Saturday 23 May 2020

ছিন্ন পাতার সাজাই তরণী - পর্ব ২৪

24


“বাবার সময় হল বিহঙ্গের – মানে কী?”
“বাবার সময় নয় গাধা – যাবার সময়। যাবার সময় হল বিহঙ্গের। তোর চশমার পাওয়ার বদলাতে হবে।“ – হাসতে হাসতে বললো ইন্দ্রাণী। মোটা লেন্সের ভেতর দিয়ে তার চোখগুলোকে খুবই ছোট ছোট দেখাচ্ছে।
টিচার্স রুমের সামনে বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলছি ইন্দ্রাণী আর ইভার সাথে। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের বিদায় উপলক্ষে আজ আর কোন ক্লাস নেই। সাড়ে এগারোটা থেকে অনুষ্ঠান। সকাল থেকেই কলেজের ছেলে-মেয়েরা ব্যস্ত হয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে। আমাদের টিচার্স রুমের সামনা-সামনি অন্যদিকের বারান্দায় মঞ্চ সাজাচ্ছে তারা। সাদা কাপড়ের উপর রঙিন কাগজ কেটে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের বিদায়ী শুভেচ্ছা – ইত্যাদি লিখেছে উপরে। তারপর বামপাশে একটির নিচে আরেকটি সাজিয়ে দিয়েছে চারটি শব্দ – যাবার সময় হল বিহঙ্গের। য আর ব প্রায় একরকম হয়ে গেছে বলে  দূর থেকে যাবার সময়কে বাবার সময় পড়ে ফেলেছি।
“কথাগুলি কী সুন্দর না?” – ইভা বললো। “রবীন্দ্রনাথ একেবারে শেষ বয়সে এসেও কী চমৎকার সব লিখে গেছেন – যাবার সময় হল বিহঙ্গের। এখনি কুলায় রিক্ত হবে। স্তব্ধ গীতি ভ্রষ্ট নীড় পড়িবে ধুলায় –“ ইন্দ্রাণী ও ইভা একসাথে আওড়ায় রবীন্দ্রনাথের কবিতা।
এতকিছু এরা কীভাবে জানে? এটা যে রবীন্দ্রনাথের লেখা সেটাও তো আমি জানতাম না। আমি মনে করেছিলাম এটা সুফিয়ানের লেখা। শুনেছি সুফিয়ান গান করে, কবিতা লেখে। সুফিয়ান, ইরফান, আদেল, ইয়াসির এরা সব কালো-প্যান্টের সাথে সাদা শার্ট-কালো টাই পরে নতুন ক্যাডেটদের মত ঘুরে বেড়াচ্ছে। কলেজে এরকম দু-একটা অনুষ্ঠানের সময় আয়োজক হিসেবে এরা ইউনিফর্ম পরার হাত থেকে মুক্তি পায়। আজ তাদের সেরকম একটা মুক্তির দিন। তাই বিদায় অনুষ্ঠানে যেরকম একটা ভাবগম্ভীর পরিবেশ থাকার কথা, সেরকম কিছুই দেখা যাচ্ছে না। তাদের আচরণে একটা উৎসব উৎসব ভাব। একটু আগে গুলশান আর মিতাকে দেখলাম খুব সেজেগুঁজে শাড়ি পরে এসেছে। এখন তাদের ইয়ারের অন্যসব মেয়েদেরও দেখা যাচ্ছে শাড়ি পরে বারান্দায় হৈ চৈ করছে। পিচ্চি পিচ্চি মেয়েগুলো কেমন যেন অচেনা হয়ে গেছে।

