Saturday 23 May 2020

ছিন্ন পাতার সাজাই তরণী - পর্ব ২৯

29


“কী সুন্দর মুরগি দেখেছিস! আল্লা কী সুন্দর!”
দরজা খুলে এদেরকে দেখে যতটা অবাক হয়েছি, তার চেয়ে বেশি অবাক হচ্ছি এদের আচরণ দেখে। পশুপাখি দেখে মুগ্ধ হতে অনেককে দেখেছি, কিন্তু মুরগি দেখে এত আহ্লাদ করতে আর কাউকে দেখিনি। এই মেয়ে কি ফার্মের মুরগি দেখেনি কখনো? সে হাত বাড়িয়ে মুরগি ধরতে যাচ্ছে দেখে আরেকজন তাকে সাবধান করলো, “এই দ্যাখিস, কামড়ে দেবে।“
সে ভয় পেয়ে “ও মাগো” বলে চিৎকার করে উঠতেই হো হো করে হেসে উঠলো তাদের পিছু পিছু আসা সবগুলো বাচ্চা। বাচ্চাগুলো এসময় গলির পথে হৈ চৈ করতে করতে খেলে। আজ এদেরকে ফলো করে আমার বাসা পর্যন্ত কী কারণে এসেছে আমি জানি না। মনে হচ্ছে পথে আসার সময় মুরগি দেখে আহ্লাদ করার মত আরো অনেক কিছু করেছে এরা – যা দেখে বাচ্চারা মজা পেয়ে গেছে।
“স্যার এগুলি কি আপনার মুরগি?”
ঘরে ঢুকতে ঢুকতে আহ্লাদি প্রশ্ন করে।
“আপনি মুরগিও পালেন স্যার?” সম্পূরক প্রশ্ন করে আরেকজন।
“শুধু মুরগি কেন? আসার সময় গরু দেখোনি অনেকগুলো? ওগুলোও আমার কি না জিজ্ঞেস করো।“ – হাসতে হাসতে বললাম।
“তাই তো, গরুগুলিও কি আপনার স্যার?” – বেশ সিরিয়াসলি প্রশ্ন করে আরেকজন।
এরা যে এত সিরিয়াস ফাজিল আমার জানা ছিল না। জিজ্ঞেস করলাম, “কী ব্যাপার তোমরা এখানে কেন?”
“স্যার সত্য বলব, না মিথ্যা বলব?”
“সত্য বলবে।”
“আপনাকে রাজি করাতে এসেছি স্যার।“
“কী ব্যাপারে?”                                                                                             
“আমাদের পড়াতে হবে স্যার।“ – চারজন একসাথে বলে উঠলো।
অনেকদিন থেকেই অনেক স্টুডেন্ট প্রাইভেট পড়ার জন্য বিরক্ত করছে। আমি প্রাইভেট পড়ানোর বিপক্ষে। কলেজে নিয়মিত ক্লাস হচ্ছে। ক্লাসে সবকিছু বুঝিয়ে দিচ্ছি। এর পরেও কেন প্রাইভেট পড়তে হবে? ইন্টারমিডিয়েটে আমি নিজে প্রাইভেট পড়েছিলাম কয়েকজন স্যারের কাছে। ক্লাসে কখনোই সিলেবাস শেষ করানো হতো না। প্রাইভেট পড়তে হয়েছিল। এখন তো তা নয়। আমার ক্লাসে আমি যা বোঝাই – প্রাইভেট পড়লে তো তার চেয়ে বেশি কিছু বোঝাবো না। এখন এরা এত দূর থেকে আমার বাসায় চলে এসেছে!
“তোমরা বাসা কীভাবে খুঁজে পেলে?”
“কত কষ্ট করে আপনার বাসা খুঁজে বের করেছি স্যার। এত্তো দূরে – এত্তো ভিতরে!”
দরজা খোলা পেয়ে মুরগির দল ঘরের ভেতর ঢুকতে চাচ্ছে। ডাক দিলাম, “শান্তা”।
