Thursday 29 April 2021

ফুটবলের বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীদের ফুটবল

 




"তোমার ফুটবল টিম কোন্‌টি?"

ভাইস-চ্যান্সেলারের প্রশ্নে আমি একটু ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম। অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে এসেছি একমাসও হয়নি তখনো। মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির স্কলারশিপ অফিসের একটি অনুষ্ঠানে ভাইস চ্যান্সেলর নিজে এগিয়ে এসে কথা বলছেন শিক্ষার্থীদের সাথে। এখানে চ্যান্সেলর ভাইস-চ্যান্সেলররা সাঙ্গপাঙ্গ ছাড়া সাধারণ মানুষের মত চলাফেরা করেন এটাই আমার কাছে আশ্চর্য ঘটনা। কিন্তু তাঁদের কেউ যখন আটপৌরে মানুষের মত শিক্ষার্থীদের কাছে ফুটবল টিম সম্পর্কে জানতে চান - তখন যেন ঠিক স্বাভাবিক বলে মনে হয় না। আমার কোন উত্তর না পেয়ে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় ফুটবলের মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে শুরু করলেন। অস্ট্রেলিয়ার সব মানুষই নাকি কোন না কোন ফুটবল দলের সমর্থক। অনেকে বংশানুক্রমিকভাবে কোন কোন দলের সমর্থক। আমি ভাবলাম - এ আর নতুন কী? আমরাও তো ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার পতাকা দিয়ে পুরো বাংলাদেশ ঢেকে ফেলি বিশ্বকাপের সময়।

ক্রমে ক্রমে জানলাম অস্ট্রেলিয়ার মানুষ যে ফুটবল টিমের সমর্থক - সেই সবগুলো টিম তাদের নিজেদের দেশের টিম, আর যে ফুটবল নিয়ে এত মাতামাতি করে - সেটা আমাদের ফুটবলের মত গোলাকার বা spheric নয় - সেটা spheroid বা উপগোলাকার। তাছাড়া তারা এই বলটা হাত-পা-মাথাসহ সারা গা দিয়ে ধাক্কাধাক্কি মারামারি করতে করতে খেলে। আমাদের গোলাকার বল নিয়ে শুধুমাত্র পা ব্যবহার করে যে ফুটবল আমরা খেলি তাকে এরা বলে সকার (soccer)। ফিফা ওলার্ল্ডকাপ ফুটবলকে এরা বলে ওয়ার্ল্ডকাপ সকার।

সকার শব্দটা আমার খুব একটা ভালো লাগে না। পা বা ফুট দিয়ে যে বল খেলি সেটা ফুটবল - সোজা হিসেব। সেখানে সকার! আসলে তাদেরও দোষ নেই খুব একটা। আমরা মানুষ নামক প্রাণিরা জন্মের আগেই মায়ের পেটে লাথি মারার মাধ্যমে পায়ের ব্যবহার শিখে যাই। জন্মের পর হাঁটতে শিখেই আমরা লাথি মারতে শুরু করি। সে হিসেবে ফুটবল খেলার জন্মের ইতিহাস অনেক পুরনো। খ্রিস্টাব্দ শুরু হবার কয়েক শ' বছর আগে থেকেই চীনের হ্যান সাম্রাজ্যের সৈনিকেরা অনুশীলনের অংশ হিসেবে ফুটবল খেলতো। চামড়ার তৈরি এই ফুটবলের ভেতর থাকতো পাখির পালক ও মানুষের চুল। তারা ফুটবলকে বলতো - 'সু চু' (Tsu' Chu)। ফুটবলের সংগঠন তৈরি করে দলগতভাবে তুলনামূলকভাবে আধুনিক ফুটবল খেলা শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে ১৮৬৩ সালে। ১৮৬৩ সালের ২৬ অক্টোবর ফুটবল খেলার নিয়মকানুন ঠিক করে দলগত ফুটবল বা Association Football শুরু হয়েছিল। এর আগে দলগত রাগবি খেলার চল ছিল। দলগত ফুটবল খেলা শুরু হবার পর রাগবি দলের লোকজনকে কথ্য ভাষায় রাগার (rugger) আর দলগত ফুটবলের লোকজনকে Assoccer থেকে Soccer বা সসার বলে ডাকা শুরু হলো। ক্রমে এই সসার হয়ে গেলো সকার। কিন্তু আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকা - এই কয়েকটি দেশ ছাড়া বাকি সারা পৃথিবীতে ফুটবল হিসেবেই এই খেলা চলছে।

ফুটবলের বলটি একটি পারফেক্ট স্ফিয়ার বা গোলক, যার আয়তন 4/3(pi r^3)। আমাদের পৃথিবীর মতো, চাঁদের মতো গোলাকার। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী ফুটবলের পরিসীমা হতে হবে ৬৮ থেকে ৭০ সেন্টিমিটারের মধ্যে। গোলকের পরিসীমা 2(pi)r । এখান থেকে খুব সহজেই আমরা হিসেব করে বের করতে পারি ফুটবলের আদর্শ ব্যাসার্ধ হতে হবে ১১ সেন্টিমিটার। এই ব্যাসার্ধের মান কাজে লাগিয়ে আমরা ফুটবলের আদর্শ আয়তন হিসেব করে নিতে পারি  ৫৫৭৫ সিসি বা ঘন সেন্টিমিটার।

 

চিত্র: বিশ্বকাপ ফুটবল ২০১৮: টেলস্টার ১৮


চিত্র: অস্ট্রেলিয়ান রুল ফুটবল

 

কিন্তু অস্ট্রেলিয়ান ফুটবলের উপগোলাকার আকৃতিটাই তো ভালো লাগে না। তাছাড়া তার আয়তন বের করার জন্য যে ফর্মূলা ব্যবহার করতে হয় সেটাও খটমট। জ্যামিতিক গণিতের বিভিন্ন আকৃতির পদার্থের আয়তন ইত্যাদি নির্ণয় করতে গিয়ে স্কুল-কলেজে আমার "গণিতের মার্কায় কাটা গেল সর্বই" অবস্থা হয়েছিল। আমার সুপারভাইজার প্রফেসর অ্যামোস ভাবলেন তাঁদের ফুটবলের আকৃতির কারণেই আমি তাঁদের ফুটবল খেলা পছন্দ করছি না। একদিন দুপুরে আমাকে বোঝাতে বসলেন কেন অস্ট্রেলিয়ান ফুটবল আমাদের ফুটবলের চেয়ে একধাপ এগিয়ে আছে।

     'তুমি তো জানো সব ধরনের বলই কিন্তু ফিজিক্সের বেসিক মেকানিক্স মেনে চলে। ক্রিকেট, টেনিস, ফুটবল, সকার, বেসবল, গল্‌ফ সবই নিউটনের গতির সবগুলো সূত্র মেনে চলে। তবে আমাদের ফুটবলে কিন্তু ম্যাগনাস ইফেক্ট খুব কম।'

     ম্যাগনাস ইফেক্টের ব্যাপারটা কমবেশি সবাই জানে। ফুটবল খেলায় কর্নার কিক থেকে বল সরাসরি গোলবক্সে পাঠিয়ে দেয়ার ঘটনা অহরহ না ঘটলেও মাঝে মাঝে ঘটে যায়। বল যখন লাথি খেয়ে শূন্যে উঠে ঘুরতে থাকে  - তখন বলের ঘূর্ণনের ফলে বাতাসের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়। ভরবেগের সংরক্ষণশীলতার কারণে বলের আদি ভরবেগ ও শেষ ভরবেগ সমান হতেই হবে। ভরবেগ সমান করার জন্য বাতাস যেদিকে যায় - বলটি তার বিপরীতদিকে ছুটে যায়। একারণেই দেখা যায় কর্নার থেকে বল সোজা গোলপোস্টের সামনে গিয়ে হঠাৎ ঘুরে গোলপোস্টে ঢুকে যায়। তবে এই ঘটনা ঘটানোর জন্য খেলোয়াড়দের প্রচুর দক্ষতা দরকার।

     অস্ট্রেলিয়ান ফুটবলে ম্যাগনাস ইফেক্ট কম হবার কারণ হলো বলের অসাম্যতা। ঘূর্ণন খুব কম হয়। কিন্তু আমার পয়েন্ট সেখানে নয়। ফুটবল খেলা দেখার সময় তার বিজ্ঞান নিয়ে কেউ ভাবে না। সবাই ভাবে গোল নিয়ে। অস্ট্রেলিয়ান ফুটবলে ম্যাগনাস ইফেক্ট কম হলে কী আসে যায়? অস্ট্রেলিয়ান ফুটবলে কর্নারই তো নেই। কারণ ফুটবলের মাঠটাই তো তাদের বলের মতো উপগোলাকার।

     প্রফেসর অ্যামোস এবার অ্যাটমিক ফিজিক্স দিয়ে আমাকে ঘায়েল করার চেষ্টা করেন। বলেন, "দেখো সকার বল কিন্তু বোর মডেল, আমার আমাদের ফুটবল সামারফেল্ড মডেল। সামারফেল্ড মডেল ছাড়া অ্যাটমিক মডেল অসম্পূর্ণ।"

 

চিত্র: পরমাণুর বোর মডেল অনুযায়ী ইলেকট্রনের কক্ষপথ বৃত্তাকার, কিন্তু সামারফেল্ডের মডেল অনুযায়ী ইলেকট্রনের কক্ষপথ ইলেকট্রনের শক্তিস্তর যত বাড়ে ততই উপবৃত্তাকার হতে থাকে।

 

     আমি দেখলাম প্রফেসর অ্যামোসের কথা অনেকটা সত্য। আমাদের ফুটবলের আকৃতি বোর মডেলের ইলেকট্রনের কক্ষপথের মতো, আর অস্ট্রেলিয়ান ফুটবলের আকৃতি সামারফেল্ড মডেলের ইলেকট্রনের কক্ষপথের মতো। কিন্তু ফুটবলকে টেনেটুনে বিজ্ঞানের তত্ত্বে নিয়ে আসতে হবে এমন কোন কথা নেই। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'সামারফেল্ড কি ফুটবল খেলতেন?'

