Saturday 23 May 2020

ছিন্ন পাতার সাজাই তরণী - পর্ব ৩১

31


“প্রদীপ, তোমারে আমি খুচতেছি একটা কতা বলার জইন্য – “
টিচার্স রুমে ঢুকে আমার সামনের চেয়ার টেনে নিয়ে বসলেন নাসির স্যার।
“আরে বস বস। দারাইতে হবে না।” – হাসিমুখে বললেন তিনি। ভাইস প্রিন্সিপাল হয়ে টিচার্স রুম থেকে পাশের ছোট্ট অফিসে চলে যাওয়ার পর নাসির স্যার আমাদের টিচার্স রুমে খুব একটা আসেন না। অবশ্য ভাইস প্রিন্সিপাল হওয়ার আগেও তাঁকে বেশিক্ষণ টিচার্স রুমে দেখিনি কোনদিন। হয় ক্লাস নিচ্ছেন, নইলে প্রিন্সিপালের রুমে কাজ করছেন। আজ হঠাৎ এই রুমে তাঁকে দেখে একটু অবাক লাগছে।
“তুমি ত এইবারের ফাস্টিয়ারের ক্লাসটিছার।“
“জ্বি স্যার।“
“কোন সেকশান? ইউরেনাস?”
“না স্যার। ইউরেনাসের ক্লাস টিচার রিফাৎ আরা ম্যাডাম।“
“অ, ওই সেকশানে তো মেয়েরা।“
“আমি প্লুটো সেকশানের।“
“নেপচুনের ক্লাস টিচার কে?”
“সুচরিত স্যার।“
“সুচরিত কোথায়?”
“সম্ভবত রিহার্সাল করছেন সেকেন্ড ইয়ারের স্টুডেন্টদের সাথে।“
“আচ্ছা। তোমারে যেই কতা বলতেছিলাম – আচ ত সেকেনিয়ারের ছেলেমেয়েরা নবীন বরণ করতেচে। তুমি তোমার সেকশানের ছেলেদের নিয়া আর-টি-এস-এ চলি যাইবা ঠিক এগারটা বাযার সাতে সাতে। সুচরিত মনে হয় বিজি তাকবে। তুমি তার সেকশানের ছেলেদেরও নিয়া যাইবা। কেউ যেন কোন গন্ডগোল করার সুযোগ না পায়।“
নাসির স্যার কথা শেষ করতে না করতেই পিয়ন কাশেম এসে বললেন, “স্যারকে প্রিন্সিপাল স্যার ডাকতেছেন।“
নাসির স্যার দ্রুত চলে গেলেন।
ফার্স্ট ইয়ারের নবীন বরণ আজ। এতগুলো ছেলেকে সাথে নিয়ে যেতে হবে আর-টি-এস এর অডিটরিয়ামে। কলেজ থেকে প্রায় এক কিলোমিটার হবে মনে হয় দূরত্ব। সকালে বাসে করে গার্ডরুম দিয়ে আসার সময় হাতের বাম দিকে রিক্রুটমেন্ট ট্রেনিং সেন্টার – বা আর-টি-এস। অনেকগুলি বড় বড় বিল্ডিং দেখা যায় সেখানে। এক বিল্ডিং এর গায়ে লেখা আছে ঈগল, আরেক বিল্ডিং এর গায়ে লেখা ফ্যালকন। নতুন যোগ দেয়া এয়ারম্যানদের ট্রেনিং দেয়া হয় সেখানে। প্রতিদিন সকালে দেখা যায় সবাই দৌড়াচ্ছে সামনের মাঠে। কত রকমের শারীরিক কসরৎ যে করতে হয় তাদের। ওখানে আগে কখনো যাইনি। এতগুলো ছেলেকে এখান থেকে ওখানে আমি কীভাবে নিয়ে যাবো? ওদেরকে স্বাধীনভাবে যেতে বলে দিলে তো ওরা যে যার মতো চলে যাবে।
সাঈদ স্যারকে বলতে হবে ব্যবস্থা করার জন্য। তিনি এসব ব্যাপারে খুবই দক্ষ মানুষ। কিংবা শংকর স্যারকে বললে হবে। জোরালো হুইসেল দিয়ে সব ঠিক করে ফেলবে। তবুও আমার সেকশানের ছেলেদের একটু হুসিয়ার করে দেয়া দরকার – যেন কোন গন্ডগোল না করে। কলেজ থেকে অন্য একটা জায়গায় এতগুলি ছেলে যাবে – গন্ডগোল বাধালে তো আমাকেই অনেক জবাবদিহি করতে হবে। শুনেছি সেকেন্ড ইয়ারের ছেলেরা নাকি সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে গিয়ে মারপিট করেছে। তারজন্য তাদের ক্লাসটিচারের অনেক ভোগান্তি গেছে।
শংকর স্যারের সাথে পরামর্শ করলাম – কী করা যায়। তিনি বললেন, “কোন ব্যাপারই না। সব আমার উপর ছেড়ে দেন। এখান থেকে লাইন করে দেবো। লাইন ধরে সবাই চলে যাবে আর-টি-এস। কেউ লাইন ভাঙলে আমি তাদের হাড্ডি ভেঙে দেবো।“
এ তো দেখি আরেক যন্ত্রণা। লাইন ভাঙলেই যদি হাড্ডি ভেঙে দেন – তাহলে কীভাবে হবে? এত দূর পথ, হেঁটে হেঁটে যাবে – এটা কোন কথা? এত বড় প্রতিষ্ঠান, কয়েকটা গাড়ির ব্যবস্থা করতে পারবে না এখান থেকে আর-টি-এস এ যাবার জন্য?
ছোলাইমান স্যারকে বলে দেখা যাক। তিনি তো আর্টসের ক্লাস টিচার।
“সেই আশা কইরেন না এখানে। আপনার ক্লাসে যদি কোন সিনিয়র অফিসারের ছেলে থাকে – তাহলে সে হয়তো তার আব্বাকে বলে কিছু করতে পারবে। নইলে গাড়ি কেন, একটা রিকশাও পাবেন না আপনি। হেঁটে হেঁটেই যাবেন।“ – ছোলাইমান স্যার বেশ বিরক্ত হয়েছেন বুঝা যাচ্ছে।
“আমি তো আমার জন্য বলছি না, স্টুডেন্টদের জন্য বলছি।“
“স্টুডেন্টদের জন্য এত দরদ দেখাইয়েন না। যত বেশি দরদ দেখাইবেন, তত বেশি ঝামেলায় পড়বেন।“
সিনিয়রদের এই ফিলোসফি আমি মন থেকে মেনে নিতে পারছি না। শিক্ষক তার শিক্ষার্থীদের জন্য দরদ না দেখালে কে দেখাবে? শিক্ষকের মূল কাজ কী? শিক্ষার্থীদের ভালো-মন্দ সুবিধা-অসুবিধার প্রতি খেয়াল রাখা কি শিক্ষকদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না?

