Saturday 16 May 2020

সি ভি রামন - পর্ব ১১


অর্থ-কর্মকর্তা রামন

বিজ্ঞানের প্রতি যার এত ভালবাসা - অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাকাউন্ট জেনারেল হিসেবে কেমন ছিলেন তিনি? ব্রিটিশ-ভারতের অর্থবিভাগে বেশ সুনামের সাথে কাজ করছিলেন রামন। এ যেন তাঁর দুটো সম্পূর্ণ আলাদা ব্যক্তিত্ব। ঠিক দশটায় অফিসে ঢোকেন, আর ঠিক পাঁচটায় বেরিয়ে পড়েন অফিস থেকে। সকালে অফিসে আসার আগে ভোর সাড়ে পাঁচটা থেকে সকাল সাড়ে ন'টা পর্যন্ত চারঘন্টা সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশানে গবেষণা করেন। তারপর ঘোড়ার গাড়িতে করে দ্রুত বাসায় গিয়ে বিশ মিনিটের মধ্যে স্নান-খাওয়া-দাওয়া সব দ্রুত সেরে অফিসে চলে আসেন। ঠিক পাঁচটায় অফিসের বাইরে তার জন্য ঘোড়ার গাড়ি অপেক্ষা করে। রামন অফিস থেকে বেরিয়েই চলে আসেন অ্যাসোসিয়েশানে। বিকেল সাড়ে পাঁচটা থেকে রাত সাড়ে ন'টা পর্যন্ত চলে গবেষণা। দৈনিক আটঘন্টা তিনি পদার্থবিজ্ঞানের গবেষক। সেই সময় তিনি ফাইন্যান্স অফিসের কিছুই জানেন না। আবার দশটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত যখন তিনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল তখন পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে চিন্তা করেন না। তখন তিনি শুধুই সরকারি অফিসার।
            অফিসে সবচেয়ে কমবয়সী অফিসার হলেও নিয়মনীতির ব্যাপারে খুবই কঠোর ছিলেন রামন। দুর্নীতির দায়ে একবার তিনি একজন বাঙালি কেরানিকে বরখাস্ত করেন। সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তখনকার বাংলা সংবাদপত্র অমৃতবাজার কঠোরভাষায় সম্পাদকীয় লেখে 'দক্ষিণ ভারতের বালক অফিসার'-এর বিরুদ্ধে। বাঙালিদের বাঙালিত্বের আবেগ অনেকসময় ন্যায়নীতির তোয়াক্কা করে না। এই আবেগের কারণে রামনকে বিজ্ঞানের জগতেও অনেক সমস্যায় পড়তে হয়েছে যেটা আমরা আরো পরের অধ্যায়ে আলোচনা করবো।
            কর্মদক্ষতার পুরষ্কার হিসেবে ১৯০৯ সালের প্রথম দিকে রামনের পদোন্নতি হলো। অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল থেকে কারেন্সি অফিসার। এই পদোন্নতিতে রামনের মা-বাবা ভাইবোন সবাই খুব খুশি হলেও রামন মোটেও খুশি হলেন না। কারণ তাঁর পোস্টিং হয়েছে রেঙ্গুনে। ভারত-বাংলাদেশ-বার্মা-পাকিস্তান সব মিলিয়ে সেই সময় একটাই দেশ ছিল - ব্রিটিশ-ভারত। কলকাতার গবেষণাগার ছেড়ে রেঙ্গুনে যাওয়ার অর্থ হলো রামনের সব গবেষণা থেকে দূরে চলে যাওয়া। রেঙ্গুনে গবেষণার সুযোগ আছে কিনা তিনি জানেন না। আর একবার গেলে সেখান থেকে আবার কখন বদলি হয়ে কলকাতায় আসতে পারবেন তার কোন ঠিক নেই। রামন মন খারাপ করলেও অন্য কোন উপায় নেই। অ্যাসোসিয়েশানে গবেষণা করতে পারছেন তিনি এটা ঠিক, কিন্তু সেখান থেকে একটা টাকাও তিনি পান না। বরং গবেষণাপত্র ইংল্যান্ডে পাঠানোর জন্য ডাক ও টেলিগ্রাম খরচ এবং অন্যান্য গবেষণা-সাময়িকী কেনার সব খরচ নিজের পকেট থেকেই দিতে হয়। সরকারি এত ভালো চাকরিটি আছে বলেই তা সম্ভব হচ্ছে। সুতরাং রেঙ্গুনে না গিয়ে কোন উপায় নেই। তিনি খোঁজ নিতে লাগলেন রেঙ্গুনে পরিচিত কেউ আছে কিনা।
            ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করার কিছু সুবিধা সারাজীবন পাওয়া যায়। যেমন সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেক সহপাঠী বন্ধুকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় চাকরিসূত্রে পাওয়া যায়। রামন মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি কলেজের এক পুরনো বন্ধুর খবর পেলেন যিনি সেই সময় রেঙ্গুন কলেজে ফিজিক্স পড়াচ্ছিলেন। রামন একটু হলেও আশার আলো দেখতে পেলেন গবেষণার ব্যাপারে। রামন তাঁর বন্ধু কৃষ্ণ আয়ারকে চিঠি লিখে জানালেন তাঁর বদলির কথা। রেঙ্গুনে কারেন্সি অফিসারের সরকারি কোয়ার্টার আছে। তাই বাসা খুঁজতে হবে না। রামনের জানার বিষয় হলো রেঙ্গুন কলেজে গবেষণার সুযোগ আছে কিনা।
            এদিকে রামনের মা চিন্তিত লোকমকে নিয়ে। তাঁর মনে নানারকম সংস্কার। বাড়ির বৌয়ের সাগর পাড়ি দেয়া উচিত নয় ইত্যাদি। তিনি নিজেও যেতে পারছেন না। রামনের সবচেয়ে ছোট ভাইটার বয়স তখনো দুই বছরও হয়নি। সুব্রাহ্মণ্যের স্ত্রী সীতাও আবার সন্তানসম্ভবা। রামনের বোন মঙ্গলমও সন্তানসম্ভবা। লোকমের সাথে যাওয়ার মতো কেউ নেই। রামনের মা বললেন লোকমকে বিশাখাপট্টমে গিয়ে থাকতে। আর রামন একাই রেঙ্গুনে চলে যাক। তাতে লোকমের কোন আপত্তি নেই। কিন্তু রামনের বাবা চন্দ্রশেখরন ভেবে দেখলেন রামনের কথা। রামন এখনো শিশুর মতো, কাজপাগল কিন্তু নিজের দেখাশোনা নিজে করতে শেখেনি। কারো সাহায্য ছাড়া একা একা কখনোই থাকেনি রামন। একা একা বৈজ্ঞানিক গবেষণা করা আর একা একা জীবন যাপন করা দুটো ভিন্ন জিনিস। রামনের দেখাশোনার জন্য লোকমের যাওয়া উচিত রামনের সঙ্গে।
            লোকম তখন পঞ্চদশী বালিকা, আর রামন একুশে পা দিয়েছে। তাদের বিয়ে হয়েছে দু'বছর হতে চললো, কিন্তু তাদের ভেতর স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা তৈরি হয়নি তখনো। রামনের ঘরের কাজকর্ম করে দেয়ার জন্য লোকমের দরকার। তাই এপ্রিল মাসের এক সকালে স্বামীর সাথে হুগলি থেকে একটা নৌকা করে মাঝ সাগরে গিয়ে রেঙ্গুনগামী জাহাজে উঠলেন লোকম। সাথে করে একজন মাদ্রাজি রাঁধুনি কাম কাজের লোকও নিয়ে যাচ্ছেন তারা।
            উচ্চপদস্থ সরকারি অফিসারদের জন্য উন্নত কেবিনের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু জাহাজের দুলুনিতে লোকম অসুস্থ পড়ে পড়লেন। রামনের তাতে কিছুই যায় আসে না। তিনি শুধু এটুকু জানেন যে সি সিকনেস হলে করার কিছুই নেই। তাই তিনি লোকমের ব্যাপারে কিছুই করলেন না। তিনদিন তিন রাত লোকম জাহাজের কেবিনে শুয়ে থাকলেন। আর রামন মনের আনন্দে জাহাজের ডেকে ঘুরে ঘুরে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করলেন আর রেঙ্গুনে গিয়ে কীভাবে বৈজ্ঞানিক গবেষণা করবেন সে সম্পর্কে ভাবলেন।
