Thursday, 3 February 2022

দর্পণে মহাবিশ্ব: হাবল স্পেস টেলিস্কোপ

 


পৃথিবীর বাইরে গিয়ে পৃথিবীকে দেখার ধারণাটা প্রথম দিয়েছিলেন গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস সেই ২৪০০ বছর আগে। তখনো খালিচোখে আকাশের চন্দ্র-সূর্য দেখে প্রকৃতিকে বুঝতে চেষ্টা করেছে মানুষ। তখনো মানুষের চিন্তাভাবনায় মহাবিশ্বের মূলকেন্দ্র ছিল পৃথিবী। পরবর্তী দুই হাজার বছর ধরে অনেক দার্শনিক-গবেষণা হয়েছে মহাবিশ্ব সম্পর্কে। কিন্তু সেইসব ধারণার সুনির্দিষ্ট প্রমাণের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে বছরের পর বছর। 

পৃথিবী থেকে আকাশ দেখার দৃশ্যপট দ্রুত পালটে গেলো যখন গ্যালিলিও আকাশের দিকে তাক করলেন প্রথম টেলিস্কোপ। ১৬১০ সালে গ্যালিলিও তাঁর নিজের তৈরি টেলিস্কোপ দিয়ে বৃহস্পতি গ্রহের চারপাশে ঘূর্ণনরত চারটি উপগ্রহ আবিষ্কার করলেন। বৃহস্পতি গ্রহের চাঁদগুলোর গতিপথ দেখার পর গ্যালিলিওর মনে হলো এই উপগ্রহগুলো যেন তাদের মনিব-গ্রহের আদেশে একটি কক্ষপথে থেকে চাকরের মতো ঘুরছে মনিবের চারপাশে। ল্যাটিন ভাষায় তিনি উপগ্রহগুলোর নাম দিলেন 'satelles' (স্যাটেলিস) - যার অর্থ হলো servant বা চাকর। satelles থেকে ইংরেজিতে স্যাটেলাইট (satellite) কথাটি এসেছে। মানুষ যে কৃত্রিমভাবে স্যাটেলাইট তৈরি করে আকাশে পাঠিয়ে দিতে পারে সেরকম কোন কল্পনাও তখন কেউ করেনি। কিন্তু গ্যালিলি-যুগের পরবর্তী তিন শ বছরের মধ্যেই মহাকাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে শত শত কৃত্রিম স্যাটেলাইট – মানুষেরই কাজে।

গ্যালিলিওর টেলিস্কোপের পর আরো অনেক শক্তিশালী টেলিস্কোপ তৈরি করা হয়েছে। পৃথিবী থেকেই সেসব টেলিস্কোপ মহাকাশ পর্যবেক্ষণ করছে দিনরাত। কিন্তু পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের কারণে মহাকাশ থেকে আলো আসার সময় অনেক ধরনের মিথস্ক্রিয়া ঘটে। পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে অনেক আলো শোষিত হয়, ধুলাবালিতে আলো বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। ফলে মহাকাশের মহাজাগতিক ঘটনাগুলি নির্বিঘ্নে পর্যবেক্ষণ করা যায় না। শত শত আলোকবর্ষ দূরের উজ্জ্বল নক্ষত্রের আলো পৃথিবীর বায়ুমন্ডল ভেদ করে আসার সময় উজ্জ্বলতা হারায়। বায়ুমন্ডলের কারণেই তারাগুলি মিটমিট করে। ফলে অনেক কিছুই ধরা পড়ে না শক্তিশালী টেলিস্কোপেও। পৃথিবীর টেলিস্কোপগুলিকে বিভিন্ন পাহাড়ের চূড়ায় স্থাপন করেও অনেক সমস্যার সমাধান পাওয়া যায়নি। তাই বিশাল আকৃতির এক টেলিস্কোপকে স্যাটেলাইট হিসেবে স্থাপন করা হয়েছে পৃথিবীর বাইরে। পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে মহাবিশ্বকে দেখার প্রথম শক্তিশালী এবং প্রচন্ড সফল এই টেলিস্কোপের নাম হাবল স্পেস টেলিস্কোপ। 

মহাকাশে টেলিস্কোপ স্থাপনের ধারণা প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৩ সালে জার্মানির বিজ্ঞানী হারমান ওবের্থ-এর “দ্য রকেট ইনটু প্ল্যানেটারি স্পেস’ বইতে। তখনো কিন্তু কোন ধরনের মহাকাশযান তৈরি হয়নি। তাই ওবের্থ-এর ধারণাকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি কেউ সেই সময়। এরপর ১৯৪৬ সালে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লাইম্যান স্পিৎজার-এর “অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল আডভান্টেজেজ অব অ্যান এক্সট্রা-টেরেস্ট্রিয়াল অবজারভেটরি” প্রবন্ধ প্রকাশিত হলে ওবের্থ-এর ধারণা আবার সামনে চলে আসে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকার মধ্যে শীতল-যুদ্ধ শুরু হলে মহাকাশ গবেষণায় দ্রুত উন্নতি ঘটে। ১৯৫৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুটনিক মহাকাশে পাঠালে আমেরিকা দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায়। ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আমেরিকান মহাকাশ প্রশাসন প্রতিষ্ঠান - নাসা। 

১৯৬০ সালে প্রফেসর স্পিৎজার এবং আমেরিকার আরো অনেক জ্যোতির্বিজ্ঞানী নাসা এবং আমেরিকান কংগ্রেসের কাছে আবেদন করেন মহাকাশে টেলিস্কোপ পাঠানোর  “লার্জ অরবিটাল টেলিস্কোপ” প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ দেয়ার জন্য। ১৯৬৯ সালে এই প্রকল্প অনুমোদন লাভ করে। তবে সেই সময় মানুষ প্রথমবার চাঁদে অবতরণ করার পর নাসার প্রকল্পে বাজেট ঘাটতি দেখা দেয়। অনেক বড় প্রকল্প বাজেটের অভাবে ছোট করতে হয়। লার্জ স্পেস টেলিস্কোপের প্রাথমিক নকশায় মূল দর্পণের ব্যাস ছিল ১২০ ইঞ্চি। টাকার অভাবে পুরো নকশা বদলে আরো ছোট আকারের টেলিস্কোপের পরিকল্পনা করতে হয়। এবার মূল দর্পণের ব্যাস দাঁড়ালো ৯৪ ইঞ্চিতে। ১৯৭৭ সালে আমেরিকান কংগ্রেস লার্জ স্পেস টেলিস্কোপ প্রকল্প অনুমোদন করে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের বাজেট কিছু বাড়ানোর জন্য নাসা ইওরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির সাথে একটি চুক্তি করে। লার্জ স্পেস টেলিস্কোপের শতকরা ১৫ ভাগ খরচ ইওরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি দেবে, কিন্তু তার বিনিময়ে টেলিস্কোপের শতকরা ১৫ ভাগ পর্যবেক্ষণ সময় তারা ব্যবহার করবে। অর্থাৎ ২৪ ঘন্টার মধ্যে সাড়ে তিন ঘন্টা সময় থাকবে ইওরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির জন্য সংরক্ষিত। 

১৯৭৯ সালের মধ্যে স্পেস টেলিস্কোপের নকশা চূড়ান্ত হয় এবং নির্মাণ-কাজ শুরু হয়। বিশটি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইওরোপিয়ান মহাকাশ সংস্থা এই নির্মাণ-কাজের সাথে যুক্ত। শুরুতে পরিকল্পনা ছিল ১৯৮৩ সালের মধ্যে টেলিস্কোপ মহাকাশে পাঠানোর। কিন্তু কাজ শুরু করার পর দেখা গেলো খরচ আর সময় কোনটাতেই কুলোচ্ছে না। ১৯৮৩ সালের মধ্যে কিছুতেই এই টেলিস্কোপ মহাকাশে পাঠানো সম্ভব নয়। এসময় এই টেলিস্কোপের নাম লার্জ স্পেস টেলিস্কোপের বদলে রাখা হলো আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডুইন হাবল-এর নামে ‘হাবল স্পেস টেলিস্কোপ’। ঠিক করা হয় ১৯৮৬ সালে মহাকাশে পাঠানো হবে এই টেলিস্কোপ। 

১৯৮৬ সালের ২৮ জানুয়ারি স্পেস শাটল চ্যালেঞ্জার দুর্ঘটনায় সাতজন নভোচারীর সবাই মর্মান্তিকভাবে নিহত হলে নাসার সব মহাকাশ প্রকল্প কয়েক বছরের জন্য স্থগিত হয়ে যায়।  সব প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও হাবল টেলিস্কোপ মহাকাশে পাঠানো যায়নি তখন। অবশেষে ১৯৯০ সালের ২৪ এপ্রিল মহাকাশে পাঠানো হয় হাবল স্পেস টেলিস্কোপ। পরেরদিন ২৫ এপ্রিল তা কক্ষপথে পৌঁছে যায়।

স্পেস শাটল ডিসকভারি তার প্রকোষ্ঠে ভরে টেলিস্কোপটিকে পৃথিবী থেকে মহাকাশে নিয়ে গিয়ে লো-আর্থ অরবিটে রেখে আসে। পৃথিবীর ভূমি থেকে ১৫০ কিলোমিটার থেকে শুরু করে ১২০০ কিলোমিটারের মধ্যে উচ্চতায় লো-আর্থ অরবিট। হাবল টেলিস্কোপ পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫৪৭ কিলোমিটার উচ্চতায় ঘন্টায় প্রায় ২৭ হাজার কিলোমিটার বেগে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে। কক্ষপথে একবার ঘুরে আসতে তার সময় লাগে প্রায় ৯৫ মিনিট। 

হাবল স্পেস টেলিস্কোপ একটি বিশাল আকৃতির স্যাটেলাইট। এর মূল দেহের আকৃতি ৪.৩ মিটার ব্যাসের ১৩ মিটার লম্বা একটি চোঙার মতো। মহাকাশে পাঠানোর সময় এর ভর ছিল ১০,৮০০ কিলোগ্রাম। শেষবার সার্ভিসের পর বর্তমানে এর বর্তমান ভর দাঁড়িয়েছে ১২,২০০ কিলোগ্রামে। এই টেলিস্কোপকে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেন যন্ত্রপাতিগুলিকে আলাদা আলাদাভাবে মেরামত করা যায় বা দরকার হলে বদলে দেয়া যায়। পৃথিবী থেকে মহাকাশচারী পাঠিয়ে এই টেলিস্কোপ মেরামত করা যায়। সেজন্য টেলিস্কোপের বাইরের খোলে বিভিন্ন জায়গায় হাতল দেয়া হয়েছে – যেন মহাকাশচারীরা সেই হাতল ধরে মহাকাশে ভাসতে ভাসতে প্রয়োজনীয় কাজ করতে পারেন।

এটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৌরশক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে সোলার প্যানেলের সাহায্যে। ৭.১ মিটার দীর্ঘ এবং ২.৬ মিটার চওড়া দুটো সোলার প্যানেল আছে এই টেলিস্কোপের দুই পাশে। প্রায় সাড়ে পাঁচ কিলোওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদন করতে পারে এই প্যানেলদুটি। ছয়টি নিকেল-হাইড্রোজেন ব্যাটারিতে এই শক্তি সংরক্ষণ করে। এই শক্তি প্রায় ২২টি গাড়ির ব্যাটারির সঞ্চিত শক্তির সমান। 

এই টেলিস্কোপটি একটি রিফ্লেকটিং টেলিস্কোপ বা প্রতিফলক দুরবিন। আলোর প্রতিফলনের জন্য দুটি আয়না আছে এই টেলিস্কোপে – প্রাইমারি মিরর বা মুখ্যদর্পণ এবং সেকেন্ডারি মিরর বা গৌণদর্পণ। মুখ্যদর্পণের ব্যাস ৯৪ ইঞ্চি বা  ২.৪ মিটার এবং ভর ৮২৮ কিলোগ্রাম। গৌণদর্পণের ব্যাস মাত্র ১২ ইঞ্চি, এবং ভর ১২.৪ কিলোগ্রাম। যে কাচ দিয়ে এই আয়নাদুটো বানানো হয়েছে, সেই কাচ প্রচন্ড বা গরমেও একটুও সংকুচিত বা প্রসারিত হয় না। কাচের উপর প্রতিফলক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে ম্যাগনেসিয়াম ফ্লোরাইডের উপর অ্যালুমিনিয়ামের আস্তরণ। 

মহাকাশ থেকে আগত আলো টেলিস্কোপের চোঙার মধ্যে ঢুকে মুখ্যদর্পণে প্রতিফলিত হয়ে গৌণদর্পণে পড়ে। গৌণদর্পণ থেকে আবার প্রতিফলিত হয়ে মুখ্যদর্পণের মাঝামাঝি সূক্ষ্ণছিদ্রের ভেতর দিয়ে মূল টেলিস্কোপের নলে প্রবেশ করে। সেখানেই প্রতিবিম্ব তৈরি হয়। টেলিস্কোপে সৃষ্ট ফোকাস পয়েন্ট – যেখানে প্রতিবিম্ব তৈরি হয় – সেখান থেকে তা টেলিস্কোপে লাগানো বিভিন্ন ক্যামেরা এবং বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির ভেতর চলে যায়। 

হাবল টেলিস্কোপের প্রধান পাঁচটি বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি হলো – ওয়াইড-ফিল্ড অ্যান্ড প্ল্যানেটারি ক্যামেরা (WF/PC), ফেইন্ট অবজেক্ট ক্যামেরা (FOC), হাইস্পিড ফটোমিটার (HSP), গডার্ড হাই-রেজ্যুলেশন স্পেকট্রোগ্রাফ (GHRS), এবং ফেইন্ট অবজেক্ট স্পেকট্রোগ্রাফ (FOS)।  



১৯৯০ সালে যে যন্ত্রপাতিগুলি পাঠানো হয়েছিল পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে টেলিস্কোপ সার্ভিসিং-এর সময় সেই যন্ত্রপাতিগুলি বদলে আরো উন্নতমানের যন্ত্র প্রতিস্থাপন করা হয়েছে বিগত তিরিশ বছরে। এপর্যন্ত মোট পাঁচবার পৃথিবী থেকে নভোচারীরা হাবল টেলিস্কোপে গিয়ে যন্ত্রপাতি বদলে দিয়ে এসেছে। প্রথম সার্ভিস মিশন গিয়েছিল ডিসেম্বর ১৯৯৩, দ্বিতীয় সার্ভিস মিশন ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭, তৃতীয় সার্ভিস মিশনের প্রথম ধাপ ডিসেম্বর ১৯৯৯, তৃতীয় সার্ভিস মিশনের দ্বিতীয় ধাপ ফেব্রুয়ারি ২০০২, চতুর্থ এবং শেষ সার্ভিস মিশন মে ২০০৯। 

হাবল স্পেস টেলিস্কোপের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় WF/PC। দুইটি ক্যামেরার সমন্বয়ে WF/PC। ওয়াইড ফিল্ড ক্যামেরা বিস্তীর্ণ আকাশের বিশাল এলাকা ধারণ করে, আর প্ল্যানেটারি ক্যামেরা সেই ছবির রেজ্যুলেশন বাড়ায় এবং ছবিকে বিবর্ধিত করে। ১৯৯০ সালে টেলিস্কোপ কাজ শুরু করার পর বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন যে মুখ্যদর্পণে সামান্য ত্রুটি রয়ে গেছে, ফলে ছবি ঝাপসা আসছে। ১৯৯৩ সালে প্রথম সার্ভিসের সময় WF/PC প্রতিস্থাপন করে এই ত্রুটি দূর করা হয়। ২০০৯ সালে শেষবার সার্ভিসিং এর সময় আরো উন্নত-প্রযুক্তির WF/PC প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। 