     'তা তো জানি না।'

     'তাহলে সামারফেল্ডকে ফুটবলে টেনে আনবেন না। ফুটবলের ক্ষেত্রে বোর-ই কথা বলার অধিকার রাখেন। কারণ বোর ফুটবল খেলতেন।'

     পারমাণবিক তত্ত্বের জন্য বিখ্যাত নিলস বোর একজন ফুটবল প্লেয়ার ছিলেন। কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটবল টিমের দুর্দান্ত গোলকিপার ছিলেন নিলস বোর। নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের জনক আর্নেস্ট রাদারফোর্ড - যিনি পরমাণুর নিউক্লিয়াস ও প্রোটন আবিষ্কার করেছেন - নিউজিল্যান্ডের নেলসন কলেজে এবং ক্যান্টারবারি ইউনিভার্সিটিতে নিয়মিত রাগবি খেলতেন। ফুটবল খেলোয়াড়দের খুব পছন্দ করতেন তিনি। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী ও পরীক্ষণ পদার্থবিজ্ঞানীদের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব কাজ করে সবসময়। রাদারফোর্ড তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানীদের সহ্যই করতে পারতেন না। কিন্তু নিলস বোরের ব্যাপারে তিনি বলতেন, "তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী হলেও বোর কিন্তু ভালোমানুষ, কারণ সে ফুটবলার।"

ফুটবলাররা যে ভালোমানুষ, তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু কোন তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানী যদি ফুটবল না খেলেন - তাহলে যে তিনি খারাপ মানুষ হবেন এমন কোন কথা নেই। ম্যানহাটান প্রজেক্টের পরিচালক ছিলেন রবার্ট ওপেনহেইমার। তাঁর জীবদ্দশায় বিজ্ঞানের এমন কোন বিষয় ছিল না যে বিষয়ে তাঁর জ্ঞান ছিল না। কিন্তু খেলাধূলা সম্পর্কে একেবারে কিছুই জানতেন না ওপেনহেইমার।  

নোবেল বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী আবদুস সালামও ফুটবল পছন্দ করতেন না। ইংল্যান্ড থেকে পিএইচডি করে পাঞ্জাবে ফিরে যাওয়ার পর প্রফেসর আবদুস সালামকে লাহোর সরকারি কলেজে ফিজিক্স পড়ানোর পাশাপাশি ফুটবল কোচের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল এবং তিনি সেই কাজটি মোটেও পছন্দ করেননি।

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত খেলাধূলার বিজ্ঞান নিয়ে কেউ মাথা ঘামাতেন না। এখন ফুটবলের বিজ্ঞান নিয়ে নিয়মিত গবেষণা হয়। ১৯৮৭ সাল থেকে শুরু হয়েছে ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস অব সায়েন্স অ্যান্ড ফুটবল। প্রতি চার বছর পর পর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তা হচ্ছে। ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, ওয়েল্‌স, অস্ট্রেলিয়া, পর্তুগাল, তুরস্ক, জাপান, ও ডেনমার্কে সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর আগামীবছর মেলবোর্নে হবে এই কংগ্রেস। ফুটবলের বৈজ্ঞানিক গবেষণা এত বেশি হয়ে যাচ্ছে যে একটা কংগ্রেসে কুলোচ্ছিল না বলে ২০০৮ সাল থেকে শুরু হয়েছে সায়েন্স অ্যান্ড সকার কনফারেন্স। এখন বিজ্ঞানীরা অনুধাবন করছেন ফুটবল থেকে অনেক নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক গবেষণার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

নিউ সায়েন্টিস্ট ৩০ জুন ২০১৬-র একটা প্রতিবেদন অনুসারে ফুটবলের সেরা খেলোয়াড়রা প্রচন্ড মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন। তাদের ব্রেন ওয়ার্ক অনেক জটিল। জেতার জন্য পায়ের স্কিলের চেয়েও মস্তিষ্কের স্কিল অনেক বেশি জরুরি। বিশ্বকাপে যে টিমগুলো খেলে তাদের প্রত্যেকটি খেলোয়াড়ই দক্ষ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, যে দল মানসিকভাবে যত শক্ত - সেই দলের জেতার সম্ভাবনা তত বেশি। বিশেষ করে পেনাল্টি শ্যুট আউটের ক্ষেত্রে খেলোয়াড়দের মানসিক দক্ষতা অনেক বেশি কার্যকরী। গবেষণায় দেখা গেছে ১৯৮২ থেকে ২০১৫'র মধ্যে জার্মানরা ছয়টি পেনাল্টি শুটের মধ্যে ছয়টিতে জিতেছে। পেনাল্টিতে জার্মানরা ৯২% ক্ষেত্রে গোল করেছে। অন্যদিকে ইংল্যান্ড জিতেছে সাতটির মধ্যে মাত্র একটিতে। তাদের খেলোয়াড়রা পেনাল্টির মাত্র ৬৭% গোল করতে পেরেছে।

এবারের বিশ্বকাপ থেকে আমাদের আনন্দের পাশাপাশি ফুটবলের অনেক অনেক নতুন বৈজ্ঞানিক তথ্য সামনে আসবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

সূত্র: FIFA.com, সায়েন্স অ্যান্ড সকার/থমাস রেইলি

________________________

বিজ্ঞানচিন্তা জুন ২০১৮ সংখ্যায় প্রকাশিত






Sunday 25 April 2021

স্বপ্নলোকের চাবি - পর্ব ১৭

 


স্বপ্নলোকের চাবি – ১৭

 

‘ছড়ার কুল’ নামটাতে প্রচ্ছন্ন কাব্যিক একটা ভাব আছে, হয়তো কিছুটা ছড়ার ছন্দও। সৈয়দ মুজতবা আলী ছড়ার কুলে এলে ওমর খৈয়ামের কবিতার অনুবাদ এভাবেও করতে পারতেন – এইখানে এই ছড়ার কুলে, তোমার আমার কৌতূহলে, যে ক’টি দিন কাটিয়ে যাবো প্রিয়ে …।  এই জায়গার নাম ছড়ার কুল কে রেখেছিল তা জানা সম্ভব নয়। পুবের পাহাড় থেকে বৃষ্টির ধারা নেমে এসে যে ছড়ার সৃষ্টি হয়েছে সে হয়তো শত বছরের পুরনো। কিন্তু এই ছড়ার কুলে দোকানপাট গড়ে উঠেছে সামান্যই। দিনের বেলা এখানে জনসমাগম হয় খুবই কম। সন্ধ্যা নামার আগে থেকেই আস্তে আস্তে ব্যস্ততা বাড়ে কিছুটা। রাস্তার দু’ধারে জমে উঠে অস্থায়ী বাজার – তাও মাত্র কয়েক ঘন্টার জন্য। ছড়ার কুল থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দক্ষিণে এলেই ফতেয়াবাদ। এখানে তুলনামূলকভাবে ব্যস্ততা অনেক। শহর এলাকার তিন নম্বর বাস আসে এপর্যন্ত। সে হিসেবে ধরতে গেলে ফতেয়াবাদ শহর এলাকা।

         

ছড়ার কুলের দেড় কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যেই পাঁচ-ছয়টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তিনটি উচ্চ-বিদ্যালয়, একটি কলেজ। এই অঞ্চলে শিক্ষার প্রতি অনুরাগ দ্রুত বাড়ছে। এখানে প্রায় বাড়িতেই ছেলেমেয়েদের পড়ানোর জন্য লজিং-মাস্টার আছে। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসে ছেলে-মেয়েরা। অনেক ছেলেই পড়ানোর বিনিময়ে থাকা-খাওয়ার সুযোগ পায় বিভিন্ন বাড়িতে। আমানত খান বিল্ডিং-এ যারা থাকে – তাদের অনেকেই টিউশনি করে। গতকাল থেকে আমিও তাদের দলে যোগ দিয়েছি। অবশ্য গতকাল ছিল পরিচিতি পর্ব – গিয়েছিলাম মাহমুদভাইয়ের সাথে রিক্‌শায়। আজ চলেছি হেঁটে। পথে না হাঁটলে পথ চেনা হয় না ঠিকমতো।

