Showing posts with label ফাইনম্যান. Show all posts
Showing posts with label ফাইনম্যান. Show all posts

Tuesday, 12 May 2026

প্রিয় ফাইনম্যান ২০২৬


 

এই বালকটির জন্ম ১৯১৮ সালের ১১ মে নিউইয়র্ক শহরে। ছবিটি তার আট-নয় বছর বয়সে তোলা। সেদিন কেউ কি ভাবতে পেরেছিল এই অশ্বারোহী বালক একদিন পদার্থবিজ্ঞান শৃঙ্গের শীর্ষে আরোহন করবেন!! 

পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়ে বিশ্ববিখ্যাত হয়েছেন যাঁরা, তাঁরা সবাই যে তাঁদের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার বা উদ্ভাবনের তত্ত্ব এবং তথ্য সহজভাবে সবার জন্য ব্যাখ্যা করতে পারেন তা কিন্তু নয়। তাঁরা

Sunday, 12 May 2024

রিচার্ড ফাইনম্যানের জন্মদিনে - ২০২৪

 


১৯৭৯ সালে আমেরিকার Omni ম্যাগাজিন রিচার্ড ফাইনম্যানের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছিল। লেখাটির শিরোনাম দিয়েছিল ‘The Smartest Man in the World’. ফাইনম্যানের মা তখনো জীবিত। তিনি যখন শুনলেন যে তাঁর ছেলেকে পৃথিবীর সবচেয়ে স্মার্ট ছেলে বলা হচ্ছে – তিনি অবাক হয়ে বলেছিলেন, “Our Richie? The World’s smartest man? God help us!”

মায়ের কাছে সন্তান চিরদিনই শিশু থেকে যায়। সন্তান যদি বিখ্যাত হয়ে যান, তাহলে তো কথাই নেই। মায়ের কথা বাদ দিলেও, রিচার্ড ফাইনম্যানকে পৃথিবীর সবচেয়ে স্মার্ট পুরুষ বলাতে অনেকের আপত্তি থাকতে পারে। আপত্তি তখনো ছিল, এখনো আছে। কিন্তু আমি তাঁকে সবচেয়ে স্মার্ট পদার্থবিজ্ঞানী বলে মনে করি। তিনি যে আইনস্টাইনের মতো মহাবিশ্বের পদার্থবিজ্ঞানের খোলনলচে পালটে দিয়েছেন তা নয়। তাঁর গবেষণা যে পদার্থবিজ্ঞানের সকল শাখায় কোনো না কোনো ভাবে প্রভাব ফেলেছে – তাও নয়। তিনি কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্সের অগ্রদূত, ফাইনম্যান-ডায়াগ্রাম তাঁর আবিষ্কৃত অত্যন্ত কার্যকরী গাণিতিক কৌশল, The Feynman Lectures of Physics পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে মৌলিক এবং স্মার্ট ক্লাসরুম লেকচার। কিন্তু ফাইনম্যানের লেকচারের চেয়েও আকর্ষণীয় লেকচার দিয়েছেন আরো অনেক পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। তাঁর চেয়েও বিখ্যাত এবং জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিল এবং এখনো আছে পৃথিবীতে। 

তারপরেও কেন শুধুমাত্র একজন পদার্থবিজ্ঞানী বেছে নেয়ার সুযোগ থাকলে আমি রিচার্ড ফাইনম্যানকে বেছে নেবো? কারণ তাঁর অনন্য স্টাইল। তিনি পদার্থবিজ্ঞানকে একেবারে নিজের মতো করে বুঝেছেন। তিনি যা বোঝেননি তা অকপটে বলে দিয়েছেন। তাঁর ভেতরে কোন ব্যাপারেই কোন দ্বিচারিতা ছিল না। তিনি নিজে তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানী হয়েও স্পষ্টভাবে বলেছেন, যে কোনো তত্ত্ব সে যত আকর্ষণীয়ই হোক, তা যদি বাস্তবে প্রমাণ করা না যায় – তা কোন তত্ত্বই নয়। 

এই মানুষটি সারাজীবন কাজ করে গেছেন নতুন জিনিস শেখার আনন্দে। প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনে তাঁর কৌতূহল ছিল একেবারে শিশুদের মতো। জনপ্রিয় হবার কোন চেষ্টাই ছিল না তাঁর মধ্যে। জীবদ্দশায় তিনি অতটা জনপ্রিয় ছিলেনও না, যতটা হয়েছেন তাঁর মৃত্যুর পর। নোবেল পুরষ্কার পাবার পরেও তাঁকে যে আমেরিকার মানুষ খুব একটা চিনতো তা নয়। অবশ্য আমেরিকাতে এত বেশি নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী যে – কে কার খবর রাখে। বিজ্ঞান জনপ্রিয়তা মাপার মাপকাঠি এখনো নয়, তখনো ছিল না। 

তবে ফাইনম্যান তাঁর মৃত্যুর দু’বছর আগে আমেরিকান সর্বস্তরের জনগণের কাছে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিলেন চ্যালেঞ্জার শাটল দুর্ঘটনার মূল কারণ উদ্ঘাটন করে। ১৯৮৬ সালের ২৮ জানুয়ারি নাসার মহাকাশ যান চ্যালেঞ্জার উৎক্ষেপণের সাথে সাথেই বিস্ফোরিত হয়ে সাতজন নভোচারীর সবাই মারা যায়। এই ঘটনার তদন্তের জন্য আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান যে কমিটি গঠন করেন সেখানে বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানী হিসেবে রিচার্ড ফাইনম্যানকে সদস্য করা হয়। ফাইনম্যান সরকারি কাজে উৎসাহী ছিলেন না কোনোদিনই। আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা আর অহেতুক ফরমালিটি তাঁর অসহ্য ছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত অনুরোধে অসুস্থ শরীরেও তিনি রাজি হয়েছিলেন। সেই সময় তিনি ক্যান্সারে ভুগছিলেন। ফাইনম্যান শর্ত দিয়েছিলেন – তিনি কমিটিতে থাকলেও কমিটির সকল সদস্যের মতের সাথে তাঁর মত মিলতে হবে কোন কথা নেই। কমিটির রিপোর্টের সাথে তাঁর ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করার স্বাধীনতাও তাঁকে দিতে হবে। এরকম তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ করতে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়, অনেক সময় কোন রিপোর্ট প্রকাশিতও হয় না। এসব তাঁর জানা ছিল বলেই তিনি এরকম শর্ত দিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট রিগ্যান তাঁর শর্ত মেনে নিয়েই তাঁকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিয়েছিলেন। রিচার্ড ফাইনম্যান চ্যালেঞ্জার মহাকাশযানের দুর্ঘটনার সঠিক কারণ বের করেছিলেন। রিপোর্টের সাথে তাঁর নিজের রিপোর্টও প্রকাশ করেছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি সংবাদ সম্মেলন করে ন্যাশনাল টেলিভিশনের ক্যামেরার সামনে ছোট্ট পরীক্ষার মাধ্যমে দেখিয়েছিলেন কী ঘটেছিল আসলে। রকেটের মোটর সেফটিতে যে রাবারের ও-রিং ছিল – প্রচন্ড ঠান্ডায় সেই রাবারের ইলাস্টিসিটি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ফাইনম্যান সাংবাদিকদের সামনে একটুকরো রাবার বরফ-পানিতে ডুবিয়ে দেখিয়েছিলেন কীভাবে রাবারের কার্যকারিতা কমে যায় তাপমাত্রা ভীষণ কমে গেলে। ফাইনম্যান সেই ঘটনার পর আমেরিকার সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছিলেন। অবশ্য তার দেড় বছর পরেই ফাইনম্যান মারা যান। কিন্তু তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়তেই থাকে। 

কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে রিচার্ড ফাইনম্যান সম্পর্কে কোন তথ্যই আমরা পাইনি সেইসময়। আমি দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম। অনার্স ও মাস্টার্স পাস করেছি। এমফিলেও ভর্তি হয়েছিলাম। আমাদের শিক্ষকরা আমাদের কোনো ক্লাসেই রিচার্ড ফাইনম্যানের নাম উচ্চারণও করেননি। এমফিল করার সময় প্রামাণিকস্যার “ফাইনম্যান’স পাথ ইন্টিগ্র্যাল” নামে একটি বই পড়তে দিয়েছিলেন। কিন্তু তখনো ফাইনম্যান সম্পর্কে কিছুই জানি না। ধরতে গেলে ফাইনম্যানের সাথে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে। ফাইনম্যানস লেকচার অব ফিজিক্সের মতো এত ভালো বই থাকতে কেন আমাদের অনার্সে এই বই পড়তে বলা হয়নি – এই অভিমান আমার কখনো যাবে বলে মনে হয় না। 

আজ ১১ মে রিচার্ড ফাইনম্যানের জন্মদিন। 

Happy birthday Feynman – the finest man! 


Saturday, 12 June 2021

ফাইনম্যানের জন্মদিনে

 



আজ ১১ মে। রিচার্ড ফাইনম্যানের জন্মদিন। ১৯১৮ সালের ১১ মে নিউ ইয়র্কে জন্মগ্রহণ করেন বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে ডায়নামিক পদার্থবিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যান। এম-আই-টি থেকে বিএসসি ডিগ্রি পান ১৯৩৯ সালে। প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ১৯৪২ সালে। কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ছিলেন ১৯৪৫ থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত। তারপর ১৯৫০ থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ক্যালটেকে অধ্যাপনা করেছেন। কোয়ান্টাম ইলেকট্রো-ডায়নামিক্স এর অন্যতম জনক তিনি। ১৯৬৫ সালে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন যে কাজের জন্য - মাত্র তেইশ বছর বয়সেই সে কাজের সূত্রপাত। পৃথিবীর প্রথম পারমাণবিক প্রকল্প - ম্যানহাটান প্রজেক্টের হিউম্যান-কম্পিউটার হিসেবে কাজ করেছেন ফাইনম্যান। যে ন্যানো-টেকনোলজির প্রয়োগ এখন ওষুধ থেকে শুরু করে জীবনের হাজারো ক্ষেত্রে সেই ন্যানো-টেকনোলজির প্রাথমিক ধারণার উৎপত্তি ফাইনম্যানের হাতে। মৌলিক কণার কার্যকলাপ বোঝার জন্য ফাইনম্যান-ডায়াগ্রাম সবচেয়ে কার্যকরী পদ্ধতি। পদার্থবিজ্ঞানের এমন কোন শাখা নেই যেখানে ফাইনম্যান কোন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেননি। পদার্থবিজ্ঞানের জগতে ফাইনম্যানের মত এমন ভালো শিক্ষক আর কখনো পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে ক্লাসিক টেক্সট বইয়ের নাম ‘ফাইনম্যান লেকচার অন ফিজিক্স’ যা রচিত হয়েছে তাঁর ক্যালটেকের ক্লাসরুমে দেয়া লেকচারগুলো থেকে। আইনস্টাইনের পরে ফাইনম্যানই ছিলেন বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে সৃষ্টিশীল বহুমাত্রিক পদার্থবিজ্ঞানী। ১৯৮৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মৃত্যু হয় ফাইনম্যানের।

১১/৫/২০২১

Sunday, 12 May 2019

ফাইনম্যানের ইলেকট্রোডায়নামিক ভালোবাসা - ৯ম পর্ব (শেষ পর্ব)


ডিভোর্সের পর ফাইনম্যানের মনে হলো চার বছর কারাবাসের পর মুক্তি পেয়েছেন তিনি। আবার ব্যাচেলর লাইফের উদ্দাম স্বাধীনতা। ক্যাজুয়েল ডেটিং করছেন ইচ্ছেমতো। ন্যুড ক্লাবে গিয়ে জটিল গাণিতিক সমীকরণের সমাধান করছেন। গ্র্যাভিটন আর পারটনের ধারণার গাণিতিক ভিত্তি তৈরি করা যায় কিনা দেখছেনকোয়ান্টাম কম্পিউটারের সম্ভাবনা নিয়েও কাজ করেছেন এ সময়।
            
১৯৫৮ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের আমন্ত্রণে পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার বিষয়ক দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তৃতা দিতে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় যান ফাইনম্যান
            
