Saturday 5 June 2021

স্বপ্নলোকের চাবি - পর্ব ২৩

 



স্বপ্নলোকের চাবি – ২৩

সকাল ছ’টা বাজার আগেই জৈষ্ঠ্য মাসের সূর্য রেগে যায়। তার তীব্র রোদের আলোর সাথে তাপও ঢুকে পড়ে আমার রুমের পুবদিকের জানালার কাচ, পর্দা, আর মশারি ভেদ করে। তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গের এই দৃশ্যমান অংশটা সম্পর্কে আমরা ক্লাসরুমে পড়বো যদি কোনদিন থার্ড ইয়ারে উঠতে পারি। যে গতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজকর্ম চলছে তাতে মনে হয় এই থার্ড ইয়ার আসতে আসতে আলো আরো কয়েক আলোকবর্ষ পথ পাড়ি দেবে। ১৯৮৫ সালের উচ্চমাধ্যমিকের ব্যাচ আমরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৯৮৮ সালে অর্থাৎ এই বছর আমাদের অনার্স শেষ হবার কথা। অথচ আমরা এখনো নিউ সেকেন্ড ইয়ার। ফার্স্ট ইয়ারের সাবসিডিয়ারি পরীক্ষা শেষ হয়েছে মাত্র ক’দিন আগে। পরীক্ষা শেষ হলে আমার পড়ালেখার শীত-নিদ্রা শুরু হয়। এই প্রচন্ড গ্রীষ্মেও সেই শীতনিদ্রা চলছে।

ঘুম ভেঙেছে অনেক আগে। কিন্তু বিছানা ছাড়তে ইচ্ছে করছে না। ইচ্ছে না করাটাই স্বাভাবিক। এই বিছানাই তো আমাদের জীবনের সবচেয়ে দরকারি জায়গা। বিছানাতেই আমাদের জন্ম, স্বাভাবিক মৃত্যু হলে তা হবে বিছানাতেই। এই বিছানাতেই আমরা হাসি, এই বিছানাতেই শুয়ে শুয়ে আমরা প্রচন্ড কষ্টে কাঁদি। অসুস্থ অবস্থায় নিজের শরীর যখন নিজের পরম-শত্রু হয়ে উঠে, তখন বিছানাই আমাদের কিছুটা হলেও আরাম দেয়। আমাদের ক্লান্তি দূর করার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জায়গা এই বিছানা। মানুষের যা সব গোপন ভালোবাসা, বোঝাপড়া, জীবনের অঙ্কুর – সবই ঘটে এই বিছানাতেই।

বিছানা সম্পর্কে এসব কথাবার্তার সবটুকুই আমার চিন্তাপ্রসূত নয়। শংকর-এর চৌরঙ্গী উপন্যাসে এরকম কিছু পড়ার পর মাথায় এসেছে। বাছবিচারহীনভাবে গল্প-উপন্যাস পড়া শুরু করেছি সে অনেক বছর হয়ে গেল। পরীক্ষার সময়টুকুতে গল্প-উপন্যাস পড়াটা কিছুটা পার্ট-টাইম হয়ে গিয়েছিল। এখন আবার ফুল-টাইমে ফিরে এসেছে। যে আগ্রহ নিয়ে বইয়ের পাতার গল্প পড়ি – সেই আগ্রহ সিলেবাসের পড়ায় থাকলে কতই না ভালো হতো। কিন্তু সিলেবাসের পড়া পড়তে হয় বাধ্য হয়ে, পরীক্ষায় পাস করার জন্য।

লেখাপড়া জানা বিখ্যাত ব্যক্তিরা লেখাপড়ার উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনেক ভালো ভালো কথা বলে থাকেন। তাঁরা বলেন – লেখাপড়ার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জ্ঞানার্জন। প্রকৃত শিক্ষিত মানুষ নাকি জ্ঞানী হয়ে থাকেন, জ্ঞান মানুষকে বিনয়ী করে তোলে, বিবেকবান করে তোলে ইত্যাদি। এগুলি সব কথার কথা বলে মনে হয় আমার। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জ্ঞানের ডিব্বা বললে কম বলা হয় – আসলে সবাই বড় বড় জ্ঞানের জাহাজ তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু তাঁদের সবাই কি খুব বিনয়ী? খুব বিবেকবান? যদি না হয়ে থাকেন, তাহলে জ্ঞানের সাথে বিনয় আর বিবেকের সম্পর্ক স্থাপন করার চেষ্টা কেন করা হয়?

