Saturday 23 May 2020

ছিন্ন পাতার সাজাই তরণী - পর্ব ১৪

14

“হ্যালো মিস্টার প্রদীপ, ভেরি প্লিজড টু মিট ইউ।“

স্কোয়ার্ডন লিডার সোবহানের হাত খুব শক্ত, শিরিষ-কাগজের মত খসখসে। হ্যান্ডশেক করার সময় এমন চাপ দিয়েছেন যে আমার ডান হাতের স্নায়ুগুলো সাময়িকভাবে অকেজো হয়ে গেছে।
“প্লিজ বি সিটেড।“

তিনি আমার হাত ছেড়ে এখন হাত নেড়ে তাঁর পাশের চেয়ারে আমাকে বসতে বলছেন। প্রিন্সিপাল স্যারের দিকে তাকালাম। তিনি হাত দিয়ে টেবিলের ধুলো ঝাড়ার ভঙ্গিতে ইঙ্গিত করছেন সোবহান সাহেবকে নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে যেতে। তাঁর ইঙ্গিত না বোঝার ভান করে এখানেই বসে পড়া যায়। তাতে তাঁর সময় আরো নষ্ট হবে। কিন্তু সোবহান সাহেব চলে যাবার পর প্রিন্সিপাল স্যার সব রাগ উড়াবেন আমার উপর। উর্ধ্বতনের উপর রাগ উঠলে সেই রাগ অধস্তনদের উপর উড়াতে হয়। এটাই প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম।

“টিচার্স রুমে চলেন স্যার। সেখানে বসে কথা বলা যাবে।“ – কোন রকমে বললাম।
“দ্যাট উইল বি বেটার।“ – প্রিন্সিপাল স্যার খুশি হয়ে উঠলেন।
“ও কে, দেন্‌। থ্যাংক ইউ মিস্টার মজিদ।“

সোবহান সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর উচ্চতা পাঁচ-আটের বেশি হবে না। কিন্তু বেশ মোটাসোটা। অফিসারদের মধ্যে এরকম মেদবহুল শরীর খুব একটা দেখা যায় না। মাথার সামনের অংশে প্রশস্ত টাক দৃশ্যমান। কপালের এক পাশে প্রায় তিন ইঞ্চি লম্বা একটি কাটা দাগ – মনে হচ্ছে কেউ দা দিয়ে কোপ মেরেছিল সেখানে।

“মিস্টার প্রদীপ, হোয়াট্‌স ইওর ফুল নেম?” – প্রিন্সিপালের রুম থেকে বেরিয়ে বারান্দায় পা দিয়েই জিজ্ঞেস করলেন সোবহান সাহেব।

“প্রদীপ দেব।“
“দেব? হিন্দু?”
“কোন সমস্যা আছে তাতে?”

আমার গলায় হয়তো সামান্য বিরক্তির আভাস ধরতে পারলেন সোবহান সাহেব। বললেন, “নো, নো প্রোবলেম এট অল। আমি আপনাকে খ্রিস্টান মনে করেছিলাম। আমার ব্যাটম্যানের নাম প্রদীপ রোজারিও। সে খ্রিস্টান।“

শুধুমাত্র চেহারা দেখে মানুষের ধর্ম কীভাবে বুঝে নেয়া যায় আমি জানি না। সোবহান সাহেব তাঁর ব্যাটম্যানের নামের সাথে আমার নামের মিল দেখেই ধরে নিলেন আমি তাঁর ব্যাটম্যানের আত্মীয়! এই আধুনিক যুগে অফিসারদের ‘ব্যাটম্যান’ থাকার ব্যবস্থাটাই তো কেমন যেন প্রভু-ভৃত্য টাইপের বলে মনে হয়।

সামরিক বাহিনীর মধ্যে ব্যাটম্যান-ব্যবস্থা সম্পর্কে জেনেছি মাত্র কিছুদিন আগে। টিচার্স রুমে কোন একটা প্রসঙ্গে সাঈদ স্যার বলছিলেন, “অফিসাররা আমাদেরকে তাদের ব্যাটম্যান বলে মনে করে।“ টিভিতে ব্যাটম্যান কার্টুন দেখেছি। অনেকটা সুপারহিরো টাইপ এই ব্যাটম্যান অসাধ্য-সাধন করতে পারে। অফিসাররা টিচারদের ব্যাটম্যান মনে করলে তো ভালোই। বললাম, “তাহলে তো স্যার অফিসাররা আমাদের সুপারহিরো মনে করেন।“ আমার কথা শুনে সাঈদ স্যার, অঞ্জন স্যার আর ছোলাইমান স্যার একযোগে হেসে উঠেছিলেন। সাঈদ স্যার বলেছিলেন, “আরে তুমি যে ব্যাটম্যান ভাবছো এ ব্যাটম্যান সে ব্যাটম্যান নয়। প্রত্যেক অফিসারের ব্যক্তিগত কাজ করার জন্য, জামা-জুতা ঠিক করে রাখার জন্য, ব্যাগ বহন করার জন্য একজন করে ব্যাটম্যান থাকে। ব্যাটম্যানদের বলা চলে অফিসারদের ব্যক্তিগত ভৃত্য।“ 