রবিবারের রোদেলা বিকেলে বিচ টাওয়েল হাতে নিয়ে বেড়াচ্ছেন লেক জেনেভার বিচে। সংক্ষিপ্ত পোশাকে বিচের বালিতে শুয়ে অনেকেই রোদ-স্নান করছে। টু-পিস পোলকা ডট বিকিনি পরা অনেক মেয়েই শুয়ে আছে বালির ওপর এখানে শেখানে। আমেরিকায় এখনো এরকম বিকিনির চল হয়নি। হঠাৎ চোখ গেল নীল বিকিনি পরা এক তরুণীর দিকে।
            
পায়ে পায়ে তরুণীটির দিকে এগিয়ে গেলেন চল্লিশ বছর বয়সী ফাইনম্যান। কীভাবে কথা বলবেন বুঝতে পারছেন না। সুইস ভাষা তিনি জানেন না। কিন্তু এমন সুন্দরী একজন মেয়ের সাথে কথা না বলে চলে যাবেন এটা তো হতেই পারে না। মেয়েটির খুব কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন ফাইনম্যান। বিড় বিড় করে তাঁর নিজস্ব ইংরেজিতেই বললেন, "লেক জেনেভার পানি মনে হয় খুবই ঠান্ডা"
            "হ্যাঁ, খুবই ঠান্ডা" - চমকে উঠলেন ফাইনম্যান। মেয়েটি কথা বলছে ইংরেজিতে।
            "তুমি ইংরেজি জানো?"
            "ইংরেজি আমার মাতৃভাষা। ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারে জন্মেছি আমি।"
            "হাই, আমি ফাইনম্যান, রিচার্ড ফাইনম্যান। আমেরিকান।"
            "হাই, গোয়েনিথ হাওয়ার্থ"
            
ফাইনম্যান তো মহাখুশি। গোয়েনিথও খুশি অনেকদিন পর ইংরেজি বলার লোক পেয়ে ফাইনম্যান দেরি না করে টাওয়াল বিছিয়ে সূর্যস্নানে শুয়ে পড়লেন গোয়েনিথের পাশে। পরিচিত হতে সময় লাগলো না।
            
ইয়র্কশায়ারের ছোট্ট একটা গ্রামের মেয়ে গোয়েনিথ। তাদের গ্রামে কখনোই উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটেনি। কোন রকমে স্কুলের গণ্ডি পার হয়ে লোকাল লাইব্রেরিতে লাইব্রেরিয়ান হবার চেষ্টা করছিল গোয়েনিথ। কিন্তু কিছুই ভাল লাগছিল না তার। তাই ১৯৫৮'র শুরুতে ওয়ান-ওয়ে টিকেট কেটে চলে এসেছে জেনেভায়। ওয়ান-ওয়ে টিকেট কাটার উদ্দেশ্য হলো এখানে কাজ করে উপার্জন করে সে টাকায় দেশ-ভ্রমণ করবে।
            
ইংল্যান্ড থেকে আসার সময় কোন চাকরি ঠিক করে আসেনি সে। লন্ডনের সুইস অ্যামবেসি থেকে দুটো এজেন্সির ঠিকানা নিয়ে এসেছিল। তাদের একটাতে যোগাযোগ করে সে জেনেভায় একটা চাকরি পেয়েছে। একটা ইংরেজ পরিবারে আয়ার কাজ। থাকা খাওয়া ছাড়া মাসে মাত্র পঁচিশ ডলার বেতন। দিনে প্রায় পনের ঘন্টা কাজ করতে হয় তাকে। সপ্তাহে সাড়ে ছয় দিন। সপ্তাহে একটা পুরো দিনও ছুটি নেই তার। বৃহস্পতিবার বিকেলে তিন ঘন্টা আর রবিবার বিকেলে তিন ঘন্টা ছুটি। সেরকম একটা রবিবারের বিকেলেই ফাইনম্যানের সাথে দেখা হয়েছে গোয়েনিথের।
            
ফাইনম্যান গোয়েনিথকে আমেরিকার সুযোগ সুবিধা সম্পর্কে বললেন। ক্যালিফোর্নিয়ার যেখানে তিনি থাকেন সেই জায়গা কত সুন্দর তা বললেন। এবং শেষে বললেন, "দেখো, তুমি এখানে যা করছো তা যদি আমার জন্য করো - মানে আমার বাড়ির দেখাশোনা, আমি তোমাকে এখানের দ্বিগুণ বেতন দিতে রাজি আছি।"
            "আপনার বাড়ির গভর্নেস হতে বলছেন?"
            "হ্যাঁ, আমার বাড়ির কাজ করার কেউ নেই। আমার স্ত্রীর সাথে আমার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে দু'বছর আগে। আমি একা মানুষ তোমাকে সারাদিনে দু'ঘন্টাও কাজ করতে হবে না।"
            "কিন্তু আমি তো আমেরিকা যাবার কথা ভাবছি না এখনো। আমার প্ল্যান হলো এখান থেকে অস্ট্রেলিয়া যাওয়া। সেখানে বছর দুয়েক থেকে ইংল্যান্ডে ফিরে যাওয়া।"
            "এখান থেকে আমেরিকার দূরত্ব অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে কম। তুমি ভেবে দেখো। আমি আমেরিকায় ফিরেই তোমাকে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করছি।"
            
ফাইনম্যান গোয়েনিথকে একজন গভর্নেসের বেশি কিছুই ভাবেননি শুরুতে। আমেরিকায় ফিরে এসে উকিলের সাথে যোগাযোগ করলেন গোয়েনিথের স্পন্সরশিপের ব্যাপারে। উকিল বললেন, "আপনি নিজে তাকে স্পন্সর করতে পারেন। কিন্তু আমি বলবো আর কাউকে দিয়ে করাতে।"
            "কেন? আমি নিজে করলে অসুবিধে কী?"
            "অসুবিধে এখন নেই। তবে ভবিষ্যতে হতে পারে। আপনার গভর্নেস যেহেতু আপনার বাড়িতে থাকবেন, সেহেতু কোনদিন যদি আপনাদের মধ্যে কোন যৌনসম্পর্ক হয় তবে আপনি বিপদে পড়তে পারেন। কারণ স্পন্সরশিপের শর্ত হলো স্পন্সরকে উন্নত চরিত্রের অধিকারী হতে হয়।"
            
ফাইনম্যান তাঁর বন্ধু ও সহকর্মী ম্যাথিউ স্যান্ডস্‌কে রাজি করালেন গোয়েনিথের স্পন্সর হওয়ার জন্য।
            
পরের বছর ১৯৫৯ সালে জেনেভা থেকে গোয়েনিথ চলে এলো ফাইনম্যানের বাড়িতে। মেরি লুইয়ের চাপে পড়ে বিরাট বাড়ি নিতে হয়েছিল ফাইনম্যানকে। সেই বিরাট বাড়িতেই থাকতে শুরু করলো গোয়েনিথ। দোতলায় একটা রুমে থাকে গোয়েনিথ, আর নিচের তলায় ফাইনম্যানের থাকা, স্টাডি সবকিছু।
            
শুরুতে ম্যাথিউ স্যান্ড্‌স ও তাঁর স্ত্রী ছাড়া ক্যালটেকের আর কেউ জানতে পারেননি যে ফাইনম্যান বাড়িতে একজন গভর্নেস রেখেছেন। কিন্তু যখন দেখা গেল ফাইনম্যান প্রতিদিন লাঞ্চ টাইমে বাড়ি চলে যাচ্ছেন - তখন কৌতূহলীদের চোখ এড়ানো গেলো না।
           
গোয়েনিথকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন ফাইনম্যান। তাই গোয়েনিথ স্থানীয় কিছু আমেরিকান ছেলের সাথে আউটিং-এও যায় মাঝে মাঝে। অচিরেই ক্যালটেকের মুখে মুখে ঘুরতে লাগলো ফাইনম্যান-গোয়েনিথ সংক্রান্ত মুখরোচক গল্প।
           
মেয়েদের সাথে যথেচ্ছ মেলামেশার কারণে ফাইনম্যানের সুনামের ক্ষতি হচ্ছে। আর মেলামেশার ব্যাপারেও মনে হচ্ছে ফাইনম্যান কোন বাছবিচার করছেন না। অনেক বিবাহিতা মহিলার সাথেও তার ঘনিষ্ঠ মেলামেশা। অনেকেই আবার এ সুযোগে ফাইনম্যানকে ব্ল্যাকমেল করতে শুরু করেছে। অনেক মহিলা ফাইনম্যানের সাথে মেশার পরে যখন তখন চার-পাঁচশ ডলার দাবি করে চিঠি লেখে। তাদের একজন ফাইনম্যানের বাড়ি থেকে আইনস্টাইন গোল্ড মেডেল নিয়ে চলে গেলো। ফাইনম্যান তাঁর আইনস্টাইন মেডেলকে নোবেল পুরষ্কারের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।
            
ফাইনম্যানের শুভাকাঙ্খীরা ফাইনম্যানকে বোঝাচ্ছেন - "দেখো, যারা তোমার মেধা ও যোগ্যতার ধারে কাছেও নেই তাদের সাথে তুমি শুধুমাত্র জৈবিক প্রয়োজনে মিশছো, এবং তারা তার সুযোগ নিচ্ছে। কে কী বলছে তাতে তোমার কিছু আসে যায় না বলেই তুমি দেখেও দেখতে পাচ্ছো না লোকে কী ভাবছে তোমাকে। আর তুমিও এসব করছো কারণ তুমি মনে করছো তুমি ব্যাচেলর, যা খুশি করতে পারো। মনে করে দেখো আরলিন যখন ছিলো কিংবা মেরি লিউ, তখন তো একদিনের জন্যও অন্য কারো কাছে যাওনি। তোমার বিয়ে করা উচিত ফাইনম্যান।"
            
একদিন ফাইনম্যানের হঠাৎ মনে হলো তাঁর সহকর্মী প্রফেসর মারি গেল-ম্যান তাঁর ইংরেজ স্ত্রী নিয়ে কত সুখে আছে। গোয়েনিথও তো ইংরেজ। গোয়েনিথ যেভাবে তাঁর দেখাশোনা করছে এবং তাঁর ঘর-বাড়ি গুছিয়ে রাখছে তাতে তো মনে হচ্ছে স্ত্রী হিসেবে বেশ ভালোই হবে সে। দেরি না করে কোনরকম ভনিতা না করেই ফাইনম্যান বিয়ের প্রস্তাব দিলো গোয়েনিথকে।
           
চমকে উঠল গোয়েনিথ। ফাইনম্যান তার চেয়ে বয়সে ষোল বছরের বড়। তাছাড়া এ ব্যাপারটা নিয়ে সে ভাবেনি কখনো। সুতরাং তার সময় দরকার। কিন্তু ফাইনম্যান দেরি করতে রাজি নন। তিনি চাচ্ছেন পরের সপ্তাহেই বিয়েটা হয়ে যাক। গোয়েনিথ ফাইনম্যানকে বোঝালেন, "আমার মা-বাবাকে না জানিয়ে আমি কিছুই বলতে পারছি না।"
            
গোয়েনিথ তার মা-বাবাকে চিঠি লিখে সব জানালেন। তাঁদের কোন ধারণাই নেই কোথায় আমেরিকা, কোথায় ক্যালিফোর্নিয়া, আর ফাইনম্যানই বা কে, কেনই বা তিনি বিখ্যাত। তাঁরা খুশি কারণ তাঁদের মেয়ে অনেক বড় দেশে স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে পেয়েছে।
            
গোয়েনিথের মা-বাবার পক্ষে বিয়েতে আসা সম্ভব নয়। গোয়েনিথকে আশীর্বাদ জানিয়ে চিঠি লিখলেন তাঁরা। গোয়েনিথ তাঁর মা-বাবার সম্মানে বিয়েটা মা-বাবার ধর্ম মেথডিস্ট খ্রিস্টান মতে করতে চাইলেন।
            
ফাইনম্যান ছোটবেলা থেকেই নাস্তিক। নিজে যা বিশ্বাস করেন না তা করেন না। তাঁর বাবার মৃত্যুর পর রাবাইরা যখন ফাইনম্যানকে বলেছিল হিব্রু ভাষায় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মন্ত্র বলতে - ফাইনম্যান জবাব দিয়েছিলেন, "আমি হিব্রু বুঝি না।" তখন রাবাইরা হিব্রু মন্ত্র ইংরেজিতে অনুবাদ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু ফাইনম্যান তাও উচ্চারণ করতে অস্বীকার করেছিলেন। বলেছিলেন, "আমি ওসব বিশ্বাস করি না।"
            
