Saturday 23 May 2020

ছিন্ন পাতার সাজাই তরণী - পর্ব ১০

10

"খুব বেশি অইলে দুই ঘন্টা লাইব দে" - চুন লাগানো পানের বোঁটাটা মুখের ভেতর চালান করে দিয়ে খচ খচ করে চিবুতে চিবুতে বললেন সাহেব মিয়া।

বলে কী? মাত্র দু'ঘন্টায় ছরার কুল থেকে চন্দনপুরা চলে যাবে ঠেলাগাড়ি নিয়ে? আমি অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকালাম তার দিকে। টেনেটুনে পাঁচ ফুটের বেশি লম্বা হবেন না সাহেব মিয়া। নামের মধ্যে সাহেব এবং মিয়া দুটোই আছে, কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে সেঅর্থে তিনি সাহেবও নন, মিয়াও নন। তিনি ঠেলাগাড়ি চালান, এই স মিলে কাঠ আনা-নেওয়া করেন। গত সাড়ে ছয় বছর ধরে তাকে দেখছি। তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি তার - শরীরেও বাড়েনি, অর্থেও না। আজ আমার রুমের সব জিনিসপত্র তিনি চন্দনপুরায় পৌঁছে দেবার দায়িত্ব নিয়েছেন।

গতকাল কলেজ থেকে ফিরে আমার মেসে এসেছি সব জিনিসপত্র নিয়ে যাবার জন্য। ভেবেছিলাম একটা ট্যাম্পু নিয়ে চলে যাবো। কেয়ারটেকার মাহমুদ মিয়া বললেন - ঠেলাগাড়ি ভালো হবে। তাহলে টেবিল-খাট সব নিয়ে যেতে পারবো। ভেবে দেখলাম তিনি ঠিক কথাই বলেছেন। ওগুলো ফেলে গেলে নতুন বাসায় গিয়ে আবার সবকিছু কিনতে হবে।

আজ শুক্রবার। স মিল বন্ধ। তাই মিলের কাঠ আনা-নেয়াও বন্ধ। সাহেব মিয়ার বাড়তি কিছু রোজগার হবে বলাতে আমিও রাজি হয়ে গেলাম। সাহেব মিয়া ও তার সহকারী কুদ্দুসকে বুঝিয়ে দিচ্ছিলাম কীভাবে যেতে হবে, কতক্ষণ লাগতে পারে। কিন্তু সাহেব মিয়া মাত্র দু'ঘন্টায় কীভাবে ছরার কুল থেকে চন্দনপুরা যেতে পারবে বলছে বুঝতে পারছিলাম না।

"দুই ঘন্টার চেয়ে বেশি লাগবে মনে হয়। প্রায় তেরো-চৌদ্দ কিলোমিটার রাস্তা। এতদূর ঠেলাগাড়ি নিয়ে যাওয়া খুব সহজ হবে না।" - আমি বোঝাতে চেষ্টা করি। সাহেব মিয়া কম কথার মানুষ। ঘন্টার পর ঘন্টা সে মুখে তালা মেরে চুপ করে থাকে। কিন্তু তার সহকারী কুদ্দুস কথা না বলে থাকতে পারে না।
"সমইস্যা নাই বদ্দা। চাক্কা আছে ত।"

কুদ্দুসের কথায় আমি হেসে উঠি। ঠেলাগাড়ির চাকা আছে ঠিকই, কিন্তু সেটা তো হেঁটে হেঁটে টেনে এবং ঠেলেই নিয়ে যেতে হবে। কুদ্দুস ছেলেটি যেমন সরল, তেমনি সরল রেখার মত লম্বা। বললাম, "ঠিক আছে। জিনিসপত্র যেন পড়ে না যায়।"
"কী পরিব বদ্দা? দুইয়ান গরি জিনিস অনর।" - আমার জিনিসপত্রের সামান্যতা দেখে হিহি করে হাসে কুদ্দুস।

