Saturday 23 May 2020

ছিন্ন পাতার সাজাই তরণী - পর্ব ২৩

23

অনেকদিন টানা বৃষ্টির পর আজ রোদের দেখা পেলাম, কিন্তু কোন রিকশা পেলাম না। বের হতে দেরি করিনি। হাতে সময় আছে হেঁটে যাবার, তাই খুব একটা বিচলিত হলাম না। গলির মুখে প্রতিদিন এই সময় একটা রিকশা থাকে। লিকলিকে এক তরুণ রিকশাওয়ালা উদাসভাবে রিকশার সিটের উপর বসে থাকে। তার সাথে কোন চুক্তি হয়নি, বা নিয়মিত তার রিকশায় যাবো বলেও কথা হয়নি। কিন্তু সে থাকে। হয়তো খেয়াল করেছে – আমি প্রতিদিন সকালে বের হই। প্রথমদিন তাকে পেয়েছিলাম মিয়ার বাপের মসজিদের সামনে থেকে। রমজানের ছুটির পর যেদিন প্রথম কলেজে গেলাম,  তাড়াহুড়ো ছিল। কিন্তু গুলজার সিনেমার কাছাকাছি গিয়ে তার রিকশার চেইন পড়ে গিয়েছিল। দৌড়ে গিয়ে বাসে উঠে পড়েছিলাম – নাম জিজ্ঞেস করার সময় পাইনি। পরের দিন তাকে পেলাম আমার গলির মুখে। আমাকে দেখেই এক লাফে সিট থেকে নেমে গেল। যেন সে আমার জন্যই অপেক্ষা করছিলো। সকালবেলা রাস্তা খালি থাকে। দশ মিনিটের বেশি লাগে না গুলজার সিনেমার সামনে আসতে। এর মধ্যেই টুকটাক কথা হয় তার সাথে। তার নাম আলমগীর। হয়তো চিত্রনায়ক আলমগীরের নাম অনুসারেই মা-বাবা নাম রেখেছিলেন।

মিয়ার বাপের মসজিদের সামনেও আলমগীর নেই আজ। কোথায় গেছে কে জানে। হয়তো মিটিং-এ লোক নেয়ার জন্য তার রিকশাও ভাড়া করে ফেলা হয়েছে।  গত দু’সপ্তাহ ধরে সারা শহরে হৈ চৈ চলছে – ২৬ জুলাই লালদীঘির মাঠে জামায়াতে ইসলামীর আমীর গোলাম আজমের সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান। গত মাসে সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে গোলাম আজমের নাগরিকত্ব বহাল থাকবে। আওয়ামী লীগ এবং অন্যান্য প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল গোলাম আজমকে চট্টগ্রামে প্রতিহত করার ডাক দিয়েছে। কিন্তু চট্টগ্রাম জামায়াত শিবিরের ঘাঁটি। তারা যে কোন মূল্যে সভা করার জন্য প্রস্তুত। আজ সেই সভা। চন্দনপুরায় অনেকগুলো মেস আছে শিবিরের। রাস্তায় প্রচুর অপরিচিত মুখ। সারাদেশের শিবির-ক্যাডাররা এখন চট্টগ্রামে চলে এসেছে। কিছুটা ভয় ভয় লাগছে। চারদিকে ঝকঝকে রোদ – কিন্তু কেমন যেন রাজনৈতিক ঝড়ের পূর্বাভাস পাচ্ছি।