            রামনের বন্ধু কৃষ্ণ আয়ার রেঙ্গুনে একটা বাসা ঠিক করে রেখেছিলেন রামনের জন্য। কোয়ার্টার পেতে যতদিন লাগে ততদিন এই বাসায় থাকবেন তারা। প্রথম দিন বাসায় লোকম আর রাঁধুনিটিকে রেখে রামন চলে গেলেন কারেন্সি অফিসে দায়িত্ব বুঝে নিতে।
            সেই সময় অর্থ বিভাগের কারেন্সি অফিসারদের দায়িত্ব ছিল অনেক বেশি। দায়িত্ব বুঝে নেয়া এবং বুঝিয়ে দেয়ার ঝামেলাও ছিল অনেক। কারেন্সি অফিসের নিচের তলায় ছিল কারেন্সি অর্থাৎ সরকারি কোষাগার; সেখানে টাকা-পয়সা বন্ড ইত্যাদি সবকিছু।  সশস্ত্র প্রহরী পাহারা দিচ্ছে অফিসের চারিদিকে। দোতলায় অফিসের দপ্তর। আর তিনতলায় অফিসারের বাসা। নিয়ম হলো দায়িত্বরত অফিসার সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত অফিস কম্পাউন্ডের বাইরে যেতে পারবেন না। সরকারের এই নিয়মটা খুব পছন্দ হলো রামনের। তিনি ভাবলেন এই নিয়মের কারণে তাঁকে সন্ধ্যাবেলা বাড়ি ছেড়ে কোথাও যেতে হবে না। বার্মায় প্রচুর ভারতীয় অফিসার কাজ করেন। তাদের সামাজিক পরিমন্ডল অনেক বড়। অফিসারদের ক্লাব আছে, সমিতি আছে, সামাজিক ভোজ আছে। এগুলো রামন পছন্দ করেন না। কিন্তু মাঝে মাঝে এড়ানোর কোন উপায় থাকে না, বিশেষ করে উর্ধ্বতন অফিসাররা নিমন্ত্রণ করলে। এখন তিনি ভাবলেন তাঁকে তো কেউ নিমন্ত্রণও করতে পারবেন না।
            কিন্তু দায়িত্ব বুঝে নেয়ার ব্যাপারটা খুব ঝামেলাপূর্ণ বলে মনে হলো তার। প্রতিটি টাকার বান্ডেল গুণে গুণে প্যাকেট করতে হয়। তারপর সেই প্যাকেটগুলো দাঁড়িপাল্লায় মেপে ওজন করতে হয়। তারপর সব হিসাব বইতে লিখে রাখতে হয়। এরকম মণ মণ টাকা গুণতে এবং ওজন করতে প্রায় সপ্তাহখানেক লেগে যায়।
            প্রথমদিন রামন বিকেল পর্যন্ত চার্জ বুঝে নিয়ে বাসায় ফিরে যাবার কথা। কিন্তু সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে যাবার পরেও রামন যখন বাসায় ফিরলেন না লোকম বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তাঁর রাঁধুনি ভয়ে কাঁদতে শুরু করেছে। আর লোকম নিজে বালিকা হলেও মনিব হওয়ার কারণে কাঁদতে পারছেন না। অনেক রাতে রামন ফিরে এসে জানালেন তিনি কৃষ্ণ আয়ারের সাথে ট্রেনে চড়ে ষোল মাইল দূরে আরেক শহরে চলে গিয়েছিলেন গবেষণার যন্ত্রপাতির অর্ডার দিতে। একটা পনেরো বছরের অসুস্থ বালিকাকে সম্পূর্ণ অপরিচিত শহরে নতুন একটা বাসায় এভাবে কোন খবর না দিয়ে চলে যাওয়াটা কতটুকু দায়িত্বজ্ঞানহীনতা তা বুঝেও বুঝতে চাইলেন না রামন। এজন্য কোন অনুতাপও হয়নি তার।
            সপ্তাহব্যাপী মুদ্রা-গণনা এবং ওজন করা শেষ করে দায়িত্ব বুঝে নিলেন রামন। আগের অফিসার চলে যাবার পর কারেন্সি অফিসারের সরকারি বাসায় উঠলেন রামন ও লোকম। বিশাল বাসার একটা রুমে গবেষণাগার স্থাপন করে ফেললেন রামন। তিনি খুব খুশি তাঁর গবেষণা শুরু করতে পেরে। কিন্তু লোকমের জন্য এই বাসাটা একটা জেলখানা ছাড়া আর কিছুই নয়। বাসার চারপাশে বন্দুক হাতে প্রহরীরা ঘুরছে, আর ভেতরে তিনি একা। বার্মিজ ভাষাও জানেন না যে কারো সাথে কথা বলবেন।
