুঁজলে), পৃঃ ৬৯- যুগান্তরকারী (যুগান্তকারী), পৃঃ ৭৬- গুদের (গোঁদের), পৃঃ ৭৭- বিট্রিশরা (ব্রিটিশরা), নন-মুসলিমরা (নন-মুসলিম), পৃঃ ৭৮- সাবস্যস্ত (সাব্যস্ত), পৃঃ ৮৭- গেলেন (পেলেন), মৎসদের (মৎস্যদের), পৃঃ ৮৮- না-কী (নাকি), পৃঃ ৯০- আমি (আমরা), করলন (করলেন), পৃঃ ৯৮- জিন (জ্বিন), পৃঃ ১০৭- ধর্মবিশ্বাসীরা (ধর্মবিশ্বাসী), পৃঃ ১৩৪- ঘটনানোর (ঘটানোর)।

পার্থিব’র সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর নির্মেদ ঝরঝরে ভাষা, আর ক্ষুরধার যুক্তি। সারা বইতে একটাও অপ্রয়োজনীয় বাক্য নেই। এমন নিরাবেগ নির্মোহ পার্থিব যুক্তির ধারাবাহিক সমাবেশ ঘটেছে যে বইতে – সে বই সবদিক থেকেই সার্থক।


Latest Post

Ken Amos — My Teacher My Mentor

  For many people, another kind of student life begins after the formal years of schooling, college, and university degrees have come to an ...

Popular Posts