বিদায়ী শিক্ষার্থীরা সবাই কলেজ ইউনিফর্ম পরে এসেছে। দু’দিন পর তাদের পরীক্ষা। বিদায় অনুষ্ঠানের আগে তারা এতক্ষণ প্রবেশপত্র সংগ্রহ করেছে। এবছর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা অনেক দেরিতে শুরু হচ্ছে। সাধারণত এপ্রিল-মে মাসে পরীক্ষা হয়। কিন্তু এবছর বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা উপলক্ষে পরীক্ষা পিছিয়ে আগস্টে নিয়ে আসা হয়েছে। আমেরিকান সময়ের সাথে মিলিয়ে রাত জেগে খেলা দেখার মানুষের অভাব নেই আমাদের দেশে। ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার পতাকায় ছেয়ে গিয়েছিল অনেক বাড়ির ছাদ। কিন্তু আর্জেন্টিনার সমর্থকরা বেশি সুবিধা করতে পারেনি এবার। রুমানিয়ার সাথে হেরে গিয়ে নক্‌ড-আউট হয়ে গেছে আর্জেন্টিনা। আমি ধরতে গেলে কোন খেলাই দেখিনি। কিন্তু একটা দল নাকি সাপোর্ট করতেই হয়। তাই আমি ছিলাম জার্মানির সাপোর্টার। জার্মানি কোয়ার্টার ফাইনালে বুলগেরিয়ার কাছে হেরে গিয়ে বিদায় নেয়। এবছর ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, ইতালি রানার্স আপ। আমাদের শংকর স্যার ব্রাজিলের সাপোর্টার। তাঁর কাছ থেকে খেলার খবর বিস্তারিত পাওয়া যায়। ১৭ জুলাই বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষ হবার পরদিন শংকর স্যারের খুশি দেখে কে। দু-সপ্তাহ পর ১ আগস্ট থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু। এই ব্যাচটা অনেক বেশি সময় পেয়েছে এবার।

সাড়ে এগারোটার একটু আগে প্রিন্সিপাল স্যার, ভাইস-প্রিন্সিপাল ম্যাডামসহ অন্যান্য স্যার-ম্যাডামদের সাথে গিয়ে বসলাম অনুষ্ঠানের মঞ্চের এক পাশে। বারান্দায় দেয়ালে একটা বড় কাপড় টাঙিয়ে তার সামনে টেবিল পেতে অনুষ্ঠান। আমরা টিচাররা সবাই বসেছি বারান্দার এক পাশে। সামনে ঘাসের চত্বরে বেঞ্চ বসানো হয়েছে। রোদের মধ্যে ছেলে-মেয়েরা বসে আছে সেই বেঞ্চে। যথানিয়মে কিছু বিদায়ী উপদেশমূলক বক্তৃতা দেয়া হলো শিক্ষকদের পক্ষ থেকে। বিদায়ী ছাত্রদের পক্ষে বক্তৃতা দিলো মোরশেদ ইমতিয়াজ পাপ্পু। সে আমাদের চ্যাম্পিয়ন বিতার্কিক, কলেজের প্রিফেক্ট। বিতর্কের স্ক্রিপ্ট লেখা হয়, মুখস্ত করা হয়, এবং অত্যন্ত জোর দিয়ে যুক্তি প্রদান করা হয়, যুক্তি খন্ডন করা হয়। মূল উদ্দেশ্য থাকে – বিতর্কে জেতা। কিন্তু আজ পাপ্পু যা বললো তা কোন যুক্তি প্রদর্শনের জন্য নয়, জেতার উদ্দেশ্যেও নয়। তার কথাগুলো তার প্রাণের কথা। সাধারণত মাধ্যমিকের পর যারা কলেজে ভর্তি হয়, তারা খুব বেশি হলে দেড় বছর কলেজে পড়াশোনা করে – তারপর চলে যায়। তারা এত বেশি ব্যস্ত থাকে যে কলেজের জন্য আলাদা করে তেমন কোন মায়া তৈরি হয় না। অনেক বছর পর তারা যখন প্রতিষ্ঠিত হয় – তখন তাদের কলেজের স্মৃতি তাদের মনে পড়ে, ফেলে আসা দিনগুলিকে অনেক বেশি মধুর মনে হয়। কিন্তু তাদের বিদায়ের সময় অতটা হয় না। কিন্তু পাপ্পু এবং আরো অনেকের মধ্যে যেটা হয়েছে – সেটা হলো তারা সেই কেজি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বারো বছর ধরে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষালাভ করেছে। তাদের শৈশব-কৈশোরের সঙ্গী এই প্রতিষ্ঠান। আজ তারা এই বারো বছরের বাঁধন ছিঁড়ে যাচ্ছে – এই কষ্টটা পাপ্পুর কন্ঠে ছিল, উচ্চারিত শব্দে ছিল।

