Saturday 23 May 2020

ছিন্ন পাতার সাজাই তরণী - পর্ব ১৭

17

“কলেজে যে টিকটিকির আনাগোনা বেড়ে গেছে খেয়াল করেছো?” মহিউদ্দিন স্যারের কথায় আমার চোখ চলে গেল টিচার্স রুমের দেয়ালে, দেয়াল থেকে ছাদে। ছাদের এক কোণায় যেখানে সাঈদ স্যার বসেন সেখানে দেখা গেলো ছোট্ট একটা টিকটিকি।
“কোথায়? আমি তো ওইখানে একটা ছোট্ট টিকটিকি ছাড়া আর কোন টিকটিকি দেখতে পাচ্ছি না।“ বলতেই জোরে হেসে উঠলেন মহিউদ্দিন স্যার ও অঞ্জন স্যার। ছোলাইমান স্যার বেশ বিরক্ত হয়ে বললেন, “প্রদীপ, আপনি এত বেকুব কেন? সেদিন না আপনাকে বললাম ফিল্ড ইউনিটের কথা?”
ছোলাইমান স্যারের বিরক্ত হবার যথেষ্ট কারণ আছে। তিনি আমাকে প্রচুর জ্ঞান দান করেন। কিন্তু জ্ঞানদাতা হিসেবে তিনি যত ভালো, জ্ঞান-গ্রহিতা হিসেবে আমি ততই খারাপ। তিনি বলেছিলেন ঘাঁটির গোয়েন্দারা অনেক সময় ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়ায় তথ্য সংগ্রহ করার জন্য। তাদেরই প্রচলিত পরিচয় টিকটিকি। কিন্তু টিকটিকি নামক প্রাণিটির সাথে তাদের তুলনার কী যুক্তি থাকতে পারে আমি জানি না। তাড়া খেলে টিকটিকির লেজ খসে পড়ে। এদেরও কি সেরকম কিছু হয়?
“মন্ত্রী আসবেন তো, তাই এখন এদের কাজকর্ম বেড়ে গেছে।“ – সাঈদ স্যার বললেন।
জানা গেল শাহীন কলেজের নতুন বিল্ডিং হবে শাহীন সিনেমা হলের ওদিকে অনেক বড় জায়গা নিয়ে। শিক্ষামন্ত্রী জমির উদ্দিন সরকার এসে ভবনের ভিত্তি-পাথর লাগিয়ে যাবেন রোজা শুরু হবার আগে। রোজা শুরু হতে বেশি দেরি নেই। তাই কলেজে এবং ঘাঁটিতে অনেক কাজ হচ্ছে। নতুন এসেছি বলে আমি এসব ব্যস্ততার কিছুই টের পাইনি তেমন।
“একানব্বইর ঘূর্ণিঝড়ে কলেজের ক্ষতি হয়েছে না? এখন নতুন কলেজ ভবন হবে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র। এজন্য সরকার টাকা দিয়েছে।“
“জমির উদ্দিন সরকার?”
“না, বাংলাদেশ সরকার।“
সাঈদ স্যার নতুন কলেজ-ভবনের অনেক তথ্যই জানেন। তাঁর বর্ণনা থেকে আমরাও জানলাম। কলেজের টিচারদের উপস্থিত থাকতে হবে শিক্ষামন্ত্রীর অনুষ্ঠানে। আমার একটু অস্বস্তি লাগছে। মন্ত্রী আসা মানেই নানারকম বিধি-নিষেধ, প্রটোকল। প্রটোকলের বাড়াবাড়ি আমার ভালো লাগে না। কিন্তু চাকরিতে কর্তব্য আর ভালো লাগা তো এক জিনিস নয়।
>>>>>>>
রিক্রুট ট্রেনিং সেন্টারের মাঠের চেহারা রাতারাতি বদলে গেছে। বিশাল তাবু টানা হয়েছে। বর্ণিল ফুলে ফুলে সজ্জিত মঞ্চ, সারি সারি চেয়ার পাতা। কলেজ থেকে অনেক বেঞ্চ নিয়ে আসা হয়েছে শিক্ষার্থীদের বসার জন্য। গতকালও যেখানে ছিল মসৃণ মাঠ – সেখানে এক রাতের মধ্যে গজিয়ে গেছে সারিসারি গাঁদাফুলের বাগান। বড় বড় হলুদ গাঁদা ফুটে আছে সেখানে। ফাল্গুন উপচে পড়ছে গাদা গাদা গাঁদা ফুলের রঙে। লাইন ধরে অনেকটা মার্চ করার স্টাইলে কলেজ থেকে শিক্ষার্থীদের নিয়ে আসা হয়েছে অনুষ্ঠানে। ক্রীড়াশিক্ষক শংকর স্যারের ক্যারিশমা দেখার মত। এক দৌড়ে তিনি লাইনের পেছন থেকে সামনে চলে যাচ্ছেন। আবার দুটো লাইন যদি মিশে যেতে চায় – তিনি দৌড় লাগাচ্ছেন দুই লাইনের মাঝখানে। যত ক্ষীপ্র তাঁর গতি, ততই উগ্র তাঁর মেজাজ। শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যেই বুঝে গেছে – শংকর স্যার যা করতে বলবেন, তা না করলে খবর আছে।