 

গতকাল মাহমুদভাইয়ের সাথে রিকশায় যাবার সময় পথ চিনে রাখার চেষ্টা করেছিলাম। আজ সেভাবেই পথ হাঁটছি। ছড়ার কুলের শেষ দোকান পেরিয়ে যাবার পর রাস্তার দুপাশে ঢোলকলমীর ঝাড়। পায়ে হাঁটা সরু পথের স্পষ্ট ছাপ। আরো কিছুদূর যাবার পর রাস্তার ডানপাশে একটি তালগাছ এক পায়ে একলা দাঁড়িয়ে আছে। শহর এলাকার বাসগুলি মেইন রোডে ঘুরার জায়গা না পেলে অনেকসময় এপর্যন্ত এসে তালগাছের গোড়ার খালি জায়গায় ঢুকে ঘুরে যায়। আমি শহর থেকে তিন নম্বর বাসে এলে অনেকসময় এপর্যন্ত চলে আসি।

 

এই তালগাছের ডানদিকে তাকিয়ে চোখ জুড়িয়ে গেল। খুবই নিচু কিছু টিলা আছে এখানে – সবুজ ঘাস আর গুচ্ছ গুচ্ছ সাদা কাশফুলে ভর্তি। তার পাশেই রেললাইন। রেললাইনের পশ্চিমপাশে গাছপালার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে পড়ন্ত বেলার কমলারঙের সূর্য। আর কিছুদূর সামনে গেলেই ফতেয়াবাদ সিটি কর্পোরেশন গার্লস স্কুল। গেট বন্ধ, রাস্তা থেকে রাস্তার পাশের  বিল্ডিংটা ছাড়া স্কুলের আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না এখন। স্কুল শুরু হবার আগে, আর ছুটির সময় নীল-সাদা ড্রেসের ছাত্রীদের ভীড় লেগে যায় রাস্তায়। নতুন এই স্কুলের ক্লাস নাইনের ফার্স্টগার্ল।

 

গতকাল মাহমুদভাইয়ের সাথে  রিকশা করে একেবারে খান সাহেবদের বাড়ির উঠোনে গিয়ে নেমেছিলাম। বিশাল পাকা বাড়ি। চারপাশ ঘেরা প্রশস্ত উঠোন। বাংলা সিনেমায় গ্রামের ধনী তালুকদার বাড়ি যেরকম দেখানো হয় – অনেকটা সেরকম বাড়ি। শ্বশুরবাড়িতে জামাই কখনো পুরনো হয় না। মাহমুদভাইতো এখনো অফিসিয়ালি জামাই হননি – সে হিসেবে তাঁর যতই নিত্য আসাযাওয়া থাকুক – তিনি তো আরো নতুন। তাঁকে আবাহনে উচ্ছ্বাসের কোন কমতি নেই। ব্যাপারটার মধ্যে যে আধুনিকতাটা আছে – সেটা খুব ভালো লাগলো আমার।

 

ভাবীর সাথে পরিচয়পর্ব হলো খুব সংক্ষিপ্ত। মাহমুদভাই বললেন, “এ হলো মুন্নি। তোমার যেহেতু ছাত্রী, সেহেতু তোমাকে ভাবী ডাকতে হবে না। তুমি নাম ধরেই ডাকতে পারবে।“

 

ভালোবাসার মানুষ হলো চুম্বকের মতো। চুম্বক যেমন চৌম্বকীয় আবেশ ছড়ায়, তেমনি ভালোবাসার জটিল রসায়নও খুশির আবেশ ছড়ায়। মাহমুদভাইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে সেই রসায়নে মুন্নির উজ্জ্বল মুখ খুশিতে ঝলমল করছে।

 

বসার ঘরের বড় জানালার পাশে বেশ বড় পড়ার টেবিল। মুন্নি টেবিলের বইপত্র একপাশে সরিয়ে ফেললো। বোঝা যাচ্ছে – আজ পড়াশোনা হবে না। পরিচয়পর্ব সংক্ষেপে শেষ হলো, কিন্তু আপ্যায়নপর্ব হলো অত্যন্ত দীর্ঘায়িত। বিশাল টেবিল ভর্তি হয়ে গেল হরেকরকম খাদ্যদ্রব্যে। এত বেশি খাওয়া কারো পক্ষেই সম্ভব নয় - জানার পরেও মানুষ কেন খাবারের স্তুপ সাজিয়ে দেয় আমি জানি না। অথচ হতদরিদ্র মানুষ যখন খাবার চায় – তখন প্রয়োজনীয় খাবারও দেয়া হয় না। এরকম চিন্তাভাবনা ইদানীং প্রায়ই হচ্ছে। তার কারণ পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর থেকে কার্ল মার্ক্স পড়া শুরু করেছি। বিশ বছর বয়সের এই চিন্তার আয়ু কত বছর পর্যন্ত তা এখনো জানি না।

 

“স্লামালাইকুম স্যার” – বলে ট্রে হাতে যে কিশোরীটি রুমে ঢুকলো তাকে দেখেই মনে হলো আগে কোথাও দেখেছি। মাহমুদভাই বললেন, “এসো নতুন। ও হচ্ছে নতুন, তোমার অন্য ছাত্রী। ক্লাস নাইনে পড়ে।“

 

জড়তাহীন হাসিমুখে নতুন এগিয়ে এসে আমার কাছে টেবিলে চায়ের কাপ রাখতে রাখতে বললো, “স্যার, আপনার চা।“

 

আমার স্মৃতি হাতড়ে বেড়াচ্ছে নতুনকে আমি আগে কোথায় দেখেছি। স্মৃতি ঝামেলা পাকায়। অনেক আগের ব্যাপার ঠিকমতো মনে রাখে, কিন্তু সাম্প্রতিক ব্যাপার মনে রাখতে চায় না। আমি এই অঞ্চলে এসেছি মাত্র চার মাস হলো – নতুনকে তো এর মধ্যেই দেখেছি কোথাও।

 

“স্যার, চায়ে দুধ-চিনি ঠিক আছে কি না দেখেন।“ – নতুন আবারো মনে করিয়ে দিলো চায়ের কথা। আমি চা পানে অভ্যস্ত নই। খুব একটা পছন্দও করি না এই ঝামেলাযুক্ত পানীয়টিকে। কেউ চা সাধলে আমি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করতে অভ্যস্ত ছিলাম। কিন্তু একদিন টিপু আমাকে চা-এর সামাজিক গুরুত্ব বুঝিয়ে দিয়েছিল। টিপু অর্থাৎ টিপু সুলতান সিকদার – চট্টগ্রাম কলেজে এক সাথে ফিজিক্স পড়েছি অনেকদিন। ছাত্র ইউনিয়নের নিষ্ঠাবান কর্মী। মার্ক্স-লেনিন মগজে ধারণ করে, আবার একই সাথে দুনিয়ার বড় বড়  পুঁজিবাদী ব্র্যান্ডের জিনিসপত্র নিত্য ব্যবহার করে। একদিন আমরা আমাদের ধনী বন্ধু মোরশেদের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। সে প্রচুর খাওয়া-দাওয়া করালো। এরপর এলো চা-পর্ব। আমি যথারীতি বলে দিলাম – আমি চা খাই না। টিপু সাথে সাথে আমাকে লেনিনের “পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় আমাদের করণীয়”র অনুকরণে চা-য়ের সামাজিক গুরুত্ব এবং চায়ের প্রতি আমাদের করণীয় – বোঝাতে লাগলো।

 

“চা হলো আমাদের দেশে আপ্যায়নের শেষ ধাপ। চা ছাড়া আপ্যায়ন সুসম্পন্ন হয় না। কেউ যদি তোকে আপ্যায়ন করে, তুই যদি কোন নাশতা না খেয়েও শুধু এক কাপ চা খাস, তাহলেও আপ্যায়নকারী খুশি হয়ে যাবে। কিন্তু তুই যদি বলিস – চা খাস না, তখন তারা তোর জন্য চায়ের বিকল্প কিছু খুঁজতে শুরু করবে। দুধ সাধবে, কফি জোগাড় করতে চাইবে। তুই বলবি – কিছুর দরকার নেই। তারা ভাববে তুই ভদ্রতা করছিস। আমাদের দেশে ভদ্রতার প্রতিযোগিতা চলে জানিস তো। অবশ্য যেখানে দরকার নেই – সেখানে চলে এই প্রতিযোগিতা। তুই যতই ভদ্রতা করে বলবি দুধ-কফি কিছুরই দরকার নেই, তারা ততই চেষ্টা করবে তোর পছন্দের পানীয় জোগাড় করতে। সামর্থ্য থাকলে তোকে চায়ের বদলে ব্রান্ডি অফার করবে।  তার মানে তুই চা না খেয়ে গৃহস্থের ঝামেলা বাড়াচ্ছিস। কিন্তু এক কাপ চা যদি চুপচাপ খেয়ে নিস, সমস্ত ঝামেলা মিটে গেল। চা-ই তো খাচ্ছিস, মরে তো যাবি না চা খেলে। নিজে বানিয়ে বা দোকানে গিয়ে অর্ডার দিয়ে চা খেতে তোকে বলছি না। কিন্তু কেউ যদি অফার করে, তাহলে খেয়ে নিস।“ – টিপুর কথায় আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ মানুষের পেটে ভাত জোগাতে পারুক কিংবা না পারুক, মুখে কথা ঠিকই জোগায়। তাই চায়ের কাপ তুলে নিয়ে চুমুক দিলাম।