            অফিসের সময়টুকু ছাড়া বাকি সময়টা রামন লেখাপড়া ও গবেষণা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। ১৯১০ সালের মধ্যে তাঁর আরো দুটো গবেষণাপত্র প্রকাশিত হলো। তারপর শুরু হলো সমস্যা। রেঙ্গুনে দরকারি যন্ত্রপাতির অভাবে গবেষণা করতে পারছেন না রামন। তিনি অ্যাসোসিয়েশানের ল্যাবোরেটরির অভাব বোধ করতে লাগলেন অনেক বেশি। রাতের পর রাত তিনি ঘুমাতে পারেন না। ঘরময় পায়চারি করে কাটান। লোকম কিছু বলতে গেলেই প্রচন্ড রেগে যান।
            ১৯১০ সালের প্রথম দিকে রামন তাঁর বাবার কাছ থেকে একটা চিঠি পেলেন। বেনারস থেকে তাঁর বাবার দুজন বন্ধু রেঙ্গুনে বেড়াতে যাচ্ছেন। রামন যেন তাদেরকে রেঙ্গুন শহর ঘুরিয়ে দেখান। কয়েকদিন পরেই বাবার বন্ধুরা এলেন। রামন তাদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তাদেরকে রেঙ্গুনের বিভিন্ন জায়গা দেখানোর সময় লোকমকেও সাথে নিলেন।
            তার কয়েক সপ্তাহ পরে রামন জরুরি টেলিগ্রাম পেয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তাঁর বাবা ১৯১০ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৬টা ২৫ মিনিটে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তাঁর বাবার বয়স হয়েছিল মাত্র চুয়াল্লিশ বছর। রামন আবার ভাবতে শুরু করলেন মানুষের জীবন কত অনিশ্চিত।
            রামন যে দ্রুত বাড়িতে ফিরবেন তার কোন উপায় নেই। পরবর্তী কারেন্সি অফিসার আসার পর টাকা-পয়সা, সোনা-দানা, সরকারি বন্ড সবকিছু গুণে, মেপে, বেঁধে, লিখে রাখতে রাখতে কয়েকদিন চলে গেলো। তারপর একটা মালবাহী জাহাজে করে বিশাখাপট্টমে ফিরে এলেন তার বাবার মৃত্যুর এগারো দিন পর। বড়ভাই সুব্রাহ্মণ্য ছিলেন লাহোরে। বড় দুই ছেলের অনুপস্থিতিতে ৩য় পুত্র কুমারস্বামীকেই সব ধর্মীয় আচার সামলাতে হয়েছে এই ক'দিন।
            বাবার মৃত্যুর পর বিশাখাপট্টমে তাদের থাকার আর কোন কারণ নেই। সুব্রাহ্মণ্য লাহোরে ফিরে গেলেন। রামন ছয় মাসের ছুটি নিয়েছেন চাকরি থেকে। তিনি পরিবারের সবাইকে নিয়ে মাদ্রাজে একটা বাসা ভাড়া করে চলে গেলেন। রামনের ছোটভাই কুমারস্বামী মাদ্রাজের প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হয়েছে। রামন আবার প্রেসিডেন্সি কলেজের ল্যাবোরেটরিতে গিয়ে হাজির হলেন। তার প্রফেসররা খুব খুশি মনেই তাঁকে গবেষণা করতে দিলেন সেখানে। রামন পাগলের মতো দিনরাত গবেষণায় মেতে রইলেন। ছুটি শেষে আবার কোথায় পোস্টিং হয় তিনি জানেন না। তাই এখানে যত পারে সময়কে কাজে লাগাতে চাইলেন তিনি।
            রামনের ছুটি শেষে পোস্টিং হলো নাগপুরে ডেপুটি অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল হিসেবে। তাঁর দক্ষতার আরেকটি পুরষ্কার এটা। চাকরির চার বছরের মাথায় তিনি প্রমোশন পেয়ে ডেপুটি অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল হলেন।   