মহাকাশে অনুজ্জ্বল বস্তুর ছবি তোলে ফেইন্ট অবজেক্ট ক্যামেরা। এই কাজ করার জন্য ইমেজ ইন্টেন্সিফায়ার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। ২০০২ সালে সার্ভিসিং-এর সময় আরো উন্নতমানের সার্ভে ক্যামেরা লাগানো হয়েছে টেলিস্কোপের সাথে। 

হাইস্পিড ফটোমিটারের কাজ হলো উচ্চশক্তির উৎস থেকে উৎপন্ন আলোর পরিবর্তন শনাক্ত করা। শুরুতে এটা ঠিকমতো কাজ করছিলো না। ১৯৯৩ সালে প্রথমবার সার্ভিসিং-এর সময় এটা বদলে একটা নতুন প্রযুক্তির COSTAR (corrective optics space telescope axial replacement) স্থাপন করা হয়। 

মহাকাশ গবেষণায় আলোর বর্ণালী বিশ্লেষণের গুরুত্ব অপরিসীম। লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ দূর থেকে আগত আলোর বর্ণালী বিশ্লেষণ করে জানা যায় আলোর উৎসের গতিপথ। আলোর তরঙ্গের দৈর্ঘ্যের ভিত্তিতে আমাদের বর্ণালী ভাগ করা হয়েছে। লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেশি, নীল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য কম। যদি আগত আলোর স্বাভাবিক বর্ণালীরেখা নীল রেখার দিকে সরতে থাকে (ব্লু-শিফ্‌ট) – তাহলে বুঝতে হবে বস্তুটি আমাদের দিকে আসছে, আর যদি লাল রেখার দিকে সরতে থাকে (রেড শিফ্‌ট) তাহলে বুঝতে হবে দূরে সরে যাচ্ছে। মহাকাশের আলোর বর্ণালী বিশ্লেষণ করার জন্য হাবল টেলিস্কোপে আছে দুইটি স্পেকট্রোগ্রাফ - গডার্ড হাই-রেজ্যুলেশন স্পেকট্রোগ্রাফ (GHRS), এবং ফেইন্ট অবজেক্ট স্পেকট্রোগ্রাফ (FOS)। দুটোই চমৎকারভাবে কাজ করেছে ১৯৯৭ পর্যন্ত। ১৯৯৭ সালে দ্বিতীয় সার্ভিসিং-এর সময় এগুলি বদলে স্পেস টেলিস্কোপ ইমেজিং স্পেকট্রোগ্রাফ (STIS) হয়েছে। এই স্পেকট্রোগ্রাফ অতিবেগুনি থেকে অবলোহিত তরঙ্গ পর্যন্ত সব তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোই বিশ্লেষণ করতে পারে। 

লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ দূর থেকে ছবি তোলার জন্য হাবলকে খুবই স্থির থাকতে হয়। অনেকে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বোঝাতে বলে থাকেন একচুলও না হেলার কথা। হাবল একটি চুলকে এক কিলোমিটার দূর থেকে দেখলে যত ছোট দেখা যাবে – সেটুকুও না হেলে ছবি তুলতে পারে। এই কাজটি করার জন্য হাবলে আছে অত্যন্ত সংবেদী সেন্সর – ফাইন গাইডেন্স সেন্সরস (FGS)। তিনটি সেন্সর হাবল টেলিস্কোপকে কোন একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে স্থির রাখতে পারে দীর্ঘ সময়। 

টেলিস্কোপের যন্ত্রপাতির সাথে লাগানো আছে অনেকগুলি কম্পিউটার এবং মাইক্রোপ্রসেসর। দুটি প্রধান কম্পিউটারের একটি যন্ত্রপাতি নিয়ন্ত্রণ করে, অন্যটি পুরো স্যাটেলাইটকে নিয়ন্ত্রণ করে। 

হাবল টেলিস্কোপের মূল নিয়ন্ত্রণ আছে পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের হাতে। হাবল টেলিস্কোপের প্রধান নিয়ন্ত্রণ কক্ষ নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারে। আমেরিকার পদার্থবিজ্ঞানী রবার্ট গডার্ডের নাম অনুসারে এই সেন্টার এবং হাবল টেলিস্কোপের স্পেকট্রোগ্রাফের নামকরণও করা হয়েছে। এখান থেকে বিজ্ঞানীরা প্রয়োজনীয় কমান্ড পাঠান। সেই কমান্ড যায় ট্রেকিং অ্যান্ড ডাটা রিলে স্যাটেলাইটে। সেখান থেকে কমান্ড যায় হাবল টেলিস্কোপে লাগানো হাই-গেইন অ্যান্টেনার সাহায্যে হাবলের কম্পিউটারে। এখন টেলিস্কোপ থেকে ছবি এবং তথ্য পৃথিবীতে পাঠানো হয় হাবলের অ্যান্টেনার সাহায্যে ট্রেকিং অ্যান্ড ডাটা রিলে স্যাটেলাইটে। স্যাটেলাইট থেকে চলে আসে পৃথিবীতে। প্রতি সপ্তাহে হাবল প্রায় ১৫০ গিগাবিট ডাটা পৃথিবীতে পাঠায়। 

অন্যান্য স্যাটেলাইটের মতোই পনেরো বছর কাজ করার লক্ষ্য নিয়ে পাঠানো হয়েছিল হাবল টেলিস্কোপ। কিন্তু এটা নির্বিঘ্নে কাজ করে যাচ্ছে গত একত্রিশ বছর ধরে। সার্ভিসিং এবং যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপনের কারণে এই টেলিস্কোপ দিনের পর পর দিন আরো শক্তিশালী হয়েছে। 

হাবল টেলিস্কোপের সাহায্যেই আমরা জেনেছি মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে। আমরা প্রমাণ পেয়েছি মহাবিশ্বের উৎপত্তি হয়েছে কমপক্ষে ১৩৮০ কোটি বছর আগে। হাবলের সাহায্যে প্রমাণ পেয়েছি ব্ল্যাকহোলের। হাবল আমাদের খুঁজে দিয়েছে অনেকগুলি নতুন গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র, নীহারিকা। হাবল টেলিস্কোপ জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষণায় দিয়েছে আশ্চর্য গতি। এপর্যন্ত প্রায় ১৮ হাজার বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে হাবলের সাহায্যে প্রাপ্ত উপাত্তের ভিত্তিতে। 

মহাকাশে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ পাঠানো হচ্ছে। এই নতুন টেলিস্কোপ হাবল টেলিস্কোপের বিকল্প নয়, প্রতিদ্বন্দ্বীও নয়। হাবল টেলিস্কোপ যেভাবে কাজ করছে সেভাবেই কাজ করতে থাকবে আরো অনেক বছর। 


তথ্যসূত্র: 

রবিন কেরড ও ক্যারোল স্টট - ‘হাবল দি মিরর অন দি ইউনিভার্স’ (২০০৮), প্রদীপ দেব – ‘সবার জন্য স্যাটেলাইট’ (২০১৯), nasa.gov, ডেভিড সায়লার ও ডেভিড হারল্যান্ড – ‘দি হাবল স্পেস টেলিস্কোপ ফ্রম কনসেপ্ট টু সাকসেস’ (২০১৬)। 

______________
বিজ্ঞানচিন্তা নভেম্বর ২০২১ সংখ্যায় প্রকাশিত








Monday, 31 January 2022

স্বপ্নলোকের চাবি - পর্ব ৫৭

 



#স্বপ্নলোকের_চাবি_৫৭

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠটিকে আজ কেমন যেন অচেনা মনে হচ্ছে। এতদিন এটাকে ডানে রেখে মেডিকেল সেন্টারে যাওয়ার সময়, কিংবা বামে রেখে প্রামাণিকস্যারের বাসার দিকে হাঁটার সময় দিগন্তবিস্তৃত বলে মনে হতো। আজ হঠাৎ মাঠভর্তি চেনা-অচেনা হাজার মুখের ভীড়ে, মাইক আর ঢোলের শব্দের হট্টগোলে, রঙবৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে মনে হচ্ছে এক অচেনা রঙভেজা মাঠে দাঁড়িয়ে আছি এই সেপ্টেম্বরের বিকেলে। বিদায় বাঁশির সুর বেজে উঠবে একটু পরেই। তারপর এই শিক্ষাঙ্গন থেকে আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে অতীত হয়ে যাবো। 

শিক্ষাবর্ষের জট না লাগলে ১৯৮৯ সালে অর্থাৎ তিন বছর আগেই আমাদের মাস্টার্স শেষ হয়ে যেতো। কিন্তু বছরের পর বছর আটকে রইলাম জটলাগা শিক্ষাব্যবস্থার খানাখন্দে। এই ১৯৯২র সেপ্টেম্বরের শেষে ঢাকঢোল পিটিয়ে “র‍্যাগ-ডে” পালন করলেও পরীক্ষার সবগুলি ধাপ শেষ হয়ে রেজাল্ট হতে হতে আগামী বছরেরও কত মাস লেগে যাবে এখনো জানি না। 

আজ সকাল এগারোটায় ইউনিভার্সিটির ট্রেন স্টেশনের সামনের চত্বরে র‍্যাগ-ডে’র আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন স্বয়ং ভাইস-চ্যান্সেলর রফিকুল ইসলাম চৌধুরি। পাস করার পর নীতিনিষ্ঠ হয়ে মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করার একটা বায়বীয় শপথবাক্য পাঠ করানো হলো। ন্যায়নীতিতে যাদের নিষ্ঠা থাকে, তাদের এমনিতেই থাকে – তারজন্য লোকদেখানো শপথবাক্য পাঠ করার দরকার হয় না। রাষ্ট্রের সেবায় জীবন উৎসর্গ করার শপথ নিয়েই যে আকন্ঠ দুর্নীতিতে মজে যায় আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতারা তা আমরা সবাই জানি। সুতরাং এই ভালো থাকার শপথ একটা লোকদেখানো রুটিন ছাড়া নতুন কোন অর্থ বহন করে না। 

এরপর একপ্রকার আনন্দমিছিল করতে করতে ফ্যাকাল্টি ঘুরে খেলার মাঠে এসেছি। রঙের খেলা শুরু হয়ে গেছে মিছিলের মধ্যেই। মাঠে এসে রঙের বালতি নিয়ে ছুটোছুটি চলছে। আগের ব্যাচের সাথে পরের ব্যাচের একটা অদৃশ্য প্রতিযোগিতা থাকেই। ২০তম ব্যাচের র‍্যাগ-ডে কেমন হয়েছিল, কিংবা আদৌ কিছু হয়েছিল কিনা আমার মনেও নেই। কিন্তু আয়োজকদের একটাই কথা - ২১তম ব্যাচের র‍্যাগ-ডে হতে হবে স্মরণীয়। কাদের কাছে স্মরণীয়? আসলে আমাদের নিজেদের কাছেই। বিশেষ কোন ঘটনা বা দুর্ঘটনা না ঘটলে আমরা আজ কী করছি তা আমরা ছাড়া আর কেউ মনে রাখবে না। অন্য ব্যাচরা মনে রাখবে তাদের নিজেদের কথা। 

এই র‍্যাগ-ডে’র ব্যাপারটা এখন ভীষণ একটা হুলুস্থুল ব্যাপারে দাঁড়িয়ে গেছে। অথচ এটা নাকি প্রথম শুরু হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়া ইউনিভার্সিটিতে ১৯২৫ সালে। পাস করে বের হয়ে যাবার আগে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় মিছিল করে চাঁদা তুলে কোন উন্নয়নমূলক কিংবা দাতব্য কাজ করতো সেই সময়। রেইজ অ্যান্ড গিভ থেকে নাকি এসেছে র‍্যাগ কথাটি। 

মাঠের একপাশে একটা বড় মঞ্চে হলভিত্তিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছে। মাঠে উপচেপড়া দর্শক দেখে বোঝা যাচ্ছে কীরকম সাংস্কৃতিক দুর্ভিক্ষ চলছে আমাদের ক্যাম্পাসে গত ক’বছর ধরে। নিউ ফার্স্ট ইয়ার থেকে শুরু করে মাস্টার্স এর শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা এখানে এসেছে তারা সবাই সাংস্কৃতিক বুভুক্ষুর মতো গিলছে নাচ-গান-কৌতুক। এর মধ্যেই ইচ্ছেমতো রঙ দিচ্ছে যে যাকে পারে। 

এই রঙ ছিটানোর ব্যাপারটা ঠিক কোত্থেকে এসেছে জানি না। শান্তি নিকেতন থেকে কি? স্টেজ থেকে ভেসে আসছে রবীন্দ্রসঙ্গীত – “তোমার আপন রাগে, তোমার গোপন রাগে, অশ্রুজলের করুণ রাগে, রাঙিয়ে দিয়ে যাও যাও যাও গো এবার যাবার আগে।“

উৎকর্ণ হয়ে শুনছি আর দেখছি। কী চমৎকার গলা আর গান নির্বাচন ইন্দ্রাণী মুৎসুদ্দীর। শহর গ্রুপের হয়ে গান গাইতে উঠেছে সে। এই চমৎকার গানের শিল্পীটার সাথে আমার অনাকাঙ্খিতভাবে একটা ঝগড়া লেগে গিয়েছিল ট্রেনের কামরায় প্রায় বছরখানেক আগে। ট্রেনের সিট থেকে সে আমার ব্যাগ ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল জানালা দিয়ে। এত সুন্দর গান গায় যে, সে যে কী ভয়ংকর ঝগড়া করতে পারে তা অকল্পনীয়। 

একটু পর পর বৃষ্টি হচ্ছে। মেঘের গর্জন যেন গানের কথার আবহ তৈরি করছে। 

“মেঘের বুকে যেমন মেঘের মন্দ্র জাগে

বিশ্ব-নাচের কেন্দ্রে যেমন ছন্দ জাগে

তেমনি আমায় দোল দিয়ে যাও যাবার আগে আগিয়ে দিয়ে

কাঁদন-বাঁধন ভাগিয়ে দিয়ে

রাঙিয়ে দিয়ে যাও যাও যাও গো এবার যাবার আগে।“

খারাপ ব্যবহার করেছিল বলে ইন্দ্রাণীর উপর আমার একটা চাপারাগ ছিল। তার গান সেই রাগ রাঙিয়ে দিয়ে ভাগিয়ে নিয়ে গেছে। 

হাফিজ সাদা টি-শার্ট আর সাদা প্যান্ট পরে এসেছে। আমরা বন্ধুরা সবাই তার শার্টে-প্যান্টে অটোগ্রাফ দিয়ে ভরিয়ে ফেলতে শুরু করেছি। তার পশ্চাৎদেশ ইতোমধ্যেই ভরে গেছে গুরুগম্ভীর সব শুভেচ্ছাবাণীতে। শুভেচ্ছাবাণী রাখার কী অভিনব স্থান! 

