Saturday 23 May 2020

ছিন্ন পাতার সাজাই তরণী - পর্ব ১৫

15           

“একটি মোরগ হঠাৎ আশ্রয় পেয়ে গেল
বিরাট প্রাসাদের ছোট্ট এক কোণে,
ভাঙা প্যাকিং বাক্সের গাদায় –
আরো দু’তিনটে মুরগীর সঙ্গে।“

আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় একের পর এক ছয়টা কবিতা শুনেই কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ যেন ইলেকট্রিক শক খেয়ে সোজা হয়ে বসলাম। যেন কবিতার শব্দ নয়, ছোট্ট মেয়েটির স্পষ্ট নিঁখুত উচ্চারণের কাব্যিক বুলেট ঢুকে যাচ্ছে মগজের ভেতর। দুটো লাইন উচ্চারণ করেই আমার এতক্ষণের ঝিমিয়ে পড়া ভাবটা কোথায় উড়িয়ে নিয়ে গেল সে।

“আশ্রয় যদিও মিলল,
উপযুক্ত আহার মিলল না।
সুতীক্ষ্ম চিৎকারে প্রতিবাদ জানিয়ে
গলা ফাটাল সে মোরগ
ভোর থেকে সন্ধে পর্যন্ত –
তবুও সহানুভূতি জানাল না সেই বিরাট শক্ত ইমারত।“

শাহীন কলেজের শক্ত ইমারতে প্রতিফলিত হলো তার প্রত্যেকটি শব্দ। এতক্ষণ যেসব শিক্ষার্থীর ফিসফিস গুঞ্জন থামাতে গিয়ে শিক্ষকরা গলদঘর্ম হচ্ছিলেন, শব্দের জাদুতে সেই সব বাচালও এখন নিশ্চুপ। সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘একটি মোরগের কাহিনী’র আবৃত্তি যে এত সুন্দর হতে পারে, আমি আগে কখনো ভাবতেও পারিনি।

“খাবার! খাবার! খানিকটা খাবার!
অসহায় মোরগ খাবারের সন্ধানে
বার বার চেষ্টা করল প্রাসাদে ঢুকতে,
প্রত্যেকবারই তাড়া খেল প্রচন্ড।“

এই কথাগুলোর অন্তর্গত ভাব বোঝার কথা নয় এই দশ-এগারো বছরের ছোট্ট ঝুঁটিবাঁধা মেয়েটির। অথচ কী মর্মভেদী যন্ত্রণা ফুটে উঠছে তার এক একবার ‘খাবার’ উচ্চারণের সাথে সাথে। মোরগের কাহিনীর আড়ালে সুকান্ত যা বলতে চেয়েছেন তার নিঁখুত প্রতিফলন ঘটছে প্রতিটি শব্দ প্রক্ষাপণে।

“ছোট্ট মোরগ ঘাড় উঁচু করে স্বপ্ন দেখে-
প্রাসাদের ভেতর রাশি রাশি খাবার!
তারপর সত্যিই সে একদিন প্রাসাদে ঢুকতে পেল,
একেবারে সোজা চলে এল
ধবধবে দামী কাপড়ে ঢাকা খাবার টেবিলে;
অবশ্য খাবার খেতে নয় –
খাবার হিসেবে।“

বিস্ময়ে হতবাক হয়ে হাততালি দিতেও ভুলে গিয়েছিলাম। চারপাশে প্রচন্ড করতালির শব্দে সম্বিত ফিরে পেলাম। বসেছি বিচারকের আসনে। নম্বর দিতে হবে। মার্কশিটের ঘরে মেয়েটির নাম-শ্রেণি লেখা আছে – রেহনুমা নাসিম, সপ্তম শ্রেণি, ক শাখা। শতকরা একশ ভাগের বেশি দেয়ার নিয়ম থাকলে তাই দিতাম।