একটা ভাবগম্ভীর পরিবেশ তৈরি হবার পর সঙ্গীতানুষ্ঠান শুরু হলো। সুফিয়ান খুব ভালো গান করে। আরো কয়েকজন ছাত্রী খুব চমৎকার গান গাইলো – তাদের নামও জানি না। ওরা সম্ভবত আর্টসের। এরপর শুরু হলো ব্যান্ডের অনুষ্ঠান। ইয়াসির আরাফাত এবং তার সঙ্গী সাথীরা ব্যান্ড নিয়ে এসেছে প্রচন্ড ধুমধাম করে তাদের অগ্রজদের বিদায় জানানোর জন্য। এতক্ষণ ধরে যে একটা কষ্ট-কষ্ট পরিবেশ তৈরি হয়েছিল তা গিটার, কী-বোর্ড আর ড্রামের প্রচন্ড শব্দে মুহূর্তেই বদলে গেল। সাউন্ড-বক্স, মিক্সার ইত্যাদি যন্ত্রপাতি সেট করতেই অনেক সময় চলে গেল। প্রিন্সিপাল স্যার সাঈদ স্যারের কানে কানে কিছু একটা বললেন। সাঈদ স্যার মাইকে ঘোষণা করলেন – ঠিক দেড়টায় অনুষ্ঠান শেষ করতে হবে। তিনি মিলিটারি কায়দায় ইংরেজিতে বললেন,  “ওয়ান থার্টি পি-এম শার্প।“

কিন্তু ব্যান্ডের গান শুরু হলে কি আর ওসব মনে থাকে? সময় মনে হয় দ্রুত চলে যায়। “চলো না ঘুরে আসি অজানাতে, যেখানে নদী এসে থেমে গেছে …” এসব গান চেয়ারে বসে গম্ভীরভাবে কি শোনা যায়? কিন্তু মাস্টারি করতে গেলে এসব গানেও গম্ভীরভাবে স্থির হয়ে বসে থাকতে হয়। তাই রইলাম। ছেলে-মেয়েরাও টিচারদের সামনে নাচার সাহস পাচ্ছে না। কেবল হাত আর মাথা দোলাচ্ছে। কিন্তু তাও কি হবার আছে? সাঈদ স্যার তাঁর কর্তব্যে এক চুল ছাঁড় দেন না। ঠিক দেড়টা বাজার সাথে সাথে তিনি দ্রুত উঠে গিয়ে মাইক বন্ধ করে দিলেন। এরকম একটা গানের মাঝখানে মাইক বন্ধ করে দিতে পারার জন্য অনেক মানসিক শক্তি দরকার হয় যা এক ধরনের নিষ্ঠুরতা। সেরকম শক্তি আমার সারাজীবনেও অর্জিত হবে না।

>>>>>>>>>>>>
সকাল-বিকাল পরীক্ষার ডিউটি করতে হচ্ছে। বোর্ডের পরীক্ষায় ডিউটি করা একটি নতুন অভিজ্ঞতা আমার জন্য। সুচরিত স্যারকে পাঠানো হয়েছে অন্য কলেজে পরিদর্শক টিমের সদস্য হিসেবে। আমাদের কলেজে বহিরাগত পরিদর্শক হিসেবে এসেছেন সরকারি কমার্স কলেজের একজন প্রৌঢ় অধ্যাপক। আমাদের কলেজের শিক্ষার্থীদের সেন্টার আমাদের কলেজেই। পরীক্ষায় কলেজের সব টিচার ডিউটিতে থাকেন বলে পরীক্ষার দিনগুলিতে কলেজের ক্লাস বন্ধ থাকে। সকালের পরীক্ষা শেষ হয় ১টায়, বিকেলের পরীক্ষা শুরু হয় ২টায়, মাঝখানে এই এক ঘন্টায় লাঞ্চ করার পরেও আধঘন্টার মত সময় হাতে থাকে। সেই সময় আড্ডা চলে টিচার্স রুমে। ইন্দ্রাণী আর ইভাও মাঝে মাঝে এসে যোগ দেয় আমাদের আড্ডায়। আজ ইন্দ্রাণীর ডিউটি নেই। সে চলে গেছে। টিচার্স রুমে আমি, বিমল স্যার, সুপাল স্যার আর মহিউদ্দিন স্যার বসে কথা বলছি। একটু পরে বারান্দায় ইভাকে দেখে মহিউদ্দিন স্যার বললেন, “আসেন আপা আসেন।“