ম্যাডামরা সবাই শাড়ী পরে এসেছেন। চমৎকার সব শাড়িতে কেমন যেন অচেনা লাগছে সবাইকে। এতদিন তো  সবাইকে সাদা অ্যাপ্রোনে হাসপাতালের করিডোরে ইন্টার্ন ডাক্তারদের মতো দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম। স্যারদের মধ্যে আমি, ফারুকী স্যার আর মহিউদ্দিন স্যার ছাড়া বাকি সবাই স্যুট-টাই পরে এসেছেন। ছোলাইমান স্যারের টাইটা একটু বেশি সংক্ষিপ্ত। হঠাৎ দেখলে মনে হবে তিনি ভুল করে কোন বাচ্চার স্কুলের টাই পরে আছেন। কী জানি, পোশাকের ব্যাপারে ছোলাইমান স্যার যেরকম আধুনিক, হয়তো এটাই টাইয়ের লেটেস্ট স্টাইল। মহিউদ্দিন স্যার তাঁর সদাশুভ্র পোশাকে দীপ্তমান। ফারুকী স্যার যে কোন ব্যাপারেই নির্বিকার থাকতে পারেন – সে উৎসবে হোক, কিংবা প্লাবনে। কিন্তু আমি নির্বিকার থাকতে পারছি না মোটেও। আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে কলেজ সেকশানের ছেলেরা যেন দুষ্টুমি না করে তা দেখতে। কিন্তু আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন দু’জন উর্দিপরা বিমানসেনা। আমাকে দেখে ছেলেদের কয়েকজনের ওষ্ঠ প্রসারিত হয়ে দন্ত প্রকাশিত হবার উপক্রম হওয়া মাত্রই বিমানসেনাদের দুজনই প্রায় এক সঙ্গে সাপের মত হিস্‌ হিস্‌ করে উঠে প্রকাশমান দন্ত অস্তমিত করে দিলেন। নতুন ভবনের ভিত্তি-পাথর বসানোর মত আনন্দময় অনুষ্ঠানে কেন সবাইকে গোমড়ামুখো হয়ে থাকতে হবে বুঝতে পারছিলাম না।
নাসির স্যার আর সাঈদ স্যারের উপর সম্ভবত সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। উনারা পালাক্রমে ঘুরছেন। সাধারণত মন্ত্রীদের অনুষ্ঠান রাজনৈতিক কারণে কখনোই সময়মত শুরু করা যায় না। কিন্তু এই অনুষ্ঠান রাজনৈতিক অনুষ্ঠান নয়। মন্ত্রীকে বিমান বাহিনীর হ্যালিকপ্টারে করে যথাসময়ে নিয়ে আসা হয়েছে। ঘাঁটি-অধিনায়ক এবং অন্যান্য কর্মকর্তাদের সাথে আমাদের প্রিন্সিপাল স্যারও মন্ত্রীকে স্বাগত জানালেন। রিফাৎ আরা ম্যাডাম উপস্থাপনা করলেন। কী সুন্দর তাঁর বাচনভঙ্গি। ম্যাডাম এই ট্রেনিং কোথায় পেয়েছেন কে জানে।
অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে নিজেকে কেমন যেন গাছ গাছ মনে হচ্ছিল। বুঝতে পারছিলাম না আমার মূল কাজটা কী। নাসির স্যার আর সাঈদ স্যারের পর অঞ্জন স্যারও একবার টহলে এলেন। জিজ্ঞেস করলেন – সবকিছু ঠিক আছে? কিন্তু কীভাবে যে বলি – সব ঠিক নেই। এত সুন্দর বিশাল আয়োজন – কিন্তু টয়লেটের কোন ব্যবস্থা নেই। এতগুলো ছেলেমেয়ে এতক্ষণ ধরে পাথরের মত বসে আছে। তাদের কষ্ট হচ্ছে না? তাদের কথা ভাবছি আসলে নিজের সমস্যা হচ্ছে দেখেই। নিজে সমস্যায় না পড়লে তো আমরা অন্যের কথা ভাবি না।