এগারোটা বাজার সাথে সাথে কলেজের সব ছেলেমেয়েকে গেটের বাইরে জড়ো করা হলো। শংকর স্যার হুইসেল বাজিয়ে লাইন ঠিক করলেন। ফার্স্ট ইয়ারের সব ছেলে-মেয়ে ইউনিফর্ম পরে এসেছে। নবীন বরণ তাদের সবচেয়ে আনন্দের অনুষ্ঠান। আজ তাদের যেমন খুশি তেমন পোশাক পরে আসার স্বাধীনতা থাকা উচিত ছিল। কিন্তু সেই স্বাধীনতা তাদের দিচ্ছে কে?
শংকর স্যার আর সাঈদ স্যারের নেতৃত্বে প্রচুর হুইসেলের শব্দ হলো, হ্যান্ড-মাইকে নির্দেশ দেয়া হলো – কেউ যেন লাইন ভঙ্গ না করে। তারপর লাইন ধরে ছেলেমেয়েরা এগিয়ে চললো।
অঞ্জন স্যার, ছোলাইমান স্যার, আলী হায়দার স্যার, সুপাল স্যার, বিমল স্যার, ফারুকী স্যারের পেছনে আমি আর আবুল হোসেন খান কথা বলতে বলতে যাচ্ছি।
আর-টি-এস ভবনে ঢুকার মুখে আবুল হোসেন বললো, “দোস্ত, আমার একটা কাজ আছে। আমি কিছুক্ষণ পর উধাও হয়ে যাবো।“
আবুল হোসেনের বাসা ঘাঁটির ভেতর। এদিক থেকে কাছেই হবে সম্ভবত। ঘাঁটির ভেতর ইতোমধ্যেই তার যথেষ্ট প্রভাব-প্রতিপত্তি গড়ে উঠেছে। অনেক অফিসারের ছেলে-মেয়েদের সে পড়ায়। আর-টি-এস অডিটরিয়ামে ঢুকার পর তাকে আর দেখলাম না।