 

“জানলাটা ঠিকমতো বন্ধ হয়নি, মশা ঢুকে যাচ্ছে।“ – মাহমুদভাই বললেন। মুন্নি বললো, “জানলার হুকটা কোথায় যেন আটকে গেছে, ঠিকমতো লাগছে না।“

“দাঁড়াও দেখছি, একটা স্ক্রু-ড্রাইভার নিয়ে আসি” – বলে নতুন দ্রুত ভেতরের ঘরে চলে যাবার সাথে সাথেই মনে পড়লো তাকে আগে কোথায় দেখেছিলাম। দেখেছিলাম তাদের স্কুলের সামনে রাস্তায়। স্কুল ছুটির পর তারা দল বেঁধে রাস্তায় হাঁটছিলো। আমি এদিকে আসছিলাম। তারা আমার সামনে ছিল। হঠাৎ একজনের পায়ের স্যান্ডেল ছিঁড়ে গেল। সে ছেঁড়া স্যান্ডেল হাতে নিয়ে হাঁটবে, নাকি ফেলে দেবে বুঝতে পারছিলো না। দেখলাম এই মেয়েটি তার চুল থেকে একটি ক্লিপ খুলে নিয়ে স্যান্ডেল মেরামতের জন্য বসে গেলো রাস্তায়। তার বন্ধুরা সবাই তাকে “ম্যাকগাইভার, ম্যাকগাইভার” বলছিলো। বিটিভিতে এই ইংরেজি সিরিয়ালটি প্রচন্ড জনপ্রিয় এখন। ম্যাকগাইভারের কারিগরী বুদ্ধি ছোটদেরকে উৎসাহিত করছে দেখে বেশ ভালো লেগেছিল। এখন সেই ক্ষুদে ম্যাকগাইভার চোখের সামনে স্ক্রু-ড্রাইভার হাতে জানালার হুক ঠিক করে ফেললো। আমি কি তাকে বলবো – যে আমি তাকে সেদিন রাস্তায় দেখেছিলাম? না, বলার দরকার নেই। টিউশনিতে এসে পড়াশোনার বাইরে অন্য কোন বিষয়ে কথা বলা ঠিক হবে না।

 

কাল পড়ানো হয়নি। আজ থেকে পড়ানো শুরু হবে। রাস্তা পার হয়ে ফতেয়াবাদ স্কুলের পাশ দিয়ে ডানে স্কুল আর বামে খেলার মাঠ রেখে সামনে এগোচ্ছি। এটাই পথ আমি নিশ্চিন্ত। এর পরেই ডানদিকে যেতে হবে। সেদিকে গেলাম। তারপর ডানদিকের প্রথম বাড়িটিই খান সাহেবের বাড়ি। কিন্তু উঠোনে ঢুকে মনে হলো রাতারাতি বাড়িটা বদলে গেছে। বাড়ি থেকে একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক উঠোনে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “অ-নে কারে চাইলানদে?” আমি কাকে চাচ্ছি? খান সাহেবের নাম বলবো – নাকি মুন্নি-নতুনের নাম বলবো? একজন অপরিচিত ছেলে এসে বাড়ির মেয়েদের খোঁজ করলে একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। জিজ্ঞেস করলাম, “এটা কি খান সাহেবের বাড়ি?”

“কোন্‌ খান সাহেব?”

“আমানত খান সাহেব?”

“অ-নে ভুল গইজ্জন বা-জী। হিঁতারো বারি আর পুম্মিখ্যা।“

আমি আসলেই ভুল করেছি। খান সাহেবদের বাড়ি আরো ‘পুম্মিখ্যা’ অর্থাৎ পূর্বদিকে। ফিরে আসার সময় বুঝলাম আমি ভুল গলিতে বাঁক নিয়েছি। আবার এই গলি থেকে বেরিয়ে এসে আরো পূর্বদিকে অনেকদূর যাবার পর ডানে মোড় নিলাম। এদিকে  প্রত্যেক রাস্তার দুপাশে সারিবদ্ধ সুপারি-গাছ। ফলে সবগুলি রাস্তাই একই রকম মনে হয়।

 

অবশেষে ঠিক বাড়িতে পৌঁছলাম। মুন্নি-নতুন দু’জনই পড়ার টেবিলে রেডি হয়ে বসেছিল। পড়া শুরু হলো। মুন্নি ফতেয়াবাদ কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। তার ফিজিক্স দিয়ে শুরু করলাম, স্কেলার ভেক্টর ইত্যাদি। উচ্চমাধ্যমিকে আমি দুটো বিষয় পড়ে কিছুটা আনন্দ পেয়েছিলাম – পদার্থবিজ্ঞান আর বাংলা। মুন্নিকে অবশ্য বাংলা পড়াতে হবে না, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি আর ম্যাথস দেখালেই হবে।

 

“নূতন, তুমি …” – আমাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই নতুন বললো, “নূতন নয় স্যার, নতুন।“

“নূতন আর নতুন তো একই অর্থ।“

“এখানে অর্থের কথা হচ্ছে না স্যার, নামের কথা হচ্ছে। আমার নাম নতুন। এই নামে সিনেমার একজন নায়িকা আছে। আপনি সিনেমা দেখেন না বলেই জানেন না।“

আমি সিনেমা দেখি না! এটাতো প্রামাণিক স্যারকে ফিজিক্স বোঝেন না বলার মতো হলো। এখন কি আমার উচিত আমার সিনেমা দেখা সম্পর্কে আলোকপাত করা। প্রথমদিনই সিনেমার গল্প শুরু করলে মাহমুদভাই আমাকে আস্ত রাখবেন? আমি কিছু না বলে নতুনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। তার চোখ বড় বড়।

 

“তুমি ক্লাস নাইনের ফার্স্ট গার্ল। সায়েন্স নাওনি কেন? আর্টস কেন নিয়েছো?”

“ক্লাস নাইনের ফার্স্ট গার্ল আর্টস পড়তে পারবে না – এমন কোন নিয়ম আছে স্যার?”

 

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “তেরো-চৌদ্দ বৎসরের ছেলের মতো পৃথিবীতে এমন বালাই আর নাই। শোভাও নাই, কোনো কাজেও লাগে না। স্নেহও উদ্রেক করে না, তাহার সঙ্গসুখও বিশেষ প্রার্থনীয় নহে। তাহার মুখে আধো-আধো কথাও ন্যাকামি, পাকা কথাও জ্যাঠামি এবং কথামাত্রই প্রগল্‌ভতা।“ কিন্তু তেরো-চৌদ্দ বছরের মেয়ের ক্ষেত্রে এসবের কিছুই খাটে না। আমি আমার বিশ বছরের চোখ দিয়ে এই তেরো-চৌদ্দ বছরের নতুন বালিকার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম সে অত্যন্ত মেধাবী এবং ম্যাকগাইভারের মতো বুদ্ধির অধিকারী।


সময়ের ক্ষুদ্রতম একক

 



সময়ের ক্ষুদ্রতম একক

 

"সময় চলিয়া যায়, নদীর স্রোতের প্রায়, বেগে ধায় নাহি রয় স্থির"... সময়ের স্রোত সামনের দিকে চলছে তা আমরা জানি। সময় মাপার জন্য অতি উন্নত মানের যন্ত্র বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন। আমাদের আধুনিক মোবাইল অ্যাপ্‌স এখন প্রতি সেকেন্ড সময়কে এক হাজার ভাগে ভাগ করে নির্ভুল সময় জানিয়ে দিচ্ছে। আরো নিঁখুত বৈজ্ঞানিকভাবে সময় নিরূপণের জন্য আমরা অ্যাটমিক ক্লক বা পারমাণবিক ঘড়িও ব্যবহার করছি। আজ আমরা সময়ের অতিসূক্ষ্ম হিসেব রাখতে পারছি। কিন্তু আমরা এখনো যখন সময়ের সংজ্ঞা দিতে যাই খুব সমস্যায় পড়ে যাই। সময় কাকে বলে? 'ঘড়ি যা মাপে তাকে সময় বলে' - এরকম সংজ্ঞায় আমরা সন্তুষ্ট নই। আইনস্টাইন তাঁর আপেক্ষিকতার সূত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন সময় ও স্থানের প্রেক্ষিতে। স্টিফেন হকিং-এর বিশ্ববিখ্যাত বই 'দ্য ব্রিফ হিস্টি অব টাইম' বা 'কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস' সময়ের প্রবাহের সাথে মহাবিশ্বের পরিবর্তনের ইতিহাস জানায় ঠিকই - কিন্তু সেখান থেকেও সময়ের সঠিক সংজ্ঞা দেয়া সম্ভব হয় না। কিন্তু আমরা সবাই ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে বুঝতে পারি যে সময় চলে যাচ্ছে। সকাল দুপুর রাত গড়িয়ে যাচ্ছে - এর মধ্যে একের পর এক ঘটনা ঘটছে। এখন যা ঘটছে কিছু সময় পরেই তা হয়ে যাচ্ছে অতীত।   