গুলজার সিনেমার সামনে মার্কেটের বারান্দায় আমরা সবাই দাঁড়াই বাসের জন্য। কিন্তু আজ কেউ নেই। অনেক আগে চলে এলাম নাকি? না – ৬টা ৪৫। এতক্ষণে বাস চলে আসে। তবে কি বাস আগে চলে গেল আজ? জানি না। অপেক্ষা করবো, নাকি বাসে চলে যাবো? কী করবো ভাবছি – দেখলাম রিকশা থেকে নামলো টুনি আর লাইলুন্নাহার ম্যাডাম। ভাইস প্রিন্সিপাল ম্যাডাম মনে হয় যাবেন না আজ।
“আজ তো বাশ আসবে না।“ – লাইলুন্নাহার ম্যাডাম বললেন।
“ও তাই নাকি? আমি ভাবছি বাস চলে গেলো কি না।“
“না, টুনির আম্মু সকালে ফোন করেছিলেন বেইজে। বলেছে আজ বাশ আসবে না।“
“তাহলে আজ না গেলেই তো পারতেন ম্যাডাম।“
“না তা কী করে হয়?”
লাইলুন্নাহার ম্যাডাম মিষ্টি করে হেসে বললেন। ক্লাস টু’র ক্লাসটিচার তিনি। সারাক্ষণ ক্লাসেই থাকেন। হ্যাঙ্গারে সেভেন বি’র ক্লাসে যাবার সময় তাঁর ক্লাসের সামনে দিয়ে যেতে হয় আমাকে। প্রায়ই দেখি ক্লাসের মাঝখানে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলছেন আর শিশুরা হা করে তার কথা শুনছে। এরকম মমতাময়ী শিক্ষককে শিশুরা ভালোবাসবে এটাই স্বাভাবিক।
“তুমি আজ না গেলে পারতে।“ – টুনিকে বললাম।
“আমার ক্লাস টেস্ট আছে স্যার।“
আগামীবছর এসএসসি পরীক্ষা দেবে সে। তাই এখন কোন ক্লাস কিংবা টেস্ট মিস করতে চাচ্ছে না।
তিনজনে একটা বেবিট্যাক্সি নিয়ে চলে গেলাম কলেজে। কলেজের সব কাজকর্ম স্বাভাবিক নিয়মেই চললো। শহরের রাজনৈতিক উত্তেজনার কোন ছিঁটেফোঁটাও কলেজে এসে পৌঁছায়নি। অবশ্য কলেজে রাজনীতিচর্চা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ না হলে কী হতো বলা মুশকিল।
ছুটির পর বিমানবাহিনীর নিয়মিত বাস এলো। মনে হলো শহরের রাজনৈতিক উত্তেজনা থেমে গেছে। কিন্তু না, দেওয়ান হাট ব্রিজ পার হয়ে টাইগারপাসের মোড়ে এসে গাড়ি থেমে গেল। গাড়ি এখান থেকেই বেইজে ফিরে যাবে। জানা গেল নিউমার্কেট এলাকায় গন্ডগোল হচ্ছে।
গাড়ি থামার সাথে সাথেই ছোলাইমান স্যার বাস থেকে নেমে কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গেলেন। টুনি, লাইলুন্নাহার ম্যাডাম আর হোসনে আরা ম্যাডাম একটি বেবিট্যাক্সি নিয়ে চলে গেলেন। সুচরিত স্যার নেমে গেছেন অনেক আগে - শিপিং কর্পোরেশন অফিসের সামনে।