আবৃত্তির কলাকৌশল আমি কিছুই জানি না। শুধুমাত্র শিক্ষক হবার কারণেই আমাকে কলেজের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার বিচারকের দায়িত্ব পালন করার স্পর্ধা দেখাতে হচ্ছে। অন্য তিনজন বিচারক – আইভি ম্যাডাম, নাহার ম্যাডাম, নাসরীন ম্যাডাম তিনজনই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। আইভি ম্যাডাম নিজে শিল্পী, ডিজাইনার; শিল্প-সংস্কৃতির সাথে তাঁর নিত্যবসবাস। সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার তিনি যোগ্য বিচারক। নাহার ম্যাডাম কবি। তাঁর কবিতা কলেজের ম্যাগাজিনে ছাপা হয়। শিক্ষার্থীরা অপেক্ষা করে থাকে কখন তাঁর নতুন কবিতা প্রকাশিত হবে। কবিতার নাট-বল্টু সব তাঁর নখদর্পণে। তিনি যথার্থ বিচারক। নাসরীন ম্যাডাম বাংলা-বিশারদ। বাংলা ভাষার এমন কিছু নেই যা তিনি জানেন না। যে কোন কবিতার একটা লাইন শুনলেই তিনি বলে দিতে পারেন কোন্‌ কবির কোন্‌ কবিতার লাইন সেটা। কথোপকথনে তিনি মাঝে মাঝে বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের চরিত্রদের সংলাপের মতো কঠিন কিছু শব্দ এত অবলীলায় প্রয়োগ করেন যে শুনে তাজ্জব হতে হয়। সেদিন কলেজের বারান্দায় ইতস্তত হাঁটছিলাম। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “পথিক, তুমি কি পথ হারাইয়াছ?" আমি ভাবলাম ম্যাডাম মনে হয় আমার নাম ভুলে গেছেন। বললাম, “ম্যাডাম, আমার নাম পথিক নয়, প্রদীপ।” তিনি আমার অজ্ঞানতাকে ক্ষমা করে দিয়ে কী সুন্দর হাসিমুখে বললেন, “ওটা বঙ্কিমচন্দ্রের কপালকুন্ডলা উপন্যাসের একটি বিখ্যাত উক্তি।” সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার বিচার নাসরীন ম্যাডামকে ছাড়া অসম্পূর্ণ। তাঁদের পাশে আমি যে বিচারক হয়ে বসেছি তাতে নিজেকে ‘হংস মাঝে কাক যথা’ বলে মনে হচ্ছে। 

তবে আশ্চর্যের বিষয় এখানে কেউ আমার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন না। চট্টগ্রাম কলেজে পড়ার সময় দেখেছিলাম সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার বিচারক হিসেবে আসতেন নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত কবি, সাহিত্যিক, শিল্পীরা। কিন্তু সেখানে সবকিছুতেই রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনগুলো খবরদারি করতো। এখানে সেই ঝামেলা নেই। এখানে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের যোগ্যতা সম্পর্কে প্রশ্ন করে না বলে শিক্ষকরা এক দিক থেকে মোটামুটি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। তাই আমার উচ্চারণে হাজারো ভুল সত্ত্বেও আমি আবৃত্তি প্রতিযোগিতার বিচারক। গানের গ’ও না জেনে রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুল গীতি কিংবা আধুনিক গানের প্রতিযোগিদের ভালোমন্দ বিচার করছি। তবুও ভালো যে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ইভেন্ট নেই। আমাকে যদি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত বা রাগপ্রধান সঙ্গীতের প্রতিযোগিতারও বিচার করতে হতো তাহলে আর দেখতে হতো না। দেখা যেতো কেউ হাসিমুখে গাইলেই আমি কম নম্বর দিয়ে দিচ্ছি। কারণ রাগপ্রধান সঙ্গীত বলতে আমি বুঝতাম প্রচন্ড রাগ করে গাওয়া গান।

সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা থেকে সুচরিত স্যারের আরো একটি গুণ জানা গেল। তিনি যে কী চমৎকার তবলা বাজান। শিক্ষার্থীদের গানের সাথে তবলা বাজাতে হয়েছে, তাই তিনি বিচারক হননি আজ। এতগুলো গুণ একজন মানুষের ভেতরে কীভাবে থাকে? তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, “এমন কিছু কাজ কি আছে যা আপনি জানেন না?”
“কী যে বলেন?” বলে গোঁফের ফাঁকে সামান্য একটু হাসলেন। গুণী মানুষ কেন যে এত অসহ্য রকমের বিনয়ী হন!

আবৃত্তি প্রতিযোগিতা শেষ হবার পর আজকের মতো সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা শেষ হলো। নাহার ম্যাডাম যখন  আবৃত্তি প্রতিযোগিতার ফলাফল যখন ঘোষণা করছিলেন, আমি তাকিয়েছিলাম রেহনুমা নাসিমের কী প্রতিক্রিয়া হয় দেখার জন্য। সে প্রায় সারাক্ষণই তার পাশে বসা আরেকটি মেয়ের সাথে হাসাহাসি করছিল। সে আবৃত্তিতে প্রথম হয়েছে তাতে তার পার্শ্ববর্তিনী আনন্দে হৈ চৈ করে উঠলো, অথচ তার নিজের কোন দৃশ্যমান প্রতিক্রিয়া হলো না। সে তার আগের আলাপচারিতাতেই ফিরে গেলো। প্রতিযোগিতার স্নায়ুচাপ তাকে একটুও স্পর্শ করতে পারেনি। এত কম বয়সে এরকম বৌদ্ধস্বভাব সে কোথায় পেল কে জানে। 

চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লাম। শিক্ষার্থীরা আস্তে আস্তে চলে যাচ্ছে। স্যার-ম্যাডামরা হিসেব করছেন নিজেদের হাউজে কত পয়েন্ট যোগ হলো ইত্যাদি নিয়ে। পূর্ণিমা ম্যাডাম রেহনুমাকে প্রায় জাপটে ধরে আদর করছেন তাঁর হাউজে অনেকগুলো পয়েন্ট এনে দেয়ার জন্য। ইভা এগিয়ে এসে বললো, “অ্যাই প্রদীপ, আবৃত্তিতে আমরা কিন্তু কোন পয়েন্ট পাইনি।”
“কোন্‌ বাড়ি তোমার?”
“মানে?”
“বাড়ি মানে জানো না? হাউজ হাউজ।”
“কেন, তুমি জানো না, হামিদ হাউজ? তুমিও তো হামিদ হাউজে।”
“তাই নাকি? তুমি আমি একই বাড়িতে তা কীভাবে হয়?”
“এই ফাজলামি করবা না।“

ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা হয় হাউজভিত্তিক। কলেজের শিক্ষার্থীদের চারটি হাউজে ভাগ করা হয় – হামিদ হাউজ, আনসার হাউজ, বাশার হাউজ, মাসুদ হাউজ।
“এই হাউজগুলি কাদের নামে স্যার?” জিজ্ঞেস করেছিলাম আমাদের টিচার্স রুমের স্পিকার সাঈদ স্যারকে।
“এয়ারফোর্সের কোন বিখ্যাত অফিসার হবেন। হেড কোয়ার্টার থেকে নামগুলো দেয়া হয়েছে। আমাদের কাজ হলো এই চারটি নামের চারটি হাউজে সব ছাত্রছাত্রীকে সমানভাবে বন্টন করে দেয়া।”

ছাত্রছাত্রীদের চারটি হাউজে ভাগ করার ব্যাপারটা খারাপ না। কিন্তু প্রতিযোগিতার নিয়মে কিছুটা সমস্যা আছে বলে আমার মনে হলো। ছাত্রছাত্রীদের রোল নম্বর অনুসারে হাউজ ভাগ করা হয়। প্রথম চারজনকে চার হাউজে, তারপর চারজনকে চার হাউজে এভাবে। এভাবে ১০০ জনের ক্লাসের মধ্যে প্রতি হাউজে ২৫ জন করে শিক্ষার্থী। ক্লাসের ভিত্তিতে কয়েকটি লেভেলে প্রতিযোগিতা হয়। প্রতিটি লেভেলে প্রতি হাউজ থেকে মাত্র দু’জনকে বাছাই করে চূড়ান্ত প্রতিযোগিতা হয়। এখন কোন হাউজে যদি দুইয়ের অধিক ভালো প্রতিযোগী থাকে, তাহলে এমনও হতে পারে যে কোন হাউজের তৃতীয় প্রতিযোগী অন্য হাউজের প্রথম প্রতিযোগীর চেয়ে ভালো। কিন্তু প্রতিযোগিতায় তার অংশ নেয়ার সুযোগ না থাকাতে সে প্রমাণই করতে পারলো না যে সে ভালো। সাধারণ গাণিতিক সেট-থিওরি দিয়ে এটা সহজেই বোঝা যায়।

বিমল স্যারকে বললাম এই সমস্যার কথা। তিনি বললেন, “একটা খুবই দরকারি নিয়ম শিখে রাখেন, ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। নিয়মটা হইল – আপনার বস যদি কোন নিয়ম তৈরি করে, সেই নিয়ম মেনে চলবেন, কিন্তু ভুলেও সেই নিয়মের ভুল বাইর করতে যাবেন না। মনে রাখবেন, আপনার বস যদি গাধাও হয়, সেই গাধার নির্দেশ মেনে চলা আপনার কাজ, ভুল ধরা নয়। মনে থাকবে?”
“মনে থাকবে স্যার।”

তারপর হাউজ বন্টন নিয়ে আর কোন কথা বলা উচিত নয়। কমিটি-মেম্বারছাড়া বাকি টিচারদেরও বিভিন্ন হাউজে বন্টন করে দেয়া হয়। প্রতিটি হাউজের একজন হাউজ-লিডার থাকেন। আমার হাউজ যে হামিদ হাউজ তা আমার মনেও থাকে না।

১৯৯৪ সাল শুরু থেকেই অনেক ব্যস্ততা নিয়ে এসেছে। জাতীয় টেলিভিশন বিতর্ক প্রতিযোগিতায় কলেজ টিম প্রথম রাউন্ডে জিতেছে। আমাদের মোর্শেদ ইমতিয়াজ পাপ্পু সেরা বিতার্কিক হয়েছে। সেকেন্ড রাউন্ডের  প্রস্তুতিও জোরোশোরে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু বিপক্ষ দল আমাদের চেয়ে কিছুটা বেশি ভালো করায় আমাদের দল জিততে পারেনি। তবে আমাদের পাপ্পু আবারও শ্রেষ্ঠ বিতার্কিক হয়েছে। প্রতিযোগিতায় হারজিত থাকবেই। কলেজের টিম হেরে যাওয়ার ব্যাপারটাকেও প্রিন্সিপাল স্যার খুব সহজভাবে নিয়েছেন দেখে ভালো লাগলো। শোনা যাচ্ছে জাতীয় পর্যায়ের স্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতা শুরু হবে শীঘ্র। কলেজের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় বিতর্কের ইভেন্ট থাকলে ভালো হতো। আশা করি আগামী বছর থেকে বিতর্কের ইভেন্টও যোগ হবে।