ইভা এমনভাবে রুমে ঢুকলো যেন মহিউদ্দিন স্যার ডেকেছেন বলেই অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে ঢুকতে হয়েছে। আমার সামনের চেয়ারে বসে সে প্রায় ফিসফিস করে বললো – “এক্সটার্নাল স্যারের কাছ থেকে পালিয়ে আসছি।“
“কী হয়েছে?”
“পরে বলবো।“
“তিনি কোথায়?”
“প্রিন্সিপাল স্যারের রুমে।“
“তুমি কেন গিয়েছিলে সেখানে?”
“প্রিন্সিপাল স্যার ডেকেছিলেন।“
বলতে বলতে তার চোখ ঘুরে গেল দরজার দিকে। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম এক্সটার্নাল স্যার আমাদের রুমে ঢুকছেন। মহিউদ্দিন স্যার তাঁকেও আহ্বান জানালেন, “আসেন স্যার, আসেন।“
“আপনাদের সবার ডিউটি আছে বিকেলে না?”
“জি স্যার” – বলে উঠে দাঁড়ালো ইভা।
“আরে ম্যাডাম, বসেন বসেন। একটু কথাবার্তা বলি” – বলতে বলতে এক্সটার্নাল স্যার ইভার গা ঘেঁষে পাশের চেয়ারে বসলেন। ভদ্রলোকের বয়স মনে হচ্ছে ষাটের কাছাকাছি। এখনো রিটায়ার করেননি – তার মানে অনেক বছর বয়স চুরি করেছেন সার্টিফিকেটে। মাথার সামনে টাক পড়েছে। পেছনের চুলে কলপ দিয়েছেন কয়েকদিন আগে। জুলপির গোড়ায় সাদা চুল উঁকি মারছে। ডান হাত দিয়ে টাকের পেছনের চুল ঠিক করছেন। দেখলাম আঙুলে বেশ বড় একটা পাথরের আঙটি। চোখদুটো ইভার দিকে। রুমে যে আমরা আরো কয়েকজন প্রাণী আছি – তাতে তাঁর কিছু যায় আসে না।
“আপনার কি স্যার বোর্ডে পোস্টিং?” – আমি তাঁর দৃষ্টি আমার দিকে ফেরানোর চেষ্টায় একটা অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করলাম।
তিনি যথেষ্ট বিরক্ত হয়ে আমার দিকে ফিরে উত্তর দিলেন, “বোর্ডে পোস্টিং হতে যাবে কেন? আমি কমার্স কলেজে আছি। বোর্ড আমাকে ঠিক করে দিয়েছে এই সেন্টার ভিজিট করার জন্য।“
আমি আর কী বলা যায় চিন্তা করছি। কিন্তু তার আগেই তিনি আবার ইভার দিকে ফিরে বলতে শুরু করলেন, “যা বলছিলাম তখন। মানুষের ভাগ্য থাকে হাতের রেখায়। আপনার হাত দেখে আমি বলে দিতে পারি আপনার ভবিষ্যৎ।“
ইভার কি হাতের রেখায় বিশ্বাস আছে নাকি? প্রিন্সিপাল স্যারের রুমে বসে কি হাতের রেখায় ভবিষ্যৎ দেখার কথা হচ্ছিল? সেখান থেকে পালিয়ে এসেছে ইভা এখানে। আর এই ভদ্রলোক এখানে চলে এসেছেন তার পিছু পিছু। গত কয়েকদিন থেকে তিনি এই কলেজে আসছেন – কিন্তু একবারও আমাদের রুমে আসেননি। সারাক্ষণ প্রিন্সিপালের রুমে থেকেছেন এবং পরীক্ষার হলে ঘুরেছেন।
“দেখি আপনার হাত?”
ইভার ভদ্রতাবোধ এত বেশি কেন? সে ডান হাত খুলে রাখলো টেবিলের উপর। এক্সটার্নাল ভদ্রলোক ইভার হাত নিজের হাতে টেনে হাতের রেখা দেখতে লাগলেন। আমি হাতের রেখায় বিশ্বাস করি না। আমার ধারণা ইভাও করে না। এই ভদ্রলোক যে হাতের রেখা দেখার নাম করে হাত ধরছেন তাতে কোন সন্দেহ নেই আমার।
“এখানে তো একটু অন্ধকার আছে স্যার। রেখা কি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে? চেয়ার নিয়ে বাইরে বারান্দায় বসবেন নাকি?”
এক্সটার্নাল স্যারের কান কি আমার দিকে আছে? তিনি আমার কথা মনে হয় শুনতেই পেলেন না। ইভা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি মনে মনে বললাম, তুই আমার দিকে তাকিয়ে আছিস কেন? নিজের হাত নিজে টেনে নিতে পারছিস না? কিন্তু ভদ্রতার দায় অত্যন্ত বেশি। ভদ্রতা দেখাতে গিয়ে কষ্টও পেতে হয় বেশি। মহিউদ্দিন স্যার কঠিন চোখে তাকিয়ে আছেন কমার্স কলেজের দিকে। কিন্তু কমার্স কলেজ শাহীন কলেজের ইংরেজি ম্যাডামের হাত নিজের হাতে নিয়ে ভাগ্যরেখা বিবেচনা করছেন।