মন্ত্রী তাঁর লিখিত ভাষণ পাঠ করে কলেজের ভবিষ্যৎ ভবনের সার্বিক সাফল্য কামনা করে চলে গেলেন। অনুষ্ঠান শেষ হবার সাথে সাথে শুরু হয়ে গেল গোছানোর পালা। আমাদের শিক্ষার্থীদের ছুটির সময় পার হয়ে গিয়েছে। তারা যে যার মত চলে গেলো। দেখলাম বিমান বাহিনীর বেসামরিক ইউনিট এসে গাঁদা ফুলের রহস্য উন্মোচন করে দিলেন। শত শত ফুলের টব মাটিতে গর্ত খুঁড়ে পুঁতে দেয়া হয়েছিল, হয়ে গিয়েছিল বাগান। এখন সবগুলো টব আবার মাটি থেকে তুলে গাড়িতে করে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আগামীকালের মধ্যে এই মাঠ আবার কুচকাওয়াজের মাঠ হয়ে যাবে।
শহরে কীভাবে ফিরবো বুঝতে পারছি না। কোন গাড়ির ব্যবস্থা হবে, নাকি নিজেদের উদ্যোগে চলে যেতে হবে জানি না। কাল থেকে রমজানের ছুটি শুরু হচ্ছে। সুতরাং আজ অনেক কষ্ট করে বাসায় গেলেও গায়ে লাগবে না। নাসির স্যার বলেছেন সবাইকে কলেজে যেতে। প্রিন্সিপাল স্যার ব্রিফিং দেবেন। লম্বা ছুটির আগে নাকি এরকম ‘ব্রিফিং’ দেয়া হয়। ফারুকী স্যারের সাথে হাঁটতে হাঁটতে কলেজে চলে এলাম। ফারুকী স্যারের হাঁটার গতির সাথে তাল মেলাতে গিয়ে আমাকে প্রায় দৌড়াতে হয়েছে। কলেজের বারান্দায় উঠেই দেখলাম ম্যাডামরা সবাই অলরেডি চলে এসেছেন। তাঁদের জন্য কি গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছিল?
“এই প্রদীপ, তুমি কি জানো যে শহরে যাবার জন্য আজ গাড়ি দেয়া হবে? শুধুমাত্র আমাদের জন্য?” – ইভার কথা শুনে মনে হচ্ছে বিশাল কোন ব্যাপার ঘটে গেছে।
“তোমাদের জন্য মানে? তুমি এবং আর কে?”
“অ্যাই, তুই এত কথা প্যাঁচাস কেন? সোজা কথারও বাঁকা অর্থ করিস?” – ইন্দ্রাণী ধমকে উঠলো আমাকে। 
“ধমকাচ্ছিস কেন? একটু আগে তোরা গাড়িতে করে এলি। আমরা এলাম হেঁটে হেঁটে। এখন শহরের গাড়িতেও যদি আমাদের জায়গা না হয়?”
“হবে হবে, জায়গা হবে” – ইভা আশ্বস্ত করে আমাকে। তারপর জিজ্ঞেস করলো, “কাল থেকে তো লম্বা ছুটি। কী করবে এই ছুটিতে?”
“ঘুমাবো। লম্বা ঘুম। এতদিন ধরে ভোরে উঠতে উঠতে টায়ার্ড হয়ে গেছি। আগামী এক সপ্তাহ আমি ঘুম থেকে উঠবো না।”
>>>>>>>>>>
প্ল্যান ছিল সারাদিন ঘুমানোর। কিন্তু ঘুমানো গেলো না। দরজার বাইরে প্রচন্ড কোলাহল। হৈ চৈ এর সাথে মনে হচ্ছে কেউ আমার দরজা জানালায় কিল ঘুষিও মারছে। ফেব্রুয়ারি মাস – শীত যাই যাই করলেও সকালের দিকে কিছুক্ষণ থাকে। চাদরটা গায়ে পেঁচিয়ে দরজা খুললাম। হৈ চৈ কোলাহল হঠাৎ থেমে গেল। দেখলাম তিন-চারজন মহিলা আর দশ বারোজন বাচ্চার একটা দল। আমি দরজা খুলেছি দেখে – আমার দরজার সামনে থেকে সরে গেল সবাই, কিন্তু একেবারে চলে গেলো না। দরজা আবার বন্ধ করে দিলাম। প্রায় সাথে সাথেই ঝগড়া শুরু হয়ে গেল আবার। কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে আমার বাম দিকের প্রতিবেশী সাথে মিসেস সালামের ঝগড়া হচ্ছে। এই দুইজনের বর্তমান সম্পর্ক ভাড়াটে-বাড়িওয়ালি হলেও জন্মগতভাবে তারা আপন বোন। ঝগড়ার বিষয় তুচ্ছ, কিন্তু ভাষা নির্মম কর্কশ কদর্য।
