৮ আগস্ট, স্যার রজার পেনরোজের জন্মদিন।
নক্ষত্রের আলোকে আলোকিত আমাদের মহাবিশ্ব। আমরা জানি আলোর গতি সর্বত্র। কত লক্ষ কোটি আলোকবর্ষ পার হয়ে সুদূর অতীতের আলো এসে ঝিকমিক করে আমাদের রাতের আকাশে। কিন্তু আমরা এটাও এখন জানি যে এই মহাবিশ্বের মহাকাশে এমন কিছু জায়গা আছে যেখান থেকে আলোও ফিরে আসতে পারে না। গভীর নিকষ অন্ধকার সেখানে। বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং যাকে তুলনা করেছেন ইতালিয় কবি দান্তে আলিগিয়েরির ডিভাইন কমেডিতে বর্ণিত দোজখের সাথে – যেখানে প্রবেশ করার সময় সমস্ত আশা চিরতরে পরিত্যাগ করতে হয়।
সেখানে মাধ্যাকর্ষণের টান এতটাই তীব্র যে সেই টানে আয়তন এত কমে যায় যে সেটা স্থান-কাল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সেখান থেকে আলো, কিংবা তড়িৎ-চৌম্বক তরঙ্গ কিংবা কোন কিছুই আর বের হয়ে আসতে পারে না। এই অদৃশ্য বস্তু মূলত মৃত নক্ষত্র। আগে এর নাম ছিলো ডার্ক স্টার। ১৯৬৭ সালে বিজ্ঞানী জন হুইলার তাদের নাম দিয়েছেন ব্ল্যাক হোল। জন হুইলারের ছাত্র ছিলেন রিচার্ড ফাইনম্যান, কিপ থর্ন প্রমুখ খ্যাতনামা বিজ্ঞানী। বিজ্ঞানী কিপ থর্ন পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন ২০১৭ সালে মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করার জন্য। তাদের শনাক্তকরা মহাকর্ষ তরঙ্গের ঢেউ এসেছিল শত কোটি বছর আগে ঘটে যাওয়া দুটো ব্ল্যাকহোলের সংঘর্ষ থেকে। ২০১৯ সালের এপ্রিলে ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপের সাহায্যে গ্যালাক্সি M87 এর কেন্দ্রে থাকা ব্ল্যাকহোলের ছায়া থেকে বিজ্ঞানীরা ব্ল্যাকহোলের ছবি তৈরি করতে সমর্থ হন। পৃথিবীব্যাপী ব্যাপক উৎসাহের জন্ম দিয়েছিল সেই ব্ল্যাকহোলের ছবি। তারই হাত ধরে ২০২০ সালের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরষ্কারের মূল বিষয় ছিল – ব্ল্যাকহোল।ব্ল্যাকহোলের আধুনিক গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানের মূল উৎস আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি বা আপেক্ষিকতার সার্বিক তত্ত্ব। যদিও আইনস্টাইন নিজে ব্ল্যাকহোলের ফ্যান ছিলেন না। আইনস্টাইন বিশ্বাস করতেন মহাবিশ্বে ব্ল্যাকহোলের উৎপত্তি হতে পারে না। ১৯৩৯ সালে তিনি একটি গবেষণাপত্রে (Stationary Systems with Spherical Symmetry Consisting of Many Gravitational Masses, Annals of Mathematics, বর্ষ ৪০ (১৯৩৯), পৃষ্ঠা ৯২২-৯৩৬) দাবি করেন যে নক্ষত্রগুলি অভিকর্ষজ টানে খুব বেশি সংকুচিত হতে পারবে না, কারণ পদার্থের সংকোচনের একটা সীমা আছে। ধরতে গেলে আইনস্টাইনের গাণিতিক জগতে ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব ছিল না। কিন্তু আইনস্টাইনের মৃত্যুর দশ বছর পর ১৯৬৫ সালে ব্ল্যাকহোল সংক্রান্ত সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য এবং সবচেয়ে ক্ল্যাসিক গাণিতিক তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানী রজার পেনরোজ। সেই তত্ত্বের জন্য ২০২০ সালের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন রজার পেনরোজ।
১৯৩১ সালের ৮ আগস্ট ইংল্যান্ডের কোলচেস্টারে জন্ম রজার পেনরোজের। তাঁর বাবা ছিলেন বিখ্যাত মনোচিকিৎসক লিওনেল পেনরোজ। ১৯৫৮ সালে তিনি কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির সেন্ট জন’স কলেজ থেকে গণিতে পিএইচডি করেন। মূল গণিত থেকে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানের গণিতে আকৃষ্ট হন ব্রিটিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ডেনিস স্কিয়ামার উৎসাহে। ডেনিস স্কিয়ামা ছিলেন স্টিফেন হকিং-এর পিএইচডি সুপারভাইজার। রজার পেনরোজের সাথে যৌথভাবে অনেক গবেষণা করেছেন স্টিফেন হকিং। ব্ল্যাকহোলের তত্ত্ব প্রতিষ্ঠায় স্টিফেন হকিং ও রজার পেনরোজের অসংখ্য গবেষণা রয়েছে। পেনরোজ জ্যোতির্বিজ্ঞানের গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানে বিপ্লব নিয়ে এসেছেন।
পদার্থবিজ্ঞানের এই বিপ্লবীর আজ ৯৫তম জন্মবার্ষিকী।
শুভ জন্মদিন স্যার পেনরোজ!!

No comments:
Post a Comment