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছি দুই বছরের বেশি হয়ে গেল। এর মধ্যে সিলেবাসের পড়া যতটুকু পড়েছি তার সবটুকুই পড়েছি পরীক্ষায় পাস করার জন্য। বিষয়বস্তুর প্রতি ভালোবাসা জন্মানোর ব্যাপারটা ক্লাসরুম থেকে এখনো হয়নি। ভবিষ্যতে হবে কি না জানি না। স্যাররা আমাদের ভেতর জ্ঞান-অর্জনের আকাঙ্খা জাগিয়ে দেয়ার বদলে প্রায় প্রতিক্ষণই মনে করিয়ে দেন যে আমরা পদার্থবিজ্ঞান পড়ার কতটুকুই না অনুপযুক্ত। আমাদের স্যার-ম্যাডামদের অনেকেই এই ডিপার্টমেন্ট থেকে পাস করে আমাদের শিক্ষক হয়েছেন। তাঁদের কথাবার্তা শুনলে মনে হয় তাঁরা  শুধুমাত্র পরীক্ষায় ভালো করার উদ্দেশ্যে পড়াশোনা করেননি,  জ্ঞান-অর্জনের জন্যই পড়ালেখা করেছিলেন। হতেও পারে। আবার এমনও হতে পারে যে একবার শিক্ষক হতে পারলেই জ্ঞানের বাতি আপনা-আপনি জ্বলে উঠে। পঠিত জ্ঞানগুলি তখন আপনাআপনি অর্জিত জ্ঞান হয়ে যায়।

কিন্তু সেই অর্জিত জ্ঞানের আলোয় আমরা আলোকিত হতে পারছি না কেন? আলোর প্রাকৃতিক ধর্ম আমাদের বেলায় বদলে যাচ্ছে কেন? নাকি আমরা এতটাই নিকষ কালো যে সব আলো শোষণ করে নিচ্ছি! তা হলেও আমার আপাতত কোন সমস্যা নেই। কিন্তু এটা সত্য যে সিলেবাসের পড়াগুলি পড়ছি পরীক্ষায় পাস করার জন্য। আর সিলেবাসের বাইরে যেসব বই পড়ছি – সেগুলি পড়ছি পড়তে ভালো লাগছে বলে। সেগুলি থেকে জ্ঞান লাভ করার কোন আকাঙ্খা নেই বলেই হয়তো জীবন সম্পর্কে অনেক দার্শনিক ব্যাপার জেনে যাচ্ছি।

এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার। উপন্যাসের পাতায় গল্পের ফাঁকে ফাঁকে যখন কিছু দার্শনিক কথাবার্তা থাকে, সেগুলিকে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। গল্প ভুলে গেলেও আমরা সেই কথাগুলি মনে রাখি। আবার বিজ্ঞান কিংবা দর্শনের বইতে জটিল তত্ত্বের ফাঁকে যখন গল্প থাকে – তখন তত্ত্বের চেয়েও সেই গল্পটাই মনে থাকে বেশি। যেমন নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ সূত্রটা আমরা ঠিকভাবে না জানলেও - নিউটনের মাথায় একদিন আপেল পড়েছিল – এই গল্পটা সবাই জানি।

চীনা দার্শনিক লাও শি’র দর্শনের বই পড়তে দিলে আমি কত পৃষ্ঠা পর্যন্ত পড়ার ধৈর্য রাখতে পারবো জানি না – কিন্তু এখলাস গতকাল চলে যাবার সময় এই দার্শনিকের কিছু দার্শনিক উক্তি বলেছিল – যা আমার মাথার ভেতর স্থায়ীভাবে ঢুকে গেছে। এখলাস প্রচন্ড হাসিখুশি, সবকিছু নিয়ে মজা করতে পছন্দ করে। আবার মজা করতে করতেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে ফেলে। হাই থিংকিং, প্লেইন লিভিং – বলতে কী বোঝায় তা এখলাসকে দেখেই বোঝা যায়। এখলাসের জন্য মনটা কেমন করছে। গতকাল সে এই বিল্ডিং ছেড়ে হলে চলে গেছে। এই বিল্ডিং-এ আমাকে সে-ই এনেছিল।