সালাম সাহেব এই অঞ্চলের আদিবাসিন্দা। এখানেই তাদের কয়েক প্রজন্মের বসবাস। বেশ কয়েকটি গরু পালন করে, তাদের দুধ বেচে আর তিনটা ঘর ভাড়া দিয়ে বেশ আরামেই কাটছে সালাম সাহেবের দিন। নিজের বাড়িতে থাকেন, খরচ কম, তাই আলাদা করে আর কিছু করতে হয় না। করেনও না। একই ছাদের নিচে ছোট ছোট তিনটি বাসা। মাঝখানেরটা আমার। আমার বামদিকের প্রতিবেশী সালাম সাহেবের স্ত্রীর বড়বোন। তাঁরা নিঃসন্তান। স্বামী-স্ত্রী আর শ’খানেক ফার্মের মুরগি নিয়ে তাঁদের সংসার। একই ঘরের মধ্যে এতগুলি মুরগি। তাদের খোলা জানালা দিয়ে যে দুর্গন্ধ বের হয় – তাতেই আমার গা গুলিয়ে উঠে, অথচ তাঁরা সেই ঘরে দরজা-জানালা বন্ধ করে ঘুমান। শুনেছি গত চার বছর ধরে আছেন তাঁরা। প্রতিবেশীর সাথে হাই-হ্যালো করা দরকার। আমিও করেছি। তবে তেমন কোন সাড়া পাইনি। সালাম সাহেবের কাছে শুনেছি স্বামীটি কিছু করেন না। সালাম সাহেবের স্ত্রীর পৈত্রিক বাড়ি কোতোয়ালি থানার পেছনে। সেখানেও তাদের অনেক সম্পত্তি। বাপের সম্পত্তির ন্যায্য অংশ তাঁরা সব ভাইবোনই পেয়েছেন। মিসেস সালামের বড় বোনের স্বামী কিছু করেন না। ইতোমধ্যে নিজের বাপের দেয়া সম্পত্তিও ধ্বংস করে ফেলেছেন, স্ত্রীর বাপের দেয়া সম্পত্তিও। মাত্র কয়েকমাসের জন্য ছোটবোনের কাছে আশ্রয় চেয়েছিলেন বড়বোন ও তার স্বামী। তারপর চার বছর কেটে গেছে। মিসেস সালাম খুবই কর্মঠ মহিলা। সারাদিনই গরুর দেখাশোনা করেন। বোনের সাথে ঝগড়া লাগে যখন মিসেস সালাম তার বড়বোনের স্বামীর সমালোচনা করেন। সাধারণ কথা থেকেই ডাল-পালা গজিয়ে ঝগড়ার রূপ নেয়।
এই বাসার পরিবেশ অদ্ভুত। চারপাশ যেরকম ঘিঞ্জি, সেরকমই অপরিচ্ছন্ন। বাসা থেকে বের হলেই নাকে এসে লাগে মুরগির গন্ধ। তারপর কয়েক পা হাঁটলেই দুপাশ থেকে ঘিরে ধরবে দুইটি বড় বড় গোয়ালঘরের বিশ-পঁচিশটি গরুর মল-মূত্রের ঝাঁঝালো দুর্গন্ধ। একটি গোয়াল সালাম সাহেবের, অন্যটি তাঁর বড়ভাইয়ের। প্রতিদিন সকালে গোয়ালারা এসে দুধ নিয়ে যায় এখান থেকে। গোয়ালঘর পার হয়ে সামনে গেলে ছোট্ট একটা পায়ে চলা পথ। সেই পথের দুপাশে দুটো ডোবা। এখন শীতকাল বলে বেশ কিছু অংশ শুকিয়ে গেছে। বর্ষাকালে কী অবস্থা হবে এখনো জানি না। এই ডোবার চারপাশে অনেকগুলো ছোট ছোট ঝুপড়ি। সালাম সাহেবদের আত্মীয়স্বজনরা সবাই যার যার জায়গায় ছোটছোট ঝুপড়িগুলি তৈরি করে ভাড়া দিয়েছেন নিম্ন-আয়ের মানুষদের কাছে। তাদের বেশিরভাগই রিক্সাওয়ালা, দিনমজুর এবং গৃহকর্মী। প্রচুর ছেলেমেয়ে তাদের। ছেলেমেয়েগুলোকে দেখে আমার নিজের ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে যায়। ধরতে গেলে এদের চেয়ে কোনভাবেই উন্নত ছিল না আমার শৈশব।
