Saturday 23 May 2020

ছিন্ন পাতার সাজাই তরণী - পর্ব ১৬

16         

দরজার বেল টিপেছি অনেকক্ষণ হয়ে গেল। দরজা খোলা তো দূরের কথা, ভেতর থেকে কোন সাড়াশব্দও পাচ্ছি না। অপরিচিত কোন বাসার কলিংবেল একবার টেপার পর দরজা না খুললে ঠিক কতক্ষণ পর আবার বেল টিপলে অভদ্রতা হবে না  তা ঠিক জানি না। বুঝতে পারছি না আবার বেল টিপবো, নাকি আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করবো। সামাজিক ভদ্রতার নিয়মকানুনগুলো আমার কাছে অসহ্য রকমের জটিল বলে মনে হয়। জটিলতার ধারেকাছেও আমি পারতপক্ষে যাই না। কিন্তু আমি না গেলে কী হবে, জটিলতা আমার কাছে ঘুরেফিরেই আসে। যেমন আজকে। প্রিন্সিপাল স্যার আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন ইন্দ্রাণী মুৎসুদ্দীর নিয়োগ-পত্র হাতে হাতে পৌঁছে দিতে। ব্যাপারটা যতটা সহজ হবে মনে করেছিলাম ততটা সহজ নয়। ইন্দ্রাণীর হাতে হাতে দেয়ার অর্থ হচ্ছে ইন্দ্রাণী ছাড়া আর কারো হাতে এই চিঠি দেয়া যাবে না। প্রিন্সিপাল স্যারকে জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলাম – ইন্দ্রাণী ছাড়া আর কারো হাতে দিলে হবে কি না। কিন্তু প্রশ্ন করিনি, কারণ বসের হুকুম নাকি বিনাপ্রশ্নে তামিল করতে হয়। অন্য কারো হাতে দিলে যদি চলতো – বস তো নিজেই তা বলে দিতেন। হাতে হাতে দেয়ার জন্য ইন্দ্রাণীদের বাসায় এসেছি। বাসা খুঁজে পেতে কোন সমস্যা হয়নি। মেইন রোডের পাশেই সুন্দর পুরনো বাড়িটা। বাড়ির সামনে ডাক্তারের সাইনবোর্ড। মনে হচ্ছে ইন্দ্রাণীর বাবা ডাক্তার। শহরের মাঝখানে এত বড় বাড়ি, এত আভিজাত্য -  দেখে একটু অস্বস্তি লাগছে।

দরজা খোলার কোন লক্ষণ নেই। বারান্দায় চল্লিশ ওয়াটের একটা বাল্ব জ্বলছে বড় বেমানান ভাবে। মনে হচ্ছে বাল্বের জায়গায় ঝাড়বাতি হলে মানাতো ভালো। ভারী কাঠের দরজায় নানারকম কারুকাজ। কাঠের ফুলের পাপড়িতে ধুলো জমে আছে। রাস্তার এত কাছে বাইরের দরজা ধুলোমুক্ত রাখতে হলে সারাক্ষণই ধুলো ঝাড়তে হবে। ইচ্ছে হচ্ছে দরজায় ধুমধুম করে কয়েকটা কিল মারি। কিন্তু তাতে ভদ্রতা মিশে যাবে দরজার ধুলোয়। কলিংবেলের দিকে হাত চলে যাচ্ছে আবার। দরজার কাছে লাগানো কলিংবেলকে নাকি ডোরবেল বলতে হয়। ডোরবেলও কলিংবেল, কিন্তু সব কলিংবেল ডোরবেল নয়। প্রিন্সিপাল স্যার যে কর্কশ কলিংবেল বাজিয়ে পিয়নদের ডাকেন – সেটা ডোরবেল নয়।  ডোরবেল বাজানোর নাকি কিছু নিয়মকানুন আছে – যা মেনে চলা এটিকেট। কয়েকবছর আগে এই ‘এটিকেট’ সম্পর্কে লম্বা এক লেকচার আমাকে শুনতে হয়েছিল এমন একজন লোকের কাছ থেকে যাকে আমি কিছুতেই ভদ্রলোক বলে মনে করি না।

