Friday 22 May 2020

ছিন্ন পাতার সাজাই তরণী - পর্ব ৫


5

"ম্যাডাম, গাড়ি আসছে" -
তীব্র ডাকে যেন কেঁপে উঠলো নিস্তব্ধ কলেজ ভবন।
"গাড়ি চলে আসছে" - বলে দ্রুত বের হয়ে গেলেন ছোলায়মান স্যার। সুপাল স্যার টেবিল থেকে তাঁর লাল রঙের চামড়ার ব্যাগটা হাতে তুলে নিতে নিতে বললেন, "চলেন, গাড়ি এসে গেছে।"  
টিচার্স রুমে আর কেউ নেই। আমিও সুপাল স্যারের পিছু পিছু বের হলাম। ছোলায়মান স্যার যেভাবে দৌড়াচ্ছেন তাতে কিছুটা ভয় পেয়ে গেলাম। এখানে কি এভাবে দৌড় দিয়ে গাড়ি ধরতে হয়? দৌড়ে গিয়ে চলন্ত বাসে উঠে যাওয়া আমার জন্য কোন ব্যাপারই না। আমাদের ইউনিভার্সিটির ১নং গেটে হাটহাজারি-নাজিরহাট রুটের বাস কখনোই পুরোপুরি থামত না। একটু স্লো করতো - আর আমরা দৌড়ে দৌড়ে উঠতাম, দৌড়ে দৌড়ে নামতাম। দরকার হলে এখানেও তা করা যাবে। কিন্তু গাড়ি কোথায়?
ছোলায়মান স্যার কলাপসিবল গেটের কাছে এসে দাঁড়িয়ে গেছেন। আমিও সুপাল স্যারের পিছু পিছু এসে কাছাকাছি দাঁড়ালাম। এখান থেকে সামনের রাস্তা দেখা যাচ্ছে। কলাপসিবল গেট থেকে প্রায় পঞ্চাশ ফুট দূরে কলেজের বাউন্ডারি দেয়াল। সেখানে আকাশী রঙের গেট। রাস্তার ওপারে 'শিরিষ শাখায় ফাগুন মাসে ক্লান্তিবিহীন ফুল ফোটানোর খেলা'
"এই টুনি, বাস আসছে বলে ডাকলা, বাস কোথায়?" - ছোলায়মান স্যার যাকে প্রশ্নটা করলেন তার দিকে তাকালাম। একটু দূরেই সে দাঁড়িয়ে আছে সপ্রতিভ এক কিশোরী শিক্ষার্থী - বড়জোর ক্লাস সেভেন বা এইট। এই পিচ্চি টুনটুনির গলায় এত জোর!
"বাস ওদিকে গেছে স্যার, এখনি আসবে।" - খুব মিষ্টি কন্ঠস্বর টুনির। সে যে এত জোরে চিৎকার করতে পারে তা নিজের কানে না শুনলে বিশ্বাসই করতে পারতাম না।
দেখলাম কয়েকজন ম্যাডাম এসে দাঁড়িয়েছেন গেটের কাছে। ভাইস-প্রিন্সিপাল ম্যাডাম সংযুক্তা ম্যাডাম ছাড়া আর কোন ম্যাডামের সাথে এখনও পরিচয় হয়নি। ভাইস-প্রিন্সিপাল ম্যাডাম বলেছিলেন আয়েশা ম্যাডামের সাথে কথা বলে নিতে। আয়েশা ম্যাডাম কোন্‌ জন কীভাবে জানবো? প্রথম দিনেই সবার সাথে পরিচয় হয়ে যাবে তা তো নয়। একই প্রতিষ্ঠানে এক সাথে কাজ করতে করতে হয়তো পরিচয় এমনিতেই হয়ে যাবে।
"বাস মনে হয় ওদিক থেকে ভর্তি হয়ে আসবে সুপালদা" - ছোলায়মান স্যার বললেন। কলেজের বাস আবার কোন্‌দিক থেকে ভর্তি হয়ে আসবে? ঠিক বুঝতে পারছি না বাসের ব্যাপারটা। জিজ্ঞেস করলাম, "কলেজের কয়টি বাস আছে?"
"কলেজের নিজস্ব কোন বাস নেই। বিমান বাহিনীর একটা বাস শহরে আসা-যাওয়া করে, আমরা সেটাতে উঠি।" - ছোলায়মান স্যার গম্ভীর মুখে উত্তর দিলেন মনে হলো কলেজের  নিজস্ব বাস না থাকাতে তিনি খুব মনোকষ্টে আছেন।
রাস্তায় গেটের সামনে একটি বড় বাস এসে দাঁড়ালো। আকাশী রঙের বাসের গায়ে সাদা অক্ষরে লেখা 'বাংলাদেশ বিমান বাহিনী' ছোলায়মান স্যার আর সুপাল স্যার দৌড়ে বাসে উঠে গেলেন। আমি ভাইস প্রিন্সিপাল ম্যাডামের দিকে তাকালাম। তিনিসহ ম্যাডামরা বাসে গিয়ে উঠলেন। তাঁদের পেছনে আমিও বাস প্রায় ভর্তি। দরজার কাছের কিছু সিট খালি রাখা আছে টিচারদের জন্য। ছোলায়মান স্যারের পাশে বসেছেন সুপাল স্যার। আমি সুপাল স্যারের পাশে বস পড়লাম। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলাম সামনের সিটে বসা কয়েকজন ছাড়া বাকিদের কারো গায়েই বিমান বাহিনীর ইউনিফর্ম নেই। বাসভর্তি মানুষ - অনেক কোলাহল হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এখানে কেউ কোন শব্দ করছে না। কথা বলছে ফিসফিস করে।