সুপাল স্যার আর বিমল স্যারের সাথে বেবিট্যাক্সিতে উঠে রওনা দিলাম নিউমার্কেটের দিকে। কিন্তু বি-আর-টি-সি মার্কেটের সামনে সব গাড়ি ঘুরিয়ে দেয়া হচ্ছে। লোকজন বলাবলি করছে শহীদ মিনারে পুলিশের সাথে আওয়ামী লীগের সংঘর্ষ হয়েছে। নিউমার্কেট এলাকা এখন রণক্ষেত্র। ওদিকে কোন গাড়ি যেতে দেয়া হচ্ছে না। সুপাল স্যার আর বিমল স্যারের নির্দেশ অনুযায়ী অনেক অলিগলি পেরিয়ে ট্যাক্সি চলে গেল নালাপাড়ার দিকে। যে গলিতে থামলো তা সম্পূর্ণ অপরিচিত জায়গা, আমি কখনো আসিনি এদিকে। বিমল স্যার চলে গেলেন। সুপাল স্যার বললেন, “বাসায় চলেন।“
“না স্যার, আমি নিজের বাসায় চলে যাবো।“
“কীভাবে যাবেন? ওদিকে এখন মারপিট হচ্ছে। আমার বাসা এখানেই। আমার সাথে ভাত খেয়ে বিকেলে যাবেন।“
এত আন্তরিক আমন্ত্রণ উপেক্ষা করার ক্ষমতা আমার নেই। সুপাল স্যারকে অনুসরণ করলাম।
সুপাল স্যারের স্ত্রী দরজা খুলে স্যারের পেছনে আমাকে দেখে একটু অবাক হলেন। সুপাল স্যার বললেন, “দেখো দেখি চিনতে পারো কি না।“
বৌদি একটু ইতস্তত করে বললেন, “সুচরিত?”
“না, হয়নি।“
“তাহলে প্রদীপ। আসেন ভেতরে আসেন। অনেকদিন থেকেই শুনছি সুচরিত আর প্রদীপের নাম। বসেন বসেন।“
খুব সুন্দর ছিমছাম বাসা সুপাল স্যারের। বৌদি খুব গুছিয়ে রেখেছেন সবকিছু। সুপাল স্যার ভেতরের রুমে চলে গেছেন। এদিকের আরেকটি রুম থেকে বের হলেন একজন মোটাসোটা ভদ্রলোক। ফাইজার কোম্পানির একটা নীল টি-শার্ট আর লুঙ্গি পরে আছেন। অনেক বড় পেটের কারণে টি-শার্টটি গায়ের সাথে ল্যাপ্টে আছে। সুপাল স্যারের ভাই নাকি? চেহারায় কোন মিল নেই।
“তুমি কি স্যারের কাছে এসেছ?”
রুমে ঢুকেই আমাকে প্রশ্ন করলেন ভদ্রলোক।
“হ্যাঁ, স্যারের সাথে এসেছি।“
“ও, স্যার দেখেছে তোমাকে? প্রাইভেট পড়তে এসেছ?”
ভদ্রলোক নিশ্চয়ই আমাকে সুপাল স্যারের ছাত্র মনে করেছেন। আমি কিছু বলার আগেই ভদ্রলোক আবার বললেন, “তুমি কি শাহীন কলেজে পড়? নাকি অন্য কলেজে?”
“আরে তুমি কাকে কী বলছ? ও শাহীন কলেজের ফিজিক্সের টিচার প্রদীপ। আর ও হলো অনুতোষ, আমার বন্ধু।“
অনুতোষবাবু হায় হায় করে উঠলেন।
“আপনি কিছু মনে করবেন না। আমি আপনাকে ছাত্র মনে করেছি। অনেক ছাত্র আসে তো বাসায়। তাদের দেখতে দেখতে সবাইকে ছাত্র মনে হয়। আপনি কিছু মনে করবেন না।“
কিছু মনে করার প্রশ্নই ওঠে না। অনুতোষ বাবুকে খুব সরল হাসিখুশি মানুষ বলে মনে হলো। জানা গেলো হাজারি লেনে তাঁর ওষুধের দোকান আছে। থাকেন এখানেই – বন্ধুর সাথে। বিয়ে করেননি। বিয়ে-বিরোধী অনেক কথাবার্তা বললেন কোন প্রসঙ্গ ছাড়াই।
আধঘন্টার মধ্যে খাবার টেবিল ভর্তি করে ফেললেন বৌদি। খেতে খেতে অনুতোষ বাবু বললেন, “ডালে লবণ কম হয়েছে। তোমার রান্না দিনে দিনে খারাপ হয়ে যাচ্ছে।“
“খুব ভালো হয়েছে। এর চেয়ে ভালো রান্না খেতে হলে বিয়ে করে বউয়ের হাতের রান্না খেতে হবে।“ – বৌদির সপ্রতিভ উত্তর।
“আরে বিয়ে করা মানে তো বউয়ের গোলামী করা। অনুতোষ কারো গোলামী করে না।“
অনুতোষ বাবু হয়তো ঠাট্টা করছেন। বন্ধুর বউয়ের সাথে মধুর ঠাট্টা-তামাশা তো করেই মানুষ। মনে হচ্ছে অনুতোষ বাবু বিয়ের জন্য অনেক চেষ্টা করেছেন।  তাকে দেখলে কোন মেয়েরই তাকে পছন্দ হবে বলে মনে হয় না। সেই কারণেই কি তিনি বিয়ে-বিরোধী কথাবার্তা বলছেন?
“নিউমার্কেটের ওদিকে আজ কী হয়েছে জানেন?” – প্রসঙ্গ ঘোরালাম আমি।
“কমপক্ষে বিশ-পঁচিশ জন মারা গেছে। শিবিরের ক্যাডাররা গুলি করে করে মারছে ছাত্রলীগের ছেলেদের।“
আমি শিউরে উঠলাম। গলা দিয়ে খাবার নামতে চাইছে না আর। অনুতোষ বাবু তৃপ্তি করে মাছের মাথা চিবুতে চিবুতে বলছেন, “গোলাম আজমের মিটিং বানচাল করার সাধ্য আওয়ামী লীগের নেই। লালদিঘীতে এখন গোলাম আজম ভাষণ দিচ্ছে। কেউ ঠেকাতে পারছে? এই যে শহীদ মিনারে এতগুলা মানুষকে গুলি করে মেরে ফেললো – কেউ কিছু করতে পারলো?”
অনুতোষ বাবুর কথা বিশ্বাস করতে মন চাইছে না। তিনি নিশ্চয় বাড়িয়ে বলছেন। বিশ পঁচিশ জন মানুষ মারা গেলে শহরে আরো বেশি প্রতিক্রিয়া হবার কথা নয়? অবশ্য কী প্রতিক্রিয়া হবে? ১৯৭১ সালে তিরিশ লক্ষ মানুষ মারা গেল যাদের হাতে – তাদের দোসরদের অনেকেই আজ স্বাধীন বাংলাদেশের মন্ত্রী। কিছু কি প্রতিক্রিয়া হয়েছে?