সপ্তাহে কমপক্ষে একদিন আমাকে আমার বড়বোনের বাসায় হাজিরা দিতে হয়। ছোটবেলা থেকে সে আমাকে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছে। এখন তার চাকরি, ঘরসংসার, সন্তান সব সামলাতে সামলাতে হিমশিম খাবার অবস্থা। এর মধ্যেও সপ্তাহে কমপক্ষে একবার আমাকে না দেখলে সে অস্থির হয়ে পড়ে। সে মনে করে ‘নো নিউজ ইজ অলওয়েজ ব্যাড নিউজ’। তাই প্রতি সপ্তাহে একবার তার বাসায় যাওয়া আমার রুটিন কাজ। সেদিন বিকেলে তাদের বাসার ডোরবেল বাজিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরও কেউ দরজা খুললো না। ইউনিভার্সিটি থেকে দেড়টার ট্রেনে এসে ষোলশহর স্টেশনে নেমে চকবাজার আসতে আসতে সাড়ে তিনটা বেজে গিয়েছিল। প্রকৃতির ডাক তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছিল, আর আমার ধৈর্যও দ্রুত কমে যাচ্ছিল। বাসায় কেউ না থাকার কোন সম্ভাবনা নেই। কারণ ভেতরে পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। ডোরবেলের পাখির অবিরাম ডাকেও কাজ হচ্ছিল না দেখে দরজার কড়া একটু কড়াভাবে নেড়ে দিতেই দরজা খুলে গেল। কে খুললো দেখার সময় নেই। আগে প্রকৃতি তারপর অন্যকিছু। দৌড়ে বাথরুমে ঢুকে পড়লাম। সেখান থেকে বের হয়ে বুঝতে পারলাম বাসায় দিদিরা কেউ নেই। মনে হয় সবাইকে নিয়ে কোথাও গেছে। তাহলে লোকটাই দরজা খুলে দিয়েছে। একটু পরেই লোকটা আমার সামনে এসে গর্জে উঠলো, “তোমার তো মিনিমাম এটিকেটও নেই। এভাবে কেউ দরজা ধাক্কায়?” তাকালাম লোকটার দিকে। গামছা পরে খালি গায়ে দাঁড়িয়ে আছে ম্যাক্সিমাম এটিকেটের নমুনা। এই লোক etiquette শব্দটি বানান করতে পারা তো দূরের কথা, শব্দটি দেখিয়ে উচ্চারণ করতে বললে বলবে – ‘ইতিকুত্তি’। দেখলাম একটি অপরিচিত মহিলা দ্রুত বেরিয়ে গেল দরজা খুলে। “কলিংবেল টিপে অপেক্ষা করাই ভদ্রতা। কোন ভদ্রলোক ডাকাতের মত দরজায় লাথি মারে না।“ - লোকটা উচ্চস্বরে বলেই যাচ্ছে। লোকটার দিকে তাকাতেও রুচি হয় না আমার। এই লোকটার জন্য দিদি বাসায় নিশ্চিন্তে কাজের মেয়ে পর্যন্ত রাখতে পারে না। কী করে সে এই লোককে সহ্য করে কে জানে। মেয়েরা নিজের ভাইকে শাসন করতে পারে, কিন্তু স্বামীর ভাইকে নয়। সামাজিক সাংসারিক ভদ্রতার কত জটিল নিয়ম যে মেয়েদের মেনে চলতে হয়।

