Friday 17 April 2020

জগদীশচন্দ্র বসু - পর্ব ১৯



বসু বিজ্ঞান মন্দির

নিজের জন্মদিনকে খুবই গুরুত্ব দিতেন জগদীশচন্দ্র। নিজের ৩৬তম জন্মদিনে তিনি তাঁর বৈজ্ঞানিক গবেষণা শুরু করেন আনুষ্ঠানিকভাবে। তেমনি বিজ্ঞান-মন্দির উদ্বোধনের দিনও ঠিক করেছিলেন তাঁর ৫৮ তম জন্মদিনে। কিন্তু সময়মতো নির্মাণ-কাজ শেষ না হওয়ায় এক বছর পিছিয়ে উদ্বোধনের দিন ঠিক করা হলো তাঁর ৫৯তম জন্মদিনে। বিজ্ঞান-মন্দির প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি চলছিলো প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অবসর গ্রহণের পর থেকে। কিন্তু তাঁর বিজ্ঞান-মন্দিরের স্বপ্ন ছিল সেই প্রথমবার বৈজ্ঞানিক সফরে ইওরোপ যাবার পর থেকেই। তাঁর সেই স্বপ্নের বীজে নিয়মিত উৎসাহ দিয়ে অঙ্কুরিত করতে যিনি সাহায্য করেছিলেন তিনি নিবেদিতা।
          প্রফেসর ভাইন্‌সকে লেখা এক চিঠিতে (১৫/১১/১৯১৬) বিজ্ঞান-মন্দিরের পরিকল্পনা সম্পর্কে জগদীশ লিখেছিলেন:
          "একদিন পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের মানুষের মধ্যে প্রীতিবন্ধনের একটা সৌন্দর্য ছিল। আমি আশা করি, সেদিন আবার ফিরে আসবে। যেখানে বিজ্ঞানের নামে এক সঙ্কল্প সাধনের জন্যে বহুসংখ্যক কর্মীর সহযোগ ঘটবে। এমন একটি মিলন-প্রাঙ্গণ গড়ে তোলবার মধ্য দিয়েই সে বিশ্বজনীন প্রীতিবন্ধন সম্ভব হবে। বিদেশী হয়েও আমি আপনাদের বিদ্যালয়গুলিতে যে অকৃপণ দাক্ষ্যিণ্য ও রয়্যাল সোসাইটি থেকে যে উৎসাহ পেয়েছি, তা হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। যাহোক, ভারতবর্ষে এমন একটি গবেষণা-কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন ছিল, যাতে এই দেশের তরুণতর বিজ্ঞান-কর্মীরা আমার মত বাধাবিঘ্নের সম্মুখীন না হয়। তাই আমার স্ত্রী ও আমি এই গবেষণা-মন্দির প্রতিষ্ঠার জন্যে সর্বস্ব উৎসর্গ করে দিচ্ছি। আমার জীবদ্দশায় আমি স্বোপার্জিত অর্থে এই প্রতিষ্ঠানের কর্মধারাকে অব্যাহত রাখবো। যদি পাশ্চাত্য দেশে আমার বৈজ্ঞানিক গবেষণা পূর্ণ স্বীকৃতি লাভ করে তবে আমি আশা করি, আমার মৃত্যুর পরে অপর কেহ প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যকে সফল করতে এগিয়ে আসবেন।"
          বিজ্ঞান-মন্দির উদ্বোধনের সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন আমেরিকায়। তিনি একটা চিঠিতে জগদীশচন্দ্রকে লিখেছিলেন:
            "তোমার বিজ্ঞান-মন্দিরে প্রথম সভা উদ্বোধনের দিনে আমি যদি থাক্‌তে পারতুম তা হলে আমার খুব আনন্দ হতো। বিধাতা যদি দেশে ফিরিয়ে আনেন তাহলে তোমার এই বিজ্ঞান-যজ্ঞশালায় একদিন তোমার সঙ্গে মিলনের উৎসব হবে একথা মনে রইল। এতদিন যা তোমার সংকল্পের মধ্যে ছিল আজকে তার সৃষ্টির দিন এসেছে। কিন্তু এ  তো তোমার একলার সঙ্কল্প নয়, এ আমাদের সমস্ত দেশের সঙ্কল্প, তোমার জীবনের মধ্যে দিয়ে এর বিকাশ হতে চলল। জীবনের ভিতর দিয়েই জীবনের উদ্বোধন হয় - তোমার প্রাণের সামগ্রীকে তুমি আমাদের দেশের প্রাণের সামগ্রী করে দিয়ে যাবে - তারপর থেকে সেই চিরন্তন প্রাণের প্রবাহে আপনিই সে এগিয়ে চলতে থাকবে।"
          ১৯১৭ সালের তিরিশে নভেম্বর স্যার জগদীশ্চন্দ্র বসুর ৫৯তম জন্মদিনে প্রতিষ্ঠিত হলো বসু বিজ্ঞান মন্দির। উদ্বোধনী বক্তৃতার শুরুতেই স্যার  জগদীশচন্দ্র ঘোষণা করলেন আমার স্ত্রী ও আমি এই গবেষণাগারের জন্য সর্বস্ব দান করছি। আক্ষরিক অর্থেই তাঁদের সবকিছু তাঁরা দান করেছিলেন বিজ্ঞান পসারের জন্য।