বিশাল অডিটরিয়াম। মূল রাস্তা থেকে এদিকের রাস্তার দুপাশে সুন্দর ফুলের বাগান। কত্তো বড় বড় সাইজের হলুদ গাঁদা ফুটে আছে। বেশ কিছু নারকেল গাছ আছে এদিকে। সবগুলো গাছের গোড়ার দিকটা সাদা চুনকাম করা। এখানকার গাছের চুনকাম করার জন্যও নিশ্চয় অনেক টাকা বরাদ্দ থাকে।
প্রিন্সিপাল স্যার, ভাইস-প্রিন্সিপাল ম্যাডাম এবং অন্যান্য ম্যাডামরা এখনো এসে পৌঁছাননি। তাঁরা নিশ্চয় হেঁটে আসবেন না। তাঁরা না এলে অনুষ্ঠান শুরু হবে না। ছাত্র-ছাত্রীরা বসে গেছে নিজেদের পছন্দের আসনে। ছাত্রীরা সামনের দিকে বসেছে। শিক্ষকরা বসে থাকতে পারবেন কি না এখনো জানি না। কারণ আমাদের বলা হয়েছে ছাত্রদের সারির মাঝখানে থেকে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা।
দেখলাম আমার সেকশানের বনকুসুমের নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন ছেলে একেবারে পেছনের দিকে বসেছে। মনে হচ্ছে ব্যান্ডের গানের তালে তালে নাচবে। শাহীন কলেজের অনুষ্ঠানে নাকি ব্যান্ড আনার অনুমতি পাওয়া অসাধ্য ব্যাপার। এবারের সেকেন্ড ইয়ারের ছেলে-মেয়েরা এই অসাধ্য-সাধন কীভাবে করলো কে জানে। তারা একটা ব্যান্ড নিয়ে এসেছে। ব্যান্ডের নাম কী ঠিক জানি না। স্টেজে ড্রাম গিটার ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র দেখা যাচ্ছে। ড্রামের গায়ে ইংরেজিতে লেখা আছে পার্ল। পার্ল কি কোন ব্যান্ডের নাম, নাকি ড্রামের ব্রান্ডের নাম – জানি না। সেকেন্ড ইয়ারের কাউকে জিজ্ঞেস করলে জানা যাবে। কিন্তু আয়োজকরা সব নিশ্চয় ভেতরে ব্যস্ত। স্টেজের উপর কয়েকজনকে ব্যস্তভাবে ঘুরাফিরা করতে দেখা যাচ্ছে। সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট, কালো টাই – অদ্ভুত একটা গাম্ভীর্য এনে দিয়েছে তাদের মধ্যে।
খুব সুন্দর করে স্টেজ সাজিয়েছে। পেছনের সাদা পর্দায় সুন্দর নকশা করা কাগজের ফুল-পাখি। মনে হচ্ছে দু-পাশ থেকে দুটো পাখি ঠোঁট দিয়ে ধরে রেখেছে কাগজের ফুলের মালা। তার উপরে লেখা “স্বাগতম হে নবীণ, নবীণ বরণ ‘৯৪”। একটু খটকা লাগছে। নবীনের দুটো ন-ই তো “ন” হবার কথা। এরা “ণ” দিয়ে কেন লিখেছে? বাংলার শিক্ষকদের উপর কি এরা কোন কারণে রেগে আছে? হয়তো বানান ভুল লিখে তার প্রতিশোধ নিচ্ছে। বানান ভুল দেখলে অনেকের গাত্রদাহ হয়। হয়তো রিফাৎ আরা ম্যাডাম বা নাসরীন বানু ম্যাডামকে রাগিয়ে দেয়ার জন্য এরা ‘নবীন’কে ‘নবীণ’ লিখেছে। নাকি এটাই এখন শুদ্ধ বানান?
