Sunday, 23 August 2026

পাঠকের দিনলিপি ১৬-অক্টোবর-২০০৪

 


১৬/১০/২০০৪

গোলাম শফিকের গল্প ‘তেজখালির ব্রিজ’ পড়লাম ভোরের কাগজের সাহিত্য পাতায়। স্বাধীনতা যুদ্ধের কিছু আগে তেজখালিতে একটা ব্রিজ তৈরির কাজ শুরু হয়। যুদ্ধের কারণে তা বন্ধ হয়ে গেলে সব নির্মাণ সামগ্রি ধনুমিয়া নিজের বাড়িতে নিয়ে যায়। ব্রিজের বদলে নিজের বাড়ি হয়। স্বাধীনতার ত্রিশ বছর পরে ব্রিজটা তৈরি হয়। ব্রিজকে ঘিরে গ্রামের জীবন দেখানো হয়েছে এই গল্পে।

মাসুদুজ্জামান লিখেছেন এলফ্রিয়েদে হেলিনেক সম্পর্কে। ভোরের কাগজে। নারীবাদী এই লেখিকাকে নিয়ে খুব হৈ চৈ হবে কিছুদিন।

শান্তনু মজুমদারের গল্প ‘ফোরটিন এবং একটি অচিন বৃক্ষের কান্না’ পড়লাম ভোরের কাগজে। শান্তনু মজুমদারের গল্প বলার ভংগি ভাষা দারুন আকর্ষনীয়। খুব ভালো লেগেছে গল্পটা। আদিবাসী সম্প্রদায়ের লোকজন নিয়ে এই গল্প। তারা ভাগ্য ফেরানোর জন্য ধর্ম বদল করেও কিছু পায়নি। খৃস্টান হয়েছে তারা। সাদা ফাদারের কথা শুনেছে, নিজেদের মন্দিরের পরিবর্তে চার্চে যেতে শুরু করেছে, কিন্ত তিমির ঘোচেনি। গল্পটা সুন্দর ঘটনার চেয়েও ভাষার জন্য। এখানে ফোরটিন আসলে প্রতিম। ফাদার প্রতিম উচ্চারন করতে পারেন না বলে প্রতিম হয়ে গেছে ফোরটিন।

সাপ্তাহিক পূর্ণিমার গল্প ‘অতিথি পাখি’। লিখেছেন শাহ্‌নেওয়াজ চৌধুরি। এটা কোন গল্পই হয়নি বলে আমার ধারণা। একটা জিনিস এখনো স্বীকার করতে হবে তা হলো ইনকিলাব পত্রিকা গোষ্ঠি এখনো দারুন ভালো লেখক তৈরি করতে পারেনি। কিন্তু জানি না, হয়তো হুমায়ূন আহমেদ টাইপের লেখক তারা কিনে ফেলবেন। ঈদ সংখ্যায় যেমন তারা ইন্ডিয়ান লেখকদের অনেক লেখা ছাপে।

আই-পত্রিকায় শমীক মুখোপাধ্যায়ের গল্প ‘দহনের পরে’। শ্যামলীকে এসিড বালব মেরে মুখ পুড়িয়ে দেয় গুন্ডা শিবাজি। শ্যামলীর প্রেমিক সুমন অনেক ছোটাছুটি করে শিবাজির বিচারের ব্যবস্থা করে। শিবাজির পাঁচ বছর জেল হয়। কিন্তু সাড়ে তিন বছরের মাথায় ছাড়া পায় সে। তাকে বাসে দেখে আতংকে শিউরে উঠে শ্যামলী। শ্যামলীর এই উদ্বেগ আর আতংকের কয়েকটা দিন নিয়ে এই গল্প। সুমন এখন অন্য একজনকে ভালোবাসে। শ্যামলির এই সময়ে মনে হয় সুমন তার সাথে প্রতারণা করেছে। এক পর্যায়ে শ্যামলী আত্মহত্যার কথাও ভাবে। কিন্তু শিবাজি প্রতিপক্ষের হাতে নিহত হওয়ায় সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়। গল্পটা সুন্দর।

ভোরের কাগজে ১৫/১০/০৪ তারিখে কে এম সোবহানের লেখা ‘এখানে এখন সবই সম্ভব’। বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে লেখা। এধরনের লেখা এখন ইনকিলাব সংগ্রাম বা দিনকাল ছাড়া আর সব পত্রিকাতেই নিয়মিত থাকছে।