বসু বিজ্ঞান মন্দির (১৯১৭)


মৌর্য যুগের ভারতীয় স্থাপত্যশৈলীতে ধূসর বেলেপাথরে নির্মিত মূল গবেষণা-ভবন দেখতে মন্দিরের মতই লাগে। পুরো প্রকল্পে জগদীশচন্দ্রের শৈল্পিক মনের স্বাক্ষর। প্রবেশপথের পাশে ছোট উদ্যান। সেখানে লজ্জাবতীর লতা। একদিকে ছোট ফোয়ারা। তার উপরে জপমালা হাতে একটি নারীমূর্তি। মন্দিরে প্রবেশ করতেই একটি আয়তাকার ঘর। সেখানে জগদীশচন্দ্রের উদ্ভাবিত যন্ত্রগুলো রাখা আছে। এই ঘরের সাথে লাগানো বিশাল বক্তৃতা-কক্ষ।

বিজ্ঞান-মন্দিরের বক্তৃতা-কক্ষ


সেখানে মঞ্চের উপর দেয়ালে লাগানো শিল্পী নন্দলাল বসুর আঁকা রূপকচিত্র - অন্বেষণ। তরবারি হাতে এক দৃপ্ত পুরুষ - মানুষের প্রজ্ঞা, তার সাথে মেয়েটির হাতে বাঁশী - কল্পনার প্রতীক। এই ছবির নিচে সোনা-রূপা-তামার সূর্য-মূর্তি।


নন্দলাল বসুর আঁকা ছবি - অন্বেষণ


বিজ্ঞান-মন্দিরের সভাকক্ষে সন্ধ্যায় বিজ্ঞান-মন্দিরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হলো। বৈদিক মন্ত্র পড়ে আচার্য-পদ গ্রহণ করেন জগদীশচন্দ্র। তারপর তাঁর সহকারীদেরও বৈদিক মন্ত্রে দীক্ষা দেন তিনি। বিজ্ঞানের সাথে ধর্মবিশ্বাসের কোন বিরোধ সেদিন কেউ কল্পনাও করেননি। তারপর এ উপলক্ষে লেখা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান "মাতৃভূমির-পূণ্য-অঙ্গন করো মহোজ্জ্বল আজি হে" সমবেত কন্ঠে গাওয়া হয়। তারপর তামার পাতায় জগদীশচন্দ্রের নিজ হাতে লেখা উৎসর্গ-পত্র নিবেদন করা হয়।


জগদীশচন্দ্রের নিজের হাতে তামার পাতায় লেখা উৎসর্গপত্র[1]