আসলেই ঠিক। পড়ে যাবার মতো তেমন কোন জিনিস আমার নেই। একটা টিনের বাক্স আর পুরনো লেপ-তোশকের একটা পুটলি নিয়ে এসেছিলাম এখানে। সাড়ে ছয় বছর পর সেই টিনের বাক্স ও পুটলি একই রকম আছে। বইপত্র কিছু বেড়েছে। বাঁশের দুটো বুক শেল্‌ফ কিনেছিলাম চৌধুরি হাট থেকে। সেগুলো সাথে নিয়ে যাচ্ছি। প্লাস্টিকের একটি ছালায় আছে অ্যালুমিনিয়ামের ডেকসি-পাতিল-বালতি এসব।  সামান্য জামা-কাপড় যা ছিল তা গত সপ্তাহে এসে নিয়ে গেছি, সাথে কিছু বইপত্রও।

রুমের ভেতর শেষ বারের মত তাকালাম। একটি টেবিল, একটি চেয়ার আর একটি চৌকি ছাড়া বাকি সবকিছু ঠেলাগাড়িতে তুলে ফেলেছে কুদ্দুস ও সাহেব মিয়া। আগামী মাস থেকে এই রুমে ফার্স্ট ইয়ারের একটা ছেলে উঠবে। তার জন্য টেবিল আর চৌকিটা রেখে যাচ্ছি।

সময় কীভাবে যে চলে যায়। ছিয়াশির নভেম্বরে ইউনিভার্সিটির সবগুলো হল দখল করে নিয়েছে শিবিরের ক্যাডাররা। জাতীয় ছাত্রসমাজের নেতা হামিদের হাত কেটে নিয়ে - সেই কাটাহাত তলোয়ারের আগায় গেঁথে হলের সামনের রাস্তায় উল্লাস-মিছিল করেছে তারা। তখন আমাদের ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাস চলছিল পুরোদমে। আমি তখন হলে এক সিনিয়র ভাইয়ের সাথে ডাবলিং করতাম। আমাদের রুমও বাদ যায়নি শিবিরের আক্রমণের হাত থেকে। তারা রুমের সব বইপত্র, বিছানা-বালিশ তলোয়ার দিয়ে ফালাফালা করে ফেলেছে। বাক্স ভেঙে টাকা-পয়সা যা পেয়েছে সব নিয়ে গেছে। হল থেকে বিতাড়িত হবার পর স্বাধীনভাবে থাকার জন্য একটি বাসা খুঁজছিলাম। কিন্তু বাসা খুঁজতে গিয়ে যেসব অভিজ্ঞতা হয়েছে তা খুব একটা সুখকর নয়। শেষপর্যন্ত আমার বন্ধু এখলাস এই মেসের সন্ধান দিয়েছিল। কিছু বইপত্র আর শিবিরের আক্রমণের স্মৃতিচিহ্ন - তলোয়ারে কাটা তোশক আর টিনের বাক্সটা নিয়ে এই আমানত খান বিল্ডিং-এর নিচের তলায় এই রুমে এসে উঠেছিলাম সাতাশির জুনে। আজ তিরানব্বই'র নভেম্বরে এখানের পাট চুকিয়ে চলে যাচ্ছি। আমার এই ছাব্বিশ বছরের জীবনের চারভাগের এক ভাগ  সময় - সাড়ে ছয় বছর কেটেছে এখানে। কিছুটা খারাপ তো লাগছেই। কিন্তু খারাপ লাগাকে প্রশ্রয় দিলে তা ভীষণ ভারী হয়ে যায়। তখন সেই ভার টেনে নিয়ে বেশিদূর যাওয়া যায় না।

"বদ্দা, আর কিছু আছেনে?" - আর কিছু আছে কি না দেখতে এসে জিজ্ঞেস করলো কুদ্দুস। নেই, আর কিছু নেই। রুমে তালা লাগিয়ে বাইরে এসে দেখি সাহেব মিয়া আর কুদ্দুস মোটা রশি দিয়ে আমার ঘরসংসারের সব জিনিস বেঁধে ফেলেছে যেন ঠেলাগাড়ি থেকে পিছলে পড়ে না যায়।