সাঈদ স্যার আর মহিউদ্দিন স্যার নতুন বছরের ক্লাসরুটিন তৈরি করা নিয়ে খুবই ব্যস্ত। দেখলাম বিশাল আকৃতির বোর্ড পেপারে ছোট ছোট ঘর এঁকে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সব ক্লাসের রুটিন তৈরি করা হচ্ছে। সাথে কোন্‌ টিচার কোন্‌ ক্লাস নেবেন তাও। নিঃসন্দেহে খুবই জটিল এবং কঠিন কাজ।
স্কুলের শিক্ষার্থীরা নতুন ক্লাসে নতুন বইখাতা নিয়ে নতুন উৎসাহে প্রস্তুত হচ্ছে। নতুন রুটিন তৈরি হবার আগপর্যন্ত গত বছরের রুটিনেই ক্লাস চলছে। এখন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা চলছে। ক্রীড়া প্রতিযোগিতার বিভিন্ন ইভেন্টের প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে।

প্রস্তুতি শুরু হবার দিনের ঘটনা একটু অন্যরকম লাগলো। আমি যখন জয়েন করেছি তখন স্কুলের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা ছিল বলে কোন অ্যাসেম্বলি হয়নি। নতুন বছরে সকাল আটটায় অ্যাসেম্বলি শুরু হলো। আটটা বাজার দশ মিনিট আগেই প্রচন্ড হুইসেলের শব্দে টিচার্স রুমের সবাই বেশ অবাক হয়ে গেলাম। ক্রীড়াশিক্ষক কামরুজ্জামানের হুইসেল এত জোরে বাজেনি কোনদিন। তিনি চলে গেছেন ক’দিন আগে। দেখলাম কলেজ চত্বরের মাঝঝানে ঘাসের উপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন একজন সাদা প্যান্ট সাদা শার্ট পরা সুঠাম যুবক। তাঁর মুখে এখনো হুইসেল গোঁজা। নতুন ক্রীড়াশিক্ষক।

সাঈদ স্যার হ্যান্ডমাইক নিয়ে বের হলেন। ছোট্ট হ্যান্ড মাইকটা বগলে নিয়ে দ্রুত বারান্দায় বের হয়ে স্পিকার অন করে তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বললেন, “শোন ছাত্রছাত্রীরা, সবাই মাঠে নেমে এস।”

একটু পরেই মাঠ ভর্তি হয়ে গেল। প্রত্যেক ক্লাসের একজন ক্লাসটিচার থাকেন। তাঁরাও মাঠে নেমে গেলেন যার যার ক্লাসের ছেলে-মেয়েদের লাইনে দাঁড় করিয়ে দিতে। আমি ও সুচরিত স্যার কোন ক্লাসের ক্লাসটিচার নই। আমাদের নামতে হলো না। মাঠভর্তি ঘাস শিশিরে ভেজা। ছাত্রছাত্রীদের কাপড়ের তৈরি পিটি-সু কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভিজে গেল। আমার কেমন যেন একটু অস্বস্তি লাগছে। কিন্তু বিমল স্যারের শেখানো নিয়ম অনুসারে আমার কিছু বলার নেই এখানে। যাঁরা নিয়ম তৈরি করেছেন তাঁরা আমার চেয়ে কম বোঝেন এটা ভাবার কোন কারণ নেই।

একটু পরেই একটা কান্ড ঘটলো। দেখা গেলো নাসির স্যার হাতে একটা বড় কাঁচি নিয়ে মাঠে নামলেন। কলেজের ছেলেদের মধ্যে, বিশেষ করে যাদের চুলের দৈর্ঘ্য বিশেষ বিশেষ ফ্যাশানের কারণে আপত্তিকর অবস্থায় গিয়ে ঠেকেছে, চাঞ্চল্য দেখা দিল। অনেকে মাথায় হাত দিয়ে চুল ঢাকার চেষ্টা করলো। কিন্তু কাজ হলো না। নাসির স্যার ধীরগতিতে লাইন বরাবর হাঁটছেন, আর হঠাৎ হঠাৎ ক্ষিপ্রগতিতে কাঁচি চালাচ্ছেন লম্বা চুল বরাবর। যার চুলে কাঁচি পড়ছে মনে হচ্ছে তার মাথায় বজ্রাঘাত হচ্ছে। মাথার মাঝখান থেকে হঠাৎ এক খাবলা চুল চলে গিয়ে কেশ-গহ্বর সৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে। চুল লম্বা রাখার এমন শাস্তি আগে কখনো দেখিনি।

