Monday, 10 August 2026

সিনডেরেলার পা

 


"ভাইয়া, সিনডেরেলার পায়ে কি কোনো সিরিয়াস প্রোবলেম ছিল?"

আমি অবাক হয়ে অথৈয়ের দিকে তাকালাম।

সিনডেরেলা সম্পর্কে এরকম প্রশ্ন আগে কখনো শুনিনি।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আমরা সিনডেরেলার গল্প শুনে আসছি। মাতৃহীন এক গরিব মেয়ে,  দুষ্ট সৎমা, এক পরী, কুমড়োর গাড়ি, মাঝরাতের সময়সীমা, আর অবশ্যই, সেই বিখ্যাত জুতোর গল্পে আমরা অভ্যস্ত। আমরা সিনডেরেলাকে পেয়েছিলাম বাংলা অনুবাদের মাধ্যমে।  অথৈয়ের প্রজন্ম, ইংলিশ মিডিয়ামের কল্যাণে সরাসরি ইংরেজিতেই পড়ছে সিনডেরেলা। এখন তাদের কী দুর্দান্ত সব বই আছে—চকচকে পাতা, ঝলমলে ছবি, প্রতিটি প্রচ্ছদে আলো ছড়ানো রাজকন্যা।

সিনডেরেলার গল্প কত হাজার বার যে বলা হয়েছে। পৃথিবীর প্রায় সব প্রধান ভাষায় অনুদিত হয়েছে এই গল্প।  বই, কার্টুন, ব্যালে, নাটক, কার্টুন, সিনেমা -সব মাধ্যমেই ছোটবড় সবাই সিনডেরেলার গল্প ভালোবাসে। এখনো নতুন নতুন আঙ্গিকে বানিয়ে চলেছে সিনডেরেলার কাহিনি।

আরো সব রূপকথার মতোই কোনো অভিযোগ ছাড়াই আমরা মেনে নিই এর অলৌকিক অযৌক্তিকতা।

কুমড়ো গাড়ি হয়ে যায়?
ঠিক আছে, রূপকথায় সব হয়।

ইঁদুরগুলো ঘোড়া হয়ে যায়?
সমস্যা নেই, রূপকথায় ইঁদুর ঘোড়া কেন, উড়োজাহাজও হয়ে যেতে পারে।

একটি পরী হঠাৎ এসে মুহূর্তেই রাজকীয় পোশাক তৈরি করে ফেলে?
সমস্যা কী? করতেই পারে।

মাঝরাতে পোশাক উধাও হয়ে যায়, পুরো গাড়ি উড়ে চলে যেতে পারে, অথচ একপাটি জুতো কীভাবে সেই জাদু থেকে বেঁচে যায়?
কোনো প্রশ্ন নয়, এটি রূপকথা।

কিন্তু আমার দশ বছরের নাতনি এমন একটা সমস্যা ধরে ফেলেছে, যা বহু প্রজন্মের সাহিত্য সমালোচক, চলচ্চিত্র নির্মাতা আর রূপকথা-প্রেমীরাও উপেক্ষা করে গেছেন।

সিনডেরেলার পা।

"অথৈভাইয়া, তুমি কেন মনে করছ তার পায়ে সিরিয়াস প্রোবলেম ছিল?" হাসি চেপে  অথৈকে পালটা প্রশ্ন করলাম।

অথৈ এমনভাবে আমার দিকে তাকাল যেন আমি বোকার মতো প্রশ্ন করছি। ঠোঁট ফুলিয়ে সে উত্তর দিলো, "কারণ তার জুতো আর কারো পায়ে হচ্ছে না। জুতোর দোকানে কি সবার পায়ের জুতো পাওয়া যায় না? সেখানে কি মিলিয়ন মিলিয়ন ডিফারেন্ট সাইজের শু আছে?"

অথৈর প্রশ্নটা চমৎকার। ভীষণ যুক্তিপূর্ণ। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। একেবারে তার মায়ের জেরক্স কপি। আমার ভগিনি তার কন্যার যুক্তি খন্ডাতে না পেরে বলতো, ডাক্তার না হয়ে তোর উকিল হওয়া উচিত ছিল। এখন তার কন্যার কন্যার যুক্তিতে আমি মুগ্ধ হয়ে ভাবছি সিনডেরেলার পায়ের কথা।

একটু ভাবুন তো।

সমগ্র মানবজাতির পায়ের জন্য আসলে কতগুলো জুতোর মাপ দরকার হয়? বিশটা? পঁচিশটা? খুব ছোট শিশু থেকে শুরু করে বিশাল বড় পায়ের দৈত্যাকৃতি মানুষ পর্যন্ত হিসেব করলে হয়তো আরও কয়েকটা এক্সট্রা লার্জ সাইজ।