            ভারতের সেন্ট্রাল প্রভিন্সের রাজধানী নাগপুরে এলেন রামন ও লোকম। সরকারের খুব উঁচু পর্যায়ের অফিসার হওয়ার সুবাদে রামন সরকারি কোয়ার্টার পেলেন সিভিল লাইনে। শহরের সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত অঞ্চল সিভিল লাইন। ব্রিটিশ অফিসারদের বাস সেখানে। কিন্তু রামনের সেদিকে কোন আগ্রহ নেই। নাগপুর বড় শহর। অনেকগুলো কলেজ আছে সেখানে - সায়েন্স কলেজ, মরিস কলেজ, হিসলপ কলেজ। রামন কলেজগুলোর গবেষণাগার দেখতে গেলেন। শুধুমাত্র সায়েন্স কলেজের ল্যাবোরেটরিতে কিছু কাজ করা যেতে পারে। রামন সিভিল লাইনের আরাম আয়েশে থাকতে চাইলেন না। কারণ সেখান থেকে সায়েন্স কলেজ অনেক দূর। যাতায়াতের কোন ভালো ব্যবস্থা নেই। তাই তিনি সায়েন্স কলেজের কাছে একটি বাসা ভাড়া নিলেন। এই বাসাটিও অনেক বড়। দোতলা বাসার উপরের তলায় বেশ বড় একটা রুম আছে। রামন খুব দ্রুত সেটাকে তাঁর গবেষণাগারে পরিণত করে ফেললেন।
            কিছুদিন পর রামনের ছোটবোন মঙ্গলম তার পুরো পরিবার নিয়ে চলে এলেন রামনের বাসায় থাকতে। মঙ্গলমের স্বামী নাগপুরে একটি চাকরি পেয়েছে। লোকম কথা বলার সঙ্গী পেয়ে কিছুটা খুশি হলেও পুরো আরেকটি পরিবারের দেখাশোনা করতে হবে বলে বেশ বিরক্তও হলেন। কিন্তু রামনের কিছুতেই কিছু যায় আসে না। তিনি অফিসে যান সময়মতো। যখন যা দরকার হাতের কাছে না পেলে লোকমের সাথে চিৎকার চেঁচামেচি করেন। তারপর অফিস থেকে ফিরে ঢুকে যান নিজের ল্যাবোরেটরি রুমে। সংসারে কী হচ্ছে না হচ্ছে তার কোন খবরও রাখেন না। লোকম অবশ্য এটা সংসার কিনা এখনো বুঝতে পারছেন না। কারণ তাঁর তেইশ বছরের তরুণ স্বামী অষ্টাদশী তরুণী স্ত্রীর দিকে তাকানোর দরকার আছে বলেও মনে করেন না।
            ডেপুটি অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল হিসেবেও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন রামন। একবার নাগপুরের এক বাড়িতে আগুন লেগে বাড়ির মালিকের ত্রিশ চল্লিশটি একশ রুপির নোট আংশিক পুড়ে যায়। লোকটি সেই পুড়ে যাওয়া টাকাগুলো নিয়ে বদলানোর জন্য আসেন ডেপুটি অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেলের অফিসে। রামন ম্যাগনিফাইয়িং গ্লাস দিয়ে নোটগুলি পরীক্ষা করে দেখেন যে সেগুলোর নম্বর পুড়ে যায়নি। তাই সেগুলো বদলে দিতে কোন অসুবিধা থাকার কথা নয়। রামনের সুবিবেচনার পরিচয় দিয়েছেন তাঁর সব অফিসিয়্যাল কাজে।
            সেই সময় নাগপুরে প্লেগের আক্রমণ হলো হঠাৎ। একদিন বাড়িতে একটা মরা ইঁদুর পাওয়া গেলো। আশেপাশের সব বাড়ি খালি করে ফেলা হলো জরুরি ভিত্তিতে। রামনরা কয়েক সপ্তাহ তখন খোলা মাঠে তাবু টাঙিয়ে থাকলেন। খোলা আকাশে বিভিন্ন রকমের তারা দেখার চেষ্টাও করেছেন রামন।
            প্লেগের ভয় কেটে যাবার পর আবার বাসায় ঢুকলেন সবাই। তার কিছুদিন পরেই রামনের ট্রান্সফার অর্ডার এলো। রামন ভীষণ খুশি এতে। এতদিন পরে আবার কলকাতায় পোস্টিং হয়েছে তাঁর।