এরপর ক্লাসটিচাররা সবাই উঠে এলেন বারান্দায়। আমরা সবাই বারান্দায় পাশাপাশি দাঁড়ালাম। সব কিছু রেডি হবার পর প্রিন্সিপাল স্যারকে ডেকে নিয়ে এলেন সাঈদ স্যার। প্রিফেক্ট মোর্শেদ ইমতিয়াজ অ্যাসেম্বলি পরিচালনা করলো। জাতীয় সঙ্গীতের পর প্রিন্সিপাল স্যার ভাষণ দিলেন। তাঁর ভাষণের সময় সাঈদ স্যার তাঁর হ্যান্ড-মাইক বগলে নিয়ে স্পিকারটি প্রিন্সিপালের মুখের সামনে ধরে রইলেন যাতে প্রিন্সিপাল স্যার মুক্তহস্তে কথা বলতে পারেন। প্রিন্সিপাল স্যার ঘোষণা দিলেন আজ থেকে মাঠে গিয়ে ক্রীড়া প্রতিযোগিতার অনুশীলন শুরু হবে। সদ্য চুল-খোয়ানো ছেলেরা তাতে খুবই মর্মাহত হলো। একে তাদের চুল কেটে নেয়া হয়েছে, এখন যদি মাঠে গিয়ে তা প্রদর্শন করতে হয় তাহলে তো মানসম্মানের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। এমনিতেই কলেজের এই ভাইয়াদের দুর্দশা দেখে স্কুলের শিক্ষার্থীরা ব্যাপক আনন্দ পাচ্ছে।

অ্যাসেম্বলির পর টিচার্স রুমে ঢুকার সাথে সাথেই পিয়ন মিজান দুটো সাদা অ্যাপ্রন নিয়ে হাজির। বললেন একটা আমার জন্য, আরেকটা সুচরিত স্যারের জন্য। লন্ড্রি থেকে ধুয়ে ইস্ত্রি করে নিয়ে এলেও বোঝা যাচ্ছে এই দুটো অ্যাপ্রনই পুরনো। লম্বাটা আমার জন্য, আর অপেক্ষাকৃত বেঁটেটা সুচরিত স্যারের জন্য। মহিউদ্দিন স্যার দেখেই বলে দিলেন, “কাইয়ুম সাহেবেরটা দিয়েছে প্রদীপকে, আর কামরুজ্জামানেরটা দিয়েছে সুচরিতকে। কেমন অথরিটি দেখো, দুজন টিচারকে দুটা নতুন অ্যাপ্রন দেবার পয়সা পর্যন্ত খরচ করতে চায় না।”

কাইয়ুম স্যারের ফেলে যাওয়া অ্যাপ্রোন গায়ে দেয়ার পর মনে হলো একটা ছোটখাট তাবু গায়ে জড়িয়েছি। বেশ মজাই লাগছে। এখন আমাকে আর শার্ট-প্যান্ট ইস্ত্রি করতে হবে না। কুঁচকানো শার্ট পরে এলেও কেউ টের পাবে না। সকালে কলেজে এসে অ্যাপ্রনটা পরে ফেললেই হলো।  মানুষের কোন্‌ সময়ের কী শখ যে কীভাবে পূর্ণ হয়! এক সময় ডাক্তারি পড়ার ইচ্ছে জেগেছিল শুধুমাত্র অ্যাপ্রন গায়ে দেয়ার লোভে। সেই কত বছর আগের অ্যাপ্রন পরার ইচ্ছে পূরণ হলো এভাবে। পুরনো ইচ্ছে বলেই হয়তো পুরনো অ্যাপ্রনই জুটেছে। কামরুজ্জামান স্যারের অ্যাপ্রনটা তুলনামূলকভাবে নতুন, আর সুচরিত স্যারের গায়ে ফিটও করেছে ঠিকমত। কামরুজ্জামান স্যারের আয়তন আর সুচরিত স্যারের আয়তন মোটামুটি কাছাকাছি বলেই প্রমাণিত হলো। 

“হ্যালো” – বলে হাত বাড়িয়ে দিলেন সদ্য আসা ক্রীড়াশিক্ষক। আমি হাতটা বাড়াতেই তিনি অদ্ভুত এক কায়দায় হ্যান্ডশেক করলেন। তাঁর হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে আমার হাতের বুড়ো আঙুলকে কীভাবে যেন প্যাঁচিয়ে ধরলেন।
“আমার নাম মন্ডল, শংকর মন্ডল।“

জেমস বন্ডের সিনেমায় দেখেছি এভাবে নাম বলতে, ‘মাই নেম ইজ বন্ড, জেমস বন্ড।‘ ধবধবে সাদা শার্ট-প্যান্টের সাথে জুতাটাও সাদা। জেমস বন্ডের মতই ছটফটে শংকর মন্ডল। সংক্ষিপ্ত পরিচয় পর্বের পরেই হুইসেল হাতে বেরিয়ে গেলেন। সাঈদ স্যার বললেন সবাইকে ষোল কোয়ার্টারের মাঠে যেতে হবে।

“ষোল কোয়ার্টারের মাঠ কোথায়?”
“ষোল কোয়ার্টারের সামনে।“ – পানের সরঞ্জাম গুছাতে গুছাতে কাশেম স্যারের সংক্ষিপ্ত উত্তর।
“ব্যাখ্যা লাগবে দাদাভাই। ষোল কোয়ার্টার কোথায়?”