পরশু রাতে এখলাস বললো সে হলে চলে যাচ্ছে। হলে চলে যাবার প্ল্যান তার অনেকদিন আগে থেকেই ছিল এটা সে বললেও আমার কেন জানি মনে হচ্ছিলো তা পুরোপুরি ঠিক নয়। এই বিল্ডিং-এর আশেপাশে  কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে অনেকগুলি টিউশনি করে সে। নিজের পড়াশোনার খরচ সে নিজেই জোগাড় করে। এখন হল থেকে এসেই তাকে সেই টিউশনিগুলি করতে হবে। আস্তে আস্তে হলের কাছে টিউশনি জোগাড় হলে হয়তো এগুলি ছেড়ে দেবে। হলে সিট পেয়ে গেলে এই বিল্ডিং-এ এত কষ্ট করে থাকার মানে হয় না। আমিও সোহরাওয়ার্দীতে সিটের দরখাস্ত করেছিলাম। প্রথমবার তো দিলই না। দ্বিতীয় বার করলাম কিছুদিন আগে ফার্স্ট ইয়ারের রেজাল্টের পর। এবারও আমাদের ইয়ারের অনেককে সিট দেয়া হলেও আমি সিট পাইনি। হলের অফিসে গিয়ে সেকশান অফিসারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম – কিসের ভিত্তিতে সিট বন্টন করা হয়েছে?

“মেরিট বেসিসে সিট দেয়া হয়েছে।“ দিয়াশলাইয়ের কাঠি ভেঙে দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে খুবই তাচ্ছিল্যের সাথে উত্তর দিয়েছিলেন টেকো অফিসার। বলার সময় মস্তকবিস্তৃত কপালে ভাঁজ ফেলে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়েছিলেন যেন মেরিট নামক পদার্থটি আমার ধারেকাছেও নেই।

“আমার ফার্স্ট ইয়ারের রেজাল্ট তো তেমন খারাপ নয়। সিট পেয়েছে এমন অনেকের চেয়েও তো আমার রেজাল্ট ভালো।“ – এর সপক্ষে আমি কমপক্ষে পাঁচটি প্রমাণ দেখাতে পারি। কিন্তু আমার কথা শেষ হবার আগেই দেখলাম একজন শিবিরনেতা আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে বললেন, “স্যাররা তো আপনার চেয়ে বেশি বোঝে তাই না? নেক্সট বার আবার ট্রাই কইরেন।“

হলের সবগুলি অফিসে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিযুক্ত অফিসার থাকলেও মূল নিয়ন্ত্রণ ছাত্রশিবিরের নেতাদের হাতে। সারাক্ষণই তাদের কেউ না কেউ হলের অফিসে বসে থাকে। এই অবস্থায় এখলাস আমানত হলে সিট পেয়ে গেছে তাতে আমি খুশি। কিন্তু এখান থেকে এখলাসের চলে যাবার পেছনে যে অন্য কারণ আছে তা জানতে পেরেছি মুকিত ভাইয়ের কাছ থেকে। এই বিল্ডিং ছেড়ে চলে যাবার সিদ্ধান্তটা তাকে নিতে হয়েছে মাহমুদভাইয়ের সাথে দ্বন্দ্বের কারণে। সেন্স অব হিউমার যাদের কম – তারা বিদ্রুপ আর কৌতুকের পার্থক্য ধরতে পারে না। এখলাসের সূক্ষ্ম কৌতুকে আমরা প্রাণখুলে হাসলেও মাহমুদভাই কেমন যেন গম্ভীর হয়ে যেতেন। তাদের দুজনের মধ্যে একটা চাপা চোরাস্রোত পরস্পরের বিপরীতদিকে প্রবাহিত হচ্ছিল তা বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু সেটা যে এত গভীর তা জানতাম না।

কাল এখলাসকে বলেছিলাম, “তুমি আমাকে আসল ব্যাপারটা বলোনি।“

“আসল ব্যাপার এটাই – আমি হলে সিট পেয়ে গেছি। এখানে কার সাথে কী হয়েছে তাতে গুরুত্ব দেয়ার কিছু নেই। লাও শি’র কথাটা জানো তো - “When I let go of what I am, I become what I might be.” 