বিজ্ঞান-মন্দিরের উদ্বোধন উপলক্ষে জগদীশচন্দ্র যে মর্মস্পর্শী ভাষণ দিয়েছিলেন তা বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান ও সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। পরে সেটা প্রবন্ধাকারে 'নিবেদন' শিরোনামে অব্যক্ত বইতে প্রকাশিত হয়েছে। তাছাড়া আরো অনেকগুলো পত্রিকা ও সাময়িকীতেও প্রকাশিত হয়েছে তা।
          জগদীশচন্দ্র তাঁর বক্তৃতায় বলেন, "আজ যাহা প্রতিষ্ঠা করিলাম তাহা মন্দির, কেবলমাত্র পরীক্ষাগার নহে।" ... ...
          "বত্রিশ বৎসর হইল শিক্ষকতার কার্য গ্রহণ করিয়াছি। বিজ্ঞানের ইতিহাস ব্যাখ্যায় আমাদের বহুদেশবাসী মনস্বীগণের নাম স্মরণ করাইতে হইত। কিন্তু তাহার মধ্যে ভারতের স্থান কোথায়? শিক্ষাকার্যে অন্যে যাহা বলিয়াছে সেই সকল কথাই শিখাইতে হইত। ভারতবাসীরা যে কেবল ভাবপ্রবণ ও স্বপ্নাবিষ্ট, অনুসন্ধানকার্য কোনদিনই তাহাদের নহে, সেই এক কথাই চিরদিন শুনিয়া আসিতাম। বিলাতের ন্যায় এদেশে পরীক্ষাগার নাই, সূক্ষ্ম যন্ত্র নির্মাণও এদেশে কোনোদিন হইতে পারে না, তাহাও কতবার শুনিয়াছি। তখন মনে হইল, যে ব্যক্তি পৌরুষ হারাইয়াছে কেবল সে-ই বৃথা পরিতাপ করে।" ... ...
          "যে সকল আশা ও বিশ্বাস লইয়া আমি এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করিলাম তাহা কি একজনের জীবনের সঙ্গেই সমাপ্ত হইবে? একটিমাত্র বিষয়ের জন্য বীক্ষণাগার নির্মাণে অপরিমিত ধনের আবশ্যক হয়; আর এইরূপ অতি বিস্তৃত এবং বহুমুখী জ্ঞানের বিস্তার যে আমাদের দেশের পক্ষে অসম্ভব, একথা বিজ্ঞজন মাত্রেই বলিবেন। কিন্তু আমি অসম্ভাব্য বিষয়ের উপলক্ষে কেবলমাত্র বিশ্বাসের বলে চিরজীবন চলিয়াছি; ইহা তাহারই মধ্যে অন্যতম। 'হইতে পারে না' বলিয়া কোনোদিন পরাঙ্মুখ হই নাই; এখনও হইব না। আমার যাহা নিজস্ব বলিয়া মনে করিয়াছিলাম তাহা এই কার্যেই নিয়োগ করিব। রিক্তহস্তে আসিয়াছিলাম, রিক্ত হস্তেই ফিরিয়া যাইব; ইতিমধ্যে যদি কিছু সম্পাদিত হয় তাহা দেবতার প্রসাদ বলিয়া মানিব। আর একজনও এই কার্যে তাঁহার সর্বস্ব নিয়োগ করিবেন, যাঁহার সাহচর্য আমার দুঃখ এবং পরাজয়ের মধ্যেও বহুদিন অটল রহিয়াছে। বিধাতার করুণা হইতে কোনোদিন একেবারে বঞ্চিত হই নাই। যখন আমার বৈজ্ঞানিক কৃতিত্বে অনেকে সন্দিহান ছিলেন তখনও দুই-এক জনের বিশ্বাস আমাকে বেষ্টন করিয়া রাখিয়াছিল। আজ তাঁহারা মৃত্যুর পরপারে।"[2]
          এই 'দু-একজন' বলতে জগদীশচন্দ্র যে নিবেদিতাকে বুঝিয়েছেন তা বুঝতে কারো অসুবিধা হলো না। বসু বিজ্ঞান মন্দিরপ্রতিষ্ঠার স্বপ্ন জগদীশ একা দেখেননি, নিবেদিতাও দেখেছিলেন এই স্বপ্নের গবেষণাগারটি প্রতিষ্ঠা করার জন্য নিবেদিতার উৎসাহ, উদ্যম, সংকল্প ছিল আকাশচুম্বী কিন্তু মন্দিরের কোথাও নিবেদিতার নাম নেই মন্দিরের উদ্বোধন উপলক্ষে যে স্মারকপুস্তক প্রকাশিত হয়েছে সেখানে একবারের জন্যও উচ্চারিত হয়নি নিবেদিতার নাম কিন্তু এজন্য জগদীশচন্দ্র বসুকে 'অকৃতজ্ঞ' বলার আগে আমাদের দেখতে হবে 'বসু বিজ্ঞান মন্দির'-এ নিবেদিতার উপস্থিতি আদৌ আছে কি না