এতক্ষণ জানালার কাছে অন্য বাচ্চাদের সাথে দাঁড়িয়ে ছিল শান্তা। ডাক শুনে দরজার সামনে এসে বললো – জ্বি।
“তোমার খালাকে বলো মুরগিগুলি নিয়ে যেতে। বলো ঘরে ঢুকে যাচ্ছে।“
“জ্বি” – বলে শান্তা দৌড়ে চলে গেল তার খালাকে ডাকতে।
“কী কিউট বাচ্চা! কে স্যার?”
“আমার বাড়িওয়ালার মেয়ে। মুরগিগুলি আমার প্রতিবেশীর। শান্তার খালা আমার প্রতিবেশী।“
একটু পরেই শান্তার খালা আর খালু দুজনই বের হয়ে এসে মুরগিদের তাড়া করে নিয়ে গেলো। দেখলাম একটু আগে মুরগির সৌন্দর্যে যে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল সে এখন মুরগির বিষ্ঠার গন্ধে নাকে ওড়নাচাপা দিচ্ছে।
“আমরা কবে থেকে আসবো স্যার?”
“দেখো, আমি তো তোমাদের বলেছি যে আমি প্রাইভেট পড়াই না। আমার ক্লাস করলে আর প্রাইভেট পড়ার দরকার নেই।“
“আমরা তো প্রাইভেট পড়ার কথা বলছি না স্যার। আমরা যদি ফিজিক্সের কোন কিছু না বুঝি – সেটা তো আপনি আমাদের বুঝিয়ে দেবেন, তাই না?”
“হ্যাঁ, তা তো দেবোই।“
“সেই টাই তো স্যার। আমরা অনেক কিছুই বুঝতে পারছি না স্যার। সেগুলি বুঝার জন্য কখন আসবো?”
এদেরকে যতটা সহজ-সরল ভেবেছিলাম – এরা মোটেও তা নয়। এরা আমার কথার জালে আমাকেই জড়িয়ে ফেলছে। বললাম, “আবার আসতে হবে না, এখনই বলো, কী সমস্যা – বুঝিয়ে দিচ্ছি।“
“আজ না স্যার। আজ তো বাসা চিনে গেলাম। এখন থেকে যখনই সমস্যা হবে চলে আসবো। একটু কষ্ট হবে। পতেঙ্গা থেকে এখানে – এমন কি আর দূরত্ব! ঠিকই চলে আসতে পারবো।“
“না, বাসায় আসতে হবে না। সমস্যা থাকলে কলেজেই দেখিয়ে নিও।“
“তাহলে তো স্যার ছুটির পর আপনাকে সময় দিতে হবে।“
“ঠিক আছে, দেখা যাবে।“
“থ্যাংক ইউ স্যার, থ্যাংক ইউ থ্যাংক ইউ থ্যাংক ইউ”
এরা কি পাগল নাকি? এত উচ্ছ্বাস দেখানোর কী আছে! আজ কোথাও বের না হবার প্ল্যান বাতিল করতে হলো।
“তোমরা কি আর কোথাও যাবে? আমাকে এক জায়গায় যেতে হবে।“
“ঠিক আছে স্যার। আমরা যাই স্যার।“
“দাঁড়াও, আমিও বের হচ্ছি।“
রুমে তালা দিয়ে বের হলাম। সারা পথজুড়ে খড় বিছানো। সালাম সাহেব ধানচাষও করেন। ধান মাড়াই করে এখন খড় শুকাচ্ছেন। তাঁর গরুর খাদ্য। এই শহুরে মেয়েগুলো খড়ের উপর দিয়ে উঁচু জুতা পরে ঠিকমতো হাঁটতেও পারছে না। একটু পরপরই পায়ে খড় লেগে পড়ে যেতে যেতে একজন আরেকজনকে ধরে সামলে নিচ্ছে আর খিলখিল করে হেসে উঠছে। কেমন যেন মায়া লাগছে এদের জন্য।
>>>>>