খাওয়ার পর আর দেরি করলাম না। বের হয়ে পড়লাম। বাসায় যেতে হবে। কিন্তু যাবো কীভাবে? নিউমার্কেটের দিকে যাওয়া যাবে না। সিটি কলেজের পেছন দিকে একটি গলিপথ ধরে স্টেশন রোডে এলাম। তারপর রেয়াজুদ্দিন বাজারের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে জুবলি রোডে এলাম। রাস্তায় খুব বেশি মানুষ নেই। কেমন যেন থমথমে পরিবেশ চারদিকে। আউটার স্টেডিয়ামের কাছে অনেক মানুষ। শোনা যাচ্ছে ছয় জন মারা গেছে জামায়াত-শিবিরের গুলিতে। কয়েক শ’ মানুষ আহত হয়েছে। চট্টগ্রামে প্রতিরোধকারিদের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে জনসভা করছেন গোলাম আযম।

গাড়িচলাচল নেই বললেই চলে। চট্টেশ্বরী রোডের সামনে দিয়ে চকবাজারে এলাম। এদিকে রিকশা চলছে। বিধ্বস্ত শরীর-মন নিয়ে বাসায় এলাম। বুঝতে পারছি না আগামীকাল হরতাল হবে কি না। যদি হয় ভোরে উঠে রিকশা করে কলেজে যেতে হবে।

২৭ তারিখ নয়, ২৮ তারিখ হরতাল ডাকা হয়েছে। বৃহস্পতিবার হরতাল ডাকলে বেশি সফল হয়। পরের দিন ছুটি থাকে বলে বৃহস্পতিবারের হরতালকেও ছুটি হিসেবে ধরে নেয় অনেকে। কিন্তু ইদানীং হরতালের পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে বলে সরকারি নির্দেশ এসেছে হরতালের দিন প্রমাণ করতে হবে যে হরতাল হয়নি। প্রিন্সিপাল স্যার আমাদের ডেকে বলে দিয়েছেন হরতালের দিন ছুটি নেয়া যাবে না।