আরো কিছুক্ষণ ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু ঘুম আর জমলো না। ক্ষুধা লেগেছে। এতদিন রান্না-বান্না তেমন করা হয়নি। হোটেলেই খেয়েছি বেশিরভাগ দিন। কিন্তু আগামীকাল থেকে রোজা শুরু হবে। রোজার সময় কোন হোটেল খোলা থাকে না। চকবাজারে হোটেল মিষ্টিমুখে তখন কালোপর্দা টাঙিয়ে দেয়া হয়। পর্দার বাইরে বড় করে লেখা থাকে – ‘হিন্দু হোটেল’। ক্ষুধার্ত হিন্দুর সংখ্যা তখন হঠাৎ বেড়ে যায়। ভেতরে তখন লোকে গিজগিজ করতে থাকে। সেই সময় যাওয়া যাবে না সেখানে। তার মানে আজকের মধ্যেই রান্নাবান্নার ব্যবস্থা করে ফেলতে হবে। চাল-ডাল-ডিম-তেল গলির মুখের দোকানে পাওয়া যাবে আশা করি।
>>>>>>>>
“বদ্দা ত এন্ডে নোয়া আইস্‌সন্দে পানলার” – গলির মুখের দোকানদার দাঁড়িপাল্লায় চাল মাপতে মাপতে জিজ্ঞেস করলেন। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার কিছু কিছু শব্দ এবং উচ্চারণ কয়েক কিলোমিটার পরপরই মনে হয় বদলে যায়। তার বাক্যটির প্রমিত বাংলা অনুবাদ হবে এরকম: ‘বড়ভাই তো মনে হয় এখানে নতুন এসেছেন’। আমি তার দিকে তাকালাম। দু’কেজি চাল মাপতে তার অনেকক্ষণ সময় লাগছে। কাগজের ঠোঙায় চাল অনেক বেশি দিয়ে ফেলেছে। সেখান থেকে হাত দিয়ে এক মুঠো দু’মুঠো করে কমাচ্ছে। দোকানে জিনিসপত্রের মান এবং পরিমাণ দেখেই বোঝা যাচ্ছে তার খরিদ্দাররা সবাই নিম্নবিত্তের মানুষ। দোকানে চিপ্‌সের প্যাকেট, মুড়ির টিন, লজেন্স, পান, বিড়ি-সিগারেট, চাল, ডাল, তেল-পেয়াজ, ডিম সবই আছে, তবে খুব কম পরিমাণে। আমার বাসার গলির মুখে এই একটাই মুদি-দোকান। এই প্রথম তার দোকানে এসেছি। প্রশ্ন শুনে তার মুখের দিকে তাকালাম। গোলগাল মোটাসোটা মানুষটার মুখে খোচা খোচা দাড়ি আর সরল হাসি। আমাকে বড়ভাই সম্বোধন করলেও তিনি বয়সে আমার বড়ভাইয়েরও বড় হবেন। এলাকায় নতুন এসেছি কিনা প্রশ্নের উত্তর দিতে দেরি করছি দেখে প্রশ্নের ধরন পাল্টে গেলো – “আপনি সালাম ভাইয়ার বাসা ভাড়া নিয়েছেন না?”
“জি”
“আমি খুব খুশি হয়েছি আপনি আমার দোকানে এসেছেন। আমার নাম ফোরকান। বসেন বদ্দা। ঐ জলিল, প্রফেসর বদ্দার জন্য এক কাপ চা নিয়ে আয়।“
সরু রাস্তার ওপারে ফোরকানের দোকানের সামনেই একটু ঝুপড়ি দোকানে চা বিক্রি হয়। যে ছেলেটা টুলে বসে বড় গামলার ময়লা পানিতে চায়ের কাপ ধুচ্ছে – হয়তো তার নামই জালাল।
“না, চা খাবো না ফোরকান ভাই। আর আমি প্রফেসর নই, লেকচারার।“
“কলেজে পড়ান না আপনি?”
“জ্বি, পড়াই।“
“কলেজে পড়ালেই প্রফেসর। সালাম ভাইয়ের গলির ভেতর এই পর্যন্ত কোনদিন কোন শিক্ষিত মানুষ ঢুকেছে বলে মনে হয় না। আপনিই প্রথম।“
আমি কী বলবো বুঝতে পারছি না। আমার বাড়িওয়ালা সালাম সাহেব মনে হচ্ছে আশেপাশের সবাইকে বলে বেড়াচ্ছেন যে এখন তাঁর বাসার পরিবেশ বদলে যাচ্ছে, কারণ প্রফেসররা এখন তাঁর ভাড়াটে হতে শুরু করেছেন!