সাঈদ স্যার ইতিহাসের অধ্যাপক। সবকিছুর ইতিহাস তাঁর জানা। তাঁর কাছে জেনেছি ইওরোপিয়ানরা যখন ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ করতো – তখন অশ্বারোহী অফিসারের ঘোড়ার জিন বহন করার জন্য, ঘোড়ার সেবাযত্ন করার জন্য একজন নিম্নপদস্থ লোক নিয়োগ করা হতো। সেই লোক অফিসারের ফাই-ফরমাশ খাটতো, সামরিক পোশাকের দেখাশোনা করতো। অফিসার যখন কাউকে কোন খবর পাঠাতে চাইতেন – তার ব্যাটম্যান দৌড়ে গিয়ে তার চিঠি বা খবর পাঠিয়ে দিয়ে আসতো। তখন তো টেলিফোন বা এরকম কোন যোগাযোগব্যবস্থা ছিল না। সেই তখনকার যুগের পদ এখনো রয়ে গেছে। এখনকার আধুনিক অফিসাররাও ব্যাটম্যানদের দিয়ে জুতা পালিশ করান, ব্যাগ বহন করান।

সোবহান সাহেব সম্ভবত বুঝতে পেরেছেন যে ব্যাটম্যানের প্রসঙ্গ উল্লেখ করাটা ঠিক হয়নি। তিনি কথা ঘোরানোর চেষ্টা করলেন।

“আপনি কি প্রফেসর জি সি দেবের আত্মীয়?”
ব্যাটম্যানের সাথে তুলনা করার ক্ষতিপূরণ প্রফেসর জি সি দেবের সাথে তুলনা। আমি বললাম, “না। কেন?”
“নামের মিল আছে তো তাই মনে হলো।”
 “আপনি কি আমাদের ফারুকী স্যারের আত্মীয়?”
“কোন্‌ ফারুকী স্যার?”
“আবদুস সোবহান ফারুকী স্যার। আমাদের গণিতের অধ্যাপক।“
“না, আমি তো তাঁকে চিনিও না। হোয়াই ইউ আস্কিং?”
“আপনাদের নামের মিল আছে তো তাই।“
“ওহ্‌ আই সি।“

তিনি রেগে গেলেন কি না বুঝতে পারলাম না। যদি রেগে যান তাহলে আমার খবর আছে। সামরিক বাহিনীর অফিসারদের সাথে হাসিঠাট্টা করা আর গোখরো সাপের লেজ দিয়ে কান চুলকানো একই রকম বিপজ্জনক। তবে সাঈদ স্যারের মতে বিমান বাহিনীর অফিসাররা নির্বিষ। কারণ তাঁরা নাকি আগ্নেয়াস্ত্র বহন করেন না।

টিচার্স রুমে ঢুকে দেখলাম সবাই ব্যস্ত যার যার টেবিলে। টিফিন আওয়ার চলছে। আমার সিটে নিয়তিদির রেখে যাওয়া সিঙাড়া দুটো চুপচাপ অপেক্ষা করছে। একজন মোটাসোটা অফিসারকে রুমে ঢুকতে দেখে সবাই একটু অবাক হয়ে গেলেন। অফিসাররা সাধারণত টিচার্স রুমে ঢুকেন না। কলেজে এসেই তাঁরা সরাসরি প্রিন্সিপালের রুমে গিয়ে বসেন। প্রিন্সিপালের সাথে কথা বলেই তাঁরা চলে যান। আর যদি ম্যানেজিং কমিটির কোন অফিসার আসেন এবং টিচারদের সাথে কথা বলতে চান তাহলে প্রিন্সিপাল স্যারও আসেন সেই অফিসারের সাথে।

সবাই চুপচাপ তাকিয়ে আছেন দেখে বললাম, “ইনি স্কোয়াড্রন লিডার সোবহান সাহেব। স্যারদের সাথে পরিচিতি হতে এসেছেন।“
“আসেন স্যার, বসেন“ - অঞ্জন স্যার উঠে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা করলেন। সোবহান সাহেব আমার সিটে বসে পড়লেন। অঞ্জন স্যার আমার জন্য রাখা সিঙাড়া দুটো সোবহান সাহেবের দিকে এগিয়ে দিয়ে হাসিমুখে বললেন, “নাস্তা করেন স্যার।“

আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু প্রকাশ করার উপায় নেই। আশা করেছিলাম অফিসার সাহেব সিঙাড়া প্রত্যাখ্যান করবেন। কিন্তু না, তিনি আমার চেয়ারে আরাম করে বসে আমারই সিঙাড়া আগ্রহভরে খেতে শুরু করলেন।

“সিঙাড়ার ফুড ভ্যালু কিন্তু খুব ভালো। ইউ ক্যান সে ইট্‌স আ টোটাল ফুড।“

টোটাল ফুড খেতে খেতে প্রায় চোখ বন্ধ করে ফেলছেন সোবহান সাহেব। এত আরাম করে সিঙাড়া খেতে আর কাউকে দেখিনি আমি। প্রতিদিনই টিফিনে সিঙাড়া নিয়ে আসেন নিয়তিদি। আর আমরা ওগুলো খাবার সময় এমন ভাব করি যেন জেনেশুনে বিষ খাচ্ছি। বিমল স্যার তো নিয়তিদিকে প্রায়ই বলেন, “তোমার সিঙাড়া খেতে খেতে আমার গ্যাস্ট্রিক হয়ে যাচ্ছে নিয়তি।“ অথচ আজ একজন স্কোয়ার্ডন লিডার সার্টিফিকেট দিচ্ছেন যে সিঙাড়া টোটাল ফুড – অর্থাৎ সিঙাড়া খেলে আর কিছু খেতে হবে না।