“আপনি কার কাছে এসেছেন?” – দেখলাম দশ এগারো বছরের একটি ছেলে বাইরের দিক থেকে বারান্দায় উঠে আসছে। হাতে ব্যাটমিন্টন র‍্যাকেট।
“ইন্দ্রাণী মুৎসুদ্দী কি এই বাড়িতে থাকেন?”
“হ্যাঁ।“
“আমি ডোরবেল টিপে অপেক্ষা করছি অনেকক্ষণ। কেউ দরজা খুলছে না।”
“কলিংবেল নষ্ট।“ বলেই ছেলেটা দরজায় প্রচন্ড জোরে থাপ্পড় দিতে শুরু করলো। এই পদ্ধতি তো আমারও জানা ছিল। ডোরবেল এটিকেট দেখাতে গিয়ে শুধু শুধু এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম।
“ও তুই?” দরজা খুলে ছেলেটিকে বললো ইন্দ্রাণী।
“তোমার কাছে একজন এসেছে” – বলেই ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেল ছেলেটি। ইন্দ্রাণী আমার দিকে তাকালো। ম্যাক্সির ওপর একটা লাল চাদর পরে আছে সে। মোটা কাচের চশমার ভেতর তার চোখগুলোকে খুব ছোট দেখাচ্ছে। আমি তাকে চিনি, কিন্তু তার আমাকে চেনার কথা নয়। বললাম, “আমি শাহীন কলেজ থেকে এসেছি। প্রিন্সিপাল স্যার আপনার অ্যাপয়ন্টমেন্ট  লেটার পাঠিয়েছেন আমাকে দিয়ে।“
“তাই নাকি? আসেন, আসেন ভেতরে আসেন।“
“না, ভেতরে আসবো না। এই যে আপনার চিঠি।“
ইন্দ্রাণী চিঠিটি হাতে নিয়ে দরজায় দাঁড়িয়েই খাম খুলে দ্রুত চোখ বুলাচ্ছে। আমি এবার চলে যেতে পারি। কিন্তু মনে হলো ইন্দ্রাণী যে চিঠিটি পেয়েছে তার একটা প্রমাণ তো লাগবে। এধরনের দরকারি চিঠি গ্রহণ করার সময় দস্তখত করতে হয়। কিন্তু আমি কোথায় সাইন নেবো? ইন্দ্রাণীকে বললাম, “আপনি যদি একটা কাগজে লিখে দেন যে আপনি চিঠিটি  অ্যাকসেপ্ট করেছেন।“
“এখনই অ্যাকসেপ্টেন্স লেটার লিখে দিতে হবে?”
“না মানে আমি যে আপনাকে চিঠিটা দিয়েছি, প্রিন্সিপাল যদি জানতে চান”
“ওহ্‌ চিঠিটা যে আমি রিসিভ করেছি। রিসিভ করা আর অ্যাকসেপ্ট করা তো এক জিনিস নয়।“
“ও তাই তো।“
“আপনি কি শাহীন কলেজে কাজ করেন?”
“হ্যাঁ।“
“কী কাজ করেন?”
“আমি পড়াই।“
“কী পড়ান?”
“ফিজিক্স”
“তার মানে আপনি ফিজিক্সের লেকচারার?”
“হ্যাঁ”
“ভেতরে আসেন।“
“না, আমি যাই।“
“দেখেন, আপনার সাথে যদি আমার আর দেখা হওয়ার সম্ভাবনা না থাকতো তাহলে আপনি দরজা থেকে চলে গেলেও কোন সমস্যা ছিল না। কিন্তু এখন আমি যদি এই অফারটা অ্যাকসেপ্ট করি, তাহলে তো আপনি আমার কলিগ হবেন। প্রতিদিনই দেখা হবে আমাদের।“
খুব সুন্দর করে যুক্তি দিয়ে কথা বলে ইন্দ্রাণী।
“আসেন, বসেন এখানে।“
ভেতরে ঢুকলাম। বেশ সুন্দর করে সাজানো বর্গাকৃতি বসার ঘর। শোকেসে অনেকগুলো পুতুল।
“আপনি একটু বসেন, আমি এক মিনিটের ভেতর আসছি।“