১৫/১০/০৪ তারিখের ভোরের কাগজে সা’দ উল্লাহর লেখা ‘বাংলাদেশে দেশটা আছে, বাংলা নেই’। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা যাবার পথে বাসে কোরান তেলাওয়াত আর পরে হিন্দি গান আর সিনেমা চালানোসহ বাংলাদেশ বিমান ট্রেন সব জায়গায় যেভাবে জোর করে মানুষকে কোরানপাঠ শোনায় তা নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি।

১৫/১০/০৪ তারিখের ভোরের কাগজে সিডনি থেকে অজয় দাশগুপ্ত লিখেছেন ‘আমাদের জাতীয় চরিত্র ও একজন জনপ্রিয় লেখকের গল্প’। হুমায়ূন আহমেদ প্রসংগে লিখেছেন তিনি। আমাদের জাতীয় জীবনের প্রধান ইস্যুতে এই লেখক চুপ মেরে থাকেন প্রচন্ড ক্ষমতা থাকা সত্বেও। ব্যাপারটা আসলেই চিন্তার। শফিক রেহমান তাঁর যায় যায় দিন পত্রিকার সুযোগ নিয়ে নির্বাচন সহ সবকিছুতেই তরুণদের প্রভাবিত করেন। আমাদের হূমায়ুন আহমেদ কেন তা করেন না। তিনি বি এন পি সহ চার জোটের এমন স্বৈরাচারী সময় কেন চুপ করে থাকেন? সুবিধাবাদী নিশ্চয়। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে তিনি নাকি প্রকাশ্যে বলেছেন সুন্দরী ম্যাডাম মানে খালেদা জিয়াকে ভোট দেবেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে তাঁর কিন্তু খালেদা জিয়াকে সাপোর্ট করার কথা নয়।

আই-পত্রিকায় পড়লাম অরিন্দম দাশগুপ্তের গল্প ‘বাবা’।  খুব একটা পিতৃত্বমূলক গল্প কিছু নয়। ছেলে খুব পরিশ্রান্ত হয়ে ফিরে আসার পরেও তার মেয়েকে নিয়ে গল্প করতে হয়, গান শোনাতে হয়। এতে আদিত্যের বাবার মন খারাপ হয়ে যায়। তিনি মনে করেন আদিত্য বিশ্রাম পাচ্ছে না। কিন্তু পরে বুঝতে পারেন আদিত্য নিজেই এখন বাবা। তার মেয়ের জন্য তারও একই রকম টান। 

আই পত্রিকায় প্রচেত গুপ্তের গল্প ‘মণি আসছে’। বেশ মজার গল্প। মণি আসছে তার ছেলেকে নিয়ে সাত বছর পর দেশের বাইরে থেকে। সে উপলক্ষে কোলকাতার বাড়িতে এসে জড়ো হয়েছে সব আত্মীয় স্বজন। মণির জন্য তাদের ভালোবাসা উদ্বেগ প্রস্তুতি ইত্যাদি। মণি আসার পরে দেখা যায় মণি বদলায়নি একটুও। সবাই মিলে খুব মজা করে। এই গল্পে কোন কষ্ট নেই। কেবল আনন্দ। দেশের বাইরে থেকে আসলে কেবল আনন্দই থাকে মনে হয়।

১৫/১০/০৪ তারিখের প্রথম আলোর সাময়িকী। মশিউল আলম লিখেছেন ইয়েলিনেকের করুণ জগৎ। একটা তথ্য প্রমাদ আছে। বলা হচ্ছে ইয়েলিনেক কোন আমেরিকান প্রকাশক পাননি। কথাটা সত্য নয়। কারণ আমি এই মুহূর্তে দি পিয়ানো টিচার পড়ছি, তা আমেরিকায় প্রকাশিত হয়েছে বৃটেনে প্রকাশিত হবার আগে।

নাসিরুদ্দিন কবির ইলিয়েনেকের একটা সাক্ষাৎকার অনুবাদ করেছেন। ইয়েলিনেক মূল্যবান কথা বলেছেন শিল্পকলা আর রাষ্ট্রক্ষমতা প্রসংগে। শিল্পকে ক্ষমতা কেন্দ্র থেকে দূরে সরিয়ে না রাখলে শিল্পের মৃত্যু ঘটে। সে বাম বা ডান যে ক্ষমতাই হোক না কেন।