আমাদের টেবিলে একটি চেয়ারও খালি নেই। খান সাহেবদের টেবিলে কামরুজ্জামান স্যারের চেয়ারটা খালি। টিফিন আওয়ারে কামরুজ্জামান স্যারকে বাইরে ব্যস্ত থাকতে হয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য। আমি কামরুজ্জামান স্যারের চেয়ারে বসতে যাচ্ছিলাম – সুচরিত স্যার বললেন, “আপনি এখানে বসেন। আমাকে বিতর্কের রিহার্সাল করাতে হবে।“

“এক্সকিউজ মি স্যার, আই হ্যাভ টু গো।“ – বলে অফিসারের কাছ থেকে কী সুন্দরভাবে বিদায় নিলেন সুচরিত স্যার। এমন মোলায়েম ইংরেজি কায়দা তিনি কোথায় শিখেছেন কে জানে।

সুচরিত স্যার চলে গেলেন। আমি তাঁর চেয়ারে বসে সোবহান সাহেবের মুখোমুখি হলাম।
“সিঙাড়াকে কেন টোটাল ফুড বললাম জানেন? সিঙাড়াতে কী কী আছে? বাইরের আবরণটা ময়দার তৈরি। মানে কার্বোহাইড্রেট। তারপর ভেতরে আছে আলু, পেয়াজ, কাঁচা মরিচ ইত্যাদি। পেয়াজে আছে পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ভাইটামিন সি, ক্যালসিয়াম। কাঁচা মরিচে আছে প্রচুর ভাইটামিন সি। আলুতে আছে গুড কার্বোহাইড্রেট, ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন, ভাইটামিন সি, ভাইটামিন বি। এটাকে তেলে ভাজা হয় – সেখান থেকে আসে ফ্যাট।“
“তাহলে তো আমাদের তিন বেলা সিঙাড়া খেলেই হয়।“
“তা তো অবশ্যই হয়। সিঙাড়ার ভেতর আলুর সাথে মাংসের টুকরাও দিতে পারেন। তাহলে প্রোটিনও পেয়ে যাবেন সেখানে।“
“আর দুটো সিঙাড়া আনতে বলি স্যার?” – অঞ্জন স্যার জিজ্ঞেস করলেন।
“নো নো নো, থ্যাংক ইউ।“
“আমাকে যেতে হচ্ছে স্যার, ক্লাস আছে।“ – বলে অঞ্জন স্যার চলে গেলেন। বিমল স্যার, ফারুকী স্যার, ছোলাইমান স্যারও বের হয়ে গেলেন। আমার ক্লাস থাকলে আমিও বের হয়ে যেতাম।

“কোয়ান্টাম থিওরি সম্পর্কে আপনার কোন ধারণা আছে?” – সিঙাড়ার পুষ্টিগুণ থেকে পদার্থবিজ্ঞানের দিকে ফিরলেন সোবহান সাহেব।

কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল প্রোবলেম নিয়ে মাস্টার্সে থিসিস করেছি আমি। তাই কোয়ান্টাম থিওরি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা তো আছেই। কিন্তু সোবহান সাহেবের ধারণা কতটুকু তা না জানলে তো কোয়ান্টাম মেকানিক্স নিয়ে একাডেমিক আলোচনা সম্ভব নয়। আমি কিছু বলার আগেই সোবহান সাহেব হঠাৎ বলে উঠলেন, “হ্যালো হ্যালো, আপনাকে কোথায় যেন দেখেছি আমি।“

দেখলাম সাঈদ স্যারকে উদ্দেশ্য করেই কথাগুলো বললেন তিনি। সাঈদ স্যার রুম থেকে চুপচাপ বের হয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁকে দেখেই প্রশ্নটা করলেন সোবহান সাহেব। সাঈদ স্যার বললেন, “আমাকে স্যার?”
“ইয়েস। এয়ারপোর্ট মার্কেটে আপনার শপ আছে না? আই হ্যাভ সিন ইউ দেয়ার ডে বিফোর ইয়েস্টার ডে। রাইট?”

সাঈদ স্যার যে অধ্যাপনার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যও করেন তা আমার জানা ছিল না। তিনি হাসিমুখে বললেন, “জ্বি স্যার, রাইট স্যার। আপনি তো স্যার রিসেন্টলি ট্রান্সফার হয়েছেন মনে হয়।“
“ইয়েস। যশোর থেকে। ইন ফ্যাক্ট গত সপ্তাহে এসেছি। এখানে এসেছি প্রিন্সিপালের সাথে দেখা করতে। আপনাদের সাথেও দেখা করে গেলাম। আমার মেয়ে ক্লাস এইটে ভর্তি হবে এখানে। খুবই ব্রিলিয়্যান্ট স্টুডেন্ট। আই টেল ইউ – শি ইজ এক্সট্রা-অর্ডিনারি। ব্রিলিয়্যান্ট স্টুডেন্টের জন্য দরকার হয় ব্রিলিয়্যান্ট টিচার। কিন্তু ব্রিলিয়্যান্ট টিচার – ভেরি হার্ড টু গেট ওয়ান। সামটাইম্‌স ব্রিলিয়্যান্ট স্টুডেন্টস ফিল সো ডিসাপয়েন্টেড হোয়েন দে গেট মিডিওকার টিচার্স।“