কাশেম স্যার মুখে আরেকটা পান গুঁজে দিয়ে ষোল কোয়ার্টারের বর্ণনা দিলেন। ঘাঁটির ভেতর এক জায়গায় এক সাথে ষোলটি কোয়ার্টার আছে। সেগুলোর নাম ষোল কোয়ার্টার। তার সামনে একটি বড় মাঠ আছে যেখানে বিমান বাহিনীর জওয়ানরা শরীরচর্চা করে। আমাদের যেতে হবে সেই মাঠে। আরেক জায়গায় নাকি বারোটি কোয়ার্টার আছে। সেগুলোর নাম বারো কোয়ার্টার।

“বারো কোয়ার্টারের সামনেও কি মাঠ আছে?”
“আজাইরা প্রশ্ন করেন ক্যা?” – কাশেম স্যার আমার ‘আজাইরা’ প্রশ্নের উত্তর দিলেন না।

সদলবলে রওনা হলাম ষোল কোয়ার্টারের মাঠের উদ্দেশ্যে। এই মাঠে যেতে হয় সার্জেন্ট মেসের পাশে বড় একটা পুকুরের পাড় ঘেঁষে অনেকটা জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। কাশেম স্যার আর অঞ্জন স্যার হাঁটছেন পাশাপাশি। ধীরে হাঁটার প্রতিযোগিতা হলে এঁরা দুজন তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী হবেন সন্দেহ নেই। জঙ্গলে সাপ আছে কি না জিজ্ঞেস করতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু কাশেম স্যার আজ আমার ‘আজাইরা’ প্রশ্নের উত্তর দেবেন না ঠিক করেছেন। তাই আর প্রশ্ন করলাম না। আমি ভীতু মানুষ। সাপ ব্যাঙ জোঁক ইঁদুর বেড়াল সবকিছুকেই ভয় পাই। এখন শীতকাল – জঙ্গলে সাপ থাকার কথা নয়। তবুও বেশ সাবধানেই হাঁটছি। কাশেম স্যার আর অঞ্জন স্যার সামনে শামুকের গতিতে যাচ্ছেন বলে আমার মনে হচ্ছে অনন্তকাল লেগে যাচ্ছে শাহীন কলেজ থেকে ষোল কোয়ার্টারের মাঠে যেতে।

মাঠটি বেশ বড়। ছেলে-মেয়েরা আমাদের আগেই পৌঁছে গেছে সেখানে। তারা কোন্‌ পথে গিয়েছে কী জানি। বিমান বাহিনীর কয়েকজন কোচ প্যারেডের জন্য আমাদের ছেলে-মেয়েদের বাছাই করতে শুরু করেছেন। হাউজ-টিচাররা সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না আমাকে কী করতে হবে।

“স্যার, আপনার এখানে কাজ কী?” – দেখলাম চারজন ছাত্রী এসে দাঁড়িয়েছে আমার কাছে। চিনতে পারলাম – একজনের নাম নাসরিন, আরেকজন কোহিনুর। বাকিদের নাম জানি না। প্রশ্নটি করেছে নাসরিন।
“আমি ঠিক জানি না এখানে আমার কাজ কী।“
“তাহলে স্যার এখানে আপনার কোন কাজ নেই। আমাদেরও এখানে কোন কাজ নেই। আপনি তো আমাদের একটা ক্লাস নিতে পারেন।“
“এখানে এই মাঠে ক্লাস নেবো?”
“এখানে না স্যার। কলেজে গিয়ে।“
“তোমরা নাসির স্যারকে অথবা সাঈদ স্যারকে বলে অনুমতি নাও। আমার কোন আপত্তি নেই।“
“উনাদের অনুমতি লাগবে স্যার?”
“হ্যাঁ। এই মাঠের পরিচালক তাঁরা।“
“তাহলে তো হবে না স্যার। উনারা বুঝবেন না স্যার আমাদের কথা।“
“কেন? তোমরা কি হিব্রু ভাষায় কথা বলবে নাকি?”