লাও শি’র কথাগুলি কত সুন্দর - আমি যদি এখন যা আছি তাকেই আঁকড়ে ধরে রাখি, তাহলে আমি যা হতে চাই – তা তো হতে পারবো না। এই কথাগুলিই হয়তো রবীন্দ্রনাথ একটু অন্যভাবে বলেছেন,

“নিজের ছায়া মস্ত করে

অস্তাচলে বসে বসে

আঁধার করে তোল যদি

জীবনখানা নিজের দোষে”

 

এখলাসের মুখে কখনো কারো নিন্দা শুনিনি। এই মহৎ গুণ সে কোত্থেকে পেয়েছে আমি জানি না। চিরকালীন দার্শনিকদের বাণী তো অনেকেই পড়ে, মানতে পারে ক’জন?

কিসের যেন ভেজা ভেজা পোড়া গন্ধ আসছে। আমার জানালার বাইরে সাদা ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে। ধড়পড় করে বিছানা ছাড়লাম। জানালা খুলে দেখি একটা লম্বা বাঁশের মাথায় কাপড় জড়িয়ে আগুন লাগিয়েছে কুদ্দুস।

“কী রে কুদ্দুস, কী করো?”

“ঢোলকলমী পুরিদ্দি বদ্দা।“

কুদ্দুস মহাউৎসাহে বর্ণনা দিচ্ছে সে কী করছে। ঢোলকলমী গাছে আগুন দিচ্ছে যেন এই গাছের পাতা গায়ে লেগে আমার মৃত্যু না ঘটে। আমার জানালার এত কাছে যে ঢোলকলমী গাছ আছে সেটা সে আগে দেখেনি। নইলে আরো আগে সাবাড় করে ফেলতো।

আমার মনটা কেমন করে উঠলো। দশ-বারো বছরের এই বাচ্চা ছেলেটা আমার জন্য চিন্তা করছে। পাঁচ ছ’দিন আগে হঠাৎ করে গুজব রটে গেছে যে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঢোলকলমী গাছের পাতা গায়ে লেগে অনেক মানুষ মারা গেছে। নিতান্তই নিরীহ গুল্মটাইপের এই গাছগুলি অযত্নে পথের পাশে জন্মে। বড় বড় সবুজ পাতা, সুন্দর বেগুনি রঙের ফুল। এই গাছের পাতা গায়ে লাগলেই নাকি মানুষ মরে যাচ্ছে। পত্রিকায় প্রতিদিনই মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে। এরপর আবার জানা গেলো – পাতা নয়, পাতাতে যে পোকা হয় – সেই পোকা গায়ে লাগলে মানুষ সাথে সাথে বিষাক্ত সাপের দংশনের মতো মুখে ফেনা এসে ছটফট করতে করতে মারা যায়। ব্যাপারটার কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই। কিন্তু পুরোপুরি গুজব – তাও জোর দিয়ে বলতে পারছিলাম না। আমার জানালা থেকে একটু দূরে এরকম একটা ঝোপ আছে। একদিকে বৈজ্ঞানিক অবিশ্বাস, আবার মনের ভেতর কিছুটা ভয় নিয়ে বেশ দোলাচলে ছিলাম এই ক’দিন। কিন্তু গতকাল টিভিতে অনেকবার দেখিয়েছে যে এটা নিতান্তই গুজব। আমাদের ইউনিভার্সিটির প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলাম স্যার বিবৃতি দিয়েছেন – ঢোলকলমীর গুজবে কান না দিতে। টিভিতে বিজ্ঞানীরা ঢোলকলমীর পাতা এবং পোকা হাত দিয়ে ঘষে দেখিয়েছেন সেখান থেকে বিপদের কোন সম্ভাবনা নেই। কুদ্দুস এই খবরটা এখনো পায়নি। তাই আমাকে ঢোলকলমীর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য নিজে নিজে বাঁশ জোগাড় করে, তার মাথায় কাপড় বেঁধে দূর থেকে আগুন দিয়ে পোড়াচ্ছে ঢোলকলমী গাছ। গত ক’দিন থেকে সারা দেশেই এরকম চলছে। মানুষ কেরোসিন পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলছে ঢোলকলমী গাছ।