            কলকাতায় এবার বাসা নিলেন কালিটোলার মুক্তারাম বাবু স্ট্রিটে। এখানে সব বিখ্যাত বাঙালিদের বাড়ি। রামনের বাসার কাছেই রাজা সুবোধ চন্দ্র মল্লিকের প্রাসাদের মতো বাড়ি। রামনের বাসাটা সেই তুলনায় খুবই ছোট। অবশ্য তাঁদের জিনিসপত্রও তেমন কিছু নেই। এত বছর পর্যন্ত শোবার খাটও ছিল না। তাঁরা রাতে ফ্লোরে বিছানা পেতে ঘুমাতেন, আর দিনের বেলা সেই বিছানা গুটিয়ে রেখে দিতেন। এবার লোকম খাট কেনার ব্যবস্থা করলেন রামনের শোবার ঘরের জন্য এবং তাঁর নিজের শোবার ঘরের জন্য।
            কলকাতার অফিসে যোগ দিয়ে প্রথম দিন অফিসের পরেই রামন অ্যাসোসিয়েশানে উপস্থিত হলেন। তাঁকে দেখে আশুবাবু ও অমৃতলাল সরকার খুবই খুশি হলেন। অ্যাসোসিয়েশনে আবার কর্মতৎপরতা ফিরে এলো।
            ১৯০৭ থেকে শুরু করে পরবর্তী দশ বছরে আলোক তরঙ্গ, শব্দ-তরঙ্গ, পদার্থের পৃষ্ঠতান, সুর-যন্ত্রের বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ে গবেষণা করে পয়ত্রিশটি গবেষণা-পত্র প্রকাশ করেন রামন।
            রামনের গবেষণার বেশির ভাগ সমস্যাই দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণের ফসল। যেমন তাঁর বাবা যখন বেহালা বাজাতেন - তিনি তারের ওপর সুরের কাজ লক্ষ্য করেছেন। কলেজে পড়ার সময় করেছেন সনোমিটার নিয়ে শব্দ সংক্রান্ত মেল্‌ডির পরীক্ষা। এ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে রামন পরীক্ষা করেছেন টানা তারের কম্পন, শব্দের ব্যাতিচার, আলোক তরঙ্গের সাথে তাপের সম্পর্ক, উত্তপ্ত পদার্থ থেকে নির্গত শব্দের তরঙ্গসহ আরো অনেক নতুন নতুন পরীক্ষা। তাঁর পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে পৃথিবীবিখ্যাত জার্নাল নেচার ও ফিলোসফিক্যাল ম্যাগাজিনে।
            ভারতীয় বাদ্যযন্ত্রের সুর নিয়ে বিশেষ করে বীণা, তানপুরা, চেলো, মৃদঙ্গ ইত্যাদিতে সৃষ্ট সুর ও শব্দ সম্পর্কে অনেক গবেষণা করেছেন রামন। বীণার তারে যে প্রায় মানুষের গলার স্বরের মত সুর সৃষ্টি করা যায় - তার কি কোন ভৌত-বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে, নাকি তার পুরোটাই মনোবৈজ্ঞানিক? রামন পরীক্ষা করে দেখলেন যে বীণার তারের ব্রিজগুলো এমন কৌশলে স্থাপন করা হয় যাতে হেল্‌মহোল্টজের নীতি (Helmholtz law) অনুসৃত হয় না। হেল্‌মহোল্টজের নীতি অনুসারে বীণার তারের যে জায়গায় টোকা দেয়া হয় - সে জায়গায় কোন অপসুর (node) সৃষ্টি হতে পারে না। বীণার তারে যেহেতু এ নীতি চলে না - সেখানে কাছাকাছি তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিপুল সুর সৃষ্টি হয়। তাই বীণার তারে মানুষের গলার স্বরের কাছাকাছি সুর সৃষ্টি হতে পারে।

মৃদঙ্গের তালে সৃষ্ট কম্পন