সাঈদ স্যার মুখটা হাসি হাসি করে রুম থেকে বের হয়ে গেলেন। সোবহান সাহেব ইংরেজিতে যা বললেন তার বাংলা অনুবাদ করে যেটুকু বুঝতে পারলাম তাতে শিক্ষক হিসেবে কিছুটা অস্বস্তি লাগছে। তাঁর ক্লাস এইট পড়ুয়া কন্যা এতই মেধাবী যে তিনি শংকিত হয়ে পড়েছেন যে তাকে পড়ানোর উপযুক্ত শিক্ষক এই প্রতিষ্ঠানে আছে কি না! তবে ক্লাস এইট শুনে কিছুটা হাল্‌কাও লাগছে এই ভেবে যে সমস্যাটি সরাসরি আমার উপর এসে পড়বে না। আমাকে নিশ্চয় ক্লাস এইটে পড়াতে হবে না। একাদশ বা দ্বাদশ শ্রেণি হলে আমার বারোটা বেজে যেতো। কী অদ্ভুত আমাদের চিন্তাভাবনা। যে কোন সমস্যায় আগে চিন্তা করি আমার ব্যক্তিগত কোন অসুবিধা হবার সম্ভাবনা আছে কি না। না থাকলে সে সমস্যা মুহূর্তেই গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে।

“বললেন না তো, কোয়ান্টাম মেকানিক্স সম্পর্কে আপনার কি কোন ধারণা আছে?” – সোবহান সাহেব আবার প্রশ্ন করলেন। এই মানুষটি যতই মোটাসোটা হোন – তাঁর বুদ্ধি যে খুব সূক্ষ্ম তাতে কোন সন্দেহ নেই। প্রসঙ্গ বদল হলেও তিনি মূল প্রসঙ্গ ভুলে যাননি।

“কয়েক বছর কোয়ান্টাম মেকানিক্স পড়েছি অনার্সে ও মাস্টার্সে। সুতরাং কিছুটা ধারণা আছে। আপনার কীরকম ধারণা আছে?”
“আমারও কিছুটা ধারণা আছে। তবে এ সম্পর্কে আমার কোন একাডেমিক পড়াশোনা নেই। আমি মহাজাতকের কোয়ান্টাম মেথড বইটা পড়েছি। হোয়াট এ ব্রিলিয়্যান্ট রাইটিং, ব্রিলিয়্যান্ট এক্সপ্লেনেশান অব মাইন্ড!” – কোয়ান্টাম মেথড বইয়ের মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে গিয়ে সোবহান সাহেবের চোখদুটো হাসের ডিমের মতো বড় হয়ে যাচ্ছে। সোবহান সাহেবের ‘ব্রিলিয়্যান্ট’ মানে যে কী তা কিছুটা আন্দাজ করতে পারছি।

মহাজাতকের কোয়ান্টাম মেথডের সাথে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের কোন সম্পর্ক নেই, ধরতে গেলে প্রকৃত বিজ্ঞানেরই কোন সম্পর্ক নেই। মানুষের মানসিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানের নামে অপবিজ্ঞান গিলিয়ে কাড়ি কাড়ি টাকা উপার্জন করছে পৃথিবীর অনেক মানুষ। এই মানুষগুলো খুবই সংঘবদ্ধ। এরা জানে কীভাবে ব্যবসা করতে হয়। মহাজাতকের কোয়ান্টাম মেথড বইটা প্রকাশিত হয়েছে মাত্র কিছুদিন আগে। প্রত্যেকটা জাতীয় দৈনিকে বিরাট বিরাট বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রচার করা হচ্ছে এই বইটার। দাবি করা হচ্ছে এই বই পড়েই মানুষ জেনে যাবে জীবনে সাফল্য, শান্তি, প্রাচুর্য কীভাবে আসবে। মানুষের জীবনে প্রাচুর্য আসবে কি আসবে না জানি না, এই বইয়ের লেখকের জীবনে যে প্রাচুর্য আসবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ টাকা উপার্জনের ফন্দি-ফিকির এরা ভালোভাবেই জানে।

সোবহান সাহেব ‘কোয়ান্টাম মেথড’ বইটাকে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের বৈজ্ঞানিক পুস্তক বলে মনে করছেন। তাঁর সাথে আমি কীভাবে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মূল বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো? আমি যদি বলি যে তিনি ভুল করছেন – তাহলে তাঁর আঁতে ঘা লাগবে। ধনে বা ক্ষমতায় কিংবা পদমর্যাদায় যারা বড় – তাঁদের ভুল কেউ ধরিয়ে দিলে তাঁদের আত্মমর্যাদা মারাত্মকভাবে আহত হয়। শুনেছি সামরিক বাহিনীতে কোন জুনিয়র তাদের সিনিয়রের ভুল ধরিয়ে দিতে পারেন না। কর্মক্ষেত্রেও নাকি সেরকম নিয়ম আছে। প্রিন্সিপাল ভুল করলে আমি সরাসরি বলতে পারবো না যে তিনি ভুল করছেন।
 
রাজনৈতিক নেতা বা ধর্মীয় গুরুদের ক্ষেত্রে তো আরো প্রকট এই সমস্যা। সেখানে কেউ যদি নেতা বা গুরুর সমালোচনা করে তাদের জ্বি-হুজুরমার্কা চেলারা সমালোচনাকারীর হাড্ডি গুড়ো করে ফেলবে। শুধুমাত্র বিজ্ঞানে এরকম কোন ব্যাপার নেই। সেখানে আইনস্টাইনও সমালোচনার উর্ধ্বে নন। স্টিফেন হকিং-এর ভুল কেউ ধরিয়ে দিলে স্টিফেন হকিং-এর চেলারা এসে চড়াও হবে না।

“কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সাথে কোয়ান্টাম মেথডের কোন সম্পর্ক নেই স্যার।“ – গলা নামিয়ে বেশ স্পষ্টভাবেই বললাম।
“আপনি কি বইটা পড়েছেন?”
“জ্বি, আমি কোয়ান্টাম মেকানিক্সও পড়েছি, কোয়ান্টাম মেথডও পড়েছি। আপনি সম্ভবত কোয়ান্টাম মেকানিক্সের কোন বই পড়েননি।“
“সেটা অবশ্য ঠিক। আমি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের কোন বই পড়িনি। আপনার কি মনে হয়, আমার কোয়ান্টাম মেকানিক্স পড়া উচিত?”
“আপনি যদি কোয়ান্টাম মেকানিক্স সম্পর্কে আগ্রহী হন, তাহলে তো আপনাকে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের বইই পড়তে হবে স্যার। কোয়ান্টাম মেথড পড়ে আপনি কোয়ান্টাম মেকানিক্স সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাবেন না। কোয়ান্টাম মেথডে ধ্যানমগ্ন হয়ে প্রশান্তি লাভ করা যায়, কিন্তু ধ্যানমগ্ন হয়ে স্বপ্নের মধ্যে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জ্ঞানলাভ করা যায় না।“
“স্বপ্নের কথা যখন বললেন, আপনাকে একটা ব্যাপার জানিয়ে রাখি। আমি কিন্তু স্বপ্নে অনেক জিনিস আগে থেকে দেখতে পাই।“
“তাই নাকি? কী কী দেখতে পান?” – আমি আগ্রহী হয়ে উঠি।
“আমার মেয়েটি জন্মাবার আগে আমি স্বপ্ন দেখলাম যে আমার একটি মেয়ে হবে। আমার স্ত্রীকে বলেছিলাম দেখো মেয়ে হবে। সে ছেলে চেয়েছিল। কিন্তু আমার স্বপ্ন অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেল।“
“আপনি মনে মনে যেটা কল্পনা করেছিলেন সেটাই আপনি স্বপ্নে দেখেছিলেন।“
“কিন্তু আমি তো কল্পনা করিনি যে আমার মেয়ের এক হাতে ছয়টি আঙুল থাকবে। কিন্তু আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম মেয়ের হাতে ছয়টি আঙুল। জন্মাবার পরে দেখলাম মেয়ের হাতে ঠিকই ছয়টি আঙুল। বাম হাতের বুড়ো আঙুলের পাশে আরেকটি আঙুল।“

পৃথিবীতে হাতে-পায়ে এক্সট্রা আঙুল নিয়ে জন্মানো শিশুর সংখ্যা অনেক। এটা কোন অতিপ্রাকৃত ঘটনা নয়। জিজ্ঞেস করলাম, “মেয়ের হাতে যে ছয়টি আঙুল থাকবে তা মেয়ের জন্মের আগে কাউকে বলেছিলেন?”
“না, শুনে মন খারাপ করবে – তাই কাউকে বলিনি।“
“কোথাও লিখে রেখেছিলেন? ডায়েরিতে কিংবা আর কোথাও?”
“না, কোথাও লিখেও রাখিনি। কিন্তু আমার স্পষ্ট মনে আছে।“
“আপনার মনে হচ্ছে আপনি স্বপ্নে দেখেছিলেন। আসলে আমাদের মন অনেক সময় বাস্তবের অনেক ঘটনাকে স্বপ্নের সাথে গুলিয়ে ফেলে।“
“আপনি কি বলতে চান আমি বানিয়ে বানিয়ে বলছি?” – কিছুটা ক্রোধের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে স্কোয়ার্ডন লিডারের গলায়। কথা বলার সময় আমি হঠাৎ ভুলে গিয়েছিলাম কার সাথে কথা বলছি। এখানে কিছুটা ‘জ্বি হুজুর’ টাইপের কথাবার্তা বলা উচিত ছিল আমার। এখন ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে হবে। বললাম, “না স্যার, আপনি মোটেও বানিয়ে বলছেন না। আপনি স্বপ্নের কথা বলছেন। স্বপ্ন দেখা যায়, বানানো যায় না। আপনি নিশ্চয় দেখেছিলেন আপনার মেয়ের হাতে ছয়টি আঙুল আছে। আর কিছু কি দেখেছিলেন স্যার?”

সোবহান সাহেব সম্ভবত বুঝতে পেরেছেন যে তাঁর স্বপ্নের কথা আমি বিশ্বাস করছি না। তাঁর শ্যামলা মুখ রাগে থমথম করছে। বললেন, “এটা কি দেখতে পাচ্ছেন?”
“কোন্‌টা স্যার?”
“এই যে আমার কপালের এই কাটা দাগটা?”

বুঝতে পারছি এই দাগের সাথেও তাঁর স্বপ্নের কোন ব্যাপার জড়িয়ে আছে। কিছু না বলে তাকিয়ে থাকলাম তার কপালের দিকে।

“এটা যে ঘটবে সেটাও আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম। তখন আমি ফ্লাইং অফিসার। আমি দেখেছিলাম যে আমার প্র্যাকটিস প্লেন ক্রাশ করবে। আমি মারা যাবো।“
“কিন্তু ব্যাপারটা তো ঘটেনি স্যার।“
“কে বললো ঘটেনি? ইট হ্যাপেন্ড। মাই প্লেন ওয়াজ ক্রাশড। তার চিহ্ন এটা।“ কপালের কাটা দাগে আঙুল ঠেকিয়ে বললেন সোবহান সাহেব।