     সময় মাপার বৈজ্ঞানিক একক হচ্ছে সেকেন্ড। ৬০ সেকেন্ডে এক মিনিট, ৩৬০০ সেকেন্ডে এক ঘন্টা, ... ইত্যাদি আমরা জানি। দৈনন্দিন ঘটনার প্রেক্ষিতে এক সেকেন্ড সময় হয়তো খুব একটা দীর্ঘ সময় নয়। আমাদের বাংলা ভাষায় সেকেন্ডের চেয়েও সংক্ষিপ্ত একটা সময়ের একক আমরা ব্যবহার করি - নিমেষ। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় যেমন আছে- "আমি দাঁড়াব যেথায় বাতায়ণ কোণে/ সে চাবে না সেথা জানি তাহা মনে/ ফেলিতে নিমেষ দেখা হবে শেষ/ যাবে সে সুদূর পুরে।" আমাদের চোখের পলক ফেলতে যেটুকু সময় লাগে সেই সময়টুকু হলো নিমেষ। একজন স্বাভাবিক মানুষের চোখের পলক ফেলতে গড়ে এক সেকেন্ডের তিন ভাগের একভাগ সময় লাগে। এই সময়টুকু খুব সংক্ষিপ্ত হলেও এটুকু সময়ের মধ্যেই ঘটে যেতে পারে অনেক ঘটনা।

     পারমাণবিক পর্যায়ে এক সেকেন্ড অনেক দীর্ঘ সময়। পারমাণবিক ঘড়িতে সিজিয়াম-১৩৩ আইসোটোপের পারমাণবিক শক্তিস্তরের মধ্যে ৯১৯,২৬,৩১,৭৭০ (৯১৯ কোটি ২৬ লক্ষ ৩১ হাজার ৭৭০) টি শক্তি-বিনিময়-ঘটনা ঘটতে যে সময় লাগে তার পরিমাণ হলো এক সেকেন্ড।  এখন আমরা যদি সিজিয়াম-১৩৩ এর পারমাণবিক শক্তিস্তরের একটি শক্তি-বিনিময়ের ঘটনার সময়কে আলাদা করে মাপতে পারি তাহলে আমরা এক সেকেন্ডের ৯১৯,২৬,৩১,৭৭০ ভাগের এক ভাগ সময় মাপতে পারবো। বিজ্ঞানে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরিমাপের হিসেব করতে হয় বলে পরিমাপের একককে অনেক ছোটছোট ভাগে ভাগ করার ব্যবস্থা আছে। এক সেকেন্ডের এক মিলিয়ন বা দশ লক্ষ ভাগের এক ভাগ হলো এক মাইক্রো-সেকেন্ড  (০.০০০০০১ বা ১০-৬ সেকেন্ড), এক বিলিয়ন বা  একশ কোটি ভাগের এক ভাগ হলো এক ন্যানো-সেকেন্ড (০.০০০০০০০০১ বা ১০-৯ সেকেন্ড)। সে হিসেবে সিজিয়াম-১৩৩ এর শক্তিস্তরে একটি বিকিরণের ঘটনা ঘটে প্রায় নয় ন্যানোসেকেন্ডে। আধুনিক বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে এই ন্যানো-সেকেন্ড সময়কেও সঠিকভাবে মেপে ফেলা সম্ভব হয়েছে। এখন ন্যানো-সেকেন্ডেরও একশো কোটি ভাগের একভাগ সময় অর্থাৎ এক অটো-সেকেন্ড (০.০০০০০০০০০০০০০০০০০১ বা ১০-১৮ সেকেন্ড) সময় পর্যন্ত সঠিকভাবে মাপা সম্ভব হয়েছে।

     ২০১৬ সালে জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাংক ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীরা হিলিয়াম পরমাণু থেকে ফটো-ইলেকট্রিক ইফেক্টের ফলে একটি ইলেকট্রন বেরিয়ে আসার ঘটনা নিঁখুতভাবে রেকর্ড করেন এবং এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞানের ইতিহাসের এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম সময় মাপতে সমর্থ হলেন। এই সময়ের পরিমাণ ৮৫০ জেপ্টো-সেকেন্ড। এক জেপ্টো-সেকেন্ড হলো ০.০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০১ বা ১০-২১সেকেন্ড।

     ধাতব পাতের উপর অতিবেগুনি রশ্মি পড়লে সেখান থেকে বিদ্যুৎ-প্রবাহ উৎপন্ন হয়। কিন্তু সাধারণ আলো থেকে এরকম ঘটনা ঘটে না। এই ঘটনা বিজ্ঞানীরা অনেকদিন আগে থেকেই পর্যবেক্ষণ করছিলেন। কিন্তু আইনস্টাইনের আগে কেউই এর সঠিক কারণ ব্যাখ্যা করতে পারেননি। ১৯০৫ সালে আইনস্টাইন ফটো-ইলেকট্রিক ইফেক্টের ব্যাখ্যা দিলেন। কোন ধাতব পদার্থের উপর আলো বা তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ পড়লে ধাতব পদার্থটি সেই আলো থেকে কিছু শক্তি শোষণ করে। যত বেশি শক্তির আলো  ধাতুর উপর আপতিত হয়, তত বেশি শক্তি শোষিত হয়। পরমাণুর ইলেকট্রনগুলো নিউক্লিয়াসের চারপাশে নিজ নিজ কক্ষপথে ঘুরতে থাকে। পরমাণুর কক্ষ থেকে বের হতে হলে ইলেকট্রনগুলোকে নির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তি অর্জন করতে হয়। বিভিন্ন পদার্থের পরমাণুর জন্য এই শক্তি বিভিন্ন। আপতিত আলোর শক্তি থেকে কোন ইলেকট্রন এই প্রয়োজনীয় শক্তি শোষণ করে পরমাণুর কক্ষ থেকে মুক্ত হয়ে বেরিয়ে আসতে পারলেই বিদ্যুৎ প্রবাহ ঘটে। আর যদি আপতিত আলোর শক্তি কম হয় তবে ইলেকট্রনগুলো প্রয়োজনীয় শক্তি পায় না। ফলে কোন বিদ্যুৎ প্রবাহ ঘটে না।

     ম্যাক্স-প্ল্যাংক ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীরা হিলিয়াম গ্যাসের প্রবাহের উপর অতিবেগুনি লেজার রশ্মি প্রয়োগ করেন মাত্র ১০০ অটো-সেকেন্ড বা ০.০০০০০০০০০০০০০০০১ বা  ১০-১৬ সেকেন্ডের জন্য। অতিবেগুনি রশ্মির শক্তি শোষণ করে হিলিয়াম পরমাণুর ইলেকট্রনগুলো কক্ষপথ থেকে বের হয়ে আসে। কম শক্তির অবলোহিত লেজার রশ্মির সাহায্যে এই ইলেকট্রন নির্গমনের ঘটনাটি ধারণ করা হয়। বিজ্ঞানীরা হিসেব করে বের করেছেন যে এই ঘটনার ব্যাপ্তি মাত্র ৮৫০ জেপ্টো-সেকেন্ড (৮৫০ x ১০-২১ সেকেন্ড)।

 

হিলিয়াম পরমাণু থেকে একটি ইলেকট্রন বেরিয়ে আসছে

 

     এর চেয়েও কম সময়ে কি কোন ঘটনা ঘটা সম্ভব? যদি সম্ভব হয় - তবে কি সময়ের সর্বনিম্ন সীমা বলে কিছু আছে? হ্যাঁ আছে। অর্থবোধক সর্বনিম্ন সময়কে বলা হয় 'প্ল্যাংক-সময়'। জার্মান বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্ল্যাংক এই সময়ের হিসেব করেছেন। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের প্রধান স্থপতি ম্যাক্স প্ল্যাংক পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কারের জন্য ১৯০৭ থেকে ১৯১৮ সালের মধ্যে ৭৪ বার মনোনয়ন পাওয়ার পর নোবেল পুরষ্কার পান ১৯১৮ সালে।

 

তরুণ ম্যাক্স প্ল্যাংক

 

     ম্যাক্স প্ল্যাংকের বাবা ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন-এর অধ্যাপক। ছোটবেলা থেকে সঙ্গীতের প্রতি বিশেষ অনুরাগ ছিল ম্যাক্স প্ল্যাংকের। চমৎকার পিয়ানো বাজাতেন ম্যাক্স। ইচ্ছে ছিল সঙ্গীত বিষয়ে পড়াশোনা করবেন। সে উদ্দেশ্য একজন সঙ্গীতগুরুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন সঙ্গীত শেখার জন্য কী কী বই পড়া দরকার। তাতে গুরু রেগে গিয়ে বলেছিলেন, "এমন প্রশ্ন যদি মাথায় আসে তাহলে সঙ্গীত তোমার জন্য নয়। তুমি অন্য কিছু পড়।"