“যা কিছু লাগে, আপনি শুধু আমাকে লিস্ট দিয়ে যাবেন। আমি আপনার বাসায় পাঠিয়ে দেবো।”
ফোরকানের উৎসাহ দেখে আমার অস্বস্তি হচ্ছে। জিনিসপত্রের দাম দিয়ে প্যাকেটটা নেয়ার জন্য হাত বাড়াতেই লোকমান বললেন, “আপনি যান বদ্দা। আমি আপনার সামান বাসায় পাঠিয়ে দেবো।“
 “আপনাকে পাঠাতে হবে না। আমাকে দেন। আমার সামান আমিই নিয়ে যাই।“
বাসার গলিতে ঢুকে দেখলাম দুটি ছেলে যাচ্ছে আমার আগে আগে। আমি নিশ্চিত এরা এখানে থাকে না। আমার মনে হচ্ছে এদের একজন হচ্ছে সেই ছেলে যে  ইলেভেন ক্লাসে পড়ে এবং যাকে দেখতে সিনেমার ভিলেন বাবরের মত লাগে। এই বাবর প্রাইভেট পড়তে চেয়েছিল। আমি মানা করেছিলাম। অন্যজন কে আমি বুঝতে পারছি না।
বাসার সামনে এসে দেখি বাবর আর তার সঙ্গী আমার পাশের বাসার জানালা দিয়ে উঁকি দিয়েই নাকে হাত চাপা দিয়ে দ্রুত পিছিয়ে এলো। শতাধিক গৃহবন্দী মুরগীর উৎকট গন্ধ সহ্য করার মত শক্তি তাদের নাসিকার থাকার কথা নয়। আমার দরজায় তালা দেখেই হয়তো সেদিকে উঁকি মেরেছিল। নাকি ওটাই আমার বাসা মনে করেছে তারা?
আমাকে আসতে দেখে মনে হলো কিছুটা খুশি হয়েছে বাবর। অন্যজনের চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেই সে খুশি না অখুশি। তাকে আমি আগে কখনো দেখিনি। সে আঙুল দিয়ে নাক টিপে ধরে আছে।
“কী ব্যাপার, তোমরা এখানে কী করছো?”
“এমনিতে স্যার। খালার বাসায় এসেছিলাম। দেখতে এলাম আপনি আছেন কি না। স্যার এ আমার খালাত ভাই – পাভেল। চিটাগং কলেজে পড়ে আমার সাথেই ফার্স্ট ইয়ারে।”
মনে হচ্ছে লুঙ্গি পরে বাসা থেকে বের হওয়াটা ঠিক হয়নি। দরজার তালা খুলে বললাম, এসো, ভেতরে এসো।‘
ভেতরে এলো দু’জন। জানালা খুলে দিলাম। দরজা ও জানালা খোলা থাকলে বাসার সামনের রুমে আলো ঢুকে। মাঝখানে যে রুমটা আছে তাতে কোন জানালা নেই। সামনের রুম এবং পেছনের রান্নাঘরের জানালা দিয়ে যতটুকু আলো আসে তাতে রুমের অন্ধকার কাটে না। বাবর আর পাভেল ঘরে ঢুকে দাঁড়িয়ে রইলো। রুমে আসবাবপত্র কিছুই নেই। ফতেয়াবাদ থেকে সাহেব মিয়া আর কুদ্দুস ঠেলাগাড়িতে করে এনে দিয়েছিল একটি চৌকি, একটি টেবিল আর একটি চেয়ার। চৌকিটি মাঝখানের রুমে পেতেছি, সামনের ঘরে চেয়ার আর টেবিলটা। দুটো বাঁশের বুকশেল্‌ফ ছিল। সেগুলো এখনো খালি। বইগুলো প্যাকেটবন্দী হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে। এদেরকে বসতে বললে কোথায় বসবে? চেয়ারের দিকে তাকিয়ে খুব অস্বস্তি হচ্ছে। কাল বাইরে থেকে এসে জামাকাপড় খুলে চেয়ারে মেলে দিয়েছি। সাদা শার্টের উপর শুয়ে থাকা কালো অন্তর্বাস বিভৎস দেখাচ্ছে। তাড়াতাড়ি হাতের প্যাকেটা রেখে চেয়ার খালি করলাম। একটি চেয়ারে দুজনকে কেমনে বসতে বলি? চৌকিতে বসতে বলা যায়। কিন্তু তার অবস্থা আরো শোচনীয়। সকালে উঠে মশারিটাও খুলিনি এখনো। ঘর গোছানোর উপকারিতা যে আছে তা টের পাচ্ছি। আবার মনে হচ্ছে – ছাত্রদের কাছে এত ফিটফাট থাকার কী আছে? অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক তো ছাত্রের সামনে গামছা গায়ে দিয়ে শুয়ে থাকলেও সংকোচ বোধ করতেন না। আবার মনে হচ্ছে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক হতে গেলে যেরকম মেধা ও পড়াশোনার দরকার তা যেহেতু আমার নেই, সেহেতু আমাকে পরিপাটি হয়ে থাকতে হবে। কিন্তু এখন তো তারা ঘরে ঢুকে পড়েছে। পরিপাটি হবার সুযোগ নেই। বললাম, “দেখো, আমার বাসায় বসারও কিছু নেই। একটা চেয়ার আছে, দুজনে ভাগাভাগি করে বসো। অথবা একজন চেয়ারে বস, আরেকজন টেবিলে বস।“
“না, স্যার ঠিক আছে।“
“কী ঠিক আছে? দাঁড়িয়ে থাকবে?”