বলতে চাচ্ছিলাম, আপনি তো স্বপ্নে দেখেছিলেন যে মারা গেছেন। কিন্তু আপনি তো মারা যাননি। কোন রকমে চেপে গেলাম। কারণ তিনি যদি হঠাৎ দাবি করে বসেন যে তিনি আসলে মারা গিয়েছিলেন – তাহলে তো বিপদে পড়ে যাবো। পুরো ব্যাপারটাই তখন এক্স-ফাইলের কোন ঘটনা বলে মনে হবে।

একজন স্কোয়ার্ডন লিডার কী কারণে এতক্ষণ ধরে অহেতুক কলেজে সময় কাটাচ্ছেন বুঝতে পারছি না। সিক্সথ পিরিয়ডে আমার একটা ক্লাস আছে সেকেন্ড ইয়ারের সাথে। রিভিশান ক্লাস। তার আগে সোবহান সাহেবকে বিদায় করতে হবে। খান সাহেবের কাছে গছিয়ে দিয়ে চলে যাবো নাকি? কিন্তু খান সাহেব বাথরুমে ঢুকে গেছে একটু আগে।

কী করা যায়? মনে হচ্ছে স্বপ্ন দেখার ব্যাপারটাকে তিনি তাঁর একটা আলাদা ক্ষমতা বলে মনে করছেন। এই ক্ষমতাকে একটু গুরুত্ব দিলে মনে হয় তিনি খুশি হবেন।

“এটা একটা আশ্চর্য ক্ষমতা স্যার আপনার। স্বপ্নে আপনি ভবিষ্যত দেখতে পান। আমার ভবিষ্যতের ব্যাপারে যদি কিছু দেখতে পান, কাইন্ডলি জানাবেন স্যার।“
“ও শিওর।“
“থ্যাংক ইউ স্যার। আপনার সাথে কথা বলে খুবই আনন্দ পেলাম স্যার। কত কিছু জানেন স্যার আপনি। কত কিছু শিখলাম আজ। সিঙাড়া যে টোটাল ফুড সেটা জানতামই না।“  - বলতে বলতে মনে হলো আমি কি তাঁকে তৈলমর্দন করতে শুরু করেছি?

“মে আই ইউজ ইওর বাথরুম?”
“এই বাথরুমটা স্যার এনগেজড। প্রিন্সিপাল স্যারের বাথরুম ইউজ করতে পারেন স্যার।“
“ওকে।“

তাঁকে সাথে নিয়ে প্রিন্সিপাল স্যারের রুমের দিকে চললাম। প্রিন্সিপাল স্যারের দরজায় লাল ট্রাফিক লাইট জ্বলছে। কিন্তু রেড লাইটের নিষেধাজ্ঞা অফিসারদের না মানলেও চলে। স্কোয়ার্ডন লিডার সোবহান প্রিন্সিপাল স্যারের রুমে ঢুকে যেতেই আমি প্রায় দৌড়ে চলে গেলাম কলেজের বারান্দা পেরিয়ে একেবারে অন্য কোণায়। সোবহান সাহেব কিংবা প্রিন্সিপাল স্যার আপাতত আমাকে আর খুঁজে পাবেন না।

“এই যে প্রদীপ, আসেন, ভেতরে আসেন।“ – নাসরীন ম্যাডামের গলা। বারান্দার শেষ প্রান্তের এই রুমে যে বিতর্কের রিহার্সাল চলছে আমি জানতাম না। সেই যে পিকনিকে গিয়ে রিফাৎ আরা ম্যাডাম স্ক্রিপ্ট লিখতে বলার পর আমি পালিয়ে এসেছিলাম, তারপর বিতর্ক থেকে একপ্রকার পালিয়ে বেড়াচ্ছি। সেই থেকে রিফাৎ আরা ম্যাডাম আমার সাথে আর একবারও কথা বলেননি। এখন নাসরীন ম্যাডামের ডাক উপেক্ষা করে পালাবার কোন পথ নেই। সোবহান সাহেবের সাথে স্বপ্নের কথাবার্তা বলার চেয়ে এখানে বিতর্কের দর্শক হওয়া অনেক ভালো।