দরজা খুলে দৌড়ে গেলাম রুমের পেছন দিকে কুদ্দুসের কাছে। “আগুন দিতে হবে না কুদ্দুস, ঢোলকলমী গাছ থেকে কিছুই হয় না।“

দেখলাম কুদ্দুসের পেছনে মাহমুদমিয়াসহ স-মিলের আরো কয়েকজন শ্রমিক দাঁড়িয়ে আছে। কাজ ফেলে ঘটনা দেখার জন্য দাঁড়িয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আমাদের উৎসাহের কোন শেষ নেই। আমার কথা শুনে কুদ্দুস অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে থমকে দাঁড়ায়।

“এই দ্যাখো, আমি হাত দিয়ে ঢোলকলমী গাছের পাতা ধরছি, আমার কিছু হবে না।“

“না বদ্দা, ন ধইরযন, মরি যাইবাইন গই।“ – কুদ্দুসের গলায় আঁকুতি।

“কিচ্ছু হবে না, এই দ্যাখো।“ – ঢোলকলমী গাছের পাতাগুলি এখনো ভেজা ভেজা। কয়েক জায়গায় আগুনের ছ্যাঁকা লেগেছে। গুজব রটার পর এই প্রথম এই পাতাগুলি ধরলাম – তাও কালকে টিভিতে দেখেছি বলে। নইলে যে গুজবে প্রাণ যাবার ভয় থাকে – সেই গুজবে ভয় পায় না এমন মানুষ কি আছে?

কুদ্দুস অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। বললাম, “তুমি এসেও ধরে দেখতে পারো। কিচ্ছু হবে না।“

কুদ্দুস এখনো ভয় পাচ্ছে। তার পেছনে যারা দাঁড়িয়ে আছে – তারাও আশ্চর্য হয়ে গেছে। আমি তাদেরকে কৃতিত্ব দেখানোর জন্য কয়েকটি পাতা ছিঁড়ে নিলাম, কয়েকটি ফুলও। অন্যের আবিষ্কারের কৃতিত্ব নিজের নামে চালিয়ে দেয়ার সুযোগ পেলে কে আর ছাড়তে চায়!

আমি রুমে ফিরে আসার পর জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম কুদ্দুসের নেতৃত্বে অনেকেই এসে ঢোলকলমী গাছের পাতা ছিঁড়ছে। যেভাবে ভীড় জমেছে সেখানে – মনে হচ্ছে আগুন থেকে রক্ষা পেলেও গাছটি এদের হাত থেকে রক্ষা পাবে না, কিছুক্ষণের মধ্যেই পত্রশূন্য হয়ে যাবে ওটা।

ইউনিভার্সিটিতে গেলাম। আমাদের ক্লাস পুরোদমে চলার কথা। শিবিরের কল্যাণে এখন ক্যাম্পাসে যেতে হলে কয়েকবার যানবাহন বদলাতে হয়। ট্রেন থেকে নেমে হেঁটে গেট পার হয়ে বাসে উঠতে হয়। সকালের ট্রেন আসার পর বাসগুলি ঠিকই ক্যাম্পাসে এসেছে। ক্যাফেটরিয়া থেকে নাস্তা করে আসার সময় হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই, শিবিরের কয়েকজন কর্মী এসে সায়েন্স ফ্যাকাল্টির মেইন কলাপসিবল গেট টেনে তালা দিয়ে দিলো। আমরা গেটের কাছে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজায় তালা লাগানো যে কত বড় ধৃষ্ঠতা তা বোঝার ক্ষমতা এদের আছে বলে মনে হয় না। কীসের জন্য এই হঠাৎ অবরোধ আমরা জানতেও পারলাম না। এই অবরোধ কি শুধু আজকের জন্য, নাকি অনির্দিষ্টকাল সেটাও জানি না।