“স্যার, ম্যাডামের হাত তো অনেকক্ষণ দেখলেন। এবার আমার হাতটা একটু দেখুন।“ – বলে আমি আমার ডান হাতটা বাড়িয়ে ইভার হাতটা আড়াল করে দিলাম। “স্যার, অঞ্জন স্যার বলেছেন আমার ভাগ্য বেশি খারাপ। আপনি যদি আমার হাতের ভাগ্যরেখাগুলো দেখে দিতেন।“ – বলতে বলতে আমার বাম হাতটাও এগিয়ে দিলাম। ভদ্রলোক আমার উপর বিরক্ত হয়ে ইভার হাত ছেড়ে দিতেই সে চেয়ার ছেড়ে উঠে চলে গেল রুম থেকে। এক্সটার্নাল ভদ্রলোক আমার হাতের দিকে একটুও না তাকিয়ে আমার দিকে ঘৃণাদৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন, “আপনার ভাগ্য আসলেই খারাপ। কারণ আপনার হাতে ভাগ্যরেখাই নেই।“
আমি আমার হাতদুটো গুটিয়ে নিতে নিতে বললাম, “আপনার অভিজ্ঞ চোখ স্যার। আপনি না দেখেই বলে দিতে পারেন কোথায় কী আছে।“