ঠেলাগাড়ির উপর আকাশের দিকে পাঁচ পা তুলে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে আমার জীবনের প্রথম কেনা খাট। অবশ্য এটাকে খাট বললে নাকি খাটের অপমান করা হয়। এটাকে বলতে হবে চৌকি। বিল্ডিং-এর সামনে স'মিল হওয়াতে মিলের বাতিল কাঠ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের আসবাবপত্র তৈরি করে বিক্রি করে একজন কাঠমিস্ত্রী। তার কাছ থেকে ঘুমানোর চৌকি, পড়ার টেবিল, চেয়ার - এসব কিনেছিলাম। ভেজা কাঠ যতই শুকিয়েছে ততই বেঁকেছে, আর ঘুণপোঁকা তো আছেই। একদিন রুমে বন্ধুসমাগম বেশি হয়েছিল। খাটের যেদিকে বসেছিল সবাই - সেদিকটা ভেঙে পড়েছিল। ভাঙা অংশে জোড়াতালি দিয়ে আরেকটি পা লাগিয়ে দেয়া হয়েছিল সেখানে। টেবিলটাকেও চিৎ করে বেঁধে রাখা হয়েছে খাটের পায়ের সাথে।

এবার যাওয়া যাক। করাত কলে এই সকালে কেউ নেই। কেয়ারটেকার মাহমুদ মিয়া কাছেই দাঁড়িয়ে আছেন। সাহেব মিয়া আর কুদ্দুস ঠেলাগাড়ি নিয়ে রওনা দিলে আমি সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাসে চলে যাবো। তারপর চকবাজারে গিয়ে তাদের জন্য অপেক্ষা করবো - এরকম প্ল্যান। সাহেব মিয়াকে দু'বার বুঝিয়ে বলেছি এই প্ল্যান। দু'বারই তিনি পান চিবুতে চিবুতে এমনভাবে মাথা নেড়েছেন যেন এই পথে তাঁর নিত্য আসা-যাওয়া।

"সাহেব মিয়া, চিনতে পারবেন তো? এখান থেকে মুরাদপুর গিয়ে বড় রাস্তা পার হয়ে পাঁচলাইশের দিকে চকবাজার চলে যাবেন।" - সাহেব মিয়াকে শেষবারের মত বুঝিয়ে দিই। সাহেব মিয়া কিছুক্ষণ চুপকরে থাকার পর মাথা চুলকে জিজ্ঞেস করলো, "বড় দিঘীর পাড় থেকে কোন্‌দিকে যাবো?"

আমার মনে হলো এতক্ষণ ধরে যেসব রাস্তার কথা এদের বলেছি - সেগুলোর কিছুই চেনে না এরা। জিজ্ঞেস করলাম, "আপনি এই রাস্তা ধরে ঠেলাগাড়ি নিয়ে কতদূর পর্যন্ত গেছেন?"
"বড়দিঘীর পাড় পর্যন্ত।"
ছরার কুল থেকে বড়দিঘীর পাড় তিন কিলোমিটারও হবে না।
"তাহলে চকবাজার চন্দনপুরা কীভাবে যাবেন?"
"আপনি চিনেন না? আপনি যেদিকে যেতে বলবেন, সেদিকে যাবো।"
"আমি কি আপনাদের সঙ্গে যাবো নাকি? আমি তো আগে চলে যাবো।"
"আগে গেলে তো আবার পিছে আসতে হবে আমরা আসছি কিনা দেখার জন্য।" - কুদ্দুস সহজ-সরল হলেও তার কথায় বেশ যুক্তি আছে। মনে হলো তাদের সঙ্গে যাওয়াই উচিত হবে। একটা টেক্সি নিয়ে তাদের সাথে সাথে যাওয়া যায়। কিন্তু মন সায় দিচ্ছে না। মনে হলো হেঁটেই দেখি - তেরো-চৌদ্দ কিলোমিটার পথ হাঁটাই যায়। ওরা পারলে আমি পারবো না কেন।
"ঠিক আছে চলো।" - কুদ্দুসকে বললাম। মাহমুদ মিয়াকে কিছু বখশিস দিয়ে বিদায় নিয়ে আস্তে আস্তে হাঁটতে শুরু করলাম। আরেকদিন এসে বিল্ডিং-এর মালিক আমানত খান সাহেবের বাড়ি গিয়ে দেখা করে আসতে হবে।