সময় যতই যাচ্ছে ততই ভেতরটা বিষাদগ্রস্ত হয়ে উঠতে শুরু করেছে। বন্ধুদের সাথে এভাবে হাসি-হুল্লোড়ের দিন আজ শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের অনুজদের মধ্যেও অনেকে এসে কথা বলে যাচ্ছে। রঙ দিয়ে যাচ্ছে। 

আজ ব্যান্ড-শো হবার কথা ছিল। কিন্তু বৃষ্টির কারণে সেটা আজ বাতিল হয়ে গেছে। আগামীকাল বিকেলে হবে যদি আবহাওয়া অনুকুল থাকে। বৃষ্টি কিছুটা ধরে এসেছে, কিন্তু রঙবৃষ্টি চলছেই। পিচকিরির বদলে এখন বালতিভর্তি রঙগোলা পানি ঢেলে দেয়া হচ্ছে যে যাকে পারছে। 

এরমধ্যেই একজন হঠাৎ ছুটে এসে আমার পেছনে লুকালো। মুঠো করে ধরে ফেলেছে আমার পিঠের কাছটার টি-শার্ট। তাকে রঙ ঢালতে তাড়া করেছিল যে সে আমার সামনে এসে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো। অপরিচিত তরুণ মুখ। চোখাচোখি হতেই চোখ ফিরিয়ে অন্যদিকে চলে গেলো অন্য কাউকে তাড়া করতে। আমার আশেপাশের বন্ধুরা হঠাৎ আমার দিকে ফিরে ফিরে তাকাতে শুরু করেছে। ঠিক আমার দিকে নয়, আমার পেছনে হঠাৎ আসা আগন্তুকের দিকে। তার ঘননিশ্বাস আমার পিঠে পড়ছে। ঘাড় ফেরাতেই চোখাচোখি। অন্যরকম নতুন লাগছে নতুনকে। কিন্তু পলক ফেলার আগেই কয়েক বালতি রঙ এসে ভিজিয়ে দিলো আমাদের। 

শিক্ষাবর্ষের জটে পড়ে এক বছরের লেখাপড়া আমরা যেখানে তিন বছরে শেষ করেছি, সেখানে স্কুল-কলেজে তিন বছরে তিন বছরের পড়া শেষ হয়েছে। মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক পাস করে নতুন এখন ইতিহাসের ছাত্রী। মনে হচ্ছে কত বছর পরে দেখলাম তাকে। সময় আর পরিবেশ তাকে আরো স্মার্ট করে তুলেছে। 

বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে হাঁটতে হাঁটতে কথা হচ্ছিলো তার সাথে। 

“টি-শার্টে এগুলি কী লিখেছেন?”

“কী?”

“আমি বিষপান করে মরে যাবো?”

“ওটা তো সুনীলের কবিতা। শেষের লাইনটাই দেখলে শুধু? কিন্তু আগের লাইনটার ভার বেশি – যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো।“

“ওসব কবিতা আমি বুঝি না। মৃত্যুর কথা বলা চলবে না।“ 

আমি অবাক হই। কেমন যেন অচেনা লাগে তাকে। বৃষ্টির তোড় বাড়তে শুরু করেছে। রঙ ধুয়ে যাচ্ছে বৃষ্টির পানিতে। 

“নির্বাসন দেয়া মানে কী?”

“জানি না।“

“আপনি নির্বাসন দেননি কাউকে?”

“না।“

ক্যাম্পাসের রাস্তাগুলি আজ বৃষ্টিভেজা, জনাকীর্ণ। রঙে রঙিন সবাই হাঁটছে, যেন কারো কোন তাড়া নেই।

“বাংলায় এখন কী মাস?”

“আশ্বিন।“

“এই আশ্বিন আমার মনে থাকবে।“

শহীদমিনারের কাছে এসে নতুন তার বন্ধুদের সাথে চলে গেল শামসুন্নাহার হলের দিকে। আজ সে হলে থাকবে। 

তৌহিদ মোটরসাইকেল নিয়ে গিয়েছিল। প্রদীপনাথসহ তার পেছনে চেপে বসলাম। প্রদীপনাথকে আলাওলে নামিয়ে দিয়ে তৌহিদ একটানে চলে এলো রাস্তায়। আলাওল হল থেকে আমাকে পিটিয়ে বের করে দেয়ার সময় হুমকি দেয়া হয়েছিল হলে যদি আর কখনো যাই অবস্থা খারাপ হবে। এরপর অনেকদিন যাইনি আলাওলে। পরীক্ষার ফরম ফিল আপ করার সময় গিয়েছিলাম। শিবিরের ছেলেরা দেখেছে আমাকে, কিন্তু কিছু বলেনি। তারা হুমকি দিয়েছিল তাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ না করার জন্য। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে কেউ কি কিছু করতে পারবে? 

আজকেও শিবিরের কয়েকজনের সাথে চোখাচোখি হলো। হলের গেটে সারাক্ষণ পাহারা দেয় তারা। কিন্তু তারা এখন ক্যাম্পাসে নিরবে কাজ করছে। ক’দিন আগেই তারা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে আক্রমণ করেছে ছাত্রলীগের উপর। কমপক্ষে বিশজন ছাত্র মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে। কয়েকজনের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। তাদের একজন ছাত্রলীগের মাহবুবুল আলমের মৃত্যু হয়েছে গতকাল। এসব হত্যার বিচার কি কখনোই হবে? 

তৌহিদ আমাকে আমানত খান বিল্ডিং-এর সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে গেছে। পরীক্ষা শেষ হলে এই বিল্ডিং থেকেও চলে যেতে হবে। কেমন যেন উদাস লাগছে, কিন্তু সেসবের এখনো অনেক দেরি আছে। 

পরের একমাস দ্রুত কেটে গেলো। অক্টোবরের মাঝামাঝি দুর্গাপূজায় বাড়িতে গেলাম। এক সপ্তাহের জন্য গিয়ে তিন সপ্তাহ কাটিয়ে এলাম। 

আমাদের ওদিকে অনেক রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির থেকে পালিয়ে চলে এসেছে। অনেকদিন থেকে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসছে। এপর্যন্ত প্রায় লক্ষাধিক শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়া হয়েছে টেকনাফের শরণার্থী শিবিরে। কিন্তু সেখানে গত কয়েক মাস থেকে চরম উত্তেজনা চলছে। সেপ্টেম্বরে রোহিঙ্গারা নিরাপত্তা বাহিনীর উপর হামলা করে একজন নিরাপত্তা রক্ষীকে হত্যা করেছে। তারপর শিবিরের ভেতর সংঘর্ষ ছড়িয়ে দিয়েছে, আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। এবং এই সুযোগে দলে দলে শিবির থেকে বের হয়ে লোকালয়ে মিশে গেছে। সেই টেকনাফ কক্সবাজার থেকে ওদের অনেকে এখন চকরিয়া বাঁশখালীসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে দিনে দিনে। 

অক্টোবরের শেষ দিনে পদার্থবিজ্ঞানের জগতে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে – যার জন্য খুব খুশি লাগছে। পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘুরছে – এই বৈজ্ঞানিক সত্য বলার অপরাধে ১৬৩৩ সালে গ্যালিলিও গ্যালিলিকে অপরাধী সাব্যস্ত করেছিল রোমান ক্যাথলিক চার্চ। গ্যালিলিওকে অন্তরীণ করে রাখা হয়েছিল বছরের পর বছর। এরপর কেটে গেছে ৩৫৯ বছর। বিজ্ঞান এগিয়ে গেছে অনেকদূর। এই বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে মহাবিশ্বের অনেক রহস্য এখন বিজ্ঞানীদের হাতের মুঠোয়। পোপদের প্রতি ভক্তি এখনো অনেকের থাকলেও তাদের সেই প্রতাপ আগের মতো নেই। তারাও এখন স্বীকার করে যে পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘোরে। তবে গ্যালিলিওর ওপর যে অন্যায় করা হয়েছিল তার কী হবে? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেল সম্প্রতি। ভ্যাটিকানের পোপ দ্বিতীয় জন পল স্বীকার করেছেন যে গ্যালিলিও ঠিক কথাই বলেছিলেন। গ্যালিলিওর উপর অবিচার করা হয়েছে। গ্যালিলিওকে যে শাস্তি দেয়া হয়েছিল সেটা ভুল ছিল। এই ভুল স্বীকার করাটাও খুব একটা সহজে হয়নি। ১৯৭৯ সালে পোপ নির্বাচিত হয়েছেন জন পল। সেবছরই তিনি কমিটি গঠন করেছিলেন গ্যালিলিওর বিচারের পুনতদন্ত করার জন্য। সেই কমিটি তেরো বছর সময় নিলো শুধু বোঝার জন্য যে পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘোরে! কমিটিতে কারা কারা ছিলেন কে জানে। তবুও ভালো যে পোপ সেই ঘটনার জন্য গ্যালিলিওর কাছে তথা বিজ্ঞানের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। ভুলকে ভুল বলে স্বীকার করার মনোবৃত্তি তো অনেকেরই থাকে না। ধর্মগুরু হলে তো কথাই নেই। 

এই খুশিতে কোয়ান্টাম মেকানিক্স বাদ দিয়ে সারাদিন গ্যালিলিওর জীবননাট্য পড়লাম – বার্টোল্ড ব্রেশ্‌ট এর লেখা যে নাটকে গ্যালিলিওর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন আলী যাকের। দিনশেষে আফসোস হচ্ছে-  গ্যালিলিও পরে পড়লেও চলতো। পরীক্ষার বাকি আছে মাত্র সাতদিন। 

Thursday, 27 January 2022

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং জটিলতার পদার্থবিজ্ঞান

 


নোবেল পুরষ্কার ২০২১: পদার্থবিজ্ঞান

আমরা একটি জটিল মহাবিশ্বে বাস করি। বিজ্ঞানীরা এই জটিলতার রহস্য উন্মোচনে কাজ করে যাচ্ছেন শত শত বছর ধরে। কিন্তু সেই জটিল রহস্যের খুব সামান্যই আমরা জানতে পেরেছি। দৈনন্দিন যেসব কাজ আমরা করতে অভ্যস্ত সেগুলি কত সহজেই আমরা করে ফেলি। কিন্তু সেই সহজ কাজও আসলে খুবই জটিল। ধরা যাক, হাত থেকে একটা কাচের গ্লাস ফ্লোরে পড়ে ভেঙে গেল। পদার্থবিজ্ঞানের ক্লাসিক্যাল মেকানিক্সের সাহায্যে আমরা সহজেই হিসেব করতে পারি গ্লাসটি কত বেগে ফ্লোরে পড়েছে, ত্বরণ কত ছিল, কত বল প্রয়োগ করা হয়েছে ইত্যাদি। এখন আমরা যদি এই ঘটনাটির পুনরাবৃত্তি করতে চাই, যদি একই উচ্চতা থেকে, একই বেগে, একই বলে, একই ত্বরণে আরেকটি গ্লাস ফ্লোরে ফেলি – সেই গ্লাসটাও ভাঙবে ঠিকই – কিন্তু হুবহু আগের মতো হবে না। ভাঙা কাচের সংখ্যা ভিন্ন হবে, টুকরোগুলি ভিন্ন আকৃতির হবে, ভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়বে, এরকম অসংখ্য পার্থক্য থাকবে। তাই যেসব ঘটনার পূর্বাভাস আমরা শতকরা একশ ভাগ নিশ্চয়তার সাথে দিতে পারি, সেগুলি আসলে ঘটনাগুলির সরল রূপ। সম্পূর্ণ ঘটনার পূঙ্খানুপুঙ্খ পূর্বাভাস দেয়া অসম্ভব। কারণ ঘটনার অসংখ্য প্যারামিটারের যেকোনো একটিও যদি ভিন্ন হয়, পুরো ঘটনাই আলাদা আরেকটি ঘটনা হয়ে যায়। জটিল মহাবিশ্বের গ্রহ-নক্ষত্রগুলির গতবিধির কিছুকিছু আমরা মোটামুটিভাবে বুঝতে পেরেছি। সে হিসেবে কিছুটা পূর্বাভাসও দিতে পারছি। যেমন সৌরজগতের গ্রহগুলির ভবিষ্যতের অবস্থান ইত্যাদি। কিন্তু সেই পূর্বাভাসের অনিশ্চয়তার পরিমাণও বেশ বড়। 

প্রাকৃতিক জটিলতার একটি সহজ উদাহরণ হলো পৃথিবীর আবহাওয়া। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নতির সাথে সাথে আবহাওয়ার পূর্বাভাস এখন অনেক সঠিকভাবে দেয়া সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু কতটুকু সূক্ষ্মভাবে সঠিক এসব পূর্বাভাস? কত লক্ষ লক্ষ প্যারামিটার হিসেব করতে হয় – যদি আমরা সঠিকভাবে মেঘের গতি, তাপমাত্রা, বাতাসের বেগ, দিক, আর্দ্রতা, এসব মাপতে চাই। খুব সামান্য কিছুর পরিবর্তনেই আবহাওয়া বদলে যেতে পারে। লক্ষ লক্ষ প্যারামিটারের জটিলতার সমাধান করার চেষ্টা করি আমরা সহজ বৈজ্ঞানিক মডেল তৈরি করার মাধ্যমে। এসব মডেলের উপর ভিত্তি করে আমরা জটিল ব্যাপারকে সহজে বোঝার চেষ্টা করি। পৃথিবীর জলবায়ুর যে পরিবর্তন হচ্ছে, গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন যে ঘটছে তা আমরা জানতে পারছি পৃথিবীর জলবায়ুর মডেলের উপর গবেষণার মাধ্যমে। পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাবার জন্য যে এই পৃথিবীর মানুষ অনেকাংশে দায়ী সেই ব্যাপারটাও বৈজ্ঞানিক মডেলের উপর হিসেব করে বের করেছেন আমাদের বিজ্ঞানীরা। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং জটিলতার গবেষণার জন্য এবছরের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয়েছে। 

এবছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন তিনজন। পৃথিবীর জলবায়ুর প্রথম সার্থক বৈজ্ঞানিক মডেল তৈরি করেছেন যে দু’জন বিজ্ঞানী এবং তাঁদের সাথে আছেন একজন তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানী যিনি জটিলতার পদার্থবিজ্ঞানের একটি যুগান্তকারী সমাধান আবিষ্কার করেছেন। 

২০২১ সালের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন যৌথভাবে আমেরিকার প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর সুকুরু মানাবে, জার্মানির ম্যাক্স প্লাংক ইন্সটিটিউট অব মেটিওরলজির প্রফেসর ক্লাউস হাসেলমান, এবং ইতালির সাপিয়েনজা ইউনিভার্সিটি অব রোমের প্রফেসর জিওরজিও পারিসি। 

এবছরের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরষ্কার অন্যান্য বছরের চেয়ে তুলনায় কিছুটা আলাদা। কারণ নোবেল পুরষ্কারের গত ১২০ বছরের ইতিহাসে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের গবেষণার জন্য কিংবা জটিলতার পদার্থবিজ্ঞানের জন্য এর আগে কাউকে নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয়নি।

এবছর দুটো আলাদা বিষয়ে পুরষ্কার দেয়া হয়েছে, যদিও সূক্ষ্মভাবে বিষয়দুটো একটা বৃহত্তর জটিল কাঠামো-পদ্ধতির অংশ। পুরষ্কারের অর্ধেক অর্থ দেয়া হয়েছে প্রফেসর মানাবে এবং প্রফেসর হাসেলমানকে। তাঁরা পৃথিবীর জলবায়ুর ভৌত কাঠামোর কার্যকর মডেল তৈরিতে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছেন যার মাধ্যমে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির নির্ভরযোগ্য গাণিতিক পূর্বাভাস দেয়া সম্ভব হয়েছে। 