          প্রশস্ত রাস্তা ঝকঝকে পরিষ্কার। অনেকেই সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রচুর গাছপালা এই ঘাঁটির মধ্যে। অনেক নারকেল গাছ দেখতে পাচ্ছি। রাস্তার দুপাশে ঘন গাছপালা পেরিয়ে বাস এবার এগোচ্ছে বিশাল এক মাঠের মধ্য দিয়ে - প্যারেড গ্রাউন্ড। বিমানবাহিনীর সদস্যরা এখানে কুচকাওয়াজ করে, অনুশীলন করে। যেদিন নিয়োগ-পরীক্ষা দিতে এসেছিলাম সেদিন এই প্যারেড গ্রাউন্ডের এক পাশে আটকা পড়েছিলাম। অভিজ্ঞতাটা খুব একটা সুখকর ছিল না, ছিল উৎকন্ঠার।
          বাস গার্ড রুমের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে নিচে নেমে গেলেন। সুপাল স্যার ফিসফিস করে বললেন, "অফিসার আসবে মনে হয়।"
          "কোন্‌ অফিসার?"
          "দেখবেন একটু পর।"
 বাস যেখানে দাঁড়িয়েছে তার বাম পাশেই শাহীন সিনেমা হল। সিনেমার ডায়লগ শোনা যাচ্ছে এখান থেকে। নায়ক মান্না ভিলেন হুমায়ূন ফরিদীর কথা কাটাকাটি চলছে। মমতাজুর রহমান আকবর পরিচালিত 'প্রেম দেওয়ানা' চলছে - সকালে আসার সময় দেখেছি সিনেমার বড় বড় পোস্টার। এক সময় একটা সিনেমাও বাদ দিতাম না। চট্টগ্রাম শহরের সবগুলো সিনেমা হলে সিনেমা দেখেছি। এই হলেও সিনেমা দেখেছি আগে এখানে ভারতীয় সিনেমাও চলতো। বন্ধুদের সাথে এসে হিন্দি সিনেমা দেখেছি অনেকবার। শহর থেকে এত দূরে যে একটি সিনেমা হল আছে সেই খবর আমি ঠিকই পেয়েছি, কিন্তু এখানে যে একটি কলেজ আছে তা কিছুদিন আগেও আমি জানতাম না। এখন শিক্ষক হয়েছি বলে কি সিনেমা দেখা বাদ দিতে হবে? কলেজের শিক্ষার্থীরা কি এখানে সিনেমা দেখে? তাদের জন্য কি সিনেমার টিকেটের দাম কম? আলাদা কাউন্টার আছে শিক্ষার্থীদের জন্য? জেনে নিতে হবে। শাহীন কলেজের শিক্ষকদের শাহীন সিনেমায় সিনেমা দেখার ব্যাপারে কি কোন বিধিনিষেধ আছে? ইচ্ছে করছিলো সুপাল স্যারকে জিজ্ঞেস করি। কিন্তু কেমন যেন সংকোচ হলো। মনে হলো প্রথম দিনেই সিনেমা সংক্রান্ত প্রশ্ন করা উচিত হবে না।
বাসের ড্রাইভার গার্ডরুম থেকে ফিরে এসেছেন। উর্দি পরা কয়েকজন গার্ড বাসের আশেপাশে হাঁটাহাঁটি করছেন। ঘাঁটি থেকে বের হবার গেট এখনো বন্ধ। বাসের পেছনের দিকে ফিসফিস কথাবার্তা ক্রমে গুঞ্জনে পরিণত হতে শুরু করেছে। মিনিট পাঁচেক পর একটা জিপ এসে থামলো বাসের কাছে। সেখান থেকে একজন ছিপছিপে তরুণ লাফ দিয়ে নামলেন। গার্ডরা সবাই স্যালুট দিলেন তাকে। ইনিই সম্ভবত অফিসার। তরুণ অফিসার বাসে উঠার সাথে সাথে সামনের সারির কয়েকজন উঠে দাঁড়িয়ে গেলেন। একদম সামনের সিটে যাঁরা বসেছিলেন - সিট খালি করে  সবাই পেছনের কয়েকটি সিটে চলে এলেন। সামনের তিন জনের সিটে আরাম করে বসলেন তরুণ অফিসার একা।
          এবার গাড়ি গা-ঝাড়া দিয়ে উঠলো। ঘাঁটির গেট খুলে গেল, গাড়ি দ্রুত রাস্তায় বের হয়ে প্রচন্ড গতিতে ছুটে চললো কর্ণফুলির তীর ঘেঁষে শহরের দিকে।