     পদার্থবিজ্ঞানে উচ্চতর পড়াশোনা করতে চান শুনে মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ফিলিপ জোলি ম্যাক্সকে বলেছিলেন, "ফিজিক্স পড়ে কী করবে? ফিজিক্সের সবকিছুই তো আবিষ্কৃত হয়ে গেছে।" প্রফেসর জোলি তো সেদিন জানতেন না যে ম্যাক্স প্ল্যাংক পদার্থবিজ্ঞানের সম্পূর্ণ নতুন একটা জগত - কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ভিত্তি স্থাপন করবেন। ১৯০০ সালে ম্যাক্স প্ল্যাংক আবিষ্কার করলেন যে তড়িৎ-চুম্বকীয় বিকিরণের শক্তি তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গের কম্পাঙ্কের সমানুপাতিক। বিকিরণের শক্তিকে তরঙ্গের কম্পাঙ্ক দিয়ে ভাগ করলে যে সমানুপাতিক ধ্রুবক পাওয়া যায় - তাকে বলা হয় প্ল্যাংকের ধ্রুবক, লেখা হয় h। বিভিন্ন শক্তি ও কম্পাঙ্কবিশিষ্ট তড়িৎচৌম্বক বিকিরণ পরীক্ষা করে h এর সার্বজনীন মান পাওয়া গেছে ৬.৬২৬০৭৬X১০-৩৪ জুল-সেকেন্ড। h হলো কোয়ান্টাম ঘটনার একক।

     নিউটনের মহাকর্ষীয় ধ্রুবক (G=6.67259x10-11m3/kgs2), শূন্য মাধ্যমে আলোর বেগ (c=3x108 m/s), এবং প্ল্যাংক-ধ্রুবক (h)-এর মান কাজে লাগিয়ে প্ল্যাংক বিজ্ঞানে অর্থবোধক দৈর্ঘ্যের সর্বনিম্ন মান হিসেব করে বের করেছেন। এই দৈর্ঘ্যকে প্ল্যাংক-দৈর্ঘ্য বলা হয়। কোন দৈর্ঘ্য যদি প্ল্যাংক দৈর্ঘ্যের চেয়ে কম হয় তবে সেখানে পদার্থবিজ্ঞানের কোন সূত্রই আর কাজ করে না। 

গাণিতিকভাবে প্ল্যাংক-দৈর্ঘ্য =


। 


হিসেব করে প্ল্যাংক-দৈর্ঘ্যের মান পাওয়া যায় ১.৬১৫৯৯x১০-৩৫ মিটার।

     আলোকের বেগে চলমান একটি ফোটন প্ল্যাংক-দৈর্ঘ্য অতিক্রম করতে যে সময় নেয় তাকে বলা হয় প্ল্যাংক-সময়। আর এটাই হলো অর্থবোধক সময়ের সর্বনিম্ন সীমা। এর চেয়ে কম কোন সময় পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র অনুযায়ী হতে পারে না। 

গাণিতিকভাবে প্ল্যাংক-সময় = 


সেকেন্ড। 


সময় যদি এর চেয়ে কম হয়, আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সার্বিক তত্ত্ব আর কাজ করে না। তার মানে পদার্থবিজ্ঞানের কার্যকরী সূত্র অনুযায়ী সময়ের শুরু শূন্য থেকে নয়। অন্যভাবে বলা যায় - মহাবিশ্বের শুরুতে যদি সময়ের মান শূন্য ধরা হয় তাহলে ০ সেকেন্ড থেকে ৫.৩৯x১০-৪৪ সেকেন্ড পর্যন্ত পদার্থবিজ্ঞানের কোন নিয়ম কাজ করবে না। এখানেই গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের পার্থক্য। গণিতে আমরা দৈর্ঘ্য ও সময়ের সর্বনিম্ন মান শূন্য ধরে নিতে পারি, কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানে তা সম্ভব নয়।

 

তথ্যসূত্র: নেচার ফিজিক্স, কিউ ইজ ফর কোয়ান্টাম - জন গ্রিবিন

_________________________

বিজ্ঞানচিন্তা - মে ২০১৮ সংখ্যায় প্রকাশিত 




Tuesday 20 April 2021

মগজে জিপিএস

 


আমরা কীভাবে পথ চিনি? পরিচিত জায়গায় গেলে কীভাবে বুঝি যে ওখানে আমরা আগেও এসেছিলাম? কিংবা একেবারে নতুন পরিবেশে গেলে কীভাবে বুঝি যে পরিবেশটা নতুন? পরিবেশের জটিল স্মৃতি আমরা কীভাবে ধরে রাখি? এসব প্রশ্নের মোটামুটিভাবে যে উত্তর আমরা সবাই জানি তা হলো আমাদের মগজের মেমোরি সেল বা স্মৃতিকোষে জমা থাকে এসব তথ্য। আমরা যখন নতুন কিছু দেখি আমাদের মস্তিষ্ক নতুন তথ্যগুলি ধারণ করে স্মৃতিকোষে জমা রাখে। আমরা এটাও জানি যে বিভিন্ন প্রাণির স্মৃতিধারণ ক্ষমতা বিভিন্ন - যেমন হাতির স্মৃতিশক্তি খুব প্রখর, কিন্তু গোল্ডফিশের স্মৃতিশক্তি প্রায় নগণ্য। মানুষেরও মস্তিষ্কের স্মৃতিধারণ ক্ষমতা সবার সমান নয়। বয়স, অনুশীলন এবং অভিজ্ঞতা বাড়ার সাথে সাথে স্মৃতিধারণ ক্ষমতাও তুলনামূলকভাবে বেড়ে যায়। যে পথ আমরা ছোটবেলায় কিছুতেই চিনতে পারতাম না, বড় হয়ে সেই পথ চিনতে আমাদের সমস্যা হয় না।

 

পথ ও অবস্থান খুঁজে বের করার জন্য এখন কত ধরনের যান্ত্রিক ব্যবস্থা আছে। গ্লোবাল পজিশানিং সিস্টেম বা জি-পি-এস এখন সুলভ এবং বহুল ব্যবহৃত একটি পদ্ধতি। গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে এখন জি-পি-এস বিশেষ পথ-প্রদর্শকের কাজ করে। উপগ্রহের মাধ্যমে আমরা আমাদের অবস্থান এবং গন্তব্যের দিক-নির্দেশনা পাই জি-পি-এসের সাহায্যে।

 

মানুষের ক্ষেত্রে পথ খুঁজে বের করার পদ্ধতি সম্পর্কে একটা ভাসা ভাসা ধারণা পাওয়া গেলো। ভাসা ভাসা বললাম এই কারণে যে মস্তিষ্কের সবগুলো কোষের কার্যপদ্ধতি নিশ্চিন্তভাবে জানা যায়নি এখনো। আমরা এখনো জানি না ঠিক কী কারণে আলজেইমার্‌স জাতীয় রোগ হয়, বা স্মৃতি-বিনাশ ঘটে। বিজ্ঞানীরা এটুকু নিশ্চিতভাবে জানতে পেরেছেন যে আলজেইমার্‌স রোগীর হিপোক্যাম্পাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানুষের রোগের কারণ সম্পর্কিত গবেষণার জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানীদের নির্ভর করতে হয় ইঁদুর বা অন্যন্য প্রাণী নিয়ে গবেষণালব্ধ ফলের ওপর।

 

স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে ইঁদুর বা অন্যান্য প্রাণিরা পথ বা পরিবেশ কীভাবে চেনে বা মনে রাখে? সব প্রাণির মগজেই কি আছে কোন না কোন ধরনের জি-পি-এস? এ সংক্রান্ত ব্যাপক গবেষণা করে যুগান্তকারী আবিষ্কার করেছেন আমেরিকান-ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জন ও'কিফ এবং নরওয়ের বিজ্ঞানী দম্পতি মে-ব্রিট মোজার ও এডভার্ড মোজার। ২০১৪ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার অর্জন করেছেন এই তিনজন বিজ্ঞানী।

 

চিত্র-১ চিকিৎসাবিজ্ঞানে ২০১৪ সালে নোবেলবিজয়ী বিজ্ঞানী জন ও'কিফ, মে-ব্রিট মোজার ও এডভার্ড মোজার।

 

যেভাবে শুরু

আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী এডোয়ার্ড টলম্যান ১৯৪৮ সালে ফিজিওলজিক্যাল রিভিউতে প্রকাশিত তাঁর 'কগনিটিভ ম্যাপ্‌স ইন র‍্যাট্‌স অ্যান্ড ম্যান' শিরোনামের গবেষণাপত্রে [১] প্রাণী কীভাবে পথ চেনে তার একটা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেন। তিনি দেখান যে প্রাণিরা স্থান ও ঘটনার সমন্বয় ঘটিয়ে পরিবেশের চিত্র মনে রাখতে পারে। ক্রমঘটমান ঘটনা ও ক্রম-অগ্রসরমান অবস্থানের সমন্বয়ে প্রাণির মগজের মধ্যে ক্রমান্বয়ে একটা সামগ্রিক মানসিক ম্যাপ তৈরি হয়। ওই মানসিক ম্যাপ দেখেই প্রাণিরা পথ চেনে। টলম্যানের তত্ত্ব পথ চেনার প্রক্রিয়া সম্পর্কে একটা বৈজ্ঞানিক ধারণা দেয় ঠিকই, কিন্তু মগজের ঠিক কোন্‌ জায়গায় এবং ঠিক কী প্রক্রিয়ায় এই মানসিক ম্যাপ তৈরি হয় সে সম্পর্কে কোন ধারণা দেয় না।