পুরষ্কারের বাকি অর্ধেক অর্থ দেয়া হয়েছে প্রফেসর পারিসিকে। তিনি পদার্থের জটিল ভৌত কাঠামোর ভেতরের সুপ্ত প্যাটার্ন আবিষ্কার করেছেন – যার মাধ্যমে আপাতদৃষ্টিতে যে সমস্ত সিস্টেম খুব বিশৃঙ্খল বলে মনে হয়, তাদের ভেতরও যে সুপ্ত শৃঙ্খলা আছে তা বোঝা যায়। তাঁর পদ্ধতির মাধ্যমে ক্ষুদ্রতম পরমাণু থেকে শুরু করে সৌরজগতের গ্রহগুলোর জটিল গতিবিধিও বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায় এবং গাণিতিকভাবে হিসেব করা যায়। 

বৈশ্বিক জলবায়ুর প্রথম সার্থক মডেল তৈরি করেছেন স্যুকুরো মানাবে। তাঁর জন্ম ১৯৩১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর জাপানের শিংগু প্রদেশে। তাঁর বেড়ে ওঠা, লেখাপড়া সব জাপানেই। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৩ সালে বিএ, ১৯৫৫ সালে এমএ, এবং ১৯৫৮ সালে ডক্টর অব সায়েন্স ডিগ্রি লাভ করেছেন তিনি। 

সেই সময় আমেরিকার ওয়াশিংটন ডিসিতে ইউএস ওয়েদার ব্যুরো আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়ার জন্য আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছে। আমেরিকান আবহাওয়াবিদ (মেটিওরোলজিস্ট) জোসেফ স্মাগোরিনস্কির নেতৃত্বে কম্পিউটারের সাহায্যে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়ার জন্য পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের মডেল তৈরি করে গাণিতিক হিসেবনিকেশ করা শুরু হয়। সেই সময়ের কম্পিউটারের আকার ছিল বিশাল, কার্যক্ষমতা ছিল খুবই কম। সেই কাজের জন্য একদল তরুণ গবেষক নিয়োগ দেয়া হলো। জাপান থেকে আমেরিকায় এসে স্যুকুরো মানাবে যোগ দিলেন সেখানে জেনারেল সার্কুলেশান রিসার্চ সেকশানে ১৯৫৮ সালের সেপ্টেম্বরে। তারপর আমেরিকাতেই রয়ে যান স্যুকুরো মানাবে। ১৯৭৫ সালে তিনি আমেরিকার নাগরিকত্ব পান। 

ইউএস ওয়েদার ব্যুরো থেকে ১৯৬৩ সালে  স্যুকুরো মানাবে সিনিয়র রিসার্চ মেটিওরোলজিস্ট হিসেবে যোগ দেন জিওফিজিক্যাল ফ্লুইড ডায়নামিক্স ল্যাবোরেটরিতে। ১৯৯৭ পর্যন্ত তিনি কাজ করেন সেখানে। এই ল্যাবে কাজ করার সময়েই তিনি পৃথিবীর জলবায়ুর প্রথম সার্থক মডেল তৈরি করেন।

পৃথিবীর জলবায়ুর মডেল তৈরির চেষ্টা চলছে অনেক বছর থেকে। প্রায় দু’শ বছর আগে ফরাসি পদার্থবিজ্ঞানী জোসেফ ফুরিয়ার পৃথিবীর বায়ুমন্ডল উত্তপ্ত হওয়ার কারণ আবিষ্কার করেন। সূর্যের আলোর যে পরিমাণ বিকিরণ পৃথিবীতে আসে তার বেশিরভাগ ভূপৃষ্ঠ শোষণ করে। আবার ভূপৃষ্ঠ থেকে যে পরিমাণ বিকিরণ নির্গত হয় তা পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে শোষিত হয়। ফলে বায়ুমন্ডল উত্তপ্ত হয়। সূর্যের আলো পৃথিবীতে আসে – সেই আলোর কম্পাঙ্ক বেশি, তরঙ্গদৈর্ঘ্য কম। কিন্তু ভূ-পৃষ্ঠ থেকে তাপের আকারে যে বিকিরণ নির্গত হয় তার কম্পাঙ্ক কম, তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেশি। ফলে সেগুলি পৃথিবীর বায়ুমন্ডল ভেদ করে মহাশূন্যে চলে যেতে পারে না। এই ব্যাপারটাকে আমরা গ্রিনহাউজ ইফেক্ট বলছি। আপাতদৃষ্টিতে এই হিসেবটা সহজ মনে হলেও এখানে অনেকগুলি প্যারামিটার কাজ করে। তার সবগুলিকে হিসেবের আওতায় আনার জন্য বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করে যাচ্ছেন বছরের পর বছর।

আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়ার জন্য ইউএস ওয়েদার ব্যুরোতে আবহাওয়ার যে গাণিতিক মডেল তৈরি করা হলো – তাতে বাতাসের তাপমাত্রার পরিবর্তন, আর্দ্রতার পরিবর্তন, বাতাসের বেগ, মেঘ এসবের সাথে পৃথিবীর স্থলভাগ এবং জলভাগের মিথস্ক্রিয়া কীভাবে ঘটে তার বৈজ্ঞানিক হিসেব নিকেশ করার জন্য কিছু মডেল দাঁড় করানো হলো। কিন্তু সেই মডেল দিয়ে পরিসংখ্যানের হিসেবে সম্ভাবনার কথা বলা যায়, কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলা যায় না। 

বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার সাথে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের যে সরাসরি সম্পর্ক আছে তা প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন সুইডিশ পদার্থবিজ্ঞানী সান্তে আরহেনিয়াস উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে। ১৯০৩ সালে তিনি রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন। বাতাসের স্বাভাবিক উপাদানের মধ্যে নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন মিলে শতকরা ৯৯ ভাগ, বাকি এক ভাগের মধ্যে খুব সামান্য পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড। এই  কার্বন-ডাই-অক্সাইড এবং জলীয় বাষ্প পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে যে তাপ বের হয় তা শোষণ করে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এটা কিন্তু খুবই দরকারি বিষয়। এটার কারণেই পৃথিবীপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এটা না হলে পৃথিবীপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা হতো মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেই তাপমাত্রায় পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভব হতো না। বিজ্ঞানী আরহেনিয়াস হিসেব করে দেখেছেন যে বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ যদি কমে গিয়ে অর্ধেক হয়ে যায়, তাহলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ৫ থেকে ৬ ডিগ্রি কমে যেতে পারে – যার ফলে পৃথিবীতে আবার বরফযুগ নেমে আসতে পারে। কিন্তু কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে গেলে কী হবে? পৃথিবীর গড়তাপমাত্রা বেড়ে যাবে। সামান্য বেড়ে গেলেই পৃথিবীর জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে। 

তরুণ আবহাওয়াবিদ স্যুকুরো মানাবে জটিল বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রার পরিবর্তন হিসেব করার জন্য একটি অত্যন্ত সরল মডেল তৈরি করলেন। তিনি ভূপৃষ্ঠ থেকে চল্লিশ কিলোমিটার উঁচু একটি বায়ুস্তম্ভ ধরে নিলেন। পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে এই উচ্চতায় ওজোনস্তর। পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে যে তাপ বিকীর্ণ হয় তা এই স্তরেই শোষিত হয়ে বায়ুমন্ডলের উষ্ণতা বাড়িয়ে দেয়। স্যুকুরো মানাবে হিসেব করে দেখতে চাইলেন বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণের তারতম্য ঘটলে বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রার কী পরিবর্তন ঘটে। সেই সময়ের কম্পিউটারের কয়েক শ ঘন্টা সময় লাগলো তাঁর মডেল দিয়ে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রার পরিবর্তন হিসেব করতে। কিন্তু হিসেবে যা দেখা গেলো তা অত্যন্ত দরকারি একটি হিসেব। বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ যদি দ্বিগুণ হয়ে যায় – তাহলে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের গড় তাপমাত্রা দুই ডিগ্রি বেড়ে যাবে। ১৯৬৭ সালে মানাবে এই মডেল প্রকাশ করেন। এটা ছিল তাঁর একমাত্রিক মডেলের পরীক্ষা। পরবর্তী কয়েক বছরে তিনি তাঁর একমাত্রিক মডেলকে ত্রিমাত্রিক মডেলে রূপান্তরিত করে আরো অনেকগুলি পরীক্ষা করলেন। তাঁর ত্রিমাত্রিক মডেল প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে। 

এরপর জলবায়ুর পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির বৈজ্ঞানিক কারণ সন্ধানে সক্রিয় থেকেছেন বিজ্ঞানী মানাবে। ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত আমেরিকায় কাজ করার পর ৬৬ বছর বয়সে তিনি জাপানে ফিরে যান। ২০০৯ পর্যন্ত তিনি কাজ করেছেন জাপানে। ১৯৯৭ থেকে ২০০২ পর্যন্ত তিনি ছিলেন জাপানের ফ্রন্টিয়ার রিসার্চ সেন্টার ফর গ্লোবাল চেঞ্জ-এর গ্লোবাল ওয়ার্মিং রিসার্চ প্রোগ্রামের পরিচালক। ২০০২ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত জাপান ম্যারিন-আর্থ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি অর্গানাইজেশানের কনসালট্যান্ট হিসেবে কাজ করেছেন। গবেষণা-প্রতিষ্ঠানে তাঁর পূর্ণকালীন চাকরি হলেও তিনি যুক্ত ছিলেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা-প্রকল্পের সাথে। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোগ্রাম ইন অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যান্ড ওশেনিক সায়েন্সের সিনিয়র মেটিওরোলজিস্ট হিসেবে কাজ করছেন ২০০৫ সাল থেকে। এই নব্বই বছর বয়সেও তিনি সক্রিয়। 

শিল্পবিপ্লবের পর থেকেই পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। এর কারণ বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের বৃদ্ধি। স্যুকুরো মানাবের মডেল থেকে এর প্রমাণ পাওয়া গেছে। এখন প্রশ্ন হলো কার্বন-ডাই-অক্সাইডের এই বৃদ্ধি কি প্রাকৃতিকভাবেই ঘটছে, নাকি এর জন্য পৃথিবীর মানুষ দায়ী? এই প্রশ্নে পৃথিবীর মানুষ বিভক্ত। বিশেষ করে রাজনীতিবিদরা মানতেই চাচ্ছেন না যে এর জন্য মানুষ দায়ী? কীভাবে প্রমাণ করা যাবে যে এরজন্য মানুষ দায়ী না প্রকৃতি? এই মোক্ষম প্রমাণটি করা সম্ভব হয়েছে বিজ্ঞানী ক্লাউস হাসেলমানের মডেল থেকে। সেজন্যই হাসেলমানও এবার নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন। 

ক্লাউস হাসেলমানের জন্ম ১৯৩১ সালের ২৫ অক্টোবর জার্মানির হামবুর্গে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে তাঁর বাবা ইংল্যান্ডে চলে যান। ১৯৩৪ থেকে ১৯৪৯ পর্যন্ত সেখানে ছিলেন। কেমব্রিজ হায়ার স্কুল সার্টিফিকেট পাস করেছেন ইংল্যান্ড থেকেই। তারপর জার্মানিতে ফিরে এসে হামবুর্গে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েন এক বছর। ১৯৫৫ সালে হামবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে ডিপ্লোমা লাভ করেন। ১৯৫৭ সালে গটিংগেন ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ইউনিভার্সিটি অব হামবুর্গের ইন্সটিটিউট অব নেভাল আর্কিটেকচারে রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬১ সালে তিনি আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া লা হোইয়ার ইন্সটিটিউট ফর জিওফিজিক্স অ্যান্ড প্লানেটারি ফিজিক্সের  অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬৩ সালে ফিরে আসেন জার্মানিতে। ১৯৬৪ সালে হামবুর্গ ইউনিভার্সিটিতে লেকচারার হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭২ সালে তিনি হামবুর্গ ইউনিভার্সিটির থিওরেটিক্যাল জিওফিজিক্সের প্রফেসর এবং ইন্সটিটিউট অব জিওফিজিক্সের ম্যানেজিং ডিরেক্টর হন। ১৯৭৫ সালে ম্যাক্স-প্ল্যাংক ইন্সটিটিউট অব মেটিওরোলজি স্থাপিত হয়। ইন্সটিটিউটের প্রথম ডিরেক্টর হিসেবে যোগ দেন তিনি। ১৯৮৮ সালে আতঁকে জার্মান ক্লাইমেট কম্পিউটার সেন্টারের সায়েন্টিফিক ডিরেক্টর করা হয়। ১৯৯৯ সালে ৬৮ বছর বয়সে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। তারপর থেকে এই নব্বই বছর বয়সেও তিনি ম্যাক্স প্ল্যাংক ইন্সটিটিউট অব মেটিওরলজির অবসরোত্তর প্রফেসর হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। 

১৯৮০ সালে প্রফেসর ক্লাউস হাসেলমান পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তনে যে মানুষের ভূমিকা আছে তা প্রমাণ করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তন খুবই জটিল প্রক্রিয়ায় ঘটছে। স্থানীয় আবহাওয়ার প্যারামিটার আর বৈশ্বিক জলবায়ুর প্যারামিটার এক নয়। আবহাওয়া ও জলবায়ুর মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর গাণিতিক প্রক্রিয়া ভীষণ জটিল এবং অনিশ্চয়তায় ভরা। আমাদের পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তন সুষম নয়, কারণ মহাকাশ থেকে যে সৌরবিকিরণ পৃথিবীতে এসে পড়ে তা সব জায়গায় সমানভাবে পড়ে না। পৃথিবী নিজের অক্ষে প্রায় ২৪ ডিগ্রি কোণে ঝুঁকে আছে বলেই পৃথিবীতে জলবায়ুর পরিবর্তন, ঋতু-পরিবর্তন দেখা যায়। বিভিন্ন জায়গায় তাপমাত্রার ভিন্নতার কারণে বায়ুপ্রবাহের গতিপথ পরিবর্তন হয়। স্থলভাগের জলবায়ু আর জলভাগের জলবায়ুর মধ্যেও আছে ব্যাপক পার্থক্য। এই জটিল জলবায়ুর পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস একেবারে সঠিকভাবে দিতে হলে আমাদের জানতে হবে মহাবিশ্বের সবগুলি কণার সঠিক অবস্থান ও গতিবেগ। কিন্তু তা একেবারেই অসম্ভব। 

প্রফেসর হাসেলমান দেখলেন আমাদের আবহাওয়ার একটি আদর্শ সাম্য অবস্থা ধরে নিয়ে তার পরিবর্তনকে যদি দ্রুত পরিবর্তনশীল গোলমাল বা নয়েজের সাথে তুলনা করা যায় – তাহলে একটা সমাধান পাওয়া যেতে পারে। পদার্থবিজ্ঞানে আকাঙ্খিত তথ্যকে আমরা সিগনাল এবং অনাকাঙ্খিত তথ্যকে নয়েজ বা গোলমাল হিসেবে ধরে নিয়ে সিগনাল টু নয়েজ রেশিও বা তথ্য ও গোলমালের অনুপাত হিসেব করা হয়। তথ্যের চেয়ে গোলমাল বেশি হলে রেজাল্টের কোয়ালিটি খারাপ হয়। সেভাবে হিসেব করলে ধরা যায় – শান্ত আবহাওয়ার নয়েজ কম, ঝড়ো আবহাওয়ায় নয়েজ বেশি। এখন এই নয়েজের পরিমাণ এবং প্রভাব যদি হিসেব করা যায়, তাহলে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়া সম্ভব। সেভাবে সমগ্র পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তনও হিসেব করা সম্ভব। 