এক্সটার্নাল ভদ্রলোক উঠে প্রিন্সিপালের রুমে চলে গেলেন। তিনি স্পষ্টতই রেগে গেছেন। এই রাগের একটা বহিপ্রকাশ তিনি ঘটাবেন নিশ্চয়, কিন্তু কীভাবে ঘটাবেন বুঝতে পারছি না।
>>>>>
পরের দিন সকালেই বুঝতে পারলাম এক্সটার্নালের রাগ কোন্‌দিকে গড়ালো। প্রিন্সিপাল স্যারের রুমে জরুরি মিটিং ডাকা হলো। আমরা কলেজের টিচাররা সবাই উপস্থিত হলাম। কমার্স কলেজের এক্সটার্নাল স্যার বসে আছেন প্রিন্সিপাল স্যারের পাশে একটি চেয়ারে। প্রিন্সিপাল স্যার খুব রেগে আছেন। তিনি চিবিয়ে চিবিয়ে কঠিন ইংরেজি-বাংলা মিশিয়ে যা বললেন তা হলো – গতকাল বিকেলে একজন ছাত্র নকল করতে গিয়ে এক্সটার্নাল স্যারের হাতে ধরা পড়েছে। এক্সটার্নাল স্যার দয়াপরবশত সেই ছাত্রকে বহিস্কার করেননি। কিন্তু এটা নিঃসন্দেহে আমাদের গাফেলতি যে আমাদের উপস্থিতিতে ছাত্র নকল করার সাহস পেয়েছে। আর আমরা ছাত্রটিকে ধরতে পারিনি। ধরেছেন এক্সটার্নাল স্যার। আমরা কী করছিলাম পরীক্ষার হলে? প্রিন্সিপাল স্যার কঠিন ইংরেজিতে প্রায় ধমক দিয়ে বললেন, “হোয়াট দ্য হেল ইউ অয়ার ডুইং দেয়ার?”

আমরা কেউ কোন কথা বলছি না। এক্সটার্নাল স্যারের মুখে মৃদু হাসির রেখা। আমার বলতে ইচ্ছে করছে, ‘এক্সটার্নাল স্যার, আমি দুঃখিত যে আপনার হাতেচ্ছায় আমি বাধা দিয়েছিলাম গতকাল।‘ হাত ধরার ইচ্ছাকে এক শব্দে হাতেচ্ছা বলা যায় কি না তা রিফাৎ আরা ম্যাডাম কিংবা নাসরীন বানু ম্যাডাম ভালো বলতে পারবেন। কিন্তু এখন তো তা বলা যাবে না। কোন্‌ রুম থেকে ছাত্রটা ধরা পড়েছিল তাও আমি জানি না। এখন প্রশ্ন করাটাও উচিত হবে না। প্রিন্সিপাল স্যার রেগে আছেন। মানুষ রেগে গেলে যুক্তিবোধ হারিয়ে ফেলেন। তাই চুপ করে থাকা ভালো। কিন্তু রিফাৎ আরা ম্যাডাম চুপ করে থাকার মানুষ নন। তিনি প্রশ্ন করলেন, “যে ছেলেটা নকল করতে গিয়ে ধরা পড়েছে, তাকে বহিস্কার না করে ছেড়ে দেয়া হলো কেন?”

প্রিন্সিপাল স্যারের কাছে কোন উত্তর নেই এই প্রশ্নের। তিনি এক্সটার্নালের দিকে তাকালেন। এক্সটার্নাল তাঁর নিজের বাম হাতের আঙুলের আঙটি ডান হাতে ঘুরাতে ঘুরাতে বললেন, “ছেলেটাকে বহিস্কার করলে ছেলেটা প্রচন্ড মানসিক আঘাত পেতো। তাতে সে উলটাপালটা কিছু করে বসতে পারতো।“
“তাহলে স্যার আপনি আমাদের কী করতে বলেন? আমরা নকল ধরবো, আর ছেড়ে দেবো?”
প্রিন্সিপাল স্যার মনে হয় বুঝতে পারছেন যে তিনি অকারণেই রেগে গিয়েছেন। অথবা তিনি এক্সটার্নালকে দেখাতে চাচ্ছেন যে তিনি কত কড়া। নয়তো একজন বহিরাগতের সামনে নিজের কলেজের শিক্ষকদের এভাবে ধমকানো কোন নীতি কিংবা সৌজন্যবোধের মধ্যেই পড়ে না। তিনি কোন রকমে ঢোক গিলে বললেন, “আপনারা এমনভাবে ডিউটি করবেন যেন স্টুডেন্টরা কোন অন্যায় সুযোগ না পায়।“