সাহেব মিয়া ঠেলাগাড়ি টানছেন, কুদ্দুস হাঁটছে আমার পাশে পাশে। সাহেব মিয়াকে দেখে মনে হচ্ছে একা টেনে নিয়ে যেতে কোন সমস্যাই হচ্ছে না তার। হাটহাজারী রোডে প্রচন্ড বেগে বাস চলে। আজ শুক্রবার বলে বাস কম। এদিকের রাস্তা প্রায় ফাঁকা। মিল থেকে বের হয়ে হাটহাজারী রোডে উঠার মুখে সাহেব মিয়া থামলেন। কুদ্দুস বললো, "উডি বইয়ন বদ্দা।"
"মানে?" কোথায় উঠতে বলছে সে? ঠেলাগাড়িতে? দেখলাম সে হাত বাড়িয়ে তোশকের পুটলির উপর থেকে ডেকসি-পাতিলের ছালাটা সরিয়ে দিল। তার মানে তোশকের পুটলির উপর বসে আরাম করেই যাওয়া যায়। কিন্তু কেমন যেন লাগছে। ওরা হেঁটে হেঁটে যাবে, আর আমি ঠেলাগাড়িতে চড়ে বসবো?
"না, না, তা হয় না। আমিও তোমাদের সাথে হাঁটছি।" - কুদ্দুসকে বললাম।
"আমিও সারা পথ হাঁটবো না তো। হাল্‌কা গাড়ি। একটা কাঠের গুঁড়ির সমান ভরও হয়নি। আমিও পেছনে বসবো। 'সাহাব বদ্দা' 'টায়ার' হলে আমি টানবো, 'সাহাব বদ্দা' বসবে।" - কুদ্দুসের প্ল্যান পরিষ্কার। বুঝলাম তাদের চিন্তাভাবনা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি প্র্যাকটিক্যাল।

ঠেলাগাড়িতে উঠে তোশকের পুটলির উপর বসলাম। কুদ্দুস বসলো পেছনের দিকে পা ঝুলিয়ে। সাহেব মিয়া গাড়ি টানতে শুরু করলো। ঠেলাগাড়ির উপর থেকে রাস্তার দু'পাশে দেখতে কেমন যেন অন্যরকম লাগছে। আমার অতিপরিচিত দৃশ্যগুলোও কেমন যেন বদলে গেছে। দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেলে দৃশ্যপটও বদলে যায়।

"'বদ্দা' আপনি এখান থেকে চলে যাচ্ছেন কেন? লেখাপড়া শেষ হয়ে গেছে?" - কুদ্দুস জিজ্ঞেস করে।
"এদিকের লেখাপড়া শেষ হয়ে গেছে। এখন চাকরি শুরু করেছি।"
"চাকরি কোথায়? শহরে?"
"হ্যাঁ, শাহীন কলেজে।"
"তাহলে তো এবার বিয়ে করবেন।"
"চাকরি করলেই বিয়ে করতে হবে?"
"সবাই তো করে। 'মাহমুদ বদ্দা' করেছে- চাকরি পেয়েই 'মুন্নি আফা'রে বিয়ে করেছে। আমি দাওয়াত খেয়েছি। আপনিও আমারে দাওয়াত দেবেন।"