          এই পথেই আমাকে কলেজে আসা-যাওয়া করতে হবে প্রতিদিন। একটা নতুন পথচলা শুরু হলো আজ থেকে। একটা নতুন পরিচয় - শিক্ষক; আজ থেকে আমি একটা কলেজে পড়াই, দেড় মাস আগেও আমি যে কলেজের নাম জানতাম না। কত কিছু ঘটে গেছে এই দেড় মাসের মধ্যে।
          আমাদের মাস্টার্সের রেজাল্ট দিয়েছে সেপ্টেম্বরে। সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে শাহীন কলেজের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখি দৈনিক পূর্বকোণে। দরখাস্ত জমা দিতে এসেছিলাম অক্টোবরের তিন তারিখ। কলেজের ঠিকানায় পোস্ট অফিস বিমানবন্দর দেখে ভেবেছিলাম কলেজটি বিমানবন্দরের আশেপাশে কোথাও হবে। আমি থাকি ফতেয়াবাদে এক মেসে শহর এলাকার  নম্বর বাস ফতেয়াবাদ থেকে মুরাদপুর চকবাজার আন্দরকিল্লা নিউমার্কেট টাইগারপাস আগ্রাবাদ সল্টগোলা ক্রসিং হয়ে এয়ারপোর্টের কাছ পর্যন্ত যায়। নম্বর বাসে উঠে লাস্ট স্টপে গিয়ে নেমে কলেজের কোন নাম নিশানা দেখতে না পেয়ে বিভিন্ন জনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম - কলেজটি শাহীন সিনেমা হলের কাছাকাছি। আরেকটি বাসে এসে সিনেমা হলের কাছে নামলাম। বি   এফ ঘাঁটি জহুরুল হক এর লোহার গেট বন্ধ। গেটের পাশে ছোট্ট জানালার মত যে মিনিগেট আছে - সেখান দিয়ে ঢুকতেই উর্দি পরা গার্ড জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার পরিচয়?" 
বড় কঠিন প্রশ্ন। কী আমার পরিচয়? স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন:  
"তোমরা শুধায়েছিলে মোরে ডাকি
'
পরিচয় কোনো আছে নাকি,
যাবে কোনখানে'?
আমি শুধু বলেছি,'কে জানে'!"
রবীন্দ্রনাথের ভূত প্রায় তাড়া করেছিল আমাকে। মুখ দিয়ে আরেকটু হলেই বেরিয়ে আসতো - "কে জানে!" কিন্তু উর্দিপরা প্রহরীর সাথে কাব্য করা নিষেধ, কারণ কাব্যবোধহীন প্রহরী প্রহার করতে পারে।  বললাম, "আমি চাকরির দরখাস্ত করতে যাচ্ছি শাহীন কলেজে।"
"গার্ড রুমে যান, ওখান থেকে পাস নেন।"
গেটের পাশে ছোট্ট একটা রুম। সেখানে বড় একটা রেজিস্টার খাতায় নাম ঠিকানা গন্তব্য উদ্দেশ্য ইত্যাদি লিখলেন একজন উর্দিপরা প্রহরী। তারপর আরেকটি রশিদ বইয়ের মত ছাপানো বইতে নাম ঠিকানা লিখে এক অংশ ছিঁড়ে আমার হাতে দিয়ে বললেন, "ফিরে যাওয়ার সময় এই পাস জমা দিয়ে যাবেন।"
"কলেজের পথ তো আমি চিনি না। আপনি কি একটু দেখিয়ে দেবেন কোন্‌ পথে যাবো?" - গার্ডরুমের গার্ডকে বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করলাম।
"সোজা গিয়ে ডানে যাবেন। প্যারেড গ্রাউন্ডের মাঝখান দিয়ে চলে যাবেন। তারপর ওখানে কাউকে জিজ্ঞেস করবেন।"
আমি তাঁর নির্দেশনা মেনে সোজা গিয়ে ডানে গেলাম। প্যারেড গ্রাউন্ডের মাঝখান পর্যন্ত গিয়ে বুঝতে পারছিলাম না কোন্‌দিকে যাবো। কারণ মাঝখান থেকে মনে হলো যে কোন দিকেই যাওয়া যাবে। কিছুটা দিকভ্রান্ত হবার মতো অবস্থা হলো। সে সময় দেখলাম এক লম্বা তরুণ বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে আসছে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, "ভাই, শাহীন কলেজে যাওয়ার রাস্তা কোন্‌দিকে?"
