১১/১২/২০০৪
ভোরের কাগজে গণিতবিদ রামানুজন আয়েঙ্গারকে নিয়ে বেশ কিছু রচনা প্রকাশিত হয়েছে। এর কয়েকটা অনুবাদ, আর একটা হলো মোটামুটি জীবনীমূলক। আসিফ নামে একজন এখন বাংলাদেশে নাকি পেশাদার বিজ্ঞান বক্তা। তাঁর বক্তৃতা শোনার চেষ্টা করতে হবে বাংলাদেশে গেলে। রামানুজন ক্ষণজন্মা গণিতবিদ। উচ্চতর গণিতে তাঁর বিরাট প্রতিভা দেখা যায়। কিন্তু সঠিক কোন নিয়মে ফেলা যায়নি তাঁর সব পদ্ধতিকে। ফাইনম্যান রামানুজনকে বলেছেন ব্যতিক্রম। ব্যতিক্রম কিন্তু নিয়ম নয়।
১৮৮৭ সালের ২২ ডিসেম্বর মাদ্রাজের তাঞ্জোর জেলার কুম্বকোনামে জন্মেছিলেন তিনি। মারা যান ১৯২০ সালের ২৬ এপ্রিল। ৩২ বছর বয়সে। তাঁর গাণিতিক প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ হবার সুযোগ ঘটেনি। তবে তিনি কিছু মৌলিক অবদান রেখে গেছেন বলেও আমার মনে হয় না। গণিতের সাথে প্রায়োগিক বিজ্ঞানের একটা অদৃশ্য বিরোধ আছে । গণিত হলো একটা যন্ত্র যা দিয়ে সমস্যা সমাধান করা হয় প্রয়োজন মত। এখন কম্পিউটার প্রোগ্রামের জগতে ম্যাথমেটিকা প্রোগ্রামের সাহায্যে কোটি কোটি সমস্যার সমাধান করা সম্ভব গণিতে খুব একটা জ্ঞান না রেখেও। রামানুজন নাকি একটানা ত্রিশ ঘন্টা কাজ করার পরে বিশ ঘন্টা ঘুমাতেন। ব্যক্তিগত ভাবে রামানুজন আমাকে খুব একটা আকর্ষণ করেন না।আজকের কাগজের সাহিত্যের পাতার নাম
সুবর্ণ রেখা। নভেরা হোসেনের একটা গল্প পড়লাম ‘খোঁয়াড়’। সমাজের নিচু তলার এক পরিবারের
সুখ দুঃখের আংশিক প্রতিফলন।
মনিকা আলির সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শাহনাজ ইউসুফ। মনিকা আলির প্রথম উপন্যাস ব্রিক লেন নিয়ে খুব হৈ চৈ হয়েছে। বইটা না পড়ে কিছু বলতে পারছি না। ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরীতে বইটা আসেনি এখনো। আমাজনে খোঁজ নিতে হবে। মনিকা আলি বাংলা বলতে পারেন না এখন আর, পড়াতো দূরের কথা। আমার মনে হচ্ছে বাংলা ভাষায় তাঁর ইংরেজি ভাষায় রচিত বইয়ের চেয়ে অনেক উঁচুমানের বই যে লেখা হয়ে গেছে তা তিনি জানেন না এখনো।
আমার মনে হয় আমাদের সাহিত্য ইংরেজিতে অনুদিত হওয়া দরকার আরো অনেক বেশি পরিমাণে। ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করা যত সহজ বাংলা থেকে ইংরেজিতে তত সহজ নয়। বিশেষ করে শিল্পমূল্য অক্ষুণ্ন রেখে যদি করতে হয়। তা করতে পারতেন সৈয়দ শামসুল হক, সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের মতো মানুষ যাঁরা শিল্পী এবং ইংরেজী বাংলায় যাঁরা সমান দক্ষ। কবীর চৌধুরি করেছেন অনেক। কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। আমি তাঁর অনুবাদে রাইফেল রোটি আওরাত পড়েছিলাম। বাংলায় পড়ার আগেই। সুনীলের অর্জুন উপন্যাস পড়েছি ইংরেজিতে। বাংলায় হাতে পাইনি বলে। বাংলাকে ইংরেজিতে রূপান্তর করার ক্ষমতা আমার থাকলে আমি নিজেই করতে শুরু করতাম। এ কাজটা করতে পারে তরুণ বাঙালি প্রজন্ম যাদের ইংরেজি হলো প্রথম ভাষা আর বাংলা দ্বিতীয়।
ভোরের কাগজে সিডনির অজয় দাশগুপ্তের
লেখা থেকে জানলাম নবনীতা দেবসেনের সিডনি ভ্রমণ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে খুব একটা লোক
সমাগম হয়নি। বাংলাদেশের বাঙালি আর ভারতীয় বাঙালির বিভাজন সেখানে। আমি অবশ্য মেলবোর্নের
খবর জেনেছি শ্রুতিদির কাছে। মেলবোর্নের অনুষ্ঠান নাকি বেশ জমেছিলো। আমি নিজে যতটুকু
দেখেছি, বিদেশে এলে বেশির ভাগ সময়েই মানুষের মন মানসিকতা বড় হবার বদলে ছোট হয়ে যায়।
ব্যক্তিগত কোন দর্শনের চেয়েও ব্যক্তি আমিটা বড় হয়ে ওঠে বিদেশে সবকিছু ছাপিয়ে। আইডেন্টিটি
ক্রাইসিসে ভোগে বলেই হয়তো একে অন্যের মাংস খাবার জন্য তৈরি থাকে সবসময়। যেমন এই যে
বাংলাদেশি বাঙালি আর ভারতীয় বাঙালি - সূক্ষ্মভাবে দেখলে দেখা যাবে ব্যাপারটা সাম্প্রদায়িক।
ভারতীয় বাঙালিরা মনে করে বাংলাদেশী বাঙালিদের অনেকেই যেহেতু মুসলমান তারা খুব একটা
সুবিধের লোক নন। বিপরীত ভাবে ভারতীয় বাঙালিদের সম্পর্কে বাংলাদেশী বাঙালিদেরও একই রকম
ধারণা। অজয় দাশগুপ্ত ভালো প্রশ্ন করেছেন, তা হলো হুমায়ূন আহমেদ সিডনিতে এলে ভারতীয়
বাঙালিরা তাঁকে নিয়ে অনুষ্ঠান করবেন কিনা।
আমি অবশ্য ব্যাপারটাকে আরো একটু
বাস্তব ভাবে দেখতে চাই। তা হলো বাংলাদেশ বা পশ্চিম বঙ্গে যখন সাহিত্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
হয়, তখন কি সমাজের সকল স্তরের মানুষই সেখানে যান? বিদেশে যারা এসেছেন তাঁরা সবাই যে
সাহিত্যরসিক বা সংস্কৃতিমনা হবেন তা আশা করা যায় না। ঐশ্বরিয়া রায়কে দেখতে যাবার মতো
করে তো আর নবনীতাদেবসেনকে দেখতে যাওয়া যায় না।
অপ্রাসঙ্গিক হলেও একটা কথা বলি এখানে।
বাংলাদেশে থাকতে একজন নোবেল বিজয়ীকে নিজের চোখে দেখবো ভাবলেও শিহরণ জাগতো। আর এখন মাঝে
মাঝে নোবেল বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানীর লেকচার শুনতেও বোরিং লাগে। এর অর্থ কী ?
কলম্বাস, ওহাইও

No comments:
Post a Comment