ইন্দ্রাণী দ্রুত চলে গেল ভেতরে। রাস্তায় গাড়ি চলার শব্দ এখান থেকেও শোনা যায়। তাতে মনে হয় খুব একটা অসুবিধা হয় না এদের। ইন্দ্রাণী আমাকে এখনো চিনতে পারেনি দেখে কিছুটা স্বস্তি লাগছে। শাটল ট্রেনের ঘটনাটা সে নিশ্চয় ভুলে গেছে। অবশ্য মনে রাখার মতো তেমন কোন ঘটনা ছিল না সেটা। যারা খারাপ ব্যবহার করে তারা তা মনে রাখে না। কিন্তু যারা খারাপ ব্যবহার পায়, তারা তা সহজে ভুলতে পারে না। সায়েন্স ফ্যাকাল্টির স্টুডেন্টরা দেড়টার ট্রেনে ফিরতে পারে না খুব একটা। আর্টস ও কমার্স ফ্যাকাল্টির প্রায় সবার ক্লাস শেষ হয়ে যায় একটার মধ্যে। তাদের প্রায় সবাই দেড়টার ট্রেনে ফিরে আসে। আমাদের প্র্যাকটিক্যাল শেষ হতে হতে পাঁচটা বেজে যায়। তখন লাস্ট ট্রেনে চড়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না। সেদিন কোন একটা কারণে দেড়টার ট্রেন ধরার সুযোগ হয়েছিল। এই ট্রেনটি প্রায় সাড়ে এগারোটা থেকে স্টেশনে থাকে। সাড়ে বারোটার দিকে গিয়ে দেখি সবগুলো বগির সবগুলো সিটেই ছোট ছোট কাগজের উপর ইটের টুকরো রাখা আছে। সিট সংরক্ষণ করার প্রচলিত পদ্ধতি এটা। কোন কোন বগিতে কয়েকজন মিলে বসে আড্ডা মারছে। বেশিরভাগ বগিই ফাঁকা। কিন্তু ইট ও কাগজের টুকরো সবখানে। আমরা যে ক’জন বন্ধু সারাক্ষণ একসাথে থাকি তারা বাসে চলে গেছে। আমার আরেক বন্ধু মৃণাল থাকে শাহজালালে। কথা ছিল সেও এই ট্রেনে যাবে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সে সিদ্ধান্ত বদল করেছে – কারণ তাকে রাউজান যেতে হবে তপুর সাথে দেখা করতে। হৃদয়ঘটিত ব্যাপার অগ্রাধিকার পাবে এটাই স্বাভাবিক। আমি ট্রেনের বিভিন্ন বগিতে ঘুরতে ঘুরতে কয়েকটা অসংরক্ষিত খালি সিট দেখে আমার বইখাতার ঝোলা রাখলাম একটা সিটে। তারপর প্লাটফরমে এসে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম ডিপার্টমেন্টের আর কাউকে পাই কিনা। কিছুক্ষণের মধ্যে দলে দলে শিক্ষার্থীরা এসে ট্রেন ভর্তি হয়ে গেলো। আমার ডিপার্টমেন্টের কাউকেই পেলাম না। যে কম্পার্টমেন্টে আমার ঝোলা রেখেছিলাম সেই কম্পার্টমেন্টের জানালায় গিয়ে দেখলাম ভেতরে সব খালি সিট দখল করে বসে গেছে সবাই। আমার ঝোলাটি দেখা যাচ্ছে না কোথাও। ঝোলার ভেতর ব্রিটিশ কাউন্সিলের বই। হারালে ঝামেলায় পড়তে হবে। কম্পার্টমেন্টের ভেতর উঠে যেখানে ঝোলা রেখেছিলাম – দেখলাম সেখানে বসে আছে মোটা ফ্রেমের মোটা লেন্সের চশমা পরা মোটা একটি মেয়ে। তার পাশে সামনে তার বন্ধুবান্ধবীরা। খুব হাসাহাসি হচ্ছে। আমি ভদ্রভাবে জানতে চাইলাম, “এখানে আমার বই-খাতার ঝোলাটা ছিল। সেটা কোথায় গেল?”
মেয়েটি আমার দিকে একটু তাকালো, তারপর আবার নিজেদের হাহাহিহি-তে ফিরে গেলো। কী এক অজানা কারণে দুনিয়ার কেউই আমাকে পাত্তা দেয় না। রিক্সাওয়ালারা, বাদামওয়ালারাও আমার কথা শোনে না। সেখানে আর্টস ফ্যাকাল্টির ভারী চশমাপরা মেয়ের বয়েই গেছে আমার কথা শুনতে। আমি আবারো ভদ্রতা করে বললাম, “এক্সকিউজ মি”