এধরনের জটিল পদ্ধতির একটি সমাধান অনেক বছর আগে আইনস্টাইনও করেছিলেন – যার নাম ব্রাউনিয়ান গতি।  কোন তরল পদার্থের উপর খালি চোখে দেখা যায় না এরকম ছোট ছোট পদার্থের কণা ভাসতে থাকলে কণাগুলোর গতি কোন নির্দিষ্ট নিয়মে ব্যাখ্যা করা যায় না। তাদের গতি হয় অত্যন্ত অনিয়মিত। আঠারো শতকে স্কটিশ উদ্ভিদবিজ্ঞানী ব্রাউন এ গতি প্রথম পর্যবেক্ষণ করেন বলে এ গতির নাম দেয়া হয়েছে ব্রাউনিয়ান গতি। আইনস্টাইন প্রমাণ করেছিলেন যে এক মিলিমিটারের এক হাজার ভাগের একভাগের সমান বা তার চেয়েও ছোট কণাগুলো তরল পদার্থে ওরকম বিশৃঙ্খলভাবে চলাফেরা করার কারণ হলো তাদের থার্মাল ডায়নামিক্স। বোলটজম্যানের সূত্র ব্যবহার করে আইনস্টাইন ব্রাউনিয়ান গতির গাণিতিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। হাসেলমান আবহাওয়ার উপাদানগুলিকে ব্রাউনিয়ান গতির মতো ধরে নিয়ে একটি স্ট্যাটিসটিক্যাল মডেল দাঁড় করালেন। সেই মডেলটি চমৎকার কাজ করলো। তিনি গাণিতিকভাবে প্রমাণ করলেন যে ভূপৃষ্ঠের জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তন ঘটলেও সমুদ্রে সেই পরিবর্তন হয় অনেক ধীর প্রক্রিয়ায়। তাই মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি বেড়ে গেলেও – সমুদ্রের তাপমাত্রা সেই পরিমাণে বাড়তে কয়েক হাজার বছর লেগে যেতে পারে। 

জলবায়ুর পরিবর্তনে মানুষের কি কোন ভূমিকা আছে? থাকলে কতটুকু আছে? প্রফেসর হাসেলমান তাঁর জলবায়ুর মডেলের সাহায্যে জলবায়ুর পরিবর্তনে মানুষের ভূমিকা হিসেব করে বের করলেন। প্রাকৃতিক ঘটনাগুলির প্রভাবে তাপমাত্রার কতটুকু পরিবর্তন হয় তা হিসেব করলেন। আর মানুষের প্রভাব – যাকে তিনি নাম দিলেন ‘ফিঙ্গারপ্রিন্ট’ – তাও হিসেব করলেন। ১৮৫০ সালের মাঝামাঝি থেকে এপর্যন্ত মাত্র ১৭০ বছরে পৃথিবীর কার্বন-ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে গেছে ৪০ শতাংশ। এই পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড প্রকৃতি গত লক্ষ বছরেও তৈরি করতে পারেনি। মানুষের জ্বালানি ব্যবহার এবং অন্যান্য কারণে এই কার্বন-ডাই-অক্সাইড বৃদ্ধির ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়ে গেছে এক ডিগ্রি। 

পৃথিবীর অনেক রাজনৈতিক নেতা বিজ্ঞানের এই সত্যকে মেনে নিতে চান না। এবারের নোবেল পুরষ্কার এমন একটা বিষয়ে এমন একটা সময়ে দেয়া হলো যে নেতারা হয়তো মেনে নিতে বাধ্য হবেন। ২০২১ সালে জলবায়ু পরিবর্তন কনফারেন্স হবে ৩১ অক্টোবর গ্লাসগোতে। সেখানে অবশ্যই নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীদের এই গবেষণার ফলকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রমাণ হিসেবে মেনে নেয়া হবে। 

এবার জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টার জটিলতা বিবেচনা করে – জটিলতার পদার্থবিজ্ঞানের  গবেষণায় তাত্ত্বিকভাবে সবচেয়ে সফল পদার্থবিজ্ঞানী জর্জিও পারিসিকে। পদার্থবিজ্ঞানের যেসব কাজকর্মকে আপাতদৃষ্টিতে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে হয়, সেগুলির মধ্যেও একটা সমন্বয়ের সম্পর্ক আবিষ্কার করেছেন ইতালিয়ান তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী জর্জিও পারিসি। 

জর্জিও পারিসির জন্ম ১৯৪৮ সালের ৪ আগস্ট ইতালির রোমে। তাঁর পিতামহ এবং পিতা বংশানুক্রমিকভাবে ছিলেন নির্মাণশ্রমিক। তাঁর বাবা চেয়েছিলেন ছেলে তাঁর মতো নির্মাণশ্রমিক না হয়ে ভালো কিছু করুক। অন্তত ইঞ্জিনিয়ার হোক। কিন্তু জর্জিও ইঞ্জিনিয়ারিং-এর চেয়েও বেশি ভালোবাসেন সায়েন্স ফিকশান। জনপ্রিয় বিজ্ঞানের বই পড়তে পড়তে তিনি গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের দিকে ঝোঁকেন। গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রির পর, তিনি ১৯৭০ সালে সাপিয়েনজা ইউনিভার্সিটি অব রোম থেকে পিএইচডি অর্জন করেন। ১৯৭১ থেকে ১৯৮১ পর্যন্ত তিনি ইতালির ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি অব ফ্রাসকাটিতে গবেষক হিসেবে কাজ করেন। এই ল্যাবরেটরিতে ১.১ গিগা-ইলেকট্রনভোল্ট শক্তির ইলেকট্রন সাইক্লোট্রন আছে। সেখানে কর্মরত অবস্থায় তিনি অতিথি-বিজ্ঞানী হিসেবে গবেষণা করেছেন কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ইওরোপের অনেক গবেষণাগারে। ১৯৮১ সালে তিনি প্রফেসর হিসেবে যোগ দেন ইউনিভার্সিটি অব রোমে। ১৯৯২ পর্যন্ত সেখানে ছিলেন। তারপর তিনি কোয়ান্টাম থিওরির প্রফেসর হিসেবে যোগ দেন স্যাপিয়েনজা ইউনিভার্সিটি অব রোমে। বর্তমানে ৭৩ বছর বয়সেও তিনি সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মরত আছেন।

তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের জগতে প্রফেসর জর্জিও পারিসি একটি বিখ্যাত নাম। বিশেষ করে ইতালির বিজ্ঞান জগতের উন্নয়নে তিনি ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন। তিনি হলেন ইতালির ষষ্ঠ নোবেলবিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী। তাঁর গবেষণার ব্যাপ্তি বিশাল। বিশৃঙ্খলার পদার্থবিজ্ঞানে যূগান্তকারী তত্ত্ব আবিষ্কার ছাড়াও তিনি উল্লেখযোগ্য গবেষণা করেছেন পার্টিক্যাল ফিজিক্স ও স্টাটিস্টিক্যাল ফিজিক্সেও। ১৯৭ সালে তিনি আবিষ্কার করেন প্রোটন ও নিউট্রনের মধ্যে কোয়ার্ক ও গ্লুয়ন কীভাবে বিন্যস্ত থাকে। মৌলিক কণার মৌলিক গঠন বুঝতে সাহায্য করেছে প্রফেসর পারসির আবিষ্কার। 

১৯৭৯ থেকে ১৯৮৪ সালের মধ্যে তিনি যে গবেষণার ভিত্তি তৈরি করেন – সেটা বিশৃঙ্খলার পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায় বলা চলে কিছুটা শৃঙ্খলা নিয়ে আসে। তাঁর ‘স্পিন-গ্লাস’ তত্ত্ব পদার্থবিজ্ঞানের এই শাখায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটায়। বস্তুর ক্ষুদ্রতম জগত আপাতদৃষ্টিতে যতটুকু শৃঙ্খলা মেনে চলে বলে মনে করা হয়, আসলে ততটা নয়। ধরা যাক গ্যাসের কথা। তাপমাত্রা বাড়লে গ্যাসের অণুগুলি ছোটাছুটি করে বিশৃঙ্খলভাবে। তাপমাত্রা কমাতে থাকলে এদের গতি আস্তে আস্তে কমতে থাকে, এরা ক্রমে স্থির হয়। তাপমাত্রা আরো কমলে গ্যাস তরল হয়। একই পরিমাণ গ্যাস একইভাবে তাপমাত্রা কমালে ও বাড়ালে বিভিন্নবার বিভিন্নরকমের আণবিক-বিন্যাস দেখায়। তাহলে আর শৃঙ্খলা থাকলো কীভাবে? 

প্রফেসর পারিসি খুব ছোট্ট একটা উদাহরণ দিয়ে দেখালেন যে কণাগুলি অনবরত দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে, হতাশ হয়ে পড়ে। কীভাবে? যদি কোন অবস্থায় একটি কণার স্পিন হয় উপরের দিকে, অন্যটির নিচের দিকে, তাহলে তৃতীয় কণার স্পিন কোন্‌ দিকে হবে – তা কীভাবে নির্ধারিত হয় – যদি কণাগুলি সব একই রকমের হয়? তৃতীয় কণার উপর প্রথম কিংবা দ্বিতীয় যে কোন একটার প্রভাব থাকতে পারে/ দুইটারও প্রভাব থাকলে তৃতীয় কণাটি কি ভিন্ন একটা দিক বেছে নিতে পারে? এই অবস্থাকে স্পিন ফ্রাস্ট্রেশান বা ঘূর্ণন-হতাশা বলা যেতে পারে। ১৯৭৯ সালে প্রফেসর পারিসি লোহা ও তামার একটি শংকরপদার্থের মধ্যে চৌম্বকক্ষেত্রের সাহায্যে লোহা ও তামার পরমাণুর স্পিন পরীক্ষা করে দেখেন চৌম্বকক্ষেত্রের প্রভাবে পরমাণু কোন্‌ দিকে ঘুরবে সে ব্যাপারে দ্বিধা দেখা দেয়। ফলে দেখা যায় একই পদার্থের পরমাণু হলেও একই চৌম্বকক্ষেত্রের মধ্যে তারা ভিন্ন ভিন্ন দিকে ঘুরছে। এর কারণ কী? প্রফেসর পারিসি এই প্রশ্নের গ্রহণযোগ্য উত্তর খুঁজে পেয়েছেন। 

নোবেল কমিটি যদিও বলছেন প্রফেসর পারিসির গবেষণা এবং প্রফেসর মানাবে ও হাসেলমানের গবেষণার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক আছে, কিন্তু সে ব্যাপারে জলবায়ু-বিজ্ঞানীদের বেশ সন্দেহ আছে। কারণ স্বয়ং প্রফেসর মানাবিই প্রফেসর পারিসির গবেষণার সাথে পরিচিত নন। সে যাই হোক, এবারের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেলপুরষ্কার নিসন্দেহে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধে কাজ করার ব্যাপারে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করবে। 

তথ্যসূত্র:

www.nobelprize.org, PNAS vol. 103 (21) 2006, Science 292: 641-642 (2001), Physics Today Special edition 2021. 

_________________
বিজ্ঞানচিন্তা অক্টোবর ২০২১ সংখ্যায় প্রকাশিত









Saturday, 22 January 2022

স্বপ্নলোকের চাবি - পর্ব ৫৬

 



#স্বপ্নলোকের_চাবি_৫৬


নিউটন, ফ্যারাডে, আইনস্টাইন শ্রোডিঙ্গার ডি-ব্রগলি – এরকম অসংখ্য নাম এবং তাদের সমীকরণ মুখস্থ করতে করতে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠার সময় আমার প্রায়ই মনে হয় এঁরা কেউই আমাদের আপন মানুষ নন। এঁদের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে ভাসাভাসা যতটুকু তথ্য আমরা জেনেছি তাতে এঁদের কাউকেই আমাদের কাছের মানুষ বলে মনে হয় না। পদার্থবিজ্ঞানে এঁদের অত্যন্ত দরকারি সব আবিষ্কারের কারণেই এই পৃথিবী এমন আধুনিক হতে পেরেছে – একথা সত্য। কিন্তু সেই আধুনিকতায় আমাদের নিজেদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নেই। বুঝে না বুঝে যে কোনোভাবে পরীক্ষার খাতায় উত্তর লেখার প্রস্তুতি নিয়েই আমাদের দায় শেষ। নিজের বিভাগের প্রতি, নিজের পঠিত বিষয়ের প্রতি ভালোবাসা জন্মানোর জন্য চোখের সামনে একেবারে নিজেদের মানুষ থাকতে হয় – যাঁদের দেখে আমরা অনুপ্রেরণা পাবো। সেরকম উদাহরণ আমাদের চোখের সামনে একেবারেই যে নেই তা নয়, কিন্তু কেন যেন আমাদের স্যার-ম্যাডামরা সেসব উদাহরণ আমাদের ক্লাসে তুলে ধরেননি। শুধুমাত্র ক্লাসরুমেই তো স্যার-ম্যাডামদের সাথে আমাদের সরাসরি সংযোগ ঘটার সুযোগ ঘটে। আড়াই হাজার বছর আগের সক্রেটিসের যুগের শিক্ষাব্যবস্থার মতো করে তো আর কেউ শেখাবেন না এ যুগে। সেটা আমরা আশাও করি না। কিন্তু ক্লাসে এসে আমাদের কাছের মানুষদের কথা বুঝি একবারও বলতে নেই? বোস-আইনস্টাইন স্ট্যাটিসটিক্স আমরা পড়েছি সত্যেন বসু কীভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে এই আবিষ্কার করেছিলেন তা না জেনেই। সিলেবাসে নেই বলেই হয়তো স্যাররা আবিষ্কারের পেছনের ইতিহাসটুকু উল্লেখ করেননি। কিন্তু সিলেবাসের বাইরের সেই কথাগুলি যদি বলতেন তাহলে হয়তো আমাদের আরো নিজের মনে হতো বিষয়টাকে। নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে স্ট্রং নিউক্লিয়ার ফোর্স ও উইক নিউক্লিয়ার ফোর্স পড়ার সময় যদি আমরা জানতাম যে উইক নিউক্লিয়ার ফোর্স আর ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফোর্স যে একই রকম ফোর্স তা আবিষ্কার করেছেন যে তিনজন বিজ্ঞানী তাঁদের একজন হলেন আমাদের একেবারে নিজস্ব বিজ্ঞানী আবদুস সালাম, তাহলে হয়তো আরো আপন মনে হতো এই বিষয়টাকেও। যদি জানতাম যে আবদুস সালামকে অনার্স মাস্টার্স পড়ার সময় কষ্ট করতে হয়েছে আমাদের মতোই কিংবা আমাদের চেয়েও বেশি – আমাদের উৎসাহ বাড়তো বৈ কি। ১৯৮৮ সালে এই নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন – সেটা নিয়েও কোন আলোচনা আমাদের ক্লাসে করেননি কেউ। আমাদের এই ডিপার্টমেন্ট যে বাংলাদেশের সেরা পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ হিসেবে গড়ে উঠেছিল প্রফেসর এখলাস উদ্দীন আহমদ-এর চেষ্টা এবং অক্লান্ত পরিশ্রমে সেটাও আমরা সেভাবে জানতে পারিনি। আমাদের অনার্স কোর্সের সিলেবাস সেই ১৯৬৯ সালে লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের সিলেবাস অনুসরণে তৈরি করেছিলেন প্রফেসর এখলাস উদ্দীন আহমদ। এই ইম্পেরিয়েল কলেজের প্রফেসর ছিলেন আবদুস সালাম। এসব জানলে হয়তো আমাদের সিলেবাসভীতির পাশাপাশি কিছুটা প্রীতিও জন্মাতে পারতো। 

