Wednesday, 26 August 2026

পাঠকের দিনলিপি ১৮-জানুয়ারি-২০০৫

 


১৮০১২০০৫

সা’দ উল্লাহ সাহেবের কলাম ইসলাম ও বর্তমান কলামে ১৪ জানুয়ারি সংখ্যায় লিখেছেন ‘‘বেহেস্ত বা স্বর্গের বর্ণনা সবই কি রূপক?’’ কোরান শরীফে ইহজাগতিক ভালো কাজের পুরষ্কার স্বরূপ মৃত্যুর পরে বেহেশতে জায়গা পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। সেখানে পুরুষদের জন্য নানারকম সুখের কথা বলা হয়েছে। যৌনসুখকে খুব প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। হুরী আর গিলমানের কথা বলা আছে। গিলমান হলো

সুন্দর প্রমোদবালক। 

ধর্মের আবরণটা সরিয়ে খুব নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখলে ব্যাপারটাকে খুব একটা শিষ্ট বলতে পারি না। যুক্তির কথা বলার জন্য অবশ্য কোন ধর্মই তৈরি হয়নি। আর ধর্মকে রাজনীতি থেকে আলাদা করার কথা আমরা যতই বলি না কেন, সেটা সম্ভব নয়। কারণ ধর্মের সৃষ্টিই হয়েছে রাজনৈতিক কারণে। রাজারা নিজে ধর্ম পালন না করলেও ধর্মকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থে। অতীতে ঘটেছে, বর্তমানে ঘটছে এবং  ভবিষ্যতেও হতে থাকবে।

আমি যে কথাগুলো বললাম এখানে এগুলোর কোনটাই সা’দ উল্লাহ সাহেব লেখেননি তাঁর লেখায়। এগুলো আমার নিজস্ব উপলব্ধি।

মাওলানা আলি জুবায়ের সাপ্তাহিক মৃদুভাষণে লিখেছেন ‘‘আরব ধবকুবেরদের মূল্যবোধ এবং একবিংশ শতাব্দীর সভ্যতা’’। বেশ গালভরা নাম সন্দেহ নেই। সাম্প্রতিক সুনামির আক্রান্তদের সাহায্য করতে আরবীয়দের কৃপনতার কথা এখন টক অব দি ওয়ার্লড। সৌদি যুবরাজ নাকি সাফাই গেয়েছেন এই বলে যে দান করা উচিত গোপনে। ব্যক্তিগত দান আর রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা তো এক হলো না। তবে আরবে রাজতন্ত্র। সেখানে যোগ্যতা বলে কারো কিছু হবার সুযোগ নেই। সে দেশে রাজার ছেলেমেয়েরা মনে করে রাষ্ট্রের যা কিছু আছে সবই তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি। একবিংশ শতাব্দীর আধুনিকতার সাথে তাদের কতটুকু সংযোগ আছে? বিলাসী দ্রব্য ছাড়া সভ্যতার আর কোন কিছুই কি আকর্ষণ করে তাদের? এরকম ভোগবাদী মানসিকতা নিয়ে আর যাই হোক চিরদিন রাজা হয়ে থাকতে পারবে না এটা নিশ্চিন্ত।

সাপ্তাহিক ২০০০- এ নির্মলেন্দু গুণ লিখেছেন সুনামি নিয়ে। তিনি বলতে চেয়েছেন সুনামি নামটা সি-এন-এন তথা আমেরিকানদের দেয়া। দাদাগিরি স্বভাব আমেরিকানদের। সুনামি নাম রাখাটা হয়েছে ‘‘কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন’’। আমার কাছে নির্মলেন্দু গুণের যুক্তিটা খুব একটা ভালো লাগলো না। মনে হয়েছে অসম্পূর্ণ তাঁর গবেষণা। আমেরিকান আল্‌মানাক দেখে তিনি আমেরিকানদের গালাগালি করলেন। নির্মলেন্দু গুণ অভিধানে সুনামি শব্দটা যে জাপানি সু (tsu) অর্থাৎ সৈকত, আর নামি(nami) মানে  ঢেউ থেকে নেয়া হয়েছে তা  পেয়েছেন। কিন্তু ভেবেছেন এটা বুঝি কোন সৌখিন সমুদ্র বন্দরের ঢেউ সংক্রান্ত কিছু। কিন্তু আরেকটু পড়াশোনা করলেই বুঝতে পারতেন ইংরেজি ভাষায় এই শব্দের অনুপ্রবেশ কখন কীভাবে ঘটে। 