“তুমি আজ আমার বাসায় থাকবে চল। কাল সকালে আমার সাথে রিকশায় চলে আসতে পারবে।“
অঞ্জন স্যার বেশ আন্তরিকভাবে নিমন্ত্রণ করছেন আমাকে। আমি ইতস্তত করছি দেখে তিনি আবার বললেন, “কী এত ভাবছ? তোমার বাসায় তো তুমি একাই থাকো। একদিন আমার বাসায় থেকে দেখো – কেমন লাগে। হরতালের উছিলায় হলেও বাসায় চলো।“

আমি রাজি হয়ে গেলাম। অঞ্জন স্যারের সাথে ফকিরের হাটে নেমে গেলাম বাস থেকে। রিকশায় সিডিএ কলোনি আসতে বেশিক্ষণ লাগলো না। এদিকের আবাসিক এলাকায় আগে আসিনি কখনো। চন্দনপুরার ঘুপচি গলিতে থাকি বলেই এদিকের রাস্তা বাড়ি সব বড় বড় মনে হচ্ছে। বিশাল এক বিল্ডিং-এর সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলাম অঞ্জন স্যারকে অনুসরণ করে। ফ্ল্যাটের দরজায় বেশ বড় একটা সাইনবোর্ড। লেখা আছে - 
প্রফেসর অঞ্জন দাস, বিএসসি অনার্স, এমএসসি, ডিএইচএমএস (ঢাকা)
বিভাগীয় প্রধান, পরিসংখ্যান বিভাগ
বি এ এফ শাহীন কলেজ, চট্টগ্রাম
ভেতরে নাই
অঞ্জন স্যার দরজায় দাঁড়িয়ে সাইনবোর্ডে কিছু একটা করলেন। নিচের লাইনে ‘নাই’ শব্দটি অদৃশ্য হয়ে – হয়ে গেল ‘ভেতরে আছে’।

অঞ্জন স্যারের মতোই আন্তরিক অঞ্জন-বৌদি। কয়েক মিনিটের মধ্যেই খাবার টেবিল রেডি করে ফেললেন। অঞ্জন স্যার ভোজনরসিক। কিন্তু খাবার সময় তিনি কথা বলেন না। চিটাগং কলেজের হরিপদ স্যারের কথা মনে পড়লো। তিনি আমাদের প্রাণিবিজ্ঞানের ক্লাসে একবার বলেছিলেন – আমাদের খাদ্যনালি আর শ্বাসনালির মুখ ধরতে গেলে একই জায়গায়। খাওয়ার সময় কথা বললে শ্বাসনালীতে খাবার ঢুকে যেতে পারে। তাতে কিন্তু মৃত্যুও হতে পারে। অঞ্জন স্যার এই বৈজ্ঞানিক নিয়মের কারণেই হয়তো খাওয়ার সময় কথা বলেন না। খুবই সচেতন মানুষ তাতে কোন সন্দেহ নেই।