 নির্বাচনের আগে এরশাদ আন্দোলন থেকে বাঁচতে হঠাৎ দেশে জরুরি আইন দিয়েছিলেন। সেই আইনে সংবিধানের সব মৌলিক অধিকার স্থগিত করা হয়েছিল। নিজের মনের মতো নির্বাচন করার পর নিজের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করে জরুরি আইন তুলে নেয়া হয়েছে। নাগরিকদের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার পুনস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু শিবিরের কার্যকলাপ আবারো প্রমাণ করে দিচ্ছে যে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির-ঘোষিত জরুরি অবস্থা চলছে। এখানে তারা ছাড়া আর কারোরই মৌলিক কিংবা যৌগিক কোন অধিকারই নেই।

ফিরে আসা ছাড়া আর কিছু করার নেই। লাইব্রেরির গেটেও তালা লাগিয়ে দিয়েছে। এতগুলি তালা কি তারা নিজেরা কিনেছে, নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালাগুলিরই চাবি তারা নিয়ে নিয়েছে জানি না। এরকম প্রশ্ন করা যায় কি না তাও জানি না।

ধর্মঘটের খবর পেয়ে কি না জানি না, একটু আগেই যে বাসগুলি এসেছে সেগুলি হঠাৎ উধাও হয়ে গেছে। প্রচন্ড রোদ মাথায় নিয়ে শহীদ মিনার চত্বর পেরিয়ে কাটা-পাহাড়ের মধ্য দিয়ে মাটির রাস্তা ধরে  হাঁটতে হাঁটতে রেল স্টেশনে এলাম। এখান থেকে এক নম্বর গেটে যাবার বাসগুলিতে এখন টইটুম্বুর ভীড়। একটা বাসের বাম্পারে করে এক নম্বর গেটে এসে নামলাম।

ছাত্রছাত্রীদের প্রচন্ড ভীড় রাস্তায়। শহরগামী বাস ধরার জন্য রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে সবাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দিয়ে হাটহাজারি, নাজিরহাট, রাঙ্গামাটি রুটের বাস যায়। এখানে কোন যাত্রীছাউনি নেই। এই বাসগুলির কোনটাই নিতান্ত বাধ্য না হলে এখানে থামতে চায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতি এত চরম অবহেলা, অবজ্ঞা ও অপমান যে বাসের ড্রাইভার ও কন্ডাকটররা করতে পারে – তা নিজের চোখে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না। এখানে কাউকে নামানোর জন্য বাসের গতি সামান্য কমলেই প্রায় দৌড়ে গিয়ে বাসের হ্যান্ডেল ধরে লাফ দিয়ে বাসে উঠতে হয়। ব্যালেন্স রাখতে না পারলে যে কোন সময়েই বাসের চাকার নিচে চলে যাবার সম্ভাবনা থাকে।

পরপর অনেকগুলি বাস দ্রুত চলে গেল। অনেকসময় এখানে না থামার জন্য এত জোরে বাস চালিয়ে নিয়ে যায় যে রাস্তা পার হতে গিয়ে যে কেউ বাসের নিচে চাপা পড়তে পারে। শহর থেকে আসার সময় প্রায় প্রতিদিনই বাসের কন্ডাক্টরদের সাথে শিক্ষার্থীদের ঝগড়া হয়। অথচ শিক্ষার্থীদের সবাই জানে – বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিদিন যতটা বাস ভাড়া করে নিয়ে আসে ক্যাম্পাসের ভেতরে চালানোর জন্য – শুধুমাত্র এক বছরের ভাড়া দিয়েই অনেকগুলি বাস কেনা যায়। বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের বাসেই শিক্ষার্থীদের নিয়ে আসতে পারতো শহর থেকে। কিন্তু তাতে তো বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন সেক্টরের সাথে যারা যুক্ত – তাদের ব্যক্তিগত লাভ খুব একটা হতো না।