১৮৯৭ সালে এই সুনামি শব্দটা ইংরেজি ভাষায় জায়গা করে নেয়। জাপানে সুনামির আক্রমণ এর কারণ। Merriam-Webster's Collegiate Dictionary   তে পরিষ্কার করে অর্থ দেয়া আছে সুনামিরঃ ‘‘a great sea wave produced especially by submarine earth movement or volcanic eruption''। 

আমেরিকাকে গালিগালাজ করার সুযোগ পেলেই কেন যে গালিগালাজ করে সবাই বুঝি না। অনেক সময় সুযোগ না পেলেও জোর করে সুযোগ করে নিয়ে গালিগালাজ করে। আমেরিকাতে বসেই আমেরিকাকে গালিগালাজ করা যায়। আইন এখানে কথা বলার স্বাধীনতা দিয়েছে বলেই সে সুযোগটা নিয়ে থাকে সবাই। আমেরিকা অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় ইউরোপে যে সমস্ত মহান বাক্য কেবলি আপ্ত বাক্য হয়ে আছে - সেগুলোর বাস্তবায়ন করেছে নিজের দেশে। যেমন ভলতেয়ারের কথাটা, ‘‘আমি তোমার কথায় বিশ্বাস না রাখলেও তোমার কথা বলার অধিকার নিশ্চিত করবো’’। আমেরিকাকে এই ক্রেডিটটা দেয়া উচিত বলে মনে করি আমি।

সাপ্তাহিক মৃদুভাষণে আবদুল গাফফার চৌধুরি ‘‘হালকা লেখা হালকা নয়’’ নামে পাঁচ পৃষ্ঠার যে লেখাটা লিখেছেন আমি সেখান থেকে একটা লাইনও সারবস্তু পেলাম না। আমারই অক্ষমতা হয়তো। এক পাঠক তাঁর কাছে জানতে চেয়েছেন কেন তিনি ভ্রমণ কাহিনী নাম দিয়ে মৃদুভাষণে হালকা লেখা লিখছেন। ভ্রমণ কাহিনী নাম দিয়ে তিনি আমেরিকা আর কানাডার যে ঘরোয়া বর্ণনা দিয়েছেন কয়েক সপ্তাহ জুড়ে তার কিছু কিছু পড়েছি আমি। সেখানেও আমি বলছি, খুব একটা উপভোগ করতে পারিনি সে  হাল্‌কা লেখাও। তবে কি আমি বেশি সিনিক হয়ে পড়েছি? নাকি আবদুল গাফফার চৌধুরির কাছে আমার প্রত্যাশা আরো অনেক বেশি? এরকম লেখার জন্যও নিশ্চয় টাকা নেন তিনি!

আমাদের বেশির ভাগ মানুষের সমস্যা হলো আমরা সত্য  কথা বলতে খুব ভেবেচিন্তে বলি। অথচ ভেবেচিন্তে বলতে হয় না বলেই সত্য কথা সত্য-কথা। আবদুল গাফফার চৌধুরি যা কিছু লিখলেই তা ভালো বলতে হবে? শামসুর রাহমান যা কিছু লিখলেই তা কবিতা বলে গদগদ করতে হবে? রবীন্দ্রনাথ বা আইনস্টাইন ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন বলেই আমাকেও করতে হবে?

মৃদুভাষণে সুলতানা আজিম ধারাবাহিক ভাবে লিখছেন ‘‘হুমায়ূন আজাদের শেষ পাঁচদিন’’। জার্মানিতে সুলতানা আজিমের সাথে টেলিফোন আলাপের অনুলিখন। সুলতানা আজিম কি রেকর্ড করেছিলেন তাঁর সাথে হুমায়ূন আজাদের টেলিফোন সংলাপ? স্মৃতি থেকে লিখছেন তা অনুমান করছি। মানুষ মরে গেলে এ ধরণের সংলাপ অনেক সময় নিজের কল্পনা থেকেও লেখা হয়ে যেতে পারে। সুলতানা আজিম নিজের লেখার প্রতি বিশ্বস্ত থাকবেন বলে আশা করি। কিন্তু এ যে বড় কঠিন কাজ। আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রাখা বড়ই কঠিন কাজ।

======

কলম্বাস, ওহাইও

No comments:

Post a Comment

Latest Post

সিনেমাখোরের দিনলিপি ৩-ফেব্রুয়ারি-২০০৫

  সোফিয়া লরেন অস্কার পেয়েছিলেন ১৯৬২ সালের   দিকে। টু ওম্যান ছবিতে অভিনয়ের জন্য। ‘টু ওম্যান’ ছবিটা দেখলাম সম্প্রতি। বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ...

Popular Posts