          বিজ্ঞান মন্দিরের প্রবেশপথে স্থাপিত হয়েছে জপমালা হাতে এক নারীর মূর্তি - The Lady of The Lamp”. শিল্পী নন্দলাল বসু এই মূর্তির ডিজাইন করেন অনেকেই এটাকে নিবেদিতার মূর্তি বলে মনে করেন
          বিজ্ঞান-মন্দিরের শীর্ষে যে পতাকা উড়ছে তাতে যে বজ্রচিহ্ন আছে তাও নিবেদিতার পছন্দের চিহ্ন ১৯০৪ সালে বুদ্ধগয়ায় গিয়ে সেখানের মন্দিরের গায়ে বজ্রচিহ্ন দেখে নিবেদিতা বজ্রকে ভারতের জাতীয় প্রতীক হিসেবে ভেবেছিলেন হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীতে আছে দধীচি মুনি নিজের শরীর থেকে হাড় বের করে বজ্র তৈরি করে দানব দমন করতে সাহায্য করেছিলেন দধীচির আত্মত্যাগের এই প্রতীক বিজ্ঞান-মন্দিরের পতাকায় স্থান দিয়েছেন জগদীশ শুধু নিবেদিতার কারণে
          প্রবেশপথে যে ফোয়ারা আছে সেই ফোয়ারার নিচে অতি সংগোপনে জগদীশ রেখে নিয়েছেন নিবেদিতার দেহভস্ম জগদীশের সহকারী . বশীশ্বর সেন দার্জিলিং থেকে নিবেদিতার দেহভস্ম নিয়ে এসেছিলেন তাঁর নির্দেশে ফোয়ারা তৈরি হবার সময় জগদীশ তাঁকে বলেন কিছুটা দেহভস্ম যেন ফোয়ারার নিচে রেখে দেন শীশ্বর সেন একটা ছোট কৌটায় নিবেদিতার দেহভস্ম রেখে দেন ফোয়ারার নিচে আর কিছু রেখে দেনLady of The Lamp’ মূর্তির নিচে জগদীশ, অবলা বশীশ্বর সেন ছাড়া সেই সময় আর কেউ জানতেন না ব্যাপারটা[3]
          ফোয়ারার পাশে একটি শেফালীগাছ লাগানো হয়েছিল সেই গাছটির বীজ এনেছিলেন নিবেদিতা জগদীশচন্দ্রের সাথে অজন্তা গুহায় বেড়াতে গিয়ে বাগবাজার স্কুলে সেই বীজ রোপন করে কিছু চারা তৈরি করেছিলেন নিবেদিতা এই গাছটির চারা নিবেদিতারই। জগদীশচন্দ্র নিবেদিতার নাম সরাসরি উচ্চারণ না করলেও তাঁর বিজ্ঞান-মন্দিরে স্থাপন করে গেছেন নিবেদিতার চিহ্ন 
          জগদীশচন্দ্র বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠা করেই প্রথমে একটি তত্ত্বাবধায়ক কমিটি গঠন করেন। কমিটির সদস্য ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ভূপেন্দ্রনাথ বসু, সুধাংশুমোহন বসু, সতীশরঞ্জন দাস এবং জগদীশচন্দ্র নিজে। কমিটিতে কোন ইংরেজকে রাখা হলো না এবং সিদ্ধান্ত নেয়া হলো যে বিজ্ঞান মন্দিরের কোন ব্যাপারে সরকারের কোন কর্তৃত্ব থাকবে না।
          বিজ্ঞান-মন্দিরের কাজকর্ম চালানোর জন্য প্রচুর অর্থের দরকার। জগদীশচন্দ্র তাঁর স্নেহভাজন ডাক্তার নগেন্দ্র চন্দ্র নাগকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন:
            "আমি বর্তমানে যে পরিমাণ অর্থের সংস্থান করতে পেরেছি, তা বিজ্ঞান-মন্দিরের প্রয়োজনের তুলনায় কিছু অতিরিক্ত নয়। জমি ও গবেষণা-ভবনের জন্যে দু'লাখ টাকা আর এক লাখ টাকার এন্‌ডাউমেন্ট। এই সঞ্চিত অর্থ থেকে মাসিক যে আয় হবে, তা মেরামতি কাজ, ট্যাক্স, বিদ্যুতের খরচা ইত্যাদিতে শেষ হয়ে যাবে। সব কিছু নির্ভর করছে আমার জীবনের স্থায়িত্বের উপর।
          ... ... আমি যদি আরও পাঁচ বছর বেঁচে থাকি, তবে এই বিজ্ঞান-মন্দিরকে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গবেষণা-কেন্দ্ররূপে গড়ে তুলবো। কিন্তু জানি না ভবিষ্যতে কি হবে। আমি সম্প্রতি অসুখ থেকে সেরে উঠেছি। অতিরিক্ত পরিশ্রমে রোগের পুনরাক্রমণ হতে পারে। ...