মোস্তফা কায়সার দি পিয়ানো টিচারের বাংলা অনুবাদ করেছেন কয়েক পৃষ্ঠা।

নাসিমা সেলিম ‘প্যাঁচা’ নামে একটা গল্প লিখেছেন। আমার মনে হয়েছে এটা একটা সুহাসিনীর পমেটম।

১৫/১০/০৪ তারিখের প্রথম আলোর উপসম্পাদকীয়তে অধ্যাপক সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী লিখেছেন বাংলাদেশের প্রথম মুসলিম মহিলা ডাক্তার জোহরা বেগম কাজী সম্পর্কে। এই মানুষটি সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না। জেনে নিতে হবে অধ্যাপক জোহরা বেগম কাজী সম্পর্কে।

আর কে নারায়ণের উপন্যাস The Vendor of Sweets পড়লাম। এই বইটা মেলবোর্নে পাইনি বলে আগে পড়তে পারিনি। ১৯৬৭ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়েছে। জগন মানে জগন্নাথ মিষ্টি বিক্রেতা। মালগুদি শহরের মোটামুটি ধনী বলা চলে। গান্ধীবাদী মানুষ। খুবই স্বাভাবিক চরিত্র। কোন ধরনের অতিরঞ্জন থাকে না নারায়ণের সৃষ্ট চরিত্রে। জগনের ছেলে মালি একদিন ঠিক করে আর পড়াশুনা করবে না। গল্প লিখবে। জগন অসম্ভব ভালোবাসে তার এই মা মরা একমাত্র ছেলেটাকে। সে মেনে নেয় মালির সিদ্ধান্ত।

কিন্তু মালি একদিন আমেরিকায় পাড়ি দেয়। সে নিজেই সব ঠিক করেছে। টাকা চুরি করেছে জগনের তহবিল থেকে। আমেরিকায় যাবার বিরুদ্ধে হলেও মালি যখন চলেই যায় সেখানে তখন জগন বেশ গল্প শোনায় আমেরিকার। অবস্থা এমন হয় যে জগনের গল্প শুনতে হবে বলে অনেকে জগনের কাছ থেকে পালিয়ে থাকতে পারলে বাঁচে। 

সময় কেটে যায়। তিন চার বছর পরে মালি ফিরে আসে। সাথে একজন চায়নিজ মেয়ে গ্রেসকে নিয়ে। মালির বৌ। জগন এবার নিজেই এড়িয়ে চলে মানুষের সংগ। গ্রেসের মা কোরিয়ান। বাবা আমেরিকান সৈন্য ছিলো। কোরিয়ান যুদ্ধের পর আমেরিকায় জন্ম হয় গ্রেসের। সে মিশিগানে মানুষ। মালির সাথে পরিচয় একটা গল্প লিখতে শেখার কোর্সে। 

মালগুদিতে ফিরে মালি বেশ আমেরিকান ভাব নিয়ে থাকে। কথায় কথায় ভারতের কিছু হবে না তা বলে। সে ব্যবসা করতে চায়। একটা মেশিনের ব্যবসা করতে চায় যে মেশিনটা গল্প লেখার মেশিন। স্বয়ংক্রিয় ভাবে গল্প লিখে দেবে এই মেশিন। টাকা লাগবে ব্যবসায়। জগনের কাছে টাকা চায় মালি আর গ্রেস। পঞ্চাশ হাজার ডলার। তখনকার সময়ে এক ডলার মানে ভারতের পাঁচ রুপি। জগন এই টাকা দিতে রাজি হয় না। ছেলে আর বাপের মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে যায়। এসময় জানা যায় গ্রেস আর মালি বিয়ে করেনি। বিয়ে না করেই একসাথে থাকছে এই চিন্তা করেই কেমন যেন দমবন্ধ হয়ে আসে জগনের। 

একসময় মালি জেলে যায়। জগন সংসার ত্যাগ করে সন্যাসী হয়ে যায় আর গ্রেস ফিরে যায় তার দেশে।

--------

কলম্বাস, ওহাইও

No comments:

Post a Comment

Latest Post

Ken Amos — My Teacher My Mentor

  For many people, another kind of student life begins after the formal years of schooling, college, and university degrees have come to an ...

Popular Posts