সাড়ে এগারোটা বাজতে আরো কিছুক্ষণ বাকি আছে। একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসা যায়। এখানে আবার কখন আসার সুযোগ হবে জানি না। পাশের দরজা দিয়ে বারান্দায় বেরিয়ে এলাম। এদিক দিয়ে স্টেজে ঢোকার একটা দরজা দেখতে পাচ্ছি। বারান্দা থেকে কয়েক ধাপের একটা সিঁড়ি সেই দরজার সাথে লাগানো। সিড়িতে বসে আছে চার-পাঁচজন মেয়ে। সবার পরনে শাড়ি, বেশ সেজেছেও। আরেকজন সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে। বারান্দা থেকে সামনের ফুলের বাগান দেখা যাচ্ছে। কত রকমের উজ্জ্বল মৌসুমী ফুল ফুটে আছে ওখানে। আমি ওসব ফুলের নামও জানি না। এত সুন্দর বাগান থাকতে এরা সিঁড়িতে বসে ছবি তুলছে কেন?
“স্যার” –
পরিচিত কন্ঠের ডাক শুনে ফিরে তাকালাম। সিঁড়িতে বসা মেয়েদের একজন উঠে দাঁড়িয়েছে। গুলশান। শাড়ির কারণে কেমন অপরিচিত মনে হচ্ছে।
‘চিঠি পেয়েছেন?” হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলো সে।
চিঠি? আকাশ থেকে পড়ার অবস্থা আমার। কোন্‌ চিঠির কথা বলছে সে? আমি বুঝতে পারছি না বুঝতে পেরেছে সে। তার সঙ্গীরা মুখ টিপে হাসছে।
যথাসম্ভব গম্ভীরভাবে জিজ্ঞেস করলাম, “কিসের চিঠি?”
“অনন্যার চিঠি আসেনি?”
“কোন্‌ অনন্যা?”
“অনন্যা, যাকে আপনি আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখেছেন।“ – হাসছে সে। সাথে তার সাথীরাও।
বুঝতে পারলাম কিসের কথা বলছে। খাল কেটে কুমির আমিই এনেছি। একটি অত্যন্ত কাঁচা প্রেমের গল্প লিখেছি। যায় যায় দিন ম্যাগাজিন সেই গল্প ছাপিয়েছে কয়েকদিন আগে। উত্তম পুরুষে লেখা সেই গল্পের অনন্যাকে চিঠি লেখার কথা আছে সেখানে। আর এই ফাজিল সেই গল্পটা পড়েছে। এখন সেটা নিয়ে কথা বলছে আহ্লাদে আটখানা হয়ে। কৈ, আমি যে পত্রিকায় মাঝে মাঝে বিজ্ঞান বিষয়েও কিছু লিখি সেগুলি তো তোদের হাতে তুলে দিলেও পড়ে দেখিস না।
প্রসঙ্গ ঘুরানোর জন্য জিজ্ঞেস করলাম, “নবীন বানান কি দন্ত্য-ন, না মূর্ধন্য ণ?”
“কেন স্যার?”
“স্টেজে নবীন বানান ভুল লিখেছো। দেখো গিয়ে।“
বলে দ্রূত হলের ভেতর ঢুকে গেলাম।