“ইয়েস, ইউ আর এক্সকিউজড” – বলে গম্ভীরভাবে তাকালো মেয়েটি। তার সাঙ্গপাঙ্গরা হোহো করে হেসে উঠলো। সেই হাসিতে আমি বিদ্রুপ দেখতে পেলাম। নিজেকে খুব অপমানিত মনে হলো আমার। অপমান মানুষকে রাগিয়ে তোলে। আমার গলাও কিছুটা ঝাঁজালো হয়ে উঠল। বললাম, “আপনি আমার জায়গায় বসেছেন।“
“এটা আপনার জায়গা? এই জায়গা আপনি কিনে রেখেছেন?”
“না, আমি আমার ব্যাগ রেখেছিলাম ওখানে। আপনি আমার ব্যাগ সরিয়ে সেখানে বসেছেন।“
“কেন ভাই গন্ডগোল করছেন? এখানে কোন ব্যাগট্যাগ ছিল না।“ মোটা মেয়েটির সরু বান্ধবী সরু গলায় বললো। কিন্তু আমি ততক্ষণে আমার ব্যাগের চিহ্ন দেখতে পেয়েছি। নীল রঙের এই  শান্তিনিকেতনী ঝোলাটি রাঙামাটি থেকে এনে দিয়েছে আমাদের বন্ধু মানস। আমার বই-খাতাসহ এই ঝোলাকে একপাশে সরিয়ে সেখানে বসে গেছে মোটা মেয়েটি। ব্যাগটি চাপা পড়েছে কিছুটা তার শরীরের নিচে, কিছুটা তার ব্যাগের নিচে।
“ঐ যে নীল রঙের ঝোলাটি, যেটার ওপর আপনি বসে আছেন, সেটা কি আপনার?“
“কোথায়?”
“আপনি কি অন্ধ? দেখতে পান না? ব্যাগের উপর হাতির মত বসে আছেন কোন ধরনের সেন্স ছাড়া?”
“আপনি আমাকে হাতি বললেন কেন?” – মেয়েটি রেগে গেছে।
“আপনাকে হাতি বলিনি। বলেছি হাতির মত বসে আছেন আমার ব্যাগের উপর।“
“এটা আপনার ব্যাগ? এটা?” – আমার নীল ঝোলা এখন তার হাতে।
“হ্যাঁ, এবার দেখতে পেয়েছেন? আমার সিটে বসেছেন আপনি।“
“কারো সিটে বসিনি আমি। এখানে কোন ব্যাগট্যাগ ছিল না” বলেই আমার ব্যাগটা জানালা দিয়ে বাইরে ছুড়ে ফেলে দিল মেয়েটি। আমার রাগ হচ্ছে। কিন্তু রাগের চেয়েও বেশি হচ্ছে কষ্ট। এরকম ব্যবহার আমি আশা করিনি একজন ডিসেন্ট স্টুডেন্টের কাছ থেকে। যখন এসেছিলাম তখন সবগুলো কম্পার্টমেন্টের সিটে রাখা সবগুলো কাগজ ও ইটের টুকরো ফেলে দিয়ে গন্ডগোল লাগিয়ে দিতে পারতাম ইচ্ছে করলে। কিন্তু করিনি। খালি সিটে আমার ব্যাগ রেখেছিলাম। সেটা আমার চোখের সামনে এভাবে জানালা দিয়ে ফেলে দেয়া কী ধরনের কাজ? আমার সাথে কেউ থাকলে প্রচন্ড গন্ডগোল লাগিয়ে দিতো। মৃণাল থাকলে এতক্ষণে কুরুক্ষেত্র বাধিয়ে ফেলতো। আমার কুরুক্ষেত্র বাধানোর ক্ষমতা নেই। আমি ক্ষুণ্ণমনে কম্পার্টমেন্ট থেকে নেমে নিচু হয়ে ঝোলাটা কুড়িয়ে নিলাম প্লাটফরম থেকে। হাঁটতে হাঁটতে ট্রেনের ইঞ্জিনে গিয়ে উঠলাম। বুঝতে চেষ্টা করছি মেয়েটি এরকম ব্যবহার কেন করলো? হাতি শুনেই মেয়েটি রেগে গেছে। এবং রেগে গিয়ে হিতাহিতশূন্য হয়ে কাজটি করেছে। কিন্তু আমার ব্যাগের উপর কেন বসলো? হয়তো বন্ধুদের সাথে কথা বলতে