মাহমুদ ভাই আমাদের সিনিয়র ছিলেন। এই বিল্ডিং-এই থাকতেন। বাড়িওয়ালার বড় মেয়েকে বিয়ে করেছেন। কুদ্দুস সেই বিয়ের কথাই বলছে। বললাম, "ঠিক আছে কুদ্দুস। যদি কখনো বিয়ে করি তোমাকে দাওয়াত অবশ্যই দেবো।"

কুদ্দুসের বকবকানির শেষ নেই। তার সব কথা শোনারও দরকার নেই, উত্তর দেয়ারও দরকার নেই। কথা বলতে পারলেই সে খুশি। তার অকপট সারল্য আমাকে মুগ্ধ করে। কত সহজেই সে কতকিছু জিজ্ঞেস করে ফেলতে পারে, যেগুলো আমরা 'একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার' বলে ইচ্ছে করলেও অপরিচিত কাউকে জিজ্ঞেস করতে পারি না।

"আপনার নতুন বাসায় কে কে থাকবে?" - কুদ্দুসের প্রশ্নে একটু চমকে উঠি। এই প্রশ্নটা প্রত্যেক বাড়িওয়ালাই করেন। তাঁর বাসা যাকে ভাড়া দেবেন সেখানে কে কে থাকবেন তা জানার অধিকার তাঁর আছে। কিন্তু যখনই বলি যে, "আমি একা থাকবো" - তখনই তিনি ভয় পেয়ে যান। একজন মানুষ স্বাধীনভাবে একা থাকতে পারবে না এমন কোন আইন কি বাংলাদেশে আছে?

জুলাইতে মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ হবার পর থেকেই শহরে একটা থাকার জায়গা খুঁজতে শুরু করেছিলাম। বাসা যেমনই হোক, স্বাধীনভাবে থাকার সুযোগটাই আমার একমাত্র চাহিদা। মুরাদপুর, ষোলশহর, পাঁচলাইশ, চকবাজার, টেরিবাজার, ফিরিঙ্গিবাজার ইত্যাদি অনেক জায়গায় অনেকগুলো খালি বাসা দেখতে গিয়েছি। কম বাজেটের বাসাগুলোর চাহিদা অনেক বেশি - তাই বাড়িওয়ালারা ব্যাচেলর দেখলেই বিদায় করে দেন। চন্দনপুরার গলির ভিতর অনেকগুলো মেস আছে। এই মেসগুলোর সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে গণ-বাথরুম। কোথাও বাসা না পেয়ে  অক্টোবর মাসে এরকম একটা মেসের একটা রুম প্রায় ঠিক করে ফেলেছিলাম। অ্যাডভান্স দেবার জন্য সাথে নিয়ে গিয়েছিলাম আমার বন্ধু সুমনকে। তাদের বাসা থেকে মেসটা খুব বেশি দূরে নয়। 

সে মেসের অবস্থা দেখে বললো, "এখানে তুই থাকবি ঠিক আছে। কিন্তু পরিবারের কেউ তো তোর এখানে আসতে পারবে না।"

তার কথা ঠিক। এই মেসগুলোর পরিবেশ এতটাই রুচিহীন পুরুষালি মেস যে সেখানে কারো মা-বোন-বন্ধু গেলে ভীষণ অস্বস্তিতে পড়তে হবে।
"কিন্তু আমাকে পারিবারিক বাসা তো কেউ ভাড়া দিচ্ছে না। মা থাকবে, বোন থাকবে - এরকম মিথ্যা কথা বলে আমি ভাড়া নিতে পারবো না।"
সুমন আমাকে বোঝে। সে বললো, "তুই আমাকে দু'দিন সময় দে।"