নবীন বরণ অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করতে উঠে কেন এত উপদেশ দেন কে জানে। এধরনের অনুষ্ঠানে কেউই চায় না উপদেশ শুনতে। সবাই চায় গান বাজনা হৈ চৈ আনন্দ। উপদেশ-মূলক বক্তৃতা শেষ হবার পর যে জোরে হাততালি স্টুডেন্টরা দিল – সেটা বক্তৃতা ভালো হয়েছে বলে দেয়নি, দিয়েছে বক্তৃতা শেষ হলো বলে। দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রছাত্রীরা বেশ কিছু ভালো গান গাইলো। সুচরিত স্যার তবলা বাজালেন। কত গুণে যে গুণী এই মানুষটা।

ব্যান্ডের গান শুরু হলো। ব্যান্ডের গান চলবে, আর ছেলে-মেয়েরা চুপচাপ শান্তি-নিকেতনী কায়দায় বসে শুধু মাথা নাড়বে – সেটা তো হবার নয়। তারা নাচবে এটাই স্বাভাবিক। যা ভেবেছিলাম তাই – বনকুসুমের নেতৃত্বে পেছনের সারির দশ বারোজন নাচতে শুরু করলো। ক্রমে সেটা সংক্রমিত হলো পেছন থেকে সামনের দিকে। ছাত্ররা শুধু নিজেরা নেচে সন্তুষ্ট নয়। তাদের সাথে শিক্ষকদেরও যদি নাচাতে পারে – তাহলেই তাদের আনন্দ বেড়ে যায় অনেকগুণ। নাচ হলো অনেকটা ফিজিক্সের ফোর্সড রেজোনেন্সের মত। আশেপাশের মানুষ নাচতে থাকলে নিজের ভেতরও একটা তাল তৈরি হয়। মনটা আগে নেচে উঠে, তারপর শরীর যোগ দেয়।
একটু পরেই দেখা গেলো আমি আর আলী হায়দারও নাচতে শুরু করেছি ছেলেদের সাথে। আমি ভুলেই গিয়েছি যে নাসির স্যার আমাকে বলে দিয়েছেন – ছেলেরা যেন গন্ডগোল না করে। এখন নাসির স্যার সামনের সারি থেকে যদি উঠে আসেন, দেখবেন আমিই গন্ডগোল করছি সবচেয়ে বেশি।
একটা উদ্দাম গান শেষ হবার পর আরেকটার প্রাথমিক সূর বাজছে। সেই সময় সাঈদ স্যার স্টেজে উঠে  মাইকে মুখ লাগিয়ে বললেন, “ছাত্র-ছাত্রীরা শোন, এখন বাজে একটা বিশ মিনিট। আর ঠিক দশ মিনিটের মধ্যে তোমাদের অনুষ্ঠান শেষ করতে হবে।“
“না স্যার, না স্যার, না স্যার …” – চিৎকার করে উঠলো হলের সব ছাত্রছাত্রী।
সাঈদ স্যার আর কিছু না বলে স্টেজ থেকে নেমে গেলেন। সেকেন্ড ইয়ারের বিদায় অনুষ্ঠান সাঈদ স্যার দেড়টা বাজার সাথে সাথে মাইক বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এবারেও কি তাই করবেন? এবার তো ফুল ব্যান্ড এসেছে। এত বড় হল। ছেলেমেয়েরা যদি একটা দিন আনন্দ করতে চায় – করুক না। এতটা নিষ্ঠুর তিনি নিশ্চয় হবেন না। কিন্তু না – পরবর্তী দশ মিনিট মনে হলো দশ সেকেন্ডে শেষ হয়ে গেলো। তুমুল একটা গান জমে উঠেছে, ছাত্র-ছাত্রীরা গলা মিলিয়ে প্রাণ খুলে গাইছে গায়কের সাথে, নাচছে সবাই মনের আনন্দে – সেই সময় হঠাৎ স্টেজে উঠে মাইক বন্ধ করে দিলেন সাঈদ স্যার। কয়েক মিনিট পরে গানটা শেষ হলেও এই কাজটা করা যেতো। শৃঙ্খলা আর নিষ্ঠুরতা তো সমার্থক হতে পারে না। এমন চমৎকার একটা আনন্দ-আয়োজন শুধুমাত্র ঠিকভাবে শেষ করতে না দেবার ফলে বিষাদে পরিণত হলো।