বলতে বসে গেছে, খেয়ালই করেনি যে সেখানে একটি ব্যাগ আছে। কিন্তু যে কাজটি করেছে তাতে তো অনেক বিপদ হতে পারতো। আমি তো শিবিরের কোন কর্মীও হতে পারতাম। নাকি আমার চেহারা দেখেই বুঝে গেছে যে আমি কেঁচো টাইপের প্রাণী? সেই ঘটনার পর মেয়েটির চেহারা আমি আর ভুলিনি। আমার বন্ধু হাফিজ ক্যাম্পাসের সব মেয়েকেই চেনে। তাকে একদিন দেখিয়ে দিতেই সে বলে দিলো, মেয়েটি আমাদের ব্যাচের, ইংলিশের ইন্দ্রাণী। সাবধান করে দিলো, “তোর কোন চান্স নেই। শি ইজ অলরেডি গন।“
আমাদের র‍্যাগ ডের প্রোগ্রামে ইন্দ্রাণী ছিল লিড ভোকালিস্ট। কী চমৎকার গান গায় সে। কী চমৎকার হাসিখুশি মানুষ। অথচ তার এতগুলো গুণের মধ্যে সেদিনের সেই ঘটনা আমি কিছুতেই মেলাতে পারি না। আমি কোনদিনই ভাবিনি যে তার সাথে আমার আবার কোনদিন দেখা হবে, কথা হবে। অথচ আজ আমি তার বাড়ির ড্রয়িং রুমে বসে আছি। সে ভেতরে গেছে আমার জন্য চা-নাস্তার ব্যবস্থা করতে। সেদিনের সেই ঘটনার ছিটেফোঁটাও তার মনে নেই। মনে করিয়ে দেয়ারও কোন দরকার নেই।
“নেন, একটু মিষ্টি খান।“ ট্রেতে অনেকগুলো মিষ্টি আর চানাচুর নিয়ে ঢুকলো ইন্দ্রাণী।
“আপনি কবে জয়েন করেছেন শাহীন কলেজে?”
“এই তো কিছুদিন আগে।“
“আপনি কি চিটাগং ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করেছেন? কোন ব্যাচে?”
“একুশতম ব্যাচ”
“আমাদের ব্যাচ? তাহলে তোমাকে শুধু শুধু আপনি আপনি করছি কেন?”
“কেন করছো আমি তো জানি না। তুমি একটা কাগজে লিখে দাও যে চিঠিটা পেয়েছো।“
“কী লিখবো?”
“তুমি যে চিঠিটা পেয়েছো সেটা ইংরেজিতে লিখে দাও।“
“ইংরেজিতে লিখতে হবে?”
“তুমি ইংরেজির মানুষ। ইংরেজিতে লিখবে না?”
“তুমি কলেজে কীভাবে যাও?”
“বিমান বাহিনীর একটি গাড়ি আছে। এদিক দিয়েই যায়। তুমি বাসার সামনে থেকে উঠতে পারবে।“
আরো কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলার পর চলে আসার সময় জিজ্ঞেস করলাম, “প্রিন্সিপালকে কী বলবো? অ্যাকসেপ্টেড? নাকি জাস্ট রিসিভড?”
“অ্যাকসেপ্টেড।“ – হাসলে ইন্দ্রাণীর চোখ দুটোও হেসে উঠে মোটা লেন্সের ভেতর।

ইন্দ্রাণী জয়েন করেছে পরের দিন। কলেজে এসে সে আমাকে তুমি’র বদলে তুই বলতে শুরু করেছে। আমি অনেকবার ভেবেছি তাকে জিজ্ঞেস করবো, ‘হাতি বললে তুই কি খুব রেগে যাস?’ – কিন্তু জিজ্ঞেস করা হয়নি। কী দরকার তাকে ভুলে যাওয়া ঘটনা মনে করিয়ে লজ্জায় ফেলে?

No comments:

Post a Comment

Latest Post

Memories of My Father - Part 6

  The habit of reading books was instilled in us from a young age, almost unknowingly. There was no specific encouragement or pressure for t...

Popular Posts