            বীণার পর  মৃদঙ্গ আর তবলার তাল নিয়ে গবেষণা করলেন রামন। তাঁর গবেষণা-পত্রে তিনি দেখালেন যে তবলা বা মৃদঙ্গের মত বাদ্যযন্ত্রও বিশেষ অবস্থায় তারের যন্ত্রের মত সুর সৃষ্টি করতে পারে। বাদ্যযন্ত্রের ওপর রামন এত গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন যে কালক্রমে তিনি এ বিষয়ের ওয়ার্ল্ড অথরিটি হিসেবে স্বীকৃত হয়েছেন।
            এসময় কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি অব ইন্ডিয়া। রামন এই সোসাইটির সদস্য হয়েছেন। রামন মহাজাগতিক আলো সম্পর্কিত গবেষণাও শুরু করেছেন। অ্যাসোসিয়েশানের ছাদে একটা সাত ইঞ্চি ব্যাসের টেলিস্কোপ স্থাপন করা হয়েছে। ১৯১২-১৩ সালে রামন সেই টেলিস্কোপের সাহায্যে বৃহস্পতিগ্রহের আলো পর্যবেক্ষণ করে বৃহস্পতির অনেকগুলো সায়েন্টিফিক ড্রয়িং করেছেন। গ্রহ থেকে ছিটকে আসা আলোর বিচ্ছুরণের ধর্ম পরীক্ষা করে দেখেন রামন।
            ১৯১৪ পর্যন্ত রামন একা একাই সব পরীক্ষা করেছেন আশুবাবুর সাহায্যে। ততদিনে অ্যাসোসিয়েশানে নিয়মিত বৈজ্ঞানিক সভা বসতে শুরু করেছে। রামন অ্যাসোসিয়েশানের ম্যানেজিং কমিটির মেম্বার হয়েছেন। তাঁর উদ্যোগে বার্ষিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনের আয়োজন করা হলো যেখানে দেশের বিভিন্ন জায়গার বিজ্ঞানীরা এসে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন।
            অ্যাসোসিয়েশানের কার্যক্রমের কথা ভারতের বিজ্ঞানীদের মধ্যে দ্রুত প্রচারিত হতে শুরু করেছে। এই ক'বছরের মধ্যে অ্যাসোসিয়েশান থেকে রামনের এতগুলো উন্নতমানের গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে, বিশেষ করে দক্ষিণ ভারত থেকে অনেকেই অ্যাসোসিয়েশানে এসে রামনের তত্ত্বাবধানে গবেষণা করার আগ্রহ প্রকাশ করছে।
            রামনের গবেষণার স্বীকৃতি মিলতে শুরু করেছে। ১৯১২ সালে তিনি পেলেন কার্জন রিসার্চ প্রাইজ। ১৯১৩ সালে পেয়েছেন উডবার্ন রিসার্চ মেডেল।
            কিন্তু রামনের পরিবারে পর পর কয়েকটি দুঃখজনক ঘটনা ঘটে গেলো। ১৯১২ সালে তাঁর ছোট বোন মীনা মারা যায় মাত্র নয় বছর বয়সে। প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র ছোটভাই কুমারস্বামীর যক্ষা ধরা পড়ে। বছরখানেক রোগে ভোগার পর ১৯১৪ সালে তার মৃত্যু হয়। তরুণ কুমারস্বামীর মৃত্যুতে একেবারে ভেঙে না পড়লেও খুবই দুঃখ পান রামন। কুমারস্বামীকে খুবই আদর করতেন রামন। দুবছরের ভেতর বাবা, বোন ও ভাইকে হারিয়ে রামন আবার বুঝতে পারলেন জীবনের অনিশ্চয়তার কথা। কত কাজ পড়ে আছে তাঁর। কাজের গতি বাড়িয়ে দিলেন তিনি।
            পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে শব্দবিজ্ঞান (Acoustics), ও  আলোকবিজ্ঞান (Optics) বিষয়ে প্রচুর গবেষণা করলেন রামন। অ্যাসোসিয়েশানে রামনের তত্ত্বাবধানে অনেক ছাত্র গবেষণা করছেন। তাদের মধ্যে আছেন এস কে ব্যানার্জি, এম এন বসু, এস কে মিত্র, টি কে চিন্ময়ানন্দ প্রমুখ। তাঁদের পেপার প্রকাশিত হয়েছে নেচার, ফিলোসফিক্যাল ম্যাগাজিন, ফিজিক্যাল রিভিউ, ও রয়েল সোসাইটির প্রসিডিংস-এ। রামনের গবেষক-ছাত্রসংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। রামন তাদের জন্য স্কলারশিপ জোগাড় করছেন বিভিন্নজনের কাছ থেকে। অনেক ছাত্র স্কলারশিপ ছাড়াও নিজের টাকায় গবেষণা করতে আগ্রহী। তরুণ গবেষকদের ভেতর এই উৎসাহ দেখে খুবই ভালো লাগছে রামনের।