চিত্র-২ এডোয়ার্ড টলম্যান


পরবর্তী বিশ বছর ধরে অনেক বিজ্ঞানীই অনেক রকমের গবেষণা করেছেন এ ব্যাপারে। কিন্তু ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তেমন সুনির্দিষ্ট কোন সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব হয়নি। ১৯৭১ সালে বিজ্ঞানী জন ও'কিফ প্রাণির মস্তিষ্কে প্লেইস সেল বা স্থানিক কোষ আবিষ্কার করে প্রাণির পথ চেনার পদ্ধতি সম্পর্কিত গবেষণায় নতুন পথের সন্ধান দেন।

 

জন ও'কিফ এবং প্লেইস সেল

নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি থেকে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করার পর জন ও'কিফের ইচ্ছে হলো মনের দর্শন (ফিলোসফি অব দি মাইন্ড) সম্পর্কে পড়াশোনা করার। ১৯৬০ সালে ভর্তি হয়ে গেলেন নিউইয়র্ক সিটি কলেজে। ১৯৬৩ সালে সাইকোলজিতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন জন। তারপর চলে যান কানাডায়। ফিজিওলজিক্যাল সাইকোলজি (শারীরতাত্ত্বিক মনোবিজ্ঞান) বিষয়ে  মন্ট্রিয়েলের ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করেন অধ্যাপক রোনাল্ড মেলজ্যাকের তত্ত্বাবধানে। তাঁর পিএইচডি গবেষণার বিষয় ছিল 'সেন্সরি প্রপার্টিজ অব অ্যামিগডালা'। প্রাণির ঘ্রাণ নেবার ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে অ্যামিগডালার কোষগুলো।



চিত্র-৩ মস্তিষ্কে অ্যামিগডালা ও হিপোক্যাম্পাসের অবস্থান।

 

পিএইচডি করার পর ১৯৬৭ সালে ইউ এস ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেল্‌থ এর পোস্টডক্টরাল ফেলো হিসেবে যোগ দেন ইউনিভার্সিটি কলেজ অব লন্ডনে। শুরুতে অ্যামিগডালার কোষ নিয়ে গবেষণা করলেও লন্ডনে এসে তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র প্রসারিত হয় হিপোক্যাম্পাসে। প্রাণির জীবনে হিপোক্যাম্পাসের ভূমিকা কী? প্রাণির স্মৃতি সংরক্ষণে মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাসের একটা ভূমিকা আছে তা জানা গেছে ১৯৫৭ সালে। হেনরি মোলেইসন নামে এক রোগীর মৃগীরোগ সারানোর জন্য দুটো হিপোক্যাম্পাসই কেটে বাদ দেয়ার পর দেখা গেছে যে হেনরি তাঁর স্মৃতিশক্তির অনেকখানিই হারিয়েছেন।

 

হিপোক্যাম্পাসের সুনির্দিষ্ট ভূমিকার ব্যাপারটা কিন্তু প্রতিষ্ঠিত হয়নি তখনো। ইঁদুরের হিপোক্যাম্পাস নিয়ে গবেষণা শুরু করেন ও'কিফ। ইঁদুরের হিপোক্যাম্পাসের পরিবর্তন ঘটিয়ে (আস্তে আস্তে কিছুটা করে কেটে নিয়ে) তিনি ইঁদুরের ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি দেখেন হিপোক্যাম্পাসের ক্ষতি হলে ইঁদুর আর জায়গা চিনতে পারছে না। নতুন জায়গায় গেলে ইঁদুরের যে উত্তেজনা বাড়ে তা হিপোক্যাম্পাসের অনুপস্থিতিতে কমে যায়। অনেক পরীক্ষা করে ও'কিফ দেখেন যে হিপোক্যাম্পাসের কিছু কোষ শুধুমাত্র প্লেইস বা জায়গার পরিবর্তন হলে উত্তেজিত হয়। তিনি এই কোষগুলির নাম দিলেন 'প্লেইস সেল'। প্লেইস সেলগুলো শুধুমাত্র জায়গা পরিবর্তন বা দিক পরিবর্তনের সময় উত্তেজিত হয়। ১৯৭১ সালে তিনি তাঁর ছাত্র জনাথন ডস্ট্রভিস্কির সাথে প্লেইস সেলের ফলাফল প্রকাশ করেন 'ব্রেইন রিসার্চ' জার্নালে। তাঁর পেপার থেকে আমরা জানতে পারি হিপোক্যাম্পাস ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রাণী জায়গা চিনতে পারে না, পথ ভুলে যায়। 

 


চিত্র-৪ প্লেইস সেল। ডান পাশে ইঁদুরের মগজের হিপোক্যাম্পাসে প্লেইস সেলের অবস্থান। ডান পাশের ধূসর বর্গক্ষেত্রে একটি ইঁদুর মুক্তভাবে ছোটাছুটি করছে। এলোমেলো লাইনগুলো ইঁদুরের গতিপথ নির্দেশ করছে। সবুজ বৃত্তের মধ্যে ডটগুলোতে এলে ইঁদুরের মগজে প্লেইস সেল উদ্দিপ্ত হয়।

 

প্লেইস সেলগুলোর উত্তেজনা জন ও'কিফের আগে আর কেউ পর্যবেক্ষণ করেননি। ও'কিফ আবিষ্কার করলেন যে প্লেইস সেলগুলো শুধুমাত্র পরিচিত পরিবেশে পেলেই উদ্দিপ্ত হচ্ছে, বিভিন্ন প্লেইস সেল মিলে পরিবেশ সম্পর্কে একটা সুনির্দিষ্ট ছক তৈরি হচ্ছে মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাসে। তিনি আরো দেখালেন যে হিপোক্যাম্পাসে বিভিন প্লেইস সেলের সমন্বয়ে বিভিন্ন পরিবেশের অসংখ্য মানসিক ম্যাপ সংরক্ষিত থাকতে পারে।

 

জন ও'কিফের আবিষ্কার স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। সারা পৃথিবীতে অসংখ্য বিজ্ঞানী প্লেইস সেল সংক্রান্ত তত্ত্বীয় ও পরীক্ষামূলক গবেষণায় লিপ্ত হন। এসব গবেষণার ফল থেকে প্রতিষ্ঠিত হয় যে প্লেইস সেলগুলো মগজে স্থানিক পরিবেশের একটা ম্যাপ তৈরি করে তা স্মৃতিতে সংরক্ষণ করে। স্মৃতি সংরক্ষণে হিপোক্যাম্পাসের ভূমিকা মানুষের মানসিক রোগের কারণ ও চিকিৎসা সংক্রান্ত গবেষণায় নতুন পথের সন্ধান দেয়। আলজেইমার্‌স রোগীদের মস্তিষ্কের এম-আর-আই স্ক্যান পরীক্ষা করে দেখা গেছে তাদের  হিপোক্যাম্পাস ক্ষতিগ্রস্ত। গবেষণা চলতে থাকে।

 

মে-ব্রিট মোজার ও এডভার্ড মোজার এবং গ্রিড সেল

১৯৯৫ সালে জন ও'কিফের ল্যাবে পোস্টডক্টরেট রিসার্চ করতে এলেন নরওয়েজিয়ান তরুণ দম্পতি মে-ব্রিট ও এডভার্ড মোজার। তখনো পর্যন্ত ধারণা ছিল যে পরিবেশ চেনার ব্যাপারে মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাসের সামনের দিক ও পেছনের দিন সমান ভূমিকা রাখে। মে-ব্রিট ও এডভার্ড আবিষ্কার করলেন যে হিপোক্যাম্পাসের সামনের দিকের চেয়ে পেছনের দিকটা বেশি ভূমিকা রাখছে ইঁদুরের পরিবেশ চেনার ক্ষেত্রে। এই আবিষ্কার তাঁদের পরবর্তী গবেষণায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। জন ও'কিফের ল্যাবে তাঁরা শিখলেন হিপোক্যাম্পাসের প্লেস সেল রেকর্ডিং সিস্টেম।

    