          ... ... ভবিষ্যতে এই বিজ্ঞান-মন্দির যখন একটা অমিত শক্তির উৎস হয়ে উঠবে, তখন হয়তো অনেকে এর সঙ্গে যুক্ত থেকে নিজেকে স্মরণীয় করবার জন্য আগ্রহশীল হয়ে উঠবেন।"
          জগদীশচন্দ্র ঘোষণা করেছেন বিজ্ঞান মন্দিরের কোন গবেষণা-কর্মের প্যাটেন্ট করানো হবে না। তাঁর নিজের যে তিনটি প্যাটেন্ট করানো হয়েছিল তাও নবায়ন না করানোর কারণে চলে গেছে। সুতরাং গবেষণা থেকে কোন অর্থ উপার্জনের পথ রইলো না। জগদীশচন্দ্র জনগণের প্রতি আহ্বান জানালেন বিজ্ঞান মন্দিরের জন্য অর্থ সাহায্য করতে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহাত্মা গান্ধী সহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের রাজা-মহারাজারা সাড়া দিলেন জগদীশচন্দ্রের আহ্বানে। কাশিম-বাজারের মহারাজা স্যার মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী বিজ্ঞান-মন্দিরের জন্য দুই লক্ষ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন। পাতিয়ালা, বরোদা, কাশ্মীর প্রভৃতি দেশীয় রাজারাও অনেক প্রতিশ্রুতি দিলেন।  
          ১৯১৮ সালের জানুয়ারি থেকে অর্থ সংগ্রহের জন্য ধারাবাহিক বিজ্ঞান বক্তৃতা দিতে শুরু করলেন জগদীশচন্দ্র। বৈজ্ঞানিক বক্তৃতা শোনার জন্য টিকেটের দাম ধার্য হলো ২ টাকা ও ১ টাকা। প্রদর্শনীর বিনিময়ে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা প্রদর্শনের ব্যবস্থাও হলো। টিকেটের দাম ধার্য করা হলো ২৪ টাকা, ১২ টাকা, ৮ টাকা ও ৪ টাকা। ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেলো এসব কার্যক্রমে।
          বিদেশী জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশের বাধা-বিঘ্ন সম্পর্কে জগদীশচন্দ্রের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পেরেছিলেন নিজস্ব একটা বিজ্ঞান জার্নাল থাকা দরকার বিজ্ঞান-মন্দিরে। সে উদ্দেশ্যে সিদ্ধান্ত হলো বসু বিজ্ঞান-মন্দির থেকে নিয়মিত বিজ্ঞান-জার্নাল Transactions of the Bose Research Institute প্রকাশিত হবে। প্রকাশনার মাপকাঠি নির্ধারিত হবে Proceedings of the Royal Society-তে প্রকাশিত গবেষণাপত্রের অনুরূপ।
            মৃত্যুর আগপর্যন্ত জগদীশবসু এই জার্নালের প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে একথাও ঠিক যে তাঁর জীবদ্দশায় এই জার্নালে শুধুমাত্র বিজ্ঞান-মন্দিরের গবেষণা-কর্মই প্রকাশিত হয়েছে।
            ১৯১৮ থেকে ১৯২১ সালের মধ্যে জগদীশচন্দ্র তাঁর Life movements in Plants নামে বৃহৎ বইটি চার খন্ডে প্রকাশ করেন। এর আগে বিজ্ঞান-মন্দিরের ট্রানজেকশানে প্রকাশিত হয় প্রবন্ধগুলো।



[1] উৎসর্গপত্রে জগদীশচন্দ্র সংবৎ লিখেছেন। সংবৎ হলো রাজা বিক্রমাদিত্য প্রবর্তিত অব্দ। খ্রিস্টাব্দের সাথে ৫৬ বা ৫৭ বছর যোগ করলে সংবৎ পাওয়া যায়। সংবৎ ১৯৭৪ = ১৯১৭ ইংরেজি।
[2] অব্যক্ত, পৃ ১৪২
[3] লোকমাতা ১ম/২য় পৃঃ ৩৯১



No comments:

Post a Comment

Latest Post

Memories of My Father - Part 6

  The habit of reading books was instilled in us from a young age, almost unknowingly. There was no specific encouragement or pressure for t...

Popular Posts