কিন্তু এখন গোয়েনিথ যখন বললেন বিয়ে হলে তা  রেজিস্ট্রেশনের পাশাপাশি মেথডিস্ট খ্রিস্টান রীতিনীতি মেনে হতে হবে বিশ্বাসের কারণে নয়, গোয়েনিথের মা-বাবার প্রতি সম্মান দেখানোর জন্য, ফাইনম্যান রাজি হয়ে গেলেন। ফাইনম্যান ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার ডিভাইনিটি স্কুলের ডিন ওয়েসলি রবকে রাজি করালেন বিয়ের মন্ত্র পড়ানোর জন্য। ফাইনম্যানের বন্ধু ম্যাথিউ স্যান্ড্‌স, যিনি গোয়েনিথের স্পন্সর হয়েছিলে, গোয়েনিথকে মেথডিস্ট রীতি অনুযায়ী ফাইনম্যানের হাতে তুলে দিলেন। ১৯৬০ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর হান্টিংটন হোটেলে গোয়েনিথ ও রিচার্ড ফাইনম্যানের বিয়ে হলো। 




তারপর সারাজীবন গোয়েনিথের সাথে সুখেই কাটিয়েছেন রিচার্ড ফাইনম্যান। বিয়ের পর মারি গেল-ম্যানকে ফাইনম্যান বললেন, "তোমার মত আমারও এখন ইংরেজ স্ত্রী আছে।"
            
মারি বলেছিলেন, "আমার কিন্তু একটা ইংরেজ কুকুরও আছে।"
            
ফাইনম্যান দ্রুত একটা কুকুর নিয়ে এলেন বাসায়। কুকুরটির নাম রাখা হলো ভেনাস।
            
বিয়ের পর ফাইনম্যান গোয়েনিথকে নিয়ে গোয়েনিথের মা-বাবার সাথে দেখা করে এলেন।
            
বিয়ের দু'বছর পর ১৯৬২ সালে ফাইনম্যান ও গোয়েনিথের প্রথম সন্তানের জন্ম হয়। পজিট্রনের আবিষ্কারক কার্ল এন্ডার্সন ছিলেন ফাইনম্যানের বন্ধু। ফাইনম্যান ছেলের নাম রাখলেন - কার্ল। ফাইনম্যান কার্লকে নিজের মত করেই বিজ্ঞানমনস্ক করে গড়ে তুলেছেন। যেমন তাঁকে গড়ে তুলেছিলেন তাঁর বাবা মিলভেল ফাইনম্যান। বড় হয়ে কার্ল নামকরা কম্পিউটার বিজ্ঞানী হন। ১৯৬৮ সালে ফাইনম্যান ও গোয়েনিথ একটা দুই মাস বয়সী মেয়েকে দত্তক নেন। তার নাম রাখেন মিশেল। মিশেল তাঁর বাবার মত বিজ্ঞানী হতে চান নি। তিনি একজন নামকরা ফটোগ্রাফার হয়েছেন।
            
১৯৬৫ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেলেন রিচার্ড ফাইনম্যান। তারপরেও অনেক বিষয়ে নিরলস কাজ করে গেছেন তিনি।
            
ফাইনম্যানকে পদার্থবিজ্ঞানের জগতে সবাই চিনতেন সারা বিশ্বে। তবে আমেরিকার একেবারে সব মানুষের হিরো হয়ে গিয়েছিলেন জীবনের একেবারে শেষের দিকে এসে। ১৯৮৬ সালের ২৮ জানুয়ারি নাসার মহাকাশ যান 'চ্যালেঞ্জার' তার দশম যাত্রাকালে উৎক্ষেপণের এক মিনিট ১৩ সেকেন্ড পরেই সাতজন আরোহী সহ বিস্ফোরিত হয়।
            
এই বিস্ফোরণের কারণ খুঁজে বের করার জন্য যে বৈজ্ঞানিক কমিশন হয় তাতে দায়িত্ব পালন করেন ফাইনম্যান। তদন্ত শেষে তিনি টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে বরফ-শীতল পানি ও রাবারের সাহায্যে খুবই সাধারণ একটা পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করে দিয়েছিলেন কীভাবে অতিরিক্ত ঠান্ডার কারণে শাটলের একটা যন্ত্রাংশের রাবার ঠিকমত সম্প্রসারিত না হয়ে দুর্ঘটনাটা ঘটেছে।
            
টিভি ও অন্যান্য প্রচার মাধ্যমের বদৌলতে ফাইনম্যানের জীবন-কাহিনি আবার নতুন করে সামনে চলে আসে। ফাইনম্যান হয়ে পড়েন বহুল উচ্চারিত একটি নাম। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর আত্মজৈবনিক গ্রন্থ 'শিওরলি ইউ আর জোকিং মিস্টার ফাইনম্যান'। প্রকাশের কয়েকদিনের মধ্যেই বইটি বেস্ট সেলার হয়।
            
অনেক বছর থেকেই পাকস্থলীর ক্যান্সারে ভুগছিলেন ফাইনম্যান। দুবার অস্ত্রোপচারের পরেও বেঁচেছিলেন বেশ কয়েক বছর। তৃতীয়বার অস্ত্রোপচারের পর ১৯৮৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রিচার্ড ফাইনম্যানের মৃত্যু হয়।

 ফাইনম্যানের মৃত্যুর পর তাঁর কাগজপত্রের সাথে একটা বাক্স পাওয়া যায়। সেখানে মুখ বন্ধ একটা খামে পাওয়া যায় একটা চিঠি। চিঠিটা ফাইনম্যান লিখেছিলেন চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় আগে আরলিনের মৃত্যুর দু'বছর পরে। ভীষণ অযৌক্তিক জেনেও মৃত আরলিনকে লিখেছিলেন ফাইনম্যানঃ

            "প্রিয় আরলিন, আমি তোমাকে ভালোবাসি প্রিয়তমা। আমি জানি এটা শুনতে তোমার কত ভাল লাগে। কিন্তু শুধু তুমি পছন্দ করো বলেই আমি তোমাকে লিখছি না। আমি তোমাকে লিখছি কারণ তোমাকে লিখলে আমার ভেতরটা জেগে ওঠে।  
            
কতদিন তোমাকে লিখিনি আমি। প্রায় দু'বছর হয়ে গেলো। আমি জানি তুমি আমাকে ক্ষমা করবে তোমাকে এতদিন না লেখার জন্য। কারণ তুমি তো আমাকে চেনো - কতটা জেদি আর বাস্তববাদী আমি।
            
মৃত্যুর পর তোমাকে লেখাটা অর্থহীন বলেই আমি লিখিনি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তোমাকে আমার লেখা দরকার। তোমার মৃত্যুর পর এতদিন আমি কী কী করেছি তোমার জানা দরকার।        
আমি তোমাকে বলতে চাই - আমি তোমাকে ভালবাসি, আমি তোমাকেই ভালবাসতে চাই, আমি সবসময় তোমাকেই ভালবাসবো।
            
আমি ঠিক বুঝতে পারছি না তোমার মৃত্যুর পরেও তোমাকে এত ভালোবাসার কী মানে হয়? আমার বাস্তববাদী মনের তা বুঝতে খুব কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু আমি এখনো তোমার দেখাশোনা করতে চাই এবং চাই তুমিও আমার দেখাশোনা কর।
            
আমি তোমার সাথে আমার সমস্যাগুলো নিয়ে কথা বলতে চাই, আমাদের যৌথ প্রকল্পগুলো চালিয়ে নিতে চাই। আগে যেভাবে আমরা একসাথে জামাকাপড় বানাতাম, চায়নিজ শিখতাম, মুভি প্রজেক্টর নিয়ে কাজ করতাম। এখন আমি ওসব কিছুই করতে পারি না। তুমি ছাড়া আমি ভীষণ একা। তুমি ছিলে আমার প্রেরণা-নারী।
            
তুমি যখন অসুস্থ ছিলে তখন তোমার মন খারাপ থাকতো আমাকে যা দিতে চাও তা দিতে না পেরে। তোমার চিন্তার কোন কারণ নেই। আমাকে তোমার কিছু দেয়ার দরকার নেই। আমি তোমাকে এত বেশি ভালবাসি যে তার বিনিময়ে কোন কিছু পাবার কথা আমার মনেই হয় না।
            
এখন তুমি নেই। আমি জানি তুমি আমাকে কোন দিনই আর কোন কিছু দিতে পারবে নাকিন্তু তবুও আমি তোমাকে এত ভালবাসি যে আমি আর কাউকে ভালবাসতে গেলেই তুমি এসে দাঁড়াও সামনে। আমিও চাই তুমি এভাবে আমার সামনে এসে দাঁড়াও। আমি বুঝতে পারছি মৃত আরলিন আমার কাছে জীবন্ত অনেকের চেয়েও জীবন্ত।
            
আমি জানি তুমি আমাকে বোকা ভাবছো এবং চাইছো আমি যেন আবার নতুন করে জীবন শুরু করি, ভালোবাসি। আমি জানি     তুমি চাইছো না আর আমার সামনে আসতে।
            
তুমি আশ্চর্য হবে গত দু'বছরে তুমি ছাড়া আর কাউকে ভালবাসতে পারিনি আমি। আমি বুঝতে পারছি না এটা কীভাবে হলো। আমি অনেক মেয়ের সাথে মিশেছি। তাদের অনেকেই খুব      চমৎকার। কিন্তু দু'দিন যেতেই মনে হয়েছে তোমার মত ওরা কেউই নয়।
            
আমি একা থাকতে চাই না। কিন্তু পারছি না। আমার কাছে তুমিই একমাত্র সত্যি, আর সবাই মিথ্যে।
            
আমার প্রিয়তমা স্ত্রী, আমি তোমাকে ভালবাসি। আমার স্ত্রীকে আমি ভালবাসি। আমার স্ত্রী মৃতা।
            
ইতি তোমার রিচ।
            
বিঃ দ্রঃ চিঠিটি পোস্ট করতে পারছি না বলে আমাকে মাফ করে দিও। কারণ আমি তোমার ঠিকানা জানি না।"



ফাইনম্যানের ইলেকট্রোডায়নামিক ভালোবাসা - ৮ম পর্ব



সময়ের সাথে এগিয়ে যেতে শুরু করেছেন ফাইনম্যান। গবেষণা করছেন পুরোদমে। মৌলিক বলগুলো আলো, বিদ্যুৎ এবং চৌম্বক বলের সাথে কীভাবে সম্পর্কিত তা নিয়ে কাজ করতে করতে কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্সের ভিত্তি তৈরিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে শুরু করেছেন ফাইনম্যান। এম-আই-টিতে ছাত্র থাকাকালীন কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অন্যতম জনক পল ডিরাক ছিলেন ফাইনম্যানের হিরো। ডিরাকের কোয়ান্টাম মেকানিক্স বই তার প্রিয় পদার্থবিজ্ঞান বইগুলোর তালিকার শীর্ষে আছে। ডিরাক তাঁর কোয়ান্টাম মেকানিক্সের বইটা শেষ করেছেন এই বাক্য দিয়ে যে ইলেকট্রনের ডায়নামিক্স পুরোপুরি বোঝার জন্য নতুন ধারণার দরকার। ফাইনম্যান নতুন ধারণার সৃষ্টি করে চলেছেন। তাঁর কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্স প্রতিষ্ঠা পেয়েছে পদার্থবিজ্ঞানের জগতে।

নিউইয়র্ক রাজ্যের ইথাকায় -  যেখানে কর্নেল ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস - আবহাওয়া এত খারাপ - বিশেষ করে শীতকালে তুষারপাত বরফঝড় লেগেই থাকে। তখন বরফঢাকা রাস্তায় চাকায় শিকল না লাগিয়ে গাড়ি চালানো যায় না। ফাইনম্যানের মেজাজ খারাপ হয়ে যায় এরকম আবহাওয়ায় গাড়ি চালিয়ে ক্যাম্পাসে যেতে।

একদিন তাঁর মনে হলো ইচ্ছে করলেই তো তিনি এসব থেকে মুক্তি পেতে পারেন। ওয়েস্ট কোস্টের দিকে কোন ইউনিভার্সিটিতে চলে গেলেই তো হয়। অনেক ভাবলেন ফাইনম্যান।