>>>>>>>>>>>


“লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলম্যান” –
প্রিন্সিপাল স্যারকে আজ অনেক বেশি খুশি খুশি লাগছে। সকালে কলেজে এসেই শুনেছি – আজ বিশেষ মিটিং আছে প্রিন্সিপাল স্যারের রুমে। আমরা সবাই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছি প্রিন্সিপাল স্যারের টেবিলের সামনে। তিনি চেয়ারে আরাম করে বসে লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলম্যান বলে সবার মুখের দিকে তাকাচ্ছেন একে একে। তারপর ভ্রু-কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, “ম্যাডাম রিফাৎ আরা আসেননি?”
“না স্যার। তাঁর জ্বর।“ – আইভি ম্যাডাম আর পূর্ণিমা ম্যাডাম প্রায় একসাথে উত্তর দিলেন।
নাসরীন ম্যাডাম বললেন, “তিনি গতকালই বলেছিলেন জ্বরজ্বর লাগছিলো। এখন অনেক জ্বর।“
পূর্ণিমা ম্যাডাম আবার বললেন, “হ্যাঁ, কালকে আমাকেও বলেছিলেন। এখন তো প্রচন্ড জ্বর।“
রিফাৎ আরা ম্যাডামের জ্বর সংক্রান্ত আলোচনার ডালপালা গজাতে শুরু করেছে। কিন্তু এত তথ্য ইনারা কীভাবে পেলেন কে জানে। আজ সকালে বাস স্টপে এসে দেখলাম রেহনুমা দাঁড়িয়ে আছে লাইলুন্নাহার ম্যাডামের সাথে। রিফাৎ আরা ম্যাডাম আসেননি। রেহনুমাকে জিজ্ঞেস করার পর বললো, “আম্মুর জ্বর।“
“তুমি কীভাবে এসেছো?”
“আব্বুর সাথে।“
রেহনুমা বাসে উঠার সময়েই আইভি ম্যাডাম জিজ্ঞেস করলেন, “আম্মু কোথায়?”
“আম্মুর জ্বর ম্যাডাম।“
দেওয়ান হাট থেকে মেহেরুন্নেসা ম্যাডাম উঠে এদিক ওদিক তাকিয়ে আইভি ম্যাডামের পাশে বসেই ঘাড় ফিরিয়ে রেহনুমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আম্মু কোথায়?”
“আম্মুর জ্বর ম্যাডাম।“
আগ্রাবাদ থেকে ইভা উঠলো। বসলো আমার সামনের সারিতে রেহনুমার পাশে। একটু পর সেও জিজ্ঞেস করলো, “রেহনুমা, আজ রিফাৎ আপা কোথায়?”
“আম্মুর জ্বর ম্যাডাম।“
কাস্টমস থেকে উঠলেন নাসরীন বানু ম্যাডাম। তিনি ইভার সামনের সারিতে বসে পেছনে ফিরে রেহনুমার দিকে তাকিয়ে কোন প্রশ্ন করার আগেই রেহনুমা বললো, “আম্মুর জ্বর ম্যাডাম।“
এই হলো মূল তথ্য। সহকর্মীদের কাছে রিফাৎ আরা ম্যাডাম যে কত প্রিয় তা তাঁকে নিয়ে এঁদের উৎকন্ঠা দেখলেই বোঝা যায়।
প্রিন্সিপাল স্যার বললেন, “সো সরি টু হিয়ার দ্যাট। আই উইশ হার এ কুইক রিকভারি। তিনি আজ এখানে থাকলে ভালো হতো। এনিওয়ে। আমি আজ আপনাদের ডেকেছি সুখবর দেয়ার জন্য। আপনারা জানেন কলেজ প্রতিষ্ঠিত হবার পর থেকে এখনো কোন প্রমোশন হয়নি কারো। আমি অনেকদিন থেকে চেষ্টা করে আসছিলাম। আমার চেষ্টা সফল হয়েছে। আজ আই এম প্রাউড টু সে দ্যাট সিক্স অব আওয়ার লেকচারার্স হ্যাভ বিন প্রমোটেড টু অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসরস।“ প্রিন্সিপাল স্যার এত দ্রুত ইংরেজি বলেন যে তাঁর সাথে পাল্লা দিয়ে আমার মস্তিষ্ক তা বাংলায় অনুবাদ করতে হিমসিম খায়।