আমি ইভার দিকে তাকাতেই চোখাচোখি হয়ে গেল। অনেক কষ্টে হাসি সামলালাম। এত গম্ভীর একটা পরিবেশে হেসে ফেলাটা ঠিক হবে না। এই হাটে এই এক্সটার্নাল ভদ্রলোকের হাঁড়ি যদি ইভা ভেঙে দেয় তো কী হবে কে জানে। ভদ্রলোক মনে হয় তখন রেগে গিয়ে শিক্ষকদেরই বহিস্কার করা শুরু করবেন।
প্রিন্সিপাল স্যারের রুম থেকে বের হয়ে টিচার্স রুমের দিকে আসার সময় নাসির স্যার বললেন, “প্রদীপ একবার গিয়ে রুমগুলো দেখে আসবে – যেন কেউ কোন কিছু লুকিয়ে রাখতে না পারে বেঞ্চের নিচে বা অন্য কোথাও।“
আমিও বেশ সিরিয়াস ভঙ্গিতে কয়েকটি রুম পরীক্ষা করলাম। নিচু হয়ে লো-বেঞ্চের নিচেও দেখলাম – কোথাও কিছু নেই। আমাদের শিক্ষার্থীরা নকল করবে – এটাই আমি বিশ্বাস করি না।
আর বিশ-পঁচিশ মিনিট পরে পরীক্ষা শুরু হবে। পরীক্ষার্থীরা আসতে শুরু করেছে। আমি টিচার্স রুমের দিকে ফিরে আসছি এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো নাসরিন। এই মেয়েটা খুবই সিরিয়াস টাইপের স্টুডেন্ট। টিচাররা আশা করছেন সে এবার স্ট্যান্ড করবে। কিন্তু কী হলো তার? উদ্ভ্রান্তের মত চেহারা হয়েছে তার – মনে হচ্ছে ভীষণ নার্ভাস হয়ে গেছে।
“কী হয়েছে?”
“আমার ক্যালকুলেটর কাজ করছে না। ঠিক করে দেন।“
তার ক্যালকুলেটর কাজ করছে না। সেটা বুঝলাম। কিন্তু আমি কীভাবে তা ঠিক করে দেবো? আর তার কেন ধারণা হলো যে আমি ক্যালকুলেটর ঠিক করে দিতে পারবো?
বললাম, “দেখি কী ক্যালকুলেটর?”
হাতে ধরা ক্যালকুলেটরটি এগিয়ে দিল সে। ক্যাসিও। অন করতেই দেখা গেলো মেমোরি মোডে আছে সেটা। সেই কারণেই অন্য কোন কমান্ড নিচ্ছে না। মেমোরি ক্লিয়ার করতে হবে। এটা ওটা টিপেটুপে দেখা গেলো সেটা আবার কাজ করতে শুরু করেছে। আমি কী করেছি কিচ্ছু জানি না। ওটার কী হয়েছিল তাও আমি ঠিক জানি না। কিন্তু ক্যালকুলেটর কাজ করছে। গণিতের পরীক্ষা শুরু হবে একটু পরে। নাসরিনের দিকে তাকালাম। তার বিবর্ণ হয়ে যাওয়া মুখে বর্ণ ফিরে আসছে, রক্তচলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।
“দেখো, তোমার ক্যালকুলেটর কাজ করছে। আমি কিন্তু কিছু করিনি। এটা এমনিতেই ঠিক হয়ে গেছে।“
“আমি জানি।“ – বলে ক্যালকুলেটরটি নিয়ে চলে গেল নাসরিন।
আমি জানি – মানে কী? সে কি জানে যে আমি কিচ্ছু জানি না? নাকি সে জানে যে ক্যালকুলেটরের আসলেই কিছু হয়নি। কিচ্ছু না হলে আমার কাছে নিয়ে আসা কেন?

2 comments:

  1. ইভা নামে আন্টিটিকে সাহায্য করার কাহিনিটি অসাধারণ। তোমার কান্ড কারখানাগুলো পড়তে আমার মজাই লাগে। তোমার মতো মানুষদের আমার তরফ থেকে অনেক ধন্যবাদ জানাই।

    ReplyDelete
    Replies
    1. অনেক ধন্যবাদ আমার পাঠককেও।

      Delete

Latest Post

Memories of My Father - Part 4

  This is my first photo taken with my father. At that time, I had just moved up to ninth grade, my sister was studying for her honors, and ...

Popular Posts