১৯৯৬ সালের আগস্ট মাসে তাঁরা নরওয়েজিয়ান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসরের পদে যোগ দিয়ে একেবারে গোড়া থেকে শুরু করলেন পরীক্ষাগার তৈরি করার কাজ। ইউনিভার্সিটির একটা বিল্ডিং-এর বেসমেন্টের কয়েকটা ঘর নিয়ে তৈরি হলো ল্যাব। শুরুতে বায়োলজিক্যাল রিসার্চের সবচেয়ে জরুরি অংশ - 'অ্যানিম্যাল হাউজ', টেকনিশিয়ান, মেকানিক্যাল ওয়ার্কশপ কিছুই ছিল না তাঁদের। সব কাজই নিজেদের করতে হয়েছে। সবকিছু নিজেদের হাতে করাতে সবকিছু নিজেদের মনের মতো করে তৈরি করে নিতে পেরেছেন। ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রমের ফল পেতে শুরু করেছেন বছর দুয়েক পর থেকে। ১৯৯৮ সালে তাঁরা প্রথম গবেষণা-শিক্ষার্থী পেলেন। ১৯৯৯ সালে পেলেন প্রথম আন্তর্জাতিক রিসার্চ গ্রান্ট - ইউরোপিয়ান কমিশন থেকে। নরওয়েজিয়ান একাডেমি অব সায়েন্স থেকে পান 'ইয়ং সায়েন্টিস্ট অ্যাওয়ার্ড'। তারপর থেকে একদিনের জন্যও গবেষণা বন্ধ রাখেননি মে-ব্রিট ও এডভার্ড। তাঁরা গবেষণা কাজ এমন ভাবে ভাগ করে নিয়েছেন যেন একটুও সময় নষ্ট না হয়। মে-ব্রিট দেখেন ল্যাবোরেটরি ও প্রশাসন। এডভার্ড দেখেন কারিগরি দিক। কাজের ক্ষতি এড়াতে পারতপক্ষে কোন কনফারেন্সেই দু'জন এক সাথে যান না।

 


চিত্র-৫ মে-ব্রিট ও এডভার্ড মোজার। তাঁদের ল্যাবে

 

পথ ও পরিবেশের স্মৃতি সংরক্ষণে প্লেস সেলের ভূমিকার ব্যাপারটা গত শতাব্দীর শেষে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলেও প্লেস সেলগুলো শুধুমাত্র হিপোক্যাম্পাসেই থাকে নাকি হিপোক্যাম্পাসের বাইরেও থাকে সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়নি তখনো। মোজাররা গবেষণা শুরু করলেন এ ব্যাপারে।

ইঁদুরের হিপোক্যাম্পাসে ইলেকট্রোড স্থাপন করে একটা বড় (দেড় মিটার দৈর্ঘ্য ও দেড় মিটার প্রস্থের) কাঠের বাক্সের ফ্লোরে ছেড়ে দেয়া হলো। বাক্সের ফ্লোর জুড়ে চকলেটের গুড়ো ছড়িয়ে দেয়া হলো যেন ইঁদুর খাবারের লোভে বাক্সের মধ্যে ছোটাছুটি করে। বাক্সের ফ্লোরের সাথে কম্পিউটারের সংযোগ ঘটানো হলো। ইঁদুরের হিপোক্যাম্পাসের প্লেইস সেলে কোন উত্তেজনা তৈরি হলে সেখানে স্থাপিত ইলেকট্রোডের সাহায্যে কম্পিউটার সেই ব্রেইন-সিগনাল রেকর্ড করতে পারে। ফ্লোরের কোন পথে গেলে ইঁদুরের প্লেইস সেলে উত্তেজনা তৈরি হয় তাও রেকর্ড হয়ে যায়।

 

চিত্র - ৬। বাক্সের মধ্যে ইঁদুরের গতিপথ ও মস্তিষ্কের এন্টোরাইনাল কর্টেক্সে সিগনাল।

 

মোজার দম্পতি আবিষ্কার করলেন যে হিপোক্যাম্পাসের বাইরে এন্টোরাইনাল কর্টেক্সেও প্লেইস সেলের সিগনাল পাওয়া যায়। তার মানে শুধু মাত্র হিপোক্যাম্পাসের প্লেইস সেলগুলিই যে পরিবেশের স্মৃতি তৈরি করছে তা নয়, এন্টোরাইনাল কর্টেক্সের সেলগুলোর ভূমিকাও আছে সেখানে। তাঁরা দেখলেন ইঁদুরের মগজের এন্টোরাইনাল কর্টেক্স থেকে যে সিগনাল আসছে তা ষড়ভুজের মত প্যাটার্ন তৈরি করছে। বোঝাই যাচ্ছে যে হিপোক্যাম্পাসের প্লেইস সেল ছাড়াও এন্টোরাইনাল কর্টেক্সের এক ধরনের সেলও কাজ করছে যা এই প্যাটার্ন তৈরি করছে। মোজাররা এই সেলের নাম দিলেন গ্রিড সেল।

 


চিত্র - ৭। গ্রিড সেল। ইঁদুর যখন পরিচিত পরিবেশে পৌঁছায় তার এন্টোরাইনাল কর্টেক্সের গ্রিড সেল উদ্দীপ্ত হয়ে সিগনাল পাঠায়।

 

গ্রিড সেল আবিষ্কারের ফলাফল প্রকাশিত হয় ন্যাচার জার্নালে ২০০৫ সালে। প্লেইস সেল ও গ্রিড সেলের সমন্বয়ে প্রাণির মস্তিষ্কে পরিবেশের স্মৃতি বা এপিসোডাল মেমোরি কীভাবে তৈরি হয় তার একটা পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া গেল [চিত্র ৮]।

 


চিত্র- ৮। হিপোক্যাম্পাসের প্লেইস সেল (নীল) ও এন্টোরাইনাল কর্টেক্সের গ্রিড সেল (হলুদ)।

 

মানুষের মগজে প্লেইস সেল ও গ্রিড সেল

ইঁদুর ও অন্যান্য প্রাণি যেভাবে পথ দেখে বা পরিবেশ মনে রাখে - মানুষের বেলায় তা কিন্তু আরো অনেক জটিল। মানুষ বহুমাত্রিক তথ্য ব্যবহার করতে পারে। ছবি, শব্দ, সময়, দূরত্ব ইত্যাদি অনেকগুলো অপেক্ষক মানুষ ব্যবহার করতে পারে। তাই মানুষের বেলায় প্লেইস সেল ও গ্রিড সেলগুলোর ভূমিকা আরো অনেক বেশি জটিল। কিন্তু তারপরেও অনেকগুলো পরীক্ষায় মানুষের হিপোক্যাম্পাসের প্লেইস সেলের পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। লন্ডনের ট্যাক্সি-ড্রাইভারদের মগজের এম-আর-আই স্ক্যান করে দেখা গেছে - যেসব ড্রাইভার দীর্ঘ প্রশিক্ষণ ও অনুশীলনের পর ট্যাক্সি ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়েছেন - তাদের হিপোক্যাম্পাসের আয়তন    ও গঠন সাধারণ মানুষের হিপোক্যাম্পাসের আয়তনের তুলনায় বেশ কিছুটা বদলে গেছে। ড্রাইভিং ট্রেনিং শুরুর আগের হিপোক্যাম্পাস আর ট্রেনিং শেষের হিপোক্যাম্পাসে অনেক পার্থক্য দেখা গেছে। কোষের জৈব বিবর্তনের সরাসরি প্রমাণ হিপোক্যাম্পাসের এই পরিবর্তন।

 

চিকিৎসাবিজ্ঞানে ও'কিফ এবং মোজারদের আবিষ্কার ব্যাপক সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। আলজেইমার্‌স, ডিমেনসিয়া সহ আরো অনেক মানসিক রোগের কারণ নির্ণয় ও তাদের চিকিৎসা সংক্রান্ত গবেষণায় দ্রুত উন্নতি হবে সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।

 

তথ্যসূত্র

[১] E. C. Tolman, Cognitive maps in rats and men. Psychological Review, 55, 189-208 (1948).

[২] J. O'Keefe,  and J. Dostrovsky, The hippocampus as a spatial map, Preliminary evidence from unit activity in the freely-moving rat. Brain research 31, 573-590 (1971).

[৩] J. O'Keefe, and L. Nadel, The Hippocampus as a cognitive map, Oxford University Press (1978).

[৪] May-Britt Moser and Edvard I Moser, Crystals of the Brain, EMBO Mol Med 3, 69-71 (2011).

[৫] T. Hafting, M. Fyhn, S. Molden, M-B, Moser, E. I. Moser, Nature 436, 801-806 (2005).

[৬] K. Woollett, and E. A. Maguire, Acquiring "the Knowledge" of London's layout drives structural brain changes. Current Biology,, 21 (24), 2109-2114 (2011).

[৭] E. A. Maguire, D. G. Gadian, I. S. Johnsrude, C. D. Good, J. Ashburner, R. S. Frackowiak, and C. D. Frith, Navigation related structural change in the hippocampi of taxi drivers. PNAS, 97 (8), 4398-4403 (2000). 



মাসিক বিজ্ঞানচিন্তার মার্চ ২০১৮ সংখ্যায় প্রকাশিত। 

Latest Post

ডাইনোসরের কাহিনি

  বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাণি কী? এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা বলবো নীল তিমি – যারা দৈর্ঘ্যে প্রায় তিরিশ মিটার, আর ওজনে প্রায় ১৯০ টন পর্যন্ত...

Popular Posts