আমার এই বন্ধুটির অসাধ্য সাধন করার ক্ষমতা আছে। সে দুদিনের মধ্যে আমার জন্য দুই রুমের একটা পারিবারিক বাসা ঠিক করে ফেলেছে। নভেম্বরের এক তারিখ থেকে সে বাসা আমার হাতে এসেছে। সে বাড়িওয়ালাকে আমার সম্পর্কে কী বলেছে জানি না, দেখলাম বাড়িওয়ালা সালাম সাহেব আমার সাথে এমন ব্যবহার করছেন, যেন আমাকে তাঁর বাসা ভাড়া দিতে পেরে তিনি কৃতার্থ হয়ে গেছেন।
পরে সুমনকে জিজ্ঞেস করলাম, "তুই আমার সম্পর্কে কী বলেছিস সালাম সাহেবকে?"
সুমন হাসতে হাসতে বললো, "বলেছি তুই সাধু বংশের মানুষ। তোর আধ্যাত্মিক ক্ষমতা আছে।"
"আধ্যাত্মিক ক্ষমতা, আমার!" - আমার সম্পর্কে কেউ এরকম ভাবতে পারে এটাও আমার কাছে অবিশ্বাস্য।
"হ্যাঁ। কিছুদিনের মধ্যেই তোকে হাত দেখাতে আসবে। পাথর টাথরও চাইতে পারে।" - সিরিয়াসভঙ্গিতে বললো সুমন।

বাড়িওয়ালা সালাম সাহেবের সাথে এখনো দেখা হয়নি আর। আজ দেখা হবে। তাঁর সামনে একটু সাধু সাধু ভাব নিয়ে থাকতে হবে। কিন্তু 'সাধুভাব' জিনিসটা কী সেটাই তো জানি না।

বড়দিঘীর পাড়ে আসার পর সাহেব মিয়াকে বললাম কোন রেস্টুরেন্টের সামনে থামতে। এখানে অনেকগুলো ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। একটা রেস্টুরেন্টের সামনে রাস্তার পাশে ঠেলাগাড়ি রাখলেন সাহেব মিয়া। লাফ দিয়ে নেমে গেল কুদ্দুস। আমি নেমে কুদ্দুসকে বললাম, "এখান থেকে যা খুশি পেটপুরে খেয়ে নাও।"

মিনিট পনেরো পরে আবার রওনা দিলাম। এবার গাড়ি টানছে কুদ্দুস। আমি আবারো উঠে বসেছি তোশকের উপর। পেছনে পা ঝুলিয়ে বসেছেন সাহেব মিয়া। কুদ্দুস বেশ জোরে হাঁটতে শুরু করেছে। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেলাম লালিয়ার হাট, তারপর আমান বাজার, বি-আর-টি-সি বাস ডিপো। ক্যান্টনমেন্ট এরিয়ার সামনে দিয়ে আসার সময় মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। ক্যান্টনমেন্ট কলেজ আমার সাথে এমন ব্যবহার কেন করলো?

ফিজিক্সের লেকচারার পোস্টের জন্য ক্যান্টনমেন্ট কলেজে দরখাস্ত জমা দিয়ে এসেছিলাম শাহীন কলেজেরও আগে। আমি নিজে কলেজে গিয়ে ভাইস-প্রিন্সিপালের অফিসে বসে হাতে হাতে দরখাস্ত জমা দিয়েছি। কথা ছিল চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেয়া হবে নিয়োগ পরীক্ষার তারিখ। আমি চিঠি পেয়েছি নিয়োগ পরীক্ষা হয়ে যাবার পর। চিঠি ইস্যু করা হয়েছে নিয়োগ পরীক্ষার অনেক আগে। অথচ চিঠিটা পোস্ট করা হয়েছে নিয়োগ পরীক্ষার পরে। আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ডাকবিভাগের তারিখসহ সিল দেখেছি। কলেজের অফিসে ফোন করে জানতে চেয়েছি - ব্যাপারটা কী। তাঁরা বলেছেন - চিঠি যথাসময়ে পোস্ট করা হয়েছে। প্রার্থী ঠিকমত চিঠি না পেলে সেটার জন্য তাঁরা দায়ী নন। আমি কাউকে দায়ি করছি না। তবে আসল ব্যাপারটা বুঝতে পেরে দুঃখ এবং আনন্দ একই সাথে হয়েছে। ওখানে আমারই এক সহপাঠী অস্থায়ীভিত্তিতে ঐ পদে কাজ করছিল - যার সাথে আমার মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতা ছিল। হতে পারে তার জন্য এই ঘটনাটা ঘটানো হয়েছে। দুঃখ এই যে এই মানুষটা জেতার জন্য অসততার পথ বেছে নিয়েছে। আর আনন্দ এই যে - এভাবেই সে মেনে নিয়েছে যে সুস্থ প্রতিযোগিতা হলে সে হেরে যাবে।