 প্রিন্সিপাল স্যার মনে হয় বুঝতে পেরেছেন আমার অবস্থা। তিনি আবার বাংলায় বললেন, “আমাদের ছয়জন লেকচারার থেকে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর পদে পদোন্নতি পেয়েছেন।“
সবার ভেতর উৎসুক্য দেখা গেল। এই ছয় জন কে কে জানার জন্য। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের প্রাইভেট কলেজে মোট শিক্ষকদের মধ্যে কতজন সহকারী অধ্যাপক হতে পারবেন, তার সংখ্যা নাকি সীমিত। তাই যোগ্যতা থাকলেও সবাই সহকারী অধ্যাপক হতে পারেন না। শাহীন কলেজে এখনো পর্যন্ত শুধু একজন সহকারী অধ্যাপক আছেন। তিনি ভূগোলের শিরিন ম্যাডাম। আজ ছয় জন সহকারী অধ্যাপক হলেন। প্রিন্সিপাল স্যার তাঁদের নাম বললেন, মিস্টার নাসিরউদ্দিন – ভাইস প্রিন্সিপাল এডমিন, মিস্টার আবু সাঈদ - ইতিহাস, মিস্টার মহিউদ্দিন - আরবি, মিস্টার আবদুস সোবহান ফারুকী - গণিত, মিস্টার বিমল চক্রবর্তী – গণিত, এবং মিসেস রিফাৎ আরা – বাংলা।

সহকর্মীদের পদোন্নতিতে আমার খুবই আনন্দ হলো। আমি আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠলাম। কিন্তু সবাই যতটা খুশি হবেন বলে ভেবেছিলাম দেখা গেলো – ঠিক সেরকম হলো না। কোথায় যেন ছন্দপতন ঘটলো। মিটিং শেষ হলো। আমি একে একে সব সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত স্যারদের অভিনন্দন জানালাম।

আমাদের টিচার্স রুমে এখন চারজন সহকারী অধ্যাপক। মহিউদ্দিন স্যারকে অভিনন্দন জানানোর পর তিনি একেবারে বুকে জড়িয়ে ধরলেন আমাকে।