কলেজের ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট হয়ে গেছে। এবার ফার্স্ট ডিভিশন ছাড়া ফর্ম দেয়া হয়নি। ভর্তি পরীক্ষায় যারা টিকেছে তারা ভর্তি হয়ে গেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই ক্লাস শুরু হবে। সায়েন্সের তিনটি সেকশানকে এ বি সি সেকশানের বদলে এখন নাম দেয়া হয়েছে – ইউরেনাস, নেপচুন, প্লুটো। আমাকে প্লুটো সেকশানের ক্লাস-টিচার করা হয়েছে। একই সাথে ক্লাস সেভেনের ক্লাস টিচারের কাজও চালিয়ে যেতে হবে তাদের বার্ষিক পরীক্ষা হয়ে যাওয়া পর্যন্ত। কাজের পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে।
টিফিন আওয়ারে ক্লাস সেভেনের এইচ-ডাব্লিউ অর্থাৎ হোম-ওয়ার্ক দেখছি যত দ্রুত সম্ভব। বি সেকশানের মনিটর ফেরদৌসী এসে দাঁড়িয়ে আছে তাদের খাতা নিয়ে যাবার জন্য। এখনো দু’তিনটা খাতা দেখার বাকি। ফেরদৌসী উশখুস করছে চলে যাবার জন্য। দেখলাম তার চোখ বারান্দায় - সেখানে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে পার্সা, রেহনুমা আর কানিজ।
“তুমি এক কাজ করো, কিছুক্ষণ তোমার বন্ধুদের সাথে গল্প করে আসো। দশ মিনিট পরে এসে খাতাগুলো নিয়ে যেও।“
“থ্যাংক ইউ স্যার” বলে প্রায় উড়ে চলে গেল ফেরদৌসী। কিন্তু সাথে সাথে আরেকজন এসে দাঁড়ালো টিচার্সরুমের দরজায়।
“স্যার, একটু কথা বলা যাবে?”
“দশ মিনিট পরে বললে কি খুব অসুবিধা হবে সুফিয়ান?”
“না স্যার, দশ মিনিট পরে বলবো।“
সুফিয়ান চলে গেলো। আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যেই খাতা দেখা শেষ করলাম। নিয়তিদির রেখে যাওয়া সিঙাড়া ঠান্ডা হয়ে গেছে। ঠান্ডা সিঙাড়া গরম করার কোন ব্যবস্থা নেই কলেজে, ঠান্ডাই খেতে হবে। বিমল স্যার সিঙাড়ার ভেতর বিড়ি পাওয়ার পর থেকে সিঙাড়া ভেঙে ভেতরটা দেখে খেতে হচ্ছে। এতে দুই হাতেই তেল লেগে যায়। কাশেম স্যার সেই তেল ছেলেমেয়েদের খাতাতেই মুছে ফেলেন। আমি পারি না। প্রিন্সিপালের রুমে টিস্যুপেপার আছে। আমাদের রুমে টিস্যু-পেপার দেয়া হয় না। তাই আমাদের হাত মোছার ব্যবস্থাটুকু নিজেদের করতে হয়।
বারান্দায় বের হওয়ার সাথে সাথেই ফেরদৌসী দৌড়ে এল।
“স্যার, হয়ে গেছে?”
“হ্যাঁ, তোমাদের খাতা নিয়ে যাও। আর আমার ক্লাস তো সিক্স পিরিয়ডে। তখন দেখা হবে।“
ফেরদৌসী হাসতে হাসতে খাতা নিয়ে চলে গেল। এতগুলো খাতা একজনের পক্ষে এখান থেকে হ্যাঙ্গারে নিয়ে যাওয়া সোজা কথা নয়। অনেক ভারী মোটা মোটা খাতা। কিন্তু এই মেয়েটি হাসিমুখে নিয়ে যাচ্ছে। মনিটর হওয়া যে কত ধরনের শাস্তি তা কি এরা বোঝে না? ক্লাসে ফার্স্ট সেকেন্ডকে দিয়ে এই কাজ না করিয়ে এগুলো তো করানো উচিত ক্লাসের লাস্ট এবং সেকেন্ড লাস্টকে দিয়ে।