তারা কিছু বললো না। বাবরকে বললাম, “যতদূর মনে পড়ে তোমাকে বাসায় আসতে মানা করেছিলাম। কেন করেছিলাম এখন বুঝতে পারছো? আমার বাসায় তোমাদের বসতে দেয়ার মতোও কিছু নেই।“
“আমি আসতে চাইনি স্যার। পাভেল জোর করলো।“
“পাভেল কেন জোর করতে যাবে? পাভেল কি আমাকে চিনে?”
পাভেল বললো, “রঞ্জন স্যারের কাছে আপনার কথা শুনেছি তো স্যার, তাই আপনাকে দেখার ইচ্ছে হলো।“
“কোন্‌ রঞ্জন?”
“রঞ্জন চক্রবর্তী। ফিজিক্সে পড়ে। আমাকে কিছুদিন পড়িয়েছিলেন। তিনি বলেছেন আপনি ফিজিক্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছেন।“
“শুধু এটুকুতে তো তোমার আমাকে দেখতে আসার কথা নয়। চিটাগং কলেজে এরকম ফার্স্ট ক্লাস অনেক আছে। রঞ্জন আর কী বলেছে?”
“আর কিছু না স্যার।“
রঞ্জন চক্রবর্তী আমার কয়েক বছর জুনিয়র। খুবই তীক্ষ্ম বুদ্ধিসম্পন্ন মেধাবী ছাত্র। ফিজিক্স সে সত্যিই ভালোবাসে এবং বোঝার চেষ্টা করে। আমার মেসে মাঝে মাঝে এসে ফিজিক্স দিয়ে শুরু করে চলমান রাজনীতি বিষয়েও তার মতামত বলে চলে যায়। তার ধারণা আমি মোটেও ক্যারিয়ারিস্ট নই। পেশাগত উন্নতির কোন ইচ্ছেই আমার নেই। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সুযোগ কাজে না লাগানোর নাম পাগলামি। তার মতে সেই পাগলামি আমার দিনে দিনে বাড়ছে। অনার্সের রেজাল্টের পর আমি যখন প্রামাণিক স্যারের কাছে থিসিস শুরু করলাম, তখন সে প্রায় ক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিল।
‘আপনি পাগলামি করছেন। প্রামাণিক স্যার প্রচুর জানেন সেটা ঠিক, কিন্তু প্রচুর ক্ষমতা তাঁর নেই। ডিপার্টমেন্টে জয়েন করতে হলে আপনাকে ঘুরতে হবে ক্ষমতাশালী প্রফেসরদের পেছনে। আর আপনি কী করছেন?”
তারপর বলেছিল ইউনিভার্সিটিতে কোন্‌ স্যারের কত ক্ষমতা। কোন্‌ স্যারের গুডবুকে  থাকতে পারলে ভবিষ্যত ঝকঝকে হয়ে যাবে, আর ব্যাডবুকে নাম উঠে গেলে ভবিষ্যত ঝরঝরে হয়ে যাবে। আমি কিছুটা অবাক হলাম। আমি অনার্স পাস করে ফেললেও যেসব তথ্য জানতে পারিনি, রঞ্জন ফার্স্ট ইয়ারটা শেষ করেই সবকিছু জেনে গেছে। এখানে আসার পর সে খুঁজে খুঁজে বাসায় এসে আমাকে না পেয়ে চলে গেছে অনেকবার। শেষে একদিন এসেছে গভীর রাতে। দরজা খোলার পর ঘুরে ঢুকতে ঢুকতে তার প্রথম প্রশ্ন ছিল, “এরকম একটা ঘিঞ্জি বস্তিতে এসে লুকিয়ে আছেন কেন?”