এমনিতেই তাঁর ভালো লাগছিলো না কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে। কর্নেলে বিজ্ঞানের পাশাপাশি ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য, সমাজতত্ত্ব, মনস্তত্ত্ব ছাড়াও গার্হস্থ্য বিজ্ঞান, হোটেল ম্যানেজমেন্ট এসব বিষয়েও ডিগ্রি দেয়া হয়। এসব সাবজেক্টকে খুব একটা দরকারি সাবজেক্ট বলে মনে করতেন না ফাইনম্যান। তিনি বুঝতে পারতেন না হোটেল ম্যানেজমেন্ট থেকে নতুন কী জিনিস আবিষ্কৃত হয়। তাঁর মনে হতো একটা বিশ্ববিদ্যালয় যদি সব রকমের ডিগ্রি দেয় তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্বতা বলে কিছুই থাকে না।

শুধুমাত্র বিজ্ঞানের ডিগ্রি দেয়া হয় এমন প্রতিষ্ঠান ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি - ক্যালটেক। ক্যালটেকে যোগ দেয়ার জন্য তিনি অফার পেয়েছেন অনেকবার। এবার অফারটা নিয়ে নেবেন ঠিক করলেন। কিন্তু সমস্যা হলো হ্যান্স বেথে। তিনি ফাইনম্যানকে এত পছন্দ করেন  - তাঁকে যদি বলেন যে কর্নেল ছেড়ে চলে যাবেন - তখন কারণ জানতে চাইবেন, বেতন বাড়িয়ে দেবেন ইত্যাদি। সুতরাং ফাইনম্যান ঠিক করলেন আগে থাকতে কাউকে কিছু বলবেন না। ক্যালটেকে একটা সিরিজ অব লেকচার দেয়ার কথা আছে ফাইনম্যানের। তখন দেখবেন কেমন লাগে ক্যালটেকে।

তার আগে নিউইয়র্কের বাজে আবহাওয়া থেকে সাময়িকভাবে হলেও পালাতে চাইছেন। দক্ষিণ আমেরিকায় যাবার ইচ্ছে অনেক দিনের। প্রস্তুতি হিসেবে স্প্যানিশ শিখতে শুরু করেছিলেন।

১৯৪৯ সালের জানুয়ারিতে প্রিন্সটনে একটা সেমিনারে গিয়ে পরিচয় হলো ব্রাজিলের দু'জন প্রফেসরের সাথে। তাঁরা সে সময় জন উইলারের সাথে কাজ করছিলেন। ফাইনম্যানকে তাঁরা আমন্ত্রণ জানালেন ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিও ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে যাওয়ার জন্য। ফাইনম্যান রাজি হলেন।

কর্নেলে ফিরে এসে স্প্যানিশের বদলে পর্তুগিজ শিখতে শুরু করলেন ব্রাজিলের কথা ভেবে।

১৯৪৯ সালের জুলাই মাসে ব্রাজিল গেলেন ফাইনম্যান। ছয় সপ্তাহ ছিলেন সেখানে। ব্রাজিলিয়ান একাডেমি অব সায়েন্সের আমন্ত্রণে বক্তৃতা দিলেন তাঁর কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্স বিষয়ে। ব্রাজিল তাঁর ভালো লেগে গেলো। বিশেষ করে ব্রাজিলের খোলামেলা সংস্কৃতি, উদ্দাম সাম্বা নৃত্য, আর সর্বোপরি ব্রাজিলের সুন্দরী মেয়েদের খুব ভাল লাগলো ফাইনম্যানের।

ব্রাজিল থেকে ফিরে এসে ১৯৫০-৫১ শিক্ষাবর্ষে ক্যালটেকে অস্থায়ীভাবে কাজ করলেন। স্থায়ী পদ নেবেন কিনা ভাবছেন। কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে প্রায় এক বছরের ছুটি পাওনা আছে। ভাবলেন সেই লম্বা ছুটিটা তিনি আবার ব্রাজিলে কাটিয়ে আসবেন।

১৯৫১ সালের আগস্টে আবার ব্রাজিল চলে গেলেন। রিও ডি জেনেরিও ইউনিভার্সিটিতে ছিলেন ১৯৫২ সালের জুন পর্যন্ত। সেই সময় তিনি ব্রাজিলিয়ান স্টুডেন্টদের ফিজিক্স পড়াতে গিয়ে খেয়াল করলেন সবাই এত মনযোগী ক্লাসে - তিনি যা বলেন সবই তারা নোট করতে থাকে, ব্ল্যাকবোর্ডে যা লেখেন তাই তারা টুকে নেয়। কিন্তু যখন তিনি প্রশ্ন করেন - সবাই হুবহু একই রকমের উত্তর দেয়।

ফাইনম্যান দেখলেন সবাই পদার্থবিজ্ঞান মুখস্থ করছে, কিন্তু বিজ্ঞানের মূল যে সুর তা ধরতেই পারছে না কেউ। ফাইনম্যান খেয়াল করলেন ব্রাজিলে স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটিতে হাজার হাজার ছেলেমেয়ে পদার্থবিজ্ঞান পড়ছে - অথচ সারাদেশে উল্লেখ করার মত পদার্থবিজ্ঞানী খুব একটা নেই।

ব্রাজিলের আবহাওয়া আর উদ্দাম সংস্কৃতিতে ভীষণ উদ্দীপ্ত ফাইনম্যান। সুযোগ পেলেই তিনি বংগো ড্রাম বাজাচ্ছেন বিভিন্ন পার্টিতে। ড্রামার হিসেবেও খুব নাম হয়ে গেল ফাইনম্যানের। এক পার্টিতে নাচার সময় একজন ব্রাজিলিয়ান এয়ার-হোস্টেজকে ভাল লেগে গেল ফাইনম্যানের।

এই সুন্দরী এয়ারহোস্টেজকে নিয়ে অনেকবার অনেক জায়গায় বেড়াতে গেছেন ফাইনম্যান। প্রায় মাস ছয়েক ডেটিং এর পর একদিন তারা দুজনে গেছেন মিউজিয়ামে। মিশরীয় সভ্যতার প্রদর্শনীতে গিয়ে ফাইনম্যান সবকিছুর বিস্তারিত বর্ণনা দিতে শুরু করেছেন। হঠাৎ তাঁর মনে হলো ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব সম্পর্কে তিনি এতসব জানলেন কীভাবে?

মনে পড়লো মেরি লুই বেলের কথা। মেরি লুইয়ের কাছেই ফাইনম্যান শিখেছেন মিশরীয় সভ্যতা সম্পর্কে এত সব। হঠাৎ মেরি লুইয়ের জন্য ভালবাসা জেগে উঠলো ফাইনম্যানের মনে।

মেরি লুইয়ের সাথে ফাইনম্যানের পরিচয় কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে। ক্যানসাসের মেয়ে মেরি লুইর শিল্পকলার ইতিহাস সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞান, ব্যাপক ভালবাসা। কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে এসেছিলেন কিছুদিনের জন্য। তখন তিনি মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক। ফাইনম্যানের সাথে তখন বেশ অন্তরঙ্গ সময় কেটেছে মেরি লুইর।

ক্যালটেকে যাবার পর ফাইনম্যান শুনেছিলেন মেরি লুই তখন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া লস এঞ্জেলেসের (ইউ-সি-এল-এ) কাছে ওয়েস্টউডে থাকেন। তখন যোগাযোগ করেননি। এখন মনে হচ্ছে মেরি লুইয়ের সাথে অত ঝগড়াঝাটি না করলেও চলত।

এয়ারহোস্টেজের সাথে ফাইনম্যানের সম্পর্ক কোন পরিণতির দিকে যাচ্ছিল না। ফাইনম্যান একটা স্থায়ী সম্পর্কের কথা ভাবছিলেন। মনে হলো মেরি লুইয়ের সাথে একটা স্থায়ী সম্পর্ক হলে খারাপ হয় না। যদিও মেরি লুইর নাকউঁচা স্বভাব আর কর্তৃত্বপরায়ণতার কারণে প্রায়ই ঝগড়া লেগে যেতো কর্নেলে থাকতে - এখন মনে হচ্ছে একটু মানিয়ে নিলেই হবে।

ফাইনম্যান মেরি লুইকে ব্রাজিল থেকে চিঠি লিখে বিয়ের প্রস্তাব জানালেন। মেরি লুই প্রস্তাবে রাজি হলেন ঠিকই, কিন্তু ফাইনম্যান ব্রাজিল থেকে আমেরিকাতে ফিরে আসার আগেই প্রশ্ন তুললেন অনেক ব্যাপারে যেগুলোর দিকে ফাইনম্যান আগে কখনো নজর দেননি।

যেমন, ফাইনম্যান যেহেতু ক্যালটেকে স্থায়ীভাবে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁর পোশাক-পরিচ্ছদও সেরকম স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী হওয়া উচিত। ফর্মাল পোশাকের ব্যাপারটা ফাইনম্যান কোনদিনই মন থেকে মেনে নেননি। সুট-কোট-টাই পরতে পছন্দ করতেন না তিনি। বাধ্য না হলে তিনি টাই পরতেন না। দরকার ছাড়া নতুন পোশাক কেনার দরকার আছে বলেও তিনি মনে করেন না।

মেরি লুই এ ব্যাপারে ফাইনম্যানের বিপরীত। তিনি মনে করেন একজন অধ্যাপকের অবশ্যই পোশাকে আচার-আচরণে অধ্যাপক-সুলভ ব্যবহার করা উচিত।

নতুন বাসা নিলে সে বাসার নতুন ফার্নিচার কিনতে হবে। সে ফার্নিচারের বাজেট কত সেটা নিয়েও বিয়ের আগেই অনেক ঝগড়া করেন মেরি লুই।

ফাইনম্যান প্রায় সবকিছু মেনে নিয়েই বিয়ে করলেন মেরি লুইকে ব্রাজিল থেকে ফেরার পরপরই ১৯৫২ সালের ২৮ জুন।

ফাইনম্যানের সহকর্মী ও বন্ধুরা সবাই অবাক হয়ে গেলো ফাইনম্যান মেরি লুইকে বিয়ে করাতে। ক্যাম্পাসে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। ফাইনম্যানকে যাঁরা ব্যক্তিগতভাবে চেনেন তাঁরা জানেন ফাইনম্যান সুন্দরী উচ্ছল মেয়েদের সাথে মিশতে ভালবাসেন, কিন্তু যাঁকে বিয়ে করলেন তাঁর সাথে কোন কিছুরই মিল নেই ফাইনম্যানের। চোখে পড়ার মত সৌন্দর্য নেই মেরি লুইর, বয়সেও তিনি ফাইনম্যানের চেয়ে কয়েক মাসের বড়। সবচেয়ে বড় কথা হলো বিজ্ঞানীদের সম্পর্কে মেরি লুইর ধারণা খুবই আপত্তিজনক।

বিয়ের দিন থেকেই মেরি লুই'র কর্তৃত্ব মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো।  বিয়ের পর ফাইনম্যান ও মেরি লুই হানিমুনে গেলেন মেক্সিকো আর গুয়াতেমালায়। কিন্তু একটা ঘন্টাও নির্ঝঞ্ঝাট উপভোগ্য হলো না। সবকিছু নিয়েই ফাইনম্যানের মজা করার প্রবণতা দেখে ভীষণ বিরক্ত মেরি লুই। ফাইনম্যানের কোন কিছুই তাঁর পছন্দ হয় না।

বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই ফাইনম্যান সম্পর্কে অভিযোগের পাহাড় মেরির - "রিচার্ড ষাঁড়ের মত চেঁচায়, কথায় ব্যাকরণ ঠিক থাকে না, লং আইল্যান্ডের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে, পোশাকের কোন ঠিক নেই, প্রফেসর হয়েও কোট-টাই পরে না, জুতায় ময়লা লেগে থাকে, বংগো ড্রাম বাজায়, স্টুডেন্টদের সাথে দূরত্ব বজায় রাখে না" - এরকম অভিযোগের শেষ নেই মেরি লুইর।

শুরুতে কী এক আশ্চর্য কারণে ফাইনম্যান মানিয়ে চলার চেষ্টা করেছেন।

সেই সামারে ব্রাজিল থেকে আবার আমন্ত্রণ পেলেন ফাইনম্যান। এবার সাথে নিয়ে গেলেন মেরি লুইকে। যে ক'দিন মেরি ছিলেন সেখানে ফাইনম্যান সুট-কোট-টাই পরে ইউনিভার্সিটিতে গেলেন। ক'দিন পরে মেরি লুই বলিভিয়ায় চলে গেলে সুট-কোট-টাই ছেড়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন ফাইনম্যান।