“স্যার, কথাটা কি এবার বলা যাবে?”
সুফিয়ান এবার সাথে আরো একজনকে নিয়ে এসেছে।
“বলা যাবে। বলো কী কথা।“
“ভয়ে বলবো, না নির্ভয়ে বলবো স্যার?”
সুফিয়ান শিল্পী মানুষ। গান করে। শুনেছি কবিতাও লেখে। ক্লাসের বইয়ের বাইরেও যে পড়াশোনা করে তা তার কথাবার্তায় বোঝা যায়।
“যা বলবে, নির্ভয়ে বলবে। তোমার কথার সাথে আমি একমত নাও হতে পারি, কিন্তু তোমার কথা বলার স্বাধীনতায় আমি বিশ্বাস করি।“
“স্যার আমার ধারণা আপনার মধ্যে জেন্ডার বায়াসনেস আছে।“
সিরিয়াসলি? কিছুটা অবাক হয়ে তাকালাম সুফিয়ানের দিকে। তার মুখ হাসিহাসি। তার মানে সে কথা বলার আর্ট ভালোই জানে। সিরিয়াস কথা সবসময় সিরিয়াসলি বলতে হবে এমন কোন কথা নেই। সে জানে সিরিয়াস অভিযোগ হাসিমুখে করলেও সিরিয়াসনেস হারায় না।
“কোন্‌ জেন্ডারের দিকে আমি বায়াস্‌ড বলে তোমার মনে হচ্ছে?”
“ফেমিনিন জেন্ডারের দিকে স্যার।“
“প্রমাণ?”
“আপনি স্যার মেয়েদেরকে কলেজের পরে ফিজিক্স বুঝিয়ে দিচ্ছেন। আমরা ছেলেরা সেই সুযোগ পাচ্ছি না।“
তাহলে এই ব্যাপার! সেদিন আমার বাসায় গিয়ে মেয়েরা সম্মতি আদায় করেছিল। তাদের সমস্যাগুলো সপ্তাহে এক বা দুই দিন ক্লাসের পর দেখিয়ে দিই। পাঁচ-ছ’জনের একটা দল। সংখ্যা মাঝে মাঝে কম-বেশি হয়। যেহেতু পরীক্ষা পাসের জন্য সাজেশান দেখে পড়া নয়, নোট মুখস্থ করার ব্যাপার নয়, - পদার্থবিজ্ঞান বুঝার জন্য কেউ আলোচনা করতে আগ্রহী হলে আমার তো কোন আপত্তি নেই। তাছাড়া আমি কোন টাকা নেবো না বলে দিয়েছি। টাকা নিলে একটা দায়বদ্ধতা চলে আসে। আমি সেই দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত থাকতে চাই। কিন্তু সুফিয়ান কি এর সবটুকু জানে?
হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলাম, “তারা যে আমার বাসায় গিয়ে মুরগি দেখে মুগ্ধ হয়ে এসেছে – তা কি তুমি জানো?”
“জানি স্যার। আমাদেরকেও কি স্যার তাই করতে হবে?”
“না না, তা করতে হবে না। এখন তো মনে হচ্ছে জেন্ডার বায়াসনেস কাটানোর জন্য হলেও তোমাদের সময় দিতে হবে।“
“জ্বি স্যার। আমাদেরও খুব বেশি কিছু লাগবে না স্যার। যেগুলো আমরা বুঝতে পারবো না, সেগুলো বুঝিয়ে দিলে হবে।“
“ঠিক আছে।“
“থ্যাংক ইউ স্যার।“