ক’দিন থেকে এই কথাগুলি মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে এখলাস উদ্দীন স্মরণে ডিপার্টমেন্টের একটা অনুষ্ঠানের গ্রন্থনা করতে গিয়ে। এখলাসস্যার মারা গেছেন ১৯৮৪ সালের ২০ আগস্ট। ১৯৮৪ থেকে ১৯৯২ – আট বছর কি খুব বেশি সময়? স্যার মারা যাবার দুই বছর পরেই আমরা ডিপার্টমেন্টে ক্লাস করতে শুরু করেছি। অথচ এই ডিপার্টমেন্টকে একটা উন্নতমানের ডিপার্টমেন্টে পরিণত করে তোলার জন্য এখলাসস্যারের যে অবিরাম চেষ্টা ছিল – সেই কথাটুকু আমরা সেভাবে জানতে পারিনি। একথা ঠিক যে প্রতিবছর আগস্টের ২০ তারিখ – বা তার কাছাকাছি সময়ে অধ্যাপক এখলাস উদ্দীন স্মারক অনুষ্ঠান হয়। সেখানে কিছু আলোচনা হয়, আনুষ্ঠানিক গুণকীর্তন করা হয় – তারপর সব শেষ। পরের বছর আবার সবকিছুর পুনরাবৃত্তি। 

গতবছর তিনদিনব্যাপী এখলাস উদ্দীন স্মারকবক্তৃতার আয়োজন করা হয়েছিল। প্রামাণিকস্যার ‘রিলিজিয়াস অ্যান্ড সায়েন্টিফিক ভিউজ অব দ্য ইউনিভার্স’ শীর্ষক বক্তৃতা দিতে গিয়ে নাজেহাল হয়েছিলেন। দ্বিতীয় দিনের পর বক্তৃতামালা বাতিল করে দেয়া হয়েছিল। এবছর চেয়ারম্যান সোবহানস্যারের কড়া হুকুম – গতবছরের মতো কিছু হওয়া চলবে না। এবার দু’ঘন্টার মধ্যেই সবকিছু শেষ করতে হবে। হামিদাবানুম্যাডাম আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন অনুষ্ঠানটির গ্রন্থনা এবং উপস্থাপনা করার জন্য। ১৯৮৬ সালে এখলাস উদ্দীন স্মারক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। ম্যাডাম বইটির একটি কপি আমাকে দিয়েছেন। ইচ্ছে থাকলে একজন অধ্যাপক কত সীমিত সুযোগের মধ্যেও একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য কত কিছু যে করতে পারেন – তার প্রত্যক্ষ উদাহরণ প্রফেসর এখলাস উদ্দীন আহমদ। 

১৯৬৮-৬৯ সালে শামসুল হক, এখলাস উদ্দীন আহমদ, হামিদা বানু, সরিৎ কুমার সাহা, এবং সাখাওয়াত হোসেন – এই পাঁচজন প্রফেসরকে নিয়ে শুরু হয়েছিল আমাদের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ। হামিদা বানুম্যাডাম এবং এস কে সাহাস্যার এখনো আমাদের ডিপার্টমেন্টে আছেন – এটা আমাদের গর্বের বিষয়। এখলাসস্যার আমাদের ডিপার্টমেন্টকে গড়ে তোলার পাশাপাশি পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কে গড়ে তোলায় সচেষ্ট ছিলেন। সরকার ফরেস্ট্রি ইন্সটিটিউট ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে ফেলেছিল। এখলাসস্যার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সবাইকে যুক্তি এবং তথ্য দিয়ে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে ফরেস্ট্রির জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ই সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা। তাঁর চেষ্টাতেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পেয়েছে ইন্সটিটিউট অব ফরেস্ট্রি। সামুদ্রিক বিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের বেলাতেও একই ঘটনা ঘটলো। পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল কক্সবাজার বা শহরের কোথাও এই ইন্সটিটিউট হবে। এখলাসস্যারের চেষ্টায় আমাদের ক্যাম্পাসেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সামুদ্রিক বিজ্ঞান ইন্সটিটিউট। 

আমাদের সায়েন্স ফ্যাকাল্টির এই ভবনটি তৈরি হয়েছে এখলাসস্যারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে। দিনরাত পরিশ্রম করে তিনি এর ভীত থেকে শুরু করে প্রতিটি নির্মাণ-ধাপ তদারক করেছেন তাঁর অন্যান্য শত ব্যস্ততা থাকা সত্ত্বেও। আক্ষরিক অর্থেই বলা চলে সায়েন্স ফ্যাকাল্টির প্রতিটি ইটেই আছে এখলাসস্যারের ছোঁয়া। প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে জানা গেছে – দেয়াল গাঁথার আগে এখলাসস্যার নিশ্চিত করেছেন যেন প্রতিটি ইট পানিতে ভেজানো হয়। এসব কাজে তিনি প্রায়ই নিজে হাত লাগাতেন। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের সন্তানদের পড়াশোনার সুবিধার্থে এখলাসস্যারের একান্ত চেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অ্যান্ড কলেজ। উপযুক্ত অধ্যক্ষ খুঁজে পাওয়ার আগপর্যন্ত নিজেই অবৈতনিক অধ্যক্ষের কাজ করেছেন এই প্রতিষ্ঠানে। এই কর্মযোগী মানুষটার পরিচয় যদি আরো আগে পেতাম – তাহলে কাজের প্রতি ভালোবাসার ভিতটা আরো শক্ত হতো। 

এখলাসস্যারের অকালমৃত্যুর পর সবকিছু কেমন যেন স্থবির হয়ে যায়। শুধুমাত্র একজন কর্মবীর হলে যা হয়। আমাদের কর্মসংস্কৃতিই সম্ভবত এরকম। যখন কেউ একজন প্রচুর কাজ করেন, আমরা তাঁর সামনে তাঁর কাজের প্রশংসা করি, আড়ালে সমালোচনা করি, কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই তাঁর কাঁধে কাঁধ মিলাই। তাই আমাদের দেশে প্রায়ই দেখা যায় কর্মবীররা খুবই একা। তাঁদের অনুপস্থিতিতে তাঁদের শুরু করা কাজ এগিয়ে নিয়ে যাবার মতো নির্ভরযোগ্য কেউ থাকে না। 

এখলাসস্যারের মৃত্যুর পর হামিদাবানুম্যাডাম যেন এখলাসস্যারের অসমাপ্ত কাজের হাল ধরতে না পারেন – সেজন্য যত ধরনের ষড়যন্ত্র করা যায় সবই করেছে ছাত্রশিবির এবং তাদের দোসররা। ম্যাডামের নামে কুৎসা রটিয়েছে তারা। এখলাসস্যার ও হামিদাবানুম্যাডামের দাম্পত্যজীবন সম্পর্কেও নানারকম মিথ্যা কথা ছড়িয়েছে তারা। ওরা এখনো থামেনি। 

জামায়াত-শিবিরের নেটওয়ার্ক কত শক্তিশালী এবং ভয়ানক তা জানতে কারো বাকি নেই। তারা এখন ফ্রিডম পার্টির সাথে মিলে সারাদেশে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সমন্বয় কমিটির নেতাদের হত্যা করতে শুরু করেছে। ১৮ জুলাই ঢাকায় সমন্বয় কমিটির মিটিং-এ গুলি চালিয়ে দু’জনকে হত্যা করেছে, আহত করেছে প্রায় শতাধিক মানুষকে। জুলাইয়ের ৩১ তারিখ খুন হয়েছেন খুলনার সিপিবির প্রবীণ নেতা রতন সেন। ১৪ আগস্ট খুন হয়েছে খুলনার ছাত্রলীগ কর্মী শিপুল। ১৭ আগস্ট ওয়ার্কার্স পার্টির কার্যালয়ের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন রাশেদ খান মেনন। ২০ আগস্ট এর প্রতিবাদে সারাদেশে হরতাল ডাকা হয়েছে। 

এখলাসস্যারের স্মারক অনুষ্ঠানটি ২০ আগস্ট হবার কথা ছিল। হরতালের কারণে পিছিয়ে ২৫ তারিখে করা হলো। সায়েন্স ফ্যাকাল্টির নতুন ডিন নির্বাচিত হয়েছেন পরিসংখ্যানের সুলতান আহমদস্যার। তাঁকে প্রধান অতিথি করা হলো। স্মারক গ্রন্থ থেকে কিছু অংশ পড়ার জন্য আমাদের রুমাকে রাজি করিয়েছিলাম। রুমা খুবই সিরিয়াস টাইপের মানুষ। আমাদের মতো অকারণে হাসি-তামাশা সে কখনোই করে না। এখলাসস্যারের স্মারক অনুষ্ঠান ভাবগম্ভীর অনুষ্ঠান বলেই সে রাজি হয়েছে। তার পড়ার ভঙ্গি চমৎকার, উচ্চারণ নিখুঁত, আর কন্ঠস্বর আশ্চর্য সুন্দর। ছাত্রদের পক্ষ থেকে আমাদের প্রেমাঙ্কর আর পরের ব্যাচের রানা এখলাসস্যার সম্পর্কে বললো। রানা তার নামের ব্যাপারে খুবই যত্নবান। সে আমাকে বার বার অনুরোধ করেছে যেন তার নাম - আহমেদ ওবায়দুস সাত্তার ভুঁইয়া - উচ্চারণে যেন কোন ভুল না করি। নুরুল মোস্তফাস্যার ছিলেন এখলাসস্যারের সরাসরি ছাত্র। তিনি তাঁর প্রিয় শিক্ষকের স্মৃতিচারণ করলেন। এস কে সাহাস্যার এখলাসস্যারের সাথে শুরু থেকে কাজ করেছেন ডিপার্টমেন্টে। তিনি সেই সময়ের অনেক কথা বললেন যেগুলি শুনে বার বার মনে হচ্ছিল – আহা, এখলাসস্যারের ছাত্র হতে পারলাম না। ডেপুটি রেজিস্ট্রার জনাব আবু হেনা মোহাম্মদ মোহসীন বললেন প্রশাসনিক কাজে এখলাসস্যার কী পরিমাণ দক্ষ ছিলেন তা অভাবনীয়। 

সব বক্তাই একমত হয়ে দাবি জানালেন এখলাসস্যারের হাতেগড়া বিজ্ঞান ভবনের নাম ‘এখলাস উদ্দীন বিজ্ঞান ভবন’ রাখা হোক এবং ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে ‘এখলাস উদ্দীন চেয়ার’ স্থাপন করা হোক। এই দাবি কতদিনে পূরণ হবে, কিংবা আদৌ হবে কি না জানি না। 

স্মারক বক্তৃতার বিষয় ছিল ‘প্রাকৃতিক ভারসাম্য – প্রক্রিয়াগত বিশ্লেষণ’। বক্তা প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক শফিক হায়দার চৌধুরি। কোন স্ক্রিপ্ট ছাড়াই এক ঘন্টার একটা বৈজ্ঞানিক বক্তৃতা যে এত নিখুঁতভাবে দেয়া যায় তা নিজের চোখে না দেখলে অবিশ্বাস্য মনে হতো। শফিক হায়দারস্যারের বক্তৃতা আগে শুনিনি কখনো। প্রাণিবিদ্যার অধ্যাপক হয়েও পদার্থবিজ্ঞানের অনেক বিষয় – বিশেষ করে বস্তুতরঙ্গ, কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অনিশ্চয়তা ইত্যাদির কী সুন্দর ব্যাখ্যা দিলেন তিনি। 

ডিপার্টমেন্টে যদি নিয়মিত সেমিনার বক্তৃতার আয়োজন করা হতো – কতো ভালো হতো। মাঝে মাঝে গৎবাঁধা ক্লাস লেকচারের চেয়ে সেমিনার লেকচার অনেক বেশি কার্যকরী। 

অনুষ্ঠান শেষ করে সবকিছু গুছিয়ে ডিপার্টমেন্ট থেকে বের হয়ে ক্যাফেটরিয়ার সামনে আসতেই ঠুসঠাস শুরু হয়ে গেল। বন্দুক-যুদ্ধ। সারাদেশে এখন বিভিন্ন ফ্যাক্টরে বন্দুক-যুদ্ধ হচ্ছে ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে। শুরুতে প্রাণভয়ে ক্যাফেটরিয়ার ভেতরে ঢুকে গেলাম এক দৌড়ে। খবর পেতে দেরি হয় না। আজ লেগেছে ছাত্রদলের দুই গ্রুপের মধ্যে। কীসের আধিপত্য নিয়ে লেগেছে জানি না। তারা এখন রাষ্ট্রের ক্ষমতায়। তাদের হাতে বিভিন্ন ধরনের প্রজেক্ট। লাভের অংশ কিংবা আধিপত্যের ভাগাভাগি নিয়ে মারপিট চলছে। 

পরদিন এখলাসস্যারের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে চকবাজারে বিজ্ঞানপরিষদের অনুষ্ঠানে গেলাম। জামাল নজরুল ইসলামস্যার ও প্রামাণিকস্যার এখানে অতিথি হয়ে এসেছেন। প্রামাণিকস্যার আমাকে জামাল নজরুল ইসলামস্যারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। জামাল নজরুল ইসলামস্যারের সাথে কথা বলার সময় একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো। মনে হলো এত বড় একজন বিজ্ঞানী – অথচ কত সহজভাবে কথা বলেন। শফিক হায়দারস্যারও এসেছেন। তিনি ‘বস্তুতরঙ্গ ও জীবজগত’ সম্পর্কে বক্তৃতা দিলেন। আমরা যে পরিচিত মানুষের পদশব্দ চিনতে পারি – তা বস্তুতরঙ্গের সহজ এবং সরাসরি উদাহরণ। জীববিজ্ঞানে পদার্থবিজ্ঞানের ব্যবহার প্রথম করেছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু। সেই ব্যবহার এখন অনেক নতুন নতুন ক্ষেত্রে প্রসারিত হয়েছে। সেইসব ক্ষেত্রের দিকে আগ্রহ অনুভব করছি। অথচ আর দু’মাস পরেই আমার যেসব বিষয়ে পরীক্ষা দিতে হবে সেগুলিকে বিষবৎ লাগছে। 

মেসে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেল। তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। ফতেয়াবাদে বাস থেকে নেমে এটুকু হেঁটে আসতে কাকভেজা হয়ে গেছি। রুমে ঢুকে জামাকাপড় বদলে শোবার আয়োজন করতে মিনিট পনেরো লাগলো। মুরাদপুরের একটা রেস্টুরেন্টে খেয়ে এসেছি, নইলে এত রাতে আবার রান্না করতে হতো। রাত প্রায় এগারোটা বাজে। একটা লম্বা ঘুম দরকার। 

বিছানায় শোবার প্রায় সাথে সাথেই দরজায় ধুপধাপ শব্দ। এত রাতে আবার কে এলো! 

- কে?

- আমি সেলিম। দরজা খোল। 

সেলিমভাই, এত রাতে! দরজা খুললাম।

কাঁধে ব্যাগ, উস্কোখুস্কো চুল, এলোমেলো পোশাক। কেমন যেন অস্থির সেলিমভাই। 

“কী হয়েছে আপনার?”