আদেল, শাহেদা আর পাপ্পুকে নিয়ে বিতর্কের টিম। আদেল প্রথম বক্তা। তার স্ক্রিপ্ট মুখস্থ হয়নি এখনো। রিফাৎ আরা ম্যাডাম, নাসরীন ম্যাডাম, সুচরিত স্যার অনেক পরিশ্রম করছেন এদেরকে নিয়ে। হোসনে আরা ম্যাডামও রুমে আছেন। রিফাৎ আরা ম্যাডাম গম্ভীরভাবে একটু তাকালেন আমার দিকে, কিন্তু কিছু বললেন না। আমি চুপচাপ কিছুক্ষণ তাদের বিতর্ক শুনলাম। আদেল প্রথম বক্তা। যেহেতু তারা প্রস্তাবের পক্ষে বলবে, সেহেতু তাকে কোন যুক্তিখন্ডন করতে হবে না। কিন্তু দ্বিতীয় বক্তাকে বিপক্ষের প্রথম বক্তার যুক্তিখন্ডন করতে হবে। বিতর্কের স্ক্রিপ্ট টিচাররা লিখে মুখস্থ করিয়ে দিলেও এই যুক্তিগুলো তাৎক্ষণিকভাবে তাদেরই খন্ডাতে হবে। কারণ অন্য পক্ষের স্ক্রিপ্টে কী থাকবে তা যেমন আমরা জানি না, আমাদের স্ক্রিপ্টেও কী থাকবে তা তারা জানে না। এখানেই আসে বিতার্কিকের নিজস্বতার প্রশ্ন। এই প্রস্তুতিটা নেয়ার জন্য বিপক্ষের সম্ভাব্য যুক্তিগুলো বিবেচনা করে দেখতে হবে। তাদের বক্তব্য শুনতে শুনতে ভাবছিলাম আমি বিপক্ষে থাকলে কী কী যুক্তি দিতাম। আদেলের অংশটা শেষ হবার পর আমি কয়েকটি পয়েন্ট বললাম। কিশোর অপরাধ দমনে পরিবারের ভূমিকা প্রধান নয় সেটাই প্রমাণ করতে চাইবে বিপক্ষের দল। তারা বলতে চাইবে পরিবারের ভূমিকা আছে সত্য, কিন্তু তা প্রধান নয়। তাহলে প্রধান কী? রাষ্ট্র, শিক্ষাঙ্গন, সমাজ ইত্যাদি বলবে। প্রমাণ করতে চাইবে কিশোররা কতক্ষণ পরিবারে থাকে ইত্যাদি। এরকম কয়েকটা পয়েন্ট বলার পর দেখলাম রিফাৎ আরা ম্যাডামের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা। মনে হলো তিনি মনে মনে বলছেন, এবার কোথায় পালাবি শয়তান? নিজের যুক্তির জালে নিজেই ধরা পড়তে এসেছিস এখানে। কিন্তু মুখে একটা শব্দও তিনি করলেন না। একটা জলজ্যান্ত মানুষকে এরকম নিঃশব্দে উপেক্ষা করতে পারার ক্ষমতা সবার থাকে না। প্রিন্সিপাল স্যারের উচিত ছিল সোবহান সাহেবকে রিফাৎ আরা ম্যাডামের হাতে ছেড়ে দেয়া।

শাহেদা আর পাপ্পু আমার পয়েন্টগুলো দ্রুত লিখে নিলো। আদেলের যুক্তি খন্ডন করতে হবে না দেখে সে কিছুই লিখলো না। এবার রিফাৎ আরা ম্যাডাম বললেন, “এখানে টিম-ওয়ার্কের ব্যাপারটা তোমাদের মাথায় রাখতে হবে। বিপক্ষ যখন যুক্তি দেখাবে সাথে সাথে তোমরা তা টুকে নিয়ে পাল্টা-যুক্তি কী দেয়া যায় সে সম্পর্কে একে-অপরকে সাহায্য করবে।“ কীভাবে যে এই শিক্ষকরা বিতার্কিকদের তৈরি করছেন তা নিজের চোখে না দেখলে বুঝতেও পারতাম না। টেলিভিশনের বিতর্কগুলো যখন দেখতাম – আমার মনে হতো তারা তাৎক্ষণিকভাবেই সব বলছে। কত দীর্ঘ অনুশীলনের ফলে যে এই তাৎক্ষণিকতার ক্ষমতা তৈরি হয় তা এখানে না দেখলে বুঝতেই পারতাম না। ক্লাসের সময় হওয়াতে চলে এলাম।

ছুটির পর বারান্দায় দাঁড়িয়ে কামরুজ্জামান স্যার ফিসফিস করে বললেন, “আপনাকে একটা কথা বলি। কাউকে বলবেন না।“
“গোপন কথা হলে বলবেন না। আমি কথা গোপন রাখতে পারি না।“
“আমি আপনাকে কথাটা বলবো। কথাটা গোপন রাখতেও বলবো। এখন সেটা রাখা না রাখা আপনার ব্যাপার।“
“আমাকে কেন বলবেন?”
“আমার ইচ্ছা।“
“ঠিক আছে, বলেন।“
“আমি রিজাইন করেছি।“
“গোপন কথাটা বলেন।“
“এটাই তো গোপন কথা।“
“এটা গোপন কথা হয় কীভাবে? আপনি তো রিজাইন করেছেন গত পরশু। দু’মাস পরে আপনি নতুন স্কুলে জয়েন করবেন।“
“আপনি কীভাবে জানলেন?” – কামরুজ্জামান স্যার কিছুটা অবাক এবং হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
“এটাতো সবাই জানে। আপনি অফিসে পদত্যাগপত্র জমা দেবেন, আর সেটা কেউ জানবে না তা কি হয়? কথাটা কি এখনো গোপন রাখতে হবে?”
“না, সবাই যখন জেনে গেছে, আর গোপন থাকলো কোথায়?” – মন খারাপ করে চলে গেলেন কামরুজ্জামান।

গত পরশু টিচার্স রুমে সাঈদ স্যার বেশ নাটকীয়ভাবেই বলেছিলেন, “কামরুজ্জামানের গুনাহ মাফ হয়ে গেছে। সে অন্য জায়গায় চাকরি পেয়ে গেছে। আজ সকালে রিজাইন লেটার জমা দিয়েছে সে।“  কামরুজ্জামান সেই সময় রুমে ছিলেন না।

কাইয়ুম স্যার চলে যাবার সময়েও সাঈদ স্যার বলেছিলেন যে তাঁর পাপখন্ডন হয়েছে। এই কলেজে চাকরি করাটাকে কেন পাপের শাস্তি বলে বিবেচনা করা হয় আমি এখনো বুঝতে পারছি না। সাঈদ স্যারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম।