সুফিয়ান, ফারুক এদের কয়েকজনের একটা গ্রুপকে ফিজিক্স বুঝানোর জন্য মাঝে মাঝে যেতাম নৌবাহিনীর কোয়ার্টারে। পড়ালেখায় খুব সিরিয়াস তারা – অন্তত ফিজিক্সে। তাদের কাছেই আমি প্রথম শুনেছিলাম – মিস্টার বিন-এর কথা। টিভিতে নাকি তখন মিস্টার বিন দেখাতো। আমার টিভি ছিল না – তাই সেই সময় একদিনও দেখিনি। সুফিয়ান আমাকে কেন মিস্টার বিনের কথা বলেছিল জানি না। পরে মিস্টার বিন দেখেছি। আমার আচার-আচরণের সাথে কি মিস্টার বিনের কোন মিল সে খুঁজে পেয়েছিল? আমি জানি না।
>>>>>>>>>>>>>
ছুটির পর খাতাপত্র গোছাচ্ছি – দেখি দরজার কাছে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছে রেহনুমা। এই মেয়েটাকে সারাক্ষণই হাসিখুশি দেখতে অভ্যস্ত আমি। হঠাৎ মন খারাপ কেন তার?
“কী হয়েছে? মন খারাপ কেন?”
“আমার ঘড়িটা পাচ্ছি না।“
“তোমার হাতে ছিল?”
“খুলে আমার ডেস্কে রেখেছিলাম। এখন নেই।“
“ভালো করে খুঁজে দেখেছো? চলো আমিও যাচ্ছি – দেখি খুঁজে। আছে কোথাও। ঘড়ি কোথায় যাবে? মন খারাপ করো না।“ - তার সাথে তার ক্লাসের দিকে যেতে যেতে বললাম।
ক্লাস সেভেনের তার ডেস্কের আশেপাশে আমিও খুঁজে দেখলাম। কোথাও নেই।
“ঘড়িটা আম্মুর। আম্মু বকা দেবে।“ – চোখ ছলছল করছে রেহনুমার।
“আম্মু মোটেও বকা দেবে না।“ বলতে বলতে ক্লাসে ঢুকলেন রিফাৎ আরা ম্যাডাম। তার পেছনে কলেজের আয়া অঞ্জনা। রেহনুমা ঘড়ি হারিয়েছে, কিন্তু রিফাৎ আরা ম্যাডাম এখানে কেন?
“আম্মু, আমার ঘড়িটা পাচ্ছি না।“
আমি একবার রেহনুমার দিকে তাকাই, একবার রিফাৎ আরা ম্যাডামের দিকে। রেহনুমা যে রিফাৎ আরা ম্যাডামের মেয়ে এই কথাটি আমি এতদিন পরে এভাবে জানলাম। রিফাৎ আরা ম্যাডাম একবারও বলেননি যে তাঁর মেয়ে আমার ক্লাসে পড়ে। প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কোন প্রভাব পড়ুক তা তিনি চান না বলেই কিছু বলেননি। এরকম ইস্পাতের মত ব্যক্তিত্ব মানুষের কীভাবে হয়!
ঘড়িটা সেদিন আর পাওয়া গেল না। পরের দিন টিফিন আওয়ারে রেহনুমা এসে জানিয়ে গেল তার ঘড়িটি পাওয়া গেছে। ওটা ভুল করে ক্লাসের অন্য কারো বাড়িতে চলে গিয়েছিল। এখন ফিরে এসেছে।
>>>>>>>>>>>>
ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাস শুরু হয়েছে। কয়েক শ নতুন মুখ এখন কলেজে। সেকেন্ড ইয়ারের ছেলে-মেয়েদের ভেতর এক দিনের মধ্যেই সিনিয়র সিনিয়র ভাব চলে এসেছে। তারা বারান্দায় দাঁড়িয়ে কিছুটা উচ্চস্বরে ফার্স্ট ইয়ারের মনযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে।