দেখলাম সুপাল স্যার ভীষণ গম্ভীর হয়ে আছেন। সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্তরা রুম থেকে বের হয়ে সম্ভবত প্রিন্সিপাল স্যারের রুমে গেলেন। এই ফাঁকে মুখ খুললেন ছোলাইমান স্যার। বললেন, বিষয়ভিত্তিক প্রমোশন হওয়া উচিত ছিল।
সুপাল স্যার বললেন, “ম্যাথম্যাটিক্সে দুজনকেই দেয়া হলো। কোন্‌ ক্রাইটেরিয়াতে এই প্রমোশন হলো কে জানে।“
মনে হচ্ছে কারো কারো ভেতর এই চাপা অসন্তোষ আরো কিছুদিন থাকবে। প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসে যাবার সময় ল্যাবে উঠার সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে দিলরুবা ম্যাডাম আর সুপাল স্যার আমাকেই বললেন, “এটা কোন ন্যায্য কাজ হলো? ছয় জনের মধ্যে চার জনই আর্টসের? বায়োলজি, কেমিস্ট্রি, ফিজিক্স এগুলো হলো আসল সাবজেক্ট। সেখান থেকে একজনও নেই?”
এই প্রশ্নটা আমাকে করার উদ্দেশ্য এই নয় যে আমাকেই প্রশ্নটার উত্তর দিতে হবে, কিংবা আদৌ কোন উত্তর আশা করছেন আমার কাছ থেকে। এই প্রশ্ন হলো ক্ষোভের বহিপ্রকাশ। এই ক্ষোভ স্বাভাবিক। নিজেকে বঞ্চিত মনে করলেই মানুষের মনে ক্ষোভের জন্ম হয়।
ছুটির পর জানা গেল – শ্রমিকরা নাকি কোথায় গন্ডগোল করেছে – তাই বাস আসবে না আজ। নিজেদের ব্যবস্থা নিজেদেরই করতে হবে। লাইলুন্নাহার ম্যাডাম এলেন রেহনুমাকে সাথে নিয়ে। বললেন, “আজ বাশ আসবে না। চলেন ট্যাক্সি নিয়ে চলে যাই।“
“চলেন যাই।“
বেরিয়ে পড়লাম। কলেজ থেকে এদিকের গার্ড রুম কাছে। গার্ডরুম পার হয়ে ভেতরের রাস্তা দিয়ে কাঠগড়ে যাওয়া যায়। রাস্তাটা খুব সরু এবং ভাঙাচোরা। রিকশা ছাড়া তেমন কিছু চলে না এদিকে। মাঝে মাঝে বেবিট্যাক্সি দেখা যায়। কিন্তু আজ একটাও নেই। রিকশায় উঠলাম তিনজন। কাঠগড় এসে বেবিট্যাক্সি পেতে সমস্যা হলো না।
পথে কোথাও কোন শ্রমিক অসন্তোষ চোখে পড়লো না। বাস ট্রাক সবই চলছে। তাদের কোন অসুবিধা হচ্ছে না। যেন শুধুমাত্র বিমান বাহিনীর গাড়ি দেখলেই শ্রমিকরা ঝাঁপিয়ে পড়বে! যাঁরা ঘাঁটি থেকে নিয়মিত শহরে আসা-যাওয়া করে তাদের সবাইকে আজ অনেক কষ্ট করে আসতে হবে।
“চলেন, রিফাৎ আপার বাসায় যাই।“ – চকবাজার আসার একটু আগে লাইলুন্নাহার ম্যাডাম বললেন। আমি ট্যাক্সি তো রিফাৎ আরা ম্যাডামের বাসা পর্যন্ত ঠিক করেছি। রেহনুমাকে তো বাসায় পৌঁছে দিতে হবে। বললাম, “চলেন, যাই।“
আমরা দোতলা পর্যন্ত উঠার আগেই রেহনুমা চারতলায় উঠে বাসায় ঢুকে গেছে। আমরা চারতলায় উঠে দেখি দরজা খুলে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন রিফাৎ আরা ম্যাডাম।
“আসেন আসেন।“
লাইলুন্নাহার ম্যাডাম রিফাৎ আরা ম্যাডামকে অভিনন্দন জানালেন। দুই ম্যাডাম হাসিমুখে ঘরে ঢুকলেন। আমি তাঁদের অনুসরণ করলাম।
এই বাসাটার মধ্যে একটা অদ্ভুত স্নিগ্ধতা আছে। কোথাও কোন বাহুল্য নেই, অথচ কত অসাধারণভাবে সম্পূর্ণ।

No comments:

Post a Comment

Latest Post

Memories of My Father - Part 6

  The habit of reading books was instilled in us from a young age, almost unknowingly. There was no specific encouragement or pressure for t...

Popular Posts