"শাহীন কলেজে কী দরকার?"
"দরখাস্ত জমা দেবো।"
"আমিও তো শাহীন কলেজে যাচ্ছি। চলো এক সাথে যাই।"
তরুণের আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে গেলাম। দুই লাইন কথা বলতে না বলতেই তুমি বলে সম্বোধন করছে। আমিও তুমি বলেই চালাই।
"কলেজ কি অনেক ভিতরে?"
"কাঠগড় দিয়ে আসলে কাছে। এদিক দিয়ে একটু হাঁটতে হবে। বেশি না, এক কিলোমিটারের মত।"
এক কিলোমিটার দেখতে দেখতে হাঁটতে হাঁটতে শেষ হয়ে গেল। কলেজে অনেক ভীড়। ছেলেটি ভীড়ের মধ্যে মিশে গেল। আমি কোন রকমে ভীড় ঠেলে অফিসরুমের জানালায় একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, "চাকরির দরখাস্ত কোথায় জমা দেবো?"
"আমাকে দেন" বলে ভদ্রলোক আমার হাতের খামটি নিয়ে ড্রয়ারে রেখে দিলেন। তারপর নিজের ফাইলপত্র ঘাঁটাঘাটি শুরু করলেন। আমার কাজ শেষ। আবার সোজা হেঁটে গার্ডরুমে এসে পাস জমা দিয়ে বের হয়ে এলাম।
বিজ্ঞপ্তিতে লেখা ছিল অক্টোবরের তারিখ সকাল ৯টায় নিয়োগ পরীক্ষা হবে। অনেক সকালে উঠে বাস ধরে আটটার আগেই পৌঁছে গেলাম শাহীন গেটে। কলেজের পথ 'দিন আগে চেনা হয়েছে। গার্ড রুম থেকে পাস নিয়ে সোজা গিয়ে ডানে গিয়ে প্যারেড মাঠের কাছে যেতেই উর্দি পরা গার্ড থামিয়ে দিলো। মাঠে প্যারেড চলছে। দলে দলে বিমান সৈনিক কুচকাওয়াজ করছেন মাঠ জুড়ে। লোক চলাচল বন্ধ। টেনশান হচ্ছে। সোয়া আটটা বেজে গেছে। এখন হাঁটতে শুরু করলেও আরো মিনিট পনের লাগবে পৌঁছাতে। জিজ্ঞেস করলাম, "কতক্ষণ চলবে এই প্যারেড?"
"'টা পর্যন্ত।"
সর্বনাশ। 'টায় তো পরীক্ষা শুরু।
"ভাই, আমার তো পরীক্ষা আছে শাহীন কলেজে। কোনভাবেই কি যাওয়া সম্ভব হবে না? "
"প্যারেড শেষ হলে যেতে পারবেন।"
বুঝলাম গার্ডের ক্ষমতা নেই কিছু করার। যে নিয়ম আছে সেটা তো সবাইকেই মানতে হবে। পরবর্তী পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধরে বিমানবাহিনীর জওয়ানদের শারীরিক কসরত দেখলাম আর একটু পরপর ঘড়ি দেখলাম 'টা বাজার সাথে সাথে সৈনিকেরা লাইন ধরে মাঠ ত্যাগ করতে শুরু করলো। এদিকের রাস্তা খুলে দেয়া হলো। আমি যত জোরে দৌড়ানো যায় - দৌড় লাগালাম। কিন্তু ঝামেলা যখন হয় তখন সবকিছুতেই হয়। কেড্‌স পরেই পুরো ইউনিভার্সিটি জীবন কাটিয়ে দিয়েছি। এখন চাকরির ইন্টারভিউ দেয়া উপলক্ষে নতুন চামড়ার জুতো কিনেছি - এবং সেটা আজকেই প্রথম পরে এসেছি। সেটা পরেই দৌড় লাগিয়েছি। যা হবার তাই হলো -  প্রথম পঞ্চাশ মিটার যাওয়ার পরেই পায়ের আঙুলে ফোস্কা পড়ে গেলো। এখন কী করা যায়? এই জুতা পায়ে আর একশ মিটার হাঁটলে আমি আর হাঁটতেই পারবো না। কিন্তু আমাকে পরীক্ষার হলে পৌঁছাতে হবে। এই ঘাঁটির ভেতর কোন যানবাহন নেই। বাইরে থেকে টেক্সি নিয়ে এলে হয়তো পাস নিয়ে ঢুকতে দেয়, কিন্তু আমি তো তা আনিনি। এখন? সাধারণ যুক্তি প্রয়োগ করতে হবে। সমস্যা কী? সমস্যা হলো জুতা। সমস্যার সমাধান হলো জুতা খুলে ফেলা মোজা পায়ে হাঁটলে কোন সমস্যা নেই। বাধানো রাস্তা - খুব পরিষ্কার। জুতা জোড়া খুলে হাতে নিয়ে মোজা পায়ে শেষ পর্যন্ত কলেজে যখন পৌঁছলাম - তখন নয়টা বিশ। লিখিত পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে।