 ক্লাস সেভেনের সাথে প্রতিদিন ফার্স্ট পিরিয়ড থাকে আমার। এখন রুটিন কিছুটা পরিবর্তন করে আমার ফার্স্ট পিরিয়ড দেয়া হয়েছে ফার্স্ট ইয়ারের প্লুটো সেকশানের সাথে। সেই সেকশানের ছেলেদের কলেজের প্রথম ক্লাসটি হলো আমার সাথে। কলেজের নিয়মকানুন ইত্যাদির উপর জোর দেয়ার চেয়েও আমি জোর দিলাম ভালো মানুষ হবার উপর। উপদেশ কেউ শুনতে চায় না। আমি উপদেশ দিতেও চাই না। আমি শুধু আমার নিজের অভিজ্ঞতা এবং দর্শন ভাগাভাগি করতে পারি তাদের সাথে। প্রথম দিন – অনেকেরই ইউনিফরম নেই। বিভিন্ন রকমের পোশাকে দেখতে ভালোই লাগছে সবাইকে। আমার নিজের কলেজের প্রথম দিনের কথা মনে পড়ছিল।

সেকেন্ড পিরিয়ডে গেলাম ক্লাস সেভেনে। ক্লাসে ঢোকার সাথে সাথে যথানিয়মে সবাই মেরুদন্ড সোজা করে বসলো। কিন্তু সারা ক্লাস এতটাই নিষ্প্রাণ নিস্তব্ধ – মনে হচ্ছে কারো নিশ্বাসের শব্দও পাওয়া যাচ্ছে না। এত হাসিখুশি একটা ক্লাসের কী হলো আজ? সেকেন্ড পিরিয়ড – তাই রোল কল করার দরকার নেই। পুরো বই কবেই শেষ হয়েছে। এখন রিভিশান চলছে। জিজ্ঞেস করলাম, “আমরা কী করবো আজ?”
পুরো ক্লাস পাথরের মত মুখ করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। তাদের চোখেমুখে কেমন একটা গাম্ভীর্য – যা এগারো-বারো বছরের ছেলে-মেয়েদের জন্য একটু বেশি ভারী হয়ে যায়। কেউ একটা শব্দও বের করছে না মুখ দিয়ে।
“কী হয়েছে তোমাদের?”
কোন উত্তর নেই। মনে হচ্ছে কোন্‌ এক মন্ত্রবলে রূপকথার সেই ঘুমন্ত পুরীর মানুষের মত পাথর হয়ে গেছে এরা। আমি একটা হাসির গল্প বলার চেষ্টা করলাম, “এক দেশে এক রাজা ছিল, তার একটি বানর ছিল, বানরটি রাজা ঘুমালে মাছি তাড়াতো …” – অন্যদিন হলে এটুকু বলার আগেই অনেকগুলো প্রশ্ন করে ফেলতো এরা। রাজার কেন বানর থাকবে? কিংবা রাজার বাড়িতে মাছি আসবে কেন? এরকম অনেক প্রশ্ন। কিংবা – রাজার নাম কী? কোন্‌ দেশ? সেই দেশের রাজধানী কী? এরকম প্রাণোচ্ছল সব প্রশ্ন। কিন্তু আজ কী হলো এদের? এদের মন খারাপ সেটা আমি বুঝতে পারছি। কেন মন খারাপ? অনেক চেষ্টা করেও কারো মুখ থেকে একটা শব্দও বের করতে পারলাম না।
বই খুলে কিছু বীজগণিত উৎপাদকে বিশ্লেষণ ইত্যাদি করলাম। তারা যন্ত্রের মতো নিঃশব্দে লিখলো। ঘন্টা বাজার পরও কেউ কোন কথা বললো না। আমি চলে এলাম। কিন্তু মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেল। কী হলো এদের?
>>>>>>
পরের দিনও ক্লাসে ঢুকার পর দেখলাম কেউ কোন কথা বলছে না। বললাম, “কাল থেকে আমার মনটা খুবই খারাপ। তোমাদের মন খারাপ দেখলে আমার ভালো লাগে না। তোমাদের কী হয়েছে আমাকে বলবে? প্লিজ।“
“আপনি আমাদের ছেড়ে অন্য ক্লাসের ক্লাসটিচার হয়ে গেছেন। আমাদের মন খারাপ হতে পারে না?” – কানিজ নাইমা বললো। মনে হচ্ছে যেন কেঁদে ফেলবে সে। এবার অন্যরাও কথা বলতে শুরু করলো। কিন্তু হাসছে না কেউ।
“আপনি কেন এমন করলেন?”
“কেন আপনি ফার্স্ট পিরিয়ডে আমাদের ক্লাসে আসেননি?”
“নতুন ফার্স্ট ইয়ার এসেছে তো। আমাকে যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তা পালন করতে হবে না? আমি তো তোমাদের সাথেই আছি। হাহাহা।“ - আমি হাসার চেষ্টা করলাম। কিন্তু একা একা তো হাসা যায় না।
তাদের অনেক বোঝালাম যে আমি তাদের ছেড়ে যাইনি। তাদের ক্লাসটিচার আমিই আছি। তারা পাস করে ক্লাস এইটে উঠলে তবেই আমার ছুটি।
ক্লাস শেষে ডেস্কে ফিরে এলাম। কিসের যেন একটা দলা-পাকানো অনুভূতি বুকের ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে। বাথরুমে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালাম। আমার উপর অভিমান করে সারা ক্লাস চুপ করে ছিল পুরো চল্লিশ মিনিট। আমি তাদের ক্লাসে আগে না গিয়ে কেন অন্য ক্লাসে আগে গেলাম – শুধুমাত্র সেজন্য! এতো ভালবাসা আমার জন্য! চোখের পানি আটকে রাখতে পারছি না কেন?

2 comments:

  1. তোমার শেষের পার্টটা অনেক সুন্দর। পড়ে মনে হচ্ছিল, আমিও এখনি কেঁদে ফেলবো।

    ReplyDelete

Latest Post

The World of Einstein - Part 2

  ** On March 14, 1955, Einstein celebrated his seventy-sixth birthday. His friends wanted to organize a grand celebration, but Einstein was...

Popular Posts