সাহেব মিয়া ও কুদ্দুস একবার করে গাড়ি টেনেছে। এবার আমারো একটু টেনে দেখা দরকার ঠেলাগাড়ি চালাতে কেমন লাগে। সাহেব মিয়া প্রস্তাবটা শুনেও না শোনার ভান করলো। কুদ্দুসকে বললাম, "এবার আমাকে চালাতে দাও কুদ্দুস।"

কুদ্দুস এমনভাবে হেসে উঠলো যেন এমন হাসির কথা জীবনে কখনো শোনেনি। অক্সিজেন আসার পর রাস্তা এমন এবখো-খেবড়ো যে দু'জনকেই নেমে যেতে হলো। সাহেব মিয়া গাড়ি ঠেলতে লাগলো। আমি কুদ্দুসের পাশে গিয়ে হ্যান্ডেলে হাত লাগিয়ে টানতে শুরু করলাম। গাড়ি গতিজড়তার কারণেই চলছে, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আমিও তো পারি। মুরাদপুর আসতে আসতে সাড়ে এগারোটা বেজে গেল।

বিশ্বরোডে প্রচুর ভীড়। মনে হলো ঠেলাগাড়িকে কেউ তেমন পাত্তা দেয় না। ইঞ্জিন নেই বলেই হয়তো। রাস্তা পার হয়ে পাঁচলাইশের দিকে যাবার রাস্তায় ঢুকতে যাবো, এমন সময় "হেই ঠেলা হেই ঠেলা" চিৎকার শুনে ঘাড় ফিরিয়ে দেখি একটা বাস সাঁই করে প্রায় গায়ের উপর এসে পড়লো। বাসের কন্ডাক্টরের প্রায় খালি বাসটার দরজায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করছে। তার দিকে তাকাতেই সে ধমক দিয়ে উঠলো, "হই, কী চঅদ্দে? চউখ গালি দিয়ম।"

দেখলাম আঠারো উনিশ বছরের একটা রোগা-পাতলা ছেলে। পরনে লুঙ্গি আর গায়ে ঢলঢলে একটা শার্ট। কুদ্দুসেরই সমবয়সী হবে। অথচ কী অবলীলায় তুই তোকারি করে চোখ গেলে নেয়ার হুমকি দিচ্ছে। কুদ্দুস "হেই কী কলি দে তুই" - বলে ফুঁসে উঠতে চাইলো। এখনি একটা গোলমাল লেগে যাবে। এরকম ঝগড়া-ঝাটি খুবই সাধারণ ব্যাপার এই শহরে। ছেলেটি বাসের কন্ডাক্টর বলেই ঠেলাগাড়ি-ওয়ালাকে গালিগালাজ করার অধিকার আছে বলে মনে করছে। পাজেরো গাড়ির ড্রাইভারকে হয়তো বিনাকারণে চোখ গেলে নেয়ার হুমকি দিতো না। কত কিছুই যে সহ্য করতে হয় এই খেটে খাওয়া মানুষদের।

আমি কুদ্দুসকে বললাম, "বাদ দাও কুদ্দুস। ওর দিকে তাকিও না।"
"আঁরার বড্ডির পারত হৈলে থোঁয়ারা ভাঙি দিতাম।" - কুদ্দুসও কম যায় না। সেও হুমকি দিচ্ছে - বড়দিঘীর পাড় হলে সে ছেলেটার মুখ ভেঙে ফেলতো।

আমরা পাঁচলাইশের দিকে যাচ্ছি এখন। পেছনে বাস-কন্ডাক্টরের চিৎকার ভেসে আসছে  "হেই টাইগারপাস আগ্রাবাদ বারেকবিল্ডিং সল্টগোলা... হেই টাইগারপাস..."