“আজ তোমার রুমে ঘুমাবো আমি।“ 

পরের কয়েক মিনিটে অতি সংক্ষেপে সেলিমভাই জানালেন কী হয়েছে। তিনি হল থেকে বিতাড়িত হয়েছেন। শিবির এবং ছাত্রদল কিছুদিন ছাত্রলীগের এই নেতার প্রতি অনাক্রমণ চুক্তি করেছিল। কিন্তু এখন ছাত্রদলের অন্য একটি গ্রুপের সাথে টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশানে মিলছে না। ফলে হল থেকে গলাধাক্কা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতার যদি এই অবস্থা হয়! 

ক্লান্ত আর অপমানিত সেলিমভাই বিছানায় শোয়ার সাথে সাথে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, কিংবা ঘুমের মতো করে পড়েছিলেন। পরদিন সকালে তিনি অন্য কোথাও চলে যাবেন বলেছিলেন। কিন্তু পরের দশ দিন তিনি আর কোথাও যাননি। দিনের বেলা বের হলেও রাতে ফিরে এসেছেন। হয়তো উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিলেন। 

আমি পড়াশোনা করার চেষ্টা করছি যতটুকু পারি। এক রাতে সেলিমভাই বিছানায় শুয়ে পা নাড়াতে নাড়াতে হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা তুমি কি জানো যে বাংলাদেশে শুধু ভালো ছাত্র হয়ে খুব একটা লাভ নেই?”

“এটা কেন বলছেন ভাইয়া?”

“বলছি এই কারণে, তুমি যদি স্বপ্ন-টপ্ন দেখতে শুরু করো – তা বন্ধ করার জন্য। শেষে স্বপ্নভঙ্গ হলে কষ্ট পাবে।“

এরপর সেলিমভাই দুটো উদাহরণ দিলেন। জয়নাল এবং কবিরের। ছদ্মনামও হতে পারে। জয়নাল ইসলামের ইতিহাসের আর কবির পরিসংখ্যানের। দুজন একই রুমে কটেজে থাকতেন। জয়নাল তেমন সিরিয়াস ছিলেন না পড়াশোনায়। বেশির ভাগ সময় বাড়িতে থাকতেন। পরীক্ষার মাসখানেক আগে এসে এর ওর কাছ থেকে নোট জোগাড় করে পরীক্ষা দিতেন। আর কবিরের সারাবছর লেখাপড়া আর লেখাপড়া। কবির পরিসংখ্যানে অনার্স মাস্টার্স দুটোতেই ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছেন। আর জয়নাল ইসলামিক হিস্ট্রিতে কোন রকমে সেকেন্ড ক্লাস পেয়েছেন। শেষে কী হলো? জয়নাল এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আর কবির দেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি না পেয়ে একটা ব্যাংকে ঢুকেছেন। 

“এই গল্প আমাকে কেন বললেন সেলিমভাই?”

“না, এমনিতেই। নাথিং সিরিয়াস। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে তোমার অবস্থা কবিরের মতো হবে।“ 

আমি টেবিল থেকে মুখ ফিরিয়ে সেলিমভাইয়ের মুখের দিকে তাকানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু দূরের চৌকিতে চিৎশোয়া মুখ দেখা গেল না। কেবল দেখলাম তার পা দুটো একটার উপর আরেকটা উঠে রাজকীয় ভঙ্গিতে নড়ছে। 

Wednesday, 19 January 2022

রাদারফোর্ড: নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের স্থপতি

 


পরমাণুর নিউক্লিয়াস কে আবিষ্কার করেছেন? প্রোটন কে আবিষ্কার করেছেন? আলফা, বিটা, গামা রেডিয়েশান – কে আবিষ্কার করেছেন? কার হাত ধরে পদার্থবিজ্ঞানের নতুন শাখা -  নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের পথ চলা শুরু হয়েছিল সেই বিংশ শতাব্দীর শুরুতে? তেজস্ক্রিয়তার প্রথম এককের নাম কী ছিল? এরকম আরো অনেক প্রশ্নের উত্তর হলো - রাদারফোর্ড। সর্বকালের সেরা তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের মতে সর্বকালের সেরা পরীক্ষণ পদার্থবিজ্ঞানী ছিলেন আর্নেস্ট রাদারফোর্ড। 

আশ্চর্য হলেও সত্যি – রাদারফোর্ড হতে চেয়েছিলেন স্কুল-শিক্ষক। নিউজিল্যান্ডের কোন সাধারণ স্কুলে পড়ানোর জন্য তিনবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিলেন তিনি। সেই রাদারফোর্ড অচিরেই হয়ে উঠেছিলেন এতবড়ো বিজ্ঞানী – যিনি পদার্থবিজ্ঞানী হয়েও ১৯০৮ সালে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন রসায়নে – তেজস্ক্রিয় বিকিরণ সংক্রান্ত গবেষণার জন্য। পরে আরো দুটো নোবেল পুরষ্কার তিনি পেতে পারতেন – প্রোটন কিংবা নিউক্লিয়াস আবিষ্কারের জন্য। তাঁর প্রায় দুই ডজন গবেষক-ছাত্র এবং গবেষণা-সহযোগীর মধ্য থেকে পরবর্তীতে এগারোজন নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে। [ফ্রেডেরিক সডি – কেমিস্ট্রি – ১৯২১, নিল্‌স বোর – ফিজিক্স ১৯২২, জেমস চ্যাডউইক – ফিজিক্স ১৯৩৫, জর্জ ডি হেবেসি – কেমিস্ট্রি ১৯৪৩, অটো হ্যান – কেমিস্ট্রি ১৯৪৪, এডওয়ার্ড অ্যাপ্লেটন – ফিজিক্স ১৯৪৭, প্যাট্রিক ব্ল্যাকেট – ফিজিক্স ১৯৪৮, সিসিল পাওয়েল – ফিজিক্স ১৯৫০, আর্নেস্ট ওয়াল্টন – ফিজিক্স ১৯৫১, জন কক্ক্রফট – ফিজিক্স ১৯৫১, পিয়ত্র ক্যাপিৎসা – ফিজিক্স ১৯৭৮] 

পদার্থবিজ্ঞানের যে শাখার নাম আমরা এখন নিউক্লিয়ার ফিজিক্স হিসেবে জানি – সেই পুরো শাখাটির উৎপত্তি হয়েছে রাদারফোর্ডের নিউক্লিয়াস আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে। পরমাণুর প্রধান উপাদানগুলির আবিষ্কারের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন রাদারফোর্ড। ইলেকট্রনের আবিষ্কারক থমসন ছিলেন রাদারফোর্ডের গবেষণা-শিক্ষক। রাদারফোর্ড আবিষ্কার করেছেন প্রোটন এবং নিউক্লিয়াস, তাঁর ছাত্র চ্যাডউইক আবিষ্কার করেছেন নিউট্রন। নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের জনক বলা হয় রাদারফোর্ডকে। আধুনিক বিজ্ঞানের জগতের এই মহানায়ক রাদারফোর্ড ছিলেন একজন চাষীর ছেলে, যার শৈশবের বেশিরভাগ কেটেছে নিউজিল্যান্ডের এক অখ্যাত গ্রামে। 

নিউজিল্যান্ডের সাউথ আইল্যান্ডের একটি ছোট্ট শহর নেলসন। এই শহর থেকে বেশ কিছু দূরে ব্রাইটওয়াটার ও স্প্রিং-গ্রোভের মাঝামাঝি একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে আর্নেস্ট রাদারফোর্ডের জন্ম ১৮৭১ সালের ৩০ আগস্ট। তাঁর বাবা-মা খুব ছোটবেলায় নিউজিল্যান্ডে এসেছিলেন অভিবাসী হয়ে। বাবা জেমস রাদারফোর্ড এসেছিলেন স্কটল্যান্ড থেকে আর মা মার্থা এসেছিলেন ইংল্যান্ড থেকে। মার্থা একটি স্কুলে পড়াতেন, আর জেমস চাষাবাদের পাশাপাশি ঘোড়ার গাড়ির কাঠের চাকা মেরামত করতেন। জেমস-মার্থার বারোটি ছেলেমেয়ের মধ্যে চতুর্থ সন্তান – আর্নেস্ট। আর্নেস্টের বয়স যখন সাড়ে পাঁচ তখন তাদের পরিবার আরো পাঁচ কিলোমিটার দূরে ফক্সহিলে চলে যায়। সেখানে সাধারণ সরকারি স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি বাবা ও বড় ভাইদের সাথে জমিতে চাষাবাদের কাজও করতে হতো আর্নেস্টকে। বড় হয়ে দক্ষ আলুচাষী হবার প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলো আর্নেস্ট তার অন্যান্য ভাইদের সাথে। 

স্কুলের লেখাপড়ায় রাদারফোর্ড খুব যে অসাধারণ মেধার স্বাক্ষর রেখেছিলেন তা নয়। মা-বাবার অর্থনৈতিক সামর্থ্য ছিল খুবই কম। স্কলারশিপ না পেলে বেশিদূর পড়াশোনা করার সুযোগ ছিল না। তাই স্কুল-কলেজের স্কলারশিপ পাওয়ার জন্য যতটুকু রেজাল্ট করলে হতো – ঠিক ততটুকুই করতেন রাদারফোর্ড। ছোটবেলায় বিজ্ঞানের প্রতি আলাদা করে কোন আকর্ষণ তৈরি হয়নি। কিন্তু হাইস্কুল এবং কলেজে পড়ার সময় যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করতে উৎসাহ পেতেন রাদারফোর্ড।

 ১৮৮৭ সাল থেকে ১৮৮৯ পর্যন্ত নেলসন কলেজে মাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশোনার পর ক্যান্টারবারি কলেজে ভর্তি হন। ক্যান্টারবারি কলেজই অনেক বছর পরে ক্যান্টারবারি ইউনিভার্সিটিতে পরিবর্তিত হয়। রাদারফোর্ডের পরীক্ষণ বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় এখান থেকেই। তড়িৎচুম্বক তরঙ্গ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন তিনি এই সময়। বেতারতরঙ্গ প্রেরণ ও গ্রহণ করার একটি কার্যকরী যন্ত্র তৈরি করেন তিনি। ১৮৯২ সালে তিনি বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। বিএ পাস করার পর স্কুলের শিক্ষক হয়ে বিয়েসাদী করে সুখে দিন যাপন করার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। তাঁর প্রেমিকা মেরি নিউটনও এরকম সুখী-গৃহকোণের স্বপ্ন দেখেছিলেন তখন। কিন্তু স্কুলে চাকরি পাননি রাদারফোর্ড। কিন্তু বিএ পরীক্ষার রেজাল্টের ভিত্তিতে এমএ পড়ার জন্য একটা স্কলারশিপ পেলেন রাদারফোর্ড। বিয়ে মুলতবি রেখে ১৮৯৩ সালে এমএ পাস করলেন রাদারফোর্ড। 

নিউজিল্যান্ডের এমএ ডিগ্রিতেও একটি স্কুলমাস্টারি জুটছে না। রাদারফোর্ড স্থির করলেন ইওরোপে চলে যাবেন আরো লেখাপড়া করার জন্য। কিন্তু সেই সময় ইওরোপের ইউনিভার্সিটিতে স্কলারশিপ পেতে হলে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় দরখাস্ত করতে হতো। রাদারফোর্ড তাই এমএ পাস করার পরেও আবার বিএসসি কোর্সে ভর্তি হলেন ১৮৯৪ সালে। এই সময় ক্রাইস্টচার্চ বয়েজ হাইস্কুলের একজন শিক্ষক অসুস্থ হয়ে পড়লে রাদারফোর্ড কিছুদিন খন্ডকালীন শিক্ষকতা করার সুযোগ পান। কিন্তু সেই বেতনে ঘরসংসার করা সম্ভব ছিল না। তিনি ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করার জন্য একটি স্কলারশিপের দরখাস্ত করলেন।

ব্রিটিশ সরকার ১৮৫১ সাল থেকে তাদের কলোনিভুক্ত দেশগুলি– ব্রিটেন, আয়ারল্যান্ড, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের জন্য কিছু স্কলারশিপের ব্যবস্থা করেছিল। এসব দেশ থেকে মাত্র একজন বা দু’জনকে বছরে ১৫০ পাউন্ড করে দুই বছর পড়াশোনার জন্য এই স্কলারশিপ দেয়া হতো। ১৮৯৫ সালে নিউজিল্যান্ডের জন্য মাত্র একটি স্কলারশিপ ছিল। রাদারফোর্ড দরখাস্ত করেছিলেন, কিন্তু প্রথমে তিনি স্কলারশিপটি পাননি। অকল্যান্ডের একজন কেমিস্ট জেমস ম্যাকলরিন স্কলারশিপটি পেয়েছিলেন। কিন্তু ম্যাকলরিন তখন একটি চাকরি পেয়ে গেছেন আর সদ্য বিয়ে করেছেন, ইংল্যান্ডে যাবার কোন ইচ্ছে নেই তাঁর। ম্যাকলরিন স্কলারশিপটি প্রত্যাখ্যান করার পর তা রাদারফোর্ডকে দেয়া হয়। 

স্কলারশিপ পাবার খবরটি যখন আসে – তখন রাদারফোর্ড আলুক্ষেতে আলু তুলছিলেন। স্কলারশিপের চিঠি পাওয়া প্রসঙ্গে পরে তিনি বলেছেন – “ঐদিনই ছিল আমার জীবনের শেষ আলু তোলা।“

১৮৯৫ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাভেন্ডিস ল্যাবে যোগ দিলেন রাদারফোর্ড। তিনিই ছিলেন ক্যাভেন্ডিস ল্যাবের প্রথম বহিরাগত ছাত্র। এর আগে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই স্নাতক পাস করে স্নাতকোত্তর গবেষণায় ক্যাভেন্ডিস ল্যাবে ঢোকার সুযোগ পাওয়া যেতো। জোসেফ জন থমসনের (জে জে থমসন) তত্ত্বাবধানে গবেষণা শুরু করলেন রাদারফোর্ড। 

ক্যাভেন্ডিস ল্যাবে গবেষণা শুরু করার মাসখানেক পরেই ১৮৯৫ সালের নভেম্বর মাসে জার্মানিতে রন্টগেন এক্স-রে আবিষ্কার করেন। ইওরোপের সব পরীক্ষণ পদার্থবিজ্ঞানীই তখন এক্স-রে সম্পর্কিত গবেষণায় আগ্রহী হয়ে উঠলেন। ক্যাভেন্ডিস ল্যাবের পরিচালক জে জে থমসন তখন আয়ন সংক্রান্ত গবেষণা করছিলেন। গ্যাসের ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ-প্রবাহ চলার সময় এক্স-রে প্রয়োগ করলে কী প্রতিক্রিয়া হয় তা দেখার ব্যাপারে উৎসাহী হয়ে উঠলেন তিনি। পরীক্ষণ পদার্থবিজ্ঞানী হলেও জে জে থমসন হাতের কাজে খুব বেশি দক্ষ ছিলেন না। তাঁকে সাহায্য করার জন্য একজন দক্ষ সহযোগী দরকার। ক্যাভেন্ডিস ল্যাবে কাজ শুরু করার কিছুদিনের মধ্যেই সবাই রাদারফোর্ডের কর্মদক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে গেছেন। রাদারফোর্ড ক্যান্টারবারি কলেজের ল্যাবে বসে তৈরি করেছিলেন বেতারতরঙ্গের ডিটেক্টর। সেই ডিটেক্টর তিনি কেমব্রিজে নিয়ে এসেছেন। সেটা নিয়েই কাজ করছিলেন তিনি। বেতারতরঙ্গ প্রেরণ ও গ্রহণের যন্ত্র নিয়ে সেই সময় ইতালিতে মার্কনি আর ভারতবর্ষে জগদীশচন্দ্র বসু স্বতন্ত্রভাবে কাজ করছিলেন। সেইসময় কোথায় কী গবেষণা হচ্ছে তা সবসময় জানার সুযোগ ছিল না। 