“এর চেয়ে ভালো জায়গায় বাসা নেবার সামর্থ্য আমার নেই।“
“সামর্থ্য নয়, বলেন ইচ্ছে নেই।“
রঞ্জন আমাকে বোঝাতে চেষ্টা করে ইচ্ছে করলেই কীভাবে আমি ব্যাচের পর ব্যাচ প্রাইভেট পড়িয়ে হাজার হাজার টাকা উপার্জন করতে পারি। তার জন্য আমাকে কলেজের কাছাকাছি বাসা নিতে হবে। তারপর কলেজের ইন্টারনাল পরীক্ষাগুলোর প্রশ্ন এমন কঠিন করতে হবে যেন বেশিরভাগ স্টুডেন্টই ফেল করে। ক্লাসে যেন কিছুতেই সব পড়িয়ে না ফেলি। তারপর বাসায় স্টুডেন্টদের লাইন পড়ে যাবে।
আমি রঞ্জনের কথা চুপচাপ শুনে তাকে প্রশ্ন করেছিলাম, “বাসার গলির সামনে সাইনবোর্ড লাগাতে হবে না? তুমি যেমন লাগিয়েছো?”
“আপনি দেখেছেন?”
“যেভাবে লাগিয়েছো না দেখার তো উপায় নেই। আমি তো জানতাম তুমি এখনো সেকেন্ড ইয়ারে। কিন্তু তুমি যে অনার্স পাস করে ফেলেছো এবং ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছো তা আমি জানতাম না। তোমার সাইনবোর্ড দেখে জানলাম।“
“ওভাবে না লিখলে আমার কাছে কেউ আসবে পড়তে? বিজ্ঞাপনের যুগ এটা। আপনি হয়তো ভাবছেন আমি প্রতারণা করছি। মোটেও না। আমি তো ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হতেই পারি ভবিষ্যতে।“
“তুমি তো জ্ঞানপাপীদের মত কথা বলছো।“
“আপনি তো পাপ-পূণ্য মানেন না। সুতরাং জ্ঞানপাপ কিংবা জ্ঞানপূণ্য সম্পর্কেও তো আপনার কোন এলার্জি থাকার কথা নয়।“
রঞ্জনকে এরপরেও আমি সহ্য করি। তার কুযুক্তি থেকে আমি চিনতে চেষ্টা করি মানুষের মনের কানাগলি। সুযোগ পেলেই সে আমাকে পাগল বলে। হয়তো অন্যদের কাছেও বলে। পাভেলকে জিজ্ঞেস করলাম, “রঞ্জন বলেনি যে আমি একটা পাগল?”
পাভেল হাসি গোপন করে আস্তে করে বললো, “জ্বি স্যার বলেছেন।“
“তাহলে তুমি পাগল দেখতে এসেছো। কেমন দেখলে?”
“জ্বি স্যার, ভালো।“
“ভালো পাগল দেখেছো। হাহাহাহা।”
পাভেল একটু অপ্রস্তুত হয়ে উঠলো। জোরে হাসার অভ্যাস আমার অনেকদিনের। টিচার্সরুমেও আমি অনেকসময় এরকম জোরে হেসে ফেলি। শংকর স্যার একদিন তো বলেই ফেলেছেন, “আপনার হাসি অনেকটা হায়নার হাসির মতো।“
“কেমন যেন একটা বিশ্রী গন্ধ পাচ্ছো না?”
“পাশের বাসার মুরগির বিষ্ঠার গন্ধ স্যার।“
“আমার তো মনে হচ্ছে মনুষ্য-বিষ্ঠার গন্ধ। পাভেল তোমার স্যান্ডেলেই তো লেগে আছে। আসার সময় মাড়িয়েছো। হাহাহাহাহা।“
আমাকে উচ্চস্বরে হেসে উঠতে দেখে পাভেল ভীষণ ভয় পেয়ে খোলা দরজা দিয়ে দ্রুত বের হয়ে গেল। সে সত্যিই আমাকে পাগল মনে করেছে। বাবর কী করবে বুঝতে না পেরে একবার দরজার দিকে তাকায়, আবার আমার দিকে তাকায়।
বললাম, “তুমিও যাও। পাভেলকে বাসায় পৌঁছে দাও। বেচারা ভয় পেয়ে গেছে।“
“যাই স্যার। আদাব স্যার।“
পাভেল বের হয়ে গেল। আমার আরো জোরে হাসি পেল। এই বাসায় যত ইচ্ছে জোরে হাসা যায়।

No comments:

Post a Comment

Latest Post

Memories of My Father - Part 2

  In our childhood and even in our adulthood, there was no tradition of celebrating birthdays. We didn't even remember when anyone's...

Popular Posts