এখন আর গাড়িতে চড়ে বসার উপায় নেই। রাস্তায় প্রচুর রিক্সা ট্যাক্সি আর প্রচন্ড ধুলো। পাঁচলাইশের মোড় পার হয়ে কাতালগঞ্জের দিকে আসার সময় রাস্তাটা একটু ঢালু। কুদ্দুস যেভাবে দৌঁড়াচ্ছে তাতে যদি হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায় তাহলে অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে। তাই পেছন থেকে জোরে টেনে ধরে সামনের দিকে যাচ্ছে। দেখলাম শুলকবহর যাবার রাস্তার মুখে দাঁড়িয়ে আছেন আমার দিদির ননদ। তিনি আমাকে চেনেন। কিন্তু তাঁর সাথে চোখাচোখি হয়ে যাবার পরেও তিনি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না আমি ঠিক আমি কি না। ঠেলাগাড়ির সাথে না দেখলে হয়তো ডাক দিতেন। আমি একবার পেছন ফিরে তাকালাম। দেখলাম তিনি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছেন। কিন্তু আরো একটা ছেলে আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মনে হলো। শাহীন কলেজের কোন ছাত্র। মনে হচ্ছে তাকে আমি ক্লাসে দেখেছি। সুনির্মল বসুর সেই যে কবিতা পড়েছিলাম - 'বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র'।  দু'সপ্তাহ মাস্টারি করেই আজ মনে হচ্ছে বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর সবাই আমার ছাত্র। মাস্টারির সাইড ইফেক্ট দেখা দিতে শুরু করেছে।

অলি খাঁ মসজিদের সামনে থেকে সোজা গিয়ে গুলজার সিনেমার সামনে দিয়ে প্যারেডের কোণায় গিয়ে উঠতে হবে। এদিকের রাস্তা ক্রমশ উঁচু হয়ে গেছে। সাহাব মিয়া জোরে ঠেলছে পেছন থেকে। আমার হঠাৎ মনে হলো পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম জানা সত্ত্বেও তা প্রয়োগ করছি না - এটা তো ঠিক হচ্ছে না। 'লন রোলার ঠেলার চেয়ে টানা সহজ' - এ কথা সবাই জানে - অন্তত পদার্থবিজ্ঞান যারা পড়েছে তারা সবাই জানে। শুধু লন রোলার কেন, সব চাকাই ঠেলার চেয়ে টানা সহজ, কারণ টানলে বলের অনুভূমিক এবং  উলম্ব দুটো অংশই সামনের দিকে কাজ করে। কিন্তু ঠেললে বলের উলম্ব অংশ ভূমির দিকে কাজ করে বলে চাকাটা সামনের দিকে যাবার বদলে কিছুটা নিচের দিকে দেবে যায়। তাই অলি খাঁ মসজিদের সামনে রাস্তা পার হবার সময় আমি দ্রুত সামনে গিয়ে কুদ্দুসের সাথে ঠেলাগাড়িটা টানতে শুরু করলাম। টানতে টানতে মার্কেটের সামনে এসে একটু সোজা হতেই দেখলাম ফুটপাতে দাঁড়িয়ে আছেন ছোলাইমান স্যার। আমি চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছিলাম। কিন্তু তার আগেই ছোলাইমান স্যার বললেন, "ঠেলাগাড়ি টানা কি আপনার পার্ট-টাইম জব?"

2 comments:

  1. আপনার এই কাহিনীটা চমকপ্রদ। আপনি যে এটাও করেছেন তা সত্যি আমার ভালো লেগেছে।

    ReplyDelete
    Replies
    1. অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

      Delete

Latest Post

Memories of My Father - Part 4

  This is my first photo taken with my father. At that time, I had just moved up to ninth grade, my sister was studying for her honors, and ...

Popular Posts