তিনি বলেছিলেন, “একটা গল্প বলি শোন। দুই বন্ধু ওয়াদা করেছিল সুখে দুঃখে জনমে মরণে একে অন্যের পাশে থাকবে। পৃথিবীতে মোটামোটি একে অন্যের পাশে ছিল। একদিন তাদের একজন মরে গেলো। মৃত্যুর পর সে স্বর্গে গেল না নরকে গেল তা অন্য বন্ধু জানতে পারলো না। কিছুদিন পরে সেও মারা গেল। তার কাজকর্ম অনুযায়ী সে স্বর্গে স্থান পেলো। স্বর্গে গিয়ে কিছুদিন সে স্বর্গের সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে করতে কাহিল হয়ে গেল। তখন তার বন্ধুর কথা মনে পড়লো। ভাবলো বন্ধুও স্বর্গে আছে। কিন্তু স্বর্গের কোথাও তাকে দেখতে না পেয়ে খুব চিন্তিত হয়ে পড়লো। স্বর্গের রেজিস্ট্রারের কাছে গিয়ে খবর নিলো বন্ধু কোথায় আছে। জানা গেল বন্ধু আছে নরকে। এখন বন্ধুর জন্য তার প্রাণ কেঁদে উঠলো। কথা ছিল মরণের পরেও একে অন্যের পাশে থাকবে। অথচ তার বন্ধু নরকে কষ্ট করছে আর সে এখানে স্বর্গসুখ ভোগ করছে। সে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে আবেদন করলো তার বন্ধুকেও স্বর্গে নিয়ে আসার জন্য। কিন্তু কর্তৃপক্ষ জানালো তা সম্ভব নয়। নরক থেকে কেউ স্বর্গে আসতে পারে না। তবে স্বর্গ থেকে কেউ চাইলে নরকে গিয়ে থাকতে পারে। বন্ধুটি চাইলে স্বর্গ থেকে নরকে চলে যেতে পারে। কিন্তু নরকযন্ত্রণা অসহ্য। বন্ধুটি বুঝতে পারছে না কী করবে। বন্ধুর জন্য প্রাণও কাঁদছে, আবার নরকযন্ত্রণার ভয়ও হচ্ছে। স্বর্গের কর্তৃপক্ষ তাকে একটি সুযোগ দিলো। বললো, “তুমি গিয়ে একবার নরক দেখে আসতে পারো। যদি মনে হয় থাকতে পারবে – তাহলে একেবারে চলে যেতে পারবে। আবার যদি দেখো যে সহ্য করতে পারবে না, তাহলে আবার স্বর্গে চলে আসতে পারবে। এই সুযোগ কিন্তু মাত্র একবার পাবে।“

বন্ধুটি রাজি হলো। সে নরক দেখতে গেলো। সেখানে গিয়েই দেখলো নরকের প্রবেশ পথে ফুলের মালা হাতে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে তার বন্ধুটি। বন্ধুকে পেয়ে সে যে কী খুশি। দুই বন্ধুতে মিলে নরকের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে বেড়ালো। স্বর্গের বন্ধু দেখলো নরকে যারা আছে তারা খুব একটা কষ্টে নেই। সবাই কীরকম হাসিমুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কোথাও কোন অশান্তি নেই। পরিবেশও বেশ ভালো। সবকিছু অনেকটা স্বর্গের মতোই। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো। সে পাকাপাকি নরকেই চলে আসবে। দুই বন্ধুতে মিলে আনন্দেই থাকবে।

স্বর্গে ফিরে গিয়ে সে কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দিলো যে সে স্থায়ীভাবে নরকেই চলে যাবে। স্বর্গের কর্তৃপক্ষ আবারো তাকে স্মরণ করিয়ে দিলো যে একবার গেলে কিন্তু আর স্বর্গে ফেরা যাবে না। সে বললো – কোন সমস্যা নেই। সে তো নরকের পরিবেশ দেখে এসেছে। স্বর্গ থেকে কোন অংশে কম নয়। সে স্থায়ীভাবে নরকে চলে গেলো।

এবার যখন নরকের দরজা খুললো সে দেখলো সম্পূর্ণ অচেনা পুঁতিগন্ধময় অসহ্য এক পরিবেশ। কোথায় তার বন্ধু কোথায় কে? সে ভুল জায়গায় এসেছে ভেবে প্রতিবাদ করে উঠলো। বললো, “এটা তো নরক নয়। নরকের চেয়ে খারাপ জায়গা। আমি তো আগে নরক দেখে গিয়েছি। সেই নরক তো এরকম খারাপ ছিল না।“

তখন নরকের কর্তৃপক্ষ তাকে বললো, “আগেরবার যখন এসেছিলে তখন তুমি ছিলে ট্যুরিস্ট। তাই ট্যুরিস্টদের জন্য রাখা সুন্দর সুন্দর জায়গাগুলি দেখছো। তাই তোমার মনে হয়েছে নরক স্বর্গের চেয়ে কোন অংশে খারাপ নয়। এবার কিন্তু তুমি ট্যুরিস্ট নও। এবার তুমি ইমিগ্র্যান্ট। এবার তুমি আসল নরকযন্ত্রণা ভোগ করবে।“
বুঝলে তো ব্যাপারটা। তুমি এই কলেজে এখনো ট্যুরিস্টের মত আছো। তাই নরকযন্ত্রণা কী এখনো টের পাচ্ছো না।“

আমি মনে মনে বললাম, যতদিন পারি আমি ট্যুরিস্টের মতোই থাকবো।

No comments:

Post a Comment

Latest Post

Memories of My Father - Part 6

  The habit of reading books was instilled in us from a young age, almost unknowingly. There was no specific encouragement or pressure for t...

Popular Posts