            রামন ভোর সাড়ে পাঁচটায় অ্যাসোসিয়েশানে আসেন, তারপর আবার বাসায় যান অফিসে যাবার জন্য প্রস্তুত হতে। এখনকার বাসা থেকে অ্যাসোসিয়েশানের দূরত্ব অনেক বেশি। রামন এই আসা-যাওয়ার পথে যে সময় নষ্ট হয় সেটাও নষ্ট করতে রাজি নন। তিনি অ্যাসোসিয়েশানের কাছে একটি বাসা খুঁজছিলেন। প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রিটে একটি বাড়ি পাওয়া গেলো। কিন্তু এলাকাটা ঘিঞ্জি, পাশে কিছু বস্তিও আছে। রামনের মত উচ্চপদস্থ অফিসারের পক্ষে এই এলাকা মোটেও উপযুক্ত নয়। কিন্তু রামন ওসব কেয়ার করেন না। এই বাসাটা অ্যাসোসিয়েশান থেকে মাত্র আধমাইল দূরে এটাই তাঁর একমাত্র বিবেচ্য বিষয়। এসব সিদ্ধান্তের ব্যাপারে লোকমের মতামত নেয়ার কোন দরকার আছে বলেও মনে করেন না রামন। লোকম রামনের ইচ্ছামতো বাসা-বদলের সব ঝামেলা সামলালেন।
            বছরখানেক পর ১৯১৫ সালে অ্যাসোসিয়েশানের পেছনের দেয়াল ঘেঁষে একটা বাড়ি পাওয়া গেলো। রামন একটুও দেরি না করে সেখানে উঠে এলেন। এখন বাসা থেকে অ্যাসোসিয়েশানে যেতে  কয়েক সেকেন্ডের বেশি সময় লাগে না। বাড়ির দোতলায় রামনের বেডরুম ও স্টাডি, নিচের তলায় কিচেন, বসার ঘর, ডায়নিং রুম ও লোকমের বেডরুম। এরপর যত বছর তাঁরা কলকাতায় ছিলেন এই বাসাতেই ছিলেন। অ্যাসোসিয়েশানের পেছনের দেয়ালে একটি দরজা তৈরি করা হলো এবং রামনকে অ্যাসোসিয়েশানের চাবি দেয়া হলো। তারপর দেখা গেলো রামন অনেক সময় রাতেও অ্যাসোসিয়েশানের ল্যাবে চলে যান।
             অ্যাসোসিয়েশানের সুনাম দেশের গন্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। ইংল্যান্ডের নেচার, ফিলোসফিক্যাল ম্যাগাজিন, ও রয়েল সোসাইটির প্রসিডিংস, এবং আমেরিকার ফিজিক্যাল রিভিউতে প্রকাশিত পেপারগুলো নজর কাড়তে শুরু করেছে পৃথিবীবিখ্যাত বিজ্ঞানীদের।
            এত বিজ্ঞান-গবেষণার মধ্যেও কিন্তু রামন তাঁর সরকারি কর্তব্যে একটুও অবহেলা করছেন না। ভাইসরয় কাউন্সিলের ফাইন্যান্সিয়াল মেম্বার রামন সম্পর্কে বলেছেন, "রামন ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্টের সবচেয়ে ভালো কর্মকর্তাদের একজন।"
            এসময় একদিন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় রামনকে 'পালিত প্রফেসর' পদে যোগদানের আহ্বান জানালেন। 

No comments:

Post a Comment

Latest Post

Hendrik Lorentz: Einstein's Mentor

  Speaking about Professor Hendrik Lorentz, Einstein unhesitatingly said, "He meant more to me personally than anybody else I have met ...

Popular Posts