থমসন যখন রাদারফোর্ডকে বললেন তাঁর এক্স-রে ও আয়নের গবেষণায় যোগ দিতে – রাদারফোর্ড রাজি হয়ে গেলেন। এক্স-রে আবিষ্কৃত হবার কিছুদিন পরেই ফরাসী পদার্থবিজ্ঞানী হেনরি বেকুয়েরেল তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার করেছেন। রাদারফোর্ড এক্স-রে ও রেডিয়োঅ্যাক্টিভিটি সংক্রান্ত গবেষণার উজ্জ্বল ভবিষ্যত দেখতে পেলেন। 

রাদারফোর্ড ও জে জে থমসনের যৌথ গবেষণার ফসল পেতে দেরি হলো না। ১৮৯৭ সালে আবিষ্কৃত হলো – ইলেকট্রন। এক্স-রে’র ফলে যে আয়নাইজেশান হয় – তাও থমসন ও রাদারফোর্ড প্রথম আবিষ্কার করেন। 

তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কৃত হবার পর ফ্রান্সে মেরি কুরি ও পিয়েরে কুরি তেজস্ক্রিয়তার রাসায়নিক ধর্ম সংক্রান্ত গবেষণা করতে করতে আবিষ্কার করেছেন তেজস্ক্রিয় মৌল রেডিয়াম ও পোলোনিয়াম। রাদারফোর্ড শুরু করলেন তেজস্ক্রিয়তার ভৌত-ধর্ম সংক্রান্ত গবেষণা। ১৮৯৭ সালের মধ্যেই রাদারফোর্ড আবিষ্কার করলেন ইউরেনিয়াম থেকে দুই ধরনের তেজস্ক্রিয় বিকিরণ বের হয়। এক ধরনের বিকিরণ খুব বেশিদূর যেতে পারে না – তিনি কাজের সুবিধার্থে গ্রিক অক্ষর অনুসারে তাদের নাম দিলেন আলফা রেডিয়েশান। আরেক ধরনের বিকিরণ – আলফা বিকিরণের তুলনায় অনেক দূর যেতে পারে (কয়েক সেন্টিমিটার থেকে এক মিটার পর্যন্ত)। রাদারফোর্ড এই বিকিরণের নাম দিলেন বিটা রেডিয়েশান। আরো কয়েক বছর পরে রাদারফোর্ড আরো এক ধরনের বিকিরণ আবিষ্কার করেন – যার নাম দিলেন গামা রেডিয়েশান। 

গবেষণায় এত দ্রুত এতকিছু আবিষ্কার করার পরেও তখনো পর্যন্ত  কোন স্থায়ী চাকরি হয়নি রাদারফোর্ডের। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর চাকরি হবার কোন সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না – কারণ কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে তখনো পর্যন্ত কোন বহিরাগতকে অধ্যাপনা করার সুযোগ দেয়া হতো না। শুধুমাত্র কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির স্নাতক এবং স্নাতকোত্তরদেরই নিয়োগ দেয়া হতো সেখানে। অন্য জায়গায় চাকরি খুঁজতে শুরু করলেন রাদারফোর্ড। তাঁর দ্রুত একটি স্থায়ী চাকরি দরকার – কারণ মেরি নিউটনের সাথে তাঁর বিয়েটা ঝুলে আছে অনেকদিন। নিউজিল্যান্ড থেকে মেরি নিয়মিত চিঠি লিখে তাগাদা দিচ্ছেন তাঁকে। 

রাদারফোর্ড দরখাস্ত করলেন কানাডার মন্ট্রিয়েলের ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটিতে। সেখানে বেশ বড় একটি নতুন ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে উইলিয়াম ম্যাকডোনাল্ড নামের একজন ধনী তামাক-ব্যবসায়ীর টাকায়। সেই ল্যাবে গবেষণা পরিচালনার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে ম্যাকডোনাল্ড প্রফেসর পদ। অনেক প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানী এই পদের জন্য দরখাস্ত করলেও জে জে থমসনের সুপারিশে পদটি দেয়া হয় ২৭ বছরের তরুণ রাদারফোর্ডকে। ১৮৯৮ সালের সেপ্টেম্বরে কেমব্রিজ থেকে কানাডায় চলে গেলেন রাদারফোর্ড। পরবর্তী দুই বছরের মধ্যে তিনি ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টকে উত্তর আমেরিকার সেরা ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে পরিণত করেন। রেডিওঅ্যাক্টিভিটি সংক্রান্ত গবেষণাই হয়ে ওঠে রাদারফোর্ডের প্রধান গবেষণার বিষয়। 

দু’বছর পর ১৯০০ সালে অবশেষে রাদারফোর্ডের সময় এবং অর্থনৈতিক সামর্থ্য হয় নিউজিল্যান্ডে গিয়ে মেরিকে বিয়ে করে কানাডায় নিয়ে আসার। আর্নেস্ট ও মেরি রাদারফোর্ডের দাম্পত্যজীবন ছিল বৈচিত্র্যহীন, কিন্তু শান্তিপূর্ণ। রাদারফোর্ডের গবেষণার কিছুই বুঝতেন না মেরি। কিন্তু স্বামীর গর্বে খুবই গর্বিত ছিলেন তিনি। তাঁদের একমাত্র সন্তান এইলিনের জন্ম হয় ১৯০১ সালে। 

রাদারফোর্ডের তেজস্ক্রিয়তার গবেষণায় প্রচুর রাসায়নিক কাজকর্ম দরকার। তাঁর গবেষণায় সাহায্য করার জন্য তিনি খুঁজে বের করলেন ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের ডেমন্সট্রেটর ফ্রেডেরিক সডিকে। ফ্রেডেরিক সডি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করে কানাডায় এসেছেন চাকরি নিয়ে। ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে রাদারফোর্ডের গবেষণা পদার্থবিজ্ঞানের জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করে। আলফা ও বিটা রেডিয়েশানের ফলে তেজস্ক্রিয় মৌলের রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে। ইউরেনিয়াম মৌল থেকে একটি আলফা কণা বেরিয়ে গেলে ইউরেনিয়াম থোরিয়ামে পরিণত হয়। আবার থোরিয়াম থেকে একটি আলফা কণা বের হয়ে গেলে থোরিয়াম পরিণত হয় রেডিয়ামে। তেজস্ক্রিয়তার ফলে মৌলের এই যে পরিবর্তন – এটা প্রথম আবিষ্কার করেন রাদারফোর্ড। এই আবিষ্কারের জন্য তিনি রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পান ১৯০৮ সালে। রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার পর রাদারফোর্ড বেশ অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর জুনিয়র সহকর্মী ফ্রেডেরিক সডিও রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন ১৯২১ সালে। 

১৯০৩ সালে রাদারফোর্ড রয়েল সোসাইটির ফেলো মনোনীত হন। ১৯০৪ সালে তিনি রয়েল সোসাইটির রামফোর্ড মেডেল অর্জন করেন। ১৯০৪ সালে প্রকাশিত হয় রাদারফোর্ডের প্রথম বই ‘রেডিওঅ্যাকটিভিটি’। এই বইটি ছিল রেডিওঅ্যাকটিভিটির উপর পৃথিবীর প্রথম টেক্সটবুক। সেই সময় সারাপৃথিবীর বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বইয়ের মাধ্যমেই এই বিষয়টির শিক্ষা দেয়া শুরু হয়। পরের বছর এই বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেন রাদারফোর্ড। ১৯০৬ সালে তিনি প্রকাশ করেন তাঁর দ্বিতীয় বই ‘রেডিওঅ্যাকটিভ ট্রান্সফরমেশান্স’। 

কানাডা থেকে ইংল্যান্ডে ফিরে আসতে চাচ্ছিলেন রাদারফোর্ড। ১৯০৭ সালে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটিতে যোগ দেন। এখানে তাঁর সহযোগী হিসেবে তিনি পান জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী হ্যান্স গেইগার এবং তাঁর তরুণ ছাত্র আর্নেস্ট মার্সডেনকে। তেজস্ক্রিয়তার গবেষণা অব্যাহত থাকে। হ্যান্স গেইগার এই গবেষণার জন্যই উদ্ভাবন করেন রেডিয়েশান ডিটেক্টর – যা এখন আমরা সবাই জানি গেইগার কাউন্টার হিসেবে। 

১৯০৯ সালে আলফা কণার ধর্ম পরীক্ষা করার জন্য রাদারফোর্ড ও মার্সডেন অনেকগুলি ধারাবাহিক পরীক্ষণের ব্যবস্থা করেন। সেই পরীক্ষায় দেখা গেল ইউরেনিয়াম সল্ট থেকে আলফা কণা নির্গত হয়ে বেশিরভাগই পাতলা সোনার পাতের দিয়ে বাধাহীনভাবে চলে গেল। কিন্তু কিছু কিছু আলফা কণা যেদিক থেকে নির্গত হয়েছে – পাতলা সোনার পাত থেকে সেদিকেই ফিরে এসেছে। এই ঘটনাকে রাদারফোর্ড পরে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে – “মনে হচ্ছিলো একটা পনেরো কেজি ভরের কামানের গোলা একটি টিস্যু পেপারে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এসেছে।“ এই পরীক্ষণের পর ধারাবাহিকভাবে আরো অনেক পরীক্ষা করার পর রাদারফোর্ড এই সিদ্ধান্তে এলেন যে পরমাণুর কেন্দ্রে আছে অত্যন্ত ঘনীভূত ভর – যা পরে নিউক্লিয়াস হিসেবে পরিচিত হয়। পরমাণুতে নিউক্লিয়াসের উপস্থিতির পর ইলেকট্রন ও নিউক্লিয়াসের ভিত্তিতে ১৯১১ সালে পরমাণুর রাদারফোর্ড মডেল প্রকাশিত হয়। কিন্তু সেখানে ইলেকট্রনগুলি কীভাবে থাকে সে ব্যাপারে পরিষ্কার ধারণা না থাকায় – মডেলটির সংশোধনের দরকার হয়। ১৯১২ সালে নীল্‌স বোর ম্যাঞ্চেস্টারে এলেন রাদারফোর্ডের সাথে গবেষণা করার জন্য। নীল্‌স বোর রাদারফোর্ডের সহযোগিতায় আবিষ্কার তাঁর বিখ্যাত ‘বোর মডেল’। 

১৯১৩ সালে রাদারফোর্ড প্রকাশ করেন তাঁর তৃতীয় বই ‘রেডিওঅ্যাক্টিভ সাবস্ট্যান্স অ্যান্ড দেয়ার রেডিয়েশান্স’। ১৯১৪ সালে রাদারফোর্ডকে ব্রিটিশ সরকার ‘নাইট’ উপাধি দেন। নাইটহুড অর্জন করার পর তিনি হলেন স্যার রাদারফোর্ড। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ পর্যন্ত রাদারফোর্ড ব্রিটিশ নেভির উদ্ভাবন ও গবেষণাকেন্দ্রে কাজ করেন।  

১৯১৯ সালে জে জে থমসন কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজের ‘মাস্টার’ নিযুক্ত হলে ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবের পরিচালক পদ থেকে সরে আসেন। তাঁর সুপারিশে সেই পদে যোগ দেন রাদারফোর্ড। আমৃত্যু এই পদেই ছিলেন রাদারফোর্ড। ক্যাভেন্ডিস ল্যাবের দায়িত্ব নিয়ে তিনি তাঁর ছাত্র জেমস চ্যাডউইকের সাথে গবেষণা শুরু করেন। ১৯১৯ সালে প্রোটন আবিষ্কার করেন। তাঁর ও চ্যাডউইকের দীর্ঘ গবেষণার ফসল নিউট্রন। ১৯২৮ সালে নিউট্রন আবিষ্কৃত হয়। এজন্য চ্যাডউইক নোবেল পুরষ্কার পান ১৯৩৫ সালে। 


১৯২৫ সালে রাদারফোর্ডকে যুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ সম্মান ‘অর্ডার অব মেরিট’ দেয়া হয়। ১৯২৫ থেকে ১৯৩০ পর্যন্ত রয়েল সোসাইটির সভাপতি ছিলেন রাদারফোর্ড। ১৯৩৭ সালে রাদারফোর্ডের চতুর্থ বই ‘দি নিউয়ার আলকেমি’ প্রকাশিত হয়। সেই বছরের ১৯ অক্টোবর রাদারফোর্ডের মৃত্যু হয়। 

মানুষ হিসেবে খুবই সোজাসাপ্টা ভালোমানুষ ছিলেন রাদারফোর্ড। খুব উচ্চস্বরে কথা বলতেন তিনি। তিনি এত জোরে কথা বলতেন যে অনেক সময় নয়েজ সেন্সেটিভ যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যেতো তার ল্যাবে। কারো ব্যক্তিগত ব্যাপারে তিনি কখনোই নাক গলাতেন না। এত এত সম্মাননা পাওয়ার পরেও তাঁর আচরণে কোন পরিবর্তন হয়নি। 

তাঁর মৃত্যুর পরেও তাঁর সম্মানে রেডিওঅ্যাক্টিভিটির প্রথম একক হিসেবে ‘রাদারফোর্ড’ গৃহীত হয় ১৯৪৬ সালে। প্রতি সেকেন্ডে ১০ লক্ষ কণার বিকিরণের হারকে এক রাদারফোর্ড ধরা হয়। ১৯৫৩ সালে এর চেয়েও বড় আরেকটি একক প্রচলন করা হয় – মেরি কুরির নামে। এক কুরি হলো সেকেন্ডে ৩৭ বিলিয়ন বিকিরণ। ১৯৭৪ সালে প্রচলন করা হয় বিকিরণের আন্তর্জাতিক একক – বেকুয়েরেল। প্রতি সেকেন্ডে একটি বিকিরণ হলো বেকুয়েরেল। ১৯৭৫ সাল থেকে রাদারফোর্ড একক আর ব্যবহার করা হয় না। ১৯৯৭ সালে ১০৪ প্রোটনবিশিষ্ট পরমাণুর নাম রাখা হয় রাদারফোর্ডিয়াম (Rf)। 


তথ্যসূত্র

১। ওয়ার্ল্ডস বুক্‌স বায়োগ্রাফিক্যাল এনসাইক্লোপিড়িয়া অদ সায়েন্টিস্টস, সপ্তম খন্ড, ২০০৩। 

২। জন গ্রিবিন, দ্য সায়েন্টিস্ট, র‍্যান্ডম হাউজ, নিউইয়র্ক ২০০২। 

৩। ইওয়ান জেমস, রিমার্কেবল ফিজিসিস্ট, কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০০৪। 

৪। রিচার্ড রিভস, এ ফোর্স অব ন্যাচার: দি ফ্রন্টিয়ার জিনিয়াস অব আর্নেস্ট রাদারফোর্ড, নরটন অ্যান্ড কোম্পানি, ২০০৮। 

_____________
বিজ্ঞানচিন্তা সেপ্টেম্বর ২০২১ সংখ্যায় প্রকাশিত









Latest Post

সিনেমাখোরের দিনলিপি ৩-ফেব্রুয়ারি-২০০৫

  সোফিয়া লরেন অস্কার পেয়েছিলেন ১৯৬২ সালের   দিকে। টু ওম্যান ছবিতে অভিনয়ের জন্য। ‘টু ওম্যান’ ছবিটা দেখলাম সম্প্রতি। বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ...

Popular Posts