মিউয়ন নিয়ে গবেষণা করছিলেন তখন ফাইনম্যান। বেশ কয়েকবার জাপান ভ্রমণ করেছেন কয়েক বছরে। ১৯৫৫ সালে মেরি লুইকেও সাথে নিয়ে গেলেন। জাপানীদের প্রচন্ড আন্তরিক আতিথেয়তাতেও বিরক্ত মেরি লুই।

ফাইনম্যানের দাম্পত্য জীবন অসহনীয় হয়ে পড়ছিল দিনের পর দিন। মেরি লুই উঠতে বসতে বলতে শুরু করেছেন তিনি একজন বুনো লোককে বিয়ে করেছেন। তাঁর মতে ফাইনম্যান একজন পি-এইচ-ডি ডিগ্রিধারী অশিক্ষিত মানুষ।

ক্যালটেকের অন্য পদার্থবিজ্ঞানীদের সাথে ফাইনম্যানের মেলামেশাও পছন্দ করেন না মেরি। তিনি ফাইনম্যানকে বাধ্য করেছেন ক্যাম্পাসের অন্য পদার্থবিজ্ঞানীদের বাসা থেকে দূরে একটা বড় বাংলো ভাড়া করতে।

গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টরা তাদের পার্টিতে ফাইনম্যানকে নিমন্ত্রণ করলে ফাইনম্যান যেতেন সেখানে। বিয়ের পর এরকম একটা পার্টিতে মেরি লুইকে নিয়ে গেলেন ফাইনম্যান। ফাইনম্যান ততদিনে মদ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু তিনি মজা করার জন্য অন্য মাতালদের সাথে মাতালের অভিনয় করতেন। ফলে তাঁকে মাতালদের চেয়েও বেশি মাতাল মনে হত।

সেদিনের পার্টিতে ফাইনম্যানকে ওরকম করতে দেখে মেরি লুই সবার সামনেই গর্জন করতে লাগলেন, "রিচার্ড, স্টপ ইট। লজ্জা করে না একজন প্রফেসর হয়ে এরকম মাতলামি করতে? ছি ছি। স্টপ ইট নাউ!" পার্টি বন্ধ হয়ে গেল। ফাইনম্যানের মত মানুষকে কেউ এরকম অপমান করতে পারে তা ক্যালটেকের কেউ স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি।

ফাইনম্যানের কোন কাজই পছন্দ হয় না মেরির। বংগো ড্রাম বাজালে তার শব্দে মাথা ধরে। বন্ধুদের কাছে অভিযোগ করতে শুরু করেছেন মেরি  - "ফাইনম্যান ঘুম থেকে উঠেই ক্যালকুলাস করতে শুরু করে, গাড়ি চালাতেও ক্যালকুলাস, খেতে বসেও মাথার মধ্যে ক্যালকুলাস, বিছানাতেও ক্যালকুলাস। অসহ্য!"

ফাইনম্যান সবকিছু সহ্য করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু একদিন আর পারলেন না যেদিন নিল্‌স বোরের সাথে তাঁর দেখা হওয়াটা মিস হয়ে গেল মেরির কারণে।

কেউ ফোন করে ফাইনম্যানকে কোন খবর দিতে বললে মেরি লুই প্রায়ই তা ভুলে যেতেন বা ইচ্ছে করেই ভুলে যাবার ভান করতেন। ফাইনম্যানের কাজের কোন গুরুত্বই তিনি দিতেন না।

সেদিন ডিনার করতে বসেছেন ফাইনম্যান ও মেরি লুই। হঠাৎ মেরি লুই বললেন, "ওহ, তোমাকে একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম, এখন মনে পড়েছে। সকালে টমি লরিটসেন ফোন করেছিল। বলেছিল আজ তাদের ওখানে ডিনার করতে। কোন্‌ এক বুড়ো বোয়ার নাকি এসেছে। আমি ভাবলাম কোথাকার বুড়ো এসেছে - তুমি নিশ্চয় যাবে না।"
"বুড়ো বোয়ারের সাথে দেখা করতে বলেছে নাকি নিলস্‌ বোর বলেছে?"
"কী জানি, হয়তো নিল্‌স বোর বলেছে। কী এমন পার্থক্য!"
"কী পার্থক্য! নিল্‌স বোর কে তুমি জানো না?"

না, কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্সের জনক রিচার্ড ফাইনম্যানের স্ত্রী হয়েও মেরি লুই কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অন্যতম জনক নিল্‌স বোরের নাম শোনেননি। ফাইনম্যান কীভাবে তা মেনে নেন?

একদিন ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের সবাই গেছেন পিকনিকে। সমস্ত ফ্যাকাল্টি মেম্বার, রিসার্চ স্টুডেন্ট ও তাদের পরিবার যোগ দিয়েছেন সেখানে। সবাই মিলে খুব হৈ চৈ মজা খেলাধূলা হচ্ছে। এ ধরনের পিকনিকে বরাবরই খুব মজা করেন ফাইনম্যান। বিশেষ করে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের সাথে খেলতে খেলতে নিজেও অনেকটা ছেলেমানুষ হয়ে ওঠেন।

মেরি লুই এসেছেন হাই-হিল আর ধবধবে সাদা শর্টস পরে। তিনি এসেই এমন ভাব করতে শুরু করলেন যেন একদল জংলীর মাঝে এসে পড়েছেন। ক্যাম্প-চেয়ারেও বসছেন না কাপড় নষ্ট হয়ে যাবে বলে। বেশি হাঁটছেন না কারণ পেন্সিল হিল মাটিতে দেবে যাচ্ছে। মেজাজ খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। প্রফেসর মারি গেলমানের স্ত্রী মার্গারেট অনেক আদর আপ্যায়ন করেও মেরিকে বসাতে পারলেন না।

বাচ্চারা ছুটতে ছুটতে কাদা ছোড়াছুড়ি করছিল। একটা বাচ্চা পড়তে পড়তে কাদামাখা হাতে মেরিকে ধরে ফেললো। মেরির ধবধবে সাদা শর্টসে কাদামাখা হাতের ছাপ। এতক্ষণ ধরে তার রাগের আগুন ফুঁসছিল - এবার দপ্‌ করে জ্বলে উঠলো।

মেরি গট্‌ গট্‌ করে ফাইনম্যানের সামনে এসে বললেন, "আর এক মুহূর্ত নয় এখানে। চলে এসো রিচার্ড।" পিকনিকের সবাই থমকে দাঁড়িয়ে গেছে। বুঝতে পারছে না কী ধরনের সিন-ক্রিয়েট হতে চলেছে।
"রিচার্ড, কী বলছি শুনতে পাচ্ছো না?" গলা চড়ছে মেরির। সবাই অপেক্ষা করছে ফাইনম্যান কী করেন দেখার জন্য।
"রিচার্ড, আমি চললাম।"
"তোমার যা খুশি করতে পারো মেরি। আই ডোন্ট কেয়ার।" - ফাইনম্যানের সাদাসিধে উত্তর। মেরি চলে গেলেন।

ফাইনম্যানের গবেষণা ও কাজকর্ম নিয়ে মজার মজার আলোচনা ক্যালটেকের ক্যাম্পাসে নৈমিত্তিক ঘটনা ছিল। সেসব আলোচনায় শ্রদ্ধা ও ভালবাসা মিশে থাকতো। কিন্তু এখন ফাইনম্যান ও মেরির জীবন-যাপন নিয়ে অন্যরকম সব মুখরোচক গল্প তৈরি হতে লাগলো।

রাজনৈতিক মতাদর্শেও বিরাট ফারাক মেরি আর ফাইনম্যানের মধ্যে। মেরি কট্টর ডানপন্থী। মেরির চাপে পড়ে ফাইনম্যানও কিছুদিন রিপাবলিকানদের সাপোর্ট করেছিলেন। কিন্তু যখন ওপেনহাইমারকে কমিউনিস্ট সন্দেহে তারা বিচারের নামে দিনের পর দিন মানসিক অত্যাচার করতে শুরু করলো - ফাইনম্যান আর সহ্য করতে পারেননি। কিন্তু মেরি লুই ওপেনহাইমারের নামে যাচ্ছেতাই আজেবাজে কথা বলতে বলতে ফাইনম্যানের মেজাজ খারাপ করে দিচ্ছিলেন।

১৯৫৪ সালে ফাইনম্যান লিকুইড হিলিয়ামের কোয়ান্টাম মেকানিক্স সংক্রান্ত গবেষণা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চেষ্টা করলেও ভেতরে ভেতরে ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলেন। তিনি চাইছিলেন দূরে কোথাও চলে যেতে। প্রফেসর হ্যান্স বেথেকে লিখলেন কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে আবার ফিরে যাবার কোন সুযোগ আছে  কিনা। যেকোন বেতনেই তিনি কর্নেলে ফিরে যেতে রাজি।

হ্যান্স বেথে তো ভীষণ খুশি ফাইনম্যানের চিঠি পেয়ে। কিন্তু বাস্তবতা হলো সেই মুহূর্তে ফাইনম্যানকে শুধুমাত্র একটা অস্থায়ী পদে নিয়োগ দেয়া সম্ভব। ফাইনম্যান চিন্তা করছিলেন কী করবেন।

এসময় ক্যালটেকে কর্মরত জার্মান জ্যোতির্বিজ্ঞানী ওয়াল্টার বাডে, রসায়নবিদ লাইনাস পাউলিং সহ অনেকের বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ঘটনা ঘটলো ক্যালটেকে যা ক্যালটেকের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিলো অনেকগুণ। ফাইনম্যান বুঝতে পারলেন অচিরেই বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও গবেষণায় ক্যালটেক বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। সুতরাং ক্যালটেক ছেড়ে যাবার কোন মানেই হয় না।

সেবছর নভেম্বরের ২৮ তারিখ শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের নোবেল জয়ী পদার্থবিজ্ঞানী এনরিকো ফার্মি মারা গেলেন। ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে ফার্মির পদে ফাইনম্যানকে নিয়ে যাবার জন্য উঠে-পড়ে লাগলেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স ফ্যাকাল্টির ডিন ওয়াল্টার বার্টকি। ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর মারভিন গোল্ডবার্গারকে সাথে নিয়ে ডিন নিজে চলে এলেন ফাইনম্যানের বাসায়। বললেন ফাইনম্যানের যে কোন শর্ত মেনে নিয়ে তাঁরা ফাইনম্যানকে শিকাগো ইউনিভার্সিটিতে নিয়ে যেতে চান।

ফাইনম্যান বললেন, "ক্যালটেক থেকে চলে যাবার সিদ্ধান্ত আমি বদল করেছি। আমি আর যাচ্ছি না।"
"সিদ্ধান্ত আরেকবার বদলানো যায় না?"
"না, এ ব্যাপারে আমি আর সিদ্ধান্ত নিতে চাই না।"
"আপনাকে আমরা কত বেতন অফার করতে রাজি আছি তা কি জানতে চান?"
"না। প্লিজ, তা উল্লেখ করবেন না। আমার স্ত্রী পাশের রুমে আছে। শুনতে পেলে আমাকে আপনাদের চাকরিটা নেবার জন্য বাধ্য করবে। আমি চাইনা আমার সিদ্ধান্ত বদলাতে। আমি দুঃখিত।"

বিফল হয়ে ফিরে গেলেন বার্টকি ও গোল্ডবার্গার। কিন্তু হাল ছাড়লেন না। পরের সপ্তাহেই ফাইনম্যান একটা চিঠি পেলেন শিকাগো ইউনিভার্সিটির ডিনের অফিস থেকে। চিঠির প্রথম লাইনেই লেখা আছে বেতনের অংক।

অবিশ্বাস্য রকমের বেশি বেতন অফার করছে শিকাগো - ফাইনম্যান ক্যালটেকে যত পান তার চারগুণ। ফাইনম্যান সাথে সাথেই উত্তর লিখে তাঁর অসম্মতির কথা জানালেন। কারণ হিসেবে উল্লেখ করলেন এত বেশি বেতন পেলে তাঁর স্ত্রী হয়তো খুশি হবেন, কিন্তু লোভ আরো বেড়ে যাবে। ফাইনম্যানের জীবন আরো এলোমেলো হয়ে যাবে।

ফাইনম্যান ক্যালটেকে রয়ে গেলেন। কিন্তু মেরি লুইয়ের সাথে তাঁর বিয়েটা আর টিকলো না।  ১৯৫৬ সালে তাঁদের ডিভোর্স হয়ে যায়। বিচ্ছেদ ত্বরান্বিত করার জন্য ফাইনম্যানকে স্বীকারোক্তি দিতে হয় যে তিনি মেরি লুইয়ের প্রতি শারীরিক মানসিক অত্যাচার করেছেন। ডিভোর্সের পরবর্তী তিন বছরে দশ হাজার ডলার খোরপোশ দিতে হয়েছে তাঁকে।