নাসরিন ছাড়া বাকি তিনজন হেসে উঠলো। নাসরিন গম্ভীর। মনে হচ্ছে সে হাসিঠাট্টা বিশেষ পছন্দ করে না। সে আরো গম্ভীর গলায় বললো, “বাংলা ভাষাতেই কথা বলবো। কিন্তু উনারা তো আর্টসের, তাই আমাদের প্রয়োজনটা বুঝতে চাইবেন না।“
“তাহলে উপায় কী?”
“আয়শা ম্যাডামকে বলবো স্যার?”
“বলো। তোমরা অনুমতি পেলে আমার কোন আপত্তি নেই।“
তারা চলে গেলো আয়শা ম্যাডামের খোঁজে।

সারা মাঠে বিভিন্ন ক্লাসের ছেলে-মেয়েরা ছড়িয়ে পড়েছে। কিছুটা মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে অনেকেই। রোদে ঝলমল করছে চারদিক। মাঠের কোথাও কোন ছায়া নেই। একটু পরেই সবাই ক্লান্ত হয়ে যাবে। তখন কোথায় বিশ্রাম করবে বুঝতে পারছি না। অঞ্জন স্যার বললেন, দু’দিন ব্যাপী ক্রীড়ানুষ্ঠান হবে এখানে। ঘাঁটি অধিনায়ক আসবেন। অন্যান্য অফিসাররাও আসবেন। তখন সুন্দর করে সাজানো হবে পুরো মাঠ, সামিয়ানা টানা হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।

শংকর মন্ডলকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে তিনি আজকেই জয়েন করেছেন। মনে হচ্ছে তিনি জানেন তাঁর কাজ কী, এবং কীভাবে তা করতে হয়। কিন্তু আমি এখনো বুঝতে পারছি না আমার কাজ কী। অঞ্জন স্যার হামিদ হাউজের হাউজ-টিচার। তাকে জিজ্ঞেস করলাম আমার কাজ কী। তিনি বললেন, “আপাতত কোন কাজ নেই। স্টুডেন্টদের মধ্য থেকে কয়েকজন লিডার ঠিক করে দিয়েছি। তারা বাছাই করে ফেলবে স্পোর্টসের বিভিন্ন ইভেন্টে কে কে মূল প্রতিযোগিতায় যাবে।“

অঞ্জন স্যার বেশ করিৎকর্মা মানুষ। তাঁর কাছাকাছি ঘাসের উপর বসে আছেন কাশেম স্যার। আমিও বসলাম সেখানে। বিভিন্ন বিষয়ে কথা হচ্ছে। অঞ্জন স্যার বললেন, “শাহীন কলেজের ফিজিক্স ডিপার্টমেন্ট অনেকটা বাঁশখালী নির্ভর হয়ে গেছে।“
“কেন কেন?” আমি আগ্রহী হয়ে উঠি।
“একদম শুরুতে ফিজিক্সের টিচার ছিল দীননাথ। তোমাদের বাঁশখালীর।“
“হ্যাঁ, চিনি তো। তিনি আমাদের গ্রামের।“
“এখন তো সরকারি কলেজে আছে। দীননাথের পরে এলো দেলোয়ার। দেলোয়ারও বাঁশখালীর। এখন আছে ফিনল্যান্ডে। দেলোয়ারের পরে এলেন আয়শা ম্যাডাম।“
“আয়শা ম্যাডামও কি বাঁশখালীর?”
“না না, আয়েশা ম্যাডাম বাঁশখালীর না।“
“তাহলে আর পুরোপুরি বাঁশখালী নির্ভর কীভাবে বলবেন?”
“তা অবশ্য ঠিক। তবে একই প্রতিষ্ঠানে তিন জন ফিজিক্সের টিচার বাঁশখালী থেকে আসা কি কম গুরুত্বপূর্ণ?”
“অঞ্জনদা, আমার সম্পর্কে কী কথা হচ্ছে?” – আয়শা ম্যাডাম এসে দাঁড়িয়েছেন কাছে। সাথে নাসরিনরাও আছে।
“না, দীননাথ আর দেলোয়ার যে বাঁশখালীর তা প্রদীপকে বলছিলাম। আর প্রদীপ জিজ্ঞেস করছিল আপনিও বাঁশখালীর কিনা।“
“আমি বাঁশখালীর হতে যাবো কোন দুঃখে? অঞ্জনদা, প্রদীপ তো আপনার হাউজের। তাকে কি এখানে দরকার আছে?”
“কেন আপা?”
“এখানে দরকার না থাকলে সে সেকেন্ড ইয়ারের স্টুডেন্টদের নিয়ে একটু বসতে পারতো।“
“কোন অসুবিধা নেই আপা। অ্যাই নাসরিন, পরিসংখ্যানের কিছু বাকি থাকলে আমাকে বলবে। আমি সব নোট করে দেবো।“

মনে মনে নাসরিনদের অনেক ধন্যবাদ দিলাম। তাদের কারণে আমি ষোল কোয়ার্টারের মাঠ থেকে আগেভাগে চলে আসার সুযোগ পেলাম। কলেজে এসে তাদের ক্লাস নিলাম। তাদের ফাইনাল পরীক্ষা হতে এখনো অনেক দেরি। কিন্তু তারা এখন থেকেই অস্থির হয়ে আছে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে। আমি যতই বলি তাদের এতটা টেনশান করার কিছু নেই, মনে হয় তাদের টেনশান আরো বেড়ে যায়। তবে তাদের এই এক্সট্রা ক্লাসের কারণে আমি ষোলকোয়ার্টারের মাঠে যাওয়া থেকে রেহাই পেয়েছি।

সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার সবগুলো ইভেন্ট আগে হয়ে যায়। পরে একটা পুরষ্কার বিতরণী ও বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। সাংস্কৃতিক কমিটির হেড রিফাৎ আরা ম্যাডাম ঠিক কী কারণে আবৃত্তিসহ কয়েকটি ইভেন্টের বিচারকের তালিকায় আমার নাম ঢুকিয়ে দিয়েছেন আমি জানি না। পালাবার পথ থাকলে এখান থেকেও আমি পালাতাম। কিন্তু সে সুযোগ না পেয়ে মনে হচ্ছে ভালোই হয়েছে। স্কুলের ছেলে-মেয়েরা যে কত সুন্দর গান করে, আবৃত্তি করে – তা এত কাছ থেকে না দেখলে হয়তো বুঝতেই পারতাম না।

টিচার্স রুমে আসার সময় দেখলাম প্রিন্সিপাল স্যার দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর রুমের সামনে। প্রিন্সিপাল যত দূরেই থাকুন, দৃশ্যমান হলেই সালাম দিতে হয়। আমিও দিলাম। অত দূর থেকে দেয়া সালাম তিনি নিলেন কি না বুঝতে পারলাম না। কিছু না বলে টিচার্স রুমে ঢুকে পড়াটাও কেমন অশোভন দেখায়। কিন্তু কী বলবো? আবার সালাম দেবো? প্রিন্সিপালকে বলার মত আমার কোন কথাই নেই। নাসির স্যার, সাঈদ স্যার, অঞ্জন স্যার যখনতখন প্রিন্সিপালের রুমে গিয়ে কথা বলেন। তাঁরা এত প্রসঙ্গ কোত্থেকে পান? আমি কি স্কোয়ার্ডন লিডার সোবহান সাহেবের খবর নেবো? কিন্তু প্রিন্সিপাল স্যার তো সোবহান সাহেবের উপর বিরক্ত হয়েছিলেন। আবার তাঁর প্রসঙ্গ তুললে যদি আরো বিরক্ত হন? সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে যথাসম্ভব ধীরপায়ে এগোচ্ছি টিচার্সরুমের দিকে। প্রতি মুহূর্তেই আশা করছি প্রিন্সিপাল স্যার নিজের রুমে ঢুকে যাবেন, আর আমি স্বচ্ছন্দে আমার চেয়ারে গিয়ে বসবো। কিন্তু সেরকম কিছু হলো না। টিচার্স রুমের দরজায় পৌঁছে আবার তাকালাম প্রিন্সিপাল স্যারের দিকে। তিনি তাকিয়ে আছেন আমার দিকে।

“আসসালামু-আলাইকুম স্যার।“
“মিস্টার প্রদীপ, প্লিজ কাম হিয়ার।“

মনে মনে বললাম খাইছে আমারে। আবার কী করলাম কী জানি। নিজের উপর রাগ লাগছে। এত ভীতু কেন আমি?
“জ্বি স্যার?”
“আসেন, আপনার সাথে একটা জরুরি কথা আছে। প্লিজ কাম ইন।“
প্রিন্সিপাল স্যারকে অনুসরণ করে ভেতরে ঢুকলাম।
“আপনার বাসা কোথায়?” 

প্রিন্সিপাল স্যারের প্রশ্নে আমি খুব অবাক হয়ে গেলাম। তিনি হঠাৎ আমার বাসা কোথায় জানতে চাচ্ছেন, ব্যাপারটা কী? কেন জানতে চাচ্ছেন সে প্রশ্ন করা যাবে না।

“স্যার, চন্দনপুরা মিয়ার বাপের মসজিদের একটু সামনে গিয়ে আবেদিনের দোকানের গলি দিয়ে ভেতরে ঢুকে সালামের বাসা বললে সবাই দেখিয়ে দেবে।“
“আপনি সালামের বাসায় থাকেন?”
“সালাম সাহেব আমার বাড়িওয়ালা স্যার।“
“রহমতগঞ্জ কোথায় চিনেন?”
“চিনি স্যার।“
“তাহলে আপনি পারবেন। এই চিঠিটা ইন্দ্রানী মুৎসুদ্দীর কাছে পৌঁছে দিতে হবে আজকেই। এটা তাঁর অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার। তিনি অ্যাকসেপ্ট করলে কালকে আমাকে একটু জানাবেন।“
“ঠিক আছে স্যার।“
“থ্যাংক ইউ।“

ইন্দ্রানী মুৎসুদ্দির অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পৌঁছে দেবার দায়িত্ব নিয়ে বেরিয়ে এলাম প্রিন্সিপালের রুম থেকে। কিন্তু ইন্দ্রানী কি আমাকে চিনতে পারবে?

No comments:

Post a Comment

Latest Post

Memories of My Father - Part 6

  The habit of reading books was instilled in us from a young age, almost unknowingly. There was no specific encouragement or pressure for t...

Popular Posts