অনেকক্ষণ পর একটা বাস থামলো – তাও আমাদের থেকে অনেক দূরে গিয়ে। দৌড়ে বাসে ওঠার ব্যাপারে যীশুর আশ্চর্য দক্ষতা আছে। অবশ্য তার পায়ে উন্নতমানের বিদেশী ক্যাডস থাকে, আমার মতো বাটার স্যান্ডেল থাকে না – দৌড়াতে তার সুবিধা হয়। আজও সে দৌড়ে গিয়ে বাসের হ্যান্ডেল ধরতে না পারলেও পেছনের বাম্পারের একটা রড ধরে ফেললো। কিন্তু আমি আর নাথ তখনো অনেক দূরে। সে রেগে গিয়ে বাসের রড ছেড়ে দিয়ে আমাদেরকে পূর্ণগর্ভা নারীর সাথে তুলনা করে গজগজ করতে লাগলো।

শহরগামী বাসে উঠতে না পেরে ক্যাম্পাসগামী বাসে উঠে ট্রেনস্টেশনে এসে নামলাম। শিবিরকে ধন্যবাদ যে তারা ট্রেনের ইঞ্জিনের চাবিও নিয়ে নেয়নি। ট্রেনেও প্রচন্ড ভীড়। দাঁড়াবার জায়গা পেলাম ইঞ্জিনে। এই ট্রেনটি অন্যদিন এতক্ষণে চলে গিয়ে আবার রওনা দেবার কথা। আজ দেরি করছে। ক্যাম্পাসে ধর্মঘট – তাই আজ আর কোন ট্রেন আসবে না। প্রায় দুই ঘন্টা পর ফতেয়াবাদ স্টেশনে নেমে আমি আর নাথ গল্প করতে করতে মেসের দিকে আসছি। মেইন রোডের কাছাকাছি এসে দেখলাম রাস্তার পাশে জমিতে একটি বাস পুরোপুরি উল্টে আছে। চাকাগুলি আকাশের দিকে, চারপাছে ছড়িয়ে আছে কাচ, রাস্তার উপর চাপচাপ রক্তের দাগ। কাছে এসে বাসটি দেখেই চিনতে পারলাম। এই সেই বাস – যেটাতে যীশু প্রায় উঠে গিয়েছিল, আমরা উঠতে চেয়েছিলাম। এখনো কিছু উৎসুক মানুষ বাসের কাছাকাছি রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে আছে। তাদের কাছে জানতে পারলাম – অন্য কোন গাড়ির সাথে সংঘর্ষ হয়নি। বাসটি নিজেই প্রচন্ড গতিতে এসে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে জমিতে পড়ে গিয়ে উল্টে গেছে। একজন ছাত্রের তৎক্ষণাৎ মৃত্যু হয়েছে। আরেকজনের হাটু ভেঙে হাড় বের হয়ে গেছে। ওরা এমনভাবে বর্ণনা দিচ্ছিলো যেন তাদের চোখের সামনেই সবকিছু ঘটেছে। হয়তো ঘটেছেও। এখান থেকে আমাদের বিল্ডিং-এর দূরত্ব খুব বেশি হলে একশ মিটার। কিন্তু এই একশ মিটার রাস্তা হেঁটে আসতে গিয়ে মনে হচ্ছে শরীরে আর শক্তি নেই। কেবলই মনে হচ্ছে  আর একটু হলেই এই বাসে আমরাও থাকতাম। স্বার্থপরতা মানুষের মজ্জাগত। যে ছেলেটি মারা গেলো, যারা আহত হলো – তাদের কথা, তাদের পরিবারের কথা বাদ দিয়ে আমরা কেবল আমাদের নিজেদের কথাই ভাবছি।

<<<<<<<<<আগের পর্ব

No comments:

Post a Comment

Latest Post

Memories of My Father - Part 2

  In our childhood and even in our adulthood, there was no tradition of celebrating birthdays. We didn't even remember when anyone's...

Popular Posts