খাওয়া শেষ হতে না হতেই কলিং বেল বাজতে শুরু করলো। বিভিন্ন ক্লাসের অনেক ছাত্রছাত্রী আসতে শুরু করলো। অঞ্জন স্যার এত কাজ কীভাবে করেন কে জানে। ডাইনিং টেবিলে বসানো হলো এক ব্যাচ, অন্য একটা রুমে বসানো হলো আরেক ব্যাচ, আর একেবারে ছোট্ট ছোট্ট তিনজনকে বসিয়ে দেয়া হলো আসন পেতে ফ্লোরে। সারাদিন কলেজ করে এসে আবার এতগুলো ছেলেমেয়েকে পড়ানো সহজ কাজ নয়। অঞ্জন স্যার এই কঠিন কাজটাই করছেন কত সহজে। একবার একেক রুমে গিয়ে একেক ক্লাসের পড়া দেখিয়ে দিচ্ছেন। আমাকে একটা রুমে বিশ্রাম করতে দিয়েছেন। কিছুক্ষণ পর পর এসে আমার খোঁজখবরও নিচ্ছেন। সন্ধ্যাবেলা তাঁর সাথে বেরিয়ে গেলাম তাঁর ডাক্তারি চেম্বার দেখতে। তিনি পাস করা হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার। আগ্রাবাদে তাঁর চেম্বারে রোগীর ভিড়ও কম নয়। এত কাজ করার শক্তি তিনি কোথায় পান কে জানে। কাছ থেকে না দেখলে আমি জানতেও পারতাম না যে তিনি কত কাজ করেন, কত ধরনের কাজ করতে পারেন।
পরের দিন হরতাল। অঞ্জন স্যারের সাথে সকালে বের হলাম কলেজে যাবার জন্য। বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় কিছুদূর আসার পর একটা রিকশা পাওয়া গেল। সেই রিকশায় ফকিরের হাট পর্যন্ত এসে মেইন রোডে উঠতেই হৈ হৈ করে ছুটে এলো একদল পিকেটার। কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই হুশশশসশ করে শব্দ হলো। রিকশার তিনটা চাকার হাওয়াই ছেড়ে দেয়া হলো। তারপর পিকেটাররা চলে গেলো অন্য রিকশা ধরতে, বেবি টেক্সি আটকাতে। অঞ্জন স্যারের মুখ গম্ভীর। হাঁটা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। আমার হাঁটতে তেমন কোন কষ্ট হচ্ছে না, কিন্তু স্যারের মনে হয় কষ্ট হচ্ছে। তিনি আস্তে আস্তে হাঁটতে হাঁটতে গম্ভীরভাবে বললেন, “আমি চিন্তাকরে দেখলাম প্রদীপ, তোমার ভাগ্যটা খুবই খারাপ। আমি এত বছর ধরে এত হরতালে আসা-যাওয়া করেছি, আমাকে কোনদিন কোন পিকেটার ধরেনি। আজ প্রথম তুমি আমার সঙ্গে আছো, পিকেটার ধরলো। তোমার ভাগ্যটা বেশি খারাপ।“
আমি কী বলবো ঠিক বুঝতে পারছি না। আমার খারাপ ভাগ্যের জন্য তাঁকে সমস্যায় পড়তে হয়েছে বলে লজ্জা লাগছে। মিনমিন করে বললাম, “আমি খুব দুঃখিত স্যার। আমার জন্য আপনাকে অসুবিধায় পড়তে হলো।“
“আরে তোমার তো দোষ নেই। তোমার ভাগ্যের দোষ। তবে দোষ কাটানোর ব্যবস্থা আছে।“
“কী ব্যবস্থা স্যার?”
“জ্যোতিষীর কাছ থেকে আংটি নিতে হবে। সুচরিতকে দেখো। পাথরে ভাগ্য ফিরে গেছে।“
এমন সময় পিকেটারদের হৈচৈ হঠাৎ অনেক বেশি জোরে শোনা গেল। একটা চলমান টেম্পু লক্ষ্য করে জর্দার কৌটা ছুড়ে দেয়া হলো। প্রায় উলটে পড়তে পড়তে থেমে গেল টেম্পু। যাত্রীরা লাফ দিয়ে নেমে যে যেদিকে পারে দৌড় দিলো। আমি থমকে দাঁড়ালাম। মনে হচ্ছে একজনকে সুচরিত স্যারের মত লাগছে। ভাবলাম আমার মনের ভুল। একটু আগে তাঁর কথা হচ্ছিল বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু না, সুচরিত স্যারই। হাঁপাচ্ছেন।

No comments:

Post a Comment

Latest Post

Memories of My Father - Part 6

  The habit of reading books was instilled in us from a young age, almost unknowingly. There was no specific encouragement or pressure for t...

Popular Posts