বিমান বাহিনীর এক অফিসার কলেজের বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলেন। আমাকে জুতাহাতে প্রবেশ করতে দেখে একটু অবাক হলেও খুব স্বাভাবিকভাবে জিজ্ঞেস করলেন, "অ্যানি প্রোবলেম?"
"পায়ে ফোস্কা প্রোবলেম।"
"আপনি কি ক্যান্ডিডেট?"
"জ্বি। প্যারেডের কারণে..."
"ওকে, কাম উইথ মি। পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে। হুইচ সাবজেক্ট?"
"ফিজিক্স"
"লেকচারার?"
"জ্বি।"
"ওকে, কাম উইথ মি।"
তাঁর পিছন পিছন একটা রুমে গেলাম। একজন ম্যাডাম সেই রুমে ছিলেন। আমাকে জুতাহাতে ঢুকতে দেখে চোখ বড় করে ফেললেন। অফিসারটি আমাকে ফিজিক্সের প্রশ্ন দিতে বলার পর তাঁর চোখ কিছুটা ছোট হলো। আমার মতো আরো কয়েকজন আটকে পড়েছিলেন কিন্তু তাদের কেউ ফিজিক্সের রুমে এলো না। দেখলাম ফিজিক্সের প্রার্থীতে রুম ভর্তি। কোন্‌দিক দিয়ে এলো সবাই?
বেঞ্চের নিচে ফ্লোরে জুতা রেখে আস্তে আস্তে লিখতে শুরু করলাম। মিনিট দশেক পর শুনলাম কে যেন ফিসফিস করে বলছে, "এই প্রদীপ, আলোর প্রতিসরণাঙ্কের সূত্রটা বল তো।"
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখি আমার পাশের বেঞ্চে বসে আছে আমার ক্লাসমেট আবুল হোসেন খান।

No comments:

Post a Comment

Latest Post

Memories of My Father - Part 4

  This is my first photo taken with my father. At that time, I had just moved up to ninth grade, my sister was studying for her honors, and ...

Popular Posts