ফাইনম্যানের ইলেকট্রোডায়নামিক ভালোবাসা - ৭ম পর্ব


পথে দু'জন মানুষ হাত দেখালে ফাইনম্যান গাড়িতে তুলে নেয় তাদের। প্রতি সপ্তাহেই তো সে অন্যের গাড়িতে যায়আর পথে গাড়ির কিছু হলে তারা সাহায্যও করতে পারবে। সান্টা ফে-র কাছে যেতেই গাড়ির একটা চাকা পাংকচার হয়ে গেলোসঙ্গী দুজনের সাহায্যে চাকাটা বদলে আবার দ্রুত ছুটল
            
কিছুদূর যেতেই আরেকটা চাকা ফেটে গেলো সশব্দে। কাছেই একটা পেট্রোল স্টেশন ছিলো। মেকানিকরা আগের একটা গাড়ি মেরামত করছিল। ফাইনম্যান চুপচাপ অপেক্ষা করছিল কখন তার গাড়িটা ঠিক করার সময় হবে মেকানিকদের। কিন্তু ফাইনম্যানের গাড়ি-সঙ্গীরা এতক্ষণে জেনে গেছে ফাইনম্যানের স্ত্রীর কথা। তারা ওয়ার্কম্যানকে গিয়ে বললো যে তার কত দ্রুত যাওয়া দরকার। তারা দ্রুত এসে তার গাড়ির চাকা বদলে দিলো। পাংকচার হয়ে যাওয়া চাকাটা রেখেই তারা ছুটলো। ওটার জন্য অপেক্ষা করতে গেলে সময় নষ্ট হবে।
            
ফাইনম্যান এমন হতভম্ব হয়ে গেছে যে মেকানিককে একটা ধন্যবাদ জানাতেও ভুলে গেছেহাসপাতাল থেকে মাত্র ত্রিশ মাইল দূরে এসে গাড়ির আরেকটা চাকার হাওয়া চলে গেল। এখন আর করার কিছু নেই। গাড়িটাকে ওখানেই রেখে তারা অন্য গাড়িকে হাত দেখালটেলিফোন বুথ থেকে একটা ওয়ার্কশপে ফোন করে জানালো অবস্থা। তারা যেন এসে গাড়িটা ওয়ার্কশপে নিয়ে যায়।
            
হাসপাতালে ঢুকতেই আরলিনের বাবার সাথে দেখা হলো। তিনি তিন দিন ধরে আছেন এখানে। আরলিনের শেষ অবস্থা। তিনি আর সহ্য করতে পারছিলেন না। ফাইনম্যানকে কোনরকমে বললেন, "আমি আর সহ্য করতে পারছি না মেয়েটার কষ্ট। আমি চলে যাচ্ছি।"
            
শেষবারের মত আরলিনকে দেখল ফাইনম্যান। ভীষণ দুর্বল, কেমন যেন ফ্যাকাশে সাদা। পৃথিবীর কোন কিছু সম্পর্কে যেন তার কোন অনুভূতি নেই। বিছানায় শুয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ছাদের দিকে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। হা করে শ্বাস নিচ্ছে। বাতাস গিলতে চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। গলায় গব্‌ গব্‌ শব্দ হচ্ছে। মাঝে মাঝে চোখ দুটো উল্টে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে। এভাবে ঘন্টা দুয়েক চেষ্টার পর আরলিন আর পারলো না।
            
আরলিনের কেবিন থেকে বেরিয়ে হাসপাতালের লনে কিছুক্ষণ অস্থির ভাবে হাঁটাহাঁটি করল ফাইনম্যান। তার খুব আশ্চর্য লাগছিলো। মৃত্যু সম্পর্কে, আপনজনের মৃত্যু ঘটলে আপনজনের অনুভূতি সম্পর্কে তার যে ধারণা ছিলো তার বেলায় তার কিছুই ঘটলো না। খারাপ লাগছিলো ঠিকই কিন্তু তা ভীষণ মারাত্মক রকমের ছিলো না। হয়তো তারা আগে থেকেই ব্যাপারটা জানত বা মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল বলেই হয়তো
            
ফাইনম্যানের কেমন লাগছিলো বোঝানো মুশকিল। সে ভাবছিল - "আমরা মানুষেরা জানি বাঁচবো বড় জোর সত্তর কি আশি বছর। মরতে তো হবেই। তবুও আমরা হাসি, আনন্দ করি, ভালবাসি। আমরা বেঁচে থাকি। অনেকে হয়তো ভালবেসে একসাথে পঞ্চাশ বছর বেঁচে থাকে। আমি আর আরলিন না হয় মাত্র পাঁচ বছর একসাথে বাঁচলাম। এতে গাণিতিক পার্থক্যটা ছাড়া মানসিকভাবে আর তো কোন পার্থক্য নেই। আমরা পরস্পরকে জড়িয়ে এই ক'টা বছর তো অত্যন্ত ভালো সময় কাটিয়েছি।"
            
আবার আরলিনের কেবিনে এলো ফাইনম্যানআরলিনের শেষ সময়টা আবার মনে করতে চাইল। বুঝতে চাইল তার শেষ শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনটা। আরলিনের ফুসফুস ঠিকমত অক্সিজেন নিতে পারছিল না। রক্তে ঠিকমত অক্সিজেনের জোগান না থাকাতে মস্তিষ্ক কাজ করছিল না। হৃৎপিন্ড দুর্বল হয়ে যাচ্ছিলো - তখন শ্বাস নেয়া আরো কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছিল। আরলিন খুব আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে পড়েছিলো এবং কোন এক সময় তার শেষ নিঃশ্বাসটা বের হয়ে যাবার পর তার ফুসফুস আর কোন বাতাস টেনে নিতে পারেনি ভেতরে।
            
আরলিনের নার্স এসে নিশ্চিত হয়ে গেলো যে আরলিন মারা গেছে। ফাইনম্যানের দিকে তাকিয়ে দেখলো একটু, তারপর রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।
            
ফাইনম্যান কিছুক্ষণ চুপ করে বসেছিল। তারপর উঠে আরলিনের ঠোঁটে একটা চুমু খেল, শেষ চুম্বন।
            
আরলিনের চুলের গন্ধ ঠিক আগের মতই আছে, মিষ্টি। হঠাৎ আশ্চর্য হয়ে গেল ফাইনম্যান। মনে হলো আরলিন মরেনি। কিন্তু পর মুহূর্তেই বুঝতে পারলো মৃত্যুর এত কম সময়ের মধ্যে চুলের গন্ধ পরিবর্তন হওয়া তো সম্ভব নয়। টেবিল ঘড়িটার দিকে চোখ গেলে চমকে উঠলো সে। ঘড়িটা বন্ধ হয়ে আছে নয়টা একুশ মিনিটে। আরলিনের মৃত্যুর পরপরই ঘড়িটা বন্ধ হয়ে গেছে! এটা কি অলৌকিক কোন কিছু?
            
ফাইনম্যান দেখলো এত শোকেও তার যুক্তির মৃত্যু ঘটেনি। ঘড়িটা অনেক দিন থেকেই গোলমাল করছিল। ফাইনম্যান নিজেই বেশ কয়েকবার ওটা ঠিক করেছে। এখন আরলিনের মৃত্যুর পর নার্স যখন কেবিনে এসেছিল মৃত্যুর সময় লেখার জন্য ঘড়িটা হাতে নিয়ে দেখছিল। সে সময় হয়তো বন্ধ হয়ে গেছে পুরনো ঘড়িটা।
            
পরদিন আরলিনের  শেষকৃত্য। মৃতদেহ সৎকার করে যে কোম্পানি তাদের লোকজন এসে আরলিনের কয়েকটি আংটি দিয়ে গেল ফাইনম্যানকেএকজন জিজ্ঞেস করলো সে আরলিনকে আবার দেখতে চায় কিনা।
       
ফাইনম্যান বললো, "না, আমি দেখেছি তাকে গতকাল।"
            
গাড়ির ওয়ার্কশপে ফোন করল ফাইনম্যানআগের দিন তারা গাড়িটি রাস্তা থেকে তুলে এনে মেরামত করে রেখেছে। গাড়িটি ওয়ার্কশপ থেকে নিয়ে এসে আরলিনের জিনিসপত্র যা ছিল গাড়ির বুটে চাপিয়ে রওনা দিল লস আলামোসের দিকে। এবারো একজন মানুষকে তুলে নিল রাস্তা থেকে।
            
হাসপাতাল থেকে পাঁচ মাইলও যায়নি - ফটাস্‌স্‌সসসস্‌। গাড়ির অবশিষ্ট চাকা যেটা গতকাল রক্ষা পেয়েছিল সেটা পাংকচার। ফাইনম্যান এমন জোরে চিৎকার করে উঠল যে তার সহযাত্রী তার দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছিলো যেন সে মানসিকভাবে অপ্রকৃতিস্থ।
            "এটা তো সামান্য একটা টায়ার, ম্যান"
            "হ্যাঁ এখন একটা, একটু পরে আরেকটা, তারপরে আরেকটা" - গলায় প্রচন্ড ক্ষোভ ফাইনম্যানের।
            
কোনরকমে চাকাটা বদলে খুব আস্তে আস্তে গাড়ি চালিয়ে লস আলামোসে ফিরলো ফাইনম্যান।
           
সে চাচ্ছিল না তাকে কেউ আরলিনের কথা জিজ্ঞেস করুক বা সান্ত্বনা বাক্য শোনাক।  কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলেই সে খুব সহজভাবে বলছে, "আরলিন মারা গেছে। তা তোমার প্রজেক্টের কাজ কতদূর? ফর্মুলাটা দেখেছিলে?"
            
সবাই বুঝতে পারলো তার আঘাতটা কত গুরুতর। ফাইনম্যান যন্ত্রের মত তার নোটবই বের করলো যেখানে আরলিনের মেডিকেল কন্ডিশান লিখে রাখতো। লিখলো - ১৬ জুন, ১৯৪৫, আরলিনের মৃত্যু হয়েছে।
            
১৯৪২ সালের ২৯ জুন বিয়ে হয়েছিল তাদের। আরলিনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হলো তাদের তিন বছরের অনন্য বিবাহিত জীবন।
            
লস আলামোসে খুব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে ফাইনম্যান। কিন্তু অস্বাভাবিকভাবে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টাটা না বোঝার মত যান্ত্রিক নন ম্যানহাটান প্রজেক্টের বিজ্ঞানীরা। হ্যান্স বেথে জোর করে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন ফাইনম্যানকে।      
            
আরলিনকে বিয়ের পর একদিনের জন্যও বাড়ি যায়নি ফাইনম্যান। মা-বাবা আরলিনের সাথে তার বিয়েটা সহজভাবে মেনে নেননি বলে ফাইনম্যানের অভিমান ছিল ভীষণ। এবার আরলিনের মৃত্যুর পর বাড়িতে যেতে হলেও বেশির ভাগ সময় সে দূরে দূরে থাকলো বাড়ির সবার কাছ থেকে। বন্ধুদের সাথে জোর করে হৈ চৈ করে সময় কাটালো।
            
ক'দিন পরেই ফাইনম্যানকে ফিরতে হলো লস আলামোসে। প্রথম পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটানোর তারিখ ঠিক হয়ে গেছে। ১৬ জুলাই ১৯৪৫ ইতিহাস সৃষ্টি হলো পৃথিবীতে। সর্বপ্রথম পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হলো - যার নাম দেয়া হলো প্রথম ট্রিনিটি টেস্ট।
            
আরিজোনার মরুভূমির গ্রাউন্ড জিরো থেকে বিশ মাইল দূরে একটা ট্রাকের ভেতর বসে ফাইনম্যান দেখলো গত কয়েক বছরের মেধা, গবেষণা ও প্রচন্ড পরিশ্রমে যে পারমাণবিক দানব তারা তৈরি করেছে কী প্রচন্ড শক্তি তার।
            
কয়েক সপ্তাহ পরেই আগস্টের ছয় ও নয় তারিখে জাপানের হিরোশিমা ও নাকাসাকি শহর সমস্ত নাগরিক সহ ধ্বংস করে দেয়া হলো পারমাণবিক বোমা ফেলে
            
বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলো। কিন্তু সারা বিশ্বের উপর রেখে গেল একটি বিরাট পারমাণবিক কলঙ্কের ছাপ। সেই কলঙ্ক তৈরির দায় এড়াতে পারে না ফাইনম্যান।
            
আরলিনের মৃত্যু এবং তার পরপর এতগুলো ঘটনা ফাইনম্যানকে উদাসীন করে তোলে। তার কেবলই মনে হচ্ছে কী দরকার এসব নগর সভ্যতার। এক মুহূর্তের মধ্যে সব ধ্বংস করে দেবার ক্ষমতা মানুষ একবার যখন অর্জন করে ফেলেছে, সেই দানবীয় ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটাবে সে সুযোগ পেলেই। 
            
এক রাতে আরলিনকে স্বপ্ন দেখলো ফাইনম্যান। দেখলো আরলিন এসেছে তার কাছে। ফাইনম্যান স্বপ্নে তাকে বললো, "তুমি মরে গেছো আরলিন। স্বপ্নেও তোমার আসা ঠিক নয়।"
            
পরের রাতে আবার স্বপ্ন। এবার সে বললো - "আমি আসলে তোমার উপর বিরক্ত হয়েছিলাম। এখন আবার তোমাকে পছন্দ করতে শুরু করেছি। আমি ফিরে এসেছি।"
            
মাথা কাজ করছিলো না ফাইনম্যানেরএই স্বপ্ন দেখার কারণ কী? মাথার ভেতর আরলিন থাকবে কেন? কেন সে স্বপ্নে আসা যাওয়া করবে? নিশ্চয়ই সে অবচেতন মনে কিছু একটা করেছে। ভাবতে থাকে ফাইনম্যান।
            
আরলিনের মৃত্যুর পর এক মাস কেটে গেছে, কান্না আসেনি একবারও। কিন্তু সেদিন ওক রিজের রাস্তায় একটা ডিপার্টমেন্ট স্টোরের পাশ দিয়ে যাবার সময় ফাইনম্যানের চোখে পড়লো চমৎকার একটি ড্রেস, শো- কেসে সাজানো। হঠাৎ মনে হলো আরলিন খুব পছন্দ করতো এটাখুব আটপৌরে ভাবনা। কিন্তু ফাইনম্যানের চোখ দিয়ে পানি গড়াতে লাগলো। আরলিনের মৃত্যুতে ফাইনম্যান কাঁদলো, প্রথম এবং শেষবার।
            
কাজে ডুবে থাকতে চাইলেন ফাইনম্যান। লস আলামোসের ল্যাবে কাজ করার সময়েই ফাইনম্যানের বৈজ্ঞানিক ক্ষমতায় মুগ্ধ সবাই। তত্ত্বীয় বিভাগের প্রধান হ্যান্স বেথে ফাইনম্যানকে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পদে চাকরি দিয়েছেন। ১৯৪৪ সালের অক্টোবর থেকেই রিচার্ড ফাইনম্যান অফিসিয়ালি জয়েন করেছেন কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে। ম্যানহাটান প্রজেক্টের কাজ চালিয়ে যাবার জন্য যোগদানের পর থেকেই ছুটি মঞ্জুর করা হয়েছে তাঁর। ফাইনম্যান এবার কাজে যোগ দিলেন ১৯৪৫ সালের ৩১ অক্টোবর।
            
বিশ্বযুদ্ধের পরে অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসছেন তাঁদের অসমাপ্ত পড়াশোনা শেষ করার জন্য। তাই ক্যাম্পাসে বিভিন্ন বয়সী শিক্ষার্থীর সমাবেশ। ছাব্বিশ বছর বয়সী অধ্যাপক ফাইনম্যানকে দেখতে আরো কমবয়সী মনে হয়। ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র বলে চালিয়ে দেয়া যায় সহজেই।
            
ফাইনম্যান উপভোগ করতে চাইলেন তাঁর নতুন চাকরি। ফ্যাকাল্টি ক্লাবে লাঞ্চ করতে না গিয়ে লাঞ্চ করেন ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে মিশে। স্টুডেন্ট সেন্টারে গিয়ে মেয়েদের সাথে বিশেষ করে সুন্দরী মেয়েদের সাথে আড্ডা মারতে বেশ ভালোই লাগছে ফাইনম্যানের। মেয়েরাও সহজে আকৃষ্ট হচ্ছে ফাইনম্যানের ক্যারিশমার কাছে।
            
ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে ছাত্রী নেই বললেই চলে। ফাইনম্যান যেসব ছাত্রীর সাথে মেশেন তারা সবাই নন-সায়েন্স স্টুডেন্ট। কেউই তাঁকে সেভাবে চেনে না। ফাইনম্যান খেয়াল করলেন তিনি যখন সত্যি কথা বলেন মেয়েদের কেউ তা বিশ্বাস করে না বা করতে চায় না। তারা জানতে চায় -
            "রিচার্ড, তুমি আসলে কী করো?"
            "আমি ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর"
            "এটম বোমা সম্পর্কে কিছু জানো?"
            "জানবো না কেন? আমরাই তো বানালাম।"
            "মানে?"
            "মানে আমি তো ম্যানহাটান প্রজেক্টে কাজ করেছি। আমি ছিলাম কম্পিউটিং ডিপার্টমেন্টের হেড।"
            "তুমি কি ট্রিনিটি টেস্টের সময় ছিলে সেখানে?"
            "অবশ্যই। আমি ছিলাম গ্রাউন্ড জিরো থেকে ২০ মাইল দূরে।"
            "বিস্ফোরণ দেখেছো?"
            "আমার মত করে আর কেউ দেখেনি। যারা দেখেছে তারা সবাই চোখে কালো চশমা পরে দেখেছে। মনে হয় একমাত্র আমিই দেখেছি খালি চোখে। একটা ট্রাকের ভেতর বসে ট্রাকের জানালার কাচের ভেতর দিয়ে। কারণ আমি জানতাম যে বিস্ফোরণের পর ২০ মাইল পর্যন্ত যা আসতে পারে তা আলট্রাভায়োলেট - যার বেশির ভাগ শক্তি সাধারণ কাচেই আটকে যাবে।"
            "রিচার্ড, তোমার মত এত বড় মিথ্যুক আমি জীবনে দেখিনি।"
            
ফাইনম্যান ভেবে পান না কেন কেউ তাঁর সত্যি কথা বিশ্বাস করতে চায় না। ক'দিন পরপরই তাঁর মেয়েসঙ্গী বদলে যাচ্ছে। শান্তি পাচ্ছেন না তিনি কোথাও।
            
এক বছর পরেই ১৯৪৬ সালের ৭ অক্টোবর ফাইনম্যানের বাবা মারা যান। ফাইনম্যান আরো বিষন্ন হয়ে পড়েন। মনের মেঘ কাটানোর জন্য তাঁর সঙ্গী হয়ে পড়ে আরো বেশি পদার্থবিজ্ঞান। আর আরলিনের অভাব ঘোচাতে আরো বেশি নারীসঙ্গ।
            
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সাফল্য আসতে শুরু করলেও আরলিনের অভাব-জনিত বিষন্নতা কাটছে না কিছুতেই। এসময় কর্নেল ইউনিভার্সিটির অনেক সুন্দরী মেয়ের সাথেই ঘনিষ্ঠভাবে মিশেছেন ফাইনম্যান কিন্তু কারো সাথে দু'দিন মেশার পরেই মনে হয় আরলিনের মত তো নয় মেয়েটি। জোর করে আরো কিছুদূর এগোনোর পরে মনে হয় আরলিন এসে দাঁড়িয়েছে পথজুড়ে।          



ফাইনম্যানের ইলেকট্রোডায়নামিক ভালোবাসা - ৬ষ্ঠ পর্ব



উইকএন্ডে ছুটি থাকে ফাইনম্যানেরআরলিনকে দেখতে যাবার সময় পায় তখন। শনিবার সকালবেলা আলবুকারকির পথে কোন গাড়িকে হাত দেখিয়ে লিফ্‌ট নেয়। বিকেলটা আরলিনের সাথে কাটায়। রাতটা কাটায় আলবুকারকির কোন হোটেলে। রোববার সকালে আবার আরলিনকে দেখে বিকেলে অন্য কারো গাড়িতে চেপে ফিরে আসে লস আলামোসে।
            
প্রতি সপ্তাহে আরলিনের চিঠি পায় ফাইনম্যানবেশ মজা করে চিঠি লেখে আরলিন
            
একবার একটা পুরনো ওয়ার্ড-পাজল দু'টুকরো করে একটা এনভেলাপে ঢুকিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে ফাইনম্যানকে। ফাইনম্যান দেখলো চিঠিটার সাথে প্রজেক্টের মিলিটারি সিকিউরিটি অফিসারের নোট - "দয়া করে আপনার স্ত্রীকে বলবেন এখানে ধাঁধার খেলা খেলার সময় আমাদের নেই।"
            
পারমাণবিক বোমা প্রকল্পের পুরো নিরাপত্তা মিলিটারিদের হাতে। তারা সব চিঠিই সেন্সর করে। আরলিনের পাজলগুলো পেয়ে আর্মি অফিসারদের ঘাম বেরিয়ে গেছে তার অর্থ বের করতে। শত্রুপক্ষের কোন গোপন সংকেত যে নয় তা প্রমাণ করতে অনেক সময় লেগেছে তাদের। তাই অফিসিয়াল সতর্ক-বার্তা।
            
ফাইনম্যান পছন্দ করে প্র্যাকটিক্যাল জোক্‌স। মিলিটারিদের বুদ্ধির মাত্রা সম্পর্কে তার খুব একটা শ্রদ্ধা নেই। তাই সে আরলিনকে কিছুই বললো না এ ব্যাপারে।
            
আরলিনের এরকম পাগলামী চলতে থাকলো। ফাইনম্যানের ভালো লাগে তা, যদিও সেজন্য মাঝে মাঝে তাকে অপ্রস্তুত হতে হয়।
            
একদিন মে মাসের শুরুতে হঠাৎ দেখা গেলো লস আলামোসে ফাইনম্যানের অফিসের প্রত্যেকের মেইলবক্সেই একটা করে সংবাদপত্র চলে এসেছে। শত শত নিউজপেপার। অথচ কেউ পত্রিকার গ্রাহক নয়।
            
পত্রিকায় বিশাল হেডিং "সারা জাতি যথাযোগ্য মর্যাদায় ফাইনম্যানের জন্মদিন পালন করছে"। আলবুকারকির স্থানীয় প্রেস থেকে পত্রিকার মত করে কাগজগুলো ছাপিয়ে আনিয়েছে সে ফাইনম্যানের জন্মদিনের উপহার হিসেবে।
            
আরলিন সারা পৃথিবীর সাথে খেলতে শুরু করেছে। সারাদিন হাসপাতালে শুয়ে সে আর করবেই বা কী। মাঝে মাঝে ম্যাগাজিনের পাতা ওল্টায়। আর রাজ্যের যত আইডিয়া মাথায় ভর করে, আর ফাইনম্যানকে লেখে।
            
একদিন ফাইনম্যানকে পাঠালো রান্নার সামগ্রীর এক বিশাল ক্যাটালগ। যে বস্তুগুলো লাগে বিশাল বিশাল রান্নাঘরে - জেলখানায় বা মিলিটারি ব্যারাকে যেখানে হাজার হাজার মানুষের রান্না হয় এক সাথে।
            
এই ক্যাটালগ দিয়ে ফাইনম্যান কী করবে বুঝতে পারছিল না। বিশাল বিশাল ডেকচি-পাতিল দিয়ে কী করবে আরলিন?
            
এর আগেও একবার এরকম করেছিল আরলিনএম-আই-টিতে পড়ার সময়। তখন পাঠিয়েছিল বিশাল যুদ্ধজাহাজের ক্যাটালগ। ফাইনম্যান জানতে চেয়েছিল, "জাহাজের ব্যাপারটা কী?"
            "আমি ভাবছিলাম আমরা বিয়ের পর এরকম একটা জাহাজ কিনবো।"
            "তুমি কি পাগল হয়েছো? জাহাজের দাম জানো?"
            