তবু কোটি কোটি মানুষ নিয়মিত জুতো কিনছে কোনো সমস্যা ছাড়াই।

কোনো জুতোর দোকানে গিয়ে কাউকেই কখনো শুনতে হয় না, "সরি ম্যাডাম। আপনার পা পুরো রাজ্যে অনন্য। এই রাজ্যে এই পায়ের জন্য জুতো পাওয়া সম্ভব নয়।"

ভিন্ন ভিন্ন মানুষের পায়ের সাইজ ভিন্ন ভিন্ন হবেই। কারো সরু, কারো চওড়া, কারো লম্বা, কারো ছোট। তবু লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রায় একই মাপের জুতো পরে।

দেখা যাচ্ছে, সিনডেরেলার রাজ্যে অন্য নিয়ম।

রাজকুমার এক পাটি জুতো নিয়ে সারা দেশ ঘুরে বেড়ালেন, যত যোগ্য তরুণী খুঁজে পেলেন, সবার পা-টি দেখে সেই এক পাটি জুতো পরিয়ে দেখলেন। কিন্তু না -

খুব বড়।
খুব ছোট।
ভুল পা।
পরের জন!

একের পর এক নারী মহান রাজকীয় পা-পরীক্ষায় ব্যর্থ হলো।

এরপর সিনডেরেলা এলো। পা-টি বাড়িয়ে দিতেই একদম সঠিক মাপ।

এখন পরিসংখ্যানগতভাবে দেখলে, এটা আমাদের সন্দেহ জাগানো উচিত।

সিনডেরেলাই কি সত্যিই গোটা রাজ্যের একমাত্র নারী, যার পায়ের মাপ এমন ছিল?

আর একটাও মেয়ে নেই?
একজন কাজিনও নেই?
একজনও অস্বাভাবিক ছোটখাটো ডাচেস নেই?

স্বাভাবিকভাবেই প্রচলিত ব্যাখ্যাটা রোমান্টিক: জুতোটা শুধু সিনডেরেলার পায়েই মানানসই ছিল, কারণ সিনডেরেলাই রাজকুমারের একমাত্র সত্যিকারের ভালোবাসা।

অথৈয়ের ব্যাখ্যা ছিল অনেক বেশি বৈজ্ঞানিক।

যদি জুতোটা আর কারো পায়ে না লাগে, তাহলে হয়তো সমস্যাটা বাকি সবার মধ্যে নয়।

হয়তো সমস্যাটা সিনডেরেলার মধ্যেই।

আরও নির্দিষ্ট করে বললে—
সিনডেরেলার পায়ে।

হয়তো একটা পা অস্বাভাবিক রকম সরু ছিল।
হয়তো তার আঙুলগুলোর গঠন ছিল অদ্ভুত রকম আলাদা।
হয়তো তার পায়ের গঠন এমন ছিল, যা পা-বিজ্ঞানে (পডিয়াট্রি) এখনো অজানা।
হয়তো তার জন্মগত কোনো অস্বাভাবিকতা ছিল, যা কখনো নির্ণয় করা হয়নি।
কে জানে?

রূপকথার চিকিৎসাবিজ্ঞান খুব একটা উন্নত ছিল না।

হঠাৎ করেই আমার সিনডেরেলাকে শুধু একটা রোমান্টিক কল্পকাহিনি বলে মনে হয় না, বরং সেটা একটা আকর্ষণীয় কেস-রিপোর্টের মতো শোনায়—

"রাজকীয় বিবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত নারীর পায়ের একটি বিরল শারীরবৃত্তীয় ভিন্নতা: একটি কেস স্টাডি।"

পটভূমি: একজন তরুণী এমন পা নিয়ে হাজির হয়েছেন, যা রাজ্যের অন্য সব নারীর জুতোর মাপের সঙ্গে স্পষ্টতই বেমানান।

পদ্ধতি: সারা দেশজুড়ে কাচের জুতো পরানোর অভিযান।

ফলাফল: রোগী শনাক্ত হওয়ার পরপরই তাৎক্ষণিক সামাজিক-অর্থনৈতিক ও রাজকীয় মর্যাদায় উত্তরণ।

উপসংহার: অস্বাভাবিক পায়ের গঠনের অপ্রত্যাশিত উপকারও থাকতে পারে।

আর ঠিক এখানেই অথৈয়ের প্রশ্নটা দারুণভাবে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। এই অস্বাভাবিক পা-ই কি সিনডেরেলাকে রানি বানিয়ে দিয়েছিল?


No comments:

Post a Comment

Latest Post

Ken Amos — My Teacher My Mentor

  For many people, another kind of student life begins after the formal years of schooling, college, and university degrees have come to an ...

Popular Posts