উত্তরে অন্য একটা ক্যাটালগ এসে পৌঁছালো। এটা একটা লম্বা নৌকা - তিরিশ-চল্লিশ জন মানুষের জন্য, ধনীলোকের প্রমোদতরী।
            
আরলিন লিখেছে, "জাহাজ কিনতে না পারলেও এরকম একটা নৌকা আমরা সম্ভবত কিনতে পারি।"
            "দেখো তুমি আমাদের সামর্থ্যের বাইরে চিন্তা করছো।"
            
খুব শীঘ্র আরেকটা ক্যাটালগ হাজির। বিভিন্ন রকম ইঞ্জিন চালিত ছোট্ট নৌকা এবং এটা সেটা।
            ফাইনম্যান লিখলো - "এগুলোর দামও কিন্তু অনেক বেশি আরলিন।"
            
এবার এলো ছোট্ট একটা চিরকূট। আরলিন লিখেছে - "তুমি সব সময় 'না' বলছো রিচার্ড। এটা কিন্তু তোমার শেষ সুযোগ।"
            
শেষ সুযোগটা হলো আরলিনের এক বান্ধবীর একটা দাঁড়টানা নৌকা আছে। সে ওটা বিক্রি করবে। দাম পনের ডলার। পুরনো হলেও এখনো সচল। সামারে হয়তো তারা ওটা নিয়ে একটু নৌকাভ্রমণও করতে পারবে। ফাইনম্যানকে নৌকাটা কিনতে হয়েছিল।
            
এখন এই রান্নাঘরের জিনিসপত্রের আইডিয়াটা আরলিনের মাথায় কেন এলো তা নিয়ে ভাবছে ফাইনম্যানএরমধ্যেই দ্বিতীয় ক্যাটালগ উপস্থিত। এটা একটা হোটেলের রেস্টুরেন্টের ক্যাটালগ। এর কয়েকদিন পরে যে ক্যাটালগটা এলো তা হলো একটা নতুন সংসারের রান্নাঘরের জিনিসপত্রের ফর্দ।
            
পরের শনিবারে আরলিনকে দেখতে যখন হাসপাতালে গেল তখন ফাইনম্যান বুঝল আসল ব্যাপারটা কী। আরলিনের রুমে ছোট্ট একটা কয়লার চুলা এসেছে। আঠারো ইঞ্চির মত চওড়া। আরলিন চুলাটা কিনেছে। খুব উৎসাহ নিয়ে বললো সে, "আমি ভাবলাম আমরা ওটাতে রাঁধতে পারবো।"
            "এখানে? পাগল হয়েছো? কয়লার ধোঁয়া কী জিনিস জানো?"
            "আরে না। এই রুমের ভেতর না। আসলে কী করতে হবে জানো - চুলাটা নিয়ে আমরা সামনের লনে চলে যাবো। প্রত্যেক রবিবার তুমি বাইরে বসে রান্না করবে।"
            
হাসপাতালটি একদম রাস্তার পাশে। আমেরিকার ইন্টার-স্টেট হাইওয়ে রোড সিক্সটি সিক্স চলে গেছে হাসপাতালের সামনে দিয়ে। ফাইনম্যান বললো, "অসম্ভব। আমি পারবো না। রাজ্যের যত ট্রাক গাড়ি দিনরাত চলছে রাস্তায়। লোকজন লনের পাশ দিয়ে সারাক্ষণ আসা যাওয়া করছে। আর আমি সেখানে বসে তোমার জন্য মাংস ভাজবো না? লোকে কী ভাববে বলো?"
            "what do you care what other people think?"
            
ফাইনম্যানের কথা দিয়ে ফাইনম্যানকে খোঁচা দেয় আরলিনএকটা ড্রয়ার খুলতে খুলতে বললো, "ঠিক আছে, তোমাকে এই শেফের টুপি পরতে হবে না। আর গ্লাভসও পরতে হবে না।"
            
আরলিনের হাতে পুরোদস্তুর হোটেলের শেফের ইউনিফর্ম।
            "দেখো তো এই এপ্রোনটা তোমাকে কেমন মানায়?"
            ফাইনম্যান দেখলো এপ্রোনের গায়ে লেখা আছে - বারবিকিউ কিং।
            
আতঙ্কিত গলায় ফাইনম্যান বললো, "ঠিক আছে, ঠিক আছে, এসব লাগবে না। আমি লনে বসে রাঁধবো।"
            
এরপর থেকে প্রত্যেক শনিবার বা রবিবার রাজপথের ধারে ধোঁয়া ছড়াতে ছড়াতে রাঁধতে লাগল ফাইনম্যান।
            
ক্রিস্টমাস কার্ড পাঠাবার সময় হয়ে এসেছে ফাইনম্যানের লস আলামোসে আসার কয়েক সপ্তাহ পরেই। আরলিন লিখলো - "চলো আমরা সবাইকে ক্রিস্টমাস কার্ড পাঠাই। আমি কার্ড রেডি করে রেখেছি।"
            
ফাইনম্যান দেখলো কার্ডগুলো খুবই সুন্দর। কিন্তু তাতে লেখা আছে - 'মেরি ক্রিস্টমাস ফ্রম রিচার্ড এন্ড পুটসি'।
            
"এগুলো সবাইকে পাঠানো যাবে না। আমি এনরিকো ফার্মি বা হ্যান্স বেথেকে এগুলো পাঠাতে পারবো না। তাদেরকে আমি এখনো এত বেশি চিনি না যে ডাকনামে কার্ড পাঠানো যায়। তাঁরা এগুলো পেলে কী বলবেন আমাকে?"
            "what do you care what other people think?"
            
সুতরাং ঐ কার্ডগুলোই পাঠানো হলো।
            
পরের বছর ক্রিস্টমাস আসছে। এর মধ্যে এনরিকো ফার্মি আর হ্যান্স বেথের সাথে ফাইনম্যানের ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। তাঁদের বাসায় যায় ফাইনম্যান। তাঁদের ছেলেমেয়েদের সাথেও তার দারুণ বন্ধুত্ব।
            
এবারের ক্রিস্টমাস কার্ডে আরলিন লিখেছে অত্যন্ত ফর্মাল ভঙ্গিতে - 'মেরি ক্রিস্টমাস এন্ড হ্যাপি নিউ ইয়ার ফ্রম রিচার্ড এন্ড আরলিন ফাইনম্যান'।
            "চমৎকার হয়েছে। এগুলো আমরা সবাইকে পাঠাতে পারবো" -বললো ফাইনম্যান।
            "আরে না না" - প্রতিবাদ করলো আরলিন, "ওগুলো সবার জন্য নয়। ফার্মি বা বেথের মত বিখ্যাত যারা আছেন তাদের জন্য অন্যরকম কার্ড।"
            
বিখ্যাত ব্যক্তিদের কার্ডে ফর্মাল কথাবার্তার পরে লেখা আছে - "ফ্রম ডক্টর এন্ড মিসেস আর পি ফাইনম্যান
            
সুতরাং বিখ্যাত ব্যক্তিরা পেলেন সেগুলো। ফাইনম্যানের কাছ থেকে এরকম ফর্মাল কার্ড পেয়ে তাঁরা তো অবাক। এনরিকো ফার্মি ফাইনম্যানকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, "এসমস্ত ফর্মালিটি কখন থেকে শুরু হলো ডিক?"
            
আরলিন শুধু এরকম মজা করেই ব্যস্ত থাকতো না। ইতোমধ্যে সে 'সাউন্ড এন্ড সিম্বল ইন চায়নিজ' নামে একটা বড় বই জোগাড় করেছে। বইটা খুব চমৎকার। প্রায় পঞ্চাশ রকমের চায়নিজ চিহ্নের ক্যালিগ্রাফি করা আছে উদাহরণ ও ব্যাখ্যা সহ।
            
আরলিন বইটা থেকে ক্যালিগ্রাফি করতে শুরু করলো। কাগজ ব্রাশ কালি সব জোগাড় করেছে। এমন কি একটা চায়নিজ টু ইংলিশ ডিকশনারিও কিনেছে।
            
এক শনিবারে ফাইনম্যান এসে দেখে আরলিন ক্যালিগ্রাফি প্র্যাকটিস করছে। কাগজে গভীর মনযোগে একটা একটা চিহ্ন ফুটিয়ে তুলছে। আবার আপন মনেই বলছে - 'না ঠিক হয়নি, হচ্ছেনা, ভুল হয়েছে' ইত্যাদি।
            
এতক্ষণ চুপ করে দেখছিল ফাইনম্যানআরলিনের কথা শুনে বললো, "ভুল হয়েছে বলতে কী বোঝাচ্ছ? এটা তো মানুষের তৈরি কিছু চিহ্ন। জাস্ট ভাব বিনিময়ের কিছু ভাষা। ঠিক এভাবেই চিহ্নটা প্রকাশ করতে হবে এমন কোন নিয়ম কি আছে প্রকৃতিতে? তোমার যেমন খুশি তেমন চিহ্ন দিয়েই তো তুমি ভাবটা প্রকাশ করতে পারো।"

           "সব কিছুর একটা শৈল্পিক দিক থাকে রিচার্ডআমি ভুল বলতে বোঝাতে চাচ্ছি শিল্পমান সম্মত হয়নি। ক্যানভাসে ব্যালান্সিং বলে একটা ব্যাপার আছে। শুধু শুদ্ধ হলেই চলে না। দেখতে কেমন লাগছে তাও দেখতে হয়।"

           "কিন্তু যেকোন ভাবেই হোক, হয়েছে তো চিহ্নটা। এটা হয়তো অন্যরকম সুন্দর।"
            
আরলিন  ফাইনম্যানের হাতে তুলি ধরিয়ে দিয়ে বললো, "এই নাও, নিজে করে দেখাও একটা। তারপর কথা বলো আর্ট সম্পর্কে।"
           
আর কী করা। বই দেখে দেখে একটা চিহ্ন আঁকলো ফাইনম্যান। কিন্তু মনে হলো ঠিক হয়নি। বললো, দাঁড়াও এক মিনিট। আরেকটা করতে দাও। এটা একটু মোটা দাগের হয়েছে। মানে সামান্য হিজিবিজি।'ভুল হয়েছ' বলতে গিয়েও নিজেকে সামলে নেয় ফাইনম্যান।
            "তুমি কীভাবে জানো যে এটা হিজিবিজি হয়েছে? কতটুকু হিজিবিজি হওয়া দরকার তা কি তুমি জানো?
            
আরলিনের কাছে ফাইনম্যান শিখলো আর্টের বিভিন্ন দিক। আসলে আর্ট একটা আশ্চর্য জিনিস। কোন কিছুর ঠিক নিয়ম নেই, আবার আছেও। এটা গণিত নয়, আবার কোথাও যেন সূক্ষ্ম একটা গাণিতিক মাত্রা আছে। আর্টের প্রতি গভীর ভালোবাসা না থাকলে তা বোঝা যায় না। ফাইনম্যান ক্যালিগ্রাফির প্রতি আকর্ষণ অনুভব করলো।
            
আরলিনের কাছ থেকে ফাইনম্যান এমন অনেক কিছুই শিখেছে তা তার ভাষায় ঠিক বিজ্ঞান নয়, কিন্তু আকর্ষণীয়। ফাইনম্যান পরবর্তী জীবনে অনেকবার স্বীকার করেছে যে আরলিন তার ভেতর মানবিক গুণাবলী বাড়িয়ে দিয়েছে।
             
আরলিনের অবস্থা খারাপ থেকে খারাপ হচ্ছে দিনের পর দিন। আরলিনের বাবা নিউইয়র্ক থেকে এসেছেন আরলিনকে দেখতে। যুদ্ধের সময়ে এতদূরে আসা সহজ নয়। আবার খরচও কম নয়। তবুও তিনি এসেছেন। আরলিনের কাছে থাকলেন ক'দিন। ফাইনম্যান তখন লস আলামোসে।
            
একদিন হঠাৎ আরলিনের বাবার ফোন - "রিচার্ড তুমি এক্ষুনি চলে এসো।"
            
এই সময়টার জন্য মোটামুটি প্রস্তুত ছিল ফাইনম্যান। লস আলামোসে তার বন্ধু ক্লস ফাসকে বলে রেখেছিল যেন তার গাড়িটি ধার দেয়। টেলিফোন পাবার সাথে সাথে ফাইনম্যান গাড়িটি নিয়ে বেরিয়ে পড়লো আরলিনের হাসপাতালের উদ্দেশ্যে।



Latest Post

রাজকন্যে সবিতা

  আমার মা ছিলেন নিরক্ষর, বাবার পড়ালেখা চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত। লেখাপড়া করতে পারেননি বলে লেখাপড়ার প্রতি প্রচন্ড ভালোবাসা ছিল বাবার। তাই নিজের ...

Popular Posts